A – Army, B – Blast, C – Communist: শিশুদের জন্যে মাওবাদীদের স্কুল পাঠ্যসূচী

c7aa70f8993262b6ca15252a474a4477c45b5a5f-tc-img-preview

নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় মাওবাদী ক্যাম্প থেকে পাওয়া মাওবাদী স্কুল পাঠ্যক্রমগুলোর একটি নোট

সম্প্রতি ছত্তিসগড়ের বস্তারে মাওবাদী ক্যাম্পে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় মাওবাদীদের পরিচালিত স্কুল পাঠ্যক্রমগুলোর নোট ও বই পুনরুদ্ধারের পরে এসব স্কুলগুলো সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা যাচ্ছে।

মাওবাদীরা এসব স্কুলগুলোতে তাদের মতাদর্শে শিশুদের গড়ে তোলার জন্যে নিজস্ব শিক্ষা পাঠ্যসূচী প্রণয়ন করেছে। ঐ সমস্ত অঞ্চল সমুহে মাওবাদী গণযুদ্ধের বাস্তবতা অনুযায়ি শিশুদের জন্যে প্রণয়ন করা হয়েছে বর্ণমালা। যেমন- “A for Army, Aim / B for Bomb, Blast / C for Communist…” উল্লেখযোগ্য।

মাওবাদী অধ্যুষিত জঙ্গলে সিপিআই (মাওবাদী)’র ক্যাম্পে চালিত এই সব স্কুলে মাওবাদীদের শিশু স্কোয়াড ‘বাল সাঘম’ এর সদস্য এবং অন্যান্য আদিবাসী শিশুদের (যাদের মা বাবা নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে সংঘর্ষে নিহত বা হত্যার শিকার হয়েছে) জন্যেই মাওবাদীরা এই আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে।

বস্তারের একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা asianage.com সংবাদপত্রকে বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি যে, মাওবাদী স্কুলে তাদের সহিংসতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য মাওবাদীদের চালচলন কিভাবে মস্তিষ্ক থেকে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা আমরা জানতে পেরেছি”। মাওবাদী স্কুলের একজন প্রাক্তন শিক্ষক এবং সিপিআই (মাওবাদী) এর কিস্তারাম এলাকার কমিটির সদস্য ২৫ বছর বয়সী মচুকি হিডমা সুকমা জেলার একটি জঙ্গলে সম্প্রতি গ্রেফতার হন।

বস্তারের এক পুলিশ কর্মকর্তা মচুকি’র উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, কিভাবে নকশাল স্কুলগুলিতে অর্ধ-শিক্ষিত নকশালী ও রাষ্ট্রের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত মাওবাদী সদস্যদের বিধবা স্ত্রী বা স্বামীদের নকশাল স্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব স্কুলগুলোতে প্রত্যেক শিক্ষককে প্রতি মাসে ১৫০০ রুপী বেতন দেয় স্থানীয় জনতা’র সরকার। বিদ্রোহী এই জেলাগুলোর গ্রামকে মাওবাদীদের সমান্তরাল সরকার, বিদ্রোহীদের ভাষ্যে ‘মুক্ত অঞ্চল’ বলে অভিহিত করা হয়।

মুচকি জানান, ১৭ বছর আগে মাওবাদীদের একটি দল তাকে তার মা-বাবার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায় এবং ৮ বছর বয়সে তিনি বাল সেনঘামে চলে যান। গ্রেফতার হওয়ার আগে তিনি মাওবাদীদের কিষানতাম এলাকার কমিটির সদস্য পদে উন্নীত হন।

মুচকি’র মতে, ৬-১০ বছর বয়সী প্রায় ২৫জন আদিবাসী শিশু তার স্কুলে অধ্যয়নরত ছিল, যেখানে আরও ২ জন নকশাল শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ডঃ বর্ণিকা শর্মা,  যিনি সংঘাতময় বস্তার অঞ্চল নিয়ে পোস্ট ডক্টোরাল গবেষণায় জানান – মাওবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত কয়েকটি সরকারী স্কুল পরিদর্শনে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি স্বাধীনতা ও প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনে “লাল সালাম” এর স্লোগান দিয়ে ছাত্ররা চিৎকার দিয়েছিল।

