কৃষক বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত

Screenshot_2016-11-16-17-07-17-1

লিখেছেনঃ স্বপন কুমার চক্রবর্তী

প্রথম সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৭)

উপমহাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-সমাজ ধ্বংসের সূত্রপাত ঘটায় । পলাশী যুদ্ধের পূর্বে উপমহাদেশের ভূমি ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী অনুপস্থিত ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভারতের সনাতন জীবনধারার গতিরোধ করে সমাজ জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে। ১৭৯৩ সালে এই প্রথা চালু করার ফলে বঙ্গদেশে বংশপরস্পরায় চলে আসা স্বাধীন কৃষিকাজ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। মোঘল শাসনকালে জমির ওপর মালিকানা ছিল না। তা সত্ত্বেও কৃষকের উৎপাদিত ফসলের কিছু অংশের দাবি কমও ছিল না মোঘল শাসকদের। আকবরের আমলে কৃষক উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশ ফসলের রাজস্ব দিত। সেটাই আওরঙ্গজেবের আমলে হয় দুই তৃতীয়াংশ। মোঘল যুগের জাকজমকের যোগানদার ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষক জনতাই। বাণিজ্যিক পণ্যের চাষ করার মূল উদ্দেশ্য হলো রাজস্ব বৃদ্ধি করা। তাই কৃষকের ওপর শোষণ অত্যাচারের সীমা ছিল না মোঘল শাসনকালেও। এই সমস্ত কারণে মোঘল শাসনকালেও অত্যাচারিত কৃষক বারংবার বিদ্রোহ করেছিল।

কৃষকের জমির ওপর ভোগদখলের অধিকার মোঘল শাসনকালে স্বীকৃত ছিল। মোঘল শাসকেরা বুঝেছিল কৃষকের শ্রম ছাড়া সম্পদ সৃষ্টি হবে না। আর এই সম্পদই মোঘল শাসন টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ।

ভারতীয় উপমহাদেশের পাঁচশো বৎসরের সমাজ জীবনে জমিদার শ্রেণি কৃষি অর্থনীতিতে জড়িয়ে আছে। এই জমিদার শ্রেণি ইংরেজদের সৃষ্ট নয়। সুলতানি আমলে এই শ্রেণির জন্ম নয়। আমাদের দেশের কৃষি অর্থনীতি নির্ভর সমাজ জীবনে মোঘল শাসনকালেই রাজস্ব আদায়ের জন্য জমিদার নিযুক্ত হয়।

বাংলাদেশের জমিদারেরা নির্দিষ্ট হারে মোঘল সরকারকে রাজস্ব দিত। জমিদারেরা জমির মালিকানার অধিকারী ছিল না। জমিদারের খাজনা আদায় আর মোঘল শাসককে দেয় রাজস্বে কিছু ফারাক ছিল। এই ফারাকটুকুই জমিদারের লাভ। গ্রামের কৃষকদের জমির মালিক জমিদার কখনই ছিল না।

মোঘল শাসন ব্যবস্থায় কৃষকদের জমি হইতে উৎখাতের চেয়ে জমিতে চাষের উৎসাহ দেয়া হতো। জমির ওপর কৃষকদের অধিকার ছিল চিরস্থায়ী। ধারাবাহিকভাবে বংশ পরস্পরায় তারা জমি ভোগদখল করতো। জমি এবং উৎপাদিত ফসলের অধিকার মোঘল শাসক জমিদারের ছিল না। অধিকার ছিল শুধু সামান্য রাজস্ব নেবার। জমির উপর কৃষকের অধিকার ছিল চিরস্থায়ী। ১৭৯৩ সালের ইংরেজ শাসকের চালু করা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঠিক বিপরীত ব্যবস্থা উপমহাদেশের সমাজজীবনে।

ইংরেজরা মোঘল সম্রাটের নিকট থেকে রাজস্ব আদায়ের ফরমান লাভ করে ১৭৬৫ সালে। শুরু হয় নগ্ন বর্বরতা আর সীমাহীন লুণ্ঠন, রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। কৃষকদের ওপর বলপূর্বক রাজস্ব আদায়ই ছিল ইংরাজদের পদ্ধতি। রাজস্ব আদায় ছাড়া ছিল আমলা, দালালদের অত্যাচার।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বহুমুখী উদ্দেশ্য সাধন করেছিল ইংরেজ শাসনের (১) ঔপনিবেশিক শাসনের স্থায়ীত্ব বৃদ্ধি (২) শিল্প পুঁজির কাঁচামাল ভারতীয় উপমহাদেশ হতে সংগ্রহ (৩) ক্রমবর্ধমান কৃষক বিদ্রোহ হতে ইংরেজ শাসকদের রক্ষা করার জন্য জমিদার নামক শ্রেণিকে জমির বন্দোবস্ত দিয়ে চড়া হারে রাজস্ব আদায় এবং সমস্ত অপকর্মের স্থায়ী সঙ্গী হিসাবে ব্যবহার করা।

ইংরেজ সৃষ্ট ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা উচ্ছেদ জমিদারের কখনও কাম্য ছিল না। কারণ লুণ্ঠিত সম্পদের উচ্ছিষ্ট জমিদারেরাও ভোগ করতো। প্রায় দুইশত বৎসরব্যাপী ইংরাজ শাসন চলাকালীন কৃষক বিদ্রোহে জমিদারেরা একই ভূমিকা পালন করেছে। কৃষক বিদ্রোহকে জমিদারেরা যেমন ভয় করতো, সেইরূপ আতঙ্কিত দালাল ইতিহাস লেখকরাও ভয় করতো। কৃষক বিদ্রোহ যে মূলত স্বাধীনতার সংগ্রাম তা স্বীকার করলেই লুক্কায়িত ঝোলা হতে বিড়াল বেরিয়ে আসে। 
ইংরেজ শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার এবং তার ঔরসজাত শিক্ষিত সম্প্রদায় তৎপরতার সাথে তার জন্মদাতা ইংরেজ প্রভুর নির্দেশ পালন করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকদের সম্পর্কে উপমহাদেশ ব্যাপী আজও অনেক অন্ধকার। কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসই একমাত্র এদের স্বরূপ উন্মোচিত করতে পারে।

সাঁওতালদের পরিচয় 
ইতিহাসের সমস্ত বিদ্রোহের মতই সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ইংরেজ জমিদার, সুদখোর মহাজন শ্রেণির আর্থিক শোষণ উৎপীড়নের অনিবার্য পরিণতি। কোন দেশ হতে কবে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী উপমহাদেশে এসেছিল সে সম্পর্কে ইতিহাস নীরবতা পালন করেছে। গাঙ্গেয় সমতট এই উপমহাদেশের বিহার রাজ্যেই তারা প্রথম বসতি স্থাপন করে। 
জঙ্গল পরিষ্কার করে, জমি চাষযোগ্য করে, হিংস্রর জন্তুর মোকাবিলা করে, কৃষিকাজে মনোনিবেশ করে। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে সরল অনাড়ম্বর জীবনে কয়েক হাজার বৎসর অতিবাহিত করে। কৃষিকাজ, বনজ সংগ্রহ এবং বিনিময় প্রথার মাধ্যমেই তাদের দিন অতিবাহিত হতো।

