বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ ‘Mother (1926)’ (ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাস অবলম্বনে)

 ‘মা’ রূশ কথাসাহিত্যিক মাক্সিম গোর্কি রচিত এক কালজয়ী উপন্যাস যা ১৯০৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। রুশ ভাষায় লিখিত এই উপন্যাসটি পরবর্তী এক শত বৎসরে সারা বিশ্বের প্রায় সব ভাষায় অনূদিত হয়েছে।  উপন্যাসটি বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের পটভূমিকায় রচিত এবং উপন্যাসের প্রধান দুটি চরিত্র হল প্যাভেল ও তাঁর মা। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থা বিভিন্ন লেখকের অনুদীত মা উপন্যাস প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল ন্যাশনাল বুক এজেন্সিস্‌-এর প্রকাশিত বইটি, যার অনুবাদ করেছেন পুষ্পময়ী বসু। মা উপন্যাসের উপর আজ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র তৈরী হয়েছে। এর মধ্যে ‘Mother (1926)’ উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ।

 

Advertisements

বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ ‘Viva Zapata’

মেক্সিকান বিপ্লবী এমিলিয়ানো জাপাতা (১৮৭৯ - ১৯১৯)

মেক্সিকান বিপ্লবী এমিলিয়ানো জাপাতা (১৮৭৯ – ১৯১৯)

মেক্সিকান বিপ্লবী এমিলিয়ানো জাপাতা, যিনি বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে দুর্নীতিগ্রস্ত, অত্যাচারী একনায়কতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট পোরফিরিরো ডিয়াজ বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্বে দিয়েছেন, তারই জীবন কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত- মার্লোন ব্রান্ডো অভিনীত ও এলিয়া কাজান পরিচালিত এই চলচ্চিত্র।

Poster - Viva Zapata_04


বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ Red Ant Dream

Red-Ant-dream-maoist-film

ভারতের মাওবাদী আন্দোলনের উপর সঞ্জয় কাক’র নির্মিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্র – Mati Ke Laal – Red Ant Dream

তথ্যচিত্রটির সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সঞ্জয় কাক’র সাক্ষাৎকারটি পড়ুন –

‘সব জায়গায়, সব গ্রামে, সাধারণ লোক বহুজাতিকের বিরুদ্ধে রায় দিচ্ছে৷ কয়েক বছর ধরে হাজার অত্যাচারের মধ্যেও আদিবাসীরা বেদান্ত কোম্পানিকে বক্সাইট ও অন্যান্য মিনারেলের জন্যে জায়গা ছাড়েনি৷’ জানালেন তথ্যচিত্র নির্মাতা সঞ্জয় কাক৷ আলাপে সৌমিত্র দস্তিদার

সৌমিত্র দস্তিদার: তোমার নতুন ছবি তো এর মধ্যেই বেশ বিতর্ক তুলেছে, অনেকে বলছে তোমার ‘রেড অ্যান্ট ড্রিম’ আগের দুই ছবি ‘নর্মদা’ ও কাশ্মীর নিয়ে ‘জশন্-এ-আজাদি’-র পরিপূরক৷ বস্ত্তত এ এক ট্রিলজি, ‘নর্মদা’ নিয়ে ক্যামেরায় তোমার যে জার্নির সূচনা, তার বৃত্ত সম্পূর্ণ হল নতুন এই ছবিতে৷ তুমি কী বলো?

সঞ্জয়: আমি ব্যক্তিগত ভাবে ট্রিলজি বা নির্দিষ্ট কোনও গন্তব্যে পৌঁছনো তা বলিনি৷ আসলে পিপলস মুভমেন্ট যেখানে যেখানে হয় তার কারণ অনুসন্ধানই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ৷ সে ক্ষেত্রে তুমি লক্ষ করবে ‘নর্মদা’ মূলত মেধা পাটকরের নেতৃত্বে গান্ধীবাদী আন্দোলন, ‘জশন্-এ-আজাদি’ আবার একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জাতিসত্তার প্রশ্ন নিয়ে সংগ্রামের এক দলিল৷

পাশাপাশি এই ছবিতে দেখো অনেক ক্ষেত্রেই বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে বস্তারের মাওবাদী রাজনীতি৷

এই নতুন ডকুমেন্টরিতে তুমি মাওবাদী রাজনীতি যেমন এনেছ, তেমনই ভগত্‍ সিং ও ওড়িশার নিয়মগিরি মুভমেন্টের কথাও বলেছ৷ সেই সঙ্গে পাঞ্জাবের খালিস্তানি আন্দোলনে শহিদ কবি পাসে’র কবিতাও ব্যবহার করেছ৷ তাঁকে স্মরণও করেছ৷ এই তিন আলাদা আলাদা আপাত পৃথক বিষয়ের মধ্যে যোগসূত্রটা ঠিক কী? তথ্যচিত্রের ফর্মের দিক দিয়েও ভাবনাটা অভিনব একটু কি উত্তরআধুনিক বলা যায়?

কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা আমি বলব না, আমি বিশ্বাসও করি না পোস্ট মডার্ন, সুরিয়ালিস্ট বা আভাগাঁর্দ- এ ভাবে ভাগাভাগিতে৷ আসলে আমি যে বিষয়ে বলতে চাই সেটাকে নানা দিক দিয়ে দেখি৷ তারই প্রতিফলন ঘটে আমার ছবির ফর্মে৷ ‘নর্মদা’ থেকে ‘বস্তার’ এই তিনের মধ্যে যোগসূত্রও থাকছে৷ এক তো আগেই বলেছি পিপলস মুভমেন্ট, দুই হচ্ছে রাষ্ট্র কী ভাবে গণআন্দোলনকে চিরকালই সন্ত্রাসবাদ আখ্যা দিয়ে দমন-পীড়ন চালায়৷ আবার প্রয়োজনে সেই সন্ত্রাসবাদীকেও আইকন হিসেবে রাষ্ট্র ব্যবহার করে৷ ‘ভগত্‍ সিং’ যেমন ব্যক্তি সন্ত্রাসের রাজনীতির বাইরে গিয়ে জেলের ভিতরে হয়ে উঠেছিলেন আদ্যন্ত মার্কসিস্ট৷ ফাঁসির ঠিক আগে জেলের কর্মীরা যখন ওকে ডাকতে আসে তখন তিনি বলেছিলেন একটু অপেক্ষা করতে হবে আমি বইটা শেষ করে যাচ্ছি৷ বইটি ছিল লেনিনের ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’৷ স্বাধীনতার পরে সমস্ত রাজনৈতিক দলই ভগত্‍ সিং-এর জনপ্রিয়তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছে তাঁর দর্শনকে বাদ দিয়ে৷ কবি পাস শহিদ হয়েছিলেন ভগত্‍ সিং-এর ফাঁসির দিনই ২৩ মার্চ, সময়ের ফারাককে বাদ দিলে দু’জনেই কিন্ত্ত আজ গোটা দেশে বিশেষ করে পাঞ্জাবের নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ দেশপ্রেমিক৷ মাওবাদীদের ক্ষেত্রে একটা কথা তো সত্যি, রাষ্ট্রের হাজার অত্যাচারের মধ্যেও বস্তারে বিস্তীর্ণ এলাকায় জনমনে তাদের প্রভাব অনস্বীকার্য৷ যেখানেই স্ক্রিনিং হয় লোকে যখন জানতে চায় যে বস্তার ও কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ কোন পক্ষে?

আমি প্রায়ই বলি, যে যদি কাশ্মীরের আমজনতাকে জিজ্ঞেস করেন ভারতীয় সেনা ও আন্দোলনকারী আপনি কার সমর্থক? দেখবেন ৯০ শতাংশ লোকই মিলিটারির বিরুদ্ধে৷ একই ভাবে বস্তারেও রাষ্ট্র পুলিশ মিলিটারি এস পি ও আর মাওবাদীদের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা হলে লোকের সমর্থন সন্দেহ নেই থাকবে মাওবাদীদের দিকে৷ এই কারণগুলো না খুঁজলে দেশের কোনওদিনই গণতন্ত্র সার্থক হতে পারে না৷

তুমি যখন কাশ্মীরের কথা বলছই তখন জিজ্ঞেস করি, কিছুদিন আগে শ্রীনগরে যে জুবিন মেহতার মিউজিক কনসার্ট হল শান্তির উদ্দেশে তা নিয়েও কিছু কিছু মহলে কথা উঠেছে কলকাতাতেও কবীর সুমন জুবিনের বিরোধিতা করে গান লিখেছেন, বিক্ষোভ হয়েছে কাশ্মীরেও, কিন্ত্ত কেন? গোটা বিষয়ে উদ্দেশ্য নিয়ে তোমার কী মত?
প্রথমেই বলি, আমরা তো কেউ সঙ্গীতের বিরুদ্ধে নই৷ এমনকী কবীর সুমনও যে গান লিখেছে তুমি নিশ্চয় জানো, সেখানেও ব্যক্তি জুবিনকে বিরোধিতা করা হয়নি৷ প্রশ্ন তোলা হয়েছে গান গাইবার সময় জুবিনের একবারও মনে পড়বে যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার কয়েক হাজার নিরীহ কাশ্মীরির কথা? তা ছাড়া, এর পিছনে যে জার্মান কনসাল-এর উদ্যোগ ছিল তিনি এর আগেও আফগানিস্তানে এ রকম কনসার্ট বসিয়েছিলেন৷ আপাত ভাবে এই উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কথাও নয়৷ কিন্ত্ত গোটা রাজ্যে বিশেষ করে শ্রীনগরে কার্ফু জারি করে কনসার্ট বোঝাই যায় এর পিছনে জনসমর্থন ছিল না৷
এক দিনে কোটি কোটি টাকা খরচা হয়েছে৷ শালিমার বাগে অত্যাধুনিক বিদেশি গাড়ির লাইন পড়ে গিয়েছিল৷ মোট বাজেটের বড়ো অংশ নাকি এই গাড়ি স্পনসর করেছিল৷ তাদের উদ্দেশ্য অবশ্যই ভারতের বাজার দখল করা, কিন্ত্ত শান্তি প্রতিষ্ঠা কিনা সে প্রশ্ন আলাদা৷ কাশ্মীরে বলা হয় টেররিস্টরা সঙ্গীতেরও বিরুদ্ধে৷ অথচ এই ‘এহসাস-এ-কাশ্মীর’ যখন জুবিন মেহতা করলেন তাঁর পাল্টা হিসেবে কাশ্মীরের সাধারণ লোক কাছেই একটা পার্কে যে ‘হকিকত-এ-কাশ্মীর’-এর আয়োজন করেছিলেন তাতে কার্ফু উপেক্ষা করে ভিড় উপচে পড়েছে৷ সুতরাং বলা যাবে না সঙ্গীতের বিরুদ্ধে কাশ্মীরের আন্দোলন৷ বরং আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে সঙ্গীত নাটক চলচ্চিত্র উঠে এসেছিল ‘হকিকত-এ-কাশ্মীর’-এ৷

তুমি কী বিশ্বায়নের সংস্কৃতির পাল্টা হিসেবে গণআন্দোলনের এক মাধ্যম হিসেবে সংস্কৃতির বিকল্প পথের উপরেও জোর দিতে চাইছ?

