সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ায় নারী মুক্তি

b97467ea337b6a637bcb0fbc5800f8a4--army-women-for-women

শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশের প্রক্রিয়ায় মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অবসান হয় এবং পুরুষ শাসিত সমাজব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন থেকে নারীদের একদিকে করা হয় শ্রমদাসী, অন্যদিকে যৌনদাসী। নারীর উপর চলে পুরুষতন্ত্রের বর্ধিত শোষণ। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের যুগে সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে নারীদের একটা অংশ অফিস-আদালতে, স্কুল-কলেজে এবং কলে-কারখানায় সামাজিক উৎপাদন বা অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করলেও শ্রেণি-নিপীড়ন ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণ-নিপীড়ন থেকে নারী মুক্ত হতে পারেনি। বাহ্যিকভাবে নারী-কল্যাণমূলক কিছু কিছু সংস্থার আবির্ভাব ঘটেছে। সেখানে ব্যাপক শ্রমিক-কৃষক, শ্রমজীবী নারীরা হন উপেক্ষিত। এছাড়া নারীদের ‘কল্যাণে’ বহু আইন করা হলেও তা থেকে যায় কাগজে-কলমে। এই আইনী সেবা পেতে গেলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালতে হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্তাদের খুশি করতে, যা শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী নারীদের পক্ষে সম্ভব নয়।

 ১৯১৭ সালে লেনিন-স্ট্যালিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় মহান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণে সেখানকার নারীরা রান্নাঘর ও আঁতুরঘর থেকে এবং শ্রেণি ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেয়েছিল। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ নারীদের জন্য যা ২০০ বছরেও করতে পারেনি, সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ও চীন মাত্র ২৫-৩০ বছরে তা করেছিল।

 সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ায় নারী মুক্তির কিছু চিত্র সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। সোভিয়েত রাশিয়ায় সংবিধান তৈরী করার সময় তারা ঠিক করেছিল- সমস্ত রকমের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় এবং অন্যান্য সর্বজনীন ক্ষেত্রে সোভিয়েত রাশিয়ার মেয়েরা পুরুষের সাথে সমানাধিকার পাবে। তার বাস্তব ভিত্তি পেয়েছিল- মেয়েদের পুরুষদের সাথে সমান কাজ করার অধিকার, সমান বেতন পাওয়ার, বিশ্রাম পাওয়ার ও অবসর বিনোদনের অধিকার, সামাজিক বীমা এবং শিক্ষা, মা ও শিশু স্বার্থকে রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্বারা রক্ষা করা, বড় পরিবারের মা আর অবিবাহিত মা-কে রাষ্ট্রীয় অর্থ সাহায্য, পুরো বেতনে মাতৃত্বের ছুটির ব্যবস্থা ছিল। ব্যাপকভাবে মাতৃসদন, শিশুসদন ও খেলাঘর-এর জাল বিস্তার করা। তারা এগুলো শুধু আইনেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। বাস্তবে পরিণত করেছিল। গ্রামে বা শহরে যেখানেই হোক না কেন, কোন মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হলে (সে মেয়ের বিয়ে হোক বা না-ই হোক) রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিনা পয়সায় নিম্নোক্ত সুযোগ-সুবিধা পাবেঃ ১) অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় চিকিৎসামূলক যত্ন ও তদারক; ২) প্রসবের জন্যে প্রসব হাসপাতালে জায়গা; ৩) পুরো বেতনে ১২ থেকে ১৬ সপ্তাহের ছুটি; ৪) সবসময়ে চিকিৎসামূলক সাহায্য ও তদারক; ৫) স্বাস্থ্যের দিক থেকে যখনই সে সম্পূর্ণভাবে কাজের উপযুক্ত তখনই তার নিজের চাকরিতে যোগ দিতে পারার অধিকার; ৬) কাজে যোগ দেওয়ার পর নবজাতককে স্তন্যদানের জন্যে নির্দিষ্ট সময় অন্তর আধ ঘণ্টা করে ছুটি; ৭) নবজাতকের জামাকাপড় কিনবার জন্যে নগদ টাকা; ৮) সন্তান জন্মাবার পর থেকে এক বছর ধরে তার খাদ্য বাবদ মাসে মাসে নগদ টাকা; ৯) মা যতক্ষণ কাজ করবে ততক্ষণ শিশুকে সামলাবার জন্য খেলাঘরের সুযোগ। দু’মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা এই সব খেলাঘরে মানুষ হবে।

