হারাবার কিছুই নেই শৃঙ্খল এবং পলিটিক্যালি কারেক্টনেস ছাড়া!!- ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে নবারুণ ভট্টাচার্য

হোয়াট ড্যু ইউ মিন বাই ফিল্ম?

সত্যিই কি তুলসী চক্রবর্তী পরশ পাথরে কিছু করেছিলেন নাকি হ্যামলেটে আমরা যে স্মোকনোফস্কিকে দেখেছি সেটা কি খুব ভাল ছিল… কীরম যেন কনফিউজড হয়ে যাই! এই যে আমাদের দেশে এইভাবে একটা লুম্পেন কালচার তৈরি হয়ে গেছে, যেখানে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক টেলিভিশনে এই কথাও কবুল করেন যে উনি মেঘে ঢাকা তারার রিমেক করবেন! মানে অসভ্যতা, অভব্যতা যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে এই সময়ে…!

সত্যি, উনি যে বললেন ঋত্বিক আবিষ্কার- এই আবিষ্কার যত বেশি করে করানো যায় ততই মঙ্গল! আমার একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছে- সেই অসামান্য সিকোয়েন্সটি তোলা হচ্ছে কোমল গান্ধারে যেখানে গিয়ে সেই বাফারের ট্রেনের ধাক্কাটা… সেই যে বাংলাদেশ বর্ডার… তো ঐখানে, আমি তখন খুব ছোট আর ঐ যে ট্রলিতে করে ক্যামেরা যাচ্ছে, ঐ ট্রলিতে আমি বসে আছি; তা লালগোলার কোন ফিল্মবেত্তা এসে হঠাৎ আমাকে বললো, ‘আচ্ছা খোকা শোন তুমি দেড়শো খোকার কাণ্ডতে ছিলে না?’ ঐ ধরেশ সিনেমা কোম্পানির সঙ্গেই সে সিনেমা করে বেড়ায়… আমি খুব স্মার্টলি উত্তর দিলাম- হ্যাঁ আমি ছিলাম! কথাটা কিন্তু খুব মিথ্যে নয়, কারণ আমার বন্ধু লোকনাথ দেড়শো খোকার একটি খোকা, আমরা একসঙ্গে পড়তাম অতএব সেই বন্ধুর গর্বে আমিও গর্বিত। যাইহোক, সেইখানে সেই লোকটিই ঋত্বিককে একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলো- ‘আচ্ছা এই ফিল্মে এমন কোন ক্যারেক্টার আছে যাকে নিয়ে আপনার ক্যামেরা এগোচ্ছে?!’ তো, ঋত্বিক বললো- কি বললে? তো, আবার বললো- ফিল্মে…? ঋত্বিক বললো, হোয়াট ড্যু ইউ মিন বাই ফিল্ম? এইটা একটা মারাত্মক প্রশ্ন কিন্তু!! ন্যাচারালি সে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি! ওর প্রশ্নের পালাতে পথ পাচ্ছে না লোকটি!!

ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে

কিন্তু হোয়াট ড্যু ইউ মিন বাই ফিল্ম? ফিল্ম বলতে আমরা কি বুঝি…? ফিল্ম কি…? ফিল্ম একটা স্টেটমেন্ট হতে পারে, ফিল্ম একটা দার্শনিক তাৎপর্য বহন করতে পারে, ফিল্ম একটা ট্রিটিজ হতে পারে, ফিল্ম একটা দাস ক্যাপিটাল হতে পারে… ফিল্ম অনেক কিছু হতে পারে। মুষ্টিমেয় চলচ্চিত্র পরিচালকই এই জায়গাটায় উত্তীর্ণ হন, সকলেই হন না! এবং সেখানে ঋত্বিক একজন, যেমন- তারকোভস্কি একজন, বার্গম্যান একজন, আকিরা কুরোশাওয়া একজন- যারা এই দর্শনের জায়গায় গিয়ে, ইতিহাসের জায়গায় গিয়ে অদ্ভুত একটা অবস্থান গ্রহণ করে- যেখানে সমস্ত শিল্পমাধ্যম গুলিয়ে যায়! তা, আমি এইটা নিয়ে একটা তত্ত্বে এসছি, ঋত্বিক ঘটক বা তার পাশাপাশি আমরা যাদের দেখতাম সেই বিজন ভট্টাচার্য, যতীন্দ্র মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, চিত্ত প্রসাদ, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য- এরা কারা? আজকে কোনো লোক এদের চেনে না! দু’দিন পর ঋত্বিককেও চিনবে না, সেটা ঠিক। কারণ, আমাকে যে নেমন্তন্নটা করা হয়েছিলো সেখানে বলা হয়েছে যে, বাঙ্গালির আধুনিকতা কোলন ঋত্বিক কুমার ঘটক। এখন, এই বাঙ্গালি যে রেটে আধুনিক হয়ে উঠেছে, তাতে তার কাছে ঋত্বিক ঘটক একটা উদ্বৃত্ত মানুষ! তা, আমি উদ্বৃত্ত মানুষটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। আমি সোভিয়েত দূতস্থানের প্রচার বিভাগে চাকরি করতাম। পাশের ঘরে বসতেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন পিকিংপন্থি। মানে, মস্কোর হেডকোয়ার্টারে পিকিংপন্থি মানুষ- অতএব কেউ তার সাথে কথা বলতো না। আমি জন্ম থেকেই ওকে দেখে আসছি। তো, আমি গিয়ে কথা বলতাম, গল্প করতাম। আর ঋত্বিক প্রায়ই আসতেন পয়সার জন্য। একটু মদ খাওয়ার জন্য পয়সা দরকার। এলেই শিবদেবের কাছ থেকে কিছু, আমার কাছ থেকে কিছু, হেমাঙ্গদার কাছ থেকে কিছু নিয়ে বেরিয়ে যেতেন। খুব কম সময়ের জন্য আসতেন। এই মানুষটাকে কাছে দেখতে দেখতে একদিন হলো কি- এই যুক্তি-তক্কো-গপ্পোর ফেইজটাতে বা তার আগে ঋত্বিক ফুটপাতে থাকতো, রাস্তায় থাকতো। আমার বাড়ির উল্টোদিকে একটা বাড়ি ছিলম, তার রক ছিল, তার উপরে থাকতো। শুধু ঋত্বিক নয়, ঋত্বিকের মত আরো কিছু লোক যাদের পরিপূর্ণ উদ্বৃত্ত বলা যায়- দে ওয়্যার লুম্পেনস, তারাও থাকতো। ঋত্বিকও সেই লুম্পেনদের একজন। আমার মনে আছে- সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আমি সিগ্রেট কিনতে গিয়েছি ঋত্বিক আমার কাছে পয়সা চেয়েছে… এক প্যাকেট চারমিনার কেনার পরে আমার কাছে আঠারো না আটাশ এরকম পয়সা আছে। তো, আমি বললাম এটা নেবে? ও বললো দে! আমি দিয়ে বললাম, এই পয়সায় কি হবে? ও বললো, চলে যাবে! ঋত্বিকের মৃত্যুর পর আমার বাবা একটা স্মরণ সভায় বলেছিলো, ‘ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে’। ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে- এই কথাটা যেন আমরা না ভুলি। কারণ, এই খুন নানাভাবে করা যায়! জাফর পানাহিকে যখন বলা হয় কুড়ি বছর তুমি ছবি করতে পারবে না, স্ক্রিপ্টও লিখতে পারবে না- এটা তাকে খুন করা। বিনায়ক সেন কে যখন বলা হয় তুমি ডাক্তারি করতে পারবে না, কিছুই করতে পারবে না- সেটাও তাকে খুন করা। এবং ঋত্বিক ছবি করার কি সুযোগ পেয়েছিলো তার সময়?! একটা স্ট্রাগ্লিং/ফাইটিং আর্টিস্ট বলতে যা বোঝায় ঋত্বিক পরিপূর্ণভাবে তাই ছিলো! আমি আপনাদের বলছি, সুবর্ণরেখার আউটডোর চাকুলিয়ায় হয়েছিলো। সেখানে রোজ রাত্তিরে সাড়ে নয়টায় কোলকাতা থেকে একটা ট্রেন এসে পৌঁছাতো। সাড়ে ন’টার আগে থেকে আমি ঋত্বিকের মধ্যে একটা অদ্ভুত টেনশন লক্ষ্য করতাম। টেনশনটা হচ্ছে ঐ ট্রেন এসে পৌঁছুবে কিনা! ট্রেনটা এলে তার থেকে কোন চেনা লোক নাববে কিনা! এবং সে ফিল্মের র’স্টক আনবে কিনা! সেইটা না আসলে শুটিং করা যাবে না! এসবের কারণে দিনের পর দিন শুটিং বন্ধ হয়ে গেছে, র’স্টক আসেনি। এইভাবে একটা মানুষকে কাজ করতে হয়েছে। ঋত্বিক যখন ছবি শ্যুট করতেন তখন তার মাথায় তো একটা অ্যাল্কেমি, একটা ক্যালকুলেশন সবই থাকতো…। কিন্তু, আরেকটা জিনিস করতেন- অনেক এক্সেস শ্যুট করতেন, ওগুলো সব এডিটিং টেবিলে ঠিক হবে। সুবর্ণরেখার সেই দুর্মূল্য বহু বহু ফুটেজ টালিগঞ্জে পড়ে পড়ে নষ্ট হয়েছে… আমাদের দেশে সত্যি কোন আর্কাইভ, সত্যি কিছু থাকলে (হয়তোবা সংরক্ষিত হতো)… এগুলো অমূল্য সম্পদ। যেমন, আইজেনস্টাইনের এইরকমের বহু কাজ তারা নষ্ট করেনি। সেগুলো নিয়ে পরে এডিট করে অনেক কিছু বেরিয়েছে। কিন্তু, ঋত্বিকের ভাগ্যে সেটা জোটেনি!! এই জন্য বললাম, ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে। ঋত্বিকের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ছে- ঋত্বিক যাদের বাজনা শুনতো, খুব পছন্দ করতো তার মধ্যে একজন মোজার্ট। মোজার্টের একটা জীবনী পড়েছিলাম সেখানে আছে যে, মোজার্ট কোথাও একটা, তার অর্কেস্ট্রা টিম দিয়ে একটা সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন, একটা সিম্ফোনি কম্পোজিশন, সামনে লোকের প্রচন্ড ওভেশন… তারা চিৎকার করছে লং লিভ মোজার্ট! আর মোজার্ট কানে শুনছেন লং স্টার্ভ মোজার্ট! তুমি না খেতে পেয়ে মরো! এইটা আমাদের দেশে হয়েছে! একাধিক শিল্পীর ক্ষেত্রে হয়েছে! আমি যাদের কথা বললাম এদের প্রত্যেকের হয়েছে। যেমন, যতিরীন্দ্র মৈত্র- তিনি কি মাপের একজন শিল্পী এটা কেউ ভাবতে পারে না! তার কাছে যখন কোন অর্কেস্টা নেই, কোন বাদ্যবৃন্দ নেই, কিচ্ছু নেই- তিনি ফুটপাতের, বস্তির বাচ্চাদের নিয়ে একটা টিম বানালেন। সেখানে ইন্সট্রুমেন্ট কি- একটা পাউডারের কৌটার মধ্যে ইট ভরে সেইটা দিয়ে একটা ইফেক্ট, এভাবে অন্যান্য ইফেক্ট এবং সেটার নাম দিলেন কী- জগঝম্প! তা জগঝম্পের সঙ্গে ঋত্বিকের যে সম্পর্ক, এই লোকটার সঙ্গে বিজন ভট্টাচার্যের যে সম্পর্ক… যেমন ধরুন একটা ঘটনা বলি- সুবর্ণরেখার ফাইনাল স্ক্রিপ্ট লেখা হচ্ছে, পরদিন শুটিং হবে… হরপ্রসাদ মানে যে চরিত্র আমার বাবা করেছিলেন, উনি সেই ডায়লগগুলিকে আবার লিখছেন- তখন ওকে একজন জিজ্ঞেস করেছে এই ডায়লগগুলি তো কালকে লেখা হয়ে গেছে আবার কেনো করছেন! বললেন, থামো! এশিয়ার গ্রেটেস্ট আর্টিস্ট তাকে আমায় প্রজেক্ট করতে হবে না!! এই বোধটা !!! এগুলি কিন্তু সবই উদ্বৃত্ত মানুষদের নিয়ে কথা। তারা কি ছিল আর বাঙ্গালির জানার কোন উপায় নেই।

