শ্রমজীবী জনগণও চাঁদাবাজদের হাতে বন্দী

may_89632

আব্দুল ওয়াদুদ এক সময়ে জমিদার জোতদাররা দেশের শ্রমিক, কৃষক, জনগণের নিকট থেকে কর আদায় করতো। এর সাথে যুক্ত হতো ইজারাদারদের তোলা। এই তোলাবাজির বিরুদ্ধে জোরদার কৃষক আন্দোলন হয়েছিল। তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল হাট-বাজারে তোলা উঠানো বন্ধ করতে হবে। প্রবল আন্দোলনের মুখে তোলা উঠানো বন্ধ হয়। শুধু তোলা উঠানো নয়, জমিদারি প্রথাই চিরতরে বিলুপ্ত হয়। জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে এবং কৃষকের উপর জবরদস্তিমূলক উপরি আদায়ের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল। এখন কমিউনিস্টদের সেই শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই চাঁদাবাজদের জুলুমের শিকার হচ্ছেন গোটা শ্রমজীবী জনগণ। দেশের শ্রমজীবী জনগণকেই একশ্রেণির চাঁদাবাজদের আবদার মেটাতে হচ্ছে। দাবি না মেটাতে পারলে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে তা আদায় করে নিচ্ছে একশ্রেণির চাঁদাবাজ। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় অবাধ্যতার শাস্তি স্বরূপ শারীরিক নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে থেমে থাকছে না, জবরদস্তিমূলকভাবে শ্রমজীবী জনগণের সামান্য পুঁজিও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

চাঁদাবাজির ঘটনা সম্পর্কে একটি সচিত্র প্রতিবেদন দেখেছিলাম টেলিভিশনে। সেখানে দেখানো হয়েছে, সিএনজি চালিত অটোরিক্সা রাস্তায় চালাতে গেলে চালককে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। তবেই সিএনজি রাস্তায় নামতে পারে এবং বৈধ হিসাবে গণ্য হয়। সিএনজি চালক এই উৎকোচের অর্থ পুষিয়ে নেয় যাত্রীদের নিকট থেকে, বেশি ভাড়া আদায় করে। সড়কে চাঁদাবাজির কারণে বাজারে ফল-মূল, শাক-সবজী ও মাংসের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। গরু, ছাগল, হাস-মুরগি ইত্যাদি পরিবহন করতে গেলে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিয়ে তবেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর পরেও সেখানে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। ঢাকা মহানগরীতে কারওয়ান বাজার একই বড় বাজার। সেখান থেকে বছরে শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। ফলে মাংসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে এখন তা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে। শাক-সবজি, তরি-তরকারি ইত্যাদি উৎপাদন করে কৃষক লাভের মুখ তো দেখতে পান না, উপরন্তু তাকে লোকসানে পড়ে দেনার দায়ে শেষ সম্বল ভিটে বাড়ি হারাতে হয়। এই সব কৃষি পণ্য উৎপাদন করে কৃষক লাভবান হতে না পারলেও পণ্য বাজারে নেওয়ার পথে পরিবহন থেকে চাঁদাবাজরা অর্থ আদায় করে নিচ্ছে। আর ক্রেতা সাধারণের ঘাড়ে তার দায়ভার পড়ছে।

ঢাকাতে ফেরিওয়ালাদের ফুটপাতে বসতে হলে চাঁদাবাজির শিকার হতে হচ্ছে। ঢাকার নবাবপুর রোডের ডাব বিক্রেতা হাশেম মিয়া। আদি নিবাস রাজবাড়ী জেলাতে। পদ্মার ভাঙনে কয়েকবার ভিটে মাটি হারিয়ে ঢাকাতে এসেছেন, ডাব বিক্রি করতে। পরিবার-পরিজন এখন বেড়ি বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। ঢাকাতে একটি বস্তির ভাঙা ঘরে কয়েকজনে মিলে ভাড়া থাকেন। সেখানেও চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পাননি। নবাবপুর রোড এমনিতেই শহরের ব্যস্ত রাস্তা। সারাদিনই এখানে যানজট লেগেই থাকে। যার মাঝে ফুটপাতে হকারের ভিড়, দোকানদারের মালপত্র দিয়ে ফুটপাত দখল করা ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। তার মাঝে হাশেম মিয়া ভ্যানে করে ডাব ফেরি করে বিক্রি করেন। তার কাছ থেকেও চাঁদাবাজি হচ্ছে। প্রতিদিন সকালে ১০ টাকা, আর বিকালে ১০ টাকা হারে। চাঁদা দিতে বিলম্ব হলে পুলিশের লাইনম্যান নামে পরিচিত চাঁদাবাজ তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করে চাঁদা আদায় করে নেয়। তার উপরে ট্রাফিক সাজেন্ট তো রয়েছেন। তিনি সপ্তাহে দুই একবার এসে দেখা করেন। হাশেম মিয়ার ভাষায়, ‘সাজেন্ট স্যার আসলে একটা করে ডাব তাকে খাওয়াতে হয়’। এইভাবে চলে যায় ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা। ঢাকার রাস্তায় এখন রিক্সায় চলে ভ্রমণ করেন নিম্ন আয়ের জনগণ। নবাবপুর রোডের বিভিন্ন গলিতে রিক্সা ঢোকার জন্য মাঝে মাঝে পুলিশ বাধা দিয়ে থাকে। তবে গলিতে ঢোকার জন্য রিক্সা প্রতি পাঁচ টাকা করে পুলিশকে চাঁদা দিলেই গলিতে প্রবেশ বৈধ হয়ে যায়।

