কারা এই ‘আরবান মাওবাদী’?

bb

ভারতে মাওবাদী নকশাল আন্দোলনের শুরুর ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে গত বছর। আর এর প্রাথমিক বিপর্যয়ের প্রায় ৪৩ বছর চলছে ২০১৮-এ। বিদ্রোহের অগ্নিপুরুষ জঙ্গল সাঁওতাল, চারু মজুমদার, কানু সান্যালও জীবিত নেই আজ আর। তবে সবকিছুই ‘রুদ্ধশ্বাস অতীত’ নয়। নকশালপন্থা নিয়ে আজও স্বস্তিতে নেই ভারত ‘রাষ্ট্র’। এই অস্বস্তি কতটা মনস্তাত্ত্বিক ভীতিজনিত, আর কতটা বাস্তব হুমকি কিংবা সচেতন রাষ্ট্রীয় ‘প্রকল্প’—তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কে নতুন জ্বালানি জুগিয়েছে ‘আরবান মাওবাদী’ শোরগোল। দেশটির চলচ্চিত্রশিল্প থেকে লিটল ম্যাগ জগৎ—সর্বত্র এখন মুখরোচক এক সামাজিক এজেন্ডা ‘আরবান মাওবাদ’। এই আলাপের ভেতর খানিক চটুল ভঙ্গি থাকলেও দেশটির আইনি ব্যবস্থার এলিট চরিত্রটিও বোঝা যায় এ থেকে।

কর্তৃত্ববাদী শাসকদের ‘দেশবিরোধী’ প্রতিপক্ষ প্রয়োজন 
ভারতজুড়ে এই মুহূর্তে ‘মাওবাদী’ দল ও গ্রুপের সংখ্যা কত, সে সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা কঠিন। বলা হয় শতাধিক। এর মধ্যে মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার (এমসিসি) এবং পিপলস ওয়ার গ্রুপ (পিডব্লিউজি) বেশ বড় এলাকাজুড়ে সক্রিয়। এদেরই ঐক্যবদ্ধ নাম সিপিআই (মাওবাদী)। এদের উপস্থিতি বোঝাতেই অন্ধ্র-বিহার-ঝাড়খন্ড-ছত্তিশগড়-ওডিশা নিয়ে ‘রেড করিডর’ কথা চালু হয়েছে। দেশের ১০টি রাজ্যের অন্তত ৯০টি জেলায় নকশালদের সক্রিয়তা আছে বলে ভারত সরকারের দাবি। সরকার এ-ও বলে, ১০ বছর আগেও এ ধরনের সক্রিয়তা ছিল অন্তত ২০০ জেলায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনসভায়ও হামেশা বলেন, কমিউনিজম ভারতে অতীতের বিষয় হয়ে গেছে। তবে গত এক দশকে প্রতিবছর ন্যূনতম ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ মারা গেছে রাষ্ট্র বনাম মাওবাদী যুদ্ধে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ‘মাওবাদী’রা এখনো দেশটির ‘একক বৃহত্তম নিরাপত্তা হুমকি’। সর্বশেষ সেই হুমকি গ্রামীণ পরিসর ছেড়ে শহরে ঢুকে পড়েছে বলে দাবি সরকারি-বেসরকারি বহু ভাষ্যকারের। এ নিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ ক্ষেত্রে বিশেষ এগিয়ে আছেন রাষ্ট্রপন্থী ভাষ্যকার বলিউডের চলচ্চিত্রকার বিবেক অগ্নিহোত্রী। ২০১৬ সালে ‘আরবান মাওবাদ’কে উপজীব্য করে তৈরি করেছিলেন ‘বুদ্ধ ইন আ ট্রাফিক জ্যাম’ সিনেমাটি। সম্প্রতি সেই মুভি তৈরির পূর্বাপর তুলে ধরে বইও লিখেছেন ‘আরবান নকশাল’ নামে। গত ৮ জুন বইটির প্রকাশনা উৎসব হলো।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বিবেককে প্রকাশ্যেই অভিনন্দন জানিয়েছেন সিনেমা ও বইয়ের জন্য। বাড়িতে ডেকে কফিও খাইয়েছেন বলে সংবাদ বেরিয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, ভারতের নীতিনির্ধারকেরা ‘আরবান মাওবাদ’কে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে ইচ্ছুক। জনমনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে কর্তৃত্ববাদী শাসকদের প্রতিনিয়ত ‘দেশবিরোধী’ প্রতিপক্ষ প্রয়োজন হয়। বিশ্বজুড়েই এই প্রবণতা আছে।

অসন্তুষ্ট তরুণদের ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে মাওবাদী ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে

সর্বগ্রাসী সংঘ-শাসন এবং ‘উন্নয়ন’-এর ঝাঁজালো প্রচারণার মধ্যেও ভারতজুড়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার জগতে প্রায়ই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-ধরনা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে নোংরা দলিতপল্লি—সর্বত্র তরুণেরা এসব বিক্ষোভে সাড়া দিচ্ছে। আরও সরাসরি বললে, রেড করিডরের কৃষিজীবী গ্রামগুলোতে কর্মসংস্থানের বড্ড অভাব; ঐতিহাসিক স্থানীয় বনজ ও খনিজ সম্পদগুলো প্রায় ‘লুটে নিচ্ছে’ করপোরেটরা।

ওডিশার কথাই ধরা যাক। এই রাজ্যে রয়েছে ভারতের কয়লা সম্পদের ২৫ ভাগ। নিকেল, ম্যাংগানিজ ও ইস্পাতের আকরিকে ওডিশার সর্বভারতীয় হিস্যা যথাক্রমে ৯২, ২৭ ও ২৮ ভাগ। কিন্তু প্রদেশটি বরাবরই অন্যতম দারিদ্র্যকবলিত এলাকা। ভারতের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত ১৪টি রাজ্যের মধ্যে বিহারের পরই ওডিশা। জনসংখ্যার ৪০ ভাগই দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে আছে এখানে। স্থানীয় সচেতন তরুণেরা সম্পদ ও দারিদ্র্যের এই ব্যবধান দেখে দেখে ক্ষুব্ধ। শাসক ভাবাদর্শে অসন্তুষ্ট এই তরুণদেরই ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে মাওবাদী ‘নগর বিদ্রোহী’ হিসেবে। এই ব্র্যান্ডিং ছাড়া এসব বিদ্রোহকে দমন করা যাচ্ছে না। ‘সন্ত্রাসী’দের ‘পোটা’ (প্রিভেনশন অব টেররিজম অ্যাক্ট ২০০২) ও উআপা (আন-লফুল অ্যাকটিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট) আইনে ধরা যায়—তাই ‘নগরক্ষুব্ধ’দের নকশাল তকমা সরকারের জন্য সুবিধাজনক। চট করে একে ‘উন্নয়নবিরোধী’ও বলা যায়। পশ্চিমবঙ্গে যে সিআরপিএফের কয়েক ডজন কোম্পানি রয়েছে, সে-ও এ রকম অল্পসংখ্যক ‘উন্নয়নবিরোধী’দের কারণেই; কিন্তু ভিন্নমত দলনই মূল লক্ষ্য।

বিজেপি ও বিবেকের মতো ‘বুদ্ধিজীবী’রা বলছেন, মাওবাদীরা নিজেদের অভূতপূর্বভাবে বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়েছে। পুরোনো কেন্দ্রীভূত ‘পার্টি’ আকারে নেই তারা। পুরোনো ধাঁচে ‘সশস্ত্র’ও নয়। ভারত রাষ্ট্রকে ছিঁড়ে ফেলতে উদ্যত মাওবাদীরা আগের গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের কৌশল ছেড়ে এখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সিনেমাশিল্প, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ছে। জঙ্গল ছেড়ে মধ্যবিত্তের ‘আইনি’ ও স্বীকৃত পরিসরগুলো ব্যবহার করছে তারা।

এই মুহূর্তে বহুল প্রচারিত এই ফর্মুলার মধ্যে ফেলা হচ্ছে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো এনজিও কর্মী, অত্যাচারিতকে বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়া আইনজীবী, ট্রাইবাল গ্রামে বিনা মূল্যে চিকিৎসারত ডাক্তার, ক্লাসরুমের র‍্যাডিক্যাল শিক্ষকদের দিকেও। পরিবর্তনবাদীমাত্রই সম্ভাব্য ‘নকশাল’; আর নকশালমাত্রই ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একজন ষড়যন্ত্রকারী—টেররিস্ট। সুতরাং নকশাল-নিধন মানে ভারতকে রক্ষার পবিত্র কর্তব্য। আন্তর্জাতিকভাবে ‘ওয়ার অন টেরর’-এ যুক্ত হওয়ার মতোই জরুরি তা।

চারু মজুমদার ও কানু সান্যালদের আপাতপরাজয়ের মধ্যেও ভারতজুড়ে সাহিত্য-সংগীত-সংলাপে নকশাল–চেতনার প্রতি সহানুভূতি আছে। ভারতের শাসকেরা অসন্তুষ্ট নতুন প্রজন্মকে ওসব থেকে রুখতে মাওবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক প্রচারণায় বিশেষ জোর দিচ্ছেন এখন। ফল হিসেবে কাশ্মীর থেকে অরুণাচল পর্যন্ত প্রতিবাদী সভাগুলোর গায়ে ‘মাওবাদী’ তকমা লাগছে। ‘তদন্ত’ও এগোচ্ছে সেই মোতাবেক। এভাবেই ভারতজুড়ে নতুন এক ‘রাষ্ট্রবাদী’ আক্রমণের মুখে পরিবর্তনবাদী সংখ্যালঘু ছিটেফোঁটা সচেতন মানুষগুলো। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক জি এন সাঁইবাবা, খ্যাতনামা চিকিৎসক বিনায়ক সেন প্রমুখ এভাবেই ‘আরবান মাওবাদী’ চিহ্নিত হয়ে যাবজ্জীবন দণ্ডের শিকার। মূলত, নিজ নিজ পরিমণ্ডলে নাগরিক অধিকারের বিভিন্ন বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন এঁরা।

