জাতিগত মুক্তি আন্দোলনে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভূমিকা

shutterstock_538847434-600x400

অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বিশ্বের বুকে প্রথম জাতিগত মুক্তির সমস্যাকে সমাধান করেছিলো। জাতি সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখা কমরেড স্ট্যালিনের মৃত্যুর পরে ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে এবং চীনে মাওয়ের মৃত্যুর পরই (১৯৭৬ সাল) পুঁজিবাদের পথগামীরা ক্ষমতা দখল করে সমাজতান্ত্রিক চীনকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এই সব দেশেই পুনরায় জাতিগত নিপীড়ন শুরু হয়েছে এবং সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে খন্ড খন্ড হয়ে গেছে।

বিশ্বের দেশে দেশে আজো জাতিগত নিপীড়ন ও তার বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতিসত্তার জনগণের মুক্তির সংগ্রাম চলছে। ইউরোপ থেকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা থেকে এশিয়া সর্বত্রই এটা দৃশ্যমান। কোথাও একই রাষ্ট্রের অধীনে বৃহৎ জাতি কর্তৃক ক্ষুদ্র জাতি সত্তা নিপীড়িত হচ্ছে, আবার কোথাও এক দেশের শাসক জাতি কর্তৃক অন্য দেশের জাতিগোষ্ঠী নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। যার এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জাতিসত্তার বিরুদ্ধে সেদেশের সেনাবাহিনীর জাতিগত উচ্ছেদ অভিযান ও গণহত্যা। নয়া উপনিবেশিক বিশ্ব ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদের এই গোষ্ঠী বা ওই গোষ্ঠী, অথবা সকলের সম্মিলিত সমর্থন ও অবহেলায় এসব জাতিগত নিপীড়ন চলতে পারছে।

চীন-রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জাতিগত সমস্যার সমাধান হয়েছিল। কারণ বলশেভিক পার্টি ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টি জাতিগত মুক্তির প্রশ্নে সঠিক অবস্থান নিয়েছিলো। লেনিন-মাও স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করেছিলেন সকল নিপীড়িত জাতির বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার রয়েছে। সমাজতান্ত্রিক চীন থেকে “দুনিয়ার মজদুর এক হও”- শ্রমিক শ্রেণির এই রণনৈতিক স্লোগানকে সম্প্রসারণ করে স্লোগান তোলা হয়েছিল- “সারা দুনিয়ার সর্বহারা এবং নিপীড়িত জাতি ও জনগণ এক হও”। লেনিন সর্বদাই শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, জাতিগত অত্যাচারের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণিকে লড়তে হবে। নিপীড়ক জাতির শ্রমিক শ্রেণিকে নিপীড়িত জাতির বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারকে সুস্পষ্টভাবে সমর্থন করতে হবে। কর্মসূচির মধ্যে এই দাবী অন্তর্ভুক্ত না করার অর্থ হলো সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদী মতাদর্শ পরিত্যাগ করা ও জাতিগত অত্যাচারের সহায়তা করা।

বিপ্লবপূর্ব রাশিয়া ছিলো বহু জাতির দেশ। ক্ষমতাসীন রুশ জারতন্ত্র কর্র্তৃক অন্যান্য জাতির উপর নিপীড়ন ছিল সীমাহীন। যাদের অর্থনেতিক অবস্থান এক ছিল না। রাশিয়ায় সব সময় জাতিগত সংঘাত লেগে থাকতো। অবিকশিত জাতিসমূহ তখনো পর্যন্ত সামন্তীয় কাঠামোতেই ছিল। তাই আইনীভাবে জাতিগত সমতা এখানে ছিল ফাঁকা বুলি। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাশিয়ায় সকল জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার দেয়া হয় স্বেচ্ছামূলক প্রকৃত ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ থেকে।

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জাতিগত সৌহার্দ তৈরি হয়। প্রত্যেক জাতি অন্যান্য জাাতিকে সম্মানের চোখে দেখতে শুরু করে। অক্টোবর বিপ্লবের মধ্য দিয়েই দুনিয়ার নিপীড়িত জাতি যারা মুক্তির জন্য লড়ছিলো তারা তাদের অকৃত্রিম বন্ধু সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে পাশে পেলো। সেই জন্য বিপ্লবী সরকার জার কর্তৃক দখলীকৃত সমস্ত এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। সমস্ত অঞ্চলের জাতীয় বিকাশের পদক্ষেপ নেয়া হয়।

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কালেও কমরেড স্ট্যালিনকে ট্রটস্কি-বুখারিনপন্থীদের বিরুদ্ধে অন্যান্য বিষয়ের সাথে সাথে জাতিগত সমস্যা নিয়েও সংগ্রাম করতে হয়েছিল। তারা ইউক্রেন, বিয়েলোরুশিয়া ও সামুদ্রিক অঞ্চল যথাক্রমে জার্মান, পোল ও জাপানীদের হাতে তুলে দেয়ার চক্রান্ত করেছিল। রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নানা রঙের জাতীয়তাবাদীদের পরাজিত করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বহু জাতির মহান মৈত্রীর পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রসমূহের যুক্তরাষ্ট্র গঠন করে। তাই আইনীভাবে জাতিগত সমতা এখানে ফাঁকা বুলি ছিল না। একইভাবে চীনা সমাজাতান্ত্রিক বিপ্লব তিব্বত, উইঘুরসহ চীনের সংখ্যালঘু নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলোর মুক্তি দিয়েছিল।

অক্টোবর বিপ্লব জাতিগত প্রশ্নে কতগুলো সুস্পষ্ট উত্তর দিয়ে দেয়। সেগুলোকে ব্যক্ত করা যায় নিম্নোক্তভাবে-

১। জাতিগত মুক্তি ঘটতে পারে কেবলমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সর্বহারা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। যা এখন মালেমা-বাদী ছাড়া হতে পারে না।

