শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির পার্টিঃ জোসেফ স্তালিন

শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির পার্টি

– জোসেফ স্তালিন


(পার্টির নিয়মাবলির প্রথম অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে)

‘রাশিয়া এক এবং অবিভাজ্য’ যখন লোকে জোর গলায় এ কথা বলতো সেদিন চলে গেছে। আজ একটি শিশুও জানে এক এবং অবিভাজ্য রাশিয়া বলে কিছু নেই, অনেক আগেই রাশিয়া ভাগ হয়ে গেছে- বুজোয়া ও শ্রমিক এই দুটি বিরোধী শ্রেণিতে। আজ আর এ কথাটি গোপন নেই যে, এই দুটি শ্রেণির সংঘর্ষকে কেন্দ্র করেই আমাদের বর্তমান জীবন অতিবাহিত হচ্ছে।

অবশ্য কিছুদিন আমাদের এসব লক্ষ্য করা কঠিন ছিল- কারণ সেদিন পর্যন্ত শুধু আলাদা আলাদা গোষ্ঠীগুলোই সংগ্রামের ময়দানে দেখতে পেয়েছি; কেননা বিভিন্ন শহর ও দেশের বিভিন্ন অংশে শুধু আলাদা আলাদা গোষ্ঠীগুলোই সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে এবং বুর্জোয়া ও শ্রমিকরা শ্রেণি হিসাবে সহজে স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ত না। কিন্তু এখন শহর ও জেলা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, শ্রমিক শ্রেণির বিভিন্ন গোষ্ঠী হাতে হাত মিলিয়েছে, যুক্ত ধর্মঘট ও বিভোক্ষে ফেটে পড়েছে, আর আমাদের সামনে ভেসে উঠেছে বুর্জোয়া রাশিয়া ও শ্রমিক রাশিয়া এ দুইয়ের সংঘাতের অপরূপ দৃশ্যটি। দুইটি বিপুল সেনাবাহিনী- শ্রমিক শ্রেণির বাহিনী ও বুর্জোয়া শ্রেণির বাহিনী- আজ সংগ্রামের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে এবং দুই বাহিনীর সংগ্রাম আমাদের সমগ্র সমাজ জীবনকে ছেয়ে ফেলেছে।

একটা সেনাবাহিনী যেমন নায়কবিহীনভাবে চলতে পারে না, প্রতিটি সেনাবাহিনীর যেমন একটি অগ্রবাহিনী থাকে যারা আগে এগিয়ে পথকে আলোময় করে রাখে, তেমনি এটাও স্পষ্ট যে, এই দুইটি সেনাবাহিনীরও দরকার নিজ নিজ উপযুক্ত নেতৃগোষ্ঠী; সাধারণভাবে যাকে বলা হয় পার্টি।

তাহলে ছবিটা দাঁড়াচ্ছে এই রকম: একদিকে লিবারেল পার্টির নেতৃত্বে বুর্জোয়া শ্রেণির বাহিনী; অন্যদিকে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণির বাহিনী; প্রত্যেকটি বাহিনীর তাদের পরিচালিত শ্রেণি সংগ্রামে নিজ নিজ পার্টির নেতৃত্বে চলছে।

এসবের উল্লেখ আমরা করছি শ্রমিক শ্রেণির পার্টিকে শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে তুলনা করার এবং এভাবে পার্টির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে সামনে তুলে ধরার জন্যে।

উপরে এই বক্তব্য থেকে এ কথা যথেষ্ট পরিষ্কার হয়ে উঠে যে নেতাদের সংগ্রামী গোষ্ঠী হিসাবে শ্রমিক শ্রেণির পার্টি, প্রথমতঃ সভ্য সংখ্যার দিক থেকে শ্রমিক শ্রেণির তুলনায় অবশ্যই অনেক ছোট হবে। দ্বিতীয়তঃ উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে শ্রমিক শ্রেণির পার্টি শ্রমিক শ্রেণি থেকে শ্রেয় হবেই, আর তৃতীয়তঃ পার্টি হবে একটি সুসংবদ্ধ সংগঠন।

যা বলা হল, আমাদের মতে তার প্রমাণের কোন দরকার পড়ে না। কারণ যতক্ষণ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকবে আর তার অনিবার্য অনুসঙ্গ হিসাবে জনগণের দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতা বহাল থাকবে ততদিন শ্রমিক শ্রেণি সামগ্রিকভাবে শ্রেণি চেতনার বাঞ্ছিত স্তরে উন্নীত হতে পারে না। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণির বাহিনীকে সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্দীপ্ত করে তোলার জন্যে, তাকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলার সংগ্রামে নেতৃত্বদানের জন্যে তার একদল শ্রেণি সচেতন নেতা থাকবেনই। এটাও পরিষ্কার, যে পার্টি সংগ্রামী শ্রমিক শ্রেণিকে নেতৃত্বদানের পথ গ্রহণ করছে, তাকে আকস্মিকভাবে গড়ে ওঠা কতকগুলো ব্যক্তির সমষ্টিমাত্র হলে চলবে না; তাকে হতে হবে সুসংহত এবং কেন্দ্রীভূত একটা সংগঠন যাতে একটি মাত্র পরিকল্পনা অনুসারে তার কার্যকলাপ পরিচালনা করতে পারে।

সংক্ষেপে গুলোই হল আমাদের পার্টির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। 
এসব কথা মনে রেখে এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক; কাকে আমরা পার্টিসভ্য আখ্যা দেব? বর্তমান প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় পার্টির নিয়মাবলির প্রথম অনুচ্ছেদে ঠিক এই প্রশ্নটি নিয়েই আলোচনা করা হবে। 
অতএব এই প্রশ্নটি বিচার করা যাক।

রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির সভ্য বলতে পারি অর্থাৎ একজন পার্টি সভ্যের কর্তব্য কি কি?

আমাদের পার্টি হল একটা সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি। তার অর্থ হল তার একটা নিজস্ব কর্মসূচি (আন্দোলনের আশু এবং চরম লক্ষ্য) রয়েছে, নিজস্ব রণকৌশল (সংগ্রামের কায়দা) রয়েছে এবং নিজস্ব সাংগঠনিক নীতি (সংগঠনের রূপ) রয়েছে। কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই আমাদের পার্টি গড়ে উঠেছে। এই ধ্যানধারণার ঐক্যই আমাদের পার্টিসভ্যদের একটি কেন্দ্রীভূত পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। ধ্যানধারণার এই ঐক্য যদি চুরমার হয়ে যায়, পার্টিও চুরমান হয়ে যায়। সুতরাং যিনি পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল, সংগঠনগত রীতিকে পুরোপুরি মেনে নেবেন তাকেই পার্টিসভ্য বলা চলবে। আমাদের পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণাকে যিনি ভালভাবে অধ্যায়ন করেছেন এবং পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন তিনিই পার্টিসভ্যের একজন এবং এভাবে শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর নেতাদের একজন হতে পারেন।

কিন্তু শুধু পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণা গ্রহণ করাই কি একজন পার্টিসভ্যের পক্ষে যথেষ্ট? এরকম একজন লোককে কি শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর একজন যথার্থ নেতা বলে গণ্য করা চলে? নিশ্চয়ই না! প্রথমতঃ সকলেই জানেন যে, দুনিয়ার এমন অনেক বাক্যবাগীশ আছে যারা পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণা বিনা প্রতিবাদেই ‘মেনে নেবে’- অথচ যাদের গলাবাজি ছাড়া আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই। এরকম একজন বাক্যবাগীশকে পার্টির সভ্য পার্টির (অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর একজন নেতা) আখ্যা দেওয়ার অর্থ পার্টিকে নষ্ট করে দেওয়া। তাছাড়া আমাদের পার্টি একটা দার্শনিক সম্প্রদায় অথবা ধর্মীয় গোষ্ঠীও নয়। আমাদের পার্টি কি একটা সংগ্রামী পার্টি নয়? আর সে জন্যই কি এটা স্বতঃসিদ্ধ নয় যে এর কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণার নিরাসক্ত স্বীকৃতিতেই আমাদের পার্টি সন্তুষ্ট থাকতে পারে, পার্টি সভ্যরা যা স্বীকার করে নিয়েছেন তা তারা বাস্তবে প্রয়োগও করবেন, পার্টি নিঃসন্দেহে এই দাবিও আমাদের কাছে করবে। সুতরাং যিনিই আমাদের পার্টি সভ্য হতে ইচ্ছুক তিনি শুধু পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণা গ্রহণ করে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না, সেগুলো বাস্তব প্রয়োগ, কার্যক্ষেত্রে সেগুলোকে ব্যবহারও তাকে করতেই হবে।

কিন্তু একজন পার্টি সভ্যের পক্ষে পার্টির ধ্যানধারণার বাস্তব প্রয়োগ বলতে কী বোঝায়? কখন তিনি এইসব ধ্যানধারণা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারবেন? শুধু তখনই যখন তিনি লড়াই করবেন, যখন তিনি সমগ্র পার্টিকে নিয়ে শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলবেন। সংগ্রাম কি কখনও একক, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে চালানো সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়, বরং ঠিক উল্টো- জনগণ প্রথমে ঐক্যবদ্ধ হন, সংগঠিত হন তারপর তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তা যদি না করা হয়, সমস্ত সংগ্রামই হয় নিষ্ফল। তাহলে এটা পরিষ্কার যে, পার্টি সভ্যরা যদি একটা সুসংবদ্ধ সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ হন একমাত্র তখনই তারা সংগ্রাম করতে পারবেন এবং তার ফলে পার্টির ধ্যানধারণা বাস্তবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবেন। এটাও পরিষ্কার যে পার্টি সভ্যেরা যে সংগঠনে সংঘবদ্ধ হবেন তা যত সুসংবদ্ধ হবে, তারা তত ভাল লড়াই করতে পারবেন, পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণাকে তত বেশি পূর্ণতরভাবে তারা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারবেন। আমাদের পার্টি কতকগুলো ব্যক্তিমাত্রেরই সমষ্টি, আমাদের পার্টি হল নেতাদের সংগঠন- একথা অকারণে বলা হয় না। এবং যেহেতু পার্টি হল নেতাদের সংগঠন, সেহেতু এটা স্পষ্ট যে একমাত্র তাদেরই এই পার্টির ও সংগঠনের সভ্য বলে গণ্য করা চলে। যারা এই সংগঠনে কাজ করেন এবং স্বভাবতঃই পার্টির ইচ্ছার সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে মিলিয়ে দেওয়াকে এবং পার্টির সঙ্গে একাত্বভাবে কাজ করাকে তাদের কর্তব্য বলে মনে করেন।

সুতরাং একজন পার্টিসভ্য হতে হলে পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণার বাস্তব প্রয়োগ করতে হবে; আর তা প্রয়োগ করতে গেলে তার জন্য লড়াই করতে হবে; এইসব মতামতের জন্যে লড়াই করতে হলে একটা পার্টি সংগঠনের মধ্য থেকে এবং পার্টির সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করতে থাকতেই হবে। একমাত্র যখন আমরা একটানা একটা পার্টি সংগঠনে যোগ দেই এবং এইভাবে আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ পার্টিস্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে দিই- শুধু তখনই আমরা পার্টিসভ্য হতে পারি আর তার ফলে শ্রমিক শ্রেণির বাহিনীর প্রকৃত নেতা হয়ে উঠতে পারি।

যদি আমাদের পার্টি জনাকয়েক বাক্যবাগীশের একটা সমষ্টিমাত্র না হয়, এটা যদি নেতাদের এমন একটি সংগঠন হয় যা কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণির বাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে উপরে লিখিত প্রতিটি কথাই স্বতঃসিদ্ধ হবে।

নিচের কথাগুলো লক্ষ্য করতে হবে। 
এযাবৎকাল আমাদের পার্টির ধরন-ধারণ ছিল অতিথিপরায়ণ কর্তা-শাষিত একটা পরিবারের মতো- সকল দরদীর জন্যই সেখানে ঠাঁই ছিল। কিন্তু এখন পার্টি হয়েছে একটা কেন্দ্রীভূত সংগঠন। গোষ্ঠী কর্তার শাসনের দিকটা খসে গিয়ে সব দিক থেকে তা হয়ে উঠেছে একটা দুর্গের মতো, যার দরজা একমাত্র যোগ্য ব্যক্তিদের জন্যই খোলা হয়। এটা আমাদের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বৈরতন্ত্র যখন শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণি চেতনাকে ‘ট্রেড ইউনিয়নবাদ’, জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা প্রভৃতির মাধ্যমে কলূষিত করার চেষ্টা করছে, আবার অন্যদিক থেকে উদারনীতিবাগীশ বুদ্ধিজীবীর দল ক্রমাগত চেষ্টা করে চলেছে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যতাকে বিনষ্ট করতে এবং নিজেদের মাতব্বরি শ্রমিক শ্রেণির ওপর চাপিয়ে দিতে- তখন আমাদের খুব সতর্ক হতে হবে এবং আমাদের ভুলবে চলবে না যে আমাদের পার্টি হল একটি দুর্গ; এই দুর্গের দরজা খোলা হবে কেবল তাদেরই জন্য যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এসেছেন।

পার্টির সভ্যদের দুটি আবশ্যিক শর্ত আমরা নির্ধারণ করেছি (পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ এবং পার্টির একটি সংগঠনে থেকে কাজ করা)। এর সঙ্গে যদি তৃতীয় একটি শর্ত আমরা যুক্ত করি যে- একজন পার্টিসভ্যকে পাটিকে অর্থসাহায্য করতেই হবে- তাহলে পার্টিসভ্য আখ্যা লাভের প্রয়োজনীয় সমস্ত শর্তই আমরা পেয়ে যাব।

সুতরাং রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির সভ্য তিনিই হবেন যিনি এই পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ করেন, পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দেন এবং পার্টির কোন একটা সংগঠনে কাজ করেন।

এইভাবেই কমরেড লেনিন তাঁর রচিত পার্টির নিয়মাবলির খসড়ার প্রথম অনুচ্ছেদটি প্রস্তুত করেছিলেন।

আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন পার্টি একটি কেন্দ্রীভূত সংগঠন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির একটি সমষ্টিমাত্র নয়- এই ধারণা থেকেই এই সূত্রটির সম্পূর্ণ উদ্ভব ঘটেছে।

এখানেই আছে সূত্রটির সর্বময় শ্রেষ্ঠত্ব।

কিন্তু দেখা গেছে, কিছু কিছু কমরেড লেনিনের এই সূত্রকে ‘সঙ্কীর্ণ’ এবং ‘অসুবিধাজনক’ বলে বাতিল করে দেন এবং তাদের নিজস্ব একটি সূত্র এনে হাজির করেন যা নাকি ‘সঙ্কীর্ণ’ ও ‘অসুবিধাজনক’ নয়। আমরা মার্তভের সূত্রের কথাই বলছি এবং তা-ই এখন আমরা বিশ্লেষণ করব। 
মার্তভের সূত্র হল- ‘রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির সভ্য হলেন তিনি যিনি তার কর্মসূচিটি গ্রহণ করেন, পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দেন এবং তার কোন সংগঠনের নির্দেশ তাকে নিয়মিত ব্যক্তিগত সাহায্য করেন।’ আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এই সূত্রটি পার্টি সভ্যপদের তৃতীয় আবশ্যিক শর্ত- পার্টি সংগঠনগুলির কোন একটিতে পার্টি সভ্যদের কাজ করার কর্তব্যের কথাটি বাদ দিয়েছেন। মনে হয় মার্তভ সুস্পষ্ট ও আবশ্যিক শর্তটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন এবং তার সূত্রে তিনি একটিও জায়গায় অস্পষ্ট, ভাসাভাসা ‘কোন সংগঠনের নির্দেশ অনুসারে ব্যক্তিগত সাহায্য’ কথাটি এনে উপস্থিত করেছেন। এ থেকে দেখা যাচ্ছে কোনও পার্টি সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত না হয়েও (নিশ্চয়ই বলা যায় একটা চমৎকার পার্টিই বটে!) এবং পার্টির ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করার বাধ্য বাধকতা না রেখেও (নিশ্চয়ই বলা যায় চমৎকার পার্টি শৃঙ্খলা বটে!)- যে কেউ পার্টির সভ্য হতে পারবেন। বেশ তো, পার্টিইবা কি করে নিয়মিত নির্দেশ দেবে সেইসব লোকদের যারা পার্টির কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নেই এবং ফলে পার্টি শৃঙ্খলার কাছে আদৌ কোন বাধ্যবধকতাও যাদের নেই।

এই প্রশ্নে মার্তভ রচিত পার্টির নিয়মাবলির খসড়া প্রথম অনুচ্ছেদ সম্পর্কিত সূত্রটি ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু সূত্রটিতে এই প্রশ্নটির সুদক্ষ জবাব দেওয়া হয়েছে। কারণ তাতে পার্টিসভ্য পদের তৃতীয় ও আবশ্যিক শর্ত হিসাবে পার্টি সংগঠনের মধ্যে থেকে কাজ করার কথা সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে।

আমাদের যেটা করতে হবে তা হল মার্তভের সূত্র থেকে অস্পষ্ট ও অর্থহীন ‘একটি পার্টি সংগঠনের নির্দেশ অনুসারে নিয়মিত ব্যক্তিদের সাহায্যের’ কথাগুলি বাতিল করে দেওয়া। এই শর্তটি বাদ দিয়ে মার্তভের সূত্রে দু’টি মাত্র শর্তই অবশিষ্ট থাকে (কর্মসূচিকে গ্রহণ করা এবং আর্থিক সাহায্য করা) যা নিছক শর্ত হিসাবে নিতান্তই মূল্যহীন; কারণ যে কোন বাক্যবাগীশ লোকই পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ করে নিতে পারে এবং পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দিতে পারে; কিন্তু এসবের দ্বারা পার্টি সভ্যপদের সামান্যতম যোগ্যতাও তার অর্জিত হয় না।
বলতেই হয় সূত্রটা খুবই সুবিধাজনক!

আমরা বলি সাচ্চা পার্টিসভ্যর পার্টির কর্মসূচিকে শুধু মেনে নিয়েই নিশ্চিত হতে পারে না, যে কর্মসূচি তাঁরা গ্রহণ করলেন সেটা বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগের চেষ্টা নিশ্চয়ই তাঁরা করবেন। মার্তভ জবাবে বলছেন: তোমরা ভীষণ কড়া; পার্টিকে আর্থিক সাহায্য করতে রাজি হলে পার্টির গৃহীত কর্মসূচির বাস্তব প্রয়োগ করাটা জরুরি কিছু নয়- ইত্যাদি। দেখে-শুনে মনে হয় মার্তভের কিছু বাক্যবাগীশ ‘সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের’ জন্য দুঃখের অন্ত নেই। আর তাই তিনি পার্টির দ্বার তাদের জন্য বন্ধ করে দিতে চান না।

আমরা আরও বলছি- কর্মসূচিকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হলে লড়াই করতে হবে এবং সংহতি ছাড়া লড়াই করা যেহেতু অসম্ভব তাই একজন সম্ভাব্য পার্টিসভ্যকে পার্টির কোন একটা সংগঠনে যোগ দিতেই হবে, পার্টির ইচ্ছার সঙ্গে নিজের ইচ্ছাকে মিলিয়ে দিতে হবে, শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামী বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে হবে অর্থাৎ তাকে একটা কেন্দ্রীভূত পার্টির সুসংগঠিত বাহিনীর মধ্যে স্থান করে নিতে হবে। মার্তব এর উত্তরে বলছেন, সভ্যদের সুসংহত বাহিনীতে সংগঠিত হবার খুব একটা কিছু প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই সংগঠনে সংঘবদ্ধ হবার; একক লড়াই-ই যথেষ্ট।

আমাদের প্রশ্ন হল আমাদের পার্টিটা তাহলে কি? কতকগুলো ব্যক্তির একটা আকস্মিক জনতা, না নেতাদের সুসংহত সংগঠন? আর যদি এটা নেতাদেরই সংগঠন হয় তাহলে যে এর অন্তর্ভুক্ত নয়, এবং যার ফলে এর শৃঙ্খলা মেনে চলার কোন বাধ্যবাধকতাও যার নেই এমন লোককে এর সভ্য বলা চলে? মার্তভ জবাবে বলছেন, পার্টি কোন সংগঠন নয়, বরং পার্টি হল একটা অসংগঠিত সংগঠন (চমৎকার কেন্দ্রানুগত্য সন্দেহ নেই!)। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, মার্তভের মতে পার্টি কোন কেন্দ্রীভূত সংগঠন নয়, পার্টির কর্মসূচি ইত্যাদি মেনে নিয়েছেন এমন ‘সোশ্যাল ডেমোক্রাট ব্যক্তিবিশেষদের এবং আঞ্চলিক সংগঠনসমূহের তা একটা সমষ্টিমাত্র। কিন্তু আমাদের পার্টি একটা কেন্দ্রীভূত সংগঠন না হলে- তা একটা দুর্গ হতে পারবে না- যে দুর্গের দুয়ার শুধু পরীক্ষিতদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

বাস্তবিকপক্ষে মার্তভের সূত্র থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তাঁর কাছে পার্টি একটা দুর্গ নয়- বরং একটা ভোজসভা বিশেষ- যাতে প্রতিটি সমর্থকেরই প্রবেশাধিকার রয়েছে। খানিকটা জ্ঞান, খানিকটা সহানুভূতি, খানিকটা আর্থিক সাহায্য- তাহলেই হল আপনি পার্টিসভ্য বলে গণ্য হবার সম্পূর্ণ অধিকার পেয়ে গেলেন। আতঙ্কিত ‘পার্টিসভ্যদের’ উৎসাহ যোগানোর জন্য মার্তভ চেঁচিয়ে বললেন- শুনবেন না, কানে নেবেন না, সেই লোকেদের কথা যারা বলে, পার্টিসভ্যকে একটা পার্টি সংগঠনে থাকতেই হবে এবং পার্টির ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাকে বিলিয়ে দিতে হবে। তিনি বললেন, প্রথমত: এমন শর্ত একজন মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়াই কঠিন, পার্টির ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছা বিলিয়ে দেওয়া তামাশা নয়! আর দ্বিতীয়ত: আমার ব্যাখ্যায় আমি এর আগেই দেখিয়ে দিয়েছি- ঐ লোকগুলোর মতামত নিতান্তই ভ্রান্ত। কাজেই ভদ্রমহোদয়গণ- এই ভোজসভায়….. আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

দেখে মনে হচ্ছে মার্তভ পার্টির ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাকে বিলিয়ে দিতে ঘৃণা বোধ করেন এমন কিছু অধ্যাপক এবং হাই স্কুলের ছাত্রদের জন্য উদ্বেগে আকুল হয়ে উঠেছেন, আর তারই জন্য আমাদের পার্টির দুর্গপ্রকারে ফাটল সৃষ্টি করে এইসব সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকদের চোরাগোপ্তা পথে পার্টিতে ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন। সুবিধাবাদকে দরজা খুলে দিচ্ছেন তিনি- আর সেটা করছেন এমন একটা সময়ে যখন শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রেণিসচেতনতার হাজার হাজার শত্রু আক্রমণ হেনে চলেছে!

কিন্তু এইটেই আসল কথা নয়। আসল কথা হল, মার্তভের এই সন্দেহজনক সূত্রটি পার্টির অভ্যন্তরেই অন্য দিকে থেকে সুবিধাবাদের উদ্ভব ঘটাতে সাহায্য করে।

আমরা জানি মার্তভের সূত্রে শুধু কর্মসূচি গ্রহণের কথাই আছে; রণকৌশল ও সংগঠনের ব্যাপারে একটি কথাও নেই। কিন্তু পার্টির পক্ষে সাংগঠনিক ও রণকৌশলগত ধ্যানধারণার দিক থেকে ঐক্য কর্মসূচিগত মতামতের ঐক্যের চেয়ে মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের তিনি বলতে পারেন যে কমরেড লেনিনের সূত্রেও তো এ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। ঠিকই! কিন্তু কমরেড লেনিনের সূত্রে এ সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। এটা কি স্বতঃসিদ্ধ নয় যে, পার্টি সংগঠনে যে কাজ করে এবং স্বভাবতঃই পার্টির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যে লড়াই করে, পার্টি শৃঙ্খলাকে যে মাথা পেতে নেয়- সে পার্টির সাংগঠনিক নীতি এবং রণকৌশল ছাড়া অন্য কোন সাংগঠিক নীতি এবং রণকৌশল অনুসরণ করতেই পারে না? কিন্তু পার্টি কর্মসূচি মেনে নিয়েছেন, অথচ কোন পার্টি সংগঠনের যিনি অন্তর্ভুক্ত নন- এমন একজন পার্টিসভ্য সম্পর্কে আপনি কী বলবেন? কী নিশ্চয়তা আছে যে এই ধরণের একজন সভ্যের রণকৌশলগত এবং সাংগঠনিক মতামত পার্টির মতামতই হবে, অন্য কিছু হবে না? মার্তভের সূত্র ঠিক একথাটিই ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। মার্তভের সূত্রের ফলে আমরা পাব একটি ‘অদ্ভূত পার্টি’ যার ‘সভ্যরা’ একই কর্মসূচি মানে (এবং সে বিষয়ে কোন প্রশ্ন নেই!), অথচ সাংগঠনিক ও রণকৌশলগত ব্যাপারে একমত নয়। কী আশ্চর্য বৈচিত্র্য! একটি ভোজসভার সঙ্গে আমাদের পার্টির পার্থক্য রইল কোথায়?

আর একটি প্রশ্ন আমরা করতে চাই: দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেস আমাদের পার্টির হাতে ভাবাদর্শ ও কর্মগত কেন্দ্রিকতা তুলে দিয়েছিল আর মার্তভের সূত্রে যার পুরোপুরি বিরোধিতা রয়েছে- তারই বা আমরা কী করব? বেমালুম ছুড়ে ফেলে দেব? যদি বেছে নেওয়ার প্রশ্নই আসে তবে নিঃসন্দেহে মার্তভের সূত্রকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া অনেক বেশি সঠিক হবে।

কমরেড লেনিনের সূত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই উদ্ভট সূত্রটিই মার্তভ আমাদের উপহার দিয়েছেন।

আমার মত হচ্ছে দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসে মার্তভের সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- সেটি প্রচন্ড ভুল; এবং আমরা আশা করি যে তৃতীয় পার্টি কংগ্রেসে এই ভুল শুধরে নেবে এবং কমরেড লেনিনের সূত্রটি গ্রহণ করবে।

সংক্ষেপে পুনরুল্লেখ করা যাক: শ্রমিক শ্রেণির বাহিনী রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে। সব সৈন্যবাহিনীরই যেমন একটি অগ্রবাহিনী থাকা আবশ্যক, এই বাহিনীও চাই একটি অগ্রবাহিনী। সুতরাং সর্বহারার নেতাদের একটা দল- রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির আবির্ভাব ঘটেছে। একটি সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট অগ্রবাহিনী বলেই এই পার্টিকে প্রথমত: নিজস্ব কর্মসূচি, রণকৌশল আর সাংগঠনিক নীতিতে সুসজ্জিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত: একে হতে হবে একটি সুসংহত সংগঠন। রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির সভ্যপদ কাকে দেয়া যেতে পারে?- এই প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তরই পার্টি দেবে : যিনি পার্টির কর্মসূচি মেনে নেবেন, পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দেবেন আর পার্টির কোন একটি সংগঠনে কাজ করবেন- তাঁকেই। 
এই সুস্পষ্ট সূত্রটি কমরেড লেনিন তাঁর চমৎকার সূত্রটিতে ব্যক্ত করেছেন।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৮

Advertisements

সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির কর্মসূচির একটি খসড়া এবং ব্যাখ্যা: ভ.ই.লেনিন

সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির কর্মসূচির একটি খসড়া এবং ব্যাখ্যা

– ভ.ই.লেনিন

 

খসড়া কর্মসূচি:


(ক) ১। ক্রমাগত আরও দ্রুত রাশিয়ায় গড়ে উঠছে বড় বড় কলকারখানা, তাতে ছোট কারিগর আর কৃষকদের সর্বনাশ হচ্ছে, তারা নিঃস্ব শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে, ক্রমাগত বেশি সংখ্যায় মানুষ তাড়িত হচ্ছে শহরে, শিল্পযুক্ত গ্রামে এবং বসতিতে।

২। পুঁজিতন্ত্রের এই বৃদ্ধির অর্থ হলো মুষ্টিমেয় কারখানা মালিক বেনিয়া আর ভূস্বামীদের আর তাদের বিলাস ব্যসনের বিপুল বৃদ্ধি, শ্রমিকদের গরিবি এবং উৎপীড়নের ততোধিক দ্রুত বৃদ্ধি। বড় বড় কারখানায় উৎপাদনে আর যন্ত্রপাতিতে চালু করা উন্নতিগুলো সামাজিক শ্রমের উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি সহজতর করার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের ওপর পুঁজিপতিদের ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, বেকারি বাড়াচ্ছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রকটিত করে তুলছে শ্রমিকদের অরক্ষিত অবস্থাটাকে।

৩। কিন্তু শ্রমের উপর পুঁজির উৎপীড়ন সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় কারখানা সৃষ্টি করছে শ্রমিকদের একটা বিশেষ শ্রেণি, যেটা পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাতে সমর্থ হয়ে উঠছে, কেননা তাদের জীবনযাত্রার অবস্থাই তাদের নিজেদের ক্ষুদে উৎপাদনের সঙ্গে তাদের সমস্ত সম্বন্ধ নষ্ট করে দিচ্ছে, আর শ্রমিকদের একই শ্রমের মাধ্যমে এবং এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায় বদলি করার ভিতর দিয়ে তাদের সম্মিলিত করে মেহনতি মানুষের বড় বড় অংশকে একত্রে জুড়ে দিচ্ছে। শ্রমিকেরা পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করছে, আর তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে প্রবল ঐক্য কামনা। শ্রমিকদের বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহগুলির মধ্য থেকে গড়ে উঠছে রুশি শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম।

৪। পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির এই সংগ্রাম হলো- যাদের চলে অপরের শ্রমের ওপর সেই সমস্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে এবং সমস্ত শোষণের বিরুদ্ধে। এর সমাপ্তি ঘটতে পারে একমাত্র যখন রাজনীতিক ক্ষমতা বর্তাবে শ্রমিক শ্রেণির হাতে, যখন সমগ্র ভূমি সাধিত্র, কারখানা, যন্ত্রপাতি আর খনি হস্তান্তরিত হবে সমগ্র সমাজের কাছে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সংগঠিত করার জন্যে, তাতে শ্রমিকরা যাকিছু উৎপন্ন করবে সেই সবই এবং উৎপাদনে সমস্ত উন্নতি অবশ্যই উপকৃত করবে মেহনতিদের।

৫। রুশ শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের প্রকৃতি আর লক্ষ্য অনুসারে সেটা সমস্ত দেশের শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক (সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক) আন্দোলনের অঙ্গ।

৬। মুক্তির জন্য রুশ শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামে প্রধান অন্তরায় হলো চূড়ান্ত স্বৈরতান্ত্রিক সরকার আর তার দায়িত্বহীন কর্মকর্তারা। ভূস্বামী আর পুঁজিপতিদের বিশেষ অধিকারের ভিত্তিতে এবং তাদের স্বার্থের প্রতি বশবর্তিতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে এই সরকার নিম্নতম শ্রেণিগুলিকে একেবারে সর্বঅধিকার বঞ্চিত করে রেখেছে এবং এইভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে শৃঙ্খলিত করে সমগ্র জনগণের বিকাশ ব্যহত করছে। এই কারণেই নিজ মুক্তির জন্য রুশ শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম থেকে অনিবার্যভাবেই দেখা দিচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম।

