সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীর ‘নিরাপত্তা’য় পুরুষ পাঠানো

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, ভুটান, নেপাল থেকে নারী গৃহকর্মী পাঠানো হচ্ছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। আমাদের দেশ থেকে যেসমস্ত নারীগণ মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যান তাদের অর্ধেকেরও বেশি যান সৌদি আরবে।

যারা যান তারা নিতান্তই দেশে দরিদ্র, যারা অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাতেন বা কাটাচ্ছেন। দেশে তারা জীবিকা নির্বাহ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে বিদেশে যান।

সৌদি আরবে এখন গৃহকর্মী পাঠানোর বিষয়টি একারণেই আলোচিত যে- সৌদি আরবে যেসমস্ত নারীরা গৃহকর্মী হিসেবে শ্রম করতে যান তাদেরকে সৌদি রাজতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক গৃহমালিকরা মানুষ হিসেবে গণ্য না করে তাদের সাথে পশুর মতো আচরণ করে। শ্রমিকের মর্যাদা তো আরো পরের বিষয়। বাংলাদেশ থেকে নেয়া গৃহকর্মী নারীদেরকে মধ্যযুগীয় ক্রীতদাসী হিসেবে গণ্য করে। দালাল চক্র তাদের ইচ্ছামতো বেচাকেনা করে। এসমস্ত অসহায় নারীদের দিয়ে যৌন ব্যবসা করায়। গৃহের কর্তার দ্বারা ধর্ষণ, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, না খাইয়ে রাখা, ঠিকমতো খেতে না দেয়া, দেশে পরিবার-পরিজনের সাথে যোগাযোগ করতে না দেয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অপমানজনক, অমানবিক, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, নিপীড়নের শিকার হতে হয় নারীদেরকে। বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে পড়ে কোনো-কোনো নারী দেশে ফিরে আসেন। সৌদি আরবে এপর্যন্ত ৮০ হাজার নারী গৃহকর্মী পাঠানো হয়েছে। তারমধ্যে ৫০ ভাগই ফেরত এসেছেন। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকা এবং গণমাধ্যমেও এটা আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।

হাসিনা সরকারের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী যুক্তি দেয় যে, গৃহকর্মীদের মাঝে হোম সিকনেস (বাড়ি ফেরা রোগ) কাজ করে, এজন্য তারা এগুলো বানিয়ে বলে। সৌদি নাগরিকরা ভাত খায় না রুটি খায়- গৃহকর্মীরা বলে তাদেরকে ভাত দেয় না, না খাইয়ে রাখে। মন্ত্রীর এসমস্ত ভাষ্য মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছেন সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা নারীরা তাদের জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অপমান, লাঞ্ছনা, বঞ্চনার কথা বর্ণনা করে। যা পত্রপত্রিকাসহ নানা মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রকাশ ও প্রচার হয়েছে।

হাসিনা সরকার আবারো সৌদি সরকারের সাথে ১ লক্ষ ২০ হাজার গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তি করেছে। যেহেতু গৃহকর্মীদের উপর নিপীড়নকে সকল স্তরের প্রগতিশীল ও সুশীল সমাজ এবং নারী সমাজ প্রতিবাদ করেছেন, আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে, তাই একজন নারীকে ‘নিরাপত্তা’ দিতে সাথে ২ জন পুরুষ যেতে পারবে বলে সরকার ঘোষণা দিয়েছে। যে পুরুষরা গৃহকর্মী নারীকে পাহারা দিবে।

সরকারের এই আনাড়ি ও গোজামিলের ব্যবস্থা নারীজাতির জন্য অসম্মানজনক, অপমানজনকই শুধু নয়, লজ্জাজনকও। সরকার এবং রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আরো একবার প্রকাশ ঘটালো এই পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে। সরকারের এই পুরুষ পাহারাদারের ব্যবস্থা নারীজাতিকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নেয়ারই দৃষ্টিভঙ্গি।

বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির দল আওয়ামী লীগ সরকার সৌদি সরকারের সাথে যে চুক্তি করেছে সেখানে সৌদি সরকারের উপর কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি। যেসমস্ত দরিদ্র নারী গৃহকর্মীদের উপার্জিত বিদেশি অর্থে তাদের সরকারি বিলাস চলে সেসমস্ত নারীদের জন্য সম্মানজনক কোনো চুক্তি করেনি। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লংঘন করে সৌদি আরব গৃহকর্মীদের উপর অমানবিক বর্বরোচিত আচরণ করেছে এবং এখনো করছে। এগুলো বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। সৌদি আরব আমাদের নারীদের সাথে যা করেছে তার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে শর্তসাপেক্ষে চুক্তি না করে নতজানু হয়েছে। যেন সৌদি সরকার গৃহকর্মী নিয়ে কৃপা করছে।