২। উগ্র জাতীয়তাবাদকে সংগ্রাম না করে প্রকৃত জাতিগত মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন করা যায় না।

৩। সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ, আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদকে বিরোধিতা না করে প্রকৃত জাতীয় মুক্তির পক্ষে দাঁড়ানো যায় না।

৪। জাতীয় স্বাধীনতার মানে শুধু  ভূ-খন্ড-গত পৃথক রাষ্ট্র গঠন নয়; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, সংস্কৃতিগত স্বাধীনতা।

৪। প্রতিটি নিপীড়িত জাতির মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়ানো একটি আন্তর্জাতিকতাবাদী দায়িত্ব।

৫। প্রত্যেকটি জাতির তার নিজস্ব বিকাশের জন্য “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার” রয়েছে। আর প্রকৃত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের অর্থ বিচ্ছিন্নতার অধিকার ব্যতীত আর কিছু হতে পারে না।

সুতরাং জাতিগত মুক্তির প্রশ্নে আমাদের অবশ্যই মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ এবং অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিতে হবে।      

উদ্ধৃতি

“ আমরা যদি একদিকে হাজার ঢঙে ঘোষণা ও পুনরাবৃত্তি করতে থাকি যে, সমস্ত জাতীয় অত্যাচারের আমরা ‘বিরোধী’, আর অন্যদিকে যদি নিপীড়কদের বিরুদ্ধে এক নিপীড়িত জাতির কোন কোন শ্রেণির অতি গতিশীল ও আলোকপ্রাপ্ত অংশের বীরত্বপূর্ণ বিদ্রোহকে ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দেই, তাহলে আমরা কাউটস্কিপন্থীদের মতো সেই একই নির্বোধ স্তরে নেমে যাব।” – লেনিন

জাতীয় সমস্যায় সমালোচনামূলক মন্তব্য, জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।

“কমিউনিস্টদের সক্রিয়ভাবে সকল সংখ্যলঘু জাতিসত্তাসমূহের জনগণকে….সংগ্রামে সাহায্য করতে হবে।….তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি ও বিকাশের জন্য সাহায্য করতে হবে।…তারা যাতে নিজস্ব সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলতে পারে সে ব্যাপারেও তাদেরকে সাহায্য করতে হবে। তাদের কথা ও লিখিত ভাষা, তাদের আচার-আচরণ ও রীতি-নীতি এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করতে হবে।”      

মাওসেতুঙ

 

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, অক্টোবর ’১৭ সংখ্যা

 


কলকাতায় মাওবাদীদের পোস্টারঃ বস্তারের ‘জনযুদ্ধ’ রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান!

image

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই বস্তার এবং দণ্ডকারণ্যে সক্রিয় মাওবাদীরা। সেই ‘জনযুদ্ধ’ এ রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পোস্টার পড়ল যাদবপুর এলাকায়। বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর করতে শুরু করেছে পুলিশ।

যাদবপুর এইট-বি মোড়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেট-সহ বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি ওই পোস্টার পড়েছে। লেখা রয়েছে— ‘ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করুন, জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন। বাংলা বিহার পঞ্জাবে বস্তারের জনযুদ্ধ ছড়িয়ে দিন’। পোস্টারের নীচে প্রথমে লেখা ছিল, ২৭ অগস্ট, ২০১৭। পরে তার উপর আঠা দিয়ে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও জে দংয়ের ছবি লাগানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের খবর, সম্প্রতি জনাপাঁচেক ব্যক্তি রাতে দ্রুত ওই পোস্টারগুলি লাগিয়ে যান। পোস্টারের নীচে লেখা রয়েছে ‘সিপিআই(এমএল)।’ সেখানেই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। সাধারণত সিপিআই(এমএল)’র বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের নকশালপন্থী হিসাবে পরিচয় দিলেও বস্তার, দণ্ডকারণ্যে জনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে সিপিআই (মাওবাদী)। তাহলে কারা লাগালেন ওই পোস্টার? সূত্রের খবর, সম্প্রতি সর্বভারতীয় স্তরে রাজনৈতিক লাইন নিয়ে মাওবাদীদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তার ফলশ্রুতিতে দল ছেড়ে নতুন করে আন্দোলন শুরু করেছেন কয়েকজন নেতা অথবা নকশালপন্থী দলগুলোর অনুগামীরাই যাদবপুরে ওই পোস্টার দিয়ে থাকতে পারেন বলে মনে করছেন পুলিশ আধিকারিকদের একাংশ।

রাজ্যের জঙ্গলমহলে মাওবাদী কার্যকলাপের সময় যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি-সহ বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া এবং অধ্যাপকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন মাওবাদীরা। যাদবপুরের একাধিক পড়ুয়া মাওবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতারও হয়েছিলেন। ফলে নতুন করে সেই যাদবপুরে বস্তারের ‘জনযুদ্ধে’র সমর্থনে পোস্টার পড়ায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। যাদবপুর থানার এক আধিকারিক বলেন, ‘‘আমরা পোস্টারটি দেখেছি। কারা ওই পোস্টার লাগিয়েছেন, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি।’’ 

সূত্রঃ https://ebela.in/state/naxalite-posters-in-jadavpur-area-raise-several-questions-1.699022

 


লেনিনবাদের শিক্ষাঃ বিপ্লব করার জন্য প্রয়োজন কমিউনিস্ট পার্টি

lenin

শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির মতবাদ মার্কসবাদের সৃষ্টি ও বিকাশের সাথে সাথেই তার ভিত্তিতে বিপ্লব করা জন্য মার্কস-এঙ্গেলসের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয়। কার্ল মার্কস প্রথমে “জার্মান শ্রমিক সমিতি” গঠন করেন এবং পরবর্তীতে ১৮৪৮ সালে “কমিউনিস্ট লীগ” নামে একটা গোপন প্রচার সমিতিতে যোগদান করেন। এই সংগঠনের দ্বিতীয় কংগ্রেস থেকেই মার্কস-এঙ্গেলসকে সুবিখ্যাত “কমিউনিস্ট ইশতেহার” লেখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

