শ্রদ্ধাঞ্জলি – শহীদ সাইদুল হাসান

20130614081243

লেখকঃ ডাঃ এম.এ.করিম

কমরেড আবদুল হক বলতেন, কারবালা প্রান্তর থেকে দুলদুল যখন একা একা ফিরে এলো তখনই সকলে বুঝতে পেরেছিল ইমাম হোসেন শহীদ হয়েছেন, তেমনি সাইদুল হাসান ভাইয়ের গাড়ি যখন ফিরে এলো তখনই তার আপনজনেরা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি শহীদ হয়েছেন। ১৯৭১ সালের ৫ মে তিনি নিখোঁজ হন। ঠিক ঐ তারিখে শহীদ হন কি-না নিশ্চিত নই, তবে ঐ দিন হতে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কেন তাকে হত্যা করা হয়েছিল, কারা তাকে হত্যা করেছিল, তা আজও রহস্যে ঢাকা। আজও আমরা জানতে পারিনি এই বিরাট হৃদয় মানুষটির চির অন্তর্ধানের মূল বিষয়টি।

সাইদুল হাসান আজকের দিনে বিস্মৃত প্রায় একটি নাম। অথচ এমন একটা সময় ছিল দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, শিল্প-সাহিত্যের প্রত্যেক শাখায় এ মানুষটির অবাধ বিচরণ ছিল। যেখানে অন্যায় যেখানে অবিচার সেখানেই প্রতিবাদ মুখর হাসান ভাই। সেটি যত সাধারণ ঘটনা হোক আর বিশেষ ঘটনা হোক। প্রথম যেদিন তাকে দেখি সেদিনের ঘটনাটি উল্লেখ করলেই স্পষ্ট হবে। সন দিন তারিখ এখন আর কিছু মনে নেই। কিন্তু ঘটনাটি স্পষ্ট মনে আছে। কোন সদ্য সিএসপি অফিসারের বিয়ে। তখনকার দিনে বিয়ে এখনকার মতো হোটেল রেস্তোরায় বা কমিউনিটি সেন্টারে হতো না। ছেলে কিংবা মেয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠান হতো। আর্মানিটোলায় এক বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান। আমিও নিমন্ত্রিত। বিয়ে বাড়িতে সাধারণত যা হয় খোশ গল্পে মেতে আছি। দেখি এক সুদর্শন ভদ্রলোক ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলছেন না এখানে আর দাওয়াত খাওয়া সম্ভব হবে না। মেহমানদের ডেকে এনে এমন অপমান। ব্যাপার কি জানতে গিয়ে জানলাম, আমার সার্জারির প্রফেসর ডাঃ আব্দুল্লাহর ছোট ভাই কোন এক সিএসপি অফিসারকে বলেছেন ‘ওতো ঘুষ খায়’। ব্যাস আর যায় কোথা! যতনা সিএসপি অফিসার প্রতিবাদ করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিবাদ মুখর আমার অচেনা ঐ ভদ্রলোক। ডাঃ আব্দুল্লাহর ছোট ভাইতো বার বার বলছেন আমি ঠিক ওভাবে বলতে চাইনি। কার কথা কে শোনে। মহা হুলস্থুল কান্ড। ডাঃ আব্দুল্লাহর ছোট ভাই ভুল স্বীকার করে মাফ চাওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে জেনেছিলাম প্রতিবাদমুখর ভদ্রলোক হলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনৈতিক সাইদুল হাসান।