ধীরে ধীর সমগ্র বিহার এবং উপমহাদেশের সমস্ত প্রদেশ ইংরেজদের গ্রাসে পড়ল। সনাতন সমাজ জীবনে অভ্যস্ত সাঁওতালদের জীবনে নেমে আসে আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়। মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতি সাঁওতালদের জীবনে অমানুষিক শোষণ উৎপীড়নের ব্যবস্থা কায়েম করল।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদাররা জঙ্গলের মালিক হলো। জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি চাষাবাদ করার জন্য প্রচুর শ্রমিক প্রয়োজন হলো। এভাবেই সাঁওতালেরা ছড়িয়ে পড়ে বীরভূম, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, ভাগলপুর, দুমকা, পাকুড়, পুর্ণিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে। সাঁওতাল পরগণাই ‘দামিনই কো’ অঞ্চল- সভ্য মানুষের পদার্পণ ঘটেনি এ অঞ্চলে। কায়িক শ্রমই ছিল তাদের পুঁজি, ঘাম, মেহনত বিনিয়োগ করে সাঁওতালরা সোনার ফসল ফলায়। বন্য হিংস্রর জন্তুর মোকাবেলা নিত্য দিনের ব্যাপার। ভদ্র, সভ্য মানুষদের অমানুসিক আচরণের সাথে কালো অসভ্য সাঁওতালরা অপরিচিত। ইংরেজ বণিকের প্রগাঢ় কপটতা, ছলনা, ষড়যন্ত্র, শৃগালের ধূর্ততা, হায়েনার লালসার সঙ্গে তাদের অনেক পরে পরিচয় হয়েছিল। 
আর্য আক্রমণকারীরা গাঙ্গেয় সমভূমিতে বহুবার আক্রমণ করে সফল হতে পারেনি। চম্পারণ (চম্পাদেশ) এলাকায় বসবাস করার সময়ও সাঁওতাল সর্দারেরা সামান্য পরিমাণে খাজনা দেওয়া ছাড়া স্বাধীনই ছিল। সরলতাপূর্ণ জীবন, অতীত স্বাধীন জীবন ছিল তাদের সমাজ জীবনের বৈশিষ্ট্য।

নিদ্রাভঙ্গের পর্ব
মহাবিদ্রোহ আরম্ভ হতে তখনও কিছু সময় বাকি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফল উপমহাদেশের আর্থিক, রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থার ওপর তীব্র কষাঘাত করছে। বিদেশি শাসকগণের বিরুদ্ধে লাগাতার কৃষক বিদ্রোহ শতবর্ষ পার করবে। অবিচারের কৃপাণ মেঘ বাংলা বিহারের আকাশ আচ্ছন্ন করে ফেলে। শারীরিক নির্যাতন করে জমিদার গোষ্ঠী সাঁওতালদের উৎপাদিত ফসলের সিংহভাগ কেড়ে নিতে শুরু করল। ফসলের যে সামান্য অংশটুকু সাঁওতালেরা ভাগে পেত ওই সামান্য ফসলটুকু দিয়ে স্ত্রী পুত্র, কন্যা, পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাছাড়া মুদ্রাভিত্তিক ক্রয় বিক্রয়, সাঁওতাল বিনিময় প্রথার অবসান ঘটায়। ব্যবসায়ী মহাজন নামক শ্রেণিটিও মুদ্রা ব্যবস্থা চালুর সঙ্গে সঙ্গেই এ অঞ্চলে উপস্থিত হলো। মুদ্রা ব্যবস্থা ভাল করে সাঁওতালরা বুঝে ওঠার আগেই মহাজন ব্যবসায়ী শ্রেণি অল্প মূল্যে ফসল ক্রয়ের নামে শুরু করে অবাধ লুণ্ঠন। ইংরেজ শাসকেরা লুণ্ঠনকারীদের প্রশ্রয় দিল।

খ্রিষ্টান ধর্মযাজকেরা সাঁওতাল পরগণায় তখনও পৌঁছায় নাই। সুদখোররাও জমিদার মহাজনদের মতই চড়া সুদে টাকা ধার দিতে শুরু করে সাঁওতালদের। অল্প সময়েই সাঁওতালদের সর্বস্বান্ত করে সুদখোররা মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলে। গো-শকট নৌকা ইত্যাদির পরিবহনের মাধ্যমে সাঁওতালদের ঘাম মেহনতে উৎপন্ন সোনালী ফসল ধান, সরিষা ইত্যাদি মুর্শিদাবাদ, কলিকাতা এমন কী খোদ ইংল্যান্ডে রপ্তানি হতে শুরু হয়।

কোন ঘটনাই একদিনে ঘটে না। প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার পশ্চাদে থাকে দীর্ঘ দিনের কান্না, ঘাম, রক্তের ইতিহাস। জমিদার গোষ্ঠী জমি, ফসল ছিনিয়ে নেয় । সুদখোর মহাজন চড়া সুদে টাকা খাটায়। সুদ দিয়ে ঋণ কোন দিন শোধ হবার নয়। ঋণ শোধ করতে না পারলে মহাজন ধরে নিয়ে বেগার খাটায়। ক্রীতদাসে পরিণত করে সমগ্র পরিবারকে। সামান্য ঋণ এক জীবনে শোধ হয় না। আমৃত্যু সাঁওতাল পরিবার পরিজনদের জমিদার, সুদখোর মহাজনের ক্রীতদাস হয়ে থাকতে হয়।

প্রবাদ আছে পশুরাজ ক্ষুধা ছাড়া শিকার করে না। সীমাহীন অত্যাচার, নির্মম, ভীষণ শোষণের রথের চাকায় পিষ্ট হয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ঘুমন্ত সিংহ, প্রকৃতির সন্তান সাঁওতালদের কয়েক শতাব্দীর ঘুম ভেঙে গেল। এই ঘুম ভাঙার কণ্ঠস্বর অচিরেই সমগ্র সাঁওতাল এলাকায় লক্ষ কণ্ঠের গর্জনে রূপান্তরিত হলো।

অবশেষে শত্রু নির্বাচন
নরপশুর অত্যাচার সনাতন, সরল, জীবনের গর্ভে জন্ম নিল এক প্রচ- শক্তি। যার ভিতর ছিল পৌরুষের আগুনে ঝলসানো এক গৌরবগাঁথা, মাদলের ঝঙ্কার। সেই উন্মাদ নির্মম মাদলধ্বনি মুক্তির ধারার বেগে ধাবিত হয়ে কাঁপিয়ে তোলে বিদেশি ইংরেজ শাসনের অহংকারের স্তম্ভ, তাদের (ইংরেজদের) আজ্ঞা অনুগ্রহধন্য জমিদার, সুদখোর মহাজন, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, পরিশেষে সমাজ সংস্কারক দালাল চরিত্রের বুদ্ধিজীবীদের। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সাঁওতাল কৃষক জনতা চিনতে ভুল করে নাই তাদের পরাধীন জীবনের মূল শত্রু বিদেশি ইংরেজ শাসক। এই সারমেয়কূল ইংরেজদের শক্তিতে বলীয়ান।

বিদেশি লেখকদের বিবরণ
উপমহাদেশের শিক্ষিত সমাজ সংস্কারক বুদ্ধিজীবী হিসাবে ইংরেজ যাদের আমাদের সাথে পরিচয় করে দিয়েছে, তারা কেহই অশিক্ষিত সাঁওতাল কৃষক জনতার স্বাধীনতার সংগ্রামের কাহিনী লেখেন নাই। ওই সময়ের বিভিন্ন জেলার গেজেট, লোকমুখে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সংগ্রামের স্মৃতিচারণ প্রভৃতি সংগ্রহের মাধ্যমে মহান সাঁওতাল বিদ্রোহের কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে।

