মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা

29C1CD9A00000578-3130307-image-m-5_1434660552551

মস্কো শহরে আমদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক নিখিল রাশিয়া শ্রমিক নারী ও কিষাণদের কংগ্রেস আহ্বানের পর পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে। দশ লক্ষ গতর খাটানো মেয়েদের এক হাজারেরও অধিক প্রতিনিধি এই কংগ্রেসে সমবেত হয়েছিল। মেহনতকারী মেয়েদের মধ্যে আমাদের পার্টির কর্ম তৎপরতায় এই কংগ্রেস নতুন যুগের সূচনা করে। আমাদের রিপাবলিকের শ্রমিক নারী ও কিষাণ মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করে কংগ্রেস অপরিমেয় কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। অনেকে মনে করতে পারেন, এ আর কি ব্যাপার? কারণ পার্টি নারীসহ জনসাধারণের মধ্যে সবসময়েই রাজনৈতিক শিক্ষা বিস্তার করে এসেছে। আবার অনেকে এমনও ভাবতে পারেন, মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার এমন কি গুরুত্ব থাকতে পারে; কারণ শীঘ্রই আমাদের মধ্যে শ্রমিক ও কিষাণদের সমবেত কর্মীদলসমূহ গড়ে উঠবে। এই ধরনের মতগুলি সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত।

শ্রমিক ও কিষাণদের হাতে শাসন ক্ষমতা চলে আবার পর মেহনতকারী মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন উপস্থিত হয়েছে। আমি এর কারণটা দেখাতে চেষ্টা করছি। আমাদের দেশের লোকসংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি; তন্মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেকই নারী। নারীদের মধ্যে অধিকাংশই অনগ্রসর, পদদলিত ও অতি অল্প রাজনৈতিক চেতনা যুক্ত শ্রমিক ও কিষাণ নারী।

আমাদের দেশ যদি রীতিমতো উৎসাহ দিয়ে নতুন সোভিয়েট জীবন গড়ে তোলার কাজ আরম্ভ করে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ইহা সুস্পষ্ট হবে যে, মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নিয়ে গঠিত এই দেশের নারীসমাজ যদি ভবিষ্যতেও অনগ্রসর, পদদলিত ও রাজনীতির দিক থেকে অজ্ঞ থেকে যায় তাহলে তারা প্রগতিমূলক যে কোন কাজকে ব্যাহত করবে না কি?

নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে একযোগে কাজ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আমাদের শিল্প সংগঠনের সার্বজনীন কাজে পুরুষদের সঙ্গে একযোগেই তারা কাজ করছে। তাদের যদি রাজনৈতিক চেতনা থাকে ও তারা রাজনৈতিক শিক্ষা পায়, তাহলে তারা এই সার্বজনীন কাজে বেশ সাহায্য করতে পারে। কিন্তু যদি তারা পদদলিত ও অনগ্রসর থেকে যায়, তাহলে নিজেদের দুষ্টবুদ্ধিবশত নয়, যেহেতু তারা অনগ্রসর সেইজন্য, এই সর্বসাধারণের কাজ পণ্ড করে ফেলতে পারে।

কিষাণ মেয়েরাও দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরুষ কৃষকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করার জন্য। পুরুষদের সঙ্গেই তারা আমাদের কৃষির উন্নতি, সাফল্য ও সমৃদ্ধি সাধন করছে। তারা যদি অনগ্রসরতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হয়, তাহলে তারা এক্ষেত্রে প্রভূত কাজ করতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত অবস্থাও ঘটতে পারে। ভবিষ্যতেও যদি তারা অশিক্ষার গোলাম থেকে যায় তাহলে তারা কাজের বাধাস্বরূপ হয়ে পড়তে পারে।

পুরুষ শ্রমিক ও কিষাণ পুরুষদের মত নারী শ্রমিক ও কিষাণ নারীরা সমান অধিকারপ্রাপ্ত স্বাধীন নাগরিক। মেয়েরা আমাদের সোভিয়েট ও সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহ নির্বাচন করে এবং এইগুলোয় নিজেরা নির্বাচিত হতে পারে। নারী শ্রমিক ও কিষাণ মেয়েরা যদি রাজনৈতিক জ্ঞানযুক্ত হয় তাহলে তারা আমাদের সোভিয়েট ও সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহে সংস্কার সাধন এবং ঐগুলোর শক্তি ও আয়তন বাড়াতে পারে। কিন্তু তারা যদি অনগ্রসর ও অজ্ঞ থেকে যায় তাহলে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, পণ্ড করে ফেলতে পারে।

চরম কথা হচ্ছে এই যে, শ্রমিক নারী ও কিষাণ নারীরা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের জননী আর তাদেরকে মানুষ করার দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত রয়েছে। তারা হতাশার মনোবৃত্তি জুগিয়ে শিশুদের খর্বতা সাধনও করতে পারে, আবার তাদের মনকে সতেজ ও স্বাস্থ্যসম্পন্ন করে তাদের দ্বারা আমাদের দেশের অগ্রগতির ব্যবস্থাও করতে পারে। সোভিয়েত ব্যবস্থা সম্বন্ধে আমাদের নারী ও জননীদের সহানুভূতি আছে, না তারা পুরোহিত, ধনী চাষি ও বুর্জোয়াদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে, এই সমস্ত তারই ওপর নির্ভর করছে।

