চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: শ্রেণীবিশ্লেষণ, অনুসন্ধান ও অনুশীলনের সাহায্যে কৃষকের শ্রেণী-সংগ্রাম গড়ে তুলুন

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

গ্রামাঞ্চলে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে সংশোধনবাদী কৌশল ও বিপ্লবী কৌশল এক হতে পারে না। আমরা এতকাল যে কায়দায় কৃষক আন্দোলন করবার চেষ্টা করেছি তাকে সংশোধনবাদী কৌশল ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। সংশোধনবাদীরা কৃষক আন্দোলন করে পার্টির প্রকাশ্য কার্যকলাপ অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে এবং আন্দোলনের জন্য নির্ভর করে বুদ্ধিজীবী পার্টি নেতাদের উপর। কাজেই তাদের আন্দোলনের সূত্রপাত হয় বড় বড় নেতার বক্তৃতা সংগঠনের ভিতর দিয়ে এবং কৃষকদের স্কোয়াড ইত্যাদির মারফৎ, প্রকাশ্য প্রচার আন্দোলনের মারফৎ। এই আন্দোলন স্বভাবতই বড় বড় নেতাদের উপর নির্ভরশীল, কাজেই সেই বুদ্ধিজীবী নেতারা সংগ্রাম তুলে নিতে বললেই সংগ্রাম শেষ হয়। তাছাড়া সমস্ত প্রচার ও আন্দোলন প্রকাশ্য থাকায় দমননীতির সামনে সমস্ত সংগঠন অসহায় হয়ে পড়ে। বিপ্লবীদের কৃষক সংগ্রাম সংগঠিত করার কেশৗশ হবে সম্পূর্ণ আলাদা। বিপ্লবীদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসার করা এবং কৃষকের শ্রেণী সংগ্রাম তীব্র করার চেষ্টা করা। কাজেই এই পার্টি সংগঠনের কাজ হব গোপন-বৈঠক মারফৎ প্রচারকে সংগঠিত করা। কৃষক তার পুরানো অভ্যাসবশে হয়তো মিটিং মিছিল চাইবে, সেক্ষেত্রে পার্টি সংগঠন এর পেছনে থেকে দুএকটা মিটিং মিছিল সংগঠিত করতে পারে।

কিন্তু মিটিং বা মিছিল আমাদের প্রধান হাতিয়ার কোন সময়েই হবে না। এই রীতি পদ্ধতি অভ্যাস করা খুবই কঠিন। একাজ করা যায় যদি বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা প্রথম থেকেই আত্মগোপন করে চলেন। তবেই তাঁরা বাধ্য হবেন কৃষক বিপ্লবীদের উপর নির্ভরশীল হতে। যতদিন কৃষক বিপ্লবীরা নিজেরা উদ্যোগ না নিচ্ছেন ততদিন বুঝতে হবে জনতা প্রস্তুত নয়। এবং স্বভাবতই আমরা আমাদের বক্তব্য কৃষক সাধারণের উপর চাপিয়ে দেবো না। দ্বিতীয় বিচ্যুতি যেটা ঘটে তা হোল যখন কৃষক ক্যাডাররা কোন কিছু করতে চান তখন বুদ্ধিজীবী কমরেডটি অত্যন্ত পশ্চাদপদ ক্যাডারটির কথার উপর জোর দিয়ে সেটাকেই সাধারণ মত বলে চালান এবং তার ফলেই দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতি ঘটে।

তাহলে প্রথম হোল, জনতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমরা কোন কিছু চাপিয়ে দেব না। এই নীতি ভুলে গেলে আমরা অনেকগুলো বিচ্যুতির মধ্যে পড়বো, সেগুলোকে সংকীর্ণতাবাদ, কাস্ত্রোবাদ ইত্যাদি অনেক নাম দেওয়া যেতে পারে। সুতরাং এই বিচ্যুতিগুলির হাত থেকে বাঁচতে গেলে আমাদের  অবিরাম কৃষকদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে যেতে হবে। এই রাজনৈতিক প্রচারের মারফৎ আমরা রাজনৈতিক ক্যাডার পাবো যারা রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলনে অভ্যস্ত হবে। এই ক্যাডারদের গোপন সংগঠনই হবে ভবিষ্যতের পার্টি। এই সংগঠন গড়ার সময় আমাদের পার্টি কমিটির নীতি মেনে চলতে হবে। প্রত্যেকটি পার্টি কমিটির নির্দিষ্ট এলাকা থাকবে এবং সে এলাকায় শ্রেণীবিশ্লেষণ করতে শিখতে হবে এবং অনুসন্ধান ও অনুশীলনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি অংশের মানুষের চিন্তা ও ইচ্ছাকে যাচাই করতে শিখতে হবে। এই অনুসন্ধান ও অনুশীলন অনেক বিচ্যুতি করবে, কিন্তু তাতে শংকিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন-যুদ্ধের ভেতর দিয়েই আমাদের যুদ্ধ শিখতে হবে। যদি পার্টি কমিটিগুলি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে চলে তাহলে এই বিচ্যুতিগুলি থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শিখবে।

