বিনিময় : ‘ড্যাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থ থেকে – কার্ল মার্কস

এটা পরিষ্কার যে পণ্যেরা নিজেরা বাজারে যেতে পারে না এবং নিজেরাই নিজেদের বিনিময় করতে পারে না। সুতরাং আমাদের যেতে হবে তাদের অভিভাবকবৃন্দের কাছে; এই অভিভাবকেরাই তাদের মালিক। পণ্যেরা হল দ্রব্যসামগ্রী; সুতরাং মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা নেই। যদি তাদের মধ্যে বিনিময়ের অভাব দেখা দেয়, তাহলে সে বলপ্রয়োগ করতে পারে অর্থাৎ সে তাদের দখল নিয়ে নিতে পারে। যাতে করে এই দ্রব্যসামগ্রীগুলি পণ্যরূপে পরস্পরের সঙ্গে বিনিময়ের সম্পর্কে প্রবেশ করতে পারে, তার জন্য তাদের অভিভাবকদেরই তাদেরকে স্থাপন করতে হবে পরস্পরের সঙ্গে সর্ম্পকের ক্ষেত্রে; তাদের অভিভাবকেরাই হচ্ছে সেই ব্যক্তিরা যাদের ইচ্ছায় তারা পরিচালিত হয়, অভিভাবকদের কাজ করতে হবে এমনভাবে যাতে একজনের পণ্য অন্য জন আত্মসাৎ না করে এবং পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত একটি প্রক্রিয়া ছাড়া কেউ তার পণ্যকে ছেড়ে না দেয়। সুতরাং অভিভাবকদের পরস্পরকে স্বীকার করে নিতে হবে ব্যক্তিগত স্বত্বের অধিকারী বলে। এই আইনগত সম্পর্কই আত্মপ্রকাশ করে চুক্তি হিসাবে- তা সেই আইনগত সম্পর্কটি কোন বিকশিত আইন-প্রণালীর অঙ্গ হোক, না-ই হোক; এই আইনগত সম্পর্কটি দু’টি অভিপ্রায়ের মধ্যেকার বাস্তব অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন ছাড়া অন্য কিছুই নয়। এই অর্থনৈতিক সম্পর্কটি নির্ধারণ করে দেয় এই ধরনের প্রত্যেকটি আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়বস্তু। ব্যক্তিদের উপস্থিতি এখানে কেবল পণ্যসমূহের প্রতিনিধি তথা মালিক হিসাবে। আমাদের অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে আমরা সাধারণভাবে দেখতে পাব যে অর্থনৈতিক রঙ্গমঞ্চে যে সব চরিত্র আবির্ভূত হয়, সে সব চরিত্র তাদের নিজেদের মধ্যে যে অর্থনীতিগত সম্পর্কগুলি থাকে, সেই সম্পর্কগুলিই ব্যক্তিরূপ ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।

যে ঘটনাটি একটি পণ্যকে তার মালিক থেকে বিশেষিত করে তা প্রধানত এই যে, পণ্যটি বাকি প্রত্যেকটি পণ্যকে তাদের নিজের মূল্যের দৃশ্যরূপ বলে দেখে থাকে। সে হল আজন্ম সমতাবাদী ও সর্ব-বিরাগী, অন্য যে কোন পণ্যের সঙ্গে সে কেবল তার আত্মাটিকেই নয়, দেহটিকেও বিনিময় করতে সর্বদাই প্রস্তুত- সংশ্লিষ্ট পণ্যটি যদি এমনকি ম্যারিটর্নেস থেকেও কুরূপা হয়, তাহলেও কিছু এসে যায় না। পণ্যের মধ্যে বাস্তববোধ সংক্রান্ত ইন্দ্রিয়ের এই যে অভাব, তার মালিক সে অভাবের ক্ষতিপূরণ করে দেয় তার নিজের পাঁচটি বা পাঁচটিরও বেশি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা। তার কাছে তার পণ্যটির তাৎক্ষণিক কোন ব্যবহার মূল্য নেই। তা যদি থাকত তাহলে সে তাকে বাজারে নিয়ে আসত না। পণ্যটির ব্যবহার মূল্য আছে অন্যদের কাছে, কিন্তু তার মালিকেদের কাছে একমাত্র প্রত্যক্ষ ব্যবহারমূল্য আছে বিনিময় মূল্যের আধার হিসাবে এবং কাজে কাজেই বিনিময়ের উপায় হিসাবে। অতঃপর যে পণ্যের মূল্য উপযোগের ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন (সেবায়) লাগতে পারে তাকে সে হাতছাড়া করতে মনস্থির করে। সমস্ত পণ্যই তার মালিকদের কাছে ব্যবহার মূল্য বিবর্জিত কিন্তু তাদের অ-মালিকদের কাছে ব্যবহার-মূল্য সমন্বিত। সুতরাং পণ্যগুলির হাত বদল হতেই হবে। আর এই যে হাত বদল তাকেই বলা হয় বিনিময়, বিনিময় তাদেরকে পরস্পরের সম্পর্কের স্থাপন করে মূল্য হিসাবে এবং তাদেরকে বাস্তবায়িতও করে মূল্য হিসাবে। সুতরাং ব্যবহার মূল্য হিসাবে বাস্তবায়িত হবার আগে পণ্যসমূহের অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে বিনিময়-মূল্য হিসাবে।

