রোবট সোফিয়াঃ কেন নারী ?

59f20b693e9d257c6d8b4c1f

কিছুদিন আগে রোবট সোফিয়া এসে দেশে একটা হইচই ফেলে দিয়েছিলো। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল তাকে দেখতে, কথা শুনতে। অবশ্য সে সৌভাগ্য আমজনতা দূরের কথা, রাজধানীর শিক্ষিত ও প্রযুক্তিমনস্ক তরুণরাও তেমনটা পায়নি। ঘটনাটা ঘটেছিল সরকারি ৩ টাকা ডিমের ঘোষণার মতো। বেশিরভাগ মানুষকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। এমনকি যারা এইসব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন এবং বিশেষজ্ঞ- তাদের সাথে সোফিয়ার একটা বিশেষ আলোচনাকেও পরে বাতিল করা হয়। মিডিয়ায় শুধু ভেসে ওঠে হাতে কাগজ ধরা প্রধানমন্ত্রীর ছবি, যিনি কিনা তার নাতনির নামও যে সোফিয়া, সেটা এই রোবটের মুখে শুনতে পেরে যারপরনাই উচ্ছ্বসিত ও বিগলিত ছিলেন বলে দেখা গিয়েছে।

সোফিয়াকে নিয়ে বিজ্ঞানগত কোন আলোচনা এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এমনকি রাষ্ট্র কোন উদ্দেশে একে নিয়ে এতো মাতামাতি করলো, আর ধর্মবাদীরা এ প্রসঙ্গে অদ্ভুত উদ্ভট কী কী সব ব্যাখ্যা দিয়েছে সেগুলো আলোচনা করাও এর বিষয় নয়। আমরা খুব সংক্ষেপে শুধু দেখতে চাই কেন এতো আলোচিত সোফিয়া রোবটটিকে মেয়ে হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। কেন পুরুষ নয়?

কেউ একে নিছক একটি পছন্দ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। পুরুষ বা নারী- কোনো একটা-তো করতেই হবে- যেহেতু রোবটটিকে একটি মানুষের আদল দেয়া হয়েছে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা সম্ভব যে, নারী হিসেবে একে তৈরি করার পেছনে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বেশ জোরালোভাবেই কাজ করেছে।

রোবট তৈরির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান আরো অনেক এগিয়েছে বলেই জানা যায়। সোফিয়া সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু নয়। ইতিমধ্যেই ঢাকার অভিজাত হোটেলে ১৪ লক্ষ টাকা খরচ করে দুটো সাধারণ মানের রোবট আনা হয়েছে ওয়েটার/ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করার জন্য। এখানেও দেখা যাচ্ছে একটি পুরুষের সাথে একটি মেয়ে রোবটও আমদানি করা হয়েছে, যদিও ঢাকার হোটেলগুলোতে সাধারণত কোনো মেয়ে ওয়েট্রেস স্বাভাবিক নয়। এ হোটেলটি যে বিজ্ঞান বা নারীমুক্তির প্রতি ভালোবাসার কারণে এসব চাকর-চাকরানি রোবট আনিয়েছে তা ভাবলে ভুল হবে। বিষয়টা নিছক বাণিজ্যিক। শুধু রোবটগুলো দেখা ও তাদের কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা শোনার জন্যই ১০ টাকার ডিমভাজি ১০০ টাকা দিয়ে কিনতে সেখানে স্বচ্ছল পরিবারগুলো বাচ্চাদের নিয়ে জড়ো হচ্ছে। সেরকম সোফিয়াকেও শেখ হাসিনা প্রায় ৯ কোটি টাকার খরচ অনুমোদন করে আনিয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক। অভিজাত হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বাণিজ্যিক অফিসগুলোতে, এবং তারপর শিল্প-প্রতিষ্ঠানে অচিরেই আরো রোবট আসবে। বাংলাদেশ যে ‘ডিজিটাল’ হয়ে গেছে তার প্রমাণ দেখা যাবে, যার মধ্য দিয়ে মুনাফা হবে শুধু এই বিজ্ঞান-বণিকদের। নিঃসন্দেহে বলা চলে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি এ বাণিজ্যের একটি ভালো ভাগ পাবার কারণে একে প্রসারিত হতে সহায়তা করে যাবে, যতদিন না কোনো পুরুষ বা নারী রোবট প্রধানমন্ত্রী হবার প্রতিযোগিতায় হাসিনা-খালেদার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভুত হচ্ছে।

তো, যেখানে বাণিজ্যই প্রধান বিষয় সেখানে নারীর ব্যবহার বুর্জোয়া ব্যবস্থায় খুবই প্রাসঙ্গিক। কারণ, নারীই এখানে বড় এক পণ্য। একটি পুরুষ রোবটের চেয়ে নারী রোবট বেশি আকর্ষণীয়। সেটা যে বেশি লোক টানবে তা সোফিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। আর যদি সে রোবটটিকে যৌন-আবেদনময়ী করে বানানো যায় তাহলে তো কথাই নেই। অবশ্য সোফিয়া এখনো তেমনটা হয়ে উঠেনি। এখনো তার পা নেই। বাংলাদেশের মতো সাংস্কৃতিক পশ্চাদপদ এক দেশে এসে তাকে মুসলমানি কামিজ পরে গলায় একটি ওড়না পেঁচিয়ে রাখতে হয়েছে। কিন্তু তার মূল বাসস্থান আমেরিকায় সে কী পরে থাকে সেটা দেখার সৌভাগ্য এখানকার তরুণদের হলো না। এর আবার একটি গূঢ় কারণ হয়তো বা এই যে, সোফিয়া হলো সৌদি নাগরিক। যেখানে নারীকে প্রকাশ্যে বের হতে হলে বোরখা পরা বাধ্যতামূলক। তরুণীরা সাথে ‘মেহরাব’ পুরুষ ছাড়া চলতে পারে না। স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে হলেও তাই। সেই দেশ কোন ধর্মমতে ও আইনে এই সচল, বাকপটু, ন্যাড়া মাথা, সুন্দরী যুবতী নারী মূর্তিকে নাগরিকত্ব দিয়েছে তা এক রহস্যই বটে! নারী-মানুষের অধিকার নেই, নারী-রোবট নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে!

