পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বরখাস্ত হওয়া ‘জামপান্না’ বিশ্বাসঘাতক –সিপিআই(মাওবাদী)

Maoist-Jampanna

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পার্টির সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য, সিনিয়র নেতা জিনুগু নরসিমহ রেড্ডী ওরফে জামপান্না একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তেলেঙ্গানা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, এককথায় ‘শত্রু’র কাছে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার মিডিয়াতে দেয়া এক বিবৃতিতে মাওবাদী পার্টি, “পার্টি লাইনের সাথে মতাদর্শগত পার্থক্য” মত বিষয়কে আশ্রয় করে নিজের দুর্বলতাগুলি ঢাকার চেষ্টা করার অভিযোগে জামপান্নাকে অভিযুক্ত করেছে। বিবৃতিতে এটিও প্রকাশ করা হয় যে, তাকে ২ বছরের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং একটি রাজ্য কমিটিকে গাইড করার জন্যে দায়িত্ব দেয়া হয়, যা কার্যত তার পদাবনতি।

রেড্ডি, যিনি জামপান্না নামে বেশী পরিচিত, সিপিআই (মাওবাদী) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গোপন জীবন কাটিয়েছিলেন। তিন দিন আগে তার স্ত্রী হিঙ্গে রজিথা’কে নিয়ে তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তার আত্মসমর্পণ, মাওবাদী আন্দোলনে ব্যাপকভাবে একটি বড় ধরনের হুমকি দিয়েছে, যা বর্তমানে দেশে একটি ‘কঠিন’ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বলে সাম্প্রতিক দলিলে দলটি স্বীকার করে। মাওবাদী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্র অভয়ের নাম উল্লেখ করে তিন পৃষ্ঠার এই বিবৃতিটি দেয়া হয়।

বিস্তারিত বিবৃতিতে, সাধারণ সদস্য থেকে ২০০১ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য হওয়া জামপান্নাকে ‘গুরুতর দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তিবাদ, আমলাতন্ত্র এবং মিথ্যা আত্মসম্মানের মত অ-সর্বহারা প্রবণতা’র বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১১ সালে তাকে উড়িষ্যাতে স্থানান্তর করা হয়েছিল এবং সেখানে তিনি ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যান। জামপান্না ‘আদর্শগত ও রাজনৈতিক দোদুল্যমানতার মধ্যে গভীর ভাবে ডুবে ছিল এবং অবশেষে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তার আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তার সহকর্মীদেরকে জানান। পার্টি বুঝতে পেরেছে, জামপান্না এর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বড় হয়ে উঠেছে এবং শেষ পর্যন্ত “বর্তমান কঠিন অবস্থা” মধ্যে তা প্রবল হয়ে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় কমিটি বলেছে যে ‘শত্রুদের সন্ত্রাস’ (পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ) ভীতি তাকে এতটাই তাড়া করেছে যে তিনি শত্রুদের সম্ভাব্য আক্রমণের অজুহাতে দলীয় সভায় যোগ দিতে অস্বীকার করেন। ‘তিনি নিজের ভারবহন ও সঙ্গতি রক্ষা করতে পারছিলেন না’ এবং পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে অসমর্থ ছিলেন এবং নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন। এর সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য, কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে তাকে বরখাস্ত করার জন্য দল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল(এই বছরের প্রথম দিকে)। বিবৃতিতে জানানো হয় যে, কেন্দ্রীয় কমিটির নিয়োগ দেয়া একটি রাজ্য কমিটির দায়িত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জামপান্না ।