অন্যদিকে মূল্য হিসাবে বাস্তবায়িত হওয়ার আগে তাদের দেখাতে হবে, যে তারা ব্যবহার মূল্যের অধিকারী। কেননা যে শ্রম তাদের ওপর ব্যয় করা হয়েছে তাকে ততটাই ফলপ্রসূ বলে গণ্য করা হবে, যতটা তা ব্যয়িত হয়েছে এমন একটি রূপে যা অন্যান্যের কাছ্ উপযোগপূর্ণ। ঐ শ্রম অন্যান্যের কাছে উপযোগপূর্ণ কিনা এবং কাজে কাজেই, তা অন্যান্যের অভাব পূরণে সক্ষম কিনা, তা প্রমাণ করা যায় কেবলমাত্র বিনিময়ের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

পণ্যের মালিক মাত্রেই চায় তার পণ্যটিকে হাতছাড়া করতে কেবল এমন সব পণ্যের বিনিময়ে, যেসব পণ্য তার কোন- না- কোন অভাব মেটায়। এই দিক থেকে দেখলে, তার কাছে বিনিময় হল নিছক একটি ব্যক্তিগত লেনদেন। অন্যদিকে, সে চায় তার পণ্যটিকে বাস্তবায়িত করতে, সমান মূল্যের অন্য যে-কোন উপযুক্ত পণ্যের রূপান্তরিত করতে- তার নিজের পণ্যটিকে কোন ব্যবহারমূল্য অন্য পণ্যটির মালিকের কাছে আছে কি নেই, তা সে বিবেচনা করে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তার কাছে বিনিয়ম হল আর্থিক চরিত্রসম্পন্ন একটি সামাজিক লেনদেন। কিন্তু এক প্রস্থ এক ও অভিন্ন লেনদেন। একই সঙ্গে পণ্যের সমস্ত মালিকদের কাছে যুগপৎ একান্তভাবেই ব্যক্তিগত এবং একান্তভাবেই সামাজিক তথা সার্বিক ব্যাপার হতে পারে না।

