আইএস জঙ্গি দমনে মাওবাদীদের সমর্থন চাইলেন ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ‘দুতার্তে’

npa-11

ফিলিপিন্সের মারাবিতে ইসলামপন্থী আইএসআইএস জঙ্গিদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর চলমান সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ১শ’ জন ছাড়িয়ে গেছে। এরমধ্যে কেবল রোববারই নিহত হয় অন্তত ১৯ জন। জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মারাবি শহর পুনরুদ্ধারে গেল সপ্তাহে শুরু হওয়া এ অভিযানে এরইমধ্যে পালিয়ে গেছে হাজার হাজার মানুষ। জঙ্গিদের নির্মূলে সরকারকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসার জন্য মরো মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদী ও মাওবাদীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে।

লানাও দেল সুর প্রদেশের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে রোববার ত্রাণ বিতরণ করে ফিলিপিন্স কর্তৃপক্ষ। মারাবি শহরে জঙ্গিদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর চলমান সংঘর্ষ থেকে বাঁচতে যারা পালিয়ে এসেছে সেই সব শরণার্থী এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। গেল সপ্তাহে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে মিনদানাও দ্বীপের হাজার হাজার মানুষ। এছাড়াও, জঙ্গিদের হাতে আটকা পড়ে আছে ২ হাজার বেসামরিক নাগরিক। বন্দী করে রাখা হয়েছে, এক খ্রিষ্টান যাজককে।

পালিয়ে আসা এক নারী বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে মৃত্যুভয় আমাদের তাড়া করে ফিরছে। বন্দুকের নলের সামনে থেকে কোনো রকমে জীবন বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছি। আমরা সরকারের সহযোগিতা চাই।’

আরেক নারী বলেন, ‘পালিয়ে আসার পর আমরা অসুস্থ হয়ে পড়েছি। সরকার আমাদের ওষুধ সরবরাহ করছে। আশা করি, খুব শিগগিরই এই অবস্থার পরিবর্তন হবে।’

ফিলিপিন্সের মারাবি শহরে জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর গেল ছয়দিনের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ১শ’ জন ছাড়িয়ে গেছে। জানা গেছে, নিহতদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। এরইমধ্যে কেবল রোববারই সহিংসতায় মারা যায় অন্তত ১৯ বেসামরিক।
পুলিশ জানায়, রোববার সকালে আটজনের মরদেহ শহরের বাইরে থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এদের সবাই পেশায় কাঠমিস্ত্রি। পুলিশের ধারণা, কোরআন পড়তে না পারায় জঙ্গিরা তাদের হত্যা করে।

এদিকে, বিচ্ছিন্নতাবাদ পরিত্যাগ করে দক্ষিণাঞ্চলে চলমান জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য মুসলিম মরো গেরিলা ও মাওবাদীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে। জোলো দ্বীপের একটি সামরিক ঘাঁটিতে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি মাওবাদীদের শান্তি আলোচনার মাধ্যমে কট্টরপন্থী দমনের লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। জঙ্গি দমনে মাওবাদীদের সমন্বয়ে একটি আলাদা বাহিনী গঠনেরও প্রস্তাব করেন দুতার্তে।

তিনি বলেন, ‘মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট এবং মোরো ন্যাশনাল ফ্রন্টের সদস্যের প্রতিও আমার আহ্বান আপনারা আমাদের সামরিক বাহিনীতে অংশ নিন। আমরা আপনাদের সেনা সদস্য হিসেবে সাদরে গ্রহণ করবো। সেনা সদস্যদের মতোই আপনাদের সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। আমি জানি, তাদের আলাদা যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। কারণ অস্ত্র চালোনাসহ সব ধরনের সামরিক কাজে পারদর্শী তারা।’

ফিলিপিন্সে আইএস সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের উত্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় আইএসের হুমকি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিপিন্সে সহিংসতা, ইন্দোনেশিয়ায় বোমা হামলা এবং মালয়েশিয়ায় আইএস সন্দেহে ছয় জনকে আটকের ঘটনায় বোঝা যায়, এশীয় অঞ্চলে পাকাপোক্তভাবেই ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা করছে আইএস।

