[ মানবাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও পরিবেশ আন্দোলন। এবং ‘উন্নয়ন’। আলোচনা করেছেন বিনায়ক সেন। ]

মানবাধিকার আন্দোলনের ধারণা কি ক্রমশ বদলাচ্ছে?

নিশ্চয়ই। তবে, সে বিষয়ে ঢোকার আগে একটা কথা জানিয়ে রাখি। বি ডি শর্মা মারা গেলেন। প্রাক্তন এই আইএএস অফিসার এক সময়ে বস্তারের কালেক্টর ছিলেন। জাতীয় এসসি, এসটি কমিশনের কমিশনার হিসেবে তফসিলি জাতি ও জনজাতি উন্নয়নের ব্যাপারে তাঁর দেওয়া রিপোর্ট মাইলস্টোন হয়ে রয়েছে। তফসিলি জাতি ও জনজাতিদের উপর অত্যাচার ও বঞ্চনা রুখতে তাঁর মস্ত ভূমিকা। ধুতি-শার্ট আর চপ্পল পরে ঘুরে বেড়িয়েছেন বস্তারের আনাচকানাচ। তাঁর সুরক্ষার জন্য কখনও একে-৪৭ লাগেনি। আর এক আইএএস অফিসার প্রয়াত এস আর শঙ্করনকেও প্রসঙ্গত স্মরণ করি (তিনিও ‘পিপল’স আইএএস অফিসার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তফসিলি জাতি ও জনজাতিদের উন্নয়নে প্রায় গোটা জীবন দিয়েছেন অকৃতদার শঙ্করন)। সামাজিক উন্নয়নে সরকারি কর্তাদেরও যে কত বড় ভূমিকা থাকে তা এঁদের দেখলে বোঝা যায়।

এঁরাও সেই অর্থে মানবাধিকার আন্দোলনের শরিক।

অবশ্যই। মানবাধিকার আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় তার ‘প্রো পিপল’ অভিমুখ থেকে। এ আন্দোলনে জনগণের বড় ভূমিকা থাকে। সাধারণ মানুষ এ ক্ষেত্রে চালিকা শক্তি। এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের ভুলগুলো আঙুল দিয়ে দেখায়। কিন্তু রাষ্ট্র ভুল না শোধরালে, আমাদের কথায় মান্যতা না দিলে মানবাধিকার আন্দোলন আহত হয়।

রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্ব বলতে কী বোঝাতে চাইছেন?

দু’টি নজির দিচ্ছি। এক, বছর আটেক আগে অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দেয়, ‘সংঘর্ষে মৃত্যু’র প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এফআইআর করতে হবে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই মামলায় ৩০২ ধারা প্রয়োগ করে তদন্ত করতে হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট সে ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় দেয়নি। দ্বিতীয় উদাহরণ মণিপুর। সেখানে প্রায় দেড় হাজার নথিবদ্ধ সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে ‘র‌্যানডম’ ছ’টি ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্তে দেখা গিয়েছে, ভুয়ো সংঘর্ষের অভিযোগ সত্য। এখন, দেড় হাজার অভিযোগের তদন্ত একসঙ্গে করা সম্ভব নয়, কিন্তু যে ছ’টি ক্ষেত্রে অভিযোগের সারবত্তা পাওয়া গেল, সেখানেও কী প্রতিকার মিলল?

অর্থাৎ, যে যে জায়গা থেকে প্রতিকার পাওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে প্রতিকার পাচ্ছি না। আমরা বুঝে উঠতে পারছি না কী করণীয়।

এই যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সেখান থেকেও তো প্রতিকার পাচ্ছি না। তাদের যা করণীয়, তারা সেটাও তো ঠিক করে করছে না। আমরা ‘পাজলড’। মানবাধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা একটা বড় সমস্যা!

খনি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের অধিকারের আন্দোলনে শঙ্কর গুহনিয়োগীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দল্লি রাজহরায় শহিদ হাসপাতালে কাজ করেছেন আপনি। ছত্তীসগঢ়ের প্রত্যন্তে গিয়ে দীর্ঘদিন বনবাসীদের চিকিৎসা করেছেন। স্বাস্থ্যের অধিকার আন্দোলন কি কিছুটা এগোল? সেটাও তো মানবাধিকার আন্দোলনের আর একটা রূপ।