আইনত প্রত্যেক ভাবী মা-ই এইসব সুযোগ সুবিধা পেতেন। শুধু তাই নয়, প্রসব হাসপাতালে একটি করে আইন বিভাগ, সেই বিভাগে অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ হাজিরা দিতেন অন্তঃসত্ত্বা কোনও নারী যাতে আইনত কোনও রকম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন সেই দৃষ্টি রাখাই ছিল এই বিভাগের একমাত্র কর্তব্য। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ায় নারীদের এই বিভাগের পরামর্শ নগদ অর্থে কিনতে হয়নি। 

শহরে প্রাক্প্রসব ক্লিনিক-এ জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্বন্ধে সমস্ত মেয়েদের পরামর্শ দেয়া হতো এবং প্রত্যেক ভাবী-মাকে ১টা করে কার্ড দেয়া হতো এবং তাদের নিম্নোক্ত সুবিধা দেয়া হতো- ১) ট্রামে সবার  আগে উঠার এবং প্রথমে বসতে  পাওয়ার অধিকার, ২) দোকান-হাটে কিছু কিনতে গেলে  প্রতীক্ষিয়মানদের সবাইকে পেরিয়ে সবার আগে জিনিপত্র কিনতে পাওয়ার অধিকার, ৩) বাড়তি রেশন, ৪) যেখানে সে কাজ করে সেখানে শুধু হালকা ধরনের কাজ করতে পাওয়ার অধিকার- ইত্যাদি।

 সোভিয়েত রাশিয়ায় নারীদের মধ্যে সামাজিক শ্রমের মর্যাদা ফিরিয়ে আনবার সচেতন বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা করা হয়। ঘর-সংসারের কাজ আর সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় উৎপাদনের কাজ- এ দুই-য়ের মাঝে তফাতটা মুছে দিয়ে নারীদের মাঝে শ্রমের মর্যাদা ফিরিয়ে এনেছিল। পৃথিবীতে এর আগে আর কোন দেশে (পরে মাও-এর চীন সেটা করেছিল) আর কোন যুগে নারীদের মুক্তির  জন্য এমনতর পরিকল্পনা আর কখনো দেখা যায়নি। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত গড়ার শুরু থেকেই এই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে নারীদের সামাজিক শ্রমের মর্যাদায় কাজে ফিরিয়ে আনার ফলাফল কী রকম ছিল তার হিসাব ছিল এরকম-  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়ে সোভিয়েত রাশিয়ায় ১,১০,০০,০০০ নারী কলকারখানা, চলাচল ব্যবস্থা আর নির্মাণ কাজে যোগ দিয়েছিল; তাদের মধ্যে ১,৭০,০০০ হ’ল ইঞ্জিনিয়ার আর টেকনিশিয়ান। চার হাজার নারী সোভিয়েত ইউনিয়নে ইঞ্জিন চালাবার কাজে নিযুক্ত ছিল।

রুশ বিপ্লবের চল্লিশ বছর আগে সে দেশের গ্রামের মেয়েদের অবস্থা সম্পর্কে স্ট্যালিন যে বর্ণনা দিয়েছিলেন তা হলো- বিয়ের আগে পর্যন্ত মেয়েকে সবচেয়ে অধম চাকরানি মনে করা হতো। বাপের সংসারে সে গতর খাটাত, উদয়াস্ত গতর খাটাত, তবু বাপ তাকে ধমকে বলতো ‘মনে রাখিস তুই আমার অন্ন ধ্বংস করিস!’ বিয়ের পর স্বামীর সংসারে সে গতর খাটাত, স্বামীর যেমন মর্জি তেমনিভাবেই। তবু স্বামী তাকে ধমক দিয়ে বলত, ‘মনে রাখিস তুই আমার অন্ন ধ্বংস করিস।’ বিপ্লবের আগে রুশ যেসব মেয়েরা কারখানায় কাজ করতো তাদের অবস্থাও ছিল একইরকম। জার আমলে ১০৭ ধারায় আইন ছিলঃ স্বামী পরিবারের প্রধান কর্তা, স্ত্রীর কর্তব্য হ’ল স্বামীর অনুগত হওয়া। তখনকার দিনে রুশ দেশে স্বামীর পক্ষে স্ত্রীকে মারধোর করাটা নেহাতই সহজ আর স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। স্ত্রীর সতীত্বে কোনও রকম সন্দেহ জাগলে স্বামীরা স্ত্রীদের সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে গরুর গাড়িতে বেঁধে চাবকাতে চাবকাতে গ্রাম ঘুরিয়ে আনত।

