‘আধুনিক’ তরুণ-তরুণীরা কেন মৌলবাদী জঙ্গী হচ্ছে?

বিশ্বে গত শতাব্দীর ৮০-র দশকে এবং ২১ শতকের প্রথম দিকে শাসকশ্রেণির মদদে বাংলাদেশে মৌলবাদী জঙ্গী উত্থান ঘটে। ২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হায়দারকে খুন করার পর থেকে একের পর এক ব্লগার, বিজ্ঞান লেখক, প্রগতিশীল প্রকাশক এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগণকে হত্যা করে। গুলশান হত্যাকান্ডের আগেই সরকারি হিসাব মতে ৩৭ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।

এই সব হত্যাকান্ডের পর বরাবরই দাবি করা হয়েছে যে তা আইএস দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু আওয়ামী সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি হত্যাকান্ডের পর তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামাতের কারসাজী বলে রাজনীতি করে এসেছে। এভাবে তারা এই জঙ্গীদের দমনে বিশেষ তৎপর হয়নি, বরং বলা ভাল নিজেদের গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির স্বার্থে একে রক্ষা করেছে এবং পরোক্ষ মদদ দিয়েছে। ১ জুলাই গুলশান হত্যাকা- এবং ৭ জুলাই শোলাকিয়া হত্যাকান্ডের পরই বরং সরকারের টনক নড়ে। যখন নাকি খোদ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে ও রাষ্ট্রের উপর আঘাত হানে খোদ তাদের ঘরের (শাসকশ্রেণির) ছেলেরাই। শুধু উচ্চ শিক্ষিত ছেলেরাই নয়, উচ্চশিক্ষিত মেয়েরা এবং শিক্ষকরাও এর সাথে জড়িত বলে দেখা যায়।

আওয়ামী সরকার এখন আটঘাট বেধে জঙ্গী দমনে নেমেছে বলে প্রচার করছে। একদিকে তারা জঙ্গী আস্তানায় ঢুকে জঙ্গীদের জীবিত ধরার পরিবর্তে তাদের হত্যা করে ত্রাস সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে জঙ্গী দমনের নামে ব্যাচেলার মেসে হানা দিয়ে, পাড়ায় পাড়ায় জঙ্গী বিরোধী কমিটি করার ঘোষণা দিয়ে পুলিশ ও আওয়ামী মাস্তানদের লেলিয়ে দিয়ে জনগণের উপর নিপীড়ন বর্ধিত করেছে। একই সাথে তারা গবেষণায় নেমেছে কেন তাদের ঘরের ছেলেরা জঙ্গী হয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন ফর্মূলা দিচ্ছে। বলা হচ্ছে- সন্তানদের প্রতি পরিবার নজর রাখছে না বা পরিবারের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক এর মূল কারণ। বলা হচ্ছে- সংস্কৃতি চর্চা না করে ফেইসবুক, ইন্টারনেটে তরুণরা বুঁদ হয়ে থাকে, গণবিচ্ছিন্নতা তাদের গ্রাস করছে, তারা মদ-গাঁজা-হিরোইনে আসক্ত হচ্ছে। কিছু প্রগতিশীল লোকজন বলছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না, ফলে ছাত্ররা বিরাজনীতিকরণ হয়ে জঙ্গী হচ্ছে- ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো কোন মূল কারণ নয়, এগুলো এ ব্যবস্থার অনুষঙ্গ মাত্র।

এর মূল কারণ নিহিত চলমান বিশ্ব ও দেশীয় রাজনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে।  সারা বিশ্ব জানে আন্তর্জাতিকভাবে মৌলবাদী তালেবান, আলকায়দা, আইএস-এর মদদদাতা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। বাংলাদেশের জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, আনসারুল্লাহ বাংলাটিম- ইত্যাদি হরেক নামের মৌলবাদী সংগঠনগুলো তাদের দ্বারা প্রভাবিত এবং শিক্ষিত। সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ ও দালাল শাসকশ্রেণি মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক ধ্যান-ধারনা ও ধর্মান্ধতাকে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে ব্যবহার করে। মৌলবাদের মূল ভিত্তি-সমর্থক রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা ও ধর্মবাদী রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে। কিন্তু একই সাথে এই ব্যবস্থায় হতাশ, দিশাহীন, বিভ্রান্ত, বিক্ষুব্ধ শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ঘরের তরুণ-তরুণীদের একটা অংশও জঙ্গী মৌলবাদে যুক্ত হয়ে পড়ছে। এ ব্যবস্থায় নারীরাও চরম নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে। তনু-মিতুরা অকাতরে হত্যা-ধর্ষিত হচ্ছে। তাই তরুণদের মত তরুণীরাও মৌলবাদী জঙ্গী ‘আদর্শে’ ঝুঁকে পড়ছে।