স্যার উইলিয়াম হান্টার ‘এনালস অফ রুরাল বেঙ্গল’ নামে সাঁওতাল বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে একটি বিরাট পুস্তক রচনা করেছিলেন- ‘এই সকল কথা লেখার পিছনে সাহেবের ছিল এক দুষ্ট মতলব। ওই সাহেব কোথাও ইংরেজ শাসনের নামও করেন নাই, অথবা সাঁওতালদের এই চরম দুর্দশার জন্য ইংরেজদের দায়ীও করেন নাই। সাঁওতালদের ওপর ইংরেজ শাসকদের অমানুষিক অত্যাচার ও শোষণ গোপন রাখার জন্য-ই ওই সাহেব সকল দোষ ইংরেজ শাসকদের ভাড়াটিয়া দালালদের ওপর চাপিয়েছেন। কিন্তু ওই সাহেবরাই আবার স্বীকার করেছে যে, ওই অঞ্চলের ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারকগণ যে কেবল খাজনা আদায় করেই সাঁওতালদের সর্বস্বান্ত করতেন তাই না, তারা সরাসরি লুটের বখরাও আদায় করতেন। যা হোক উক্ত সাহেবের এই বিবরণটি সাঁওতালদের চরম দুর্দশা ও দুর্ভাগ্যের কথা বুঝবার পক্ষে যথেষ্ট। 
উপরিউক্ত বিবরণ কী ভয়ঙ্কর অবস্থার ইঙ্গিত করে ভাবলেও শিহরণ জাগে। ন্যায় বিচার পাবার জন্য তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন ছিল না। সবাই মিলে যুক্ত হয়ে নিরীহ নিষ্পাপ সাঁওতালদের ওপর পশুর মত অত্যাচার করেছে। স্যার উইলিয়াম হান্টারের বিবরণ পরিষ্কার ইংরেজ শাসনের চিত্র অঙ্কন করেছে।

মহান সমাজ বিজ্ঞানী কার্ল মার্কস যথার্থই বলেছেন, “বিকাশ হইতে সমাজে এমন এক অবস্থার উদ্ভব হয় যে, তখন উৎপাদনের বাস্তব শক্তিসমূহের সহিত উৎপাদন সম্বন্ধ ও সম্পত্তি সম্বন্ধের বিরোধ আসিয়া যায়। ইহার ফলে এতদিন যাবৎ যে অবস্থা উৎপাদন শক্তির সহায়ক হইয়াছে, তাহাই আবার নতুন অবস্থায় সেই শক্তির বিকাশের পথে বাধা হিসাবে দেখা দেয়। এইভাবে সমাজে বিপ্লবের মুহূর্ত ঘনাইয়া আসে। তাহার পূর্বতন আর্থিক ভিত্তি বদল হইয়া যায় এবং উহার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের উচ্চাঙ্গের সমগ্র গঠনও পরিবর্তিত হইয়া পড়ে।”

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রয়োগের ফসল মধ্যবর্তী শোষক ও নতুন আর্থিক রীতি। এর ফলে পরিবর্তন হয়ে গেল সাঁওতাল সমাজের জনতান্ত্রিক উৎপাদন রীতি, যা ছিল বিদ্রোহীদের মূল আর্থিক বুনিয়াদ। সাঁওতালদের বিদ্রোহের মূল কারণ বিচার করতে হবে পরিবর্তিত উৎপাদন পদ্ধতি, আর্থিক রীতির নিরিখে।

ভারতে ইংরেজ শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে মহান মার্কস তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্তব্য করেছেন, “স্বদেশে যা ভদ্র রূপ নেয় এবং উপনিবেশে গেলেই যা নগ্ন হয়ে আত্মপ্রকাশ করে, সেই বুর্জোয়া সভ্যতার প্রগাঢ় কপটতা এবং অঙ্গাঙ্গী বর্বরতা আমাদের সামনে অনাবৃত।”

হুল বিদ্রোহ শুরু
এক শতাব্দীর কৃষক বিদ্রোহের ধারাবাহিকতার রূপ হলো সাঁওতাল বিদ্রোহ। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ সমাপ্ত হয়ে ওয়াহাবি বিদ্রোহ শুরু হয়, এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে সমগ্র উত্তর ভারতে দাবানল আকারে ছড়াইয়া পড়ে। সৈয়দ আহম্মদদের আদর্শে অনুপ্রাণিত ওয়াহাবি বিদ্রোহীরা পেশোয়ার হতে বঙ্গদেশ পর্যন্ত জীবনপণ সংগ্রাম করেছিল বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে। বাংলা বিহারের ওয়াহাবি বিদ্রোহীরা কৃষকদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশীদার হবার জন্য সাঁওতালরাও বিদ্রোহ করে। দীর্ঘ অত্যাচার বিদ্রোহীদের নির্মম আঘাতের শক্তি যোগান দেয়। সাঁওতাল বিদ্রোহীরা তাদের ‘দামিন ই কো’র স্বাধীনতা রক্ষার্থে বিদেশি ইংরেজ জমিদার সুদখোর, মহাজন, পুলিশ আমলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্মম আঘাত হেনে বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটাল। শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়।

পরাধীন জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য সুসংবদ্ধ রাজনৈতিক দল তখনও অনুপস্থিত। স্বাধীন সাঁওতাল রাজ গড়ার সংগ্রামই তাদের নেতার জন্ম দিয়েছিল। দেশি বিদেশি শোষক শয়তানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছাড়া অন্য কোন পথ তাদের সামনে ছিল না। অর্থনৈতিক শোষণ, উৎপীড়ন হতে মুক্তির পথ সাঁওতালরাই ঠিক করিল, “আক্রমণই দেশি বিদেশি শাসকদের লুণ্ঠন শোষণের অবসান ঘটাবে।” নিজভূমে পরবাসী হয়ে বাঁচার দরকার হবে না। 
স্বাধীন সাঁওতাল রাজ ফিরিয়ে দেবে আমাদের হারানো মাটি, ঘরবাড়ি, ক্ষেতখামার, লুণ্ঠিত সম্মান, হারানো বিশাল বনভূমি। হুল হুল রবে মাদলের ডঙ্কা নিনাদের অগ্নিস্ফূলিঙ্গ দাবানল হয়ে সমগ্র সাঁওতাল মহলে ছড়িয়ে পড়লো। এই বিদ্রোহে অন্যান্য মেহনতি শ্রেণি, বঞ্চিত সর্বহারার দল বিদ্রোহীদের সমর্থনে সীমাহীন আত্মত্যাগ করে বিদ্রোহীদের জয়যুক্ত করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসে। আদিবাসী নয় এমন শ্রেণিও উপলব্ধি করেছিল সাঁওতালদের শত্রু তাদেরও শত্রু। বঙ্গদেশের বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, বিহারের ভাগলপুর, দুমকা, ছোটনাগপুর ইত্যাদি অঞ্চলের অ-সাঁওতাল গোষ্ঠীও বিদ্রোহীদের সমর্থনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করে বিদ্রোহের শক্তি বৃদ্ধি করেছিল।

ইংরেজ লেখক ও সরকারি কর্মচারীদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো রিপোর্টে সাঁওতাল বিদ্রোহ এবং এই বিদ্রোহে অন্যান্য অ-সাঁওতাল শ্রেণির সমর্থনের উল্লেখ পাওয়া যায়।

বিদ্রোহের নেতৃত্ব 
আকাশ হতে দেবদূত এসে বিদ্রোহের নেতৃত্ব গঠন করেনি। সাঁওতাল পরগণার আকাশে বিদ্রোহের মাদলধ্বনির মধ্যে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বীর সাঁওতার বিদ্রোহীদের চারজন নেতা- কানু, সিধো, চাঁদ, ভৈরব। বিচক্ষণ এই চার নেতা সাঁওতালদের চিন্তা চেতনার গভীর পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান তদন্ত করেছিলেন বিদ্রোহের পূর্বেই। চিন্তা, চেতনার অনুসন্ধান কর্মে চার নেতাই অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

দ্রুততার সাথে সাঁওতাল জনতাকে লড়াইয়ে সামিল করার শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হল, “ভগবানের নির্দেশে সাঁওতালদের ইংরেজ ও দিকু’দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে”- এই কথা প্রচার করা। যেই কথা সেই কাজ। কানু, সিধো উভয়ে গ্রামে গ্রামে প্রচার করল, “ভগবান কাগজে লিখে নির্দেশ দিয়েছেন- সমগ্র সাঁওতাল পরগণার সাঁওতালদের রক্ত শোষক বিদেশি ইংরেজ ও তার দালাল দেশীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। স্বাধীন সাঁওতাল রাজ কায়েম করতে হবে। যে এই যুদ্ধে শামিল হবে না সে ভগবানের নির্দেশ অমান্য করবে। সে সমগ্র সাঁওতাল সমাজের শত্রু।”