একদম ঠিক, কাশ্মীরের পার্কে গণজমায়েতে যে সংস্কৃতির ধারা সাধারণকে অনুপ্রাণিত করেছিল তা কোনও কর্পোরেট পুঁজির দাক্ষিণ্যে জনপ্রিয়তা পায়নি৷ মানুষের আবেগই উঠে এসেছিল গান কবিতা নাটক সংস্কৃতি নানা মাধ্যমে৷ ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইডের গ্যাস দুর্ঘটনা, আদতে যা গণহত্যা তার প্রতিবাদেও ‘৮৪-র পর থেকে আজ অবধি প্রতি শনিবার কার্বাইড কারখানার কাছের এক পার্কে নিয়মিত এক সাংস্কৃতিক জমায়েত হয়৷ সেখানে দুর্ঘটনায় নিহত শহিদের পরিবারেরা যেমন থাকেন তেমনই দেখা যায় নতুন প্রজন্মের অজস্র তরুণ তরুণীদের৷ ডকুমেন্টরির বিপণনেও মাল্টিপ্লেক্স কালচারের বিপরীতে আমরা গড়ে তুলতে চাই ‘জনতা কি মাল্টিপেক্স’৷ অজস্র গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে জন্ম নিতে পারে এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন৷ এই জনগণের সংস্কৃতি সব সময়ই সব দেশেই শাসকদের ভয়ের কারণ হয়৷ এক দিকে যখন কাশ্মীরে রাষ্ট্র সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে শান্তির আবহ তৈরি করতে চাইছে, অন্য দিকে পুনায় ও অন্যান্য নানা শহরে নব্যহিন্দুত্ববাদীরা আক্রমণ নামিয়ে আনছে কবীর কলা মঞ্চের মতো দলিত গণশিল্পীদের সংগঠনের উপর৷ এ কাজে বি জে পি ও কংগ্রেস কোনও ফারাক নেই৷ আনন্দ পট্টবর্ধনের নতুন ছবি ‘জয় ভীম কমরেড’-এ গান করেছেন কবীর কলা মঞ্চের শিল্পীরা৷ তাদের মাওবাদী সন্দেহে পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে হয়রান করেছে৷ অথচ দলিত তরুণী শীতল শাঠের মতো গায়িকা নিঃসন্দেহে দেশের গৌরব৷

তুমি বস্তারের আন্দোলনটা কী ভাবে দেখছ?

দেখো, আবারও বলব, নর্মদা, বস্তার, ওডিশার বিভিন্ন জায়গা সর্বত্রই ছবিটা এক৷ খনিজ সমৃদ্ধ এলাকাগুলিতে একের পর এক বহুজাতিক পুঁজি হিংস্র থাবা বসাচ্ছে উন্নয়নের নামে৷ আমাদের সরকার দু’হাত তুলে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে৷ তার ফলে বঞ্চিত হচ্ছে বিশাল সংখ্যক আদিবাসী জনজাতির লোকেরা৷ একটা সময় ছিল যখন সব কিছুই তারা ভবিতব্য বলে নীরবে মেনে নিত৷ কয়েক বছরে ধীরে ধীরে ছবিটা পাল্টেছে৷ কৃষক, অসংগঠিত শ্রমিক আদিবাসী পাল্টা প্রতিরোধে নেমেছে৷ বঞ্চনার বিরুদ্ধে নিজেদের জল-জঙ্গল-জমি নিয়ে অধিকারের দাবিতে৷ রাষ্ট্র, পুঁজি বনাম জনগণের এই দ্বন্দ্বে সারা ভারতেই পুঁজির পক্ষ নিচ্ছে৷ সন্ত্রাস নামাচ্ছে নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে৷ বস্তারেও তার ব্যতিক্রম নয়৷ ওখানে এখন আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধপরিস্থিতি৷ গ্রামের পর গ্রাম একদিকে ‘মাওবাদী পিপলস্ গেরিলা লিবারেশন’ আর্মি মার্চ করছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র ক্রমেই নতুন নতুন পথ খুঁজছে দেশের পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক শক্তির উপর আঘাত হানার জন্য৷ এই পরিস্থিতি ক্রমশই আরও জটিল হবে৷ পুঁজি খনিজসমৃদ্ধ এলাকা নিজের অধিকার যত বেশি কায়েম করতে চাইবে ততই সংঘাত তীব্র হবে৷

বস্তারের অবুঝমার-এ মিলিটারি তো নতুন করে ঘাঁটি করবে ঠিক করেছে৷ আকাশপথেও বিমান আক্রমণে প্রস্ত্ততি চলছে৷ এই অবস্থায় তোমার কী মনে হয় দু’এক বছরের মধ্যেই সরকারি ভাবে যুদ্ধ ঘোষণা হবে?