সেইজন্য শ্রমিক ও কিষাণরা যখন নতুন জীবন গড়ে তোলার দয়িত্ব গ্রহণ করেছে, সেই সময় আজ বুর্জোয়াদের ওপর প্রকৃত জয়লাভ সম্পর্কে শ্রমিক নারী ও কিষাণ মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। সেইজন্য মেহনতকারী মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক ও কিষাণ নারীদের প্রথম কংগ্রেসের মূল্য ও গুরুত্ব সত্য সত্যই অপরিমেয়।

পাঁচ বছর আগে এই কংগ্রেস নতুন সোভিয়েত জীবন গড়ে তোলা সম্পর্কে লক্ষ লক্ষ মেহনতকারী মেয়েদের টেনে আনা পার্টির চলতি কর্তব্যরূপে গণ্য হয়েছিল। এই কর্তব্যের পুরোভাগে দাঁড়িয়েছিল কারখানা অঞ্চলসমূহ থেকে আগত শ্রমিক মেয়েরা; কারণ মেহনতকারী মেয়েদের মধ্যে তারাই ছিল সবচেয়ে জীবন্তু চেতনাযুক্ত। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ সম্বন্ধে যে অনেক কিছু করা হয়েছে তা বেশ বলা যেতে পারে, যদিও করণীয় অনেক কিছুই এখনও পড়ে আছে।

আজ পার্টির আশু করণীয় কর্তব্য হচ্ছে আমাদের সোভিয়েত জীবন গড়ে তোলার কাজে নিযুত কিষাণ মেয়েদের টেনে আনা। 
পাঁচ বছরের কাজের ফলে কিষাণদের ভেতর থেকে বহুসংখ্যক অগ্রগামী কর্মী গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।

আশা করি নতুন নতুন রাজনৈতিক চেতনাযুক্ত কিষাণ মেয়েরা এসে অগ্রগামিনী কিষাণ নারীদের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলবে। আশা করি, আমাদের পার্টি এই সমস্যারও সমাধান করতে পারবে।

– স্ট্যালিন, প্রথম শ্রমিক ও কিষাণ নারী কংগ্রেসের পঞ্চবার্ষিকী উপলক্ষে প্রদত্ত বক্তৃতা, ১৯২৩।

Advertisements

নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৪ মাওবাদী নারী নিহত

Odisha-News-Insight

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম odishatv খবরে বলা হয়েছে, রবিবার রাতে উড়িষ্যার কোরাতপুর জেলার ডকরি ঘাট এলাকার কাছে নারায়ণপাটনাতে নিরাপত্তা বাহিনীর জেলা ভলান্টেরি ফোর্স ও স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের সাথে মাওবাদীদের সঙ্গে গুলি বিনিময়ে ৪ মাওবাদী নারী ক্যাডার নিহত হয়েছে। তাদের এখনও শনাক্ত করা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে নিহতরা সকলেই অন্ধ্র-উড়িষ্যা জোনাল কমিটির সদস্য।  পুলিশ এমনটাই দাবী করছে।

উল্লেখ্য যে, নারায়ণপাটনায় ২০০৯-১০ সাল থেকে মাওবাদীরা কার্যক্রম জোরালো করার চেষ্টায় রয়েছে। ওই সময় থেকে মাওবাদীদের ফ্রন্ট সংগঠন চাষী মুলিয়া আদিবাসী সংঘ এখানে উড়িষ্যার লালগড় গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। 


বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামী যোদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা

haj

মাতঙ্গিনী হাজরা ভারত বর্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছেন।

১৭৫৭ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষ দখল করে শোষণ-লুন্ঠন, অত্যাচার নিপীড়ন চালিয়েছে। সেই ভারতবর্ষে  ১৮৭০ সালের ১৯ অক্টোবর মাতঙ্গিনী হাজেরা কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

ভারতের পশ্চাদপদ সমাজ ব্যবস্থায় মাতঙ্গিনীর বাবা তাকে অল্প বয়সেই বিয়ে দেন। তিনি ১৮ বছর বয়সেই বিধবা হন। হিন্দু ধর্মের রীতি অনুযায়ী সারা জীবন তিনি বিধবা হিসেবেই কাটিয়ে দেন।

কিন্তু মাতঙ্গিনী তার জীবনকে স্বার্থক করে তোলেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে।

তিনি ৩ বার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। প্রথমবার লবণ তৈরি আইন অমান্য করে গ্রেফতার হন। দ্বিতীয়বার কালো পতাকা পুলিশকে দেখানোর জন্য এবং তৃতীয়বার চৌকিদারী ট্যাক্স বন্ধ করার আন্দোলনের কারণে।

১৯৪০ সালে বৃটিশ আইন অমান্য করে যে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয় সেই বিদ্রোহে তিনি নেতৃত্বের সারিতে ছিলেন।  বিদ্রোহীরা ভারতের মেদিনীপুরে টেলিগ্রাফের তার উপড়ে ফেলেন, বৃটিশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বোমা-হামলা করেন এবং বৃটিশ পতাকা পুড়িয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে সশস্ত্র বিদ্রোহের সময় পুলিশের গুলিতে ১৮০ জন বিদ্রোহী শহীদ হন। ১৬৩০ জন আহত হন এবং গ্রেফতার হন ৬০ হাজার। ১৯৪২-এর সেপ্টেম্বরে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে ৫০ হাজার নারী-পুরুষের এক বাহিনী তমলুক থানার লালবাড়ী দখল করতে যান। সেখানে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনে বহু নেতা-কর্মী আহত-নিহত হন। মাতঙ্গিনীও ৩টি গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তিনি ৭৩ বছর বয়সে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন।