তথাপি বাংলাদেশের তরুণরা মোটেই বেরসিক নয়। তাদের অনেকে সোফিয়াকে প্রেম নিবেদন করেছে। অনেক আদি-রসাত্মক গল্প, চুটকি ও স্ট্যাটাসও চলেছে। এসবই বাণিজ্যকে বাড়িয়েছে। পুরুষ হলে এগুলো নিশ্চয়ই কম হতো।

যাহোক, প্রধানমন্ত্রীও নারী। তিনি মাথায় কাপড় দিয়ে ধর্মমতে চলাফেরা করেন। যা ভোটের বছরে বিশেষ বেড়ে চলে। তবুও তিনি সোফিয়াকে মাথায় কাপড় দিতে যে বলেননি এটাই রক্ষা। কারণ, যে হারে তার সরকার নারী ভাস্কর্যগুলোকে সরিয়ে, বা লিঙ্গ বদল করে চলেছে, তাতে সে রকম হতে যে পারতো না তা নয়। এভাবেই পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ- উভয়ের পুরুষতন্ত্র হাত ধরাধরি করে চলছে এই বাংলাদেশে।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮


ভারতের সর্ববৃহৎ নারী সংগঠনের প্রধান কমরেড অনুরাধা গান্ধী- যুগ যুগ বেঁচে থাকুন !

anuradha_gandhi_india_maoist

১২ এপ্রিল, ২০০৮ কমরেড অনুরাধা ফেলসিফেরাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৪ বছর। তিনি বিহার ঝাড়খন্ডের গেরিলা অঞ্চলের কিছু পার্টি কাজ সেরে ফিরে আসা মাত্রই জ্বরে আক্রান্ত হন। ৬ এপ্রিল তার উচ্চমাত্রার জ্বর থাকার পরও গোপন জীবনের জটিলতার কারণে উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে পারেননি। স্থানীয় প্যাথলজিস্টের ভুল রক্ত পরীক্ষার ফলাফলের কারণে ভুল চিকিৎসা হয়। অন্য একটি রক্ত পরীক্ষায় ১১ এপ্রিল যখন জানা গেল যে তিনি ফেলসিফেরাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত, তখন যদিও তাঁকে দ্রুতই মুস্বাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিল তাঁর একেবারেই শেষমুহূর্ত। কষ্ট সহিষ্ণু বৈশিষ্ট্যের কারণে বাইরে থেকে তখনো তাঁকে ভাল দেখা গেলেও ফ্যালসিফেরাম ম্যালেরিয়া ইতোমধ্যেই তাঁর হৃৎপন্ডি, ফুসফুস ও কিডনী আক্রমণ করে ফেলেছে। যা তাঁর শরীরকে দুর্বল করে দিয়েছে। এবং এক ঘন্টার মধ্যে তাঁর সকল অঙ্গের কার্যক্রম বিকল হওয়া শুরু হয়। প্রথমে অক্সিজেন এবং পরে লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা দেয়া হলেও পরের দিন সকালে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কমরেড অনুরাধার মৃত্যুতে ভারতের বিপ্লব একজন আদর্শস্থানীয় কমিউনিস্ট নেতা ও মেধাবী বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীকে হারালো। ভারতীয় শ্রমিক শ্রেণি হারালো তাদের সবচেয়ে সক্ষম শীর্ষ নারী নেতৃত্বকে, যিনি কঠোর পরিশ্রম, গভীর মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক অধ্যয়ন এবং বিপ্লবী দৃঢ়তার মধ্যদিয়ে সিপিআই(মাওবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যের পর্যায়ে উঠে এসেছিলেন। ভারতের নিপীড়িত নারী সমাজ তাদের মহান শ্রেষ্ঠ একজনকে হারালো যিনি সাড়ে তিন দশক অক্লান্তভাবে তাদেরকে শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সংগঠিত করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। নাগপুরের অসংগঠিত দলিত ও শ্রমজীবী জনগণ এমন একজন হারাল যিনি তাদের মধ্যে থেকে তাদেরকে জাগরিত ও সংগঠিত করেছিলেন। এবং বস্তারের জনগণ যারা গণহত্যাকারী সালুয়া জুদুমে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন তারা হারালেন প্রিয় দিদিকে, যিনি তাদের সাথে বছর বছর থেকে তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়েছিলেন। ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীগণ হারাল তাদের অনুকরণীয় বিপ্লবীকে, যিনি নিপীড়িত জনগণের সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির আরাম আয়েশের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন।

প্রথম জীবনঃ

১৯৪০-১৯৫০-এর দশকে অবিভক্ত সিপিআই থেকে আসা একটি পরিবারে ১৯৫৪ সালে অনুরাধা মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। সিপিআই মুম্বাই অফিসেই তার বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তারা পার্টিতে সক্রিয় ছিলেন। তার বাবা গণেশ শনবাগ একজন উকিল ছিলেন। তিনি পার্টির নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্য ছিলেন এবং তেলেঙ্গানার সংগ্রামে গ্রেফতারকৃত কমিউনিস্টদের মামলার স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে তিনি মুম্বাইয়ের একজন প্রগতিশীল আইনজীবী হয়েছিলেন। মা কুমুদ শনবাগ একজন সমাজকর্মী হিসেবে তার জীবন অতিবাহিত করেছেন। শেষ বয়সেও তিনি একটি নারী দলের সাথে জড়িত ছিলেন। শিশুদের সৃজনশীলভাবে বেড়ে ওঠার জন্য এই পরিবারে উদার আবহাওয়া ছিল উপযুক্ত পরিবেশ। তাই অনুরাধা বিপ্লবী এবং তার ভাই মুম্বাইয়ের একজন বিশিষ্ট প্রগতিশীল নাট্যকার হতে পেরেছেন। অনুরাধা সান্তাক্রুজে জেবি ক্ষুদে স্কুলের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। ক্লাসে তিনি সর্বদাই শীর্ষ অবস্থানে থাকতেন। সেখানে তিনি ধ্রুপদী নাচও শিখেছিলেন। স্কুলটিতে শিশুদের জ্ঞান বিকাশের জন্য নানাবিধ বিষয়ে অধ্যয়নকে উৎসাহিত করা হতো। এ ধরনের পরিবেশের কারণে তিনি রাজনীতি বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান। এবং সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম ও বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। সে সময় কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিশ্বব্যাপী আলোড়ন ছিল। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিরাট প্রভাব, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের জনগণের গণযুদ্ধের ঐতিহাসিক অগ্রগতির সংবাদ বিশ্বব্যাপী যুব সমাজকে আন্দোলিত করেছিল। এবং সেই আন্তর্জাতিক বিদ্রোহ, বিপ্লবের মধ্যে নকশালবাড়ীর সশস্ত্র গণ উত্থানের বিস্ফোরণ সমগ্র ভারতব্যাপী এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তরুণী অনুর ওপরও এসকল দেশীয়-আন্তর্জাতিক আন্দোলনের প্রভাব পড়ে।