ঋত্বিক সেই লোক যিনি ইংরেজি জানা ক্রিটিকদের কাল্টিভেট করতো না

আমি একটা ছোট্ট কথা বলছি, আপনাদের মধ্যে যারা আমার হারবার্ট উপন্যাসটা পড়েছেন… তা সেই হারবার্টকে নকশালি বুদ্ধি-টুদ্ধি শিখিয়েছিলো বিনু বলে একজন। এবং সুবর্ণরেখার বিনু, ছোট বিনু, যে আমার ভাই, যে মারা যায় লেকের জলে ডুবে… সুবর্ণরেখার শেষ হচ্ছে মামার সঙ্গে সে যাচ্ছে আর বলছে আমরা নতুন বাড়িতে যাবো যেখানে প্রজাপতি আছে, গান হয়, সেখানে গেলে মাকে পাবো, বাবা আছে… এই নতুন বাড়িতে যাচ্ছিলো বিনু। এখানেই ছবিটা শেষ হয়। এবং এর পরবর্তী যে বিনু, আমি যাকে কনশাসলি হারবার্টে নিয়ে এসেছিলাম; সেই বিনু তখন বড় হয়েছে। এবার সে নতুন বাড়িটা নিজে বানাবার চেষ্টা করছে। এবং আজকেও এই চেষ্টাটা ফুরিয়ে যায়নি। আজকে আমার যে মাওবাদী বন্ধুরা জঙ্গলে বা জেলে রয়েছেন তারা ঐ নতুন বাড়িটার জন্যই ভাবছেন… আর কিছু না। এবং প্রত্যেক যুগে, সমস্ত সময়ে বিনুদের এটা অধিকার! বিনুরা এটা করবেই, সেটা ঠিক হোক কি ভুল হোক! এবং সেইটাকে ক্যামেরায় এবং কলমে ধরবার লোকও থাকবে। যেমন, সত্যি সত্যি অমূল্য বাবুদের দলের সঙ্গে ঋত্বিকের কনফ্রন্টেশনটা… তা একটা ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট, অসামান্য ডকুমেন্ট। পার্টলি আপনারা এই রকম ডকুমেন্ট পাবেন বিজন ভট্টাচার্যের চলো সাগরে নাটকে। ওখানে একটা ডায়লগ আছে যেইটা একচুয়ালি নকশালবাড়িতে হয়েছিলো হরে কৃষ্ণ কুমারের সঙ্গে ঐখানকার নেতৃবৃন্দের- জঙ্গল সাঁওতাল, চারু বাবু এদের আলোচনা। এই ডকুমেন্টশনের যে কাজটা ঋত্বিক করে গেছেন, এটার মূল্য অপরিসীম। সেটা আজকেও টপিক্যাল। ঐ যে বলছেন- তোমরা সফল ও নিষ্ফল; সেখানে তিনি মোটামুটি একটা প্র্যাকটিসিং সোশালিজমের ইতিহাস বলছেন। ঋত্বিক কিন্তু সবটা জানতেন। তিনি সুসলভ থিসিস পড়েছিলেন, তিনি চেগুয়েভারার অন গেরিলা ওয়্যারফেয়ার জানতেন। এগুলো জেনে এই জিনিসটাকে করা। এবং কতটা তার ডিটেইল সেন্স… অনন্যর একটা সিকোয়েন্স আছে ব্রেনগান নিয়ে উলটে উলটে যায়, একচুয়ালি দ্যাট ইজ দ্য ওয়ে দ্যাট গান ইজ টু বি ট্যাকলড! এবং অন্যন্যর সঙ্গে একটা ছেলে ছিল সে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ঐ বন্দুকটা নিয়েই লড়াই করেছিলো এবং দে ওয়্যার প্রোপারলি ট্রেইন্ড। এখানে সবটা আবেগের বিষয় নয়, একটা সায়েন্টিফিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ফটোগ্রাফির এই যে সিদ্ধি দেখছি, এই যে আশ্চর্যের জায়গা ওর সিনেমায়, এরও কিন্তু একটা গুরু-শিষ্য পরম্পরা আছে। ঋত্বিকের এই কাজের অনেকটাই কিন্তু শেখা বিমল রায়ের কাছে। যার মত একজন টেকনিশিয়ান তখনকার যুগে কেন, এখনো নেই। বিমল রায় কি মানের টেকনিশিয়ান তার একটা উদাহরণ দেই- বিমল রায় শুটিং করছেন মীনা কুমারীকে নিয়ে। এমন সময় পাশের স্টুডিও থেকে কে.আসিফ একটা নোট পাঠায়- বিমলদা একবার আসবে? উনি গেলেন আর সেটে বলে গেলেন থাকো আমি আসছি। ওখানে গিয়ে দেখেন সব্বনাশে ব্যাপার! মুঘলে আযমের শুটিং হচ্ছে– আয়নায় মধুবালাকে দেখা যাচ্ছে, সেই সিকোয়েন্সেটা… ঐটা শুট করার সময় ক্যামেরা বারবার চলে আসছে আয়নায়। তো, কে.আসিফ বলছে এখন আমি কি করে শুট করবো!? ঐখানে ক্যামেরায় ছিলেন আর ডি মাথুর। তো, বিমল রায় ক্যামেরাম্যানকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ক্যামেরা বসাচ্ছেন কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না। তখন উনি নিজের ফ্লোরে একটা নোট পাঠালেন শুটিং প্যাকআপ করে দাও, মীনাকে বাড়ি চলে যেতে বলো। তিনি ঐ ফ্লোরের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন এবং ছয়-সাত ঘন্টা থেকে প্রব্লেমটা সলভ করেন। সেই ফিনিশড প্রোডাক্টটা আমরা দেখি এখন। সেই লোকের সঙ্গে কাজ করেছেন। এদের ট্রেনিং, এদের আউকাত, এদের ঘারানাসবগুলোই অন্যরকম। কারণ, ঋত্বিক সমন্ধে একটা ইমেজ বাজারে দেওয়া হয়, ঐ পলিটিক্যালি কারেক্ট বাঙ্গালিরা করে…! এ প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি ঋত্বিক সেই লোক যিনি ইংরেজি জানা ক্রিটিকদের কাল্টিভেট করতো না! বেশি তালেবড় লোক তার কাছে গেলে লাথ মেরে বের করে দিতেন, সোজা কথা। এবং আমি বাকি ডিরেকটদের জানি তারা এই হাফ সাহেবদের কালিটিভেট করেছিলেন এবং তারা তখনই বুঝতে পেরেছিলেন সাহেবদের বাজারে কল্কে না পেলে কিছু হবে না। ঋত্বিকের এসব মাথায় ছিলো না। একটা অ্যাওয়ার্ডও পায়নি, একটাও না! মানে কিচ্ছু পায়নি, কোন ফেস্টিভালে না… কিচ্ছু না! এবং আজকে সে সমস্ত ফেস্টিভালের বাইরে চলে গেছে, অন্য জায়গায় চলে গেছে। এবং এই যে, ফাইটিং স্পিরিট… ঠিক আছে ছবি করতে পারছে না, থিয়েটারের উপর ম্যাগাজিন করছে, নাম ছিল অভিনয় দর্পণ। সেটাও উইথ ইক্যুয়াল অনেস্টি। আমি নিজের চোখে দেখেছি। শেষে হলো প্রফেশনাল থিয়েটার করবো… শালা সিনেমা করতে দিবি না… যাহ থিয়েটারই করবো। এবং সেই প্রজেক্টও এগিয়েছিলো… সাথে ছিল তিনটা ছবি করা এবং প্রত্যেকটা বানচাল হয়ে যায়। ঐ মিসেস (ইন্দিরা)গান্ধী একটু স্পেশালি ফেভার করতেন বলে উনার কিছু কাজ-টাজ, তারপর ইমার্জেন্সি ফ্লাইটে করে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা-এগুলো হয়েছিলো। আদারওয়াইজ, কোন জায়গা থেকে কোন সহায়তা লোকটা পাননি। আমাদের সো-কল্ড ইন্ডাস্ট্রি, সো-কল্ড বিগ নেইমস কেউ পাশে এসে দাঁড়ায়নি। এবং তার সময়ও তাকে কেউ বুঝতো না। ছবি তো ফ্লপ। ছবি যখন রিলিজ হতো, হলে কেউ নেই।