সূত্রঃ  somoynews


ফিলিপাইনঃ মাওবাদীদের সাথে শান্তি আলোচনা স্থগিত করল সরকার

npainternationale12-22-2016-02-800x445

মাওবাদীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা স্থগিত করেছে ফিলিপাইন সরকার। শনিবার নেদারল্যান্ডসে মাওবাদীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা বাতিলের ঘোষণা দেন সরকার পক্ষের আলোচকরা। সম্প্রতি মাওবাদীদের সশস্ত্র শাখা ‘নিউ পিপলস আর্মি’ (এনপিএ)-র পক্ষ থেকে দেশজুড়ে হামলা জোরদারের প্রেক্ষিতে আলোচনা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতেও আরেকটি শান্তি আলোচনা ভেস্তে যায়। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। প্রায় ৫০ বছর ধরে ফিলিপাইনের ভূখণ্ডে নয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে আসছে এনপিএ। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের দীর্ঘ লড়াইয়ে উভয় পক্ষের ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। দীর্ঘ এ সংঘাত থামাতে নরওয়ের মধ্যস্থতায় আলোচনায় সম্মত হয় উভয় পক্ষ। তবে মাওবাদীদের তৎপরতা জোরদারের মুখে সে আলোচনাও ভেস্তে গেলো। নেদারল্যান্ডসের আলোচনায় এনপিএ-র রাজনৈতিক শাখা ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের সঙ্গে ফিলিপাইন সরকারের আলোচনায় বসার কথা ছিল। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জেসাস দুরেজা বলেন, সরকার আলোচনা স্থগিত করেছে। কারণ মাওবাদীরা প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুয়ার্তে-র শান্তি আলোচনায় সায় দেয়নি।


ভিডিওঃ ফিলিপিনের কমিউনিস্ট পার্টি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন

গত ২৬শে ডিসেম্বর ২০১৬, ফিলিপিনের কমিউনিস্ট পার্টি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন হয়েছে। এতে নেতৃত্ব দেয় পার্টির সশস্ত্র শাখা ‘নিউ পিপলস আর্মি’র পুলাং বাগানি ব্যাটেলিয়ন।


ফিলিপাইনের রাজধানীতে শতশত মাওবাদী গেরিলা, জনগণকে বিপ্লবে যোগ দেয়ার আহবান

গত ২৭শে মার্চ ২০১৭, ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টি’র এর সশস্ত্র শাখা ‘নিউ পিপলস আর্মি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পার্টির রাজনৈতিক সংগঠন ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ এর বিপ্লবী মাওবাদী গেরিলা কর্মীরা রাজধানীতে সমাবেশ ও র‍্যালি বের করে। এসময় শতশত মাওবাদী বিপ্লবীরা- মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী বিপ্লবে অংশ নিতে ও ‘নিউ পিপলস আর্মি’তে যোগ দেয়ার জন্যে জনগণের প্রতি আহবান জানান।


ফিলিপাইনঃ প্রতিক্রিয়াশীল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মাওবাদীদের গেরিলা অ্যাকশন চলমান রয়েছে

ফিলিপাইনের মাওবাদী গেরিলারা

ফিলিপাইনের মাওবাদী NEP / NPA এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তাদের গেরিলারা গত ২৩, ২৪, ২৫ মার্চ প্রতিক্রিয়াশীল সেনাবাহিনী ও বহুজাতিক কোম্পানি Dole-Stanfilco frutera এর বিরুদ্ধে তাদের সশস্ত্র অ্যাকশন অব্যাহত রেখেছে।

মান্দায়া’তে কৃষক জনগণের উপর সেনাবাহিনীর বিমান ও হেলিকপ্টার যোগে সন্ত্রাসী বোমা বর্ষণের প্রত্যুত্তরে মাওবাদী গেরিলারা সেনাবাহিনীর ৬৬তম ইনফান্ট্রি ব্যাটেলিয়নের উপর গেরিলা হামলা চালিয়ে ৫ সেনাকে খতম করে ও অস্ত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী জব্দ করে।

