নক্সালবাড়ীর শিক্ষা অমর হোক!

xNAXALBARI-EKAL-SEKAL-1-678x381.jpg.pagespeed.ic.W35FKhk1wi

নক্সালবাড়ী একটি ছোট এলাকার নাম। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার একটি প্রত্যন্ত থানা ছিল নক্সালবাড়ী। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু গত শতাব্দীর ’৬০-দশকের শেষদিকে সেই নামটি ছড়িয়ে পড়লো সারা ভারতে, সারা দক্ষিণ এশিয়ায়, শুধু তাই নয় সারা দুনিয়ায়। নক্সালবাড়ী হয়ে উঠলো এক অমিততেজ আন্দোলনের নাম। আর আজ ৫০ বছর পরে নক্সালবাড়ী হয়ে উঠেছে, বিশেষত ভারতের নিপীড়িত কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী, নারী, দলিত, প্রগতিশীল ছাত্র বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্তসহ শত কোটি মানুষের বিপ্লবী সংগ্রাম ও মুক্তি আন্দোলনের প্রেরণার উৎস। তা হয়ে উঠেছে এক আলোকস্তম্ভ, যাকে দিশা ধরে আজ নিপীড়িত জনগণ তাদের মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

কী হয়েছিলো নক্সালবাড়ীতে সে সময়টাতে? বাহ্যিকভাবে সেটা ছিল একটি সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থান, যাতে কিনা সেই এলাকা ও আশপাশের আরো দু’একটি থানার (খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া) কৃষকেরা জাগরিত হয়েছিলেন। তারা জোতদারদের জোঁকসম শোষণ-নিপীড়ন উচ্ছেদে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা বিদ্রোহ করেছিলেন। কিন্তু এরকম স্থানীয় বিদ্রোহ, বিশেষত কৃষক বিদ্রোহ ভারতেবর্ষে বহু বহু ঘটেছে। ব্যাপকতা ও বিস্তৃতির দিক থেকে বহু কৃষক অভ্যুত্থান ছিল এর চেয়ে অনেক উন্নত। ভারতবর্ষের প্রায় সকল কৃষক অভ্যুত্থান যেমনটা এক পর্যায়ে সশস্ত্র রূপ গ্রহণ করে, এটিও তেমনটাই হয়েছিল, যদিও ব্যাপকতা ও মাত্রার বিচারে অন্য অনেক আন্দোলনের চেয়ে তা ছিল অনেক দুর্বল। তাহলে নক্সালবাড়ী কেন এত বিশিষ্ট হয়ে উঠলো? কেন পরবর্তীকালে ভারতের গোটা বিপ্লবী আন্দোলনটিই ‘নক্সাল আন্দোলন’ নামে পরিচিতি পেয়ে গেলো? আর কেনই বা সেই আন্দোলন আজ “মাওবাদী আন্দোলন” বা “মাওবাদী বিপ্লব” নামে ভারতের মতো এতবড় এক শক্তিশালী প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রের প্রধানতম বিপদ হিসেবে আবির্ভুত হলো? এখানেই নিহিত নক্সালবাড়ীর কৃষক অভুত্থানের বিশিষ্টতা। আর তার মহত্ত্ব।

নক্সালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল কৃষকদের নিছক কিছু জরুরি স্বার্থকে কেন্দ্র করে নয়। ঠিক-যে, সেখানে জোতদারদের শোষণ-নিপীড়ন উচ্ছেদের বিষয় ছিল, ছিল জোতদারের গোলায় ধান না তুলে কৃষকের দখলে তা নিয়ে আসার কর্মসূচি, ছিল সুদি ব্যবসায়ীদের কাগজপত্র ধ্বংস করে দেবার কর্মকা-, কৃষকের হাতে জমির অধিকার ছিনিয়ে নেবার আন্দোলন। সেখানে শিলিগুড়ির চা-শ্রমিকদের সাথে কৃষকের আন্দোলনের এক দৃঢ় মৈত্রী ও মেলবন্ধনও সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সব কিছুর ঊর্ধ্বে এসবই হয়েছিল সমাজবিপ্লবের সর্বশেষ তাত্ত্বিক-মতাদর্শগত বিকাশ মাওবাদের আদর্শে; শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবকে অক্ষশক্তি হিসেবে আঁকড়ে ধরে; শ্রমিক-কৃষকের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হিসেবে ধারণ করে। এবং ফলতঃ ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বের মাঝে জেঁকে বসা সংস্কারবাদী-নির্বাচনবাদী-সংশোধনবাদী মতাদর্শ, রাজনীতি, ঐতিহ্য ও কর্মপদ্ধতিকে স্পর্ধিত চূর্ণ করার মাধ্যমে তার সাথে পরিপূর্ণ বিচ্ছেদ সাধনের দ্বারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক নব উল্লম্ফনের সূচনা ক’রে।

