ভারতের মাওবাদীরা মোবাইলের ব্যবহার সম্পূর্ণ বাতিল করেছে

Maoist-surrendering

কেরালায় মাওবাদীদের বিরুদ্ধে চলমান অপারেশনে পুলিশ এক নতুন ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, মাওবাদীরা নিজ ক্যাডারদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার জন্যে মোবাইলের ব্যবহার সম্পুর্ন বাতিল করেছে, এতে করে মাওবাদীদের অবস্থানগুলি চিহ্নিত করতে বা তথ্য সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে।

কেরল পুলিশের কয়েকটি জেলার বিশেষ দলগুলি (ওয়াইনাদ, পালক্কাদ, কোজিকোড এবং মালাপ্পুরাম) একত্রিত হয়েও তারা সিপিআই (মাওবাদী) ক্যাডারদের বিস্তারিত সন্ধান করতে সক্ষম হয়নি, যদিও এসময় মাওবাদীরা জনসাধারণের মাঝে সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থান করেছিল।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনও ধরণের ট্র্যাকিং এড়াতে মাওবাদী বিদ্রোহীরা মোবাইল ফোনের বা অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগ ডিভাইসগুলি ব্যবহার করে বন্ধ করে দিয়েছে। এর বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে তারা মানব কুরিয়ার ব্যবহার করার মতো প্রচলিত যোগাযোগ পদ্ধতিগুলি ব্যবহারে আরও বেশি সক্রিয় হয়েছে”।

কানুর রেঞ্জের ইন্সপেক্টর জেনারেল বলরাম কুমার উপাধ্যায় বলেন, ওয়াইনাডের বন এলাকায় মাওবাদীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, “তারা জানে যে আমরা তাদের দমনে অঙ্গীকারবদ্ধ অপারেশন শক্তিশালী করেছি”।

আরেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ‘মাওবাদীরা তাদের সেল গুলোর সাথে যোগাযোগের জন্য লংহ্যান্ড নোট ব্যবহার প্রথায় ফিরে গেছে। মাওবাদীদের কাছ থেকে জব্দ করা নথিপত্রের বিশদ বিশ্লেষণ করে মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দ্বারা প্রদত্ত নির্দেশিকা পাওয়া গেছে’।

মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, মোবাইল ফোন বহন করা বা এর ব্যবহার করে কোন তথ্য ডাউনলোডের বিরুদ্ধে ক্যাডারদের সতর্ক করা করেছে। সকল গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা নিজেদের অবস্থান ট্র্যাকিং এড়াতে নিজ কর্মীদের খুব সতর্কতার সঙ্গে ইন্টারনেট অ্যাক্সেস করতে বলা হয়েছে।

সূত্রঃ http://www.newindianexpress.com/states/kerala/2018/dec/28/maoists-shun-mobile-phones-to-prevent-tracking-by-agencies-1917478.html

Advertisements

জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতা-কর্মীদের জীবনাচরণ প্রসঙ্গে -কমরেড হেমন্ত সরকার

49135321_740783072966592_7648877497618006016_n

 প্রয়াত প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা হেমন্ত সরকার দক্ষ সংগঠকই শুধু ছিলেন না, তিনি অবসর সময়ে লেখালেখিও করতেন। তাঁর এই লেখাটি শ্রুতি লিখনের সাহায্যে লিখিত। ২৮শে ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে এই মূল্যবান রচনাটি প্রকাশিত হল।

সাধারন মানুষ সম্পর্কে ব্যাপক শিক্ষিত সুধীজনদের একটি বদ্ধমুল ধারণা বহু কাল ধরে চালু আছে। আর তা হল, এই সাধারণ মানুষ মূর্খ, অশিক্ষিত, অলস, জীবন-জগত, সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্কে ওরা কিছুই ভালো করে বোঝে না। ওদেরকে যে দিকে চালানো যায় সে দিকেই ছোটে। গত একশ’ বছরে লেখাপড়া জানা সাফ-কাপুড়ে অধিকাংশ শিক্ষিত ভদ্রলোকদের এই নাক উঁচু ধারণার উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন হয়েছে বলে বাস্তবে দেখা যায় না। শাসক-শোষক গোষ্ঠীর নানা বর্ণের নানা রঙের প্রায় দেড় শতাধিক রাজনৈতিক দল এদেশে তাদের ঘুনে-ধরা সমাজ-রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্বে সদা তৎপর, সাধারণ মানুষ সম্পর্কে তাদের ধারণা ও আচার-আচরণ ঐ সুধীজনদের চেয়ে ভিন্ন নয়। সাধারণের সঙ্গে তাদের আচরণ সব সময়ই হয় প্রভুত্বমূলক। নিজেদেরকে তারা জনগণের মাস্টার ভাবে। জনগণের চিন্তা-চেতনা আর সৃষ্টিশীলতার ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা-বিশ্বাস-ভরসা এদের নেই (আর তার প্রয়োজনও করে না)। একমাত্র ভোটার হিসাবে এদের কাছে জনসাধারণের মূল্য অসীম, দেবতা-তুল্য!

