সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে সাতটি কল্প কাহিনী — স্টিভেন গাউন্স

maxresdefault

২২ বছর পূর্বে ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়; মার্কসবাদের নামে বুর্জোয়া চিন্তার আমদানি যখন থেকে শুরু হলো, সেই সময় থেকেই সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রচারকেরা সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঘরে বাইরে অপপ্রচারের বন্যা বইয়ে দিতে থাকে। প্রচার করতে থাকে কিছু কাল্পনিক কাহিনী।

কিন্তু এই ধারণাগুলোর কোনোটাই সঠিক নয়।

এই কল্প কথাগুলোর প্রথমটি হলো — ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি সেখানকার জনগণের কোনো সমর্থন ছিল না।’ এর জবাবে বলা যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির ৯ মাস আগে ১৯৯১ এর ১৭ মার্চ সোভিয়েত নাগরিকরা একটি গণভোটে অংশ নেয়। যেখানে জানতে চাওয়া হয়েছিল তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে কিনা? সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে দেয়ার সম্পূর্ণ বিপরীতে তিন চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐক্যের পক্ষেই ভোট দেয়।

দ্বিতীয় ভ্রান্ত ধারণা হলো — ‘রাশিয়ানরা স্ট্যালিনকে ঘৃণা করে।’ এধারণাও যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত তার প্রমাণ ‘রাশিয়া’ নামে একটি টিভি চ্যানেল তিন মাস ধরে পাঁচ কোটি রাশিয়ান নাগরিকের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখতে চায় তাদের মতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রাশিয়ান কারা? সেখানে দেখা যায় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যিনি সাফল্যের সঙ্গে পশ্চিমী রাষ্ট্র কর্তৃক রাশিয়া আক্রমণের প্রচেষ্টা প্রতিহত করে ছিলেন সেই আলেকজান্ডার নভোস্কিকে প্রথম স্থান দেয়া হয়। দ্বিতীয় জার নিকোলাসের প্রধানমন্ত্রী পাইথর স্টলিপিন, যিনি রাশিয়ায় ভূমি সংস্কার কার্যকরী করেছিলেন, তাঁকে সমীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান দেওয়া হয়। মাত্র ৫৫০০ ভোটের ব্যবধানে তৃতীয় স্থান দেয়া হয় জোসেফ স্ট্যালিনকে। যাঁকে পশ্চিমী মতামত সৃষ্টিকারীরা নিয়মিতভাবে একজন নির্মম স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন, যার হাত নাকি লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তে রঞ্জিত।

কর্পোরেট ধনকুবের যারা পশ্চিমী আর্দশগত প্রচার কেন্দ্রের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে তাদের হৃদয় জয়ের দিকে যিনি ছোটেননি, তাকে সেই পশ্চিমী দুনিয়ায় গালিগালাজ করাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রাশিয়ানদের মত সম্পূর্ণ অন্যরকম। রাশিয়ানরা স্ট্যালিনের শাসনে ভালো থাকার পরিবর্তে খারাপ অবস্থায় ছিলেন পশ্চিমী প্রচারকদের এই ধারণার সঙ্গেও এই জনমতের রায় অসঙ্গতিপূর্ণ। ২০০৪ সালের মে-জুন মাসে প্রকাশিত ‘ফরেন অ্যাফেয়ার‘ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ফ্লাইট ফ্রম ফ্রিডম হোয়াট রাশিয়ান থিংক এন্ড ওয়ান্ট’ প্রবন্ধে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্যুনিস্ট বিরোধী ঐতিহাসিক রিচার্ড পাইপ একটি সমীক্ষার উল্লেখ করেন। ঐ সমীক্ষায় রাশিয়া ও সমগ্র বিশ্বের সর্বকালের ১০ জন শ্রেষ্ঠ পুরুষ ও নারীর তালিকা দিতে বলা হয়েছিল। যথেষ্ট বিরক্তির সঙ্গেই ঐ সমীক্ষার ফলাফল তুলে ধরে পাইপ দেখান যেÑ স্ট্যালিনকে পিটার দি গ্রেট, লেনিন ও পুশকিনের পর চতুর্থ স্থানে রাখা হয়।

তৃতীয় কাল্পনিক ধারণা হলো — ‘সোভিয়েত সমাজতন্ত্র ছিল অকার্যকরী।’ একথা সত্য হলে তর্কাতীতভাবে ধনতন্ত্র সমপরিমাণে ব্যর্থ। ১৯২৮ সালে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সূচনা থেকে ১৯৮৯ সালে তা ভেঙে যাওয়ার সময় পর্যন্ত একমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ছাড়া সোভিয়েত সমাজতন্ত্র কখনোই মন্দায় হোঁচট খায়নি বা পূর্ণ কর্মসংস্থানেও ব্যর্থ হয়নি।