মাতঙ্গিনী হাজরা কোনো বিপ্লবী দিশায় দিক্ষিত ছিলেন না। বা সমাজের সার্বিক মুক্তিকামী কোনো সংগঠনের কর্মীও ছিলেন না। তিনি ছিলেন মূলত বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একজন নির্ভীক সৈনিক। মাতঙ্গিনী ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস নেতা গান্ধীর অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও অহিংস নীতির বদলে যেখানেই সহিংস আন্দোলন শুরু হয়েছে- সেখানেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এবং জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করেছেন; শেষ পর্যন্ত জীবন বির্সজন দিয়েছেন। এটাই তার অগ্রসরতা।

আমাদের দেশের ও ভারতের নিপীড়িত নারীদের সংগ্রামে মাতঙ্গিনীর জীবন উৎসর্গ প্রেরণা যোগাবে নিঃসন্দেহে। একই সাথে এই শিক্ষা নিতে হবে মাতঙ্গিনী সহ হাজার-হাজার নারী পুরুষের রক্তের বিনিময়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ উচ্ছেদ হলেও ভারতবর্ষের শ্রমিক, কৃষক এবং নিপীড়িত নারীরা সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ-পুরুষতন্ত্রের শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পায়নি। এখনো নির্ভয়াদের ধর্ষণের শিকার হয়ে জীবন দিতে হচ্ছে। নারী ধর্ষণকারী শহর হিসেবে নয়াদিল্লি ২য় স্থানে। এখনো ভারতীয় নারী সমাজ বৃটিশ দখলদারিত্বের যুগ থেকে একটুও আগায়নি। আগানো সম্ভবও নয়। ভারতে এখনো পালা বদল করে ক্ষমতা চালাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদেরই দালাল শাসকশ্রেণি। এই দালাল শাসকশ্রেণি উচ্ছেদ ব্যতীত নারীদের মুক্তি অসম্ভব। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে ভারতের বিপ্লবী নারী সংগঠন। তার অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিপীড়িত নারীগণ।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮


বিপ্লবী নারী মুক্তি ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের উদ্যোগে ‘নারী দিবস’ পালিত

বিপ্লবী নারী মুক্তি

চট্রগ্রাম মহানগর শাখা

০৯/০৩/২০১৮

 বরাবর,

 বার্তা সম্পাদক,

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আজ চট্রগ্রাম নগরের নাসিরাবাদ এলাকায় “বিপ্লবী নারী মুক্তি” চট্রগ্রাম মহানগর শাখার উদ্যোগে এক ঘরোয়া আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। গার্মেন্টস শ্রমিক কমরেড নীলু আক্তারের সভাপতিত্ব ও বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন, চট্টগ্রাম মহানগরের সংগঠক কমরেড লক্ষ্মী রাণীর পরিচালনায় বক্তাগণ ১৮৫৭ সালের ৮ই মার্চ আমেরিকার নিউইর্য়ক শহরের কারখানা গুলোতে সুষ্ট কর্মপরিবেশ, নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সমমজুরি সহ কর্মঘন্টা নির্ধারনের দাবিতে নারী শ্রমিকদের কতৃর্ক সংঘঠিত কর্মসূচীর প্রতি সংহতি জানিয়ে এদেশের নারী শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও অধিকার প্রদান সহ সমাজে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জোর দাবী জানান। সাথে আরো বলেন- নারী মুক্তির একই পথ- সমাজতন্ত্র সাম্যবাদ।

বার্তা প্রেরক

লক্ষ্মী রাণী

বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন


বাংলাদেশের নারী চা-শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম

37822831_303

বাংলাদেশের চা নারী শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম সম্পর্কে লিখতে গেলে বর্তমান পরিস্থিতির আলোচনাটাই যথেষ্ট নয়। তাদের অতীত ইতিহাস তুলে না ধরলে তাদের জীবন সংগ্রামের ইতিহাসটা আংশিকই বলা হবে। তাদের বাংলাদেশে আগমনের পূর্ব ইতিহাস ও সংগ্রাম তুলে ধরাটাও প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।

বৃটিশ ভারতের আসামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮২৮ সালে এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৮৪০ সালে চা উৎপাদন শুরু করে । চা উৎপাদনের জন্য চীনা শ্রমিকরা অভিজ্ঞ ছিল বলে সেখান থেকে প্রথম শ্রমিক আমদানি করা হয়। কিন্তু আবহাওয়া, পরিবেশ এবং গৃহ সমস্যার কারণে শ্রমিকরা চলে যায় বা রোগে মারা পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে কোম্পানি ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে আদিবাসী কৃষি শ্রমিকদের আমদানি করে। যার মধ্যে বিহারের রাঁচি, হাজারিবাগ, সাঁওতাল পরগণা, ডুমকা ও গয়া, উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্চ, গঞ্জ, সম্বলপুর ও চাইবাসা এবং মধ্যপ্রদেশের রায়পুর, রামপুর হাট ও চকলপুর, উত্তরপ্রদেশ, মাদ্রাজ এবং পশ্চিমবঙ্গ উল্লেখযোগ্য। চা শ্রমিকদের এক বিশাল অংশ উদ্বৃত্ত কৃষি শ্রমিকদের মধ্য থেকে এসেছিল।

