নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৪ মাওবাদী নারী নিহত

Odisha-News-Insight

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম odishatv খবরে বলা হয়েছে, রবিবার রাতে উড়িষ্যার কোরাতপুর জেলার ডকরি ঘাট এলাকার কাছে নারায়ণপাটনাতে নিরাপত্তা বাহিনীর জেলা ভলান্টেরি ফোর্স ও স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের সাথে মাওবাদীদের সঙ্গে গুলি বিনিময়ে ৪ মাওবাদী নারী ক্যাডার নিহত হয়েছে। তাদের এখনও শনাক্ত করা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে নিহতরা সকলেই অন্ধ্র-উড়িষ্যা জোনাল কমিটির সদস্য।  পুলিশ এমনটাই দাবী করছে।

উল্লেখ্য যে, নারায়ণপাটনায় ২০০৯-১০ সাল থেকে মাওবাদীরা কার্যক্রম জোরালো করার চেষ্টায় রয়েছে। ওই সময় থেকে মাওবাদীদের ফ্রন্ট সংগঠন চাষী মুলিয়া আদিবাসী সংঘ এখানে উড়িষ্যার লালগড় গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। 

Advertisements

বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামী যোদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা

haj

মাতঙ্গিনী হাজরা ভারত বর্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছেন।

১৭৫৭ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষ দখল করে শোষণ-লুন্ঠন, অত্যাচার নিপীড়ন চালিয়েছে। সেই ভারতবর্ষে  ১৮৭০ সালের ১৯ অক্টোবর মাতঙ্গিনী হাজেরা কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

ভারতের পশ্চাদপদ সমাজ ব্যবস্থায় মাতঙ্গিনীর বাবা তাকে অল্প বয়সেই বিয়ে দেন। তিনি ১৮ বছর বয়সেই বিধবা হন। হিন্দু ধর্মের রীতি অনুযায়ী সারা জীবন তিনি বিধবা হিসেবেই কাটিয়ে দেন।

কিন্তু মাতঙ্গিনী তার জীবনকে স্বার্থক করে তোলেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে।

তিনি ৩ বার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। প্রথমবার লবণ তৈরি আইন অমান্য করে গ্রেফতার হন। দ্বিতীয়বার কালো পতাকা পুলিশকে দেখানোর জন্য এবং তৃতীয়বার চৌকিদারী ট্যাক্স বন্ধ করার আন্দোলনের কারণে।

১৯৪০ সালে বৃটিশ আইন অমান্য করে যে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয় সেই বিদ্রোহে তিনি নেতৃত্বের সারিতে ছিলেন।  বিদ্রোহীরা ভারতের মেদিনীপুরে টেলিগ্রাফের তার উপড়ে ফেলেন, বৃটিশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বোমা-হামলা করেন এবং বৃটিশ পতাকা পুড়িয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে সশস্ত্র বিদ্রোহের সময় পুলিশের গুলিতে ১৮০ জন বিদ্রোহী শহীদ হন। ১৬৩০ জন আহত হন এবং গ্রেফতার হন ৬০ হাজার। ১৯৪২-এর সেপ্টেম্বরে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে ৫০ হাজার নারী-পুরুষের এক বাহিনী তমলুক থানার লালবাড়ী দখল করতে যান। সেখানে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনে বহু নেতা-কর্মী আহত-নিহত হন। মাতঙ্গিনীও ৩টি গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তিনি ৭৩ বছর বয়সে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন।

মাতঙ্গিনী হাজরা কোনো বিপ্লবী দিশায় দিক্ষিত ছিলেন না। বা সমাজের সার্বিক মুক্তিকামী কোনো সংগঠনের কর্মীও ছিলেন না। তিনি ছিলেন মূলত বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একজন নির্ভীক সৈনিক। মাতঙ্গিনী ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস নেতা গান্ধীর অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও অহিংস নীতির বদলে যেখানেই সহিংস আন্দোলন শুরু হয়েছে- সেখানেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এবং জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করেছেন; শেষ পর্যন্ত জীবন বির্সজন দিয়েছেন। এটাই তার অগ্রসরতা।

আমাদের দেশের ও ভারতের নিপীড়িত নারীদের সংগ্রামে মাতঙ্গিনীর জীবন উৎসর্গ প্রেরণা যোগাবে নিঃসন্দেহে। একই সাথে এই শিক্ষা নিতে হবে মাতঙ্গিনী সহ হাজার-হাজার নারী পুরুষের রক্তের বিনিময়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ উচ্ছেদ হলেও ভারতবর্ষের শ্রমিক, কৃষক এবং নিপীড়িত নারীরা সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ-পুরুষতন্ত্রের শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পায়নি। এখনো নির্ভয়াদের ধর্ষণের শিকার হয়ে জীবন দিতে হচ্ছে। নারী ধর্ষণকারী শহর হিসেবে নয়াদিল্লি ২য় স্থানে। এখনো ভারতীয় নারী সমাজ বৃটিশ দখলদারিত্বের যুগ থেকে একটুও আগায়নি। আগানো সম্ভবও নয়। ভারতে এখনো পালা বদল করে ক্ষমতা চালাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদেরই দালাল শাসকশ্রেণি। এই দালাল শাসকশ্রেণি উচ্ছেদ ব্যতীত নারীদের মুক্তি অসম্ভব। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে ভারতের বিপ্লবী নারী সংগঠন। তার অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিপীড়িত নারীগণ।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮


বিপ্লবী নারী মুক্তি ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের উদ্যোগে ‘নারী দিবস’ পালিত

বিপ্লবী নারী মুক্তি

চট্রগ্রাম মহানগর শাখা

০৯/০৩/২০১৮

 বরাবর,

 বার্তা সম্পাদক,

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আজ চট্রগ্রাম নগরের নাসিরাবাদ এলাকায় “বিপ্লবী নারী মুক্তি” চট্রগ্রাম মহানগর শাখার উদ্যোগে এক ঘরোয়া আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। গার্মেন্টস শ্রমিক কমরেড নীলু আক্তারের সভাপতিত্ব ও বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন, চট্টগ্রাম মহানগরের সংগঠক কমরেড লক্ষ্মী রাণীর পরিচালনায় বক্তাগণ ১৮৫৭ সালের ৮ই মার্চ আমেরিকার নিউইর্য়ক শহরের কারখানা গুলোতে সুষ্ট কর্মপরিবেশ, নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সমমজুরি সহ কর্মঘন্টা নির্ধারনের দাবিতে নারী শ্রমিকদের কতৃর্ক সংঘঠিত কর্মসূচীর প্রতি সংহতি জানিয়ে এদেশের নারী শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও অধিকার প্রদান সহ সমাজে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জোর দাবী জানান। সাথে আরো বলেন- নারী মুক্তির একই পথ- সমাজতন্ত্র সাম্যবাদ।

বার্তা প্রেরক

লক্ষ্মী রাণী

বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন


বাংলাদেশের নারী চা-শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম

37822831_303

বাংলাদেশের চা নারী শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম সম্পর্কে লিখতে গেলে বর্তমান পরিস্থিতির আলোচনাটাই যথেষ্ট নয়। তাদের অতীত ইতিহাস তুলে না ধরলে তাদের জীবন সংগ্রামের ইতিহাসটা আংশিকই বলা হবে। তাদের বাংলাদেশে আগমনের পূর্ব ইতিহাস ও সংগ্রাম তুলে ধরাটাও প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।