কানু, সিধো গ্রামে গ্রামে সংঘবদ্ধতার প্রতীক শালগাছের ডালসহ ভগবানের নির্দেশ কাগজে লিখে পাঠিয়ে দিলেন।

ভারতীয় সমাজে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হলেও ধনতন্ত্রের বিকাশ অতি মন্থর। জনজীবনে ধর্ম তখনও গভীর রেখাপাত করতো। পৃথিবীর সমস্ত দেশে স্বাধীনতা জনতার সংযোগও অংশগ্রহণ ধর্মীয় আহ্বান দ্বারাই সংগঠিত হয়েছিল। অন্য কোন পদ্ধতি ছিল অজানা। কানু, সিধো তৎকালীন আর্থ সামাজিক পরিস্থিতিতে ধর্ম, ভগবান- এর নামে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ডাক দিয়ে সমগ্র সাঁওতাল, অ-সাঁওতাল কৃষকদের সংগ্রামে সামিল করাতে সক্ষম হয়েছিল। সেই সময়ের নিরিখে এটাই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।

অগ্নিগর্ভ সাঁওতাল পরগণা ১৮৫৫
মহেশলাল দত্ত তখন দিঘি থানার দারোগা। ইংরেজ শাসক, জমিদার, সুদখোর মহাজনদের স্বার্থ রক্ষার্থে অত্যধিক তৎপর। অপরদিকে স্বাধীনতা হারিয়ে সাঁওতালেরা বীরসিং মাঝি নামক এক সাঁওতাল সর্দারের নেতৃত্বে ‘দিকু’দের বাড়ি বাড়ি ডাকাতি ও লুণ্ঠন আরম্ভ করে দিল। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত অত্যাচার, অবিচারের প্রতিহিংসাই তাদের বাধ্য করলো এই কর্মে। জমিদার, মহাজন দারোগাকে অভিযোগ করল। দারোগা যথেষ্ট সংখ্যক পুলিশ থানায় না থাকায় এক্ষেত্রে অভিযোগের প্রতিকার করতে তৎপর হতে পারে না। পাকুড়ের জমিদার বীরসিং মাঝিকে আটক করে অত্যধিক নির্যাতন করেছিল। দলনেতার প্রতি অত্যাচারে ক্ষিপ্ত হয়ে বিদ্রোহী সাঁওতালরা প্রতিশোধ নিল কিছু মহাজনের বাড়ি লুট করে।

জমিদার, মহাজন উপরমহলে অভিযোগ করে। উপরমহল তখন বাধ্য হলো মহেশলাল দত্তকে প্রচুর পুলিশ পাঠাতে। নতুন পুলিশের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দারোগা বিদ্রোহী সাঁওতালদের আক্রমণ করে। অবস্থাপন্ন এক সাঁওতাল গোক্কোকে চুরির অভিযোগে দারোগা বেশ কিছু সঙ্গীসহ গ্রেফতার করে। কিন্তু মিথ্যা অভিযোগে গোক্কো গ্রেফতার হলেও শত চেষ্টা করেও দারোগা অভিযোগ প্রমাণ না করতে পেরে, বাধ্য হলো গোক্কোকে মুক্তি দিতে। সাঁওতালেরা দারোগার কার্যকলাপে আরও ক্ষুব্ধ হলো। শত বৎসরব্যাপী ইংরেজ বিরোধী কৃষক বিদ্রোহের কিছু সংবাদ এ অঞ্চলে এসে পড়েছে। তারা বিদ্রোহ আরম্ভ করার অপেক্ষায় সতর্ক হয়ে সমস্ত প্রস্তুতি সমাপ্ত করেছিল।

সমুদ্র কল্লোল, সমুদ্র কল্লোল শোন, শোন শোন রে…
বিদ্রোহ বিদ্রোহ বিদ্রোহ ….. চারিদিকে বিদ্রোহ রে …
১৮৫৫ সালের ৩০ জুন। সূর্য অস্ত যেতে তখনও খানিক দেরি আছে। অস্তগামী সূর্যের প্রভাবে আকাশ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। উত্তপ্ত আকাশ, বাতাস ভগনাদিহি গ্রামে। পরিষ্কার উঠানে বসে আছেন সাঁওতাল বিদ্রোহের বীর চার নায়ক। আম সভার দিন আগেই ঠিক করে ভগবানের নির্দেশ লেখা কাগজ ও শাল ডাল প্রায় চার শত গ্রামে পাঠান হয়েছিল। দশ হাজার আদিবাসী ঘরোয়া অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কিছু খাবার সঙ্গে নিয়ে ভগনাদিহি গ্রামে উপস্থিত হলো। কানু সিধো সমবেত সাঁওতালদের সামনে জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। উভয়ের বক্তব্যের মূল কথায় দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অত্যাচার, শোষণের বিরুদ্ধে আগুন ঝরে পড়তে লাগল। স্বাধীন সাঁওতালেরা কিভাবে পরাধীন জীবনযাপন করছে, কারা তাদের জীবন ঢেকে দিয়েছে অত্যাচারের ঘন অন্ধকারের আবরণে, তাদের উভয়কে চিহ্নিত করে দিল। তাদের বক্তব্যের প্রখরতায় সাঁওতালদের মনে পড়ে গেল দীর্ঘদিনের ফসল লুণ্ঠন, নারীর ইজ্জত সম্ভ্রম হরণের এক বিরাট পাহাড় তাদের বুকে চেপে আছে। ভয়াবহ বিবরণ প্রতিশোধ স্পৃহার আগুনে ঘি ঢেলে দিল। কানু, সিধো বললেন, “ভগবান নির্দেশ দিয়েছেন সাঁওতাল এলাকা হতে সমস্ত ইংরেজ দিকু’দের উৎখাত করে স্বাধীন সাঁওতাল রাজের লড়াই একমাত্র কর্তব্য। ভগবানের এই নির্দেশ যে পালন করবে না সে সাঁওতালদের শত্রু, ইংরেজ দিকু’দের বন্ধু।

দাসত্বের অসহনীয় পীড়নে লাঞ্ছিত সাঁওতালেরা কানু, সিধোর কথা শুনে নতুন করে বাঁচার আশা ভরসা পেল। দশ হাজার সাঁওতাল গর্জন করে সমর্থন জানালো প্রতিকারের পন্থার উপায়ে। এক স্থানে দাঁড়িয়ে শপথ গ্রহণ করলো ‘দাসত্ব নয়, চাই স্বাধীনতা, স্বাধীন সাঁওতাল রাজ’ মাদলের শব্দে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল স্বাধীন সাঁওতাল রাজ গড়ার ঘোষণা।

কানু, সিধোর অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতায় শিক্ষিত যুবক কির্তা, ভাদু, সুন্নো মাঝি তাদের দুই নেতার নির্দেশে চরমপত্র দিল, পনেরো দিনের মধ্যে সাঁওতাল এলাকায় অত্যাচার অবিচার অবসানের জন্য। কিন্তু অত্যাচারী বিদেশি শাসক ও তার দালাল জমিদারদের নিকট হতে কোন উত্তর আসলো না। ঘরোয়া হাতিয়ারে সজ্জিত সাঁওতার জনতা সদাসতর্ক। স্বাধীনতার স্পৃহা কেউ-ই রোধ করতে পারবে না। যে কোন মুহূর্তে আরম্ভ হবে মহাসমর। 