 চা শ্রমিক সংগ্রহ পদ্ধতি তখন ‘ফ্রি কন্ট্রাক্টস’ নামে পরিচিত ছিল। এটি ছিল অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। এই ব্যবসার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা কপটতা, মিথ্যাচার, শক্তি প্রয়োগসহ নান রকম অমানবিক পন্থা অবলম্বন করে লোভ-লালসা দেখিয়ে শ্রমিকদের আসামে আসতে প্রলুব্ধ করতো। যা মধ্যযুগের ইউরোপিয়ানদের দাস ব্যবসাকেও হার মানায়। এই শ্রমিকরা আসামে যাওয়ার পথেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। যারা বেঁচে থাকত তাদেরও বাগান কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণ, গৃহ, চিকিৎসা সমস্যা এবং খাদ্য সরবরাহের স্বল্পতায় নিদারণ দুঃখ কষ্টের মধ্যে ফেলে দিত। ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৭ সালের মধ্যে ৮৪,৯১৫ জন শ্রমিক আসামে আসলেও ১৮৬৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ৩০,০০০ শ্রমিক প্রাণ হারায়। তা সত্তেও¡ শ্রমিক সংগ্রহ বন্ধ থাকেনি। পর্যায়ক্রমে আসামের অন্যান্য অঞ্চলের মত সিলেট ও চট্টগ্রামের সকল বাগানেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে চা শ্রমিক আমদানি করা হয়েছে। চা-শ্রমিকরা বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী থেকে এসেছেন। তাদের মধ্যে ওরাওঁ, মুন্ডা, সাঁওতাল, খরিয়া, খারওয়ার, ভুইহার, মাল, রাজ গন্দ, কিসান, নাগেসিয়া, তাঁতি, বড়াইক, মাহালিসহ আরো অনেক জাতি। কোন কোন গবেষক ১০৪টি চা-শ্রমিক জাতির উল্লেখ করেছেন।

 মিথ্যা প্রলোভন, শক্তি প্রয়োগ, এবং প্রতারণার জন্য শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিবাদ করা হলেও কোন ফল আসেনি। শ্রমিকদের চা শ্রমে বাধ্য করার জন্য ইস্ট ইন্ডয়া কোম্পানি এবং বৃটিশরা ১৮৫৭ সালে নানা রকম আইন-কানুন জারি করে। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ থেকে দাবি-দাওয়া বা প্রতিরোধের জন্য শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা হয়। কিন্তু বর্বরোচিতভাবে শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে বাগান মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি হ্রাসের উদ্যোগ নিলে বৃটিশ বিরোধী জনগণের অসহযোগ আন্দোলন চা শ্রমিকদের মধ্যেও প্রভাব ফেলে। তারা  নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চা বাগানের দাস ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঐ সময়ে নারী পুরুষ শিশুসহ প্রায় ত্রিশ হাজার শ্রমিক নিজেদের আদি বাসস্থানের উদ্দেশ্যে বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পরে। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য বাগান থেকে শ্রমিকরা বেরিয়ে যায়। চা-শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীপংকর মোহান্তের প্রবন্ধ ‘সিলেটের চা-শ্রমিক আন্দোলন’ থেকে জানা যায়, সিলেট বরমচাল, কুলাউড়া, শমসেরনগর, শ্রীমঙ্গল, সাতগাঁও এবং শায়েস্তাগঞ্জ রেল স্টেশনে অজস্্র শ্রমিক জমা হয়। শ্রমিকরা যাতে এলাকা ত্যাগ করতে না পারে সেজন্য শ্রমিকদের রেলওয়ের টিকিট না দেওয়ার জন্য প্রশাসন আদেশ জারি করে।

এই শ্রমিকরা টিকেট না পেয়ে রেললাইন ধরে চাঁদপুর ঘাটে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করে। চারিদিক থেকে চাঁদপুরে এসে শ্রমিকরা জড়ো হতে শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল নদী পাড়ি দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটে যাবে। গোয়ালন্দগামী স্টিমার ঘাটে এসে পৌঁছতেই শ্রমিকরা স্টিমারে উঠার চেষ্টা করে। বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে আগেই সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। একটা হুইসেল বাজতেই পুলিশ শ্রমিকদের লক্ষ করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। গুলিতে অনেকে মারা যায়, বাকীরা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পালিয়ে যায়। গভীর রাতে বৃটিশ কোম্পানির কর্তৃপক্ষ প্রলোভন দেখিয়ে এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে শ্রমিকদের বাগানে ফেরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ফলে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গুর্খা সৈন্যরা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে অনেকের মৃত্যু হয়। চাঁদপুরে চা শ্রমিকদের উপর নৃশংস হামলার প্রতিবাদে সাধারণ হরতাল আহ্বান করা হয়। এতে জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। আসাম-বাংলার রেল ও জাহাজ কোম্পানির কর্মচারীরা হরতালসহ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। তাদের ধর্মঘট অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে থাকে এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাসহ অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। রেলকর্মচারীদের ধর্মঘট প্রায় আড়াই মাস স্থায়ী হয়। চার হাজার পাঁচশত রেল কর্মচারী চাকুরিচ্যুত হন। শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া নেতৃত্বে চলমান আন্দোলন আপোষের মাধ্যমে চা-শ্রমিকদের আন্দোলনেরও সমাপ্তি ঘটে। এই সময় চা শ্রমিকদের কোন ইউনিয়ন ছিল না। ১৯৩৮ সালে ‘শ্রীহট্ট কাছার কমিউনিস্ট পার্টি’ শ্রমিকদের মধ্যে আন্দোলন গড়ে তুলতে ‘শ্রীহট্ট কাছার চা-শ্রমিক ইউনিয়ন’ গঠন করে। এবং কিছু দাবি-দাওয়াও উত্থাপন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় আন্দোলন-সংগ্রাম চললেও বৃটিশ ভারতের চা-শ্রমিকদের দাসসুলভ জীবনের কোন পরিবর্তন আসেনি বাংলাদেশ সময়েও।