হাসান ভাইকে প্রথম দেখেই ভাল লেগে যায়। শান্ত শিষ্ট মানুষটি যে অশান্ত হতে পারেন তা কল্পনার অতীত। এর পর থেকে হাসান ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে হাসান ভাই আর বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী ওয়াহিদুল হক সাভারের দাঙ্গা পীড়িত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। দাঙ্গাকারীদের প্রতিরোধ করা প্রতিহত করা একাজে তখন সম্ভবত তার সাথে ছিলেন সাভার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান ইদ্রীস। দাঙ্গা পীড়িতদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য আমাকে বেশ কয়েকবার সাভারে যেতে হয়েছিল। চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র ঔষধ পথ্য দেওয়া এ কাজ হাসান ভাই নিজ উদ্যোগে অনেককে সঙ্গে নিয়ে করেছেন। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করবার জন্য ক্ষতির পরিমাণ সরে জমিনে গিয়ে নির্ধারণ করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে ক্ষতিগ্রস্থদের নামধাম ক্ষতির পরিমাণের তালিকা দিয়ে তা দিতে দাবি করেছেন। দাবি আদায়ে সক্রিয় থেকেছেন। যারা এগুলো না দেখেছে তারা তা বিশ্বাস করতে পারবেন না। একজন মানুষ কতটা অসাম্প্রদায়িক সংবেদশীল হলে এমন উদ্যোগী হতে পারেন সেটা হাসান ভাইকে না দেখলে শুধু অনুমানে সম্ভব নয়।

১৯৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনের পর মাওলানা ভাসানী কাগমারীতে কৃষক সম্মেলন করেন। সে সম্মেলনে আদমজী আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করে। এ ধরনের আডম্বর দেখে আমি সম্মেলনে যায়নি। এতে করে মাওলানা সাহেব খুব অবাক। মওলানা ভাসানী আহুত সম্মেলনে করিম উপস্থিত নেই দেখে মওলানা মনে মনে আহত হন। এর কিছু দিন পর হাসান ভাই আমাকে এক রকম জোর করেই সন্তোষে নিয়ে গেলেন। সাথে কমরেড আবদুল হক ও মোহাম্মদ তোয়াহা। সন্তোষে গিয়ে জানলাম মওলানা যমুনায় বজরা নিয়ে আছেন। আমরা সবাই মিলে যমুনায় গেলাম। মওলানা তো আমাকে দেখে মহাখুশি। আমি বললাম হাসান ভাই আমাকে এক প্রকার জোর করে ধরে এনেছেন। শুনে মওলানা বললেন ‘তুমি কৃষক কনফারেন্সে আইলা না কেন করিম। আমি মওলানার সরল প্রশ্নের উত্তরে বললাম আমি এলে কি হতো বলেন, বড়জোর ২০/৫০ টা মোমবাতি অথবা এক ডজন হারিকেন দিতে পারতাম। ইলেকট্রিক বাতি দিয়ে আলোকসজ্জা করতে পারতাম না। মওলানা আমার ভাষা বুঝে আর কথা বাড়ালেন না।

যমুনার অবাধ মুক্ত হওয়া পেয়ে আমি বললাম- আমি একটু ঘুমিয়ে নেই, আপনারা আলোচনা করুন। আলোচনার মানে রাজনৈতিক বিতর্ক। একদিকে মওলানা আর অন্য দিকে কমরেড আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা মাঝখানে হাসান ভাই। বাক্যালাপ উচ্চস্বরে উঠলেই হাসান ভাইয়ের হস্তক্ষেপ। এদেশে মওলানা ভাসানী, আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহার নাম কমবেশি সবার জানা। কিন্তু বিস্মৃতির দেয়ালে চাপা পড়ে গেছে সদা কর্মব্যস্ত এই মানুষটির নাম। এদেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক অগ্নিপুরুষ ছিলেন হাসান ভাই। যারা তাকে কাছে থেকে দেখেছেন তাদের পক্ষেও এই মানুষটির বিশালতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। মানুষের প্রতি দরদ ভালবাসা ছিল অকৃত্রিম। তাইতো মানুষের দুর্যোগে বিপন্নের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন এই মানুষটি। ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পার্টির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ন্যাপের প্রয়োজনে অকাতরে নিজের পকেট থেকে পয়সা ঢেলেছেন। বাড়িতেই হতো ন্যাপের ওয়াকিং কমিটির মিটিং। মিটিং মানেই বিশাল আয়োজন। হয়তো বলেছি আমরা তো ঢাকার কর্মী নিজেদের বাড়িতে গিয়েই খেয়ে নিতে পারি। যারা মফস্বল থেকে এসেছে ওদের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেই তো হয়। হাসান ভাই শোনেননি। সবাইকে ভুরিভোজ করিয়েই ছেড়েছেন।