পাঁচ ক্ষেতিয়া বাজারে কানু, সিধো সাঁওতাল জনতার মাঝে প্রচার করার সময় উক্ত বাজারের সুদখোর মহাজনরা বিদ্রোহী সাঁওতালদের ওপর আক্রমণ করে। বিক্ষুব্ধ জনতা কানু, সিধোর নেতৃত্বে কুখ্যাত ৫ জন সুদখোর মহাজনকে প্রকাশ্য বাজারে হত্যা করে দীর্ঘ দিনের একচেটিয়া হত্যা, অত্যাচারের অধিকার কেড়ে নেয়। এই ঘটনা হতে পূর্ণ উদ্যমে সাঁওতাল বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল।

বাতাসে সংবাদ দিঘি থানায় পৌঁছায়। কুখ্যাত দারোগা অনেক পুলিশ নিয়ে কানু, সিধোকে আটক করতে ভগনাদিহি গ্রাম আক্রমণ করে। পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সমবেত জনতা অন্যান্য পুলিশসহ মহেশ দারোগাকে পাল্টা আটক করে। তৎক্ষণাৎ শুরু হয় অত্যাচারী দারোগা ও সঙ্গী পুলিশের বিচার। বিচারে জনতা দারোগাসহ নয় পুলিশের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। কানু, সিধো নিজের হাতেই দারোগাকে হত্যা করে। অন্যান্য সঙ্গীরা অপর নয় পুলিশের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করে। দূরে দাঁড়িয়ে যারা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছিল, অবস্থা বেগতিক দেখে দারোগা পুলিশের লাশ ফেলে পালায়ন করে। মহেশলাল একটি নরপশু ছিল, জমিদার, সুদখোর মহাজনের নিকট হতে উৎকোচ নিয়ে সমস্ত ধরনের অপকর্ম করেছিল সাঁওতালদের বিরুদ্ধে। অত্যাচারিত সাঁওতালদের আর্ত চিৎকারে অশ্রু ও রক্তের বন্যা বয়েছে সাঁওতাল এলাকায়। শান্ত সরল সাঁওতাল জনতা নীরবে সহ্য করেছে সমস্ত অত্যাচার। প্রতিকার চেয়েছিল, কিন্তু কে করবে প্রতিকার?
প্রতিকার কেউ-ই করে দেয় নাই, নিজেদের-ই প্রতিকার করতে হয়। এই উপলব্ধির মাধ্যমে সাঁওতাল দ্রোহের আগুন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গলমহলে।

দিঘি থানার দারোগা হত্যার দিন ছিল ১৮৫৫ সালের ৭ই জুলাই। এই দিনই হলো সাঁওতাল হুল।

বিদেশি লেখক হান্টার সাহেবের মতে দারোগা হত্যার ঘটনা হতেই সাঁওতাল বিদ্রোহের অভিযানের চরিত্র ও রূপ বদল হয়ে যায়। এই দারোগা হত্যার মধ্যে দিয়েই বিদ্রোহের শুরু, এতে কোন দ্বিমত নেই। তবে দারোগা হত্যার নানারকম কাহিনী বিভিন্ন লেখকের লিখিত কাহিনীতে ভিন্নতা আছে, তা সত্ত্বেও মূল ঘটনা প্রায় একই রকম। তাই ‘ভগবান যেমন হিন্দু মহাজনদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, তেমনই নিম্নবর্ণের অন্য সকল শ্রেণিকে রক্ষারও নির্দেশ দিয়েছিল।’
সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব পূর্বেই ঘোষণা করেছিলেন ‘আমাদের সংগ্রামে সহায়তা করছে কর্মকার, মুসলমান, তাঁতি, চামার, ডোম, তেলি ইত্যাদি সম্প্রদায়। বিদেশি দিকুদের বিরুদ্ধেই কেবল আমাদের সংগ্রাম পরিচালিত হবে। অন্যান্য শ্রেণিদের সঙ্গে আমাদের সংগ্রামের স্বার্থেই দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। অ-সাঁওতাল জনতাকে ইংরেজ এবং দিকুদের আক্রমণ হতে রক্ষা করতে হবে।’

সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব প্রথম সফল আক্রমণের পর সংগ্রাম পরিচালকদের সঙ্গে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনায় বসলেন। সিদ্ধান্ত হলো যে, সমস্ত সাঁওতালরা প্রচলিত ঘরোয়া হাতিয়ারে সজ্জিত হয়ে বিদেশি ফৌজ ও পুলিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইংরেজ শক্তি ধ্বংস করতে হবে।’ উন্নত কামান বন্দুকের সাথে তীর, কুঠার মুখোমুখি হলো। 
অপরিসীম মনোবল, স্বাধীনতার স্পৃহা, জীবনদানের প্রতিযোগিতা লক্ষ কামান, বন্দুক হতে অধিক শক্তিশালী। অদম্য সাহস, সংকল্পে স্থির, সাঁওতালদের শক্তি অটুট, দৃঢ় মনোবল, কে বাধা দিবে? বিদেশি ইংরেজ ও দিকুদের প্রতিরোধ শক্তি সাঁওতাল আক্রমণের ঘৃণার আগুনে পুড়ে অন্তত বেশ কিছুদিনের জন্য ছাই হয়ে গিয়েছিল।

পাল্টা আক্রমণের মোকবিলার প্রস্তুতিতে সাঁওতালরাও নিজস্ব লড়াকু বাহিনী গড়ে তোলে। তারা জানত ইংরেজ শাসক এবং জমিদার মহাজনদের হাতিয়ার মহেশলাল হত্যার ঘটনায় পাল্টা আক্রমণ আসবেই। আর এই আক্রমণ হবে পূর্বের যে কোন আক্রমণ হতে আরও তীব্র।

সাঁওতালদের নিজস্ব গুপ্তচর বাহিনী মারফত খবর আসল কুরহরিয়া থানার দারোগা প্রতাপনারায়ণ বিদ্রোহীদের আক্রমণ করার ফন্দি আঁটছে। বিদ্রোহীরা দারোগাকে আক্রমণের পরিকল্পনা করে। বিশেষ কাজে দারোগা দলবলসহ থানা হতে বেশ কিছু দূরে (আসলে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের আক্রমণের কলা কৌশল নিয়ে জমিদারদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে গোদ্দা মহাকুমা সদরে) গিয়েছিল। অ-সাঁওতাল সম্প্রদায় বিদ্রোহী সাঁওতালদের গুপ্তচরের কাজ করতো। সময় নষ্ট না করে বিদ্রোহী সাঁওতালেরা প্রতাপনারায়ণের ফেরার পথে গোপনে লুকিয়ে থাকে। অত্যাচারী প্রতাপনারায়ণ নির্দিষ্ট পথে ফেরার সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিদ্রোহী সাঁওতালদের হাতে বন্দী হয়। ভগবানের নামে বিদ্রোহীরা প্রতাপনারায়ণকে বলি দেয়।

দীর্ঘদিন ধরে সুদখোর মহাজনের ঘাঁটি ছিল বড় হাইতের বাজার। এই বিরাট বাজারটি বিদ্রোহী সাঁওতালেরা দখল করে। সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। দীর্ঘদিনের শোষণ, অত্যাচারে নিষ্পেষিত সাঁওতাল জনতার হাতে প্রায় সব সুদখোর মহাজন (ওই বাজারের) নিহত হয়। কিছু অত্যাচারী বদমাইশ ধন সম্পদ বাঁচানোর চেয়ে প্রাণ বাঁচানো শ্রেয় মনে করে দ্রুত ঐ স্থান ছেড়ে পালায়ন করে। খান সাহেব নামক এক কুখ্যাত দারোগা কানুর হাতে নিহত হয়।

বিষাক্ত তীর, টাঙ্গি সজ্জিত সাঁওতাল বিদ্রোহীরা মাদল বাজাতে বাজাতে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সমগ্র সাঁওতাল পরগণায় ছড়িয়ে পড়ে।