মুম্বাইয়ের এলফিনস্টোন কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৭২ সালে অনুরাধা তার বিপ্লবী জীবন শুরু করেন। সে সময় এই কলেজটি বামপন্থী বিপ্লবী কর্মীদের প্রাণকেন্দ্র ছিল। তখন একদল ছাত্রছাত্রীর সাথে যুদ্ধ আক্রান্ত বাংলাদেশীদের শরণার্থী শিবির এবং মহারাষ্ট্রের দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকাগুলো দেখে তিনি স্পর্শকাতর হয়ে পড়েন এবং তখন থেকে কলেজের ও সমাজের প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে তিনি গরীবদের সাথে অংশ নিতেন। এ প্রক্রিয়ায় ছাত্রদের মধ্যে যখন তিনি সক্রিয় তখন নকশাল আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত ছাত্র সংগঠন ‘প্রগতিশীল যুব আন্দোলন’-এর সংস্পর্শে আসেন। শীঘ্রই তার সক্রিয় সদস্য এবং পরে তার নেতৃত্ব দেন। তিনি বস্তিতেও কাজ করেন এবং এর মধ্যদিয়ে প্রথমে দলিত আন্দোলন ও অস্পৃশ্যতার ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি দলিত প্যান্থার আন্দোলনে যোগ দেন। এবং মহারাষ্ট্রের ওররলিতে তিন মাস স্থায়ী দাঙ্গায় শিবসেনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেন। স্পর্শকাতর বৈশিষ্ট্যর কারণে তিনি দলিত নিপীড়নের মর্মবেদনায় উদ্বেলিত হন এবং তার প্রতিকারের প্রচেষ্টায় ব্রতী হন।

বিপ্লবী গণনেতৃত্ব হিসেবে বিকাশ ও খ্যাতিঃ

১৯৭০-এর দশকে যুদ্ধ, দাঙ্গায় আক্রান্ত দরিদ্র নিপীড়িত দলিত জনগণের অধিকার রক্ষার আন্দোলন-সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় অনুরাধা প্রথমে মাওবাদী ছাত্র রাজনীতি, সিভিল লিবার্টিজ মুভমেন্ট ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা কমিটির সামনের সারিতে চলে আসেন। এবং ব্যাপকভাবে মার্কসবাদ অধ্যয়ন করে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। মহারাষ্ট্রে সিপিআই(এমএল) পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ১৯৮০-র দশকে সিপিআই(এম-এল)(পি.ডব্লিউ) সর্ব প্রথমে গডচিরোলী থেকে মহারাষ্ট্রে বিপ্লবী আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। মুম্বাই থেকে বিদর্ভ অঞ্চলে বিপ্লবী তৎপরতা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। পার্টির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য তিনি তার উচ্চ মর্যাদার ব্যক্তি জীবন ও মুম্বাই কলেজের চাকরি ত্যাগ করে সম্পূর্ণ অচেনা একটি জায়গা নাগপুরে স্থানান্তরিত হন। বিদর্ভ অঞ্চলে তার কাজের প্রকাশ্য দিক ছিল প্রাথমিকভাবে ট্রেড ইউনিয়ন ও দলিতদের মধ্যে সংগঠন ও আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা। ট্রেড ইউনিয়নে তিনি প্রথমে নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করেছিলেন। এবং সেখানে বহু জঙ্গী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘট করেছিলেন। খাপার খোলার থর্মোল পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের সময়, সেখানে প্রায় ৫,০০০ শ্রমিক কাজ করতেন। পুলিশের গুলি এবং অঞ্চল জুড়ে কারফিউ জারি করে রাষ্ট্র এ আন্দোলনকে দমন করেছিল। তিনি নাগপুরের গৃহপরিচারক, হিংনার এসআইডিসি কোম্পানির শ্রমিক, রেলওয়ে শ্রমিক, ভান্দারার বিড়ি শ্রমিক, কাম্পতির পাওয়ার লুম শ্রমিক এবং অন্যান্য অসংগঠিত শ্রমিকদের সংগঠিত করার সাথে জড়িত ছিলেন। এবং পরে কয়লাখনি শ্রমিক ও নির্মাণ শ্রমিকদের সাহায্য করার জন্য তিনি চন্দপুরে স্থানান্তর হন। এ সকল অসংগঠিত শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত ট্রেড ইউনিয়ন করার কোন অধিকার ছিল না এবং প্রচলিত ইউনিয়নগুলো এসকল শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি এড়িয়ে যেত। তিনি শুধু নাগপুরেই নয়, চন্দপুর, অমরাবতী, জবলপুর, ইরাটমাল প্রভৃতি এলাকায় অন্যান্য প্রগতিশীল ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের সাথে যৌথ তৎপরতা বিকশিত করেন। এই সংগ্রামে তিনি কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং কিছুদিন নাগপুর জেলে কাটিয়েছেন। তার চাকরি থাকার পরও তিনি এ অঞ্চলের একজন বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বের সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

তাছাড়া তিনি আরো বেশী সক্রিয় ছিলেন দলিত সম্প্রদায়কে প্রচলিত শোষণমূলক ব্যবস্থা থেকে তাদের স্বাধীনতা ও জাত-পাতের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠিত ও জাগরিত করার জন্য। তিনি বিপ্লবী মার্কসবাদীদের একজন যিনি সর্বপ্রথম দলিত ও জাত-পাত ইস্যুর বিশেষত্বকে চিহ্নিত করেছিলেন। জাত-পাত প্রশ্নে তিনি আম্বেদকর এবং অন্যান্য সমাজ বিজ্ঞানীদের লেখা ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। তথাকথিত মার্কসবাদীদের মত গতানুগতিক না থেকে দলিত ইস্যুর বিশেষত্ব উপলব্ধি করার পরপরই তিনি বসবাসের জন্য মহারাষ্ট্রের দলিতদের বৃহৎ অঞ্চল নাগপুরে চলে যান। যদিও এখানে দলিত রাজনীতি এবং অধিকাংশ দলিত নেতাদের শক্তি ও তাদের বিকাশের উপয্ক্তু ভিত্তি ছিল, তারপরও অনুরাধার তৎপরতায় যুবকদের একটি বড় অংশ মাওবাদীদের প্রতি দ্রুতই আকৃষ্ট হতে থাকে। বিশেষত সাংস্কৃতিক দল সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন। দলিত আন্দোলনে তিনি মাওবাদীদের প্রকাশ্যমুখ এবং বিদর্ভ অঞ্চলের অধিকাংশ দলিত জনসভার একজন বক্তা হয়ে উঠেছিলেন। যদিও দলিত নেতাদের দ্বারা প্রচন্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন, কিন্তু আম্বেদকর, দলিত ইস্যু ও জাত-পাতের নিপীড়নের প্রশ্নে তাঁর গভীর অধ্যয়ন থাকায় তিনি টিকে থাকতে পেরেছিলেন এবং যুবকদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিলেন।

