পাহাড়ী জনগণ তাক করা বন্দুকের নলের মুখেই রয়ে গেছেন

Tribel-Women-Pic3

পার্বত্য চট্টগ্রামে তথাকথিত শান্তি আলোচনা
পাহাড়ী জনগণ তাক করা বন্দুকের নলের মুখেই রয়ে গেছেন

(ফেব্রুয়ারি/’৯৩)

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী জনগণ বিশ বছর যাবত রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনীর বুটের তলায় রয়েছেন।  পাহাড়ী জনগণের খাওয়া-পরা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবন-যাপনের প্রতিটা ক্ষেত্রে সামরিক কর্মকর্তাদের অনুমতিপত্র ছাড়া চলে না।  হাট-বাজার, কৃষি কাজের জন্য লাঙ্গল নিয়ে মঠে যাওয়া, স্কুল-কলেজে লেখাপড়ার জন্য ভর্তি হতে যাওয়া, আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া- যে কোন ক্ষেত্রেই এই অনুমতি অবশ্য অবশ্যই লাগবে।  নচেৎ জেল বা মারপিট খেয়ে ‘দুষ্কৃতকারী’ হতে হয়।  এই হচ্ছে গত বিশ বছর যাবৎ পাহাড়ী জনগণের জীবন ব্যবস্থা। সেখানে এই জনগণ প্রতি পদে পদে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী শাসনে পদদলিত।  এই রাষ্ট্রীয় সামরিক সন্ত্রাসী শাসনের আওতায়ই খালেদার সরকার এখন নতুন করে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলছে।  এই জন্য সংসদীয় কমিটি গঠন করে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘শান্তিবাহিনী’র সাথে।  দু’দফা আলোচনা ইতিমধ্যে হয়েছেও। এই আলোচনা নাকি ওখানকার জনগণের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।  এ ব্যাপারে উভয় পক্ষ থেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রচার চালানোও হচ্ছে।  কথিত এই ‘শান্তি’ আলোচনা পাহাড়ী জনগণের জীবনে কেমন ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করবে তা সহজেই বলে দেওয়া যায়, শুধুমাত্র একটি বাস্তবতাকেই বিচার করে। আলোচনায় দুই পক্ষই পাহাড়ী জনগণের জীবনকে সামরিক শাসকের অনুমোদনপত্রের শৃঙ্খলে রেখেই আলোচনা চালাচ্ছে।  এটা হচ্ছে পাহাড়ী জাতি ও জনগণকে বন্দুকের নলের মুখে রেখে আলোচনা চালানো।  কীভাবে এই আলোচনা সৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হতে পারে?
পাহাড়ী জনগণের বুকে বন্দুকের নল তাক করে রেখে সরকারী পক্ষের এই আলোচনা তার বর্বর ফ্যাসিস্ট নিপীড়ক চরিত্রই পুনরায় প্রমাণ করছে।  অন্যদিকে শান্তিবাহিনীর নেতারা নির্লজ্জ আপোস ও জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার পথই অনুসরণ করছে।  এ আলোচনা যখন থেকে শুরু হয়েছে তারপর কয়েক মাস অতিবাহিত হয়েছে।  উভয় পক্ষের কিছু কিছু কূটনৈতিক কথাবার্তা ও ফাঁকা ‘আশাবাদ’ ছাড়া জনগণ কিছুই পায়নি।  অথচ এ ক’মাসেই আলোচনা চলাকালীনও এই জাতীয় নিপীড়ক সরকার রাডার, জুম্মকণ্ঠ ও স্যাটেলাইট নামে তিনটি পত্রিকা পরপর নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ পত্রিকাগুলো পাহাড়ী জনগণের উপর সেনাবাহিনী ও বাঙালী অত্যাচারীদের বর্বর নির্যাতনের অল্প কিছু সত্য চিত্র তুলে ধরেছিল মাত্র। এ সময়ই লোগাং গণহত্যার তথাকথিত তদন্ত রিপোর্ট এই ফ্যাসিস্ট সরকার প্রকাশ করে।  এতেও নিপীড়নকে আড়াল করা হয়েছে।  সুতরাং পাহাড়ী জনগণ কীভাবে এই সরকার ও শাসক শ্রেণীর সাথে এমন একটি আলোচনায় নিজেদের অধিকার পাবে আশা করতে পারেন?
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের যে কোন উদ্যোগের প্রাথমিক পূর্বশর্ত হতে পারে পাহাড় থেকে ফ্যাসিস্ট বাঙালী সেনাবাহিনীর অপসারণ এবং পাহাড়ে বাঙালী পুনর্বাসন বন্ধ।  এছাড়া সমস্ত আলোচনা ব্যর্থ হতে বাধ্য। পাহাড়ী জনগণের স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে কিছু বেঈমান নিজেদের ভাগ্য হয়তো গড়তে পারবে, কিন্তু পাহাড়ী জনগণের জীবনে এক বিন্দু শান্তি বর্ষিত হবে না।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা

 


কল্পনা চাকমা অপহরণের বিশ বছরঃ ‘CHT Writers & Activist Forum’ এর প্রতিবাদ সমাবেশ

13441602_10209686776070609_2113410291_o

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

।।  কল্পনা চাকমা ও বিচারহীন রাষ্ট্র

কল্পনা চাকমা অপহরণের বিশ বছর পদাপর্ণে এবং এমেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের ফটো একশন কার্যক্রমের সমর্থনে গতকাল ১০ই জুন বিকেল ৪টায় শাহাবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের প্রাঙ্গনে “সিএইচটি রাইটারস এন্ড এক্টিভিষ্ট ফোরাম” এক মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে।  সমাবেশে বিশ (২০) বছর আগে অপহরণ হওয়া কল্পনা চাকমার খোঁজ চেয়ে বক্তারা তাঁদের বক্তব্য পেশ করেন।  বক্তাগণ পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কার্যকলাপের বিচারহীনতার দায়, অতীত এবং বর্তমানে বিরামহীন অরাজকতার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ঐচ্ছিক ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরেন।  সমাবেশটি শুরু হয় আহ্বায়ক বুক্কু চাকমা ও সঞ্চালকের দায়িত্বে থাকা জয় মারমার নেতৃত্বে।  সমাবেশে তরুণ ছাত্রনেতা ইকুবাবু চাকমা কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন- ১৯৯৬ সালে বাগাইছড়ির নাইল্যাগোনা গ্রাম থেকে আনুমানিক রাত তিনটার (৩টার) সময় সেনাবাহিনী কতৃক অপহৃত হওয়া কল্পনা চাকমা ছিলেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক।  তাঁর মতন লড়াকু সৈনিককে সে সময় স্তব্ধ করার জন্য সেনাবাহিনীর এক লেফটেন্যান্ট কতৃক তিনি অপহৃত হন এবং এরপরে তাঁর কোনপ্রকার খোঁজ পাওয়া যায়নি।  উক্ত সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি .তাঁর বক্তব্য তিনি বলেন- আজ যে বিচারহীনতা সারাদেশজুড়ে শুরু হয়েছে এটি শুরু হয়েছিলো পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে, কল্পনা চাকমার মত এক সংগ্রামী নেত্রীর জীবনে কি ঘটেছিলো তা আজো আমরা জানি না অথচ প্রধানমন্ত্রী বলছেন তিনি নাকি চিফ অফ গর্ভমেন্ট, আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাই, এই কল্পনা চাকমার বিচার আমরা কবে পাবো।  সেই সময়ের সহযোদ্ধা ইলিরা দেওয়ান বলেন-পুলিশের দ্বারা ধর্ষিত হয়ে খুন হওয়া ইয়াসমিনের বিচার রাষ্ট্র তিনবছরের মাথায় করতে পারলেও কল্পনা চাকমা অপহরনের বিচার আজ বিশ বছরেও করা সম্ভব হয়নি শুধুমাত্র উগ্র জাতিগত আগ্রাসনের মনোভাবের কারনে। কয়েকদিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, ওনার কাছে হত্যাকান্ডের যাবতীয় ঘটনার তথ্য আছে, তাহলে তনুর ধর্ষন ও হত্যার তথ্যও নিশ্চয় উনার কাছে আছে।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাহলে সেটা প্রকাশ করে ন্যায় বিচার করুন! বিশ বছর আগে অপহৃত হওয়া কল্পনা চাকমা হতে শুরু করে আজ ধর্ষিত হয়ে খুন হওয়া হতভাগী তনু, সেই একই রাষ্ট্রীয় দৈত্য আজ পাহাড় কিংবা সমতল সবাখানে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে।

