আজীবন মাওবাদী কমিউনিষ্ট বিপ্লবী কমরেড হামিদুজ্জামান বাঘা

োোো

২০১৪ সালের ২৯শে এপ্রিল রাত ৯টায় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রাক্তন কৃষিবিদ মুক্তিযোদ্ধা প্রবীণ বিপ্লবী, মাওবাদী নেতা হামিদুজ্জামান বাঘা আকস্মিক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে ২০০৯ সালে ব্রেন স্ট্রোক থেকে প্যারালাইজড হয়ে নিজ বাড়ীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকাকালীন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর পরই হামিদুজ্জামান বাঘার জীবন রক্ষা ও মুক্তি কমিটি গঠিত হয় এবং তার মুক্তির দাবীতে আন্দোলন গড়ে তোলে। এই কমিটি সভা-সমাবেশ, লিফলেট, ব্যানারসহ বিভিন্ন উপায়ে প্রচারনা চালায়। দেশের বিশিষ্ট বাম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ- টিপু বিশ্বাস, ফয়জুল হাকিম লালা, সাইফুল হক, মোশরেফা মিশু, জোনায়েদ সাকী সহ অনেকেই কমরেড বাঘার নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে বিবৃতি দিয়েছিলেন। নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা পোষ্টার করেছিল। অন্যদিকে প্যরালাইজড রোগী হিসেবে বিশেষ বিবেচনায় জামিনের চেষ্টা করা হয়। এমনকি জেল কর্তৃপক্ষ গুরুতর অসুস্থতার কারণে হামিদুজ্জামানকে জেলে আনফিট হিসেবে একাধিকবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও সরকার তাকে জামিন বা মুক্তি দেয়নি। সর্বোপরি রাজশাহী জেল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পিজি হাসপাতালে প্রেরণ করলেও তাকে পিজিতে চিকিৎসা না করেই পুনরায় রাজশাহীতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। অথচ এই দেশে বড় বড় দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতা-আমলারা কোর্টে হাজির না থেকেও আগাম জামিন নিয়ে থাকে। এভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চাটমোহর থানা পুলিশের এস.আই মাইনুদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল লোক দেখানো “গার্ড অব অনার” প্রদান করেছিল। হামিদুজ্জামান বাঘা পাবনা জেলার চাটমোহর থানার লাউতিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বিশিষ্ট স্কুল শিক্ষক মজনু মাষ্টার তার পিতা। তিনি বড় ধনী শ্রেণীর রাজনৈতিক দল বা নেতাদের মত আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য কিছুই করেননি। বিগত ৪০ বছর এই শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব তথা শ্রমিক-কৃষক মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক জনগণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাইতো তরুণ বয়সে রাজনীতি বুঝে ওঠার আগেই ছাত্র অবস্থায় জীবন বাজী রেখে ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি আবার পড়াশুনায় ফিরে যান। কিন্তু ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি দেখলেন তাদের স্বপ্নের শ্রমিক-কৃষকসহ সর্বস্তরের নিপীড়িত জনগণের মুক্তি আসেনি। পাকিস্তানি বড় ধনীদের জায়গায় কিছু বাঙালী বড় ধনী শ্রেণী তৈরী হচ্ছে। “অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত” মাওসেতুঙের এই বাণীকে আকড়ে ধরে বাঘা’৭২ সালে জাসদ ছাত্রলীগ এবং পরবর্তীতে ’৭৩ সালে মহান মাওবাদী নেতা কমরেড সিরাজ সিকদারের প্রতিষ্ঠিত পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টিতে যোগদান করেন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে তিনি উপজেলা কৃষি-কর্মকর্তা হিসেবে সরকারী চাকুরীর পাশাপাশি গোপনে পার্টির সংগঠক হিসেবে শ্রমিক-কৃষকসহ বিভিন্ন স্তরের জনগণকে পার্টিতে সংগঠিত করেছেন। অবশেষে ’৮৪ সালে লোভনীয় সরকারী চাকুরী ত্যাগ করে বিপ্লবকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সার্বক্ষণিকভাবে নিজেকে পার্টি কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সেই থেকে গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত আনোয়ার কবীরের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি (সিসি)’র নেতৃস্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। যতদূর জানা যায়, এই সুদীর্ঘ সময়ে পার্টির উত্থান-পতনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আশির দশকে এই পার্টির নেতৃত্বে যে সংগ্রাম গড়ে ওঠে সেই সংগ্রামে নরসিংদীর সংগ্রামের অন্যতম নেতৃত্ব ছিলেন তিনি। সেই সংগ্রামে কুখ্যাত সামরিক ফ্যাসিষ্ট এরশাদের পার্টি বিরোধী “অপারেশন দুর্বার” এর দমন অভিযানে হামিদুজ্জামান কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হন’৮৯ সালে এবং ’৯৮ সালে জামিনে মুক্তি পান। জেল থেকে মুক্তি পেয়েই বাঘা পার্টি পুনর্গঠন এবং অতীত সংগ্রামের সারসংকলন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। ’৭৩ সাল থেকে অনেকবার তিনি কারাবরণ করেছেন- সরকারী বাহিনীর অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু শত্রু তাকে কখনো পরাজিত করতে পারেনি। অসুস্থ হওয়ার পূর্বে পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের স্টাফ হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন ছাড়াও সামরিক বিভাগের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কমরেড হামিদুজ্জামান বাঘা আমাদের মাঝে আজীবন বেঁচে থাকবেন।আমরা তার বিপ্লবী কাজ সমাপ্ত করবো এই অঙ্গীকার করছি।