‘৬০-এর দশকে নাগাল্যান্ডের নাগা ‘বিদ্রোহী’দের দমন করার জন্যে গ্রামের পর গ্রাম ভারতীয় বায়ুসেনার বোমায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল৷ সে সব এখন ইতিহাস৷ কত হাজার গ্রামবাসী ওই সময় প্রাণ দিয়েছিলেন৷ তা নিয়ে আজ আর কোনও আলোচনাই হয় না৷ কে জানে বস্তারের ঠিক কী হতে চলেছে? তবে আমার মনে হয় যেহেতু এখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা চলছে বহুজাতিক পুঁজি কিছুটা কোণঠাসা৷ তাই বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি সরকারকে এখনও চরমসীমা দিতে পারেনি যে গোটা এলাকা আদিবাসীশূন্য করে দেওয়ার৷ তাই এখনও সে অর্থে যুদ্ধ ঘোষণা হয়নি কিন্ত্ত বাকিটাই বা কী আছে? দন্তেওয়াড়া, গীদম, বাসাগুডা, গড়চৌলি সব জায়গায় ভারতীয় সেনার রণহুঙ্কার হঠাত্‍ দেখলে ইরান ইরাক আফগানিস্তানকে মনে করিয়ে দেয়৷ সরকারি সন্ত্রাস যত বাড়বে তত মাওবাদী রাজনীতির প্রভাবও বাড়বে৷

অবুঝমার তো প্রাচীন গোণ্ড আদিবাসীদের পবিত্র স্থান৷ স্বাভাবিক ভাবে সেখানে মিলিটারি ঘাঁটি গড়ে উঠলে মাওবাদী নয় এবং সাধারণ আদিবাসীরাও তো বিদ্রোহ করবে৷ তা তো করবেই৷ নিয়মগিরিও তো তাই৷ ওডিশা রায়গোডা বিভিন্ন গ্রামে কয়েক বছর ধরে স্থানীয় গ্রামসহ ভোটাভুটি হচ্ছে ‘উন্নয়নের স্বার্থে’ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিকে জায়গা দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে৷ সব জায়গায়, সব গ্রামে, সাধারণ লোক বহুজাতিকের বিরুদ্ধে রায় দিচ্ছে৷ কয়েক বছর ধরে হাজার অত্যাচারের মধ্যেও আদিবাসীরা বেদান্ত কোম্পানিকে বক্সাইট ও অন্যান্য মিনারেলের জন্যে জায়গা ছাড়েনি৷ এই বিস্তীর্ণ ভারতে ছোটো ছোটো যে গণআন্দোলন তাই কিন্ত্ত আগামী দিনে ভারত রাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে৷ তা সে গান্ধীবাদী পথেই হোক বা মাওবাদী বা অন্যান্য বামপন্থী ধারার নেতৃত্বেই হোক৷ স্বাভাবিক আমি এ ছবিটা করেছি, ছবিটার নাম দিয়েছি ‘রেড অ্যান্ট ড্রিম’৷ এই ছোটো আপাত গুরুত্বহীন লাল স্বপ্ন যত তুচ্ছই হোক, ইতিমধ্যেই তা সরকারি মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে৷ কাশ্মীর, মধ্যভারত ও উত্তরপূর্ব ভারতে সন্ত্রাস দিয়ে কখনওই তা দমন করা যায় না৷ এক জায়গায় যদি আগুন নিভে যায় অন্য জায়গায় তা জ্বলে ওঠে৷ এই ভারতকে নতুন করে আমাদের আবিষ্কার করতে হবে৷ খুঁজতে হবে মানুষের মধ্যে অপরিসীম শক্তিকে যা শাসকদের দম্ভ কখনওই থামিয়ে দিতে পারে না৷ আমার ছবিতে বা আমাদের ছবিতে বারে বারে এই ভারতই উঠে আসে৷

কয়েক বছর আগেও ডকুমেন্টারি গোটা দেশে এত পরিচিত ছিল না৷ এখন আজমগড়, ভাতিন্দা, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, রাজস্থান বিভিন্ন জায়গায় ছোটো ছোটো শহরে ডকুমেন্টারি এক বিকল্প বিপণনের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে৷ সাধারণ লোক জানতে চাইছে এ দেশের আসল পরিস্থিতি কী? গ্রামের দেহাতি মানুষও পকেটের পয়সা খরচা করে কিনে নিয়ে যাচ্ছে বিকল্প তথ্যচিত্রের ডিভিডি৷ আন্দোলন ও আন্দোলনের ছবি একে অন্যের পরিপূরক৷ আন্দোলন যত বাড়বে ডকুমেন্টারিও এ দেশে তত গুরুত্বপূর্ণ হবে৷

 


বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ ‘The Battle of Stalingrad’

একটি বিখ্যাত যুদ্ধ নিয়ে এই চলচ্চিত্র, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনারা জার্মান নাৎসি সেনাদের উপর কঠিন আঘাত হানে।  ১০ লক্ষেরও বেশি রেড আর্মি সৈন্য ও ১০ হাজার সোভিয়েত নাগরিক এই যুদ্ধে প্রাণ হারায়। ১৯৪৫ সালে, ২য় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির পরাজয়ে নেতৃস্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সোভিয়েতদের এই বিজয়।

hqdefault


বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ ‘The Green Guerillas / সবুজ গেরিলা’

