সমাজতান্ত্রিক সমাজের বিপর্যয়ের কারণ

1612251300-The-Fall-Of-The-Soviet-Union

সমাজতান্ত্রিক সমাজ বলতে কমরেড লেনিন-স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং কমরেড মাওয়ের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক চীনকেই বোঝানো হয়ে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনেই কেবলমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং তা কমিউনিজমের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণিকে পথ নির্দেশ করেছিল। অন্য কিছু দেশ, যেমন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, উত্তর কোরিয়া, কিউবা, পূর্ব ইউরোপীয় কয়েকটি দেশে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হলেও সেসব দেশ সমাজতন্ত্রের পথে সঠিকভাবে এগোতে পারেনি। হয় তারা সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্ততায় চলে গেছে, নতুবা বিভিন্ন ধরনের জাতীয়তাবাদী ও সংশোধনবাদী তত্ত্বগত অনুশীলনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাই সমাজতন্ত্রের দৃষ্টান্ত হিসেবে উপরোক্ত দুটো সময়ের রাষ্ট্রকেই বোঝানো হয়। যদিও সেগুলোও যথাক্রমে স্ট্যালিন ও মাও-য়ের মৃত্যুর পর পুঁজিবাদে অধঃপতিত হয় এবং এভাবে সমাজতন্ত্র সাময়িকভাবে হলেও পরাজিত হয়।

          কিন্তু প্রশ্ন হলো এ দুটো সমাজতন্ত্রের আদর্শস্থানীয় দেশ হলেও কেন সেখানে সমাজতন্ত্র টিকতে পারলো না? অন্যকথায় সমাজতন্ত্রের এই বিপর্যয়ের কারণ কী?

১৯৩৬ সালে কমরেড স্ট্যালিন বলেছিলেন, রাশিয়ার সমাজতন্ত্র পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। এখন আর ব্যক্তি মালিকানা নেই। বৈরী শ্রেণি নেই। কাজেই বৈরী শ্রেণিসংগ্রামও নেই। তিনি সমাজতন্ত্রের মূল শত্রু হিসেবে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করেন।

কিন্তু আমরা দেখেছি যে, সমাজতন্ত্রের অভ্যন্তর থেকেই আসল শত্রু সৃষ্টি হয়েছে। যদিও তাতে বাইরের সাম্রাজ্যবাদীদের বিরাট মদদ ছিল, এবং সাম্রাজ্যবাদের বাস্তবতা সমাজতন্ত্রের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল, তথাপি এটা বলা সঙ্গত যে, অভ্যন্তরীণ শ্রেণি সংগ্রামের বাস্তবতাকে স্ট্যালিনের ঐ লাইন কার্যত বাতিল করে দিয়েছিল।

মাও রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর এই সারসংকলন করেন।

মাও দেখান যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজেও বৈরী শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রাম থাকে এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজেও শ্রেণি সংগ্রামই হলো চাবিকাঠি। তিনি  লেনিন বর্ণিত সর্বহারা একনায়কত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। লেনিন বলেছিলেন “বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিরোধ, নিজের পতনের কারণে (একটি মাত্র দেশে পতন ঘটলেও) দশ গুণ তর হয়ে উঠে। তার প্রবলতা শুধু আন্তর্জাতিক পুঁজির শক্তিতে নয়, শুধু তার বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃঢ়তায় ও শক্তিতে নয়, উপরন্তু অভ্যাসগত শক্তিতে ও ক্ষুদে উৎপাদনের শক্তিতেও বটে। কারণ দুঃখের বিষয় এই যে, দুনিয়ায় এখনো অনেক অনেক বেশি ক্ষুদে উৎপাদন রয়েছে, আর ক্ষুদে উৎপাদন সর্বদাই, প্রতিদিন প্রতিঘণ্টায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও বিপুল পরিমাণে  পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া শ্রেণিকে জন্ম দিচ্ছে। এই সব কিছু কারণে, সর্বহারাশ্রেণির একনায়কত্ব  হচ্ছে অপরিহার্য।” (লেনিন রচনাবলী. চীনা সংস্করণ, খ- ৩১, পৃঃ ৬)