ধর্মীয় মৌলবাদীদের আদর্শ, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং তাদের এ্যাকশন গণবিরোধী ও ফ্যাসিষ্ট- কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি এবং আওয়ামী সরকার এই মৌলবাদী নৃশংসতা ও গণবিরোধিতাকে উচ্চ প্রচারে নিয়ে নিজেদের ফ্যাসিবাদ ও গণবিরোধিতাকে ধামা-চাপা দিতে চায়- তাতেও অল্প সন্দেহই রয়েছে। দেশে মৌলবাদীরা এবং বিদেশে আইএস যে সব নৃশংসতা চালাচ্ছে তার থেকে বহুগুণ নৃশংসতা বৈশ্বিকভাবে সাম্রাজ্যবাদ এবং দেশীয় ক্ষেত্রে তাদের দালাল বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্রযন্ত্র চালাচ্ছে যুগ যুগ ধরে। খোদ শাসকশ্রেণির লোকজনই বলছে র‌্যাব এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭শ’রও বেশি লোককে ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে হত্যা করেছে। যদিও এর প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বন্দী অবস্থায় বর্বরোচিত নির্যাতন করে এক হাসিনা সরকার আমলেই ১০০’র বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গুম করা হয়েছে বহু লোককে। নিখোঁজ হওয়া পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই মানববন্ধন করে থাকেন এর প্রতিবাদে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে গত বছর শাসকশ্রেণির সকল পক্ষ মিলে পেট্রোল বোমায় পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেছে। এ ছাড়া বহু বহু ঘটনায় বিগত ৪৫ বছর ধরে শাসকশ্রেণি বর্বরতা চালাচ্ছে। প্রচার আছে শেখ মুজিব আমলেই ৩০ হাজার বামপন্থী নেতা-কর্মীকে রক্ষিবাহিনী দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। জিয়া-এরশাদ-খালেদার শাসনামলেও বহু হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। খালেদা সরকারের শাসনামলে গঠিত খুনী র‌্যাব হাসিনা সরকারের আমলেও নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়।

একইরকম ভাবে এদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরা বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে- তা ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান ও সিরিয়ারসহ বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছে। তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদীরা বিভিন্ন অজুহাতে আগ্রাসন চালিয়ে এবং শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব বাধিয়ে সেখানে লক্ষ লক্ষ লোক তারা হত্যা করছে। এক সিরিয়াতেই গত দুই বছরে ৩ লক্ষের বেশি লোক নিহত হয়েছে। শরণার্থী হয়ে দেশ ছেড়েছে ৫০ লক্ষ মানুষ। সারা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা শুধু এ তথ্যটি থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। এ নৃশংসতা ঘটছে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালালদের কামড়াকামড়ির ফলে। আইএস-এর ভূমিকা সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালালদের রাজনৈতিক চালেরই অন্তর্গত। ইন্টারনেট, ফেইসবুকে সাম্রাজ্যবাদ, শাসকশ্রেণির এই বর্বরতা তরুণরা যখন দেখেন তখন এই বর্বরতার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হওয়া এবং তাদের মাঝে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের স্পৃহা গড়ে উঠাই স্বাভাবিক। যাকে আজ ব্যবহার করছে আইএস ও সমগোত্রীয় ‘হোম-গ্রোন’ মৌলবাদীরা।

বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদের এই আগ্রাসন, আক্রমণ, যুদ্ধ, গণহত্যা, নিপীড়ন, ধ্বংস ইত্যাদিকে মুসলমান জনগণের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করাটা কঠিন নয় ধর্মীয় রাজনীতির জন্য। প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেরাও মাঝে মাঝে সেরকম প্রচার চালাচ্ছে। ফলে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতেও সাধারণ মুসলমান জনগণ শান্তি এবং স্বস্তিতে নেই। তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ফ্রান্সের সরকার মুসলিম মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী হিজাব পরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। মুসলমানরা সমঅধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদেরকে বাসাভাড়া পেতে কঠিন অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচিত হলে সে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমান অভিবাসীদের ঢুকতে দেবে না বা যারা আছে প্রয়োজনে তাদেরও তাড়িয়ে দেবে। এসবেরই নিশ্চিত প্রভাব রয়েছে দেশে-বিদেশে উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের মাঝে।