অথচ বিপ্লবের পর সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার কাজে এই নারীরাই এগিয়ে এসেছে পুরুষের পাশাপাশি, সমান সমান হয়ে। এই দেশেই ১৯৩৫ সালে, বিপ্লবের মাত্র ১৮ বছর পরে, দেশের যত শিক্ষক আর যত ডাক্তার আছে তার মধ্যে তিনভাগের দু’ভাগই ছিল নারীরা। এমনকি সৈন্য ও নৌবাহিনীতেও যোগ দিয়েছিল মেয়েরা। আজকে বাংলাদেশের নারীরা পুলিশ, সেনাবাহিনী বা অন্যান্য পেশায় যোগ দিলেও পুরুষতান্ত্রিক নির্যাতন তাদের পিছু ছাড়ছে না। প্রতিদিন খবরের কাগজে আসছে ঊর্ধ্বতন অফিসার, সহকর্মী বা অন্যদের দ্বারা তারা ধর্ষিতা-নির্যাতিতা হচ্ছেন, যা সোভিয়েত দেশে ছিল কল্পনার অতীত।

মোট কথা হলো- রুশ বিপ্লব পূর্বের রাশিয়া এবং সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়া ছিল যেন দুটো পৃথক পৃথিবী। তাই পৃথিবীর দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। পূর্ব ইউরোপের রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, চেকোশ্লভাকিয়া এবং এশিয়ায় চীন, ভিয়েতনামের মানুষ বেছে নিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার আদর্শ ও পথ। সে সব দেশে সমাজতান্ত্রিক বা তার লক্ষানুসারী ব্যবস্থা কায়েম হলেও বর্তমানে সোভিয়েত রাশিয়াসহ কোন দেশেই এখন আর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে নেই। বিশ্বাসঘাতক ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ এবং তেং-হুয়া চক্রসহ তাবদ দেশের সংশোধনবাদীরা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। যার পরিণতিতে নারীরা হারিয়েছে তাদের স্বাধীনতা, তারা পুনরায় শ্রমিক ও নারী হিসেবে পুঁজিবাদের শ্রম ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণ-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। তা সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া নিপীড়িত নারীদের মুক্তির দিশা ও অনুপ্রেরণা হয়ে আজও আলো ছড়াচ্ছে।

উদ্ধৃতি

“শ্রমিক শাসিত সরকার, কমিউনিস্ট পার্টি ও সংঘগুলি নরনারীর সেকেলে ধারণাগুলি দূর করবার জন্য, অসাম্যবাদী মনস্তত্ত্বকে বিনাশ করার জন্য কোনও রকম কসুর করছে না। আইনের দিক থেকে অবশ্যই পুরুষ এবং নারীর মধ্যে সম্পূর্ণ সাম্য রয়েছে। এই সাম্যকে বাস্তবে পরিণত করবার জন্য… … … আমরা মেয়েদের নিয়ে আসছি অর্থনীতি, আইনসভা ও সরকারের মধ্যে। যাতে তারা কাজকর্মের শক্তি আর সামাজিক শক্তি বাড়াতে পারে সেই জন্যেই সমস্ত শিক্ষায়তনে প্রবেশের পথ তাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। আমরা প্রতিষ্ঠা করছি যৌথ রান্নাঘর, সাধারণের খাবারঘর, শিশুদের রাখবার জায়গা, শিশুদের খেলাঘর, ছেলে-মেয়েদের বাড়ি- সব রকম শিক্ষালয়। এক কথায়, স্বতন্ত্র সংসারের অর্থনৈতিক ও শিক্ষামূলক কাজকে সামাজিক কাজে পরিণত করবার চেষ্টায় আমরা সত্যিই উঠেপড়ে লেগেছি। তার দরুন নারীরা মুক্তি পাবে বহু দিনকার পুরনো ঘর-সংসারের একঘেঁয়ে কাজ থেকে এবং পুরুষের আধিপত্য থেকে। ফলে নারীরা নিজেদের প্রতিভা এবং রুচিকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগাতে পারবে……।”

“শ্রমজীবী নারী আন্দোলনের প্রধান কাজ হলো নারীদের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার জন্য সংগ্রাম করা, এবং তা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সমতা নয়। মূল বিষয়টা হলো নারীদের জন্য সামাজিক উৎপাদন শ্রমে অংশ নেয়া, “গৃহস্থালী দাসত্ব” থেকে তাদেরকে মুক্ত করা, রান্নাঘর আর শিশুপালনের আদিঅন্তহীন ক্লান্তিকর খাটুনির নিকট তাদের অসাড়কারী ও অবমাননাকর অধীনতা থেকে তাদেরকে মুক্ত করা।

এই সংগ্রাম হবে এক দীর্ঘ সংগ্রাম, এবং এটা সামাজিক প্রযুক্তি ও নৈতিকতা উভয়ের মৌলিক পুনর্গঠনের দাবি করে। কিন্তু এটা কমিউনিজমের পরিপূর্ণ বিজয়ে সমাপ্ত হবে।”

– লেনিন, ৪ মার্চ ১৯২০, “আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস সম্পর্কে”, সংগৃহীত রচনাবলী, খ- ৩০।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, অক্টোবর ’১৭ সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.