নকশালবাড়ী আন্দোলনে ছাত্র-যুবদের অবিশ্বাস্য উত্থান

cropped-13254344_601118923376961_7289040117773670514_n

নকশালবাড়ী আন্দোলন ভারতের বুকে প্রতিত্রিয়াশীল রাষ্ট্র-সরকারের ক্ষমতার বিপরীতে ভূমিহীন, গরীব কৃষক, নিপীড়িত নারী ও জাতিসত্তার ব্যাপক দরিদ্র জনগণের গণক্ষমতার বিস্ফোরণ। যা পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ীসহ কয়েকটি থানায় শুরু হলেও ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০-এর মধ্যেই এর বিপ্লবী শিক্ষা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশে দেশে। এ আন্দোলন প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবতাবাদী ছাত্র-তরুণ-বুদ্ধিজীবীদের সামনে বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল ও তার লেজুড় নির্বাচনপন্থী, সংস্কারবাদী, সংশোধনবাদী ভুয়া বামদের রাষ্ট্রক্ষমতার বিপরীতে মর্যাদাসম্পন্ন, দুর্নীতিমুক্ত নির্লোভ চিত্ত, আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সমতা-ভিত্তিক এক নতুন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। যে আন্দোলনের মতবাদ ছিল মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (তৎকালে মাওসেতুঙ চিন্তাধারা)। এবং এর তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় সিক্ত, ত্যাগ বিপ্লবী দৃঢ়তা ও যোগ্যতার প্রতীক কমরেড চারু মজুমদার।

তাই নকশালবাড়ীর বিপ্লবী ঢেউয়ে প্লাবিত হয়ে ভারতের আলোকপ্রাপ্ত ছাত্র-তরুণগণ অন্যায়, অমানবিকতা ও তাদের স্রষ্টাদের উচ্ছেদ করে পৃথিবীর বুকে কাঙ্খিত স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষে দলে দলে যোগদান করেন। যেখানে কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না, একে অন্যকে নিপীড়ন করবে না, জাত-পাত, ধর্ম ও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হবে না। যেখানে জন্ম নেবে এক নতুন সমাজতান্ত্রিক মানুষ। যাদের লোভ, স্বার্থপরতা, আত্মঅহংকার, প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্থলে প্রতিস্থাপিত হবে নিঃস্বার্থ, বিনয়ী ও পরস্পর সুসমন্বয়ের মহান জীবনবোধ।

মাওবাদী আদর্শে বলিয়ান তরুণ-যুবক বিপ্লবীগণ নিপীড়িত জনগণের সেবায় বুর্জোয়া লেখাপড়া, সম্পদ, পরিবার সর্বস্ব ত্যাগ করেন। শত্রুর বুলেট ও অমানবিক নির্যাতনের মুখে মরণজয়ী সাহস প্রদর্শন করেন। সেসময় সহ¯্রাধিক ছাত্র ও যুবক ভূমিহীন গরীব কৃষকদের সাথে একাত্ম হওয়া ও তাদেরকে বিপ্লবের জন্য জাগিয়ে তুলতে গেরিলা অঞ্চলে গিয়েছিলেন এবং কষ্টকর গ্রামীণ জীবনকে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭০-৭১ সালে তারুণ্য ধ্বংসের রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাসে সহস্রাধিক হত্যাকান্ড এবং তাতে শতাধিক ছাত্র-যুব বুদ্ধিজীবী কমরেড শহীদ হন।

১৯৬৯-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজ, হিন্দু ছাত্রাবাস মাওবাদী রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। মাওবাদী ছাত্রদের জোট- “প্রগতিশীল ছাত্র সমন্বয় কমিটি” কলকাতা এবং চারদিকের প্রায় সব ছাত্র সংসদই দখল করেছিল। মাওবাদীদের নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ছাত্র ফেডারেশন ‘ঘেরাও’-এর মতো জঙ্গীরূপ আবিস্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অসংখ্য সংগ্রাম পরিচালনা করে। পরবর্তীতে পার্টির ডাকে ঐসকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শতাধিক ছাত্র বিপ্লবী রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। বুর্জোয়া আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া ত্যাগ করে কৃষক জনতার সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য গ্রামে চলে যান।

অন্ধ্র প্রদেশে যারা নকশালবাড়ী আন্দোলনের সমর্থনে প্রথমেই এগিয়ে এসেছিলেন এবং ‘নকশালবাড়ী সংহতি কমিটি’ গঠন করেছিলেন তারা ছিলেন গুনতুর মেডিকেল কলেজের ছাত্র। এম ভেঙ্কটারত্মম এবং প্রেমচাঁদ ছিলেন তার পথিকৃৎ। তারা পার্টির ‘লিবারেশন’ পত্রিকা থেকে প্রবন্ধ তেলেগু ভাষায় অনুবাদ করে কমিউনিস্টদের সর্বস্তরে বিতরণ করেন। চাগান্তি প্রসাদ রাও এবং দেবীনেনি মাল্লিকর জুন্ধদ্ধ ছিলেন মেডিকেলের মেধাবী ছাত্র। তারা শ্রীকাকুলামে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে গিয়েছিলেন। ভাস্কর রাও প্রথমদিকে ছাত্রদের মধ্যে নকশালবাড়ীর রাজনীতি তুলে ধরার জন্য পিকিং রেডিও থেকে সংবাদ ও প্রবন্ধ নিয়ে ‘রণভেরী’ নামে হাতে লেখা ম্যাগাজিন বের করেছিলেন।

তারপর পাঞ্জাব, বিহার, ইউপি, তামিলনাড়ু, কেরালা, দিল্লী ও বোম্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও নকশালবাড়ীর রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলাম এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের সশস্ত্র সংগ্রামের উত্থানেও ছাত্র-যুবরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শ্রীকাকুলামকে কমরেড চারু মজুমদার বলেছিলেন ভারতের “ইয়েনান”। যে শ্রীকাকুলাম গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষক বুদ্ধিজীবী সত্যম, কৈলাশম এবং পরবর্তীতে কমরেড পঞ্চাদ্রি কৃষ্ণমূর্তি। যেখানের লোকসাহিত্যে গেঁথে রয়েছেন বিপ্লবী গণশিল্পী শুব্বারও পানিগ্রাহী। যারা রাষ্ট্রীয় শ্বেতসন্ত্রাসের হাজারো শহীদের উজ্জ্বল তারকা।

নকশালবাড়ীর মাওবাদী বিপ্লবী আন্দোলন ’৭০-এর দশকে বিপর্যস্ত হলেও পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারীগণ সারা ভারতে নতুন বিপ্লবী উত্থানের সৃষ্টি করেছেন। ছত্রিশগড়, বিহার, ঝাড়খ-, উড়িষ্যা, কেরালাসহ পশ্চিমবেঙ্গের লালগড়/ জঙ্গলমহলে। যা নকশালবাড়ী আন্দোলনের নতুন বিকাশ। এখনও ভারতের তরুণরা নতুন সংগ্রামে যুক্ত হচ্ছেন, বিপ্লবের স্বার্থে সর্বস্ব ত্যাগ করছেন। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষে। আমাদের দেশের ছাত্র-যুব-তরুণদেরকেও আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে নকশালবাড়ীর বিপ্লবী শিক্ষা তথা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদে সজ্জিত হয়ে অভিন্ন লক্ষ্যে শ্রমিক-কৃষকের সাথে একাত্ম হতে হবে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s