সুতরাং এই বিশ্ব ব্যবস্থা ও তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, অন্যায়-অত্যাচার, নৃশংসতা, শোষণ-লুটপাট, নৈতিক-সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব, তাদের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণ হতাশ এবং চরমভাবে বিক্ষুব্ধ। উচ্চবিত্ত ঘরের, বিদেশে থাকা, উচ্চশিক্ষিত ‘আধুনিক’ তরুণ-তরুণীরাও হতাশ ও দিশাহারা। তারা অনেকেই মাদকে সান্তনা খোঁজেন। কেউ কেউ বাপ-মাকে হত্যা করেন। আবার কেউ কেউ এ ব্যবস্থার পরিবর্তন চান এবং সেটা খুবই ন্যায্য। কিন্তু সেজন্য সঠিক আদর্শ কর্মসূচি ও পথ তাদের সামনে আজ স্পষ্ট নয়। তাদের একাংশ অগত্যা আশ্রয় নিচ্ছে ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতিতে।

এই রাজনৈতিক বিষয়টিকে আড়াল করার জন্যই শাসকশ্রেণি ও তাদের সমমনা বা তাদের দ্বারা শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা সামনে তুলে আনছে পারিবারিক জীবনের সমস্যাটি। বাস্তবে পারিবারিক সমস্যাটিও যে এই পচা-গলা ব্যবস্থার থেকেই জাত একটি উপসর্গ মাত্র তা তারা লুকিয়ে রাখতে চায়, অস্বীকার করতে চায় নিজেদের ব্যবস্থাটিকে রক্ষা করার জন্য এবং তাদের প্রভু বিদেশী সা¤্রাজ্যবাদীদের অন্যায় অত্যাচারকে মাটিচাপা দিয়ে সেটিকেও রক্ষা করার জন্য। শাসক শ্রেণির এই সচেতন অপচেষ্টার প্রমাণ পাওয়া যাবে সাংবাদিক সম্মেলনের মতো প্রকাশ্য জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্যে যে, কেন-যে এই শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত ঘরের তরুণরা মৌলবাদী হচ্ছে তা তিনি বুঝে ওঠেন না। তারপর তিনি যুক্ত করেন এই অশ্লীল ইঙ্গিত যে, এই তরুণেরা নাকি বেহেস্তে হুর পাওয়ার লোভে এ পথে পা বাড়িয়েছে। এটা যে শুধু উপরোক্ত রাজনৈতিক কারণকে আড়াল করার অপচেষ্টা তাই নয়, তা তরুণ সমাজের প্রতি অপমানজনক তাচ্ছিল্যেরও প্রকাশ।

এ অবস্থায় তরুণদের সামনে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের আদর্শকে জোরালোভাবে তুলে ধরাটাই একমাত্র বিকল্প। তরুণ-তরুণীদের সামনে সমাজ পরিবর্তনের ও মুক্তির দিশা দেখাতে হবে। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদেরকে সেই লক্ষ্যেই নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা

Advertisements

কলম্বিয়ায় বামপন্থি গেরিলা দল ELN এর সর্বশেষ নেতা নিহত

ইএলএন গেরিলা

কলম্বিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর এক অভিযানে কলম্বিয়ার বামপন্থি গেরিলা দল ‘ লিবারেশন আর্মি-ELN’ এর সর্বশেষ নেতা নিহত হয়েছেন।  ২৩শে মার্চ, বৃহস্পতিবার, দেশটির প্রেসিডেন্ট জুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস একথা জানিয়েছেন।

সান্টোশ টুইটারে লিখেন, ‘ইএলএন এর জোসে এন্তনিও গালান ফ্রন্টের প্রধান নেতা আলভারো গেলভেস ওর্তেগা ওরফে জাইরোকে দমন করায় আমি আমাদের পাবলিক ফোর্সকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।’

কলম্বিয়ার জাতীয় পুলিশের পরিচালক জেনারেল জর্জ নিয়েতো টুইটারে লিখেন দেশের উত্তরাঞ্চলীয় বলিভার এলাকার উত্তরে এই অভিযান চালানো হয়। এতে ওর্তেগা নিহত হয়েছেন।

বামপন্থী ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (ইএলএন) ও সান্টোশ সরকারের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শান্তি আলোচনা চলছে।

উভয়পক্ষের মধ্যে অস্ত্রবিরতি হয়নি। এর মধ্যেই সান্টোশ আলোচনার মাধ্যমে দেশে ‘সম্পূর্ণ শান্তি’ স্থাপনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কলম্বিয়া সরকারের একদিকে শান্তি প্রচেষ্টার নাম, আর অপরদিকে হত্যা করা হয়েছে এই বামপন্থি গেরিলা নেতাকে।

অথচ শান্তির জন্যেই প্রেসিডেন্ট সান্টোশকে নোবেল দেয়া হয়েছিল। আর তিনিই কিনা শান্তি আলোচনার নামে এই বামপন্থি গেরিলা নেতাকে হত্যার নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

সূত্রঃ http://www.gulf-times.com/story/539739/ELN-leader-killed-by-Colombian-security-forces