চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: “নির্বাচন বয়কট করো” স্লোগানের আন্তর্জাতিক তাৎপর্য

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

১৯৩৭ সাল। জার্মানী, ইটালী এবং জাপানী ফ্যাসীবাদ-বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের তিন অগ্রবাহিনী পৃথিবীকে নতুন করে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেওয়ার ষড়যন্ত্রে অগ্রসর হচ্ছিল। স্পেনের রঙ্গমঞ্চে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর পেছনে এসে দাঁড়াল জার্মানী ও ইটালী ফ্যাসীবাদ। সংযুক্ত ফ্রণ্টের সরকারকে সমর্থন জানাল বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণী। দেশে দেশে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গড়ে উঠল। আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের প্রতিরোধ চূর্ণ করে ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদ স্পেনে প্রতিষ্ঠিত হোল।

ঠিক তখনই চীনের এক এলাকা ইয়েনানকে মুক্ত করে চেয়ারম্যান মাও-এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি জাপানী অধিকৃত অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের জাগ্রত করে সৃষ্টি করে চলল নতুন নতুন মুক্ত এলাকা জাপানী সমরবাদের সমস্ত দম্ভকে চূর্ণ করে। এই মুক্ত এলাকা শুধু টিকে থেকেছে তাই নয়, আঘাত করেছে জাপানী সাম্রাজ্যবাদকে। চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সেদিন শুধু জাপানী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল তাই নয়, তাকে প্রতিরোধ করতে হয়েছিল চিয়াং-এর নেতৃত্বে কুয়োমিণ্টাঙ সরকারকেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হোল। পুরাতন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির উপনিবেশগুলি তাসের ঘরের মত ভেঙে গেল। ঔপনিবেশিক দুনিয়ার মানুষ দেখল প্রবল প্রতাপান্বিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি জাপানী আক্রমণের সামনে মার খাওয়া কুকুরের মত লেজ গুটিয়ে পালাল। জার্মান ফ্যাসীবাদ সারা ইউরোপ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিকে করল পদানত-কি সমর-কৌশলে, কি শক্তিমত্তায়। পুরাতন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি ফ্যাসিবাদের মোকাবেলা করতে অসমর্থন হোল। সমস্ত ইউরোপের শিল্পোশ্চর্যের মালিকানা পেয়ে উদ্ধত ফ্যাসিবাদ আক্রমণ করল শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। মহান স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত দেশের সমস্ত মানুষকে, উদ্বুদ্ধ করলেন দেশরক্ষার পবিত্র সঙ্কল্পে, চূর্ণ করলেন ফ্যাসীবাদের সমস্ত ঔদ্ধত্যকে। স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মান ফ্যাসীবাদের পরাজয় সুনিশ্চিত করে তুলল স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়। পৃথিবীর সর্বত্র ফ্যাসীবাদ দ্বারা নিপীড়িত মানুষ মহান চীন কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে ফ্যাসীবাদকে রুখে দাঁড়াল। তারই ফলে বিশ্ব ফ্যাসীবাদ ধ্বংস হোল। যুদ্ধ পরবর্তী যুগে যখন পুরাতন সাম্রাজ্যবাদীরা আবার তাদের শাসন ও শোষণকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করল তখন আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ ঔপনিবেশিক দুনিয়ার মানুষ দাবানলের মত জ্বলে উঠল। সশস্ত্র সংগ্রামের আগুন ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ল। চেয়ারম্যান মাও এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তার সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে যখন এগিয়ে চলেছে ইয়াংসির দিকে সুনিশ্চিত জয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তখন ভারতবর্ষের বুকে ঘটেছে তেলেঙ্গানা; কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের নেতৃত্বে গড়ে তুলেছে কৃষক গেরিলা বাহিনী, লক্ষ লক্ষ কৃষকের মনে জাগিয়ে তুলেছে বিপ্লবী প্রতিরোধের চেতনা, শত শত গ্রামকে করেছে মুক্ত।