তিনি নাগপুরে বিপ্লবী নারী আন্দোলন গড়ে তোলায়ও সহায়ক ছিলেন। সমাজের পিতৃতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের জন্য যে সকল নারী সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের কাছে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি নারীদের বড় একটি অংশকে শুধু নারী সংগঠনেই নয় পার্র্টিতেও যোগদানের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। তিনি অসংখ্য উত্তরাধুনিকতাবাদী প্রবণতা এবং দলিত ও জাত-পাত প্রশ্নে মার্কসবাদীদের ভুল ব্যাখ্যার পাল্টা শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গিগত বিষয় তুলে ধরে ইংরেজী ও মারাঠী উভয় ভাষাতেই প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন। দলিত প্রশ্নে ২৫ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধে মার্কসবাদী অবস্থান তুলে ধরে দলিতদের স্বাধীনতাকে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাথে যুক্ত করে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। আজ অবধি অনেকেই এই প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দেন। তিনি হচ্ছেন সেই কমরেড যিনি বহুবছর আগে ভারতের মার্কসবাদী আন্দোলনে পূর্বতন সিপিআই(এম-এল)(পি.ডব্লিউ)-র জাত-পাত প্রশ্নে প্রথম নীতিগত খসড়া দলিল উপস্থিত করেছিলেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, আভিজাত্যবাদী জাত-পাতের প্রথাকে চূর্ণ না করে এবং এর নগ্নরূপ অস্পৃশ্যতার আকারে দলিতদের ওপর নানাবিধ নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে ভারতে গণতন্ত্রায়ন অসম্ভব। এ প্রশ্নে ১৯৯০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনি প্রচুর ব্যাখ্যা করেছেন। যেগুলো পরে সিপিআই (মাওবাদী)’র কংগ্রেসে গ্রহণ করা হয়েছে।

দুটো ক্ষেত্রের এসকল কাজ ছাড়াও নাগপুরে এমন অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে যেগুলোর প্রবর্তক ছিলেন কমরেড অনুরাধা। নির্দিষ্টভাবে এ জাতীয় দুটো উদাহরণ উল্লেখ করা যায়। যেখানে বিদর্ভের জনগণের সচেতনতার ক্ষেত্রে অমুছনীয় প্রভাব পড়েছিলো। প্রথমটি ছিল ১৯৮৪ সালে কমলাপুর সম্মেলন এবং দ্বিতীয়টি ১৯৯২ সালে গদ্দরের নেতৃত্বে জননাট্যমন্ডলী(জ ন ম)-এর অনুষ্ঠান।

কমলাপুর সম্মেলনটি এ অঞ্চলে মাওবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় গডচিরোলীর গভীর জঙ্গলে সংগঠিত করা হয়েছিল। সম্মেলনে উপস্থিতির জন্য অনুরাধার নেতৃত্বে বিদর্ভের সর্বত্র ব্যাপক প্রচারাভিযান চালানো হয়েছিল। সেখানে জঙ্গলের মধ্যে ব্যাপক সশস্ত্র স্কোয়াডের সমাবেশ ঘটানো হয়েছিল। যদিও পুলিশ নির্মমভাবে দমন করে সম্মেলন ভেঙ্গে দিয়েছিল। তারপরও হাজার হাজার জনগণ গভীর জঙ্গলের ছোট গ্রাম কমলাপুরে ঝাঁকে ঝাঁকে যাওয়া শুরু করেছিলেন। এবং মাসব্যাপী এ অঞ্চলের বিপ্লবী সংবাদ মিডিয়ার হেডিং আকারে প্রচারিত হয়েছিল। নাগপুরে গদ্দরের অনুষ্ঠানটি পুলিশের নির্মম দমন এ্যাকশনে ধ্বংস হয়ে যায়। তবুও ব্যাপক জনগণ ও প্রগতিশীলদের মধ্যে এই অনুষ্ঠানের বিরাট প্রভাব পড়েছিল। এখানে বিরাট সংখ্যক সাংবাদিক, প্রভাষক, লেখক, আইনজীবী এবং সিনিয়র ফ্যাকাল্টি সদস্যদের সমাবেশ ঘটেছিল। তারা গদ্দরকে শীঘ্রই দেখার জন্য লাঠিতে আগুন জ্বেলেছিল। অনুষ্ঠানটি হতে না পারলেও প্রায় দু’মাস এ নিয়ে পত্রিকায় হেড লাইন করে সংবাদ এসেছে। সমগ্র বিদর্ভ অঞ্চলে বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি ছড়ানোর ক্ষেত্রে এ সকল ঘটনাবলী বড় রকমের প্রভাব ফেলেছিল। এবং কমরেড অনুরাধাই ছিলেন উভয় অনুষ্ঠানের স্থপতি।

এই সকল তৎপরতায় ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। যিনি একটি লেকচারও মিস না করে উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। যে কোন কাজের মতোই অধ্যাপনাকে একটি কাজ হিসেবেই নিয়েছিলেন। তিনি এখানে ধারাবাহিকভাবে থাকতেন এবং এক্ষেত্রে সচেতন ছিলেন। ছাত্ররা তাকে খুব ভালবাসতো এবং সহকর্মী অধ্যাপকগণ তাকে সম্মান করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশের চাপের বিবেচনায় পার্টি তাকে গোপন জীবনে থেকে কাজ করার পরামর্শ দেয়। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি গোপন জীবনের সকল জটিলতাকে সচেতনভাবে সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করেছেন। ২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিন বছর দন্ডকারণ্যের জঙ্গলে সশস্ত্র স্কোয়াড সদস্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। সিপিআই(এম-এল)(পি.ডব্লিউ)’র মহারাষ্ট্র রাজ্য শাখার সম্পাদক এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে সিপিআই (মাওবাদী) নবম কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য নির্বাচিত হন।

বিদর্ভ অঞ্চলে দেড় দশক বিপ্লবী রাজনীতির অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি প্রচুর প্রভাব সৃষ্টি করেন। শুধু তাই নয়, অন্যদের সাথে একত্রে শ্রমিক শ্রেণি ও দলিতদের মধ্যে শক্তিশালী বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন; ছাত্রদের বিপ্লবী আন্দোলন, সিনিয়র অধ্যাপক, সাংবাদিক, উল্লেখযোগ্য নাটক লেখক, এ অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী সহ বুদ্ধিজীবীদের বিশাল অংশকে আকৃষ্ট করেছিলেন। নাগপুরে আসার পরই অন্ধ্র প্রদেশের বিপ্লবী কবি চেরাবান্ডা রাজুর মৃত্যুর পর তাঁর কবিতা মারাঠী ভাষায় অনুবাদ করেন এবং এ অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত মারাঠী কবির মাধ্যমে একটি অনুষ্ঠানে সংকলন আকারে প্রকাশ করেন। মারাঠী অনুবাদ সমগ্র মহারাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে বিক্রি হয় এবং বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করে।

মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক অবদানঃ

গোপন পার্টি সংগঠকের কর্মপদ্ধতি বজায় রেখে একজন গণনেতৃত্ব হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সুদীর্ঘ বিপ্লবী জীবনে অনুরাধাকে বিভিন্ন ভূমিকা নিতে হয়েছে। তিনি প্রথম দিকে বিদ্যার্থী প্রগতি সংগঠন, সিপিডিসার, এ আই এল আর সি, এন বি এস, স্ত্রী চেতনা, অখিল মহারাষ্ট্র কমাগড় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য অসংখ্য গণসংগঠনের সহযোগী ছিলেন। তখন থেকেই তিনি আস্থাশীল নিয়মিত লেখক ছিলেন। তিনি প্রগতিশীল ছাত্রদের ম্যাগাজিন কলম-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। যে সংগঠনটির দেশব্যাপী প্রভাব ছিল। এই ম্যাগাজিনটি ইংরেজি এবং মারাঠী উভয় ভাষাতেই প্রকাশিত হতো। তিনি নাগপুর থেকে হিন্দিতে প্রকাশিত বিপ্লবী ম্যাগাজিন জনসংগ্রামের প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ভ্যানগার্ড, পিপলস মার্চের মতো ম্যাগাজিনে বিভিন্ন ছদ্মনামে প্রবন্ধ লিখতেন। স্থানীয় মারাঠী পার্টি ম্যাগাজিন ঝিরানামার এবং এক সময় তার প্রকাশনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মূলত তাত্ত্বিক ও মতাদর্শগত রচনা লিখেছেন। তাছাড়া দলিত প্রশ্নে যে সকল মার্কসবাদীরা শত্রুভাবাপন্ন ও উত্তরাধুনিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন তাদের খন্ডন করে অনেক লেখা লিখেছেন। তিনি সিপিআই(এম-এল)(পি.ডব্লিউ)’র জাত-পাত প্রশ্নে মূল খসড়া নীতিগত দলিল লিখেছেন। তিনি সিপিআই(মাওবাদী)’র নারী বিষয়ক নীতি প্রণয়নেও সহায়ক ভূমিকা রেখেছেন এবং পার্টির ৮ মার্চের বিবৃতির বহু খসড়া লিখেছেন।

তার বেশীর ভাগ মতাদর্শগত অবদান জাত-পাত ও দলিত নিপীড়ন এবং নারী আন্দোলনের বিভিন্ন প্রশ্নে, বিশেষত বুর্জোয়া নারীবাদের ওপর বিশদ বিশ্লেষণ মার্কসবাদী উপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি অবশ্য মাওবাদী পার্টিতে নারী বিষয়কে কাঠামোগত রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন।

আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত ছিল না এমন কোন লেখা তিনি লিখেননি। ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি ভাষার তিনি নিয়মিত লেখক ছিলেন। তাঁর বহু প্রবন্ধ ও লেখা অন্য ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তিনি ইংরেজি, হিন্দি ও মারাঠিসহ অসংখ্য ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন; গুজরাটিতে  ভাল ধারণা ছিল; তেলগু, কান্নাদা ও গোন্ডী ভাষা বুঝতেন।

উপসংহারঃ

কমরেড অনুরাধার অবদান ভারতের বিপ্লবী আন্দোলন, বিশেষত মহারাষ্ট্রের আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে। বিরল প্রকৃতির গুণাবলীর কারণে তিনি শুধুই মাঠের নেতৃত্বই ছিলেন না, বরং সমন্বিতভাবে মতাদর্শগত, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ও বহু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতি রায় বলেছেন- কমরেড অনুরাধার বর্ণনা একজন পাঠককে হ্যান্ড গ্রেনেডের মতো বিস্ফোরিত করতে পারে। অন্যত্র বলেছেন- অনুরাধার লেখা পড়ে নারী প্রশ্নে মাওবাদীদের সম্পর্কে তার ভুল ধারণাকে সংশোধন করেছেন তিনি। কমরেড অনুরাধা পার্টির নীতিমালা ও অনুশীলনের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও ভুলকে সমালোচনার ক্ষেত্রে খোলামেলা ও সাহসী ছিলেন। পার্টি ফোরামে তিনি কোন ইতস্তত না করে দৃঢ়ভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতেন। তিনি নারী প্রশ্নে পার্টির ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উপলদ্ধিতে ব্যাখ্যা করে নারী ফ্রন্টে পার্টির উপলদ্ধি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রচুর অবদান রেখেছেন। তিনি পার্টির মধ্যে যদি কারো ভুল দেখতেন তবে যে কাউকে পার্টিতে তার পদ-স্তর ইত্যাদি কি তা গ্রাহ্য না করে সরাসরি সমালোচনা করতেন। কমরেড অনুরাধা নিঃস্বার্থপরতা, সুশৃংখল কর্মপদ্ধতি, কঠোর পরিশ্রম করার অভ্যাস, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা, বিনয়, সৃষ্টিশীলতা, নির্ভীক চিত্ত, পার্টি বিপ্লব ও জনগণের প্রতি অবিচল আস্থা ভারত ও বিশ্বের যেকোন প্রান্তের কমিউনিস্ট বিপ্লবী, সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তি, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীলদের অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর জীবন ও কর্ম জনগণকে অব্যাহতভাবে বিপ্লবের প্রেরণায় উদ্দীপিত করবে। তাঁর অকাল মৃত্যুতে একটি উজ্জ্বল তারকা নিপতিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার আলোক রশ্মি ম্লান করা যাবে না, বরং নতুন করে পথকে আলোকিত করবে। আসুন কমরেড অনুরাধাকে অধ্যয়ন করি এবং তার আদর্শ অনুসরণ করি। যুগ যুগ বেঁচে থাকুন- কমরেড অনুরাধা।

সূত্রঃ বিপ্লবী নারী মুক্তি, নারী দিবস সংখ্যা ‘১৮


রোকেয়া দিবসে ‘বিপ্লবী নারী মুক্তি’র আহবান

Begum-Rokeya....

 

৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ “রোকেয়া দিবস”-এর আহবান

বেগম রোকেয়া’র অগ্রসরতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরুন, তাঁর সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করুন!

এ সমাজ ধর্ষকদের সীমাহীন দৌরাত্মের সমাজ। এই রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি ধর্ষক ও নারী নিপীড়কদের স্রষ্টা, রক্ষক ও মদদকারী। নারীর প্রকৃত মুক্তির জন্য এ সমাজকে বদলে ফেলুন! সমাজতন্ত্রের লক্ষে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের নতুন গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করুন!

