ছত্তিশগড়ের পাঙ্খাজুরে মাওবাদী-বিএসএফ গুলির লড়াই

85320-mb

ছত্তিশগড়ের পাঙ্খাজুর এলাকায় আজ বিএসএফ জওয়ানদের সঙ্গে একচোট গুলির লড়াই চলল সশস্ত্র মাওবাদীদের। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই ২৪শে এপ্রিল সুকমায় মাওবাদী হামলায় নিহত হয় সিআরপিএফের ২৫ জওয়ান। ঘটনার পরই ছত্তিশগড়ের চিন্তালনার ও চিন্তাগুফা এলাকা থেকে আক্রমণে যুক্ত সন্দেহে গ্রেফতার হয় কমপক্ষে ৯ জন।

প্রসঙ্গত, সুকমায় মাওবাদী আক্রমণের পরই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-এর নেতৃত্বে দশ মাওবাদী উপদ্রুত রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্র সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সেখানেই ঠিক হয়, উ ন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি এবং মাওবাদীদের অর্থের উত্‍স অবরোধ করার মধ্যমে সরকার মাওবাদীদের মোকাবিলা করবে। তারপরেই আজ পাঙ্খাজুরের গুলি বিনিময় হল।

সূত্রঃ http://zeenews.india.com/bengali/nation/gunbattle-between-bsf-maoists-at-pankhajur-in-chhattisgarh_166933.html

Advertisements

খাপড়া ওয়ার্ড সম্পর্কে কমরেড আবদুল হক-এর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার

18194809_918887364919843_7010470610119449904_n

18222183_918887388253174_4834193869224904335_n

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯

[শাসক-শোষক শ্রেণি ইতিহাসকে মিথ্যার জালে ঢেকে দিয়ে সব সময়েই প্রয়াস চালিয়ে থাকে। খাপড়া ওয়ার্ডের রক্তাক্ত ঘটনাকে হটকারিতার ফল হিসাবে অনেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। অনেকে আবার খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলনের নেতা কে ছিলেন সে সম্পর্কের বিকৃত বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। এ সম্পর্কে প্রকৃত সত্য তুলে ধরা আবশ্যক। খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলনের নেতা কমরেড আবদুল হক-এর মুখ থেকেই ঘটনার বিবরণ জানা যাক। এই ঘটনার নির্মম সত্য বর্তমান প্রজন্মের জানার স্বার্থে এই বিবরণ তুলে ধরা হলো। এই বিরল সাক্ষাতকারটি ইতিপূর্বে সাপ্তাহিক সেবায় প্রকাশ করা হয়েছিল। ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করেই সেটি আবার সাপ্তাহিক সেবাতে পুনঃমুদ্রিত হলো- সম্পাদক, সাপ্তাহিক সেবা]

দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর দুই বাঙলায় পৃথক পার্টি হয়। পূর্ব বাঙলার কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকেন- খোকা রায় (সম্পাদক), মনি সিংহ, বারীন দত্ত, মারুফ হোসেন, সর্দার ফজলুল করিম, আবদুল হক, মুনীর চৌধুরী, কেষ্টবাবু, ব্রজেস দাস, মনসুর হাবিব, কৃষ্ণ বিনোদ রায়। যদিও প্রাদেশিক কমিটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়, তাহলেও সেই কমিটি সাংগঠনিক দিক দিয়ে সর্বভারতীয় পার্টির সাথে পূর্বের মতোই যুক্ত থাকে। সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় কমিটিতে খোকা রায়, মনি সিংহ, কৃষ্ণ বিনোদ রায় এবং প্রমথ ভৌমিক (খুলনা) পূর্ব বাঙলার প্রতিনিধিত্ব করতেন। এছাড়া একটি নতুন পাকিস্তান কমিটিও গঠিত হয় সাজ্জাদ জহিরকে সম্পাদক করে। এই কমিটি পূর্ব বাঙলার সাথে সাংগঠনিক দিক দিয়ে যুক্ত ছিল না। তার কাজ ছিল শুধু দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা। ১৯৪৮ সালে পার্টি থেকে সকলকে Option দেওয়া হয় পূর্ব বাঙলায় অথবা পশ্চিম বাঙলায় কাজ করার জন্য। মনসুর হাবিব তখন পূর্ব বাঙলায় কাজ করার জন্য Option দেন। অন্যান্যরাও নিজ নিজ ইচ্ছামতো দুই জায়গার মধ্যে যেখানে ইচ্ছা থাকেন। ১৯৫১ সালে রণদীভে থিসিস পরিবর্তনের পর পূর্ব বাঙলাতে অন্যান্য জায়গার মতো নতুন সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটিতে থাকেন- মনি সিংহ (সম্পাদক), খোকা রায়, বারীন দত্ত, সুখেন্দু দস্তিদার, শচীন ঘোষ, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখ। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত দুই বাঙলার সংগঠনের সামগ্রিক দায়িত্ব ন্যাস্ত ছিল ভবানী সেনের ওপর।