পার্টি যখনি তার বরখাস্তের বিষয়টি উত্থাপন করে, তখনি তিনি ‘পার্টি লাইনের সাথে রাজনৈতিক পার্থক্য’ এর বিষয়টি উত্থাপন করে, এ অভিযোগেও তাকে অভিযুক্ত করেছে পার্টি। তিনি দলের মতাদর্শের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন যে, ভারত একটি আধা-সামন্তবাদী ও আধা-ঔপনিবেশিক দেশ এবং তর্ক করেন যে, এটি নিজেকে পুঁজিবাদী দেশে রূপান্তরিত করেছে। তিনি যুক্তি দেখান যে, পার্টির লাইনটি শর্ত অনুযায়ী পরিবর্তিত হওয়া উচিত এবং দেশে বিদ্যমান নতুন শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বিদ্রোহের রেখা’ অনুসরণ করা উচিত। তবে তিনি তার সহকর্মীদের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেননি এবং দলের কোনো ফোরামেও নয়। যখন তাকে এই বিষয়ে বলা হয়, “তিনি প্রস্তুত ছিলেন না, তখনই দল থেকে বেরিয়ে যান(আত্মসমর্পণ)”। মুখপাত্র অভয় বলেন, “এইসব রাজনৈতিক পার্থক্যগুলো কিছুই নয়, এসব তার অধঃপতনকে ঢাকতে আবরণ মাত্র”।

অভয় আরো উল্লেখ করেন যে, সিনিয়র ক্যাডারদের আত্মসমর্পণ করার মতো যে কোন ধরনের অস্থায়ী বাধাগুলি সত্ত্বেও তার দল বিপ্লবের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকবে।

সূত্রঃ https://telanganatoday.com/jampanna-surrendered-himself

Advertisements

কার্ল মার্কসের সমাধিস্থলে বক্তৃতা -ফ্রেডারিক এঙ্গেলস

lead_960

১৪ই মার্চ, বেলা পৌনে তিনটেয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক চিন্তা থেকে বিরত হয়েছেন। মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্য তাঁকে একা রেখে যাওয়া হয়েছিল। আমরা ফিরে এসে দেখলাম যে তিনি তাঁর আরামকেদারায় শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন- কিন্তু ঘুমিয়েছেন চিরকালের জন্য।

এই মানুষটির মৃত্যুতে ইউরোপ ও আমেরিকার জঙ্গি প্রলেতারিয়েত এবং ইতিহাস-বিজ্ঞান উভয়েরই অপূরণীয় ক্ষতি হল। এই মহান প্রাণের তিরোভাবে যে শূন্যতার সৃষ্টি হল তা অচিরেই অনুভূত হবে।

ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন তেমনি মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানুষের ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম, মতাদর্শের অতি নিচে এতদিন লুকিয়ে রাখা এই সহজ সত্য যে, রাজনীতি, বিজ্ঞান, কলা, ধর্ম ইত্যাদি চর্চা করতে পারার আগে মানুষের প্রথম চাই খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, পরিচ্ছদ, সুতরাং প্রাণধারণের আশু বাস্তব উপকরণের উৎপাদন এবং সেইহেতু কোনো নির্দিষ্ট জাতির বা নির্দিষ্ট যুগের অর্থনৈতিক বিকাশের মাত্রাই হলো সেই ভিত্তি যার ওপর গড়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট জাতিটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের ধ্যান-ধারণা, শিল্পকলা, এমনকি তাদের ধর্মীয় ভাবধারা পর্যন্ত এবং সেই দিক থেকেই এগুলির ব্যাখ্যা করতে হবে, এতদিন যা করা হয়েছে সেভাবে উল্টো দিক থেকে নয়।

কিন্তু শুধু এই নয়। বর্তমান পুঁজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতির এবং এই পদ্ধতি যে বুর্জোয়া সমাজ সৃষ্টি করেছে তার গতির বিশেষ নিয়মটিও মার্কস আবিষ্কার করেন। যে সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে এতদিন পর্যন্ত সব বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ ও সমাজতন্ত্রী সমালোচক উভয়েরই অনুসন্ধান অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল, তার ওপর সহসা আলোকপাত হল উদ্ধৃত্ত মূল্য আবিষ্কারের ফলে।