          কিছু পরে “কমিউনিস্ট লীগ” বিলুপ্ত হয়। মার্কস-এঙ্গেলস পরে গড়ে তোলেন “দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক” নামের কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সংগঠন। তবে প্রথমে মার্কস ও পরে এঙ্গেলসের মৃত্যুর কিছু পর থেকে এই আন্তর্জাতিক তার বিপ্লবী সত্ত্বা হারিয়ে ফেলতে থাকে।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতা বার্নেস্টাইন-কাউটস্কির নেতৃত্ব মার্কসবাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ান বলশেভিক পার্টি এই কুখ্যাত সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে জীবন-মরণ সংগ্রাম করে মার্কসবাদকে রক্ষা ও বিকশিত করেন।

শুধু মার্কসবাদী মতবাদ রক্ষাই নয়, তার ভিত্তিতে একটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করতে হলে শ্রমিক শ্রেণির কী ধরনের পার্টি গঠন করতে হবে লেনিন তার নীতিমালাগুলো গড়ে তুলতে থাকেন। তিনি অর্থনীতিবাদীদের বিরুদ্ধে “কী করিতে হইবে” শীর্ষক পুস্তকের মাধ্যমে তীব্র মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা করেন। লেনিনই সর্বপ্রথম সর্বহারা শ্রেণির প্রধান সংগঠন হিসেবে পার্টির ভূমিকা ও নীতি-পদ্ধতি তুলে ধরেন তার বিখ্যাত “এক পা আগে, দু’পা পিছে” শীর্ষক আরেকটি পুস্তকে।

তিনি স্পষ্ট করেন সাধারণ শ্রমিকশ্রেণি থেকে পার্টির পার্থক্য হলো এই যে, পার্টি হলো শ্রমিক শ্রেণির মধ্যকার অগ্রগামীদের বাহিনী। আরও নির্দিষ্টভাবে বলা যায়, শ্রেণি চেতনায় সজ্জিত মার্কসবাদী বাহিনী। অনেকে কুযুক্তি দেয়- শ্রমিকশ্রেণি যাহা পার্টিও তাহা। এই  ধারণা ভুল। কেউ শ্রমিক হলে এবং ধর্মঘটে যোগ দিলেই সে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হতে পারবে তা সঠিক নয়। এমন হলে সাধারণ শ্রমিক ও পার্টি সদস্য শ্রমিকের মধ্যকার পার্থক্য গুলিয়ে যাবে। সুতরাং পার্টি হলো শ্রমিক শ্রেণির অগ্রসর অংশ। যারা মার্কসবাদী বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনায় সজ্জিত।

পার্টি গঠন  ও কাঠামো সম্পর্কে লেনিনের মত ছিল- দৃঢ় সুশৃংখল, পেশাদার বিপ্লবী, গোপনে পার্টি কার্যক্রম চালাতে সক্ষম এমন কর্মী- যারা পার্টির কাজ ছাড়া অন্য কিছু করে না। পার্টির সদস্য সে-ই হতে পারবে যে ব্যক্তি পার্টির কোন না কোন সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকবে, পার্টিকে চাঁদা দিবে। পার্টির কোন সংগঠনের সাথে যুক্ত নয় এমন স্বতন্ত্র ব্যক্তিদের সদস্য করা যাবে না।

তিনি  আরও বলেন, “পার্টিকে হতে হবে শ্রমিক শ্রেণির অগ্রগামী বাহিনী, সর্বহারা শ্রেণি সংগ্রামের সমন্বয় সাধনে ও পরিচালনায় ব্রতী……পুঁজিতন্ত্রের উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করাই হলো পার্টির চরম লক্ষ্য”।

একটি সঠিক বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার জন্য লেনিন প্রথমে রাশিয়ায় “শ্রমিক মুক্তি সংঘ”, পরে “রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক  লেবার পার্টি” গঠন করেন। পরবর্তীতে লেনিন তার লিখিত বিখ্যাত “এপ্রিল থিসিস” দলিলে সুনির্দিষ্টভাবে সোশ্যাল ডেমোক্রাট নাম পরিবর্তন করে কমিউনিস্ট পার্টি রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। পার্টির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কমিউনিস্ট  পার্টি অব রাশিয়া (বলশেভিক)। সেই থেকে সোশ্যাল ডেমাক্র্যাটদের থেকে কমিউনিস্টদের সুস্পষ্ট বিভাজন হয়ে যায়।

১৯১৬ সালে অনুষ্ঠিত রাশিয়ান পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেসে পার্টির প্রতি সদস্য, প্রতি ইউনিট এবং প্রতি সংস্থার জন্য অবশ্যই পালনীয় গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার সাংগঠনিক নীতিমালা গৃহীত হয়। যে নীতিমালা ছাড়া মতপার্থক্যসহ পার্টি পরিচালনা অসম্ভব। এটাই হলো লেনিনবাদী পার্টি-নীতি।

মার্কস-লেনিনের সুযোগ্য  উত্তরসুরী চেয়ারম্যান মাওসেতুঙ পার্টি প্রশ্নে আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন “যদি বিপ্লব করতে হয় তাহলে অবশ্যই একটা বিপ্লবী পার্টি থাকতে হবে। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বে এবং বিপ্লবী রীতিতে গড়ে উঠা বিপ্লবী পার্টি ছাড়া শ্রমিকশ্রেণি ও ব্যাপক জনসাধারণকে সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহী কুকুরদের পরাজিত করতে নেতৃত্বদান করা অসম্ভব।”