ঋত্বিক ওয়াজ দ্য ওনলি ম্যান

বাঙ্গালি শুধু বোঝেনি তা নয়… ঋত্বিক ওয়াজ দ্য ওনলি ম্যান যার হাত থেকে কোন ডিরেকটর বের হয়নি। তার সঙ্গে যারা ছিলো তারা কোন কাজ করতে পারেনি। এইটা একটা পিকুইলিয়ার ঘটনা কিন্তু! লোকে গিয়ে শেখে অথচ অত বড় লোকের কাছে থেকেও কেউ শিখতে পারেনি। কারণ, তারা তার অরাতে এত বেশি আচ্ছন্ন যে শুধু মদ খাওয়াটা শিখে নিলো কিন্তু কাজের কাজটা শিখলো না। যার ফলে কিছুই হয়নি। এ্যাটলিস্ট মিডিয়োক্রিটও তৈরি হয়নি। আমি ঋত্বিকের কাজের কতগুলি ধারার সাথে পরিচিত যার মধ্যে একটা স্পট ইম্প্রোভাইজেশন। ঐযে অসামান্য বহুরুপী এয়ারপোর্টে যার সামনে সীতা গিয়ে পড়ে, এই বহুরূপীর কোন সিকোয়েন্স স্ক্রিপ্টে ছিল না। আমরা গিয়েছিলাম ওখানে একটা বাজারে, সেইখানে ঐ বহুরূপী ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। তখন ওকে দেখে ইম্প্রোভাইজ করে তুলে নিয়ে যায় এয়ারপোর্টে। নিয়ে গিয়ে শ্যুট করা হয়। এবং তখন আমি অবাক হয়ে গেছলাম ওরে! বাবা! ওত বড় এয়ারপোর্টে আমি ঘুরে বেড়ালাম কই প্লেনটা তো দেখি নি… কিন্তু ছবিতে প্লেনের একটা রেকেজ ছিল… সিনেমায় তো এটাই মজা কোথায় কিসের সাথে কি জুড়ে দেয় বোঝা যায় না! তবে, চাখলিয়ার যে এয়ারপোর্ট ওখানে ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের প্র্যাক্টিস করার জায়গা ছিল… তারা মেশিনগান মানে পোর্টেবল গান নিয়ে মহড়া দিতো। আমি ওখান থেকে মেশিনগানের অনেক বুলেট খুলে এনেছিলাম কিন্তু বুলেটগুলো মরচে পড়ে পড়ে খুলে খুলে নষ্ট হয়ে গেছে। এটা সুবর্ণরেখার শুটিংয়ের সময় দেখা যেত, সেখানে রয়্যাল এয়ারফোর্সের ইন্সিগ্নিয়া লাগানো ছিল। কিন্তু সবই নষ্ট হয়ে গেছে… এখন আর কিচ্ছু নেই।

বাংলায় ঋত্বিকের কোন ঘারানা তৈরি হলো না কেন?

এবং এটাও ঠিক যে বাংলায় তার কোন ঘারানা তৈরি হলো না কেন? অন্য জায়াগায় কিন্তু অন্ধ ভক্ত ফিল্মমেকার জুটলো, বিশেষত জন এব্রাহাম; কিন্তু বাংলায় কোন কিছু হলো না। কারণ, এই এত আধুনিক বাঙ্গালি উদ্বৃত্ত মানুষটাকে আর রাখার দরকার মনে করেনি!! কেননা, এই লোকটা খুব ঝামেলা। আপনার লক্ষ্য করবেন এই ঝামেলাবাজ লোকগুলোর হাতে আর বাঙ্গালি কুক্ষিগত হয়ে থাকতে চাইছে না! এখন তার ফ্লাইট এত বেশি, এখন তার বহুমুখী ইয়ে এত বেশি মানে তার সাহিত্যই বলুন, চলচ্চিত্রই বলুন সব খানেই ঐ যে- কে যেন বলছিলেন হরমোনাল ডিজঅর্ডার না কি যেন…! তো, যাই হোক মানে প্রব্লেম বলবো না… এগুলোর কোন সোশ্যাল রিলেভেন্স আছে কি না…  মানে, এক পার্সেন্ট লোকের মধ্যে কে হোমোসেক্সুয়াল আর কে নয়, তার রাইট নিয়ে উচ্চবাচ্য হচ্ছে আর এদিকে ওয়ার্কারদের রাইট নিয়ে কোন কথা হবে না, কেউ কোন ফিল্ম করবে না। লাখের ওপর কারখানা বন্ধ তাই নিয়ে কোন ফিল্ম হবে না। চা-বাগানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করে মরে গেলো সেসব নিয়ে কিচ্ছু হবে না! আর ননসেন্স, ইডিয়োটিক ইস্যুজ নিয়ে যত কথা… আসল কথা কি, একটা সোসাইটি যখন ডি-পলিটিসাইজড হয়ে যায় তখন এইসব হয়। যেমন, আজকে হচ্ছে ফলস থিয়েট্রিক্যাল, ফলস স্পেক্টাকলস ভঙ্গি; এইভাবে যখন রাজনীতিটা এগোয়, শিল্পীরাও এই গড্ডলিকায় ভিড়ে পরে পয়সা খেয়ে এবং না খেয়ে। তো, এই কারবারের মধ্যে ঋত্বিকের কথা আনা, এ্যাট অল আলোচনা করা সম্ভব কি!

ঋত্বিকের রাজনীতি

আমি ঋত্বিকের রাজনীতি নিয়ে দু’একটা কথা বলছি। মেঘে ঢাকা তারার দুই ছেলে একজন কন্ঠশিল্পী হবে, হয়ও, প্রতিষ্ঠিত হয়। আরেকজন ফুটবলার হবে, হতে পারে না… কারখানায় চাকরি নেয় এবং সেখানে তার অঙ্গহানি ঘটে। ঐ যে আমার বাবার একটা ডায়লগ আছে ‘যন্ত্র গ্রাস করতে পারে নাই’। ষাটের দশকে বা পঞ্চাশের দশকের পর থেকে আমাদের দেশে এই যে একটা নতুন দশা এলো… এবার চিন্তা করুন সুবর্ণরেখায় রবিরাম- যে লেখক হবে তাকে হতে হলো বাস ড্রাইভার। একটা বিরাট মধ্যবিত্তের জীবনে পরিবর্তন এসে গিয়েছিলো; অসংখ্য বাঙ্গালি ছেলে ওয়ার্কার হয়ে দুর্গাপুর চলে গিয়েছিলো। সেই পুরো পিকচারটা, সমস্ত কিছু ঋত্বিকের ছবিতে রয়েছে। ঋত্বিকের মার্কস-এঙ্গেলস প্রীতি, যে টা সে বলছে- ‘এটা কিন্তু ফেলনা নয়’!উনি একমাত্র ডিরেকটর যার প্রতিটি ফ্রেম পলিটিক্যাল। প্রত্যেকটা ফ্রেম বারুদে ভর্তি। সে যখন একটা অপমানিত মানুষকে দেখায়… সে এই বার্তাই আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়-মানুষের অপমানকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে!! এবং সাঙ্ঘাতিক দায়িত্ববোধ থেকে কাজগুলো করা। তার দায়িত্ববোধের চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে যুক্তি-তক্কো-গপ্পো। আমার মজাটা হচ্ছে, ছবিটা যখন তৈরি হয় আমি তখন কিচ্ছু বুঝতে পারিনি। বরং আমি ঋত্বিকের সঙ্গে একটা ফ্যানাটিক ঝগড়া করেছি। আমি বলেছি এনাফ ইজ এনাফ!! তুমি ক্যামেরার ফ্রেমে মদ ঢেলে দিবে আর যা ইচ্ছা তাই করবে… ইন ডিফেন্সে অভ ইউর অ্যালকোহলিজম- এটা আমি মানবো না! প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিলো এবং তখনকার মত ঋত্বিক কিন্তুকন্সিডারড হিজ ডিফিট। সে বলছে- ‘না, আমি আর পারছি না’! ঐ কথাটাও মনে আছে, সেটা ক্যোওট করছে কিং লিয়ার থেকে ‘ডিনাওন্সড দ্য ওয়ার্ড’… আমি বললাম হ্যা… চুপ করে থাকো আর কিচ্ছু করতে হবে না। এবং তারপর আমি যতবার ছবিটা দেখেছি, তার আধুনিকতার দিকটি আমাকে পাগল করে দিয়েছে। কোথায় নিয়ে গেছে একটা ছবিকে… কোথায় চলে গেছে একেকটা ইমেজ… এবং তৎকালীন বাংলায় যা কিছু ঘটেছে পলিটিক্যাল, বিশ্বে যা কিছু ঘটেছে পলিটিক্যাল সমস্ত কিছু ঐ ছবিটাতে সারৎসার হয়ে ঢুকে গেছে। এবং ঋত্বিকের ফ্রেমের এপিক কোয়ালিটি… এটা আমাকে অসম্ভব মোটিভেইট করে। কোলকাতা শহরে রোজ অনেক মেয়ে নতুন করে বেশ্যা হয় তাদের কাছে তাদের দাদারা গিয়ে পৌঁছয়, প্রমত্ত অবস্থাতেই গিয়ে পৌঁছয় কিন্তু এটা ক্যামেরার ফ্রেমে অরকম একটা বোল্ড সিকোয়েন্সে দেখানো… এটা ঋত্বিক ছাড়া আর কারো পক্ষে করা সম্ভব ছিলো না। কারণ, গ্রেট আর্টিস্টরা খুব নিষ্ঠুর হয়। ঋত্বিকও নিষ্ঠুর। মারাত্মক নিষ্ঠুর। এবং তার নিষ্ঠুরতার চাবুক দিয়ে মেরে মেরে মেরে সে সম্বিৎ ফেরাবার চেষ্টা করেছে মানুষের! কতটা পেরেছে আমরা জানি না।

