আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা – ঊ চিয়াং

gettyimages-113695033

 

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

ঊ চিয়াং

 

অনলাইন প্রকাশলাল সংবাদ / lalshongbad.wordpress.com

                                                             

                         

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

(চীনা পত্রিকা ‘ষ্টাডি’তে প্রকাশিত নিবন্ধের অনুবাদ)

 

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে মজুর, ক্ষেতমজুর আর বুদ্ধিজীবি-এ দুয়ের মধ্যে খুব বেশি তফাৎ নেই। তবে বুদ্ধিজীবিদের কতকগুলো বিশেষত্ব একটু ভিন্ন ধরনের। তাই সারবস্তু (কণ্টেণ্ট) ও পদ্ধতি দু’দিক থেকেই সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা প্রশ্নে এদিক দিয়ে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। অতীতে যে সব কমরেড বুদ্ধিজীবি ছিলেন তাঁদের মধ্যেকার সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার সমস্যাই এই প্রবন্ধের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটা কি ?

এ বিষয়ে অনেকের স্পষ্ট ধারণা নেই। নিম্নলিখিত তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে বিষয়টা পরিষ্কার হতে পারে:

ক) বিভিন্ন বিপ্লবী পার্টি ও গ্রুপের পক্ষে তাদের চালিকা শক্তি (মোটিভ ফোর্স) হল সমালোচনা আর আত্ম-সমালোচনা; যে সব কমরেড ঐ পার্টি বা গ্রুপে কাজ করেন তাঁদের পক্ষেও তাই। কোন মেশিন দিয়ে যদি কিছু উৎপাদন করতে হয় তো আগে তার বাষ্প, বিদ্যুৎ বা ঐ ধরনের কোন একটা চালিকা শক্তির দরকার। তেমনি সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা বিপ্লবী পার্টির আর বিপ্লবী কমরেডদের উদ্দীপনা দেয়- তাঁদের এগিয়ে যাবার মত প্রেরণা যোগায়। এ না হলে অগ্রগতি শুধু বন্ধই হয়ে যায় না, এমন কি পশ্চাদগতি কিংবা ভাঙনও দেখা দেয়। ভুল-ত্রুটি শুধরে নিতে হলে, ভাল গুণগুলো আরও বাড়িয়ে তুলতে হলে, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ছাড়া পথ নেই। মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্রে এই অস্ত্রটি যদি আমাদের হাতে থাকে তবে ‘‘শত্রুর কোন ঘাঁটিই আমাদের কাছে অজেয় নয়, কোন শত্রুই আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারে না।”

বাস্তবিক, বিপ্লবী কর্মতৎপরতায় এগিয়ে যাবার মত অনুপ্রেরণা আমরা পাই সমালোচনা আর আত্ম-সমালোচনা থেকেই; বিপ্লবী পার্টি ও বিপ্লবীদের এগিয়ে যাবার সামর্থ্য কতখানি তা এর দ্বারাই নির্ধারিত হয়।

খ) বিপ্লবী পার্টি বা গ্রুপের উৎকর্ষ (কোয়ারিটি) কতখানি তা সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা থেকেই প্রকাশ পায়। প্রত্যেক বিপ্লবীর যোগ্যতার চূড়ান্ত পরীক্ষা হয় এরই মারফৎ। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটাকে পার্টি বা গ্রুপ কতখানি বুঝছে, কিভাবে কাজে লাগাচ্ছে, তা দেখেই বোঝা যায় সে পার্টি বা গ্রুপ সত্যিই বিপ্লবী কিনা। পার্টি বা তরুণ কমিউনিষ্ট লীগের কোন সভ্য বা মুক্তিফৌজের কোন সৈনিকের উৎকর্ষ যাচাই করতে হলেও ঐ সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সম্বন্ধে তাঁদের বোধ আর প্রয়োগ ক্ষমতা দিয়েই তা করতে হবে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আর কুওমিন্টাং এর দৃষ্টান্ত ধরুন। জমিদার, পুঁজিদার আর অত্যাচারীদের প্রতিনিধি হল- কুওমিন্টাং জনসাধারণকে শোষণ করে। আর কমিউনিষ্ট পার্টি হল সর্বহারা শ্রেণির প্রতিনিধি- এ পার্টি জনসাধারণকে পরিচালিত করে, তাদের মুক্তি এনে দেয়। পার্টি দু’টির আসল প্রভেদ এখানেই; আর এই মূল পার্থক্য থেকেই আসছে আর একটি বিশেষ পার্থক্য। কুওমিন্টাং-এর মতে অধঃপাতে গেছে যে পার্টি তার সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা মারফৎ লোকের সামনে নিজের দোষ-ত্রুটি খুলে ধরার ইচ্ছে নেই, ক্ষমতা বা সাহসও নেই। চিয়াং কাইশেক কখনো কারো কাছে নিজের দোষ স্বীকার করেনি। যদি কখনো স্বীকার করে থাকে তো সে নেহাত ঘটনা চক্রে কিংবা প্রতারণার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমাদের কমিউনিষ্টরা, বিপ্লবী সৈনিকেরা জনগণের কাছে নিজেদের দোষের কথা খুলে ভয়ই তো পায়ই না, বরং আনন্দ পায়; আর ধরার সঙ্গে সঙ্গে অমনি নতুন নতুন উপায় ভেবে বের করে, যাতে দোষ-ত্রুটি দূর করা যায়। অন্য পার্টি অন্য মানুষ- যারা বিশেষ ছাঁচে ঢালাই করা নয় – তারা এ কাজ করতে পারে না।

সম্প্রতি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আর কমিউনিষ্ট পার্টি ইনফরমেশন ব্যুরো জাপানী কমিউনিষ্ট পার্টি’র এক নেতৃস্থানীয় কমরেডের সমালোচনা করেছিলেন। ঐ কমরেড দ্বিধাহীনভাবে সর্বজন-সমক্ষে আমাদের সমালোচনা গ্রহণ করেছিলেন, স্বীকার করেছিলেন তাঁর দোষ। এ হলো একটা দৃষ্টান্ত যা বুর্জোয়া বা পাতিবুর্জোয়া রাজনৈতিক পার্টির পক্ষে করা অসম্ভব।

আমেরিকায় রিপাবলিকান আর ডেমোক্রেটিক নামে যে বুর্জোয়া পার্টি আছে তারা চিয়াং কাইশেককে ছ’ শ’ কোটি ডলার সাহায্য দিয়েও টিকিয়ে রাখতে পারেনি। কিন্তু মাইনে করা চিয়াং কাইশেকের যখন পতন হল, তখন তাদের সাহস হলো না খোলাখুলি নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করার। তার বদলে তারা এক সরকারী ইস্তিহার বের করে বললো যে, সব দোষ অপদার্থ চিয়াং কাইশেকের আর নিজেদের কুৎসিত বীভৎসতা ঢাকার জন্যে তারা আবার লজ্জার মাথা খেয়ে মিথ্যে গল্প বানালো ‘সোভিয়েত হস্তক্ষেপের’।