এ হলো দেশের শিক্ষিত সুধীজনদের একাংশ আর শোষক-শাসক গোষ্ঠীর জনসাধারণের প্রতি মনোভাব। কিন্তু নিজেদেরকে যাঁরা জনগণের প্রকৃত বন্ধু মনে করেন, জনগণকে তাঁরা কিভাবে দেখবেন কি ধরণের আচরণ করবেন সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন। যাঁরা প্রগতিশীল তাঁরা সমাজ পরিবর্তনের ধারাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেন। সমাজের পরিবর্তন ঘটে কেন? শোষক ও শোষিতের মধ্যকার শ্রেণী সংগ্রাম সমাজকে পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে নেয় বলে প্রগতিপন্থীরা শোষিত শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং শ্রমজীবী মানুষের সৃষ্টিশীলতা, কর্মদক্ষতায় আস্থা স্থাপন আর ইতিহাসের নায়ক হিসাবে স্বীকার করা। একজন দু’জন করে সবাইকে শ্রমজীবী মাসুষের ভাবাদর্শে দীক্ষিত করা। সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর প্রতি প্রগতিধারার নেতা-কর্মীদের প্রাথমিক কাজ হবে নিজের পরিবারের সদস্যদের সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের আর্থিক বিষয়, কুশল ও সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে নিয়মিত আন্তরিকভাবে খোঁজ-খবর নেয়া। অর্থাৎ তাদের পরিবারের একজন হিসাবে নিজেকে ভাবা। এক সময় ছিল যখন প্রগতিশীল কর্মীদের মধ্যে কৃষক-শ্রমিকসহ ব্যাপক জনসাধারণের সঙ্গে মেলামেশার, তাদের সঙ্গে একাত্ম হবার বিপুল আগ্রহ লক্ষ্য করা যেত। দেখা যেত তাঁরা জনগণের মধ্যে শ্রেণীঘৃণা ও শ্রেণীস্বার্থের চেতনা জাগাবার জন্য বিশেষভাবে সচেষ্ট। জনগণের মধ্যে শ্রেণীচেতনা সৃষ্টি হবার ফলে তাদের কাছে শত্রু-মিত্র সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হত, সংঘশক্তির প্রয়োজন তারা অনুভব করত এবং জনসাধারণের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার জন্য এগিয়ে আসার আগ্রহও লক্ষ্য করা যেত। জনগণের আপনজন হবার জন্য কর্মীদের মধ্যে চলত নীরব প্রতিযোগিতা। জনগণ ও নেতা-কর্মীদের মধ্যে গড়ে উঠত ত্যাগের মনোভাব। সে সময় জনগণের প্রতি নেতা-কর্মী-সংগঠনের মনোভাব ছিল পরম শ্রদ্ধার। জনগণের প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধ, কর্তব্যবোধ, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কর্মীদের নিবেদিতপ্রাণ করে তুলত। জনগণের সঙ্গে একাত্ম হবার জন্য এবং তাদের সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করে তোলার জন্য খাল-পুকুর খনন, রাস্তা-ঘাট সংস্কার, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, তাদের অক্ষর জ্ঞানদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেখা যেত।

জনগণের শ্রেণী সচেতন করার জন্য তাদের মধ্যে র্সংগঠন গড়ে তোলার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রায়ই শ্রমিক বস্তি আর সাধারণ ভূমিহীন, গরীব ও মাঝারি কৃষকদের বাড়িতে যেত ও থাকতে দেখা যেত। সে সময় তারা বাড়িতে সকল সদস্যের সঙ্গে সংসারের সব খুঁটি-নাটি অভাব-অভিযোগ, সমস্যা-সংকট সম্পর্কে আলোচনা করতেন। অভাব-অভিযোগের মৌলিক কারণ নিয়ে আলোচনা করতেন। সুন্দর মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে সকলের মন জয় করে নিতে চেষ্টা করতেন। এ সময় হিন্দু-মুসলমান পরিবারগুলোর মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা সৃষ্টির জন্য ধারাবাহিক আদর্শিক সংগ্রাম চলত। সহজভাবে সংগঠনের উদ্দেশ্য-আদর্শ ব্যাখ্যা করার ফলে সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কি বলতে চায় এবং কি তাদের করণীয়- জনগণের কাছে অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠত। সে সময় শ্রমিক বস্তিতে আর গ্রামে গ্রামে নিয়মিত গ্রুপ বৈঠক, পাড়া বৈঠক, গ্রাম বৈঠক হত। এ সব বৈঠক গণসংগ্রাম, গণআন্দোলন আর গণসংগঠন সম্পর্কে, দেশের ও বিশ্বের রাজনীতি সম্পর্কে শ্রমিক-কৃষকদের প্রশিক্ষণের কাজ করত। জনসাধারণের সঙ্গে এসব বৈঠকের ফলে নেতা-কর্মীরাও অর্জন করতেন জ্ঞান, অনুভব করতে পারতেন জনগণের মনোভাব ও সংগ্রামী উত্তাপ-যা উদ্দীপ্ত করে তুলত কর্মী ও জনগণ উভয়কেই।