 মার্কস-লেনিন-মাওসেতুঙ আমাদের শিক্ষা দেন- একটি দেশে বিপ্লব করতে হলে সর্বহারা শ্রেণির মতবাদ এবং তার ভিত্তিতে গড়ে তোলা একটি কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়োজন। অথচ আমাদের দেশে সমাজতন্ত্রের দাবীদার বাসদ, গণসংহতি, মুক্তি কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সংশোধনবাদী সংগঠন পার্টি গড়ে তোলার কাজকে শিকেয় তুলে রেখে শুধুমাত্র ফ্রন্টের কাজ করছে। এরা কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াই ফ্রন্ট দিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েমের দিবা স্বপ্ন দেখছে। যা পৃথিবীর কোথাও কখনই হয়নি- হবেও না। আর সিপিবি মুখে কমিউনিস্ট পার্টির নাম বললেও খোদ পার্টিকেই বানিয়ে ফেলেছে বিপ্লব-বিহীন- যারা বিপ্লবকে শিকেয় তুলে বুর্জোয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কারবাদে নিমজ্জিত হয়ে রয়েছে।

সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ছাড়াও আমাদের দেশে অনেক বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, এমনকি মাওপন্থী দাবীদার বুদ্ধিজীবীও আছেন যারা সমাজতন্ত্রের সপক্ষে দাঁড়াতে চান। কিন্তু মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নীতি আদর্শের ভিত্তিতে পার্টি গড়ার কাজকে কার্যত বিরোধিতা করেন, নানাভাবে আক্রমণ করেন। যেমন এক চিমটে লবণ, এক মুঠ চিনি, আর এক গ্লাস পানি দিয়ে স্যালাইন বানানো হয়। তেমনি এরা একটু সমাজতন্ত্রের সমর্থন, একটু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, আর একটু সাম্প্রদায়িক বিরোধিতা দিয়েই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। এদের অনেকের আন্তরিকতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলা যায় মালেমা’র সঠিক তত্ত্ব এবং তার অনুশীলন ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টি হবে না, সমাজতন্ত্র-তো আরও দুরের কথা। এই ধরনের ভুয়া সমাজতন্ত্রীরাই আজকের সরকারি বাম মেনন-ইনু বা অতীতের কাজী জাফর-সিরাজুল আলম খান হয়েছে।

এই সব বুদ্ধিজীবীরা কমিউনিস্ট পার্টির শৃংখলাকে দাসত্ব মনে করে। নিজেদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে জায়েজ করার জন্য সত্যিকার পার্টি প্রক্রিয়াকে নানাভাবে বিরোধিতা করে। প্রায় ১০০ বছর পূর্বে এ জাতীয় মেনশেভিকদের বিরুদ্ধে লেনিনের বলশেভিক পার্টি সংগ্রাম করেই রাশিয়ায় বিপ্লব সংগঠিত করেছিল।

এদের সম্পর্কে লেনিন  লিখেছেন “ব্যক্তি স্বাতন্ত্রে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবী মনে করে……সর্বপ্রকার সর্বহারা সংগঠন ও শৃংখলা দাসত্বেরই নামান্তর।” তিনি আরও বলেছেন, “…..সর্বহারা শ্রেণির মুক্তি সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে পার্টি সংগঠনের গুরুত্বকে ছোট করিয়া দেখা হইলো মেনশেভিকদের অন্যতম চরম পাপ।”

এখন এই ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট-ফেসবুক-ইউটিউব প্রভৃতি মাধ্যমে সমাজতন্ত্র-মাওবাদের সপক্ষে অনেক সাইবার সমাজতন্ত্রী বা সাইবার কমিউনিস্টও দেখা যায়। এরা দুই কলম লিখে নিজেদের বিপ্লবী ভাবতে থাকে, কিন্তু পার্টি গঠনের কাজ থেকে সতর্কভাবে দূরে থাকে। শ্রমিক-কৃষকের ধারে কাছেও যায় না। বরং অনুশীলনে নিয়োজিত সাচ্চা কমিউনিস্টদের এই বলে সমালোচনা করে- পার্টি প্রযুক্তি বোঝে না, প্রযুক্তি ছাড়া বিপ্লব হবে না- ইত্যাদি। এরা বোঝে না, যেখানে পার্টি ছাড়া বিপ্লবই সম্ভব নয়, সেখানে পার্টিবিহীন প্রযুক্তি দিয়ে কি হবে?

এই সাইবার কমিউনিস্টরা পুরনো আইনী মার্কসবাদীদের মত রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণির কাছে সহনীয়, ভাসাভাসা, খন্ডিত, বিমূর্ত বক্তব্য দিয়ে সমাজ পরিবর্তন করতে চায়। বাস্তবে সমাজ পরিবর্তনের মৌলিক কর্মসূচি ছাড়া কিছু সংস্কারবাদী সুন্দর আকাংখা দিয়ে বিপ্লব করা যায় না। রাশিয়ায় লেনিনকে এ জাতীয় আইনী মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করতে হয়েছে।

তাই রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকীতে লেনিনবাদের শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরতে হবে। মতবাদ, পার্টি ও বিপ্লবী অনুশীলন ছাড়া যারা বিপ্লব করতে চায় তাদের বিরুদ্ধেও তত্ত্বগত-আদর্শগত সংগ্রাম জোরদার করতে হবে। আর বিপ্লব করার জন্য বিভিন্ন আকৃতির সংশোধনবাদ-সংস্কারবাদ-সুবিধাবাদকে পরাজিত করেই কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রশ্নটিকে জোরদার করতে হবে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, অক্টোবর ’১৭ সংখ্যা


সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটি’র সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

 

f

 

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

  

সাংবাদিক সম্মেলনে শোষিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বেগবান করার আহ্বান