দোষ স্বীকার করতে বা সংশোধন করতে অনিচ্ছার বিরুদ্ধে আমাদের পার্টি সর্বদা সংগ্রাম করেছে, সংগ্রাম করছে রাজনৈতিক জড়তার বিরুদ্ধে- চরম শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের মত করেই। সর্বকালে ও সর্বদেশে আমাদের বিপ্লবী পার্টি প্রগতির দিকেই অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে এবং সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা প্রয়োগ করে।

সুতরাং বিপ্লবী কর্মধারার (প্র্যাকটিস) শ্রেষ্ঠ পরিচয় হল সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা।

গ) রোজ আমাদের যে সব জিনিস প্রয়োজন সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা তারই একটি। স্তালিন দেখিয়ে দিয়েছেন যে, পানি বাতাসের মতই এটা আমাদের প্রয়োজনে লাগে। পানি আর বাতাস ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, তেমনি সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ছাড়া বিপ্লবী পার্টি বা বিপ্লবী কমরেডরা বাঁচতে পারেন না।

এগিয়ে যাবার প্রেরণা জুগিয়ে দেয় সমালোচনা আর আত্ম-সমালোচনা। বিভিন্ন বিপ্লবী গ্রুপ ও কমরেডদের মূল উৎকর্ষ-এর ভেতর দিয়েই প্রকাশিত হয়। এটা আবার জরুরী নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসও বটে- এরই থেকে আসে অবাধ প্রগতির প্রেরণা, এরই থেকে শক্তি ও তেজ সংগ্রহ করে বিপ্লবী সংগঠনগুলো, সেগুলোর ক্ষমতা এতে বেড়ে চলে।

আমরা সত্যই বলতে পারি, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার সাহায্যে বিপ্লবী সংগঠন সুসংহত হয়, ব্যক্তিগতভাবে বিপ্লবীরা কর্মতৎপর হন এবং এর ফলে অতিরিক্ত শক্তির নিশ্চিত ভরসা পাওয়া যায়।

এ কথাটি অনেক কমরেড ঠিক মত বোঝেন না। তাঁরা ভাবেন, সমালোচনা, আত্ম-সমালোচনা এমন কিছু গুরুতর ব্যাপার নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়- ওটা শুধু অনুধাবন (স্টাডি) করার একটা পদ্ধতিমাত্র। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা হচ্ছে অপরকে আক্রমণ করার একটা বিশেষ পদ্ধতি- এমন কথাও কোন কোন কমরেড মনে করেন। আবার কেউ কেউ ভাবেন যে, এটা একটা ঐন্দ্রজালিক জিনিস যাতে সব দোষ ঢাকা পড়ে। এমন এক ধরনের কমরেড আছেন যাঁরা প্রায়ই আত্ম-সমালোচনা করেন- খোলাখুলি স্বীকৃতিতে তাঁরা ‘অদ্বিতীয়’ হলেও, তারপরও দোষ-ত্রুটিতে তাঁরা যে মহাপ্রভু সেই মহাপ্রভুই থেকে যান। কোন কোন কমরেড আবার অপরকে সমালোচনা করার বেলায় সবার আগে; কিন্তু নিজের দুর্বল জাযগায় ভুলেও হাত দেন না। লোকের চোখে ধূলো দিয়ে নিজেদের দোষ ঢাকার জন্যে তাঁরা এলোপাতাড়ি সমালোচনা করে চলেন।

কেউ কেউ ভাবেন, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা যেন বনের বাঘের মত ভয়ঙ্কর; সমালোচনার জন্যে মিটিং হবে শুনলেই তাঁদের ‘জ্বর এসে যায়’ এবং এইভাবেই তাঁরা পালাবার চেষ্টা করেন। আত্ম-সমালোচনা করতে হলেই এঁদের বুক কেঁপে উঠে, তার ঠেলা সামলাতে তাঁরা ভরসা পান না। কেউ কেউ আবার এ জিনিসটাকে জুজুর মত ভয় করেন; আর সব যেন ঠিকই চলছে, কেবল এটা নিয়েই যত গন্ডগোল। এরা ভুল করে মনে করেন যে, প্রকৃত সমালোচনা যেন “জনতার আদালতে বিচার”। কমরেডরা ভাবেন যে, অন্য লোকে তাঁদের দোষ-ত্রুটির কথা জানলে তাদের মর্যাদা নষ্ট হয়ে যাবে, ইজ্জত ধূলোয় লুটোবে। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার লক্ষ্য কি তা পরিষ্কার না বোঝার ফলেই এই সব ধারনার উদ্ভব হয়।

মোট কথা হল: সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা হচ্ছে বিপ্লবী আর প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যেকার বিপ্লবী আর প্রতি-বিপ্লবীদের মধ্যেকার একটি মূল পার্থক্য। আবার এর দ্বারাই কমরেডদের উৎকর্ষ ও প্রগতিশীলতা কতখানি তা-ও স্থির করা যায়।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা গড়ে তুলতে হবে কেন ?

আমাদের মস্ত বড় জয় হয়েছে তা সবাই জানেন। পুরোনো সমাজ-টাকে উচ্ছেদ করে আমরা জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু তাই বলে পুরানো ব্যবস্থাটাকে আমরা একবারে লোপ পাইয়ে দিতে পেরেছি, একথা বলতে পারি কি? না। চীনদেশে সামন্তবাদ আর আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ এখনো সমূলে উৎপাটিত হয়নি। উৎপাদনের পুরানো সম্বন্ধগুলো এখনো একেবারে দূর হয়নি: পুরানো ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা এখনো রয়েছে; হাজার হাজার বছর পুরানো সমাজের বিশেষ করে তার জঘন্য মতাদর্শের ধ্বংসাবশেষের প্রভাব আজও অনেক লোকের চেতনায় দেখতে পাওয়া যায়।

এই সব আদর্শগত শত্রুর হাত থেকে আমরা কখনই নিরাপদ নই। কারণ তারা অনবরত চেষ্টা করেছে যাতে আমাদের আক্রমণ করে মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারে।

পুরানো সমাজ থেকে যেসব বুদ্ধিজীবিরা এসেছেন, অতীতে তাঁরা বরাবর কিছুটা আরামের জীবনই যাপন করতেন-পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী শিক্ষা এবং প্রভাব তাঁদের ওপর অনবরত পড়ত। তার ফলে তাঁদের মতাদর্শে সবসময়ে অনেক ‘বংশগত’ দুর্বলতা প্রতিফলিত হয় এবং সেগুলো বারে বারে সামনে এসে দাঁড়ায়। তাই যে অ-সর্বহারা মতাদর্শগুলো আমাদের ওপর ‘অতর্কিত আক্রমণ’ চালায়, ‘অলক্ষিতে আমাদের মধ্যে ‘অনুপ্রবেশ’ করে সেগুলিকে পরাস্ত করার জন্যে আমাদের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ব্যবহার করতেই হবে। শ্রেষ্ঠ গুণাবলীর বিকাশের জন্য সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা প্রয়োগ করতেই হবে।