প্রগতিশীল সংগঠনের কর্মী রিক্রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এ সময় সংগঠনে কর্মী রিক্রুট করা হত খুবই সতর্কভাবে ও বিচার-বিবেচনা করে। হুট করে কাউকে কর্মী হিসাবে গ্রহণ করা হত না। নতুন কর্মীর শ্রেণী অবস্থান, তার স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেওয়া হত এবং অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টিতে তাদের কাজ-কর্মের তদারক করা হত। একই সঙ্গে আদর্শ সংগ্রামী মনোভা, সংগঠন, সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা, জনগণ ও জনগণের শত্র“-মিত্র সম্পর্কে তাদের ধারণার স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তা যাচাই করা হত। কাজেই খেটে খাওয়া মানুষের জন্য শোষনহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দর্শন যিনি গ্রহণ করবেন তাঁকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে অবশ্যই সমষ্টিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্ম-বর্ণ গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের ধারণার বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। তাকে অবশ্যই বিনয়ী ও সৎ মনোবৃত্তি রূপে গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক কর্মী পার্টি-সংগঠনকে একটি পরিবার হিসাবে দেখবেন। পার্টি-সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তাকে চোখের মণির মত রক্ষা করবেন। পার্টির সিদ্ধান্ত কার্যকরী করতে ব্যর্থ হলে অথবা কোন ভূল করলে সে জন্য সংগঠনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মনে করতে হবে দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য আমি জনগণের কাছে আসামী হয়ে গিয়েছি। শ্রমিকশ্রেণী ছাড়া অন্যান্য শ্রেণী থেকে আসা কর্মীদের সর্বাগ্রে শ্রেণীচ্যুত হওয়া ও সর্বহারা শ্রেণীর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী অর্জনের জন্য আত্মগত সংগ্রাম চালাতে হবে। অর্থাৎ তাকে সবার আগে লড়তে হবে নিজের অ-সর্বহারা শ্রেণী চরিত্রের বিরুদ্ধে। শোষকের বিরুদ্ধে শ্রেণী ঘৃণাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।

বর্তমান শ্রেণী বিভক্ত সমাজে শ্রেণীচ্যুত হওয়ার কাজটি একটি খুবই জরুরী সমস্যা। সমালোচনা-আত্মসমালোচনার যে হাতিয়ার মার্কসবাদীদের আছে তা সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করতে হবে। নিজের রূপান্তর ঘটাতে হবে। প্রতিটি মানুষের ত্র“টি-বিচ্যুতি আছে। পচা-গলা এ সমাজে জন্ম ও বেড়ে ওঠায় ত্র“টির পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে গভীরভাবে সমালোচনা-আত্মসমালোচনার অস্ত্রটিকে রপ্ত ও ব্যবহার করতে শিখতে হবে। প্রত্যেক কর্মীকে কোন না কোন কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত থাকা ও কমিটির বৈঠকে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে হবে। কোন কারণে উপস্থিত না হতে পারলে চিঠি লিখে বৈঠকের পূর্বেই সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেবার তাড়না অনুভব করতে হবে। প্রতি বৈঠকে লিখিত রিপোর্ট উপস্থিত করা জরুরী কর্তব্য। তবে কখনোই রিপোর্টে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা তথ্য উপস্থিত করা যাবে না। কমিটির সকল সদস্যকে আপন করে নিতে হবে। তাদের ভুল-ত্র“টি ধরা পড়লে গঠনমূলকভাবে সমালোচনা করে ত্র“টি শোধরাতে সাহায্য করতে হবে। সহকর্মীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ, চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করার অভ্যাস পরিহার করতে হবে। সহকর্মীদের রক্ষার জন্য জীবনও দিতে হতে পারে- এ মনোভাব মনে প্রাণে লালন করতে হবে। সহকর্মী যাতে কোন বিপদে না পড়ে সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রত্যেক সহকর্মীকে নিজের অঙ্গ মনে করতে হবে। মনে করতে হবে সে যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, অধঃপতিত হয় তাহলে যেন নিজেরই অঙ্গহানি ঘটছে।

প্রত্যেক কর্মীকে কৃষক-শ্রমিক ও অন্যান্য পেশার মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে পুংখানুপুংখভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তারা কি উদ্দেশ্যে নেতা-কর্মীদের প্রতি সদয় আচরণ করছে তা উপলব্ধি করতে হবে। অবশ্যই জনগণের প্রতি গভীর আস্থা রাখতে হবে। তবে তাদের সবার কথাকেই সরলভাবে বিশ্বাস করে সামাজিক দলাদলি আর কোন্দলে পার্টি সংগঠনকে জড়ানো চলবে না। জনগণের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি, জোর করে চাঁদা আদায় বা কোন সম্পদ হস্তগত করা নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। সামাজিক প্রতিপত্তি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি সুবিধা গড়ে তোলার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। মিথ্যা বলা যাবে না, কোন অন্যায় করা চলবে না। যদি তা করেও ফেলেন এবং তা বুঝতে পারার সাথে সাথে খোলাখুলি ভুল স্বীকার করা উচিত।