(খ) ১। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টি ঘোষণা করছে শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা বিকোশিত করে তাদের সংগঠনের উন্নতি ঘটিয়ে এবং সংগ্রামের উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে রুশ শ্রমিক শ্রেণির এই সংগ্রামের আনুকূল্য করাই এর উদ্দেশ্য।

২। নিজ মুক্তির জন্য রুশ শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম একটা রাজনৈতিক সংগ্রাম, রাজনৈতিক মুক্তিলাভই তার প্রধান লক্ষ্য।

৩। এই কারণেই নিজেকে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন থেকে পৃথক করে না নিয়ে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিরুদ্ধে, বিশেষ অধিকারভোগী ভূসম্পত্তিবান অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে এবং ভূমিদাস প্রথার সমস্ত অবশেষ আর সামাজিক স্তর বিভেদ যা অবাধ প্রতিযোগিতার অন্তরায় তার বিরুদ্ধে প্রত্যেকটা সামাজিক আন্দোলন সমর্থন করবে।

৪। অন্যদিকে স্বৈরাচারী সরকার আর তার কর্মকর্তাদের অভিভাবকত্ব দিয়ে মেহনতি শ্রেণিগুলির ওপর মুরুব্বিয়ানার সমস্ত চেষ্টার বিরুদ্ধে পুঁজিতন্ত্রের বিকাশ মন্দিত করার এবং তার ফলে শ্রমিক শ্রেণির বিকাশ মন্দিত করার সমস্ত চেষ্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাবে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি।

৫। শ্রমিকদের মুক্তির ব্যাপারটা হওয়া চাই শ্রমিক শ্রেণির নিজের-ই ঘটানো প্রক্রিয়া।

৬। রুশ জনগণের যা আবশ্যক সেটা নয় স্বৈরাচারী সরকার আর তার কর্মকর্তাদের সাহায্য, সেটা হল তার উৎপীড়ন থেকে মুক্তি।

(গ) এইসব বিবেচনাকে আরম্ভস্থল হিসাবে ধরে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি প্রথমত আর সর্বোপরি দাবি করছে;
১। একটা সংবিধান রচনার জন্য সমস্ত নাগরিকের প্রতিনিধিদের নিয়ে জেমস্কি সভা ডাকার দরকার।

২। রাশিয়ায় যারা ২১ বছর বয়সে পড়েছে তাদের ধর্ম কিংবা জাতি নির্বিশেষে সবার সর্বজনীন এবং প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার।

৩। সমাবেশ আর সংগঠনের স্বাধীনতা এবং ধর্মঘট করার অধিকার।

৪। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।

৫। সামাজিক স্তর বিভাগের বিলুপ্তি এবং আইনের কাছে সমস্ত নাগরিকের পূর্ণসমতা।

৬। ধর্মের স্বাধীনতা এবং সমস্ত জাতিসত্তার সমতা। জন্ম বিবাহ আর মৃত্যু নিবন্ধকরণের কাজ পুলিশ থেকে স্বতন্ত্র পৌর কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তরকরণ।

৭। সরকারি কর্মকর্তাদের উপরওয়ালাদের কাছে অভিযোগ না করেই যে কোন কর্মকর্তাকে আদালতে অভিযুক্ত করার জন্য প্রত্যেকটি নাগরিকের অধিকার।

৮। ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র তুলে দেয়া এবং স্থানান্তরে যাওয়া আর আবাসের পূর্ণ স্বাধীনতা।

৯। বৃত্তি আর পেশার স্বাধীনতা, গিল্ডের বিলুপ্তি।

(ঘ) শ্রমিকদের জন্যে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি দাবি করছে: 
১। সমস্ত শিল্পে শিল্প আদালতের স্থাপনা, তাতে পুঁজিপতি আর শ্রমিকদের মধ্য থেকে সমান সংখ্যায় নির্বাচিত বিচারপতি।

২। আইন করে কর্মদিন ৮ ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ করা।

৩। আইন করে রাতে কাজ আর রাতের শিফট নিষিদ্ধকরণ, ১৫ বছরের কম বয়সের ছেলেমেয়েদের কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা।

৪। জাতীয় ছুটির দিনগুলো আইনত নির্দিষ্টকরণ।

৫। রাশিয়ার সর্বত্র সমস্ত শিল্পে সরকারি কারখানাগুলিতে এবং বাড়িতে কর্মরত কারিগরদের ক্ষেত্রেও কারখানা আইন আর কারখানা পরিদর্শনের প্রয়োগ।

৬। কারখানা পরিদর্শকম-লী হওয়া চাই স্বতন্ত্র- অর্থমন্ত্রকের অধীন নয়। কারখানা আইন পালন নিশ্চিত করার কাজে শিল্প আদালতগুলোর সদস্যদের অধিকার হওয়া চাই কারখানা পরিদর্শকম-লীর সমান।

৭। সর্বত্র বস্তুশোধ প্রথার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ।

৮। উপযুক্ত হার বাঁধা, মাল বাতিল করা, জরিমানার সঞ্চিত টাকার খরচ এবং কারখানার মালিকানাধীন শ্রমিক বাসাবাড়ির ওপর শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধান। যে কোন কারণে (জরিমানা, বাতিল মাল ইত্যাদি) শ্রমিকদের মজুরি থেকে যাকিছু কেটে নেয়া হোক সেটা রুবলে মোট ১০ কোপেকের বেশি হতে পারবে না, এই মর্মে আইন।

৯। শ্রমিকদের জখমের জন্য মালিকদের দায়ী করার আইন প্রণয়ন। শ্রমিকদের ওপর দোষারোপ করতে হলে সেটা মালিকের প্রমাণ করা চাই।

১০। বিদ্যালয় চালানো এবং এবং শ্রমিকদের চিকিৎসার দায়িত্ব মালিকদের ওপর দেবার আইন।

কর্মসূচির ব্যাখ্যা

কর্মসূচিটি তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে সমস্ত নীতি উপস্থাপিত হয়েছে, যার থেকে এসেছে কর্মসূচির বাদবাকি ভাগগুলি। প্রথম ভাগে দেখান হয়েছে সমসাময়িক সমাজে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থান, মালিকদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামের মর্ম আর তাৎপর্য এবং রাশিয়া রাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতিক অবস্থান।

দ্বিতীয়ভাগে পার্টির লক্ষ্য বিবৃত হয়েছে, আর দেখান হয়েছে রাশিয়ায় অন্যান্য রাজনীতিক মতধারার সঙ্গে পার্টির সম্পর্ক। পার্টি এবং সমস্ত শ্রেণিসচেতন শ্রমিকের ক্রিয়াকলাপ কী হওয়া উচিত, আর রুশি সমাজে অন্যান্য শ্রেণির স্বার্থ আর প্রচেষ্টার প্রতি কী হবে তাদের মনোভাব, সেটা নিয়ে এই দ্বিতীয় ভাগ।

কার্যক্ষেত্রে পার্টির দাবি দাওয়া রয়েছে তৃতীয়ভাগে। এইভাগ তিনটে অংশে বিভক্ত। প্রথমাংশে আছে দেশজোড়া সংস্কারের দাবিদাওয়া। শ্রমিক শ্রেণির দাবিদাওয়া আর কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে দ্বিতীয়াংশে, তৃতীয়াংশে আছে কৃষকদের স্বার্থানুযায়ী দাবি দাওয়া। কর্মসূচির ব্যবহারিক ভাগে যাবার আগে, অংশগুলোর কিছু কিছু প্রাথমিক ব্যাখ্যা নিম্নে দেয়া হলো।

(ক) ১। কর্মসূচিতে সর্বপ্রথমে আলোচনা করা হয়েছে বড় বড় কল-কারখানার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে, কেননা সমসাময়িক রাশিয়ায় যা জীবনযাত্রার পূরণ অবস্থাটাকে, বিশেষত মেহনতি শ্রেণিগুলির জীবনযাত্রার অবস্থাকে একেবারে বদলে দিচ্ছে তার মধ্যে এটাই প্রধান জিনিস। পুরনো অবস্থায় দেশের একরকম সমস্ত সম্পদই উৎপন্ন করত ক্ষুদে মালিকেরা, তারা ছিল জনসমষ্টির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। গ্রামে-গ্রামে মানুষের জীবন ছিল নিশ্চল, তাদের উৎপাদনের বেশির ভাগ হত হয় তাদের নিজেদের ব্যহারের জন্য, নইলে লাগোয়া গ্রামগুলির ছোট ছোট বাজারের জন্যে, কাছাকাছি অন্যান্য বাজারের সঙ্গে যেগুলোর বিশেষ কোন যোগাযোগ ছিল না। এই একই ক্ষুদে মালিকেরা খাটত ভূস্বামীদের জন্যে, ভূস্বামীরা প্রধানত নিজেদের পরিভোগের জন্যে তাদের উৎপন্ন করতে বাধ্য করতো। গৃহজাতদ্রব্য প্রোসেসিংয়ের জন্যে ভার দেওয়া হতো কারিগরদের হাতে, তারাও বাস করতো গ্রামে কিংবা কাজ পাওয়ার জন্যে যেত লাগোয়া এলাকাগুলোতে। কিন্তু কৃষকরা খালাস পাবার পরে মানুষের বিপুল অংশের এই জীবনযাত্রার অবস্থায় সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেল; কারিগরদের ক্ষুদে কারবারগুলোর জায়গায় আসতে থাকল বড় বড় কারখানা, সেগুলো বাড়তে থাকল অসাধারণ দ্রুত; সেগুলো ক্ষুদে মালিকদের উচ্ছেদ করে তাদের মজুরি শ্রমিকে পরিণত করলো, আর হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ শ্রমিককে একত্রে কাজ করতে বাধ্য করলো, তাতে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ মাল বিক্রি হল রাশিয়ার সর্বত্র।

কৃষক খালাস পাবার ফলে জনসমষ্টির নিশ্চলতা ভেঙে গেল, আর কৃষক যে অবস্থায় পড়ল তাতে তাদের দখলে রইলো যে ছোট্ট ছোট্ট জমির টুকরো তার থেকে তাদের আর জীবিকানির্বাহ হয় না। জনরাশিগুলি ঘর ছেড়ে বেরলো জীবিকার সন্ধানে, তারা চললো কারখানাগুলোর দিকে কিংবা রেলপথ নির্মাণে কাজের জন্যে, যেসব রেলপথ রাশিয়ার কোণগুলোকে সংযুক্ত করে এবং বড় কারখানাগুলোর উৎপন্ন দ্রব্য বয়ে নিয়ে যায় সর্বত্র। জনরাশিগুলি কাজে গেল শহরে-শহরে ,অংশগ্রহণ করল কারখানা আর ব্যবসা- বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের ঘরবাড়ি নির্মাণে, কারখানায়-কারখানায় জ্বালানি সরবরাহের কাজে এবং তাদের জন্যে কাঁচামাল প্রস্তুত করায়। তাছাড়া অনেক কাজ চালালো বাড়িতে, যেসব বেনিয়া আর কারখানা মালিক প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট দ্রুত সম্প্রসারিত করতে পারে নি তাদের জন্যে ঠিকা কাজ করতো তারা। অনুরূপ বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটলো কৃষিক্ষেত্রে; বিক্রির জন্যে শস্য উৎপাদন করতে থাকলো ভূস্বামীরা, ঘটনাস্থলে এসে পড়লো কৃষক আর বেনিয়াদের মধ্য বড় বড় খামারিরা, দশক-দশক কোটি পুদ শস্য বিক্রি হতে থাকলো বিদেশে। উৎপাদনের জন্য মজুরি শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দিল- লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি কৃষক নিজেদের ছোট্ট জমি-বন্দগুলো ছেড়ে বিক্রির জন্যে শস্য উৎপাদনে ব্যাপৃত নতুন মনিবদের জন্যে নিয়মিত মজুর কিংবা দিন-মজুর হয়ে খাটতে থাকলো। পুরণো জীবনযাত্রা প্রণালীতে এইসব পরিবর্তনই বর্ণিত হয়েছে কর্মসূচিতে, তাতে বলা হয়েছে, বড় বড় কল-কারখানা ছোট কারিগর আর কৃষকদের সর্বনাশ করে তাদের মজুরি শ্রমিকে পরিণত করছে। সর্বত্র ক্ষুদ্রায়তনের উৎপাদনের জায়গায় আসছে বৃহদায়তনের উৎপাদন, আর এই উৎপাদনে শ্রমিকদের বিপুল অংশ নিছক ঠিকা মজুর, যাদের মজুরি দিয়ে খাটায় পুঁজিপতিরা, যাদের আছে বিপুল পরিমাণ পুঁজি, যারা তৈরি করে প্রকান্ড-প্রকান্ড কর্মশালা, পাইকারী হারে কিনে ফেলে বিপুল পরিমাণ মালমশলা, আর একত্রে জড়ো করা মজুরদের ব্যাপক পরিসরে উৎপাদন থেকে তোলা মুনাফা দিয়ে পকেট ভর্তি করে। উৎপাদন হয়ে উঠেছে পুঁজিতান্ত্রিক, সেটা সমস্ত ক্ষুদে মালিকদের ওপর নির্মম নিষ্করুণ চাপ দিয়ে গ্রামে গ্রামে তাদের নিশ্চল জীবন ভেঙে দিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টহল দিতে বাধ্য করে মামুলী অদক্ষ মজুর হিসেবে, যারা শ্রমশক্তি বিক্রি করে পুঁজির কাছে, জনসমষ্টির ক্রমাগত বৃহত্তর অংশ গ্রামাঞ্চল আর কৃষি থেকে চিরকালের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে জড়ো হচ্ছে শহরে, কারখানায় আর শিল্পযুক্ত গ্রামে আর বসতিতে, সেখানে তারা একটা বিশেষ নিঃস্ব শ্রেণির মানুষ, মজুরি করা প্রলেতারিয়ান মজুরদের শ্রেণি, যাদের জীবিকানির্বাহ হয় কেবল শ্রমশক্তি বিক্রি করেই।

বড় বড় কল-কারখানা দেশের জীবনে যেসব প্রচ- পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে সেগুলো এই- ক্ষুদ্রায়তনের উৎপাদনের জায়গায় আসছে বৃহদায়তনের উৎপাদন, ক্ষুদে মালিকেরা মজুরি শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। তাহলে সমগ্র মেহনতি জনসমষ্টির পক্ষে এই পরিবর্তনের অর্থটা কী, আর এটা চলছে-ই বা কোথায়? কর্মসূচিতে পরে সে সম্বন্ধে বলা হয়েছে।

(ক) ২। ক্ষুদ্রের স্থলে বৃহদায়তন উৎপাদন আসার সঙ্গে সঙ্গে আসছে পৃথক-পৃথক, ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র আর্থিক সংগতির জায়গায় পুঁজি হিসেবে খাটান বিপুল পরিমাণ অর্থ, আর ক্ষুদ্র, নগণ্য লাভের জায়গায় আসছে লক্ষ লক্ষ মুদ্রার লাভ। এই কারণে পুঁজিতন্ত্রের বৃদ্ধির ফলে সর্বত্র ঘটছে বিলাস-ব্যসন আর সম্পদের বৃদ্ধি। রাশিয়ায় দেখা দিয়েছে ধনকুবের, কারখানা মালিক, রেলপথ মালিক, বেনিয়া আর ব্যাঙ্কারদের একটা গোটা শ্রেণি, শিল্পপতিদেরকে সুদে ধার- দেওয়া অর্থ-পুঁজি থেকে পাওয়া আয়ে যাদের চলে এমন একটা গোটা শ্রেণি দেখা দিয়েছে; ভূমি পুনরুদ্ধার বাবত কৃষকদের কাছ থেকে বেশ মোটা টাকা পেয়ে, কৃষকদের ভূমির প্রয়োজনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেশ মোটা টাকা পেয়ে, কৃষকদের ভূমির প্রয়োজনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের কাছে ইজারা দেওয়া ভূমির দাম বাড়িয়ে এবং ভূমিসম্পত্তিতে বীট চিনি শোধনাগার আর ভাটিখানা স্থাপন করে বড় ভূস্বামীরা আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। এই সমস্ত বিলাস ব্যসন আর অমিতব্যয়িতা যে মাত্রায় বেড়ে উঠেছে তার কোন জুড়ি নেই; বড় বড় শহরের সদর রাস্তাগুলোয় সারি সারি রয়েছে তাদের রাজকীয় অট্টালিকা আর জাঁকাল প্রাসাদগুলো। কিন্তু পুঁজিতন্ত্রের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের অবস্থা সমানে আরও খারাপ হয়ে পড়েছে। কৃষক খালাস পাবার পরে কোন কোন জায়গায় রোজগার বাড়লেও সেটা খুবই সামান্য এবং বেশি কালের জন্য নয়, কেননা গ্রাম থেকে দলে দলে ভুখা মানুষ ভিড় করে এসে মজুরি হার নামিয়ে দিয়েছে, আর খাদ্যসামগ্রী এবং অন্যান্য জীবনীয়ের দাম বেড়েই চলার ফলে বর্ধিত মজুরি দিয়েও শ্রমিকেরা জীবনধারনের উপকরণ পেয়েছে অপেক্ষাকৃত কম; কাজ পাওয়া ক্রমাগত বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর ধনীদের জাঁকাল অট্টালিকাগুলোর পাশাপাশি (কিংবা শহরের উপকণ্ঠে) গড়ে উঠেছে বস্তিগুলো, সেখানে শ্রমিকরা থাকতে বাধ্য হয়েছে তহখানায়, ঠাসাঠাসি করা স্যাঁতসেতে তাপ ছাড়া ঠান্ডা বসতস্থানে, এমনকি নতুন নতুন শিল্পায়তনের কাছে মাটি খুঁড়ে তৈরি আশ্রয়েও। পুঁজি বৃহত্তর হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেটা শ্রমিকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে, তাদের ফকির করে দিয়েছে, তাদের সমস্ত সময় কারখানায় কাজে লাগাতে বাধ্য হয়েছে, কাজ নিতে বাধ্য করেছে শ্রমিকদের স্ত্রী- ছেলেমেয়েদের। কাজেই, পুঁজিতন্ত্রের বৃদ্ধি প্রথম যে পরিবর্তনটার দিকে চলেছে সেটা হল এই; মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের সিন্ধুকে জমেছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ, আর জনগণের বিরাট অংশ ফকিরে পরিণত হচ্ছে।

দ্বিতীয় পরিবর্তনটা হলো এই যে, ক্ষুদ্রের স্থলে বৃহদায়তন উৎপাদন আসার ফলে উৎপাদনে বহু উৎকর্ষ ঘটেছে। সর্বপ্রথমে প্রত্যেকটা ছোট কর্মশালায়, প্রত্যেকটা বিচ্ছিন্ন ছোট পরিবারে একা-একা পৃথক-পৃথকভাবে করা কাজের জায়গায় এসেছে এক কারখানায়, একজন ভূস্বামীর জন্যে, একজন ঠিকাদারের জন্যে একত্রে কাজ করা সমবেত মেহনতিদের কাজ। যৌথ শ্রম ব্যক্তি শ্রমের চেয়ে ফলপ্রদ (উৎপাদনকর), যৌথ শ্রম দিয়ে ঢের বেশি সহজে এবং দ্রুত পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়। কিন্তু এই সমস্ত উন্নতি উপভোগ করে একা পুঁজিপতিই, সে শ্রমিককে একরকম কিছুই দেয় না, এবং শ্রমিকদের সমবেত শ্রম থেকে উদ্ভূত সমস্ত লাভ আত্মসাৎ করে। পুঁজিপতি হয়ে ওঠে আরও শক্তিশালী, আর শ্রমিক হয়ে পড়ে আরও দুর্বল, কেননা সে কোন এক রকমের কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, অন্য কাজে বদলি হওয়া, বৃত্তি বদলান তার পক্ষে আরও কঠিন।

পুঁজিপতিরা যন্ত্রপাতি চালু করে, এ হলো উৎপাদনে আর একটা, ঢের বেশি গুরুত্বসম্পন্ন উৎকর্ষ। যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে শ্রমের ফলপ্রদতা বহুগুণ বেড়ে যায়; কিন্তু পুঁজিপতি এই সমস্ত সুবিধা কাজে লাগায় শ্রমিকের বিরুদ্ধে; যন্ত্রপাতিতে কায়িক শ্রম লাগে কম, এই ব্যাপারটার সুযোগ নিয়ে সে তাতে লাগায় নারী আর অপ্রাপ্তবয়স্কদের, আর তাদের পয়সা দেয় কম। যেখানে যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয় সেখানে শ্রমিক লাগে অনেক কম, এই ব্যাপারটার সুযোগ নিয়ে সে দলে-দলে শ্রমিককে কারখানা থেকে বরখাস্ত করে, আর তখন এই বেকারির সুযোগে শ্রমিককে আরও বেশি করে বাঁধে দাসত্ববন্ধনে, কর্মদিন বাড়ায়, শ্রমিককে রাতের বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত করে, শ্রমিককে করে তোলে নিছক যন্ত্রের লেজুড়। যন্ত্রপাতির সৃষ্টি করা এবং সর্বক্ষণ বেড়ে চলা বেকারি তখন শ্রমিককে একেবারেই অরক্ষিত করে ফেলে। তার দক্ষতার আর দাম থাকে না, তার জায়গায় সহজেই আনা যায় কোন মামুলি অদক্ষ মেহনতিকে যে চটপট যন্ত্রে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং অপেক্ষাকৃত কম মজুরিতে কাজটা ধরে সানন্দে। পুঁজিপতিদের উৎপীড়ন প্রতিরোধ করার যেকোন চেষ্টা হলে বরখাস্ত হতে হয়। একার চেষ্টায় শ্রমিক পুঁজির বিরুদ্ধে নিতান্তই অসহায়, আর যন্ত্র তাকে পিষে ফেলতে চায়।

(ক) ৩। পূর্ববর্তী বিষয়টার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমরা দেখিয়েছি, যে পুঁজিপতি যন্ত্র চালু করে তার বিরুদ্ধে শ্রমিক একার চেষ্টায় অসহায় এবং অরক্ষিত। আত্মরক্ষা করার জন্যে শ্রমিককে পুঁজিপতিকে প্রতিরোধ করতে যেমন করে হোক উপায় বের করতে হয়। আর এমন উপায় সে দেখতে পায় সেটা হল সংগঠন। একার চেষ্টায় অসহায় শ্রমিক তার কমরেডদের সঙ্গে সংগঠিত হলে একটা শক্তি হয়ে ওঠে এবং পুঁজিপতির বিরুদ্ধে লড়তে, তার হামলা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।

বৃহৎ পুঁজির বিরুদ্ধে সম্মুখীন শ্রমিকের পক্ষে সংগঠন তখন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু একই কারখানায় কাজ করলেও পরস্পরের অপরিচিত পাঁচ মিশালী লোকরাশিকে সংগঠিত করা কি সম্ভব? অবস্থা শ্রমিকদের ঐক্যের জন্যে প্রস্তুত করে এবং তাদের মধ্যে গড়ে তোলে সংগঠিত করার ক্ষমতা আর সামর্থ্য, সেটা কর্মসূচিতে নির্দেশ করা হয়েছে। এইসব অবস্থা নিম্নলিখিতরূপ ঃ ১) যাতে সংবৎসর ধরে নিয়মিত কাজ আবশ্যক এমন যন্ত্রসজ্জিত উৎপাদনের বৃহৎ কারখানা শ্রমিক এবং ভূমি আর তার নিজ খামারের মধ্যকার সম্বন্ধে একেবারে ভেঙে দিয়ে তাকে পুরাদস্তুর প্রলেতারিয়ানে পরিণত করে। একটুকরো জমিতে প্রত্যেকের নিজের জন্যে কৃষিকাজ করার অবস্থাটা মেহনতিদের পৃথক-পৃথক করে রাখত, আর তাতে আসত প্রত্যেকের একটা কিছু বিশেষ-নির্দিষ্ট স্বার্থ যা তার সহ- মেহনতিদের স্বার্থ থেকে পৃথক, সেইভাবে সেটা ছিল সংগঠনের পথে অন্তরায়। ভূমির সঙ্গে শ্রমিকের কাঁটান-ছিড়েন এইসব অন্তরায়কে নষ্ট করে।

২) এরপর শত-শত আর হাজার-হাজার শ্রমিকের যৌথ কাজ আপনাতেই শ্রমিকদের অভাব প্রয়োজনাদি নিয়ে যৌথ আলোচনা করতে, যৌথ ব্যবস্থা অবলম্বন করতে অভ্যস্ত করে এবং সমগ্র শ্রমিকম-লীর অবস্থান আর স্বার্থের অভিন্নতাটাকে তাদের দেখিয়ে দেয় স্পষ্ট করে। ৩) শেষে এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায় শ্রমিকদের ক্রমাগত বদলির ফলে তারা বিভিন্ন কারখানার অবস্থাদি আর রেওয়াজের মধ্যে তুলনা করতে অভ্যস্ত হয় এবং সমস্ত কারখানায় শোষণের অভিন্ন প্রকৃতি সম্বন্ধে দৃঢ় প্রত্যয় হতে, পুঁজিপতিদের সঙ্গে সংঘাতে অন্যান্য শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা লাভ করতে তারা সক্ষম হয়। আর এইভাবে বেড়ে চলে শ্রমিকদের সংহতি। একত্রে মিলে এইসব অবস্থাদির কারণেই বড় বড় কল-কারখানা দেখা দেবার ফলে শ্রমিকদের সংগঠনের উদ্ভব ঘটে। রুশ শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্যের প্রকাশ ঘটে প্রধানত এবং সবচেয়ে ঘনঘন ধর্মঘটের মধ্যে (ইউনিয়ন কিংবা পারস্পরিক কল্যাণ সমিতি আকারের সংগঠন আমাদের শ্রমিকদের নাগালের বাইরে কেন, তার কারণ নিয়ে পরে আলোচনা করা হবে)। কল-কারখানা যত আরও বড় হয়ে ওঠে ততই বেশি ঘনঘন, প্রবল এবং নাছোড় হয়ে ওঠে শ্রমিকদের ধর্মঘট; পুঁজিতন্ত্রের উৎপীড়ন যত বাড়ে ততই বেশি আবশ্যক হয় শ্রমিকদের যৌথ প্রতিরোধ। কর্মসূচিতে যা বলা হয়েছে শ্রমিকদের বিভিন্ন ধর্মঘট আর বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহই এখন রুশি কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বহু বিস্তুত ব্যাপার। কিন্তু পুঁজিতন্ত্রের আরও বৃদ্ধি এবং ধর্মঘটের পৌনঃপুনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো অপ্রতুল প্রতিপন্ন হচ্ছে। মালিকেরা সেগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ ব্যবস্থা অবলম্বন করে; তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে, শ্রমিক আনে অন্যান্য এলাকা থেকে এবং সাহায্য চায় রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকদের কাছে, তারা শ্রমিকদের প্রতিরোধ চূর্ণ করতে তাদের সাহায্য করে। প্রত্যেকটা পৃথক কারখানার একজন ব্যক্তি মালিক শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সম্মুখীন হবার বদলে এখন তাদের বিরুদ্ধে সম্মুখীন হচ্ছে গোটা পুঁজিপতি শ্রেণি এবং তার সহায়ক সরকার। গোটা পুঁজিপতি শ্রেণি সংগ্রামে নামে গোটা শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে; ঐ শ্রেণি ধর্মঘটের বিরুদ্ধে অবলম্বন করার জন্যে সাধারণ ব্যবস্থা বের করে, শ্রমিক শ্রেণি বিরোধী আইন পাস করবার জন্য সরকারের ওপর চাপ দেয়, কারখানা তুলে নিয়ে যায় অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী এলাকায়, যারা বাড়িতে কাজ করে তাদের মধ্যে কাজ বিলি করে দেয় এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আরও হাজারটা কল-কৌশল আর ফন্দি-ফিকির খাটায়। কোন পৃথক কারখানার এমনকি কোন পৃথক শিল্পেরও শ্রমিকদের সংগঠন দেখা যায় গোটা পুঁজিপতি শ্রেণিকে রুখবার জন্যে যথেষ্ট নয়, গোটা শ্রমিক শ্রেণির যৌথ ক্রিয়াকলাপ হয়ে ওঠে একেবারেই অপরিহার্য। এইভাবে শ্রমিকদের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহের মধ্য থেকে গড়ে ওঠে গোটা শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম। মালিকদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম শ্রেণিসংগ্রামে পরিণত হয়। বশবর্তী অবস্থায় শ্রমিকদের রাখা এবং তাদের যথাসম্ভব কম মজুরি দেবার একই স্বার্থ দিয়ে মালিকেরা ঐক্যবদ্ধ। মালিকেরা এটাও দেখতে পায় যে, গোটা মালিক শ্রেণির যৌথ ক্রিয়াকলাপ, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর প্রভাববিস্তার করাই তাদের স্বার্থ নিরাপদ রাখার একমাত্র উপায়। শ্রমিকেরাও তেমনি একই স্বার্থের সূত্রে বাঁধা- সেটা হল পুঁজির পেষণে চূর্ণ হওয়া রোধ করা, জীবন আর মানুষের মতো অস্তিত্বের অধিকার তুলে ধরা। আর শ্রমিকেরা তেমনি দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে যে, তাদেরও চাই ঐক্য, চাই গোটা শ্রেণির, শ্রমিক শ্রেণির যৌথ ক্রিয়াকলাপ, আর সেই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর তাদের প্রভাব খাটানো চাই।

