বাংলাদেশের নারী চা-শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম

37822831_303

বাংলাদেশের চা নারী শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম সম্পর্কে লিখতে গেলে বর্তমান পরিস্থিতির আলোচনাটাই যথেষ্ট নয়। তাদের অতীত ইতিহাস তুলে না ধরলে তাদের জীবন সংগ্রামের ইতিহাসটা আংশিকই বলা হবে। তাদের বাংলাদেশে আগমনের পূর্ব ইতিহাস ও সংগ্রাম তুলে ধরাটাও প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।

বৃটিশ ভারতের আসামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮২৮ সালে এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৮৪০ সালে চা উৎপাদন শুরু করে । চা উৎপাদনের জন্য চীনা শ্রমিকরা অভিজ্ঞ ছিল বলে সেখান থেকে প্রথম শ্রমিক আমদানি করা হয়। কিন্তু আবহাওয়া, পরিবেশ এবং গৃহ সমস্যার কারণে শ্রমিকরা চলে যায় বা রোগে মারা পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে কোম্পানি ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে আদিবাসী কৃষি শ্রমিকদের আমদানি করে। যার মধ্যে বিহারের রাঁচি, হাজারিবাগ, সাঁওতাল পরগণা, ডুমকা ও গয়া, উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্চ, গঞ্জ, সম্বলপুর ও চাইবাসা এবং মধ্যপ্রদেশের রায়পুর, রামপুর হাট ও চকলপুর, উত্তরপ্রদেশ, মাদ্রাজ এবং পশ্চিমবঙ্গ উল্লেখযোগ্য। চা শ্রমিকদের এক বিশাল অংশ উদ্বৃত্ত কৃষি শ্রমিকদের মধ্য থেকে এসেছিল।

 চা শ্রমিক সংগ্রহ পদ্ধতি তখন ‘ফ্রি কন্ট্রাক্টস’ নামে পরিচিত ছিল। এটি ছিল অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। এই ব্যবসার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা কপটতা, মিথ্যাচার, শক্তি প্রয়োগসহ নান রকম অমানবিক পন্থা অবলম্বন করে লোভ-লালসা দেখিয়ে শ্রমিকদের আসামে আসতে প্রলুব্ধ করতো। যা মধ্যযুগের ইউরোপিয়ানদের দাস ব্যবসাকেও হার মানায়। এই শ্রমিকরা আসামে যাওয়ার পথেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। যারা বেঁচে থাকত তাদেরও বাগান কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণ, গৃহ, চিকিৎসা সমস্যা এবং খাদ্য সরবরাহের স্বল্পতায় নিদারণ দুঃখ কষ্টের মধ্যে ফেলে দিত। ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৭ সালের মধ্যে ৮৪,৯১৫ জন শ্রমিক আসামে আসলেও ১৮৬৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ৩০,০০০ শ্রমিক প্রাণ হারায়। তা সত্তেও¡ শ্রমিক সংগ্রহ বন্ধ থাকেনি। পর্যায়ক্রমে আসামের অন্যান্য অঞ্চলের মত সিলেট ও চট্টগ্রামের সকল বাগানেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে চা শ্রমিক আমদানি করা হয়েছে। চা-শ্রমিকরা বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী থেকে এসেছেন। তাদের মধ্যে ওরাওঁ, মুন্ডা, সাঁওতাল, খরিয়া, খারওয়ার, ভুইহার, মাল, রাজ গন্দ, কিসান, নাগেসিয়া, তাঁতি, বড়াইক, মাহালিসহ আরো অনেক জাতি। কোন কোন গবেষক ১০৪টি চা-শ্রমিক জাতির উল্লেখ করেছেন।

 মিথ্যা প্রলোভন, শক্তি প্রয়োগ, এবং প্রতারণার জন্য শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিবাদ করা হলেও কোন ফল আসেনি। শ্রমিকদের চা শ্রমে বাধ্য করার জন্য ইস্ট ইন্ডয়া কোম্পানি এবং বৃটিশরা ১৮৫৭ সালে নানা রকম আইন-কানুন জারি করে। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ থেকে দাবি-দাওয়া বা প্রতিরোধের জন্য শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা হয়। কিন্তু বর্বরোচিতভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে বাগান মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি হ্রাসের উদ্যোগ নিলে বৃটিশ বিরোধী জনগণের অসহযোগ আন্দোলন চা শ্রমিকদের মধ্যেও প্রভাব ফেলে। তারা  নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চা বাগানের দাস ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঐ সময়ে নারী পুরুষ শিশুসহ প্রায় ত্রিশ হাজার শ্রমিক নিজেদের আদি বাসস্থানের উদ্দেশ্যে বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পরে। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য বাগান থেকে শ্রমিকরা বেরিয়ে যায়। চা-শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীপংকর মোহান্তের প্রবন্ধ ‘সিলেটের চা-শ্রমিক আন্দোলন’ থেকে জানা যায়, সিলেট বরমচাল, কুলাউড়া, শমসেরনগর, শ্রীমঙ্গল, সাতগাঁও এবং শায়েস্তাগঞ্জ রেল স্টেশনে অজস্্র শ্রমিক জমা হয়। শ্রমিকরা যাতে এলাকা ত্যাগ করতে না পারে সেজন্য শ্রমিকদের রেলওয়ের টিকিট না দেওয়ার জন্য প্রশাসন আদেশ জারি করে।