* পুরুষতন্ত্রের রক্ষক সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ-সামন্তবাদের বিরোধিতা না করে নারীমুক্তির কথা বলা ভন্ডামি! শাসকশ্রেণি, সরকার ও বহু এনজিও সেটাই করে।

* রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ধর্ষণ, হত্যা ও জাতিগত নির্মূলীকরণের সত্যিকার বিরোধিতা জন্য তাদের জাতিগত স্বতন্ত্রতার স্বীকৃতি, রাখাইনে স্বায়ত্তশাসনসহ জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রামকে সমর্থন ও সহযোগিতা করুন! সুচি সরকার ও হাসিনা সরকারের মধ্যকার ভূয়া চুক্তির মুখোশ উন্মোচন করুন! চরম বিপদাপন্ন রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বর অত্যাচারের মুখে ঠেলে দেয়াকে বিরোধিতা করুন!

* বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন,’১৭-এ মৌলবাদীদের চাপের মুখে অপ্রাপ্ত বয়স্কা কিশোরীদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছে হাসিনা সরকার। এই নারী বিরোধী আইন বাতিলের দাবিতে এবং বাল্যবিবাহ রোধের নামে পুলিশ ও প্রভাবশালীদের হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন!

* নারীদেহকে পণ্য বানানোর সুন্দরী প্রতিযোগিতা, নারী-বিরোধী ব্লুফিল্ম, ফ্যাশন-শো, বিজ্ঞাপন, সিনেমা, নাটকের বিরোধিতা করুন ও প্রতিবাদ করুন!

* গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মূল বেতন ৫ মণ চালের মূল্যের সমান নির্ধারণ করতে হবে! বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব মালিক ও রাষ্ট্র পক্ষকে নিতে হবে।

* নারীমুক্তি আন্দোলনের মহান নেত্রী চিয়াং চিং, নাদেজদা ক্রুপস্কায়া, রোজা লুক্সেমবার্গ, ক্লারাসেৎকিন, কল্লোনতাই লাল সালাম!

নারীমুক্তির একই পথ সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ !

বিপ্লবী নারী মুক্তি

ডিসেম্বর, প্রথম সপ্তাহ, ’১৭


সিপিআই(মাওবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটি সকল ফ্রন্টে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে

608271276-Maoist_6

নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট দল সিপিআই(মাওবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির ১৭তম বার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে সারা দেশ থেকে ব্যাপক সংখ্যায় নারী ক্যাডারদের দলে নিয়োজিত করার জন্যে পার্টির আঞ্চলিক কমিটির সদস্যগণকে নির্দেশ দিয়েছেন।

সংগঠনটি, মাওবাদী আধিপত্য রয়েছে এমন রাজ্যের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে বসবাসরত নারীদেরকে এই সংগঠনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানিয়ে ব্যাপক মাত্রায় পোস্টার এবং ব্যানার লাগিয়েছে।

এর মধ্যে একটি পোষ্টারে সিপিআই(মাওবাদী) বলেছে, ” পিতৃতন্ত্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উত্থাপন করুন, সব মঞ্চে নারীর সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে তুলুন।”

এ নিয়ে গোয়েন্দা বিভাগ সূত্র বলছে, ব্যাপক মাত্রায় পুরুষ ক্যাডার ও নেতৃত্ব হারানোর কারণে মাওবাদীরা এই ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে।  

মাওবাদীরা ২-৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পিএলজিএ সপ্তাহ পালন করছে।

উল্লেখ্য যে, গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ৫ জন নারী ক্যাডার সহ কমপক্ষে ৮ জন মাওবাদী কর্মীকে ভুয়া এনকাউন্টারে হত্যা করেছে এবং সারা দেশে আটক হওয়া ৫ জন মাওবাদীর মধ্যে ৩ জন নারী কর্মী রয়েছে।

সূত্রঃ http://www.newsnation.in/india-news/cpi-maoist-central-committee-decides-to-involve-women-in-all-fronts-article-187743.html


সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ায় নারী মুক্তি

b97467ea337b6a637bcb0fbc5800f8a4--army-women-for-women

শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশের প্রক্রিয়ায় মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অবসান হয় এবং পুরুষ শাসিত সমাজব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন থেকে নারীদের একদিকে করা হয় শ্রমদাসী, অন্যদিকে যৌনদাসী। নারীর উপর চলে পুরুষতন্ত্রের বর্ধিত শোষণ। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের যুগে সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে নারীদের একটা অংশ অফিস-আদালতে, স্কুল-কলেজে এবং কলে-কারখানায় সামাজিক উৎপাদন বা অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করলেও শ্রেণি-নিপীড়ন ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণ-নিপীড়ন থেকে নারী মুক্ত হতে পারেনি। বাহ্যিকভাবে নারী-কল্যাণমূলক কিছু কিছু সংস্থার আবির্ভাব ঘটেছে। সেখানে ব্যাপক শ্রমিক-কৃষক, শ্রমজীবী নারীরা হন উপেক্ষিত। এছাড়া নারীদের ‘কল্যাণে’ বহু আইন করা হলেও তা থেকে যায় কাগজে-কলমে। এই আইনী সেবা পেতে গেলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালতে হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্তাদের খুশি করতে, যা শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী নারীদের পক্ষে সম্ভব নয়।

 ১৯১৭ সালে লেনিন-স্ট্যালিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় মহান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণে সেখানকার নারীরা রান্নাঘর ও আঁতুরঘর থেকে এবং শ্রেণি ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেয়েছিল। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ নারীদের জন্য যা ২০০ বছরেও করতে পারেনি, সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ও চীন মাত্র ২৫-৩০ বছরে তা করেছিল।

 সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ায় নারী মুক্তির কিছু চিত্র সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। সোভিয়েত রাশিয়ায় সংবিধান তৈরী করার সময় তারা ঠিক করেছিল- সমস্ত রকমের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় এবং অন্যান্য সর্বজনীন ক্ষেত্রে সোভিয়েত রাশিয়ার মেয়েরা পুরুষের সাথে সমানাধিকার পাবে। তার বাস্তব ভিত্তি পেয়েছিল- মেয়েদের পুরুষদের সাথে সমান কাজ করার অধিকার, সমান বেতন পাওয়ার, বিশ্রাম পাওয়ার ও অবসর বিনোদনের অধিকার, সামাজিক বীমা এবং শিক্ষা, মা ও শিশু স্বার্থকে রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্বারা রক্ষা করা, বড় পরিবারের মা আর অবিবাহিত মা-কে রাষ্ট্রীয় অর্থ সাহায্য, পুরো বেতনে মাতৃত্বের ছুটির ব্যবস্থা ছিল। ব্যাপকভাবে মাতৃসদন, শিশুসদন ও খেলাঘর-এর জাল বিস্তার করা। তারা এগুলো শুধু আইনেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। বাস্তবে পরিণত করেছিল। গ্রামে বা শহরে যেখানেই হোক না কেন, কোন মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হলে (সে মেয়ের বিয়ে হোক বা না-ই হোক) রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিনা পয়সায় নিম্নোক্ত সুযোগ-সুবিধা পাবেঃ ১) অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় চিকিৎসামূলক যত্ন ও তদারক; ২) প্রসবের জন্যে প্রসব হাসপাতালে জায়গা; ৩) পুরো বেতনে ১২ থেকে ১৬ সপ্তাহের ছুটি; ৪) সবসময়ে চিকিৎসামূলক সাহায্য ও তদারক; ৫) স্বাস্থ্যের দিক থেকে যখনই সে সম্পূর্ণভাবে কাজের উপযুক্ত তখনই তার নিজের চাকরিতে যোগ দিতে পারার অধিকার; ৬) কাজে যোগ দেওয়ার পর নবজাতককে স্তন্যদানের জন্যে নির্দিষ্ট সময় অন্তর আধ ঘণ্টা করে ছুটি; ৭) নবজাতকের জামাকাপড় কিনবার জন্যে নগদ টাকা; ৮) সন্তান জন্মাবার পর থেকে এক বছর ধরে তার খাদ্য বাবদ মাসে মাসে নগদ টাকা; ৯) মা যতক্ষণ কাজ করবে ততক্ষণ শিশুকে সামলাবার জন্য খেলাঘরের সুযোগ। দু’মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা এই সব খেলাঘরে মানুষ হবে।