মতাদর্শ ভ্রান্ত হওয়া সত্তে¡ও আমাদের বিপ্লবী কর্মীরা যদি তা উপেক্ষা করেন কিংবা সহ্য করেন, যদি তাঁরা অ-সর্বহারা লাইনে চলে কিংবা উদার নীতিবাদের প্রশ্রয় দেন- তাহলে ভ্রান্তি ঘটতেই থাকবে, ছোট ছোট ভুলগুলো মারাত্মক ভ্রান্তিতে পরিণত হবে, এখান ওখানকার আলাদা ভুলগুলো সর্বব্যাপী হয়ে দাঁড়াবে। এরকম ভ্রান্ত পদ্ধতিতে চলতে থাকলে কর্মীদের মধ্যেও অধঃপতনের আশঙ্কা দেখা দেবে।

কমরেড মাও সে তুং বলছেন: ‘বিপ্লব সাধারনভাবে আমরা যে জয়লাভ করেছি সে তো আমাদের ‘‘দশ হাজার লি দীর্ঘ অভিযানে, এ প্রথম কদম মাত্র” *এই মন্তব্যটার অর্থ নানান দিক থেকে ভেবে দেখা দরকার।

মতাদর্শের সংগ্রামের ব্যাপারে বলা যায়: কৃষককুল, পাতিবুর্জোয়া সম্প্রদায় আর জাতীয় পুঁজিদার শ্রেণী-এই তিন পক্ষকে পরিচালনা করে যে সর্বহারা শ্রেণী তাদের পক্ষে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা অপেক্ষাকৃত সহজই ছিল। কিন্তু পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী মতাদর্শের সংগ্রাম-ঠিক ‘দীর্ঘ অভিযানের’ মতো।

মাহিনা ও সুখ-সুবিধার ব্যাপার নিয়ে কোনো কোনো কমরেড সম্প্রতি খুব মেতে উঠেছেন। মনে হবে ব্যাপারটা খুব সামান্য, মাত্র কয়েকজন লোকই এ নিয়ে মাথা ঘামায়। কিন্তু আসলে এটা হচ্ছে বুর্জোয়া মতাদর্শের চিহ্নাবশেষ, ব্যক্তিগত সম্পত্তির যে ধারণা তারই জের। কমিউনিজমে লক্ষ্যে অগ্রসর হবার জন্যে আমাদের নয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নয়া গণতান্ত্রিক শিক্ষা ও প্রচার আমাদের ক্রমাগত চালিয়ে যেতে হবে এবং পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে এই সংগ্রামের অস্ত্র হচ্ছে সমালোচনা ও আাত্ম-সমালোচনা।

আমাদের বুদ্ধিজীবীদের বেশীর ভাগই অতীতকালে কোন প্রত্যক্ষ দৈহিক পরিশ্রমের কাজ করেননি। এই ঘটনা এবং তাঁদের লালন-পালনের পদ্ধতি আর পরিবেশের প্রভাবের ফলে- তাঁদের মধ্যে অনেক রকমের দুর্বলতা জন্মায়। আর সব থেকে বড় কথা, চীনদেশের প্রতিক্রিয়াশীল শাসন কর্তারা ধোঁকা আর অত্যাচারের কৌশল চালাত, যত সব বিষাক্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করত- যাতে তরুণ সম্প্রদায় তাদের যন্ত্রে পরিণত হয়- যাতে তারা দূষিত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এরই ফলে কত শোচনীয় ঘটনা ঘটত- কত তরুণ ছাত্র ঘুরে ঘুরে বেড়াত নাচঘরে না হয় জুয়ার আড্ডায়, নয় তো বেশ্যালয় কিংবা এমনি আরও কোথাও; বিষের ধোঁয়ায় তাদের মন আচ্ছন্ন হত, তাদের আত্ম-সম্মানবোধ নষ্ট হয়ে যেত।

সস্তা রোমান্টিক উপন্যাস আর অশ্লীল সিনেমা ছবি দিয়ে আমাদের শহরগুলোকে ছেয়ে দিত- জাপানী সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল কুওমিন্টাং। তাই সেই পুরানো সমাজে তরুণ বুদ্ধিজীবীরা এক জীবন্মৃত অস্তিত্বের বোঝা বয়ে বেড়াত। এই অবস্থায় মতাদর্শের দিক থেকে অনেক রোগই তাদের মধ্যে সংক্রমিত হত।

আজ বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে আমরা প্রতিজ্ঞা নিয়েছি- এই সব দোষ দূর করব, পিছনে টানার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেব। এর জন্যে আমাদের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছে এটাই সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন।

জনগণের মুক্তিযুদ্ধের জয়লাভ এখন প্রায় সর্ম্পূণ হয়ে এসেছে।* শীঘ্রই সমগ্র চীনদেশ মুক্ত হবে, প্রতিক্রিয়াশীলরা ঝাড়ে বংশে দূর হবে। কিন্তু এত দীর্ঘকালব্যাপী সামন্তবাদ, তার ওপর শতাধিক বর্ষব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ (সেই আফিম যুদ্ধের সময় থেকে)- এর পর এই বিপুল জনসংখ্যা সম্পন্ন এমন প্রকাণ্ড দেশে কমিউনিজম গঠন করা খুব সহজ কাজ হবে না। এর জন্য অনেক বিপ্লবী, অনেক কর্মী লাগবে যাতে জনসাধরনকে শিক্ষিত, সংগঠিত ও পরিচালিত করা যায়: সকলে মিলে গঠনকর্ম নিষ্পন্ন করা যায়, শেষ করা যায় “দীর্ঘ অভিযান”।

বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের কর্মী গড়ে তুলতে হবে, তাদের শিক্ষা দিতে হবে। চালু স্কুল যা আছে তা তো আছেই; তাছাড়া রাজনৈতিক মতাদর্শের সাধারনভাবে উন্নতির জন্যে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা মারফৎ শিক্ষা দিতে হবে।

বস্তুগত বা আত্মগত যেভাবেই দেখি না কেন, এই সব তথ্য থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা কত দরকার। বোঝাই যাচ্ছে যে, বিপ্লবী কাজকর্মের ফল পেতে হলে আমাদের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা উপর গুরুত্ব আরোপ করতেই হবে।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটাকে একটা জরুরী বিপ্লবী দায়িত্ব হিসেবে আমরা গ্রহণ করব- এই আমার প্রস্তাব।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার ক্ষেত্রে বিচ্যুতি