উক্ত সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন আনিস রায়হান, সমগীত সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণের রেবেকা নীলা, হানা শামস আহমেদ, অজল দেওয়ান, আলোড়ন খীসা, ডিসেন্সি চাকমা, নিউটন চাকমাসহ আরো বিভিন্ন সংগঠনের বাম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।  শেষে “সিএইচটি রাইটার্স এন্ড এক্টিভিষ্ট ফোরাম”র মুখপাত্র ও সঞ্চালকের দায়িত্বে থাকা জয় মারমা ভবিষ্যতে রাজপথে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে উক্ত সমাবেশের ইতি টানেন।


নানিয়ার চরে গণহত্যা ও খুনীদের সাথে জনসংহতি’র শান্তি আলোচনা

নানিয়ারচর উপজেলা

 নানিয়ার চরে গণহত্যা ও খুনীদের সাথে জনসংহতি’র শান্তি আলোচনা

(ডিসেম্বর/’৯৩)

উগ্র জাতীয়তাবাদী বাঙালী আমলা ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের সেনাবাহিনী ১৭ নভেম্বর, ’৯৩ আরেকবার রাঙামাটির নানিয়ার চরে পাহাড়ী জনগণের রক্তে ভাসিয়ে দিল পার্বত্য চট্টগ্রাম।  এটি হচ্ছে খালেদা সরকারের ‘গণতন্ত্র’ আমলের ২য় দফা পাহাড়ী গণহত্যা।  ’৯২ সালে রাঙামাটির লোগাং-এ আরেকটি গণহত্যা এই ‘গণতন্ত্রী’রা চালিয়েছিল।  তার আগে এরশাদ ও জিয়া আমলে ছোট-বড়, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত এরকম গণহত্যা অনেকবার চালিয়েছে এদেশের শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী।

নানিয়ারচর হত্যাকান্ডের বিবরণ
পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এদিন (১৭ নভেম্বর) পূর্ব ঘোষিত মিছিল, সমাবেশ শুরু করে নানিয়ারচরে অন্যায়ভাবে খবরদারি করা সেনাছাউনি প্রত্যাহারের ন্যায়সঙ্গত দাবিতে।  এ সময় পার্বত্য গণপরিষদ নামধারী স্বৈরাচারী খালেদা সরকারের লেলিয়ে দেয়া উগ্র বাঙালী কুত্তারা বর্বরভাবে পাহাড়ী ছাত্র-জনতার সমাবেশে হামলা করে সমাবেশ ভণ্ডুল করে। নানিয়ারচরে উগ্র বাঙালী বন্দুকধারী ওসি এ সময় ‘ডিসি এসপি আসছে ………….. আপনারা অপেক্ষা করুন’ এ ধরনের আশ্বাস দিয়ে সুকৌশলে পাহাড়ীদেরকে প্রতিরোধহীন করে রাখে।  উগ্র বাঙালী সশস্ত্র খুনীদের নানিয়ারচর হাসপাতালের দিকে জড়ো করে আক্রমণ চালাতে প্রস্তুত করতে থাকে।  ৪০ ইবি বাঙালী সেনাবাহিনীর ল্যান্স নায়েক নাজিম হুইসেল বাজানোর সাথে সাথে খুনীরা পাহাড়ীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।  পাহাড়ী জনগণ সংগঠিত হবার চেষ্টা মাত্রই সেনাবাহিনী তাদের উপর এলোপাতাড়ি ব্রাশ ফায়ার করে।  এখানে তাৎক্ষণিকভাবে শহীদ হন ফনি ভূষণ চাকমা, শোভাপূর্ণ চাকমা, বীরেন্দ্র চাকমাসহ ৮ জন পাহাড়ী। যারা প্রাণ রক্ষার্থে পানিতে ঝাঁপ দেন।  তাদের উপর জেটবোট ও নৌকার উপর থেকে বর্বর সেনাবাহিনী ও অনুপ্রবেশকারী উগ্র জাতীয়তাবাদীরা বল্লম, বর্শা মেরে কুপিয়ে হত্যা করে।  ৪০ ইবি রেজিমেন্টের মেজর মোস্তাফিজের নেতৃত্বে ৩০/৩৫ জন আর্মী বেয়নেট দিয়ে কোপায়।  আর দাঙ্গায় মারা গেছে দেখানোর জন্য লেলিয়ে দেয়া পার্বত্য গণপরিষদের জল্লাদরা সেই আহতদেরকে আহত অবস্থায়ই কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।
এরা অনেক লাশ গুম করে বাকি লাশগুলো আত্মীয়-স্বজনকে ফেরত বা সৎকারের সুযোগ না দিয়ে একত্রে পুড়িয়ে ফেলে পাহাড়ীদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রীতিকে অবমাননা করে। অথচ বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়াদের সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট পত্রিকা ইনকিলাব ১৮ তারিখে লিখলো- ‘২৫ জন আহত’।  সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়াদের পত্রিকা ইত্তেফাক একই তারিখে বলল- ‘১ জন নিহত’। ইত্তেফাক, ইনকিলাব যে উগ্র বাঙালী বড় বুর্জোয়া শাসক খুনীদের পত্রিকা, মিথ্যুকদের পত্রিকা- এটাই তার প্রমাণ।  ইতিপূর্বেও সর্বদাই এরা এভাবে গণহত্যাকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছে।

এরপর পাহাড়ী জনগণের রক্ত মাড়িয়ে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ’ আলোচনা
পাহাড়ী জনতার রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই আমরা শুনলাম আরেক তামাশার কথা।  খুনী সরকারের পাঠানো প্রতিনিধি দলের সাথেই ‘শান্তি বৈঠক’ করল পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনী সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জে.এস.এস.) গণহত্যার মাত্র এক সপ্তাহ পরে। এমনকি আরেকবার ‘অস্ত্রবিরতি’ চুক্তির মেয়াদও তারা বাড়াল। কিসের অস্ত্রবিরতি ! যে দুষ্কৃতিকারীরা মাত্র সাতদিন আগে অস্ত্র দিয়ে ব্রাশ ফায়ার, বন্দুকের বাঁট-বর্শা দিয়ে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা করল ত্রিশজনের অধিক পাহাড়ীদের- তাদের সাথেই ‘অস্ত্র বিরতি’।  এটা কি নানিয়ারচরের ওসি’র মতোই ভূমিকা নয়? যদি ষষ্ঠ দফায় অস্ত্র বিরতিই হয়, তবে নানিয়ারচরে আর্মীদের গণহত্যার জবাব কি দেবেন জনসংহতি সমিতি নেতৃবৃন্দ? অস্ত্রবিরতি যদি হত্যা-নির্যাতন বন্ধের জন্য হয় তবে তার প্রথম শর্ত হতে হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এই সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, প্রতিবিপ্লবী উগ্র বাঙালী পার্বত্য গণপরিষদ নামধারী খুনী বাহিনীকে চট্টগ্রাম থেকে সরানো, তাদের নিষিদ্ধ করা।  সেটা হয়নি, বরং আমরা পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নানিয়ারচর থানা শাখার “জরুরী বিবৃতি” থেকে জানতে পারছি “যে যাত্রী ছাউনি নিয়ে সেনাবাহিনী ৪০ ইবি রেজিমেন্ট এত বড় হত্যাকা- সম্পন্ন করল, এতো লোকের রক্ত ঝড়িয়ে এখনও বীরদর্পে যাত্রী ছাউনি দখল করে রেখে চেকপোষ্ট বানিয়ে রেখেছে- এটাই প্রমাণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনো সেনা অপশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট”।
এ অবস্থায় কথিত অস্ত্রবিরতির কেবল একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে তা হচ্ছে সশস্ত্র হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পাহাড়ী জনগণকে তাদের সংগ্রাম-লড়াই থেকে বিরত করা। তাই এই “শান্তি আলোচনা”- তা “সৌহার্দ্যপূর্ণ” হয়েছে বলে জে.এস.এস. নেতার সন্তুষ্টি- এ সব হচ্ছে উগ্র বাঙালী শাসকশ্রেণীর গণহত্যা-নির্যাতনের প্রতিনিয়ত শিকার পাহাড়ী জনগণের স্বার্থের বিপরীত।  এটা হচ্ছে নানিয়ারচরের বিদ্রোহী পাহাড়ী তরুণদের স্বার্থের বিরোধী।  সেটা আমরা দেখি “বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কমিটি ও জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ পার্বত্য এলাকায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যে কোন জনগোষ্ঠীর উসকানিমূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন” (দৈনিক বাংলা ২৫-১১-’৯৩)- এই রিপোর্ট থেকে।  এখানে খুনী সরকার-সেনাবাহিনী ও পার্বত্য গণপরিষদের নরপিশাচদের কাতারেই ফেলা হয়েছে পাহাড়ী জনগণ ও তাদের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে।  আরেক দিকে বাঙালী মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর বলির পাঁঠা পুনর্বাসিত বাঙালীদের সম্পর্কেও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে।  এই বাঙালী গরিব জনগণকে শোষণ নির্যাতন, জমি থেকে উচ্ছেদ, বস্তি-পেশা থেকে উচ্ছেদ করে যে খুনী শাসক শ্রেণী পাহাড়ীদের অধিকার হরণের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহারের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে পাঠিয়েছে সেই জনগণকেই মূল অপরাধী প্রমাণ করতে বাঙালী বা পাহাড়ী কোন বুর্জোয়াদেরই আপত্তি নেই।