আইনত প্রত্যেক ভাবী মা-ই এইসব সুযোগ সুবিধা পেতেন। শুধু তাই নয়, প্রসব হাসপাতালে একটি করে আইন বিভাগ, সেই বিভাগে অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ হাজিরা দিতেন অন্তঃসত্ত্বা কোনও নারী যাতে আইনত কোনও রকম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন সেই দৃষ্টি রাখাই ছিল এই বিভাগের একমাত্র কর্তব্য। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ায় নারীদের এই বিভাগের পরামর্শ নগদ অর্থে কিনতে হয়নি। 

শহরে প্রাক্প্রসব ক্লিনিক-এ জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্বন্ধে সমস্ত মেয়েদের পরামর্শ দেয়া হতো এবং প্রত্যেক ভাবী-মাকে ১টা করে কার্ড দেয়া হতো এবং তাদের নিম্নোক্ত সুবিধা দেয়া হতো- ১) ট্রামে সবার  আগে উঠার এবং প্রথমে বসতে  পাওয়ার অধিকার, ২) দোকান-হাটে কিছু কিনতে গেলে  প্রতীক্ষিয়মানদের সবাইকে পেরিয়ে সবার আগে জিনিপত্র কিনতে পাওয়ার অধিকার, ৩) বাড়তি রেশন, ৪) যেখানে সে কাজ করে সেখানে শুধু হালকা ধরনের কাজ করতে পাওয়ার অধিকার- ইত্যাদি।

 সোভিয়েত রাশিয়ায় নারীদের মধ্যে সামাজিক শ্রমের মর্যাদা ফিরিয়ে আনবার সচেতন বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা করা হয়। ঘর-সংসারের কাজ আর সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় উৎপাদনের কাজ- এ দুই-য়ের মাঝে তফাতটা মুছে দিয়ে নারীদের মাঝে শ্রমের মর্যাদা ফিরিয়ে এনেছিল। পৃথিবীতে এর আগে আর কোন দেশে (পরে মাও-এর চীন সেটা করেছিল) আর কোন যুগে নারীদের মুক্তির  জন্য এমনতর পরিকল্পনা আর কখনো দেখা যায়নি। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত গড়ার শুরু থেকেই এই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে নারীদের সামাজিক শ্রমের মর্যাদায় কাজে ফিরিয়ে আনার ফলাফল কী রকম ছিল তার হিসাব ছিল এরকম-  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়ে সোভিয়েত রাশিয়ায় ১,১০,০০,০০০ নারী কলকারখানা, চলাচল ব্যবস্থা আর নির্মাণ কাজে যোগ দিয়েছিল; তাদের মধ্যে ১,৭০,০০০ হ’ল ইঞ্জিনিয়ার আর টেকনিশিয়ান। চার হাজার নারী সোভিয়েত ইউনিয়নে ইঞ্জিন চালাবার কাজে নিযুক্ত ছিল।

রুশ বিপ্লবের চল্লিশ বছর আগে সে দেশের গ্রামের মেয়েদের অবস্থা সম্পর্কে স্ট্যালিন যে বর্ণনা দিয়েছিলেন তা হলো- বিয়ের আগে পর্যন্ত মেয়েকে সবচেয়ে অধম চাকরানি মনে করা হতো। বাপের সংসারে সে গতর খাটাত, উদয়াস্ত গতর খাটাত, তবু বাপ তাকে ধমকে বলতো ‘মনে রাখিস তুই আমার অন্ন ধ্বংস করিস!’ বিয়ের পর স্বামীর সংসারে সে গতর খাটাত, স্বামীর যেমন মর্জি তেমনিভাবেই। তবু স্বামী তাকে ধমক দিয়ে বলত, ‘মনে রাখিস তুই আমার অন্ন ধ্বংস করিস।’ বিপ্লবের আগে রুশ যেসব মেয়েরা কারখানায় কাজ করতো তাদের অবস্থাও ছিল একইরকম। জার আমলে ১০৭ ধারায় আইন ছিলঃ স্বামী পরিবারের প্রধান কর্তা, স্ত্রীর কর্তব্য হ’ল স্বামীর অনুগত হওয়া। তখনকার দিনে রুশ দেশে স্বামীর পক্ষে স্ত্রীকে মারধোর করাটা নেহাতই সহজ আর স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। স্ত্রীর সতীত্বে কোনও রকম সন্দেহ জাগলে স্বামীরা স্ত্রীদের সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে গরুর গাড়িতে বেঁধে চাবকাতে চাবকাতে গ্রাম ঘুরিয়ে আনত।

অথচ বিপ্লবের পর সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার কাজে এই নারীরাই এগিয়ে এসেছে পুরুষের পাশাপাশি, সমান সমান হয়ে। এই দেশেই ১৯৩৫ সালে, বিপ্লবের মাত্র ১৮ বছর পরে, দেশের যত শিক্ষক আর যত ডাক্তার আছে তার মধ্যে তিনভাগের দু’ভাগই ছিল নারীরা। এমনকি সৈন্য ও নৌবাহিনীতেও যোগ দিয়েছিল মেয়েরা। আজকে বাংলাদেশের নারীরা পুলিশ, সেনাবাহিনী বা অন্যান্য পেশায় যোগ দিলেও পুরুষতান্ত্রিক নির্যাতন তাদের পিছু ছাড়ছে না। প্রতিদিন খবরের কাগজে আসছে ঊর্ধ্বতন অফিসার, সহকর্মী বা অন্যদের দ্বারা তারা ধর্ষিতা-নির্যাতিতা হচ্ছেন, যা সোভিয়েত দেশে ছিল কল্পনার অতীত।