অতি সাধারণ বিষয়ে যেমন দৃষ্টি রেখেছেন তেমনি এদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন, সংগ্রাম, সংলাপ সব জায়গায়ই হাসান ভাইয়ের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। সম্ভবত উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর পরই ভুট্টো এসেছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আলোচনা। সেই আলোচনার মধ্যমণি সাইদুল হাসান ভাই। যেমন লাঞ্চ ডিনারের ব্যবস্থা করেছেন তেমনি জাঁদরেল রাজনীতিবিদ ভুট্টোর মোকাবেলা করেছেন। মিডিয়া রাজনীতি অর্থনীতি শিল্প বাণিজ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তার অবাধ বিচরণ এবং এই বিচরণ কোন অমূলক উদ্দেশ্যবিহীন বিচরণ নয়,তার লক্ষ্য ছিল জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ আমলা মুৎসুদ্দি শোষণ মুক্ত স্বাধীন এক স্বদেশ। এই আকাঙ্খা বাস্তবায়নের প্রচন্ড এক তাগিদ আপন সত্তায় অনুভব করতেন- আর এই তাড়নায় তাকে আরও বেশি সামনে এগিয়ে নিয়ে যেত।
হাসান ভাই যেদিন হারিয়ে যান সেই রাতেই আমার সেগুন বাগিচার বাসায় এসেছিলেন। সব সময়ই গাড়ি বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসতেন। কিন্তু ঐদিন গাড়ি ভিতরে না এনে বাইরে রেখেছিলেন। অনেক কথাই হলো কিন্তু প্রতিটি কথাই খাপছাড়া ছিল একটু যেন চিন্তাযুক্ত মনে হচ্ছিল। বেরিয়ে যেতে গিয়ে আবার ফিরে এলেন, কি যেন বলতে চাইছিলেন বলে মনে হলো, আমি বললাম হাসান ভাই কিছু বলবেন, কোন কথা না বলে গেটের দিকে রওনা দিলেন। এমন সময় কে যেন চা নিয়ে এলো। বললাম ভাই চা খেয়ে যান। বললো না আজ যাই আর এক দিন এসে খাব। এই বলে গেট খুলে বাইরে চলে গেলেন এটাই তার সাথে আমার শেষ দেখা। ওদিন ভাবতেও পারিনি হাসান ভাইয়ের সাথে আর কোন দিন দেখা হবে না। ঐ দিন রাতে আর খোঁজ নেইনি। পরদিন হাসান ভাই বিহীন গাড়ি ফিরে এলো। আর তখন বোঝা গেল হাসান ভাই নেই। নেই তো নেই চিরদিনের জন্য নেই। পরে অনেক খোঁজাখুজি হয়েছে কিন্তু পাওয়া যায়নি সাইদুল হাসানকে সকলের প্রিয় হাসান ভাই। হাসান ভাই মারা গেছেন কবে কেন তাকে মেরে ফেলা হয়েছে তা আজও জানা যায়নি। এমনকি তার মৃতদেহটিও পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তখনকার সামরিক গভর্নর টিক্কা খানও অনেক চেষ্টা করেছেন বলে শুনেছি কিন্তু হাসান ভাইয়ের মৃত্যু রহস্য এবং মৃত দেহের কোন হদিসই পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বিষ্ময়ের ব্যাপার তিনি গাড়ি পাকিং জোনে পার্ক করে আজকের রূপসী বাংলা তখনকার ইন্টার কন্টিনেন্টাল এর ভেতরে যান আর ফিরে আসেননি। আমার মনে আজও প্রশ্ন জাগে যে হোটেল হলো সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, সেখান থেকে তাকে অপহরণ করে তাকে হত্যা করা হলো এটা সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার কিন্তু সব সম্ভবের এদেশে সেটাও সম্ভব হয়েছে।

