ক্যাম্পাস হত্যার মিছিল দীর্ঘতরঃ দায় “উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে” : সুদীপ্ত শাহিন

 

ধারাবাহিকভাবে ঘটছেই দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে একের পর এক হত্যাকান্ড । তাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সমাজের সকল শ্রেণিপেশার মানুষ। সরব হয়ে উঠেছেন বুদ্ধিজীবি , সুশীল সমাজ এবং মিডিয়াও । ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের প্রতি সকলের অভিযোগের অংগুলি নির্দেশ হলেও অনেকেই আবার গোটা ছাত্র রাজনীতিকেই অভিযুক্ত করে তা নিষিদ্ধের দাবি তুলছেন। বিশেষত বুয়েটের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি তোলায় অতি উৎসাহীরা একে রেফারেন্স ধরে সারাদেশেই ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আওয়াজ তুলছে। এ প্রেক্ষিতে তাদের যুক্তি হলো- “ছাত্ররাজনীতিতে আদর্শিক অবস্থান এখন আর নেই, ছাত্ররা লেজুরবৃত্তি রাজনীতি করছে” – এরকম আরও বহু বদনাম। এইসব বদনামের পালে হাওয়া দিতে কোন কোন মিডিয়া দ্বারস্থ হচ্ছে ছাত্ররাজনীতির একাল আর সেকালের পার্থক্য নিরুপণে । শাসক গোষ্ঠির বয়োবৃদ্ধরাও “একদা আমরা ছিলাম. . . . .” এরকম মুখরোচক গল্প জমিয়ে প্রচার মিডিয়াতে এই প্রজন্মের প্রতি এক নাক সিঁটকানো ভাব দেখাচ্ছেন। অথচ আমরা জানি ছাত্র রাজনীতিও শ্রেণি নিরপেক্ষ নয়। বিদ্যমান রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্র দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও ধারণ করে। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বা প্রশাসনের মধ্যেও স্বৈরতন্ত্রের স্বরুপ মূর্ত হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের স্বৈরতন্ত্র রুপ যেমন রাষ্ট্রের শ্রমিক- কৃষক- জনগণের জীবনকে দূর্বিষহ করে তোলে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বৈরতন্ত্রও এই জনগণের সন্ত্বানদের জীবনকে দূর্বিষহ করে তোলে। একই হল- এ, একই ক্যাম্পাসে শত শত বা হাজার হাজার শিক্ষার্থী একসাথে চলার কারণে সচেতন শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যায়, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে বা সহজে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই শাসক গোষ্ঠী একদল লাঠিয়াল তৈরি করে রাখে, যাদের দিয়ে স্বৈরাচারি রাষ্ট্র ও সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে তার স্বৈরতন্ত্র সহজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। পাকিস্তান আমল থেকে সামরিক, বেসামরিক নামে বেনামে হাল আমল পর্যন্ত আমাদের দেশে যতগুলি সরকার এসেছে সকলেই নির্লজ্জভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই অপততপরতা অব্যাহত রেখেছে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে হল দখল, টেন্ডার বাজি, ভর্তি বাণিজ্য শাসক গোষ্ঠীর এই লাঠিয়ালরাই দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে। রাষ্ট্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজনীতি সচেতন ছাত্ররা যাতে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়তে না পারে ছাত্র নামধারী এই লাঠিয়ালদের বিভিন্নরকম পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে ছাত্র- শ্রমিক- কৃষক- জনগণের পক্ষে সবসময়ই আরেকদল শিক্ষার্থী দাঁড়িয়েছে। দেশের বড় বড় অর্জনগুলি তাদের হাত ধরেই এসেছে। অন্যায়, অনিয়মের বিরুদ্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী সবসময়ই দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী আজ পুঁজিবাদী- সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে ঘৃণ্য ফ্যাসিজম আর নয়া- ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে স্বৈরতন্ত্রের প্রকট রুপ ধারণ করছে। তাই শাসক- শোষক শ্রেণির কাছে আমাদের মত দেশে বড় আতংক ও প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ছাত্রসমাজ। তাই এই ছাত্রসমাজ যেনো সংগঠিত হতে না পারে এবং রাজনৈতিক সচেতন হয়ে গড়ে উঠতে না পারে সেই জন্য বিভিন্ন কৌশলে ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শাসক গোষ্ঠীই ছাত্ররাজনীতি