নকশালবাড়ি আন্দোলনে সৃষ্ট সাহিত্য সম্পর্কে

 

নকশালবাড়ির বিপ্লবী কৃষক আন্দোলন সংশোধনবাদী রাজনীতির সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে সারা ভারতে যেমন বিপ্লবী আলোড়ন তুলেছে, তেমনি সর্বহারা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতকেও লাল আলোয় উদ্ভাসিত করেছে। শিল্প-সাহিত্যেও বিপ্লবী জোয়ার এনেছে। এ আন্দোলন অনেক গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা ও গান সৃষ্টি করেছে। তবে নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলনের মতই শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির পথও কন্টকাকীর্ণ ও রক্তাক্ত ছিল। রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাসের খড়গ লেখক-সাহিত্যিকদের উপরও নেমে আসে। হত্যা-গ্রেপ্তার-নির্যাতন, কারাবরণ কিছুই বাদ যায়নি তাদের ক্ষেত্রেও। কারণ জনগণের ক্ষমতার লড়াইয়ে লেখক-সাহিত্যিকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। শ্রমিক-কৃষক-নিপীড়িত জনগণের বিপ্লবী সংগ্রাম যে বিপ্লবী সাহিত্য নির্মাণ করে নকশালবাড়ির সংগ্রাম তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নকশাল আন্দোলনে সৃষ্ট কবিতগুলোতে উঠে এসেছে সরাসরি কৃষকদের জীবন ও সংগ্রামের কথা, মতবাদ ও রাজনৈতিক আহ্বান। প্রতিক্রিয়াশীল-সংশোধনবাদী ভোটবাজ রাজনীতি বর্জনের ডাক, রক্তাক্ত সংগ্রামের আহ্বান। সামন্তবাদী শোষণের উম্মোচন, রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লাল সন্ত্রাসের ন্যায্যতা। গল্প-উপন্যাস-নাটকে উঠে এসেছে ছাত্র-তরুণ-তরুণী, কৃষক, নারী, আদিবাসীদের দুঃসাহসী হয়ে উঠার কাহিনী। উঠে আসে সাঁওতাল মেয়ের নির্ভীক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এবং সমাজের রীতি ভাঙ্গার দুঃসাহস। রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাস এবং কৃষক-আদিবাসী জনতাকে বিপ্লবী চেতনায় জাগ্রতকরণ।

নকশালবাড়ি আন্দোলনে ব্যাপক সংখ্যায় ন্যায়নিষ্ঠ ছাত্র-যুবকরা এসেছিল। পার্টির ‘গ্রামে চলো’ ডাকে ঘর ছেড়ে তারা ভূমিহীন ও গরীব কৃষকদের সঙ্ঘবদ্ধ করতে গ্রামে যায় এবং শহরে যায় মজুরের মধ্যে। স্বর্ণমিত্র লিখলেন ‘গ্রামে চলো’ উপন্যাস। ‘গ্রামে চলো’ উপন্যাসে দেখা যায় উচ্চ শিক্ষিত শহুরে ছাত্র-তরুণদের অংশগ্রহণে মধ্যবিত্ত জীবনের মোহ ত্যাগ করে গ্রামের কষ্টকর সংগ্রামে তাদের জীবন-মরণ সংগ্রাম। নকশালবাড়ির সাহিত্য সম্পর্কে ভারতীয় বিপ্লবী সাহিত্যিক-কবি কাঞ্চন কুমার লিখেছেন “নকশালবাড়ির রাজনৈতিক উত্তাপ জোয়ারের মতো অগুণতি নতুন কবিদের সামনে নিয়ে এল। এই নতুন প্রজন্মের অগ্রগামী কবি ছিলেন দ্রোণাচার্য ঘোষ……এই কবি এবং গেরিলা কমান্ডারকে শাসকশ্রেণি জেলে নির্মমভাবে হত্যা করে। আজ বাংলার কোনো কবিতা সংকলন দ্রোণাচার্যের কবিতা ছাড়া অপূর্ণ থেকে যাবে”। নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান শুরু হতেই নাট্যকার উৎপল দত্ত নকশালবাড়ি যান; সরেজমিনে কৃষকদের এবং স্বয়ং চারু মজুমদারের সাথে আলাপচারিতার ভিত্তিতে লেখেন ‘তীর’ নাটক। যা বাংলা নাটকে নকশালবাড়ির আন্দোলনের তত্ত্বকে শৈল্পিক রূপ দিয়ে দর্শকদের আলোড়িত করেছিলো।