হাসান ভাইয়ের মৃত্যু দিবস নেই। আছে অন্তর্ধান দিবস। একটিই সান্তনা হাসান ভাই অমর, আমরা কোন দিনই তার মৃত্যু দিবস পালন করবো না। একাত্তরে শুধু হাসান ভাই নয় মারা গেছেন ডাঃ ফজলে রাব্বি, ডাঃ আলীম চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, ডাঃ মুর্তোজার মতো ব্যক্তিত্ব। যারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ছিলেন ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার অধিকারী এবং প্রত্যেকেই ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির অনুসারী কর্মী ও নেতা। এরা কোন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। এদেশের জন্য ছিলেন সম্পদ। এরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। এখানেই সাহসের সাথে থেকেছেন। পালিয়ে গেলে যেতে পারতেন, কিন্তু দেশ ছেড়ে যাননি। অন্যদের কথা জানিনা কিন্তু হাসান ভাই সহজেই যেতে পারতেন এ বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। কারণ ঐ দুর্যোগের সময়ে হাসান ভাইয়ের ব্যবসায়ীক অংশীদার এক হিন্দু ভদ্রলোক তার অবিবাহিত তরুণী মেয়েদের নিয়ে কোথায় যাবেন কি করবেন চিন্তায় দিশেহারা তখন হাসান ভাই তার বন্ধুকে সকণ্যা ভারত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। যে ব্যক্তি অন্যদের নিরাপদে দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠাতে পারেন, তিনি নিজেও ইচ্ছা করলে যেতে পারতেন, যাননি। দেশপ্রেমের এমন নিদর্শন বোধহয় বিরল। শুধু হাসান ভাই নয় আমাদের মতো অনেকেই যাননি। এদের অনেকেই শহীদ হয়েছেন আমরা হাতে গোণা কয়েকজন মানুষ বেঁচে আছি। শুনেছি আমাকেও মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। কিন্তু যারা মারবে সেই ‘মুক্তিযোদ্ধাদের’ মধ্যে আমাকে মারা নিয়ে বিভেদের কারণে হয়তো বেঁচে আছি, কিন্তু বাঁচতে পারেননি হাসান ভাইয়েরা।

মৃত্যু মানুষের জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি, সেই মৃত্যু যদি বীরের মতো হয় তাতে গর্ব আছে। হাসান ভাইয়েরা কখনও কোন প্রকার আপোস করেননি। নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন আপোস করেননি। এটি হাসান ভাইদের বৈশিষ্ট্য। আজ ৪৩ বছর পার হয়ে গিয়েছে, আজও মনে হয় সেদিনের কথা। এখনও সেই স্মৃতি জ্বল জ্বল করছে। কত মানুষের সাথেই তো পরিচয় হয়েছে কিন্তু এমন ক্ষণজন্মা পুরুষ কমই দেখেছি। এ মানুষের স্মৃতি তর্পণও গর্বের বিষয়। এসব মানুষ সম্বন্ধে আরও আরও বিস্তারিত লিখে এ প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। বিশাল বিত্ত বৈভবের মাঝে মানুষ হয়েও সাধারণ মানুষের মুক্তির আন্দোলনে শরিক হওয়া মানুষ- আজ ক’জন আছে। সাইদুল হাসান সেই বিরলদের একজন। জীবন দিয়েছেন মাথা নোয়াননি। যে আদর্শ যে নীতিনিষ্ঠতা এই মানুষগুলোকে সাহসী করেছিল সেই আদর্শ সেই রাজনীতি আজ মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া আজ কত বেশি প্রয়োজন্ এদের সাহসী জীবন দান অন্যদেরকে সাহসী হতে প্রেরণা যোগাবে। সাইদুল হাসানের মৃত্যু নেই। সাইদুল হাসান অমর।

সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s