অথচ সৌদি আরবে নারীর প্রতি এ জাতীয় অপমান ও বর্বরতার জন্য শ্রীলংকা এবং ফিলিপাইন সৌদি আরবে গৃহকর্মী না পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে  বছরে ১ লক্ষ ২০ হাজার গৃহকর্মী পাঠাতে পেরে সরকার নিজেই নিজেকে বাহবা দিচ্ছে। আমাদের নারীদের সম্মান সম্ভ্রম তার কাছে গুরুত্ব পায়নি। সরকার এবং তার মন্ত্রী এই চুক্তি করতে পেরেছে এ কারণেই যে এসমস্ত নারীগণ হচ্ছেন দরিদ্র কৃষক-শ্রমিক-শ্রমজীবী জনগণ ও তাদের সন্তান। একইসাথে তারা নারী। গৃহকর্মীদের সাথে ২ জন পুরুষ নিরাপত্তার জন্য পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে, যা কার্যত অর্থহীন অসার এবং হাস্যকরও।

রাজতান্ত্রিক ধর্মান্ধ মৌলবাদী চরম প্রতিক্রিয়াশীল সৌদি আরবে নারীদের ‘পরপুরুষ’-এর সামনে যাওয়া নিষিদ্ধ। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুরুষরা কি গৃহে প্রবেশ করতে পারবেন? তা পারবেন না নিঃসন্দেহে। গৃহকর্মী গৃহকর্তার লালসার শিকার হলে (যা সাধারণভাবেই হয়ে থাকে) বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলে উক্ত পুরুষরা রক্ষা করবেন কীভাবে? যদি তিনি রক্ষা করতে যান তাহলে তারই গর্দান যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। সৌদি আরবে এমনই মধ্যযুগীয় বিধি-বিধান, আইন রয়েছে।

সরকার নাকি মোট ৬৮টি দেশে নারী শ্রমিক (গৃহকর্মীসহ) পাঠাচ্ছে। এই হার নাকি গত ১০ বছরে ৬ গুণ বেড়েছে। সারা বিশ্বের নারী শ্রমিকদের উপর একইভাবে শ্রম শোষণ নিপীড়ন নির্যাতন হয়ে আসছে। কারণ তারা মূল শ্রেণির জনগণ। ধনীক শ্রেণির নারী হলে এভাবে শর্তবিহীন চুক্তি তারা করতে পারতো না। তাই শ্রেণির প্রশ্নটি খুবই গুরুরুত্বপূর্ণ, তা শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র নারীদেরকে বুঝতে হবে। তাদের শ্রম, ঘাম, রক্ত এবং বাধ্যতামূলক দেহব্যবসার উপার্জিত রেমিটেন্সে শাসক শ্রেণির সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার পূর্ণ হচ্ছে; মন্ত্রী, আমলা, উপদেষ্টাদের টাকা বাড়ছে, বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি হয়েছে- হচ্ছে।

গৃহকর্মীসহ শ্রমিক-কৃষক দরিদ্র জনগণকে বুঝতে হবে এই সরকার, রাষ্ট্র তাদের স্বার্থের নয়। এই সরকার, রাষ্ট্র হচ্ছে শোষণমূলক ব্যবস্থার। বড়ধনী শ্রেণির সরকার আপনাদের স্বার্থ সম্মান রক্ষা করার সরকার নয়। তা আপনারা নিজস্ব অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝতে পারছেন।

সৌদি আরবেও একই শোষনমূলক সমাজ ব্যবস্থা। রাজতান্ত্রিক মৌলবাদের শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত রয়েছেন সেখানকার নারীরা। তারা মাত্র ২০১৫ সালে ভোটাধিকার পেয়েছেন। সৌদি নারীরা আরো একধাপ পিছিয়ে রয়েছেন। তাদেরকেও বিপ্লবী নারী মুক্তির আন্দোলনে নামতে হবে। সেদেশের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবে যোগ দিতে হবে। সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। তাছাড়া যেমন বাংলাদেশের নারীদের মুক্তি নেই। সৌদি নারীদেরও মুক্তি নেই।

– ডিসেম্বর/’১৬

সূত্রঃ নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা

 

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.