ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তিঃ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর চরম হুমকি

india-bangladesh4

গত ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী বিশাল বহর নিয়ে ৪ দিনের ভারত সফর করে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বয়ং বিমান বন্দরে এসে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানানো ও রাষ্ট্রপতি ভবনে আতিথেয়তা, সরকারের ভাষায় তা ভারত-বাংলাদেশ বিশেষ বন্ধুত্বের মর্যাদার  নজির। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৬টি চুক্তি, ১৬টি সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে ৩৪টি দলিলে সইয়ের কথাও বলা হয়েছে। এ সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা পানি বন্টন চুক্তি, ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য বৈষম্য হ্রাস, গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প, সীমান্তে বি.এস.এফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যার মত বিষয়গুলোর সুরাহা হয়নি। যদিও ভারতের দিক থেকে  শেখ হাসিনার এ সফরে বিশেষ গুরুত্ব পায় ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তির মত স্পর্শকাতর বিষয়টি। সফরের পূর্বে ও পরে চুক্তির বিষয়ে জনগণকে মূলত অন্ধকারে রাখা হয়েছে। সরকারের এই গোপনীয়তা রক্ষা ও পরবর্তীতে চুক্তির বিষয়ে যতটুকু জানা যায় তা বাংলাদেশের জন্য চরম অবমাননাকর। এ সরকারের ঔদ্ধত্য এতখানি যে ব্যাপক জনগণের তীব্র বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ভারতের কাছে বিকিয়ে দিয়েছে। এমন একটি চুক্তি করতে তারা কোন গণভোট বা জাতীয় ঐক্যেরও প্রয়োজন বোধ করেনি। এমনকি তাদের ভুয়া সংসদে পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন পূর্ব-আলোচনা বা অনুমতি তারা নেয়নি। গুম-খুন-ক্রসফায়ার-মামলা-গ্রেফতার সর্বত্র রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাস সৃষ্টি করে জনগণের কণ্ঠরোধ করে তারা এ চুক্তি করে এসেছে। শাসকগোষ্ঠীর অপর দল বিএনপি-জামাতও এই প্রশ্নে কোন আন্দোলন গড়ে তুলেনি। আগামী নির্বাচনে গদি রক্ষার জন্যই দেশবিরোধী এই “চুক্তি” করেছে লুটেরা গণবিরোধী এ সরকার। দাসখতের এই চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী অতীতের মত ভারতের সমর্থন আদায়ের মধ্য দিয়ে তার শাসনামলকে দীর্ঘায়িত করার নকশা আঁকছে।

’৭১-এ মুজিবনগর অস্থায়ী সরকারের সাথে তৎকালীন ভারত সরকারের যে চুক্তি হয়েছিল তা পরিণতি পেয়েছিল ১৯৭২ সালের “মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি”র মধ্য দিয়ে। এই চুক্তির মাধ্যমে এদেশের উপর ভারতের যে সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা শুরু হয়েছিল “ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি” তারই বিকশিত রূপ। মার্কিন সাহায্য ও পরামর্শ ছাড়া ভারতের এই অঞ্চলে এই ধরনের চুক্তি করার সামর্থ্য নেই। মোদি সরকারের সাথে হাসিনা সরকারের এই চুক্তি বাংলাদেশে চীনের আধিপত্য ঠেকানো ও দক্ষিণ-চীন সাগর ও বঙ্গপোসাগর কেন্দ্রিক ‘ভারত-মার্কিন’ যৌথ পরিকল্পনার অংশ বৈ আর কিছু নয়।

এই চুক্তি হঠাৎ করেই হয়নি। ২০১৫ সালে মোদির বাংলাদেশে আগমনের সময়ই এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। জনগণ দেখেছে এদেশে আসার ঠিক আগে মোদি সরকার তাদের দৃষ্টিতে এদেশের “বোকা জনগণ”কে সান্তনা দেওয়া ও ভারত বিরোধিতা ঠেকানোর জন্য সংসদে “সীমান্ত চুক্তি” বিল এনেছিল। এই সীমান্ত চুক্তির পরও ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা বন্ধ তো হয়ইনি, বরং বেড়েছে।