অন্যদিকে, কায়াগা, সান ফেরনান্দো ও বুকিদননে সেনাবাহিনীর ৬০তম ইনফান্ট্রি ব্যাটেলিয়নের উপর গেরিলা অ্যাকশন চালিয়ে ২ সেনাকে খতম ও ২ জনকে গুরুতর জখম করে।

২৫শে মার্চ, শ্রমিকদের চাকরি থেকে ছাঁটাই এবং শোষণের প্রতিবাদে মাওবাদী গেরিলারা বহুজাতিক ফল কোম্পানি Dole-Stanfilco frutera এর ৩টি যানবাহন ধ্বংস করে দিয়েছে।


ফিলিপাইনে মাওবাদী গেরিলাদের হামলায় ৭ মেরিন সেনা নিহত

ফিলিপাইনের মাওবাদী ‘নিউ পিপলস আর্মি'(NPA)

গত ২১শে মার্চ মঙ্গলবার ফিলিপাইনের সুলতান কুদরাতের কালামান্সিগ শহরে ফিলিপাইনের মাওবাদী নিউ পিপলস আর্মি’র(NPA) সাথে সরকারী সেনাদের এক বন্দুকযুদ্ধে ৭ মেরিন সেনা নিহত হয়েছে।

এ বিষয়ে NPA মুখপাত্র ‘কা দেঞ্চিও মাদ্রিগাল’ এক বিবৃতিতে বলেন,  এই আক্রমণটি মেরিন ব্যাটেলিয়ন ল্যান্ডিং টিমের ২য় মেরিন কোম্পানির বিরুদ্ধে মাওবাদীদের একটি ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’।

David M. Consunji, Inc. কর্তৃক উন্মুক্ত কয়লা খনি উত্তোলনের রক্ষায় নিয়োজিত মেরিন সেনাদের ‘পাহারাদার কুকুর’ হিসেবে অভিযুক্ত করেন মুখপাত্র মাদ্রিগাল। এ ছাড়াও তিনি এই যুদ্ধে আর্টিলারি গোলাবর্ষণে ৬ মাওবাদী গেরিলা নিহত হওয়ার দাবী করে সেনাবাহিনীর দেয়া মিথ্যা বিবৃতিকে অস্বীকার করেন।

সূত্রঃ http://davaotoday.com/main/politics/npa-kills-7-marines-in-sultan-kudarat-clash/

 


ফিলিপাইনে সরকার ও মাওবাদীদের মধ্যকার শান্তি আলোচনা থমকে গেছে

মাওবাদী কমিউনিস্ট গেরিলা

মাওবাদী কমিউনিস্ট গেরিলা

ফিলিপাইনের সরকারের সঙ্গে কমিউনিস্ট মাওবাদীদের অতি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনা ভেস্তে দিয়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট দুতার্তে। আলোচনার শর্ত অনুযায়ী, কারাবন্দী ৪০০ মাওবাদী বিদ্রোহীকে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব ‘অগ্রহণযোগ্য’ বিবেচনা করে তিনি এ আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দেন। এর ফলে ছয় মাস ধরে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান অস্ত্রবিরতি বাতিলের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নরওয়ের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী অসলোতে ফিলিপাইন সরকার ও কমিউনিস্ট মতাদর্শের মাওবাদী বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিউ পিপলস আর্মির (এনপিএ) মধ্যে ধারাবাহিক শান্তি আলোচনা চলছিল। এ আলোচনা এগিয়ে নিতে দু’পক্ষ অস্ত্রবিরতিও পালন করছে। চলতি মাসের শেষে দু’পক্ষের পরবর্তী বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এর মাঝেই আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দিলেন দুতের্তে।