বেশি আক্রান্ত দলিত ও কৃষক আন্দোলনের কর্মীরা

‘মাওবাদী’ তকমায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দলিত ও কৃষক আন্দোলন সংগঠকেরা। এ বছরের শুরুতে মহারাষ্ট্রের পুনের করেগাঁওতে দলিতদের নিপীড়নবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ ও সফল বন্‌ধের দিকে সমগ্র ভারতের নজর কাড়ামাত্রই বলা হলো, এর পেছনে মাওবাদীদের ইন্ধন রয়েছে। মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতাদের এরূপ বক্তব্য সংঘ পরিবার নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারও পেল। এরই সূত্র ধরে ঘটনার ছয় মাস পর জুনে নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সোমা সেন, দিল্লির মানবাধিকারকর্মী রোনা উইলসনসহ পাঁচজনকে আটক করে বলা হলো, এরা ‘টপ আরবান মাওবাদী’—দলিত বিস্ফোরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অচ্ছুতদের উত্তেজিত করতে শহুরে এই মাওবাদীরা সিপিআই (এম) থেকে অর্থ নিয়েছিল বলেও আটককালে সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই বলা হয়। অথচ পুনের ঘটনা যে দলিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে শুরু, তা আয়োজিত হয়েছিল ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে স্থানীয় দলিত মাহারদের এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ২০০ বছর পূর্তি স্মরণে। কিন্তু তথ্য প্রচারের আগেই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ হয়ে যাচ্ছে।

একইভাবে মাওবাদের তকমা পড়েছে গত মার্চে বিশ্বব্যাপী মনোযোগ পাওয়া মহারাষ্ট্রের কৃষকদের ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ লংমার্চের গায়েও। এই লংমার্চের উদ্যোক্তা সিপিআই (এম)–এর কৃষক সংগঠন নিখিল ভারত কৃষাণ সভা। বিভিন্ন জরুরি দাবিতে উত্তর-পশ্চিম মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে উঠে এসেছিল ৩৩ হাজার চাষির তিন দিনের ওই ‘কৃষাণযাত্রা’। মিছিল মহারাষ্ট্র বিধানসভা ঘেরাও করে কিছু দাবি আদায় করে নেওয়ার পরই আন্দোলনের নৈতিক বিজয়কে খাটো করতে যেসব অভিযোগ তোলা হলো, তার মধ্যে একটি হলো লংমার্চের অন্যতম সংগঠক ভিজু কৃষ্ণ একসময় জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্রসংসদের সভাপতি ছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে আরএসএস-বিজেপি পরিবার মাওবাদের প্রধান এক ‘আরবান সেন্টার’ মনে করে। বিজেপির প্রভাবশালী এমপি পুনম মহাজন মহারাষ্ট্রের লংমার্চের ইন্ধনদাতা হিসেবে ‘কৃষক সমাজে ঢুকে পড়া শহুরে মাওবাদী অনুপ্রবেশকারী’দের দায়ী করেছিলেন সরাসরি।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর গত দুই বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকগুলো বিক্ষোভ হলো। এগুলোকেও ‘মাওবাদী প্রভাবিত’ বলে প্রচার চালিয়েছে বিজেপির ছাত্রসংগঠন অখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদ। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন শহরতলির কয়েকটি জন-আন্দোলনের ক্ষেত্রে একইরূপ বৈরী প্রচার ছিল এবং আছে।

কিন্তু ভারতজুড়ে এসব আন্দোলনের জন্ম ও প্রসার আঞ্চলিকভাবে ভারসাম্যহীন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচারের শূন্যতা এবং রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক আবহের দুর্বলতা থেকে। মোদি সরকার ও ভারতীয় শাসনকাঠামো সেটা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক। পুনের দলিত বন্‌ধ্‌ (হরতাল), মহারাষ্ট্রের কৃষক লংমার্চ কিংবা জেএনইউয়ের ছাত্রসংগ্রামীরা নিজ নিজ পরিমণ্ডলের সংকট নিয়ে অহিংস পথেই সর্বোচ্চ সক্রিয় হয়েছিল। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে পোটা ও উআপাসহ দানবীয় সব আইনে শহুরে ছাত্রসংগঠক, নারী আন্দোলনকর্মী, শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মীদের আটক করে বিনা বিচারে জেলে পুরে রাখা হচ্ছে। আর প্রচারমাধ্যম এটাকে দেখাচ্ছে মাওবাদবিরোধী এক দেশপ্রেমিক যুদ্ধ আকারে।

সূত্রঃ prothomalo.com

Advertisements