 ১৯৬৭ সালে নকশালপন্থীদের মুখপত্র ‘দেশব্রতী’র শারদীয় সংখ্যায় অনল রায়ের ‘রক্তের রং’ ছাপা হয়-  নকশালবাড়ি আন্দোলনের উপর এটি মুদ্রিত প্রথম নাটক। নকশালবাড়ির আন্দোলনের জোয়ারে যেখানে যেখানে সংগ্রাম হয়েছিল সেখানে সেখানেই বিপ্লবী সাহিত্য লেখা হয়েছে। বিপ্লবী লেখক সরোজ দত্ত তার লেখা প্রবন্ধগুলোতে সাহিত্য সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বকে তুলে ধরেছেন। নকশালবাড়ীর আন্দোলনে সৃষ্ট শিল্প-সাহিত্যের সমগ্র বিবরণ আমাদের এই ছোট্ট পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়। এমন অসংখ্য শিল্প সাহিত্য সৃষ্টির রূপকার কবি সাহিত্যিকদের সংগ্রাম ও সাহিত্যের তথ্য পাওয়া যাবে বিপ্লবী কবি ও সাহিত্যিক কাঞ্চন কুমারের “নকশালবাড়ী ও সাহিত্য”সহ ভারতীয় বিপ্লবীদের বিভিন্ন প্রকাশনায়।

কবিদের মধ্যে দ্রোনাচার্য ঘোষ, তিমির বরণ সিংহ, অমিয় চট্টোপাধ্যায়, মুরারি মুখোপাধ্যায়, সৃজন সেন, চেরাবন্ডা রাজু, ওয়র ওয়র রাও, সুব্বারও পানিগ্রাহী সহ আরও অনেকে। এদের অনেকেই শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন। সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘জননাট্য মন্ডলী’ নকশালবাড়ি শহীদ কমরেডগণের রক্ত বহন করছে। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব গড়ে তোলার লক্ষে কাজ করছে। নকশালবাড়ী আন্দোলনে সৃষ্ট উপন্যাস, গণসংগীত ও সিনেমা রয়েছে বেশ কিছু।

আমাদের দেশে বিপ্লবাকাঙ্খী সাহিত্যিকগণ আন্দোলন থেকে দূরে বা বিচ্ছিন্ন থেকে সাহিত্য নির্মাণের চেষ্টা করেন যা বিপ্লবী হয় না, হয় কল্পনাশ্রয়ী সাহিত্য। তারা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অংশগ্রহণ, দৃঢ় সমর্থন ও নতুন সমাজ নির্মাণে তাদের ভূমিকাকে এড়িয়ে চলেন। এবং বলেন যে, বিপ্লবী আন্দোলন গড়া পার্টির কাজ, সাহিত্যিকদের নয়। এ ধরনের বক্তব্যে তারা নিজেদের দায় সারা করেন। যে জিনিসটা তারা বুঝেন না অথবা বুঝেও সুবিধাবাদী অবস্থান নেন সেটা হল বিপ্লবী সাহিত্য নির্মাণের জন্য প্রয়োজন বিপ্লবী মতাদর্শ ধারণ। বিপ্লবী মতাদর্শ ধারণ না করলে সে সাহিত্য সংস্কৃতিও পুঁজিবাদী মতাদর্শকেই ধারণ করে। মাও বলেছেন রাজনীতি-অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশ হচ্ছে সংস্কৃতি। বিপ্লবী সাহিত্য সৃষ্টিতে বিপ্লবী সংগ্রামকে ধারন করতেই হবে।