১। এক রকম কমরেড আছেন তাঁর দোষ ঢাকবার চেষ্টা করেন; খোলাখুলি, সৎ আচরণ করতে চান না। দেখলেই বোঝা যায় যে, তাঁদের দোষের কমতি নেই- তবু তারা ভাবেন যে দোষ অতি সামান্য। এমন কি একটা দোষের কথাও হয়তো তারা স্বীকার করেন না। এরা ভাবেন যে, যতক্ষণ দোষ স্বীকার না করছি ততক্ষণ ধরে কে? চীনে একটা প্রবাধ আছে,“কোন কিছু যদি বাস্তবিক গোপন রাখতে চাও তো তেমন কাজ করোই না”। কিন্তু এই সব কমরেড মনে করেন, “গোপন রাখার উপায় হল মুখে তালাচাবি আঁটা। আর যদি কেউ জেনেও ফেলে তবু যতক্ষণ স্বীকার না করছি ততক্ষণ করবে কি?” এ সব হল অহংকারের কথা- তাঁর বদনামের ভয়। কিন্তু কমরেড, যদি আপনি স্বীকার না-ও করেন তবু বাস্তবিকই কি আপনি মনে করেন যে, কেউ জানতে পারবে না? চুপ করে থাকতে আপনার শুধু তিক্ততাই বাড়বে। দোষ স্বীকার করলে “মানহানিটা” কোন খানে?

কারই বা দোষ নেই? নিজের দোষ স্বীকার করে শোধরাবার সাহস যদি আপনার থাকে তো লোকে আপনার তারিফই করবে, আপনাকে ঘৃণা করবে না।

কেউ কেউ শাস্তির ভয় পান। ভাবেন, ছোট ছোট দোষে হয় তো কেউ নজর করবে না; কিন্তু বড় দোষে শাস্তি পেতে হবে।

এ ধরনের অসাধু, এড়িয়ে- চলার মনোবৃত্তিতে ইজ্জত তো থাকেই না, বরং গুরুতর ‘মানহানি’ ঘটে থাকে।

২। কোন কোন কমরেড অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখান। ভাবেন “চোখের বদলে চোখ চাই, দাঁতের বদলে দাঁত” এবং “প্রতিহিংসা বড় মধুর”। সমালোচনা-সভায় তাঁরা অনুগ্রহের বদলে অনুগ্রহ দেখান, আর করেন আক্রমণের বদলে আক্রমণ। “গতবার তুমি আমার বিরুদ্ধে কিছু বলনি সুতরাং এবার আমিও তোমার সম্পর্কে কিছু বলব না” কিংবা, “গত সপ্তায় আমার সমালোচনা করেছিলে! আচ্ছা এবার তোমায় এমন দেখে নেব যে তুমি জীবনে তা ভুলবে না।” তারপর যত রাজ্যের কুৎসা, বিদ্বেষ জুটিয়ে এনে তাক্ লাগানো হামলা চালান। “তিন রাজ্য” উপন্যাসে *চুকে লিয়াং ওয়াং লাংকে শাপান্ত করে বেমালুম খতমই করে ফেললেন। গালাগালি দিয়ে একেবারে ভূত না ভাগানো পর্যন্ত এঁদের শান্তি নেই।

৩। কোন কোন কমরেড আবার নিজেদের দোষগুলো খুব ওপর ওপর দেখেন- গুরুতর দোষগুলো এড়িয়ে গিয়ে শুধু ছোটখাটো ত্রুটিরই উল্লেখ করেন। বড় দোষ ছোট করে দেখান, ছোট দোষ গ্রাহ্যেই আনেন না, কিংবা সমস্যার ভেতরই ঢুকতে চান না।

নিজেদের প্রতি এই তাঁদের মনোভাব। কিন্তু অন্যের বেলায় দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং সে দোষ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলাই তাঁদের রীতি। নিজের বেলায় খুব উদার আর অপরের বেলায় তাঁরা মহা কড়াঁ। এর নাম হচ্ছে-“তোমার বেলায় মার্ক্স, লেনিনবাদ-আর আমার বেলায় উদারনীতিবাদ।” নিজেদের দোষ সম্বন্ধে তাঁরা বলেন, ‘হঠাৎ হয়ে গেছে’, ‘ঝোকের মাথায় করে ফেলেছি’, ‘ও শুধু অসাবধনতার জন্যে’ ইত্যাদি। কিন্তু সে ভুলই যদি অপরে করে তখন এঁরা বলেন, ‘ওরা বদলাবে না’, ‘ওদের স্বভাবই ঐ রকম’, ‘গুরুতর ত্রুটি’, অমুক ‘বাদ’ নয় তো তমুক ‘বাদ’।

৪। কোন কোন কমরেড একটা খুঁটিনাটির ওপর সবটা জোর দিয়ে ভাবেন যে, তাতেই সবটা ধরা যাবে। তাঁরা “কায়া ভ্রমে ছায়াকেই পাকড়াও করেন”। আপাত রূপটাই তাঁরা খেয়াল করেন, আসল মর্ম বিস্মৃত হন। এ কমরেড, সে কমরেডের সামান্য কোন খুঁত ধরে তারই সাহায্যে তাকে একহাত নিতে চান। দোষ খুঁজে বেড়ানোই তাদের একাগ্র সাধনা। ‘অমুক দিন তুমি বড্ড জোরে কথা বলেছিলে’, ‘বেড়ানোর সময় তোমার জামার বোতাম খোলা ছিলো’- এমনি সব তুচ্ছ নালিশের তাঁরা ফিরিস্তি করে বেড়ান, দোষটা বড় হোক বা ছোট হোক তার আসল চেহারাটা কি সেটা ধর্তেব্যের মধ্যেই আনেন না। দোষটা ইচ্ছাকৃত বা আকস্মিক, স্বভাবগত না অন্যরকম, রাজনীতিগত না মতাদর্শগত তা তাঁদের দেখার দরকার হয় না, তখনকার অবস্থার কথাটাও চিন্তা করেন না। উন্মাদ সমালোচনা করে তাঁদের শিকারকে তাঁরা একেবারে কাঁদিয়ে ছাড়েন। কিন্তু ফল কিছুই হয় না’, ‘বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া’।

৫। অন্য কমরেডদের সমালোচনা করার সময় কেউ কেউ আবার শুধু গুণের কথাই তোলেন, দোষের কথা একেবারে এড়িয়ে যান। চারদিকে প্রশংসা-সৃষ্টি করাই তাদের কায়দা। তাদের মতে সবাই একেবারে চমৎকার- সবার সেরা এঁরা লোকের সুনজরে পড়ার জন্যেই প্রাণপাত করেন।

অনেক কমরেড আছেন তাঁরা অন্যের মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শুনতেই শুধু ভালবাসেন- খোলাখুলি প্রশংসায় তাঁদের মন খুশী হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের ভুল-ত্রুটির কথা ওঠালেই এদের চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠে- মাথা গরম হয়ে যায়। প্রশংসা করাই যেসব কমরেডের কায়দা তারা এদের কাছে খুবই পছন্দসই। এ ধরনের প্রশংসা যে শুধু ফাঁকা কথা তা তাদের মাথায় ঢোকে না।

৬। অন্যদের শুধু দোষের সমালোচনাই করলাম; কিন্তু তাদের কৃতিত্বের কথা উল্লেখই করলাম না-এ আর এক ধরনের বিচ্যুতি। এ বিচ্যুতিটা খুব গোঁড়া ধরনের। কোন কোন কমরেড ভাবেন যে, সমালোচনা মানেই হ’ল শুধু দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। তারা ভাবেন যে, সমালোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে যত পার দোষ খুঁজে বের করে কমরেডটিকে এমন অপদার্থ বলে প্রমাণ করে দিতে হবে যে, সে যেন ‘আর মুখ দেখাবার ঠাঁই না পায়’। “প্রশংসা! তাহলে আর সমালোচনা কি হল?”