এই শ্রমিকরা টিকেট না পেয়ে রেললাইন ধরে চাঁদপুর ঘাটে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করে। চারিদিক থেকে চাঁদপুরে এসে শ্রমিকরা জড়ো হতে শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল নদী পাড়ি দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটে যাবে। গোয়ালন্দগামী স্টিমার ঘাটে এসে পৌঁছতেই শ্রমিকরা স্টিমারে উঠার চেষ্টা করে। বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে আগেই সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। একটা হুইসেল বাজতেই পুলিশ শ্রমিকদের লক্ষ করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। গুলিতে অনেকে মারা যায়, বাকীরা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পালিয়ে যায়। গভীর রাতে বৃটিশ কোম্পানির কর্তৃপক্ষ প্রলোভন দেখিয়ে এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে শ্রমিকদের বাগানে ফেরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ফলে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গুর্খা সৈন্যরা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে অনেকের মৃত্যু হয়। চাঁদপুরে চা শ্রমিকদের উপর নৃশংস হামলার প্রতিবাদে সাধারণ হরতাল আহ্বান করা হয়। এতে জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। আসাম-বাংলার রেল ও জাহাজ কোম্পানির কর্মচারীরা হরতালসহ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। তাদের ধর্মঘট অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে থাকে এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাসহ অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। রেলকর্মচারীদের ধর্মঘট প্রায় আড়াই মাস স্থায়ী হয়। চার হাজার পাঁচশত রেল কর্মচারী চাকুরিচ্যুত হন। শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া নেতৃত্বে চলমান আন্দোলন আপোষের মাধ্যমে চা-শ্রমিকদের আন্দোলনেরও সমাপ্তি ঘটে। এই সময় চা শ্রমিকদের কোন ইউনিয়ন ছিল না। ১৯৩৮ সালে ‘শ্রীহট্ট কাছার কমিউনিস্ট পার্টি’ শ্রমিকদের মধ্যে আন্দোলন গড়ে তুলতে ‘শ্রীহট্ট কাছার চা-শ্রমিক ইউনিয়ন’ গঠন করে। এবং কিছু দাবি-দাওয়াও উত্থাপন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় আন্দোলন-সংগ্রাম চললেও বৃটিশ ভারতের চা-শ্রমিকদের দাসসুলভ জীবনের কোন পরিবর্তন আসেনি বাংলাদেশ সময়েও।

বাংলাদেশে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, বৃহত্তর সিলেট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ, লালমনিরহাটে ১৬২টি বাণিজ্যিক ভিত্তিক চা বাগান রয়েছে। বিশ্বের চা উৎপাদনের ৩% বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। চা বাংলাদেশের রপ্তানীকারক অর্থকরী ফসল। ২০১৫ সালে ৬৭.৩৮ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়। ২০১৬ সালে ৭০ মিলিয়ন কেজি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা দেয়া হয়েছিল (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। বাংলাদেশে তিন লক্ষাধিক খোদ চা-শ্রমিক-এর ৭৫% নারী।

 বাংলাদেশ আমলে চায়ের উৎপাদন বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের জীবনমান বৃটিশ আমলের মতই রয়ে গেছে। বৃটিশ আমলে চা শ্রমিকদের মজুরি ছিল সর্বপ্রথম ২১ টাকা। পর্যায়ক্রমে ২৮ টাকা, ৪৮ টাকা ও ৬৯ টাকা। সর্বশেষে ২০১৫ সালে নির্ধারণ করা হয় ৮৫ টাকা। রেশনসহ তাদের দৈনিক শ্রমের মূল্য পড়ে ১৫৬ টাকা। দৈনিক ৮ ঘণ্টা টানা পরিশ্রম করে ২৩ কেজি চা পাতা তুলতে পারলে ৮৫ টাকা মজুরী দেয়া হয়। ২০ কেজির কম হলে ৮০ টাকারও কম মজুরী দেয়া হয়। ২৩ কেজি তোলার কথা থাকলেও ২৪ কেজি পাতা সংগ্রহের বিনিময়ে মজুরী দেয়া হয়। অতিরিক্ত কেজি প্রতি সাড়ে তিন টাকা করে দেয়। এই ৮৫ টাকা দিয়ে ৪ জনের একটি পরিবার কীভাবে চলে আকাশ ছোঁয়া এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে। মাসে একজন শ্রমিকের বেতন পড়ে ২,৫৫০ টাকা যাতে একজন শ্রমিকের খাওয়া খরচও হয় না। এই মজুরীতে তাদের জীবন চলে না বলেই তারা বাড়তি আয়ের জন্য বাগানে কাঠ সংগ্রহ করে, ঘরে হাঁস-মুরগী, গুরু-ছাগল পালে। কোন কোন বাগানের শ্রমিকরা চা বাগানের জঙ্গল কেটে ধান, শাক-সব্জি উৎপাদন করে। শ্রমিকরা দুই সপ্তাহে একবার বাজারে গিয়ে সবচেয়ে সস্তা সিলভারকার্প মাছ কিনে খেতে পারে। তারা সকালে শুকনা মরিচ দিয়ে চা-পাতা ভাজা খেয়ে কাজে যান। দুপুরে খান শুকনা রুটি। আর দিন-রাতে মাত্র একবেলা ভাত খাওয়ার সুযোগ পান। কখনো টাকা না থাকলে ভাতও খেতে পারেন না।