ব্যাপরটাকে আরেকটু ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যাক। একটি পণ্যের মালিকের কাছে, তার নিজের পণ্যটির প্রেক্ষিতে, বাকি প্রত্যেকটি পণ্যই হচ্ছে এক-একটি সমার্ঘ সামগ্রী এবং কাজে কাজেই, তার নিজের পণ্যটি হল বাকি সমস্ত পণ্যের সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী। কিন্তু যেহেতু এটা প্রত্যেক মালিকের পক্ষেই প্রযোজ্য, সেহেতু কার্যত কোন সমার্ঘ সামগ্রী নেই, এবং পণ্যসমূহের আপেক্ষিক মূল্য এমন কোন সার্বিক রূপ ধারণ করে না, সে-রূপে মূল্য হিসাবে সেগুলির সমীকরণ হতে পারে এবং তাদের মূল্যের পরিমাপের তুলনা করা যেতে পারে। অতএব এই পর্যন্ত; তারা পণ্য হিসাবে পরস্পরের মুখোমুখি হয় না, মুখোমুখি হয় কেবল উৎপন্ন দ্রব্য বা ব্যবহার মূল্য হিসাবে। তাদের অসুবিধার সময়ে আমাদের পণ্য মালিকেরা ফাউস্টের মতই ভাবে, “Im An fang war die That”। সুতরাং ভাববার আগেই তারা কাজ করেছিল এবং লেনদেন করেছিল। পণ্যের স্বপ্রকৃতির দ্বারা আরোপিত নিয়মাবলীকে তারা সহজাত প্রবৃত্তি বলেই মেনে চলে। তারা তাদের পণ্যসমূহকে মূল্য-রূপে এবং সেই কারণেই পণ্যরূপে, সম্পর্কযুক্ত করতে পারে না। সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী হিসাবে অন্য কোন একটিমাত্র পণ্যের সঙ্গে তুলনা না করে। পণ্যের বিশ্লেষণ থেকে আমরা তা আগেই জেনেছি। কিন্তু কোন একটি বিশেষ পণ্য সামাজিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী হিসাবে স্বীকৃতি পেতে পারে না। সুতরাং নির্দিষ্ট সামাজিক প্রক্রিয়ার ফলে বাকি সমস্ত পণ্য থেকে এই বিশেষ দ্রব্যটি স্বাতন্ত্র্য লাভ করে এবং বাকি সমস্ত পণ্যের মূল্য এই বিশেষ পণ্যটির মাধ্যমে ব্যক্ত হয়। এইভাবে এই পণ্যটির দেহগত রূপটিই সমাজ-স্বীকৃত সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রীর রূপে পরিণত হয়। সর্বজনীন সমার্ঘ রূপে পরিণত হওয়াটাই এই সামাজিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে উঠে উক্ত সর্ব-ব্যতিরিক্ত পণ্যটির নির্দিষ্ট কাজ। এইভাবেই তা হয়ে ওঠে- ‘অর্থ’। অর্থ হচ্ছে একটি স্ফটিক; বিভিন্ন বিনিময়ের মাধ্যমে শ্রমের বিবিধ ফল কার্যক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সমীকৃত হয় এবং এইভাবে নানাবিধ পণ্যে পরিণত হয়; সেই সব বিনিময়ের ধারায় প্রয়োজনের তাগিদে ব্যবহারের মধ্যদিয়ে এই স্ফটিক গড়ে ওঠে। বিনিময়ের ঐতিহাসিক অগ্রগমন ও সম্প্রসারণের ফলে পণ্যের অন্তঃস্থিত ব্যবহার-মূল্য এবং মূল্যের মধ্যে তুলনাগত বৈশিষ্ট্যটি বিকাশ লাভ করে। বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের উদ্দেশ্যে এই তুলনা-বৈশিষ্ট্যের একটি বাহ্যিক অভিব্যক্তি দেবার জন্য মূল্যের একটি স্বতন্ত্র রূপ প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা দেখা দেয় এবং যতকাল পর্যন্ত পণ্য এবং অর্থের মধ্যে পণ্যের এই পার্থক্যকরণের কাজ চিরকালের জন্য সুসম্পন্ন না হয়েছে ততকাল পর্যন্ত এই আবশ্যকতার অবসান ঘটে না। তখন যে-হারে উৎপন্ন দ্রব্যের পণ্যে রূপান্তর ঘটে থাকে, সেই হারেই একটি বিশেষ পণ্যের ‘অর্থ’-রূপে রূপান্তর সম্পন্ন হয়।