বাংলাদেশে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, বৃহত্তর সিলেট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ, লালমনিরহাটে ১৬২টি বাণিজ্যিক ভিত্তিক চা বাগান রয়েছে। বিশ্বের চা উৎপাদনের ৩% বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। চা বাংলাদেশের রপ্তানীকারক অর্থকরী ফসল। ২০১৫ সালে ৬৭.৩৮ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়। ২০১৬ সালে ৭০ মিলিয়ন কেজি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা দেয়া হয়েছিল (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। বাংলাদেশে তিন লক্ষাধিক খোদ চা-শ্রমিক-এর ৭৫% নারী।

 বাংলাদেশ আমলে চায়ের উৎপাদন বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের জীবনমান বৃটিশ আমলের মতই রয়ে গেছে। বৃটিশ আমলে চা শ্রমিকদের মজুরি ছিল সর্বপ্রথম ২১ টাকা। পর্যায়ক্রমে ২৮ টাকা, ৪৮ টাকা ও ৬৯ টাকা। সর্বশেষে ২০১৫ সালে নির্ধারণ করা হয় ৮৫ টাকা। রেশনসহ তাদের দৈনিক শ্রমের মূল্য পড়ে ১৫৬ টাকা। দৈনিক ৮ ঘণ্টা টানা পরিশ্রম করে ২৩ কেজি চা পাতা তুলতে পারলে ৮৫ টাকা মজুরী দেয়া হয়। ২০ কেজির কম হলে ৮০ টাকারও কম মজুরী দেয়া হয়। ২৩ কেজি তোলার কথা থাকলেও ২৪ কেজি পাতা সংগ্রহের বিনিময়ে মজুরী দেয়া হয়। অতিরিক্ত কেজি প্রতি সাড়ে তিন টাকা করে দেয়। এই ৮৫ টাকা দিয়ে ৪ জনের একটি পরিবার কীভাবে চলে আকাশ ছোঁয়া এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে। মাসে একজন শ্রমিকের বেতন পড়ে ২,৫৫০ টাকা যাতে একজন শ্রমিকের খাওয়া খরচও হয় না। এই মজুরীতে তাদের জীবন চলে না বলেই তারা বাড়তি আয়ের জন্য বাগানে কাঠ সংগ্রহ করে, ঘরে হাঁস-মুরগী, গুরু-ছাগল পালে। কোন কোন বাগানের শ্রমিকরা চা বাগানের জঙ্গল কেটে ধান, শাক-সব্জি উৎপাদন করে। শ্রমিকরা দুই সপ্তাহে একবার বাজারে গিয়ে সবচেয়ে সস্তা সিলভারকার্প মাছ কিনে খেতে পারে। তারা সকালে শুকনা মরিচ দিয়ে চা-পাতা ভাজা খেয়ে কাজে যান। দুপুরে খান শুকনা রুটি। আর দিন-রাতে মাত্র একবেলা ভাত খাওয়ার সুযোগ পান। কখনো টাকা না থাকলে ভাতও খেতে পারেন না।

আট বাই আটের একটি ঘরে দুটি করে রুম, এর এক কোনায় রান্নাঘর। এর মধ্যেই গাদাগাদি করে থাকছেন সাত-আট সদস্যের এক একটি পরিবার। কোন শ্রমিক বাগান কর্তৃপক্ষের দেয়া ঘরের বাইরে আলাদাভাবে ঘর বানাতে চাইলে বাগান কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় না। কেউ ঘর তৈরির উদ্যোগ নিলে সেই শ্রমিককে চাকুরিচ্যুত করার হুমকিও দেওয়া হয়। অথচ সরকারি শ্রম আইনের ৩২-ধারায় চা শ্রমিকদের জন্য বলা হয়েছে, একজন শ্রমিক অবসরে যাওয়ার পরই তাকে তার ঘর থেকে এক মাসের মধ্যে উচ্ছেদ করা হবে। বাগান মালিকদের দেয়া ঘরগুলোতে পল্লীবিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া যায় না। অথচ মাস শেষে শ্রমিকের বেতন থেকে কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎবিলের টাকা কেটে নেয়। হাঁস-মুরগি পালনের জন্য বছরে ১৫ টাকা কেটে নিচ্ছে। শ্রমিকের ঘরে যে মাটির চুলা আছে তার জন্যও বছরে ১২ টাকা কর দিতে হয়। আর গরু-ছাগল বাগানে ঢুকলে ৫০/১০০ টাকা জরিমানা করা হয়।

