চে গুয়েভারার ছোট ভাইয়ের স্মৃতি

চে গুয়েভারার কাঁধে ছোট ভাই হুয়ান মার্তিন গুয়েভারা

বলিভিয়ার লা হিগুয়েরা নামের সীমান্তবর্তী এক গ্রামের যে স্কুলঘরে ১৯৬৭ সালে বিপ্লবী এরনেস্তো চে গুয়েভারাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, ৪৭ বছর পর প্রথম সেখানে পা রাখেন তাঁর ছোট ভাই হুয়ান মার্তিন গুয়েভারা।

জায়গাটা এখন ব্যস্ততম পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ চে। এই বিপ্লবীর চিরচেনা ছবি শোভা পাচ্ছে চারপাশে।

হুয়ান মার্তিন যখন বাসিন্দাদের কাছে নিজের পরিচয় দেন, অবিশ্বাসী কণ্ঠে তাঁরা বলে ওঠেন, ‘যিশুর কোনো ভাইবোন থাকতে পারে না!’

হুয়ান লিখেছেন, ‘এখানকার সবার কাছে চে একজন সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে উঠেছেন। তাঁর ছবি সামনে নিয়ে প্রার্থনা করা হয়, অলৌকিক প্রত্যাশা করা হয় তাঁর কাছে। এ এক ভয়ংকর অবস্থা। আমার ভাইয়ের চিন্তা ও আদর্শ ধুয়েমুছে গেছে।’

হুয়ানের সঙ্গে চের বয়সের পার্থক্য ছিল ১৫ বছর। ছোট ভাইকে প্রায় সন্তানের মতোই দেখতেন চে। মৃত্যুর কিছুকাল আগে ঘনিষ্ঠজনদের কাছে চে বলেছিলেন, ছোট ভাইয়ের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি নৈকট্য অনুভব করেন তিনি।

চের সঙ্গে নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণা করেছেন হুয়ান। গত সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিচারণামূলক বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ চে, মাই ব্রাদার। প্রকাশক পলিটি প্রেস। হিস্পানি ভাষায় মূল বইটি বেরিয়েছিল গত বছর।

বইটিতে হুয়ান লিখেছেন এরনেস্তোর বিপ্লবী হওয়ার পারিবারিক কাহিনি। উঠে এসেছে অ্যাজমায় ভোগা এক শিশুর কথা, যার স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুষ্ক আবহাওয়ার অন্য শহরে ঠিকানা বদল করেছিল পুরো পরিবার। টগবগে তরুণ চে পড়ছিলেন চিকিৎসাবিদ্যা। কিন্তু মোটরবাইকে করে দুই বছর লাতিন আমেরিকার পথে পথে ঘুরে বদলে যায় তাঁর জীবনদর্শন। গড়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে বিপ্লবী চেতনা ও রাজনৈতিক আদর্শ।

ভাইয়ের কাছে কেমন ছিলেন চে? হুয়ান বলেন, ‘বাবা ও মায়ের মিশেলে গড়ে উঠেছিল সে। মা সিলিয়া ডি লা সারনা ছিলেন ধীরস্থির, বুদ্ধিমতী ও একই সঙ্গে প্রথাবিরোধী। বাবা এরনেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ আবার নিজেকে বেঁধে রাখার মানুষ নন। পরিবার থেকে কিছুটা দূরেই থেকেছেন। দুজনের বৈশিষ্ট্যই এসেছিল চের মধ্যে। আমার কাছে বাবার বিকল্প ছিল সে। আবার ছিল ভাই ও বন্ধুও।’

কিন্তু ১৯৫৭ সালের পর বদলে যায় চের পরিচয়। একই সঙ্গে হুয়ানের পরিচয়ও বদলে যায়। আগে ছিলেন মেডিকেল পড়ুয়া চের ভাই। পরে হলেন কিংবদন্তি বিপ্লবী ও ভয়ডরহীন যোদ্ধা চের ‘ছায়ায় বেড়ে ওঠা’ হুয়ান মার্তিন গুয়েভারা। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের শুরু পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে কারাগারে ছিলেন চের এই ছোট ভাই। পরে ছাড়া পান ঠিকই, কিন্তু তত দিনে প্রিয় ভাই আর পৃথিবীতে নেই।

হুয়ানের মতে, চের ভাস্কর্য বা মূর্তি গড়ে তাঁকে আরাধনা করার প্রয়োজন নেই। চেকে এই পূজার বেদি থেকে নামিয়ে আনতে হবে। সবার উচিত তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে দেখা, স্রেফ মানুষ, যিনি কিনা মার্ক্সবাদী আদর্শে বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়তে চেয়েছিলেন।

বিশ্বে কি চের মতো আরেকজন বিপ্লবীর প্রয়োজন আছে? তেমন মানুষ কি পাওয়া সম্ভব? হুয়ান দ্বিধাহীনভাবে
লিখেছেন, ‘হ্যাঁ, পাওয়া সম্ভব। সে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আমাদের কি ঠিক তাঁর মতো মানুষই প্রয়োজন? একজন গেরিলা? না। টুপি মাথায় পাহাড়ে থাকা কোনো মানুষ? না। কিন্তু এমন একজন মানুষ লাগবে, যাঁর পরিবর্তনের ভাবনা আছে। আছে সুস্পষ্ট নীতি, যা অর্থবিত্ত বা ক্ষমতার কাছে কখনো বিক্রি হয় না। চে এমনটাই ছিল। আমাদের এমন মানুষ দরকার। চে যখন বেঁচে ছিল, তখনকার তুলনায় আজকের পৃথিবী খুব ভালো অবস্থায় নেই। বরং আরও খারাপ অবস্থায় আছে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আমাদের অবশ্যই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

 

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.