দ্রব্যের পরিবর্তে দ্রব্যের প্রত্যক্ষ (দ্রব্য বিনিময় প্রথা) একদিকে মূল্যের আপেক্ষিক অভিব্যক্তির প্রাথমিক রূপে উপনীত হয়, কিন্তু আরেক দিকে নয়। সেই রূপটি এই: ও পণ্য ক = ঔ পণ্য খ। প্রত্যক্ষ দ্রব্য বিনিময়ের রূপটি হচ্ছে এই ও ব্যবহার মূল্য ক = ঔ ব্যবহার মূল্য খ। এই ক্ষেত্রে ক এবং খ জিনিস দু’টি এখনো পণ্য নয়, কিন্তু কেবল দ্রব্য বিনিময়ের মাধ্যমেই তারা পণ্যে পরিণত হয়। যখন কোন উপযোগিতা সম্পন্ন সামগ্রী তার মালিকের অন্য একটি না-ব্যবহার মূল্য উৎপাদন করে তখনই বিনিময় মূল্য অর্জনের দিকে সেই সামগ্রীটি প্রথম পদক্ষেপ অর্পণ করে এবং এটা ঘটে কেবল তখনই যখন তা হয়ে পড়ে তার মালিকের আশু অভাব পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কোন জিনিসের অতিরিক্ত কোন অংশ। জিনিসগুলি নিজেরা তো মানুষের বাইরে অবস্থিত এবং সেই কারণে তার দ্বারা পরকীকরণীয়। যাতে করে এই পরকীকরণ পারস্পরিক হয়, সেই জন্যে যা প্রয়োজন তা হল পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে পরস্পরকে ঐ পরকীকরণীয় জিনিসগুলির ব্যক্তিগত মালিক হিসাবে এবং তার মানেই স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসাবে গণ্য করা। কিন্তু সর্বজনিক সম্পত্তির ওপর ভিত্তিশীল আদিম সমাজে- তা প্রাচীন ভারতীয় গোষ্ঠী-সমাজের পিতৃ-তান্ত্রিক পরিবারই হোক বা পেরুভীয় ইনকা রাষ্ট্রই হোক- কোথাও এই ধরনের পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্যমূলক অবস্থানের অস্তিত্ব ছিল না। সেই ধরনের সমাজে স্বভাবতই পণ্য বিনিময় প্রথম শুরু হয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, যেখানে যেখানে তারা অনুরূপ কোন সমাজের বা তার সদস্যদের সংস্পর্শে আসে। যাই হোক, যত দ্রুত কোন সমাজের বাইরের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্রব্য বিনিময় হয় পণ্যে ততই দ্রুতই তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে আভ্যন্তরীণ লেনদেনের ক্ষেত্রেও দ্রব্য পরিণত হয় পণ্যে। কখন কোন হারে বিনিময় ঘটবে, তা ছিল গোড়ার দিকে নেহাৎই আপতিক ব্যাপার তাদের মালিকদের পারস্পরিক ইচ্ছার পরকীকরণই বিনিময়যোগ্য করে তোলে। ইতিমধ্যে উপযোগিতা সম্পন্ন বিদেশীয় দ্রব্য সামগ্রীর অভাববোধও ক্রমে ক্রমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। বিনিময়ের নিত্য পুনরাবৃত্তির তা হয়ে ওঠে একটি মামুলি সামাজিক ক্রিয়া। কালক্রমে অবশ্যই এমন সময় আসে যে, শ্রমফলের অন্তত একটা অংশ উৎপন্ন করতে হয় বিনিময়ের বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে। সেই মুহূর্ত থেকেই পরিভোগের জন্যে উপযোগিতা এবং বিনিময়ের জন্যে উপযোগিতার মধ্যকার পার্থক্যটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কোন সামগ্রীর ব্যবহার মূল্য এবং তার বিনিময় মূল্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। অন্যদিকে যে পরিমাণগত অনুপাতে বিভিন্ন জিনিসপত্রের বিনিময় ঘটবে, তা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাদের নিজের নিজের উৎপাদনের ওপর। প্রথাগতভাবে এক একটি জিনিসের ওপরে এক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্যের ছাপ পড়ে যায়।