তৎকালীন ভারতবর্ষের সবচেয়ে অগ্রসর কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা একটি সচেতন আদর্শগত ভিত্তিতে এবং একটি সচেতন বিপ্লবী কর্মসূচির অধীনে, সর্বোপরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের স্বপ্নকে ধারণ করে এই নক্সালবাড়ীকে সৃষ্টি করেছিলেন। যাকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম সচেতন মাওবাদী বিপ্লবী কমরেড চারু মজুমদার। যে কারণে নক্সালবাড়ীর অভ্যুত্থানের সাথে চারু মজুমদারের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। যদিও তাকে অস্বীকার করার বহু অপচেষ্টা হয়েছে, যদিও এই নেতৃত্ব ও এই আন্দোলনটির বিরুদ্ধে হাজারটা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যদিও এই আদর্শটিকে ধ্বংস করার জন্য তাবদ প্রতিক্রিয়াশীল এবং ভারতের চরম ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রশক্তি তার সর্বোচ্চ বর্বরতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু তাদের সে সকল অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। নক্সালবাড়ী রয়ে গেছে জাজ্বল্যমান সত্য রূপে। তার বাণী ছড়িয়ে গেছে সারা ভারত জুড়ে, সারা দক্ষিণ এশিয়ায়। তার বার্তা পৌঁছে গেছে সারা বিশ্বে।

** নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ১৯৬৭ সালের মে মাসে। মে মাসের ২৫ তারিখটিকে বিশেষভাবে আনা হয়, কারণ সেদিনটি ছিল সংগ্রামের একটি টার্নিং পয়েন্ট। এটা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা মনে হতে পারে যে, যখন শিলিগুড়ির কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা এরকম এক কৃষক অভ্যুত্থানের সূচনা ঘটান, তখন তারা অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে যে পার্টির সদস্য ছিলেন সেই পার্টিটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হুকুমেই ঐ দিনের নারকীয় হত্যালীলাটি সংঘটিত হয়েছিলো। কারণ, ওই সিপিএম পার্টিই তখন পশ্চিম বঙ্গের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল। আগে থেকেই ক্রমান্বয়ে তীব্র হতে থাকা কৃষক অভ্যুত্থানটির উপর ২৫ মে তারিখে যে কাপুরুষোচিত পুলিশী আক্রমণ পরিচালিত হয় তাতে  ৮ জন নারী ও ২ জন শিশুসহ মোট ১১ জন শহীদ হন। পরে অবশ্য সিপিএম নেতৃত্ব (জ্যোতি বসুরা) কালবিলম্ব না করে চারু মজুমদারসহ অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদেরকে তাদের সেই পচে যাওয়া পার্টি থেকে বহিস্কার করে। সেজন্য অবশ্য পার্টির বিপ্লবী অংশটির মানসিক প্রস্তুতি হয়েই ছিল।

এ পরিস্থিতিটিকে বুঝতে হলে সে সময়কার ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরিস্থিতিটি খুব সংক্ষেপে হলেও তুলে ধরা যায়। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি মহান স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ৩য় আন্তর্জাতিকের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিলো ২০-এর দশকে। সেই পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের সবেচেয়ে সংগ্রামী, ত্যাগী ও মেধাবী বিপ্লবীরা। কিন্তু পার্টিটি সাংগঠনিকভাবে বিরাট বিস্তৃতি ঘটালেও বিপ্লবী রাজনীতির ভিত্তিতে বিপ্লবী সংগ্রামকে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। তবে কৃষক শ্রমিক জনতার বহু গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে এ পার্টির আন্তরিক নেতা-কর্মীরা যুক্ত থাকেন ও তাতে নেতৃত্ব দেন। এর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও উত্থান ছিল ৪০-দশকের শেষ দিকে ও ৫০-দশকের শুরুতে তেলেঙ্গানার মহান কৃষক অভ্যুত্থান, যা কৃষক ও নিপীড়িত জনতার বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের সংগ্রামে পর্যবসিত হয়। কয়েক হাজার গ্রাম জুড়ে সামন্তবাদী কর্তৃত্ব ভেঙ্গে কৃষক-জনতার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হাজার হাজার কৃষকের বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে। কিন্তু তৎকালীন পার্টি নেতৃত্ব এই মহান উত্থানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা একে বর্জন করে ও নিভিয়ে দেয়Ñ তৎকালীন রাষ্ট্রক্ষমতার কংগ্রেস পার্টির সাথে যোগসাজশে। সেই থেকে শুরু। কিছু পরেই এই নেতৃত্ব যৌক্তিকভাবেই প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র রাশিয়ায় বিপ্লব-বিরোধী ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদীদের উত্থান হলে তাদের সাথে সহজেই যোগ দেয়। এ অবস্থায় বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিপ্লবী নেতৃত্বদানে মাও সেতুঙের নেতৃত্বে চীনা পার্টি এগিয়ে আসে। তারই প্রভাব পড়ে ভারতীয় পার্টিতেও। চীনা পার্টির বিপ্লবী লাইনের প্রভাবে ভারতের আন্তরিক কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা সিপিআই নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এর ফলশ্রুতিতেই গঠিত হয় ১৯৬৪ সালে সিপিএম। জ্যোতি বসু-নাম্বুদ্রিপদদের নেতৃত্বে। স্বভাবতই শিলিগুড়ির বিপ্লবীরা সিপিএম-এ যুক্ত হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই প্রমাণ হতে থাকে যে, সিপিএম নেতৃত্ব শুধু বাহ্যিকভাবেই চীনা পার্টির আদর্শের কথা বলছে, কিন্তু সারবস্তুগতভাবে তারা পুরনো সিপিআই সংশোধনবাদী-সুবিধাবাদীদের পথেই চলছে।

