সুইডিশ রেডিওতে ‘র‌্যাব কর্মকর্তার বয়ানে’ ক্রসফায়ারের ব্যবচ্ছেদ

বাংলাদেশের এলিট বাহিনী র‌্যাব কীভাবে ‘ক্রসফায়ারের নামে’ মানুষ হত্যা করে, তা ওই বাহিনীর ‘উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার’ বয়ানে তুলে ধরেছে সুইডিশ রেডিও।

সাড়ে আট মিনিটের একটি প্রতিবেদনে সুইডিশ রেডিও জানিয়েছে, ওই কর্মকর্তার অজান্তে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তার বক্তব্য রেকর্ড করা হয়। সেখানে র‌্যাবের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেন তিনি।

পাঠকদের জন্য সেটির অনুবাদ তুলে ধরা হল
সুইডিশ রেডিও এমন একটি গোপন রেকর্ডিং হাতে পেয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিওন (র‍্যাব) এর অব্যাহত গুম ও খুনের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই কথোপকথনে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা র‌্যাবের ব্যবহৃত নৃশংস পন্থাগুলোর বর্ণনা দেন।

“যদি তাকে পাও, গুলি করে আগে মেরে ফেলো। এরপর লাশের পাশে একটা বন্দুক রেখে দিও”

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটাই হয় কমান্ড, বলছিলেন র‌্যাবের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আলাপচারিতায় তিনি বলছিলেন কিভাবে র‍্যাব গুম-খুনের জন্য মানুষ বাছাই করে। এই কর্মকর্তা অবশ্য জানতেন না যে এই কথাগুলো রেকর্ড করা হচ্ছে।

তিনি নিজেই প্রায় ডজনখানেক খুনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। যাদের হত্যা করা হয়েছিল, তাদের বেশিরভাগই গুরুতর অপরাধের সন্দেহভাজন আসামী ছিল, কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের অপরাধ প্রমাণ করাটা বেশ কঠিন ছিল।
২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই এলিট বাহিনী সামরিক ও পুলিশ দুই বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত, যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল গুরুতর অপরাধ, সন্ত্রাস ও মাদক চোরাচালান দমন করা।

ঐ কর্মকর্তা জানান, টার্গেট করা লোকদেরকে হঠাত করে আটক করা হয়, যেমন চায়ের দোকান থেকে বা তাদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যক্রম থেকে, যেখানে তারা সতর্ক হবার নূন্যতম সুযোগ পায় না।
ঐ কর্মকর্তা আরও জানান, পুলিশ অপরাধীদের থেকে ঘুষ নেয়, এবং এই টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনে সেই অস্ত্রই খুন হওয়া মানুষের পাশে ফেলে রাখা হয়।
খুব কম ক্ষেত্রেই ক্রসফায়ারে নিহতদের কাছে অস্ত্র থাকে। এইভাবে অস্ত্র ধরিয়ে দিলে আত্নরক্ষার গল্প তৈরি করা যায়, যেটা সেই খুনের বৈধতা দিয়ে দেয়।
দুই ঘন্টার এই অতি-গোপনীয় রেকর্ডিং এ র‌্যাবের কর্মকর্তা বারংবার উল্লেখ করেছেন র‌্যাবের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হত্যা ও গুমের কথা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুদিন ধরেই র‌্যাবের এইসব কাজকর্মের তীব্র সমালোচনা করে আসছিলো। গুম-খুনে নিহত মানুষজনের আত্নীয়-স্বজনদের সাথেও যোগাযোগ রাখছে অ্যামনেস্টি।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ওলাফ ব্লমকুভিস্ট বলেন, একজন মানূষ খুব সাধারণ ভাবে ঠান্ডা মাথায় এই ধরণের কথা বলে চলেছে এটি ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। যদিও আমরা এটি নিশ্চিত করতে পারছি না, তবে এই বিষয়ে একটা জোরদার তদন্ত হওয়া খুবই জরুরী।
তবে এই বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, র‌্যাবের উচ্চ পদস্থ এই কর্মকর্তার ভাষ্য নির্ভরযোগ্য বলেই মনে হচ্ছে, কারণ অনেক বিষয়েই তিনি বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। সুইডিশ রেডিও অবশ্য এই বক্তব্য যাচাই করবার জন্যে অন্যান্য পন্থাও ব্যবহার করেছে।