প্রত্যক্ষ দ্রব্য বিনিময় ব্যবস্থায় প্রত্যেকটির জন্যেই তার মালিকের কাছে প্রত্যক্ষভাবে একটি বিনিময়ের উপায় এবং অন্য সকলের কাছে সমার্ঘ সামগ্রী কিন্তু সেটা ততখানি পর্যন্তই, যতখানি পর্যন্ত তাদের কাছে তার থাকে ব্যবহার মূল্য। সুতরাং এই পর্যায়ে বিনিমিত জিনিসগুলির নিজেদের ব্যবহার মূল্য থেকে বা বিনিময়কারীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন বোধ থেকে নিরপেক্ষ কোন মূল্য রূপ অর্জন করে না। বিনিমিত পণ্যের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে একটি মূল্যরূপের আবশ্যকতা অনুভূত হয়। সমস্যা আর তার সমাধানের উপায় দেখা দেয় একই সঙ্গে। বিভিন্ন মালিকের হাতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য এবং সেই সমস্ত পণ্য একটি মাত্র বিশেষ সঙ্গে বিনিমেয় এবং মূল্য হিসাবে সমীকৃত না হলে, পণ্য মালিকেরা কখনও তাদের নিজেদের পণ্যসমূহকে অন্যদের পণ্যসমূহের সঙ্গে সমীকরণ করে না এবং বৃহৎ আকারে বিনিময় করে না। এই শেষ উল্লেখিত পণ্যটি অন্যান্য বহুবিধ পণ্যের সমার্ঘ সামগ্রী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি সাধারণ সামাজিক সমার্ঘ সামগ্রীর চরিত্র অর্জন করে যদিও অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ পরিধির মধ্যেই। সেই সমস্ত তাৎক্ষণিক সামাজিক ক্রিয়াগুলির প্রয়োজনে এই বিশেষ চরিত্রটি জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, তা এই ক্রিয়াগুলির প্রয়োজনমাফিক কাজ করে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে অকেজো হয়ে যায়। ঘুরে ফিরে এবং সাময়িকভাবে এই চরিত্রটি কখনও এই পণ্যের সঙ্গে, কখনও ঐ পণ্যের সঙ্গে লগ্ন হয়। কিন্তু বিনিময়ের বিকাশের সঙ্গে তা দৃঢ়ভাবে এবং একান্তভাবে বিশেষ বিশেষ ধরনের পণ্যের সঙ্গে লগ্ন হয়ে যায় এবং ক্রমে ক্রমে অর্থ-রূপে সংহতি লাভ করে। এই বিশেষ প্রকৃতির পণ্যটি কোন পণ্যে লগ্ন হবে, তা গোড়ার দিকে থাকে আপতিক। যাই হোক না কেন এ ব্যাপারে দুটি ঘটনার প্রভাব চূড়ান্ত ভূমিকা নেয়। হয়, এই অর্থ-রূপ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাইরে থেকে বিনিময় মারফত পাওয়া জিনিসগুলির সঙ্গে নিজেকে লগ্ন করে- আর বাস্তবিক পক্ষেই দেশজ দ্রব্যগুলির মূল্য প্রকাশের এগুলিই হচ্ছে আদিম ও স্বাভাবিক রূপ; নয়তো তা নিজেকে লগ্ন করে গবাদি পশুজাতীয় উপযোগিতাপূর্ণ জিনিসের সঙ্গে- যেসব জিনিস দেশজ পরকীকরণীয় ধনসম্পদের প্রধান অংশ। যাযাবর গোষ্ঠীগুলিই অর্থ-রূপ প্রবর্তনের ব্যাপারে পথিকৃৎ, কেননা তাদের সমস্ত পার্থিব ধনসম্পদ কেবল অস্থাবর জিনিসপত্রেরই সমষ্টি, আর সে জন্যই সেগুলি সরাসরি পরকীকরণীয় এবং কেননা তাদের জীবনযাত্রার ধরনই এমন যে তারা নিরন্তর বিদেশি গোষ্ঠীসমূহের সংস্পর্শে আসে এবং দ্রবাদি বিনিময়ের প্রয়োজন অনুভব করে। মানুষ অনেক ক্ষেত্রে মানুষকেও, ক্রীতদাসের আকারে, অর্থের আদিম সামগ্রী হিসাবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু কখনও জমিকে এ কাজে ব্যবহার করেনি। এমন ধরনের ধারণার উদ্ভব হতে পারে কেবল বুর্জোয়া সমাজে যা ইতিমধ্যেই অনেকটা বিকাশ প্রাপ্ত। সপ্তদশ শতকের শেষ তৃতীয়াংশ থেকে এই ধরনের ধারণা চালু হয় এবং এক শতাব্দী পরে, ফরাসি বুর্জোয়া বিপ্লবের কালে এই ধারণাটিকে জাতীয় আকারে কার্যকরী করার প্রথম প্রচেষ্টা হয়।