মাও আন্তর্জাতিক সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রামের সাথে নিজ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবেরও সারসংকলন করেন। ১৯৫৭ সালে জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সঠিক মীমাংসা সম্পর্কে দলিলে মূর্ত বিশ্লেষণ দ্বারা দেখান, মালিকানা ব্যবস্থার সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের মাধ্যমে কৃষি সমবায়ের অর্জন হলেও শ্রেণিসমূহ, শ্রেণিদ্বন্দ্বসমূহ এবং শ্রেণি সংগ্রাম রয়েছে। উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদিকা শক্তির মধ্যে, আর উপরিকাঠামো ও অর্থনৈতিক ভিত্তির মধ্যে সঙ্গতি ও দ্বন্দ্ব তখনো রয়ে গেছে। তিনি মালিকানা ব্যবস্থা পরিবর্তনের পর সর্বহারা একনায়কত্বের করণীয় ও কর্মনীতিসমূহ নিরূপণ করেন এবং সর্বহারা একনায়কত্বের অধীনে বিপ্লব অব্যাহত রাখার ও পার্টির মৌলিক লাইনের তত্ত্বগত ভিত্তি স্থাপন করেন। তার ভিত্তিতে দীর্ঘ সময়ব্যাপী লিউ শাওচী, লিন-পিয়াও এবং তেং-শিয়াও পিং ও তাদের অনুসারীদের অনুসৃত সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তীব্র মতাদর্শগত-রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করেন, যা মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব নামে পরিচিত। ১৯৬৯ সালে নবম কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে মাও বলেছিলেন “স্পষ্টতঃই প্রতীয়মান যে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ব্যতীত আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না, কারণ আমাদের ভিত্তি মজবুত ছিল না। আমার পর্যবেক্ষণ থেকে, আমি ভীত যে কারখানাসমূহের একটা ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতেই- আমি মনে করছিনা সকল কিংবা নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ- প্রকৃত মার্কসবাদীদের এবং শ্রমিক জনগণের হাতে নেতৃত্ব ছিলনা। তার মানে এই নয় যে কারখানাসমূহের নেতৃত্বে কোন ভাল মানুষ ছিল না। সেখানে তা ছিল। পার্টির কমিটিসমূহের সম্পাদক, উপসম্পাদক ও সদস্যদের মধ্যে এবং পার্টির শাখা সম্পাদকের মধ্যে ভাল মানুষ ছিল। কিন্তু তারা লিউ শাও-চি’র শুধুমাত্র বৈষয়িক প্রণোদনাকে অবলম্বন করা, মুনাফাকে কমান্ডে রাখা, আর সর্বহারা রাজনীতিকে উৎসাহের পরিবর্তে বোনাসের মুষ্টিভিক্ষা ও এ জাতীয় বিষয়কে উৎসাহ দেবার লাইনকে অনুসরণ করছিলেন।” “কিন্তু কারখানাসমূহে প্রকৃতই মন্দ লোক বিদ্যমান।” “এটাই দেখাচ্ছে যে বিপ্লব এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে।”

মাও আরো বলেছিলেন, “আমাদের দেশ বর্তমানে একটা পণ্য ব্যবস্থা অনুশীলন করছে, মজুরি ব্যবস্থাও অসম, যেমন আট গ্রেড মজুরি স্কেল ও এ রকম আরো কিছু। সর্বহারা একনায়কত্বের অধীনে এ জাতীয় বিষয়গুলোকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই, লিন পিয়াওয়ের মতো লোকেরা ক্ষমতায় আসলে তাদের পক্ষে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তৈরী করা খুবই সহজ হবে।” এই সব বক্তব্যের মধ্যদিয়ে মাও সমাজতন্ত্র থেকে কমিউনিজমে পৌঁছার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন শ্রেণি সংগ্রাম, সর্বহারা একনায়কত্বের কথা বলেছেন। এবং কয়েক দশক অন্তর অন্তর সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরিচালনার পথনির্দেশ করেছেন।