একজন কমরেডকে জানি, যাকে অনেকেই পছন্দ করত না। এ নিয়ে মিটিং হবার আগে তারা একটা খাতা-পেন্সিল নিয়ে ঘুরে বেড়াতে আরম্ভ করল- কমরেডটির সম্বন্ধে কার কি সমালোচনা আছে জড়ো করতে। দোষের কথা শুনলেই তারা খাতায় টুকল; কিন্তু যদি কেউ কমরেডটির পক্ষে কিছু বলল, তা আর টুকল না- বলল, “ওকে প্রশংসা করেন কেন ? আমরা তো আর ওকে আদর্শ কমরেড বলে দেখাতে যাচ্ছিনে।” এইভাবে তারা আসামীর বিরুদ্ধে প্রায় দু’তিন শ’ ‘কসুর’ জোগাড় করে আনল।

কমরেডস, আপনারা ভেবে দেখুন এ ধরনের সমালোচনায় কি কোন কাজ হতে পারে ? যাকে সমালোচনা করা হ’ল তার কি কোন উপকার হতে পারে ?

৭। কোন কোন কমরেড শুধু নিজেকেই যাচাই করেন, নিজের সমালোচনা করেন; কিন্তু অন্যদের সমালোচনা করেন না। এ ধরনের কমরেডের নজর শুধু নিজের দিকে, অন্যদের দিকে তার খেয়ালই নেই। তার ভয় অপরকে শত্রু দাঁড় করানো ঠিক হবে না। অপরকে সমালোচনা করতে তিনি ভয় পান, ভাবেন তারা তাহলে তাকে ঘৃণা করবে, তার ওপর শোধ নেবে। তার মনে হয়, “কারই বা দোষ নেই ? আজ যদি ওর সমালোচনা করি তো কালই হয় তো ও শোধ নেবে।” “আপন সদর দরজার সামনেটা ঝাঁট দাও- অন্যের ছাদের জঞ্জাল আপনা-আপনিই দূর হবে এখন”- খুচিয়ে ঘা করার দরকার কি? এ হল তার মন্ত্র।

৮। কোন কোন কমরেড চান “পূর্ণ শান্তি”। নিজেদের সম্বন্ধে তারা যেমন ঢিলেঢালা, অপরের সম্বন্ধেও তেমনি। চীনে প্রবাদ আছে, “নদীর জলে আর কুয়োর জলে ঝগড়া নেই”। সমালোচনায় কাজ কি? আর নেহাতই যদি সমালোচনা করবে তো মৃদুভাবে করো-ঝগড়াঝাটি করো না- পরস্পরের প্রতি বন্ধুত্বের পর্দায় সুর বেঁধে রাখ।”

এঁরা “অনাক্রমণ-চুক্তির” পক্ষপাতী। শুধু তাই নয়-এরা বিশ্বাস করেন যে, ‘আমাদের যুগেই শান্তি আসবে।’ সব বন্ধু-বান্ধব একসাথে সৌজন্যে আর শিষ্টাচারে, গড়ে তুলবে সুখী পরিবার। “আনন্দমুখর জমায়েত- কী সুন্দর, না! সমালোচনা করে মেজাজ বিগড়ে দিয়ে আমাদের কি লাভ?

৯। তারপর আছেন ‘প্রশান্তবাদীরা’ (ট্র্যাংকুইলিষ্টস) – মুশকিল এড়িয়ে যাওয়াই এঁদের চিরন্তন প্রচেষ্টা। “আপনার কথা ঠিক; কিন্তু উনি যা বলছেন তাও তো সত্যি।” “শ্বশুর বলেন, ভুলটা শাশুড়ির, আর শাশুড়ি বলেন শ্বশুরের- কিন্তু বৌ কি করে ভরসা করে বলে কে ঠিক!” এসব লোকে আবার বড় জিনিসগুলোকে সামান্য করে দেখান, আর ছোট জিনিস হ’লে উড়িয়ে দেন। “আমরা তো আর অচেনা মানুষ নই, তবে সবাই মাথা গরম করে কি দরকার ?”

১০। কমরেডদের সামনে সমালোচনা করে পেছনে টিপ্পনী কাটা কারও কারও অভ্যাস। মিটিংয়ে তাঁরা সমালোচনা করেন না, মিটিংয়ের পরে গাল-গল্পচ্ছলে তারা টিপ্পনী কাটেন। তারা মিটিংয়ে কথা কননি কেন? জিজ্ঞসা করলে জবাব দেন, “আমার কিছু বলার নেই ভেবেছ? যথেষ্ট বলতে পারি।” যার সঙ্গে দেখা হবে তার সঙ্গেই তারা গাল-গল্প চালান; কিন্তু যাকে সমালোচনা করতে চান শুধু তাকেই কিছুই বলেন না।

কথায় আছে, “ভালো লোক কখনো মুখের ওপর বলে দিতে ভয় পায় না।” কিন্তু এই কমরেডরা তা করতে বড়ই লজ্জা পান।

১১। নিজের পছন্দ-অপছন্দ দিয়েই কেউ বা নীতি স্থির করেন। যদি বন্ধু হয় তবে পরস্পরকে বাচাঁবেন, আড়াল করবেন। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, তাঁদের বন্ধুর বহু দোষ। তবু তারা ভাববেন, “আহা ওর সঙ্গে একসঙ্গে এসেছি”, “একসঙ্গে পড়েছি,” “ওর সঙ্গে জমে ভাল” সুতরাং এইসব ব্যক্তিগত কারণে তারা বন্ধুর সমালোচনা করবেন না, বরং তার দোষ ঢাকা দিতে চেষ্টা করবেন।

কিন্তু যে কমরেডকে তারা পছন্দ করেন না তার বেলায় একেবারে মারমুখো হয়ে এ বিশেষ বক্তৃতা ঝাড়বেন, বলবেন যে ওর সব ভুল। এর নাম “বন্ধু আমার এত ভাল যে তার সাতখুন মাফ আর শত্রু এত খারাপ যে তাকে টিকতে দেওয়াই চলতে পারে না।”