আট বাই আটের একটি ঘরে দুটি করে রুম, এর এক কোনায় রান্নাঘর। এর মধ্যেই গাদাগাদি করে থাকছেন সাত-আট সদস্যের এক একটি পরিবার। কোন শ্রমিক বাগান কর্তৃপক্ষের দেয়া ঘরের বাইরে আলাদাভাবে ঘর বানাতে চাইলে বাগান কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় না। কেউ ঘর তৈরির উদ্যোগ নিলে সেই শ্রমিককে চাকুরিচ্যুত করার হুমকিও দেওয়া হয়। অথচ সরকারি শ্রম আইনের ৩২-ধারায় চা শ্রমিকদের জন্য বলা হয়েছে, একজন শ্রমিক অবসরে যাওয়ার পরই তাকে তার ঘর থেকে এক মাসের মধ্যে উচ্ছেদ করা হবে। বাগান মালিকদের দেয়া ঘরগুলোতে পল্লীবিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া যায় না। অথচ মাস শেষে শ্রমিকের বেতন থেকে কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎবিলের টাকা কেটে নেয়। হাঁস-মুরগি পালনের জন্য বছরে ১৫ টাকা কেটে নিচ্ছে। শ্রমিকের ঘরে যে মাটির চুলা আছে তার জন্যও বছরে ১২ টাকা কর দিতে হয়। আর গরু-ছাগল বাগানে ঢুকলে ৫০/১০০ টাকা জরিমানা করা হয়।

চা বাগানের একজন শ্রমিকের ছেলে যখন কাজের উপযুক্ত হয় তখন সেও তার বাবার মত বাগানে শ্রমিক হিসেবে যোগদান করবে- এটাই নিয়ম। এমনকি না চাইলেও সে ছেলে বিয়ে করলে তার স্ত্রীকেও শ্রমিক হিসেবে বাগানের কাজে বাধ্যতামূলক ঢুকতে হবে। চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকরা পুষ্টিহীনতা, ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং গর্ভকালীন সমস্যাসহ নানা রোগ-শোকে ভুগে ক্ষয় হচ্ছেন। এই নারী শ্রমিক বা পুরুষ শ্রমিকরাও ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে আছেন। বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সময় মজুরির আশায় ছুটিতে না গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নারী শ্রমিকরা কাজ করছেন। আর গর্ভকালীন সময়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানা ৮ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে পরিশ্রম করায় মা ও গর্ভের সন্তান উভয়ের ক্ষতি হচ্ছে। নারীরা সাধারণত চা বাগানে পাতা সংগ্রহ, নার্সারিতে গাছের কলম তৈরি  এবং চারা সংগ্রহ ইত্যাদি কাজ করেন। চা বাগানে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই তাদের গর্ভপাত হয়। কারণ এই শ্রমিকরা গর্ভধারণের পর থেকে সন্তান প্রসবের আগ পর্যন্ত ছুটি নেন না। মাতৃত্বকালীন সবেতন ছুটি তাদের কপালে নেই। তাই সন্তানকে পেটে নিয়েই রোদে পুড়ে আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে টানা কাজ করে যান। একজন প্রসূতি মায়ের এই সময়ে যে পরিমাণ বিশ্রাম ও সুষম খাদ্য খাওয়া প্রয়োজন তার কিছুই  ভাগ্যে জোটে না। অপুষ্টির শিকার একজন নারী শ্রমিক যে সন্তানের জন্ম দেন সে সন্তানও নানা জটিলতা নিয়ে জন্ম নেয়। সন্তান পেটে নিয়ে কাজ করায় তাদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট হয়। নানা ধরনের শারীরিক জটিলতাও দেখা দেয়। কিন্তু কোন উপায় না থাকায় তাদের কষ্ট সহ্য করতে হয়। বাগানে কাজ করার সময় নারী শ্রমিকরা পানি পান বা সুপারি খাওয়ার সময়ও কর্র্তৃপক্ষ অসদাচরণ করে থাকে। পর্যাপ্ত নলকূপ বা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও থাকে না। চা বাগানের মধ্যে প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই; যা আছে তার অবস্থাও খারাপ। ফলে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আবার বড় ধরনের রোগ হলে মালিকরা অর্ধেক খরচ দেয়। পেটের ব্যথা, মাথার ব্যথা, বুকের ব্যথায় একই ধরনের ঔষধ প্যারাসিটামল দেয় বলে শ্রমিকদের ভাষ্য।