দীর্ঘ ৫৬ বছর সময়কাল ধরে (১৯২৮-১৯৪১ ও ১৯৪৬-১৯৮৯, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল সমাজতান্ত্রিক এবং তারা কোনো যুদ্ধে লিপ্ত ছিল না।) কোনো ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি মন্দা ছাড়া এবং পূর্ণ কর্মসংস্থান কি কখনও অব্যাহতভাবে বিকশিত হয়েছে? তদুপরি ১৯২৮ সালে স্ট্যালিন যখন প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু করেন তখন যে সমস্ত ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র অর্থনৈতিক বিকাশের একই স্তরে ছিল সেই সমস্ত ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির চেয়ে সোভিয়েত অর্থনীতির বিকাশ ছিল দ্রুততর। এমনকি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অস্তিত্বের অধিকাংশ সময়ই সোভিয়েত অর্থনীতির বিকাশ ছিল মার্কিন অর্থনৈতিক বিকাশের চেয়েও দ্রুততর।

নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, সোভিয়েত অর্থনীতি কখনোই মূল অগ্রসর ধনতান্ত্রিক শিল্প-অর্থনীতিগুলির সমান হতে বা ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। যদিও তারা দৌড় শুরু করেছিল অনেক পেছন থেকে, আবার তা পশ্চিমী রাষ্ট্রগুলোর মতো কোনো সাহায্যও পায়নি। ক্রীতদাসত্বের ইতিহাস, ঔপিনিবেশিক লুটতরাজ এবং অর্থনৈতিক সা¤্রাজ্যবাদ ও অব্যাহতভাবে পশ্চিমী দুনিয়ার বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ঘাত প্রচেষ্টার লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত অর্থনীতির বিকাশের পক্ষে বিশেষ করে ক্ষতি করছিল পশ্চিমী সামরিক চাপের চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার জন্য বৈষয়িক ও মানব সম্পদকে বেসামরিক অর্থনীতি থেকে যুদ্ধ অর্থনীতিতে ঘুরিয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা। রাষ্ট্রীয় মালিকানা বা পরিকল্পিত অর্থনীতি নয় বরং ঠান্ডা যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা- যা সোভিয়েত ইউনিয়নকে অধিকতর শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে ফেলেছিল, তাই সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পক্ষে অগ্রসর ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর শিল্প অর্থনীতিগুলোকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তথাপি, সোভিয়েত অর্থনৈতিক বিকাশকে পঙ্গু করার অব্যাহত পশ্চিমী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত অর্থনীতি যুদ্ধের সময় ছাড়া প্রতি বছরই তার অস্তিত্বের সমগ্র পর্যায়েই ইতিবাচক বিকাশ ঘটিয়েছে এবং সকলের জন্য বৈষয়িকভাবে নিরাপদে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করেছে। কোন ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি এমন সাফল্যের দাবি করতে পারে?

চতুর্থ কল্পকথা হলো — ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষ সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে পুঁজিবাদেই আস্থা রেখেছে।’ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা সোভিয়েত ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা বা সমাজতন্ত্রই ফিরিয়ে আনতে চাইছে। একটি সাম্প্রতিক জনসমীক্ষায় উঠে এসেছে আটান্ন শতাংশ মানুষ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও বন্টনের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেখানে মাত্র আটাশ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত বন্টনের পক্ষে তাদের মত ব্যক্ত করেছে। চৌদ্দ শতাংশ মানুষ এ বিষয়ে তাদের মতামত দিতে পারেননি। অধ্যাপক পাইপ কর্তৃক আর একটি জনসমীক্ষায় বাহাত্তর শতাংশ মানুষ ব্যক্তি পুঁজির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে।