পাহাড়ীদের বন্ধু কারা, পাহাড়ীদের শত্রু কারা- 
কি হবে তাদের মুক্তির পথ (?)
পার্বত্য চট্টগ্রাম গণহত্যা কেবল খালেদার বিএনপি সরকারই করেনি খুনী ফ্যাসিস্ট ‘বাঙালী সমন্বয় পরিষদ’, ‘পার্বত্য গণপরিষদ’-এ পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় আঃ লীগ নেতৃবৃন্দই নেতৃত্ব দিচ্ছে (দেখুন ‘সময়’ পত্রিকা, ৩-১২-’৯৩)।
আঃ লীগ এমনকি যেনতেন কারণেই হরতাল-ধর্মঘট ডাকে, সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে- কিন্তু নানিয়ারচর গণহত্যার জন্য তারা একটা ধর্মঘট তো দূরে থাকুক, জোরালো কোন প্রতিবাদও করেনি।  এর কারণ হচ্ছে কোনভাবেই সেনাবাহিনীকে অসন্তুষ্ট করা যাবে না, কারণ তাতে ক্ষমতায় যাবার আশা তাদের বানচাল হতে পারে।
এই আঃ লীগের মৃত নেতা শেখ মুজিব উগ্র বাঙালী বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি হিসেবে পাহাড়ী সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহকে বাঙালী হতে বলেছিল এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী বাহিনীর সহযোগিতায় ’৭২/’৭৩-এ পাহাড়ীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও শুরু করেছিল। ফ্যাসিস্ট বুর্জোয়া জিয়া সরকার আমলে পাহাড়ে চালানো হয়েছিল কুখ্যাত ‘লংগদু হত্যাকান্ড’। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের আমলে অব্যাহত গণহত্যা-নির্যাতন অন্যায়ভাবে বাঙালী পুনর্বাসনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক পাহাড়ীদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। জামাতের মুখপত্র ‘সংগ্রাম’ উপ-সম্পাদকীয় লিখে প্রমাণ করতে চায় পাহাড়ীরাই পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত; শত শত বছর আগে বাঙালীরাই নাকি সেখানে ছিল।  পাহাড়ীদের উৎখাত-নির্যাতন-শোষণ করার কতখানি ফ্যাসিবাদী যুক্তি! ফিলিস্তিনিদের আবাসভূমি দখল করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পুলিশী রাষ্ট্র ইজরাইলী ইহুদীবাদীরা যুক্তি দেয়, তারাই এখানে আদি নাগরিক, লক্ষ লক্ষ বছর আগে ইহুদীরাই এখানে ছিল। বাংলাদেশী মুসলমান সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী আর ইজরাইলী ইহুদীবাদীদের ফ্যাসিবাদ, আগ্রাসন, পররাজ্য গ্রাস-এর যুক্তি এখানে সম্পূর্ণ একই।  আর এই যুক্তিই পার্বত্য চট্টগ্রামে ফেরী করছে পার্বত্য গণপরিষদ, আঃ লীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি, বাঙালী সেনা আমলাসহ পুরা শাসক শ্রেণী।  এই পুরা বাঙালী বড়-বুর্জোয়া ধনী সামন্ত শ্রেণীটাই পাহাড়ীদের শত্রু, পাহাড়ী জনগণ এটা ভালভাবেই বোঝেন। একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশেই নির্যাতিত জাতি-শ্রেণী-জনগণের সাধারণ শত্রু ভারত আছে ওঁৎ পেতে পাহাড়ীদের গ্রাস করতে।  পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা, পাহাড়ী জনগণের অধিকারের অর্থ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এই শত্রুগুলোকে উৎখাত করা।  এছাড়া ‘শান্তি আলোচনা’ যারা চালায় তারা পাহাড়ীদের স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী ব্যতীত আর কিছুই নয়।
অন্যদিকে পাহাড়ী জনগণের বন্ধু হচ্ছে সারা দুনিয়ার নির্যাতিতরা।  আজ পাহাড় থেকে যে শত্রুদের পাহাড়ী জনগণকে উৎখাত করতে হবে, সমতল ভূমি থেকে বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তকে তার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যও উৎখাত করতে হবে সেই একই বাঙালী বড় বুর্জোয়া-বড় আমলা-জেনারেল ও তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদকে।
শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ’৭১-এর পর যেমন রক্ষীবাহিনী দিয়ে হাজার হাজার মুক্তিকামী সংগ্রামী-বিপ্লবীদের হত্যা করা হয়েছে, বাঙালী জনগণের মুক্তি হয়নি, তেমনি শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্যাতিত জাতিসত্তার প্রকৃত মুক্তি অসম্ভব।  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কমিটির সাথে শান্তি আলোচনায় বসে জনসংহতির নেতারা আজ পাহাড়ী যুবকদের ন্যায্য সংগ্রামকে ‘উসকানিমূলক কর্মকান্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করে পাহাড়ীদের উপর গণহত্যাকে ন্যায্য ও পাহাড়ীদের বিদ্রোহকে অপরাধের কাতারে ফেলেছে।  সংশোধনবাদীরা আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের এই বুর্জোয়া সমাধানেরই লেজুড়বৃত্তি করছে।  ৫ দল নেতা মেনন সাহেব নির্যাতক, হত্যাকারী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী অলি আহম্মদের নেতৃত্বের সাথী হয়ে বাঙালী বুর্জোয়াদেরই উলঙ্গ লেজুড়বৃত্তি করতে গেছে নির্লজ্জভাবে।  আর সংশোধনবাদীদের অন্যতম মুখপত্র ‘সময়’ পত্রিকা প্রেসক্রিপশন করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার প্রধান সমাধান নাকি ‘সরকার ও জনসংহতি সমিতি উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।’ এরা লুটেরা ও খুনীদের সাথে আপোষ, শত্রু শ্রেণীর ‘ভাল হয়ে যাওয়া’র ভুয়া আশার পেছনে জনগণকে ছুটাতে চায়।  পার্বত্য চট্টগ্রামের কথিত রাজনৈতিক সমাধান বলতে এরা এটাই বোঝায়।
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমাধান একমাত্র বাঙালী সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, পুনর্বাসিত বাঙালীদের পাহাড় থেকে ফেরত আনা, বাঙালী বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উৎখাত এবং পাহাড়ীদের পরিপূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। আর সেটার পথ আর কেউ বাতলাতে পারে না- একমাত্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের বিপ্লবী আদর্শ ছাড়া।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


খাগড়াছড়ি মহাসম্মেলন: শান্তি আলোচনা-প্রশাসনিক সমাধান বনাম পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার

larma-lrg20151202200326

খাগড়াছড়ি মহাসম্মেলন: শান্তি আলোচনা-প্রশাসনিক সমাধান বনাম পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার

(মে/’৯৪)

গত ৯ এপ্রিল ’৯৪ অনুষ্ঠিত হলো ‘পাহাড়ী গণপরিষদ’-এর উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে খাগড়াছড়ি মহাসম্মেলন। পাহাড়ী গণপরিষদ, ছাত্র পরিষদসহ পাহাড়ী নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন মার্কসবাদী দাবিদার দলসমূহ, বুর্জোয়া মানবাধিকারবাদীসহ সাতজন বক্তা সমতল থেকে আমন্ত্রিত হয়ে উক্ত মহাসমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন। বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধিও এই মহাসমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন। মহাসমাবেশের উদ্যোক্তাদের মূল শ্লোগান ছিল ‘স্বায়ত্তশাসনই একমাত্র সমাধান।’ উপস্থিত বিভিন্ন জাতীয় সংগঠন এবং পাহাড়ী নেতৃবৃন্দের সমস্ত আলোচনায় দুইটি পথের কথা উল্লেখিত হয় পাহাড়ী জনগণের জাতিগত মুক্তির প্রশ্নে . . . . . . .
একটি হচ্ছেঃ সরকারী প্রতিনিধি দলের সাথে ‘জনসংহতি সমিতি’র আলোচনা, বাঙালী শাসক-বুর্জোয়া শ্রেণীর সংসদ। এসবের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন সাংবিধানিক তথা প্রশাসনিক সমাধান।
আরেকটি পথ হচ্ছেঃ পাহাড়ী জাতিসত্তাসমূহের জনগণের সংগ্রামের পথে প্রকৃত জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার তথা প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন- দুইটি পথ সম্পূূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