(ক) ৪। কারখানার শ্রমিক আর মালিকদের মধ্যে সংগ্রাম কীভাবে এবং কেন হয়ে ওঠে শ্রেণিসংগ্রাম- পুঁজিপতি শ্রেণি বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণি প্রলেতারিয়ানদের সংগ্রাম তার ব্যাখ্যা আমরা দিয়েছি। প্রশ্ন ওঠে সমগ্র জনগণ এবং মেহনতি মানুষের পক্ষে এই সংগ্রামের তাৎপর্য কী? ১নং বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে যে সমসাময়িক অবস্থাদি সম্বন্ধে আমরা আগেই বলেছি তাতে মজুরি শ্রমিকদের দিয়ে করান উৎপাদন ক্ষুদে খামারকে উচ্ছেদ করে। মজুরি শ্রম দিয়ে যারা বেঁচে থাকে তাদের সংখ্যা বাড়ে দ্রুত আর কারখানার নিয়মিত শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ে শুধু তাই নয়, আরও বেশি বাড়ে সেই কৃষকদের সংখ্যা যাদেরও বাঁচার জন্যে মজুরি শ্রমিক হিসেবে কাজের খোঁজ করতে হয়। বর্তমানে মজুরি করা, পুঁজিপতির জন্যে খাটা ইতোমধ্যে হয়ে উঠেছে শ্রমের সবচেয়ে বহু বিস্তৃত ধরন। শিল্পের শুধু নয় কৃষিতেও জনসমষ্টির প্রধান অংশটা জুড়ে রয়েছে শ্রমের ওপর পুঁজির আধিপত্য। সমসাময়িক সমাজের যা অবলম্বনস্বরূপ সেই মজুরি শ্রমের ওপর শোষণটাকে এখন বড় বড় কল-কারখানা সর্বোচ্চ মাত্রায় বাড়িয়ে তুলছে। সমস্ত শিল্পে সমস্ত পুঁজিপতির ব্যবহৃত সমস্ত শোষণপ্রণালী, যেগুলো থেকে দুর্ভোগ ভোগে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণির মানুষের গোটা সমষ্টিটা, সেগুলোকে একেবারে কারখানার ভিতরে ঘনীভূত আর তীব্রতর করা হয়, করা হয় স্বাভাবিক ধারণানুযায়ী নিয়ম, আর সেগুলো প্রসারিত হয় শ্রমিকের শ্রম আর জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে, সেগুলো সৃষ্টি করে একটা গোটা রুটিন, একটা গোটা ব্যবস্থা যাতে করে পুঁজিপতি স্বল্প মজুরি দিয়ে শ্রমিককে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটায়। একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে কথাটাকে স্পষ্ট করে তোলা যাক : সবসময় এবং সর্বত্র যে কেউ মজুরি করার কাজ করলে সে বিশ্রাম করে, কাছাকাছি পর্ব হলে সেই ছুটিতে যায় সেখানে। কারখানায় ব্যাপারটা একবারে অন্য রকম। কারখানার পরিচালকেরা কোন শ্রমিককে কাজে লাগালে তারা এই শ্রমিক নিয়ে বন্দোবস্ত করে মর্জিমাফিক- শ্রমিকটির অভ্যাস, তার রেওয়াজ জীবনযাত্রা প্রণালী, পরিবারে তার অবস্থান তার সাংস্কৃতিক চাহিদার দিকে একটুও নজর রাখে না। যখনই নিযুক্ত ব্যক্তির শ্রমের দরকার পড়ে তখনই কারখানা তাকে কাজে ঠেলে দেয়- তার গোটা জীবনটাকে কারখানার প্রয়োজন অনুসারে খাপ খাইয়ে নিতে, তার অবসর সময়টাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে বাধ্য করে, এবং সে শিফটে থাকলে তাকে রাত্রে এবং ছুটির দিনে কাজ করতে বাধ্য করে। কাজের সময়ের ব্যাপারে যত রকমের অনাচার কল্পনা করা যেতে পারে সবই কারখানা চালু করে দেয়, আর তারই সঙ্গে সঙ্গে চালু করে নিজ নিয়মাবলী, নিজ রেওয়াজ সেগুলো প্রত্যেকটি শ্রমিকের পক্ষে বাধ্যতামূলক। মজুরি খাটান শ্রমিক যতখানি শ্রম ঢালতে সক্ষম সবটা নিঙড়ে নিয়ে, সবচেয়ে চড়া বেগে সেটা নিঙড়ে নিয়ে পরে তাকে বের করে দেবার জন্যেই কারখানার সমস্ত হালচাল পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থিত! আর একটা দৃষ্টান্ত। যারা কোন কাজ নেয় তারা প্রত্যেকেই অবশ্য মালিকের অধীন হবার, হুকুমমতো সবকিছু করার কড়ার মেনে যায়। কিন্তু কেউ একটা অস্থায়ী কাজে মজুরি করতে গেলে সে কোনক্রমেই নিজ ইচ্ছা সমর্পণ করে না; মালিকের দাবি অন্যায় কিংবা মাত্রাতিরিক্ত মনে হলে সে তাকে ছেড়ে যায়। অন্যদিকে, কারখানা দাবি করে, শ্রমিককে তার ইচ্ছা সমর্পণ করতে হবে সম্পূর্ণতই; কারখানা তার চৌহদ্দির ভিতরে শৃঙ্খলা চালু করে, ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিককে কাজ শুরু কিংবা বন্ধ করতে বাধ্য করে; শ্রমিককে শাস্তি দেবার অধিকার নেয় নিজ হাতে, আর তার নিজেরই তৈরি করা নিয়মের প্রত্যেকটা লঙ্ঘনের জন্যে জরিমানা করে কিংবা পয়সা কেটে নেয়। শ্রমিক হয়ে পড়ে যন্ত্রপাতির বিশাল পুঞ্জের একটা উপাংশ। তাকে বাধ্য দাস্যাবদ্ধ আর নিজস্ব ইচ্ছাবর্জিত হতে হবে একেবারে যন্ত্রটারই মতো।

আরও একটা দৃষ্টান্ত। যে কেউ কোন কাজ নিলে মালিকের প্রতি তার অসন্তোষ ঘটে কখনও কখনও সে আদালতে কিংবা কোন সরকারি কর্মকর্তার কাছে মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। আদালত আর ঐ সরকারি কর্মকর্তা উভয়েই সাধারণত বিষয়টার নিষ্পত্তি করে মালিকের সপক্ষে, তাকে সমর্থন করে, কিন্তু মালিকের স্বার্থ এইভাবে তুলে ধরাটার ভিত্তি নয় কোন সাধারণ প্রনিয়ম কিংবা আইন, ভিত্তিটা হলো পৃথক-পৃথক কর্মকর্তার বশ্যতা, তারা বিভিন্ন সময়ে মালিককে রক্ষা করে কমবেশি মাত্রায় এবং তার সপক্ষে বিষয়টার অন্যায় নিষ্পত্তি করে, তার কারণ তারা হয় তার পরিচিত লোক, নইলে কাজের পরিবেশ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নয়, শ্রমিককে বুঝতে পারে না। এই রকমের প্রত্যেকটা পৃথক ঘটনা নির্ভর করে শ্রমিক আর মালিকের মধ্যে প্রত্যেকটা পৃথক বিরোধের ওপর। প্রত্যেকটি পৃথক কর্মকর্তার ওপর। অন্যদিকে, কারখানা এমন বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে একত্রে জড়ো করে উৎপীড়ন করে এত চড়া মাত্রায় যাতে প্রত্যেকটা পৃথক ব্যাপার নিয়ে বিচার বিবেচনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাধারণ প্রনিয়মাবলি বলবৎ করা হয়, শ্রমিক আর মালিকদের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হয়, যে আইন সবারই অবশ্যপালনীয়। এই আইনে মালিকের স্বার্থ তুলে ধরার পিছনে থাকে রাষ্ট্রের প্রাধিকার। পৃথক পৃথক কর্মকর্তার অবিচারের জায়গায় আসে আইনেরই অবিচার। যেমন নিম্নলিখিত বিভিন্ন ধরনের প্রনিয়ম দেখা যায় : শ্রমিক কাজে গরহাজির হলে তার মজুরি খোয়া যায় শুধু তাই নয় তদুপরি তাকে দিতে হয় জরিমানা, অথচ কাজ নেই বলে মালিক শ্রমিকদের ঘরে ফেরত পাঠালে তাকে কিছুই দিতে হয় না; শ্রমিক কড়া কথা বললে মালিক তাকে বরখাস্ত করতে পারে, কিন্তু শ্রমিকের প্রতি অনুরূপ আচরণ করা হলে সে কাজ ছেড়ে যেতে পারে না; মালিক নিজ প্রাধিকার অনুসারে জরিমানা করতে পারে, মজুরি কেটে নিতে পারে কিংবা ওভারটাইম খাটাতে পারে, ইত্যাদি।

কারখানা কিভাবে শ্রমিকদের ওপর শোষণটাকে তীব্রতর করে তোলে এবং সেটাকে করে তোলে সর্বব্যাপী, সেটাকে নিয়ে তৈরি করে একটা গোটা তন্ত্র, তা আমরা দেখতে পাই এই সমস্ত দৃষ্টান্ত থেকে। ইচ্ছা অনিচ্ছা নির্বিশেষে শ্রমিককে এখন সম্পর্কে আসতে হয় ব্যক্তি মালিক, তার ইচ্ছা আর উৎপীড়নের সঙ্গে নয়, কিন্তু গোটা মালিক শ্রেণির কাছ থেকে সে যে স্বেচ্ছাচার উৎপীড়ন ভোগ করে সেটার সঙ্গে। শ্রমিক দেখতে পায়, কোন একজন পুঁজিপতি নয়, গোটা পুঁজিপতি শ্রেণিই তার উৎপীড়ক, কেননা শোষণ ব্যবস্থাটা সমস্ত প্রতিষ্ঠানে একই। ব্যক্তি পুঁজিপতি এই ব্যবস্থা থেকে অন্যদিকে যেতে পারেই না। যেমন, সে যদি কাজের সময় কমাতে মনস্ত করে তাহলে তার প্রতিবেশি আর একজন কারখানা মালিকের চেয়ে তার পণ্যদ্রব্যের খরচ পড়বে বেশি, অপর কারখানা মালিক তার নিযুক্ত লোকদের আরও বেশি সময় খাটায় একই মজুরিতে। নিজ অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে শ্রমিককে এখন মোকাবিলা করতে হয় সেই গোটা সমাজব্যবস্থাটার সঙ্গে যার লক্ষ্য হলো শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণ। কোন ব্যক্তি কর্মকর্তার কোন পৃথক অবিচার নয়, শ্রমিকের বিরুদ্ধে এখন সম্মুখীন হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অবিচার, যে কর্তৃপক্ষ গোটা পুঁজিপতি শ্রেণিটাকে নিজ রক্ষণাধীন করে এবং ওই শ্রেণির স্বার্থসেবী, কিন্তু সবারই অবশ্যপালনীয় আইন পাস করে। এইভাবে, মালিকদের বিরুদ্ধে কারখানা শ্রমিকদের সংগ্রাম অনিবার্যভাবেই গোটা পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে, শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণের বিরুদ্ধে স্থাপিত গোটা সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে পরিণত হয়। এই কারণেই শ্রমিকদের সংগ্রামে আসে সামাজিক তাৎপর্য, যে সমস্ত শ্রেণির চলে অন্যান্যের শ্রমের ওপর তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত মেহনতি মানুষের একটা সংগ্রাম হয়ে ওঠে শ্রমিকদের সংগ্রামে। এই কারণেই শ্রমিকদের সংগ্রাম একটা নতুন যুগের সূচনা করছে রুশ ইতিহাসে, এ সংগ্রাম শ্রমিকদের মুক্তির উদয়কাল।

সমগ্র মেহনতি জনরাশির ওপর পুঁজিপতি শ্রেণির আধিপত্যের ভিত্তিটা কি? ভিত্তিটা হলো এই: সমস্ত কারখানা, মিল, খনি, যন্ত্রপাতি আর শ্রমের সাধিত্র পুঁজিপতিদের হাতে, তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি; তারা বিপুল পরিমাণ ভূমির মালিক (ইউরোপীয় রাশিয়ার সমস্ত ভূমির তৃতীয়াংশের বেশিটা ভূমিসম্পত্তি মালিকদের, সংখ্যায় তারা পাঁচ লক্ষও নয়) শ্রমিকরা কোন শ্রম সাধিত্র বা মালমশলার মালিক নয়, তাকেই তাদের শ্রমশক্তি বিক্রি করতে হয় পুঁজিপতিদের কাছে, এরা শ্রমিকদের দেয় শুধু যা যা জীবন ধারণের জন্য আবশ্যক, আর শ্রম দিয়ে উৎপন্ন সমস্ত উদ্বৃত্ত ফেলে নিজেদের পকেটে। এইভাবে এরা ব্যবহৃত শ্রম কাজের শুধু একাংশের পয়সা দেয়, বাদ বাকিটা আত্মসাৎ করে। শ্রমিক সমষ্টির সমবেত শ্রমে কিংবা উৎপাদনে উৎকর্ষ থেকে সম্পদের যত বৃদ্ধি ঘটে সবটাই যায় পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে, আর পুরুষানুক্রমে মেহনত করে যে শ্রমিকেরা তারা সম্পত্তিবিহীন প্রলেতারিয়ান হয়েই থেকে যায়। এই কারণে শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণ খতম করার উপায় আছে একটাই, সেটা হলো-শ্রম সাধিত্রে ব্যক্তিগত মালিকানার লোপ করা, সমস্ত কারখানা, মিল, খনি, আর সমস্ত বড় ভূমিসম্পত্তি ইত্যাদিও সমগ্র সমাজের হাতে তুলে দেয়া এবং সবাই একত্রে মিলে শ্রমিকদের নিজেদেরই পরিচালিত সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন চালান। একত্রে সবার শ্রম উৎপন্ন হবে সেটা লাগান হবে শ্রমিকদের নিজেদেরই প্রয়োজন মেটাতে, বিজ্ঞান আর শিল্পকলার যাবতীয় সাধনসাফল্য উপভোগ করতে তাদের সমস্ত সামর্থ্য আর সমান অধিকারের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্যে। এই কারণেই কর্মসূচিতে বলা হয়েছে, শ্রমিক শ্রেণি আর পুঁজিপতিদের মধ্যে সংগ্রাম শেষ করতে পারে কেবল এই উপায়েই। তবে এটা হাসিল করতে হলে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা যাওয়া চাই পুঁজিপতি আর ভূস্বামীদের প্রভাবাধীন সরকারের হাত থেকে কিংবা সরাসরি পুঁজিপতিদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গড়া সরকারের হাত থেকে শ্রমিক শ্রেণির হাতে।

এটাই শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য, এটাই শ্রমিক শ্রেণির পূর্ণ মুক্তির শর্ত। শ্রেণিসচেতন, সংগঠিত শ্রমিকদের সচেষ্ট হওয়া চাই এই চূড়ান্ত লক্ষ্যের জন্য; তবে এখানে, রাশিয়ায় তাদের পথে এখনও রয়েছে প্রচন্ড বাধা-বিঘ্ন, সেগুলো মুক্তিসংগ্রামে তাদের ব্যাহত করছে।

(ক) ৫। সমস্ত ইউরোপীয় দেশের শ্রমিকেরা এবং আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ার শ্রমিকেরাও এখন পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণির সংগঠন আর সংহতি কোন একটা দেশে কিংবা একটা জাতিসত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সারা পৃথিবীর শ্রমিকদের স্বার্থ আর লক্ষ্যের পূর্ণ অভিন্নতা (সংহতি) সশব্দে ঘোষণা করছে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক পার্টিগুলি তারা একত্রে মিলিত হয় বিভিন্ন যুক্ত কংগ্রেসে, সমস্ত দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির কাছে একই দাবিদাওয়া তুলে ধরে, তারা স্থাপন করেছে মুক্তির জন্যে সচেষ্ট সমগ্র সংগঠিত প্রলেতারিয়েতের একটা আন্তর্জাতিক উৎসব দিন (মে দিবস), এইভাবে সমস্ত জাতিসত্তা আর সমস্ত দেশের শ্রমিক শ্রেণিকে দৃঢ়সংলগ্ন করে তারা গড়ে তুলছে এক বিরাট শ্রমিক বাহিনী। শ্রমিকদের ওপর কর্তৃত্ব করে যে পুঁজিপতি শ্রেণি সেটা কর্তৃত্ব কোন একটা দেশে গন্ডিবদ্ধ রাখে না, এরই মধ্যে আসছে সমস্ত দেশের শ্রমিকদের ঐক্যের অপরিহার্যতা। বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের সম্পর্ক ক্রমাগত ঘনিষ্ঠতর আর বিস্তৃততর হয়ে উঠেছে; এক দেশ থেকে অন্য দেশে পুঁজির চলাচল ঘটছে নিরন্তর। প্রকান্ড-প্রকান্ড যেসব ন্যাসরক্ষক পুঁজি একত্রে জড়ো করে ঋণ হিসাবে পুঁজিপতিদের মধ্যে বণ্টন করে সেই ব্যাঙ্কগুলো জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুরু হয়ে পরে হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক, পুঁজি সমাহরণ করে সমস্ত দেশ থেকে এবং সেটাকে বণ্টন করে ইউরোপ আর আমেরিকার পুঁজিপতিদের মধ্যে। কোন এক দেশে নয়, একই সময়ে কয়েকটা দেশে বিভিন্ন পুঁজিতান্ত্রিক কারবার স্থাপনের জন্যে এখন সংগঠিত হচ্ছে প্রকান্ড প্রকান্ড জয়েন্ট স্টক কোম্পানি; দেখা দিচ্ছে পুঁজিপতিদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিমেল। পুঁজিতান্ত্রিক আধিপত্য আন্তর্জাতিক। তাই, আন্তর্জাতিক পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমিকরা যুক্তভাবে লড়লে একমাত্র তবেই মুক্তির জন্যে সমস্ত দেশের শ্রমিকদের সংগ্রাম সাফল্যমন্ডিত হতে পারে। এই কারণে পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রুশ শ্রমিকের হলো জার্মান শ্রমিক, পোলীয় শ্রমিক আর ফরাসি শ্রমিক, ঠিক যেমন তার শত্রু হলো রুশ, পোলীয় আর ফরাসি পুঁজিপতিরা। সাম্প্রতিক কালে বৈদেশিক পুঁজিপতিরা সাগ্রহে তাদের পুঁজি স্থানান্তর করেছে রাশিয়ায়, যেখানে তৈরি হয়েছে শাখা কারখানা; আর বিভিন্ন কোম্পানি পত্তন করেছে নতুন নতুন শিল্পায়তন চালাবার জন্যে। লোভাতুর হয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছে এই নবীন দেশটার ওপর। যেখানে সরকার অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে বেশি পরিমাণে পুঁজির প্রতি প্রসন্ন, পুঁজির পা-চাটা, সেখানে তারা দেখে এমনসব শ্রমিক যারা পশ্চিমের চেয়ে কম সংগঠিত এবং লড়াইয়ে কম বড়, আর যেখানে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান অনেক নিচু এবং তারা দেখে মজুরিও অনেক কম, যাতে বৈদেশিক পুঁজিপতিরা তাদের দেশে যার জুড়ি মেলে না এমন পরিসরে বিপুল লাভ তুলে নিতে পারে। আন্তর্জাতিক পুঁজি ইতোমধ্যে রাশিয়ার দিকে হাত বাড়িয়েছে। রুশ শ্রমিকরা হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদ্দেশ্যে।

(খ) ১। এটাই কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সর্বপ্রধান উপাদান, কেননা শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য কী হবে পার্টির ক্রিয়কলাপ, শ্রেণিসচেতন শ্রমিকদের ক্রিয়াকলাপ, সেটা এতে নির্দেশ করা হয়েছে। বৃহদায়তন কারখানাগুলোর সৃষ্টি করা জীবনযাত্রার অবস্থা থেকে উদ্ভুত জন আন্দোলনের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের জন্যে প্রচেষ্টা, মানুষের ওপর মানুষের যুগ যুগান্তরের শোষণ অবসানের প্রচেষ্টা সংযুক্ত করতে হবে কিভাবে সেটা এতে নির্দেশ করা হয়েছে।

শ্রমিকদের শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলাই হওয়া চাই পার্টির ক্রিয়াকলাপ। শ্রমিকদের সাহায্য করার কোন ফ্যাশনমাফিক উপায় বের করা নয়, পার্টির কাজ হলো শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া, তাতে জ্ঞানলোক দেওয়া, শ্রমিকরা নিজেরাই ইতোমধ্যে যে সংগ্রাম শুরু করেছে তাতে তাদের সহায়তা করা। শ্রমিকদের স্বার্থ তুলে ধরা এবং শ্রমিক শ্রেণির গোটা আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করাই পার্টির কাজ। শ্রমিকদের আন্দোলনে তাদের এই সহায়তা করাটা তাহলে কী হওয়া চাই?

কর্মসূচিতে বলা হয়েছে এই সহায়তা হওয়া চাই প্রথমত শ্রমিকদের শ্রেণিচেতনা গড়ে তোলা। মালিকদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম কীভাবে হয়ে ওঠে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিসংগ্রাম সে সম্পর্কে আমরা আগেই বলেছি।

শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা বলতে কী বুঝায় সেটা আমরা বিষয়টা সম্বন্ধে যা বলেছি তার থেকে বেরিয়ে আসে। বড় বড় কল-কারখানার সৃষ্টি করা পুঁজিপতি আর কারখানা মালিক শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানই শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন আর মুক্তি হাসিল করার একমাত্র উপায়। এই মর্মে তাদের উপলব্ধিই শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা। তাছাড়া যে কোন একটা দেশে সমস্ত শ্রমিকের স্বার্থ অভিন্ন, তারা সবাই মিলে একই শ্রেণি, যা সমাজের অন্যান্য শ্রেণি থেকে পৃথক,এই উপলব্ধি হলো শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা, শেষে শ্রমিকদের শ্রেণি চেতনা বলতে বুঝায় এই উপলব্ধি যে লক্ষ্যগুলি সাধনের উদ্দেশ্যে রাজকার্যে শ্রমিকদের প্রভাববিস্তারের জন্যে কাজ করতে হবে, ঠিক যেমনটা ভূস্বামী আর পুঁজিপতিরা করেছে এবং এখনও করে চলেছে।

এই সব কিছু সম্বন্ধে শ্রমিকদের উপলব্ধি ঘটে কোন উপায়ে? মালিকদের বিরুদ্ধে তারা যে সংগ্রাম চালাতে শুরু করে, যে সংগ্রাম বর্ধিত মাত্রায় বিকশিত হয়, তীব্রতর হয়ে ওঠে এবং বড় বড় কল-কারখানা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যাতে আরও বেশি বেশি সংখ্যায় শ্রমিক জড়িত হয়, তারই থেকে নিরন্তর অভিজ্ঞতা পেয়ে তাদের এই উপলব্ধি ঘটে। এমন এক সময় ছিল যখন পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের বৈরিতা প্রকাশ পেত কেবল তাদের শোষকদের প্রতি ঝাপসা ঘৃণাবোধে। তাদের ওপর উৎপীড়ন আর দাসত্ব বন্ধন সম্বন্ধে ঝাঁপসা চেতনায় এবং পুঁজিপতিদের ওপর প্রতিহিংসা নেবার কামনায়। সংগ্রাম তখন প্রকাশ পেত শ্রমিকদের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহে, তাতে তারা ঘরবাড়ি ধ্বংস করতো, যন্ত্রপাতি ভেঙে চুরমার করতো, কারখানার পরিচালকদের ওপর হামলা চালাতো ইত্যাদি। সেটা ছিল শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের প্রথম, প্রারম্ভিক আকার, আর সেটা ছিল অবশ্যম্ভাবী, কেননা সব সময়ে সর্বত্র পুঁজিপতিদের প্রতি ঘৃণাই ছিল শ্রমিকদের মধ্যে আত্মরক্ষা কামনা জাগাবার দিকে প্রথম তাড়না। তবে, রুশ শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন বেড়ে এই প্রারম্ভিক আকার ছাড়িয়ে এসেছে ইতোমধ্যে। পুঁজিপতির প্রতি আবছা ঘৃণার বদলে শ্রমিকেরা ইতোমধ্যে শ্রমিক শ্রেণি আর পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থের দ্বন্দ্ব বুঝতে শুরু করেছে। উৎপীড়ন সম্বন্ধে আবছা বোধের বদলে তারা পুঁজি যেসব উপায় উপকরণ দিয়ে তাদের উৎপীড়ন করে সেগুলোকে চিনতে শুরু করেছে, এবং বিভিন্ন ধরনের উৎপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে, পুঁজিতান্ত্রিক উৎপীড়ন গন্ডিবদ্ধ করছে, পুঁজিপতিদের লালসা থেকে আত্মরক্ষা করছে। পুঁজিপতিদের ওপর প্রতিহিংসা নেবার বদলে এখন সুযোগ সুবিধার জন্যে লড়াই ধরছে, একটার পরে একটা দাবি নিয়ে পুঁজিপতি শ্রেণির সম্মুখীন হতে শুরু করেছে, দাবি করছে কাজের উন্নততর পরিবেশ, মজুরি বৃদ্ধি আর খাটো কর্মকাল। শ্রমিক শ্রেণি যে অবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করে তারই কোন বিশেষ দিকের ওপর শ্রমিকদের সমস্ত মনোযোগ আর সমস্ত প্রচেষ্টা কেন্দ্রীভূত হয় প্রত্যেকটা ধর্মঘটে। প্রত্যেকটা ধর্মঘট থেকে এইসব অবস্থা সম্বন্ধে আলোচনা ওঠে; সেগুলোর মূল্যায়ন করতে কোন বিশেষ ক্ষেত্রে পুঁজিতান্ত্রিক উৎপীড়নটা কিসে এবং এই উৎপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোন উপায় লাগানো যেতে পারে সেটা বুঝতে প্রত্যেকটা ধর্মঘট শ্রমিকদের সহায়ক হয়। সমগ্র শ্রমিক শ্রেণির অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে প্রত্যেকটা ধর্মঘট। কোন ধর্মঘট সাফল্যমন্ডিত হলে অনুপ্রাণিত হয় তাদের সাথীদের সাফল্য কাজে লাগাবার জন্যে। সেটা সাফল্যমন্ডিত না হলে ব্যর্থতার কারণ সম্বন্ধে এবং সংগ্রামের উন্নততর প্রণালী সন্ধানের জন্যে আলোচনা দেখা দেয়। অত্যাবশ্যক প্রয়োজনগুলোর জন্যে দৃঢ় সংগ্রামে, সুযোগ সুবিধা আর জীবনযাত্রার অবস্থা, মজুরি এবং কর্মকালের উন্নতির জন্যে লড়াইয়ে শ্রমিকদের এই উত্তরণ যা এখন শুরু হয়ে গেছে সারা রাশিয়ায় তার অর্থ হলো বিপুল অগ্রগতি ঘটছে রুশি শ্রমিকদের আর সেই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি আর সমস্ত শ্রেণি সচেতন শ্রমিকের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হওয়া চাই প্রধানত এই সংগ্রামের ওপর, এটাকে অগ্রসর করাবার ওপর। শ্রমিকদের সবচেয়ে জরুরি যেসব প্রয়োজন মেটাবার জন্যে লড়া দরকার সেগুলো তাদের দেখিয়ে দেওয়া, শ্রমিকদের বিভিন্ন বর্গের অবস্থার অবনতি ঘটে বিশেষত যেসব কারণে সেগুলোর বিশ্লেষণ করা, যেসকল কারখানা আইন আর প্রনিয়ম লঙ্ঘনের ফলে (আর তার সঙ্গে পুঁজিপতিদের শঠ ফন্দি ফিকির মিলে) শ্রমিকেরা প্রায়ই হয়ে পড়ে দুমুখো ডাকাতির শিকার, সেইসব আইন প্রনিয়মের ব্যাখ্যা দেওয়া- এইগুলো হওয়া দরকার শ্রমিকদের প্রতি সহায়তা। এই সহায়তা হওয়া দরকার- শ্রমিকদের দাবিদাওয়াকে আরও যথাযথ এবং স্পষ্ট রূপে প্রকাশ করা এবং সেগুলোকে সাধারণ্যে হাজির করা, প্রতিরোধের সবচেয়ে উপযোগী সময়টার বাছন, সংগ্রামের প্রণালী নির্বাচন, দুই বিরুদ্ধ পক্ষের অবস্থান আর শক্তি নিয়ে আলোচনা, লড়াইয়ের আরও ভাল কায়দা বেছে নেয়া যেতে পারে কি না সেটা নিয়ে আলোচনা (কায়দাটা হয়তো হতে পারে কারখানা মালিকের কাছে চিঠি পাঠানো, কিংবা পরিস্থিতি অনুসারে যখন সরাসরি ধর্মঘট সংগ্রাম যুক্তিসঙ্গত নয়, পরিদর্শক কিংবা ডাক্তারের কাছে যাওয়া ইত্যাদি)।

আমরা বলেছি এমন সংগ্রামে রুশিদের উত্তরণ হলো তারা যে অগ্রগতি ঘটিয়েছে তারই নিদর্শন। এই সংগ্রাম শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনকে তুলে ধরে (নিয়ে যায়) সিধে সদর রাস্তায়, এই সংগ্রাম ওই আন্দোলনের পরবর্তী সাফল্যের নিশ্চায়ক। মেহনতি মানুষের প্রধান অংশটা এই সংগ্রাম থেকে শেখে প্রথমত পুঁজিতান্ত্রিক শোষণের কায়দাগুলোকে একে একে চিনতে আর বিচার বিবেচনা করতে, এবং আইনের সঙ্গে নিজেদের জীবনযাত্রার অবস্থার সঙ্গে আর পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে সেগুলোকে তুলনা করতে, শোষণের বিভিন্ন ধরণ আর ঘটনা বিচার বিবেচনা করে শ্রমিকরা সমগ্রভাবে শোষণের তাৎপর্য আর মর্ম বুঝতে শেখে, বুঝতে শেখে শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণের ভিত্তিতে স্থাপিত সমাজব্যবস্থাকে। দ্বিতীয়ত এই সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের শক্তি পরখ করে, সংগঠিত হতে শেখে, সংগঠনের আবশ্যকতা আর তাৎপর্য বুঝতে শেখে। এই সংগ্রামের প্রসার এবং সংঘাতের ক্রমবর্ধমান পৌনঃপুনিকতার ফলে অনিবার্যভাবেই সংগ্রাম আরও প্রসারিত হয়, গড়ে ওঠে ঐক্যবোধ আর সংহতি বোধ- প্রথমে কোন একটা এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে, আর তারপরে গোটা দেশের শ্রমিকদের মধ্যে, সমগ্র শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে। তৃতীয়ত, এই সংগ্রাম বিকশিত করে শ্রমিকদের রাজনৈতিক চেতনা। মেহনতি মানুষের বিপুল অংশের জীবনযাত্রার অবস্থা তাদের এমন জায়গায় ফেলে দেয় যাতে রাষ্ট্র সংক্রান্ত প্রশ্নাবলী নিয়ে বিবেচনা করার অবসর অথবা সুযোগ তাদের থাকে না (থাকতে পারে না)। অন্যদিকে দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্যে কারখানা মালিকের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম শ্রমিকদের মধ্যে যে তাগিদ সৃষ্টি করে তাতে আপনা থেকে আর অনিবার্যভাবেই তাদের ভাবতে হয় রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক বিষয়াবলী নিয়ে, রুশ রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয়, আইন প্রনিয়ম জারি হয় কীভাবে, আর সেগুলো কার স্বার্থের সেবা করে, এইসব প্রশ্ন নিয়ে। কারখানায় প্রত্যেকটা সংঘাতের ফলে আইনকানুন আর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শ্রমিকদের বিরোধ বাধে, এটা অবশ্যম্ভাবী। শ্রমিকরা রাজনৈতিক বক্তৃতা প্রথমবার শোনে এই প্রসঙ্গে। সেটা প্রথমে আসে, ধরা যাক, কারখানা পরিদর্শকদের কাছ থেকে। তারা তাদের কাছে ব্যাখ্যা করে বলে তাদের ঠকাবার জন্যে কারখানা মালিকের খাটান ফিকিরটা কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত প্রতিনিয়মের যথাযথ অর্থের ভিত্তিতেই স্থাপিত- শ্রমিকদের ঠকাবার অবাধ সুযোগ দেয় ওই প্রনিয়ম, কিংবা তারা বলে কারখানা মালিকের উৎপীড়নকর ব্যবস্থা একেবারেই আইনসঙ্গত, কেননা সে শুধু নিজের অধিকার কাজে খাটাচ্ছে, অমুক কিংবা অমুক আইন বলবৎ করছে, যে আইন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত, ওই কর্তৃপক্ষ সেই আইন প্রতিপালিত করাবার ব্যবস্থা করে। পরিদর্শক মহাশয়েদের রাজনীতিক ব্যাখ্যাটাকে কখনও কখনও সম্পূরক বলে মন্ত্রীরা আরও বেশি উপকারী রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, মন্ত্রী শ্রমিকদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শ্রমিকদের শ্রম থেকে অগাধ পয়সা করার জন্যে কারখানা মালিকদের প্রতি তাদের খৃষ্টীয় প্রেম অবশ্য কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের এইসব ব্যাখ্যা এবং এই কর্তৃপক্ষ কার ভালোর জন্য কাজ চালায় সেটা যাতে দেখা যায় এমনসব তথ্যাদির সঙ্গে শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সঙ্গে পরে আরও যুক্ত হয় কোন লিফলেট কিংবা সমাজতন্ত্রীদের দেওয়া অন্যান্য ব্যাখ্যা, তার ফলে এমন ধর্মঘট থেকে শ্রমিকেরা রাজনৈতিক শিক্ষা পায় পুরোপুরি। শ্রমিক শ্রেণির বিশেষ নির্দিষ্ট স্বার্থটাই শুধু নয়, রাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণির বিশেষ নির্দিষ্ট স্থানটাও তার বুঝতে শেখে। এইভাবে, শ্রমিকদের শ্রেণিসংগ্রামে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি যে সহায়তা করতে পারে সেটা হওয়া চাই: শ্রমিকদের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনগুলোর জন্য লড়াইয়ে সহায়তা করে তাদের শ্রেণিচেতনা বিকশিত করা।