চা বাগানের একজন শ্রমিকের ছেলে যখন কাজের উপযুক্ত হয় তখন সেও তার বাবার মত বাগানে শ্রমিক হিসেবে যোগদান করবে- এটাই নিয়ম। এমনকি না চাইলেও সে ছেলে বিয়ে করলে তার স্ত্রীকেও শ্রমিক হিসেবে বাগানের কাজে বাধ্যতামূলক ঢুকতে হবে। চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকরা পুষ্টিহীনতা, ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং গর্ভকালীন সমস্যাসহ নানা রোগ-শোকে ভুগে ক্ষয় হচ্ছেন। এই নারী শ্রমিক বা পুরুষ শ্রমিকরাও ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে আছেন। বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সময় মজুরির আশায় ছুটিতে না গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নারী শ্রমিকরা কাজ করছেন। আর গর্ভকালীন সময়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানা ৮ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে পরিশ্রম করায় মা ও গর্ভের সন্তান উভয়ের ক্ষতি হচ্ছে। নারীরা সাধারণত চা বাগানে পাতা সংগ্রহ, নার্সারিতে গাছের কলম তৈরি  এবং চারা সংগ্রহ ইত্যাদি কাজ করেন। চা বাগানে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই তাদের গর্ভপাত হয়। কারণ এই শ্রমিকরা গর্ভধারণের পর থেকে সন্তান প্রসবের আগ পর্যন্ত ছুটি নেন না। মাতৃত্বকালীন সবেতন ছুটি তাদের কপালে নেই। তাই সন্তানকে পেটে নিয়েই রোদে পুড়ে আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে টানা কাজ করে যান। একজন প্রসূতি মায়ের এই সময়ে যে পরিমাণ বিশ্রাম ও সুষম খাদ্য খাওয়া প্রয়োজন তার কিছুই  ভাগ্যে জোটে না। অপুষ্টির শিকার একজন নারী শ্রমিক যে সন্তানের জন্ম দেন সে সন্তানও নানা জটিলতা নিয়ে জন্ম নেয়। সন্তান পেটে নিয়ে কাজ করায় তাদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট হয়। নানা ধরনের শারীরিক জটিলতাও দেখা দেয়। কিন্তু কোন উপায় না থাকায় তাদের কষ্ট সহ্য করতে হয়। বাগানে কাজ করার সময় নারী শ্রমিকরা পানি পান বা সুপারি খাওয়ার সময়ও কর্র্তৃপক্ষ অসদাচরণ করে থাকে। পর্যাপ্ত নলকূপ বা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও থাকে না। চা বাগানের মধ্যে প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই; যা আছে তার অবস্থাও খারাপ। ফলে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আবার বড় ধরনের রোগ হলে মালিকরা অর্ধেক খরচ দেয়। পেটের ব্যথা, মাথার ব্যথা, বুকের ব্যথায় একই ধরনের ঔষধ প্যারাসিটামল দেয় বলে শ্রমিকদের ভাষ্য।

শিক্ষাক্ষেত্রে চা-শ্রমিকদের সন্তানরাও বঞ্চিত। শ্রম আইনানুযায়ী কোন চা-বাগানে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেই সেই বাগান কর্তৃপক্ষকে সেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু বাগান কর্তৃপক্ষ তা করছে না। সরকারিভাবে চা বাগানগুলোতে স্কুল তৈরি করা হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে তা অপর্যাপ্ত। আর স্কুলগুলোর শিক্ষার মানও নিম্ন। অর্থের অভাবে সন্তানরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। বাসস্থান থেকে স্কুল দূরে হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অনেকেই স্কুলে যায় না। যারা সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করছেন তারা টাকা ঋণ করে লেখাপড়ার খরচ চালান। কোন শ্রমিকের সন্তান যদি উন্নত জীবন-যাপনের উদ্দেশ্যে লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত হয় তাহলেও তাদের চাকরি পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাদের নিজস্ব বাড়ী (জমি) বা বাসস্থানের ঠিকানা না থাকায় উচ্চ শিক্ষা নিয়েও চাকরির সুযোগ পাচ্ছে না।

      চা-শ্রমিক নারীদেরও পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন সহ্য করতে হয়। চা-বাগানে নারী শ্রমিকরাই কাজ করেন বেশি । নারীরা সপ্তাহের তলবের সব টাকাই স্বামী বা বাবার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। ১০/২০ টাকা লুকিয়ে নিজের কাছে রেখে দিলে ধরা পড়লে কপালে জোটে নির্যাতন। পুরুষরা মেয়েদের টাকা দিয়ে সদাই করে, ধার শোধ করে এবং তার পর যায় ভাটি খানায়। সেখানে বাংলা মদ খেয়ে এসে বউ পিটায়। যা পুঁজিবাদী-পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থারই নগ্নরূপ। আদিবাসী চা-শ্রমিক হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী এবং বিজ্ঞান শিক্ষার অভাবে ধর্মীয় কুসংস্কার তাদের মধ্যে অত্যধিক। ভূত-প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করে। প্রচলন আছে আমদানি করা শ্রমিকরা যাতে রাতের আঁধারে পালিয়ে না যায় সেজন্য বাগান কর্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্তৃপক্ষ ভূত-প্রেত্মাতার গল্প বলে তাদের মাঝে ভয়-ভীতি সৃষ্টি করেছিল।

     সবশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের সমস্ত ধরনের শ্রমিকদের মাঝে চা-শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত। ১২৫/১৫০ বছর আগে চা-শ্রমিকরা গহীন জঙ্গল কেটে জমিকে আবাদযোগ্য করে গড়ে তুলে এবং বংশানুক্রমে শ্রম ও ঘাম দিয়ে ফসল ফলিয়ে দুর্বিসহ জীবনকে কিছুটা সহনীয় করে চলছিল। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের চা বাগানের শ্রমিকরা শতাধিক বছর ধরে বাগান সংলগ্ন যে ৫১১ একর জমি চাষ করে নিজেদের কিছু অতিরিক্ত আয়ের সংস্থান করে এসেছিলেন, উন্নয়নের নামে হাসিনা সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ঘোষণা দিয়ে তা কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চা-শ্রমিকদের কার্যত ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারও নেই।

আজকের চা-বাগান মালিক, শাসকশ্রেণি, হাসিনা সরকার বৃটিশ উপনিবেশিক শাসকদেরই ঔরসজাত সন্তান, তা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। চা-শ্রমিকদের দাস ব্যবস্থাই তার জীবন্ত প্রমাণ।

তাই, নারী চা-শ্রমিকদেরকে আশু দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি এ দেশের শ্রমিক, কৃষক ও নিপীড়িত জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি, সরকার উচ্ছেদ এবং সমাজ পরিবর্তনের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবে যোগ দিতে হবে। কারণ বিপ্লবী আন্দোলনই শ্রমিক-কৃষক সহ সমস্ত নিপীড়িত জনগণের মুক্তির দিশা দিতে পারে।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮


৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে ‘বিপ্লবী নারী মুক্তি’র আহ্বান

নারীর শত্রু সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা, দালাল শাসকশ্রেণি, পুরুষতন্ত্র উচ্ছেদের বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিন!