মাদকসেবী, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী, খুনী, মামলাবাজ, টাউট, দুর্ণীতিবাজ মাতব্বর ইত্যাদি লোকদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে এবং কৃষক-শ্রমিকদের সংকীর্ণ স্বার্থবোধ দ্বারা নিজেকে চালিত করা যাবে না। মনে রাখতে হবে সামন্ত প্রথায় তাদের জীবনে সংকীর্ণ স্বার্থপরতা ও নিজেদের শক্তির উপর আস্থা-বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে। তাদের আত্মবিশ্বাসকে জাগিয়ে তোলায় সচেষ্ট হতে হবে।

সর্বোপরি সারাদিনের কাজের পর প্রতিদিন গভীরভাবে আত্মবিশ্লেষণ করা উচিত। সারাদিন কয়টি কাজ বাস্তবায়িত হলো, কয়টি হয়নি, কোন কাজটি সঠিক হলো, কোনটি হয়নি, এজন্য কি করা প্রয়োজন ছিল-এভাবে নিজের দায়বদ্ধতার কাছে, রাজনৈতিক সচেতনতার কাছে জবাবদিহিতা বিশ্লেষণ করা। মনে রাখা প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ এই পদ্ধতি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে একজন নেতা বা কর্মী ধীরে ধীরে আত্মআবিষ্কার করা শেখে, তার উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল ক্ষমতা বেড়ে যায়, মধ্যবিত্ত নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য- যেমন ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখা, আমলাতান্ত্রিকতা, নিজেকে জাহির করা, সংকীর্ণতা, হিংসা-বিদ্বেষ, অপরের ছিদ্রান্বেষণ, চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করা, সংগঠনকে কুক্ষিগত করা ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এক নতুন মানুষে রূপান্তরিত হন। এ ধরণের নেতা কর্মীদের দ্বারাই রাশিয়ার যুগান্তকারী বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল, বাংলাদেশে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করতে হলে শ্রমিক শ্রেণীর চিরকালীন আদর্শকেই অনুসরণ করতে হবে।

সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা’র ১৭ জানুয়ারী ১৯৯৯ রবিবার ১৮ বর্ষ ২১ সংখ্যা


আসামের মানুষ বাঙালিবিরোধী নয়, দাবি উলফার

AssamD

আসামের মানুষ বাঙালি বা বাংলাদেশের বিরোধী নয়—এমন দাবি করেছেন সংযুক্তি মুক্তি বাহিনী আসামের (উলফা) চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়ার। উলফার এই আলোচনাপন্থী নেতা আগরতলায় প্রথম আলোর কাছে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগও করেন।

জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন তালিকা (এনআরসি) আর নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে উত্তাল আসামের রাজনীতি। অভিযোগ, বাঙালিবিদ্বেষ থেকেই আসামের নাগরিকেরা ৪০ লাখেরও বেশি ভারতীয়র নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে চাইছে।

ত্রিপুরার সাবেক কট্টর সশস্ত্র সংগঠন অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্সের (এটিটিএফ) প্রধান সুপ্রিমো রঞ্জিত দেববর্মার ডাকে ত্রিপুরায় এসেছিলেন উলফার আলোচনাপন্থীদের নেতা অরবিন্দ। আগরতলা থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে এসরাই গ্রামে দুই নেতাই ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগ করেন।

উলফা চেয়ারম্যানের দাবি, ‘আমরা মোটেই বাঙালিবিদ্বেষী নই। আসামের নাগরিকেরা বরং বাঙালিদের বন্ধু বলে মনে করেন।’ একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, ‘আমাদের (আসামের নাগরিক ও বাঙালিদের) লড়াই লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ব্রিটিশ আমলেই শুরু হয়েছিল এই দ্বিজাতি তত্ত্ব। এখনো সেটাই অব্যাহত।’

একই সঙ্গে সম্প্রতি আসামের তিনসুকিয়ায় পাঁচ বাঙালি হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অরবিন্দ রাজখোয়ার। তিনি মনে করেন, এর পেছনে গভীর রহস্য রয়েছে। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওঁরা কিসের বাঙালি! গরিব মানুষ। খেতে পান না। নিজেদের মধ্যে কথাও বলেন আসামের ভাষায়। রাজনৈতিক লাভের প্রশ্নেই প্রাণ দিতে হয়েছে তাঁদের। উলফা করেনি। তাহলে করল কে? কে খুন করল তাঁদের?’ তাঁর অভিযোগ, ভারত সরকার ঘটা করে তাঁদের আলোচনার টেবিলে ডেকে আনলেও শান্তি আলোচনা সঠিক পথে এগোচ্ছে না। প্রতারণা করা হচ্ছে। কোনো প্রতিশ্রুতিই রাখা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁদের এই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল ফের অশান্ত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন অরবিন্দ রাজখোয়ার।

এদিকে অরবিন্দের বক্তব্যকে সমর্থন করে সুপ্রিমো রঞ্জিত দেববর্মা বলেন, ত্রিপুরাতেও একই ছবি। আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে বলেও জানান তিনি।