বিপুল উদ্দীপনা, সংগ্রামের দৃঢ় প্রত্যয় পাহাড়ী কৃষক-ছাত্র-জনগণের হৃদয়ে

৯ তারিখ সকালে আমরা যখন সম্মেলন স্থলে পৌঁছলাম, পাহাড়ী ছাত্র-জনগণ ও নেতৃবৃন্দ শ্লোগান দিয়ে আমাদেরকে স্বাগত জানালেন।  ঢাকা থেকে ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট, জাসদের কেন্দ্রীয় নেতারা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক মানবাধিকারবাদী ব্যারিস্টার লুৎফর রহমান শাহ্জাহান আগের দিনই খাগড়াছড়ি পৌঁছেছেন।  দুই হাজারেরও অধিক পাহাড়ী ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমজীবী-পেশাজীবী জুম চাষীর উৎসাহী অংশগ্রহণ লক্ষণীয়।  এদের প্রায় সকলেরই হৃদয়ের যে আকাংখাটি চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল তা হলো সংগ্রামের দৃঢ় প্রত্যয় এবং সঠিক পথ পাবার অনুসন্ধিৎসা।  তারা বক্তাদের বক্তব্য শুনেছেন অভাবনীয় মনোযোগের সাথে। কিন্তু কি তাদের মুক্তির সেই পথ!! যা জানবার জন্য আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার এই উৎকণ্ঠা?

শান্তি বৈঠক ও একই সাথে নানিয়ারচর গণহত্যা!
মহাসম্মেলনে যে প্রশ্নটি গুরুত্ব সহকারে এসেছে তা হচ্ছে সরকারী কমিটির সাথে জনসংহতির আলোচনা।  ১০ এপ্রিল লোগাং হত্যাদিবস উপলক্ষে প্রখর রৌদ্রের ভিতর হাজার হাজার পাহাড়ীর সমাবেশে উপস্থাপক জনৈক ছাত্র নেতা বলছিলেন, এই আলোচনা আসলে আমাদের কিছুই দিতে পারেনি।  এটা পাহাড়ীদের উপর নিরাপদে হত্যা-নির্যাতন চালানোর লক্ষ্যে সময় ক্ষেপণ মাত্র। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতা জগজিৎ বড়ুয়া ও এই সরকারী ষড়যন্ত্রের বিরোধিতা করে লোগাং-এ বক্তব্য রেখেছেন।  আন্দোলন পত্রিকার গত সংখ্যায় এই শান্তি আলোচনার মধ্যেই কীভাবে ঠাণ্ডা মাথায় নানিয়ারচরে বর্বোরোচিত হত্যাকান্ডে পাহাড়ী জনগণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে তা বর্ণনা করা হয়েছে।  এখন পাহাড়ীদের সংগ্রামের সামনে এ প্রশ্নটা খুবই স্পষ্ট আকারেই আসছেঃ তাদেরকে খুন-লুটপাট-ধর্ষণ করবার জন্য উগ্র বাঙালী বড় ধনী শাসক শ্রেণীর আর্মী রয়েছে, বাঙালী পুনর্বাসনের মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে পাহাড়ীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু করার ও তাদের জাতিগত অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া, সে অবস্থায় এই শান্তি আলোচনায় কি তাদের সমাধান?  অবশ্য বাঙালী উগ্র জাতীয়তাবাদী সরকারী প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য রাশেদ খান মেননের দল ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিনিধি তার বক্তব্যে এই শান্তি আলোচনাকে সমর্থন করেছে।
পাহাড়ী জনগণের মধ্যে হতাশা ছড়াতে প্রচার চলছে- কোন্দিন এদেশে বিপ্লব হবে ততোদিনে পাহাড়ীরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তাই সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে যা পাওয়া যায়- তাই ভালো। এমন প্রচারও চলছে, পাহাড়ী জনগণ নাকি সংগ্রাম করতে করতে ক্লান্ত। তাই শান্তি আলোচনায় তারা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
কিন্তু পাহাড়ে যে চিত্র দেখা গেল তা এই মতের সম্পূর্ণ বিপরীত। পাহাড়ী জনগণ তাদের প্রকৃত মুক্তির জন্য তার শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কিছুই হয়নি; রাজাকার পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে নয়, তিনজন পাহাড়ী এমপি (আওয়ামী লীগের টিকিটে)-কে ভোট দিয়ে নয়, এমনকি সর্বশেষ সরকারী কমিটির সাথে আলোচনায়ও নয়, যখন চলছে আলোচনা ও কথিত যুদ্ধ বিরতি তখনই ঘটছে নানিয়ারচরের বর্বোরোচিত হত্যা। শান্তি-স্থিতি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও প্রতিদিন নতুন নতুন বাঙালী পুনর্বাসন করে বেশি বেশি অশান্তি ঘটানো হচ্ছে। আর্মী ক্যাম্পের সম্প্রসারণ চলছে। এমনকি রাজনৈতিক সমাধানের নামে ভারত থেকে ফেরত আসা পাহাড়ী শরণার্থীদের রাখা হয়েছে মানবেতর উদ্বাস্তু করে। আসলে এই তথাকথিত ‘শান্তি’ হচ্ছে বাঙালী নিপীড়ক বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর জন্য শান্তি। যেন তারা কোন বাধা ছাড়া নির্বিঘ্নে পাহাড়ীদের হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন-জমি দখল-উচ্ছেদ করতে পারে।  পাহাড়ীদের জন্য এটা হচ্ছে প্রতিরোধ ছাড়া মৃত্যুর শান্তিকে মেনে নেয়া।
এভাবে দেখা যায়, উগ্র বাঙালী সরকার ও বড় ধনী শাসক শ্রেণীর সাথে আলোচনা, দাবি এ সবকিছুই নিষ্ফল। এবং এসব কিছু করে পাহাড়ী জনগণের অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি।  বরং নতুন করে আক্রমণের লক্ষ্যে পাহাড়ী জনগণকে সংগ্রাম থেকে নিষ্ক্রিয় করার সরকারী চক্রান্ত এগিয়ে চলছে।

তিনজন পাহাড়ী এমপি’র বিতর্কিত ভূমিকা এবং উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী প্রাধান্যপুষ্ট জাতীয় সংসদ।
কি দেবে এই গণবিরোধী সংসদ?
পাহাড়ী গণ পরিষদ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের উপর সারির নেতৃবৃন্দ বাঙালী নিপীড়কদের সাথে স্রোতে ভেসে বলেছেন, ‘বর্তমানের গণতান্ত্রিক সরকার’ ‘গণতান্ত্রিক সংসদ’ ইত্যাদি। কিন্তু আসলে কি? এটা পাহাড়ী জনগণের দিক থেকে যেমন, তেমনি নির্যাতিত বাঙালী শ্রমিক-কৃষক মেহনতি জনগণের কাছে স্পষ্ট যে, এই সংসদ নির্যাতিতদের বন্ধু নয় বরং নির্যাতক, শোষকদেরই আস্তানা।  এরা স্বৈরাচারী। এরা মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি।  এই কারণেই এরা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ-এর নির্দেশে লক্ষ লক্ষ কর্মচারী ছাঁটাই করে, কোটি কোটি দরিদ্র কৃষককে করে সর্বস্বান্ত।  উচ্ছেদ করে হকার, বস্তিবাসী, রিক্সাচালকদের। সমতলে এদের শোষণ-নিপীড়নের পাশাপাশি পাহড়ে এরা উগ্র বাঙালী বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী নিপীড়নের হোতা। আর্মীরা যে পাহাড়ে হত্যা-ধর্ষণ-তান্ডবলীলা চালায়, তাতে এদেরই প্রত্যক্ষ অনুমোদন রয়েছে।  ফলে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এই সংসদের আরেকটি চরিত্র হচ্ছে এটা উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী। তাই এরা পাহাড়ী জনগণের উপর নিপীড়ন চালাতে বাধ্য। আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে এত গণহত্যা-ধর্ষণ-নিপীড়ন- তারপরেও কেন পাহাড় থেকে নির্বাচিত তিনজন এমপি ন্যূনতম কোন প্রতিবাদ করেননি, বিক্ষোভে ফেটে পড়েননি, পদত্যাগ করা তো দূরে থাক, পদত্যাগের হুমকিও দেননি। সেটা সংসদের চরিত্র থেকেই স্পষ্ট। অধিকার সংরক্ষণ কমিটির নেতা ব্যারিষ্টার লুৎফর সাহেব পাহাড়ী এম.পি.দের এই ভূমিকার নিন্দা করেছেন বটে, একই সাথে আশাবাদী তিনি যদি পাহাড়ী এম.পি.রা এ ব্যাপারে সোচ্চার হতেন বা ভবিষ্যতে সে রকম সোচ্চার এম.পি.দের নির্বাচিত করা যায় তবে নাকি একটা ভাল ফলাফল পাওয়া যাবে। ব্যারিষ্টার শাহ্জাহান সাহেবের এ আশাবাদ বাস্তবে হবার নয়, কারণ নিপীড়ক বাঙালী বড় ধনীদের সংসদ নিপীড়িত পাহাড়ী সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন করতে পারে। নিপীড়ন বন্ধ করতে কখনই পারে না।  এটা নিপীড়নেরই যন্ত্র; যতদিন তা চালু থাকবে তা নিপীড়ন করবেই।  এদের কাছে এটা আশা করার অর্থ বাঘের কাছে হরিণের নিরাপত্তা আশা করা।