এই কর্মকর্তার ভাষ্যে উঠে এসেছে ‘ক্রসফায়ার’, কিভাবে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এই ঘটনার তথ্য প্রকাশ করা হয় তা সহ পুরো প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ।
আলাপচারিতায় উঠে এসেছে গুম-খুনের তিনটি ধাপ; প্রথম ধাপে টার্গেটকে অপহরণ, দ্বিতীয় ধাপে হত্যা এবং তৃতীয় ধাপে লাশ গুম করা। ঐ কর্মকর্তা ঠান্ডা গলায় নির্বিকারভাবে বলে গিয়েছেন কিভাবে লাশের গায়ে ইট বেঁধে তা নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয়।
কর্মকর্তা এটিও বলেন যে, কিভাবে টার্গেটদেরকে ধোঁকা দিয়ে অপহরণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই বলা হয়, কোন একজন বন্ধুর কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, নিরাপত্তার খাতিরে। এরপর তাদের হত্যা করা হয়।

কর্মকর্তার ভাষ্যে উঠে এসেছে, কিভাবে গুম-খুনে জড়িত র‍্যাব সদস্যরা নিশ্ছিদ্রে কাজগুলো সম্পন্ন করে। ঘটনাস্থলে কোন চিহ্ন রেখে যেন না আসা হয়, এইজন্যে হাতে গ্লাভস, পায়ের ছাপ মুছতে কভার ব্যবহার করা হয়। অপারেশন চলাকালীন সদস্যদের ধূমপানও নিষিদ্ধ থাকে।
উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তা বলেন, গুম-খুনের এই ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে যে কেউই এইভাবে খুন হয়ে যেতে পারে। আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করবার জন্যে এটা বেশ ভালো একটা পথ, এবং অনেকেই এটি করতে চায়।
এক পর্যায়ে কর্মকর্তা কৌতুক করে বলে ওঠেন, এটা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটা উপায়। সুইডিশ রেডিও জানায়, পুরো আলাপচারিতা এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে, এর অনুবাদককে বেশ ক’বার বাইরে গিয়ে খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে হচ্ছিল।

এই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, কাদেরকে গুম-খুন করা হবে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত উচ্চপর্যায় থেকে আসে। এছাড়া তিনি নির্যাতনের বর্ণনাও দেন। এক জায়গায় এসে তিনি বলেন, একজন বন্দীকে অন্ধকার কক্ষে ঢুকিয়ে বিবস্ত্র করে ছাদের সাথে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে ঝুলানো হয়। এরপর তার অন্ডকোষে ভারী ইট বেঁধে রাখা হয়, যার ফলে এক পর্যায়ে তার অণ্ডকোষ ছিড়ে পড়ে যায়। কর্মকর্তা বলেন, সেই লোকটা বেঁচে আছে না মারা গেছে এটি তার জানা নেই।
র‍্যাবের এই ধরণের কার্যক্রম নিয়ে অনেকদিন ধরেই তীব্র সমালোচনা চলছে। তবে খুব কম সংখ্যক র‍্যাব সদস্যকেই মানবাধিকার লংঘনের দায়ে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির আলোকে অ্যামনেস্টি পুরো বিষয়টির একটি যথাযথ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করবার আহবান জানিয়েছে।

 

সূত্রঃ অডিও বার্তাটির অফিসিয়াল লিঙ্ক http://sverigesradio.se/sida/artikel.aspx?programid=83&artikel=6665807

http://rtnbd.net/bishesh/37995



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.