বিপ্লবী চলচ্চিত্র ‘The Green Guerillas / সবুজ গেরিলা’ হচ্ছে ১৯৯৬ সালে রড প্রোসসের কর্তৃক রচিত ও পরিচালিত চলচ্চিত্র।  এতে ফিলিপাইনের মিন্দানাও অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত সুরক্ষায় নিউ পিপলস আর্মি’র প্রচারণার পদক্ষেপ উল্লেখ করা হয়েছে।  এখানে কমরেড কা পাকিং (বর্তমানে বিপ্লবী শহীদ), পরিবেশ ইস্যু এবং গণযুদ্ধে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিয়ে বিপ্লবী আন্দোলনের নীতি সম্পর্কে কথা বলেন।

green-guerillas


মানিক ও গৌতম ঘোষের পদ্মা নদীর মাঝি

mamun653_16725170675031f7d4e86587.45357345.jpg_xlarge

মানিক ও গৌতম ঘোষের পদ্মা নদীর মাঝি

(মে, ’৯৩)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসটি লিখেছিলেন ১৯৩৬ সালে তার বয়স যখন ২৮। তখনও মানিক মার্কসবাদ দ্বারা প্রভাবিত হননি। ১৯৩৮ সাল থেকেই মার্কসবাদের সাথে তার পরিচয়ের পালা শুরু হয়, ১৯৪৪-এ তিনি তৎকালীন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন এবং আমৃত্যু [মৃত্যু ১৯৬৬ সাল] তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। মার্কসবাদ গ্রহণের পর মানিক তার পূর্ববর্তী সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে লিখেছিলেন “মার্কসবাদ যেটুকু বুঝেছি তাতেই আমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছে যে আমার দৃষ্টিতে কত মিথ্যা, বিভ্রান্তি আর আবর্জনা আমি আমদানী করেছি- জীবন ও সাহিত্যকে একান্ত নিষ্ঠার সাথে ভালবেসেও, জীবন ও সাহিত্যকে এগিয়ে দেবার উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও।” মানিকের এই বিশ্লেষণ তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় উপন্যাস পদ্মা নদীর মাঝির ক্ষেত্রে সম্ভবত অনেকটাই সত্য।
উপন্যাসের শুরু পদ্মা নদীর মাঝিদের জীবন নিয়ে। কুবের গনেশ এরা হচ্ছে মাঝি, গ্রামের সর্বহারা-আধাসর্বহারা, উপন্যাসের ভাষায়, “গরীবের মধ্যে গরীব, ছোটলোকের মধ্যে ছোট লোক”। সাধারণ মালিক-জেলে ধনঞ্জয় থেকে শুরু করে জমিদারের নায়েব, চালান বাবু, জমিদার, নদীর মালিক সকলেই এদের ঠকায় বা শোষণ করে। তাদের ধরা মাছ পণ্য হয়ে কলকাতায় যায়, বাবুদের রসনা তৃপ্ত করে, ব্যবসায়ীদের মুনাফার যোগান দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও, শ্রমজীবী এইসব মানুষের জীবন নিষ্প্রাণ, গতিহীন, বৈচিত্রহীন নয়। সীমাহীন দারিদ্র, এর থেকে উদ্ভূত অসহায়ত্ব, ছোটখাট মোটা ধরণের অসততা, ক্ষুদে স্বার্থের রেষারেষি- এই সব কিছুর মধ্য দিয়েও উঁকি দেয় কঠোর জীবন সংগ্রাম, অনমনীয় সাহস, শ্রেণী মমত্ববোধ, শ্রেণী সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, ধর্মের নোংরা সংকীর্ণতাকে ছিন্ন করে শ্রেণীগত উদারতা ইত্যাদি। এই জীবনের মাঝেই রয়েছে নর-নারীর প্রেম, সন্তানের প্রতি ভালবাসা, ক্ষুদে ক্ষুদে আকাংখা-চাহিদা-আনন্দ, উৎসব, রথযাত্রা, মেলা, রং খেলা, সবকিছু। মানিক অসাধারণ প্রতিভার সাথেই শ্রমজীবী মানুষের এই জীবন চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি এখানে সফল এবং সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম।
উপন্যাসের প্রথম পর্বেই প্রবেশ করে হোসেন মিঞা ও তার ময়নাদ্বীপ। পদ্মা নদীর মাঝিদের জীবন উপন্যাসে যতটা বাস্তব ও স্পষ্ট, হোসেন মিঞা ও তার ময়নাদ্বীপ ঠিক সেই পরিমাণেই রহস্য, হেঁয়ালী ও কল্পনা, বলা যায় ইউটোপিয়া। এই অংশটাই উপন্যাসের প্রধান অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও দুর্বল দিক।
হোসেন মিঞা রহস্যময় পুরুষ। পথের কাঙ্গাল থেকে সে বিত্তশালীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তার আভিজাত্যের প্রকাশ নেই। গরীব মাঝিদের সাথে সে নিঃসঙ্কোচে মিলেমিশে যায়, মাঝিরা না জানলেও কুবের ক্রমান্বয়ে জানতে পারে, হোসেন মিঞার বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে, রয়েছে আফিমের কারবার। এই-ই তার সম্পদের উৎস। পরিস্কারভাবে না হলেও বোঝা যায় হোসেন মিঞা সম্ভবত উঠতি বুর্জোয়া- মেজকর্তার মত সামন্ত নয়। কিন্তু এহেন হোসেন মিঞা- সে সাহসী, কুশলী, বুদ্ধিমান, প্রয়োজনে নিমর্ম এবং কাঙ্গাল থেকে আমীর- মাঝিদের সাথে অবাধে মেশে, বিনাসুদে ঋণ দেয়, বিপদে সাহায্য করে; কিন্তু কেন করে তা স্পষ্ট নয়। মানিক দেখাচ্ছেন, হোসেন মিঞার স্বপ্ন- ময়নাদ্বীপে বসতি গড়ে তোলা এবং এখানেও তার মুনাফার স্বার্থ নেই। তাহলে এই সমস্ত প্রশ্নে সে কি শ্রেণীস্বার্থ বর্জিত?