শিক্ষাক্ষেত্রে চা-শ্রমিকদের সন্তানরাও বঞ্চিত। শ্রম আইনানুযায়ী কোন চা-বাগানে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেই সেই বাগান কর্তৃপক্ষকে সেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু বাগান কর্তৃপক্ষ তা করছে না। সরকারিভাবে চা বাগানগুলোতে স্কুল তৈরি করা হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে তা অপর্যাপ্ত। আর স্কুলগুলোর শিক্ষার মানও নিম্ন। অর্থের অভাবে সন্তানরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। বাসস্থান থেকে স্কুল দূরে হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অনেকেই স্কুলে যায় না। যারা সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করছেন তারা টাকা ঋণ করে লেখাপড়ার খরচ চালান। কোন শ্রমিকের সন্তান যদি উন্নত জীবন-যাপনের উদ্দেশ্যে লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত হয় তাহলেও তাদের চাকরি পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাদের নিজস্ব বাড়ী (জমি) বা বাসস্থানের ঠিকানা না থাকায় উচ্চ শিক্ষা নিয়েও চাকরির সুযোগ পাচ্ছে না।

      চা-শ্রমিক নারীদেরও পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন সহ্য করতে হয়। চা-বাগানে নারী শ্রমিকরাই কাজ করেন বেশি । নারীরা সপ্তাহের তলবের সব টাকাই স্বামী বা বাবার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। ১০/২০ টাকা লুকিয়ে নিজের কাছে রেখে দিলে ধরা পড়লে কপালে জোটে নির্যাতন। পুরুষরা মেয়েদের টাকা দিয়ে সদাই করে, ধার শোধ করে এবং তার পর যায় ভাটি খানায়। সেখানে বাংলা মদ খেয়ে এসে বউ পিটায়। যা পুঁজিবাদী-পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থারই নগ্নরূপ। আদিবাসী চা-শ্রমিক হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী এবং বিজ্ঞান শিক্ষার অভাবে ধর্মীয় কুসংস্কার তাদের মধ্যে অত্যধিক। ভূত-প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করে। প্রচলন আছে আমদানি করা শ্রমিকরা যাতে রাতের আঁধারে পালিয়ে না যায় সেজন্য বাগান কর্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্তৃপক্ষ ভূত-প্রেত্মাতার গল্প বলে তাদের মাঝে ভয়-ভীতি সৃষ্টি করেছিল।

     সবশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের সমস্ত ধরনের শ্রমিকদের মাঝে চা-শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত। ১২৫/১৫০ বছর আগে চা-শ্রমিকরা গহীন জঙ্গল কেটে জমিকে আবাদযোগ্য করে গড়ে তুলে এবং বংশানুক্রমে শ্রম ও ঘাম দিয়ে ফসল ফলিয়ে দুর্বিসহ জীবনকে কিছুটা সহনীয় করে চলছিল। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের চা বাগানের শ্রমিকরা শতাধিক বছর ধরে বাগান সংলগ্ন যে ৫১১ একর জমি চাষ করে নিজেদের কিছু অতিরিক্ত আয়ের সংস্থান করে এসেছিলেন, উন্নয়নের নামে হাসিনা সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ঘোষণা দিয়ে তা কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চা-শ্রমিকদের কার্যত ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারও নেই।

আজকের চা-বাগান মালিক, শাসকশ্রেণি, হাসিনা সরকার বৃটিশ উপনিবেশিক শাসকদেরই ঔরসজাত সন্তান, তা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। চা-শ্রমিকদের দাস ব্যবস্থাই তার জীবন্ত প্রমাণ।

তাই, নারী চা-শ্রমিকদেরকে আশু দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি এ দেশের শ্রমিক, কৃষক ও নিপীড়িত জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি, সরকার উচ্ছেদ এবং সমাজ পরিবর্তনের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবে যোগ দিতে হবে। কারণ বিপ্লবী আন্দোলনই শ্রমিক-কৃষক সহ সমস্ত নিপীড়িত জনগণের মুক্তির দিশা দিতে পারে।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.