এদিকে কিন্তু মাও-এর শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে শিলিগুড়িসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার আন্তরিক বিপ্লবীরা সত্যিকার কৃষি বিপ্লব সাধনের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন। চারু মুজুমদার তখন শিলিগুড়ি শাখার নেতৃত্বদের একজন। যদিও তিনি ছিলেন পূর্বাপর অসুস্থ, কার্ডিয়াক এ্যাজমার জটিল রোগী, ক্ষীণকায় এক মানুষ। কিন্তু তিনি তার অঞ্চলে পার্টিকে বিপ্লবী চেতনায় সজ্জিত এবং বাস্তব বিপ্লবী সংগ্রামে উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ১৯৬৫ সালের মধ্যেই পর পর আটটি দলিল রচনা করেন। যা পরবর্তীতে ‘ঐতিহাসিক ৮ দলিল’ নামে খ্যাত হয়। এই ছিল মতাদর্শগত-রাজনৈতিক ভিত্তি,  সেইসাথে নতুন বিপ্লবী ধারার সাংগঠনিক কাজেরও গাইড লাইন, যার ভিত্তিতে শিলিগুড়িতে চা-শ্রমিক ও কৃষকদের মাঝে বিপ্লবী সংগঠন বিকশিত হয়ে ওঠে। এবং তারই যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে সংঘটিত হয় নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান।

নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান তিনটি মূল বিষয়কে সামনে নিয়ে এলো- ১. মাও সেতুঙ চিন্তাধারাকে মতাদর্শগত তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা; ২. কৃষি-বিপ্লবকে আঁকড়ে ধরা; এবং ৩. সশস্ত্র বিপ্লবী পথে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা। এই ছিল সূচনা, এক নতুন ভোর, যা পরে বিকশিত হয়ে ওঠে এক রোদ্র করোজ্জল দিবসে। যা ছিল মহান মাওয়ের নেতৃত্বে চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরই ভারতীয় সংস্করণ।

তখনও উপরোক্ত মতাদর্শ-রাজনীতির ভিত্তিতে কোন বিপ্লবী পার্টি গড়ে ওঠেনি। অভ্যুত্থানটি ছিল স্থানীয়। ফলে রাষ্ট্রীয় দমনে ও স্থানীয় শত্রুদের যোগসাজশে যে দমন-নির্যাতন নেমে আসে তাকে মোকাবেলা করে সে অভ্যুত্থান টিকতে পারেনি। কিন্তু তা এক নতুন বার্তা সমগ্র ভারতে সাচ্চা কমিউনিস্ট, সাচ্চা বিপ্লবী ও নিপীড়িত জনগণের সামনে তুলে ধরে। সারা ভারত জুড়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো- নক্সালবাড়ী লাল সেলাম! মুক্তির একই পথ নক্সালবাড়ী!! কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠতে থাকে বহু গ্রুপ ও গোষ্ঠী যারা এই নতুন মতাদর্শ ও রাজনীতির সমর্থনে এগিয়ে এলো। যারই ধারাবাহিকতায় দুই বছর পর ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল কলকাতায় ভারতের সত্যিকার বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, সিপিআই(এমএল) গঠিত হয়, যার প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হন কমরেড চারু মজুমদার।