যে অনুপাতে বিনিময় স্থানীয় সীমানা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় এবং পণ্য মূল্য ক্রমেই সম্প্রসারিত হতে হতে অমূর্ত মনুষ্য-শ্রমে রূপ লাভ করে। সেই অনুপাতে অর্থের চরিত্র এমন, সব পণ্যে নিজেকে লগ্ন করে যে-পণ্যগুলি সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী হিসাবে কাজ করার জন্যে প্রকৃতির দ্বারাই নির্দিষ্ট হয়ে আছে। ঐ পণ্যগুলি হচ্ছে বিভিন্ন মহার্ঘ ধাতু।

‘যদিও সোনা রূপা প্রকৃতিগতভাবে অর্থ নয় কিন্তু অর্থ প্রকৃতিগতভাবেই সোনা এবং রূপা।’ এই যে বক্তব্য তার সত্যতা প্রতিপন্ন হয় এই ধাতুগুলির অর্থ হিসাবে কাজ করার জন্যে যোগ্যতাসম্পন্ন দেহগত গুণাবলীর দ্বারা। যাই হোক এই পর্যন্ত আমরা কেবল অর্থের একটিমাত্র কাজের সঙ্গেই পরিচিত হয়েছি; সে কাজটি হলো পণ্য-মূল্যের অভিব্যক্তি হিসাবে অথবা পণ্য মূল্যের বিভিন্ন পরিমাণ যে সামগ্রীর মাধ্যমে কাজ করে সেই সামগ্রীটি সামাজিক বর্ণনা হিসাবে কাজ করা। মূল্য প্রকাশের যথোপযুক্ত রূপ, অমূর্ত অবিশেষিত এবং সে কারণেই সমান মনুষ্য শ্রমের যথোপযুক্ত মূর্তরূপ- এমন একটি সামগ্রীই- যার নমুনামাত্র প্রদর্শনে তার বিভিন্ন গুণগুলি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে- এমন একটি সামগ্রীই কেবল হতে পারে অর্থ। অন্যদিকে যেহেতু মূল্যের বিভিন্ন পরিমাণের মধ্যে যে পার্থক্য, তা কেবল পরিমাণগত, সেহেতু অর্থ পণ্যটিকে কেবল পরিমাণগত পার্থক্যেরই সক্ষমতা সম্পন্ন হতে হবে, এবং সেই জন্য তাকে হতে হবে ইচ্ছেমতো বিভাজ্য এবং পুনর্মিলিত হবার ক্ষমতাসম্পন্ন। সোনা ও রূপা প্রকৃতিগতভাবেই এই গুণাবলীর অধিকারী।

অর্থ-পণ্যের ব্যবহার-মূল্য দ্বৈত। পণ্য হিসাবে বিশেষ ব্যবহার মূল্য (যেমন সোনা যা কাজে লাগে দাঁত বাঁধাবার উপাদান হিসাবে, বিলাস-দ্রব্যাদির কাঁচামাল হিসেবে ইত্যাদি) ছাড়াও তা অর্জন করে একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবহার-মূল্য- নির্দিষ্ট সামাজিক ভূমিকা থেকে যার উদ্ভব। অর্থ হচ্ছে সমস্ত পণ্যের সর্বজনীন সমার্ঘ বিশেষ বিশেষ সমার্ঘ সামগ্রী সেই হেতু অর্থের তথা সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রীটির সম্পর্কে বিশেষ বিশেষ সমার্ঘ সামগ্রীগুলি কাজ করে বিশেষ বিশেষ পণ্য হিসাবে।