দ্বিতীয় ধরনের সহায়তা হল শ্রমিকদের সংগঠন এগিয়ে নেওয়া, যা বিবৃত হয়েছে কর্মসূচিতে। একটু আগে যে সংগ্রামের কথা বর্ণিত হয়েছে তার থেকে এটা আসে যে, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়াটা অপরিহার্য। ধর্মঘটের ব্যাপারে সংগঠন অপরিহার্য হয়ে ওঠে যাতে ধর্মঘট বিপুল সাফল্যের সঙ্গে চালিত হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্যে, ধর্মঘটিদের সমর্থনে অর্থাদি সংগ্রহের জন্য, শ্রমিকদের পারস্পরিক কল্যাণ সমিতি স্থাপনের জন্য এবং তাদের মধ্যে লিফলেট, ঘোষণা, ইশতেহার, ইত্যাদি প্রচারের জন্য। শ্রমিকেরা যাতে পুলিশ আর সশস্ত্র পুলিসের নির্যাতন থেকে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয় সেজন্য ওদের কাছ থেকে শ্রমিকদের সমস্ত যোগাযোগ আর সমিতি গোপন রাখার জন্য এবং বই, পুস্তিকা, সংবাদপত্র ইত্যাদি পৌঁছে দেবার বন্দোবস্তের জন্য সংগঠন আবশ্যক আরও বেশি।এই সবকিছুতে সহায়তা করা হয় পার্টির দ্বিতীয় কাজ।

তৃতীয় কাজ হলো সংগ্রামের আদত লক্ষ্যগুলি নির্দেশ করা, অর্থাৎ শ্রমিকদের কাছে ব্যাখ্যাকারে বলা শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণটা, কিসে, তার ভিত্তিটা কী, ভূমি আর উৎপাদন সাধিত্রে ব্যক্তিগত মালিকানার ফলে মেহনতি জনগণের গরিবি ঘটে কীভাবে, পুঁজিপতিদের কাছে তারা শ্রম বিক্রি করতে এবং শ্রমিকদের জীবনধারনের জন্য যা আবশ্যক তার উপরি শ্রমিকদের শ্রম দিয়ে উৎপন্ন উদ্বৃত্তের সবটা অমনি দিতে তারা বাধ্য হয় কেন, তার উপরে আরও এটা ব্যাখ্যা করা কিভাবে এই শোষণ থেকে অনিবার্যভাবেই আসে শ্রমিক আর পুঁজিপতিদের মধ্যে শ্রেণি সংগ্রাম, এই সংগ্রামের পরিবেশ এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য কী- এককথায় কর্মসূচিতে যা বিবৃত হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়া।

(খ) ২। শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম একটা রাজনৈতিক সংগ্রাম-এই কথাটায় কী বুঝায়? কথাটায় বুঝায় এই যে, রাজকার্যের ওপর রাষ্ট্রের প্রশাসনের ওপর, আইনসংক্রান্ত বিষয়াবলীর ওপর প্রভাব বিস্তার না করে শ্রমিক শ্রেণি নিজ মুক্তির জন্য লড়তে পারে না। রুশি পুঁজিপতিরা এমন প্রভাবের আবশ্যকতা বুঝেছে দীর্ঘকাল যাবত, আর আমরা দেখিয়েছি, পুলিশের আইন কানুনে হরেক রকমের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তারা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করার হাজারটা উপায় বের করতে পেরেছে কীভাবে, আর কীভাবে এই কর্তৃপক্ষ পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ সেবা করে। এইভাবে এর থেকে স্বভাবতই এটা বেরিয়ে আসে যে, শ্রমিক শ্রেণিও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত না করলে তার সংগ্রাম চালাতে পারে না, এমনকি নিজ হালতের কোন সুস্থিত উন্নতি ঘটাতেও পারে না।

আমরা আগেই বলেছি, পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম থেকে সরকারের সঙ্গে বিরোধ বাধা অবশ্যম্ভাবী, আর শ্রমিকরা যে কেবল সংগ্রাম আর যৌথ প্রতিরোধ দিয়েই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করতে পারে সেটা তাদের কাছে প্রমাণ করার জন্য সর্বতোভাবে সচেষ্ট রয়েছে সরকারই। রাশিয়ায় ১৮৮৫-১৮৮৬ সালের বড় বড় ধর্মঘট থেকে এটা দেখা গিয়েছিল বিশেষ স্পষ্টভাবে। সরকার অবিলম্বে শ্রমিকদের সম্বন্ধে প্রনিয়মাবলি রচনা করতে বসেছিল, কারখানায় চলিতকর্ম সম্বন্ধে নতুন নতুন আইন জারি করেছিল সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিয়েছিল শ্রমিকদের নাছোড় দাবিগুলো (যেমন, জরিমানা সীমাবদ্ধ করা এবং ঠিকমতো মজুরি দেবার ব্যবস্থা করে প্রনিয়ম চালু করা হয়েছিল); সেই একইভাবে এখনকার ধর্মঘটগুলো (১৮৯৬ সালে) আবার সরকারের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ ঘটিয়েছে, আর সরকার ইতোমধ্যে বুঝেছে কেবল গ্রেপ্তার আর নির্বাসনের ব্যাপারের মধ্যে থাকা চলে না, কারখানা মালিকদের সমুন্নত আচরণ নিয়ে নির্বোধ উপদেশামৃত শ্রমিকদের সেবন করান হাস্যকর (১৮৯৬ সালের বসন্তকালে কারখানা পরিদর্শকদের কাছে অর্থমন্ত্রী ভিত্তের সার্কুলার দ্রষ্টব্য)। সংগঠিত শ্রমিকেরা এমন শক্তি যা বিবেচনায় ধর্তব্য; এটা সরকার উপলব্ধি করেছে, তাই কারখানা আইনকানুন ইতোমধ্যে তার পর্যালোচনাধীন হয়েছে, কর্মকাল কমান এবং শ্রমিকদের অন্যান্য অপরিহার্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে আলোচনার জন্যে সিনিয়র কারখানা পরিদর্শকদের সম্মেলন বসাচ্ছে সেন্ট পিটার্সবুর্গে।

এইভাবে দেখা যাচ্ছে পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম রাজনৈতিক সংগ্রাম হওয়াই অবশ্যম্ভাবী। প্রকৃতপক্ষে এই সংগ্রাম ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ওপর প্রভাব খাটাচ্ছে; রাজনৈতিক তাৎপর্যসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। তবে, শ্রমিকদের রাজনৈতিক অধিকার নেই একেবারেই, সে সম্বন্ধে আমরা আগেই বলেছি, আর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ওপর শ্রমিকদের প্রকাশ্যে এবং সরাসরি প্রভাব খাটান অসম্ভব, সেটা শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন বিকশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি স্পষ্ট করে এবং প্রখরভাবে প্রকাশ পাচ্ছে এবং অনুভূত হচ্ছে। এই কারণে শ্রমিকদের সবচেয়ে জরুরি দাবি রাজকার্যের ওপর শ্রমিকদের প্রভাবের প্রধান লক্ষ্য হওয়া চাই রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন, অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় সমস্ত নাগরিকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, যা আইন দিয়ে নিশ্চিত, সমস্ত নাগরিকের অবাধে সমবেত হওয়া নিজেদের বিষয়াবলী নিয়ে আলোচনা করা, নিজেদের সমিতি আর পত্র পত্রিকা মারফত রাজকার্যের ওপর প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করার অধিকার। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন শ্রমিকদের চূড়ান্ত গুরুত্বসম্পন্ন কাজ হয়ে উঠেছে, তার কারণ সেটা না হলে রাজকার্যের ওপর শ্রমিকদের কোন প্রভাব থাকে না, থাকতে পারে না, তার ফলে শ্রমিকেরা অধিকারবিহীন, হীনাবস্থা, অস্পুট শ্রেণি হয়েই থেকে যায়। শ্রমিকেরা এখন লড়তে এবং একাট্টা হতে শুরু করেছে সবেমাত্র, এই এখনই আন্দোলন আরও বৃদ্ধি রোধ করার জন্য সরকার ইতোমধ্যেই তড়িঘড়ি শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা দিতে আসছে, তাহলে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, শ্রমিকেরা পুরোপুরি একাট্টা হয়ে গেলে এবং একই রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করতে পারবে, নিজেদের এবং সমগ্র রুশ জনগণের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে।

সমসাময়িক সমাজে এবং সমসাময়িক রাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণির স্থান কোথায়, শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের লক্ষ্য কী, তা কর্মসূচির পূর্ববর্তী অংশগুলোতে নির্দেশ করা হয়েছে। সরকারের নিরঙ্কুশ শাসনের অধীনে রাশিয়া কোন প্রকাশ্য সক্রিয় কোন রাজনৈতিক পার্টি নেই, থাকতে পারেও না। কিন্তু যারা অন্যান্য শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে এবং জনমত আর সরকারের ওপর প্রভাব খাটায় এমন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতধারা রয়েছে। কাজেই সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির মতাদর্শগত অবস্থান স্পষ্ট করবার জন্য রুশি সমাজের বাদবাকি রাজনৈতিক মত ধারাগুলির প্রতি এর মনোভাব এখন প্রকাশ করা আবশ্যক, যাতে শ্রমিকেরা স্থির করতে পারে কে তাদের মিত্র হতে পারে এবং সেটা কী পরিমাণে, আর কে তাদের শত্রু।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা অক্টোবর বিপ্লববার্ষিকী ২০১৮


মাওবাদী ধরার নামে শিশু-হত্যা ভারতীয় বাহিনীর

মাওবাদী খোঁজার অভিযানে শিশুহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় ঝাড়খণ্ডের পুলিশ ও সিআরপিএফ। পালামৌ জেলার বাকোরিয়ায় এই বীভৎস ঘটনা গত শুক্রবারের। সেই বাকোরিয়া, যেখানে পুলিশ-আধা সেনার তথাকথিত মাওবাদী বিরোধী অভিযানে ১১ জন নিহত হয়েছিলেন। সেই গণহত্যা নিয়ে ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত চলছে। তার মধ্যেই বাবা-কে না-পাওয়ার পরিণামে উন্মত্ত বাহিনী তিন বছরের একটি শিশুকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠল। পালামৌর পুলিশ সুপার অজয় লিন্ডা সোমবার সংবাদমাধ্যমে এই অভিযোগ দায়েরের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, তদন্ত শুরু হয়েছে।

সন্তানহারা ববিতা দেবী অভিযোগে জানিয়েছেন, শুক্রবার গভীর রাতে পুলিশ-সিআরপিএফের একটি দল বাকোরিয়া গ্রামে তাঁদের বাড়িতে আসে। ববিতার স্বামী বিনোদ সিংয়ের খোঁজ করে। যৌথ বাহিনী দাবি করে, বিনোদ নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠন ঝাড়খণ্ড জনমুক্তি মোর্চার সদস্য। পুলিশ ও জওয়ানরা জোর করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে সব তছনছ করে। বিনোদকে না পেয়ে তিন বছরের মেয়েকে কেড়ে নিয়ে সজোরে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দেয়। মারা যায় দুধের শিশুটি। পুলিশ জানিয়েছে, মেয়েটির মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন মিলেছে ময়না-তদন্ত রিপোর্টে। পুলিশ ও সিআরপিএফের কারা সে রাতের অভিযানে ছিল, খোঁজ করা হচ্ছে। তবে কেউই এখনও ধরা পড়েনি। আতঙ্কে গ্রাম ছেড়েছেন ববিতারা। ঝাড়খণ্ড জনমুক্তি মোর্চা বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাকোরিয়ায় বিনোদ সিং বলে কেউই তাদের সদস্য নয়।

সূত্রঃ https://eisamay.indiatimes.com/nation/maoist-capture-of-child-killing-force/articleshow/70849750.cms?fbclid=IwAR2tJZWA24kVGeEAErN6OInHhy2GoMzrzmw_aDNAOYfcHe_FbGAWUiNtYXs


ইউটোপীয় ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র: ফ্রেডরিক এঙ্গেলস

ইউটোপীয় ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র

(১৮৯২ ইংরেজি সংস্করণের জন্য বিশেষ ভূমিকা)

– ফ্রেডরিক এঙ্গেলস

 


