চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (৫ম পর্ব)

বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি বিপ্লব বিরোধী, চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর চিন্তাধারা বিরোধী, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিরোধী শ্রেণী সহযোগিতার ও সংশোধনবাদী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটি তার মাদুরাই বৈঠকে শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশের অগ্রগতির পথ বেছে নিয়েছে। [ইতিমধ্যে তারা তাদের অষ্টম কংগ্রেসে তাদের ঐ মাদুরাই লাইন অনুমোদন করিয়ে নিয়েছে – প্রকাশক]।

আন্তর্জাতিক মত-বিরোধ সম্পর্কে অনেক বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও আসলে তারা মহান চীনের পার্টি ও চেয়ারম্যান মাও-এর সমস্ত সিদ্ধান্তকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ধনতন্ত্রের বিকাশ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নীরব থেকে তারা কমরেড স্তালিনের শেষ লেখা সোভিয়েত-এ সমাজবাদের আর্থিক সমস্যাবলী (Economic problems of socialism in USSR) – এর বক্তব্যও সোজাসুজি অস্বীকার করলো এবং মহান চীনের পার্টির সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করলো এই ঘোষণা করে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন এখনো সমাজতান্ত্রিক শিবিরেই আছে। এই কথা বলার তাৎপর্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম প্রশ্নে সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের প্রস্তাবকে সমর্থন জানানো এবং আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সোভিয়েত অর্থনৈতিক সাহায্য ও ব্যবসা বাণিজ্যের প্রগতিশীল ভূমিকা দেখা এবং তাকে সমর্থন জানানো। কেন্দ্রীয় কমিটি কৃষক সংগ্রাম সম্বন্ধে সোজাসুজি মেনশেভিক রাজনৈতিক মত গ্রহণ করেছে। এবং কৃষক সংগ্রামের বিরোধীতা করেছে।

স্বভাবতঃই কেন্দ্রীয় কমিটির মাদুরাই বৈঠক পার্টিকে এক সংশোধনবাদী বুর্জোয়া পার্টিতে পরিণত করেছে; তাই এই নীতির বিরোধীতা করা ছাড়া বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের অন্য কোন পথ নেই। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কমিটি মাদুরাই প্রস্তাব গ্রহণ করায় একথা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে কেন্দ্রীয় কমিটি বিপ্লবী নয়।

কাজেই বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীকে এই কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। মাদুরাই প্রস্তাবের যে বাগাড়ম্বরতা কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির মধ্যকার বিপ্লবী অংশের চোখে ধুলো দেবার জন্যেই করেছে এবং গোপন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের দালালী করার জন্যই করেছে।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা আদর্শগত আলোচনা করে একটি মাত্র উদ্দেশ্যে, তা হল তাদের নিজের দেশের বাস্তব অবস্থায় সেই আদর্শের প্রয়োগ কি ভাবে হবে তার জন্যে। সাধারণভাবে কোন আদর্শগত আলোচনারই কোন বিপ্লবী তাৎপর্য নেই, কারণ সত্যের যাচাই হবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগের মারফৎ। কেন্দ্রীয় কমিটি আন্তর্জাতিক মত-বিরোধকে একটি বিমূর্ত চিন্তাধারা (abstract concept) হিসাবে আলোচনা করেছে, নির্দিষ্টভাবে (Concretely) যা করেছে তা হলো সোজাসুজি সোভিয়েত সংশোধনবাদকেই ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে একমাত্র পথ হিসাবে ঘোষণা করেছে। কাজেই তাদের মহান চীনের পার্টির বিরোধীতা করতে হয়েছে।

তাদের বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পারমাণবিক অস্ত্র মজুত সম্বন্ধে বক্তব্যে। তারা সোভিয়েত ও মার্কিন পারমাণবিক একচেটিয়া মালিকানার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেনি, কেবল সমালোচনা করেছে “সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনকে পারমাণবিক জ্ঞানের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সাহায্য করেনি কেন” বলে। পারমাণবিক বোমা আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসাবে কাজ করছে। সেক্ষেত্রে সোভিয়েত ও মার্কিন সহযোগিতা যে প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব প্রভূত্বের জন্য সহযোগিতা-এই স্পষ্ট কথাটি নানা কথার প্যাঁচে গোপন করা হয়েছে।

