মার্কিন কৃষি ও কৃষকদের দুরাবস্থা

merlin_136161087_3ec94552-746b-4c7f-a6bb-b6adc5262b18-articlelarge

একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার প্রতিপক্ষ পুঁজিবাদী চীন এবং অন্যান্য পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশের সাথে বাণিজ্যে ব্যাপক ঘাটতি মোকাবেলায় মুক্তবাজার অর্থনীতি থেকে বের হয়ে এসে গ্রহন করে সংরক্ষণবাদ (Protectionism)। এ সময়ে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৭৫ বিলিয়ন (৩৭ হাজার ৫০০ কোটি) ডলার। যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাটতি অর্ধেকে নামিয়ে আনতে চায়। বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিপক্ষ চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করে। যা কার্যত বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ ধারণ করতে চলেছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েই মাঠে নেমেছে। এই প্রতিযোগিতায় চীনকে বেকায়দায় ফেলার মার্কিন তৎপরতার নেতিবাচক প্রভাব চীনের অর্থনীতিতে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রও যে তা থেকে মুক্ত তা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রকেও পড়তে হচ্ছে একের পর এক সমস্যা ও বেকায়দায়। মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে একে অপরের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্কারোপ করার ক্ষেত্রে পরস্পর পরস্পরকে বেকায়দায় ফেলার কৌশল গ্রহণ করে অগ্রসর হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চীন, মার্কিনের কৃষি পণ্য আমদানির উপর শুল্ক আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের মত উন্নত তথা সাম্রাজ্যবাদী দেশে কৃষিপণ্য উৎপাদন হয় মুনাফাকেন্দ্রিক প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প হিসেবে। এ সকল কৃষিশিল্পের মালিক আমাদের দেশের মত কৃষক নয় বরং সে দেশের বুর্জোয়া শ্রেণী তথা একচেটিয়া পুঁজিপতিরা। যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকারের ভর্তুকি প্রদান একটি সাধারণ ব্যপার। ভর্তুকি নির্ভর উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করে বিক্রিত পণ্যের লাভ দিয়ে ভর্তুকি পরিশোধ ও লাভ দুটাই করে থাকে মালিক। এবারে বাণিজ্য যুদ্ধে চীন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের উপর শুল্কারোপ করায় বোকায়দায় পড়ে মার্কিন কৃষকরা।

সদ্যসমাপ্ত মৌসুমে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের পাহাড়সম মজুদ কোথায় রাখবেন তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন মার্কিন কৃষকরা। অতিরিক্ত মজুদের কারণে দেশটির শস্য গুদামগুলোর ভাড়াও বেড়েছে। ফলে কৃষকদের তার নিজস্ব আবাদী জমিতে এ সকল শস্য নষ্ট হতে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। বাণিজ্যযুদ্ধ না হলে নিকটবর্তী সাইলো বা গুদামের কাছে ন্যায্যমূল্যে শস্য বিক্রি করতে পারতো। এই সাইলোগুলো আন্তর্জাতিক খাদ্যশস্য সংগ্রহকারী কোম্পানিগুলো পরিচালনা করে থাকে। চলতি মৌসুমে অধিক পরিমাণে খাদ্যশস্য কিনছে না এই সাইলোগুলো। তাদের বর্তমান খাদ্য মজুদ নিয়েও তারা পড়েছে বিপাকে। এই অবস্থায় বাড়তি শস্য মজুদে চাষীদের জন্য গুদাম ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে সাইলো ও গুদামের মালিকরা। মার্কিন কৃষকদের অভিমত, যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত বাণিজ্য যুদ্ধের করাণেই চীনে শস্য রফতানি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। মার্কিন কৃষকদের এই সংকট মোকাবেলায় ট্রাম্প প্রশাসন ১৫ বিলিয়ন (১ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারের উদ্ধার কর্মসূচী নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে এ পর্যায়ে ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলার দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহন করে। এতে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা লাঘব হলেও ক্ষতি থেকেই যাচ্ছে। বাণিজ্য যুদ্ধে বিশাল পরিমাণের মার্কিন কৃষিপণ্য রফতানির স্থবিরতা পরবর্তী মৌসুমের কৃষি উৎপাদনে কৃষককে নিরুৎসাহিত করবে। যা কৃষিশিল্পের সাথে সাথে ভোগ্যপণ্য উৎপাদন শিল্পে এবং ভারী শিল্পের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাণিজ্য যুদ্ধে চীনে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য রফতানি নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ায় চীনের বাজারে অন্যদের ঢোকার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ ভারতসহ বিভিন্ন দেশ কাজে লাগাতে সচেষ্ট। ভারত প্রতিবেশী চীনের বিশাল বাজারকে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। চীনের কৃষিপণ্যের বাজারে ভারত ঢুকতে পারলে চীন-ভারত বাণিজ্য ঘাটতি কমার পাশাপশি দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে একধাপ অগ্রগতি ঘটবে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভারতকে পক্ষে টানার এ প্রতিযোগিতাময় পরিস্থিতি অন্তত এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিকূলে যাওয়ার দিকটিকে সামনে আনছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা- ৩৮বর্ষ ॥ সংখ্যা ০৮ ॥ রবিবার ॥ ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বাংলা ॥ ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.