১৯৪৯-৫০ সালে আমরা জেলখানায় মোট চারবার অনশন ধর্মঘট করি। প্রথমবার ৩৮ দিন, দ্বিতীয় বার ৪১ দিন, তৃতীয়বার ৪৫ দিন এবং চতুর্থবার ৬১ দিন। আমাদের দাবি প্রত্যেক বারই ছিল মোটামুটি এক। জেলখানায় সে সময়ে সরকার আমাদেরকে কোন রাজনৈতিক মর্যাদা না দিয়ে তৃতীয় শ্রেণির সাধারণ কয়েদি করে রেখেছিল। সেই হিসাবে আমাদের জেলের কুর্তা পরতে হতো, বইপত্র, খবরের কাগজ ইত্যাদি দেওয়া হতো না। এসবের প্রতিবাদে আমরা ধর্মঘট শুরু করি। এই ধর্মঘট ঢাকা ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার এবং অন্যান্য জেলা কারাগারগুলিতে শুরু হয়। রাজশাহী জেলে যারা অনশন ধর্মঘটে যোগ দেন তাদের মধ্যে ছিলেন অমূল্য লাহিড়ী, বাবর আলী, গারীসউল্লাহ, শিবেন ভট্টাচার্য, খবিরউদ্দিন, পি. রায়, আমিনুল ইসলাম, অজয় ভট্টাচার্য, শীতাংশু মৈত্র, ভুজেন পালিত, বিজন সেন, ডোমারাম সিংহ, কম্পরাম সিংহ, সুখেন ভট্টাচার্য, হানিফ শেখ, দেলোয়ার হোসেন, আবদুল হক, আনোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, মনসুর হাবিব, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, নুরুন্নবী চৌধুরী। ঢাকা জেলে ধর্মঘটিদের মধ্যে ছিলেন- শিবেন রায়, কমনীয় দাশগুপ্ত, নগেন সরকার, তকিউল্লাহ, জ্ঞান চক্রবর্তী, সর্দার ফজলুল করিম, নাসিম আহম্মদ, নাদেরা বেগম, নলিনী দাস, কেষ্টবাবু। রাজনৈতিক মর্যাদা আদায়ের জন্য সর্বশেষ ধর্মঘট চলাকালে ১৯৫০ এর ৫ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কুষ্টিয়ার শিবেন রায় মারা যান। অনশন ধর্মঘটের সময়ে আমাদেরকে জেল কর্তৃপক্ষ বুকের ওপর চড়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করতো নাকে পাইপ দিয়ে। এই পাইপ ঢুকিয়ে জবরদস্তি খাওয়ানোর সময়ে বরাবরে পাইপ শিবেন রায়ের Lungs পর্যন্ত যাওয়ায় তিনি সঙ্গে সঙ্গে মারা যান।