সোভিয়েত ও মার্কিন পারমাণবিক জ্ঞানের আদান প্রদানের মত ঘটনা কেন্দ্রীয় কমিটির চোখে পড়েনি এবং তা থেকে যে সিদ্ধান্তে আসা উচিত ছিল তাও তারা আসেনি । কারণ তারা আন্তর্জাতিক মত-বিরোধকে বুর্জোয়া জাতীয় স্বার্থের বিরোধ হিসাবে দেখছে বলেই আন্তর্জাতিক মত বিরোধের আসল তাৎপর্য অর্থাৎ এই বিরোধ যে প্রকৃতপক্ষে মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের বিশুদ্ধতা রক্ষার এবং বিপ্লবী মতের সাথে বিপ্লব বিরোধী মতের বিরোধ-সে হিসাবে দেখছে না।

ভারত প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র সম্বন্ধে কোন কথা না বলে তারা “কংগ্রেসের এখনও জনসমর্থন আছে” বলার মধ্যে দিয়ে এই প্রতিক্রিয়াশীল সরকারকে জনতার সামনে সুন্দর করে দেখাতে চেয়েছে। ভারতবর্ষব্যাপী গণ-বিক্ষোভ সম্বন্ধে নীরব থেকে তারা এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করেছে এবং যুক্তফ্রণ্ট মন্ত্রীসভা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরোক্ষভাবে গণ-বিক্ষোভ দমনের প্রতিটি কার্যকলাপকে সমর্থন জানিয়েছে এবং সেই জনবিরোধী কাজগুলির যৌক্তিকতা স্বীকার করেছে। যুক্তফ্রণ্টের শরিকদের শ্রেণী বিশ্লেষণের কোন চেষ্টা না করে নির্বিচারে তারা নির্দেশ দিয়ে বসলো এই সমস্ত পার্টিগুলোকে (যুক্তফ্রণ্টের শরিক) বুজিয়ে-সুঝিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির প্রোগ্রামের পক্ষে টেনে আনতে হবে। এর নাম যদি নির্জলা গান্ধীবাদ না হয় তবে গান্ধীবাদ কাকে বলে আমাদের জানা নেই। শ্রেণী, শ্রেণীস্বার্থ এবং তার বিরোধের মত সব কথা কেন্দ্রীয় কমিটির বিচারের মধ্যে আসেনি অর্থাৎ মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গী জলাঞ্জলি দিয়ে কতকগুলি মার্কসবাদী শব্দ যোজনা করে কেন্দ্রীয় কমিটি সমগ্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদকেই বাতিল করে দিয়েছে।

কংগ্রেস সরকারের এখনও গণ-ভিত্তির গল্প বলে কেন্দ্রীয় কমিটি দেখাতে চেয়েছে যে ভারতে প্রতিক্রিয়াশীলরাই খুব শক্তিশালী। গণবিক্ষোবের মধ্য দিয়ে এই সরকারের অর্থনৈতিক সঙ্কট যে রাজনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিচ্ছে এই সুস্পষ্ট ঘটনাকে আড়াল করে রেখে জনতার শক্তিকে ছোট করে দেখানো হচ্ছে। প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস সরকারের দুর্বলতা যখন সাধারণ মানুষের কাছেও জীবন্ত হয়ে উঠেছে তখন কেন্দ্রীয় কমিটি তার শক্তিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখিয়ে জনসাধারণকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের পক্ষে এমন নির্লজ্জভাবে প্রচার করতে কংগ্রেসও বোধ হয় লজ্জা পেতো।

এই সরকারকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সংশোধনবাদ পুরো মদত দিয়েও যখন জনসাধারণের মনে এর শক্তি সম্বন্ধে বিশ্বাস সৃষ্টি করাতে পারছে না, তখন কেন্দ্রীয় কমিটি খাঁটি দালালের মত এগিয়ে এসেছে এই প্রতিক্রিয়াশীল সরকারকে রক্ষা করতে। এই কেন্দ্রীয় কমিটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের সহযোগী ও মিত্র।