পঞ্চম যে কল্পকথাটি প্রচার করা হয় তা হলো ‘বাইশ বছর পর পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষ দেখছে সোভিতে ইউনিয়নে ভাঙন তাদের জন্য ক্ষতিকর হয়নি; বরঞ্চ ভালোই হয়েছে।’ কিন্তু এই ধারণাটিও সম্পূর্ণভাবে ভুল। একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী এগারোটি পূর্বতন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের মানুষ (রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ, উজবেকিস্তান, কাজাকস্তান, জর্জিয়া প্রভৃতি) যারা ভেবেছিলেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন তাদের জন্য ভালো হবে, আজ তারা অনেকেই মনে করেন ভাঙনের ফলে তাদের ক্ষতি হয়েছে বেশি। বিশেষ করে যে বয়স্ক মানুষরা পূর্বতন সোভিয়েত ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তারা এই ক্ষতির দিকটি আরো ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারছেন। সমাজতন্ত্র বিরোধী পাইপের দ্বারা সংগঠিত আর একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে রাশিয়ার চার ভাগের তিন ভাগ মানুষের কাছেই সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন দুঃখজনক, যা একেবারেই অপ্রত্যাশিত তাদের কাছে যারা পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের দমননীতি ও আর্থিক দুরবস্থার কথা বলেন।

ষষ্ঠ যে কাল্পনিক কাহিনীটি পুঁজিবাদের প্রচারকরা দাবি করে থাকেন — ‘পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের নাগরিকরা আগের তুলনায় ভালো আছেন।’ এক্ষেত্রে সকলেই জানেন কিছু লোক নিশ্চয়ই ভালো আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বেশিরভাগ মানুষই কী ভালো আছেন? যেহেতু বেশিরভাগ মানুষই মানছেন যে তারা পূর্বতন সোভিয়েত সমাজতন্ত্রেই ভালো ছিলেন এবং নতুন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তাদের ক্ষতিই করেছে বেশি। তাই বলা যায় যে, বেশিরভাগ মানুষই নতুন বর্তমান ব্যবস্থায় ভালো নেই। এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয় যদি আমরা এই মানুষগুলির জীবনকাল (Life expectancy) সম্পর্কে আলোকপাত করি। একটি বিশ্ব বিখ্যাত স্বাস্থ্য পত্রিকা ‘দি ল্যান্সেট’-এ সমাজতত্ত্ববিদ ডেভিড স্টাকলার ও স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক মার্টিন ম্যাক্কি দেখিয়েছেন যে পূর্বতন সোভিয়েত ব্যবস্থার পর থেকে সেখানকার মানুষের জীবনকাল কীভাবে কমতে শুরু করেছে। খুব কম সংখ্যক পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক দেশই তাদের পূর্বের জীবনকাল ধরে রাখতে পেরেছে। রাশিয়াতে পুরুষদের জীবনকাল ১৯৮৫ সালে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ছিল ৬৭ বছর। ২০০৭ সালে সেটি নেমে এসেছে ৬০ বছরে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ আয়ুষ্কাল সব থেকে কমেছে। সমাজতন্ত্রের ভাঙনের পর পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বহু অকাল মৃত্যু ঘটেছে এবং মৃত্যুর হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শার্লে শিরিসটো ও হাওয়ার্ড ওয়াটকিনের ১৯৮৬ সালের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে পুঁজিবাদের সময় থেকে সমাজতন্ত্রের সময়ই জীবনকাল, শিশু মৃত্যুর হার, ক্যালোরি গ্রহণ এবং বাহ্যিক সুযোগ সুবিধা প্রভৃতি আরো ভালো ছিল। অধ্যাপক পাইপের দ্বারা সংগঠিত আরো একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে, রাশিয়ানরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একটি ধাপ্পা হিসাবেই দেখেন। বেশিরভাগ রাশিয়ানরাই মনে করেন পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধনী ও প্রভাবশালী লোকেদের পরিচালিত সরকারের একটি মুখোশ মাত্র। কে বলেছে যে, রাশিয়ানদের বোঝার ও বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নেই?

সপ্তম কাহিনীটি হলো — ‘যদি পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের লোকেরা সমাজতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে চাইত তাহলে তারা তা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেই করতে পারত।’ কিন্তু বাস্তবে তা এত সহজ নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সেইসব নীতিকেই সমর্থন করে যা তাদের অনুকূলে, এমন নীতি নয় যা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্পের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা যেতে পারে। যদিও সব আমেরিকান নাগরিক এই বীমার আওতার মধ্যে আসতে চান, কিন্তু সবার অন্তর্ভুক্তি হয়নি। তাহলে তারাও চাইলে এর জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে এটি সম্ভব নয়। কারণ এটি কিছু শক্তিশালী ও বিত্তবান বেসরকারি বীমা কোম্পানির স্বার্থের প্রতিকূলে যাবে, তাই তারা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে এই নীতি স্থগিত করে রেখেছে। তাই বলা যায়, যা জনমোহিনী তা সব সময় সমাজে স্থান পায় না, সেখানে বিত্তবানরা তাদের স্বার্থে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন।