অস্ত্র ছাড়লেও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাবেক দুই নেতা বলেন, নিজেরা সংঘবদ্ধ হয়ে দাবি আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাবেন। তবে আর অস্ত্র হাতে নয়, শান্তিপূর্ণভাবেই লড়াই করবেন নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়।


মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা

29C1CD9A00000578-3130307-image-m-5_1434660552551

মস্কো শহরে আমদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক নিখিল রাশিয়া শ্রমিক নারী ও কিষাণদের কংগ্রেস আহ্বানের পর পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে। দশ লক্ষ গতর খাটানো মেয়েদের এক হাজারেরও অধিক প্রতিনিধি এই কংগ্রেসে সমবেত হয়েছিল। মেহনতকারী মেয়েদের মধ্যে আমাদের পার্টির কর্ম তৎপরতায় এই কংগ্রেস নতুন যুগের সূচনা করে। আমাদের রিপাবলিকের শ্রমিক নারী ও কিষাণ মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করে কংগ্রেস অপরিমেয় কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। অনেকে মনে করতে পারেন, এ আর কি ব্যাপার? কারণ পার্টি নারীসহ জনসাধারণের মধ্যে সবসময়েই রাজনৈতিক শিক্ষা বিস্তার করে এসেছে। আবার অনেকে এমনও ভাবতে পারেন, মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার এমন কি গুরুত্ব থাকতে পারে; কারণ শীঘ্রই আমাদের মধ্যে শ্রমিক ও কিষাণদের সমবেত কর্মীদলসমূহ গড়ে উঠবে। এই ধরনের মতগুলি সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত।

শ্রমিক ও কিষাণদের হাতে শাসন ক্ষমতা চলে আবার পর মেহনতকারী মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন উপস্থিত হয়েছে। আমি এর কারণটা দেখাতে চেষ্টা করছি। আমাদের দেশের লোকসংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি; তন্মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেকই নারী। নারীদের মধ্যে অধিকাংশই অনগ্রসর, পদদলিত ও অতি অল্প রাজনৈতিক চেতনা যুক্ত শ্রমিক ও কিষাণ নারী।

আমাদের দেশ যদি রীতিমতো উৎসাহ দিয়ে নতুন সোভিয়েট জীবন গড়ে তোলার কাজ আরম্ভ করে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ইহা সুস্পষ্ট হবে যে, মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নিয়ে গঠিত এই দেশের নারীসমাজ যদি ভবিষ্যতেও অনগ্রসর, পদদলিত ও রাজনীতির দিক থেকে অজ্ঞ থেকে যায় তাহলে তারা প্রগতিমূলক যে কোন কাজকে ব্যাহত করবে না কি?

নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে একযোগে কাজ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আমাদের শিল্প সংগঠনের সার্বজনীন কাজে পুরুষদের সঙ্গে একযোগেই তারা কাজ করছে। তাদের যদি রাজনৈতিক চেতনা থাকে ও তারা রাজনৈতিক শিক্ষা পায়, তাহলে তারা এই সার্বজনীন কাজে বেশ সাহায্য করতে পারে। কিন্তু যদি তারা পদদলিত ও অনগ্রসর থেকে যায়, তাহলে নিজেদের দুষ্টবুদ্ধিবশত নয়, যেহেতু তারা অনগ্রসর সেইজন্য, এই সর্বসাধারণের কাজ পণ্ড করে ফেলতে পারে।

কিষাণ মেয়েরাও দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরুষ কৃষকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করার জন্য। পুরুষদের সঙ্গেই তারা আমাদের কৃষির উন্নতি, সাফল্য ও সমৃদ্ধি সাধন করছে। তারা যদি অনগ্রসরতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হয়, তাহলে তারা এক্ষেত্রে প্রভূত কাজ করতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত অবস্থাও ঘটতে পারে। ভবিষ্যতেও যদি তারা অশিক্ষার গোলাম থেকে যায় তাহলে তারা কাজের বাধাস্বরূপ হয়ে পড়তে পারে।

পুরুষ শ্রমিক ও কিষাণ পুরুষদের মত নারী শ্রমিক ও কিষাণ নারীরা সমান অধিকারপ্রাপ্ত স্বাধীন নাগরিক। মেয়েরা আমাদের সোভিয়েট ও সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহ নির্বাচন করে এবং এইগুলোয় নিজেরা নির্বাচিত হতে পারে। নারী শ্রমিক ও কিষাণ মেয়েরা যদি রাজনৈতিক জ্ঞানযুক্ত হয় তাহলে তারা আমাদের সোভিয়েট ও সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহে সংস্কার সাধন এবং ঐগুলোর শক্তি ও আয়তন বাড়াতে পারে। কিন্তু তারা যদি অনগ্রসর ও অজ্ঞ থেকে যায় তাহলে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, পণ্ড করে ফেলতে পারে।