বৃটিশ ভারতের আসামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮২৮ সালে এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৮৪০ সালে চা উৎপাদন শুরু করে । চা উৎপাদনের জন্য চীনা শ্রমিকরা অভিজ্ঞ ছিল বলে সেখান থেকে প্রথম শ্রমিক আমদানি করা হয়। কিন্তু আবহাওয়া, পরিবেশ এবং গৃহ সমস্যার কারণে শ্রমিকরা চলে যায় বা রোগে মারা পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে কোম্পানি ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে আদিবাসী কৃষি শ্রমিকদের আমদানি করে। যার মধ্যে বিহারের রাঁচি, হাজারিবাগ, সাঁওতাল পরগণা, ডুমকা ও গয়া, উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্চ, গঞ্জ, সম্বলপুর ও চাইবাসা এবং মধ্যপ্রদেশের রায়পুর, রামপুর হাট ও চকলপুর, উত্তরপ্রদেশ, মাদ্রাজ এবং পশ্চিমবঙ্গ উল্লেখযোগ্য। চা শ্রমিকদের এক বিশাল অংশ উদ্বৃত্ত কৃষি শ্রমিকদের মধ্য থেকে এসেছিল।

 চা শ্রমিক সংগ্রহ পদ্ধতি তখন ‘ফ্রি কন্ট্রাক্টস’ নামে পরিচিত ছিল। এটি ছিল অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। এই ব্যবসার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা কপটতা, মিথ্যাচার, শক্তি প্রয়োগসহ নান রকম অমানবিক পন্থা অবলম্বন করে লোভ-লালসা দেখিয়ে শ্রমিকদের আসামে আসতে প্রলুব্ধ করতো। যা মধ্যযুগের ইউরোপিয়ানদের দাস ব্যবসাকেও হার মানায়। এই শ্রমিকরা আসামে যাওয়ার পথেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। যারা বেঁচে থাকত তাদেরও বাগান কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণ, গৃহ, চিকিৎসা সমস্যা এবং খাদ্য সরবরাহের স্বল্পতায় নিদারণ দুঃখ কষ্টের মধ্যে ফেলে দিত। ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৭ সালের মধ্যে ৮৪,৯১৫ জন শ্রমিক আসামে আসলেও ১৮৬৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ৩০,০০০ শ্রমিক প্রাণ হারায়। তা সত্তেও¡ শ্রমিক সংগ্রহ বন্ধ থাকেনি। পর্যায়ক্রমে আসামের অন্যান্য অঞ্চলের মত সিলেট ও চট্টগ্রামের সকল বাগানেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে চা শ্রমিক আমদানি করা হয়েছে। চা-শ্রমিকরা বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী থেকে এসেছেন। তাদের মধ্যে ওরাওঁ, মুন্ডা, সাঁওতাল, খরিয়া, খারওয়ার, ভুইহার, মাল, রাজ গন্দ, কিসান, নাগেসিয়া, তাঁতি, বড়াইক, মাহালিসহ আরো অনেক জাতি। কোন কোন গবেষক ১০৪টি চা-শ্রমিক জাতির উল্লেখ করেছেন।

 মিথ্যা প্রলোভন, শক্তি প্রয়োগ, এবং প্রতারণার জন্য শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিবাদ করা হলেও কোন ফল আসেনি। শ্রমিকদের চা শ্রমে বাধ্য করার জন্য ইস্ট ইন্ডয়া কোম্পানি এবং বৃটিশরা ১৮৫৭ সালে নানা রকম আইন-কানুন জারি করে। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ থেকে দাবি-দাওয়া বা প্রতিরোধের জন্য শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা হয়। কিন্তু বর্বরোচিতভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে বাগান মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি হ্রাসের উদ্যোগ নিলে বৃটিশ বিরোধী জনগণের অসহযোগ আন্দোলন চা শ্রমিকদের মধ্যেও প্রভাব ফেলে। তারা  নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চা বাগানের দাস ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঐ সময়ে নারী পুরুষ শিশুসহ প্রায় ত্রিশ হাজার শ্রমিক নিজেদের আদি বাসস্থানের উদ্দেশ্যে বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পরে। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য বাগান থেকে শ্রমিকরা বেরিয়ে যায়। চা-শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীপংকর মোহান্তের প্রবন্ধ ‘সিলেটের চা-শ্রমিক আন্দোলন’ থেকে জানা যায়, সিলেট বরমচাল, কুলাউড়া, শমসেরনগর, শ্রীমঙ্গল, সাতগাঁও এবং শায়েস্তাগঞ্জ রেল স্টেশনে অজস্্র শ্রমিক জমা হয়। শ্রমিকরা যাতে এলাকা ত্যাগ করতে না পারে সেজন্য শ্রমিকদের রেলওয়ের টিকিট না দেওয়ার জন্য প্রশাসন আদেশ জারি করে।

এই শ্রমিকরা টিকেট না পেয়ে রেললাইন ধরে চাঁদপুর ঘাটে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করে। চারিদিক থেকে চাঁদপুরে এসে শ্রমিকরা জড়ো হতে শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল নদী পাড়ি দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটে যাবে। গোয়ালন্দগামী স্টিমার ঘাটে এসে পৌঁছতেই শ্রমিকরা স্টিমারে উঠার চেষ্টা করে। বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে আগেই সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। একটা হুইসেল বাজতেই পুলিশ শ্রমিকদের লক্ষ করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। গুলিতে অনেকে মারা যায়, বাকীরা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পালিয়ে যায়। গভীর রাতে বৃটিশ কোম্পানির কর্তৃপক্ষ প্রলোভন দেখিয়ে এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে শ্রমিকদের বাগানে ফেরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ফলে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গুর্খা সৈন্যরা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে অনেকের মৃত্যু হয়। চাঁদপুরে চা শ্রমিকদের উপর নৃশংস হামলার প্রতিবাদে সাধারণ হরতাল আহ্বান করা হয়। এতে জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। আসাম-বাংলার রেল ও জাহাজ কোম্পানির কর্মচারীরা হরতালসহ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। তাদের ধর্মঘট অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে থাকে এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাসহ অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। রেলকর্মচারীদের ধর্মঘট প্রায় আড়াই মাস স্থায়ী হয়। চার হাজার পাঁচশত রেল কর্মচারী চাকুরিচ্যুত হন। শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া নেতৃত্বে চলমান আন্দোলন আপোষের মাধ্যমে চা-শ্রমিকদের আন্দোলনেরও সমাপ্তি ঘটে। এই সময় চা শ্রমিকদের কোন ইউনিয়ন ছিল না। ১৯৩৮ সালে ‘শ্রীহট্ট কাছার কমিউনিস্ট পার্টি’ শ্রমিকদের মধ্যে আন্দোলন গড়ে তুলতে ‘শ্রীহট্ট কাছার চা-শ্রমিক ইউনিয়ন’ গঠন করে। এবং কিছু দাবি-দাওয়াও উত্থাপন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় আন্দোলন-সংগ্রাম চললেও বৃটিশ ভারতের চা-শ্রমিকদের দাসসুলভ জীবনের কোন পরিবর্তন আসেনি বাংলাদেশ সময়েও।

বাংলাদেশে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, বৃহত্তর সিলেট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ, লালমনিরহাটে ১৬২টি বাণিজ্যিক ভিত্তিক চা বাগান রয়েছে। বিশ্বের চা উৎপাদনের ৩% বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। চা বাংলাদেশের রপ্তানীকারক অর্থকরী ফসল। ২০১৫ সালে ৬৭.৩৮ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়। ২০১৬ সালে ৭০ মিলিয়ন কেজি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা দেয়া হয়েছিল (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। বাংলাদেশে তিন লক্ষাধিক খোদ চা-শ্রমিক-এর ৭৫% নারী।