আজ ৩০ অক্টোবর, সোমবার, সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে ঢাকায় ২, পুরানা পল্টন, মুক্তি ভবনের চতুর্থ তলায় প্রগতি সম্মেলন কক্ষে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটির আয়োজনে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আহ্বায়ক হাসান ফকরী কমিটির বক্তব্য তুলে ধরেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, মুক্তিকামী মানুষের মাঝে আজ সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের সঠিক দিশা নিয়ে যেতে হবে। সেজন্য উর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে বলশেভিক সংগ্রামী শিক্ষা, শ্রেণীসংগ্রাম, শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব, বলপ্রয়োগে শোষিতের ক্ষমতা দখল, একশ বছরে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে লেনিন-স্ট্যালিন-মাও সেতুঙ মার্কসবাদী শিক্ষকদের পথ এবং বাতিল করতে হবে শ্রেণীসংগ্রাম বিরোধী, শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব বিরোধী, মার্কসবাদ ও সমাজতন্ত্র বিরোধী পথকে। এটাই অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, আগামী ১০ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে প্রধান কর্মসূচি। এদিন শুক্রবার সকাল ১০টা ৩০মিনিটে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ১১টা ৩০মিনিটে লাল পতাকাসহ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১২টা ৩০মিনিটে রুশ বিপ্লবের উপর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউশন, বাংলাদেশ-এর দ্বিতীয় তলার সেমিনার কক্ষে। বিকেল ৩টা ৩০মিনিটে একই স্থানে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এছাড়াও দেশের একাধিক জেলায়ও উদযাপন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। যার মধ্যে আগামী ১৭ নভেম্বর রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে মিছিল ও আলোচনাসভা।

সংবাদ সম্মেলনে কমিটির আহ্বায়ক হাসান ফকরীসহ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন- সৈয়দ আবুল কালাম, বি ডি রহমতুল্লাহ, জাফর হোসেন, অধ্যাপক ম. নুরুন্নবী, বাদল শাহ আলম, মাসুদ খান প্রমুখ।

ধন্যবাদসহ,

       

বার্তা প্রেরক,

বিপ্লব ভট্টচার্য

সদস্য, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটি।

# ০১৭৩৭২৮৪০৬৩।

 

 

f

সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য –

৩০ অক্টোবর ২০১৭, প্রগতি সম্মেলন কক্ষ, মুক্তি ভবন, ঢাকা।

 

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

দুনিয়া কাঁপানো সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষে আপনাদের সবাইকে রক্তিম শুভেচ্ছা। আজকের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হবার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে শুরু করছি।

বন্ধুগণ,

অসহনীয় দ্রব্যমূল্যের কারণে শ্রমিক কৃষক গরীব মেহনতী মানুষের ঘরে ঘরে আজ শুধু হাহাকার আর হাহাকার। মাত্র তিনদিন আগে শেরপুরে ভাতের অভাবে ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হলো কিশোরী কনিকা। এ যেন কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষকের জীবনের করুন অবস্থার এক প্রতীকী চিত্র। অথচ, সরকারের কথিত উন্নয়নের গল্প এ নির্মম বাস্তবতাকে উপহাস করছে।

বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে আজ একদিকে বিভৎস নির্যাতন-গণহত্যার শিকার হয়ে দেশ ছাড়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার অসহায় আহাজারি; অন্যদিকে গুম, খুন, ধর্ষণসহ হরেক রকম নির্যাতনের শিকার মানুষ ও স্বজনের বুকচাপা কান্নার শব্দ। প্রতিদিনের সংবাদেই ফুটে উঠছে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আর অসহায়ত্বের ছবি। সীমান্তের ওপারে আরাকানে মানুষের বাড়ীঘরে আগুন অথবা নদী-সাগরে ভাসমান গলিত লাশ আপনারা দেখছেন। কদিন আগে গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ঘরে আগুন, ধানক্ষেতে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ লাশ অথবা বাঁশখালীতে পুলিশের গুলিতে বুক ঝাঁঝড়া হওয়া কৃষকের লাশ আপনারা নিশ্চয় ভোলেননি।

শুধু বাংলাদেশ নয়, মধ্যপ্রাচ্য-আফ্রিকাসহ দুনিয়াজুড়ে পুজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ও দালালদের স্বার্থের সংঘাত-সংঘর্ষ-যুদ্ধ ও নির্যাতনে জর্জরিত লাখো কোটি মানুষ জীবন বাঁচাতে আজ এক দেশ থেকে আর এক দেশে অথবা দেশের ভেতরেই উদ্বাস্তু হয়ে দুর্বিসহ জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। নিপীড়িত মানুষ মুক্তির পথ খুঁজছে। কিন্তু, সঠিক দিশার অভাবে যথাযথ সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারছে না, নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না। দিশাহীনতার এই সময়ে মুক্তির সঠিক দিশাটাই নিপীড়িত জনগণের জন্য সবচেয়ে বেশী দরকারি। একই সাথে দরকার ভুল পথগুলো চিহ্নিত করা। কারণ, ভুল পথে কখনোই মুক্তি আসে না। বরং শোষণ-নির্যাতনের পুরনো ব্যবস্থাই তাতে পুষ্ট হয়। অবরুদ্ধ হয় মুক্তির পথ।

বন্ধুগণ,

আজ থেকে একশো বছর আগে ১৯১৭ সালে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বাস্তবে দেখিয়েছিল মানুষের মুক্তির প্রকৃত পথ হলো সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ। রাশিয়ায় শ্রমিক ও গরীব কৃষক এবং সাধারণ সৈনিকরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুঁজিপতি ও জমিদারদের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করেছিল। ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল শোষকদের আধিপত্য ও নিপীড়নের হাতিয়ার-রাষ্ট্র। কায়েম করেছিল শ্রমিকশ্রেণীর নতুন ধরনের রাষ্ট্র, সোভিয়েত রাষ্ট্র ও নতুন সমাজ- সমাজতন্ত্র। সুবিধাবাদ, সংস্কারবাদসহ সব ধরনের বিপ্লববিরোধী ভুল পথ-পদ্ধতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে মার্কসবাদী পথ দেখিয়েছিলেন কমরেড লেনিন।