প্রকৃত জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বনাম স্বায়ত্তশাসনের বর্তমান প্রস্তাবসমূহ্ ॥
সংশোধিত ৫ দফা, গণপরিষদের ৭ দফাঃ
এই একটি ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলার সাহস (নাকি উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী স্বার্থের প্রতি টান) এদেশের বুর্জোয়া বা সংশোধনবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় কারোরই নেই।  সেটা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে যা চলছে তা হচ্ছে উগ্র জাতিগত নিপীড়ন।  সেই নিপীড়নের হোতা উগ্র বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া শাসকশ্রেণী, তাদের রাষ্ট্রযন্ত্র, নিপীড়নের সরাসরি মাধ্যম হচ্ছে তাদের সশস্ত্র সেনাবাহিনী।  প্রক্রিয়া হচ্ছে সেনাবাহিনী দিয়ে গণহত্যা-ধর্ষণ-উচ্ছেদ-দেশছাড়া করা। বাঙালী পুনর্বাসনের মাধ্যমে পাহাড়ীদের খোদ পাহাড়েই সংখ্যালঘু করে ধীরে ধীরে জাতিসত্তাসমূহকে নিশ্চিহ্ন করা। বাঙালী-পাহাড়ী সাধারণ জনগণের ভিতর বৈরিতা সৃষ্টি করা।  জাতিগত নিপীড়ন-শোষণের অবসানের জন্য প্রয়োজন পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত এবং জাতীয় মুক্তির পক্ষের ধনীদের যৌথ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ক্ষমতা।  তার জন্য প্রথম দাবি বাঙালী সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, বাঙালী পুনর্বাসন বন্ধ, পুনর্বাসিতদের ফেরত আনা।  পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক জনগণের নিজ জাতিকে নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদান।  এটাই হচ্ছে প্রকৃত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, এ জন্য প্রয়োজন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া শ্রেণীর শাসন- শোষণের পরিপূর্ণ উচ্ছেদ।
পাহাড়ী গণপরিষদ, জনসংহতি সমিতির দাবিনামার দিকে তাকিয়ে দেখা যাক। গণপরিষদ মহাসম্মেলন, ’৯৪ উপলক্ষে তাদের বক্তব্যে যে সাতদফা দাবিনামা পেশ করেছে তার প্রথম নম্বরেই এভাবে লেখা আছে- “. . . . . . . . সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ স্বায়ত্তশাসন প্রদানের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জাতিসত্তাসমূহের স্বাতন্ত্র্য, অস্তিত্ব রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।”
এখানে সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ স্বায়ত্তশাসন প্রদানের ব্যাপারটি কি? সাংবিধানিক গ্যারান্টি কার কাছে চাওয়া হচ্ছে? অস্তিত্ব রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে- এ দাবিটা কার কাছে? বুঝতে বাকি থাকে না যে, উগ্র বাঙালী সরকার ও শাসক শ্রেণীর কাছে এই দাবি। আসলে এ ধরনের দাবি থেকে যা বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে কাশ্মীর, পাঞ্জাব, আসাম, তামিলনাড়– এসব জাতিকে ভারত যতটা আইনী “স্বায়ত্তশাসন” দিয়েছে এ দাবি ঠিক ততটাই। এই কথিত স্বায়ত্তশাসন-যে প্রকৃত জাতিসত্তাসমূহের নিজস্ব ক্ষমতা নয় তার প্রমাণ জাতিসমূহের কারাগার ভারতের নিপীড়ক সরকার সামান্য পান থেকে চুন খসলেই এক কলমের খোঁচায় কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে, আর্মী পাঠিয়ে চালায় গণহত্যা-দমন। এবং সেটা তারা সংবিধান সম্মতভাবেই করে থাকে। ভারতে এসব নিপীড়িত জাতিসত্তা-যে মুক্তি পায়নি প্রতিদিন তাদের তীব্র সংগ্রামই তা প্রমাণ করছে। আজ তথাকথিত পার্বত্য জেলা পরিষদ উঠিয়ে নিয়ে যদি বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে একটা মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যসভা করার অনুমতি দেয় তাতেই কি জে.এস.এস. এবং পার্বত্য গণপরিষদ খুশি? আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত সংগ্রামে নিয়োজিত পাহাড়ী ছাত্র শ্রমিক কৃষক মেহনতি জনগণকে এটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে যে, এই রকম স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হলে পাহাড়ের বড় বড় ধনী ও দালাল মধ্যবিত্তদের একাংশই মাত্র ক্ষমতা পাবে। জনগণের উপর নিপীড়ন তাতে কমবেই না, এমনকি জাতিগত নিপীড়ন আরো ভিন্ন চেহারায় ভয়ংকরভাবে নেমে আসবে।  এ ধরনের কোন সমাধান মেনে নেয়া হলে তা হবে লোগাং, নানিয়ারচর, লংগদু, পানছড়িসহ অসংখ্য গণহত্যার শহীদ পাহাড়ীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। ফলত “সাংবিধানিক গ্যারান্টি” বলে যে দাবি তুলে ধরা হয়েছে এটা নিপীড়নের অধীনেই কিছু একটা সমস্যার সমাধান মাত্র।  পাহাড়ের বড় ধনীরা ও দালাল মধ্যবিত্তরা শুধু নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে এ দাবি তুলে ধরেছে- আর পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ জনগণকে ভাঁওতা দিচ্ছে এই বলে যে, এতে নাকি জাতীয় মুক্তি হবে। পাহাড়ী গণপরিষদের উক্ত বক্তব্যের ৪নং দাবিনামায় রয়েছে ‘সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বেসামরিকীকরণ করতে হবে এবং সেনাক্যাম্প বন্ধ করতে হবে’- এটা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ন্যায্য দাবি থেকে এক ধাপ পিছু হটে আসা। কেবল বেসামরিকীকরণ, আর ব্যারাকে ফিরিয়ে আনাই সফলতা নয়, সমস্যা হচ্ছে ঐ সেনাবাহিনী ও তার ব্যারাককেই ওখান থেকে সরানো।
আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জাতিসমূহের জাতিগত নিপীড়ন-শোষণ-অবসানের পথ থেকে সরে না আসা বরং আরও সঠিক পথে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রশ্ন্।  তাই শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব ও মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ-এর আদর্শে এগিয়ে আসতে হবে পাহাড়ী যুবকদের, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ও সকল শ্রমজীবী পাহাড়ীকে।  কারণ আজকের জাতিগত সমস্যার সাম্রাজ্যবাদী সমাধান যে সব আমরা দেখছি ফিলিস্তিনে, একদিকে হোয়াইট হাউজে বুর্জোয়া নেতৃত্ব আরাফাত গংদের বিশ্বাসঘাতকতা, ‘সীমিত স্বায়ত্তশাাসন’- অন্যদিকে হেবরনে ফিলিস্তিনিদের উপর গণহত্যা; সাদা বুর্জোয়া ডি ক্লার্কের সাথে কালো বুর্জোয়া ম্যান্ডেলার আঁতাত, আরেকদিকে প্রতিদিন শত শত কালো আফ্রিকানের হত্যা-নিপীড়ন। তাই দেখা যায়, প্রথম দিকে যতটাই-বা সংগ্রামী থাকে, পেটিবুর্জোয়া-বুর্জোয়া নেতৃত্ব, ধীরে ধীরে তারা সাম্রাজ্যবাদ ও শাসক জাতিরই পদানত হয়ে পড়ে।  বিপ্লবী সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্ব ও মাওবাদ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রাম তাই আজকের জায়গা থেকে আর সামনে এগুতে পারবে না।
মাওবাদী অগ্রসর ধারা ছাড়া আজ আত্মনির্ভরশীলভাবে লড়াই এবং পাহাড়ে পুনর্বাসিত দরিদ্র শ্রমজীবী বাঙালীসহ সমতলের বাঙালী শ্রমিক-কৃষকের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙালী নিপীড়ক আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া শ্রেণীর আস্তানায় আঘাত হানা যাবে না।  বরং তা বেশি বেশি জাতিগত সংকীর্ণতায় গিয়ে জাতিতে জাতিতে হিংস্রতার প্রকাশ ঘটাবে।  উপর থেকে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী (বাঙালী ও পাহাড়ী উভয় অংশের) তার সালিসদারী করে নিজেদের ফায়দা লুটবে, নিজেদের সুবিধামত ক্ষমতা-সম্পদ ভাগাভাগি করবে। যা পাহাড়ী জনগণের আজকের মরণপণ সংগ্রামের লক্ষ্য হতে পারে না কোনক্রমেই।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


পার্বত্য চট্টগ্রামে “বহিরাগত” কারা?