 বাংলাদেশ আমলে চায়ের উৎপাদন বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের জীবনমান বৃটিশ আমলের মতই রয়ে গেছে। বৃটিশ আমলে চা শ্রমিকদের মজুরি ছিল সর্বপ্রথম ২১ টাকা। পর্যায়ক্রমে ২৮ টাকা, ৪৮ টাকা ও ৬৯ টাকা। সর্বশেষে ২০১৫ সালে নির্ধারণ করা হয় ৮৫ টাকা। রেশনসহ তাদের দৈনিক শ্রমের মূল্য পড়ে ১৫৬ টাকা। দৈনিক ৮ ঘণ্টা টানা পরিশ্রম করে ২৩ কেজি চা পাতা তুলতে পারলে ৮৫ টাকা মজুরী দেয়া হয়। ২০ কেজির কম হলে ৮০ টাকারও কম মজুরী দেয়া হয়। ২৩ কেজি তোলার কথা থাকলেও ২৪ কেজি পাতা সংগ্রহের বিনিময়ে মজুরী দেয়া হয়। অতিরিক্ত কেজি প্রতি সাড়ে তিন টাকা করে দেয়। এই ৮৫ টাকা দিয়ে ৪ জনের একটি পরিবার কীভাবে চলে আকাশ ছোঁয়া এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে। মাসে একজন শ্রমিকের বেতন পড়ে ২,৫৫০ টাকা যাতে একজন শ্রমিকের খাওয়া খরচও হয় না। এই মজুরীতে তাদের জীবন চলে না বলেই তারা বাড়তি আয়ের জন্য বাগানে কাঠ সংগ্রহ করে, ঘরে হাঁস-মুরগী, গুরু-ছাগল পালে। কোন কোন বাগানের শ্রমিকরা চা বাগানের জঙ্গল কেটে ধান, শাক-সব্জি উৎপাদন করে। শ্রমিকরা দুই সপ্তাহে একবার বাজারে গিয়ে সবচেয়ে সস্তা সিলভারকার্প মাছ কিনে খেতে পারে। তারা সকালে শুকনা মরিচ দিয়ে চা-পাতা ভাজা খেয়ে কাজে যান। দুপুরে খান শুকনা রুটি। আর দিন-রাতে মাত্র একবেলা ভাত খাওয়ার সুযোগ পান। কখনো টাকা না থাকলে ভাতও খেতে পারেন না।

আট বাই আটের একটি ঘরে দুটি করে রুম, এর এক কোনায় রান্নাঘর। এর মধ্যেই গাদাগাদি করে থাকছেন সাত-আট সদস্যের এক একটি পরিবার। কোন শ্রমিক বাগান কর্তৃপক্ষের দেয়া ঘরের বাইরে আলাদাভাবে ঘর বানাতে চাইলে বাগান কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় না। কেউ ঘর তৈরির উদ্যোগ নিলে সেই শ্রমিককে চাকুরিচ্যুত করার হুমকিও দেওয়া হয়। অথচ সরকারি শ্রম আইনের ৩২-ধারায় চা শ্রমিকদের জন্য বলা হয়েছে, একজন শ্রমিক অবসরে যাওয়ার পরই তাকে তার ঘর থেকে এক মাসের মধ্যে উচ্ছেদ করা হবে। বাগান মালিকদের দেয়া ঘরগুলোতে পল্লীবিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া যায় না। অথচ মাস শেষে শ্রমিকের বেতন থেকে কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎবিলের টাকা কেটে নেয়। হাঁস-মুরগি পালনের জন্য বছরে ১৫ টাকা কেটে নিচ্ছে। শ্রমিকের ঘরে যে মাটির চুলা আছে তার জন্যও বছরে ১২ টাকা কর দিতে হয়। আর গরু-ছাগল বাগানে ঢুকলে ৫০/১০০ টাকা জরিমানা করা হয়।

চা বাগানের একজন শ্রমিকের ছেলে যখন কাজের উপযুক্ত হয় তখন সেও তার বাবার মত বাগানে শ্রমিক হিসেবে যোগদান করবে- এটাই নিয়ম। এমনকি না চাইলেও সে ছেলে বিয়ে করলে তার স্ত্রীকেও শ্রমিক হিসেবে বাগানের কাজে বাধ্যতামূলক ঢুকতে হবে। চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকরা পুষ্টিহীনতা, ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং গর্ভকালীন সমস্যাসহ নানা রোগ-শোকে ভুগে ক্ষয় হচ্ছেন। এই নারী শ্রমিক বা পুরুষ শ্রমিকরাও ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে আছেন। বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সময় মজুরির আশায় ছুটিতে না গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নারী শ্রমিকরা কাজ করছেন। আর গর্ভকালীন সময়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানা ৮ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে পরিশ্রম করায় মা ও গর্ভের সন্তান উভয়ের ক্ষতি হচ্ছে। নারীরা সাধারণত চা বাগানে পাতা সংগ্রহ, নার্সারিতে গাছের কলম তৈরি  এবং চারা সংগ্রহ ইত্যাদি কাজ করেন। চা বাগানে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই তাদের গর্ভপাত হয়। কারণ এই শ্রমিকরা গর্ভধারণের পর থেকে সন্তান প্রসবের আগ পর্যন্ত ছুটি নেন না। মাতৃত্বকালীন সবেতন ছুটি তাদের কপালে নেই। তাই সন্তানকে পেটে নিয়েই রোদে পুড়ে আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে টানা কাজ করে যান। একজন প্রসূতি মায়ের এই সময়ে যে পরিমাণ বিশ্রাম ও সুষম খাদ্য খাওয়া প্রয়োজন তার কিছুই  ভাগ্যে জোটে না। অপুষ্টির শিকার একজন নারী শ্রমিক যে সন্তানের জন্ম দেন সে সন্তানও নানা জটিলতা নিয়ে জন্ম নেয়। সন্তান পেটে নিয়ে কাজ করায় তাদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট হয়। নানা ধরনের শারীরিক জটিলতাও দেখা দেয়। কিন্তু কোন উপায় না থাকায় তাদের কষ্ট সহ্য করতে হয়। বাগানে কাজ করার সময় নারী শ্রমিকরা পানি পান বা সুপারি খাওয়ার সময়ও কর্র্তৃপক্ষ অসদাচরণ করে থাকে। পর্যাপ্ত নলকূপ বা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও থাকে না। চা বাগানের মধ্যে প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই; যা আছে তার অবস্থাও খারাপ। ফলে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আবার বড় ধরনের রোগ হলে মালিকরা অর্ধেক খরচ দেয়। পেটের ব্যথা, মাথার ব্যথা, বুকের ব্যথায় একই ধরনের ঔষধ প্যারাসিটামল দেয় বলে শ্রমিকদের ভাষ্য।

শিক্ষাক্ষেত্রে চা-শ্রমিকদের সন্তানরাও বঞ্চিত। শ্রম আইনানুযায়ী কোন চা-বাগানে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেই সেই বাগান কর্তৃপক্ষকে সেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু বাগান কর্তৃপক্ষ তা করছে না। সরকারিভাবে চা বাগানগুলোতে স্কুল তৈরি করা হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে তা অপর্যাপ্ত। আর স্কুলগুলোর শিক্ষার মানও নিম্ন। অর্থের অভাবে সন্তানরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। বাসস্থান থেকে স্কুল দূরে হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অনেকেই স্কুলে যায় না। যারা সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করছেন তারা টাকা ঋণ করে লেখাপড়ার খরচ চালান। কোন শ্রমিকের সন্তান যদি উন্নত জীবন-যাপনের উদ্দেশ্যে লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত হয় তাহলেও তাদের চাকরি পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাদের নিজস্ব বাড়ী (জমি) বা বাসস্থানের ঠিকানা না থাকায় উচ্চ শিক্ষা নিয়েও চাকরির সুযোগ পাচ্ছে না।