একবার ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম। ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যেকার ট্রেনে যাত্রী ভিড় লেগেই থাকে। এখানকার ট্রেনগুলোতে নির্ধারিত আসনে যাত্রী তো আছেনই, তার উপর আসন ছাড়াও বহু লোক দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করছেন। তার মধ্যে আবার বিভিন্ন হকারদের আনাগোণা, হাঁক-ডাক, চিৎকার মিলে গরমে এক ভয়াবহ অবস্থা। চলতি পথে ট্রেন ভৈরব এসে থামলো। ভৈরব স্টেশনে দাঁড়ানোর সাথে সাথে কিছু সংখ্যক মাস্তান চাঁদাবাজ হকারদের ওপর চড়াও হলো। তারা হকারদের কাছ থেকে জোর জবরদস্তিমূলকভাবে ২০ টাকা, ৩০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করে নিল। অনেক ফেরিওয়ালা সদ্য ফেরি করতে উঠেছেন, বিক্রি হয়নি, এই অজুহাতে চাঁদা দিতে না চাওয়ায় চাঁদাবাজ মাস্তানরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে চাঁদা আদায় করে নিল। ফেরিওয়ালাদের অসহায় অবস্থা দেখে ট্রেন স্টেশন থেকে ছাড়ার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারা গেল, ট্রেনে ফেরি করে ব্যবসা করতে হলে এই মাস্তানদের চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদাবাজ মাস্তানদের সাথে রয়েছে জিআরপি’র ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। মাস্তান চাঁদাবাজরা আবার জিআরপি’র পক্ষ থেকেই চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা আদায়ের পর জিআরপি ও মাস্তান চাঁদাবাজরা ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে।

ঢাকা মহানগরের সড়কের আশে-পাশের ফুটপাতগুলোতে হকার উচ্ছেদের অভিযান এখনও চলমান রয়েছে। ঢাকা মহানগরীর রাস্তাগুলো থেকে ভিক্ষুক উচ্ছেদ, হকার উচ্ছেদের অভিযান মাঝে মাঝে চলে থাকে। প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় এটা সরকারের উদ্ভট পরিকল্পনা হলেও এই ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে। আর সরকারের তেল মারা কিছু মিডিয়া রয়েছে তারা প্রকৃত সমস্যা আড়াল করে এই ভূমিকার গুণকীর্তন করছে। প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যেখানে জনসংখ্যার অর্ধেকই বেকার সেখানে এই ধরনের অভিযানের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবুও চলেছে ঘটা করে হকার উচ্ছেদের অভিযান। সিটি কর্পোরেশন রাজধানী ঢাকার ফুটপাতকে হকারমুক্ত করার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারীদের সমন্বয়ে চলছে এই অভিযান। তবে একদিকে চলছে হকার উচ্ছেদের অভিযান আবার অন্যদিকে নতুনভাবে হকার বসানোর আয়োজন। এর তাৎপর্য কী তা বুঝতে একটু সময় লাগলো। নতুন করে বসা হকারদের কাছে একটু খোঁজ নিয়ে জানা গেল মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাদের আবার ফুটপাতে বসতে দেওয়া হয়েছে। তার উপরে হকারদের নিকট থেকে প্রতিদিনের চাঁদা তা তো অব্যাহত রয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী ও কিছু সংখ্যক অসাধু পুলিশের যোগাযোগে এই নতুন করে হকার বসানোর কর্মসূচি চলছে। সিটি কর্পোরেশনের হকার উচ্ছেদের কর্মসূচি এইভাবে একটি চক্রের পকেট ভারী করার কাজে লাগানো হচ্ছে। ভিক্ষুকদের নিকট থেকে চাঁদা আদায় হয় কী না সে সম্পর্কে কোন তথ্য এখনও জানা নেই।