মার্কস-এঙ্গেলস শিখিয়েছিলেন শ্রেণীসংগ্রামই হলো ইতিহাসের চালিকা শক্তি। শোষণ-নিপীড়নের উৎস হলো শ্রেণীবিভক্ত শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থা। শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্ত হতে হলে শোষণমুলক ব্যবস্থাকেই বিদায় করতে হবে, কায়েম করতে হবে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব। কেননা, শোষণমূলক ব্যবস্থা দূর করার উপায় হলো শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব। শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বে শোষণের যাবতীয় ভিত্তি, উপায়-উপকরণ বিলুপ্ত করার সমাজ সমাজতন্ত্র। যা এগিয়ে যাবে শোষণ-বৈষম্যহীন মুক্ত মানুষের সমাজ- সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে। ইতিহাসের অনিবার্য গতি সেদিকেই।

এই শিক্ষায় অবিচল থেকে রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণী গড়ে তুলেছিল শ্রেণীসংগ্রামের সুশৃঙ্খল অগ্রবাহিনী- বলশেভিক কমিউনিস্ট পার্টি। এমন এক বিপ্লবী পার্টি, যা বিপ্লবী সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে পারে এবং যা গড়ে তুলতে পারলেই কেবল প্রলেতারিয় বিপ্লব করা যায়। বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে রাশিয়ায় শোষক-নিপীড়কদের বিরুদ্ধে কায়েম হয়েছিল শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব। শ্রমিকশ্রেণী সুদৃঢ় জোট বেঁধেছিল গরীব কৃষকের সাথে এবং মৈত্রী গড়ে তুলেছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সঙ্গে। শ্রমিক কৃষক মেহনতী জনগণের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিল এক অভূতপূর্ব স্বাধীনতা, গণতন্ত্রসহ তাদের সার্বিক অধিকার।

সাংবাদিক বন্ধুগণ,

কমরেড লেনিনের মৃত্যুর পর কমরেড স্ট্যালিন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিকে শ্রেণীসংগ্রামের মাঠে নেতৃত্ব দেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে মানুষকে চুড়ান্তভাবে মুক্ত করতে সমাজতন্ত্রের নির্মাণ এগিয়ে নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসীবাদকে পরাজিত করে শ্রমিকশ্রেণীর বিজয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু, কমরেড স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভ চক্র সমাজতন্ত্রের নামেই শান্তিপূর্ণ সহবস্থান ও শ্রেণী সমন্বয়বাদসহ শ্রেণীসংগ্রাম বিরোধী ও মার্কসবাদ বিরোধী তত্ত্ব ও পথ অবলম্বন করে রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব ও সমাজতন্ত্রকে নস্যাত করে। অক্টোবর বিপ্লবে ক্ষমতা হারানো শোষক পুঁজিপতিশ্রেণীকে ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯১ সালে এই পুঁজিপতিরা খোলাখুলিভাবে রাশিয়ায় পুঁজিবাদ ঘোষণা করে।

আবার, রুশ বিপ্লবের দিশা ও প্রেরণায় ঘটেছিল চীন বিপ্লব। কিন্তু, ১৯৭৬ সালে কমরেড মাও সেতুঙ এর মৃত্যুর পর চীনেও তেঙ চক্রের নেতৃত্বে নতুন বুর্জোয়ারা ক্ষমতা দখল করে। শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব ও শোষণ-বৈষম্য অবসানের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে হটিয়ে ভুয়া সমাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদ কায়েম করে। এভাবে, শোষকদের ক্ষমতা আপাতত ফিরে এলেও শোষিতের মুক্তির লক্ষ্যে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে হটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছেই। গত একশ বছর ধরে শ্রমিকশ্রেণী ও শোষিত জনগণ সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়েছে।

একদিকে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ আজ আবারও গোটা বিশ্বকে গ্রাস করেছে। নতুনভাবে ভাগবাটোয়ারার লড়াইয়ে পারমাণবিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি করেছে। দেশে দেশে কায়েম করছে ফ্যাসীবাদ। জনগণকে বিভক্ত করে শোষণ-শাসনের জন্য উস্কে দিচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতাসহ বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারা। চালিয়ে যাচ্ছে নজিরবিহীন শোষণ-লুন্ঠন-নিপীড়নের বিভীষিকা। প্রকৃতি-পরিবেশের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে চরম ধ্বংসাত্মক তৎপরতা। শোষণ-লুন্ঠণের নৈরাজ্যে মানব সমাজের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে। বাংলাদেশেও সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসী ভারতের অনুগত শাসকশ্রেণীর কয়েক দশকের শাসন-শোষণে জর্জরিত জনগণ। আওয়ামী সরকার কায়েম করেছে এক নজিরবিহীন ফ্যাসীবাদ।

অপরদিকে, অব্যাহত আছে জনগণের শোষণমুক্তির লড়াই। মুক্তিকামী জনগণ খুঁজছে মুক্তির দিশা, সঠিক পথ। এমন সময় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন মুক্তিকামী মানুষের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কেননা, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শোষিতের ক্ষমতা কায়েম করেছিল, দেখিয়েছিল মানব মুক্তির প্রকৃত পথ। আর সমাজতান্ত্রিক সমাজকে নস্যাৎ করে শোষকরা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে শোষণের পুরনো ব্যবস্থা। ব্যাহত করেছে শোষিতের মুক্তির পথ।

কাজেই, মুক্তিকামী মানুষের মাঝে আজ সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের সঠিক দিশা নিয়ে যেতে হবে। সেজন্য উর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে বলশেভিক সংগ্রামী শিক্ষা, শ্রেণীসংগ্রাম, শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব, বলপ্রয়োগে শোষিতের ক্ষমতাদখল, একশ বছরে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে লেনিন-স্ট্যালিন-মাও সেতুঙ মার্কসবাদী শিক্ষকদের পথ। বাতিল করতে হবে শ্রেণী সংগ্রাম বিরোধী, শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব বিরোধী, মার্কসবাদ ও সমাজতন্ত্র বিরোধী পথকে। এটাই সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষা।