১২। কেউ কেউ আবার মিটিং এর আগেই চুক্তি করে ফেলেন-অনাক্রমণ চুক্তি ও গোপন শর্ত। “আমি প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে আপনি যদি আমার বিরুদ্ধে কোন কথা না তোলেন তবে আমিও আপনার বিরুদ্ধে সমালোচনা না করিতে বাধ্য থাকিব।” ফলে সবাই বেশ চুপচাপ থাকে।

১৩। কেউ কেউ আবার সাধারণ ‘শত্রুর’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার জন্যে চুক্তি ও পরিকল্পনা তৈরি করেন, নিজেদের প্রত্যেকটি ‘অভিনেতা’র  ‘ভূমিকা’ নির্দিষ্ট করে দেন। তারপর একেবারে মুহুমুর্হু গোলাবর্ষণ। আসামীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত সমালোচনার অগ্নিবৃষ্টি।

১৪। কোন কোন কমরেড একগুয়ে, কিছুতেই দোষ স্বীকার করবেন না। কেউ সমালোচনা করলে তাঁরা সবই অস্বীকার করবেন। “শেষ পর্যন্ত অটল থেকো,” “ধীর থেকো,” “আত্মসর্মপণ কোরো না”- এই হল তাঁদের মন্ত্র। যা করতে পার কর, কিন্তু আমাকে কবুল করাতে পারবে না।”

১৫। কোন কোন কমরেড মনে মনে সমালোচনা ও দোষত্রুটি স্বীকার করেন, কিন্তু প্রকাশ্যে খোলাখুলি দোষ স্বীকার করতে রাজী হন না। তাঁরা ভাবেন, “আমি নিজে যখন নিজের দোষ বুঝছি, দোষ শোধরাতেও প্রস্তুত আছি, তখন তার বেশী আর কি দরকার? সকলের সামনে স্বীকারোক্তির প্রয়োজন কোথায়?” কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এই কমরেডদের যদি স্বীকার করার মত সাহস ও মনের জোর না থাকে তবে দোষ সংশোধনের মত দৃঢ়তা তাঁরা পাবেন কোথায় ?

এই সব ত্রুটি বিশ্লেষণ করলে তিনটি ভ্রান্ত মতাদর্শ ধরা পড়ে,যথা-আত্মবাদিতা (সাবজেক্টিভিজম), উদারনৈতিকতা (লিবারলিজম) এবং চক্রান্তকারিতা (ক্লিকিজম) সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সম্বন্ধে এই যে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি, এর কোনটাই সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গি নয়। এর কোনটিতেই নীতির বালাই নেই।

আত্মবাদিতা হচ্ছে অবস্তুবাদী মতাদর্শ। উদারনতৈক পুঁজিবাদী মতাদর্শেরই জের। আর সামন্তবাদী মতাদর্শের রেশ হচ্ছে চক্রান্তকারিতা। এগুলি সবই সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধী।

এ ধরনের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা মোটেই সাচ্চা নয়, সোজা নয়-এ হচ্ছে তার হীন ধরনের রকমফের। এতে অহংকেই প্রথম স্থান দেওয়া হয়, সমষ্টির কথা আসে তারপর।

এর অর্থ হচ্ছে যে, সর্বহারা শ্রেণীর সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার মধ্যে প্রাচীন সামাজিক তত্ত্বের ভ্রান্ত মতাদর্শ অনুপ্রবেশ করেছে।

এর অর্থ হচ্ছে যে, বিভিন্ন বিপ্লবী কমরেডদের পরস্পর সম্পর্কগুলিকে ব্যক্তিগত সামাজিক সম্পর্কের স্তরে নামিয়ে আনা। এর মানে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটাকে এমন ঘুরিয়ে দেওয়া যাতে সেটা যেন সামাজিক মেলামেশারই পন্থা হয়ে দাঁড়ায়।

শ্রেণি শত্রুর বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম তার সঙ্গে আভ্যন্তরীণ মতাদর্শের সংগ্রাম গুলিয়ে যায় যদি সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ভ্রান্ত পথে চলে। তার ফল হয় যে, চাষী যে দৃষ্টিতে জমিদারকে দেখে কিংবা জমিদার যে দৃষ্টিতে চাষীকে দেখে, আমরা নিজেদের কমরেডকেও সেই দৃষ্টিতে দেখতে আরম্ভ করি।

আর এক ভ্রান্ত ধরনের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা বিপ্লবী সমালোচনার মধ্যে গুণ্ডা-বদমায়েশদের পদ্ধতি সংক্রামিত করে, যেমন, প্রতারণা, হুমকি, মারমার কাটকাট (কাট এন্ড থ্রাষ্ট) সন্ত্রাস।

বিপ্লবী উদ্দেশ্যের চেয়ে নিজেদের স্বার্থের প্রতি কমরেডদের বেশী দৃষ্টি থাকে বলেই এই সব ত্রুটির উদ্ভব হয়।

বিপ্লবী সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার এই সব কদর্য অভ্যাসের পরিচয় দেওয়া মস্ত ভুল। এই সব নীচ মতাদর্শ বিশেষ করে চক্রান্তকারিতার মতাদর্শ বিপ্লবী বাহিনীতে সংক্রামিত করা কিছুতেই চলতে পারে না।

প্রকৃত সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা গড়ে তোলা

১। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনায় ষোল আনা সাধুতা দরকার। মান-অপমানের কথা ভুলে যান। সেই যে প্রাচীন বচন “ছাল থাকে সব গাছে, সব মানুষের মান আছে”- এ হচ্ছে সেই প্রাচীন সামাজিক সম্পর্কেরই দার্শনিকতা। কিন্তু সর্বহারা শ্রেণী হল সৎ, অকপট, তার ব্যবহার খোলাখুলি। তথ্যের মধ্যে থেকেই সর্বহারা শ্রেণী সত্যের অনুসন্ধান করে।

কমরেড মাও সেতুং শিখিয়েছেন যে “কুন্ঠা না করে, সকলের সামনে দাঁড়িয়েই আমাদের টিকি (টেলস) কেটে ফেলতে হবে।” অহংকার বড়াই এসব একেবারে বাদ দিতে হবে।

দোষ স্বীকার করা মানে এ নয় যে আপনি নিজেকে একবারে অপদার্থ বলে মেনে নিচ্ছেন। দোষ স্বীকার করে গ্রুপের কাছে তা প্রকাশ করলে লাভই হয়, কোন ক্ষতি হয় না। এতে মান খোয়াতে তো হয়ই না, বরং ইজ্জত বাড়ে, প্রভাব বাড়ে। খোলাখুলি দোষ স্বীকার করলে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়, তাই জনগণও খোলাখুলি কথাবার্তা খুব পছন্দ করে। যে কমরেড দোষ মানেন না, সাফাই দেবার চেষ্টা করেন, তর্কের চোটে দোষটাই উড়িয়ে দিতে চান- সে কমরেডের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হচ্ছে যে তিনি জনগণের কাছ থেকে আলাদা হয়ে পড়বেন। জনগণ তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হবে, তাঁর সম্পর্কে কোন ভরসা রাখতে পারেন না, তিনিও তাদের ওপর সমস্ত প্রভাব হারিয়ে ফেলবেন।

২। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সম্বন্ধে চটুল বা দায়িত্বহীন ভাব দেখালে চলবে না, গুরুত্ব আরোপ করে একে গ্রহণ করতে হবে। কমরেডরা যেন ‘মধ্যপন্থা’ বা দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ না করেন। প্রত্যেকে কমরেড তথা সমগ্র গ্রুপটির স্বার্থ আমাদের মনে রাখতে হবে, কারণ যে কমরেডের ত্রুটি আছে, যিনি দোষ করেন তিনি বিপ্লবী লক্ষ্যের পক্ষে ক্ষতিকর- তাঁর সম্বন্ধে তাই সকলকেই মাথা ঘামাতে হবে। “পরের দোষ নিয়ে আমার মাথা ব্যাথার কি দরকার”- এ মনোভাব ভুল। একজনের দোষে বিপ্লবী লক্ষ্যের ক্ষতি হয়, গ্রুপেরও ক্ষতি  হয়।

কমরেডদের আত্ম-সমালোচনা গড়ে তুলতে হবে এবং  গ্রুপের সমালোচনায় কান দিতে হবে। নিজের দোষ আর পরের দোষ-এর মধ্যে তফাৎ করা কমরেডদেও উচিৎ নয়। অন্য কমরেডদের দোষ দেখে চোখ বুজে থাকলে সেই কমরেডদেরই সর্বনাশ করা হয়। আবার নিজের দোষ হাল্কা করে দেখার মানে মতাদর্শের দিক থেকে আত্মহত্যা করা।

দোষ সহ্য করা বা দোষের সাফাই দেওয়া মানে দোষ আরও বাড়ানো, গায়ে পড়ে দোষগুলিকে বাড়িয়ে তোলা।

৩। পথনির্দেশের নীতিটি কমরেডদের অটলভাবে ধরে রাখতে হবে, কোন্টা ভুল আর কোন্টা ঠিক তা বুঝে নিতে হবে, সমালোচনা করতে হবে পথনির্দেশের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশী মতো করলে চলবে না। পথনির্দেশক নীতিটা কি? শ্রমিক শ্রেণীর ব্যাপক স্বার্থ আমাদের পথনির্দেশক নীতি, পার্টির নীতি, পর্টির বিভিন্ন লক্ষ্য ও পার্টির লাইন, জনসাধারণের কল্যাণ- এই আমাদের শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশক নীতি।

এই নীতি দৃঢ়ভাবে তুলে ধরলে আমরা সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা থেকে লাভবান হতে পারি। শুধু এই পথেই আমাদের নানান সমস্যার সঠিক সমাধান পাওয়া যেতে পারে।

তুচ্ছ, দৈনন্দিন যে সব জিনিসের সঙ্গে নীতির সম্বন্ধ নেই, যেমন “অমুক দিনে চারবার দাঁত মাজে” ‘মেয়ে কমরেডদের চুল বাঁধার কায়দা’ “অমুক বড্ড জোরে হাসে,” এসব জিনিস গ্রুপের সমালোচনার যোগ্য নয়, এ সব জিনিসকে নীতির পর্যায়ে তোলার দরকার নেই।

৪। কোন কমরেড সমালোচনা করার সময় প্রথমে তাঁর সদ্-গুণের কথা বলে তারপর তার ভুলত্রুটির কথা বলা উচিৎ। এভাবে বললে তবেই আমরা তাঁকে সমালোচনা করার মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারব, তবেই তিনি খুশী মনে আমদের সমালোচনা গ্রহণ করবেন, সমালোচনার উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হবে। কোন কমরেডের বেলায় যদি শুধু তাঁর দোষ নিয়েই পড়া যায়, তাঁর গুণগুলি নাকচ বা অস্বীকার করে দেওয়া হয়, দেখানো হয় যে কমরেডটি একদম বাজে তাহলে প্রথমতঃ সে কমরেডের পক্ষে কোন সমালোচনা মেনে নেওয়া মুশকিল হয়; দ্বিতীয়তঃ তাঁর মনে হয় যে তাঁর কোণ গুণ নেই, একেবারেই তিনি অপদার্থ- সুতরাং তিনি হতাশ বা নৈরাশ্যবাদী হয়ে পড়েন। অবশ্যি কোন কমরেডের সমালোচনা করার আগে প্রত্যেকবারই যে তার গুণের তালিকা দাখিল করতে হবে তা নয়। কথাটা হচ্ছে এই যে, কারও সমালোচনার সময় মনে রাখা দরকার যে তাঁর কতগুলি সদ্গুণও আছে।

যে সব কমরেডের অপেক্ষাকৃত বেশী দোষত্রুটি আছে শুধু তাঁদের ক্ষেত্রেই সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা যেন সীমাবদ্ধ না থাকে, এটা বুঝা দরকার। কোন কোন ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ভাল কমরেডের সমালোচনা প্রায় হয়ই না। এর একমাত্র ফল হচ্ছে সে কমরেডটি অহংকারী ও আত্মসন্তুষ্ট হয়ে দাঁড়াবেন। তিনি যাতে উন্নতির পথে এগিয়ে চলেন সেজন্য তাঁকে জাগিয়ে তুলতে হবে, মাঝে মাঝে সাবধান করতে হবে, এতে আমাদের অবহেলা করা চলবে না। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা এমনই জিনিস যে প্রত্যেককেই এতে অংশ নিতে হবে, এর কোন ব্যতিক্রম নেই।

৫। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা করার সময় কমরেডদের আবেগ বাদ দিয়ে বস্তুগত ভিত্তির (অবজেকটিভ) ওপর দাঁড়াতে হবে। তাঁদের সহৃদয়, যুক্তিপূর্ণ ও বিশ্লেষণপরায়ণ হতে হবে। এরাপাথারি গালা-গালির প্রয়োজন নাই। ‘টুপির মাপ ঠিক হলে তবেই মাথায় লাগবে- এই কথাটা খুব জুরুরী। কোন কোন কমরেডের আবেগের প্রাবল্য বড় বেশী, কল্পনার লাগাম ছেড়ে দিয়ে তাঁরা একবারে “কথার ঝড় বইয়ে দেন”। নানান ধরনের ‘বাদ’-এর অপরাধে তারা আসামীকে অপরাধী সাব্যস্ত করেন। তথ্য সম্বন্ধে যদি যথেষ্ট জ্ঞান না থাকে, যদি শুধু আবেগই থাকে তো তার ফলে আসে আত্মগত বিচার আর সংকীর্ণচিত্ততা। পাতি-বুর্জোয়া পরিবেশ থেকে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের দৃষ্টি প্রায়ই সংকীর্ণ হয়ে থাকে। কোন লোক বা কোন বিষয়ের সমালোচনা করতে গেলে ভুলটার জড় কোথায়, সেটা কিভাবে বেড়ে উঠল তা পরীক্ষা করা খুবই দরকার। কোন্টা দরকারী আর কোন্টা নয়, কোন্টা ইচ্ছাকৃত কোন্টা অনিচ্ছাকৃত, তা বুঝে নিতেই হবে। যদি তথ্য থেকে সত্য খুঁজে বার করি, বস্তুগতভাবে প্রতিটি প্রশ্ন বিচার ও বিশ্লেষণ করি, তবেই আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি যে আমাদের সমালোচনা বিনাশর্তে প্রফুল্ল মনে গৃহীত হবে।