সে প্রসঙ্গে আসব। কিন্তু স্বাস্থ্যের অধিকারের আগেও নজর দেওয়া দরকার খাদ্য ও পুষ্টির অধিকারের উপরে। জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা জানাচ্ছে, পাঁচ বছরের নীচের প্রতি দু’টি বাচ্চার মধ্যে একটি অপুষ্টিতে ভুগছে। পাঁচ বছরের নীচে যত মৃত্যু ঘটে তার অর্ধেকের পিছনে অপুষ্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাশনাল নিউট্রিশন মনিটরিং ব্যুরো (এনএনএমবি) দেশের জনতার স্বাস্থ্য নিয়ে বারে বারে সমীক্ষা করেছে। দেখা গিয়েছে, দেশের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্কের (পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে) বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ১৮.৫-এর কম। এই মানুষদের অনাহারগ্রস্ত গণ্য করা হচ্ছে। যদিও গত অক্টোবরে কেন্দ্রের নির্দেশে এনএনএমবি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) বলছে, যে কোনও কমিউনিটি-তে ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের বডি মাস ইনডেক্স ১৮.৫-এর কম হলে সে কমিউনিটি অনাহারগ্রস্ত। বা বলা যেতে পারে দুর্ভিক্ষপীড়িত। এই অবস্থা কিন্তু অল্প দিনে হয়নি। এটা একটা স্থায়ী অবস্থা। আমরা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বন্ধ চা বাগানে সমীক্ষা করে দেখেছি, ৪০ শতাংশের অনেক বেশি লোক অনাহারগ্রস্ত। এটাও স্থায়ী অবস্থা। মনে রাখতে হবে, ভারতবাসীর একটা বড় অংশ দুর্ভিক্ষপীড়িত।

এটা অত্যন্ত আশঙ্কার, দুর্ভাগ্যের।

অথচ খাদ্যশস্যের উৎপাদন যথেষ্ট। কিন্তু খাদ্যশস্যের গ্রহণ কম হচ্ছে। ২০০৯-এর এক সমীক্ষা বলছে, উন্নত দেশগুলিতে খাদ্যে প্রোটিনের মাত্রা দৈনিক গড়ে ১০০ গ্রাম। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ৭০ গ্রাম। ভারতে? গড়ে ৫৫ গ্রাম।

তা হলে স্বাস্থ্যের অধিকার থেকে মানুষ এখানে নিদারুণ বঞ্চিত?

হ্যাঁ। চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারের মনোভাবেরও পরিবর্তন ঘটেছে। তা কিছুতেই জনমুখী নয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার বেসরকারিকরণ ঘটেছে ব্যাপক হারে। ‘কর্পোরেটাইজেশন অব হেলথ’ হচ্ছে। এতে গরিবের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগটা ক্ষীণ হয়ে যায়। বড়সড় বঞ্চনা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আপনি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর ইউপিএ সরকার আপনাকে জাতীয় স্বাস্থ্য কমিটিতে রেখেছিল। সেখানে আপনার প্রস্তাবগুলো কী ছিল?

আমি ছিলাম স্টিয়ারিং কমিটিতে। যে বিশেষজ্ঞ কমিটি স্বাস্থ্য বিষয়ক নানা সুপারিশ করেছিল, স্টিয়ারিং কমিটি সেগুলো খতিয়ে দেখে মান্যতা দেয়। কিন্তু যোজনা কমিশনের তৎকালীন ডেপুটি চেয়ারম্যান মন্টেক সিংহ অহলুওয়ালিয়া তার সব ক’টিই খারিজ করে দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এই সব সুপারিশ মানার মতো আর্থিক সামর্থ্য বা পরিকাঠামো, কোনওটাই নেই। বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ ছিল, সামগ্রিক ‘হেল্থ কেয়ার’-এর জন্য প্রায় ১.৭৬ লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন। জনমুখী স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে এই টাকা খরচ করা যায় না, অথচ ‘নন-পারফর্মিং অ্যাসেট’-এ এর দ্বিগুণ খরচের সুপারিশ মানা হয়েছে! তাই স্বাস্থ্যকে সত্যিই জনমুখী করে গরিব মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারের সদিচ্ছা আছে বলে আমি মনে করি না।

নরম পানীয়ের একটি সংস্থার বিরুদ্ধে তামিলনাড়ুর পেরুন্ডুরাইয়ের মানুষ আন্দোলনে নেমেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এমনিতেই গোটা এলাকায় জলের তীব্র অভাব। এর উপর ওই সংস্থা এমন ভাবে ভূগর্ভস্থ জল টেনে নিচ্ছে যে তাঁরা জল পাচ্ছেন না। আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত সরকার ওই সংস্থাকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি তৈরির অনুমতি দেয়নি। ওই সংস্থার বিরুদ্ধে একই কারণে আন্দোলন হয়েছিল কেরলের প্লাচিমাডাতেও। এই ধরনের আন্দোলনও তো এক অর্থে মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলন। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

ঠিকই। যেমন, রায়গড়েও একটি শিল্পগোষ্ঠীর প্লান্ট-এর বিরুদ্ধেও নদী থেকে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি জল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এটা অনেক জায়গাতেই দেখতে পাচ্ছি। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রেক্ষিতে এটা একটা বিরাট সমস্যা। আবার নিয়মগিরিতে জয়ও এসেছে (ওড়িশার পার্বত্য এলাকা নিয়মগিরিতে বক্সাইট খননের জন্য একটি বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর প্রকল্প তীব্র জনআন্দোলনের চাপে সরকার খারিজ করে দেয়।)। পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে জনতা সরব হচ্ছে। এই আন্দোলন আরও তীক্ষ্ণ হবে। চেন্নাইতে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলের বড় উদাহরণ। এটা নিয়ে প্যারিসে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনেও আলোচনা হচ্ছে। আবার, কুড়নকুলামে পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিতে রাষ্ট্রের ভূমিকাও দেখেছি। ওই আন্দোলন শেষ করতে কী না অভিযোগ আনা হয়েছে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে!