মাদলধ্বনি বজ্রের শক্তি হয়ে আঘাত করতে করতে সাঁওতাল পরগণায় ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীদের আক্রমণে শঙ্কিত পুলিশ, চৌকিদার, জমিদার, সুদখোর মহাজন, প্রাণভয়ে সংগ্রামী এলাকা পরিত্যাগ করে পলায়ন করে। বিদ্রোহী সাঁওতালেরা ঘোষণা করে- বিদেশি ইংরেজ শাসন ধ্বংস হয়েছে। স্বাধীন সাঁওতাল রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কখনও ইংরেজ রাজ স্বাধীন সাঁওতাল শক্তির আঘাত কতটা, পরিমাপ করতে পারে নাই। চিরশান্ত সাঁওতালেরা বিদ্রোহ করেছে, এই সংবাদে বিদেশি শক্তি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। পর পর দারোগা হত্যা, বাজার লুণ্ঠন, সুদখোর মহাজন হত্যা- ইংরেজদের হতবুদ্ধিভাব কাটাতে সাহায্য করে।

ব্যাপক ফৌজ ইংরেজরা তখনও সংগ্রহ করতে পারে নাই। এক বিরাট পুলিশ বাহিনী কানু, সিধোর গ্রাম ভগনাদিহি আক্রমণ করে। মাদলের শব্দে সাঁওতালেরা বুঝতে পারে পুলিশ গ্রাম ঘেরাও করেছে। যে সকল সুদখোর মহাজন পুলিশকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল, সাঁওতালেরা প্রথম তাদের হত্যা করে, তারপর বীরের ন্যায় যুদ্ধ করে পুলিশকে নিশ্চিহ্ন করে। জমিদার সুদখোর মহাজনদের গো সম্পদ, মজুত শস্যের গুদাম বাজেয়াপ্ত করে গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। সাহেবদের অফিস কাছারি ধ্বংস করে ফেলে। রেললাইন উপড়ে ফেলে, পাকা রাস্তা ভেঙে মাঠ করে দেয়। সাঁওতালদের ঘাঁটিতে আক্রমণ করার সাধ মিটিয়ে দেয়।

হুল আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দেয়। বিদ্রোহের সংবাদ একদিকে যেমন বিদেশি শাসক ও দিকু সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করে, বিপরীতে সকল সম্প্রদায়ের হাজার হাজার কৃষক, কারিগর জনতাকে বিদ্রোহে উৎসবে সামিল করে।

চারিদিকে ওয়াহাবি বিদ্রোহের ঢেউ। সমগ্র কৃষক জনতা ওয়াহাবি বিদ্রোহে সামিল হয়ে সংগ্রামী অঞ্চলের পরিধি বাড়িয়েছিল। গুপ্তচরের কাজ অ-আদিবাসী জনতা তো করতোই। উপরন্তু কর্মকার সমাজ দিনরাত পরিশ্রম করে বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের হাতিয়ার প্রস্তুত করে দিল। ধর্ম, জাতপাত উঠে গেল। কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে আদিবাসী এই পরিচয় আর কোন কাজে লাগল না। সমগ্র জনতার পরিচয় হল, হয় সে বিদ্রোহী জনতার স্বাধীনতার পক্ষে- নতুবা ইংরেজ দিকুদের অন্যায় অত্যাচারের পক্ষে।

পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ ভারতীয় পূর্ব অঞ্চলের শোষিত, মেহনতি, দলিত জনসাধারণের মধ্যে যে অভূতপূর্ব ঐক্যের বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল, ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার স্বার্থে তাকে কেবলমাত্র সাঁওতাল বিদ্রোহ আখ্যা দিল এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি করবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এই সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ঐক্যবদ্ধ সমগ্র মেহনতি কৃষক জনতার ইংরেজ ও জমিদার মহাজনদের উৎখাত করে স্বাধীন রাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বহু বৎসরের যন্ত্রণার রুদ্ধ কক্ষে বিস্ফোরণ। যা ছিল মহান পূর্ব পুরুষের সুর, আর পাগল করা বিদ্রোহের মাদলধ্বনি।

রাজমহলের পথে ভাগলপুর অভিমুখে অগ্রসর হবার কালে বিদ্রোহীদের তীব্র আঘাতে ইংরেজ জমিদারদের কুঠি, বাড়িগুলি ধুলায় মিশে গেল। এতদিন বিনা বাধায় ইংরেজ সরকারের পুলিশের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিয়ে জমিদার, সুদখোর মহাজনগণ যে ভয়াবহ অন্ধকারের রাজত্ব কায়েম করেছিল, এক আঘাতেই সেই অন্ধকার সরে গিয়ে নতুন সূর্য উঠলো আদিবাসী সাঁওতাল অধ্যুষিত জঙ্গলমহলে।

উদিত সূর্যের বিকীর্ণ অগ্নিতাপের প্রচণ্ডতায় সাঁওতালদের চোখের জল শুকিয়ে গেল। শুকিয়ে গেল দিনের পর দিন তাদের মুখে ছিটানো অবজ্ঞার থুতু।

আত্মরক্ষার কোন উপায় নেই দেখে ভাগলপুরের কমিশনার দিকে দিকে বার্তা পাঠিয়ে সৈন্য প্রেরণের জন্য অনুরোধ করলেন, যাতে সাঁওতাল বিদ্রোহী জনতা ভাগলপুরে পৌঁছিবার পূর্বেই তাদের ধ্বংস করা সম্ভব হয়। হাজার হাজার সাঁওতাল বিদ্রোহী সমস্ত বাধা অতিক্রম করে একের পর এক নতুন অঞ্চল দখল করে, মাদল বাজাতে বাজাতে সামনে এগিয়ে চললো।

ভাগলপুরের ভারপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর মেজর মিঃ বরোজ তার ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে দশ হাজার সাঁওতাল ফৌজের বিশাল বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করতে ভয় পেয়ে গেল। দানাপুর, ছোটনাগপুর, সিংভূম, হাজারীবাগ, মুঙ্গের হতে বিপুল সংখ্যক সেনা আসে বিদ্রোহ দমন করতে।

১৮৫৫ সালের ১৬ জুলাই ভাগলপুরের পিয়ারপুরের কাছে পীর বাইতির ময়দানে মেজর বরোজের বিপুল সংখ্যক সৈন্যের সঙ্গে বীর বিদ্রোহী সাঁওতাল বাহিনীর এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়। মৃত্যু ভয়হীন সাঁওতালেরা মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করে ইংরেজ সৈন্যদের পরাজিত করে। মেজর বরোজের বাহিনীর বেশ কিছু অফিসার ও সাধারণ সেনা এই যুদ্ধে নিহত হয়। চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করে জীবিত কিছু সেনাসহ বরোজ যুদ্ধক্ষেত্র হতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। এই যুদ্ধে সাঁওতালদের হাতিয়ার ছিল শুধু ঘরোয়া হাতিয়ার। পরাজিত শত্রুর নিকট থেকে বিদ্রোহীরা বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলা বারুদ ছিনিয়ে নেয়।

ক্রমশ ইংরেজ বাহিনীর আক্রমণ ধ্বংস করে বিদ্রোহীরা বাংলা, বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করে, সাময়িকভাবে হলেও সাঁওতাল রাজ প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

আতঙ্কে দিশেহারা ইংরেজ শাসকবৃন্দ সাঁওতালদের প্রতিষ্ঠিত মুক্ত এলাকায় সামরিক আইন জারির পরিকল্পনা করে। বিদ্রোহী নায়ক ও তাদেরসহ নেতৃত্বকে ধরে দেবার জন্য বিভিন্ন পরিমাণে আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করে। বিদ্রোহীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়। তলে তলে গোপনে বিদ্রোহীদের নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা চলতে থাকে।