সাংবাদিক বন্ধুগণ,

বাংলাদেশে শ্রমিকশ্রেণী ও শোষিত-নিপীড়িত জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষায় সজ্জিত করে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে বেগবান করার জন্য আমরা অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। আগামী ১০ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে প্রধান কর্মসূচি। এদিন শুক্রবার সকাল ১০টা ৩০মিনিটে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ১১টা ৩০মিনিটে লাল পতাকাসহ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১২টা ৩০মিনিটে রুশ বিপ্লবের উপর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউশন, বাংলাদেশ-এর দ্বিতীয় তলার সেমিনার কক্ষে। বিকেল ৩টা ৩০মিনিটে একই স্থানে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এই প্রধান কর্মসূচির পর দেশের একাধিক জেলায়ও আমরা উদযাপন কর্মসূচি আয়োজন করছি। যার মধ্যে আগামী ১৭ নভেম্বর রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে মিছিল ও আলোচনাসভা। এসব কর্মসূচির খবর এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষা জনসাধারণের মাঝে তুলে ধরার জন্য আমরা আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি। আশা করছি, আপনাদের সংবাদ মাধ্যমে এসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ/প্রচার করে আমাদের সহযোগিতা করবেন। জনগণের কাছে রুশ বিপ্লবের শিক্ষা ও মুক্তির সঠিক দিশা তুলে ধরায় আপনাদের ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসবেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে ধৈর্য্য ধরে এতক্ষণ আমাদের বক্তব্য শোনার জন্য আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি।

 

হাসান ফকরী,

আহ্বায়ক

সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটি

পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ- ধ্বংস হোক, নিপাত যাক !

ভূয়া সমাজতন্ত্র- নিপাত যাক !

সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের বিশ্বব্যবস্থা- জিন্দাবাদ !


বাংলাদেশঃ নভেম্বরে ‘সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বা রুশ বিপ্লবের শতবর্ষ’ উদযাপনের আমন্ত্রন পত্র

বাংলাদেশঃ এই বছরের নভেম্বর মাস জুড়ে বিভিন্ন বিপ্লবী সংগঠনের উদ্যোগে পৃথক ভাবে উদযাপন করা হবে – “মহান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ বা মহান রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকী”। 
এই সকল অনুষ্ঠান সূচী সম্পর্কে পাঠকদের মনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি এড়াতে ভিন্ন ভিন্ন আমন্ত্রণ পত্রগুলো নিম্নে প্রকাশ করা হলঃ

 

22489920_494119700966265_5668504083333841122_n

 

k

 

17 nov

 


৭ই নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকী’ উদযাপন করা হবে

 

22489920_494119700966265_5668504083333841122_n


১৭ই নভেম্বরঃ রাজশাহীতে উদযাপন হবে ‘সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ’

17 nov

দুনিয়ার মজদুর এক হও!
মহান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরুন!
সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম এগিয়ে নিন!