১৯৪৯ সালে মহান চীন বিপ্লবের সাফল্য ও চীন প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করল জনযুদ্ধের অসীম ক্ষমতা। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সেতুঙ’ এর চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত চীনের কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক কৃষক মেহনতী জনতার ঐক্য দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে চীনের বিজয়লাভ সমস্ত ঔপনিবেশিক দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রত্যেকটি উপনিবেশে সশস্ত্র সংগ্রাম দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলল। সফল চীন বিপ্লব ঔপনিবেশিক দুনিয়ার মানুষের সামনে সাফল্যের সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এনে দিল এবং তখনই শুরু হলো বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের পরিপূর্ণ ধ্বংসের যুগ। বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস যতই আসন্ন হয়ে উঠল ততই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংশোধনবাদী কমিউনিস্ট নেতৃত্ব জনতার সংগ্রামের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করল এবং স্তালিনের মৃত্যুর পর সংশোধনবাদী চক্র সোভিয়েত পার্টি-নেতৃত্ব দখল করে বসল এবং বিশ্বসাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বিশ্বব্যাপী সংশোধনবাদী চক্রের মিলিত প্রচেষ্টা শুরু হলো। চীন বিপ্লবের সাফল্যে আতঙ্কিত হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট নামধারী বিশ্বাসঘাতকেরা তেলেঙ্গানার মহান সংগ্রামকে নিঃশর্তভাবে তুলে নিল এবং সংসদীয় পথে পা বাড়াল। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর প্রত্যেকটি ঔপনিবেশিক দেশের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে সোভিয়েত সংশোধনবাদী চক্র বিভেদ এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহযোগিতা করে। চেয়ারম্যান বলেছেন, বিশ্বসাম্রাজ্যবাদ আজকের যুগে এমন একটা ইমারত-যে ইমারতটি একটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং সেই স্তম্ভটি হোল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস বিশ্বসাম্রাজ্যবাদকে চূর্ণ বিচূর্ণ করবে। বিশ্বাসঘাতক ক্রুশ্চেভচক্র তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়াল। তাই চেয়ারম্যান মাও ১৯৫৭ সালে সাবধান বাণী ঘোষণা করলেন যে, বিপ্লবী সংগ্রামের যুগে প্রধান বিপদ সংশোধনবাদ। ১৯৬২ সাল থেকে চেয়ারম্যান মাও যখন সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংগ্রাম শুরু করলেন তখন পৃথিবীব্যাপী বিপ্লবী মার্কসবাদী লেনিনবাদীদের মনে নতুন উৎসাহ সঞ্চারিত হোল। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠতে থাকল। বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকলেন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম এক নতুন স্তরে উন্নীত হোল। ভিয়েতনামের বীর সংগ্রামীরা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের পুরোভাগে থেকে আঘাত হানতে শুরু করলেন সাম্রাজ্যবাদের একমাত্র স্তম্ভ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে। দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে উঠলো বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের আসন্ন ধ্বংস। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা যে আজকের দিনের মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-এটা স্বীকার করতে আজকে দ্বিধা থাকলে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম দুর্বল হতে বাধ্য। কারণ সংশোধনবাদকে আঘাত করার হাতিয়ারকেই করে দেওয়া হয় ভোঁতা। চেয়ারম্যান মাও আমাদের শিখিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদকে আঘাত করতে হলে সংশোধনবাদকে আঘাত না করে এক পাও এগোন যায় না। আজকের যুগে অর্থাৎ যে যুগে সাম্রাজ্যবাদ পরিপূর্ণ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, যখন বিপ্লবী সংগ্রাম দেশে দেশে সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ নিয়েছে, যখন সোভিয়েত সংশোধনবাদ সমাজতন্ত্রের মুখোশ রাখতে না পেরে সাম্রাজ্যবাদের কৌশল পর্যন্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে, যখন বিশ্ববিপ্লব এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে এবং সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা দুর্বার বেগে এগিয়ে চলেছে-সেই যুগে সংসদীয় পথে পা বাড়ানোর অর্থ বিশ্ববিপ্লবের এই অগ্রগতিকে রোধ করার সামিল হয়ে দাঁড়ায়। সংসদীয় পথ আজ বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের পক্ষে গ্রহণীয় নয়। এটা ঔপনিবেশিক দেশের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, ধনতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রেও তা’ একই রকম সত্য। বিশ্ববিপ্লবের এই নতুন যুগে যখন চীনের সর্বহারা শ্রমিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব জয়লাভ করছে তখন বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের একটি কাজই প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হোল, গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে দৃঢ় ভিত্তিতে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতী মানুষের ঐক্য গড়ে তোলা। তাই সমগ্র যুগ ধরে বিপ্লবী মার্কসবাদী লেনিনবাদীদের আওয়াজ হবে, ‘নির্বাচন বয়কট করো’ এবং গ্রামে চলো, ঘাঁটি গেড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা বানাও। সংসদীয় পথে চলে বিশ্বব্যাপী বিপ্লবীরা বহু রক্তের ঋণ জমা করেছেন। আজ দিন এসেছে সেই ঋণ শোধ করার! শত শত শহীদ আজ বিপ্লবীদের আহ্বান জানাচ্ছেন ‘মুমূর্ষু সাম্রাজ্যবাদকে আঘাত করো’, ‘ধ্বংস করো’! পৃথিবীকে নতুন করে গড়বার দিন আজ এসেছে। জয় এবার সুনিশ্চিত।

দেশব্রতী, ২১শে নভেম্বর, ১৯৬৮

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.