জল-সমাধি। কুড়নকুলম পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিবাদে বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি।

ছত্তীসগঢ়েও খনি বেসরকারি হাতে দেওয়া থেকে শুরু করে বেসরকারি শিল্পের হাতে অরণ্যের জমি ছেড়ে দেওয়ার ফলে বনবাসীরা বিপন্ন হচ্ছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেছাড়া। বস্তার থেকে অসংখ্য মানুষের মিছিল চলছে ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশের দিকে। কিন্তু, উন্নয়নেরও তো প্রয়োজন আছে। শিল্পায়নের প্রয়োজন আছে। তা হলে? দু’টো মিলবে কী করে?

আপনি যাকে উন্নয়ন বলছেন, আমি তাকে উন্নয়ন বলি না। পৃথিবীর অনেক দেশই ‘ইনডিজেনাস পপুলেশন’-কে এ ভাবে নিঃশেষ করেছে। আমেরিকা, ইউরোপেও হয়েছে। ভারতেও হচ্ছে। এই যে ব্যাপক অনাহার, যেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদনে কোনও ঘাটতি নেই, সেখানে কিছু লোক অনেক বেশি খেতে পাচ্ছে আর অনেক লোক একেবারেই পাচ্ছে না— এই যে অবস্থাটা, এটাকে উন্নয়ন বলা চলে না। ইনডিজেনাস পপুলেশন-কে উৎখাত করে এটা চলবে না। জনতা এটা প্রতিহত করবে।

আপনি মানবাধিকার সংগঠন পিইউসিএল-এর পদাধিকারী ছিলেন। দীর্ঘ দিন মানবাধিকার আন্দোলনে আছেন। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও অ-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মূল্যায়নে আপনাদের সংগঠনের সঙ্গে অন্য একাধিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতপার্থক্য আছে। আপনারা অ-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসেরও সমালোচনা করছেন। কিন্তু অন্য অনেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসেরই সমালোচনা করে, অন্য পক্ষের সন্ত্রাস নিয়ে ততটা সরব নয়। বালাগোপাল, কান্নাবিরানদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আপনাদের মতপার্থক্য ছিল…

মানবাধিকার আন্দোলন কোনও ধরনের সন্ত্রাসকেই সমর্থন করবে না। কান্নাবিরান দীর্ঘ কাল আমাদের সংগঠনের শীর্ষ পদে ছিলেন, তাঁকে আমি মানবাধিকার আন্দোলনের গুরু বলে মনে করি। আর অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না। আমাদের অবস্থান আমি খুব স্পষ্ট করেই জানিয়েছি।

মাওবাদীরাও তো প্রান্তিক মানুষের অধিকারের আন্দোলনে সমর্থন জোগাচ্ছেন, আদিবাসীদের, বনবাসীদের অধিকার রক্ষায় হাতিয়ার তুলেছেন। মাওবাদীরাও কি একটা শক্তি নয়?

জনগণ তাঁদের অধিকার নিয়ে সরব হচ্ছেন। কোন আইডেন্টিটি নিয়ে তাঁরা এটা করছেন, কোন কোন ক্ষেত্রে কাদের সাহায্য নিচ্ছেন, এটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, এই অধিকার থেকে জনসাধারণকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। মাওবাদীরা তাঁদের কার্যকলাপ নিয়েই নিজেদের ‘আইডেন্টিটি’ প্রতিষ্ঠা করবেন।

বারে বারেই মাওবাদীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার প্রসঙ্গ উঠছে। সেই আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

শান্তি আলোচনা নিয়ে অনেক আগেই সচেষ্ট হয়েছিলাম। আমি মনে করি, শান্তি আলোচনা ছাড়া কোনও সমাধান বের হবে না। তবে, আলোচনা চলার সময়ে বহু সময় রাষ্ট্রশক্তি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কিন্তু, সন্ত্রাস যে পক্ষই করুক না কেন, তাকে স্বীকৃতি দেওয়া চলবে না। তাকে ‘ডিরেকগনাইজ’ করতে হবে। রোসা লুক্সেমবার্গ একটা কথা বলতেন, ‘সোশ্যালিজম’ না হলে ‘বারবারিজম’ কায়েম হবে। কাজেই সমাজতন্ত্র আসাটা খুব দরকার।

সূত্রঃ anandabazar