মেকানিক্যাল মার্ক্সিজম দিয়ে ঋত্বিককে বোঝা যাবে না

কিন্তু, আজকে আমার নিজের খুব ভালো লাগছে যে, এই ধরনের একটা আলোচনা সম্ভব হয়েছে। এতটা ভালোবাসা, এতটা রেস্পেক্ট নিয়ে ঋত্বিকের ব্যাপারটা ডিস্কাসড হচ্ছে। ঋত্বিকের জীবনদর্শন, ঋত্বিকের রাজনৈতিক আদর্শ প্লাস তার বহু বিশ্রুত ইয়ুং প্রীতি এইসবগুলি নিয়ে আরো বিশদ গবেষণা-আলোচনা করা দরকার। ঋত্বিকের দুটো বই ইনফ্যাক্ট আমার কাছে আছে, একটা হলো মডার্ন ম্যান ইন সার্চ অভ স্যোওল- কেউ গবেষণা করলে আমি দিতে পারি। ঐ বইটার পাতায় ঋত্বিকের কমেন্টস আছে। এবং আমার পরিচিত এক বন্ধুর কাছে আছে এরিখ নিউম্যানের দ্য গ্রেট মাদার। এবং সত্যি কথা বলতে কি ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলে- এই অন্তর্জগতের যে রহস্য আর বহির্জগতের যে সমস্যা এদের মধ্যে কিন্তু ভয়ংকর বিরোধের কিছু নেই। একটা ইন্ডিভিজুয়ালকে বুঝতে গেলে তার প্রব্লেমসকে বুঝতে গেলে, সে কিভাবে তার রিয়ালিটির সঙ্গে লড়াই করছে সেটা বুঝতে গেলে, তার এক্সিজটেনশিয়াল ফ্রেমটাকে বুঝতে গেলে আমাদের ইয়ুংকে দরকার, ফ্রয়েডকে দরকার, অ্যাডলারকে দরকার- প্রত্যেককে দরকার। ইভেন আব্রাহাম ম্যাসলোকেও দরকার। ম্যাসলো যে সাতটা ক্যাটাগরি বলছেন অর্থাৎ সাতটা ক্রাইসিস আছে মানুষের… একটা শেল্টারের ক্রাইসিস, একটা সান্নিধ্যের ক্রাইসিস, একটা খাবারের ক্রাইসিস… এগুলো মিট আপ করতে প্রতিটি স্তরে মানুষের লড়াই চলে। কাজেই, এই যে ট্রেন্ডটা ঋত্বিক আমাদের চিনিয়ে দিলো, এটারও অপরিসীম মূল্য আছে। কারণ, এই মেকানিক্যাল মার্ক্সিজম দিয়ে (জীবন-বাস্তবতা) বোঝা যাবে না! ইটালিতে মার্ক্সবাদের প্রতিষ্ঠাতা যিনি গ্যাব্রিওলা, তিনি বলেছিলেন- দান্তের সময়ে গম কত দামে বিক্রি হতো আর সিল্কের কাপড়ের কি দাম ছিলো- এইগুলো জানলেই সেই সোসাইটিকে এক্সপ্লেইন করা যাবে না, দান্তেকে তো নয়ই! এই ভুল মার্ক্সবাদ আমাদের দেশের অনেক বারোটা বাজিয়েছে। যার ফলে, একটা সময় এই তথাকথিত মার্ক্সিস্ট ক্যাম্পে আমরা দেখেছি যেটাকে আজকে ভুল রাজনীতির জন্য এক্সপ্লোয়েট করা হচ্ছে, তা হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে শিল্পীদের বিরোধের প্রেসনোট। আর মজাটা ছিলো- শিল্পীরা অনেক অ্যাডভান্সড লুকিং, তারা এগিয়ে ভেবেছিলেন আর কমিউনিস্ট পার্টি ছিলো ব্যাকোয়ার্ড, কমিউনিস্ট পার্টি ছিলোঅজিফায়েড চিন্তাধারার বাহক; কাজেই তারা সেই শিল্পীকে বুঝতে পারেনি। এই একই অভিযোগ ঋত্বিকের বিরুদ্ধেও এসছে, উনি কিসব গ্রেট মাদার পড়েন, আমার বাবার সমন্ধে এসছে… উনিও তো মাদার-কাল্টে বিশ্বাসী…। এই মেকানিক্যাল মার্ক্সিজমে যেটাকে আমি ভালগার মার্ক্সিজমই বলি- এটা নিজেকে এনরিচ করতে পারেনি, এনরিচ করতে না পেরে দিনের পর দিন নতুন নতুন গাড্ডায় গিয়ে পড়েছে এবং প্রচুর ভুল ব্যাখ্যা এবং ইন্টারপ্রিটেশনের সুযোগ ঘটেছে।

কালচার ইন্ডাস্ট্রির যে খেলা, মুনাফার যে খেলা, সেখানে ঋত্বিক চলে না

আমি আর কিছু বলবো না… সাম্প্রতিক একটা নাটক দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়ে, সেখানে কতটা ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট আছে এবং সেখানে যা যা সমস্যার কথা বলা হয়েছে সেগুলো কোন লেভেলের সমস্যা… এগুলো একটু ভাববার দরকার। অ্যাকচুয়ালি ঋত্বিকের সঙ্গে কি হয়েছিলো, হোয়াট সর্ট অভ ডিফারেন্স হি হ্যাড এবং সো ফার মাই নলেজ গোজ জর্জ বিশ্বাসের সঙ্গে এরকম ভয়ংকর কিছু টাসেল হয়েছিলো বলে আমার জানা নেই! এই ইতিহাসের অনেকটার সঙ্গেই আমি জড়িত খুব কাছ থেক জড়িত। আমার বাবাও একজন ভুক্তভোগী প্লাস আমি বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে এসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি, যেমন- সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন চট্টোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, বিষ্ণু দে… আমি কোথাও বাবা এসব পাইনি! এখন সব অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস উঠে আসছে এবং আমি দেখছি এগুলোকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই অস্ত্র সমস্ত যদি প্রতিপক্ষের হাতে চলে যায়, আমরা কি নিয়ে লড়বো?! এটাও একটা সমস্যা। কাজেই ঋত্বিক চান যে আমরা তাকে সেফগার্ড করি, আমিও চাই আজকের ইয়ঙ ফিল্মমেকাররা এ্যাটলিস্ট একটা অটোগ্রাফ কাজ করুক যেখানে বলা যাবে যে, ঋত্বিক বেঁচে আছেন। সেরকম একটা অবস্থা আসবে কি কখনো, কখনো কি দেখতে পাবো? নাকি বাঙ্গালি আরো আধুনিক হতে থাকবে! এ একটা জটিল সংকটের সময়, সংকটটাকে আমি অস্বীকার করি না… ম্যাসিভ একটা মার্কেট, একটা কালচার ইন্ডাস্ট্রি আছে… কালচার ইন্ডাস্ট্রির যে খেলা, মুনাফার যে খেলা সেখানে ঋত্বিক চলে না। বরং বলা হয়, ঋত্বিকের ছবির কদর এখন হচ্ছে। সত্যি কথা বলতে কি- যারা তাদের সময় অনেক এগিয়ে থাকে, তাদের লেখার কদর পরে হয় বা শিল্পকর্মের! যেমন, সেইদিন কাফকাকে কেউ বুঝতে পারেনি কিন্তু এখন দিন কে দিন কাফকার রেলিভেন্সি প্রত্যেকদিন বাড়ছে। এই নতুন ম্যানুস্ক্রিপ্টগুলো বেরোলে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে তা বোঝা যাচ্ছে না। যেমন, আন্তোনিও গ্রামসি। তাকে কুড়ি বছরের জন্য এই ব্রেনটাকে কাজ করতে দেবো না বলে জেলে দেয়া হলো; আর তিনি টুকরা পেন্সিল আর কাগজেলিখে ফেললেন প্রিজনারস ডায়েরি! সেটার রেলেভেন্স ভয়ংকরভাবে বেড়ে যাচ্ছে দিন কে দিন… সমাজকে দেখার চোখগুলো পালটে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। এই যে চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে রদবদল, এই রদবদলের যে দর্শন সেখানে ঋত্বিক একদম প্রথম সারির সৈনিক হয়ে থাকবেন।