১৯১৭ সালে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রুশ শ্রমিক ও গরীব কৃষক এবং সাধারণ সৈনিকরা সীমাহীন ঔদ্ধত্যে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পুঁজিপতি ও জমিদারদের উচ্ছেদ করেছিল রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে, ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল তাদের আধিপত্য-অহঙ্কার ও রাষ্ট্র। কায়েম করেছিল শ্রমিকশ্রেণীর নতুন ধরনের রাষ্ট্র, সোভিয়েত রাষ্ট্র ও নতুন সমাজ- সমাজতন্ত্র। বুর্জোয়া উদারনৈতিকতা, সুবিধাবাদ, সংস্কারবাদ, অর্থনীতিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বিলোপবাদসহ সব ধরনের বিপ্লববিরোধী ধারার বিরুদ্ধে অবিচল সংগ্রাম চালিয়ে এই বিপ্লবকে পথ দেখিয়েছিলেন লেনিন, নেতৃত্ব দিয়েছিল রুশ বলশেভিক পার্টি।
১৭৮৯ সালের ফরাসী বিপ্লবের সময় থেকে পশ্চিমা বুর্জোয়াশ্রেণী নিজেদের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে দাবী করে আসছিল। তাদের সাম্য ছিল বুর্জোয়া রাষ্ট্রের আইনে ধনী-গরীবের সমান অধিকারের ঘোষণা- যা কখনোই হতে পারে না। তাদের মৈত্রী ও স্বাধীনতা ছিল মেহনতীদের বিরুদ্ধে ধনীদের মৈত্রী ও শোষণ-লুণ্ঠনের স্বাধীনতা। ইতিহাসে বুর্জোয়া গণতন্ত্র সর্বদাই ধনীকশ্রেণীর জন্য গণতন্ত্র ও গরীব জনগণের জন্য ধনীর দাসত্ব তথা একনায়কত্ব হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। বিপরীতে রুশ বিপ্লব সেদেশের জনগণকে পুঁজিপতি ও জমিদারদের একনায়কত্ব ও শোষণমূলক সমাজব্যবস্থা থেকে মুক্ত করেছিল।
নতুন সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল পুঁজিপতি-জমিদার ও নতুন-পুরাতন শোষক-নিপীড়কদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব। রুশ শ্রমিকশ্রেণী এজন্য সুদৃঢ় জোট বেঁধেছিল গরীব কৃষকের সঙ্গে এবং মৈত্রী গড়ে তুলেছিল মধ্যকৃষক, মধ্যবিত্ত শ্রেণী, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়সহ সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সঙ্গে। জনগণ, বিশেষভাবে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী জনগণের জন্য তা কায়েম করেছিল এক অভূতপূর্ব স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার। যা তাদের সৃজনশীলতা, উদ্যোগ ও সচেতনতার এমন বিষ্ফোরণ ঘটিয়েছিলÑবুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তা অচিন্তনীয় ও অসম্ভব।
শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণের এই গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ওপর ভর করেই রুশ দেশের কোটি কোটি কৃষক বিপ্লবী অভ্যুত্থানে জেগে উঠেছিল- অবসান ঘটিয়েছিল জমিদার, চার্চ ও অভিজাতদের ভূমি মালিকানার এবং জমি পরিণত হয়েছিল জনগণের সম্পত্তিতে। দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী কলকারখানা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পুঁজিবাদী মালিকানার বিলোপ ঘটিয়ে কায়েম হয়েছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও শ্রমিক কর্তৃত্ব। লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিনের নেতৃত্বে শ্রমিক ও গরীব কৃষকের সচেতন উত্থানের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন হয়েছিল। বিদায় নিয়েছিল অশিক্ষা, নারীরা পেয়েছিল মুক্তি, নিপীড়িত জাতিসমূহ পেয়েছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। আধুনিক শিল্পোন্নত ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সারা পৃথিবীর শোষিত-নিপীড়িত জনগণের আশা-ভরসার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
রুশ বিপ্লবের দিশা ও প্রেরণায় ঘটেছিল চীন বিপ্লব। বিশ্বের এক চতুর্থাংশে জন্ম নিয়েছিল একগুচ্ছ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রাম। ১৯১৭ থেকে ১৯৫০ সাল- সাম্রাজ্যবাদীদের অব্যাহত সামরিক আগ্রাসন, সামরিক-অর্থনৈতিক অবরোধ, অন্তর্ঘাত ও মিথ্যাচার- সবকিছু ব্যর্থ করে দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল পৃথিবীর এই প্রথম সমাজতন্ত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তা পরাজিত করেছিল পশ্চিমা সাহায্য ও প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা নাৎসী জার্মানিকে। এককভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন সম্পন্ন করেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুরনো সমাজের বুর্জোয়া অধিকার, অসাম্য ও পচা-গলা ধ্যানধারণা রাতারাতি বিলুপ্ত হয় না- অব্যাহতভাবে জন্ম দেয় নতুন বুর্জোয়া। ক্ষমতার উচ্চস্তরে সৃষ্ট এই নতুন বুর্জোয়ারা স্ট্যালিনের মৃত্যুর সুযোগে ১৯৫৬ সালে ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে। মাও সে-তুঙ-এর মৃত্যুর পর ১৯৭৬ সালে তেঙ শিয়াও পিং চক্রের নেতৃত্বে চীনেও একই ঘটনা ঘটে। সমাজতন্ত্রকে হটিয়ে এরা কায়েম করে ভুয়া সমাজতন্ত্র তথা পুঁজিবাদ।
আমাদের দেশে বামপন্থী মহলে ক্রুশ্চেভের রাশিয়া ও বর্তমান চীনকে পুঁজিবাদী হিসেবে চিহ্নিত না করে সমাজতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার বিভ্রান্তি অদ্যাবধি বিদ্যমান। ফলে এই বামপন্থীরা কার্যত সমাজতন্ত্রের পক্ষে নয়, পুঁজিবাদের পক্ষেই দাঁড়াচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ বর্তমান সরকার ও শাসকশ্রেণীর লেজুড়বৃত্তিও করছে।
আজ দুনিয়ায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর নেই। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ গোটা বিশ্বকে আবারও গ্রাস করেছে। এরা দুনিয়াকে নতুনভাবে ভাগবাটোয়ারার লড়াইয়ে লিপ্ত। ফলে মানব সমাজ পারমাণবিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদের মুখোমুখি। আজ সারা দুনিয়ার মানুষের পরিশ্রমলব্ধ সম্পদ কেন্দ্রীভূত মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি-সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে। ক্ষুধা-দারিদ্র-অনাহার-দুর্ভিক্ষ-অনিরাপত্তা-অনিশ্চয়তাগ্রাস করেছে বিশ্বকে এবং প্রকৃতি-পরিবেশের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে চরম ধ্বংসাত্মক তৎপরতা। দেশে দেশে এরা উসকে দিচ্ছে উগ্র ধর্মান্ধতা-মৌলবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং আঞ্চলিক বিভেদ ও যুদ্ধ। সদ্য রোহিঙ্গা সমস্যা এরই এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। পুঁজিবাদী শোষণ-লুণ্ঠন ও নৈরাজ্য এভাবে চলতে থাকলে গোটা মানব সমাজের অস্তিত্বই ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের জনগণও সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের অনুগত বুর্জোয়াশ্রেণী এবং তাদের দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও সামরিক স্বৈরতন্ত্রের কয়েক দশকের শাসন-শোষণ লুণ্ঠনে চরম বিপর্যস্ত। তাদের ওপর অব্যাহতভাবে চেপে রয়েছে শাসকশ্রেণীর স্বৈরতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচার। আওয়ামী সরকার উসকে দিচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা ও ফ্যাসিবাদ। জনগণ যে কোনো সময় গুম-খুন কিংবা লোপাট হয়ে যাওয়ার বিপদে রয়েছে।
রুশ বিপ্লব ছিল পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী যুগের অবসান ঘটিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে বিশ্ববিপ্লবের নতুন যুগের দুনিয়াকাঁপানো সূচনা। এই যুগ দেশে দেশে শ্রমিকশ্রেণী ও শোষিত-নিপীড়িত জনগণের রাষ্ট্রক্ষমতা, শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা ও সমাজতন্ত্রকে জয়যুক্ত করার বিপ্লবী যুগ। একমাত্র এর মধ্য দিয়েই পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের করাল গ্রাস, শোষণ-নিপীড়ন, শ্রেণীবৈষম্য ও ব্যক্তি স্বার্থের পচা-গলা ধ্যানধারণা থেকে মানববিশ্ব মুক্ত হতে পারে। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন ও মাও সেতুঙ-এর বিপ্লবী শিক্ষা এটাই। আসুন, আমরা নতুন যুগের বিপ্লবী পথে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করি।