বন্ধের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক বুয়েটের রাজনৈতিক অসচেতন ছাত্রদের দাবিকে পুঁজি করে শাসকগোষ্ঠী দেশব্যপী ছাত্ররাজনীতি বন্ধের পাঁয়তারা করছে। এ সমস্ত তৎপরতার মাধ্যমে ভারতের সাথে জাতীয় ও জনস্বার্থবিরোধী বিরোধী চুক্তিকে উন্মোচন ও বিরোধীতা করতে গিয়ে নিহত আবরার হত্যার বিচার দাবির আন্দোলনকেও ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ফাঁপা কথা ও বুলির মাধ্যমে আবরার হত্যার বিচারেরও অনিশ্চয়তা তৈরির চক্রান্ত চলছে। এই হত্যাকান্ডের সাথে ক্ষমতাসীনদের আরও অনেকের সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয় যখন সামনে আসছে তখন পরিকল্পিতভাবে সামনে আনা হচ্ছে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের টপিক। পিছনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এরকমভাবেই অতীতের সমস্ত ক্যাম্পাস হত্যার খুনীদের স্বৈররান্ত্রিক সরকারগুলি রক্ষা করে এসেছে।

দেশের ছাত্ররাজনীতির স্নায়ুবিক স্থান ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ের চিত্র দেখলেই স্পষ্ট হয়ে উঠে শাসক-শোষক গোষ্ঠীর চক্রান্ত । অভ্যন্তরীণ কোন্দল , ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি এসব ঘৃণিত বিষয়-বস্তু নিয়ে শাসক-শোষক গোষ্ঠীর হাতের ক্রীড়ানক ছাত্রসংগঠনগুলোর মাধ্যমে একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটলেও সচেতনভাবেই এ পর্যন্ত কোন সরকার এসব হত্যাকান্ডের কোনটিরও বিচার করে নি । ঘটনা প্রবাহগুলির দিকে চোখ বুলালে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল রাত ১টা ২৫ মিনিটে সূর্যসেন হলের ৬৪৫ ও ৬৪৮ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করে ৭ জনকে টেনে বের করে এনে টিভি রুমের সামনের করিডোরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে। নিহতেরা হলেন – নাজমূল হক কোহিনর , মোহাম্মদ ইদ্রিস, রেজওয়ানুর রব , বশির উদ্দিন আহমেদ জিন্নাহ, আবুল হোসেন এবং এবাদ খান । এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগের সেক্রেটারী শফিউল আজম এর যাজ্জীবন সাজা হলেও অদৃশ্য শক্তি বলে মুক্তি পেয়ে যায় । ১২ এপ্রিল ১৯৭৮ সালে ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ও তাদের সমর্থক ছাত্রীদের সঙ্গে অপর পক্ষের ছাত্রীদের মতবিরোধের জের ধরে পারস্পরিক সংঘষের্ রেজিষ্ট্রার বিল্ডিংয়ের ১২৭ নম্বর কক্ষে এক ছাত্র মারা যায় । যার নাম প্রকাশ করা হয়নি । এই হত্যারও বিচার হয়নি । ১৩ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৩ সালে শিবিরের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শোভাযাত্রা বের হলে কলা ভবনের পশ্চিম গেট অতিক্রম করার সময় সংগ্রাম পরিষদের একটি মিছিল হামলা করে । এত জয়নুল নামের এক ছাত্র মারা যান । এ ঘটনাতেও দোষী সাব্যস্ত্ করা হয়নি । ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টায় জহুরুল হক হল ও এফ রহমান হলের মধ্যবর্তী রাস্তায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ফেব্রুয়ারি প্রস্তুতি মিছিলের ওপর কাঁটা রাইফেলের গুলিবর্ষণে বাকশালের সংগঠক জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ন সম্পাদক ঢাবিতে সমাজ বিঞ্জান শেষ বর্ষের ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া নিহত হন । এ ঘটনার জন্য সরকারি মদদপুষ্ট পেটোয়া বাহিনীকে দায়ী করলেও পরবর্তীতে কোন বিচার হয় নি । ১৯৮৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীর রাতে ছবি টানানো নিয়ে শহীদ মিনারে ছাত্রদল , আওয়ামীলীগ ও জাসদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে । এতে সোহরাব গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । সোহরাবের মায়ের দায়ের করা মামলায়ে ছাত্রদলকে অভিযুক্ত করা হলেও বিচার হয় নি। ৩১ মার্চ ১৯৮৬ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রইউনিয়নের মিছিলের ওপর ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও জাসদ ছাত্রলীগ সম্মিলিত সশস্ত্র আক্রমনের ফলে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী আসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় । এ ঘটনায় কারো বিচার হয়নি । ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ মুহসীন হলের ৪২৬ নম্বর কক্ষে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে । এতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা বাবলু, মাঈনুদ্দীন ও নূর মোহাম্মদ আহত হয়ে পিজিতে নেয়ার পথে মারা যান । একই বছরের ১৪ জুলাই সূর্যসেন হলের একটি কক্ষের দখল নিয়ে ছাত্রদল, জাসদ ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে । এতে সূর্যসেন হলের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইতিহাস বিভাগের ১ম বর্ষেও ছাত্র আব্দুল হালিম নিহত হন । এ ঘটনার জের ধরে ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন রণক্ষেত্রে পরিণত হয় । এতে আরও ৩ জন নিহত হন । নিহতদের মধ্যে শহিদুল্লাহ হলের ছাত্র আসাদ, রিক্সাচালক আব্দুর রহিম এবং পথচারী কামরুল হাসান । এ ঘটনায় ৮ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন এবং কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয় । কিন্তু সেই রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হয়নি । ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সালের রাতে মুহসীন হলের ৩৫৭ নং কক্ষে জাতীয়তাবাদি ছাত্রদলের অন্যতম নেতা বজলুর রহমান শহীদ আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । এ ঘটনায় ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করে ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে রিপোর্ট করতে বলা হলেও সে রিপোর্ট আজও আলোর মূখ দেখেনি। ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকসু নির্বাচনে ফলাফলকে কেন্দ্র করে পরাজিত ছাত্রদলের হামলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মি কফিল উদ্দিন কনক নামের ছাত্র নিহত হন । এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করলেও ঐ তদন্তের ফল আজও জানা যায় নি । ১৯৯০সালের ২৬ নভেম্বর সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য ও ছাত্রদলের থেকে বহিষ্কৃত নেতা নিরু-অভি গ্রুপের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে ক্যাম্পাসের চা দোকানদার নিমাই নিহত হন । এ পরিস্থিতি আর যেন উপনীত না হয় এ বিষয়ে আইন -শৃঙ্খলা বাহিনীকে পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানিয়ে ঘটনার সমাপ্তি ঘটে । এর আগে ১৯৯০ সালের ২১ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার মিছিলে ছাত্রলীগের হামলার জের ধরে ২৫ ফেব্রুয়ারি মধুর কেন্টিনে এক সংঘর্ষে জহুরুল হক হলের ছাত্রলীগের ভিপি শহীদুল ইসলাম চুন্নু মাথায় গুলিবিদ্দ হয়ে মারা যান । এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করে ২০ মার্চের মধ্যে রিপোর্ট পেশ করতে বলা হলেও তার হদিস মেলেনি আজ পর্যন্ত । ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্মর স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্তরে ছাত্রদল ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে ক্রসফায়ারে ডা. মিলন প্রাণ হারান । ২০ জুন ১৯৯১ সালে সিট দখল নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের সূত্র ধরে আওয়মী ছাত্রলীগ ও জাসদ ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষে জাসদ ছাত্রলীগের নেতা মাহবুবুর গুলিবিদ্ধ হন । দীর্ঘ ৪ মাস ধরে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের মধ্যে বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনার জের ধরে ২৭ অক্টোবর ১৯৯১ সালে ছাত্রদল –ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষে ভাষা ইনষ্টিটিউটের সামনে ছাত্রদল কর্মি মির্জা গালিব গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । গালিব কে নেয়ার জন্য এগিয়ে গেলে ছাত্রদল কর্মি লিটন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । এই ২ জনের মৃত্যুর পর ছাত্রদল ছাত্রলীগের উপর ব্যাপকভাবে গুলিবর্ষণ করলে রেজিষ্ট্রারের বাসভবনের সামনে ছাত্রলীগ কর্মি মিজানুর রহমান ও এক টোকাই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় । তখন কারফিউ জারি করে পরিস্থিতি আয়ত্বে আনা হয় । ৯ জানুয়ারি ১৯৯২ সালে টিএসসির সড়কদ্বীপে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা চলাকালে সংগঠনের দুই গ্রুপের কর্মিদের মধ্যে সংঘর্ষে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান বাদল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ গণতান্ত্রিক ছাত্রঐক্য ও ছাত্রদলের মধ্যে গোলাগুলির এক পর্যায়ে ছাত্রইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় নেতা মইন হোসেন রাজু টিএসসির সড়কদ্বীপে গুলিতে নিহত হন । মৃত্যুর পর ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয় । ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ সালে সূর্যসেন হল দখল কে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের ২ গ্রুপের সংঘর্ষে আশরাফুল আজম মামুন ও মাহমুদ হোসেন নামে ছাত্রদল নেতা নিহত হন । এ ঘটনার প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল ও বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা পর্যন্ত –ই ক্ষান্ত থাকেন । ১লা নভেম্বর ১৯৯৩ সালে চাঁদা আদায় ও ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আভ্যন্তলীণ কোন্দলে মারা যান ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা জিন্নাহ । এ প্রেক্ষিতে ৮ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি-ই হয় সর্বশেষ বিচার । ২২ নভেম্বও ১৯৯৩ সালে নিজেদের মধ্যে টেন্ডারের চাদা নিয়ে কোন্দলের শিকার হয়ে মারা য়ান ছাত্রলীগের মন্টু গ্রুপের নেতা অলোক কান্তি । ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে এক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাচের অভ্যন্তরে ছাত্রলীগের মধ্যে পরস্পর বিরোধী ২টি গ্রুপের গোলাগুলিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে পুলিশের টিয়ারশেলের আঘাতে মারা যান বুলবুল নামে এক ছাত্র । এ ঘটনায় ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি র মধ্যেই বিচার কার্য আটকে থাকে । ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ সালের ছাত্রদলের ২টি গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দ্বলে মিঠু নামে এক ছাত্র মারা যায় । ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ সালের ছাত্রলীগের জগন্নাথ হল নেতা জাকিরকে হলের মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় । ছাত্রলীগ এজন্য সরকারী কিলিং এজেন্টকে দায়ী করে । আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিরকেট সভা ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিতেই বিচার কার্য সমাপ্ত করে । ১৩ মার্চ ৯৭ সালে ছাত্রদলের নেতা কামরজ্জামান নিয়ন্ত্রিত ইলিয়াস গ্র“প ও বরিশাল টিটু গ্রুপের মধ্যে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের হিসেবে মুজিব হলের ৩০৫ নং কক্ষে আরিফ কে গুলি করে হত্যা করে । এ ঘটনায়ও একটি তদন্ত কমিটিতেই শেষ । ২৩ এপ্রিল ৯৮ সালে সূর্যসেন হল দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষে পার্তপ্রতিম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় । এ ঘটনার জন্যও একটি তদন্ত কমিটি করে । ২৯ মার্চ ২০০১ সালে ৫০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে খায়রূল আলম লিটন ওরফে কুত্তা লিটন মারা যায় । এ ঘটনার জন্যও ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে । ১৭ আগস্ট ২০০১ সালে গুলিবিদ্ধ হয়ে জিয়াউর রহমান হলের ছাত্রলীগ নেতা ফিরোজ নিহত হন্ । এঘটনায়ও ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি হয় । এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২০১০ এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই গ্র“পের সংঘর্ষে প্রাণ হারান মেধাবী ছাত্র আবু বকর । এ ঘটনায় ৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দেয় পুলিশ । তবে তা গ্রহণ না করে সিআইডি কে পুনর্তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত । গত ২ বছওে আসামী গ্রেফতার তো দূরের কথা কাউকে জিজ্ঞাসা ও করা হয় নি । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কেন্দী্রয় ছাত্ররাজনীতির আরেকটি গুর“ত্বপূর্ন স্থার বুয়েটে গত ২০ বৎসরে মারা গেছে ১৯ জন। যা তদন্ত কমিটি তেই সীমাবদ্দ থাকে বিচারকার্য । এদের মধ্যে ১২ জন এম এ রশিদ হলের ছাত্র ।এবং ৪জনের অস্বভাবিক মৃত্যু । ৭১ সালের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬২ টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে । ভয়াবহ এসব সংঘর্ষে ঝরে গেছে ২৯ টি তাজা প্রাণ । এছাড়াও আহত হয়েছে দুই হাজারের বেশী । এদের মধ্যে ২৭ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র । সংঘর্ষের পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থেকেছে ৬০০ দিন । নিহতদেও মধ্যে ১৫ ছাত্রশিবিরের , ৫ছাত্রলীগের , ৪ জন ছাত্রদলের , ২জন ছাত্রমৈত্রীর এবং ১জন ছাত্র ইউনিয়নের । এছাড়াও অন্যান্য বিশবিদ্যালয়ের ২/১ টি ঘটনা উল্লেখ করলে বোঝা যাবে সমগ্র দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভৎস চিত্র । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৮৮ সালের ১৫ জানুয়ারি জাতীয় ছাত্রসমাজের হাতে নিহত হন আইনুর হক । ৮৮ সালের ১৮ এপ্রিল ট্রেন থকে নামিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা খুন করে আমিনুলকে । সর্বশেষ ২০১২ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের হামলায় মাসুদ ও মুজাহিদুল নামে ছাত্র শিবিরের দুই কর্মি নিহত হয় । ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯২ সালে ২৫ নভেম্বর হরিণায়নপুরে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও ছাত্রমৈত্রীর যৌথ হামলায় নিহত হন সাইফুল । ৯৬ সালে ২৬ সেপ্টেম্বও ছাত্রলীগের হামলায় নিহত হয় আমিনুল । ৯৮ সালে ২৯ অক্টোবর ছাত্রলীগের হামলায় নিহত হন মুহসীন ও মামুন । এছাড়াও জাহাঙ্গীর নগর , কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় , শাহজালাল বিশ্ব বিদ্যালয় সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও অসংখ্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে । তাতে ঝরে গেছে অসংখ্য তাজা প্রাণ । ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র রাজনীতির কারণেই ভীত হয়ে শাসক শোষক শ্রেণী পরিকল্পিতভাবে এসব হত্যাকান্ডের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ নষ্ট করার সুযোগ নিয়ে বেসরকারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করছে । যেখানে শিক্ষা থেকে সর্বোচ্ছ মুনাফার একটা অবাধ সুযোগ এবং ছাত্ররাজনীতির অনুপস্থিতির সুযোগে নিশ্চিত থাকে লুটপাটের নিরাপত্তাও । কিন্তু সব ক্যাম্পাস হত্যাকান্ডের প্রশ্ন একটাই – কী অদৃশ্য কারণে এসব হত্যাকান্ডের বিচার হলো না । আর সেক্ষেত্রে যুক্তির উত্তর হলো- রাষ্ট্রই এসব হত্যাকান্ডের হোতা এবং হত্যাকারীদের রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে । পুঁজিবাদী – সাম্রাজ্যবাদি অর্থনীতি ব্যবস্থার নিজস্ব সংকটের চক্রাকারে একের পর সংকট ও মন্দায় নিমজ্জিত পুঁজিবাদী সাম্রাজৗবাদী দেশগুলো । সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির অভয়ারণ্য বাংলাদেশে অবাধ লুটপাট, সীমাহীন দুর্নীতি, জনস্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপ – এ সমস্ত কারণে ছাত্র জনতা দিন দিন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংক , আই,এম , এফ র নীতি নির্দেশে এ কাজ করতে যেয়ে শাসক শোষক শ্রেণীর একমাত্র ভয় ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রআন্দোলনকে । আর সে কারণেই শাসক শোষক গোষ্ঠী তার শ্রেণী , সঙ্গী সাথী প্রতিক্রিয়াশীল মিডিয়া, বুদ্ধিজীবি বা সূশীল সমাজদের নিয়ে মাথা বেঁধে মাঠে নেমেছে ছাত্ররাজনীতির বদনাম দিয়ে ছাত্ররাজনীতিকে বন্ধ করার ষড়যন্ত্রে । তাই এ ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত উন্মোচন করার দায়িত্ব এই ছাত্রসমাজ বা ছাত্র আন্দোলনের কর্মিদেরকেই নিতে হবে । শাসক শোষক শ্রেণীর হাতের ক্রীড়ানক ছাত্ররাজনীতির বিপরীতে শক্তিশালী করতে হবে বিপ্লবী বিকল্প ধারার ছাত্ররাজনীতিকে ।

লেখক পরিচিতিঃ সুদীপ্ত শাহিন, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ(ময়মনসিংহ জেলা)



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.