নীচে নকশালবাড়ির সাহিত্যের কিছু তালিকা দেওয়া হলোঃ

উপন্যাসঃ

১। হাজার চুরাশির মা- মহাশ্বেতা দেবী

২। গ্রামে চলো- স্বর্ণমিত্র

৩। অগ্নির উপাখ্যান- শৈবাল মিত্র

৪। কমুনিস – শঙ্কর বসু

৫। শালবনী- গুনময় মান্না

৬। এই ভাবেই এগোয়- জয়ন্ত জোয়ারদার

গল্পঃ

১। অপারেশন, বসাই টুডু, ‘দ্রৌপদী’- মহাশ্বেতা দেবী

২। বাঘ শিকার, প্রসব – স্বর্ণমিত্র

৩। খোচর –  নবারুণ ভট্টাচার্য

৪। অপ্রতিদ্বন্দ্বী –  দীপংকর চক্রবর্তী

৫। মোকাবেলা –  কালী প্রসাদ রায় চৌধুরী

৬। অভ্যুত্থান – সুখেন মুখার্জী

৭। প্রতিরোধ – শঙ্কর সেনগুপ্ত

৮। খোদা হাটির ডাক –  ব্রজেন মজুমদার

৯। সন্তানের নাম ধান – বেনু দাসগুপ্ত

নাটকঃ

১। তীর – উৎপল দত্ত

২। রক্তের রং – অনল রায় ইত্যাদি।

 

বিপ্লব জ্বলে

   – দ্রোণাচার্য ঘোষ

প্রত্যেক ঘরে গর্জে উঠছে আজকে লক্ষ ছেলে

প্রত্যেক গ্রামে ঘাঁটি  গড়া চাই এই কথা ভুলে গেলে

বিষম সর্বনাশ।

   তাই আজ জাগে নতুন সূর্য। নতুন দিনের মাস।

বিপ্লবী দিন বুকে এসে বাজে ছুঁড়ে ফ্যালো ভীরু ঘুম

ক্রীতদাস বেলা কাটানো এখন নয়।

এখন আমরা নির্ভীক নির্ভয়

এখন সময় নেই ওড়ানোর বৃথা কোনো কালো ঘুম।

পৃথিবী সচল, বিপ্লব আগুয়ান

সেই পথে যেতে মজদুর হাতে থাকুক লাল নিশান

    অন্য ভাবনা ভাবার সময় আজকে যে আর নেই

বিপ্লব জ্বলে প্রতি বুকে বুকে মুক্তির বাতাসেই।

 

মুখোশ খুলে ধরেছে

সৃজন সেন

পিকিং মন্ত্রে ধনুর্ধারী

যত সব হঠকারী

দখল করে খড়িবাড়ি

ফাঁসিদাও আর নকশালবাড়ী

লড়াই শুরু করেছে।

তাই না দেখে দাদা-কাকা

ছাড়েন বচন আঁকা-বাঁকা

মাও-ও নাকি সিআইএ-র চর

মিটিং করে বলেছে।

জোতদারেরা মদত পেয়ে

বন্দুক হাতে চলেছে,

সাতকিষাণী দু’জন শিশুর

রক্তে মাটি ভরেছে।

এক তীরেতে ভাঙলো হাড়ি

‘ডাঙ্গে’ ধরা পড়েছে।

পিকিং মন্ত্রে ধনুর্ধারী

যত সব হঠকারী

দখল করে খড়িবাড়ী

ফাঁসিদাও আর নকশালবাড়ী

ঠুনকো যত বিপ্লবীদের

মুখোশ খুলে ধরেছে

সাত কিষাণী দুজন শিশুর

মরণ ধন্য হয়েছে।

১৫.৮.১৯৬৭

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s