      চা-শ্রমিক নারীদেরও পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন সহ্য করতে হয়। চা-বাগানে নারী শ্রমিকরাই কাজ করেন বেশি । নারীরা সপ্তাহের তলবের সব টাকাই স্বামী বা বাবার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। ১০/২০ টাকা লুকিয়ে নিজের কাছে রেখে দিলে ধরা পড়লে কপালে জোটে নির্যাতন। পুরুষরা মেয়েদের টাকা দিয়ে সদাই করে, ধার শোধ করে এবং তার পর যায় ভাটি খানায়। সেখানে বাংলা মদ খেয়ে এসে বউ পিটায়। যা পুঁজিবাদী-পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থারই নগ্নরূপ। আদিবাসী চা-শ্রমিক হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী এবং বিজ্ঞান শিক্ষার অভাবে ধর্মীয় কুসংস্কার তাদের মধ্যে অত্যধিক। ভূত-প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করে। প্রচলন আছে আমদানি করা শ্রমিকরা যাতে রাতের আঁধারে পালিয়ে না যায় সেজন্য বাগান কর্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্তৃপক্ষ ভূত-প্রেত্মাতার গল্প বলে তাদের মাঝে ভয়-ভীতি সৃষ্টি করেছিল।

     সবশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের সমস্ত ধরনের শ্রমিকদের মাঝে চা-শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত। ১২৫/১৫০ বছর আগে চা-শ্রমিকরা গহীন জঙ্গল কেটে জমিকে আবাদযোগ্য করে গড়ে তুলে এবং বংশানুক্রমে শ্রম ও ঘাম দিয়ে ফসল ফলিয়ে দুর্বিসহ জীবনকে কিছুটা সহনীয় করে চলছিল। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের চা বাগানের শ্রমিকরা শতাধিক বছর ধরে বাগান সংলগ্ন যে ৫১১ একর জমি চাষ করে নিজেদের কিছু অতিরিক্ত আয়ের সংস্থান করে এসেছিলেন, উন্নয়নের নামে হাসিনা সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ঘোষণা দিয়ে তা কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চা-শ্রমিকদের কার্যত ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারও নেই।

আজকের চা-বাগান মালিক, শাসকশ্রেণি, হাসিনা সরকার বৃটিশ উপনিবেশিক শাসকদেরই ঔরসজাত সন্তান, তা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। চা-শ্রমিকদের দাস ব্যবস্থাই তার জীবন্ত প্রমাণ।

তাই, নারী চা-শ্রমিকদেরকে আশু দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি এ দেশের শ্রমিক, কৃষক ও নিপীড়িত জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি, সরকার উচ্ছেদ এবং সমাজ পরিবর্তনের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবে যোগ দিতে হবে। কারণ বিপ্লবী আন্দোলনই শ্রমিক-কৃষক সহ সমস্ত নিপীড়িত জনগণের মুক্তির দিশা দিতে পারে।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮


৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে ‘বিপ্লবী নারী মুক্তি’র আহ্বান

নারীর শত্রু সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা, দালাল শাসকশ্রেণি, পুরুষতন্ত্র উচ্ছেদের বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিন!

নারীমুক্তির সমাজ, সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষে বিপ্লবী আন্দোলন বেগবান করুন!

Untitled

 

আওয়াজ তুলুন

* নারীর মুক্তির জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বদলে ফেলুন! শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের নতুন সমাজ নির্মাণ করুন!

* পুরুষতন্ত্রের রক্ষক সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ-সামন্তবাদ দালাল শাসকশ্রেণিকে বিরোধিতা না করে নারীমুক্তির কথা বলা ভন্ডামি ! শাসকশ্রেণি, সরকার, এনজিও সেটাই করে!

* বুর্জোয়ার নারীদের শোষণ-শাসন করার ক্ষমতাকে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত নারীদের ক্ষমতা বলার ভন্ডামিকে উন্মোচন করুন !

* আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ছত্রছায়ায় নারী ধর্ষণ-খুন-নির্যাতন ও পুলিশী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন!

* নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপন, ব্লুফিল্ম, ও সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নারীদেহ প্রদর্শনের মাধ্যমে নারীকে পণ্য বানানো চলবে না !

* রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ধর্ষণ, হত্যা ও জাতিগত নির্মূলীকরণের সত্যিকার বিরোধিতার জন্য তাদের জাতিগত স্বতন্ত্রতার স্বীকৃতি, রাখাইনে স্বায়ত্তশাসনসহ জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রামকে সমর্থন ও সহযোগিতা করুন!

– সুচি সরকার ও হাসিনা সরকারের মধ্যকার ভূয়া চুক্তির মুখোশ উন্মোচন করুন! রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের মিয়ানমার সরকারের সেনাবাহিনীর বর্বর অত্যাচারের মুখে ঠেলে দেয়াকে বিরোধিতা করন!

* বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন,‘১৭-এ মৌলবাদীদের চাপের মুখে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরীদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছে হাসিনা সরকার। এই আইন বাতিলের দাবীতে এবং বাল্যবিবাহ রোধের নামে পুলিশ ও প্রভাবশালীদের হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন!

* গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম মূল বেতন ৫মণ চালের মূল্যের সমান নির্ধারণ করতে হবে!

– বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব মালিক ও রাষ্ট্র পক্ষকেই নিতে হবে!

* কর্মক্ষেত্রে নারীদের সমশ্রমে সমমজুরি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করুন!

* পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নারীদের সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষণ-নির্যাতনের প্রতিবাদ করুন!

* দেশে-বিদেশে গৃহশ্রমিকদের উপর বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন! তাদের ৮ঘণ্টা কাজের সময় ও নির্ধারণ ও ন্যায্য মজুরির জন্য আন্দোলন গড়ে তুলুন!

* নারী বিরোধী পশ্চাদপদ সামন্ততান্ত্রিক আইএস সহ সকল মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন!

– নারী বিরোধী ওয়াজ-নসিহত, ফতোয়া ও ক্যাসেট নিষিদ্ধ করতে হবে!

* মহান নারী নেত্রী চিয়াং চিং, নাদেজদা ক্রুপস্কায়া, ক্লারাসেৎকিন, রোজালুক্সেমবার্গ, কলোনতাই- লাল সালাম!

* নারীমুক্তির একই পথ- সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ !

বিপ্লবী নারী মুক্তি

ফেব্রুয়ারি, শেষ সপ্তাহ,’১৮

মোবাইলঃ ০১৯১৫ ২২ ১৯ ৮০


রোবট সোফিয়াঃ কেন নারী ?

59f20b693e9d257c6d8b4c1f

কিছুদিন আগে রোবট সোফিয়া এসে দেশে একটা হইচই ফেলে দিয়েছিলো। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল তাকে দেখতে, কথা শুনতে। অবশ্য সে সৌভাগ্য আমজনতা দূরের কথা, রাজধানীর শিক্ষিত ও প্রযুক্তিমনস্ক তরুণরাও তেমনটা পায়নি। ঘটনাটা ঘটেছিল সরকারি ৩ টাকা ডিমের ঘোষণার মতো। বেশিরভাগ মানুষকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। এমনকি যারা এইসব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন এবং বিশেষজ্ঞ- তাদের সাথে সোফিয়ার একটা বিশেষ আলোচনাকেও পরে বাতিল করা হয়। মিডিয়ায় শুধু ভেসে ওঠে হাতে কাগজ ধরা প্রধানমন্ত্রীর ছবি, যিনি কিনা তার নাতনির নামও যে সোফিয়া, সেটা এই রোবটের মুখে শুনতে পেরে যারপরনাই উচ্ছ্বসিত ও বিগলিত ছিলেন বলে দেখা গিয়েছে।

সোফিয়াকে নিয়ে বিজ্ঞানগত কোন আলোচনা এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এমনকি রাষ্ট্র কোন উদ্দেশে একে নিয়ে এতো মাতামাতি করলো, আর ধর্মবাদীরা এ প্রসঙ্গে অদ্ভুত উদ্ভট কী কী সব ব্যাখ্যা দিয়েছে সেগুলো আলোচনা করাও এর বিষয় নয়। আমরা খুব সংক্ষেপে শুধু দেখতে চাই কেন এতো আলোচিত সোফিয়া রোবটটিকে মেয়ে হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। কেন পুরুষ নয়?