বিদ্রোহীদের সঙ্গে মেজর বরোজের সৈন্যবাহিনীর চূড়ান্ত মোকাবেলা সংগঠিত হবার পূর্বেই সাঁওতালেরা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মূলঘাঁটি পাকুড় রাজবাড়ি ও অম্বর পরগণার জমিদারের কাছারিবাড়ি দখল করে। এই আক্রমণের দিন ছিল ১৮৫৫ সালের ১২ জুলাই। চাঁদ ও ভৈরব এই আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। উভয় স্থান থেকেই বিদ্রোহীরা বিপুল পরিমাণে ধনসম্পদ, মজুত খাদ্য, অন্যান্য জিনিস লুট করে জনসাধারণের মধ্যে বিলি করে দেয়।

ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিদ্রোহীরা ইংরেজ সৈন্যদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে মনোবল গুঁড়িয়ে দেয়। পরাজিত বাহিনীর ওপর ভরসা করতে না পেরে অত্যাচারী জমিদার, সুদখোর মহাজন, রাজা, নীলকর সাহেব কুঠিবাড়ি, ধনসম্পদ ত্যাগ করে নিরাপদ অঞ্চলে পালিয়ে যায়। মহারাজা, রাজা, জমিদার, মহাজন, নীলকর সাহেব মুর্শিদাবাদের নবাব সকলে মিলে পুনরায় ধনসম্পদ লোকবল একত্রিত করে বিদ্রোহীদের হাতে পরাজয়ের প্রতিহিংসা গ্রহণের উদ্দেশ্যে কলকাতার ইংরেজ গভর্নরের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

অর্থ, অস্ত্র, রসদ লোকবল সংগ্রহ করেও সাঁওতালদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসঘাতক, বেইমান দেশীয় সামন্তশ্রেণির নিকট হতে আদায় করে, বিদ্রোহ দমন করার লক্ষ্যে এক বিপুল সংখ্যক সৈন্যবাহিনীকে ইংরেজ শাসকেরা বিদ্রোহ অধ্যুষিত অঞ্চলে পাঠায়।

আতঙ্কে দিশেহারা তৎকালীন ইংরেজদের সাময়িক পত্রিকা ক্যালকাটা রিভিউ সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে- ‘এই অসভ্য কালো ভূতগুলির মনে মৃত্যুভয় জাগাইয়া তোলা ব্যতীত এই বিদ্রোহ দমনের অন্য কোন উপায় নেই। প্রত্যেকটি পরাজয় এবং হত্যার প্রতিশোধ যেন অতি ভয়ঙ্কর হয়। ভবিষ্যতে তারা যেন আর কোন বিদ্রোহ করতে সাহসী না হয়। কেবল বিদ্রোহের নায়কদেরই নয়, সকল বিদ্রোহী সাঁওতালকেই বার্মার ভয়ঙ্কর জঙ্গলে নির্বাসিত করতে হবে, না হয় গুলি করে অথবা ফাঁসিতে হত্যা করতে হবে।’

বড় লাট ডালহৌসির নির্দেশে ব্রিগেডিয়ার লয়েডের নেতৃত্বে কামান, বন্দুক ইত্যাদি আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত এক বিরাট সৈন্যদল গ্রামে তাঁবু ফেলল। মধ্যরাত্রে কানু, সিধোর বাহিনী ইংরেজ শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আকস্মিক আক্রমণে কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইংরেজ সৈন্যবাহিনী পরাজিত এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। ইংরেজ বাহিনীর সমস্ত আগ্নেয়াস্ত্র গোলাবারুদ বিদ্রোহীরা দখল করে। বিজয়ী বাহিনী গঙ্গার তীর ধরে গলসা পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে রানীগঞ্জ দখল করে।

তারা মুর্শিদাবাদ অভিযানকালে কালিকাপুর, বল্লভপুর প্রভৃতি গ্রামের মহাজন ও সুদখোরদের গৃহ ধ্বংস করে ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। মহেশপুর আক্রমণ করে বিদ্রোহীরা সমস্ত ধনরত্ন বাজেয়াপ্ত করে। এই মহেশপুরে বিশাল ইংরেজ বাহিনীর সাথে সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা কানু, সিধোর আরও একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে বহু সাঁওতাল বীর যুদ্ধ করে প্রাণ দেয়। ইতিমধ্যে ভাগলপুরের যুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ দুই সাঁওতাল নেতা দস্যু ইংরেজ বাহিনীর হাতে নিহত হয়। অপরদিকে প্রায় ৫ হাজার বিদ্রোহী ত্রিভূবন ও মান সিং মাঝির নেতৃত্বে দুমকার নিকট নীলকুঠি আক্রমণ করে ধূলিস্যাৎ করে এবং অত্যাচারী নীলকর সাহেবদের হত্যা করে।

বড় লাটের নির্দেশে পূর্ব ভারতের সমস্ত সৈন্য একত্র করে সাঁওতাল বিদ্রোহ ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে। সাঁওতাল বিদ্রোহের আতঙ্কে কম্পমান ইংরেজ শাসকরা বিভিন্ন স্থান থেকে পদাতিক, গোলন্দাজ, অশ্বারোহী বাহিনী সংগ্রহ করে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের মোকাবেলা করার পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়। দেশীয় রাজা, মহারাজা, জমিদারবর্গ অর্থ অস্ত্র খাদ্য লোকবল যোগান দিয়ে ইংরেজ বাহিনীর শক্তি বাড়ায়।

মুর্শিদাবাদের নবাব সৈন্য, অস্ত্র, রসদ, খাদ্য ছাড়াও তার সুশিক্ষিত হস্তীবাহিনী প্রেরণ করার মাধ্যমে ইংরেজ শাসকদের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দিল। নীলকর দস্যুরাও অর্থ, অস্ত্র, খাদ্য যোগান দিল। পূর্ববঙ্গের সমস্ত সামরিক শক্তি সংগ্রহ করেও ইংরেজ শাসক নিশ্চিত হতে পারে না। নিশ্চিতরূপে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জয়লাভের উদ্দেশ্যে পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন স্থানের সৈন্যদের নিয়ে আসে। দেড় বৎসর কাল ধরে স্বাধীনতা সংগ্রামরত সাঁওতালদের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন সামরিক শক্তির সমাবেশ ঘটে। মুখোমুখি হলো কামান, বন্দুক আর তীর, বল্লম, কুঠার।

বীরভূম, মুর্শিদাবাদ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইংরেজ সৈন্যদের সাথে বিদ্রোহী সাঁওতাল বাহিনীর মরণপণ যুদ্ধ হয়। এই অসম যুদ্ধে দলে দলে সাঁওতাল নারী-পুরুষ যুদ্ধ করতে করতে অকাতরে প্রাণ বলি দিল। যেখানে ইংরেজ বাহিনী পরাস্ত হল সেখানে মত্ত হস্তি ছেড়ে দিয়ে গ্রাম, ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেয়া হলো। বহু নারী, শিশুকে মত্ত হস্তী পদপিষ্ঠ করলো। যুদ্ধে ইংরেজরা চূড়ান্ত কপটতার আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।

সম্মুখ যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে জঙ্গলের গভীরে আশ্রয় গ্রহণ করে হঠাৎ আক্রমণ করে বিদ্রোহী বাহিনী ইংরেজদের প্রচুর সৈন্য ধ্বংস করে।

বিদ্রোহীদের মূলঘাঁটি বরহাইত অঞ্চলে কামান, বন্দুক, হস্তীবাহিনী সুসজ্জিত ইংরেজ সৈন্যদলের সাথে বিদ্রোহী সাঁওতাল বাহিনীর এক ঘোরতর যুদ্ধ হয়। বিদ্রোহী বাহিনী এই যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে। পশুশক্তি আগুন দিয়ে সাঁওতালদের গ্রামগুলি ধ্বংস করে দিল।