অ্যাপারেন্টলি কিচ্ছু জানতোনা

এবং আমি এই মানুষটাকে এত কাছ থেকে দেখেছি, তিনি আমাকে এত কিছু জানিয়েছেন, বুঝিয়েছেন, শিখিয়েছেন… যেমন ধরুন মিউজিক শোনা- এই লোকটা ভারতীর মার্গ সঙ্গীত থেকে শুরু করে ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল ইভেন জ্যাজ ইভেন বিং ক্রসবির গান- এ সমস্ত কিছুর উপরে এন্সাইক্লোপিডিক নলেজ থাকতো। সেই লোকটা আমাকে মদেস মুশোভস্কির মিউজিক শোনালো। লং প্লেয়িং রেকর্ডের উপর মদের গেলাশ রাখতো ফলে গোল গোল দাগ হয়ে যেত… একটা বাজিয়ে একদিন শোনালো নাইট অন দ্য বেয়ার মাউন্টেন। পরে যখন চাকরি-বাকরি করেছিতখন এগুলো সংগ্রহ করেছি। একবার বসুশ্রী কফি হাউসে ক্রিকেট নিয়ে কিছু কথা বলেছিলো… সেখানে তো বাঙ্গালির ক্রিকেট নিয়ে বিশাল আড্ডা… সব একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে, এগুলো জানেই না! ক্রিকেটের সবচাইতে বড় যে লেখক সি এল আর জেমস- ওয়েস্ট ইন্ডিজের, হি ওয়াজ প্রোটেস্টান্ট অ্যান্ড আ জায়ান্ট ইন্টেলেকচুয়াল। তার লেখারও হদিশ জানতেন ঋত্বিক। এই যে ব্যাপারটা… সত্যি কি জানতেন আর জানতেন না… আমি তাকে কন্ঠস্থ শেক্সপিয়ার বলতে শুনেছি কিং লিয়ার থেকে। আমি ঋত্বিককে স্টেজে আশ্চর্য আলোর কাজ করতে দেখেছি, কিছু না জেনে। তিনি আমার বাবার নাটক দেখতে গেছেন, সেই নাটকে আলোর কাজ করছেন তাপস সেন। ঋত্বিক গিয়ে তাপস সেনকে গলাধাক্কা দিয়ে বললো, বেরো এখান থেকে! আমি আলো করবো, যা শালা ভাগ! তাপস আর কি করবে… ইয়ে মদটদ খেয়ে এসেছে… কিন্তু তারপর ও যে কাজটা করলো অসাধারণ। জাস্ট একটা ডিমার আর একটা স্পট লাইট কমিয়ে বাড়িয়ে পুরো ডাইমেনশনটা পালটে দিলো! ঋত্বিক থিয়েটারেরও লোক, ছবি আঁকার লোক ছিলেন, স্কেচ করতে পারতেন, তিনি মিউজিকের লোক…। এইবার বলি, ঋত্বিকের ক্যামেরার কথা, ওঁর প্রত্যেকটা ছবিতে ক্যামেরাম্যানের নাম থাকতো কিন্তু বেশিরভাগ কাজ ঋত্বিকের নিজের করা। ক্যামেরায় যখন লুক থ্রু করছে, সেখান থেকে বলে দিচ্ছে রোল-ক্যামেরা-অ্যাকশন… চললো! একটা লোক সবকিছু করতে পারতো। আর এডিটিংটা তো রমেশ যোশীর সাথে বসে ফ্রেম বাই ফ্রেম এডিট করতেন। যাই হোক, ঋত্বিক ঘটক কিরকম ছিলেন… তার বন্ধুবান্ধব অনেকে নেই দুই একজন যারা আছেন তারা কতটুকু বলবেন তাও জানি না। কিন্তু, আবার নতুন করে তথ্য যদি কিছু পাওয়া যায় সেগুলো যোগাড় করার এখন হাইটাইম! ঋত্বিকের সিনেমার মেকআপের কাজটা করতেন মূলত শক্তি সেন, শক্তি দা নেই, আমি নিজে দেখেছি ঋত্বিক নিজে বলে দিচ্ছেন এই শেডটা মার, ঐটা কর। মানে, এই লোকটা কি জানতো আর কি জানতো না সেইটাই একটা রহস্য। বাট, অ্যাপারেন্টলি কিচ্ছু জানতো না। সরোদ বাজাতে পারতো, বাঁশি বাজাতে পারতো। কিন্তু, কিচ্ছু নয়।

আরে! শালা! ও গ্রামার বানাচ্ছে! ওর গ্রামারটাকে শেখ!

আর বাঙ্গালি ক্রিটিকরা লেখলো- এনার একটু ডিসিপ্লিনের অভাব আছে! এনার সিনেমায় কোন গ্রামার নেই! আরে! শালা! ও গ্রামার বানাচ্ছে! ওর গ্রামারটাকে শেখ! চিরকাল এরা গোল গোল, নিটোল জিনিস মানে ঐ ক্যালেন্ডার ফটোগ্রাফি টাইপ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়ে গেলো!! খালি চিন্তা জিনিসটা কত নিটোল হবে! আরে, একটা বীভৎস ,ভাঙ্গাচোরা জিনিসকে নিটোল করা যায় না! দ্যাট ইজ নট দ্য নিউ এস্থেটিক! নিউ এস্থেটিক হলো মন্তাজ, সেটাও কিন্তু পলিটিক্যাল কারণেই ওয়ার্ক করেছে। ঐ যে সিকোয়েন্সটা- মা বলছে, ক্যামেরা উপরে ঘুরছে, সেখানে একটা জিনিস আছে, একটা বাচ্চা ছেলে দোলনায় দুলছে, এখানে বাচ্চা ছেলেটা হচ্ছে অনন্ত সময়ের মধ্যে একটা পেন্ডুলাম, সে কোথায় যাচ্ছে ডাইনে না বায়ে সে জানে না! কারণ, ঐ ছেলেটার এখন কেউ নেই… মা নেই, বাবা নেই, প্রেমিকা নেই, কেউ নেই! ওর লেখা নেই, কিচ্ছু নেই, টোটালি লস্ট! যেকোন সময় পেন্ডুলাম থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাবে, ও তখন ট্রাপিজের খেলোয়াড়! এই একটা সিকোয়েন্স তোলেন তিনি। আরেকটা সিকোয়েন্সে হরপ্রসাদকে যখন ঈশ্বর বলছে, তুমি আমাকে কোলকাতায় নিয়া যাবা? কোলকাতায় এখন মজা, সে যে কি বীভৎস মজা! তখন হরপ্রসাদ বলছে, নিয়ে যাবো… ওখান থেকে কাট করছে রেসের মাঠ, একটা ঘোড়া লাফ দিয়ে বের হচ্ছে, আর সীতার গলায় একটা পোকার হার…। চিন্তা করা যায় না! বিশ্ব সিনেমাতে নেই, কোথাও নেই এমন একটা সিকোয়েন্স! আমাদের যা বড় বড় নাম, যাদের নামে আকাডেমি, ইন্সটিটিউট হয়েছে তাদের কোন কাজে নেই, কিচ্ছু নেই! কিন্তু, এই লোকটার আছে! এই লোকটা বিশ্বসিনেমাতে রুথলেসলি অটোগ্রাফ করে গেছে, খোদাই করে দিয়ে গেছে! এবং আমাদের এটা গর্বের বিষয় তিনি আমাদেরই লোক, আমরা তাকে কাছে পেয়েছি দেখেছি।

হারাবার কিছুই নেই শৃঙ্খল এবং পলিটিক্যালি কারেক্টনেস ছাড়া!!

তার স্পিরিটটা খুব সহজ কিন্তু- মানুষের প্রতি বিশ্বস্ত হওয়া! গরিব মানুষের প্রতি অনেস্টি বজায় রাখা! বেশি বড়লোকের সঙ্গে মাখামাখি করার দরকার নেই- তাতে কখনো শিল্প হয় না, দালালি হয়! এগুলো হচ্ছে প্রত্যক্ষ শিক্ষা এবং পলিটিক্যালি অ্যালাইভ হওয়া। এবং আই স্ট্যান্ড ফর লেফট উইং আর্ট বাট নো ফারদার লেফট ইন দ্য আর্ট! এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কবুল করা এবং কবুল করতে করতে করতে করতে মরে যাওয়া একসময়! এইটাই স্বাভাবিক। এইটাই একটা শিল্পীর জীবন! এইখানেই সে বাঁচে। এবং শিল্পীরা পৃথিবীর কোন দেশে খুব একটা আনন্দে খেয়েছে আর থেকেছে এমনটা কেউ দেখাতে পারবে না! মদিলিয়ানির মত শিল্পী একটা ব্রেডরোল খাবার জন্য কাফেতে বসে সাদা কাপড়ে ছবি এঁকে দিতেন। সেই ছবিগুলি পরে কোটি ডলারে বিক্রি হয়েছে। এই মার্কেট তো রয়েছে চারদিকে…। তো, যাইহোক- আমাদের এই পলিটিক্যালি কারেক্ট ও কালচারালি কারেক্ট বাঙ্গালিরা নিপাত যাক!! তাদের আধুনিকতা নিপাত যাক!! আমরা যারা প্রিমিটিভ, পুরোনোপন্থি আমরা থাকবো! আমরাও বুঝি- এই হোমোসেক্সুয়ালিটি নিয়ে দেবেশ রায়ের দাদা দীনেশ রায় একটা গল্প লিখেছিলেন, অসামান্য গল্প, সেই গল্প আমরা প্রোমোট করেছিলাম… আমরা হোমোসেক্সুয়ালিটিকে প্রোমোট করিনি, আমরা প্রোমোট করেছিলাম একটা অসামান্য শিল্পকর্মকে- যার বিষয় হোমোসেক্সুয়ালিটি হতেই পারে!! আমরাও কিছু জানি না, বুঝি না এমন নয়! আমরা রামছাগল এরকম মনে করো না! আমরা ডেথ ইন ভেনিস দেখেছি। উই ক্যান টিচ ইউ হোয়াট ইজ হোমোসেক্সুয়ালিটি! এরা যেন আজকে আবিষ্কার করলো এমন ভাব! এগুলো অনেক প্রিমিটিভ ব্যাপার-স্যাপার! এসব হয়ে গেছে অনেক আগে! এগুলো আমরা জানি! কাজেই, হারাবার কিছুই নেই শৃঙ্খল এবং পলিটিক্যালি কারেক্টনেস ছাড়া!!

থ্যাঙ্কিউ !!