কেউ একে নিছক একটি পছন্দ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। পুরুষ বা নারী- কোনো একটা-তো করতেই হবে- যেহেতু রোবটটিকে একটি মানুষের আদল দেয়া হয়েছে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা সম্ভব যে, নারী হিসেবে একে তৈরি করার পেছনে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বেশ জোরালোভাবেই কাজ করেছে।

রোবট তৈরির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান আরো অনেক এগিয়েছে বলেই জানা যায়। সোফিয়া সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু নয়। ইতিমধ্যেই ঢাকার অভিজাত হোটেলে ১৪ লক্ষ টাকা খরচ করে দুটো সাধারণ মানের রোবট আনা হয়েছে ওয়েটার/ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করার জন্য। এখানেও দেখা যাচ্ছে একটি পুরুষের সাথে একটি মেয়ে রোবটও আমদানি করা হয়েছে, যদিও ঢাকার হোটেলগুলোতে সাধারণত কোনো মেয়ে ওয়েট্রেস স্বাভাবিক নয়। এ হোটেলটি যে বিজ্ঞান বা নারীমুক্তির প্রতি ভালোবাসার কারণে এসব চাকর-চাকরানি রোবট আনিয়েছে তা ভাবলে ভুল হবে। বিষয়টা নিছক বাণিজ্যিক। শুধু রোবটগুলো দেখা ও তাদের কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা শোনার জন্যই ১০ টাকার ডিমভাজি ১০০ টাকা দিয়ে কিনতে সেখানে স্বচ্ছল পরিবারগুলো বাচ্চাদের নিয়ে জড়ো হচ্ছে। সেরকম সোফিয়াকেও শেখ হাসিনা প্রায় ৯ কোটি টাকার খরচ অনুমোদন করে আনিয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক। অভিজাত হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বাণিজ্যিক অফিসগুলোতে, এবং তারপর শিল্প-প্রতিষ্ঠানে অচিরেই আরো রোবট আসবে। বাংলাদেশ যে ‘ডিজিটাল’ হয়ে গেছে তার প্রমাণ দেখা যাবে, যার মধ্য দিয়ে মুনাফা হবে শুধু এই বিজ্ঞান-বণিকদের। নিঃসন্দেহে বলা চলে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি এ বাণিজ্যের একটি ভালো ভাগ পাবার কারণে একে প্রসারিত হতে সহায়তা করে যাবে, যতদিন না কোনো পুরুষ বা নারী রোবট প্রধানমন্ত্রী হবার প্রতিযোগিতায় হাসিনা-খালেদার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভুত হচ্ছে।

তো, যেখানে বাণিজ্যই প্রধান বিষয় সেখানে নারীর ব্যবহার বুর্জোয়া ব্যবস্থায় খুবই প্রাসঙ্গিক। কারণ, নারীই এখানে বড় এক পণ্য। একটি পুরুষ রোবটের চেয়ে নারী রোবট বেশি আকর্ষণীয়। সেটা যে বেশি লোক টানবে তা সোফিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। আর যদি সে রোবটটিকে যৌন-আবেদনময়ী করে বানানো যায় তাহলে তো কথাই নেই। অবশ্য সোফিয়া এখনো তেমনটা হয়ে উঠেনি। এখনো তার পা নেই। বাংলাদেশের মতো সাংস্কৃতিক পশ্চাদপদ এক দেশে এসে তাকে মুসলমানি কামিজ পরে গলায় একটি ওড়না পেঁচিয়ে রাখতে হয়েছে। কিন্তু তার মূল বাসস্থান আমেরিকায় সে কী পরে থাকে সেটা দেখার সৌভাগ্য এখানকার তরুণদের হলো না। এর আবার একটি গূঢ় কারণ হয়তো বা এই যে, সোফিয়া হলো সৌদি নাগরিক। যেখানে নারীকে প্রকাশ্যে বের হতে হলে বোরখা পরা বাধ্যতামূলক। তরুণীরা সাথে ‘মেহরাব’ পুরুষ ছাড়া চলতে পারে না। স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে হলেও তাই। সেই দেশ কোন ধর্মমতে ও আইনে এই সচল, বাকপটু, ন্যাড়া মাথা, সুন্দরী যুবতী নারী মূর্তিকে নাগরিকত্ব দিয়েছে তা এক রহস্যই বটে! নারী-মানুষের অধিকার নেই, নারী-রোবট নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে!

তথাপি বাংলাদেশের তরুণরা মোটেই বেরসিক নয়। তাদের অনেকে সোফিয়াকে প্রেম নিবেদন করেছে। অনেক আদি-রসাত্মক গল্প, চুটকি ও স্ট্যাটাসও চলেছে। এসবই বাণিজ্যকে বাড়িয়েছে। পুরুষ হলে এগুলো নিশ্চয়ই কম হতো।

যাহোক, প্রধানমন্ত্রীও নারী। তিনি মাথায় কাপড় দিয়ে ধর্মমতে চলাফেরা করেন। যা ভোটের বছরে বিশেষ বেড়ে চলে। তবুও তিনি সোফিয়াকে মাথায় কাপড় দিতে যে বলেননি এটাই রক্ষা। কারণ, যে হারে তার সরকার নারী ভাস্কর্যগুলোকে সরিয়ে, বা লিঙ্গ বদল করে চলেছে, তাতে সে রকম হতে যে পারতো না তা নয়। এভাবেই পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ- উভয়ের পুরুষতন্ত্র হাত ধরাধরি করে চলছে এই বাংলাদেশে।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮


ভারতের সর্ববৃহৎ নারী সংগঠনের প্রধান কমরেড অনুরাধা গান্ধী- যুগ যুগ বেঁচে থাকুন !

anuradha_gandhi_india_maoist

১২ এপ্রিল, ২০০৮ কমরেড অনুরাধা ফেলসিফেরাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৪ বছর। তিনি বিহার ঝাড়খন্ডের গেরিলা অঞ্চলের কিছু পার্টি কাজ সেরে ফিরে আসা মাত্রই জ্বরে আক্রান্ত হন। ৬ এপ্রিল তার উচ্চমাত্রার জ্বর থাকার পরও গোপন জীবনের জটিলতার কারণে উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে পারেননি। স্থানীয় প্যাথলজিস্টের ভুল রক্ত পরীক্ষার ফলাফলের কারণে ভুল চিকিৎসা হয়। অন্য একটি রক্ত পরীক্ষায় ১১ এপ্রিল যখন জানা গেল যে তিনি ফেলসিফেরাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত, তখন যদিও তাঁকে দ্রুতই মুস্বাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিল তাঁর একেবারেই শেষমুহূর্ত। কষ্ট সহিষ্ণু বৈশিষ্ট্যের কারণে বাইরে থেকে তখনো তাঁকে ভাল দেখা গেলেও ফ্যালসিফেরাম ম্যালেরিয়া ইতোমধ্যেই তাঁর হৃৎপন্ডি, ফুসফুস ও কিডনী আক্রমণ করে ফেলেছে। যা তাঁর শরীরকে দুর্বল করে দিয়েছে। এবং এক ঘন্টার মধ্যে তাঁর সকল অঙ্গের কার্যক্রম বিকল হওয়া শুরু হয়। প্রথমে অক্সিজেন এবং পরে লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা দেয়া হলেও পরের দিন সকালে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কমরেড অনুরাধার মৃত্যুতে ভারতের বিপ্লব একজন আদর্শস্থানীয় কমিউনিস্ট নেতা ও মেধাবী বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীকে হারালো। ভারতীয় শ্রমিক শ্রেণি হারালো তাদের সবচেয়ে সক্ষম শীর্ষ নারী নেতৃত্বকে, যিনি কঠোর পরিশ্রম, গভীর মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক অধ্যয়ন এবং বিপ্লবী দৃঢ়তার মধ্যদিয়ে সিপিআই(মাওবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যের পর্যায়ে উঠে এসেছিলেন। ভারতের নিপীড়িত নারী সমাজ তাদের মহান শ্রেষ্ঠ একজনকে হারালো যিনি সাড়ে তিন দশক অক্লান্তভাবে তাদেরকে শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সংগঠিত করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। নাগপুরের অসংগঠিত দলিত ও শ্রমজীবী জনগণ এমন একজন হারাল যিনি তাদের মধ্যে থেকে তাদেরকে জাগরিত ও সংগঠিত করেছিলেন। এবং বস্তারের জনগণ যারা গণহত্যাকারী সালুয়া জুদুমে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন তারা হারালেন প্রিয় দিদিকে, যিনি তাদের সাথে বছর বছর থেকে তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়েছিলেন। ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীগণ হারাল তাদের অনুকরণীয় বিপ্লবীকে, যিনি নিপীড়িত জনগণের সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির আরাম আয়েশের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন।