নারীমুক্তির সমাজ, সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষে বিপ্লবী আন্দোলন বেগবান করুন!

Untitled

 

আওয়াজ তুলুন

* নারীর মুক্তির জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বদলে ফেলুন! শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের নতুন সমাজ নির্মাণ করুন!

* পুরুষতন্ত্রের রক্ষক সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ-সামন্তবাদ দালাল শাসকশ্রেণিকে বিরোধিতা না করে নারীমুক্তির কথা বলা ভন্ডামি ! শাসকশ্রেণি, সরকার, এনজিও সেটাই করে!

* বুর্জোয়ার নারীদের শোষণ-শাসন করার ক্ষমতাকে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত নারীদের ক্ষমতা বলার ভন্ডামিকে উন্মোচন করুন !

* আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ছত্রছায়ায় নারী ধর্ষণ-খুন-নির্যাতন ও পুলিশী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন!

* নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপন, ব্লুফিল্ম, ও সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নারীদেহ প্রদর্শনের মাধ্যমে নারীকে পণ্য বানানো চলবে না !

* রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ধর্ষণ, হত্যা ও জাতিগত নির্মূলীকরণের সত্যিকার বিরোধিতার জন্য তাদের জাতিগত স্বতন্ত্রতার স্বীকৃতি, রাখাইনে স্বায়ত্তশাসনসহ জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রামকে সমর্থন ও সহযোগিতা করুন!

– সুচি সরকার ও হাসিনা সরকারের মধ্যকার ভূয়া চুক্তির মুখোশ উন্মোচন করুন! রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের মিয়ানমার সরকারের সেনাবাহিনীর বর্বর অত্যাচারের মুখে ঠেলে দেয়াকে বিরোধিতা করন!

* বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন,‘১৭-এ মৌলবাদীদের চাপের মুখে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরীদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছে হাসিনা সরকার। এই আইন বাতিলের দাবীতে এবং বাল্যবিবাহ রোধের নামে পুলিশ ও প্রভাবশালীদের হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন!

* গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম মূল বেতন ৫মণ চালের মূল্যের সমান নির্ধারণ করতে হবে!

– বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব মালিক ও রাষ্ট্র পক্ষকেই নিতে হবে!

* কর্মক্ষেত্রে নারীদের সমশ্রমে সমমজুরি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করুন!

* পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নারীদের সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষণ-নির্যাতনের প্রতিবাদ করুন!

* দেশে-বিদেশে গৃহশ্রমিকদের উপর বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন! তাদের ৮ঘণ্টা কাজের সময় ও নির্ধারণ ও ন্যায্য মজুরির জন্য আন্দোলন গড়ে তুলুন!

* নারী বিরোধী পশ্চাদপদ সামন্ততান্ত্রিক আইএস সহ সকল মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন!

– নারী বিরোধী ওয়াজ-নসিহত, ফতোয়া ও ক্যাসেট নিষিদ্ধ করতে হবে!

* মহান নারী নেত্রী চিয়াং চিং, নাদেজদা ক্রুপস্কায়া, ক্লারাসেৎকিন, রোজালুক্সেমবার্গ, কলোনতাই- লাল সালাম!

* নারীমুক্তির একই পথ- সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ !

বিপ্লবী নারী মুক্তি

ফেব্রুয়ারি, শেষ সপ্তাহ,’১৮

মোবাইলঃ ০১৯১৫ ২২ ১৯ ৮০


রোবট সোফিয়াঃ কেন নারী ?

59f20b693e9d257c6d8b4c1f

কিছুদিন আগে রোবট সোফিয়া এসে দেশে একটা হইচই ফেলে দিয়েছিলো। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল তাকে দেখতে, কথা শুনতে। অবশ্য সে সৌভাগ্য আমজনতা দূরের কথা, রাজধানীর শিক্ষিত ও প্রযুক্তিমনস্ক তরুণরাও তেমনটা পায়নি। ঘটনাটা ঘটেছিল সরকারি ৩ টাকা ডিমের ঘোষণার মতো। বেশিরভাগ মানুষকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। এমনকি যারা এইসব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন এবং বিশেষজ্ঞ- তাদের সাথে সোফিয়ার একটা বিশেষ আলোচনাকেও পরে বাতিল করা হয়। মিডিয়ায় শুধু ভেসে ওঠে হাতে কাগজ ধরা প্রধানমন্ত্রীর ছবি, যিনি কিনা তার নাতনির নামও যে সোফিয়া, সেটা এই রোবটের মুখে শুনতে পেরে যারপরনাই উচ্ছ্বসিত ও বিগলিত ছিলেন বলে দেখা গিয়েছে।

সোফিয়াকে নিয়ে বিজ্ঞানগত কোন আলোচনা এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এমনকি রাষ্ট্র কোন উদ্দেশে একে নিয়ে এতো মাতামাতি করলো, আর ধর্মবাদীরা এ প্রসঙ্গে অদ্ভুত উদ্ভট কী কী সব ব্যাখ্যা দিয়েছে সেগুলো আলোচনা করাও এর বিষয় নয়। আমরা খুব সংক্ষেপে শুধু দেখতে চাই কেন এতো আলোচিত সোফিয়া রোবটটিকে মেয়ে হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। কেন পুরুষ নয়?