এরপরই জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে এসে বলে যে, আমাদেরকে তারপর থেকে ডিটিনিউ হিসাবে বিবেচনা এবং রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া হবে। এছাড়া রাজনৈতিক কর্মীদেরকে এক জায়গায় থাকতে প্রতিশ্রুতি দিল। সেই অবস্থায় ৮ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে আমরা ঢাকা, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং অন্যান্য কারাগারেও অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করি। ১৯৪৯ সালে দ্বিতীয়বার অনশন ধর্মঘট শুরু হলে পূর্ব বাঙলা সরকারের অর্থমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী ঢাকা জেলে গিয়ে অনশনরত ধর্মঘটীদের বলেন, আপনারা হচ্ছেন দেশদ্রোহী। সরকার আপনাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সেটাই খুব বেশি। তার ওপর আপনারা আবার রাজনৈতিক মর্যাদা চান। এই দ্বিতীয় ধর্মঘটের সময় আমাদেরকে আত্মহত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে এক বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়। যার ফলে আমাদের প্রত্যেককে ঘানি, তাঁত ইত্যাদিতে তারা সাধারণ কয়েদিদের মতো কাজে লাগিয়ে দেয়। এইভাবে আমরা বিভিন্ন চাকীতে কাজ করতে থাকি।

১৯৫০ সালে আমাদের রাজনৈতিক মর্যাদা পাওয়ার পরই সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেল। এই হাঙ্গামার সময়ে জেলের পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তার ওপর নাচোলের ঘটনাও ঘটে ফেব্রুয়ারি (জানুয়ারি) ১৯৫০ এ। সে ঘটনায় অন্যান্য দু’জন পুলিশের সাথে একজন A.S.I. মারা যায়। সেই A.S.I. এর স্ত্রী সেই সময়ে প্রত্যেক দিন রাজশাহী কারাগারের গেটে এসে বহুপথে নিয়মিতভাবে বসে থাকতো এবং হিন্দু ও সাঁওতালদেরকে গালাগালি করে এবং নাচোলের ঘটনা সম্পর্কে নানা প্রকার বিকৃত তথ্য বিবৃত করে বলতো যে হিন্দুরা মুসলমান মেরেছে ইত্যাদি। জেলের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং বৃদ্ধির চেষ্টা এইভাবে করতো। সেই সময়ে রাজশাহীর জেলার ছিলো মান্নান নামের একজন। সেও সক্রিয়ভাবে এই প্রচারণা এবং উত্তেজনা সৃষ্টির কাজে উৎসাহ দিতো এবং সহায়তা করতো। কেন্দ্রীয় জেল থেকে ইলা মিত্রকে রাজশাহী জেলে নিয়ে আসার পর তাকে তারা জেল গেটে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে কয়েদিদেরকে দেখাতো এবং বলতো, ‘তোমরা রানীমাকে দেখো। ইনি আবার রানী হয়েছিলেন।’ সাঁওতালরা ইলা মিত্রকে রানী বলতো। এছাড়া ইলা মিত্রের উপর থানা হাজত ও জেলখানাতে বহুবার পাশবিক অত্যাচারও করা হয়। এইসব কারণে সেই সময়ে জেলের মধ্যে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটে যে হিন্দু কমরেডরা ঘরের বাইরে বের হতে পারতেন না। ঘরের সামনে সামান্য একটু খালি জায়গায় বেড়ানোর যে সুযোগ ছিল তাও তাদের জন্য এইভাবে বন্ধ করা হলো। তখন সেই অসহ্য অবস্থা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে আমরা ১৫ দিনের সময় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীনের কাছে একটা মেমোরেন্ডাম দিলাম তাতে বলা হলো যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা যদি বন্ধ করা না হয় তাহলে আমরা তার প্রতিকারের জন্য অনশন ধর্মঘট করতে বাধ্য হবো। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোন জবান না পেয়ে ১৯৫০ এর ২ ফেব্রুয়ারি আমরা আবার অনশন ধর্মঘট শুরু করি। সেই ধর্মঘট চলার নবম দিনে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের সাথে দেখা করে বললেন, আপনারা নিশ্চিত হোন আমরা অবস্থা পরিবর্তনের ব্যবস্থা করছি। এরপর পূর্বোক্ত A.S.I. এর স্ত্রীর জেল গেটে আসা বন্ধ করে দিলো। জেলার মান্নান নাচোল সম্পর্কে বিকৃত সাম্প্রদায়িক বক্তব্যও বন্ধ হলো।