আমরা দেখেছি যে বাকি সমস্ত পণ্যের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে যে মূল্য-সম্পর্কসমূহ বিদ্যমান, সেই সম্পর্কসমূহের প্রতিক্ষেপ হচ্ছে অর্থ-রূপ- যা উৎক্ষিপ্ত হয়েছে একটি মাত্র পণ্যের ওপর। সুতরাং ঐ অর্থও যে একটা পণ্য, তা কেবল তাদের কাছে একটা নতুন আবিষ্কার বলে প্রতীয়মান হবে যাঁরা তাঁদের বিশ্লেষণ শুরু করেন অর্থের পূর্ণ বিকশিত রূপটি থেকে। অর্থরূপে রূপান্তরিত পণ্যটি বিনিময়-ক্রিয়ার ফলে মূল্য-মন্ডিত হয় না, কেবল তার নিদিষ্ট মূল্যরূপ প্রাপ্ত হয়। এই দুটি সুস্পষ্টভাবে আলাদা আলাদা ব্যাপারকে একাকার করে ফেলে কিছু কিছু লেখক এই সিদ্ধান্তে গিয়ে পৌঁছেছেন যে সোনা বা রূপার মূল্য হচ্ছে কাল্পনিক। কতকগুলি ব্যাপারে অর্থের নিছক প্রতীকগুলিই যে অর্থের কাজ করে থাকে তা থেকে আরও একটা ভ্রান্ত ধারণা উদ্ভব হয় তা এই যে অর্থ নিজেই একটা প্রতীক মাত্র। যাই হোক এই ভ্রান্তির পেছনে একটা মানসিক সংস্কার উঁকি দেয় তা এই যে কোন সামগ্রীর অর্থরূপ সেই সামগ্রীটি থেকে বিচ্ছেদ্য কোন অংশ নয়, বরং সেটা হল এমন একটা রূপ যার মাধ্যমে কতকগুলি সামাজিক সম্পর্কের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই দিক থেকে প্রত্যেকটি পণ্যই হচ্ছে একটা প্রতীক, কেননা যেহেতু তা হচ্ছে মূল্য, সেহেতু সে হচ্ছে তার ওপর ব্যয়িত মনুস্য-শ্রমের বস্তুগত লেফাফা মাত্র। কিন্তু যদি ঘোষণা করা হয় যে একটা নির্দিষ্ট উৎপাদন পদ্ধতির অধীনে বিভিন্ন সামগ্রী কর্তৃক অর্জিত সামাজিক চরিত্রগুলি কিংবা শ্রমের সামাজিক গুণাবলী কর্তৃক অর্জিত বস্তুগত রূপগুলি নিছক প্রতীক মাত্র, তা হলে এই একই নিঃশ্বাসে এটাও ঘোষণা করা হয় যে, এই চরিত্র-বৈশিষ্ট্যগুলি মানবজাতির তথাকথিত সর্বজনীন সম্মতির দ্বারা অনুমোদিত খেয়ালখুশি মত দেওয়া অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। আঠারো শতকে এই ধরনের ব্যাখ্যা বেশ সমর্থন লাভ করেছিল। মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্কগুলি নানান ধাঁধা-লাগানো রূপ ধারণ করেছিল, সেগুলি ব্যাখ্যা করতে না পেরে, লোকে চেয়েছিল সেগুলির উৎপত্তি সম্বন্ধে একটা গৎবাঁধা বৃত্তান্ত হাজির করে সেগুলিকে তাদের অদ্ভূত দৃশ্যরূপ থেকে বিবস্ত্র করতে।

এর আগেই উপরে মন্তব্য করা হয়েছে যে পণ্যের সমার্ঘরূপ তার মূল্যের পরিমাণ বোঝায় না। সুতরাং যদিও আমরা এ বিষয়ে অবগত থাকতে পারি যে সোনা হচ্ছে অর্থ, এবং সেই কারণেই তা বাকি সব পণ্যের সঙ্গে সরাসরি বিনিমেয়, তবুও কিন্তু এই তথ্য থেকে আমরা এটা কোন ক্রমেই জানতে পারি না যে এতটা সোনার, ধরা যাক, ১০০ পাউন্ড সোনার মূল্য কতটা। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে যেমন, অর্থের ক্ষেত্রেও তেমন, অন্যান্য পণ্যের মাধ্যমে ছাড়া সে তার নিজের মূল্য প্রকাশ করতে পারে না। এই মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনে প্রয়োজনীয় শ্রম সময়ের পরিমাপ দিয়ে এবং তা প্রকাশিত হয় একই পরিমাণ শ্রম সময়ে উৎপাদিত অন্য যে কোন পণ্যের মাধ্যমে। তার মূল্যের এবং পরিমাণগত নির্ধারণ তার উৎপাদনের উৎসক্ষেত্রেই দ্রব্য বিনিময় প্রথার মাধ্যমে হয়ে থাকে। যখন তা অর্থরূপে চলাচল করতে শুরু করে তার আগেই কিন্তু তার মূল্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। সতের শতকের শেষের দশকগুলিতে এটা প্রতিপন্ন হয়ে গিয়েছিল যে, অর্থ হচ্ছে একটা পণ্য; কিন্তু এই বক্তব্যে আমরা যা পাই তা হল এই বিশ্লেষণের শৈশবাবস্থা। অর্থ যে একটা পণ্য সেটা পরিষ্কার করা তেমন একটা সমস্যা নয়; সমস্যা দেখা দেয় তখন যখন আমরা চেষ্টা করি কেন, কিভাবে, কি উপায়ের মাধ্যমে পণ্য অর্থে পরিণত হয়।