এই চুক্তির মাধ্যমে সরকার যেমন সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করেছে, তেমনি ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীও অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙ্গে সম্প্রসারণবাদী নীতির ষোলকলা পূর্ণ করেছে। একটি বৃহৎ পুঁজির কাছে ক্ষুদ্র পুঁজি যেভাবে ধ্বংস হয়, বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর সাথে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়বে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই চুক্তির খসড়া সরকার জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মালিকানাধীন পত্রিকা “দ্য ইন্ডিপেন্ডেট” আংশিক প্রকাশ করেছে।

সেখানে দেখা যায় এ চুক্তিতে মোট ১০টি অনুচ্ছেদ রয়েছে।

** অনুচ্ছেদ-১ এ বলা হয়েছে “উভয় দেশ সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। এক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে এবং জাতীয় আইন, নিয়মনীতি ও প্রথার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।” এই ধরনের কথা বলা যে ফাঁকা বুলি, আর জনগণকে ধোকা দেওয়া ছাড়া কিছুই না তার অনেক উদাহরণ আছে। জনগণ দেখেছে গত ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে সংবিধানের দোহাই দিয়ে ভারত কিভাবে এদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে জাতীয় আইন, নিয়মনীতি ও প্রথার প্রতি কিরূপ “শ্রদ্ধা” দেখিয়েছে!

** অনুচ্ছেদ-২ এ বলা হয়েছে “উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধি পাঠাবে। সামরিক প্রশিক্ষণ, সামরিক বিশেষজ্ঞ বিনিময়, পর্যবেক্ষণ, তথ্যবিনিময়, সামরিক সরঞ্জাম দেখভালের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ত্রাণ সহায়তা, বার্ষিক আলোচনার ব্যবস্থা, জাহাজ ও বিমান কার্যক্রম পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় যৌথ মহড়া দিতে পারে”। এটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, পারস্পরিক সহযোগিতার নামে এক ভয়ানক নতজানু অবস্থান নিয়েছে এই সরকার। এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে ভারতীয় সেনাদের যথেচ্ছগমন নিশ্চিত হবে। এর ফলস্বরূপ ইতিমধ্যেই ভারতীয় সেনাপ্রধান দু’বার বাংলাদেশ সফর করেছে। কখন, কোথায়, কি নিয়ে আলোচনা হবে জনগণ এর কিছুই জানবে না। অবশ্য এই চুক্তির আগেও যে জনগণ জানত তা বলা যাবে না। কিন্তু এর মাধ্যমে জনগণকে আরো অন্ধকারে রেখে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে তা বলা যায়। ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে শাসকগোষ্ঠিও এসব গোপন করে যাবে। চলবে মিডিয়ার উপর নজরদারী।

‘সামরিক সরঞ্জাম দেখভাল’র মাধ্যমে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কাছে এদেশের সামরিক বাহিনীর প্রকৃত অবস্থা আর গোপন থাকবে না। এদেশের সেনাবাহিনীর কাছে কি কি অস্ত্র আছে তা খুব সহজেই জেনে যাবে তারা। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে তারা যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আশীর্বাদপুষ্ট একটা শ্রেণি তৈরি করবে তা বলাই বাহুল্য।

‘যৌথ মহড়া’র মাধ্যমে তারা এদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে ভারত-চীন ¯œায়ুযুদ্ধের রণকৌশলের সাথে যুক্ত করবে। ফলে স্পষ্টত এক ভয়াবহ মেরুকরণ হবে দক্ষিণ-এশিয়ার ভূরাজনীতিতে। যার ফলে এদেশ হতে পারে ভারত-মার্কিন যৌথ সামরিক ঘাঁটি ও রণক্ষেত্র। যেমনটি এখন চলছে উত্তর কোরিয়াকে ঠেকানোর লক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি। চীনকে ঠেকাতে এদেশও এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্ত হল।