ভিডিওঃ https://www.youtube.com/watch?v=VIuC9Gv-R2o


অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্রঃ জহির রায়হান

রুশ বিপ্লবের পঞ্চাশতম বার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘তরঙ্গ’ পত্রিকায় জহির রায়হান-এর লেখা ‘অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্র’ লেখাটি প্রকাশিত হয়। এ বছর রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকী উপলক্ষে ‘লাল সংবাদ’ এ লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হল:

আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে স্মরণীয় অবদান হচ্ছে দুটো।

একটি সিনেমার জন্ম।

অপরটি সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম।

দুটোই বিপ্লব।

একটা চারুকলার ক্ষেত্রে।

অন্যটা সমাজ ব্যবস্থা ক্ষেত্রে।

সিনেমা মানুষের স্বষ্টি ক্ষমতাকে প্রকাশের এবং বিকাশের এক নতুন মাধ্যমের সন্ধান দিয়েছে, যার শক্তি অপরিসীম।

সিনেমা হলো কবিতা।

সিনেমা হলো উপন্যাস।

সিনেমা হলো সংগীত।

সিনেমা হলো পেইন্টিং।

সিনেমা হলো নাটক।

সিনেমা হলো বিজ্ঞান।

সিনেমা হচ্ছে সবকিছুর সমষ্টি। এ এক যৌথকলা। অথচ কোন একটির একক অস্তিত্ব এখানে নেই। সবকিছুকে ভেঙেচুরে, সবকিছুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বৈজ্ঞানিক শিল্পকর্ম। অক্টোবর বিপ্লব এবং সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম মানুষের ইতিহাসে এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তন ঘটিয়েছে।

মানুষ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও বৈষম্যের শেকল থেকে মুক্তি পেয়েছে। শোষণের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে। মানুষ তার সত্যিকার মর্যাদা পেয়েছে এবং নিজের শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। ব্যক্তি ও সমষ্টির যৌথ প্রচেষ্টায় মানুষ এক বৈজ্ঞানিক সমাজ ব্যবস্থা গোড়াপত্তন করেছে এবং শ্রেণিহীন সমাজ গড়ে তোলার পথে এগিয়ে চলেছে।

অক্টোবর বিপ্লবের সঙ্গে সিনেমার জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই। দুটোই পৃথক ঘটনা।

কিন্তু অক্টোবর বিপ্লব যদি না হতো, সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম যদি না হতো তাহলে সিনেমা চারুকলা (Fine art) হিসাবে আদৌ স্বীকৃতি পেতো কিনা সন্দেহ। শুধু তাই নয়, এই নতুন কলামাধ্যমটির মধ্যে যে এতবড় স্বষ্টিশক্তি লুকিয়ে আছে তাও হয়তো আমরা আবিষ্কার করতে পারতাম না।

কথাটার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে বুর্জোয়া সিনেমার স্বরূপটা একবার দেখা দরকার।

বুর্জোয়া সিনেমার এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা। সিনামার আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া শ্রেণি মানব সভ্যতার এই নতুন আবিষ্কারটিকে অর্থ উপার্জনের এক মোক্ষম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে লাগলো। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানী ও ফ্রান্সের বুর্জোয়া শ্রেণি সিনেমার জন্ম মুহূর্তে তার স্বজনশীল সম্ভাবনার টুটি টিপে দিলো। সস্তা চিত্তবিনোদনকারী হাল্কা যৌন আবেদনময়, উগ্র অপরাধমূলক বিষয়বস্তুগুলোই প্রাধান্য পেলো বুর্জোয়া সিনেমার অঙ্গনে।

এ প্রসঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কীর একটা উক্তি মনে পড়লো।

লুমিয়ার ব্রাদার্স (ফরাসি) প্রযোজিত একটা ছবি দেখতে যান তিনি। সিনেমার সঙ্গে সেই তার প্রথম পরিচয়। সেটা ১৮৯৬ সাল। সিনেমা দেখে পরদিন গোর্কী একটা স্থানীয় সংবাদপত্রে লিখলেন–

Last night I was in the Kingdom of Shadows……………..I was at Aumont’s and swa Lumier’s Cinematograph_moving photography. The extraordinary impression it creates is so unique and complex that I doubt my ability to describe it with all its nuances………………I am convinced that these pictures will soon he replaced by others of a genre more suited to the general tone of the ‘Concert Parisian’. For example, they will show a Picture titled ‘As She undresses’ or ‘Madame at her Bath’ or ‘A woman in Stockings”.

বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় আর্টের সহজ ও স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব নয়। ফিল্ম আর্টের পক্ষে এ উক্তি সবচেয়ে বেশি করে প্রযোজ্য। কারণ চলচ্চিত্র হচ্ছে একদিকে আর্ট অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রি, দুটোই। ছবি বানাতে হলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। যে সমস্ত পুঁজিপতি এতে টাকা খাটান তাঁরা প্রচুর মুনাফা পাবার আশায় টাকা খাটান। দর্জির দোকানে মানুষ যেমন অর্ডার দিয়ে তাদের জামা কাপড় তৈরি করে তেমনি পুঁজিপতিরা অর্ডার দিয়ে তাদের মর্জিমাফিক এবং তাদের শ্রেণি-স্বার্থ রক্ষাকারী ছবি তৈরি করেন। এ ধরনের সমাজ ব্যবস্থায় আর্ট-ছবি কি করে তৈরি হবে?

‘Art is the privilege of the free……………..art is a mode of freedom, and a class society conceives freedom to be absolutely whatever relative freedom the class has attained to’_ Christopher Caudwell.তবু অনেকে হয়তো বলবেন, অক্টোবর বিপ্লবের অনেক আগে, আমেরিকার বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার ভেতরে থেকে ডি ডব্লু গ্রিফীথ কি করে দু-দুটো আর্ট-ফিল্ম (Birth of Nation Ges Intolearance) তৈরি করলেন?

ও দুটো ছবি সত্যিকার আর্ট ফিল্মের মর্যাদা পাবার যোগ্য নয় বলেই আমার ধারণা।

এ সম্পর্কে John Howard Lawson Zvi Film, The Creative Process বইতে কি বলছেন শুনুন।

He [Griffith] felt that the fate of humanity is a factor in history……………He could not believe that humanity would ever control its own destiû. His philosophic views were colored by the vulgari“ation of Darwin’s theories current at the time…………..critics have praised the film’s technical brilliance and have deplored its reactionary treatment of the Negro struggle for freedom. Its advance technique and backward social content are often considered as fixed opposites’ এরজন্যে গ্রিফীথকে দায়ী করা অর্থহীন। বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত স্ববিরোধীতাই এর জন্যে দায়ী।

`In bourgeois art man is conscious of the necessity of outer reality but not of his own, because he is unconscious of the society that makes him what he is. He is only half a man’

_Christopher Caudwell ধনতন্ত্রের দেশ আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক ডি ডব্লু গ্রিফীথের অর্ধেক সত্য, অর্ধেক জীবন, অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক আর্ট তাই পরবর্তীকালে সমাজতন্ত্রের সন্তান, সোভিয়েত পরিচালক সার্জ্জি আইজেনস্টাইন, পুদোভকীন আর ডোভজেঙ্কোর হাতে এসে সম্পূর্ণ সত্য, সম্পূর্ণ জীবন, সম্পূর্ণ মানুষ ও সম্পূর্ণ আর্টের মর্যাদা পেয়েছে।

সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম ও তার ইতিহাস এবং সোভিয়েত সিনেমার জন্ম ও তার ইতিহাস এক ও অভিন্ন।

অক্টোবর বিপ্লবের প্রচণ্ড ঢেউ রাশিয়ার জনসাধারণের মধ্যে এক নতুন চেতনাবোধের জন্ম দিয়েছিলো। পুরাতনকে ভেঙেচুরে নতুনভাবে নতুন দর্শন ও নবলদ্ধ জীবন-বোধের আলোকে নতুন করে দেখার অদম্য বাসনা তখন সমার মনে। সাহিত্য, কবিতা, পেইন্টিং, সংগীত, নাটক এর একটা ট্র্যাডিশন আছে। অতীত আছে। এর কতটুকু গ্রহণ ও কতটুকু বর্জন করা প্রয়োজন এ নিয়ে তখনো দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের অবকাশ রয়েছে। এদিক থেকে চলচ্চিত্র তখনো রাশিয়ানদের কাছে একটা সম্পূর্ণ নতুন মাধ্যম। যার কোন ট্র্যাডিশন কিম্বা দ্বন্দ্বমূলক অতীত নেই এবং যার শক্তি সমাজতন্ত্রের শক্তির মতই অফুরন্ত ও অপরিসীম। তাই সমাজ সচেতন এই নতুন মানুষগুলো সিনেমার প্রতি আকৃষ্ট হলো সবচেয়ে বেশি। এবং সোভিয়েত সিনেমার জন্ম হলো।

`Soviet Cinematography is the offspring of the October Revolution. It was born of the struggle and has drawn its content, beauty and purpose from the latter’s great historical significance. It took Lenin’s behest_Art belongs to the people_as a banner, as a guide to action’_Alexander Doveyhenko.

`The all powerful form of the October Revolution uprooted all of us from the most diverse activities and occupations, swept us away with its mighty stream and combining into one whole everything we had brought with us from various field of knowledge and activity, set us working at a great and collective endeavour_our Cinematography’.আইজেনস্টান ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার, পুদোভকীন ছিলেন কেমিস্ট, ভোডজেঙ্কো ছিলেন স্কুলশিক্ষক, জীগান ছিলেন অভিনেতা, কুলেশভ, কোজিনস্তভ, ইয়াকুতভীচ এঁরা ছিলেন পেইন্টার, আলোকজান্ডারভ ছিলেন একজন সিনেমা অপারেটর আর ভার্তব তখন ডকুমেন্টারি ছবি বানাতেন আর মায়াকোভস্কি ছিলেন একজন খ্যাতনামা কবি। সোভিয়েত সিনেমার জন্ম মুহূর্তে এরাই ছিলেন তার পুরোধা।

সোভিয়েত সিনেমার প্রথম ফসল হচ্ছে সাজ্জি আইজেনস্টাইনের STRIKE (১৯২৪) আদিক, প্রতীকের ব্যবহার এবং উপস্থাপনায় ছবিটি অভিনব। গ্রিফীথের Intolerance ছবিতেও ধর্মঘটের একটা দৃশ্য আছে। সে দৃশ্যটিকে তিনি দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আইজেনস্টইনের STRIKE এ ছবির প্রতিটি চরিত্র এমনকি ছবির দর্শকরাও সংঘাতের সঙ্গে একাত্ম্য হয়ে যান। তবে ছবিটা মাঝে মাঝে একটু থিয়েটার ঘেঁষা হয়ে পড়েছে। আইজেনস্টাইন নিজেই বলেছেন– `Our first film, Strike, floundered about in the flotsam of rank theatricality’.