উত্তর পশ্চিমের ভাগলপুর, দক্ষিণ পশ্চিমে তালডাঙ্গা থেকে রাজমহল, বীরভূমের নলহাটি, রামপুরহাট, সিউড়ি প্রভৃতি স্থানকে কেন্দ্র করে বাংলা, বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী সাঁওতালগণ নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তৎকালীন বহু সরকারি বেসরকারি বিবরণে এ সত্য স্বীকার করা হয়েছে। শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু থাকা পর্যন্ত বিদ্রোহী সাঁওতালরা যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করেনি। বিদ্রোহী সাঁওতালেরা তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে বিদ্রোহের বিস্তার ঘটায় মুঙ্গের অঞ্চলে। এই ঘটনায় ইংরেজ বাহিনী উল্লসিত হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানায় যে বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়েছে।

ইংরেজ শাসক সাঁওতাল বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। আত্মসমর্পণ করলে তাদের মার্জনা করা হবে। বিদ্রোহী সাঁওতালেরা ঘৃণাভরে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ১৮৫৫ সালের ১০ নভেম্বর ইংরেজ সরকার প্রচলিত আইন মারফত বিদ্রোহীদের দমন করতে অসমর্থ হয়ে, বঙ্গদেশের বীরভূম, মুর্শিদাবাদসহ বিহারের ভাগলপুর পর্যন্ত বিশাল আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে সামরিক আইন জারি করে। সমগ্র অঞ্চলটি সামরিক বাহিনীর হস্তে ন্যস্ত হয়। এর সুবিধা হলো আইন আদালত সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন নেই। সামরিক আদালত অবাধে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অধিকার পেল।

আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ইংরেজ বাহিনী গ্রামে গ্রামে মত্ত হস্তী নিয়ে হত্যা, লুণ্ঠন, ধ্বংস শুরু করে। হাজার হাজার বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ শিশুকে হত্যা করে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ফসলের ক্ষেতে মত্ত হস্তী ছেড়ে দিল। গ্রামের পর গ্রাম জনমাবনশূন্য হয়ে গেল। বিদ্রোহীরা সম্মুখ যুদ্ধ না করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে প্রাণপণে ইংরেজ শক্তিকে বাধা দিল। কিন্তু পর পর কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বিদ্রোহীরা হতাশ হয়।

এই ডামাডোলের মাঝেই একদিন হতাশ একদল সাঁওতাল, বীরশ্রেষ্ঠ নায়ক সিধোর গোপন আশ্রয়স্থলের সংবাদ ইংরেজদের জানিয়ে দেয়, সম্ভবত ১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১০/১২ তারিখে। ইংরেজ সৈন্যরা সিধোকে গোপন আশ্রয়স্থল হতে গ্রেফতার করেই গুলি করে হত্যা করে। সিধো, চাঁদ, ভৈরব বীরের মৃত্যুবরণ করলেন। কানু তখনও জীবিত। ছত্রভঙ্গ সাঁওতালদের একত্রিত করে যুদ্ধপ্রস্তুতির জন্য কানু আগুনের মত জ্বলে উঠলেন। আবার বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়, বহু ইংরেজ সৈন্য প্রাণ হারায়। সংগ্রামের প্রতি নিষ্ঠা, আত্মত্যাগই ছিল বিদ্রোহীদের মূলশক্তি। এই শক্তির বলে বলীয়ান হয়েই তারা যুদ্ধ করেছে।

১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯/২০ তারিখে একদল সশস্ত্র ইংরেজ সৈন্যের বিরুদ্ধে বীরভূম জেলার ওপারে বাঁধের নিকটে যুদ্ধ চলাকালীন ঘেরাও হয়ে যান বীর বিদ্রোহী নেতা কানু। কোনমতেই ঘেরাও হতে বের হতে পারেননি। ইংরেজ সৈন্যরা আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিলে কানু ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে পুনরায় তীরনিক্ষেপ করে একজন সেনাকে হত্যা করেন। ইংরেজ সেনা তৎক্ষণাৎ গুলি করে কানুকে হত্যা করে। অন্যান্য সাঁওতাল নেতারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। অসমশক্তি নিয়ে তুলনায় বিপুল শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ধীরে ধীরে থেমে যায়। বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী কেউ-ই আর তখন জীবিত নেই। শেষ যুদ্ধ বিদ্রোহীরা করেছিল শরীরে প্রাণ থাকা পর্যন্ত। আত্মসমর্পণ ছিল তাদের অজানা।

কপটতা এবং দস্যুবৃত্তি যাদের পেশাগত, অস্থিমজ্জায় যাদের ভণ্ডামি, হিংস্রতা মিশে ছিল, পরাজিত সাঁওতালদের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিল, তা পরবর্তীকালে সংগঠিত মহাবিদ্রোহ থেকে ৪৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজ দস্যুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহের ঘটনার মধ্যেই ভারতবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

এই বিদ্রোহের পরাজয় সাঁওতালদের মধ্যে হতাশা ও গ্লানির জন্ম দেয়। বহুমাত্রায় অত্যাচার, উৎপীড়ন বৃদ্ধি পায়। মূল নেতৃত্বের মৃত্যুতে মাদলধ্বনি থেমে যায়। এক বিরাট অংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পাহাড় ও জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। অপর অংশ গঙ্গা পার হয়ে মালদহ, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি জেলায় নতুন করে ঘর বাঁধে। ৫০ হাজার বিদ্রোহীর মধ্যে ২৫ হাজার বিদ্রোহীর রক্তে বাংলা ও বিহারের মাটি লাল হয়ে যায়। কিভাবে অকাতরে স্বাধীনতার জন্য এক বিরাট শক্তি জান দিয়েছে মান দেয়নি, আদালতের নথি তারই প্রমাণ। আদালতে ২৫১ জন বিদ্রোহীকে রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে ১৯১ জন সাঁওতাল। বাকিরা ডোম, চামার, কর্মকার, মুসলমান (মোমিন), তাঁতী, ধাঙর, গোয়ালা, ভূঁইয়া ইত্যাদি নিম্ন বর্গের মানুষ। বালকের সংখ্যা ৪৬, যাদের বয়স ছিল ৯/১০ বৎসর। বিচারে বিচারক বালকদের বেত মারার আদেশ দেন, অন্যদের ৭ থেকে ১৪ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

প্রত্যক্ষ বিদেশি শাসনের অবসান হলেও পরোক্ষ শোষণ আজও বিদ্যমান। যে দাবি নিয়ে সাঁওতাল ও তার সহযোগিরা লড়াই করেছিল, তা আজও পূরণ হয়নি। সাঁওতালদের দাবি আজ সাধারণ দাবিতে পরিণত হয়ে বনভূমি হতে রাজপথে পৌঁছে গিয়েছে। তৎকালীন তাদের দাবি আজও কৃষক অব্যাহত রেখেছে বার বার লড়াই করে। এই উপমহাদেশের কৃষককে সম্মানের আসনে বসিয়েছে। কৃষককে আজ কোন শাসক উপেক্ষা করতে পারে না। আজ পর্যন্ত চলে আসা সমস্ত কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৫৫ সালের প্রথম সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৭) একটি মাইল স্টোন।

সাঁওতাল বিদ্রোহের মাদলধ্বনি সাময়িকভাবে বন্ধ গেলেও একেবারে স্তব্ধ হয়নি। ভারতীয় উপমহাদেশে কৃষক জনতার উত্তাল আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামে আজও বর্তমান কালের কৃষক সংগ্রামীদের প্রেরণা যোগায়- ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম সাঁওতাল বিদ্রোহ। যতদিন না দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক জনতার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম বিজয় অর্জন করছে, ততদিন অব্যাহত থাকবে সাঁওতাল বিদ্রোহের মাদলধ্বনি।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লববার্ষিকী ২০১৭

 


One Comment on “কৃষক বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত”

  1. Rabin das says:

    ধন্যবাদ,

    Like


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.