** অনুচ্ছেদ-৩ এ বলা হয়েছে, “উভয় দেশ সামরিক শিল্প স্থাপন ও সহযোগিতা বিনিময় করতে পারবে। মহাকাশ প্রযুক্তিতে সহায়তা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সমুদ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারবে।” এখানে উভয় দেশ বলা যে কত হাস্যকর তা বলাই বাহুল্য। কারণ ভারতে যদি এদেশের সামরিক বাহিনী কিছু করতে চায় তা তারা রাজনৈতিক অনুমতি ছাড়া করতে পারবে না। আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে ভারতের উপর নির্ভরশীল তা আগেই বলা হয়েছে। এদেশের সামরিক বাহিনী যে ভারত থেকে শক্তিশালী নয় তা জনগণ জানে। তাই পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময় যে একতরফা হবে তা বলা যায়। বরং এই চুক্তির মাধ্যমে এমন ক্ষেত্র তৈরি করা হবে যাতে ভবিষ্যতে এদেশের সেনাবাহিনী ভারতের অনুগত হয়ে কাজ করবে। এর আরো মূর্ত রূপ দেখা যায় এই অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে “সামরিক শিল্প স্থাপন”র কথা। অর্থাৎ ভারত চাইলেই এদেশে সামরিক শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। ভবিষ্যৎ যুদ্ধের পরিকল্পনায় যেকোন সময় জাহাজ বা অস্ত্র কারখানা তারা এদেশের মাটিতেই করতে পারবে। যার ফলে এদেশের সামরিক বাহিনী কার্যত হবে ভারতের পদানত। এদেশকে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের শুরু হবে নতুন নতুন খেলা। দেশের ভূখন্ড ও জনগণ হয়ে পড়বে চরমভাবে অরক্ষিত। এদেশের সামরিক বাহিনীতে সৃষ্টি হবে ভারতের মদদপুষ্ট আমলা-দালাল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। চিকিৎসা সেবার নামে এসব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পাবে নানা সুযোগ সুবিধা ও নিরাপত্তা। এর মাধ্যমে দেশের উপর ভারতের সামরিক আধিপত্য আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

“মহাকাশ প্রযুক্তি সহায়তা”র নামে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এদেশের উপর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করবে গোয়েন্দা নজরদারী। সীমান্ত কার্যত হয়ে পড়বে অরক্ষিত।

“সমুদ্র অবকাঠামো” নির্মাণের নামে এদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস উত্তোলন, গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর তৎপরতা। পায়রা বন্দরসহ দেশের সবকটি সমুদ্র ও নদী বন্দরে দেখা যেতে পারে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি।

** অনুচ্ছেদ-৭ এ বলা হয়েছে “উভয় দেশ তথ্য আদান-প্রদানে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না তা নিশ্চিত হবে এবং এক্ষেত্রে উভয় দেশ কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করবে”। এর মাধ্যমে ভারতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোন তথ্য বাংলাদেশ অন্য দেশকে দিতে পারবে না বা পরামর্শ করতেও পারবে না। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী তথা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভারতের নতজানু হয়ে চলতে হবে। বুর্জোয়া সামরিক বিশেষজ্ঞরা যতই বলুক পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করলে এই চুক্তিতে কোন সমস্যা নেই, বাস্তবে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে। গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র ভারতীয় স্বার্থই রক্ষা হবে, কারণ নিকট ভবিষ্যতে এদেশে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হবে। বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর বা গণবিরোধী হলেও এদেশের সামরিক বাহিনী কার্যত কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না অথবা রাখলেও দুই বাহিনীর মধ্যে প্রতিযোগিতায় ভারতীয় বাহিনীর স্বার্থই রক্ষিত হবে। এছাড়াও চুক্তিতে শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণে ভারত ও বাংলাদেশ থেকে কোন কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে তারও একটা খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে টাটা মেডিকেল সেন্টার, ভারতীয় ডিফেন্স কলেজগুলো……… পরস্পর সহযোগিতার আওতায় আসবে ।

এই চুক্তির আরো অংশ যে গোপন রয়েছে তা ধারণা করা যায়। যদি এ চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশিত হত তাহলে আরো ভালভাবে এই চুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব ব্যাখ্যা করা যেত। জনগণের কোন ধরনের অনুমতি ছাড়াই যেভাবে এই চুক্তি করা হয়েছে তার দায় কেবলমাত্র আওয়ামী সরকারের। এ দায় বর্তায় শুধু মাত্র আমলা-মুৎসুদ্দি শাসকশ্রেণির উপর। অবর্ণনীয় লুটপাট, বিদেশে টাকা পাচার, গুম-খুন-ক্রসফায়ারের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এই ফ্যাসিবাদী সরকার। ফলে জনগণের কন্ঠরোধ করতে সকল আয়োজনই ক্রমান্বয়ে সম্পন্ন করছে। “ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি” তার শেষ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে এদেশের উপর ভারতীয় শাসকগোষ্ঠির আধিপত্য আরো বৃদ্ধি পাবে, দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে এদেশকে ভারতের দক্ষিণ-এশীয় যুদ্ধকৌশলের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, তা এদেশের সচেতন জনগণ কখনো মেনে নেবে না। এ অবস্থায় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ত্ব-গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দেশের প্রতিটি জনগণ ভারতের এই আধিপত্য ও সরকারের নতজানু নীতির বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলবেন। সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে বেগবান করবেন।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা

 

Advertisements

নকশালবাড়ি পরবর্তী ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন

82927270-575b-46db-8d0e-50fcd6145a93

১৯৬৭ সালের মে মাসে নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন মূলত: মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাস। নকশালবাড়ি কৃষক সংগামের ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ বিশ্বাসঘাতক সংশোধনবাদী লাইনের মুখোশ টেনে-ছিঁড়ে খোলাসা করে দেয়। সিপিআই-সিপিএম অনুসৃত শ্রেণি সমন্বয়বাদী-শান্তিপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচনপন্থী-সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের (তখন মাও চিন্তাধারা বলা হতো) ভিত্তিতে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের পথে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনীতিতে এগিয়ে নেয়। নকশালবাড়ি তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহের উত্তরাধিকার লাভ করে। ভারতে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির মতবাদ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশ হিসেবে তৃতীয় স্তর মাওবাদ তথা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (মালেমা) প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

নকশালবাড়ির পর আর কোন কিছই আগের মতো রইলো না। পুরনো সব ধ্যান-ধারণা-চিন্তাধারা-দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা হয় নকশালবাড়ির কষ্টিপাথরে। যা ছিল চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধারাবাহিকতা।

কৃষক অভ্যুত্থানের পরপরই ১৪ জুন ১৯৬৭, কলকাতায় “নকশালবাড়ি ও কৃষক সংগ্রাম সহায়ক কমিটি” গঠিত হয়। নকশালবাড়ির স্ফুলিঙ্গ থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ-বিহার-উড়িশ্যা-উত্তর প্রদেশ-পাঞ্জাব-কেরালা-তামিলনাড়–-ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তৃত এলাকায় সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। ’৬৭ সালেই গঠিত হয় “কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি”। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল মহামতি লেনিনের জন্মবার্ষিকীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে)-[সিপিআই(এমএল)] গঠিত হয়। পার্টির তাত্ত্বিক ভিত্তি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা। নবগঠিত এই পার্টির দশ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন মহান মাওবাদী নেতা কমরেড চারু মজুমদার। ঐ বছরেই মে দিবসে কলকাতায় শহীদ মিনারে এক জনসভায় কানু সান্যাল পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন।

১৯৭১-৭২ সালে খুনি ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার পশ্চিমবঙ্গসহ সমগ্র ভারতে এই সশস্ত্র ও গণসংগ্রাম তথা গণযুদ্ধকে ধ্বংস করার জন্য ব্যাপক দমন-নির্যাতন চালায়। তারা ক. চারু মজুমদার-সরোজ দত্তসহ হাজার হাজার মাওবাদী বিপ্লবীকে গ্রেফতার-হত্যা করে। বিখ্যাত লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর লেখা “হাজার চুরাশির মা” উপন্যাসে তার কিঞ্চিত স্বাক্ষর রয়েছে। পার্টির কিছু লাইনগত ভুল-ত্রুটি এবং রাষ্ট্রীয় শ্বেত সন্ত্রাসে নকশালপন্থী সংগ্রাম বিপর্যস্ত হয়। পার্টি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়।

‘৭২ থেকে ‘৭৭ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দমন-নির্যাতন-বিপর্যয়-দল-উপদল-ভাঙ্গন-অধ:পতন চলতে থাকে। ‘৭৭ সালে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার হলে নকশালবাড়ি অনুসারীরা পার্টি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেন। সারা ভারতে নকশালবাড়ি দাবিদার বহু দল-উপদলের সৃষ্টি হয়। এইসব ধারা-উপধারায় মোটা দাগে তিন ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা প্রকাশিত হয়।

(১)     সিপিআই(এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন পুরোপুরি ভুল। এই ধারা অনুসারীরা পুরনো বস্তাপচা সংসদীয় নির্বাচনী পথ নেয়।