আইজেনস্টাইনের পরবর্তী ছবি Battleship Potemkin চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। সাহিত্যে যেমন টলস্টয়ের War and peace, কাব্যে যেমন মিল্টনের Paradise lost and paradise Regained, পেইন্টিংয়ে যেমন দা ভিঞ্চির Last Supper তেমনি চলচ্চিত্রে আইজেনষ্টাইনের Battleship Potemkin একটি ক্ল্যাসিক। একটি মহাকাব্য। অন্য মহাকাব্যগুলোর চেয়ে Battleship Potemkin আরো মহৎ, আরো শক্তিশালী। কারণ, অন্য মহাকাব্যগুলোতে নায়ক নিয়তির দাস। নিয়তি তাকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেখানেই যাচ্ছে সে। অসহায় শিশুর মত ঘুরে বেড়াচ্ছে নায়ক। কিন্তু এখানে নায়ক নিয়তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। নিয়তিকে নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিতে চাইছে। এখানে নায়ক হলো জীবন, নায়ক হলো মানুষ। এক নয় অনেক। অসংখ্য মানুষ। নায়ক হলো ইতিহাস।

মাত্র একটি ঘটনা, একটি সংঘাতের মাধ্যমে (সিনেমার ভাষায় যাকে বলা হয় Sequecne) একটি বিরাট ও ব্যাপক বিপ্লবী আন্দোলনকে (১৯০৫ সালের বিপ্লব) তার সমস্ত শক্তি, চেতনা, তাৎপর্য ও বিপর্যয়সহ জীবন্ত ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। অক্টোবর বিপ্লব যেমন সারা দুনিয়ার মেহনতি মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিলো তেমনি Battleship Potemkin পুঁজিবাদী দেশের সৎ ও সচেতন সিনেমা শিল্পীদের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছিলো।

মাত্র একটি ঘটনা, একটি সংঘাতের মাধ্যমে (সিনেমার ভাষায় যাকে বলা হয় Sequecne) একটি বিরাট ও ব্যাপক বিপ্লবী আন্দোলনকে (১৯০৫ সালের বিপ্লব) তার সমস্ত শক্তি, চেতনা, তাৎপর্য ও বিপর্যয়সহ জীবন্ত ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। অক্টোবর বিপ্লব যেমন সারা দুনিয়ার মেহনতি মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিলো তেমনি Battleship Potemkin পুঁজিবাদী দেশের সৎ ও সচেতন সিনেমা শিল্পীদের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছিলো। ১৯৫৮ সালে Brussels এ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে Battleship Potemkin কে The best film of all times and Peoples” এবং আইজেনষ্টাইনকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সোভিয়েত সিনামের ইতিহাসকে তিন অধ্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম অধ্যায় হলো ১৯১৭ থেকে ১৯৩০। দ্বিতীয় অধ্যায় হলো ১৯৩০ থেকে ১৯৪১। তৃতীয় অধ্যায় হলো ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৭। প্রথম অধ্যায়ে যে ক’জন কৃতী পরিচালককে আমরা পাই তারা হচ্ছেন, সার্জি আইজেনষ্টাইন (Battleship Potemkin, October, Strike) ভি পুদোভকীন (Mother, The end of St petersburgh, Descendants of Chingis khan) আলেকজান্ডার ডোভজেঙ্কো (Arsenal, Earth) জীগা ভার্তব (Enthusiasm)। একই মতবাদের অনুসারী হলেও এঁদের প্রত্যেকের কাজের পদ্ধতি ছিলো ভিন্ন। প্রত্যেকেই নিজস্ব এক একটা ধারার সৃষ্টি করে গেছেন। এদের প্রত্যেকটি ধারার প্রভাব আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রে এখনো সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাই। আইজেনষ্টাইন ছিলেন আঙ্গিক প্রধান। পুদোভকীন বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক দুটোর প্রতিই সমান জোর দিয়েছেন। ডোভজেঙ্কো হলেন গীতিধর্মী। আর ভার্তব চূড়ান্ত বাস্তবতায় বিশ্বাসী। এদের প্রত্যেকেই মহৎ চিত্র সৃষ্টি করে গেছেন। জীগা ভার্তবের Enthusiasm সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিখ্যাত চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন বলেছেন– `Never had I known that these mechanical sounds could be arranged to seem so beautiful. I regard it as one of the most exhilarating symphonies I have heard.’ দ্বিতীয় অধ্যায় হলো সমাজতান্ত্রিক গঠনের অধ্যায়। সারাদেশ তখন গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত। দেশের তরুণরা তখন রাশিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, নতুন নতুন কল কারখানা, বাঁধ ও শহর তৈরির কাজে। তাই, প্রথম অধ্যায়ের ছবিগুলোতে যেমন বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিষয়বস্তু সবচেয়ে বেশি তেমনি, দ্বিতীয় অধ্যায়ের ছবিগুলোতে এই গঠনমূলক কাজের বিষয়বস্তুগুলো প্রাধান্য পেলো। এ অধ্যায়ের ছবিগুলোর আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চূড়ান্ত বাস্তবতা। `Counter Plan` `The Road to life`, `Golden Hills’, `Alone’ সেলুলয়েডে ধরে রাখা কয়েকটি বাস্তব জীবন দলিল। সার্জ্জি জেরাসীমভের “We are from Kronsdat”, ভ্যাসিলি ব্রাদার্স এর “Chapayev”, মার্ক ডনস্কয়ের “Gorï trilogy”, ভ্লাদিমির প্যাট্রভের “The storm”, মিখাইল বুমের “The dream”, ইয়ুদি রাজিমেন ও আইওনিফ হাইফিটের “Baltic Deputy”, ছবিগুলোতে বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের সমতা রক্ষা করা হয়েছে অতি সুন্দরভাবে। এতে বাস্তবতার আবেদন আরো বেড়েছে। মাঝে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সোভিয়েত সিনেমা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সোভিয়েত শিল্পী ও কলাকুশলীরা তখন স্টুডিওর চত্বর ছেড়ে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্যে সীমান্তে ছুটে যান। ক্যামেরা ছেড়ে রাইফেল তুলে নেন হাতে। তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম দিকের বছরগুলো হচ্ছে যুদ্ধোত্তর পূনর্গঠনের দিন। ফ্যাসিস্ট বর্বরতার ফলে সোভিয়েত সমজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী অঞ্চল তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের বীভৎসতা প্রতিটি নাগরিকের মনে যুদ্ধের প্রতি ঘৃণার জন্ম দিয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সমাজতন্ত্রের শক্তির প্রতি তাদের প্রত্যয় ও বিশ্বাসকে আরো সুদৃঢ় করেছে। এই পারিপার্শ্বিক ও মানসিক অবস্থার মধ্যে সোভিয়েত সিনেমা নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলো। আর যুদ্ধ নয়। আর ধ্বংস নয়। “Maû artists are today turing to the subject of the last war. That is quite understandable. We cannot forget toe war, just as we can’t stop thinking that the next one will be far more terrible……” Mikhail Romm Soviet film Director. “A war brings people together in irreconcilable conflicts, compels them to consider anwe the meaning of their life, of their relations with others. Their conceptions of the world is shattered rudely……my films are all connected with war to on degree or another.” Igor Talankin Soviet Film Director. যুদ্ধের ধ্বংসলীলা, ফ্যাসিজমের বর্বরতা, সমাজতান্ত্রিক মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্যে শত শত তরুণের জীবন বিসর্জ্জন, যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে বিপর্যয় এবং সেই বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করে নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলা–উপরোক্ত বিষয়বস্তু নিয়ে একের পর এক ছবি তৈরি হতে লাগলো। “The cranes are fliing”, “The house I live in”, A ManÕs Destiû”, “Ballad of a soldier”, “Ivan’s Childhood”, “Story of the flaming years”, “Ordinary Fascism.” প্রত্যেকটি ছবি বিষয়বস্তুর উপস্থাপনায়, সম্পাদনার ব্যঞ্জনায়, ক্যামেরার গীতিধর্মী গতিময়তায়, শিল্পীর নিপুন অভিব্যক্তিতে এবং সিনেমার সর্বাধুনিক কুশলতার প্রয়োগে এক অপূর্ব রসের সৃষ্টি করেছে। যে রস দর্শকের অন্তরের অন্তঃস্থলে এক দীর্ঘস্থায়ী আবেদনের সৃষ্টি করে। যখন দর্শক স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে- “Those remarkable works of the cinema art ÒBallad of a soldierÓ, and ÒThe cranes are flyingÓ— strengthens still more my deep faith on Socialism, in its genuinely inexhaustible possibilities for creativity.” -Dean Reed, Famous American Actor and Singer ‘An amaying film called Òordinary Fascism’ is on at the Urainai Cinema in Viena. A must for every democrat, it is a film that enables us to understand why bombs explode- whether in the centre of viena or in North Vietnam.’ -‘Volksstimme’, Austria, September, ৩, ১৯৬৬ শুধু যে যুদ্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে ছবি তৈরি হচ্ছে না নয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক “(“The two”, ‘The journalist’, ‘I am twenty’, ‘A long and happy life’, ‘Clear skies’, ‘The Communists’) খ্যাতনামা দেশি বিদেশি লেখকের চিরন্তন সাহিত্য কীর্তি। (‘Hamlet’, ‘War and Peace’, ‘The lady with the dog’, ‘Anna Krennina’) প্রভৃতি বিষয় নিয়েও সার্থক ছবি তৈরি হচ্ছে। সোভিয়েত চিত্র পরিচালক গ্রিগরী কোজিনৎস্তব তাঁর Hamlet ছবিতে শেক্সপিয়ারকে নবজন্ম দিয়েছেন। এখানে হ্যামলেট নিপীড়িত মানবাত্মার প্রতীক। এখানে হ্যামলেট চিরন্তন সত্যের প্রতীক। সার্জ্জি বন্দুরাকের War and Peace সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ফরাসি পত্রিকা Le Figaro লিখেছে- ‘Go to see `War and Peace’; it is, of course, one of the most splendid works of art, one of the most thrilling and memorable films ever made.’ (Le Figaro, Nov, 26-27, 1966, Louis Chamvet) সোভিয়েত সিনেমা সম্পর্কে কিছু দর্শক ও সমালোচকের কাছ থেকে অনুযোগ শোনা যায় যে- সোভিয়েত ছায়াছবিগুলো নাকি প্রচারধর্মী হয় এবং এতে বড় বেশি বক্তৃতাবাজী থাকে। বাইরে থেকে দেখতে গেলে তা মনে হওয়া স্বাভাবিক। সোভিয়েত সিনেমাকে বুঝতে হলে, সোভিয়েত সিনেমার রস পরিপূর্ণভাবে আস্বাদন করতে হলে সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থা, সমাজতান্ত্রিক সমাজে মানুষের ধ্যানধারণা, ব্যক্তি ও সমষ্টির সম্পর্ক, সেখানকার মানুষের বিভিন্ন মানসিকতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। উপনেবেশিক, আধাউপনেবেশিক, সামন্ততান্ত্রিক, আধাসামন্ততান্ত্রিক অর্থবা বুর্জোয়া সমাজে বাস করে সমাজতান্ত্রিক সমাজের মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন সম্ভবপর নয়। আমরা ছবি তৈরি করি মুনাফার জন্য। আমরা ছবি দেখি চিত্ত বিনোদনের প্রয়োজনে। সোভিয়েত পরিচালক ছবি বানান জীবনের অন্তরঙ্গ রূপকে সেলুলয়েডে ধরে রাখার অভিপ্রায়ে। সে জীবন James Bond মার্কা “০০৭” নয়। সে জীবন যৌবনা নারীর বিকার নয়- “Darling”, সে জীবন সামাজিক কলুষতায় বিধ্বস্ত নয়- “Apartment”. সে জীবন “সবার উপরে মানুষ সত্য” এই নীতিতে বিশ্বাসী। মানুষের কল্যাণ, মানবজাতির কল্যাণ হচ্ছে এই সদা সচেতন মানুষগুলোর সৃষ্টির লক্ষ্যে- …..‘We tell the world that man is born for happiness and that it is the striving for goodness, justice and creative labour that must triumph in society, not base instincts. We tell the world that man has no right to wrap himself up in a concoon of personal interests and concerns, but must realise his responsibility for everything that happens around him.’ -Lev Kulijanov President of the Union of Film makers of the U.S.S.R. q