প্রথম জীবনঃ

১৯৪০-১৯৫০-এর দশকে অবিভক্ত সিপিআই থেকে আসা একটি পরিবারে ১৯৫৪ সালে অনুরাধা মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। সিপিআই মুম্বাই অফিসেই তার বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তারা পার্টিতে সক্রিয় ছিলেন। তার বাবা গণেশ শনবাগ একজন উকিল ছিলেন। তিনি পার্টির নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্য ছিলেন এবং তেলেঙ্গানার সংগ্রামে গ্রেফতারকৃত কমিউনিস্টদের মামলার স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে তিনি মুম্বাইয়ের একজন প্রগতিশীল আইনজীবী হয়েছিলেন। মা কুমুদ শনবাগ একজন সমাজকর্মী হিসেবে তার জীবন অতিবাহিত করেছেন। শেষ বয়সেও তিনি একটি নারী দলের সাথে জড়িত ছিলেন। শিশুদের সৃজনশীলভাবে বেড়ে ওঠার জন্য এই পরিবারে উদার আবহাওয়া ছিল উপযুক্ত পরিবেশ। তাই অনুরাধা বিপ্লবী এবং তার ভাই মুম্বাইয়ের একজন বিশিষ্ট প্রগতিশীল নাট্যকার হতে পেরেছেন। অনুরাধা সান্তাক্রুজে জেবি ক্ষুদে স্কুলের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। ক্লাসে তিনি সর্বদাই শীর্ষ অবস্থানে থাকতেন। সেখানে তিনি ধ্রুপদী নাচও শিখেছিলেন। স্কুলটিতে শিশুদের জ্ঞান বিকাশের জন্য নানাবিধ বিষয়ে অধ্যয়নকে উৎসাহিত করা হতো। এ ধরনের পরিবেশের কারণে তিনি রাজনীতি বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান। এবং সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম ও বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। সে সময় কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিশ্বব্যাপী আলোড়ন ছিল। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিরাট প্রভাব, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের জনগণের গণযুদ্ধের ঐতিহাসিক অগ্রগতির সংবাদ বিশ্বব্যাপী যুব সমাজকে আন্দোলিত করেছিল। এবং সেই আন্তর্জাতিক বিদ্রোহ, বিপ্লবের মধ্যে নকশালবাড়ীর সশস্ত্র গণ উত্থানের বিস্ফোরণ সমগ্র ভারতব্যাপী এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তরুণী অনুর ওপরও এসকল দেশীয়-আন্তর্জাতিক আন্দোলনের প্রভাব পড়ে।

মুম্বাইয়ের এলফিনস্টোন কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৭২ সালে অনুরাধা তার বিপ্লবী জীবন শুরু করেন। সে সময় এই কলেজটি বামপন্থী বিপ্লবী কর্মীদের প্রাণকেন্দ্র ছিল। তখন একদল ছাত্রছাত্রীর সাথে যুদ্ধ আক্রান্ত বাংলাদেশীদের শরণার্থী শিবির এবং মহারাষ্ট্রের দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকাগুলো দেখে তিনি স্পর্শকাতর হয়ে পড়েন এবং তখন থেকে কলেজের ও সমাজের প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে তিনি গরীবদের সাথে অংশ নিতেন। এ প্রক্রিয়ায় ছাত্রদের মধ্যে যখন তিনি সক্রিয় তখন নকশাল আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত ছাত্র সংগঠন ‘প্রগতিশীল যুব আন্দোলন’-এর সংস্পর্শে আসেন। শীঘ্রই তার সক্রিয় সদস্য এবং পরে তার নেতৃত্ব দেন। তিনি বস্তিতেও কাজ করেন এবং এর মধ্যদিয়ে প্রথমে দলিত আন্দোলন ও অস্পৃশ্যতার ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি দলিত প্যান্থার আন্দোলনে যোগ দেন। এবং মহারাষ্ট্রের ওররলিতে তিন মাস স্থায়ী দাঙ্গায় শিবসেনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেন। স্পর্শকাতর বৈশিষ্ট্যর কারণে তিনি দলিত নিপীড়নের মর্মবেদনায় উদ্বেলিত হন এবং তার প্রতিকারের প্রচেষ্টায় ব্রতী হন।

বিপ্লবী গণনেতৃত্ব হিসেবে বিকাশ ও খ্যাতিঃ

১৯৭০-এর দশকে যুদ্ধ, দাঙ্গায় আক্রান্ত দরিদ্র নিপীড়িত দলিত জনগণের অধিকার রক্ষার আন্দোলন-সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় অনুরাধা প্রথমে মাওবাদী ছাত্র রাজনীতি, সিভিল লিবার্টিজ মুভমেন্ট ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা কমিটির সামনের সারিতে চলে আসেন। এবং ব্যাপকভাবে মার্কসবাদ অধ্যয়ন করে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। মহারাষ্ট্রে সিপিআই(এমএল) পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ১৯৮০-র দশকে সিপিআই(এম-এল)(পি.ডব্লিউ) সর্ব প্রথমে গডচিরোলী থেকে মহারাষ্ট্রে বিপ্লবী আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। মুম্বাই থেকে বিদর্ভ অঞ্চলে বিপ্লবী তৎপরতা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। পার্টির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য তিনি তার উচ্চ মর্যাদার ব্যক্তি জীবন ও মুম্বাই কলেজের চাকরি ত্যাগ করে সম্পূর্ণ অচেনা একটি জায়গা নাগপুরে স্থানান্তরিত হন। বিদর্ভ অঞ্চলে তার কাজের প্রকাশ্য দিক ছিল প্রাথমিকভাবে ট্রেড ইউনিয়ন ও দলিতদের মধ্যে সংগঠন ও আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা। ট্রেড ইউনিয়নে তিনি প্রথমে নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করেছিলেন। এবং সেখানে বহু জঙ্গী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘট করেছিলেন। খাপার খোলার থর্মোল পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের সময়, সেখানে প্রায় ৫,০০০ শ্রমিক কাজ করতেন। পুলিশের গুলি এবং অঞ্চল জুড়ে কারফিউ জারি করে রাষ্ট্র এ আন্দোলনকে দমন করেছিল। তিনি নাগপুরের গৃহপরিচারক, হিংনার এসআইডিসি কোম্পানির শ্রমিক, রেলওয়ে শ্রমিক, ভান্দারার বিড়ি শ্রমিক, কাম্পতির পাওয়ার লুম শ্রমিক এবং অন্যান্য অসংগঠিত শ্রমিকদের সংগঠিত করার সাথে জড়িত ছিলেন। এবং পরে কয়লাখনি শ্রমিক ও নির্মাণ শ্রমিকদের সাহায্য করার জন্য তিনি চন্দপুরে স্থানান্তর হন। এ সকল অসংগঠিত শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত ট্রেড ইউনিয়ন করার কোন অধিকার ছিল না এবং প্রচলিত ইউনিয়নগুলো এসকল শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি এড়িয়ে যেত। তিনি শুধু নাগপুরেই নয়, চন্দপুর, অমরাবতী, জবলপুর, ইরাটমাল প্রভৃতি এলাকায় অন্যান্য প্রগতিশীল ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের সাথে যৌথ তৎপরতা বিকশিত করেন। এই সংগ্রামে তিনি কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং কিছুদিন নাগপুর জেলে কাটিয়েছেন। তার চাকরি থাকার পরও তিনি এ অঞ্চলের একজন বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বের সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