বিপ্লবী শ্রেণীগুলির মধ্যেও অগ্রণী অংশ ও পশ্চাদপদ অংশ থাকে। অগ্রণী অংশ তাড়াতাড়ি বিপ্লবী নীতি গ্রহণ করে এবং পশ্চাদপদ অংশের রাজনৈতিক প্রচার গ্রহণ করতে স্বভাবতই দেরী হয়। এবং এই জন্যেই সামন্তশ্রেণীর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই জন্যেই ফসল দখলের আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই সংগ্রাম কোথায় কি রূপ নেবে তা নির্ভর করছে এলাকার রাজনৈতিক চেতনা এবং সংগঠনের উপর। এই সংগ্রাম পরিচালিত হবে স্বভাবতই সামন্তশ্রেণীর বিরুদ্ধে অর্থাৎ অ-কৃষক জমির মালিক অর্থাৎ জমিদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে এবং কোন মতেই মধ্যকৃষকের বিরুদ্ধে নয়।

কৃষকের ব্যাপক গণ-আন্দোলনের চেষ্টা না করলে এবং ব্যাপক জনতাকে আন্দোলনে সামিল করতে না পারলে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি কৃষক সাধারণের চেতনায় দৃঢ়মূল হতে স্বভাবতই দেরী হবে। তার ফলে সংগ্রামের উপর রাজনীতির প্রাধান্য কমে এসে অস্ত্রের প্রাধান্য বাড়াবার ঝোঁক দেখা দিতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বে কৃষকের শ্রেণীসংগ্রামের উচ্চতর রূপ হচ্ছে গেরিলা যুদ্ধ। তাই শ্রেণীবিশ্লেষণ, শ্রেণীসংগ্রাম, অনুসন্ধান ও অনুশীলন-এই চারটি হাতিয়ারকে সফল প্রয়োগ করতে পারলে তবেই কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তোলা যায়।

আমাদের দেশের ধনীকৃষক প্রধানত সামন্ত শোষণের উপরই প্রতিষ্ঠিত। তাই তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে প্রধানত সংগ্রামের সম্পর্ক। কিন্তু যেহেতু তাদের উপর সাম্রাজ্যবাদী বাজারের শোষণও আছে তার ফলে সংগ্রামের কোন কোন স্তরে তাদের সাথে ঐক্যের সম্ভাবনাও আছে। এই ধনীকৃষক বাদ দিলে অন্যান্য সমস্ত কৃষককেই সমর্থক শুধু নয়, সংগ্রামে সামিল করা যায়। শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক ব্যাপক কৃষক জনতার সংগ্রামের ঐক্য গড়ে তুলতে পারবে এবং এই ঐক্য যত দ্রুত হবে ততই সংগ্রামের চরিত্র বিপ্লবী রূপ নেবে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে চেয়ারম্যানের শিক্ষা, বিপ্লবী যুদ্ধ হচ্ছে জনগণের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ চালান যায় কেবলমাত্র জনগণকে সামিল করে এবং তাদের উপর নির্ভর করেই [Revolutionary war is a war of the masses. It can be waged only by mobilising the masses and relying on them].

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও সোভিয়েত সংশোধনবাদ ভারতবর্ষে তাদের শাসন ও শোষণকে তীব্র করে তুলছে এবং এই শোষণের বোযা গিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়ছে ব্যাপক কৃষকশ্রেণীর উপর। দারিদ্র্য ও অনাহার কৃষকের জীবনে এক চরম অবস্থা এনে দিয়েছে এবং স্বভাবত:ই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। তেমনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও সোভিয়েত সংশোধনবাদের শাসন অন্যান্য শ্রেণীগুলির মধ্যেও বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছে এবং সেই বিক্ষোভের প্রভাব কৃষকের উপরে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ভারতবর্ষের সমস্ত রাজনৈতিক পার্টি আজ শাসকশ্রেণীর পার্টিতে পরিণত হয়েছে এবং সকলেই চেষ্টা করছে বিভিন্ন কৌশল জনতাকে শান্ত করে রাখার। এই কাজে সবচেয়ে সুদক্ষ ডাঙ্গে বিশ্বাসঘাতকচক্র ও নয়া-সংশোধনবাদী চক্র। তারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মুখোশ এঁটে অনেক বিপ্লবী বুলি কপচিয়ে জনতাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু চেকোশ্লোভাকিয়ায় সোভিয়েতের ফ্যাসীবাদী আক্রমণ এদের বিপ্লবী মুখোশ খুলে দিয়েছে এবং যত দিন যাবে ততই জনতার কাছে এটা স্পষ্ট হবে যে নয়া-উপনিবেশবাদের ফেরিওয়ালা বিশ্বের আক্রমণকারী শক্তিগুলির অন্যতম, সোভিয়েত রাষ্ট্রের বশংবদ এরা। এদের মুখোশ খোলার সাথে সাথে জনতার প্রতিরোধ সংগ্রামের জোয়ার খুলে যাবে এবং কৃষকের ব্যাপক গণ-আন্দোলনের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে। তাই আজ শ্রমিকশ্রেণী ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সামনে দায়িত্ব এসেছে কৃষকের শ্রেণী চেতনাকে জাগিয়ে তোল, ব্যাপক শ্রেণীসংগ্রাম সংগঠিত করা। সেদিন আর বেশী দূরে নেই যখন ভারতবর্ষের লক্ষ লক্ষ কৃষক জনতার সৃজনীশক্তি গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তুলবে, বিশ্বের সমস্ত বিপ্লবী মুক্তি-সংগ্রামের পাশে ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতা তার আসন করে নেবে; মহান লেনিনের স্বপ্ন-মহান চীন এবং ভারতবর্ষের সংগ্রামী মানুষের ঐক্য-বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের কবর রচনা করবে। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সমস্ত বিপ্লবীকে এখনই কাজে নামতে হবে।

দেশব্রতী, ১৭ই অক্টোবর, ১৯৬৮

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.