সঙ্গে সঙ্গে কমরেডটিকে উন্নতির পথও দেখিয়ে দেওয়া উচিত। যতখানি সম্ভব তাঁর ভুল শোধরানোর পথ বাতলাতে হবে। কারণ সমালোচনা তো শুধু ধ্বংসই করে না, গঠনও করে। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে পাতি-বুর্জোয়া, বুর্জোয়া আর সামন্তবাদী মতাদর্শের জায়গায় সর্বহারা মতাদর্শ কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।

৬। রোগীর প্রতি ডাক্তারের মনোভাব যে রকম, কমরেডদের প্রতি আমাদের মনোভাবও সেই রকম হওয়া উচিত। সমালোচনা করতে হবে সহৃদয়ভাবে, এমনভাবে যাতে কমরেডটি তাঁর ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য পান। কোন অবাঞ্ছিত ব্যাপারের বা কোন কমরেডের সমালোচনার উদ্দেশ্য হল কমরেডটির দোষ সংশোধন করা, কাজের উন্নতি করা। কমরেডটি তো আমাদের শত্রু নন, শত্রু হল তাঁর ভ্রান্ত  মতাদর্শ। তারা মতাদর্শের এই ভ্রান্ত অংশটুকুই আমরা নষ্ট করতে চাই, তার গোটা মতাদর্শ তো আর নষ্ট করতে চাইনে! এই ভাবেই শুধু আমরা কমরেডটিকে তাঁর ত্রুটি সংশোধন করতে, সদ্গুণগুলি বাড়িয়ে তুলতে উৎসাহিত করতে পারি।

৭। আত্ম-সমালোচনার জন্যে কমরেডদের নির্ভীক মনোভাব দরকার। মতাদর্শের রণক্ষেত্রে চূড়ান্ত জয়ের জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হবে।

অপরকে সমালোচনা করতে গেলে যেমন সাহস চাই, নিজেকে করতে গেলেও তেমনি সাহস চাই। যখন সত্যই যুদ্ধ চলে, তখন অনেক কমরেড নির্ভয়ে শত্রুর সাথে সংঘর্ষে নামেন। প্রাণ দিতে, রক্ত ঢালতে তাঁদের দ্বিধা নেই। কিন্তু আত্ম-সমালোচনার অস্ত্র দিয়ে মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ে নামার যখন সময় আসে তখন তাঁরা ঘাবড়ে যান। অত্যন্ত প্রতিক‚ল অবস্থায়ও এঁরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন, কিন্তু আত্ম-সমালোচনার সামান্য অসুবিধা তাদের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে।

কোন কোন কমরেড সবসময়ই আগে দাঁড়াতে চান, অন্যদের তাঁরা অনবরত ডাক দেন প্রতিযোগিতার জন্য। কিন্তু আত্ম-সমালোচনার বেলায় পেছনে থাকাই তারা পছন্দ করেন। সব ময়লা ঝেড়ে-মুছে সাফ করার বদলে এরা নিজের জঞ্জাল ঘরের মধ্যে রেখে দিতে চান, লোকচক্ষু থেকে আড়াল করতে চান। জঞ্জাল চোরা গুদামে রাখলেই লাভ হবে এদের ধারনা। ঘরদোর, পোশাক-আশাক সব এঁরা ঝক্ঝকে তকতকে রাখতে চান, কিন্তু মতাদর্শের জঞ্জাল ঝেঁটিয়ে সাফ করার ব্যাপারে এদের মাথা ব্যথা নেই।

কমরেডদের চেষ্টা করা দরকার যাতে মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্রেও তাঁরা সবার আগে থাকতে পারেন।

৮। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার ব্যাপারে- চরম লাইন নয় যা যথাযথ তা সেই লাইনেই নেওয়া উচিত। পাতি-বুর্জোয়া মতাদর্শের বিরুদ্ধে পাতি-বুর্জোয়া কৌশল প্রয়োগ করা ঠিক নয়। আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মনোভাবে যতক্ষণ ভুল থাকবে ততক্ষণ আমরা ভ্রান্ত মতাদর্শ নিঃশেষ করতে পারব না।

ব্যক্তিগত অন্ধ সংস্কারের ভিত্তিতে কমরেডদের সমালোচনা করা ঠিক নয়। এইভাবে যদি আমরা দোষ দিয়েই দোষের বিরুদ্ধে লড়তে যাই তবে তার ফলে শুধু গোলমালই বাড়বে, দোষের বোঝা বাড়তে থাকবে, কোন্টা ভুল আর কোন্টা ঠিক তার হদিস পাওয়া যাবে না। তাই দোষের সঙ্গে আপোষ করার মতবাদের যেমন আমরা বিরোধিতা করি, তেমনি চরম পন্থারও (এক্সষ্ট্রিমিজম) আমরা বিরোধী।

কমরেডরা কেউ কেউ ভাবেন “সংগ্রামের জ্ঞান”(সেন্স অব ষ্ট্রাগ্ল) দেখাবার জন্যে তাঁদের বুঝি হিংস্র মূর্তি ধরে লোককে ভয় দেখাতে হবে। কিন্তু আস্তিন গুটিয়ে দাঁত কিড়মিড় করা, চেঁচিয়ে শাপান্ত করা এ সব একদম ভুল। যাঁরা অনভিজ্ঞ তাঁরা এতে ভয় পেতে পারেন, কিন্তু তাঁরাও এমন হতভম্ব হয়ে যাবেন যে, আপনারা সমালোচনা ধরতেই পারবেন না। আর অভিজ্ঞ কমরেডরা এসব গ্রাহ্যই করবেন না, তাঁরা জানেন আপনি যতই “চেঁচান না কেন লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন না”।

নিশ্চয়ই সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার ভিত্তি হতে হবে বিচার-বুদ্ধি; এর মধ্যে অবশ্যই বস্তু থাকা চাই, নিদের্শক নীতি থাকা চাই। সমালোচনা করার সময় গুরুত্ব দিয়ে কথা বলতে হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু সাবধান! মতাদর্শের লড়াইয়ে ঘুঁষাঘুঁষি করে কাজ হয় না।

 

লেখাটির পিডিএফ সংগ্রহ করতে নীচে ক্লিক করুন –

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

Advertisements

One Comment on “আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা – ঊ চিয়াং”

  1. gopidebnath63 says:

    Sent from my Samsung Galaxy smartphone.

    Like


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.