একজনের জীবদ্দশার পক্ষে এরকম দুটো আবিষ্কারই যথেষ্ট। এমনকি এরকম একটা আবিষ্কার করতে পারার সৌভাগ্য যাঁর হয়েছে তিনিও ধন্য। কিন্তু মার্কসের চর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে- এবং তিনি চর্চা করেছিলেন বহু বিষয় নিয়ে এবং কোনোটাই ওপর ওপর নয়- তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই, এমনকি গণিতশাস্ত্রও তিনি স্বাধীন আবিষ্কার করে গেছেন। 
এই হল বিজ্ঞানী মানুষটির রূপ। কিন্তু এটা তাঁর ব্যক্তিত্বের অর্ধেকও নয়। মার্কসের কাছে বিজ্ঞান ছিল এক ঐতিহাসিকভাবে গতিষ্ণু বিপ্লবী শক্তি। কোনো একটা তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের নতুন যে আবিষ্কার কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের কল্পনা করাও হয়তো তখনো পর্যন্ত অসম্ভব, তেমন আবিষ্কারকে মার্কস যতই স্বাগত জানান না কেন, তিনি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের আনন্দ পেতেন যখন কোনো আবিষ্কার শিল্পে এবং সাধারণভাবে ঐতিহাসিক বিকাশে একটা আশু বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যুৎশক্তির ক্ষেত্রে যেসব আবিষ্কার হয়েছে তার বিকাশ এবং সম্প্রতি মার্সেল দ্রেপ্রের আবিষ্কারগুলি তিনি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করতেন।

কারণ মার্কস সবার আগে ছিলেন বিপ্লববাদী। তাঁর জীবনের আসল ব্রত ছিল পুঁজিবাদী সমাজ এবং এই সমাজ যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে তার উচ্ছেদে কোন না কোন উপায়ে অংশ নেওয়া, আধুনিক প্রলেতারিয়েতের মুক্তি সাধনের কাজে অংশ নেওয়া, একে তিনিই প্রথম তার নিজের অবস্থা ও প্রয়োজন সম্বন্ধে, তার মুক্তির শর্তাবলী সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছিলেন। তাঁর ধাতটাই ছিল সংগ্রামের। এবং যে আবেগ, যে অধ্যবসায় ও যতখানি সাফল্যের সঙ্গে তিনি সংগ্রাম করতেন তার তুলনা মেলা ভার। প্রথম Rheinische zeitung (1842), প্যারিসের vorwarts (1844) পত্রিকা, Deutsche Brusseler zeitung (1847), Neue Rheinische (1848-49), New york Tribune (1852-61) পত্রিকা এবং এছাড়া একরাশ সংগ্রামী পুস্তিকা, প্যারিস, ব্রাসেলস এবং লন্ডনের সংগঠনে তাঁর কাজ এবং শেষে, সর্বোপরি মহান শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি গঠন- এটা এমন একটা কীর্তি যে আর কোন কিছু না করলেও শুধু এইটুকুর জন্যই এর প্রতিষ্ঠাতা খুবই গর্ববোধ করতে পারতেন।

তাই, তাঁর কালের লোকেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রোশ ও কুৎসার পাত্র হয়েছেন মার্কস। স্বেচ্ছাতন্ত্রী এবং প্রজাতন্ত্রী দু’ধরনের সরকারই নিজ নিজ এলাকা থেকে তাঁকে নির্বাসিত করেছে। রক্ষণশীলই বা উগ্র-গণতান্ত্রিক সব বুর্জোয়ারাই পাল্লা দিয়ে তাঁর দুর্নাম রটনা করেছে। এসব কিছুই তিনি ঠিক মাকড়শার ঝুলের মতোই ঝেঁটিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন, উপেক্ষা করেছেন এবং যখন একান্ত প্রয়োজনবশে বাধ্য হয়েছেন একমাত্র তখনই এর জবাব দিয়েছেন। আর আজ সাইবেরিয়ার খনি থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত, ইউরোপ ও আমেরিকার সব অংশে লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী সহকর্র্মীদের প্রীতির মধ্যে, শ্রদ্ধার মধ্যে, শোকের মধ্যে তাঁর মৃত্যু। আমি সাহস করে বলতে পারি যে মার্কসের বহু বিরোধী থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রু তাঁর মেলা ভার।

যুুগে যুগে অক্ষয় হয়ে থাকবে তাঁর নাম, অক্ষয় হয়ে থাকবে তাঁর কাজ।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