এখানেই উপন্যাসের অসম্পূর্ণতা, বিভ্রান্তি ও সামঞ্জস্যহীনতা। আর এর ফলে সম্পূর্ণ উপন্যাস মূলত শ্রেণীসংগ্রাম থেকে সরে গেছে। মাঝিদের জীবন চিত্রিত করার ক্ষেত্রে যদিও ছিটেফোটা শ্রেণী শোষণ মাঝেমধ্যে ঝলক দিয়ে ওঠে কিন্তু শ্রেণী শোষণ বা শ্রেণী সংগ্রামের নির্ধারক ভূমিকাটা কোথাও জীবন্ত হয়ে দেখা দেয় না। রাসু সর্বস্বান্ত হয়ে ময়নাদ্বীপে যায়। কিন্তু কেন সর্বস্বান্ত হয়? সে ময়নাদ্বীপ থেকে ফেরার পথে পরিবার-পরিজন সকলকে হারায়। কেন, কি জন্য হারায়? আমিনুদ্দিন কেন সর্বস্বান্ত হয় ? কুবের কেন ময়নাদ্বীপে যেতে বাধ্য হয়? আমিনুদ্দিন যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সকলকে হারিয়ে, কুবের ময়নাদ্বীপে যায় তার স্বশ্রেণী- রাসুর চক্রান্তের কারণে। বাস্তবে এমন হয় এবং হতেও পারে। কিন্তু এটা ঘটনার বাইরের আবরণ মাত্র। ঘটনার মূল কারণ সমাজের শ্রেণী শোষণ ও শ্রেণী সংগ্রাম। মানিক এই আবরণ ভেদ করে ভিতরে ঢুকতে পারেননি, সারবস্তুকে টেনে বের করে মেলে ধরতে পারেননি। ফলে রাসু, আমিনুদ্দিন ও কুবের হয়ে পড়ে পরিস্থিতির অসহায় ও নিষ্ক্রিয় শিকার, আর নায়ক মূলত হয়ে দাঁড়ায় নব্যধনী, চতুর, প্রতিভাবান হোসেন মিঞা। ১৯৩০-এর দশকে, যখন ইতিমধ্যে রুশ বিপ্লব হয়ে গেছে, তার উত্তাপে ঔপনিবেশিক ভারত ও বিশ্বের দেশে দেশে মার্কসবাদ ও কমিউনিষ্ট আন্দোলন প্রসার লাভ করেছে, তখন কি এটা আর সম্ভব ছিল ? অথবা এটা কি প্রগতিশীল? না এটা তা নয়। সম্ভবত উপন্যাসের এই সীমাবদ্ধতা ও ত্র“টির কারণেই মধ্যবিত্ত ও বুর্জোয়া শিক্ষিত পাঠক সম্প্রদায় মানিকের অন্যান্য আরো উল্লেখযোগ্য প্রতিভাদীপ্ত সৃষ্টির চেয়ে এটিকে এত বেশি উপরে তুলে ধরে এবং হোসেন মিঞা তাদের কাছে হয়ে দাঁড়ায় এক অসাধারণ সৃষ্টি।
উপন্যাসের রোমান্টিক দিক হচ্ছে কপিলা-কুবের প্রেম। এভাবে বাস্তবতা, রোমান্টিকতা, ও কাল্পনিকতার [ইউটোপিয়া] মিশ্রণে মানিক উপন্যাসটি সৃষ্টি করেছেন।
উপন্যাসের উল্লেখিত ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানিকের আপেক্ষিক অগ্রসরতাও সহজেই ধরা পড়ে। যেমন- স্বামীর প্রভুত্বের বন্ধন ত্যাগ করে কপিলা কুবেরের সাথে চলে গেল। যেখানে মানিক সামন্ততান্ত্রিক প্রথাকে আঘাত করেছেন, এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। শরৎচন্দ্র এ প্রশ্নে ব্যর্থ। কপিলা-কুবেরের প্রেমটাই অগ্রসরতা। কপিলা চরিত্রই অগ্রসর, মানিকের অগ্রসর সৃষ্টি।
“ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্র পল্লীতে। এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না”- এটাও মানিকের অগ্রসর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। হোসেন মিঞা বলছে, “মুসলমানে মসজিদ দিলি হিন্দু দিব ঠাকুর ঘর- না মিঞা আমার দ্বীপের মদ্যি ও কাম চলব না।” – এখানে হোসেন মিঞার মধ্য দিয়ে অগ্রসর মধ্যবিত্ত মানিকই উঁকি দিচ্ছেন।
যাই হোক মানিকের এই পদ্মা নদীর মাঝিকেই চলচ্চিত্রায়িত করেছেন পশ্চিম বাংলার গৌতম ঘোষ। ১৯৩৬-এ মানিক যা লিখেছিলেন ১৯৯২-তে ৫৬ বছর পর তিনি তার চলচ্চিত্রায়ন করেছেন। এতদিনে পৃথিবী অনেক এগিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কে বেশি এগিয়ে ? মানিক না গৌতম ?
মানিক এঁকেছিলেন পদ্মা নদীর মাঝিদের জীবন চিত্র। পদ্মা নদী ও তার মাঝি- এ দু’টোর মধ্যে মাঝি তথা মানুষ প্রধান, অথচ গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্রে পদ্মা নদী তথা প্রকৃতি অনেক জায়গাতেই এত সামনে চলে এসেছে যে মানুষ আড়াল হয়ে যায়। এভাবে গৌতম মানিক থেকেও দু’কদম পিছে হটেছেন।
হোসেন মিঞার চরিত্রের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এমনই। এ প্রশ্নে মানিকেরও সমস্যা রয়েছে। যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। কিন্তু তবুও মানিক হোসেন মিঞাকে ঘিরে কুবেরের আশঙ্কা-সন্দেহ-অবিশ্বাসকে তুলে ধরেছেন বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু গৌতম চলচ্চিত্রে তা করেননি। যেমন সর্বশেষ কুবেরের সংলাপ, “হোসেন মিঞা দ্বীপে আমারে নিবই কপিলা। একবার জেল খাইটা পার পামু না। ফিরা আবার জেল খাটাইব।”- এই তীক্ষ্ণ সংলাপটা, যা কুবেরের ভিতরের ঘৃণাকে প্রকাশ করছে, তা বাদ দিয়েছেন গৌতম ঘোষ। “দৈনিক আজকের কাগজ”-এর সাথে সাক্ষাতকারে গৌতম বলেছেন, “এই হোসেন মিঞারাই স্বপ্ন দেখায় সমাজকে। যে স্বপ্নের ফলাফল সে নিজে দেখে যেতে পারে না, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম সে স্বপ্নের ফলাফল পায়।” কিন্তু মানিকের কুবের কি বলছে ? এখানেই মানিক আর গৌতমের পার্থক্য। মানিকের উপন্যাসে মোটেই এটা এত স্পষ্টতায় নেই। মানিক বরং বিভ্রান্ত। পদ্মা নদীর মাঝিদের জীবন-বঞ্চনা-দারিদ্র-প্রাণচাঞ্চল্য-শক্তিসামর্থ্য সবকিছু তিনি দেখেছেন। আবার তাদের জীবন যন্ত্রণার পরিণতিও তিনি দেখেছেন। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত কারণ কি এবং তারপর কি- তা তিনি উদঘাটন করতে পারেন নি। ফলে তিনি হোসেন মিঞা ও ময়নাদ্বীপের অবতারণা করে বাস্তবতার খেই হারিয়েছেন। কিন্তু হোসেন মিঞা স্বপ্ন দেখায়- এ চিত্র তার উপন্যাসে নেই। কুবের রাসু আমিনুদ্দিন কারও কাছে ময়নাদ্বীপ স্বপ্ন নয়, বরং চরম পরিস্থিতিতে তারা হোসেন মিঞার খপ্পরে পতিত হয়। আবার এটাকে স্পষ্টভাবে চিত্রিত করতে মানিক ব্যর্থ। তিনি প্রকৃত পক্ষে নিজেই দিশাহীন। এখানেই মানিকের বিভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতা। অথচ গৌতম ৫৬ বছরের আগের মানিকের চেয়ে পিছিয়ে বলেছেন, “হোসেন মিঞারা স্বপ্ন দেখায়।” তার চলচ্চিত্রে তিনি এভাবেই হোসেন মিঞাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এটা পুরোপুরি প্রতিক্রিয়াশীল। মানিক তার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে প্রগতিশীল ও মার্কসবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু গৌতম ঘোষ সেটা পারবেন তা এখনো মনে হবার যুক্তি নেই। ভারতের বড় বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর সহচর পশ্চিম বাংলার বুর্জোয়া সংশোধনবাদী জ্যোতিবসু সরকার যে গৌতম ঘোষদের সংস্কৃতি নির্মাণের জন্য টাকা সাহায্য কেন করে তা এ থেকে সহজে বোধগম্য।
সর্বোপরি, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ চলচ্চিত্র হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের জন্য। আর এ জন্য দরকার কাহিনীর ধারাবাহিকতা, কাহিনীর কিছুটা সহজ সরল উপস্থাপন। উপন্যাসকে চলচ্চিত্র করার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। কারণ উপন্যাসে অনেক কিছু বর্ণনা করে দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রে তা দেখাতে হয়। ফলে পরিচালককে কাটছাট, সংযোজন-বিয়োজন করতে হয়, মূল বিষয়কে ঠিক রেখে। গৌতম ঘোষও তা যথেষ্টই করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘটনা থেকে ঘটনা তিনি হাজির করেছেন বেশ খাপছাড়াভাবে। ফলে উপন্যাস পড়েনি বা মনে রাখেনি এমন দর্শকের পক্ষে, সাধারণ দর্শকের কথা বাদ দিলেও, ছবিটা ভালভাবে বুঝে ওঠা কষ্টকর। সাধারণ দর্শকদের এই চলচ্চিত্রটি যে টানতে ব্যর্থ হয়েছে- এটিই এর অন্যতম একটি কারণ। আর গৌতম ঘোষ সংযোজন-বিয়োজন করেছেন তার প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। ফলে কুবের-কপিলা প্রেম, হোসেন মিঞার তথাকথিত স্বপ্ন দেখানো বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি যত সামনে এসেছে, মাঝিদের জীবন সংঘাত সেই তুলনায় পিছিয়ে গেছে।
কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও বলতে হবে এই চলচ্চিত্র এদেশের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত শিক্ষিত দর্শককুলের জন্য নতুন স্বাদ বয়ে এনেছে। ঢাকার চলচ্চিত্রের যে নীচুমান তার তুলনায় এর অনেক অনেক উঁচু শিল্পমানকে কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না। সংযত উপস্থাপনা, সুন্দর ক্যামেরার কাজ, অভিনয় সৌকর্য- এসমস্ত ক্ষেত্রে পরিচালক গৌতম ঘোষ শিক্ষিত দর্শককুলের প্রশংসা কুড়াতে অবশ্যই সক্ষম হবেন।
কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। অন্ধকার দেখাতে গিয়ে পরিচালক এমন অন্ধকার অনেক সময় করে ফেলেছেন যে পর্দায় কি হচ্ছে বুঝতেই কষ্ট হয়। এক্ষেত্রে বাস্তবতা দেখাতে গিয়ে দর্শকদের কথা মনে রাখা হয়নি। এটা দুর্বল টেকনিকেরও পরিচয়। সাউণ্ড অর্থাৎ শব্দেও বেশ সমস্যা রয়েছে। এর ফলে স্বচ্ছন্দে চলচ্চিত্র উপভোগ ব্যাহত হয় এবং চোখ ও কানে কষ্ট হয়। ছবিটিতে কোন কোন চরিত্রের উপস্থাপনও প্রায় অস্পষ্ট, যেমন যুগল চরিত্র।
শেষ কথা হলো, আমাদের দেশে আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, শহিদুল হক খান থেকে শুরু করে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী ও সমালোচকরা গৌতম ঘোষের “পদ্মা নদীর মাঝি”র উদ্বাহু প্রশংসাই করেছেন। এর বাইরে এরা কিছু পাননি। এটা এদের দৈন্যদশাকেই আর একদফা তুলে ধরে। এদের কাছে পাশ্চাত্য বা ভারতের যা কিছু বড় তাই-ই মহান, সর্বাংশে মহান। এরা বড়’র পূজারী, ব্যক্তিত্বের পূজারী।
তাই ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে এদেরকে ধিক্কার না দিলে আলোচনাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