এতো গেল সমাজের নিচের মহলের চাঁদাবাজির কিছু ঘটনা। সমাজের সর্বমহলেই এভাবে চলছে চাঁদাবাজি। এবারে আসা যাক সরকারের একজন মন্ত্রীর ভাইয়ের চাঁদাবাজির কাহিনী। সরকারের মন্ত্রী বলে তার ভাইয়েরও কদর বেড়েছে। তাই ভুক্তভোগী মানুষজন নিত্য যাতায়াত করছেন মন্ত্রীর ভাইয়ের কাছে সুপারিশের জন্য। চাকরি, ব্যবসা, জমিজমা, সামাজিক বিরোধ, এলাকার সকল সমস্যার সমাধান দেন মন্ত্রীর ভাই। এব্যাপারে অনেকেই তার গুণকীর্তন করে থাকেন। সরকারি চাকরির ব্যাপারে তার কাছে গেলে তো কথা নেই। তিনি কোন প্রার্থীর সুপারিশ-ই অগ্রাহ্য করেন না। চাকরি দেওয়ার নামে তিনি সকলের নিকট থেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা নগত হাতিয়ে নেন। তার মধ্যে কারো না কারো চাকরি নিজ যোগ্যতা বলে হয়ে যায়। যাদের যোগ্যতা বলে চাকরি হয়ে যায় তারা তো খুশিতে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আর যাদের চাকরি হয় না, তাদেরকেও তিনি হতাশ করেন না। যাওয়া মাত্র আলমারি থেকে কাগজপত্র, টাকা পয়সা বের করে তিনি চাকরি লাভে ব্যর্থ প্রার্থীর হাতে ধরিয়ে দেন। এইভাবেই তিনি কৌশল করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

এবারে আসা যাক বিগত সরকারের অর্থাৎ চার দলীয় জোট সরকারের জনৈক প্রভাবশালী মন্ত্রীর প্রভাব প্রতিপত্তি আর উৎকোচ গ্রহণের কাহিনী। তবে মন্ত্রী সজ্জন ব্যক্তি, নিছক ভদ্রলোক, তিনি উৎকোচ গ্রহণ করেন না। তাই তার কাছে কেউ উৎকোচ নিয়ে যেতে সাহস পায় না। তবে মন্ত্রীর স্ত্রী, যিনি জনগণকে উপকার (!) করতে কার্পন্য করেন না। সরকারি চাকরির সার্কুলার দিলেই তার পোয়াবারো অবস্থা। শত শত চাকরি প্রার্থী। তিনি কোন প্রার্থীকেই হতাশ করেন না। সকলকেই চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন। এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সবার নিকট থেকে মোটা অংকের উৎকোচ গ্রহণ করেন। তারপর প্রার্থীর যোগ্যতা অনুসারে কারো কারো চাকরি হয়ে যায়। যার চাকরি হলো তার খুশি আর ধরে না। যাদের চাকরি হলো না, তারা আবার মন্ত্রীর বাড়ির দিকে ছুটলেন মন্ত্রীর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে। অনেক কষ্ট করে দেখাও হয়তো করলেন। মন্ত্রীর স্ত্রী আশ্বাস দিল এবারে চাকরি হলো না, পরে আবার সাকুর্লার হলে দিয়ে দেওয়া যাবে। মন্ত্রীর স্ত্রীর কথায় আশ্বস্ত হয়ে পিছনে পিছনে ঘুরতে শুরু করলেন চাকরি প্রার্থী। কিন্তু পরের বারও হলো না। মন্ত্রীর স্ত্রীর সাথে দেখা করে টাকা ফেরত পেলেন। তবে তার দেওয়া পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকার পুরোটা নয়, আংশিক। অবস্থাভেদে এক থেকে তিন লাখ টাকা। বাঁকি টাকার ব্যাপারে মন্ত্রীর স্ত্রী বললেন, ‘এখন আর বিরক্ত করিস না, পরে আসিস দেখা যাবে’। মন্ত্রী বাহাদুরের স্ত্রী টাকা ফেরত চাইলে বিরক্ত হয়েছেন। এর পরে আর কোন চাকরি প্রার্থীর সাহস আছে তার পাওনা টাকা ফেরত চাওয়া।

ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি শাসক-শোষক শ্রেণির কল্যাণে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। চাঁদাবাজি, মাস্তানি, অনিয়ম, দুর্নীতি এত ব্যাপক হয়েছে যার হাত থেকে নিঃস্ব, হতঃদরিদ্ররাও রেহাই পাচ্ছে না। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি করতে পারাটাই এখন অনেকের কাছে কারিশমা। বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের আমলে এই দুর্নীতি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মহাজোট সরকার দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থেকে যাওযায় আশ্বস্ত হয়ে ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি এখন খোলাখুলিভাবে করতে পারছেন। অবক্ষয়ি সমাজের নৈতিকতার মানদন্ড এত নিচুতে পৌঁছেছে যে গোটা সমাজটাই ডুবতে বসছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৭।।সংখ্যা-০২, রোববার।। ২৫ জুন ২০১৭।।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s