 

 

 


বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ ব্যালাড অব সোলজার/Ballad of a Soldier

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। রেড আর্মির এক সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্রে। এদিকে শত্রুপক্ষ ধেয়ে আসছে তার দিকে। বয়সে নবীন। বুঝতে পারছে না কী করবে। এমন সময় কাছাকাছি এসে পড়ে বিরোধী শিবিরের ট্যাংক। ভয়ে দৌড়ে একটি বাংকারে ঢুকে যায়। সেখান থেকে সাহস করে একটি ট্যাংককে ধ্বংস করে। এরপর সে তাঁবুতে ফিরে এলে বাহিনীপ্রধান তাকে ডেকে পাঠান। ভয় পেয়ে যায়। ভেবেছিল যুদ্ধক্ষেত্রে স্থান পরিবর্তন করার জন্য তাকে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল প্রধান তাকে ট্যাংক ধ্বংস করার জন্য সম্মান জানান। উনিশ বছর বয়সী নবীন সেনার মন পড়ে আছে বাড়িতে মায়ের কাছে। সে সম্মানের বদলে বাড়িতে মাকে দেখতে যাওয়ার ছুটির আবেদন জানায়। এরপর ছুটে চলে বাড়ির দিকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৫৯সালে তৈরি এই সোভিয়েত ছবির বিষয়বস্তু কিন্তু একেবারেই যুদ্ধ নয়। যুদ্ধের সাথে মিশে আছে তরুণ জুটির ভালোবাসা, বিবাহিত জুটির ভালোবাসা, মা-ছেলের ভালোবাসা। যুদ্ধের ক্যানভাসে অসাধারণ ভালোবাসার সব গল্প বললেন পরিচালক গ্রিগরি চুখরাই। এই চমৎকার ছবিটির নাম ব্যালাড অব সোলজার/ Ballad of a Soldier ছবিতে আলিওশা ও শুরা চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভ্লাদিমির ইভাশভঝানা প্রখোরেঙ্কো।

চলচ্চিত্রটি দেখতে ক্লিক করুন এই লিংকেঃ https://www.youtube.com/watch?v=H2ZFe7XGwt8

সিপিআই(মাওবাদী) ‘পদ্মাবতী’ সিনেমাকে সমর্থন করেছে

1387

সিপিআই(মাওবাদী) পার্টি বলছে, ‘পদ্মাবতী’ সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফি ব্লক করার মানে প্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা এবং জনগণের মতামত প্রকাশ করার সব প্রচেষ্টা রোধ করার একটি উপায়।

রাজপুত রাণী ‘পদ্মাবতী’র জীবন নিয়ে নির্মিত এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে ছত্তিশগড়ের বাস্তার ও দান্তেওয়াদা জেলায় লিফলেট ও পোস্টার লাগিয়েছে মাওবাদীরা, এতে পদ্মাবতী চলচ্চিত্রের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করা হয়।

 মাওবাদী পার্টি দাবি করেছে যে, সরকার অবিলম্বে কোন ধরণের বাধা ছাড়াই ‘পদ্মাবতী’ সিনেমা মুক্তির বিষয়ে সহযোগিতা করবে। দান্তেওয়াদা নকশাল অপারেশনস এএসপি অভিষেক পল্লা মিডিয়াকে জানায়, ‘এই পোস্টারগুলি মাওবাদীদের, সেই হিসেবে রিপোর্ট করা হয়েছে’।

কিছুদিন ধরে রাজপুত সম্প্রদায় এবং তার সাম্প্রদায়িক বাহিনী ‘পদ্মাবতী’ সিনেমা’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছে এবং ছবিটিতে নর্তকী’র ভুমিকায় দীপিকা পাড়ুকোন ও ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালীকেও খুন করতে চেয়েছে। বিজেপি তাদের এই কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে।

ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক অভিব্যক্তি এবং খাদ্যাভ্যাসের উপর সাম্প্রদায়িক হামলার অংশ হিসাবে ‘পদ্মাবতী’ সিনেমা নিয়ে বিতর্কের পর মাওবাদী পার্টি এই ঘোষণাটি দিয়েছে।

সূত্রঃ http://avaninews.com/article.php?page=1387


বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ Sparkling Red Star

Sparkling Red Star/স্পার্কলিং রেড স্টার’ একটি চমৎকার বিপ্লবী সিনেমা। চীনের বিপ্লবী গণযুদ্ধের সময়ে কিভাবে জনগন সেই যুদ্ধের সাথে যুক্ত হচ্ছেন তা এই সিনেমায় দেখানো হয়েছে। পরিবারগুলো কিভাবে নিজেদের সর্বস্ব রেড গার্ডদের দিয়ে দিচ্ছে তা বোঝা যায় এই ছবির কাহিনীতে। চেয়ারম্যান মাও সেতুং প্রদর্শিত চীনের বিপ্লবী যুদ্ধ কিভাবে একইসাথে জনগনকে রক্ষা করেছে তা বোঝা যায়। সর্বোপরি একজন ১০/১২ বছরের শিশু কিভাবে রেডগার্ড হয়ে উঠছে সেই বিষয়টি এখানে খুবই স্পষ্ট হয়েছে। শিশুটির চোখের সামনে তার ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং সেই ঘরে তার মা রয়েছে, তারপরেও সে শক্ত হয়ে থাকে, বিপ্লবী প্রতিজ্ঞায় নিজেকে সজ্জিত করে। বিপ্লবী যুদ্ধে তথা জনগণের যুদ্ধে শিশুরা স্বেচ্ছায় কি ভূমিকা রাখতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে রেড আর্মির ভূমিকা কি থাকে তা এই সিনেমা দেখলে পরিষ্কার হওয়া যায়।


বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ The Young Karl Marx/কার্ল মার্কস

The_Young_Karl_Marx_film_poster

মহান দার্শনিক ‘কার্ল মার্কস’কে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘The Young Karl Marx’/ ‘Der junge Karl Marx’। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করছেন এই বছর অস্কার নমিনেশন পাওয়া হাইতিয়ান চলচ্চিত্রকার রাউল পেক/Raoul Peck। বার্লিনে চিত্রায়িত এই ছবিতে ১৯ শতকের মাঝামাঝিতে কমিউনিজমের সূচনা কাল, ১৮৪৪ সালের দিকে প্যারিসে শিল্প বিপ্লব, র‍্যাডিক্যাল ধারার রাজনীতি, ২৬ বছর বয়সে মার্কসের যৌবন কালে বন্ধু এঙ্গেলস, মার্কসের স্ত্রী জেনি, আর্থ-সামাজিক টানা পোড়েনে বিক্ষুব্ধ জনগণ সহ নানা চরিত্র, সম্পর্ক ও ঘটনা নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে।

সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রটি দেখতে নীচে ক্লিক করুন –


বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ Battle for Sevastopol

battle-for-sevastopol-poster

‘ব্যাটেল ফর সেভাস্তপোল’ মূলত জীবনী ভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত নারী রুশ স্নাইপার ‘লুদমিলা পাবলিচেঙ্কো’র বিপ্লবী জীবন নিয়ে ছবিটি নির্মিত হয়েছে। লুদমিলা, মাত্র ২৪ বছর বয়সে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত রেড আর্মির একজন স্নাইপার সদস্য হিসেবে নাৎসি/জার্মানি’র বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করেছিলেন। এই যুদ্ধে তিনি একাই ৩০৯জন নাৎসি সেনাকে স্নাইপার শটে হত্যা করেন। তাকে বলা হয়, ২য় বিশ্বযুদ্ধের এবং এ যাবতকালের সবচেয়ে ভয়ংকর স্নাইপার এবং ইতিহাসে সবচেয়ে সফল নারী স্নাইপার। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে ছবিটি।