চরম কথা হচ্ছে এই যে, শ্রমিক নারী ও কিষাণ নারীরা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের জননী আর তাদেরকে মানুষ করার দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত রয়েছে। তারা হতাশার মনোবৃত্তি জুগিয়ে শিশুদের খর্বতা সাধনও করতে পারে, আবার তাদের মনকে সতেজ ও স্বাস্থ্যসম্পন্ন করে তাদের দ্বারা আমাদের দেশের অগ্রগতির ব্যবস্থাও করতে পারে। সোভিয়েত ব্যবস্থা সম্বন্ধে আমাদের নারী ও জননীদের সহানুভূতি আছে, না তারা পুরোহিত, ধনী চাষি ও বুর্জোয়াদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে, এই সমস্ত তারই ওপর নির্ভর করছে।

সেইজন্য শ্রমিক ও কিষাণরা যখন নতুন জীবন গড়ে তোলার দয়িত্ব গ্রহণ করেছে, সেই সময় আজ বুর্জোয়াদের ওপর প্রকৃত জয়লাভ সম্পর্কে শ্রমিক নারী ও কিষাণ মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। সেইজন্য মেহনতকারী মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক ও কিষাণ নারীদের প্রথম কংগ্রেসের মূল্য ও গুরুত্ব সত্য সত্যই অপরিমেয়।

পাঁচ বছর আগে এই কংগ্রেস নতুন সোভিয়েত জীবন গড়ে তোলা সম্পর্কে লক্ষ লক্ষ মেহনতকারী মেয়েদের টেনে আনা পার্টির চলতি কর্তব্যরূপে গণ্য হয়েছিল। এই কর্তব্যের পুরোভাগে দাঁড়িয়েছিল কারখানা অঞ্চলসমূহ থেকে আগত শ্রমিক মেয়েরা; কারণ মেহনতকারী মেয়েদের মধ্যে তারাই ছিল সবচেয়ে জীবন্তু চেতনাযুক্ত। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ সম্বন্ধে যে অনেক কিছু করা হয়েছে তা বেশ বলা যেতে পারে, যদিও করণীয় অনেক কিছুই এখনও পড়ে আছে।

আজ পার্টির আশু করণীয় কর্তব্য হচ্ছে আমাদের সোভিয়েত জীবন গড়ে তোলার কাজে নিযুত কিষাণ মেয়েদের টেনে আনা। 
পাঁচ বছরের কাজের ফলে কিষাণদের ভেতর থেকে বহুসংখ্যক অগ্রগামী কর্মী গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।

আশা করি নতুন নতুন রাজনৈতিক চেতনাযুক্ত কিষাণ মেয়েরা এসে অগ্রগামিনী কিষাণ নারীদের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলবে। আশা করি, আমাদের পার্টি এই সমস্যারও সমাধান করতে পারবে।

– স্ট্যালিন, প্রথম শ্রমিক ও কিষাণ নারী কংগ্রেসের পঞ্চবার্ষিকী উপলক্ষে প্রদত্ত বক্তৃতা, ১৯২৩।


লেহম্যান ব্রাদার্স পতনের এক দশক

8-years-ago-lehman-brothers-became-the-only-true-icon-to-fall-in-a-tsunami-that-rocked-the-global-economy

এক সময়কার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামী ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক হিসাবে লেহম্যান ব্রাদার্সকে এক ডাকে চিনত সারা দুনিয়া। কদর বেড়ে যেত সেখানে কাজের সুযোগ পেলে। এই নামী ব্যাংকটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করে লেহম্যান ব্রাদার্স। ৬০ হাজার কোটি ডলার ঋণের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে ২০০৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আমেরিকার চতুর্থ বৃহৎ ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ঘোষণা করে ঐ ধার আর শোধ করতে পারবে না তারা।

সমস্যার শুরু হয় বাড়ির আকাশছোঁয়া দামের বুদ্বুদ ফেটে যাওয়া থেকে। অর্থনীতির পরিভাষায় ‘সাবপ্রাইম মর্টগেজ ক্রাইসিস’। সহজ কথায়, যে দাম ধরে বাড়ি বন্ধক রেখে ধার দেওয়া হয়েছিল, পরে ব্যাংক দেখে যে তার বাজারদর আসলে অনেক কম। ফলে শোধ না হওয়া ঋণের টাকা ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় নেই। তার উপরে অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভাল থাকাকালে ঋণ দেওয়া হয় দেদার, ফলে জটিল ডেরিভেটিভের আঁক কষেছিল বীমা সংস্থা ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলি। সব মিলিয়ে অর্থনীতির মরণ ফাঁদ। সবার আগে সাবধান করেছিল রিজার্ভ ব্যাংকের এক প্রাক্তন গভর্ণর।