কেন্দ্রীয় কমিটি দেখাবার চেষ্টা করেছে যে তারা কোন পার্টিরই নেতৃত্ব মানে না। ধনিকশ্রেণী চিরকাল বলে এসেছে যে কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত পার্টির নির্দেশ নিয়ে চলেছে। কেন্দ্রীয় কমিটি সেই বুর্জোয়া প্রচারের বিরুদ্ধে দেখাবার চেষ্টা করেছে যে তারা কারও নির্দেশ বা বিশ্লেষণ মানে না। আমরা কমিউনিস্টরা একটা বিজ্ঞানে বিশ্বাস করি, যার নাম মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুং-এর চিন্তাধারা। বিজ্ঞান মানলেই সেই বিজ্ঞানের যারা বিকাশ করছেন তাঁদের মানতে হবে। লেনিনকে না মেনে যারা মার্কসবাদী হতে চেয়েছিল তারা ইতিহাসের আবর্জনা স্তুপে আশ্রয় নিয়েছে। তেমনি আজও মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সর্বোচ্চ রূপ মাও সেতুঙের চিন্তাধারা -এই আন্তর্জাতিক মার্কসবাদী কর্ত্তৃত্বের যারা বিরোধীতা করছে তাদের আশ্রয় নিতে হবে সাম্রাজ্যবাদের কোলে।

ভারতবর্ষ একটা আধা-ঔপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশ। তাই এই দেশে ঔপনিবেশিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রধান ভিত্তি কৃষকশ্রেণী এবং সেই শ্রেণী সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রাম। কৃষি বিপ্লব ছাড়া এদেশের কোনও পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং কৃষি বিপ্লবই একমাত্র পথ, যে পথে এ দেশের মুক্তি আসতে পারে। সেই কৃষি বিপ্লব সম্বন্ধে কেন্দ্রীয় কমিটি শুধু যে নীরব তাই কেবল নয়, যেখানে সেখানে কৃষকেরা বিদ্রোহের পথ নিচ্ছে, সেখানেই তারা বিপ্লবী সংগ্রামের বিরোধীতা করতে বদ্ধপরিকর। কি অসীম ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্রের নকশালবাড়ীর বিপ্লবী কৃষক সংগ্রামীদের প্রতি, কি উল্লাস প্রকাশ পেয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল যুক্তফ্রণ্ট সরকারের দমননীতির সাময়িক সাফল্যে। খাঁটি বুর্জোয়ার প্রতিনিধির মত তারা পূর্বশর্ত করেছে, “জয়ের গ্যারাণ্টি দিতে হবে, তবেই তারা সেই সংগ্রামকে সমর্থন করবে।”

প্রত্যেকটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদীর আজ দায়িত্ব হচ্ছে সংগ্রামী ফ্রণ্ট থেকে এই কেন্দ্রীয় কমিটিকে বিতারিত করা, তবেই সংগ্রামে জোয়ার আসবে, সংগ্রাম জয়যুক্ত হওয়ার পথ নেবে। এই সংশোধনবাদী প্রতিক্রিয়াশীল কেন্দ্রীয় কমিটি কোন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সামন্তবাদ-বিরোধী সংগ্রামের শরিক তো নয়ই, তারা শত্রু। একমাত্র এই কেন্দ্রীয় কমিটি এবং তার পাপ রাজনীতির সংসর্গ ত্যাগ করেই বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠতে পারে। এই বুর্জোয়া রাজনীতিকে ধ্বংস করেই বিপ্লবী মতাদর্শ গড়ে উঠতে পারে। এই প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকে উৎখাত করতে না পারলে ভারতবর্ষের বিপ্লব এক পাও এগোতে পারে না, কাজেই পার্টির মধ্যে যারা বিপ্লবী আছেন তাঁদের এই রাজনীতির কেন্দ্রীকতা মানার একটাই অর্থ হয়, তা হল বুর্জোয়া কর্তৃত্ব মেনে চলা। তাই এই কেন্দ্রীয় কমিটির কেন্দ্রীকতা ভাঙা হচ্ছে প্রাথমিক পূর্বসর্ত যা ছাড়া বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠতে পারে না।