(২)     সিপিআই (এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন পুরোপুরি সঠিক। এরা পুরনো কায়দায় যান্ত্রিকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম করার চেষ্টা করে।

(৩)     সিপিআই (এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন মৌলিকভাবে সঠিক। কিন্তু গুরুতর কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল।

এই ধারার অনুসারীদের অন্যতম কমরেড কোন্ডাপল্লী সিতারামাইয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য কমিটি ’৭৪ সালে  ৬৭-৭২-এর সংগ্রামের একটি সারসংকলন করে। এই সংগঠন আত্মসমালোচনামূলক লাইনগত পর্যালোচনায় ৪টি গুরুতর ভুলকে চিহ্নিত করে।

      ক) দেশীয়-বিশ্ব বিপ্লব সংঘটনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিজয় আকাংখা;

       খ) খতমকে এ্যাকশনের একমাত্র রূপ হিসেবে নির্ধারণ;

       গ) গণসংগঠন-গণসংগ্রামের লাইন বর্জন; এবং

       ঘ) পার্টি গঠনের কাজকে অবহেলা করা।

এই সারসংকলনের ভিত্তিতে ’৮০ সালের ২২ এপ্রিল সিপিআই(এম-এল) [পিপলস ওয়ার-জনযুদ্ধ] গঠন করে। এই গ্রুপ প্রথমে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পরে দন্ডকারণ্যসহ সন্নিহিত রাজ্যগুলিতে গণযুদ্ধ বিকশিত করে।

পরবর্তীতে আরো কিছু নকশালবাড়ি লাইনের অনুসারী সংগঠন প্রায় একই ধরনের সারসংকলন করে। যার মধ্যে পড়ে সিপিআই(এম-এল) পার্টি ইউনিটি, করম সিং-এর নেতৃত্বাধীন পাঞ্জাব কেন্দ্রীক মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র (যে সংগঠন পরে এমসিসির সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়), কেরালা কেন্দ্রীক সিপিআই (এম-এল) নকশালবাড়িসহ আরো কিছু সংগঠন। অন্যদিকে সিপিআই(এম-এল)-এ সংগঠিত হয়নি এমন সংগঠন “দক্ষিণ দেশ” এমসিসি নামে সংগঠিত হয়ে বিহার-ঝাড়খন্ডে গণযুদ্ধ গড়ে তোলে।

একই সাথে এইসব সংগঠন একটা সর্বভারতীয় মাওবাদী পার্টি গড়ার প্রক্রিয়াও চালাতে থাকে। প্রথমে ১৯৯৮ সালে সিপিআই(এম-এল)-এর “পিপলস ওয়ার” গ্রুপ এবং ক. নারায়ণ সান্যাল (বিজয়দা)’র নেতৃত্বাধীন “পার্টি ইউনিটি” গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ হয়। এবং পরে ২০০৪ সালে ২১ সেপ্টেম্বর ক. গণপতির নেতৃত্বাধীন সিপিআই(এম-এল) এবং ক. কানাই চ্যাটার্জী প্রতিষ্ঠিত ক. সুশীল রায়-ক. কৃষাণের নেতৃত্বাধীন এমসিসি  ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) গঠন করেন। এই নবগঠিত পার্টির সম্পাদক হন ক. গণপতি। ঐক্য প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ২০১৪ মে দিবসে ক. গণপতি এবং নকশালবাড়ি গ্রুপের সম্পাদক ক.অজিত এক যৌথ বিবৃতিতে সিপিআই(এম-এল) নকশালবাড়ি, সিপিআই (মাওবাদী)তে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেয়। মালেমা ও নকশালবাড়ি অনুসারী গণযুদ্ধের লাইনের অন্যান্য সংগঠনের সাথেও ঐক্য প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, এইসব সংগঠনের কোন কোনটি আরআইএম-কমপোসার সদস্য ছিল।

আর সংসদীয় নির্বাচনপন্থী সংশোধনবাদী এবং গোড়ামীবাদী-যান্ত্রিক ধারাগুলো শাসক সাম্রাজ্যবাদের দালাল আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া-সামন্ত শ্রেণির সেবাদাসে পরিণত হয়েছে।