স্থানীয় সময় শনিবার জন্মশহর দাভাওয়ে এক বক্তব্যে দুতের্তে বলেন, ‘৪০০ মাওবাদী বিদ্রোহীকে মুক্তি দেয়ার শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমি আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত নই। আলোচনা বাদ দিয়ে সরকারপক্ষের লোকজনদের দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছি।’  তিনি আরো বলেন, ‘আমি শান্তি আলোচনা সফল করতে অনেক ছাড় দিয়েছি। অসলোতে আলোচনায় অংশ নিতে বিদ্রোহী নেতাদের মুক্তি দিয়েছি। কিন্তু নতুন করে আর কোনো শর্ত মানা সম্ভব নয়।’ যেসব বিদ্রোহী নেতা অসলোতে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, তাদের দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এরপর দুর্মুখ প্রেসিডেন্ট দুতার্তে কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র শাখা নিউ পিপলস আর্মিকে ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দেন। উভয় পক্ষের মধ্যে যে দুর্বল ঐকমত্য ছিল, সেখান থেকে উভয়েই সরে এসেছে। ফলে ফিলিপাইনের প্রান্তিক অঞ্চলে নতুন করে সশস্ত্র বিবাদ শুরু হতে পারে। এসব অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন এখনো টিকে আছে। আবার অনেক জায়গায় তা শুরুও হচ্ছে।
ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলফিন লরেনজানা ঘোষণা দিয়েছেন, এই মাওবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ শুরু হবে। আরেক জেনারেল সতর্ক করে দিয়েছেন, তাঁর সেনারা ‘তাদের ঘাঁটিতে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করবে’। ওদিকে মাওবাদীরাও কম যায় না। তারা ভাবলেশহীনভাবে বলেছে, সরকার সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করুক না। গর্ব করে তারা বলেছে, ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়’।
দুতার্তের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে একটি ছিল এ রকম যে, দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা হবে। কিন্তু কমিউনিস্টদের দাবী সরকার না মানায় মাওবাদীরা আবারও গেরিলা যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার কারণে দুতার্তের এই প্রতিজ্ঞা পূরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ফিলিপাইন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অসমতা ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশ, সেখানে ভাগ চাষও পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি, যার জন্য দেশটি কুখ্যাত। সেখানে ব্যাপারটা এমন যে, নিপীড়ক ভূস্বামী, লোভী মধ্যস্বত্বভোগী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকেরা নিয়মিতভাবে লাখ লাখ সাধারণ কৃষককে নির্যাতন করেন। এই কৃষকেরা এখনো প্রকৃত অর্থে ভূমি সংস্কার কর্মসূচি থেকে লাভবান হননি।

এই নিপীড়নের ফলে দেখা গেল, ফিলিপাইনের গ্রামীণ অঞ্চলে মানুষের মধ্যে প্রভূত ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের মধ্যে সামগ্রিকভাবে এই ক্ষোভ আছে বলে মানুষ বিদ্রোহ করছে, যাদের বেশির ভাগই মাওবাদীদের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে উজ্জীবিত। কমিউনিস্ট আন্দোলন ১৯৮০-এর দশকের ফিলিপাইনে একনায়ক মার্কোসের আমলে চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু এই আন্দোলন সম্প্রতি শক্তি হারিয়েছে বলে সরকার পক্ষ বলছে ।

আজ দেখা যাচ্ছে, বড় বড় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থানের কারণে এই আন্দোলন অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। বিশেষ করে, মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের কথা বলা যায়, যারা সরকারের সঙ্গে ২০১৫ সাল থেকে আলোচনা করে আসছে, যদিও মাঝে নানা ছেদ পড়েছে। তা সত্ত্বেও দুতার্তে কমিউনিস্টদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তি করতে আগ্রহী ছিলেন, যিনি নিজ শহর দাভাওয়ে যুদ্ধরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতা আনার চেষ্টা করেছিলেন। আবার তিনি একজন স্বঘোষিত ‘সমাজতন্ত্রী’, যার সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ভালো। অনেকেই মনে করেন, এই দীর্ঘদিনের মাওবাদী বিদ্রোহের রাশ টানতে তাঁর ওপরই বেশি ভরসা রাখা যায়।