সূত্রঃ সংস্কৃতি বিষয়ক, আন্দোলন সিরিজ ৩, আন্দোলন প্রকাশনা


বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ ‘হাজার চুরাশির মা/Hazaar Chaurasi Ki Maa’

bollywood-films-based-on-novels-16

বিপ্লবী চারু মজুমদারের ইশতেহারের ডাকে নকশালবাড়ি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ। কলকাতায় তখন সময়টা সত্তরের দশক।  নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর বই ‘হাজার চুরাশির মা’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা।  কাহিনীটি সুজাতার, যিনি ব্রতী অর্থাৎ মর্গের ১০৮৪ নং মৃতদেহটির মা।

অন্যান্য অনেক তরুণের মত কলেজপড়ুয়া ব্রতিও গিয়েছিল নকশাল আন্দোলনে।  কিন্তু বাড়িতে খবর এলো, সে ফিরেছে লাশ হয়ে।  ব্রতীর নকশাল রাজনৈতিক মতবাদ ও ক্রিয়াকলাপের জন্য তাকে নির্দয় ভাবে হত্যা করেছিল কংগ্রেস সরকার।  লেখাপড়ায় ভাল, আদরের সন্তান ব্রতী নয় বরং হাজার চুরাশি নাম্বার লাশের দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা হয় তার মা, সুজাতাকে।

নকশালবাড়ি আন্দোলনে ছেলে হারানো এক মায়ের মর্মস্পর্শী এই গল্প লিখেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী, তার ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসে।  সেই গল্প থেকেই ভারতে ১৯৯৮ সালে নির্মিত হয় ‘হাজার চৌরাসি কা মা’।  কলকাতায় ষাট থেকে আশির দশকের মধ্যে বামপন্থী নকশালদের আন্দোলনে পুলিশি অত্যাচার এবং গুলিবর্ষণে নিহত হয়েছিল এরকম অসংখ্য তরুণ।  গুমোট এই পরিস্থিতির বেদনাবহুল প্রেক্ষাপট পরিষ্কারভাবেই ধরা পড়েছিল জয়া বচ্চনের অভিনীত সুজাতা চ্যাটার্জি চরিত্রটিতে।

আমরা এই মাকে ব্লতীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তার ছেলের স্মৃতিচারণ করতে দেখি ও তার মাধ্যমে বাংলার যুবাদের সেই রক্তাক্ত বিপ্লবী নকশাল আন্দোলনের সাথে পরোক্ষ ভাবে জড়িয়ে পড়া মানুষগুলির মুখ খুব কাছ থেকে দেখতে পাই।