মূল্যের সবচাইতে প্রাথমিক অভিব্যক্তি থেকে আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পেয়েছি যে ও পণ্য ক=ঔ পণ্য খ; দেখতে পেয়েছি যে যে সামগ্রীটি অন্য একটি সামগ্রীর মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে, সেই সামগ্রীটি প্রতীত হয় যেন তার এই, সম্পর্ক থেকে নিরপেক্ষভাবেই এক সমার্ঘ রূপ আছে- যে রূপটি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গুণ যা প্রকৃতি তাকে দান করেছে। আমরা এই মিথ্যা প্রতীতিকে বিশ্লেষণ করতে করতে শেষ পর্যন্ত তার চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা অবধি গিয়েছি; এই চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা তখনই পূর্ণ সম্পন্ন হয় যখন সর্বজনীন সমার্ঘ রূপটি একটি বিশেষ পণ্যের দৈহিক রূপের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করে এবং এইভাবে অর্থ-রূপে স্ফটিকায়িত ( কেলাসিত) হয়। যা ঘটে বলে দেখা যায় তা এই নয় যে সোনা পরিণত হয় অর্থে এবং তার ফলে বাকি সমস্ত পণ্যের মূল্য প্রকাশিত হয় সোনার মাধ্যমে, বরং উল্টো যে, বাকি সমস্ত পণ্য সর্বজনীনভাবে তাদের মূল্য প্রকাশ করে সোনার মাধ্যমে কেননা সোনা হচ্ছে অর্থ। আদ্যন্ত প্রক্রিয়াটির মধ্যবর্তী পর্যায়গুলি ফলত অদৃশ্য হয়ে যায় ; পেছনে কোন চিহ্নই রেখে যায় না; পণ্যরা দেখতে পায় যে তাদের নিজেদের কোন উদ্যোগ ছাড়াই তাদের মূল্য তাদের সঙ্গের আর একটি পণ্যের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। সোনা ও রূপা এই সামগ্রীগুলি যে মুহূর্তে পৃথিবীর জঠর থেকে বেরিয়ে আসে, সেই মুহূর্তেই তারা হয়ে ওঠে সমস্ত মনুষ্য শ্রমের প্রত্যক্ষ মূর্তরূপ। এখান থেকেই অর্থের যাদু। উপস্থিত যে সমাজ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, সে সমাজে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ায় মানুষের আচরণ নিছক আণবিক (অণুর মতো)। এই কারণে উৎপাদন প্রণালীতে তাদের সম্পর্কগুলি ধারণ করে এমন একটি বস্তুগত চরিত্র, যা তাদের নিয়ন্ত্রণ ও সচেতন থেকে ব্যক্তিগত ক্রিয়াকর্ম থেকে নিরপেক্ষ। এই ঘটনাগুলি প্রথমে আত্মপ্রকাশ করে সাধারণভাবে উৎপন্ন দ্রব্যসমূহের পণ্যের রূপ পরিগ্রহ করার মধ্যে। আমরা দেখেছি কেমন করে পণ্য উৎপাদনকারীদের এক সমাজের ক্রমিক অগ্রগতির ফলে একটি বিশেষ পণ্য অর্থ-রূপের মোহরাঙ্কিত হয়ে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হল। সুতরাং অর্থ যে কুহেলি সৃষ্টি করে তা আসলে পণ্যেরই সৃষ্ট কুহেলি; বৈশিষ্ট্য শুধু এই টুকু যে অর্থের কুহেলি তার সবচাইতে চোখ ধাঁধানো রূপ দিয়ে আমাদের ধাঁধিয়ে দেয়।

(সমাপ্ত)

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৮



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.