অবশ্য স্বাস্থ্যে যে ঘুণ ধরেছে, মার্কিন অর্থনীতির নাড়ি টিপে তা টের পাওয়া যাচ্ছিল আগে থেকেই। কিন্তু লেহম্যানের পতনের পরে যেন তা ধসে গিয়েছিল স্রেফ তাসের ঘরের মতো। একে একে দেউলিয়া ঘোষণা করে জি.এম. ক্রাইসলারের মতো মার্কিন বহুজাতিক গাড়ি কোম্পানি। মাথা চাড়া দেয় মাত্রা ছাড়া বেকারত্ব। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ, এশিয়াসহ সারা পৃথিবীতে। ভয়াল মন্দার মুখোমুখি হয় সারাবিশ্ব। যার তুলনা শুরু হয় ১৯৩০ সালের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ এর সঙ্গে। নানান দেশ অর্থনীতির চাকার গতি ধরে রাখতে ত্রাণ প্রকল্প (উদ্ধার কর্মসূচি) ঘোষণা করে, এমনকি ভারতের তৎকালীন ইউপিএ সরকার ২০০৯ সালের বাজেটে অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় মন্দার ধাক্কায় নড়বড়ে ভারতীয় অর্থনীতিকে সামাল দিতে ত্রাণ প্রকল্প ঘোষণা করে যে সুনাম অর্জন করেন তার পুরস্কার হিসাবে ইউপিএ সরকার তাঁকে ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করে।

রসাতলে যাওয়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার স্বপ্ন দেখিয়েই মার্কিন রাজনীতিতে উত্থান হয় আর এক নতুন তারকার, বারাক ওবামা। সঙ্গে শ্লোগান- ‘ইয়েস, উই ক্যান’। ঐ মন্দার সময়ে মার্কিন মুলুকে চেনা ছবি হয়ে দাঁড়ায় চাকরির খোঁজে লম্বা লাইন আর ধস হয়ে ওঠে তখনকার মার্কিন অর্থনীতির প্রতীক। দেখা দেয় নিউইয়র্ক স্টক এক্সেঞ্জের হতাশ ব্রোকার।

ব্যাংক, শেয়ার বাজারের মাত্রাছাড়া লোভেই ভুগতে হয় সাধারণ মানুষকে। এই ক্ষোভ, রাগ উগরে দিয়েই মার্কিন মুলুকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে- ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’। শ্লোগান ওঠে ১ শতাংশের জন্য বাকী ৯৯ শতাংশের ভোগান্তি বন্ধ হোক।

আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটির ওয়াল স্ট্রিটে পৃথিবীর বৃহত্তম শেয়ার বাজার। একে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এই ওয়াল স্ট্রিটের জুকোতি পার্কে এক বৃহৎ প্রতিবাদ আন্দোলন ও অবস্থান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এই সমাবেশ বিভিন্ন দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অসাম্যের বিরুদ্ধে জনমতকে প্রবলভাবে উজ্জীবিত ও উৎসাহিত করে। যদিও তার প্রভাব ছিল স্বল্পকালীন। নিউইয়র্ক সিটির এই গণআন্দোলন ও সমাবেশ ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

একটি কলোনিয়াল ভোগবাদ বিরোধী ও পরিবেশ রক্ষাকারী গোষ্ঠী এবং তাদের মুখপত্র এ্যাবডাস্টার এই ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের সুত্রপাত করেছিল। এই আন্দোলনে উত্থাপিত বিষয়গুলি ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্যের সমস্যা, অর্থনৈতিক লোভ ও দুর্নীতি এবং সরকারের ওপর কর্পোরেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে আর্থিক পরিবেশ প্রদানকারী সংস্থাসমূহের লাগাম ছাড়া অনৈতিক প্রভাব। এই আন্দোলনের প্রধান শ্লোগান, ‘আমরা শতকরা ৯৯ ভাগ’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই শ্লোগানের মর্মবাণী যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা ধনী এক শতাংশ এবং অবশিষ্ট মানুষজনের মধ্যে আয় ও সম্পদের মধ্যে যে ব্যাপক বৈষম্য তা নিরসনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

২০১১ সালের ১৫ নভেম্বর অর্থাৎ প্রায় ২ মাস পরে জুকোতি পার্ক থেকে আন্দোলনকারীদের বলপূর্বক বহিস্কার করা হয়। এরপর তারা বিভিন্ন ব্যাংক, বহুজাতিক (কর্পোরেট) ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রধান কার্যালয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলির প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলন বিক্ষোভ সংগঠিত করে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমও এই আন্দোলনের সমর্থনে সোচ্চার হয়।

দি গার্ডিয়ান পত্রিকার ২০১৭, ২৯ ডিসেম্বর সংখ্যায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং পুলিশ প্রশাসন ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’এর আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে গণ্য না করে জয়েন্ট টেরোরিজম টাস্ক ফোর্স-এর মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা করে এবং নানাবিধ দমন-পীড়ন নীতি প্রয়োগ করে এই আন্দোলনকে বন্ধ করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়। তা সত্ত্বেও এই আন্দোলনের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে প্রসার লাভ করে।

শুরুতে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন ছিল প্রধানত রাজনীতিতে কর্পোরেট সংস্থা ও আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব হ্রাস করা ও অর্থনৈতিক অসাম্য হ্রাস করার আন্দোলন। ৫ বছরের মধ্যে তার সাথে যুক্ত হয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কর্মস্থানে বিভিন্ন ধরনের অধিকারের ব্যবস্থা করা, ব্যাংকগুলির ফটকা ব্যবসায় অর্থলগ্নির প্রবণতা হ্রাস করা। ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা ঋণের বোঝা লাঘব করা, অশ্বেতাঙ্গ মানুষজনের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিদ্বেষ দূর করা, ন্যুনতম মজুরি চালু করা, কারাগারে বন্দীদের অধিকার সুনিশ্চিত করা এবং এইডস আক্রান্তদের জন্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি দাবি-দাওয়া।