** পার্টি-গঠনের পর নক্সালবাড়ীর আদর্শে বিপ্লবী সংগ্রাম ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে, তা আরো এগিয়ে চলে। সারা ভারতকে তা কাঁপিয়ে দেয়। শ্রীকাকুলাম, দেবরা-গোপীবল্লভপুর, বীরভূমসহ বিভিন্ন বিপ্লবী এলাকা গড়ে ওঠে। অসংখ্য তরুণ ও কৃষক ঝাঁপিয়ে পড়েন এই মুক্তি সংগ্রামে। এক নতুন বিপ্লবী সংস্কৃতি পুরনো বুর্জোয়া মুৎসুদ্দি সামন্ত সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণার দুর্গে সজোর আঘাত হেনে বেড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র ও কায়েমী স্বার্থবাদীরাও বসে থাকেনি। তারা বিভৎস দমনে ক্ষত-বিক্ষত করে বিপ্লবী কৃষক, তরুণ ও বিপ্লবীদেরকে। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে কমরেড চারু মজুমদারকে গ্রেফতারের পর পুলিশী হেফাজতে তাকে হত্যা করা হয়। মুক্তির এ সংগ্রাম সাময়িকভাবে হলেও মার খেয়ে যায়।

কিন্তু পূর্বেই যেমনটা বলা হয়েছে, নক্সালবাড়ী নিছক এক স্থানীয় কৃষক অভ্যুত্থান ছিল না। সেটা ছিল ভারতবর্ষে বিশ্বের অগ্রসরতম বিপ্লবী মতাদর্শ ও তাত্ত্বিক ভিত্তির আগমনবার্তা। যার কোন মৃত্যু নেই। তাই আমরা দেখি আজ ৫০-বছর পরে নক্সাল আন্দোলন ধ্বংস তো দূরের কথা, বরং ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় নক্সালবাড়ীর আদর্শ মাথা উঁচু করে ভিত্তি গেড়ে বসেছে। বিগত ৫০-বছরে এই আদর্শের বেদিতে স্বেচ্ছাবলী দিয়েছেন হাজারো তরুণ, হাজারো কৃষক ও শ্রমিক। কিন্তু এ মিছিলের শেষ নেই। এবং তার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অমিত শক্তিধর চরম প্রতিক্রিয়াশীল ভারতীয় রাষ্ট্রশক্তিকে পরাজিত করে বিস্তীর্ণ মুক্ত এলাকা, কৃষক ও নিপীড়িত জনগণের, আদিবাসী কৃষক ও নারীদের বিশাল বাহিনী। যার সুবাতাস প্রতিনিয়তই ছড়াতে থাকে ছত্তিশগড়, ঝাড়খ-, বিহার, মহারাষ্ট্র, পশ্চিবঙ্গের জঙ্গলমহল থেকে।

** নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান, আর ‘নকশাল আন্দোলন’ একই বিষয় নয়। নক্সালবাড়ী দিয়ে সূচিত নকশাল আন্দোলনও অন্ততপক্ষে দুটো প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত- কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বকালীন সময়কাল; আর পরবর্তীকালে অন্ধ্র-বিহার থেকে উত্থিত সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। এগুলো একটি থেকে আরেকটি উচ্চতর। বিপ্লবী সারবস্তুকে আঁকড়ে ধরে কৃত ভুলকে কাটিয়ে ক্রমাগত এগিয়ে যাবার অভিন্ন ধারা। এই ক্রমোন্নতির ধারাটিকে কেউ কেউ বুঝতে চান না, যদিও তারা নকশাল আন্দোলনের সমর্থক। এটা হয় এজন্য যে, তারা একথা অস্বীকার করেন যে, নক্সালবাড়ী বা চারু মজুমদারের জায়গাতেই এ বিপ্লবী আন্দোলন সীমাবদ্ধ নেই, থাকতেও পারে না, থাকলে তা এগুতেও পারতো না।

কিন্তু এগুলোকে এক থেকে আরেকটিকে বিচ্ছিন্ন করলেও চলবে না। নক্সালবাড়ীরই ধারাবাহিকতা আজ ছত্তিশগড়ের গণযুদ্ধ। যাকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে মাওবাদ, নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব- যার কেন্দ্রে রয়েছে কৃষি বিপ্লব এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের গণযুদ্ধ- এই তিন মৌলিক মতাদর্শ ও রাজনীতি।

নক্সালবাড়ীর ৫০-তম বার্ষিকীতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন আর স্মৃতিতর্পণের সাথে যদি উপরোক্ত মতাদর্শ-রাজনীতিকে সঠিকভাবে ধারণ ও প্রয়োগ করা না যায় তাহলে পথভ্রষ্ট হতে হবে। নক্সালবাড়ীর মূল বাণী বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ জনগণের বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিষ্ঠা, বিপ্লবী রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণ, যা কিনা সমাজতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ বেয়ে বিশ্বব্যাপী কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষে এগিয়ে চলবে। তাই, সংগ্রামটি বৈশ্বিক এবং সুদীর্ঘস্থায়ী। কয়েক প্রজন্ম ধরে এই সংগ্রামকে বহমান রাখতে হবে। ভারতে, বাংলাদেশে, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় এবং সারা বিশ্বে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা

 

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s