বর্তমানের এই ছোট্ট পুস্তিকাটি মূলত একটি বৃহত্তম রচনার অংশ। ১৮৭৫ সালের কাছাকাছি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের Privatdocent ডা. ও. দ্যুরিং সহসা ও খানিকটা সরবে সমাজতন্ত্রে তাঁর দীক্ষাগ্রহণের কথা ঘোষণা করেন ও জার্মান জনসাধারণের কাছে একটা বিস্তারিত সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বই শুধু নয়, সমাজ পুনর্গঠনের একটা সুসম্পূর্ণ ব্যবহারিক ছকও হাজির করেন। বলাই বাহুল্য উনি তাঁর পূর্ববর্তীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন; সর্বোপরি মার্কসকে পাকড়াও করে তাঁর পুরো ঝাল ঝাড়েন।
ঘটনাটা ঘটে প্রায় সেই সময় যখন জার্মানির সোস্যালিস্ট পার্টির দুটি অংশ আইজেনাখীয় ও লাসালীয়রা সবে মিলিত হয়েছে এবং তাতে করে প্রভূত শক্তি সঞ্চয় করেছে তাই নয়, অধিকন্তু তাঁরা সমগ্র শক্তিকে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে নিয়োগের ক্ষমতাও অর্জন করেছে। জার্মানির সোস্যালিস্ট পার্টি দ্রুত একটা শক্তি হয়ে উঠছিল। কিন্তু শক্তি হয়ে ওঠার প্রথম শর্তই ছিল, এই নবার্জিত ঐক্যকে বিপন্ন করা চলবে না। ডা. দ্যুরিং কিন্তু প্রকাশ্যেই তাঁর চারিপাশেই একটা জোট পাকাতে শুরু করেন, একটি ভবিষ্যৎ পৃথক পার্টির তা বীজ। কিন্তু প্রয়োজন হয় আহ্বান গ্রহণ করে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ চালানোর, চাই বা না চাই।
কাজটা অতি দুষ্কর না হলেও স্পষ্টতই এক দীর্ঘ ঝামেলার ব্যাপার। একথা সুবিদিত যে আমরা জার্মানরা হলাম সাঙ্ঘাতিক রকমের গুরুভার এর ভক্ত- যাতে র্যা ডিক্যাল প্রগাঢ়ত্ব অথবা প্রগাঢ় র্যা ডিক্যালত্ব যা খুশি বলুন। আমাদের কেউ যখন তার বিবেচনানুসারে যা নতুন মনে হচ্ছে এমন একটি মতবাদ বিবৃত করতে চান, যখন সর্বাগ্রে সেটিকে একটি সর্বাঙ্গীন মতধারায় পরিপ্রসারিত করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ দিতে হবে যে, ন্যায়শাস্ত্রের প্রথম সূত্রটি থেকে বিশ্বের মৌলিক নিয়মগুলি সবই যে অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান, তার পেছনে শুধু শেষ পর্যন্ত এই নবাবিষ্কৃত মুকুটমণি তত্ত্বটিকে পৌঁছানো ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। এবং এদিক থেকে ডা. দ্যুরিং একান্তই জাতীয় মানোত্তীর্ণ। একছিটে কম নয়, একেবারে সুসম্পূর্ণ একটা দর্শন ব্যবস্থা- মনোজাগতিক, নৈতিক, প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক; সুসম্পূর্ণ একটা অর্থশাস্ত্র ও সমাজতন্ত্রের ব্যবস্থা; এবং পরিশেষে অর্থশাস্ত্রের বিচারমূলক ইতিহাস- অক্টাভো সাইজের তিনটি মোটা মোটা খন্ড, আকার ও প্রকার উভয়তঃ গুরুভার, সাধারণভাবে পূর্বতন সমস্ত দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদের বিরুদ্ধে বিশেষত মার্কসের বিরুদ্ধে তিনি অক্ষৌহিনী যুক্তি, মোট কথা একটা পরিপূর্ণ ‘বিজ্ঞান বিপ্লবের’ প্রচেষ্টা, এরই মোকাবেলা করতে হত। আলোচনা করতে হতো সম্ভাব্য সবকিছু প্রসঙ্গ: স্থান কালের ধারণা থেকে Bimetallism পর্যন্ত; বস্তু ও গতির চিরন্তনতা এবং নৈতিক ভাবনার মরণশীল প্রকৃতি; ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন থেকে ভবিষ্যৎ সমাজে তরুণদের শিক্ষা- সব। যাই হোক আমরা প্রতিবাদীর সর্বাঙ্গীনতার ফলে এই অতি বিভিন্ন সব প্রসঙ্গে মার্কস ও আমার যা মতামত সেগুলিকে দ্যুরিং-এর বিপরীতে, এবং এ যাবৎ যা করা হয়েছে তার চেয়ে আরও সুসম্বন্ধ আকারে বিকশিত করার একটা সুযোগ পাওয়া গেল। অন্যথায় অকৃতার্থ এ কর্তব্যগ্রহণে সেই আমার প্রধান কারণ।
আমার জবাব প্রথমে প্রকাশিত হয় সোস্যালিস্ট পার্টির প্রধান মুখপত্র লাইপজিগ Vorwarts পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রবন্ধ হিসাবে এবং পরে ‘Herrn Eugen Duhrings Umwalzung der Wissenschaft’ (শ্রী ও দ্যুরিং-এর বিজ্ঞান ও বিপ্লব) নামক পুস্তকাকারে, দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় জুরিখে ১৮৮৬ সালে।
সুহৃদ্বয় এবং অধুনা ফরাসি প্রতিনিধি সভায় লিল্ প্রতিনিধি পল লাফার্গের অনুরোধে এ বইয়ের তিনটি পরিচ্ছেদ একটি পুস্তকাকারে সাজিয়ে দেই। তিনি তা অনুবাদ করে ১৮৮০ সালে (ইউটোপীয় ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র) নামে প্রকাশ করেন। এই ফরাসি পাঠ থেকে একটি পোলীয় এবং একটি স্পেনীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৮৮৩ সালে আমাদের জার্মান বন্ধুরা পুস্তিকাটিকে মূল ভাষায় প্রকাশ করেন। জার্মান পাঠের ওপর ভিত্তি করে ইটালীয়, রুশ, দিনেমার, ওলন্দাজ ও রুমানীয় অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান ইংরেজি সংস্করণের সাথে সাথে পুস্তকটি তাহলে দশটি ভাষায় প্রকাশিত হল। আর কোন সমাজতান্ত্রিক পুস্তক এর বেশি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে বলে আমার জানা নেই, এমনকি আমাদের ১৮৪৮ সালের কমিউনিস্ট ইশতেহার বা মার্কসের পুঁজি বইটিও না। জার্মানিতে এই বইয়ের চারটি সংস্করণ হয়েছে, সর্বসমেত ২০,০০০ কপি।
মার্ক (জার্মানির প্রাচীন গ্রামগোষ্ঠী) এই সংযোজনী লেখা হয়েছিল জার্মানিতে ভূমি সম্পত্তির ইতিহাস ও বিকাশের কিছুটা প্রাথমিক জ্ঞান জার্মান সোস্যালিস্ট পার্টির মধ্যে প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে। এ কাজ তখন বিশেষ জরুরি ঠেকেছিল কারণ সে পার্টির দ্বারা শহুরে মজুরদের অঙ্গীভবন বেশ গুরুত্বপূর্ণ দিকে, পালা এসেছে ক্ষেতমজুর ও চাষিদের। অনুবাদে এ সংযোজনী রেখে দেওয়া হয়েছে, কেননা সমস্ত টিউটনিক জাতির পক্ষে যা একই সেই ভূমি-ব্যবস্থার আদি ধরণটা এবং তার অবক্ষয়ের ইতিহাস জার্মানির চেয়েও ইংল্যান্ডে কম সুবিদিত নয়। লেখাটি মূলে যা ছিল তাই রেখে দিয়েছি, ম্যাক্সিম কভালেভস্কি সম্প্রতি যে প্রকল্প দিয়েছেন তার কথা উল্লেখ করা হয়নি; এই প্রকল্প অনুসারে মার্ক-এর মধ্যে আবাদি ও চারণ-ভূমির বাঁটোয়ারা হয়ে যাবার আগে বেশ কয়েক পুরুষ এগুলির চাষ হত এজমালি হিসাবে এক একটি বৃহৎ পারিবারিক গোষ্ঠী দ্বারা (অদ্যাবধি বর্তমান দক্ষিণ স্লোভোনীয় জাদ্রুগা তার দৃষ্টান্ত স্থানীয়), বাঁটোয়ারা হয় পরে, যখন গোষ্ঠী বৃদ্ধি পায়, ফলে এজমালি হিসাবে পরিচালনা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কভালেভস্কির বক্তব্য হয়ত ঠিকই, কিন্তু বিষয়টা এখনও বিচারসাপেক্ষ।
এ বইয়ে ব্যবহৃত অর্থনৈতিক পরিভাষার যেগুলি নতুন সেগুলি মার্কসের পুঁজি বইটির ইংরেজি সংস্করণ অনুযায়ী। ‘পণ্যোৎপাদন’ আমরা সেই পর্যায়কে বলছি যেখানে সামগ্রী উৎপাদন করা হচ্ছে কেবলমাত্র উৎপাদকদের ভোগের জন্য শুধু নয়, বিনিময়ের জন্যেও; অর্থাৎ ব্যবহার মূল্য হিসাবে নয়, পণ্য হিসাবে। বিনিময়ের জন্য উৎপাদনের প্রথম সূত্রপাত থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত এই পর্যায়টা প্রসারিত; তার পূর্ণ বিকাশ ঘটে কেবলমাত্র পুঁজিবাদী উৎপাদনেই অর্থাৎ সেই অবস্থায় যখন উৎপাদনের মালিক পুঁজিপতি মজুরি দিয়ে নিয়োগ করে শ্রমিকদের, শ্রমশক্তি ছাড়া যারা উৎপাদনের সর্ববিধ উপায় থেকে বঞ্চিত তাদের, এবং সামগ্রীর বিক্রয়মূল্য থেকে তার লগ্নির ওপর যেটা উদ্ধৃত্ত হয় সেটি পকেটস্থ করে। মধ্যযুগ থেকে শিল্পোৎপাদনের ইতিহাসকে আমরা তিনটি যুগে ভাগ করি: ১) হস্তশিল্প, ক্ষুদে ক্ষুদে ওস্তাদ কারুশিল্পী ও তদধীনস্থ কয়েকজন কর্মী ও সাগরেদ, প্রত্যেক শ্রমিকই এখানে পুরো সামগ্রীটাই তৈরি করে; ২) কারখানা (manufacture) যেখানে অধিকতর সংখ্যক শ্রমিক একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে একত্রে হয়ে সমগ্র সামগ্রীটা উৎপাদন করে শ্রম বিভাগ নীতিতে, প্রতেকটি শ্রমিক করে শুধু একটা আংশিক কাজ যাতে সামগ্রীটা সম্পূর্ণ হয় শুধু পর পর প্রত্যেকের হাত ফেরতা হয়ে যাবার পর; ৩) আধুনিক যন্ত্রশিল্প, যেখানে মাল তৈরি হয় শক্তি-চালিত যন্ত্র দ্বারা আর শ্রমিকের কাজ শুধু যন্ত্রের ক্রিয়ার তদারকি ও নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ।
আমি বেশ জানি যে এই বইয়ের বিষয়বস্তুতে ব্রিটিশ পাঠক সাধারণের একটা বড় অংশের আপত্তি হবে। কিন্তু আমরা কন্টিনেন্টবাসীরা যদি ব্রিটিশ ‘শালীনতা’ রূপ কুসংস্কারের বিন্দুমাত্র ধারও ধারতাম, তাহলে আমাদের অবস্থা যা আছে তা আরও শোচনীয় হত। আমরা যাকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলি এ বইয়ে তাকে সমর্থন করা হয়েছে আর বস্তুবাদ শব্দটাই ব্রিটিশ পাঠকদের বিপুল অধিকাংশের কানে বড়ো বেঁধে। অজ্ঞেয়বাদ তবু সহনীয়, কিন্তু বস্তুবাদ একেবারেই অমার্জনীয়। অথচ সপ্তদশ শতক থেকে শুরু করে আধুনিক সমস্ত বস্তুবাদেরই আদিভূমি হল ইংল্যান্ড।
‘বস্তুবাদ গ্রেট ব্রিটেনের আত্মজ সন্তান। ব্রিটিশ স্কলাস্টিক দুনস স্কোট তো আগেই প্রশ্ন তুলেছিলেন,“বস্তুর পক্ষে ভাবনা কি অসম্ভব?”
এই অঘটন-ঘটনের জন্যে তিনি আশ্রয় নেন ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তায় অর্থাৎ তিনি ধর্মতত্ত্বকে লাগান বস্তুবাদের প্রচারে। তদুপরি তিনি ছিলেন নামবাদী। নামবাদ বস্তুবাদের প্রাথমিক এই রূপ প্রধানত দেখা যায় ইংরেজ স্কলাস্টিকদের মধ্যে।
ইংরেজি বস্তুবাদের আসল প্রবর্তক হলেন বেকন। তাঁর কাছে প্রাকৃতিক দর্শনই হল একমাত্র সত্য দর্শন এবং ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করা পদার্থবিদ্যা হল প্রাকৃতিক দর্শনের প্রধান ভাগ। আনাক্সেইগরস এবং তাঁর homoiomeriae, ডিমোক্রিটস এবং তাঁর পরমাণুর কথা তিনি প্রায়ই উদ্ধৃত করতেন তাঁর প্রামাণ্য হিসাবে। তাঁর বক্তব্য, ইন্দ্রিয় অভ্রান্ত ও সর্বজ্ঞানের মূলাধার। সমস্ত বিজ্ঞানের ভিত্তি অভিজ্ঞতা, ইন্দ্রিয়-দত্ত তথ্যকে যুক্তিসম্মত পদ্ধতিতে বিচার করাই হল বিজ্ঞানের কাজ। অনুমান, বিশ্লেষণ, তুলনা, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা হল এই ধরনের যুক্তিসম্মত প্রণালীর প্রধান অঙ্গ। বস্তুর অন্তর্নিহিত গুণের মধ্যে প্রথম এবং প্রধান হল গতি, যান্ত্রিক ও গাণিতিক গতিই শুধু নয়, প্রধানত একটা উদ্বেগ (impulse), একটা সজীব প্রেরণা, একটা টান অথবা ইয়াকব ব্যেমের কথা অনুসারে- বস্তুর একটা বেদনা (qual)।
বস্তুবাদের প্রথম স্রষ্টা বেকন, একটা সর্বাঙ্গীণ বিকাশের বীজ তখনও তাঁর বস্তুবাদে অন্তর্নিহিত। একদিকে ইন্দ্রিয়গত কাব্যময় ঝলকে পরিবৃত বস্তু যেন মানবের সমগ্র সত্তাকে আকৃষ্ট করছিল মোহনী হাসি হেসে। অন্যদিকে অ্যাফরিজম-প্রভাবে সূত্রবদ্ধ মতবাদ ধর্মতত্ত্বের অসঙ্গতিতে পল্লবিত হয়ে উঠেছিল।
পরবর্তী বিকাশে বস্তুবাদ হয়ে উঠে একপেশে। বেকনীয় বস্তুবাদকে যিনি গুছিয়ে তোলেন তিনি হব্স। ইন্দ্রিয়ভিত্তিক জ্ঞান তার কাব্য মায়া হারিয়ে গাণিতিকের বিমূর্ত অভিজ্ঞতার করায়ত্ত হল; বিজ্ঞানের রাণী বলে ঘোষণা করা হল জ্যামিতিকে। বস্তুবাদ আশ্রয় নিল মানবদ্বেষে। প্রতিদ্বন্দ্বী মানবদ্বেষী দেহহীন আধ্যাত্মবাদকে যদি তারই স্বভূমিতে পরাস্থ করতে হয়, তাহলে বস্তুবাদকেও তার দেহ দমন করে যোগী হতে হয়। এইভাবে ইন্দ্রিয়গত সত্তা থেকে তার পরিণতি হল বুদ্ধিক সত্তায়; কিন্তু এভাবেও, বুদ্ধির যা বৈশিষ্ট্য সেই অনুসারে, ফলাফলের হিসাব না করে সবকটি সঙ্গতিকেই তা বিকশিত করে তোলে।বেকন অনুবর্তক হিসাবে হব্স-এর বক্তব্য এই : সমস্ত মানবিক জ্ঞান যদি পাই ইন্দ্রিয় থেকে তাহলে আমাদের ধারণা ও প্রত্যয়গুলি তাদের ইন্দ্রিয়গত রূপ থেকে, বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন ছায়ারূপ ছাড়া আর কিছু নয়। দর্শন শুধু কেবল তাদের নামকরণ করতে পারে। একই নাম প্রযুক্ত হতে পারে একাধিক ছায়ারূপে। নামেরও নাম থাকতে পারে। স্ববিরোধ দেখা দেবে যদি আমরা একদিকে বলি যে, সমস্ত ধারণার উদ্ভব ইন্দ্রিয়ের জগত থেকে এবং অন্যদিকে বলি, শব্দটা শব্দেরও অতিরিক্ত কিছু ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে পরিজ্ঞাত যে সত্তাগুলি সকলেই এক একটি একক, সেগুলি ছাড়াও একক নয় সাধারণ চরিত্রের সত্তা বর্তমান। দেহহীন বস্তুর মতই দেহহীন সত্তাও আজগুবি। দেহ, বস্তু, সত্তা হল একই বাস্তবের বিভিন্ন নাম। চিন্তক বস্তু থেকে চিন্তাকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। জগতে যে পরিবর্তন চলেছে তা সবের অধস্তন হলো এই বস্তু। অসীম কথাটা অর্থহীন, যদি না বলা হয় যে, অবিরাম যোগ দিয়ে যাবার ক্ষমতা আমাদের মনের আছে। কেবল বস্তুময় জগৎ আমাদের বোধগম্য বলে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানা আমাদের সম্ভব নয়। একমাত্র আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বই নিশ্চিত। মানবিক প্রতিটি আবেগই হল এক একটি যান্ত্রিক সঞ্চালন যার একটা শুরু ও একটা শেষ আছে। যাকে আমরা কল্যাণ বলি তা হল চিত্তাবেগের (Impulse) লক্ষ্য। প্রকৃতির মত মানুষও একই নিয়মের অধীন। ক্ষমতা ও স্বাধীনতা একই কথা।
হব্স বেকনকে গুছিয়ে তুলেছেন, কিন্তু ইন্দ্রিয়ের জগত থেকে সমস্ত মানবিক জ্ঞানের উদ্ভব, বেকনের এই মূলনীতির কোন প্রমাণ দাখিল করেননি। সে প্রমাণ দেন লক তাঁর মানবিক বোধ বিষয় প্রবন্ধে।
‘বেকনীয় বস্তুবাদ আস্তিক্যবাদী কুসংস্কার ছিন্ন করেছিলেন হব্স। লকের ইন্দ্রিয়বাদের মধ্যে যে ধর্মতত্ত্বের অবশেষ তখনও থেকে গিয়েছিল তাকে একই ভাবে ছিন্ন করেন কলিন্স, ডডওয়েল, কাউয়ার্ড, হার্টিলি, প্রিস্টলি। ব্যবহারিক বস্তুবাদীদের পক্ষে ধর্ম থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সহজ পদ্ধতি হল শেষ পর্যন্ত Deism।
আধুনিক বস্তুবাদের ব্রিটিশ উৎস বিষয়ে এই হল মার্কসের লেখা। ইংরেজদের পূর্ব পুরুষদের মার্কস যে প্রশংসা করেছিলেন সেটা যদি আজকাল তাদের তেমন রুচিকর না লাগে তবে আক্ষেপেরই কথা। কিন্তু অস্বীকার করার জো নেই যে, বেকন, হব্স, লকই হলেন ফরাসি বস্তুবাদীদের সেই চমৎকার ধারাটির জনক। যার দরুন ফরাসিদের ওপর ইংরেজ ও জার্মানরা স্থল ও নৌযুদ্ধে যত জয়লাভই করুক না কেন, অষ্টাদশ শতাব্দী পরিণত হয় প্রধানত এক ফরাসি শতাব্দীতে এবং তা হয় পরিণামের সেই ফরাসি বিপ্লবেরও আগে যার ফলশ্রুতি ইংল্যান্ড ও জার্মানির আমরা, বাইরের লোকেরা, আজও পর্যন্ত আত্মস্থ করতে চেষ্টিত।
এ কথা অনস্বীকার্য। এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিদগ্ধ যে বিদেশিরা ইংল্যান্ডে এসে বসবাস শুরু করেছেন তাঁদের প্রত্যেকেরই যে জিনিসটা চোখে পড়েছে সেটাকে তাঁরা ভদ্র ইংরেজ মধ্য শ্রেণির ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নির্বুদ্ধিতা গণ্য করতে বাধ্য। আমরা সেই সময়ে সকলেই ছিলাম নয় অন্ততপক্ষে অতি র্যা ডিক্যাল স্বাধীন-চিন্তক, এবং ইংল্যান্ডের প্রায় সমস্ত শিক্ষিত লোকেই যে যত রকম অসম্ভাব্য অলৌকিকত্বে বিশ্বাস করবেন, বাকল্যান্ড ও মানটেলের মতো ভূতাত্ত্বিকরাও বিজ্ঞানের তথ্যকে বিকৃত করে বিশ্বসৃষ্টির পুরান কাহিনীর সঙ্গে খুব বেশি সংঘর্ষের মধ্যে যেতে চাইবেন না, তা আমাদের কাছে অকল্পনীয় লেগেছিল। অন্যপক্ষে ধর্মীয় প্রসঙ্গে যাঁরা স্বীয় বুদ্ধিবৃত্তি প্রয়োগে সাহসী এমন লোকের সন্ধান পেতে হলে যেতে হয় অবিদ্যানদের মধ্যে, তখন যাদের বলা হত ‘অধৌত জনগণ’ সেই তাদের মধ্যে, বিশেষ করে ওয়েনপন্থী সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে। কিন্তু অতঃপর ইংল্যান্ড ‘সুসভ্য’ হয়েছে। ১৮৫১ সালের প্রদর্শনী থেকে আত্মপর ইংরেজি বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটে। ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের আন্তর্জাতিকীকরণ হয়েছে খাদ্যে, আচার-আচরণে, ভাবনায়; এতটা পরিমাণে হয়েছে যে ইচ্ছে হয় বলি, কন্টিনেন্টের অন্যান্য অভ্যাস এখানে যেমন চালু হয়েছে তেমনি কিছু ইংরেজি আচার-ব্যবহার কন্টিনেন্টেও সমান চালু হোক। যাই হোক, স্যালাড-তেলের প্রবর্তন ও প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে (১৮৫১ সালের আগে তা কেবল অভিজাতদের কাছেই সুবিদিত ছিল) ধর্ম বিষয়ে কন্টিনেন্টসুলভ সন্দেহবাদের একটা মারাত্মক প্রসার ঘটেছে; এবং তা এতদূর গড়িয়েছে যে, চার্চ অব ইংল্যান্ডের মত ঠিক অতটা ‘এই-তো-চাই’ বলে এখনও গণ্য না হলেও অজ্ঞেয়বাদ শালীনতার দিক থেকে প্রায় ব্যাপটিস্ট সম্প্রদায়ের সমতুল্য এবং নিশ্চিতই ‘স্যালভেশন আর্মি’র চেয়ে উচ্চে। না ভেবে পারি না যে, এই অবস্থায় অধর্মের এ প্রসারে যাঁরা আন্তরিকভাবেই ক্ষুব্ধ ও তার নিন্দা করেন, তাঁরা এই জেনে সান্ত¡না পেতে পারেন যে, এই সব নয়া হালফিল ধারণাগুলি বিদেশি বস্তু নয়, দৈনন্দিন ব্যবহারের বহু সামগ্রীর মতো Made in Germany বস্তু নয়, বরং নিঃসন্দেহে তা সাবেকি বিলাতি এবং উত্তরপুরুষেরা এখন যতটা সাহস করে না দু’শো বছর আগে তার চেয়েও অনেক দূর এগিয়েছিলেন তাঁদের ব্রিটিশ আদিপুরুষেরা।
বস্তুতপক্ষে, ‘সসঙ্কোচ’ বস্তুবাদ ছাড়া অজ্ঞেয়বাদ আর কী? প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞেয়বাদীদের ধারণা বস্তুবাদী। সমগ্র প্রকৃতি জগত নিয়ম-চালিত, বাইরে থেকে তার ক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের কথা একেবারে ওঠে না। কিন্তু অজ্ঞেয়বাদী যোগ করে জ্ঞাত বিশ্বের অতিরিক্ত কোনো পরম সত্তার অস্তিত্ব নিরূপণের অথবা খন্ডনের কোন উপায় আমাদের নেই। এ কথা হয়তো বা খাটতো সেকালে যখন সেই মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানীর Mecanique celeste স্রষ্টার উল্লেখ নেই কেন, নেপোলিয়নের এ প্রশ্নে লাপ্লাস সগর্বে জবাব দেন, “Je navais pas besoin de cette hypotheses”। কিন্তু আজকাল বিশ্বের বিবর্তনী ধারণার স্রষ্টা বা নিয়ন্ত্রতার কোন স্থান নেই; সমগ্র বর্তমান বিশ্ব থেকে পরিবিচ্ছিন্ন এক পরম সত্তার কথা বলা স্ববিরোধসূচক, এবং আমাদের মনে হয় ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের প্রতি একটা অকারণ অপমান।
অথচ, আমাদের অজ্ঞেয়বাদী মানেন যে, জ্ঞানের ভিত্তি হল ইন্দ্রিয়দত্ত সংবাদ। কিন্তু অজ্ঞেয়বাদী যোগ করেন ইন্দ্রিয়ের মারফত যে বস্তুর বোধ হচ্ছে তার সঠিক প্রতিচ্ছবিই যে ইন্দ্রিয় আমাদের দিয়েছে তা জানলাম কী করে? অতঃপর অজ্ঞেয়বাদী আমাদের জানিয়ে দেন, বস্তু বা তার গুণের কথা তিনি যখন বলেন তখন তিনি আসলে সেই সব বস্তু বা গুণের কথা বলছেন না, নিশ্চিত করে তার কিছু জানা সম্ভব নয়, স্বীয় ইন্দ্রিয়ের ওপর তারা যে ছাপ ফেলেছে শুধু তারই কথা বলছেন। এ ধরনের কথাকে কেবল যুক্তি বিস্তার করে হারান বোধ হয় সত্যিই শক্ত। কিন্তু যুক্তি বিস্তারের আগে হল ক্রিয়া। Im An fang war die That। এবং মানবিক প্রতিভা কর্তৃক এ সমস্যা আবিষ্কারের আগেই মানবিক কর্ম দ্বারা তার সমাধান হয়ে গেছে। পুডিংয়ের প্রমাণ তার ভক্ষণে। এই সব বস্তুর অনুভূত গুণাগুণ অনুসারে বস্তুটা আমাদের কাজে লাগালেই আমাদের অনুভূতিগুলির সঠিকতা বা বেঠিকতার একটা যাচাই হয়ে যায়। আমাদের এই অনুভূতিগুলি যদি ভুল হত, তাহলে সে বস্তুর ব্যবহার যোগ্যতা সম্পর্কে আমাদের হিসাবও ভুল হতে বাধ্য এবং সব চেষ্টা বিফল হত। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য সফল করতে যদি আমরা সক্ষম হই, যদি দেখা যায় যে, বস্তুটা সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা তার সঙ্গে সে বস্তু মিলছে, বস্তুটার কাছ থেকে যে আশা করছি তা হাসিল হচ্ছে, তাহলে পরিষ্কার প্রমাণ হয়ে যায় যে, সে বস্তু এবং তার গুণাগুণ সম্পর্কে আমাদের অনুভূতি ততটা পর্যন্ত মিলে যাচ্ছে আমাদের বহিঃস্থিত বাস্তবের সঙ্গে। যদি বা বিফলতার সম্মুখীন হই, তাহলে সে বিফলতার কারণ বার করতে দেরি হয় না; দেখা যায় যে অনুভূতির ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি সেটা হয় অসম্পূর্ণ ও ভাসাভাসা, নয় অন্যান্য অনুভূতির ফলাফলের সঙ্গে তাকে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে যা অসঙ্গত- একে আমরা বলি যুক্তির ত্রুটি। ইন্দ্রিয়গুলিকে ঠিকমতো পরিশীলিত ও ব্যবহৃত করতে এবং সঠিকভাবে গৃহীত ও সঠিকভাবে ব্যবহৃত অনুভূতির দ্বারা নির্দিষ্ট আওতার মধ্যে কর্মকে সীমাবদ্ধ রাখতে যতক্ষণ আমরা সচেষ্ট, ততক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাবে যে, আমাদের কর্মের ফলাফল থেকে অনুভূত বস্তুর কর্তা-নিরপেক্ষ (Objective) প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের অনুভূতির মিল প্রমাণিত হচ্ছে। এযাবৎ একটি দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়নি যাতে এই সিদ্ধান্তে আসতে হয় যে বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয়ানুভূতিগুলি দ্বারা আমাদের মনে বহির্জগত সম্পর্কে যে ধারণা উপার্জিত হচ্ছে তা তৎপ্রকৃতিগতভাবেই বাস্তব থেকে বিভিন্ন কিংবা বহির্জগত ও সে বিষয়ে আমাদের ইন্দ্রিয়ানুভূতির মধ্যে একটা অনিবার্য গরমিল বর্তমান।
কিন্তু তখন আসেন নয়া-কান্টপন্থী অজ্ঞেয়বাদীরা এবং বলেন: হ্যাঁ একটা বস্তুর গুণাগুণ বোধ আমাদের সঠিক হতে পারে, কিন্তু কোন ইন্দ্রিয়গত ও মনোগত প্রকরণেই প্রকৃত-বস্তুটাকে (think-in-itself) আমরা ধরতে পারি না। এই প্রকৃত-বস্তু আমাদের জ্ঞান সীমার বাইরে। এবং উত্তরে হেগেল বহু পূর্বেই বলেছিলেন: একটা বস্তুর সমস্ত গুণই যদি জানা যায় তাহলে বস্তুটাকেও জানা হল; বাকি যা রইল সেটা এই সত্য ছাড়া কিছুই নয় যে, বস্তুটা আমাদের বাদ দিয়েই বর্তমান; এবং ইন্দ্রিয় মারফত এই সত্যটি শেখা হলেই প্রকৃত-বস্তুটির, কান্টের বিখ্যাত অজ্ঞেয় Ding an sich-এর চূড়ান্ত অবশেষটিও জানা হয়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ দেওয়া যেতে পারে যে, কান্টের কালে প্রাকৃতিক বস্তু বিষয়ে আমাদের জ্ঞান ছিল এতই টুকরো টুকরো যে, প্রত্যেকটা বস্তুর যেটুকু আমরা জানতাম তার পরেও একটা রহস্যময় ‘প্রকৃত-বস্তুর’ সন্দেহ তাঁর স্বাভাবিক। কিন্তু একের পর এক এইসব অধরা বস্তুগুলোকে ধরা হয়েছে, বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং আরও বড় কথা, পুনঃসৃষ্টি করা হয়েছে বিজ্ঞানের অতিকায় প্রগতির কল্যাণে; আর যেটাকে আমরা সৃষ্টি করতে পারি সেটাকে নিশ্চয় অজ্ঞেয় বলে গণ্য করা যায় না। এ শতকের প্রথমার্ধে জৈব-বস্তুগুলো ছিল রসায়নের কাছে এক ধরনের রহস্য-বস্তু; এখন জৈব ক্রিয়া ব্যতিরেকেই এক ধরনের রাসায়নিক মৌলিক উপাদান থেকে একের পর এক তাদের বানাতে আমরা শিখেছি। আধুনিক রসায়নবিদরা ঘোষণা করেন, যে-বস্তুই হোক না কেন তার রাসায়নিক সংবিন্যাস জানতে পারলেই মৌলিক উপাদান থেকে তাকে তৈরি করা যায়। উচ্চ পর্যায়ের জৈব বস্তুর, এ্যালবুমিন-বস্তুর সংবিন্যাস এখনও আমরা জানতে পারিনি; কিন্তু কয়েক শতাব্দী পরেও তার জ্ঞান আমাদের অর্জিত হবে না, এবং তার সাহায্যে কৃত্তিম এ্যালবুমিন তৈরি করতে পারবো না, এর কোন যুক্তি নেই। যদি তা পারি তবে সেই সঙ্গে জৈব জীবনও আমরা সৃষ্টি করতে পারবো, কেননা এ্যালবুমিন-বস্তুর অস্তিত্বের স্বাভাবিক ধরণ হল জীবন তার নিম্নতম থেকে উচ্চতর রূপ পর্যন্ত।এই সব আনুষ্ঠানিক মানসিক আপত্তি পেশ করার পরেই আমাদের অজ্ঞেয়বাদীর কথা ও কাজ একেবারে এক ঝানু বস্তুবাদীর মতো, যা তাঁর আসল স্বরূপ। অজ্ঞেয়বাদী হয়তো বলবেন আমরা যতটা জেনেছি তাতে পদার্থ ও গতিকে, আমরা বর্তমানে তার যা নাম, তেজকে (Energy) সৃষ্টিও করা যায় না, ধ্বংসও করা যায় না, কিন্তু কোন না কোন সময়ে তার সৃষ্টি হয়নি এমন প্রমাণ আমাদের নেই। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তার এই স্বীকৃতি তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে গেলেই তিনি মামলা খারিজ করে দেবেন। In abstract o (বিমূর্ত ক্ষেত্রে) আধ্যাত্মবাদ মানলেও In concerto (প্রত্যÿ ক্ষেত্রে) তা তিনি মোটেও মানতে রাজি নন। বলবেন যতদূর আমরা জানি ও জানতে পারি তাতে বিশ্বের কোন স্রষ্টা বা নিয়ন্তা নেই; আমাদের সঙ্গে যতটা সম্পর্ক তাতে পদার্থ বা তেজ সৃষ্টিও করা যায় না, ধ্বংসও করা যায় না, আমাদের ক্ষেত্রে ভাবনা হল তেজের একটা ধরন, মস্তিষ্কের একটা ক্রিয়া; যা কিছু আমরা জানি তা এই যে ক্ষেত্রে তিনি বৈজ্ঞানিক মানুষ, যে ক্ষেত্রে তিনি কোন কিছু জানেন, সে ক্ষেত্রে বস্তুবাদী; কিন্তু তাঁর বিজ্ঞানের বাইরে যে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না, সে অজ্ঞতাকে তিনি গ্রিক অনুবাদ করে বলেন agnosticism বা অজ্ঞেয়বাদ।
যাই হোক একটা জিনিস মনে হয় পরিষ্কার: আমি যদি অজ্ঞেয়বাদী হতাম তাহলেও এই ছোট বইখানিতে ইতিহাসের যে ধারণা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সেটাকে ঐতিহাসিক অজ্ঞেয়বাদ বলে বর্ণনা করা যে যেত না তা স্পষ্ট। ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা হাসাহাসি করতেন, অজ্ঞেয়বাদীরা সরোষে প্রশ্ন করতেন, আমি কি তাদের নিয়ে তামাশা শুরু করেছি? তাই আশা করি ব্রিটিশ শালীনতাবোধও অতিমাত্রায় স্তম্ভিত হবে না যদি ইংরেজি তথা অপরাপর বহু ভাষায় ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ কথাটি আমি ব্যবহার করি ইতিহাস ধারার এমন একটা ধারণা বোঝাবার জন্যে, যাতে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার মূল কারণ ও মহতী চালিকা শক্তির সন্ধান করা হয় সমাজের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্যে, উৎপাদন ও বিনিময় পদ্ধতির পরিবর্তনের মধ্যে, বিভিন্ন শ্রেণিতে সমাজের তজ্জনিত বিভাগের মধ্যে এবং সেই সব শ্রেণির পারস্পরিক সংগ্রামের মধ্যে।
এ প্রশ্রয় বোধ হয় আরও পাওয়া সম্ভব যদি দেখান যায় যে, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ব্রিটিশ শালীনতার পক্ষেও সুবিধাজনক হতে পারে। আগেই উল্লেখ করেছি যে, চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগে ইংল্যান্ডে বসবাস করতে গিয়ে বিদগ্ধ বিদেশিদের যেটা চোখে পড়ত সেটাকে তাঁরা ইংরেজ শালীন মধ্য শ্রেণির ধর্মীয় গোঁড়ামি আর নির্বুদ্ধিতা বলে গণ্য করতে বাধ্য হতেন। আমি এবার প্রমাণ করতে চাই যে, বিদগ্ধ বিদেশিদের কাছে সে সময় শালীন ইংরেজ মধ্য শ্রেণি ঠিক যতটা নির্বোধ বলে মনে হত ততটা নির্বোধ তারা ছিল না। তাদের ধর্মীয় প্রবণতার ব্যাখ্যা আছে।
ইউরোপ যখন মধ্যযুগ থেকে উত্থিত হয় তখন শহরের উদীয়মান মধ্য শ্রেণি ছিল তার বিপ্লবী অংশ। মধ্যযুগীয় সামন্ত সংগঠনের মধ্যে তারা একটা সর্বজনস্বীকৃত প্রতিষ্ঠা অর্জন করে নিয়েছিল, কিন্তু সে প্রতিষ্ঠাও তার বর্তমান ক্ষমতার তুলনায় অতি সংকীর্ণ হয়ে পড়ে; মধ্য শ্রেণির bourgeoisie-র বিকাশের সামন্ত ব্যবস্থার সংরক্ষণ খাপ খাচ্ছিল না; সুতরাং সামন্ত ব্যবস্থার পতন হতে হল।
কিন্তু সামন্ততন্ত্রের বিরাট আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ছিল রোমান ক্যাথলিক চার্চ। অভ্যন্তরীণ যুদ্ধাদি সত্ত্বেও তা সমগ্র সামন্ততান্ত্রিক প্রতীচ্য ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ করে এক বিরাট রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এবং তা ছিল যেমন স্খিস্মাটিক গ্রিক দেশগুলির বিরুদ্ধে তেমনি মুসলিম দেশগুলির বিরুদ্ধে। সামন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে চার্চ স্বর্গীয় আশীর্বাণীর জ্যোতিঃভূষিত করে। সামন্ত কায়দায় এ চার্চ নিজ যাজকতন্ত্রের সংগঠন করে এবং শেষত, এ চার্চ নিজেই ছিল এর প্রবলতম সামন্ত অধিপতি, ক্যাথলিক জগতের পুরো এক-তৃতীয়াংশ জমি ছিল এর দখলে। দেশে দেশে এবং সবিস্তারে অপবিত্র সামন্ততন্ত্রকে সফলভাবে আক্রমণ করার আগে তার এই পবিত্র কেন্দ্রীয় সংগঠনটিকে বিনষ্ট করার দরকার ছিল।
তাছাড়া মধ্য শ্রেণির অভ্যুদয়ের সমান্তরালে শুরু হয় বিজ্ঞানের বিপুল পুনরুজ্জীবন; জ্যোতির্বিজ্ঞান, বলবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, শরীরস্থান, শরীরবৃত্তের চর্চা ফের শুরু হয়। শিল্পোৎপাদনের বিকাশে বুর্জোয়াদের দরকার ছিল একটা বিজ্ঞানের যাতে প্রাকৃতিক বস্তু দৈহিক গুণাগুণ এবং প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের ক্রিয়া-পদ্ধতি নিরূপিত করা যায়। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞান হয়ে ছিল গির্জার বিনীত সেবাদাসী, খৃষ্ট বিশ্বাসের আরোপিত সীমা তাকে লঙ্ঘন করতে দেওয়া হত না, সেই কারণে তা আদৌ বিজ্ঞানই ছিল না। বিজ্ঞান বিদ্রোহ করল গির্জার বিরুদ্ধে; বিজ্ঞান ছাড়া বুর্জোয়ার চলছিল না, তাই সে বিদ্রোহে যোগ দিতে হল তাকে।
প্রতিষ্ঠিত ধর্মের সঙ্গে উদীয়মান মধ্য শ্রেণি যে কারণে সংঘাতে আসতে বাধ্য তার শুধু দুটি ক্ষেত্রের উল্লেখ করলেও এটা দেখানোর পক্ষে তা যথেষ্ট যে, প্রথম, রোমান চার্চের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ স্বার্থ ছিল বুর্জোয়া শ্রেণির; এবং দ্বিতীয়ত, যে সময় সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিটি সংগ্রামকেই নিতে হত ধর্মীয় ছদ্মবেশ, পরিচালিত করতে হত সর্বাগ্রে চার্চের বিরুদ্ধে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শহরের ব্যবসায়ীরা কলরবের সূত্রপাত করলেও প্রবল সাড়া পাওয়া নিশ্চিত ছিল এবং পাওয়া যায় ব্যাপক গ্রামবাসীদের মধ্যে, চাষিদের মধ্যে- আধ্যাত্মিক ও ইহজাগতিক সামন্ত প্রভুদের বিরুদ্ধে যাদের সর্বত্র সংগ্রাম করতে হত নিতান্তই প্রাণধারণের জন্যেই।
সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে বুর্জোয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের পরিণতি হয় তিনটি চূড়ান্ত মহাযুদ্ধে।
প্রথমটিকে বলা হয় জার্মানির প্রটেস্টান্ট রিফর্মেশন। চার্চের বিরুদ্ধে লুথার যে রণধ্বনি তোলেন তাতে সাড়া দেয় দুটি রাজনৈতিক চরিত্রের অভ্যুত্থান: প্রথমে ফ্রানৎস ফন জিকিঙ্গেনের নেতৃত্বে নিম্ন অভিজাতদের অভ্যুত্থান (১৫২৩), পরে- ১৫২৫ সালে- মহান কৃষক যুদ্ধ। দুটিই পরাজিত হয় প্রধানত যে দলগুলির সবচেয়ে বেশি স্বার্থ, শহরের সেই বার্গারদের অনিশ্চিতমতির ফলে, এ অনিশ্চিতমতির কারণ নিয়ে এখানে আলোচনা করা চলে না। সেই সময় থেকে স্থানীয় রাজন্যদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শক্তির লড়াইয়েতে সে সংগ্রামের অধঃপতন ঘটে এবং তার পরিণতি হয় ইউরোপের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় জাতিগুলির ভেতর থেকে দু’শো বছরের জন্য জার্মানিকে মুছে দেওয়া। লুথারীয় রিফর্মেশন থেকে সৃষ্টি হয় এক নতুন ধর্মমত, স্বৈরশক্তি রাজতন্ত্রেরই উপযোগী একটা ধর্ম। উত্তর-পূর্ব জার্মানির কৃষকরা লুথারবাদ গ্রহণ করতে না পারলেও স্বাধীন লোক থেকে তারা পরিণত হয় ভূমিদাসে।