২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের প্রভাব আমেরিকার প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। যদিও গতি তার ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়। ২০১৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ আন্দোলনের শুরুর ৫ বছর পর পুনরায় আন্দোলনের সংগঠক ও সমর্থকবৃন্দ আমেরিকার কোভারম্যান হালাস পার্কে একটি জমায়েত সংগঠিত করে এবং ওই জমায়েত পুলিশ হেড কোয়াটারের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

প্রচন্ড উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে শুরু হলেও ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন কোনও ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। ঘোষিত দাবি-দাওয়া পূরণ করার ব্যাপারেও এই আন্দোলন সফল হতে পারেনি। এর কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়।

প্রথমত ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন সুনির্দিষ্ট এমন কোন লক্ষ্য স্থির করতে পারেনি, যেগুলি বাস্তবে নীতি নির্ধারক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে।

দ্বিতীয়ত এই আন্দোলনের মূল শ্লোগান ‘আমরা ৯৯ পার্সেন্ট’ ঘোষণা করা সত্ত্বেও এর সাথে ব্যাপক সংখ্যক দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ এবং বিশেষ করে আমেরিকাবাসী, আফ্রিকান জনগোষ্ঠীকে সামিল করা সম্ভব হয়নি। এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল মূলত গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ, সোশ্যাল মিডিয়া, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী এবং ছাত্র-ছাত্রীরা।

তৃতীয়ত ২০১১ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই আন্দোলনের স্বপক্ষে মামলা-মোকদ্দমার জয় লাভের ব্যর্থতার কারণে এর সংগঠকগণ আন্দোলনের সমর্থনে কোনও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হন।

চতুর্থত এই আন্দোলনে সমাজ পরিবর্তনকামী অন্যান্য আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির সাথে বিশেষত রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়ন সংস্থাগুলির সাথে যৌথক্রিয়া ও সহযোগিতার বাতা-বরণ সৃষ্টি করতে পারেনি।

এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনে ইহুদি বিরোধী শ্লোগানের আধিক্য দেখা যায়। এতে আমেরিকার বেশ কিছু গণমাধ্যম এই আন্দোলনকে সংকীর্ণ ইহুদি বিরোধী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করে।
এইসব কারণে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন সামগ্রিকভাবে সাফল্য লাভ করতে পারেনি। খোদ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলে ২০১১ সালে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল এবং সমগ্র বিশ্বের পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জন-মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল, মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে তার প্রভাব দ্রুত হ্রাস পায় এবং বর্তমানে সেটা প্রায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা মেনে নিলেও এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে ভবিষ্যতে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন-সংগ্রামে এই ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের ইতিহাস অনুপ্রেরণার ভূমিকা পালন করবে।

‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন এই শিক্ষা প্রদান করে যে, সুসংগঠিত শ্রমিকশ্রেণির সংগঠনের নেতৃত্ব ছাড়া পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে সার্বিক সাফল্য লাভ সম্ভব নয়।

লেখক – বিজয় মিত্র

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৮।।সংখ্যা-০৭, রোববার।। ২৮ অক্টোবর ২০১৮।। ১৩ কার্তিক ১৪২৫ বাংলা


পশ্চিমবঙ্গে আবার মাওবাদী সক্রিয়তা বাড়ছে, উদ্বিগ্ন প্রশাসন

রাজ্যে আবার মাওবাদী সক্রিয়তা শুরু হয়েছে, খোদ লালবাজারের পুলিশি রিপোর্ট তেমনটাই বলছে। আর এই রিপোর্ট পাওয়ার পড়েই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। রিাপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, বন্ধ কলকারখানা, বিভিন্ন বস্তি এলাকায় মাওবাদী কার্যকলাপ শুরু হয়েছে। জানা যাচ্ছে বাইরে থেকে বিভিন্ন লোকজনদের আনাগোনা চলছে শহর ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকায়। এ বিষয়ে পুলিশকে বিশেষ নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে লালবাজার সূত্রের খবর। কেন আবার মাওবাদী কার্যকলাপ বাড়ছে, তার অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রশাসনের নজরে এসেছে বিভিন্ন এলাকার বন্ধ কলকারখানা, এলাকার মস্তান ও তোলা বাজিরদের অত্যাচারে অতিষ্ট মানুষজনকে কাছে টানছে মাওবাদীরা। এলাকায় এলাকায় সরকার ও প্রশাসনের নানা ব্যর্থতা তুলে ধরে প্রচার চালানো হচ্ছে বলেও প্রশাসনের কাছে খবর এসেছে। এই রিপোর্ট প্রশাসনকে যথেষ্ট উদ্বেগে রেখেছে বলে সূত্রের খবর। এর মোকাবিলা করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন তেমনটাই খবর।

সুত্রঃ satdin.in