কেউ একে নিছক একটি পছন্দ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। পুরুষ বা নারী- কোনো একটা-তো করতেই হবে- যেহেতু রোবটটিকে একটি মানুষের আদল দেয়া হয়েছে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা সম্ভব যে, নারী হিসেবে একে তৈরি করার পেছনে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বেশ জোরালোভাবেই কাজ করেছে।

রোবট তৈরির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান আরো অনেক এগিয়েছে বলেই জানা যায়। সোফিয়া সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু নয়। ইতিমধ্যেই ঢাকার অভিজাত হোটেলে ১৪ লক্ষ টাকা খরচ করে দুটো সাধারণ মানের রোবট আনা হয়েছে ওয়েটার/ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করার জন্য। এখানেও দেখা যাচ্ছে একটি পুরুষের সাথে একটি মেয়ে রোবটও আমদানি করা হয়েছে, যদিও ঢাকার হোটেলগুলোতে সাধারণত কোনো মেয়ে ওয়েট্রেস স্বাভাবিক নয়। এ হোটেলটি যে বিজ্ঞান বা নারীমুক্তির প্রতি ভালোবাসার কারণে এসব চাকর-চাকরানি রোবট আনিয়েছে তা ভাবলে ভুল হবে। বিষয়টা নিছক বাণিজ্যিক। শুধু রোবটগুলো দেখা ও তাদের কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা শোনার জন্যই ১০ টাকার ডিমভাজি ১০০ টাকা দিয়ে কিনতে সেখানে স্বচ্ছল পরিবারগুলো বাচ্চাদের নিয়ে জড়ো হচ্ছে। সেরকম সোফিয়াকেও শেখ হাসিনা প্রায় ৯ কোটি টাকার খরচ অনুমোদন করে আনিয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক। অভিজাত হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বাণিজ্যিক অফিসগুলোতে, এবং তারপর শিল্প-প্রতিষ্ঠানে অচিরেই আরো রোবট আসবে। বাংলাদেশ যে ‘ডিজিটাল’ হয়ে গেছে তার প্রমাণ দেখা যাবে, যার মধ্য দিয়ে মুনাফা হবে শুধু এই বিজ্ঞান-বণিকদের। নিঃসন্দেহে বলা চলে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি এ বাণিজ্যের একটি ভালো ভাগ পাবার কারণে একে প্রসারিত হতে সহায়তা করে যাবে, যতদিন না কোনো পুরুষ বা নারী রোবট প্রধানমন্ত্রী হবার প্রতিযোগিতায় হাসিনা-খালেদার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভুত হচ্ছে।

তো, যেখানে বাণিজ্যই প্রধান বিষয় সেখানে নারীর ব্যবহার বুর্জোয়া ব্যবস্থায় খুবই প্রাসঙ্গিক। কারণ, নারীই এখানে বড় এক পণ্য। একটি পুরুষ রোবটের চেয়ে নারী রোবট বেশি আকর্ষণীয়। সেটা যে বেশি লোক টানবে তা সোফিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। আর যদি সে রোবটটিকে যৌন-আবেদনময়ী করে বানানো যায় তাহলে তো কথাই নেই। অবশ্য সোফিয়া এখনো তেমনটা হয়ে উঠেনি। এখনো তার পা নেই। বাংলাদেশের মতো সাংস্কৃতিক পশ্চাদপদ এক দেশে এসে তাকে মুসলমানি কামিজ পরে গলায় একটি ওড়না পেঁচিয়ে রাখতে হয়েছে। কিন্তু তার মূল বাসস্থান আমেরিকায় সে কী পরে থাকে সেটা দেখার সৌভাগ্য এখানকার তরুণদের হলো না। এর আবার একটি গূঢ় কারণ হয়তো বা এই যে, সোফিয়া হলো সৌদি নাগরিক। যেখানে নারীকে প্রকাশ্যে বের হতে হলে বোরখা পরা বাধ্যতামূলক। তরুণীরা সাথে ‘মেহরাব’ পুরুষ ছাড়া চলতে পারে না। স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে হলেও তাই। সেই দেশ কোন ধর্মমতে ও আইনে এই সচল, বাকপটু, ন্যাড়া মাথা, সুন্দরী যুবতী নারী মূর্তিকে নাগরিকত্ব দিয়েছে তা এক রহস্যই বটে! নারী-মানুষের অধিকার নেই, নারী-রোবট নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে!

তথাপি বাংলাদেশের তরুণরা মোটেই বেরসিক নয়। তাদের অনেকে সোফিয়াকে প্রেম নিবেদন করেছে। অনেক আদি-রসাত্মক গল্প, চুটকি ও স্ট্যাটাসও চলেছে। এসবই বাণিজ্যকে বাড়িয়েছে। পুরুষ হলে এগুলো নিশ্চয়ই কম হতো।

যাহোক, প্রধানমন্ত্রীও নারী। তিনি মাথায় কাপড় দিয়ে ধর্মমতে চলাফেরা করেন। যা ভোটের বছরে বিশেষ বেড়ে চলে। তবুও তিনি সোফিয়াকে মাথায় কাপড় দিতে যে বলেননি এটাই রক্ষা। কারণ, যে হারে তার সরকার নারী ভাস্কর্যগুলোকে সরিয়ে, বা লিঙ্গ বদল করে চলেছে, তাতে সে রকম হতে যে পারতো না তা নয়। এভাবেই পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ- উভয়ের পুরুষতন্ত্র হাত ধরাধরি করে চলছে এই বাংলাদেশে।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