আমাদের দ্বিতীয়বার অনশন ধর্মঘটের পর এবং এক বৎসরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হলে বিভিন্ন চাকীতে যখন কাজ করতে দিলো সে সময় সাধারণ কয়েদিদের সাথে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপিত হতো। তারা সে সময় নানাভাবে উৎপীড়িত হতো কিন্তু উপযুক্ত সহযোগিতা ও সহানুভূতির অভাবে সাহস করে কোন কিছু করতে পারতো না। কিন্তু তারা বলতো যে পাকিস্তান হওয়ার পরেও জেলের মধ্যে মানুষ দিয়ে ঘানি টানাবে কেন? তামাক খাওয়া বেআইনি থাকবে কেন ইত্যাদি। আমরাও তাদের এই দাবিগুলি সমর্থন করি এবং আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতার আশ্বাস দেই। এরপর তারা একটা মেমোরেন্ডাম দেয় জেল কর্তৃপক্ষের কাছে। সেটি মনসুর হাবিব এবং অন্য দু’জন মিলে তৈরি করেন। জেল কর্তৃপক্ষ মেমোরেন্ডামে কর্ণপাত না করায় তারা ৫ এপ্রিল ১৯৫০ সাল থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করে। তাদের সমর্থনে আমরাও ৭ই এপ্রিল থেকে অনশন শুরু করি। অনশন শুরু হওয়ার কয়েকদিন পর কয়েদিদের মধ্যে অনেকে ধর্মঘট ছেড়ে দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রায় এক হাজার কয়েদি ধর্মঘটে অটল থাকে। ধর্মঘটের পঞ্চম দিনে অর্থাৎ ১০ এপ্রিল ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজনস আমীর হোসেন রাজশাহী জেলে গিয়ে কয়েদিদেরকে ধর্মঘট প্রত্যাহার করার জন্যে বলে। আমাদের সাথে আমীর হোসেন এগারো বারো তারিখ দেখা করে বলে যে কয়েদিদের ধর্মঘট আমাদের সমর্থনের জন্যই হচ্ছে, কাজেই আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করলে তারাও প্রত্যাহার করবে। সে বিবেচনায় সে আমাদেরকে ধর্মঘট প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করে। তার কথা মতো কাজ করার কোন প্রশ্নই আমাদের ওঠেনি। কাজেই জেলে অনশন অব্যাহত থাকে। ১৪ এপ্রিল আমীর হোসেন আমাদের সকলকে এবং কয়েদিদের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধিদেরকে ডেকে পাঠালো। কয়েদিদেরকে সে বললো ধর্মঘট প্রত্যাহার করতে। কয়েদিরা বললো, আগে দাবি মেনে নাও পরে ধর্মঘট প্রত্যাহার। ১৫ তারিখে আবার তারা আমাদের সকলকে ডাকলো এবং বললো যে, মানুষ দিয়ে আর ঘানি টানা হবে না। সরকারি পয়সায় তামাক দেওয়া সম্ভব হবে না, তবে তারা নিজের পয়সায় তামাক যোগাড় করতে পারবে এবং তাদেরকে তামাক খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। এছাড়া মারপিট ইত্যাদিও বন্ধ করা হবে। রাজশাহী জেলের ফুটবল মাঠের মধ্যে সেদিনই বিকেলে আমীর হোসেন জেলের প্রায় ২,৫০০ কয়েদিকে হাজির করে বললো, তারা যেন কমিউনিস্টদের সম্পর্কে হুশিয়ার থাকে। ফুটবল মাঠের এই মিটিং শেষ হওয়ার পূর্বেই আমাদের লক আপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সন্ধ্যার পর আমীর হোসেন তালা খুলে ভিতরে এসে আমাদেরকে বললো, ‘বাইরে আপনার বিপ্লব করেছেন। জেলের ভেতরেও এই সব করছেন। এর প্রতিফল কী আপনাদেরকে পেতে হবে।’ ১৫ তারিখের ঘটনার পর এলো ২৪ এপ্রিল। সেদিন সকাল ঠিক পৌনে পাঁচটায় জেলের কোন জায়গাতেই লক আপ খোলা হয়নি। সে সময়ে জেল সুপারিনটেন্ড মিঃ বিল, জেলার মান্নান এবং আর কয়েকজন অফিসার লক আপ খুলে আমাদের ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো। ঘরে ঢুকে তারা বললো এখনই তোমাদেরকে ঘর ত্যাগ করতে হবে। আমরা বললাম, জেলে যখন আছি তখন ঘর ত্যাগ করতে আপত্তি নেই, তবে তৎক্ষণাৎ আমরা ঘর ত্যাগ করতে পারবো না। সকালের চা-নাস্তা খাওয়া শেষ হলে আমরা ঘর ছেড়ে দেব। আমাদের এ কথা শুনে তারা আর কোন বিতর্কের মধ্যে না গিয়ে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে লক করে দিল। এবং বাইরে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পাগলা ঘণ্টী বাজিয়ে দিয়ে জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো।