এমনকি দুতার্তে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শ্রম, সমাজকল্যাণ, কৃষি সংস্কার ও দারিদ্র্য দমন কমিশনের মন্ত্রী বানাতে চেয়েছিলেন। আর এখানেই তিনি অন্য ফিলিপিনো প্রেসিডেন্টদের চেয়ে ভিন্ন। বস্তুত দুতার্তে ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তাত্ত্বিক হোসে মারিয়া সিসনের ছাত্র। অনেক বছর তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কিছুদিন আগেও এমন আশা ছিল যে, ছাত্র-শিক্ষকের মিলন হবে। শিক্ষক তো নেদারল্যান্ডসে নির্বাসনে আছেন, সম্ভাবনা ছিল, তিনি ফিলিপাইনে ফিরে আসবেন। এটা করতে দুতার্তে প্রশাসনকে বহুদূর যেতে হতো। এর জন্য ওয়াশিংটনের সন্ত্রাসী তালিকা থেকে তাঁর শিক্ষককে বের করে আনতে হতো।

এর মধ্যে দুই দফা উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে, অসলো ও রোমে। ফলে এমন আশা সৃষ্টি হয়েছিল যে, দ্রুতই পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য চুক্তির মাধ্যমে এশিয়ার সবচেয়ে পুরোনো কমিউনিস্ট বিদ্রোহের অবসান হবে। সিসনও আনন্দিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আবার আমি দুতার্তের কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।’ প্রাক্তন ছাত্র ও বর্তমানে ফিলিপাইনের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষটির প্রতি তিনি এভাবেই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।

প্রাথমিকভাবে শান্তি আলোচনায় সফলতা আসার পর অনেক ভাষ্যকারই কিছুটা ঠাট্টার সুরে বলেছিলেন, দুতার্তে শিগগিরই নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিদার হবেন। সর্বোপরি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস অনেক বছরের চেষ্টায় ফার্ক বিদ্রোহীদের আস্থা অর্জন করে তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছেন। ফলে তিনি গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু দুটি ব্যাপার দুতার্তের প্রচেষ্টা ব্যাহত করেছে।

প্রথমত ও সর্বাগ্রে দুতার্তে খেপে গিয়ে বলছে, মাওবাদীরা কাঠামোগত ঐকমত্য ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হওয়ার আগে নানা দাবি তুলেছে। সরকার শীর্ষ কমিউনিস্ট নেতাদের মুক্তি দেওয়ার পর তাঁরা আরেক দফা দাবি উত্থাপন করে। এতে সামরিক বাহিনীসহ যারা কমিউনিস্টদের সঙ্গে দীর্ঘদিন তিক্ত লড়াই করেছে, তারা বিরক্ত ও বিরোধিতা জানাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দুতার্তে বাহ্যত তাঁদের সতর্ক করে দেন, তাঁরা যেন বেশি দাবি না করেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।

এরই মাঝে কমিউনিস্টদের স্থানীয় ইউনিটগুলো যুদ্ধবিরতি ও চলমান শান্তি আলোচনার মধ্যে কয়েকটি বিলাসবহুল রিসোর্ট ও সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। সেনাবাহিনী বলছে, এই সময় শান্তি আলোচনার সুযোগ নিয়ে মাওবাদীরা প্রায় ১০০০ নতুন গেরিলা সদস্য রিক্রুট করে ফেলেছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দুতার্তে ভাবতে শুরু করেন, কমিউনিস্টদের সতর্ক করে স্বল্প মেয়াদে কৌশলগতভাবে জয়লাভ করতে চাচ্ছেন, যিনি এর বাইরে যাবেন না।

উল্লেখ্য, এনপিএ ফিলিপাইন কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র অংশ। প্রায় ৫০ বছর ধরে এ মাওবাদীদের সাথে দেশটির সরকারের সঙ্ঘাত চলছে। সঙ্ঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ১৯৮৯ সালে ফিলিপাইনে অবস্থিত মার্কিন সেনা কলোনিতে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে এ মাওবাদী বিদ্রোহীরা।

সূত্রঃ আল জাজিরা থেকে নেওয়া।