লেনিনবাদের শিক্ষাঃ বিপ্লব করার জন্য প্রয়োজন কমিউনিস্ট পার্টি

lenin

শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির মতবাদ মার্কসবাদের সৃষ্টি ও বিকাশের সাথে সাথেই তার ভিত্তিতে বিপ্লব করা জন্য মার্কস-এঙ্গেলসের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয়। কার্ল মার্কস প্রথমে “জার্মান শ্রমিক সমিতি” গঠন করেন এবং পরবর্তীতে ১৮৪৮ সালে “কমিউনিস্ট লীগ” নামে একটা গোপন প্রচার সমিতিতে যোগদান করেন। এই সংগঠনের দ্বিতীয় কংগ্রেস থেকেই মার্কস-এঙ্গেলসকে সুবিখ্যাত “কমিউনিস্ট ইশতেহার” লেখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

          কিছু পরে “কমিউনিস্ট লীগ” বিলুপ্ত হয়। মার্কস-এঙ্গেলস পরে গড়ে তোলেন “দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক” নামের কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সংগঠন। তবে প্রথমে মার্কস ও পরে এঙ্গেলসের মৃত্যুর কিছু পর থেকে এই আন্তর্জাতিক তার বিপ্লবী সত্ত্বা হারিয়ে ফেলতে থাকে।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতা বার্নেস্টাইন-কাউটস্কির নেতৃত্ব মার্কসবাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ান বলশেভিক পার্টি এই কুখ্যাত সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে জীবন-মরণ সংগ্রাম করে মার্কসবাদকে রক্ষা ও বিকশিত করেন।

শুধু মার্কসবাদী মতবাদ রক্ষাই নয়, তার ভিত্তিতে একটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করতে হলে শ্রমিক শ্রেণির কী ধরনের পার্টি গঠন করতে হবে লেনিন তার নীতিমালাগুলো গড়ে তুলতে থাকেন। তিনি অর্থনীতিবাদীদের বিরুদ্ধে “কী করিতে হইবে” শীর্ষক পুস্তকের মাধ্যমে তীব্র মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা করেন। লেনিনই সর্বপ্রথম সর্বহারা শ্রেণির প্রধান সংগঠন হিসেবে পার্টির ভূমিকা ও নীতি-পদ্ধতি তুলে ধরেন তার বিখ্যাত “এক পা আগে, দু’পা পিছে” শীর্ষক আরেকটি পুস্তকে।

তিনি স্পষ্ট করেন সাধারণ শ্রমিকশ্রেণি থেকে পার্টির পার্থক্য হলো এই যে, পার্টি হলো শ্রমিক শ্রেণির মধ্যকার অগ্রগামীদের বাহিনী। আরও নির্দিষ্টভাবে বলা যায়, শ্রেণি চেতনায় সজ্জিত মার্কসবাদী বাহিনী। অনেকে কুযুক্তি দেয়- শ্রমিকশ্রেণি যাহা পার্টিও তাহা। এই  ধারণা ভুল। কেউ শ্রমিক হলে এবং ধর্মঘটে যোগ দিলেই সে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হতে পারবে তা সঠিক নয়। এমন হলে সাধারণ শ্রমিক ও পার্টি সদস্য শ্রমিকের মধ্যকার পার্থক্য গুলিয়ে যাবে। সুতরাং পার্টি হলো শ্রমিক শ্রেণির অগ্রসর অংশ। যারা মার্কসবাদী বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনায় সজ্জিত।

পার্টি গঠন  ও কাঠামো সম্পর্কে লেনিনের মত ছিল- দৃঢ় সুশৃংখল, পেশাদার বিপ্লবী, গোপনে পার্টি কার্যক্রম চালাতে সক্ষম এমন কর্মী- যারা পার্টির কাজ ছাড়া অন্য কিছু করে না। পার্টির সদস্য সে-ই হতে পারবে যে ব্যক্তি পার্টির কোন না কোন সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকবে, পার্টিকে চাঁদা দিবে। পার্টির কোন সংগঠনের সাথে যুক্ত নয় এমন স্বতন্ত্র ব্যক্তিদের সদস্য করা যাবে না।