B5WdLsBCMAA_X76

পার্বত্য চট্টগ্রামে “বহিরাগত” কারা?

(আগষ্ট/’৯৫)

সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীতে কিছু দেয়াল-লিখন হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক।  এ ধরনের দেয়াল-লিখন, পোষ্টার, লিফলেট, এমনকি পত্রিকায় লেখালেখি পূর্বেও দেখা গেছে।  এই সব প্রচারে বলা হয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারা বার্মার আরাকান প্রদেশ থেকে এসে এদেশে বসতি স্থাপন করেছে এবং তাই তারা বহিরাগত। এসব প্রচার করা হয়ে থাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালী গণপরিষদ বা এ জাতীয় বিভিন্ন সংগঠনের নামে। এছাড়া ফ্রিডম পার্টি, জাগপা, যুবকমান্ড, জামাত, ইনকিলাব, মিল্লাত- এরাও এ ধরনের প্রচার করে থাকে- যাকে নেপথ্যে সমর্থন দিয়ে থাকে বিএনপি, জাপা, আঃ লীগ প্রভৃতি বুর্জোয়া দলগুলো।
এই ধরনের প্রচারকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ না করেও বোঝা যায় যে, এগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জাতিসত্তার বিরুদ্ধে চালিত উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী প্রচার।  প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের (ও অন্যান্য ছোট ছোট পাহাড়ী জাতিসত্তার) কোন ন্যায্য অধিকার নেই, কারণ তারা তো এদেশে বহিরাগত।
প্রশ্ন আসে যে, ওখানে তাহলে ন্যায্য অধিকারটা কার? এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রচারকারীরা বলতে চায় বাঙালী মুসলমানদেরই অধিকার সেখানে, কারণ, এ দেশটাই তো- তাদের বিবেচনায়- বাঙালী মুসলমানদেরই।
এই প্রচার থেকে যে কর্মসূচি সরাসরিভাবে চলে আসে তা হচ্ছে, এই বহিরাগত চাকমাদেরকে (ও অন্যান্য পাহাড়ী জনগণকে) খেদিয়ে দাও, ওখানে বাঙালী মুসলমানদেরকে প্রতিষ্ঠা কর।  এই উগ্র জাতীয়তাবাদীদের কাছে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য হত্যা-নির্যাতন-জ্বালাও-পোড়াও-ধর্ষণ সবই ন্যায্য।  যেমনি আজ করছে বসনিয়াকে কেন্দ্র করে সার্ব ও ক্রোট বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা।
ঠিক এ কাজগুলোই কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে এদেশের বড় বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী করে চলেছে।  ’৭১ সালের পর থেকে বিভিন্ন সরকারের বদল হলেও শাসক শ্রেণী একই রয়েছে এবং ফলে সমস্ত সরকারের চরিত্রও মূলত এক। এরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৪টির মত ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগণের উপর নির্মম ফ্যাসিস্ট জাতিগত নির্যাতন চালিয়ে আসছে।   এই জাতিগত নিপীড়নের তুলনা চলে শুধু ’৭১ সালে এদেশের বাঙালী জনগণের উপর পাকিস্তানী শাসক শ্রেণীর জাতিগত নিপীড়নের সাথেই। এই নিপীড়নের একটা প্রধান কর্মসূচি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা চাকমাসহ অন্যান্য পাহাড়ী জনগণকে তাদের ভিটে-মাটি-পাহাড়-জঙ্গল-সম্পদ থেকে উচ্ছেদ করা এবং সেখানে বাঙালীদের বসিয়ে দেয়া। এটা তারা করছে বন্দুকের ডগায়, আর্মী দিয়ে। পাহাড়ী জনগণের যে কোন প্রতিবাদ-প্রতিরোধকে সামরিক কায়দায় দমন করা হচ্ছে। এভাবে পাহাড়ে সংঘটিত হয়েছে অসংখ্য গণহত্যা, বহু গ্রাম-জনপদ ধ্বংস করা হয়েছে। অব্যাহতভাবে চলছে নির্যাতন ও উচ্ছেদ।
এ কাজের স্বার্থে তারা ওখানে উপনিবেশ স্থাপনকারী দরিদ্র বাঙালীদেরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। পাহাড়ী-বাঙালী দাঙ্গা উসকে দিচ্ছে।  বাঙালী শাসক শ্রেণীর ও তার ফ্যাসিস্ট আর্মীর এই উগ্র জাতিগত নিপীড়নেরই হাতিয়ার হচ্ছে এই ধরনের প্রচার। এই প্রচার থেকে শাসক শ্রেণীর কে না লাভবান হচ্ছে?- আর্মী অফিসার থেকে শুরু করে বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী, বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যেকেই কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে- পাহাড় কেটে, জঙ্গল সাফ করে, জমি লিজ নিয়ে ও পাহাড়ী জনগণকে স্রেফ লুট করে ও ধর্ষণ করে।
ইতিহাস খুঁজতে গেলে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচার সহজেই মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে।  ’৭১ সালের পূর্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী জনগণের সংখ্যা ৫%-এর বেশি ছিল না।  বাকি সবাই ছিল পাহাড়ী বিভিন্ন ক্ষুদে জাতিসত্তার জনগণ। সহজেই বোঝা যায় যে, এই পাহাড়ী জনগণই ওখানকার আদি বাসিন্দা- বাঙালীরা নয়।  কিন্তু বাঙালী বড় বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর উগ্র জাতীয়তাবাদী কর্মসূচির ফলশ্রুতিতে মাত্র ২৫ বছরের ব্যবধানে আজ পাহাড়ে বাঙালী জনসংখ্যা প্রায় ৫০%-এ এসে দাঁড়িয়েছে।  তাহলে কে বহিরাগত? স্পষ্টতই বাঙালীরাই বাইরে থেকে গিয়ে পাহাড়ী জনগণের মাথায় চড়াও হয়েছে।
দূর অতীতে এই চাকমা বা অন্য ক্ষুদে জাতিসত্তাগুলোও হয়তো এখানে ছিলেন না- জায়গাটি মনুষ্য বসতিবিহীন ছিল। চাকমারা তখন পার্শ্ববর্তী আরাকান বা অন্য কোন জায়গা থেকে এখানে এসে থাকতে পারেন (স্মর্তব্য যে তখন উগ্র জাতীয়তাবাদী বদমাইশ বাঙালী শাসক শ্রেণীর “বাংলাদেশ” রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব ছিল না)।  মানুষের ইতিহাসে এরকম সর্বত্র হয়েছে।  কারণ, পৃথিবীর সমস্ত জায়গা প্রথম থেকেই মানুষের বাসপোযোগী ছিল না। বাইরে থেকে মানুষ গিয়ে একেকটা জায়গায় বসতি স্থাপন করেছিল।  আদিবাসী তারাই যারা প্রথমে একটা জায়গাকে বাসপোযোগী করে বসতি স্থাপন করেন।  তারাও প্রথমে নিশ্চয়ই বাইরে থেকেই আসেন, কিন্তু একারণে তাদেরকে বহিরাগত বলতে পারে কোন মূর্খ? যে কিনা তার অন্যায় স্বার্থ দ্বারা চালিত হয়ে ইতিহাসের বিকৃত ব্যাখ্যা দেয় এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত সমস্যার একটা বড় কারণ সেখানে বাঙালী পুনর্বাসন।  এর উদ্দেশ্য হচ্ছে পাহাড়ী জনগণকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা ও তাদেরকে উচ্ছেদ করা।  তাই পাহাড়ী জনগণ সেখান থেকে সমস্ত পুনর্বাসিত বাঙালীকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন।  এটা খুবই ন্যায্য দাবি।  এই ন্যায্য দাবিকে দমনের জন্য এবং পাহাড়ী জনগণের উপর চালিত অবর্ণনীয় জাতিগত নির্যাতনকে ধামাচাপা দেবার জন্যই এই “বহিরাগত” তত্ত্ব আনা হচ্ছে।
একে বিরোধিতা করা ও পাহাড়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর পক্ষে দাঁড়ানো এদেশের নির্যাতিত সকল জনগণ ও প্রগতিশীল মানুষের জরুরী কর্তব্য।  এটা বাঙালী শ্রমিক-কৃষক নিপীড়িত জনগণকে তার নিজের মুক্তির স্বার্থেই করতে হবে- কারণ এই শাসক শ্রেণী ও রাষ্ট্রযন্ত্র তারও অভিন্ন শত্রু ।  উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদ বা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ধ্বজা এই শত্রু শ্রেণীরই হাতিয়ার।  একে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে হবে।  আওয়াজ তুলুন- পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী হটাও, আর্মি হটাও, উগ্র বাঙালী মুসলিম জাতীয়তাবাদী প্রচার নিষিদ্ধ কর।   নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে নিপীড়িত পাহাড়ী-বাঙালী ঐক্যবদ্ধ হও।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’ পাহাড়ে শান্তি আনবে না, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সৃষ্টি করবে