তাছাড়া তিনি আরো বেশী সক্রিয় ছিলেন দলিত সম্প্রদায়কে প্রচলিত শোষণমূলক ব্যবস্থা থেকে তাদের স্বাধীনতা ও জাত-পাতের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠিত ও জাগরিত করার জন্য। তিনি বিপ্লবী মার্কসবাদীদের একজন যিনি সর্বপ্রথম দলিত ও জাত-পাত ইস্যুর বিশেষত্বকে চিহ্নিত করেছিলেন। জাত-পাত প্রশ্নে তিনি আম্বেদকর এবং অন্যান্য সমাজ বিজ্ঞানীদের লেখা ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। তথাকথিত মার্কসবাদীদের মত গতানুগতিক না থেকে দলিত ইস্যুর বিশেষত্ব উপলব্ধি করার পরপরই তিনি বসবাসের জন্য মহারাষ্ট্রের দলিতদের বৃহৎ অঞ্চল নাগপুরে চলে যান। যদিও এখানে দলিত রাজনীতি এবং অধিকাংশ দলিত নেতাদের শক্তি ও তাদের বিকাশের উপয্ক্তু ভিত্তি ছিল, তারপরও অনুরাধার তৎপরতায় যুবকদের একটি বড় অংশ মাওবাদীদের প্রতি দ্রুতই আকৃষ্ট হতে থাকে। বিশেষত সাংস্কৃতিক দল সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন। দলিত আন্দোলনে তিনি মাওবাদীদের প্রকাশ্যমুখ এবং বিদর্ভ অঞ্চলের অধিকাংশ দলিত জনসভার একজন বক্তা হয়ে উঠেছিলেন। যদিও দলিত নেতাদের দ্বারা প্রচন্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন, কিন্তু আম্বেদকর, দলিত ইস্যু ও জাত-পাতের নিপীড়নের প্রশ্নে তাঁর গভীর অধ্যয়ন থাকায় তিনি টিকে থাকতে পেরেছিলেন এবং যুবকদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিলেন।

তিনি নাগপুরে বিপ্লবী নারী আন্দোলন গড়ে তোলায়ও সহায়ক ছিলেন। সমাজের পিতৃতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের জন্য যে সকল নারী সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের কাছে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি নারীদের বড় একটি অংশকে শুধু নারী সংগঠনেই নয় পার্র্টিতেও যোগদানের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। তিনি অসংখ্য উত্তরাধুনিকতাবাদী প্রবণতা এবং দলিত ও জাত-পাত প্রশ্নে মার্কসবাদীদের ভুল ব্যাখ্যার পাল্টা শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গিগত বিষয় তুলে ধরে ইংরেজী ও মারাঠী উভয় ভাষাতেই প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন। দলিত প্রশ্নে ২৫ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধে মার্কসবাদী অবস্থান তুলে ধরে দলিতদের স্বাধীনতাকে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাথে যুক্ত করে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। আজ অবধি অনেকেই এই প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দেন। তিনি হচ্ছেন সেই কমরেড যিনি বহুবছর আগে ভারতের মার্কসবাদী আন্দোলনে পূর্বতন সিপিআই(এম-এল)(পি.ডব্লিউ)-র জাত-পাত প্রশ্নে প্রথম নীতিগত খসড়া দলিল উপস্থিত করেছিলেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, আভিজাত্যবাদী জাত-পাতের প্রথাকে চূর্ণ না করে এবং এর নগ্নরূপ অস্পৃশ্যতার আকারে দলিতদের ওপর নানাবিধ নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে ভারতে গণতন্ত্রায়ন অসম্ভব। এ প্রশ্নে ১৯৯০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনি প্রচুর ব্যাখ্যা করেছেন। যেগুলো পরে সিপিআই (মাওবাদী)’র কংগ্রেসে গ্রহণ করা হয়েছে।

দুটো ক্ষেত্রের এসকল কাজ ছাড়াও নাগপুরে এমন অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে যেগুলোর প্রবর্তক ছিলেন কমরেড অনুরাধা। নির্দিষ্টভাবে এ জাতীয় দুটো উদাহরণ উল্লেখ করা যায়। যেখানে বিদর্ভের জনগণের সচেতনতার ক্ষেত্রে অমুছনীয় প্রভাব পড়েছিলো। প্রথমটি ছিল ১৯৮৪ সালে কমলাপুর সম্মেলন এবং দ্বিতীয়টি ১৯৯২ সালে গদ্দরের নেতৃত্বে জননাট্যমন্ডলী(জ ন ম)-এর অনুষ্ঠান।

কমলাপুর সম্মেলনটি এ অঞ্চলে মাওবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় গডচিরোলীর গভীর জঙ্গলে সংগঠিত করা হয়েছিল। সম্মেলনে উপস্থিতির জন্য অনুরাধার নেতৃত্বে বিদর্ভের সর্বত্র ব্যাপক প্রচারাভিযান চালানো হয়েছিল। সেখানে জঙ্গলের মধ্যে ব্যাপক সশস্ত্র স্কোয়াডের সমাবেশ ঘটানো হয়েছিল। যদিও পুলিশ নির্মমভাবে দমন করে সম্মেলন ভেঙ্গে দিয়েছিল। তারপরও হাজার হাজার জনগণ গভীর জঙ্গলের ছোট গ্রাম কমলাপুরে ঝাঁকে ঝাঁকে যাওয়া শুরু করেছিলেন। এবং মাসব্যাপী এ অঞ্চলের বিপ্লবী সংবাদ মিডিয়ার হেডিং আকারে প্রচারিত হয়েছিল। নাগপুরে গদ্দরের অনুষ্ঠানটি পুলিশের নির্মম দমন এ্যাকশনে ধ্বংস হয়ে যায়। তবুও ব্যাপক জনগণ ও প্রগতিশীলদের মধ্যে এই অনুষ্ঠানের বিরাট প্রভাব পড়েছিল। এখানে বিরাট সংখ্যক সাংবাদিক, প্রভাষক, লেখক, আইনজীবী এবং সিনিয়র ফ্যাকাল্টি সদস্যদের সমাবেশ ঘটেছিল। তারা গদ্দরকে শীঘ্রই দেখার জন্য লাঠিতে আগুন জ্বেলেছিল। অনুষ্ঠানটি হতে না পারলেও প্রায় দু’মাস এ নিয়ে পত্রিকায় হেড লাইন করে সংবাদ এসেছে। সমগ্র বিদর্ভ অঞ্চলে বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি ছড়ানোর ক্ষেত্রে এ সকল ঘটনাবলী বড় রকমের প্রভাব ফেলেছিল। এবং কমরেড অনুরাধাই ছিলেন উভয় অনুষ্ঠানের স্থপতি।