মাইকেল পেরেন্টি লিখেছেন, পুঁজিবাদ শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়, এটি একটি সমাজব্যবস্থা। একবার এটি প্রচলিত হয়ে গেলে ভোটের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদে পরিণত করা যায় না। তারা দপ্তর অধিগ্রহণ করতে পারে কিন্তু আসল ক্ষমতা সমাজের সম্পদ, উৎপাদন সম্পর্ক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, আইন ব্যবস্থা, পুলিশ বিভাগ প্রভৃতি পুঁজিবাদীদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়।

রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন আবার বিপ্লবের মাধ্যমেই হতে পারে, ভোটের মাধ্যমে নয়। কিন্তু বিপ্লব শুধুমাত্র মানুষের পছন্দ অপছন্দের উপর নির্ভর করে না। বিপ্লব তখনই ঘটে যখন পুরনো ব্যবস্থায় মানুষের জীবন অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং দেশের বেশিরভাগ মানুষ সেই ব্যবস্থা থেকে মুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে একটি বিকল্প রাজনৈতিক সংগ্রাম ও শক্তির জন্ম দেয়। কিন্তু দুঃখের হলেও সত্য রাশিয়ার মেহনতি, সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও শক্তি এখনও সেই কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছতে পারেনি।

২০০৩ সালে একটি সমীক্ষা হয়েছিল যাতে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, যদি আবার সমাজতন্ত্র ফিরে আসে তাহলে তাদের মনোভাব কী হবে? সেই সমীক্ষায় দেখা গেল যে, মাত্র ১০ শতাংশ মানুষই এর বিরোধিতা করছে। সেখানে ২৭ শতাংশ মানুষ এটি মেনে নিতে প্রস্তুত। ১৬ শতাংশ মানুষ অন্য কোথাও যাবার কথা বলেছেন। আর মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ সক্রিয়ভাবে এটিকে প্রতিরোধ করবেন বলে জানিয়েছেন।

তাই বলা যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনে অনেকেই দুঃখিত, বিশেষ করে যারা পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেখেছেন। কিন্তু সেইসব পশ্চিমী সাংবাদিক বা রাজনীতিকরা যারা তাদের পুঁজিবাদের চোখ দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেখেন তাদের কাছে বিষয়টি ভিন্ন। এখন বুর্জোয়া মিডিয়ার প্রচার সত্ত্বেও দু’দশকের বহুদলীয় গণতন্ত্র, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও বাজার অর্থনীতির অভিজ্ঞতা থেকে বেশিরভাগ রাশিয়ানই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চান। তাই বলা যায় সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছিল এটি সত্য নয়।

সূত্রSeven Myths about the USSR By Stephen Gowans

Advertisements

মহান রুশ বিপ্লবের শিক্ষা : পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা নয়, সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের বিশ্ব ব্যবস্থাই নিপীড়িত জনগণকে মুক্ত করবে

cropped-header

সোভিয়েত রাশিয়া ও গণচীনে সমাজতান্ত্রিক সমাজের বিপর্যয়ের পর পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব সমাজতন্ত্রের উপর সামগ্রিক মতাদর্শিক আক্রমণ পরিচালনা করেছে। সাম্রাজ্যবাদীরা সমাজতন্ত্রের সাময়িক বিপর্যয়কে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সামগ্রিক পতন হিসেবে দেখাতে চাইছে। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের মতবাদ মৃত বলে প্রচার করছে। সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের পালিত বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা পুঁজিবাদ জিন্দাবাদ ধ্বনি তুলছে। বলছে পুঁজিবাদ চিরস্থায়ী, চিরন্তন। তার মানে পুঁজিবাদ আগেও ছিল, বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

কিন্তু এটা তো প্রমাণিত যে, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের ভঙ্গুর সমাজের দ্বন্দ্বগুলোর সমাধান করতে পারছে না, পারবেও না। শ্রমিকশ্রেণির সম্মিলিত সামাজিক উৎপাদনের ফসল চলে যাচ্ছে কতিপয় বড় বড় পুঁজিপতিদের হাতে। কিন্তু যারা বিশাল সম্পদ উৎপাদন করছে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম হয়ে থাকছেন নিগৃহীত, নিপীড়িত। পুঁজিপতিদের সম্পদের পরিমাণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর শ্রমিকের সন্তানদের পুনরায় শ্রমিক হওয়ার নিশ্চয়তা চলতে থাকে। শ্রমিক-কৃষক, নারী, মেহনতি জনগণের শ্রম আত্মসাৎ করে পরজীবী বুর্জোয়াশ্রেণি পুষ্টি পাচ্ছে। উৎপাদন শক্তি ও সম্পর্কের এই অনিবার্য দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রকট আকার ধারণ করছে ক্রমে ক্রমে। তাদের এই শোষণমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতেই তারা তাদের  রাষ্ট্র দ্বারা শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত সহ নিপীড়িত জাতি-জনগণের উপর সীমাহীন নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।

পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের সীমাহীন সংকট মোচনে দুর্বল ও অনুন্নত দেশে আগ্রাসন চালায়। দালালশ্রেণিকে ক্ষমতায় বসায় এবং বিভিন্ন জাতিসত্তার জনগণের উপর জাতিগত নিপীড়ন চালায়। শিল্প ও কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও ধ্বংস সাধন করে। তারা পরিবেশ ও প্রকৃতির এতটাই ধ্বংস সাধন করে যে, এ শতাব্দীতে এসে পরিবেশ বিপর্যয়, উষ্ণায়ন ও অন্যান্যভাবে তারা খোদ পৃথিবীটিকেই ধ্বংসের মুখে এনে ফেলেছে। তাদের এই বিশ্ব ব্যবস্থায় উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ, ব্যক্তিস্বার্থের আফিম খাওয়ানো হয়। প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শকে ছড়িয়ে দেয়া হয় ব্যাপক জনগণের মাঝে। সকল নিপীড়িত জাতি ও জনগণের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে তাদের ব্যবস্থাটিকে টিকিয়ে রাখার হীনস্বার্থে। তারা নারীদের উপর হাজার হাজার বছর ধরে চলা নিপীড়ন ও অসাম্যকে টিকিয়ে রাখে ও নব নব রূপে চালু করে। তারা নিজেদের গোষ্ঠী স্বার্থে পৃথিবী লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতায় বর্বর যুদ্ধকে ছড়িয়ে সারা পৃথিবীকে করে তুলেছে আতংকের নগরী। পূর্ব ইতিহাস বাদ দিলেও একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, কুর্দ্দিস্থান, উত্তর-পূর্ব ভারত, কাশ্মীর এবং সদ্য উদ্বাস্তু মিয়ানমারের  লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা কাফেলা, এমনকি বাংলাদেশের পাহাড়ী-সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার উপর নিপীড়ন সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার হিংস্র থাবারই নগ্ন প্রকাশ।

নিপীড়িত জাতি ও জনগণও সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন। জার্মানির হামবুর্গ শহরে বিশ্বের বড় বড় ২০টি দেশের বুর্জোয়া নেতারা এক হওয়ায় সেখানকার তরুণরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তারা চিৎকার করে বলেছেন, আপনারা সমাধান দিতে পারছেন না। আপনারা যা সমাধান দেন সেটা আমাদের জন্য সমস্যা। বিশ্বব্যাপীই পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম দেখা যাচ্ছে। ব্রিটেনের সাধারণ জনগণ বার বার জঙ্গী হামলার ঘটনায় সন্ত্রস্থ হয়ে সাম্রাজ্যবাদকেই এর জন্য দায়ী করছেন। সাম্রাজ্যবাদী অন্যায় যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিস্তিন, ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার, কুর্দ্দিস্থান সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক-কৃষক সহ নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলোর মুক্তি আন্দোলন চলছে। নিপীড়িত জাতি ও জনগণের যুগ যুগ ধরে সমস্যার সমাধান পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো করতে পারছে না। কারণ তারাই এগুলোর স্রষ্টাও পৃষ্ঠপোষক।

পুঁজিবাদ যখন তার মুমূর্ষু পর্যায় সাম্রাজ্যবাদে রূপান্তরিত হয় তখন (১৯১৭ সালে) মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র কায়েম হয়েছিল। সেখানে মুক্তি পেয়েছিল শ্রমিক-কৃষক, নারী, মধ্যবিত্ত সহ নিপীড়িত জাতিসত্তার ব্যাপক জনগণ। তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত রাশিয়ায় সকল ক্ষুদ্র ও নিপীড়িত জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ঘোষণা করেছিল। স্ব স্ব  জাতিগুলোর উপর তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার ছেড়ে দেয়া হয়েছিল এবং এই জাতিগুলোকে স্বেচ্ছায় সোভিয়েতে থাকার সুযোগও রাখা হয়েছিল। ফিনল্যান্ড- পৃথক রাষ্ট্র গঠন করেছিল। অন্য জাতিগুলো স্বেচ্ছায় রাশিয়ান সমাজতন্ত্রের সাথে একত্রে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গড়ে উঠেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন।

সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া- সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবে দেশে দেশে শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী জনগণের মুক্তি আন্দোলন বেগবান হয়। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৪৯ সালে মাও ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক, মধ্যবিত্ত ও জাতীয় বুর্জোয়াদের ঐক্যবদ্ধ করে সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত সহ ব্যাপক জনগণের রাষ্ট্র। সদ্যমুক্ত চীন বিরতি না দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা করে। একটি জনবহুল দেশ চীন সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল। পশ্চাৎপদ কৃষিকে ভারী শিল্পের সাথে পাল্লা দিয়ে উন্নত করেছিল। সমগ্র জনগণ উৎসাহের সাথে দেশ গঠনের কাজে ব্রতী হয়েছিল। মাওলানা ভাসানীর লেখা “মাওসেতুঙের দেশে” বইয়ে সেইরকম বর্ণনাই পাওয়া যায়। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার আগের চীনের তুলনায় কৃষিতে উৎপাদন দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়েছিল এবং সাম্রাজ্যবাদীদের পচাগলা তত্ত্বকে কাঁচকলা দেখিয়েছিল। শ্রমিক, কৃষক, হতদরিদ্র মানুষের জীবনের দুর্গতির অবসান ঘটেছিল। আর তারাই হয়েছিল রাষ্ট্র ও ক্ষমতার মালিক। প্রথমে সাময়িক ধাক্কা খেলেও জনগণের যৌথ উৎপাদন প্রমাণ করেছিল পুঁজিবাদী উৎপাদনের তুলনায় সমাজতান্ত্রিক উৎপদন ব্যবস্থাই শ্রেয়। বৈজ্ঞানিকভাবেই জনগণের কাছে এই সত্য গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল।

পুঁজিবাদীরা জানতো যে, কোন দেশে সমাজতন্ত্র হলে আশ-পাশের দেশগুলোও সমাজতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায়। এই ভয়ে সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা রোধ করতে তারা সর্বদাই তৎপর ছিল ও আছে। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৫৬ সালের পর দেশীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্তে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া পুঁজিবাদে, ও পরে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে অধঃপতিত হয়। এবং ১৯৭৬ সালের পর চীনা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবও একই কারণে বিপর্যস্ত হয়।

চীন বিপ্লবের আলোকবর্তিকায় ভারতের নিপীড়িত জনগণ, দৃশ্যত আদিবাসী জনগণ ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তুলেছেন। সেখানে ছোট পরিসরে হলেও তারা গড়ে তুলেছেন “জনাতন সরকার” (জনতার সরকার)। যে শিশুটি ত্রিশ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছে সে মাওবাদীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কখনও নারী নিপীড়ন চোখে দেখেনি। এমনকি নারী ধর্ষণ, নির্যাতনের ব্যাপারটাই অপরিচিত তাদের কাছে। যা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের অনিবার্য ব্যধি, যা বন্ধ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব।

সারা পৃথিবীর শ্রমিক, কৃষক ও নিপীড়িত জাতি ও জনগণ, এবং নিপীড়িত নারী সমাজ ও সংখ্যালঘু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিন্ন শত্রু হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, তাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ। যারা পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। তারা নিছক তাদের মুনাফার স্বার্থে পৃথিবী ধ্বংসের ৩য় বিশ্বযুদ্ধের পাঁয়তারা করছে। এমতাবস্থায় শ্রমিকশ্রেণিকে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের থেকে শিক্ষা নিয়ে মুক্তির মতবাদ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদে সজ্জিত ও সংগঠিত হতে হবে এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী তরুণদেরও এ আদর্শে সজ্জিত-সংগঠিত হতে হবে। প্রগতিশীল ছাত্র-তরুণদেরকে নিজেদের শ্রেণিচ্যুত হয়ে শ্রমিক কৃষকের সংগ্রামে একাত্ম হতে হবে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বর্বরতাকে উন্মোচন ও উচ্ছেদ করা ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শ্রমিক-কৃষক ও শ্রমজীবী জনগণের সাথে সামিল হতে হবে। কারণ সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নয়, সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমে বিশ্ব-ব্যবস্থাই তাদের ও বিশ্বের সকল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ। মহান রুশ অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এ সত্যই প্রতিষ্ঠা করেছিল।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, অক্টোবর ’১৭ সংখ্যা