pic_03_672423690

 

পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’ পাহাড়ে শান্তি আনবে না
ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সৃষ্টি করবে

(ডিসেম্বর, ’৯৭)

[নোট: ‘শান্তি চুক্তি’ হওয়ার পরপরই আমাদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য এই বক্তব্যটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তখন আন্দোলন প্রকাশিত না হওয়ায় তা প্রচার হয়নি। যেহেতু চুক্তি সম্পর্কে পরবর্তীতে কোন লেখা আন্দোলন-এ যায়নি, সেহেতু সেই লেখাটি এই সংকলনে এখন অন্তর্ভুক্ত করা হলো।]

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাঙালী বড় ধনী শ্রেণীর যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারাই পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী জাতিসত্তার জনগণের ওপর জাতিগত নিপীড়ন চালিয়ে আসছে।  এ নিপীড়ন পাকিস্তান আমলেও ছিল।  বিশেষত ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে তা গুণগতভাবে বৃদ্ধি পায়।
এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে পাহাড়ী জনগণ “অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত” নীতির ভিত্তিতে মানবেন্দ্র লারমার নেতৃত্বে “জনসংহতি সমিতি” (জে.এস.এস) এবং তাদের সশস্ত্র সংগঠন “শান্তি বাহিনী” পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলেন। সেই সংগ্রামের এক পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মানবেন্দ্র লারমা নিহত হন এবং নেতৃত্বে আসেন তার ভাই সন্তু লারমা।
সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস ২ ডিসেম্বর, ’৯৭ পার্বত্য শান্তি চুক্তির নামে পাহাড়ী জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই পাহাড়ের সংগ্রামী জনগণ ঘৃণা ভরে এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কেন এই ‘শান্তি চুক্তি’ পাহাড়ী জনগণের স্বার্থ বিরোধী?
* এই চুক্তি পাহাড়ী জনগণের বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তথা স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেনে নেয়নি। ফলে জাতিগত সমতা প্রতিষ্ঠা হয়নি।
* কল্পনা চাকমাসহ হাজার হাজার পাহাড়ী জনগণের হত্যাকারী, বাড়িঘর ধ্বংসকারী সেনাবাহিনীর বিচারের কোন ব্যবস্থা হয়নি। সেনাবাহিনী প্রত্যাহারও হবে না।
* পাহাড়ে আদিবাসীদেরকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করার চক্রান্তের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পুনর্বাসিত বাঙালীদের সমতলে ফিরিয়ে নেয়া হয়নি।
* সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী ও তাদের দালাল বাঙালী বড় ধনী শ্রেণীর শোষণ-নির্যাতনে বাধ্য হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার হওয়া দরিদ্র বাঙালীদের সমস্যার সুনির্দিষ্ট কোন সমাধান করেনি।
* দলিলপত্র থাক বা না থাক পাহাড়ী জমিতে বসবাসকারী পাহাড়ীরাই হচ্ছেন জমির প্রকৃত মালিক- এই নীতির ভিত্তিতে ভূমি সমস্যার সমাধান করেনি। তথাকথিত ভূমি কমিশন হলো লোক দেখানো, যা ভূমি সমস্যার কোন সমাধান করতে পারবে না।
* এই চুক্তির পিছনে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ বিশেষতঃ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের চাপ স্পষ্ট। এর মাধ্যমে তাদের স্বার্থ হাসিল করবে।
বাঙালী বড় ধনী শ্রেণী এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে উঠতি বড় ধনীদের কিছু ক্ষমতার ভাগ দিয়েছে মাত্র। এর মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে না। বরং আরও বেশি অশান্তি সৃষ্টি হবে।
এ পরিস্থিতিতে পাহাড়ী জনগণের ও বাঙালী জনগণের মধ্যে সৌহার্দ্য-শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। দূর হতে পারে না উগ্র বাঙালী শাসক শ্রেণী কর্তৃক সৃষ্ট জাতিগত বৈরিতা। তাই পাহাড়ী জনগণের প্রকৃত মুক্তির জন্য মাওবাদের আদর্শে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে পাহাড়ী-বাঙালী নিপীড়িত জনগণের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। অভিন্ন নিপীড়ক শাসক সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দালাল বাঙালী বড় ধনী শ্রেণীকে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে উচ্ছেদ করতে হবে।  প্রতিষ্ঠা করতে হবে সমাজতন্ত্র।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


ইউ.পি.ডি.এফ. কি পাহাড়ী জনগণের জাতিগত মুক্তির বিপ্লবী সংগঠন হতে পেরেছে?

UPDF-logo1

ইউ.পি.ডি.এফ. কি পাহাড়ী জনগণের জাতিগত মুক্তির বিপ্লবী সংগঠন হতে পেরেছে?

(এপ্রিল/’৯৯)

ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউ.পি.ডি.এফ.) পার্বত্য শান্তি চুক্তি বিরোধী পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ী গণপরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নতুন সংগঠন।  গত ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর ‘৯৮ সংগঠন তিনটি এক পার্টি-প্রস্তুতি সম্মেলনের মাধ্যমে এই ফ্রন্টের নাম ঘোষণা করা হয়।  পাহাড়ী জনগণের মুক্তি আন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ শান্তি চুক্তি ও শান্তি বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে পাহাড়ী জনগণের ব্যাপক অংশের বিদ্রোহ ও বিপ্লবী আকাংখারই প্রকাশ এই সম্মেলন।
উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের বর্তমান নাটের গুরু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাহাড়ী জাতিগত বিশ্বাসঘাতক জনসংহতি সমিতি নেতা সন্তু লারমা ও তার শান্তি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সময়ও সংগ্রামী পাহাড়ী জাতিসত্তাগুলোর জনগণের বিদ্রোহ ঢাকা পড়েনি। ইয়াহিয়া-মুজিবের গোল টেবিল বৈঠকের অনুরূপ হাসিনা-সন্তু লারমার পার্বত্য শান্তি চুক্তির আনন্দ বিহারকে সেদিন ধূলিসাৎ করেছে আত্মসমর্পণ বিরোধী পাহাড়ী যুবক-যুবতীদের শ্লোগান, ব্যানার, ফেস্টুন, কালো পতাকা প্রদর্শন। দুই যুগেরও অধিককাল ব্যাপী সংঘটিত লোগাং, লংগদু, নানিয়ারচরসহ অসংখ্য গণহত্যা, সংগ্রামী পাহাড়ী নেত্রী কল্পনা চাকমার সম্ভাব্য গুম-খুন, অজস্র পাহাড়ী নারী ধর্ষণ, সমতল থেকে বাঙালী জনগণ এনে আর্মী প্রহরায় পাহাড়ীদের জমি-জিরাত দখল, তার মাধ্যমে পাহাড়ী-বাঙালী সংঘর্ষ বাধানো, বনভূমি উজার করা, কাপ্তাই বাঁধের মাধ্যমে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে হাজার হাজার একর আবাদী জমি ধ্বংস- এসব পাহাড়ী জনগণ ভোলেননি। পাহাড়ী জনগণ এটা ভালই বুঝেছেন, বাঘ আর হরিণের একই বনে অবস্থান- কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ নয়।
গণহত্যাকারী বাহিনী, বাঙালী সেটলারদের পাহাড়ে রেখে শান্তি- সেটা দুঃস্বপ্ন মাত্র। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী- আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী, তাদের শাসন-শোষণের সকল শক্তিকে বিপ্লবী লড়াইয়ে উচ্ছেদের মাধ্যমে কেবল পাহাড়ী জনগণ অর্জন করতে পারেন তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার তথা বিচ্ছিন্নতার অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসন।
কিন্তু ইউ.পি.ডি.এফ-এর কর্মসূচিতে আমরা কি দেখতে পাই? “…….. এই পার্টি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে” (ইউ.পি.ডি.এফ.-এর প্রেস বিজ্ঞপ্তি)।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মোতায়েন, বাঙালী পুনর্বাসন, দীর্ঘকালের গণহত্যা-ধর্ষণ-নিপীড়নের হোতা বাংলাদেশের শাসক-শোষক শ্রেণী তাদের সকল অপকর্মের যুক্তি হিসেবে এটাকেই ব্যবহার করে থাকে। আজ ‘বাঙালীদের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে’ বলে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী বিএনপি, জামাত, পার্বত্য গণপরিষদরা পাহাড়ী জনগণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমেছে ঠিক এই যুক্তিতেই। কিন্তু পাহাড়ী ১৪টি জাতিসত্তার কাছে এ প্রশ্নটি সামনে আসে না। বরং আসে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, আসে তাদের নিপীড়নকারী সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দালাল বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীকে ও তাদের নিপীড়নের যন্ত্রগুলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উচ্ছেদের প্রশ্নে। এ প্রশ্নে উপরোক্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা ঘোষণায় কোন কথা নেই। বাস্তবে পাহাড়ী জনগণসহ যে কোন নিপীড়িত জাতির জাতীয় মুক্তির জন্য নিুতম কর্মসূচি হচ্ছে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কর্মসূচি। এর অর্থ হচ্ছে বিচ্ছিন্নতার অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসন। জাতীয় নিপীড়ক রাষ্ট্রের অধীনস্থতায় দেশের অখণ্ডতা রক্ষা, আর ‘বিচ্ছিন্নতার অধিকার’ হচ্ছে দু’টো বিপরীতমুখী কর্মসূচি। এভাবে ইউ.পি.ডি.এফ. বিচ্ছিন্নতার অধিকারের মূল কর্মসূচিকে বর্জন করেছে। এটার সরল অর্থ হচ্ছে ইউ.পি.ডি.এফ. জাতিগত মুক্তির প্রশ্নে আসল জায়গাটাকেই জাতীয় নিপীড়ক রাষ্ট্রকে ছাড় দিয়ে বসেছে।

“সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের স্বীকৃতি দানের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করবে।”
এ উক্তি নবগঠিত এই সংগঠনের জাতীয় নিপীড়ক রাষ্ট্রের অধীনে সংস্কারবাদী চরিত্রকে তুলে ধরে। বর্তমান সংবিধান জাতীয় নিপীড়ক রাষ্ট্র ব্যবস্থারই অংশ। নিপীড়ক ব্যবস্থা উচ্ছেদের বিপ্লবী লাইনের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের এ জাতীয় ‘সংসদীয় বিতর্ক’ স্টাইলের দাবি কোন বিপ্লবী দিশা দিতে পারে না। আর সেটা শেষ পর্যন্ত জে.এস.এস.-এর পরিণতির দিকেই যেতে বাধ্য, যা ধারণ করতে ব্যর্থ পাহাড়ী জনগণের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের সুদীর্ঘ গৌরবময় ঐতিহ্যকে।
তাদের ঘোষণায় সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাসমূহ (এনজিও) উচ্ছেদের প্রশ্নে কোন স্পষ্ট ঘোষণা নেই। অথচ পাহাড়ী জনগণের পরিপূর্ণ মুক্তির জন্য এইসব জাতীয় নিপীড়ক বহিঃশত্রুদের উচ্ছেদের কর্মসূচি ছাড়া তা এগুতে পারে না। জে.এস.এস.-এরও অন্যতম সমস্যা ছিল এটা। আজ এখন পর্যন্ত ইউ.পি.ডি.এফ. রয়ে গেছে সেই একই বৃত্তে।
তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা বলেছেন। কিন্তু সেই ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থা কেমন হবে, কাকে উচ্ছেদ করতে হবে, কোন শ্রেণীর নেতৃত্বে, কোন কোন শ্রেণীর ক্ষমতা কায়েম করতে হবে, মূল কর্মসূচিগুলো কি কি হবে- সেসব বিষয় তারা স্পষ্ট করেননি। এই অস্পষ্টতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাশী পাহাড়ী জনগণকে ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন করে রাখবে। এবং তারা গণতন্ত্রের নামে বিভ্রান্ত হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের ভোটবাজি রাজনীতির খপ্পরে পড়বেন।
পাহাড়ী জনগণের আশু কর্মসূচি বা দাবির মাঝে অবশ্যই থাকতে হবে-
– পুনর্বাসিত বাঙালীদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরিয়ে নাও, সমতলে তাদের পুনর্বাসন কর।
– পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নিপীড়ক বাঙালী উগ্র জাতীয়তাবাদী সকল বাহিনীকে গুটিয়ে নাও- ইত্যাদি।
কিন্তু ইউ.পি.ডি.এফ. তার যে সম্মেলন-পরবর্তী ঘোষণা-কর্মসূচি ও প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, তার ভিতরে স্পষ্টভাবে এগুলো নেই। এভাবে ইউ.পি.ডি.এফ. পাহাড়ী জনগণের আশু জরুরী দাবির প্রশ্নেও আপোষের ও ধোঁয়াশার পথ নিয়েছে।

ইউ,পি.ডি.এফ. তার ‘ঘোষণা’য় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নে কিছু বাম প্রগতিশীল শক্তির বিবৃতি প্রদান ছাড়া পাহাড়ী জনগণ প্রশ্নে দেশব্যাপী কোন সংগ্রাম হয়নি বলে উল্লেখ করেছেন (তাদের সম্মেলন-পরবর্তী ঘোষণা দ্রষ্টব্য)।
এখানে একটি উজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস ধামাচাপা পড়েছে। ’৭৩-’৭৪-এ কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক বিরাট বাহিনী তৈরি হয়েছিল এবং শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের গণক্ষমতা তথা নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে পাহাড়ী-বাঙালী নির্বিশেষে সারাদেশের জনগণকে নিয়ে সংগ্রামের বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। তার সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে, কিন্তু পাহাড়ী জনগণের সংগ্রামের ইতিহাসে তা এক উল্লেখযোগ্য বিপ্লবী সংগ্রামের দৃষ্টান্ত, তা পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের যত ক্ষুদ্র অংশ জুড়েই ঘটুক না কেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিপ্লবী শক্তি পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রশ্নে আরো সুস্পষ্ট বক্তব্য আনেন। বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন-বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলন এবং সংগঠনদ্বয়ের মুখপত্র ‘আন্দোলন’ পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারসহ বিভিন্ন প্রশ্নে অব্যাহতভাবে বিপ্লবী রাজনীতি ও আশু দাবিনামা ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উগ্র বাঙালী সরকারের সেনাবাহিনী এবং পুনর্বাসিত বাঙালীদের ফেরত আনার বিপ্লবী দাবিসমূহ। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইউ.পি.ডি.এফ.-কে এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে ধারণ করতে হবে এবং এ ধরনের উদ্যোগকে সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করতে হবে। কিন্তু ইউ.পি.ডি.এফ.-এর ঘোষণা তা করতে পারেনি।

এভাবে পাহাড়ী জনগণ জাতিগত মুক্তির জন্য তাদের প্রতিদিনকার স্বপ্ন মহান আত্মবলিদান, বিপুল সাহস নিয়ে যে নেতৃত্বকারী বিপ্লবী সংগঠনের জন্য পথ চেয়ে বসে আছেন ইউ.পি.ডি.এফ. তার কর্মসূচিতে, তার চরিত্রে সে জায়গায় নিজেকে দাঁড় করাতে পারেনি। তাই পাহাড়ী জনগণের প্রকৃত মুক্তির জন্য নিবেদিত বন্ধুদের প্রতি আহ্বান- আপনারা পেটি-বুর্জোয়া সংস্কারবাদী ও জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে আপোষবাদী লাইন পরিহার করে পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী পথে আসুন। সমতলের প্রকৃত বিপ্লবী, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তি আপনাদের সাথে থাকবেন।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা