১৭ই নভেম্বরঃ রাজশাহীতে উদযাপন হবে ‘সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ’

17 nov

দুনিয়ার মজদুর এক হও!
মহান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরুন!
সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম এগিয়ে নিন!

১৯১৭ সালে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রুশ শ্রমিক ও গরীব কৃষক এবং সাধারণ সৈনিকরা সীমাহীন ঔদ্ধত্যে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পুঁজিপতি ও জমিদারদের উচ্ছেদ করেছিল রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে, ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল তাদের আধিপত্য-অহঙ্কার ও রাষ্ট্র। কায়েম করেছিল শ্রমিকশ্রেণীর নতুন ধরনের রাষ্ট্র, সোভিয়েত রাষ্ট্র ও নতুন সমাজ- সমাজতন্ত্র। বুর্জোয়া উদারনৈতিকতা, সুবিধাবাদ, সংস্কারবাদ, অর্থনীতিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বিলোপবাদসহ সব ধরনের বিপ্লববিরোধী ধারার বিরুদ্ধে অবিচল সংগ্রাম চালিয়ে এই বিপ্লবকে পথ দেখিয়েছিলেন লেনিন, নেতৃত্ব দিয়েছিল রুশ বলশেভিক পার্টি।
১৭৮৯ সালের ফরাসী বিপ্লবের সময় থেকে পশ্চিমা বুর্জোয়াশ্রেণী নিজেদের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে দাবী করে আসছিল। তাদের সাম্য ছিল বুর্জোয়া রাষ্ট্রের আইনে ধনী-গরীবের সমান অধিকারের ঘোষণা- যা কখনোই হতে পারে না। তাদের মৈত্রী ও স্বাধীনতা ছিল মেহনতীদের বিরুদ্ধে ধনীদের মৈত্রী ও শোষণ-লুণ্ঠনের স্বাধীনতা। ইতিহাসে বুর্জোয়া গণতন্ত্র সর্বদাই ধনীকশ্রেণীর জন্য গণতন্ত্র ও গরীব জনগণের জন্য ধনীর দাসত্ব তথা একনায়কত্ব হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। বিপরীতে রুশ বিপ্লব সেদেশের জনগণকে পুঁজিপতি ও জমিদারদের একনায়কত্ব ও শোষণমূলক সমাজব্যবস্থা থেকে মুক্ত করেছিল।
নতুন সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল পুঁজিপতি-জমিদার ও নতুন-পুরাতন শোষক-নিপীড়কদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব। রুশ শ্রমিকশ্রেণী এজন্য সুদৃঢ় জোট বেঁধেছিল গরীব কৃষকের সঙ্গে এবং মৈত্রী গড়ে তুলেছিল মধ্যকৃষক, মধ্যবিত্ত শ্রেণী, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়সহ সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সঙ্গে। জনগণ, বিশেষভাবে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী জনগণের জন্য তা কায়েম করেছিল এক অভূতপূর্ব স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার। যা তাদের সৃজনশীলতা, উদ্যোগ ও সচেতনতার এমন বিষ্ফোরণ ঘটিয়েছিলÑবুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তা অচিন্তনীয় ও অসম্ভব।
শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণের এই গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ওপর ভর করেই রুশ দেশের কোটি কোটি কৃষক বিপ্লবী অভ্যুত্থানে জেগে উঠেছিল- অবসান ঘটিয়েছিল জমিদার, চার্চ ও অভিজাতদের ভূমি মালিকানার এবং জমি পরিণত হয়েছিল জনগণের সম্পত্তিতে। দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী কলকারখানা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পুঁজিবাদী মালিকানার বিলোপ ঘটিয়ে কায়েম হয়েছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও শ্রমিক কর্তৃত্ব। লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিনের নেতৃত্বে শ্রমিক ও গরীব কৃষকের সচেতন উত্থানের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন হয়েছিল। বিদায় নিয়েছিল অশিক্ষা, নারীরা পেয়েছিল মুক্তি, নিপীড়িত জাতিসমূহ পেয়েছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। আধুনিক শিল্পোন্নত ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সারা পৃথিবীর শোষিত-নিপীড়িত জনগণের আশা-ভরসার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