কিন্তু লুথার যেখানে পরাজিত হলেন যেখানে জয়ী হলেন কালভাঁ। কালভাঁ-এর ধর্মমত ছিল তাঁর কালের সবচেয়ে সাহসী বুর্জোয়াদের উপযোগী। প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক জগতে সাফল্য অসাফল্য মানুষের কর্ম বা বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে তার সাধ্যাতীত পরিস্থিতির ওপর, এই ঘটনাটার এক ধর্মীয় প্রকাশ হল তাঁর ঐশ্বরিক নির্বন্ধ (Predestination) মতবাদ। অভিপ্রায় সেটা আমার নয়, কর্ম সেটা আমার নয়, উচ্চতর অজানা অর্থনৈতিক শক্তির কৃপায়; এটা সবিশেষ সত্য ছিল অর্থনৈতিক বিপ্লবের সেই এক যুগের যখন সমস্ত পুরানো বাণিজ্য পথ ও কেন্দ্রের জায়গায় আসছে নতুন পথ, নতুন কেন্দ্র, যখন ভারত ও আমেরিকা উন্মুক্ত হয়েছে দুনিয়ার কাছে এবং তখন বিশ্বাসের পবিত্রতম অর্থনৈতিক মানদন্ড যথা সোনা রূপার দামও টলতে শুরু করেছে, ভেঙ্গে পড়ছে। কালভাঁ-এর গির্জা-গঠনতন্ত্র পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিক। এবং ঈশ্বরের রাজত্ব যেখানে প্রজাতান্ত্রিক করে দেওয়া হয়েছে, সেখানে ইহজাগতিক রাজ্য কি থাকতে পারে রাজরাজড়া, বিশপ আর সামন্তপ্রভুদের অধীনে? জার্মান লুথারবাদ সেই ক্ষেত্রে রাজন্যদের হাতের পাঁচ হয়ে রইল সে ক্ষেত্রে কালভাঁবাদ হল্যান্ডে প্রতিষ্ঠা করলো একটি প্রজাতন্ত্রের এবং ইংল্যান্ডে সর্বোপরি স্কটল্যান্ডে সৃষ্টি করল সক্রিয় প্রজাতান্ত্রিক পার্টির।
কালভাঁবাদের মধ্যে দ্বিতীয় মহান বুর্জোয়া অভ্যুত্থান পেল তার তৈরি মতবাদ। এ অভ্যুত্থান ঘটে ইংল্যান্ডে। শহরের মধ্য শ্রেণি (বুর্জোয়া) তাকে শুরু করে আর গ্রামাঞ্চলের চাষিরা (Yeomanry) তা লড়ে শেষ করে। মজার ব্যাপার এই যে মহান তিনটি বুর্জোয়া অভ্যুত্থানেই লড়াইয়ের সৈন্যবাহিনী যোগায় কৃষক সম্প্রদায়, অথচ জয়লাভ হবার পরেই সে জয়লাভের অর্থনৈতিক ফলাফল অনিশ্চিত যারা ধ্বংস হতে বাধ্য তারা হল এই কৃষকেরাই। ক্রমওয়েলের একশ বছর পরে ইংল্যান্ডের কৃষককূল প্রায় অদৃশ্য হয়। মোটের ওপর কৃষককূল ও শহরের প্লেবিয়ান অংশ না থাকলে একা বুর্জোয়ারা কখনই চরম পরিণতি পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেত না এবং ফাঁসির মঞ্চে কখনও এনে দাঁড় করাত না প্রথম চার্লসকে। বুর্জোয়ার যে সমস্ত প্রতিষ্ঠা তখন অর্জনযোগ্য হয়ে উঠেছে সেইগুলো লাভ করতে হলেও বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় বহুদূর পর্যন্ত- ঠিক ১৭৯৩ সালে ফ্রান্স এবং ১৮৪৮ সালে জার্মানির মতো। বস্তুত এ যেন বুর্জোয়া সমাজের একটা ক্রমবিকাশের নিয়ম বলেই গণ্য হয়।বিপ্লবী ক্রিয়াকলাপের এই আধিক্যের পর অবশ্যই আসে অনিবার্য প্রতিক্রিয়া এবং যে পর্যন্ত সে প্রতিক্রিয়ার থাকা সম্ভব ছিল তাও এবার তার ছাড়িয়ে যাবার পালা। একাদিক্রমে এদিক ওদিক দোলার পর অবশেষে পাওয়া যায় নতুন ভারকেন্দ্র এবং তা থেকে হয় একটা নতুন সূচনা। ইংল্যান্ডে ইতিহাসের যে সমারোহী যুগটা ভদ্রসম্প্রদায়ের কাছে ‘বৃহৎ বিদ্রোহ’ নামে পারিচিত সেই যুগ ও তার পরবর্তী সংগ্রামগুলির অবসান হয় অপেক্ষাকৃত তুচ্ছ এক ঘটনায়, উদারনৈতিক ঐতিহাসিকেরা যার নাম নাম দিয়েছেন ‘গৌরবোজ্জ্বল বিপ্লব’।
নতুন সূচনাটি হল উদীয়মান মধ্য শ্রেণি ও ভূতপূর্ব সামস্ত জমিদারদের মধ্যে আপোস। এখনকার মতো এ জমিদারদের অভিজাত বলা হলেও বহু আগে থেকেই তাঁরা সেই পথ নিয়েছিল যাতে তারা হয়ে ওঠে বহু পরবর্তী যুগের ফ্রান্সের লুই ফিলিপের মতো ‘রাজ্যের প্রথম বুর্জোয়া’। ইংল্যান্ডের পক্ষে সৌভাগ্যবসত গোলাপের যুদ্ধের সময় প্রাচীন সামন্ত ব্যারনরা পরস্পরকে নিধন করেছিল। তাদের উত্তরাধিকারীরা অধিকাংশই প্রাচীন বংশোদ্ভূত হলেও প্রত্যক্ষ বংশধারা থেকে এতই দূরে যে, তারা একটা নতুন সম্প্রদায় হয়ে ওঠে, তাদের যা অভ্যাস ও মনোবৃত্তি সেটা সামন্ততান্ত্রিক নয়, হয়ে ওঠে বহু পরিমাণে বুর্জোয়া। টাকার দাম তারা বেশ বুঝতো এবং অবিলম্বেই ছোট ছোট ক্ষুদে চাষিকে উচ্ছেদ করে সে জায়গায় ভেড়া রেখে তারা খাজনা বেশি তুলতে শুরু করে। অষ্টম হেনরি গির্জার জমি অপব্যয় করে পাইকারি হারে নতুন নতুন বুর্জোয়া জমিদার সৃষ্টি করেন; অসংখ্য মহালের বাজেয়াপ্তি ও একেবারে ভুঁইফোড় বা আধা ভুঁইফোড়দের নিকট তা ফের বিলি, গোটা সপ্তদশ শতাব্দী ধরে যা চলে একই ফল হয়। সুতরাং সপ্তম হেনরির সময় থেকে ইংরেজ অভিজাতরা শিল্প উৎপাদনের বিকাশে বাধা দেবার বদলে উল্টে তা থেকেই মুনাফা তোলার চেষ্টা করেছে; এবং চিরকালই বড়ো বড়ো জমিদারদের এমন একটা অংশ ছিল যারা অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কারণে মহাজনী ও শিল্পজীবী বুর্জোয়ার সঙ্গে সহযোগিতায় ইচ্ছুক। ১৬৮৯ সালের আপোস তাই সহজেই সাধিত হয়। ‘অর্থ ও পদমর্যাদার’ রাজনৈতিক বখরা রইল বড়ো বড়ো জমিদার বংশের জন্য এই শর্তে যে, মহাজনী কারখানাজীবী ও বাণিজ্যিক মধ্য শ্রেণির অর্থনৈতিক স্বার্থ যথেষ্ট দেখা হবে। এবং সে সময় দেশের সাধারণ নীতি নির্দেশ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল এই সব অর্থনৈতিক স্বার্থ। খুঁটিনাটি ব্যাপারে ঝগড়া হয়তো হত, কিন্তু মোটের ওপর অভিজাত গোষ্ঠীতন্ত্র খুব ভালোই জানতো যে, তার নিজস্ব অর্থনৈতিক উন্নতি অনিবার্যরূপে ছড়িয়ে আছে শিল্পজীবী ও বাণিজ্যিক মধ্য শ্রেণির উন্নতির সঙ্গে।
সেই সময় থেকে ইংল্যান্ডের শাসক শ্রেণির একটা কিন্তু তথাপি স্বীকৃত অংশ হল বুর্জোয়ারা। অন্যান্য শাসক শ্রেণির সঙ্গে এদেরও সমান স্বার্থ ছিল দেশের বিপুল মেহনতিজনকে বশে রাখা। বণিক বা কারখানা-মালিক (manufacturer) নিজেই হল তার কেরানি, তার মজুর, তার বাড়ির চাকরবাকরদের কাছে প্রভু, বা কিছু আগে পর্যন্তও যা বলা হত ‘স্বতঃই ঊর্ধ্বতন’। তাদের কাছ থেকে যথাসাধ্য বেশি ও যথাসাধ্য ভাল কাজ আদায় করাই তার স্বার্থ; সে উদ্দেশ্যে ঠিকমতো বাধ্যতার শিক্ষায় তাদের শিক্ষিত করতে হবে। নিজেও সে ধর্মভীরু; তার ধর্মের পতাকা নিয়েই সে রাজা ও ভূস্বামীদের সঙ্গে লড়েছে; স্বতঃই-অধস্তনদের মনের ওপর প্রভাব ফেলে, ঈশ্বরস্থাপিত প্রভুটির আদেশাধীন করে তোলার দিক থেকে এ ধর্ম যে সুবিধা দান করেছে তা আবিষ্কার করতে তার দেরি হয়নি। সংক্ষেপে ‘ছোট লোকদের’ দেশের বিপুল উৎপাদক জনগণকে দাবিয়ে রাখার কাজে ইংরেজ বুর্জোয়াকে এবার একটা অংশ নিতে হচ্ছে এবং সে উদ্দেশ্য প্রযুক্ত অন্যতম একটা উপায় হল ধর্মের প্রভাব।
আর একটা ঘটনাও ছিল যাতে বুর্জোয়াদের ধর্মীয় প্রবণতা বেড়েছে। সেটা হল ইংল্যান্ডে বস্তুবাদের উত্থান। এই নতুন মতবাদ মধ্য শ্রেণির ধর্মানুভূতিতেই শুধু ঘা দেয়নি; বুর্জোয়া সমেত বিপুল অশিক্ষিত জনগণের যাতে বেশ চলে যায় সেই ধর্মের বিপরীতে এ মতবাদ নিজেকে জাহির করলো কেবল দর্শন বলে যা বিশ্বের পন্ডিত বিদগ্ধ জনদেরই যোগ্য। হব্স-এর হাতে বস্তুবাদ মঞ্চে আসে রাজকীয় অধিকার ও ক্ষমতার সমর্থক হিসাবে। স্বৈরশক্তি রাজতন্ত্রকে তা আহ্বান করে সেই puer robustus sed malitiosus অর্থাৎ জনগণকে দমন করতে। একইভাবে হব্স-এর পরবর্তীদের- বলিংব্রক, শ্যাফ্টস্বেরি ইত্যাদির কাছে বস্তুবাদের নতুন deistic ধারাটা থেকে যায় একটা অভিজাত, অধিকার-ভেদী (esoteric) মতবাদ হিসাবে এবং সেহেতু মধ্য শ্রেণির কাছে তা ঘৃণ্য হয়, তার ধর্মীয় অস্বীকৃতি ও বুর্জোয়া বিরোধী রাজনৈতিক যোগাযোগ উভয় কারণেই। এইভাবে, অভিজাতদের deism ও বস্তুবাদের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল মধ্য শ্রেণির প্রধান শক্তি যোগাতে থাকলো সেই সব প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়েরাই যারা রণপতাকা ও সংগ্রামী বাহিনী যুগিয়েছিল স্টুয়ার্টদের বিরুদ্ধে, ‘মহান উদারনৈতিক পার্টির মেরুদন্ড’ আজও পর্যন্ত তারাই।
ইতিমধ্যে ইংল্যান্ড থেকে বস্তুবাদ চলে যায় ফ্রান্সে, সেখানে আর একটি বস্তুবাদী দার্শনিক ধারার, কার্থেজিয়ানবাদের একটি শাখার সংস্পর্শে সে আসে এবং তার সঙ্গে মিশে যায়। ফ্রান্সেও প্রথম দিকে বস্তুবাদ থাকে একটি অভিজাত মতবাদ হিসাবে। কিন্তু অচিরেই তার বিপ্লবী চরিত্র আত্মপ্রকাশ করল। ফরাসি বস্তুবাদীরা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই সমালোচনা সীমাবদ্ধ রাখল না; তৎকালীন বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা কিছু সামনে পড়ল সবেতেই প্রসারিত করলো তাদের সমালোচনা; তাদের মতবাদের সর্বজনীন প্রয়োগযোগ্যতার দাবি প্রমাণের জন্য সংক্ষিপ্ততম পন্থা অবলম্বন করে সাহসের সঙ্গে তা জ্ঞানের সবকটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলো এক অতিকায় রচনা, encyclopedie-য়, যা থেকে তাদের নাম। এইভাবে খোলাখুলি বস্তুবাদ বা deism, এই দুই ধারার কোন না কোন একটা রূপে বস্তুবাদ হয়ে দাঁড়াল ফ্রান্সের সমগ্র সংস্কৃতিবান যুব সমাজের মতবাদ; এতটা পরিমাণে হল যে, মহান বিপ্লব যখন শুরু হয় তখন ইংরেজ রাজতন্ত্রীদের সৃষ্ট মতবাদটা থেকেই এল ফরাসি প্রজাতন্ত্রী ও সন্ত্রাসবাদীদের তাত্ত্বিক ধ্বজা, এবং ‘মানবিক অধিকার ঘোষণাপত্রের বয়ান। মহান ফরাসি বিপ্লব হল বুর্জোয়াদের তৃতীয় অভ্যুত্থান, কিন্তু এই প্রথম বিপ্লব যা ধর্মের আলখাল্লাটা একবারে ছুড়ে ফেলে এবং লড়াই চালায় অনাবরণ রাজনৈতিক ধারায়। এদিক থেকে এটা প্রথম যে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের একপক্ষের, অর্থাৎ অভিজাতদের বিনাশ এবং অন্য পক্ষের, বুর্জোয়ার পরিপূর্ণ জয়লাভ না হওয়া পর্যন্ত সত্যি করেই সে লড়াই চালিয়ে যাওয়া হয়। ইংল্যান্ডে প্রাকবিপ্লব ও বিপ্লবোত্তর প্রতিষ্ঠানাদির ধারাবাহিকতা এবং জমিদার ও পুঁজিপতিদের মধ্যে আপোসের প্রকাশ হয় আদালতী নজিরের ধারাবাহিকতায় এবং আইনের সামন্ততান্ত্রিক রূপগুলির পবিত্র সংরক্ষণে। ফ্রান্সে অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে একটা পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটায় বিপ্লব; সামন্ততন্ত্রের শেষ জেরটুকুও তা সাফ করে code civil-এর মাধ্যমে আধুনিক পুঁজিবাদী পরিস্থিতির উপযোগী করে চমৎকার খাপ খাইয়ে নেয় প্রাচীন রোমক আইনকে- মার্কস যাকে বলেছিলেন পণ্যোৎপাদন, সেই অর্থনৈতিক পর্যায়ের অনুসারী আইনি সম্পর্কের একটা প্রায় নিখুঁত প্রকাশ ছিল তাতে, -এমন চমৎকার খাপ খাইয়ে নেয় যে, এই ফরাসি বিপ্লবী বিধিসংহিতাটি আজও পর্যন্ত অন্য সব দেশের সম্পত্তি আইন সংস্কারের আদর্শস্বরূপ, ইংল্যান্ডও বাদ নয়। অবশ্য, ইংরেজি আইন যদিও পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রকাশ করেই চলেছে সেই এক বর্বর সামন্ততান্ত্রিক ভাষায় যার সঙ্গে প্রকাশিত বস্তুর ততটাই সাদৃশ্য যতটা সাদৃশ্য ইংরেজি বানানের সঙ্গে ইংরেজি উচ্চারণের-vous ecrivez Londres et vous prononcez constantinople বলেছিলেন জনৈক ফরাসি-তবুও এ কথা ভোলা ঠিক নয় যে, সেই একই ইংরেজি আইনই একমাত্র আইন যা প্রাচীন জার্মান ব্যক্তি স্বাধীনতা, স্থানীয় স্বশাসন এবং আদালত ছাড়া অন্য সমস্ত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তির সেরা অংশটিকে যুগে যুগে রক্ষা করে এসেছে এবং প্রেরণ করেছে আমেরিকা ও উপনিবেশে- স্বৈরশক্তি রাজতন্ত্রের যুগে কন্টিনেন্ট থেকে এ জিনিসটা লোপ পায় এবং এখনও পর্যন্ত কোথাও তার পূর্ণ প্রতিষ্ঠা হয়নি।আমাদের ব্রিটিশ বুর্জোয়ার কথায় ফেরা যাক। ফরাসি বিপ্লবের ফলে তার একটা চমৎকার সুযোগ হল কন্টিনেন্টের রাজতন্ত্রগুলির সাহায্যে ফরাসি নৌবাণিজ্য ধ্বংস, ফরাসি উপনিবেশ অধিকার এবং জলপথে ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতার শেষ দাবিটাকেও চূর্ণ করার। ফরাসি বিপ্লবের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ বুর্জোয়া যে লড়েছিল তার একটা কারণ এই। আর একটা কারণ, এ বিপ্লবের ধরণ-ধারণটা তার অভিরুচিকে বড়ো বেশি ছাড়িয়ে যায়- জঘন্য ‘সন্ত্রাস’ শুধু নয়, বুর্জোয়া শাসনকে চরমে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাটাই। যে অভিজাতরা ব্রিটিশ বুর্জোয়াকে আদব-কায়দা শিখিয়ে তুলেছে (ঠিক নিজেরই মতো), ফ্যাশন উদ্ভাবন করে দিয়েছে তার জন্য, যারা অফিসার জুগিয়েছে সৈন্য বাহিনীতে যা শৃঙ্খলা রক্ষা করেছে স্বদেশে, এবং নৌ-বাহিনীতে, যা জয় করে দিয়েছে ঔপনিবেশিক সম্পত্তি এবং বিদেশের নতুন নতুন বাজার- তাদের বাদ দিয়ে ব্রিটিশ বুর্জোয়ার চলে কী করে? বুর্জোয়াদের একটা প্রগতিশীলতা অবশ্য ছিল, আপসের ফলে এ সংখ্যালঘুর স্বার্থ তত বেশি দেখা হচ্ছিল না। অপেক্ষাকৃত কম সম্পন্ন মধ্য শ্রেণি দিয়ে প্রধানত তৈরি এই অংশটার সহানুভূতি ছিল বিপ্লবের প্রতি, কিন্তু পার্লামেন্টে তার ক্ষমতা ছিল না।
এভাবে বস্তুবাদ যতই হয়ে ওঠে ফরাসি বিপ্লবের মতবাদ ততই ধর্মভীরু ইংরেজ বুর্জোয়া আরও বেশি আঁকড়ে ধরে ধর্ম। জনগণের ধর্মচেতনা লোপ পেলে তার ফল কী দাঁড়ায় তা কী প্যারিস সন্ত্রাসের কালে প্রমাণিত হয়নি? বস্তুবাদ যতই ফ্রান্স থেকে আশপাশের দেশে ছড়িয়ে শক্তি সঞ্চয় করছিল অনুরূপ মতবাদ থেকে, বিশেষ করে জার্মান দর্শন থেকে, সাধারণভাবে স্বাধীন চিন্তা ও বস্তুবাদ যতই কন্টিনেন্টে প্রকৃতপক্ষে বিদগ্ধ ব্যক্তির অনিবার্য গুণস্বরূপ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল, ততই গোঁ ধরে ইংরেজ মধ্য শ্রেণি আঁকড়ে রইল তার বহুবিধ ধর্ম বিশ্বাসকে। এ সব ধর্ম বিশ্বাসের মধ্যে পারস্পরিক তফাৎ যতই থাকুক তাদের সবকটিই হল পরিষ্কার রকমের ধর্মীয়, খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস।
বিপ্লব যখন ফ্রান্সে বুর্জোয়া রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করছিল, সেই সময়ে ইংল্যান্ডে ওয়াট, আর্করাইট, কার্টরাইট প্রভৃতিরা সূচিত করে এক শিল্প বিপ্লবের, অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র তাতে পুরোপুরি সরে যায়। ভূমিজীবী অভিজাতদের চেয়ে বুর্জোয়ার সম্পদ বেড়ে উঠতে লাগল অতি দ্রুত গতিতে। খাস বুর্জোয়ার মধ্যেই মহাজনী অভিজাত, ব্যাঙ্কার প্রভৃতিদের পিছনে ঠেলে দিয়ে এগিয়ে এল কারখানা-মালিকরা। ১৬৮১ সালের আপোস এযাবৎ ক্রমশ বুর্জোয়ার অনুকূলে পরিবর্তিত হয়ে এলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পারস্পরিক অবস্থানের সঙ্গে তা আর খাপ খাচ্ছিল না। পক্ষগুলির চরিত্রেও বদল হয়েছে; ১৮৩০ সালের বুর্জোয়ারা আগের শতকের বুর্জোয়াদের চেয়ে ভয়ানক পৃথক। অভিজাতদের হাতে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে গিয়েছিল এবং নতুন শিল্পজীবী বুর্জোয়ারা দাবি-দাওয়া প্রতিরোধে যা ব্যবহৃত হচ্ছিল তা নতুন অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিহীন হয়ে দাঁড়াল। অভিজাতদের সঙ্গে একটা নতুন লড়াইয়ের প্রয়োজন পড়ল; তার পরিণতি হতে পারতো কেবলমাত্র নতুন অর্থনৈতিক শক্তির জয়লাভে। প্রথমে ১৮৩০ সালের ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে, সমস্ত প্রতিরোধ সত্ত্বেও সংস্কার আইন (Reform Act) পাশ করিয়ে নেওয়া হয়। এতে পার্লামেন্টে বুর্জোয়ারা পেল একটা শক্তিশালী ও সর্বজনস্বীকৃত প্রতিষ্ঠা। তারপর শস্য আইন বরবাদ, এতে ভূমিহীন অভিজাতদের ওপর বুর্জোয়ার বিশেষ করে তার সবচেয়ে সক্রিয় অংশ- কারখানা মালিকদের প্রাধান্য চিরকালের মত নির্দিষ্ট হয়ে গেল। বুর্জোয়ার এই সব চেয়ে বড় জয়; একান্ত নিজের স্বার্থে অর্জিত বিজয় হিসাবে এই আবার কিন্তু তার শেষ বিজয়। পরে যা কিছু সে জিতেছে তা ভাগ করে নিতে হয়েছে নতুন সামাজিক শক্তির সঙ্গে, এ শক্তি ছিল প্রথমে তার সহায় কিন্তু অচিরেই হয়ে দাঁড়াল তার প্রতিদ্বন্দ্বী।
শিল্প-বিপ্লবে বৃহৎ কারখানা মালিক পুঁজিপতিদের একটা শ্রেণি সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছিল তাদের চেয়ে বহু বেশি সংখ্যক কলজীবী শ্রমিকদের একটা শ্রেণি। যে অনুপাতে শিল্প বিপ্লব উৎপাদনের একটা শাখার পর আর একটা শাখা অধিকার করতে থাকে সে অনুপাতে এ শ্রেণি ক্রমশ সংখ্যায় বেড়ে ওঠে এবং সেই অনুপাতেই হয়ে ওঠে শক্তিশালী। ১৮২৪ সালেই এ শক্তির প্রমাণ সে দেয়- শ্রমিকদের সমিতি গঠনের নিষেধ-আইন নাকচ করতে অনিচ্ছুক পার্লামেন্টকে বাধ্য করে। সংস্কার আন্দোলনের সময়ে শ্রমিকেরা ছিল সংস্কারের দলের (Reform party) র্যা ডিক্যাল অংশ; ১৮৩২ সালের আইনে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করায় তারা জনগণের চার্টার বা সনদে নিজেদের দাবি-দাওয়া নির্দিষ্ট করে শস্য আইন বিরোধী বৃহৎ বুর্জোয়া পার্টির বিরুদ্ধে নিজেদের সংগঠিত করে এক স্বাধীন চার্টিস্ট, আধুনিককালে এই প্রথম মজুর পার্টি।
তারপর শুরু হয় ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে কন্টিনেন্টের বিপ্লবগুলি। এতে শ্রমিকজন অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা নেয় এবং অন্তত প্যারিসে তারা যেসব দাবি-দাওয়া উপস্থিত করে পুঁজিবাদী সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে তা নিশ্চিতই অননুমোদনীয়। তারপর সাধারণ প্রতিক্রিয়া। প্রথমে ১৮৪৮ সালের ১০ এপ্রিল চার্টিস্টদের পরাজয়, তারপর সেই বছরের জুনে প্যারিস শ্রমিকদের অভ্যুত্থান দমন, তারপর ইতালি, হাঙ্গেরি, দক্ষিণ জার্মানিতে ১৮৪৯ সালের বিপর্যয়, পরিশেষে ১৮৫১ সালের ২ ডিসেম্বর প্যারিসের ওপর লুই বোনাপার্টের জয়। অন্তত, কিছু কালের জন্য শ্রমিক দাবি-দাওয়ার জুজুটাকে দমন করা গেল, কিন্তু কী মূল্য দিয়ে! সাধারণ লোককে ধর্মভীরু করে রাখার প্রয়োজনীয়তা যদি ব্রিটিশ বুর্জোয়ারা আগেই বুঝে থাকে তবে এত সব অভিজ্ঞতার পর তারা সে প্রয়োজনীয়তা আরও কত বেশিই না টের পাচ্ছে! কন্টিনেন্টি ভায়াদের বিদ্রূপের পরোয়া না করে তারা নিম্ন শ্রেণির মধ্যে বাইবেলের প্রচারের জন্যে হাজার হাজার টাকা খরচ করে চলেছে; নিজেদের স্বদেশি ধর্মযন্ত্রে তুষ্ট না হয়ে তারা আবেদন জানিয়েছে ধর্ম ব্যবসার বৃহত্তম সংগঠক জোনাথন ভাইদের কাছে এবং আমেরিকা থেকে আমদানি করছে রিভাইভ্যালিজন, মুডি স্যাঙ্কি প্রভৃতিদের; এবং পরিশেষে ‘স্যালভেশন আর্মির’ বিপজ্জনক সাহায্যও গ্রহণ করেছে- এটা আদি খৃষ্ট ধর্মের প্রচার ফিরিয়ে আনছে, সেরা অংশ হিসাবে আবেদন করে গরিবদের কাছে, পুঁজিবাদের সঙ্গে লড়ে ধর্মের মধ্যে দিয়ে এবং এইভাবে আদি খৃষ্টীয় শ্রেণি বৈরিতার একটা বীজ লালন করে তুলছে, যে সম্পন্ন লোকরা আজ এর জন্যে নগদ টাকা ধার দিচ্ছে তাদের কাছে যা হয়তো একদিন মুশকিল বাধাবে।
মনে হয় এ যেন ঐতিহাসিক বিকাশের একটা নিয়ম যে, মধ্যযুগে সামন্ত অভিজাতরা যে-ভাবে একান্তরূপে নিজেদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রেখেছিল, কোন ইউরোপীয় দেশেই বুর্জোয়ারা সেভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা রাখতে পারবে না- অন্তত বেশ কিছু দিনের জন্যে। এমনকি সামন্ততন্ত্র যেখানে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়েছে সেই ফ্রান্সেও বুর্জোয়ারা সমগ্রভাবে সরকারের পুরো দখল পেয়েছে কেবল অতি স্বল্প কতকগুলি সময়ের জন্য। ১৮৩০-১৮৪৮ সালে ল্ইু ফিলিপ-এর রাজত্বকালে বুর্জোয়াদের একটি ক্ষুদ্র অংশই রাজ্য চালায়; যোগ্যতার কড়া শর্তের ফলে তাদের বড় অংশটাই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের আমলে, ১৮৪৮-১৮৫১ সালের মধ্যে সমগ্র বুর্জোয়াই শাসন চালায়, কিন্তু কেবল তিন বছরের জন্য; তাদের অক্ষমতায় এলো দ্বিতীয় সাম্রাজ্য। মাত্র এখন তৃতীয় প্রজাতন্ত্রেই বুর্জোয়ারা সরকারের কর্ণধার হয়ে আছে কুড়ি বছরেরও বেশি কাল, এবং ইতিমধ্যেই তাদের অবক্ষয়ের শুভলক্ষণ ফুটে। বুর্জোয়াদের একটি স্থায়ী শাসন সম্ভব হয়েছে কেবল আমেরিকার মত দেশে, যেখানে সামন্ততন্ত্র অজানা এবং সমাজ প্রথম থেকেই শুরু হয় বুর্জোয়া ভিত্তিতে। এবং এমনকি ফ্রান্স ও আমেরিকাতেও বুর্জোয়াদের উত্তরাধিকারী শ্রমিক জনগণ ইতিমধ্যেই দ্বারে করাঘাত শুরু করেছে।ইংল্যান্ডে বুর্জোয়াদের কখনোই একক অধিকার ছিল না। ১৮৩২ সালের বিজয়েও ভূমিজীবী অভিজাতদের হাতে প্রধান প্রধান সরকারি পদের প্রায় পূর্ণ দখল ছিল। ধনী মধ্য শ্রেণি যেরূপ বিনয়ে এটা মেনে নেয় তা আমাদের কাছে দুর্বোধ্য ছিল ততদিন পর্যন্ত যতদিন না উদারনীতিক বৃহৎ কলওয়ালা মিঃ ডবলিউ এ. ফস্টার প্রকাশ্য ভাষণে ব্রাডফোর্ডের যুব সম্প্রদায়কে জানান, দুনিয়ায় চলতে গেলে ফরাসি শিখতে হবে এবং নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ক্যাবিনেটে মন্ত্রী হিসাবে তাঁকে যখন এমন একটা মহলে চলাফেরা করতে হত সেখানে ফরাসি ভাষা অন্তত ইংরেজি ভাষার মতোই জরুরি, তখন তাকে কী আহাম্মকই না লাগত। আসলে তখনকার ইংরেজ মধ্য শ্রেণি ছিল সাধারণত একেবারে অশিক্ষিত ভুঁইফোঁড়, অভিজাতদের তারা উচ্চতর সরকারি সেই সব পদ না দিয়ে পারত না যেখানে ব্যবসায়ী চতুরতায় পোক্ত একটা নিতান্ত গন্ডি সঙ্কীর্ণতা ও গন্ডি অহমিকা ছাড়াও অন্য যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল। এমনকি তখনও মধ্য শ্রেণির শিক্ষা বিষয়ে সংবাদপত্রের অনবসান বিতর্ক থেকে দেখা যায়, ইংরেজ মধ্য শ্রেণি তখনও নিজেকে সেরা শিক্ষার যোগ্য বলে মনে করছে না, কিছু কম-সমের দিকেই তার চোখ। সুতরাং শস্য আইন বাতিল করার পরেও এ যেন স্বাভাবিক যে, কবডেন, ব্রাইট, ফস্টার প্রভৃতি যে লোকেরা জিতল তারা দেশের সরকারি শাসনের অংশ থেকে বঞ্চিত রইল পরবর্তী কুড়ি বছর পর্যন্ত যতদিন না নতুন একটা সংস্কার আইনে ক্যাবিনেটের দ্বার উন্মুক্ত হয় তাদের জন্য। ইংরেজ বুর্জোয়ারা আজও পর্যন্ত তাদের সামাজিক হীনতাবোধে এত বেশি আচ্ছন্ন যে, সমস্ত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তারা যোগ্যরূপে জাতির প্রতিনিধিত্বের জন্য স্বীয় খরচায় এবং জাতির খরচায় একদল শোভাবর্ধক নিষ্কর্মার প্রতিপালন করে চলেছে; এবং নিজেদের দ্বারাই তৈরি করা এই অধিকারী ও সুবিধাভোগী মহলে নিজেদের কেউ যখন প্রবেশাধিকারের যোগ্য বিবেচিত হয় তখন ভয়ানক সম্মানিত বোধ করে তারা।
সুতরাং শিল্পজীবী ও বাণিজ্যিক মধ্য শ্রেণি রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে ভূমিজীবী অভিজাতদের সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করতে না করতে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটল আর একটি প্রতিদ্বন্দ্বী- শ্রমিক শ্রেণির। চার্টিস্ট আন্দোলন ও কন্টিনেন্টের বিপ্লবগুলির পরেকার প্রতিক্রিয়া তথা ১৮৪৮-১৮৬৬ সালের ব্রিটিশ বাণিজ্যের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে (স্থূলভাবে বলা হয় একমাত্র স্বাধীন বাণিজ্যই তার কারণ, তার চেয়েও কিন্তু অনেক বড় কারণ রেলপথ, সমুদ্র জাহাজ ও সাধারণভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপুল বিস্তার) শ্রমিক শ্রেণিকে ফের উদারনীতিক দলের অধীনে যেতে হয়- প্রাক চার্টিস্ট যুগের মত তারা হয় এ দলের র্যা ডিক্যাল অংশ। তাদের ভোটাধিকারের দাবি কিন্তু ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে; উদারনীতিকদের হুইগ নেতারা যে-ক্ষেত্রে ভয় পায় সে-ক্ষেত্রে ডিজরেলি তাঁর উৎকর্ষের প্রমাণ দিয়ে টোরিদের পক্ষে অনুকূল মুহূর্তটিকে ব্যবহার করে আসনের পুনর্বণ্টনসহ প্রবর্তন করান ‘বুরো’-গুলিতে ঘর পিছু ভোট (household suffrage in the boroughs)। অতঃপর প্রবর্তিত হয় ব্যালট; তারপরে ১৮৮৪ সালে কাউন্টিগুলিতে ঘর-পিছু ভোটাধিকারের প্রসার এবং আসনের আর একটা নববণ্টন যাতে নির্বাচনী এলাকাগুলি কিছুটা সমান সমান হয়ে আসে। এই সব ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেণির নির্বাচনী ক্ষমতা একটা বেড়ে যায় যে, অন্তত দেড়’শ থেকে দুই’শটি নির্বাচনী এলাকায় এ শ্রেণির লোকেরা এবার হয় অধিকাংশ ভোটদাতা। কিন্তু ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখানোর একটা খাসা স্কুল হল পার্লামেন্টি ব্যবস্থা; লর্ড জন ম্যানের্স ঠাট্টা করে যাদের বলেছিলেন ‘আমাদের সাবেকি অভিজাত’ তাদের দিকে মধ্য শ্রেণি যদি তাকায় সভয়সম্ভ্রমে তাহলে শ্রমিক শ্রেণিও শ্রদ্ধা সম্মান করে তাকাবে মধ্য শ্রেণির দিকে যাদের অভিহিত করা হয়েছে তাদের ‘শ্রেয়তম’ বলে। বস্তুতপক্ষে, বছর পনের আগে ব্রিটিশ মজুর ছিল আদর্শ মজুর, মনিবের প্রতিষ্ঠার প্রতি সশ্রদ্ধ সম্মান এবং নিজের জন্য অধিকার দাবি করতে তার সংযমী বিনয় আমাদের ক্যাথিডার- সোস্যালিস্ট গোষ্ঠীর জার্মান অর্থনীতিবিদরা তাদের স্বদেশি মজুরদের দুরারোগ্য কমিউনিস্ট এবং বিপ্লবী প্রবণতার একটা সান্ত্বনা পেয়েছিল।
কিন্তু ইংরেজ মধ্য শ্রেণি ভাল ব্যবসায়ী বলে জার্মান অধ্যাপকদের চাইতে দূরদর্শী। শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে তারা ক্ষমতা ভাগ করে যে নিয়েছিল তা অনিচ্ছা সহকারে। চার্টিস্ট আন্দোলনের বছরগুলিতে তারা শিখেছে সেই puer robustus sed malitious, অর্থাৎ জনগণের ক্ষমতা কেমন। সেই সময় থেকে জনগণের চার্টারের সেরা ভাগটা যুক্তরাজ্যের স্ট্যাটিউটে সন্নিবদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এখনই সবচেয়ে বেশি করে জনগণকে শৃঙ্খলায় রাখতে হবে নৈতিক উপায়ে, এবং জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তারের কার্যকরী সমস্ত নৈতিক উপায়ের মধ্যে প্রথম ও প্রধান উপায় ছিল এবং রয়েই গেল ধর্ম। এই কারণেই স্কুল বোর্ডগুলিতে পাদ্রীদের সংখ্যাধিক্য, এই কারণেই পূজার্চনা থেকে ‘স্যালভেশন আর্মি’ পর্যন্ত সর্ববিধ পুনরুদয়বাদের (revivalism) সমর্থনে বুর্জোয়াদের ক্রমবর্ধমান আত্ম-ট্যাক্স।
কন্টিনেন্টি বুর্জোয়ারা স্বাধীন চিন্তা ও ধর্মীয় শিথিলতার ওপর এবার জিত হল ব্রিটিশ শালীনতার। ফ্রান্স ও জার্মানির শ্রমিকরা বিদ্রোহভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিল। সমাজতন্ত্রে তারা একেবারে সংক্রামিত এবং যে উপায়ে স্বীয় প্রাধান্য অর্জন করতে হবে, তার বৈধতা নিয়ে তারা, সঠিক কারণেই, বিশেষ ভাবিত নয়। এখানকার puer robustus দিন দিন বেশি malitiosus হয়ে উঠছে। বড়াই করে জ্বলন্ত চুরুটটা নিয়ে ডেকের ওপর সমুদ্রপীড়ার প্রকোপে ছোকরা যাত্রী যেমন সেটিকে গোপনে ত্যাগ করে তেমনিভাবে শেষ পন্থা হিসাবে ফরাসি ও জার্মান বুর্জোয়ার পক্ষে তাদের স্বাধীন চিন্তা নিঃশব্দে পরিত্যাগ করা ছাড়া আর কোন গত্যান্তর রইল না; বাইরের ব্যবহারে একের পর এক ধার্মিক হয়ে উঠতে লাগলো ঈশ্বরবিদ্বেষীরা, চার্চ এবং তার শাস্ত্রবচন ও অনুষ্ঠানাদির ওপর কথা কইতে লাগল সম্মান করে, যেটুকু না করলে নয় সে সব মেনেও নিতে লাগল। ফরাসি বুর্জোয়ারা শুক্রবার শুক্রবার হবিষ্যি শুরু করল আর রবিবার রবিবার জার্মান বুর্জোয়ারা গির্জায় নিদিষ্ট আসটিতে বসে শুনতে লাগলো দীর্ঘ প্রটেস্টান্ট সার্মন। বস্তুবাদ নিয়ে তারা বিপদে পড়েছে। “Die Religion muss dem volk erhaltenwerden”-ধর্মকে জীইয়ে রাখতে হবে জনগণের জন্য- সমূহ সর্বনাশ থেকে সমাজের পরিত্রাণের এই হল ও সর্বশেষ উপায়। দুর্ভাগ্যবশত, চিরকালের মত ধর্মকে চূর্ণ করার জন্য যথাসাধ্য করার আগে এটি তারা আবিষ্কার করতে পারেনি। এবার বিদ্রূপ করে ব্রিটিশ বুর্জোয়ার বলার পালা : “আহাম্মকের দল, এ কথা তো দুশো বছর আগেই আমি তোমাদের বলতে পারতাম!”
আমার কিন্তু আশঙ্কা, ব্রিটিশদের ধর্মীয় নিরেটত্ব অথবা কন্টিনেন্টি বুর্জোয়াদের post festum দীক্ষাগ্রহণ কিছুতেই বর্তমান প্রলেতারীয় তরঙ্গকে ঠেকাতে পারবে না। ঐতিহ্যের একটা মস্ত পিছু টানের শক্তি আছে, ইতিহাসের সে vis inertiae কিন্তু নিতান্ত নিষ্ক্রিয় বলে তা ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য এবং এই কারণে পুঁজিবাদী সমাজের চিরস্থায়ী রক্ষাকবচ ধর্ম হবে না। আমাদের আইনি, দার্শনিক ও ধর্মীয় ধারণাগুলি যদি হয় একটা নির্দিষ্ট সমাজের অর্থনৈতিক সম্পর্কপাতের মোটামুটি সুদূর কতকগুলো শাখা তাহলে এই সম্পর্কের আমূল পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া সহ্য করে এ সব শাখা টিকে থাকতে পারবে না। এবং অলৌকিক দৈব-প্রজ্ঞায় বিশ্বাস না করলে আমাদের মানতেই হবে যে, পতনোম্মুখ সমাজকে ঠেকা দিয়ে রাখার শক্তি কোন ধর্মীয় প্রবচনেই নেই। বস্তুতপক্ষে ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণি বেশ সচল হয়ে উঠেছে। সন্দেহ নেই যে, তারা নানাবিধ ঐতিহ্যে শৃঙ্খলিত। বুর্জোয়া ঐতিহ্য, যথা এই ব্যাপক-প্রচলিত বিশ্বাস যে, শুধু রক্ষণশীল ও উদারনীতিক, মাত্র এই দুই পার্টিই থাকা সম্ভব এবং শ্রমিক শ্রেণিকে মুক্তি অর্জন করতে হবে মহান উদারনীতিক পার্টির সাহায্যে ও তারই মাধ্যমে। শ্রমিকদের ঐতিহ্য, যা স্বাধীন সংগ্রামের প্রথম খসড়া প্রচেষ্টা থেকে তারা পেয়েছে, যথা যারা একটা নিয়মিত শিক্ষানবিসীর মধ্য দিয়ে আসেনি এমন সমস্ত আবেদনকারীকে সাবেকি বহু ট্রেড ইউনিয়ন থেকে বাদ দিয়ে রাখা; তার অর্থ দাঁড়াবে এই সব ইউনিয়ন কর্তৃক নিজেদের হাতেই নিজেদের বেইমান বাহিনী গঠন করা। কিন্তু এ সব সত্ত্বেও শ্রমিক শ্রেণি এগুচ্ছে, ভ্রাতৃপ্রতিম ক্যাথিডার- সোস্যালিস্টদের কাছে এমনকি অধ্যাপক ব্রেনতানোকেও যা রিপোর্ট করতে হয়েছে সখেদে। এগুচ্ছে ইংল্যান্ডের সবকিছুর মতোই, ধীরে ধীরে পা মেপে মেপে, কোথাও দ্বিধা, কোথাও মোটের ওপর অসফল অনিশ্চিত প্রচেষ্টায়; এগুচ্ছে মাঝে মাঝে সমাজতন্ত্র এই নামটার প্রতি এক অতিসতর্ক অবিশ্বাস নিয়ে, সেই সঙ্গে ক্রমশই তার সারবস্তুটিকে আত্মসাৎ করছে সে; এবং এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিকদের একটার পর একটা স্তরকে ধরে ফেলছে। লন্ডন ইস্ট এন্ডের অনিপুণ মজুরদের তন্দ্রা ঘুচিয়ে দিয়েছে এ আন্দোলন, এবং আমরা সকলেই জানি, প্রতিদানে এই নতুন শক্তিগুলো কী চমৎকার প্রেরণা জুগিয়েছে শ্রমিক শ্রেণিকে। আন্দোলনের গতি যদি কারও অধৈর্যের সমপর্যায়ে না ওঠে তাহলে এ কথা যেন তাঁরা না ভোলেন যে, ইংরেজ চরিত্রের সেরা গুণগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে শ্রমিকেরাই এবং একটা অগ্রসর পদক্ষেপ যদি ইংল্যান্ডে একবার অর্জিত হয় তাহলে পরে তা প্রায় কখনও মোছে না। সাবেকি চার্টিস্টদের ছেলেরা যদি পূর্ব কথিত কারণে ঠিক বাপ কা বেটা হয়ে উঠতে না পেরে থাকে, তবে নাতিদের দেখে মনে হয় পূর্বপুরুষদের মান তারা রাখবে।
কিন্তু ইউরোপীয় শ্রমিকদের বিজয় শুধু ইংল্যান্ডের ওপরেই নির্ভরশীল নয়। সে বিজয় অর্জিত হতে পারে অন্তত ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানির একযোগে। শেষোক্ত দুটি দেশেই শ্রমিক আন্দোলন ইংল্যান্ডের চেয়ে বেশ এগিয়ে। জার্মানিতে এমনকি তার সাফল্যের দিন এখন হিসাবের মধ্যেও ধরা যায়। গত পঁচিশ বছরে সেখানে তার যে অগ্রগতি ঘটেছে সেটা অতুলনীয়। ক্রমবর্ধমান গতিতে তা এগুচ্ছে। জার্মান মধ্য শ্রেণি যদি রাজনৈতিক দক্ষতা, শৃঙ্খলা, সাহস, উদ্যোগ, অধ্যাবসায়ে শোচনীয় অযোগ্যতা জাহির করে থাকে, তবে জার্মান শ্রমিক শ্রেণি সবকটি যোগ্যতারই প্রভূত প্রমাণ দিয়েছে। চারশ বছর আগে ইউরোপীয় মধ্য শ্রেণির প্রথম উৎসারের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল জার্মানি; অবস্থা এখন যা, তাতে ইউরোপীয় প্রলেতারিয়েতের প্রথম মহান বিজয়ের মঞ্চও হবে জার্মানি, এ কি সম্ভাব্যতার বাইরে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা \ ৩৯ বর্ষ \ সংখ্যা- ০১\ রবিবার \ ১ বৈশাখ ১৪২৬ \ ১৪ এপ্রিল ২০১৯

 


বিনিময় : ‘ড্যাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থ থেকে – কার্ল মার্কস

এটা পরিষ্কার যে পণ্যেরা নিজেরা বাজারে যেতে পারে না এবং নিজেরাই নিজেদের বিনিময় করতে পারে না। সুতরাং আমাদের যেতে হবে তাদের অভিভাবকবৃন্দের কাছে; এই অভিভাবকেরাই তাদের মালিক। পণ্যেরা হল দ্রব্যসামগ্রী; সুতরাং মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা নেই। যদি তাদের মধ্যে বিনিময়ের অভাব দেখা দেয়, তাহলে সে বলপ্রয়োগ করতে পারে অর্থাৎ সে তাদের দখল নিয়ে নিতে পারে। যাতে করে এই দ্রব্যসামগ্রীগুলি পণ্যরূপে পরস্পরের সঙ্গে বিনিময়ের সম্পর্কে প্রবেশ করতে পারে, তার জন্য তাদের অভিভাবকদেরই তাদেরকে স্থাপন করতে হবে পরস্পরের সঙ্গে সর্ম্পকের ক্ষেত্রে; তাদের অভিভাবকেরাই হচ্ছে সেই ব্যক্তিরা যাদের ইচ্ছায় তারা পরিচালিত হয়, অভিভাবকদের কাজ করতে হবে এমনভাবে যাতে একজনের পণ্য অন্য জন আত্মসাৎ না করে এবং পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত একটি প্রক্রিয়া ছাড়া কেউ তার পণ্যকে ছেড়ে না দেয়। সুতরাং অভিভাবকদের পরস্পরকে স্বীকার করে নিতে হবে ব্যক্তিগত স্বত্বের অধিকারী বলে। এই আইনগত সম্পর্কই আত্মপ্রকাশ করে চুক্তি হিসাবে- তা সেই আইনগত সম্পর্কটি কোন বিকশিত আইন-প্রণালীর অঙ্গ হোক, না-ই হোক; এই আইনগত সম্পর্কটি দু’টি অভিপ্রায়ের মধ্যেকার বাস্তব অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন ছাড়া অন্য কিছুই নয়। এই অর্থনৈতিক সম্পর্কটি নির্ধারণ করে দেয় এই ধরনের প্রত্যেকটি আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়বস্তু। ব্যক্তিদের উপস্থিতি এখানে কেবল পণ্যসমূহের প্রতিনিধি তথা মালিক হিসাবে। আমাদের অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে আমরা সাধারণভাবে দেখতে পাব যে অর্থনৈতিক রঙ্গমঞ্চে যে সব চরিত্র আবির্ভূত হয়, সে সব চরিত্র তাদের নিজেদের মধ্যে যে অর্থনীতিগত সম্পর্কগুলি থাকে, সেই সম্পর্কগুলিই ব্যক্তিরূপ ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।

যে ঘটনাটি একটি পণ্যকে তার মালিক থেকে বিশেষিত করে তা প্রধানত এই যে, পণ্যটি বাকি প্রত্যেকটি পণ্যকে তাদের নিজের মূল্যের দৃশ্যরূপ বলে দেখে থাকে। সে হল আজন্ম সমতাবাদী ও সর্ব-বিরাগী, অন্য যে কোন পণ্যের সঙ্গে সে কেবল তার আত্মাটিকেই নয়, দেহটিকেও বিনিময় করতে সর্বদাই প্রস্তুত- সংশ্লিষ্ট পণ্যটি যদি এমনকি ম্যারিটর্নেস থেকেও কুরূপা হয়, তাহলেও কিছু এসে যায় না। পণ্যের মধ্যে বাস্তববোধ সংক্রান্ত ইন্দ্রিয়ের এই যে অভাব, তার মালিক সে অভাবের ক্ষতিপূরণ করে দেয় তার নিজের পাঁচটি বা পাঁচটিরও বেশি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা। তার কাছে তার পণ্যটির তাৎক্ষণিক কোন ব্যবহার মূল্য নেই। তা যদি থাকত তাহলে সে তাকে বাজারে নিয়ে আসত না। পণ্যটির ব্যবহার মূল্য আছে অন্যদের কাছে, কিন্তু তার মালিকেদের কাছে একমাত্র প্রত্যক্ষ ব্যবহারমূল্য আছে বিনিময় মূল্যের আধার হিসাবে এবং কাজে কাজেই বিনিময়ের উপায় হিসাবে। অতঃপর যে পণ্যের মূল্য উপযোগের ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন (সেবায়) লাগতে পারে তাকে সে হাতছাড়া করতে মনস্থির করে। সমস্ত পণ্যই তার মালিকদের কাছে ব্যবহার মূল্য বিবর্জিত কিন্তু তাদের অ-মালিকদের কাছে ব্যবহার-মূল্য সমন্বিত। সুতরাং পণ্যগুলির হাত বদল হতেই হবে। আর এই যে হাত বদল তাকেই বলা হয় বিনিময়, বিনিময় তাদেরকে পরস্পরের সম্পর্কের স্থাপন করে মূল্য হিসাবে এবং তাদেরকে বাস্তবায়িতও করে মূল্য হিসাবে। সুতরাং ব্যবহার মূল্য হিসাবে বাস্তবায়িত হবার আগে পণ্যসমূহের অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে বিনিময়-মূল্য হিসাবে।

অন্যদিকে মূল্য হিসাবে বাস্তবায়িত হওয়ার আগে তাদের দেখাতে হবে, যে তারা ব্যবহার মূল্যের অধিকারী। কেননা যে শ্রম তাদের ওপর ব্যয় করা হয়েছে তাকে ততটাই ফলপ্রসূ বলে গণ্য করা হবে, যতটা তা ব্যয়িত হয়েছে এমন একটি রূপে যা অন্যান্যের কাছ্ উপযোগপূর্ণ। ঐ শ্রম অন্যান্যের কাছে উপযোগপূর্ণ কিনা এবং কাজে কাজেই, তা অন্যান্যের অভাব পূরণে সক্ষম কিনা, তা প্রমাণ করা যায় কেবলমাত্র বিনিময়ের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

পণ্যের মালিক মাত্রেই চায় তার পণ্যটিকে হাতছাড়া করতে কেবল এমন সব পণ্যের বিনিময়ে, যেসব পণ্য তার কোন- না- কোন অভাব মেটায়। এই দিক থেকে দেখলে, তার কাছে বিনিময় হল নিছক একটি ব্যক্তিগত লেনদেন। অন্যদিকে, সে চায় তার পণ্যটিকে বাস্তবায়িত করতে, সমান মূল্যের অন্য যে-কোন উপযুক্ত পণ্যের রূপান্তরিত করতে- তার নিজের পণ্যটিকে কোন ব্যবহারমূল্য অন্য পণ্যটির মালিকের কাছে আছে কি নেই, তা সে বিবেচনা করে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তার কাছে বিনিয়ম হল আর্থিক চরিত্রসম্পন্ন একটি সামাজিক লেনদেন। কিন্তু এক প্রস্থ এক ও অভিন্ন লেনদেন। একই সঙ্গে পণ্যের সমস্ত মালিকদের কাছে যুগপৎ একান্তভাবেই ব্যক্তিগত এবং একান্তভাবেই সামাজিক তথা সার্বিক ব্যাপার হতে পারে না।

ব্যাপরটাকে আরেকটু ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যাক। একটি পণ্যের মালিকের কাছে, তার নিজের পণ্যটির প্রেক্ষিতে, বাকি প্রত্যেকটি পণ্যই হচ্ছে এক-একটি সমার্ঘ সামগ্রী এবং কাজে কাজেই, তার নিজের পণ্যটি হল বাকি সমস্ত পণ্যের সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী। কিন্তু যেহেতু এটা প্রত্যেক মালিকের পক্ষেই প্রযোজ্য, সেহেতু কার্যত কোন সমার্ঘ সামগ্রী নেই, এবং পণ্যসমূহের আপেক্ষিক মূল্য এমন কোন সার্বিক রূপ ধারণ করে না, সে-রূপে মূল্য হিসাবে সেগুলির সমীকরণ হতে পারে এবং তাদের মূল্যের পরিমাপের তুলনা করা যেতে পারে। অতএব এই পর্যন্ত; তারা পণ্য হিসাবে পরস্পরের মুখোমুখি হয় না, মুখোমুখি হয় কেবল উৎপন্ন দ্রব্য বা ব্যবহার মূল্য হিসাবে। তাদের অসুবিধার সময়ে আমাদের পণ্য মালিকেরা ফাউস্টের মতই ভাবে, “Im An fang war die That”। সুতরাং ভাববার আগেই তারা কাজ করেছিল এবং লেনদেন করেছিল। পণ্যের স্বপ্রকৃতির দ্বারা আরোপিত নিয়মাবলীকে তারা সহজাত প্রবৃত্তি বলেই মেনে চলে। তারা তাদের পণ্যসমূহকে মূল্য-রূপে এবং সেই কারণেই পণ্যরূপে, সম্পর্কযুক্ত করতে পারে না। সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী হিসাবে অন্য কোন একটিমাত্র পণ্যের সঙ্গে তুলনা না করে। পণ্যের বিশ্লেষণ থেকে আমরা তা আগেই জেনেছি। কিন্তু কোন একটি বিশেষ পণ্য সামাজিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী হিসাবে স্বীকৃতি পেতে পারে না। সুতরাং নির্দিষ্ট সামাজিক প্রক্রিয়ার ফলে বাকি সমস্ত পণ্য থেকে এই বিশেষ দ্রব্যটি স্বাতন্ত্র্য লাভ করে এবং বাকি সমস্ত পণ্যের মূল্য এই বিশেষ পণ্যটির মাধ্যমে ব্যক্ত হয়। এইভাবে এই পণ্যটির দেহগত রূপটিই সমাজ-স্বীকৃত সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রীর রূপে পরিণত হয়। সর্বজনীন সমার্ঘ রূপে পরিণত হওয়াটাই এই সামাজিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে উঠে উক্ত সর্ব-ব্যতিরিক্ত পণ্যটির নির্দিষ্ট কাজ। এইভাবেই তা হয়ে ওঠে- ‘অর্থ’। অর্থ হচ্ছে একটি স্ফটিক; বিভিন্ন বিনিময়ের মাধ্যমে শ্রমের বিবিধ ফল কার্যক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সমীকৃত হয় এবং এইভাবে নানাবিধ পণ্যে পরিণত হয়; সেই সব বিনিময়ের ধারায় প্রয়োজনের তাগিদে ব্যবহারের মধ্যদিয়ে এই স্ফটিক গড়ে ওঠে। বিনিময়ের ঐতিহাসিক অগ্রগমন ও সম্প্রসারণের ফলে পণ্যের অন্তঃস্থিত ব্যবহার-মূল্য এবং মূল্যের মধ্যে তুলনাগত বৈশিষ্ট্যটি বিকাশ লাভ করে। বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের উদ্দেশ্যে এই তুলনা-বৈশিষ্ট্যের একটি বাহ্যিক অভিব্যক্তি দেবার জন্য মূল্যের একটি স্বতন্ত্র রূপ প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা দেখা দেয় এবং যতকাল পর্যন্ত পণ্য এবং অর্থের মধ্যে পণ্যের এই পার্থক্যকরণের কাজ চিরকালের জন্য সুসম্পন্ন না হয়েছে ততকাল পর্যন্ত এই আবশ্যকতার অবসান ঘটে না। তখন যে-হারে উৎপন্ন দ্রব্যের পণ্যে রূপান্তর ঘটে থাকে, সেই হারেই একটি বিশেষ পণ্যের ‘অর্থ’-রূপে রূপান্তর সম্পন্ন হয়।

দ্রব্যের পরিবর্তে দ্রব্যের প্রত্যক্ষ (দ্রব্য বিনিময় প্রথা) একদিকে মূল্যের আপেক্ষিক অভিব্যক্তির প্রাথমিক রূপে উপনীত হয়, কিন্তু আরেক দিকে নয়। সেই রূপটি এই: ও পণ্য ক = ঔ পণ্য খ। প্রত্যক্ষ দ্রব্য বিনিময়ের রূপটি হচ্ছে এই ও ব্যবহার মূল্য ক = ঔ ব্যবহার মূল্য খ। এই ক্ষেত্রে ক এবং খ জিনিস দু’টি এখনো পণ্য নয়, কিন্তু কেবল দ্রব্য বিনিময়ের মাধ্যমেই তারা পণ্যে পরিণত হয়। যখন কোন উপযোগিতা সম্পন্ন সামগ্রী তার মালিকের অন্য একটি না-ব্যবহার মূল্য উৎপাদন করে তখনই বিনিময় মূল্য অর্জনের দিকে সেই সামগ্রীটি প্রথম পদক্ষেপ অর্পণ করে এবং এটা ঘটে কেবল তখনই যখন তা হয়ে পড়ে তার মালিকের আশু অভাব পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কোন জিনিসের অতিরিক্ত কোন অংশ। জিনিসগুলি নিজেরা তো মানুষের বাইরে অবস্থিত এবং সেই কারণে তার দ্বারা পরকীকরণীয়। যাতে করে এই পরকীকরণ পারস্পরিক হয়, সেই জন্যে যা প্রয়োজন তা হল পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে পরস্পরকে ঐ পরকীকরণীয় জিনিসগুলির ব্যক্তিগত মালিক হিসাবে এবং তার মানেই স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসাবে গণ্য করা। কিন্তু সর্বজনিক সম্পত্তির ওপর ভিত্তিশীল আদিম সমাজে- তা প্রাচীন ভারতীয় গোষ্ঠী-সমাজের পিতৃ-তান্ত্রিক পরিবারই হোক বা পেরুভীয় ইনকা রাষ্ট্রই হোক- কোথাও এই ধরনের পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্যমূলক অবস্থানের অস্তিত্ব ছিল না। সেই ধরনের সমাজে স্বভাবতই পণ্য বিনিময় প্রথম শুরু হয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, যেখানে যেখানে তারা অনুরূপ কোন সমাজের বা তার সদস্যদের সংস্পর্শে আসে। যাই হোক, যত দ্রুত কোন সমাজের বাইরের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্রব্য বিনিময় হয় পণ্যে ততই দ্রুতই তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে আভ্যন্তরীণ লেনদেনের ক্ষেত্রেও দ্রব্য পরিণত হয় পণ্যে। কখন কোন হারে বিনিময় ঘটবে, তা ছিল গোড়ার দিকে নেহাৎই আপতিক ব্যাপার তাদের মালিকদের পারস্পরিক ইচ্ছার পরকীকরণই বিনিময়যোগ্য করে তোলে। ইতিমধ্যে উপযোগিতা সম্পন্ন বিদেশীয় দ্রব্য সামগ্রীর অভাববোধও ক্রমে ক্রমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। বিনিময়ের নিত্য পুনরাবৃত্তির তা হয়ে ওঠে একটি মামুলি সামাজিক ক্রিয়া। কালক্রমে অবশ্যই এমন সময় আসে যে, শ্রমফলের অন্তত একটা অংশ উৎপন্ন করতে হয় বিনিময়ের বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে। সেই মুহূর্ত থেকেই পরিভোগের জন্যে উপযোগিতা এবং বিনিময়ের জন্যে উপযোগিতার মধ্যকার পার্থক্যটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কোন সামগ্রীর ব্যবহার মূল্য এবং তার বিনিময় মূল্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। অন্যদিকে যে পরিমাণগত অনুপাতে বিভিন্ন জিনিসপত্রের বিনিময় ঘটবে, তা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাদের নিজের নিজের উৎপাদনের ওপর। প্রথাগতভাবে এক একটি জিনিসের ওপরে এক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্যের ছাপ পড়ে যায়।

প্রত্যক্ষ দ্রব্য বিনিময় ব্যবস্থায় প্রত্যেকটির জন্যেই তার মালিকের কাছে প্রত্যক্ষভাবে একটি বিনিময়ের উপায় এবং অন্য সকলের কাছে সমার্ঘ সামগ্রী কিন্তু সেটা ততখানি পর্যন্তই, যতখানি পর্যন্ত তাদের কাছে তার থাকে ব্যবহার মূল্য। সুতরাং এই পর্যায়ে বিনিমিত জিনিসগুলির নিজেদের ব্যবহার মূল্য থেকে বা বিনিময়কারীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন বোধ থেকে নিরপেক্ষ কোন মূল্য রূপ অর্জন করে না। বিনিমিত পণ্যের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে একটি মূল্যরূপের আবশ্যকতা অনুভূত হয়। সমস্যা আর তার সমাধানের উপায় দেখা দেয় একই সঙ্গে। বিভিন্ন মালিকের হাতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য এবং সেই সমস্ত পণ্য একটি মাত্র বিশেষ সঙ্গে বিনিমেয় এবং মূল্য হিসাবে সমীকৃত না হলে, পণ্য মালিকেরা কখনও তাদের নিজেদের পণ্যসমূহকে অন্যদের পণ্যসমূহের সঙ্গে সমীকরণ করে না এবং বৃহৎ আকারে বিনিময় করে না। এই শেষ উল্লেখিত পণ্যটি অন্যান্য বহুবিধ পণ্যের সমার্ঘ সামগ্রী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি সাধারণ সামাজিক সমার্ঘ সামগ্রীর চরিত্র অর্জন করে যদিও অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ পরিধির মধ্যেই। সেই সমস্ত তাৎক্ষণিক সামাজিক ক্রিয়াগুলির প্রয়োজনে এই বিশেষ চরিত্রটি জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, তা এই ক্রিয়াগুলির প্রয়োজনমাফিক কাজ করে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে অকেজো হয়ে যায়। ঘুরে ফিরে এবং সাময়িকভাবে এই চরিত্রটি কখনও এই পণ্যের সঙ্গে, কখনও ঐ পণ্যের সঙ্গে লগ্ন হয়। কিন্তু বিনিময়ের বিকাশের সঙ্গে তা দৃঢ়ভাবে এবং একান্তভাবে বিশেষ বিশেষ ধরনের পণ্যের সঙ্গে লগ্ন হয়ে যায় এবং ক্রমে ক্রমে অর্থ-রূপে সংহতি লাভ করে। এই বিশেষ প্রকৃতির পণ্যটি কোন পণ্যে লগ্ন হবে, তা গোড়ার দিকে থাকে আপতিক। যাই হোক না কেন এ ব্যাপারে দুটি ঘটনার প্রভাব চূড়ান্ত ভূমিকা নেয়। হয়, এই অর্থ-রূপ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাইরে থেকে বিনিময় মারফত পাওয়া জিনিসগুলির সঙ্গে নিজেকে লগ্ন করে- আর বাস্তবিক পক্ষেই দেশজ দ্রব্যগুলির মূল্য প্রকাশের এগুলিই হচ্ছে আদিম ও স্বাভাবিক রূপ; নয়তো তা নিজেকে লগ্ন করে গবাদি পশুজাতীয় উপযোগিতাপূর্ণ জিনিসের সঙ্গে- যেসব জিনিস দেশজ পরকীকরণীয় ধনসম্পদের প্রধান অংশ। যাযাবর গোষ্ঠীগুলিই অর্থ-রূপ প্রবর্তনের ব্যাপারে পথিকৃৎ, কেননা তাদের সমস্ত পার্থিব ধনসম্পদ কেবল অস্থাবর জিনিসপত্রেরই সমষ্টি, আর সে জন্যই সেগুলি সরাসরি পরকীকরণীয় এবং কেননা তাদের জীবনযাত্রার ধরনই এমন যে তারা নিরন্তর বিদেশি গোষ্ঠীসমূহের সংস্পর্শে আসে এবং দ্রবাদি বিনিময়ের প্রয়োজন অনুভব করে। মানুষ অনেক ক্ষেত্রে মানুষকেও, ক্রীতদাসের আকারে, অর্থের আদিম সামগ্রী হিসাবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু কখনও জমিকে এ কাজে ব্যবহার করেনি। এমন ধরনের ধারণার উদ্ভব হতে পারে কেবল বুর্জোয়া সমাজে যা ইতিমধ্যেই অনেকটা বিকাশ প্রাপ্ত। সপ্তদশ শতকের শেষ তৃতীয়াংশ থেকে এই ধরনের ধারণা চালু হয় এবং এক শতাব্দী পরে, ফরাসি বুর্জোয়া বিপ্লবের কালে এই ধারণাটিকে জাতীয় আকারে কার্যকরী করার প্রথম প্রচেষ্টা হয়।

যে অনুপাতে বিনিময় স্থানীয় সীমানা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় এবং পণ্য মূল্য ক্রমেই সম্প্রসারিত হতে হতে অমূর্ত মনুষ্য-শ্রমে রূপ লাভ করে। সেই অনুপাতে অর্থের চরিত্র এমন, সব পণ্যে নিজেকে লগ্ন করে যে-পণ্যগুলি সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী হিসাবে কাজ করার জন্যে প্রকৃতির দ্বারাই নির্দিষ্ট হয়ে আছে। ঐ পণ্যগুলি হচ্ছে বিভিন্ন মহার্ঘ ধাতু।

‘যদিও সোনা রূপা প্রকৃতিগতভাবে অর্থ নয় কিন্তু অর্থ প্রকৃতিগতভাবেই সোনা এবং রূপা।’ এই যে বক্তব্য তার সত্যতা প্রতিপন্ন হয় এই ধাতুগুলির অর্থ হিসাবে কাজ করার জন্যে যোগ্যতাসম্পন্ন দেহগত গুণাবলীর দ্বারা। যাই হোক এই পর্যন্ত আমরা কেবল অর্থের একটিমাত্র কাজের সঙ্গেই পরিচিত হয়েছি; সে কাজটি হলো পণ্য-মূল্যের অভিব্যক্তি হিসাবে অথবা পণ্য মূল্যের বিভিন্ন পরিমাণ যে সামগ্রীর মাধ্যমে কাজ করে সেই সামগ্রীটি সামাজিক বর্ণনা হিসাবে কাজ করা। মূল্য প্রকাশের যথোপযুক্ত রূপ, অমূর্ত অবিশেষিত এবং সে কারণেই সমান মনুষ্য শ্রমের যথোপযুক্ত মূর্তরূপ- এমন একটি সামগ্রীই- যার নমুনামাত্র প্রদর্শনে তার বিভিন্ন গুণগুলি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে- এমন একটি সামগ্রীই কেবল হতে পারে অর্থ। অন্যদিকে যেহেতু মূল্যের বিভিন্ন পরিমাণের মধ্যে যে পার্থক্য, তা কেবল পরিমাণগত, সেহেতু অর্থ পণ্যটিকে কেবল পরিমাণগত পার্থক্যেরই সক্ষমতা সম্পন্ন হতে হবে, এবং সেই জন্য তাকে হতে হবে ইচ্ছেমতো বিভাজ্য এবং পুনর্মিলিত হবার ক্ষমতাসম্পন্ন। সোনা ও রূপা প্রকৃতিগতভাবেই এই গুণাবলীর অধিকারী।

অর্থ-পণ্যের ব্যবহার-মূল্য দ্বৈত। পণ্য হিসাবে বিশেষ ব্যবহার মূল্য (যেমন সোনা যা কাজে লাগে দাঁত বাঁধাবার উপাদান হিসাবে, বিলাস-দ্রব্যাদির কাঁচামাল হিসেবে ইত্যাদি) ছাড়াও তা অর্জন করে একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবহার-মূল্য- নির্দিষ্ট সামাজিক ভূমিকা থেকে যার উদ্ভব। অর্থ হচ্ছে সমস্ত পণ্যের সর্বজনীন সমার্ঘ বিশেষ বিশেষ সমার্ঘ সামগ্রী সেই হেতু অর্থের তথা সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রীটির সম্পর্কে বিশেষ বিশেষ সমার্ঘ সামগ্রীগুলি কাজ করে বিশেষ বিশেষ পণ্য হিসাবে।

আমরা দেখেছি যে বাকি সমস্ত পণ্যের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে যে মূল্য-সম্পর্কসমূহ বিদ্যমান, সেই সম্পর্কসমূহের প্রতিক্ষেপ হচ্ছে অর্থ-রূপ- যা উৎক্ষিপ্ত হয়েছে একটি মাত্র পণ্যের ওপর। সুতরাং ঐ অর্থও যে একটা পণ্য, তা কেবল তাদের কাছে একটা নতুন আবিষ্কার বলে প্রতীয়মান হবে যাঁরা তাঁদের বিশ্লেষণ শুরু করেন অর্থের পূর্ণ বিকশিত রূপটি থেকে। অর্থরূপে রূপান্তরিত পণ্যটি বিনিময়-ক্রিয়ার ফলে মূল্য-মন্ডিত হয় না, কেবল তার নিদিষ্ট মূল্যরূপ প্রাপ্ত হয়। এই দুটি সুস্পষ্টভাবে আলাদা আলাদা ব্যাপারকে একাকার করে ফেলে কিছু কিছু লেখক এই সিদ্ধান্তে গিয়ে পৌঁছেছেন যে সোনা বা রূপার মূল্য হচ্ছে কাল্পনিক। কতকগুলি ব্যাপারে অর্থের নিছক প্রতীকগুলিই যে অর্থের কাজ করে থাকে তা থেকে আরও একটা ভ্রান্ত ধারণা উদ্ভব হয় তা এই যে অর্থ নিজেই একটা প্রতীক মাত্র। যাই হোক এই ভ্রান্তির পেছনে একটা মানসিক সংস্কার উঁকি দেয় তা এই যে কোন সামগ্রীর অর্থরূপ সেই সামগ্রীটি থেকে বিচ্ছেদ্য কোন অংশ নয়, বরং সেটা হল এমন একটা রূপ যার মাধ্যমে কতকগুলি সামাজিক সম্পর্কের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই দিক থেকে প্রত্যেকটি পণ্যই হচ্ছে একটা প্রতীক, কেননা যেহেতু তা হচ্ছে মূল্য, সেহেতু সে হচ্ছে তার ওপর ব্যয়িত মনুস্য-শ্রমের বস্তুগত লেফাফা মাত্র। কিন্তু যদি ঘোষণা করা হয় যে একটা নির্দিষ্ট উৎপাদন পদ্ধতির অধীনে বিভিন্ন সামগ্রী কর্তৃক অর্জিত সামাজিক চরিত্রগুলি কিংবা শ্রমের সামাজিক গুণাবলী কর্তৃক অর্জিত বস্তুগত রূপগুলি নিছক প্রতীক মাত্র, তা হলে এই একই নিঃশ্বাসে এটাও ঘোষণা করা হয় যে, এই চরিত্র-বৈশিষ্ট্যগুলি মানবজাতির তথাকথিত সর্বজনীন সম্মতির দ্বারা অনুমোদিত খেয়ালখুশি মত দেওয়া অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। আঠারো শতকে এই ধরনের ব্যাখ্যা বেশ সমর্থন লাভ করেছিল। মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্কগুলি নানান ধাঁধা-লাগানো রূপ ধারণ করেছিল, সেগুলি ব্যাখ্যা করতে না পেরে, লোকে চেয়েছিল সেগুলির উৎপত্তি সম্বন্ধে একটা গৎবাঁধা বৃত্তান্ত হাজির করে সেগুলিকে তাদের অদ্ভূত দৃশ্যরূপ থেকে বিবস্ত্র করতে।

এর আগেই উপরে মন্তব্য করা হয়েছে যে পণ্যের সমার্ঘরূপ তার মূল্যের পরিমাণ বোঝায় না। সুতরাং যদিও আমরা এ বিষয়ে অবগত থাকতে পারি যে সোনা হচ্ছে অর্থ, এবং সেই কারণেই তা বাকি সব পণ্যের সঙ্গে সরাসরি বিনিমেয়, তবুও কিন্তু এই তথ্য থেকে আমরা এটা কোন ক্রমেই জানতে পারি না যে এতটা সোনার, ধরা যাক, ১০০ পাউন্ড সোনার মূল্য কতটা। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে যেমন, অর্থের ক্ষেত্রেও তেমন, অন্যান্য পণ্যের মাধ্যমে ছাড়া সে তার নিজের মূল্য প্রকাশ করতে পারে না। এই মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনে প্রয়োজনীয় শ্রম সময়ের পরিমাপ দিয়ে এবং তা প্রকাশিত হয় একই পরিমাণ শ্রম সময়ে উৎপাদিত অন্য যে কোন পণ্যের মাধ্যমে। তার মূল্যের এবং পরিমাণগত নির্ধারণ তার উৎপাদনের উৎসক্ষেত্রেই দ্রব্য বিনিময় প্রথার মাধ্যমে হয়ে থাকে। যখন তা অর্থরূপে চলাচল করতে শুরু করে তার আগেই কিন্তু তার মূল্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। সতের শতকের শেষের দশকগুলিতে এটা প্রতিপন্ন হয়ে গিয়েছিল যে, অর্থ হচ্ছে একটা পণ্য; কিন্তু এই বক্তব্যে আমরা যা পাই তা হল এই বিশ্লেষণের শৈশবাবস্থা। অর্থ যে একটা পণ্য সেটা পরিষ্কার করা তেমন একটা সমস্যা নয়; সমস্যা দেখা দেয় তখন যখন আমরা চেষ্টা করি কেন, কিভাবে, কি উপায়ের মাধ্যমে পণ্য অর্থে পরিণত হয়।

মূল্যের সবচাইতে প্রাথমিক অভিব্যক্তি থেকে আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পেয়েছি যে ও পণ্য ক=ঔ পণ্য খ; দেখতে পেয়েছি যে যে সামগ্রীটি অন্য একটি সামগ্রীর মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে, সেই সামগ্রীটি প্রতীত হয় যেন তার এই, সম্পর্ক থেকে নিরপেক্ষভাবেই এক সমার্ঘ রূপ আছে- যে রূপটি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গুণ যা প্রকৃতি তাকে দান করেছে। আমরা এই মিথ্যা প্রতীতিকে বিশ্লেষণ করতে করতে শেষ পর্যন্ত তার চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা অবধি গিয়েছি; এই চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা তখনই পূর্ণ সম্পন্ন হয় যখন সর্বজনীন সমার্ঘ রূপটি একটি বিশেষ পণ্যের দৈহিক রূপের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করে এবং এইভাবে অর্থ-রূপে স্ফটিকায়িত ( কেলাসিত) হয়। যা ঘটে বলে দেখা যায় তা এই নয় যে সোনা পরিণত হয় অর্থে এবং তার ফলে বাকি সমস্ত পণ্যের মূল্য প্রকাশিত হয় সোনার মাধ্যমে, বরং উল্টো যে, বাকি সমস্ত পণ্য সর্বজনীনভাবে তাদের মূল্য প্রকাশ করে সোনার মাধ্যমে কেননা সোনা হচ্ছে অর্থ। আদ্যন্ত প্রক্রিয়াটির মধ্যবর্তী পর্যায়গুলি ফলত অদৃশ্য হয়ে যায় ; পেছনে কোন চিহ্নই রেখে যায় না; পণ্যরা দেখতে পায় যে তাদের নিজেদের কোন উদ্যোগ ছাড়াই তাদের মূল্য তাদের সঙ্গের আর একটি পণ্যের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। সোনা ও রূপা এই সামগ্রীগুলি যে মুহূর্তে পৃথিবীর জঠর থেকে বেরিয়ে আসে, সেই মুহূর্তেই তারা হয়ে ওঠে সমস্ত মনুষ্য শ্রমের প্রত্যক্ষ মূর্তরূপ। এখান থেকেই অর্থের যাদু। উপস্থিত যে সমাজ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, সে সমাজে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ায় মানুষের আচরণ নিছক আণবিক (অণুর মতো)। এই কারণে উৎপাদন প্রণালীতে তাদের সম্পর্কগুলি ধারণ করে এমন একটি বস্তুগত চরিত্র, যা তাদের নিয়ন্ত্রণ ও সচেতন থেকে ব্যক্তিগত ক্রিয়াকর্ম থেকে নিরপেক্ষ। এই ঘটনাগুলি প্রথমে আত্মপ্রকাশ করে সাধারণভাবে উৎপন্ন দ্রব্যসমূহের পণ্যের রূপ পরিগ্রহ করার মধ্যে। আমরা দেখেছি কেমন করে পণ্য উৎপাদনকারীদের এক সমাজের ক্রমিক অগ্রগতির ফলে একটি বিশেষ পণ্য অর্থ-রূপের মোহরাঙ্কিত হয়ে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হল। সুতরাং অর্থ যে কুহেলি সৃষ্টি করে তা আসলে পণ্যেরই সৃষ্ট কুহেলি; বৈশিষ্ট্য শুধু এই টুকু যে অর্থের কুহেলি তার সবচাইতে চোখ ধাঁধানো রূপ দিয়ে আমাদের ধাঁধিয়ে দেয়।

(সমাপ্ত)

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৮


শামুরবাড়ির প্রতিরোধঃ কমরেড নিজামুদ্দিন মতিন

(প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড নিজামউদ্দিন মতিন। দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির সামরিক শাখার প্রধান নেতৃত্ব ছিলেন। অসংখ্য বিচিত্র সামরিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন বিপ্লবী ছিলেন। আজীবন লড়াকু এই বিপ্লবী ছিল শত্রুর কাছে আতংক। বহু বহু কন্টকাকীর্ন পথে পথ চলেছেন তিনি। দীর্ঘ সময় ছিলেন শত্রু শিবিরে বন্দী । ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিজীবনে লিখেছেন “প্রেরণা”রাজনৈতিক -সাংস্কৃতিক পত্রিকায়। ঐ সময়টিতে তারই লেখা ‘শামুরবাড়ির প্রতিরোধ’ প্রকাশ করছে ‘লাল সংবাদ’)

বর্ষাকাল। তবুও আজ মেঘ নেই আকাশে। সূর্যটা ঠিক মাথার উপর আগুনের ভাটার মতো জ্বলছে, আর গনগনে আগুন ছড়াচ্ছে। অসহ্য গরম। তবু বিরাম নেই চলার। হাত আটেক চওড়া চওড়া আঁকা বাঁকা খাল দিয়ে স্রোতের অনুকূলেই এগিয়ে চলছে ডিংগী নৌকাটা। আরোহী মাত্র দু’জন। একজনের বয়স বিশ,নাম তার সানু;অপরজন তালেব,বয়স মাত্র আঠারো। চাকলাদার বাড়িকে পিছনে ফেলে,চঁইগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ধইঞ্চা গাছের সারিকে বাঁ পাশে রেখে,ডান দিকের বড় বড় গাছের ছায়ার নিচ দিয়ে দুটো বাঁক ঘুরে তারা এসে পড়লো বড় খালে। কিছু দূরেই ডহুরী লঞ্চস্টেশন। অলস দৃষ্টিতে স্টেশনের দিকে তাকালো সানু। সাথে সাথেই চমকে উঠলো সে। একটা হিম স্রোত মেরুদণ্ড বেয়ে নীচের দিকে নামছে -মনে হলো তার। দেখতে পেয়েছে তালেবও।

দুজনেই ছানাবড়া চোখে দেখলো -রক্ষী বাহিনী বোঝাই দুটো লঞ্চ ভিড়ে আছে স্টেশনের বিপরীতে,শামুরবাড়ি ঘাটে-ঠিক যেখানে নির্জন দোতলা ঘরটি দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ । কিছু রক্ষী নেমে পড়েছে খালের উঁচু পাড়ে। এবং ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে। আরো নামছে। ওদের লক্ষ্য শামুরবাড়ি ক্যাম্প। এ ক্যাম্পের গেরিলাদের সাথেই গতরাতে গোলাগুলি হয়েছে একটি লঞ্চের। তাই আজ কর্মী,গেরিলা আর পার্টিকে সমর্থনকারী জনগনকে ‘শায়েস্তা করতে’ এসেছে ওরা।

শামুরবাড়ি ক্যাম্প থেকেই সকালে বের হয়েছিল দুজনে,আবার ফিরে আসছিল ক্যাম্পেই। কিন্ত মাঝখানে একি বিপত্তি-ভাবলো সানু। আরো ভাবলো সে,দশ মিনিটেরও কম সময়ে এই রক্ষীরা পৌছে যাবে গ্রামে। গ্রামের অধিকাংশ যুবকই থাকে ঢাকা শহরে। যারা গ্রামে থাকে তাদের অনেককেই এই ভর দুপুরে গ্রামে পাওয়া যাবে না। কেউ গেছে স্কুলে,কেউ ক্ষেতে,কেউবা হাটে -বাজারে। সকালে দেখেছিল ক্যাম্পে গেরিলারা আছে মোটে পাঁচজন। মিলিশিয়াদের কাউকে কাউকে হয়তো গ্রামে পাওয়া যাবে। কিন্তু তারা সকলেই অনভিজ্ঞ। অনভিজ্ঞ কয়েকজন মিলিশিয়া আর পাঁচজন গেরিলা দিয়ে ঠেকানো যাবে না ট্রেনিংপ্রাপ্ত রক্ষীদের বিরাট বাহিনীকে। বিপদটা এড়ানো যাবেনা, বুঝতে পারলো দু’জনেই।

চকিতে জেগে ওঠা পালাবার ইচ্ছাটাকে সজোরে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ক্যাম্পে যাবারই সিদ্ধান্ত নিল তারা।

খাল পাড়ি দিয়ে পশ্চিম পাশে এলো দুজনে। এ পাড়ে উঁচু মাটির বাঁধ। কোথাও কোথাও ভাংগা। এগুলো দিয়ে হুহু করে পানি ঢুকছে চকে। চক বোঝাই আমন ধানের গাছ। ধান গাছগুলো যেন প্রতিযোগিতা করে পানি বাড়ার সাথে সাথে তাল মিলিয়ে মাথা তুলছে আকাশ পানে। বাঁধের একটি ভাংগা দিয়ে ডিংগিটাকে ঠেলে নিয়ে দু’জনে ঢুকলো চকে। তারপর কোনাকুনি দ্রুত চালাতে চেষ্টা করলো নৌকাটা। কিন্ত ধান গাছে আটকে যাচ্ছে নৌকা,কচুরিপানাও যেন শত্রুতা শুরু করেছে আজ। “আরো জোরে”হাঁক দিলো সানু। সমস্ত শক্তিতে বৈঠাটা জাপটে ধরলো তালেব। দু’জনের আপ্রাণ চেষ্টায় নৌকা এসে ভিড়লো গ্রামের পুর্ব পাশে। নৌকা থেকে লাফিয়ে নেমে নানির বৈঠকখানা লক্ষ্য করে ছুটলো সানু। ওখানেই পার্টির স্থানীয় অফিস আর অস্ত্রাগার।

ছুটতে ছুটতে অফিসে এলো সানু। অফিসের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল বেলা ও ফাহমিদা। দু’জনকেই প্রশ্ন করলো সে,” গেরিলা-মিলিশিয়ারা কোথায়?” “গেরিলারা ক্যাম্পে। মিলিশিয়াও কয়েকজন আছে গ্রামে” উত্তর দিল বেলা। “কিন্ত রক্ষীরা আসছে শুনে কোথায় যে পালালো, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।” ক্ষুব্ধ স্বরে জানালো ফাহমিদা। “ঠিক আছে” আমি দেখছি। “তোমরা অফিসই রক্ষা করো”বলে দ্রুত অফিসে ঢুকে পড়লো সানু। কাঁধে তুলে নিল রুশ নির্মিত ঝকঝকে প্রিয় সাব মেশিনগানটা। গুলি ভর্তি দুটো স্পেয়ার ম্যাগজিন নিতেও ভুলল না সে। এরপর দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে গেল ক্যাম্পকে লক্ষ্য করে।

ক্যাম্পের সামনে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল জীবন, রাজু,পলাশ,হাফিজ ও হিরু। সানুকে আসতে দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো সবাই। ঝটপট প্রাথমিক ডিফেন্স পরিকল্পনা তৈরী করে স্ব স্ব পজিশনে চলে গেল সকলে। সানু বের হলো মিলিশিয়াদের খোঁজে। তার সাথে যোগ দিল আলম,লোকমান ও রাজু। পাঁচজন মিলিশিয়াকে খুঁজে বার করতে সক্ষম হলো তারা। ভয়ে কুঁকড়ে গেছে মিলিশিয়ারা। তাদেরকে পজিশন নেওয়ানো হলো- জবরদস্তিমুলকভাবে।

গ্রামের লোকজন কিছুটা সন্তষ্ট হয়ে ছোটাছুটি করছে। প্রশ্ন করছে গেরিলাদেরকে,”জিততে পারবে তো বাবা?” “সাধ্যমতো চেষ্টা করবো” মৃদু হেসে উত্তর দিচ্ছে গেরিলারা। বিজয় কামনায় মসজিদে সিন্নি দেবার মানত করছে অনেকে,কেউবা মানত করছে মিলাদ শরীফের। গেরিলাদের অনুরোধে নারী-পুরুষ সকলেই হাতে তুলে নিল টেটা,বল্লম,লেজা। কেউবা দা,বটি। বাঁশের লাঠিও কারো কারো হাতে দেখা গেল। গুলি বিনিময় শুরু হলে লোকজন আহত হতে পারে ভেবে সকলকে অনুরোধ করলো সানু,”আপনারা শুয়ে পড়ুন মাটির উঁচু ভিটার আড়ালে।”

রক্ষীদের হামলা প্রতিরোধ করার জন্য অপেক্ষা করছে সকলে। কিন্ত ওরা আসছে না। আসতে হয়তো ওদের কিছু দেরি হবে। ওরা চুল্লী তৈরী করছে দোতলা ঘরটির পাশে। রান্নার আসবাবপত্র সাথে নিয়েই এসেছে ওরা,লুটপাট করে বিরাট ভোজ খাবে বলে।”এতো সহজে না,বাচাধনরা”চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করলো সানু। তারপর নিজেদের প্রস্তুতিটা আরেকবার দেখে নেবার জন্য লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেলো।

পূর্ব-পশ্চিমে দুই শত গজ লম্বা আর উত্তর-দক্ষিনে ত্রিশ গজ চওড়া গ্রামের চারিদিকে পানি। পানির গভীরতাও অনেক। হাত তিনেক চওড়া ও আড়াই হাত গভীর একটা খাল কোমর বন্ধনীর মতো ঘিরে আছে গ্রামকে। আরেকটি ছোট খাল এক হাঁটু পানি বুকে নিয়ে আড়াআড়ি দ্বিখন্ডিত করেছে গ্রামকে। এ দুটো খালই শত্রুর আক্রমণ বেগকে কিছুটা মন্থর করতে সাহায্য করবে গেরিলাদের। উত্তরে মাইলখানেকের মধ্যে কোন গ্রাম নেই। দূরে -বহু দূরে দেখা যায় দ্বীপের মতো পানির উপর ভাসছে গ্রামগুলো। এ গ্রামগগুলোতে যেতে পারলে নিরাপদ হতে পারতো কর্মী,গেরিলা ও জনগণ। কিন্তু যাবে কি করে? উন্মুক্ত চক দিয়ে নৌকায় পালাবার চেষ্টা করলেই দেখতে পাবে রক্ষীরা। সাথে সাথেই গুলি ছুঁড়বে ওরা। সাঁতার কেটেও পাড়ি দেয়া যাবে না এত বড় চক। এদিক দিয়ে অবশ্য নৌকা ব্যতিরেকে আসতে পারবেনা রক্ষীবাহিনীও। যদি আসে তবে ওদেরকে ঠেকানোর দায়িত্ব পড়েছে পাঁচজনের উপর। মিলিশিয়া তিনজন শুয়ে আছে মরার মতো। প্রয়োজনে তারা গুলি ছুঁড়তে পারবে বলে মনে হয় না। তবে চাংগা আছে বাচ্চা ছেলে দুটো। সর্বদাই উচ্ছাসে ভরপুর ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র মান্নান। রাইফেলটা বাগিয়ে উত্তেজিতভাবে পায়চারি করছে -আসন্ন যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেবার জন্য। একটা বিরাট আম গাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছেলে লালু। শ্রমিক পরিবারের সন্তান সে। ছোটছোট হাত দুটো দিয়ে রাইফেলটা সাপটে ধরে সদা সতর্ক প্রহরীর মত তাকিয়ে আছে রক্ষীবাহিনী আসার পথের দিকে। পশ্চিমে মাইল দেড়েক দূরে গাওদিয়া বাজার। ওদিক দিয়েই আসতে পারে থানার ফোর্স,এ সম্ভাবনা বিবেচনা করেই নিয়োগ করা হয়েছে দুজন মিলিশিয়া। দুজনেই ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ভয়ে। হাত কাঁপছে তাদের। এস,এল,আর, ও জি-থ্রিটাকেও শক্ত করে ধরে রাখতে পারছে না তারা। উত্তর আর পশ্চিমের ডিফেন্সের সহায়তার জন্য রয়েছে তালেব। মিলিশিয়াদের অবস্থা দেখে হতাশ হয়ে জি-থ্রিটাকে হাতে নিয়ে পায়চারি করছে সে। অফিস ও অস্ত্রাগার রক্ষার দায়িত্ব পড়েছে ফাহমিদা,বেলা,মুন্নি ও আসমার উপর। সকলের হাতেই রাইফেল,কোমরে গুলির বেল্ট। ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী তারা,আসন্ন যুদ্ধের উন্মাদনায় উদ্দীপ্ত। তাদের মৃদু হাসি আর মুখের ভাব দেখেই বুঝা যায়, জান দিয়েই লড়বে তারা। পুবে আধা মাইলেরও কম দুরত্বে ডহুরী লঞ্চ স্টেশন। স্টেশন থেকে 
একটা মাটির রাস্তা এসে গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে গাওদিয়া হয়ে চলে গিয়েছে লৌহজং থানায়। রাস্তার সাথে গ্রামের সংযোগ রক্ষা করছে একটা কাঠের পুল। এ পুল পেরিয়েই গ্রামে ঢুকতে হবে রক্ষীদের। পুলের পাশের ছোট কোনটার মধ্যে এল,এম,জি,সহ অবস্থান নিয়েছে হাফিজ। সে একজন খাঁটি শ্রমিক -বেজায় ফুর্তিবাজ লোক। আসন্ন যুদ্ধের চিন্তা বিন্দু মাত্র বিচলিত করতে পারেনি তাকে। এ অবস্থায়ও হাসি মুখে নীচু গলায় গান গাইছে সে। সাথে গলা মিলাচ্ছে আলম ও লোকমান। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আলম-তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র পিতৃহারা লোকমান এ বয়সেই কামলা খাটে অন্যর জমিতে। দুজনেই রাইফেল নিয়ে বসে আছে হাফিজের দুপাশে-কাঠের পুলকে রক্ষা করবে বলে। স্টেশন থেকে মাটির রাস্তা ধরেই এগিয়ে আসবে রক্ষীর। তাই রাস্তার সমান্তরাল রেখার তৈরী করা হয়েছে এ্যামবুশ ফাঁদ। এ্যামবুশের দ্বায়িত্বে আছে ছাত্র জীবন ত্যাগ করে আসা জীবন,রাজু,রেডিও মেকানিক পলাশ ও বেকারী শ্রমিক হিরু। সাথে থাকবে সানু নিজে। এ ফাঁদের সফলতার বা ব্যর্থতার উপর নির্ভর করছে জয় অথবা পরাজয়। তাই সকলকে জানিয়ে দিয়েছে সানু,রক্ষীদের বড় একটা অংশ এ্যামবুশ ফাঁদের মধ্যে আসলে সে নিজেই প্রথমে গুলি ছুঁড়বে ;তার পর অন্যরা। তা’না হলে রক্ষীরা সতর্ক হয়ে যাবে, ফাঁদ কার্যকরী হবে না। তবে রক্ষীরা যদি নৌকাপথে আসার চেষ্টা করে তা’হলে নিকটে অবস্থানরতরাই প্রথমে গুলি ছুঁড়বে _এটাও জানিয়ে দিয়েছে সে।

প্রস্তুতিটা খুব বেশি সন্তোষজনক মনে হলো না সানুর। সে জানে,সশস্ত্র প্রতিরোধ ভেঙে পড়লেই বাঁধ ভাংগা জলোচ্ছাসের মত গ্রামে ঢুকে পড়বে রক্ষীবাহিনী। শুরু হবে হাতাহাতি লড়াই। এ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়বে গ্রামের সকল নারী,কিশোর,বালক ও বৃদ্ধ। রক্তের ঢ্ল নামবে শামুর বাড়ির গ্রামে। আর ভাবতে পারছে না,মাথাটা ঝিম ঝিম করছে তার। এ অবস্থাতেই এগিয়ে গিয়ে পুর্ব-দক্ষিণ দিকের শেষ প্রান্তে অবস্থান নিল সে। তার পাশেই পজিশন নিয়েছে জীবন। জীবনের পর রাজু। তার পাশে পলাশ। সর্বশেষে হিরু। সকলের হাতেই চকচকে অটোমেটিক অস্ত্র। এগুলো মাত্র কয়েকদিন পূর্বে তারা দখল করেছে শত্রু বাহিনীর নিকট থেকে। সানুকে দেখে প্রশ্ন করলো জীবন,”প্রস্তুতি কেমন দেখলেন”? “মোটামুটি”জবাব দিল সানু।” “রক্ষীরা কিন্তু এখনও রান্নার আয়োজনেই ব্যস্ত” জানালো জীবন। “ভালই হয়েছে,না হলে প্রস্তুতি নেয়ার সময়ই পেতাম না আমরা” বললো সানু। “এ…ই…চুপ করুন,ওরা আসছে!” চাপা স্বরে বলে উঠলো রাজু। 
ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এগিয়ে আসছে রক্ষীবাহিনী। প্রথম দলটা একেবারে গ্রামের সামনে। ওরা গেরিলাদের নিকট থেকে মাত্র আট হাত দূরেই রাস্তায় ঘোরাফিরা করছে। হয়তো রেকি করছে। নয়তো অল্প লোক নিয়ে গ্রামে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না। দ্বিতীয় দলটা এসে পড়লে সন্মিলিতভাবে গ্রামে ঢুকবে -এমন পরিকল্পনাও থাকতে পারে ওদের। লতাপাতা, গাছ-গাছালির আড়ালে লুকিয়ে থাকা গেরিলাদের দেখতে পাচ্ছে না রক্ষীরা। কিন্তু গেরিলারা সবই দেখতে পাচ্ছে। এতো অল্প দূর থেকে অটোমেটিক ব্রাশের একটা গুলিও বাজে খরচ হবে না ভেবে উল্লসিত হয়ে উঠলো তারা। এগিয়ে আসছে রক্ষীদের দ্বিতীয় দলটাও। সংখ্যায় ওরা অনেক। এতোগুলো রক্ষীকে একবারেই ব্রাশের আওতায় আনা যাবে ভেবে বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে উঠলো গেরিলারা। এ অবস্থায় জীবন আর চুপ করে থাকতে পারলো না। খুশি খুশি গলায় ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো সে,”এতো বড় শিকার সহজে মেলে না”।”ঠিক বলেছেন কমরেড”সমর্থন জানালো রাজু।

এল,এম,জি,’র ট্রিগারে আংগুল রেখে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল হাফিজ। উত্তেজনায় ট্রিগারে চাপ পড়ে বেরিয়ে গেল একটা গুলি। সাথে সাথেই পজিশন নিয়ে নিলো রক্ষীরা। ভন্ডুল হয়ে গেল গেরিলাদের পরিকল্পনা। সবেধন নীলমনি এল,এম,জি,টাও গেলো অকেজো হয়ে। শত চেষ্টাতেও সেটাকে আর কার্যকর করতে পারলো না তারা।

গুলি ছুঁড়ছে রক্ষীরা। দুটো লঞ্চ থেকে, বড় খালে উঁচু পাড়ের আড়াল থেকে,স্টেশন আর গ্রামের মাঝ বরাবর অবস্থিত ব্রীজ থেকে,ডহুরী খালের পাড়ে অবস্থিত শামুর বাড়ি গ্রামের বিচ্ছিন্ন অংশ থেকে,গ্রামের সামনের রাস্তার আড়াল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুঁড়ছে ওরা। গাছ-পালা ছিঁড়ে, ডাল-পালা ভেঙে, ঘরের দরজা-বেড়া-চাল ফুটো করে ছুটে চলছে গুলি। নীরব-নিঃশব্দ গ্রামীন পরিবেশ ভেঙে খান খান হয়ে পড়ছে এল,এম,জি.,এস,এল,আর.,রাইফেলের অট্টহাসিতে। এ শব্দ শুনতে পেয়ে এগিয়ে আসবে থানার রক্ষী-পুলিশ। থানার ওয়ারলেসে খবর যাবে নিকটবর্তী থানাগুলোতে। খবর যাবে মুন্সিগঞ্জ,নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায়। দু’তিন ঘণ্টার মধ্যেই এসে পড়বে বিরাট বাহিনী। এমনকি হেলিকপ্টারও আসতে পারে। কি দিয়ে, কেমন করে ঠেকাবে ওদের-ভাবতে পারছে না গেরিলারা।

নিশ্চিত পরাজয়-বুঝতে অসুবিধা হয়নি কারো। সকলের মুখেই ফুটে উঠেছে আসন্ন মৃত্যুর ম্লান ছায়া। সমস্ত গ্রামটা দ্রুত একবার চক্কর দিল সানু। কেউ কিছু বললো না তাকে। কিন্তু সকলের চোখে সে দেখতে পেয়েছে একটা নীরব প্রশ্ন-কি করবে তারা এখন? প্রশ্নটা তো তার নিজেরও। কি করবে সে? সামনে এগুলে মৃত্যু। গ্রামে বসে থাকলেও রেহাই নেই। চারিদিকে থৈ থৈ পানি,পালাবারও যে পথ নেই। তবে কিভাবে মৃত্যুকে বরন করবে তারা-সে সিদ্ধান্ত নেয়ার একটুখানি সময় তাদের হাতে আছে।

চরম সিদ্ধান্ত নিলো সানু-সামনে এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুকে বরন করবে চারজন,বাকিরা থাকবে গ্রামে;তারাই দেবে শেষ লড়াই। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মসজিদের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো ঝাঁকড়া মাথাওয়ালা মহীরুহের মতো বড় বড় তিনটা আম গাছের নীচে টান টান হয়ে পাশাপাশি দাঁড়ানো চারজন। লুংগিটাকে মালকোঁচা দিয়ে, উদাম শরীরে,দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। শক্ত হয়ে উঠেছে তাদের মুখের পেশি-দাঁতের চোয়াল। সাগ্রহে দাঁড়িয়ে আছে তারা-প্রত্যাশিত কমান্ডের অপেক্ষায়।

“এডভান্স”-রক্ষীবাহিনীর একটানা গুলির শব্দকে ছাপিয়ে ঘোষিত হলো কমান্ড। সাথে সাথেই উন্মুক্ত প্রান্তরে ঝাঁপিয়ে পড়লো সানু,জীবন,রাজু,পলাশ। প্রচন্ড গুলি বর্ষনকে উপেক্ষা করে মাটির রাস্তা ধরে তারা এগিয়ে চললো স্টেশনের দিকে।

নিমিষেই খবরটা রটে গেল গ্রামে।খবরটা শুনতে পেয়েই বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরটাকে এক ঝটকায় সোজা করে চীৎকার দিল নানী,” আমাকে একটা অস্ত্র দে,আমিও যাবো সানুদের সাথে “।তাকে অনেক কষ্টে থামালো বেলা। ” শামুর বাড়ি আদর্শ বিদ্যাপীঠ”-এর ছাত্র-ছাত্রীরা সমস্বরে গেয়ে উঠলো গেরিলাদের প্রিয় গান,”লক্ষ জনতা,জাগ্রত আজ। বাঁধব্র বুনো ষাঁড়। রক্ত পতাকা,খুনে রঙিন। সংগীন সর্বহারা।”লেজটাকে ঝান্ডার মতো উঁচু করে ধরে আলমের বুড়ো দাদু দিল শ্লোগান। সাথে তান ধরলো গ্রামের সকল নারী-পুরুষ-বালক-বৃদ্ধ। এ শ্লোগানে সাড়া দিল গাওদিয়া,রানাদিয়া,পাখীদিয়া,বনসামন্ত,ডহুরীর হাজার হাজার জনগণ। সমুদ্রের জলোচ্ছাসের মতো আকাশ-বাতাস মুখরিত হতে থাকলো শ্লোগানে শ্লোগানে।

জনগনের সক্রিয় সমর্থনে ভীতি কেটে গেলো মিলিশিয়াদের। তারা গেরিলাদের সাথে এগিয়ে গেলো গ্রামের পূর্ব পাশে এবং একযোগে গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো অগ্রসরমাণ চারজনের মাথার উপর দিয়ে লঞ্চ দুটোকে লক্ষ্য করে।

এগিয়ে চলছে কখনো দৌড়ে,কখনো হামাগুড়ি দিয়ে। কখনো বা চুপচাপ থাকছে তারা। গতি খুব ধীর,তবুও তারা এগিয়ে চলছে জীবনকে বাজি রেখে।

(সমাপ্ত)

 

 


প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড নিজামুদ্দিন মতিন

 

বাংলাদেশের ফেসবুকে বামপন্থীদের বিভিন্ন পোস্ট ও দেশটির জাতীয় দৈনিক ‘ঢাকা ট্রিবিউন’ জানাচ্ছে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতির অন্যতম ব্যক্তিত্ব, মাওবাদী ধারার কমিউনিস্ট পার্টি ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি(এমবিআরএম)’ এর সম্পাদক কমরেড নিজামুদ্দিন মতিন ওরফে কমরেড ‘ক’ ওরফে কমরেড শাহিন গত ১২ই আগস্ট সকাল ১১টায় মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫বছর। তিনি দীর্ঘদিন যাবত কিডনি রোগে ভুগছিলেন। ১৯৫৫ সালে বরিশালের আলেকান্দায় জন্ম নেয়া মাওবাদী ধারার এই কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্ত্ব মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯৬৯ সালে তিনি সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পুর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৭৫সালে কমরেড  সিরাজ শিকদারকে হত্যার সময়ে কমরেড নিজামুদ্দিন মতিন জেলে ছিলেন। সেখানেই বিভিন্ন কেন্দ্রের বিভ্রান্তি এড়াতে নিজেরা তৈরী করেন “সত্ত্বা” নামে একটি আলাদা গ্রুপ। পরে আবার মিশে যান মূলধারার সাথে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাবনা, টাংগাইল ফ্রন্টের দ্বায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতিতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর অসংখ্য লেখা থেকে “শামুরবাড়ির প্রতিরোধ” স্মৃতিচারণমুলক লেখাটা ‘লাল সংবাদ’ আজ প্রকাশ করেছে।