এ থেকেই বোঝা যায় যে, চীনের সমাজতন্ত্র বিপদমুক্ত ছিল না। যদিও মাও মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের পুনরুত্থানকে দশ বছর ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু নিরন্তর এক কঠিন বিপ্লব চলাকালীন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। চীনা পার্টি তখনও যথেষ্টভাবে পুনর্গঠিত হয়নি। নতুন লাইনে নেতৃত্ব সংকটও ছিল এক বিরাট সমস্যা।

এসবই চীনের সমাজতন্ত্রকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে না পারায় পর্যবসিত হয়।

চীনে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটলেও পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ঠেকানোর জন্য মাওয়ের সাংস্কতিক বিপ্লবের লাইনই যে সমাধান তাতে কোন সন্দেহ নেই। রাশিয়া ও চীনে ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদ হয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলেও বুর্জোয়া উপাদান তখনও থেকেই গিয়েছিল। তখনো মার্কস বর্ণিত চার সকলের বিলোপ সাধন সম্পূর্ণ হয়নি। অর্থাৎ, ১) সাধারণভাবে সকল শ্রেণি পার্থক্য বিলোপ; ২) যে উৎপাদন সম্পর্ক সমূহের উপর এগুলো দাঁড়িয়ে তার সকলগুলোর বিলোপ; ৩) এই উৎপাদন সম্পর্কসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সকল সামাজিক সম্পর্কের বিলোপ; এবং ৪) এই সামাজিক সম্পর্কসমূহ থেকে জন্ম নেওয়া সকল ধারণাসমূহের বিপ্লবীকরণ সম্পূর্ণতা পায়নি। বিপ্লব চলমান ছিল। এ অবস্থায় মাও-এর মৃত্যুর পর পরই সংকটের সুযোগে পুঁজিবাদের পথগামী তেং শিয়াও পিং চক্র ক্যু-দেতার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মাও-এর প্রকৃত অনুসারীদের কু-চক্রী হিসেবে চিত্রিত করে। মাওকে রক্ষার নামে সারাদেশে প্রকৃত মাও অনুসারীদের উপর রাষ্ট্রীয় দমন চালিয়ে তাদের বিধস্ত করে। সর্বহারা একনায়কত্ব বর্জন করে পুঁজিবাদ পুনপ্রতিষ্ঠিত করে।

সমাজতান্ত্রিক সমাজের চূড়ান্ত গন্তব্য হল কমিউনিজম। কমিউনিজম হল শোষণ, বৈষম্য ও শ্রেণিহীন সুসভ্য মানব সমাজের এক বিজ্ঞানসম্মত বিশ্বব্যবস্থা। কিন্তু এই বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্তর্বর্তীকালে সমাজতন্ত্র হচ্ছে একটি উৎক্রমণকালীণ স্তর যা পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের পথগামী সংশোধনবাদীদের সাথে নিরন্তর সংগ্রাম এবং জয়-পরাজয়ের মধ্যদিয়ে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত কমিউনিজমে পৌঁছাবে।

এই অন্তর্বর্তীস্তরে মাও-প্রদর্শিত ও অনুশীলিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। নিশ্চয়ই এই বিপ্লবেই সব শিক্ষা সম্পন্ন হয়ে গেছে তা নয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাও-শিক্ষাকে আরো এগিয়ে নিতে হবে- প্রথম সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সারসংকলন করে এবং আরো নব নব সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ ধরে এগিয়ে চলে। যার মধ্য দিয়ে আগামীতে আরো উচ্চতর সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। এবং সমাজতন্ত্রের বিজয়কে স্থায়ী করা যাবে। সেটা সফলভাবে এগিয়ে যাবে বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের কাংখিত বন্দরে। 

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, অক্টোবর ’১৭ সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.