সম্প্রতি ,মাওবাদীদের দ্বারা মুক্তিপ্রাপ্ত ২২ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ বস্তার জেলার আবুজমাদ এলাকার নারায়নপুরের একটি স্কুলে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা ছাত্রদের নকশাল বিপ্লবী হতে প্রভাবিত করেছে সশস্ত্র মাওবাদীদের একটি স্কোয়াড। ঐ সময় মাওবাদীরা ছাত্রদের বলে “আপনারা যদি নকশাল হন, তাহলে আপনারা পৃথিবীর শাসন করবেন এবং যদি আপনি ডাক্তার বা প্রকৌশলী হন, তবে একজন সরকারী কর্মচারী হিসেবে আপনাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে । “শক্তি, স্টেথোস্কোপ (ডাক্তারের) থেকে নয়, বন্দুকের ব্যারেল থেকে বের হয়” বলেও ছাত্রদের জানায় নকশালরা।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এসব মাওবাদী স্কুলের আদিবাসী শিশুদের মধ্য থেকে বেছে নেয়া একটি নির্বাচিত দলকে বুনিয়াদী কমিউনিস্ট প্রশিক্ষণ স্কুলে (বি.সি.সি.এস.- একটি বিশেষায়িত মাওবাদী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) নকশাল মতাদর্শের উপর ছয় মাসের কোর্স/প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং বিশেষ অস্ত্রশিক্ষা প্রশিক্ষণে অধ্যয়ন করতে দেয় মাওবাদীরা।

স্থানীয় শীর্ষস্থানীয় মাওবাদীরা শিক্ষার্থীদের স্কুলে গিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন এবং ছাত্রদের দৃঢ় নকশালে পরিণত করেন। মাওবাদীরা “সি ৪ আই” (কমান্ড, কন্ট্রোল, যোগাযোগ, সমন্বয়, বুদ্ধিমত্তা) নামে মোবাইল স্কুলও পরিচালনা করে, যেখানে সীমিত বালসংঘের সদস্যরা, স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নির্বাচিত, গেরিলা যুদ্ধে প্রশিক্ষিত হয়।

এই ধরনের স্কুলগুলি বিভিন্ন ধরনের কাজ করে থাকে, মাওবাদীদের নগর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য, সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী বাচ্চাদের সমালোচনা করে মাওবাদী আদর্শে প্রভাবিত করা, পাশাপাশি যোদ্ধা হিসেবেও কাজ করা। নকশালরা সরকারি বিদ্যালয়ের ভবনগুলিকে ধ্বংস করে দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর মাওবাদী দমনের কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করার ফলে বস্তারের অভ্যন্তরে মাওবাদীদের স্কুলগুলোর বিকাশের চিত্র ফুটে উঠেছে।

কিছুদিন আগে মাওবাদীদের বস্তার পশ্চিমাঞ্চলীয় কমিটির তৎকালীন সচিব ‘মাধভি’র একাধিকবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বস্তার জেলার দূরবর্তী এলাকায় নকশালরা স্কুল চালাচ্ছে।

একটি সরকারি হিসাবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে বস্তার বিভাগের প্রত্যন্ত অঞ্চল, দান্তেওয়াড়া, সুকমা, বিজয়পুর, কাঁকর, নারায়ণপুর, বাষ্টার ও কান্দগাঁওসহ সাত জেলায় মাওবাদীরা ১০৯টি সরকারি স্কুল ধ্বংস করেছে।

নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করেছে যে, তারা মাওবাদীদের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করেছে এবং জঙ্গলের বহু মাওবাদী-পরিচালিত বিদ্যালয় ধ্বংস করেছে। স্টেট ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (এসআইবি) সূত্র বলছে যে, বালসংঘের ছাত্ররা স্থানীয় ভাষা এবং গণযুদ্ধের ইংরেজী বর্ণমালার শেখার মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে – যা মূলত মাওবাদী মতাদর্শের সাথে তাদের যুক্ত করা।

 

Advertisements