গুলিতে প্রথম মারা যান কমরেড হানিফ শেখ, তারপর কমরেড আনোয়ার হোসেন। উদ্যত রাইফেলের লক্ষ্যকে উপেক্ষা করে আনোয়ার হোসেন আমাকে এক ধাক্কা দিয়ে বলেন, ‘সরে যাও তোমার বাঁচা দরকার।’ এরপর মুহূতেই একটি বুলেট আমার কপালে সামান্য ক্ষত সৃষ্টি করে আনোয়ার হোসেনের মাথায় লাগে এবং তার মাথা সম্পূর্ণরূপে চুরমার হয়ে যায়। কমরেড সুধীন ধর মারা যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তেও তার সহজ ভাব পরিত্যাগ করেন নি। একটা বিড়ি তাড়াতাড়ি ধরিয়ে তিনি বলেন, সবাই আজ লম্বা বিড়ি ধরাও। আজ আর কারো রক্ষা নেই। এর অল্পক্ষণ পরেই তিনি গুলিতে নিহত হন। কম্পরাম সিংহ মারা যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বলেন, ‘যাঁরা বেঁচে থাকবে বাইরে গিয়ে তাদেরকে বলো লাল ঝান্ডার সম্মান রেখেই আমরা মারা গেলাম’। পাগলা ঘণ্টী শুনে রাজশাহীর এস.পি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হলে সেদিন আমাদের প্রত্যেককেই মারা যেতে হতো। এস.পি সঙ্গে সঙ্গে সেই নৃশংস হত্যাকান্ড বন্ধ করার আদেশ করলেন। তার বাড়ি ছিল হায়দারাবাদে (ডেকান)। তিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে ক্যাপ্টেন ছিলেন সেনাবাহিনীতে। তিনি বলেছিলেন যে, যুদ্ধের সময়ে অনেক মৃত্যু তিনি দেখেছিলেন। কিন্তু অসহায় লোকদেরকে ঘরের মধ্যে গুলি করে মারবার কোন নজির তিনি জানেন না।

২৪ এপ্রিল ১৯৫০এ গুলিতে যারা মারা যান যারা তারা হলেন- বিজন সেন, কম্পরাম সিংহ, হানিফ শেখ, দেলোয়ার হোসেন, আনোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, সুখেন ভট্টাচার্য। আহতদের মধ্যে ছিলেন আবদুল হক, বাবর আলী, আমিনুল ইসলাম, মনসুর হাবিব, ভুপেন পালিত, অমূল্য লাহিড়ী এবং নুরুন্নবী চৌধুরী। গুলিতে আবদুল হকের বাম হাতটি দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় এবং মনসুর হাবিবের জানু ও বাহুতে গুলি লাগে। নুরুন্নবী চৌধুরীর পা কেটে ফেলে দিতে হয়। বাকী চারজনও গুরুতর আহত হন। সেদিন যে ৭ জন আহত হয়েছিলেন তারা সেরে ওঠার পর আড়াই বছর তাদেরকে ১৪ নম্বর সেলে তারকাঁটার বেড়ার মধ্যে রাখা হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি ছিল জেলের মধ্যে আমাদের জন্য একটি বিরাট দিন। গুলি চলার পর থেকে আমাদের জন্য খবরের কাগজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পূর্বে জেলে যেভাবে আমরা এক এক ঘরে থাকতাম এরপরে তার অবসান ঘটে। এরপর থেকে তারা আমাদেরকে সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। আমাদেরকে নিজেদের লোক হিসাবে মনে করলো।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৭।।সংখ্যা-০১, রোববার।। ৩০ এপ্রিল ২০১৭।।