এই সকল তৎপরতায় ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। যিনি একটি লেকচারও মিস না করে উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। যে কোন কাজের মতোই অধ্যাপনাকে একটি কাজ হিসেবেই নিয়েছিলেন। তিনি এখানে ধারাবাহিকভাবে থাকতেন এবং এক্ষেত্রে সচেতন ছিলেন। ছাত্ররা তাকে খুব ভালবাসতো এবং সহকর্মী অধ্যাপকগণ তাকে সম্মান করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশের চাপের বিবেচনায় পার্টি তাকে গোপন জীবনে থেকে কাজ করার পরামর্শ দেয়। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি গোপন জীবনের সকল জটিলতাকে সচেতনভাবে সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করেছেন। ২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিন বছর দন্ডকারণ্যের জঙ্গলে সশস্ত্র স্কোয়াড সদস্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। সিপিআই(এম-এল)(পি.ডব্লিউ)’র মহারাষ্ট্র রাজ্য শাখার সম্পাদক এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে সিপিআই (মাওবাদী) নবম কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য নির্বাচিত হন।

বিদর্ভ অঞ্চলে দেড় দশক বিপ্লবী রাজনীতির অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি প্রচুর প্রভাব সৃষ্টি করেন। শুধু তাই নয়, অন্যদের সাথে একত্রে শ্রমিক শ্রেণি ও দলিতদের মধ্যে শক্তিশালী বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন; ছাত্রদের বিপ্লবী আন্দোলন, সিনিয়র অধ্যাপক, সাংবাদিক, উল্লেখযোগ্য নাটক লেখক, এ অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী সহ বুদ্ধিজীবীদের বিশাল অংশকে আকৃষ্ট করেছিলেন। নাগপুরে আসার পরই অন্ধ্র প্রদেশের বিপ্লবী কবি চেরাবান্ডা রাজুর মৃত্যুর পর তাঁর কবিতা মারাঠী ভাষায় অনুবাদ করেন এবং এ অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত মারাঠী কবির মাধ্যমে একটি অনুষ্ঠানে সংকলন আকারে প্রকাশ করেন। মারাঠী অনুবাদ সমগ্র মহারাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে বিক্রি হয় এবং বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করে।

মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক অবদানঃ

গোপন পার্টি সংগঠকের কর্মপদ্ধতি বজায় রেখে একজন গণনেতৃত্ব হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সুদীর্ঘ বিপ্লবী জীবনে অনুরাধাকে বিভিন্ন ভূমিকা নিতে হয়েছে। তিনি প্রথম দিকে বিদ্যার্থী প্রগতি সংগঠন, সিপিডিসার, এ আই এল আর সি, এন বি এস, স্ত্রী চেতনা, অখিল মহারাষ্ট্র কমাগড় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য অসংখ্য গণসংগঠনের সহযোগী ছিলেন। তখন থেকেই তিনি আস্থাশীল নিয়মিত লেখক ছিলেন। তিনি প্রগতিশীল ছাত্রদের ম্যাগাজিন কলম-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। যে সংগঠনটির দেশব্যাপী প্রভাব ছিল। এই ম্যাগাজিনটি ইংরেজি এবং মারাঠী উভয় ভাষাতেই প্রকাশিত হতো। তিনি নাগপুর থেকে হিন্দিতে প্রকাশিত বিপ্লবী ম্যাগাজিন জনসংগ্রামের প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ভ্যানগার্ড, পিপলস মার্চের মতো ম্যাগাজিনে বিভিন্ন ছদ্মনামে প্রবন্ধ লিখতেন। স্থানীয় মারাঠী পার্টি ম্যাগাজিন ঝিরানামার এবং এক সময় তার প্রকাশনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মূলত তাত্ত্বিক ও মতাদর্শগত রচনা লিখেছেন। তাছাড়া দলিত প্রশ্নে যে সকল মার্কসবাদীরা শত্রুভাবাপন্ন ও উত্তরাধুনিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন তাদের খন্ডন করে অনেক লেখা লিখেছেন। তিনি সিপিআই(এম-এল)(পি.ডব্লিউ)’র জাত-পাত প্রশ্নে মূল খসড়া নীতিগত দলিল লিখেছেন। তিনি সিপিআই(মাওবাদী)’র নারী বিষয়ক নীতি প্রণয়নেও সহায়ক ভূমিকা রেখেছেন এবং পার্টির ৮ মার্চের বিবৃতির বহু খসড়া লিখেছেন।

তার বেশীর ভাগ মতাদর্শগত অবদান জাত-পাত ও দলিত নিপীড়ন এবং নারী আন্দোলনের বিভিন্ন প্রশ্নে, বিশেষত বুর্জোয়া নারীবাদের ওপর বিশদ বিশ্লেষণ মার্কসবাদী উপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি অবশ্য মাওবাদী পার্টিতে নারী বিষয়কে কাঠামোগত রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন।

আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত ছিল না এমন কোন লেখা তিনি লিখেননি। ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি ভাষার তিনি নিয়মিত লেখক ছিলেন। তাঁর বহু প্রবন্ধ ও লেখা অন্য ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তিনি ইংরেজি, হিন্দি ও মারাঠিসহ অসংখ্য ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন; গুজরাটিতে  ভাল ধারণা ছিল; তেলগু, কান্নাদা ও গোন্ডী ভাষা বুঝতেন।

উপসংহারঃ

কমরেড অনুরাধার অবদান ভারতের বিপ্লবী আন্দোলন, বিশেষত মহারাষ্ট্রের আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে। বিরল প্রকৃতির গুণাবলীর কারণে তিনি শুধুই মাঠের নেতৃত্বই ছিলেন না, বরং সমন্বিতভাবে মতাদর্শগত, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ও বহু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতি রায় বলেছেন- কমরেড অনুরাধার বর্ণনা একজন পাঠককে হ্যান্ড গ্রেনেডের মতো বিস্ফোরিত করতে পারে। অন্যত্র বলেছেন- অনুরাধার লেখা পড়ে নারী প্রশ্নে মাওবাদীদের সম্পর্কে তার ভুল ধারণাকে সংশোধন করেছেন তিনি। কমরেড অনুরাধা পার্টির নীতিমালা ও অনুশীলনের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও ভুলকে সমালোচনার ক্ষেত্রে খোলামেলা ও সাহসী ছিলেন। পার্টি ফোরামে তিনি কোন ইতস্তত না করে দৃঢ়ভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতেন। তিনি নারী প্রশ্নে পার্টির ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উপলদ্ধিতে ব্যাখ্যা করে নারী ফ্রন্টে পার্টির উপলদ্ধি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রচুর অবদান রেখেছেন। তিনি পার্টির মধ্যে যদি কারো ভুল দেখতেন তবে যে কাউকে পার্টিতে তার পদ-স্তর ইত্যাদি কি তা গ্রাহ্য না করে সরাসরি সমালোচনা করতেন। কমরেড অনুরাধা নিঃস্বার্থপরতা, সুশৃংখল কর্মপদ্ধতি, কঠোর পরিশ্রম করার অভ্যাস, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা, বিনয়, সৃষ্টিশীলতা, নির্ভীক চিত্ত, পার্টি বিপ্লব ও জনগণের প্রতি অবিচল আস্থা ভারত ও বিশ্বের যেকোন প্রান্তের কমিউনিস্ট বিপ্লবী, সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তি, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীলদের অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর জীবন ও কর্ম জনগণকে অব্যাহতভাবে বিপ্লবের প্রেরণায় উদ্দীপিত করবে। তাঁর অকাল মৃত্যুতে একটি উজ্জ্বল তারকা নিপতিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার আলোক রশ্মি ম্লান করা যাবে না, বরং নতুন করে পথকে আলোকিত করবে। আসুন কমরেড অনুরাধাকে অধ্যয়ন করি এবং তার আদর্শ অনুসরণ করি। যুগ যুগ বেঁচে থাকুন- কমরেড অনুরাধা।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