বিপ্লবী পার্টি গড়ার কাজে প্রথম কাজ বিপ্লবী রাজনীতির প্রচার ও প্রসার। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ, শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবের পথে গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী সংগ্রামের এলাকা গড়ে তোলা এবং সেই বিপ্লবী সংগ্রামের এলাকাকে প্রসারিত করে শহরকে ঘিরে ফেলা। কৃষক গেরিলাবাহিনী থেকে গণমুক্তি সেনা গড়ে তোলা এবং শহর দখল করে বিপ্লবকে জয়যুক্ত করা অর্থাৎ চেয়ারম্যান মাও-এর জনযুদ্ধের কৌশলকে পুরো কাজে লাগানো। এই হল ভারতবর্ষের মুক্তির একমাত্র সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পথ। এই পথের ব্যাপক প্রচার করতে হবে শুধু পার্টি সভ্য ও দরদীদের মধ্যেই নয়, ব্যাপক জনসাধারণের মধ্যেও – তবেই বিপ্লবী সংগ্রাম ও তার সাথে বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে। পার্টির এই গণলাইন [mass line]  প্রচারের মারফতেই আমরা, কেন্দ্রীয় কমিটির বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল দলিলগুলির অসারতা জনসাধারণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো এবং সংগ্রামী জনতার ভিতর এই প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বের প্রভাব কাটাতে পারবো। চেয়ারম্যান মাও-এর শিক্ষা এই গণলাইন সর্বদা সমস্ত ফ্রণ্টে প্রচার করতে হবে।

এই শিক্ষার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে ভারতবর্ষে। পার্টির ভিতর বিপ্লবীকর্মী আছেন এটাও যেমন সত্য তেমনি সত্য হচ্ছে পার্টি দীর্ঘকাল সংশোধনবাদী রাজনীতি এবং বুর্জোয়া কাজের ধরণ মেনে চলেছে। ফলে বিপ্লবী কর্মীদের মধ্যেও রয়েছে কাজের পুরোনো সংশোধনবাদী অভ্যাসগুলো যার প্রতিফলন ঘটে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে অর্থনীতিবাদী ঝোঁকে এবং অর্থনীতিবাদী ধরণ-ধারণের অভ্যাসে এবং জঙ্গী অর্থনীতিবাদের প্রকাশে। আমাদের এলাকার অভিজ্ঞায় আমরা দেখেছি যে পার্টির পুরাতন কৃষকসভা বা শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মীরা বিপ্লবী রাজনীতি নিজেরা গ্রহণ করলেও জনসাধারণের মধ্যে তার প্রচারের কাজে নামতে ইতঃস্তত করেন এবং যখন বিপ্লবী সংগ্রাম ঘাড়ের উপর এসে পড়ে তখন আতঙ্কিত হন, জনতার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বিরোধীতার পথ বেছে নেন। এই বিরোধীতা সব সময়েই প্রকাশ্য বিরোধীতার পথ বেছে নেন। এই বিরোধীতা সব সময়েই প্রকাশ্য বিরোধীতার রূপ নেয় না। রূপ নেয় জনতার শক্তি সম্বন্ধে অনাস্থা এবং শত্রুর শক্তিকে বড় করে দেখানোর মধ্য দিয়ে। এই ধরণের কর্মীদের এই ধরণের অনিষ্টকারিতাকে নষ্ট করে দেওয়া যায়, যদি তাদের ঘিরে যে ব্যাপক সংখ্যক সংগ্রামী মানুষ আছেন সেই সংগ্রামী মানুষদের কাছে পার্টির এই গণলাইনের প্রচার থাকে। এই ক্ষেত্রে উপরোক্ত কর্মীদের মধ্যে যদি কারও সত্যিকারের বিপ্লবী মনোভাব থাকে তবে তিনি বা তাঁরা দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন।

এই অবস্থার সম্মুখীন আমরা সব এলাকাতেই হবো, কারণ বহুদিন সংশোধনবাদী ক্রিযাকলাপের সাথে যুক্ত থাকায় পার্টি সভ্যদের মধ্যে বহু সংশোধনবাদী ধ্যান ধারণা আছে, যা একদিনে কাটবে না-অনেক দিনের বিপ্লবী প্রয়োগের মধ্য দিয়ে কাটবে। পার্টির বাইরে যে বিপুল সংখ্যক বিপ্লবী মানুষ আছেন তাঁদের কাছে আমাদের পার্টির গণলাইন প্রচারের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন বিপ্লবী কর্মী পার্টিতে আসবেন এবং তাঁরা তাঁদের সতেজ বিপ্লবী চেতনার দ্বারা পার্টির ভেতরকার জড়তা কাটাবেন এবং পার্টির বিপ্লবী কর্মচাঞ্চল্য বাড়িয়ে তুলবেন।

ভারতবর্ষে দীর্ঘস্থায়ী কঠিন সংগ্রাম চালিয়েই একমাত্র বিপ্লবকে জয়যুক্ত করা যায়। কারণ পঞ্চাশ কোটী মানুষের এই বিরাট দেশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির শক্ত ঘাঁটি এবং সোভিয়েত সংশোধনবাদের প্রধান ভিত্তি। কাজেই ভারতবর্ষে বিপ্লব জয়যুক্ত হলে সা¤্রাজ্যবাদের ধ্বংসের দিন ঘনিয়ে আসবে এবং ঘনিয়ে আসবে সোভিয়েত সংশোধনবাদের মৃত্যু। কাজেই বিশ্ব প্রতিক্রিয়ার দুর্গ এই ভারতবর্ষে বিপ্লবকে রুখতে তারা এগিয়ে আসবে এবং এটাই স্বাভাবিক। অবস্থায় জয় সহজ ভাবা, অন্ধ ভাববিলাস ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তবুও জয় আমাদের হবেই, কারণ এদেশ পঞ্চাশ কোটি মানুষের এবং বিরাট এলাকা জুড়ে। কাজেই সাম্রাজ্যবাদীরা এবং সংশোধনবাদীরা তাদের সমস্ত শক্তি দিয়েও এ দেশের বিপ্লবী অভিযানকে স্তব্ধ করতে পারে না।

কিন্তু বিপ্লব কখনো সফল হতে পারে না বিপ্লবী পার্টি ছাড়া। যে পার্টি দৃঢ় ভাবে চেয়ারম্যান মাও সেতু-এর চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্ত যুবকের দ্বারা গঠিত, যে পার্টির অভ্যন্তরে পুরো গণতান্ত্রিক অধিকার আছে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার এবং যে পার্টির সভ্যরা স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে শৃঙ্খলা মেনে নিয়েছে, যে পার্টি শুধু উপরের হুকুম মেনে চলে না, স্বাধীনভাবে প্রত্যেকটি নির্দেশকে যাচাই করে এবং ভুল নির্দেশকে অমান্য করতেও দ্বিধা করে না, বিপ্লবের স্বার্থে যে পার্টির প্রত্যেকটি সভ্য নিজের ইচ্ছায় কাজ বেছে নেন এবং ছোট কাজ থেকে বড় কাজ সব কিছুকেই সমান গুরুত্ব দেন; যে পার্টির সভ্যরা নিজেদের জীবনে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শকে প্রয়োগ করেন, নিজেরা আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন, আরও আত্মত্যাগ, আরও কর্মোদ্যম বাড়াতে যে পার্টির সভ্যরা কোন অবস্থাতেই হতাশ হন না, কোন কঠিন পরিস্থিতি দেখেই ভয় পান না, দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যান তার সমাধানে-এ রকম একটা পার্টিই পারে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী ও মতের মানুষের ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গড়ে তুলতে। এই রকম একটি বিপ্লবী পার্টিই পারে ভারতবর্ষের বিপ্লবকে সফল করে তুলতে। যে মহান আদর্শ চেয়ারম্যান মাও সেতুং তুলে ধরেছেন সমস্ত মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের সামনে, সে আদর্শকে নিশ্চয়ই সফল করা যাবে এবং তবেই আমরা পারব নয়া-গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ সৃষ্টি করতে এবং সেই নয়া-গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে পারবে সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষ গড়ার কাজে।

দেশব্রর্তী, ২৬ শে অক্টোবর ’৬৭

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s