রুশ বিপ্লবের দিশা ও প্রেরণায় ঘটেছিল চীন বিপ্লব। বিশ্বের এক চতুর্থাংশে জন্ম নিয়েছিল একগুচ্ছ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রাম। ১৯১৭ থেকে ১৯৫০ সাল- সাম্রাজ্যবাদীদের অব্যাহত সামরিক আগ্রাসন, সামরিক-অর্থনৈতিক অবরোধ, অন্তর্ঘাত ও মিথ্যাচার- সবকিছু ব্যর্থ করে দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল পৃথিবীর এই প্রথম সমাজতন্ত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তা পরাজিত করেছিল পশ্চিমা সাহায্য ও প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা নাৎসী জার্মানিকে। এককভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন সম্পন্ন করেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুরনো সমাজের বুর্জোয়া অধিকার, অসাম্য ও পচা-গলা ধ্যানধারণা রাতারাতি বিলুপ্ত হয় না- অব্যাহতভাবে জন্ম দেয় নতুন বুর্জোয়া। ক্ষমতার উচ্চস্তরে সৃষ্ট এই নতুন বুর্জোয়ারা স্ট্যালিনের মৃত্যুর সুযোগে ১৯৫৬ সালে ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে। মাও সে-তুঙ-এর মৃত্যুর পর ১৯৭৬ সালে তেঙ শিয়াও পিং চক্রের নেতৃত্বে চীনেও একই ঘটনা ঘটে। সমাজতন্ত্রকে হটিয়ে এরা কায়েম করে ভুয়া সমাজতন্ত্র তথা পুঁজিবাদ।
আমাদের দেশে বামপন্থী মহলে ক্রুশ্চেভের রাশিয়া ও বর্তমান চীনকে পুঁজিবাদী হিসেবে চিহ্নিত না করে সমাজতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার বিভ্রান্তি অদ্যাবধি বিদ্যমান। ফলে এই বামপন্থীরা কার্যত সমাজতন্ত্রের পক্ষে নয়, পুঁজিবাদের পক্ষেই দাঁড়াচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ বর্তমান সরকার ও শাসকশ্রেণীর লেজুড়বৃত্তিও করছে।
আজ দুনিয়ায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর নেই। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ গোটা বিশ্বকে আবারও গ্রাস করেছে। এরা দুনিয়াকে নতুনভাবে ভাগবাটোয়ারার লড়াইয়ে লিপ্ত। ফলে মানব সমাজ পারমাণবিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদের মুখোমুখি। আজ সারা দুনিয়ার মানুষের পরিশ্রমলব্ধ সম্পদ কেন্দ্রীভূত মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি-সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে। ক্ষুধা-দারিদ্র-অনাহার-দুর্ভিক্ষ-অনিরাপত্তা-অনিশ্চয়তাগ্রাস করেছে বিশ্বকে এবং প্রকৃতি-পরিবেশের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে চরম ধ্বংসাত্মক তৎপরতা। দেশে দেশে এরা উসকে দিচ্ছে উগ্র ধর্মান্ধতা-মৌলবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং আঞ্চলিক বিভেদ ও যুদ্ধ। সদ্য রোহিঙ্গা সমস্যা এরই এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। পুঁজিবাদী শোষণ-লুণ্ঠন ও নৈরাজ্য এভাবে চলতে থাকলে গোটা মানব সমাজের অস্তিত্বই ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের জনগণও সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের অনুগত বুর্জোয়াশ্রেণী এবং তাদের দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও সামরিক স্বৈরতন্ত্রের কয়েক দশকের শাসন-শোষণ লুণ্ঠনে চরম বিপর্যস্ত। তাদের ওপর অব্যাহতভাবে চেপে রয়েছে শাসকশ্রেণীর স্বৈরতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচার। আওয়ামী সরকার উসকে দিচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা ও ফ্যাসিবাদ। জনগণ যে কোনো সময় গুম-খুন কিংবা লোপাট হয়ে যাওয়ার বিপদে রয়েছে।
রুশ বিপ্লব ছিল পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী যুগের অবসান ঘটিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে বিশ্ববিপ্লবের নতুন যুগের দুনিয়াকাঁপানো সূচনা। এই যুগ দেশে দেশে শ্রমিকশ্রেণী ও শোষিত-নিপীড়িত জনগণের রাষ্ট্রক্ষমতা, শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা ও সমাজতন্ত্রকে জয়যুক্ত করার বিপ্লবী যুগ। একমাত্র এর মধ্য দিয়েই পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের করাল গ্রাস, শোষণ-নিপীড়ন, শ্রেণীবৈষম্য ও ব্যক্তি স্বার্থের পচা-গলা ধ্যানধারণা থেকে মানববিশ্ব মুক্ত হতে পারে। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন ও মাও সেতুঙ-এর বিপ্লবী শিক্ষা এটাই। আসুন, আমরা নতুন যুগের বিপ্লবী পথে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করি।



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.