নকশালবাড়ি একটা চলমান বিপ্লব। যার লক্ষ্য নয়া গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ। পথটা আঁকাবাঁকা, কিন্তু একে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তাই একটি থানা নকশালবাড়ির উত্থান মাত্র পঞ্চাশ বছরে আজ সর্বভারতীয় মাওবাদী পার্টি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সেই পার্টির নেতৃত্বে অন্ধ্র-বিহার-দন্ডকারণ্য-ছত্তিশগড়ের পর দক্ষিণ ভারতের কেরালা-কর্ণাটক সীমান্তে পশ্চিম ঘাট এলাকায় গেরিলা অঞ্চল এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের আসাম-মনিপুর রাজ্যে গণযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় শাসক শ্রেণি এখন বলতে বাধ্য হচ্ছে মাওবাদ ভারত রাষ্ট্রের জন্য প্রধান বিপদ। সে জন্যই চলমান গণযুদ্ধকে ধ্বংস করতে ২০০৯ সালে এক বছরের পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করা “অপারেশন গ্রিনহান্ট” বর্বরোচিভাবে এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।

গণযুদ্ধ হলো জনগণের যুদ্ধ। যেখানেই অন্যায়-অত্যাচার সেখানেই জনগণ প্রতিরোধ-যুদ্ধ করবে। এর আগানো-পিছানো থাকে, কিন্তু ধ্বংস করা যায় না। নকশালবাড়ি আবারো প্রমাণ করেছে ঝরে যাওয়া রক্তে বিপ্লব তলিয়ে যায়না, বরং ছড়িয়ে পড়ে।

নকশালবাড়ি লাল সালাম!।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা


ওড়িশায় মাওবাদী নেতাকে হত্যার প্রতিবাদে ৩০টি গ্রামের শতশত আদিবাসীর বিশাল সমাবেশ

Malkangiri-rally

ভূয়া এনকাউন্টারে মাওবাদী নেতা চিন্নাবাই’কে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল ওড়িশার মালকানগিরি জেলার পপুলুরু’তে ৩০টি গ্রামের আদিবাসীদের শ্লোগান মুখরিত একটি বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

আদিবাসীরা অভিযোগ করেন যে, আত্মসমর্পণকারী চিন্নাবাইকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে।

একজন প্রতিবাদকারী বলেন- “চিন্নাবাই পুলিশের কাছে আগেই আত্মসমর্পণ করেছিল। পুলিশের দাবিকৃত কথিত এনকাউন্টারে তাকে হত্যা করা হয়নি। তাকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। আমরা তার হত্যার প্রতিবাদ করছি, এভাবে কি তারা বিদ্রোহীদের সংস্কার করছে? এটা একটা ভূয়া এনকাউন্টার। এটা হত্যা।

অন্যদিকে, পুলিশ দাবি করে যে মাওবাদী নেতা ছিলেন চিন্নাবাই, তাঁর বিরুদ্ধে ১২টি মামলা রয়েছে এবং গুলি বিনিময়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হন এবং মালকানগিরি ও কোরাপুট জেলার কারাগারে বন্দী ছিলেন।

সূত্রঃ http://odishasuntimes.com/odisha-villagers-protest-killing-of-maoist-leader/


চিলির সান্তিয়াগোতে নারীবাদী স্কুল ”ফ্লোরা ত্রিস্তান” এর সভা অনুষ্ঠিত

19024463_1181256855320049_1628049613_o

গত ৬ই জুন, মঙ্গলবার চিলির সান্তিয়াগোতে ত্রিশ জন সদস্যের উপস্থিতিতে, নারীবাদী স্কুল “ফ্লোরা ত্রিস্তান” এর গোল টেবিল সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভার আয়োজন করে কনট্র্যাকরিয়েন্টে ছাত্ররা। ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদে অনুষ্ঠিত এই সভায় নারী এবং পুরুষ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছাত্র ছাত্র ছিল।

সভায়, প্রতিটি সংগঠন নারীবাদী বিষয়ে তাদের মতামত পেশ করে এবং উল্লেখিত প্রশ্নগুলির বিষয়ে বিতর্কের দিকে অগ্রসর হয়:

“চিলিতে আজ নারীবাদীর কাজ কী? নারীবাদী সংগ্রামের বিষয় বা বিষয় কি? এটা কি গুরুত্বপূর্ণ? নারীবাদী সংগঠন হিসেবে আমরা নিজেদেরকে পুঁজিবাদ বিরোধী বলে ঘোষণা করি?”