তিনি  আরও বলেন, “পার্টিকে হতে হবে শ্রমিক শ্রেণির অগ্রগামী বাহিনী, সর্বহারা শ্রেণি সংগ্রামের সমন্বয় সাধনে ও পরিচালনায় ব্রতী……পুঁজিতন্ত্রের উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করাই হলো পার্টির চরম লক্ষ্য”।

একটি সঠিক বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার জন্য লেনিন প্রথমে রাশিয়ায় “শ্রমিক মুক্তি সংঘ”, পরে “রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক  লেবার পার্টি” গঠন করেন। পরবর্তীতে লেনিন তার লিখিত বিখ্যাত “এপ্রিল থিসিস” দলিলে সুনির্দিষ্টভাবে সোশ্যাল ডেমোক্রাট নাম পরিবর্তন করে কমিউনিস্ট পার্টি রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। পার্টির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কমিউনিস্ট  পার্টি অব রাশিয়া (বলশেভিক)। সেই থেকে সোশ্যাল ডেমাক্র্যাটদের থেকে কমিউনিস্টদের সুস্পষ্ট বিভাজন হয়ে যায়।

১৯১৬ সালে অনুষ্ঠিত রাশিয়ান পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেসে পার্টির প্রতি সদস্য, প্রতি ইউনিট এবং প্রতি সংস্থার জন্য অবশ্যই পালনীয় গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার সাংগঠনিক নীতিমালা গৃহীত হয়। যে নীতিমালা ছাড়া মতপার্থক্যসহ পার্টি পরিচালনা অসম্ভব। এটাই হলো লেনিনবাদী পার্টি-নীতি।

মার্কস-লেনিনের সুযোগ্য  উত্তরসুরী চেয়ারম্যান মাওসেতুঙ পার্টি প্রশ্নে আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন “যদি বিপ্লব করতে হয় তাহলে অবশ্যই একটা বিপ্লবী পার্টি থাকতে হবে। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বে এবং বিপ্লবী রীতিতে গড়ে উঠা বিপ্লবী পার্টি ছাড়া শ্রমিকশ্রেণি ও ব্যাপক জনসাধারণকে সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহী কুকুরদের পরাজিত করতে নেতৃত্বদান করা অসম্ভব।”

 মার্কস-লেনিন-মাওসেতুঙ আমাদের শিক্ষা দেন- একটি দেশে বিপ্লব করতে হলে সর্বহারা শ্রেণির মতবাদ এবং তার ভিত্তিতে গড়ে তোলা একটি কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়োজন। অথচ আমাদের দেশে সমাজতন্ত্রের দাবীদার বাসদ, গণসংহতি, মুক্তি কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সংশোধনবাদী সংগঠন পার্টি গড়ে তোলার কাজকে শিকেয় তুলে রেখে শুধুমাত্র ফ্রন্টের কাজ করছে। এরা কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াই ফ্রন্ট দিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েমের দিবা স্বপ্ন দেখছে। যা পৃথিবীর কোথাও কখনই হয়নি- হবেও না। আর সিপিবি মুখে কমিউনিস্ট পার্টির নাম বললেও খোদ পার্টিকেই বানিয়ে ফেলেছে বিপ্লব-বিহীন- যারা বিপ্লবকে শিকেয় তুলে বুর্জোয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কারবাদে নিমজ্জিত হয়ে রয়েছে।

সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ছাড়াও আমাদের দেশে অনেক বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, এমনকি মাওপন্থী দাবীদার বুদ্ধিজীবীও আছেন যারা সমাজতন্ত্রের সপক্ষে দাঁড়াতে চান। কিন্তু মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নীতি আদর্শের ভিত্তিতে পার্টি গড়ার কাজকে কার্যত বিরোধিতা করেন, নানাভাবে আক্রমণ করেন। যেমন এক চিমটে লবণ, এক মুঠ চিনি, আর এক গ্লাস পানি দিয়ে স্যালাইন বানানো হয়। তেমনি এরা একটু সমাজতন্ত্রের সমর্থন, একটু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, আর একটু সাম্প্রদায়িক বিরোধিতা দিয়েই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। এদের অনেকের আন্তরিকতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলা যায় মালেমা’র সঠিক তত্ত্ব এবং তার অনুশীলন ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টি হবে না, সমাজতন্ত্র-তো আরও দুরের কথা। এই ধরনের ভুয়া সমাজতন্ত্রীরাই আজকের সরকারি বাম মেনন-ইনু বা অতীতের কাজী জাফর-সিরাজুল আলম খান হয়েছে।

এই সব বুদ্ধিজীবীরা কমিউনিস্ট পার্টির শৃংখলাকে দাসত্ব মনে করে। নিজেদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে জায়েজ করার জন্য সত্যিকার পার্টি প্রক্রিয়াকে নানাভাবে বিরোধিতা করে। প্রায় ১০০ বছর পূর্বে এ জাতীয় মেনশেভিকদের বিরুদ্ধে লেনিনের বলশেভিক পার্টি সংগ্রাম করেই রাশিয়ায় বিপ্লব সংগঠিত করেছিল।

এদের সম্পর্কে লেনিন  লিখেছেন “ব্যক্তি স্বাতন্ত্রে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবী মনে করে……সর্বপ্রকার সর্বহারা সংগঠন ও শৃংখলা দাসত্বেরই নামান্তর।” তিনি আরও বলেছেন, “…..সর্বহারা শ্রেণির মুক্তি সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে পার্টি সংগঠনের গুরুত্বকে ছোট করিয়া দেখা হইলো মেনশেভিকদের অন্যতম চরম পাপ।”

এখন এই ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট-ফেসবুক-ইউটিউব প্রভৃতি মাধ্যমে সমাজতন্ত্র-মাওবাদের সপক্ষে অনেক সাইবার সমাজতন্ত্রী বা সাইবার কমিউনিস্টও দেখা যায়। এরা দুই কলম লিখে নিজেদের বিপ্লবী ভাবতে থাকে, কিন্তু পার্টি গঠনের কাজ থেকে সতর্কভাবে দূরে থাকে। শ্রমিক-কৃষকের ধারে কাছেও যায় না। বরং অনুশীলনে নিয়োজিত সাচ্চা কমিউনিস্টদের এই বলে সমালোচনা করে- পার্টি প্রযুক্তি বোঝে না, প্রযুক্তি ছাড়া বিপ্লব হবে না- ইত্যাদি। এরা বোঝে না, যেখানে পার্টি ছাড়া বিপ্লবই সম্ভব নয়, সেখানে পার্টিবিহীন প্রযুক্তি দিয়ে কি হবে?

এই সাইবার কমিউনিস্টরা পুরনো আইনী মার্কসবাদীদের মত রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণির কাছে সহনীয়, ভাসাভাসা, খন্ডিত, বিমূর্ত বক্তব্য দিয়ে সমাজ পরিবর্তন করতে চায়। বাস্তবে সমাজ পরিবর্তনের মৌলিক কর্মসূচি ছাড়া কিছু সংস্কারবাদী সুন্দর আকাংখা দিয়ে বিপ্লব করা যায় না। রাশিয়ায় লেনিনকে এ জাতীয় আইনী মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করতে হয়েছে।

তাই রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকীতে লেনিনবাদের শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরতে হবে। মতবাদ, পার্টি ও বিপ্লবী অনুশীলন ছাড়া যারা বিপ্লব করতে চায় তাদের বিরুদ্ধেও তত্ত্বগত-আদর্শগত সংগ্রাম জোরদার করতে হবে। আর বিপ্লব করার জন্য বিভিন্ন আকৃতির সংশোধনবাদ-সংস্কারবাদ-সুবিধাবাদকে পরাজিত করেই কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রশ্নটিকে জোরদার করতে হবে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, অক্টোবর ’১৭ সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.