মোট কথা হলো- রুশ বিপ্লব পূর্বের রাশিয়া এবং সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়া ছিল যেন দুটো পৃথক পৃথিবী। তাই পৃথিবীর দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। পূর্ব ইউরোপের রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, চেকোশ্লভাকিয়া এবং এশিয়ায় চীন, ভিয়েতনামের মানুষ বেছে নিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার আদর্শ ও পথ। সে সব দেশে সমাজতান্ত্রিক বা তার লক্ষানুসারী ব্যবস্থা কায়েম হলেও বর্তমানে সোভিয়েত রাশিয়াসহ কোন দেশেই এখন আর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে নেই। বিশ্বাসঘাতক ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ এবং তেং-হুয়া চক্রসহ তাবদ দেশের সংশোধনবাদীরা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। যার পরিণতিতে নারীরা হারিয়েছে তাদের স্বাধীনতা, তারা পুনরায় শ্রমিক ও নারী হিসেবে পুঁজিবাদের শ্রম ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণ-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। তা সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া নিপীড়িত নারীদের মুক্তির দিশা ও অনুপ্রেরণা হয়ে আজও আলো ছড়াচ্ছে।

উদ্ধৃতি

“শ্রমিক শাসিত সরকার, কমিউনিস্ট পার্টি ও সংঘগুলি নরনারীর সেকেলে ধারণাগুলি দূর করবার জন্য, অসাম্যবাদী মনস্তত্ত্বকে বিনাশ করার জন্য কোনও রকম কসুর করছে না। আইনের দিক থেকে অবশ্যই পুরুষ এবং নারীর মধ্যে সম্পূর্ণ সাম্য রয়েছে। এই সাম্যকে বাস্তবে পরিণত করবার জন্য… … … আমরা মেয়েদের নিয়ে আসছি অর্থনীতি, আইনসভা ও সরকারের মধ্যে। যাতে তারা কাজকর্মের শক্তি আর সামাজিক শক্তি বাড়াতে পারে সেই জন্যেই সমস্ত শিক্ষায়তনে প্রবেশের পথ তাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। আমরা প্রতিষ্ঠা করছি যৌথ রান্নাঘর, সাধারণের খাবারঘর, শিশুদের রাখবার জায়গা, শিশুদের খেলাঘর, ছেলে-মেয়েদের বাড়ি- সব রকম শিক্ষালয়। এক কথায়, স্বতন্ত্র সংসারের অর্থনৈতিক ও শিক্ষামূলক কাজকে সামাজিক কাজে পরিণত করবার চেষ্টায় আমরা সত্যিই উঠেপড়ে লেগেছি। তার দরুন নারীরা মুক্তি পাবে বহু দিনকার পুরনো ঘর-সংসারের একঘেঁয়ে কাজ থেকে এবং পুরুষের আধিপত্য থেকে। ফলে নারীরা নিজেদের প্রতিভা এবং রুচিকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগাতে পারবে……।”

“শ্রমজীবী নারী আন্দোলনের প্রধান কাজ হলো নারীদের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার জন্য সংগ্রাম করা, এবং তা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সমতা নয়। মূল বিষয়টা হলো নারীদের জন্য সামাজিক উৎপাদন শ্রমে অংশ নেয়া, “গৃহস্থালী দাসত্ব” থেকে তাদেরকে মুক্ত করা, রান্নাঘর আর শিশুপালনের আদিঅন্তহীন ক্লান্তিকর খাটুনির নিকট তাদের অসাড়কারী ও অবমাননাকর অধীনতা থেকে তাদেরকে মুক্ত করা।

এই সংগ্রাম হবে এক দীর্ঘ সংগ্রাম, এবং এটা সামাজিক প্রযুক্তি ও নৈতিকতা উভয়ের মৌলিক পুনর্গঠনের দাবি করে। কিন্তু এটা কমিউনিজমের পরিপূর্ণ বিজয়ে সমাপ্ত হবে।”

– লেনিন, ৪ মার্চ ১৯২০, “আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস সম্পর্কে”, সংগৃহীত রচনাবলী, খ- ৩০।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, অক্টোবর ’১৭ সংখ্যা


চিলির সান্তিয়াগোতে নারীবাদী স্কুল ”ফ্লোরা ত্রিস্তান” এর সভা অনুষ্ঠিত

19024463_1181256855320049_1628049613_o

গত ৬ই জুন, মঙ্গলবার চিলির সান্তিয়াগোতে ত্রিশ জন সদস্যের উপস্থিতিতে, নারীবাদী স্কুল “ফ্লোরা ত্রিস্তান” এর গোল টেবিল সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভার আয়োজন করে কনট্র্যাকরিয়েন্টে ছাত্ররা। ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদে অনুষ্ঠিত এই সভায় নারী এবং পুরুষ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছাত্র ছাত্র ছিল।

সভায়, প্রতিটি সংগঠন নারীবাদী বিষয়ে তাদের মতামত পেশ করে এবং উল্লেখিত প্রশ্নগুলির বিষয়ে বিতর্কের দিকে অগ্রসর হয়:

“চিলিতে আজ নারীবাদীর কাজ কী? নারীবাদী সংগ্রামের বিষয় বা বিষয় কি? এটা কি গুরুত্বপূর্ণ? নারীবাদী সংগঠন হিসেবে আমরা নিজেদেরকে পুঁজিবাদ বিরোধী বলে ঘোষণা করি?”

 


ছত্তিশগড়ে মাওবাদী হামলাঃ হামলাকারীদের মধ্যে ৭০% নারী গেরিলা ছিল

গত সোমবার ছত্তিশগড়ের দক্ষিণ বাস্তার জেলার কালাপথে মাওবাদীদের সাথে বন্দুকযুদ্ধে আহত একজন সিআরপিএফ সৈনিক বলেছে যে, হামলাকারীদের মধ্যে ৭০% ভাগই মাওবাদী নারী গেরিলা ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সৈনিক বলেন যে, ঐ সময় মাওবাদীদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল, যারা AK-47 নিয়ে সিআরপিএফ সৈন্যদের আক্রমণ করেছিল।

আরেকজন সৈনিক বলেন যে, সৈনিকদের হত্যা করার পর নারীরা অস্ত্র লুট করে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

উল্লেখ্য যে, ২৪শে এপ্রিল ছত্তিশগড়ের দক্ষিণ বাস্তার জেলার কালাপথের এলাকায় মাওবাদীদের সঙ্গে প্রচণ্ড এক লড়াইয়ের সময় ২৬ জন সিআরপিএফ জওয়ান নিহত হয়।

সূত্রঃ http://m.dailyhunt.in/news/india/english/oneindia-epaper-oneindia/chhattisgarh+maoists+attack+70+attackers+were+women-newsid-66871565?ss=fb&s=a