তথ্যসূত্র: চাটমোহর থেকে প্রকাশিত “দৈনিক চলনবিল” হামিদুজ্জামান বাঘার জীবন রক্ষা ও মুক্তি কমিটির প্রকাশিত কাগজপত্র থেকে


চে গুয়েভারার ছোট ভাইয়ের স্মৃতি

চে গুয়েভারার কাঁধে ছোট ভাই হুয়ান মার্তিন গুয়েভারা

বলিভিয়ার লা হিগুয়েরা নামের সীমান্তবর্তী এক গ্রামের যে স্কুলঘরে ১৯৬৭ সালে বিপ্লবী এরনেস্তো চে গুয়েভারাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, ৪৭ বছর পর প্রথম সেখানে পা রাখেন তাঁর ছোট ভাই হুয়ান মার্তিন গুয়েভারা।

জায়গাটা এখন ব্যস্ততম পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ চে। এই বিপ্লবীর চিরচেনা ছবি শোভা পাচ্ছে চারপাশে।

হুয়ান মার্তিন যখন বাসিন্দাদের কাছে নিজের পরিচয় দেন, অবিশ্বাসী কণ্ঠে তাঁরা বলে ওঠেন, ‘যিশুর কোনো ভাইবোন থাকতে পারে না!’

হুয়ান লিখেছেন, ‘এখানকার সবার কাছে চে একজন সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে উঠেছেন। তাঁর ছবি সামনে নিয়ে প্রার্থনা করা হয়, অলৌকিক প্রত্যাশা করা হয় তাঁর কাছে। এ এক ভয়ংকর অবস্থা। আমার ভাইয়ের চিন্তা ও আদর্শ ধুয়েমুছে গেছে।’

হুয়ানের সঙ্গে চের বয়সের পার্থক্য ছিল ১৫ বছর। ছোট ভাইকে প্রায় সন্তানের মতোই দেখতেন চে। মৃত্যুর কিছুকাল আগে ঘনিষ্ঠজনদের কাছে চে বলেছিলেন, ছোট ভাইয়ের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি নৈকট্য অনুভব করেন তিনি।

চের সঙ্গে নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণা করেছেন হুয়ান। গত সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিচারণামূলক বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ চে, মাই ব্রাদার। প্রকাশক পলিটি প্রেস। হিস্পানি ভাষায় মূল বইটি বেরিয়েছিল গত বছর।

বইটিতে হুয়ান লিখেছেন এরনেস্তোর বিপ্লবী হওয়ার পারিবারিক কাহিনি। উঠে এসেছে অ্যাজমায় ভোগা এক শিশুর কথা, যার স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুষ্ক আবহাওয়ার অন্য শহরে ঠিকানা বদল করেছিল পুরো পরিবার। টগবগে তরুণ চে পড়ছিলেন চিকিৎসাবিদ্যা। কিন্তু মোটরবাইকে করে দুই বছর লাতিন আমেরিকার পথে পথে ঘুরে বদলে যায় তাঁর জীবনদর্শন। গড়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে বিপ্লবী চেতনা ও রাজনৈতিক আদর্শ।

ভাইয়ের কাছে কেমন ছিলেন চে? হুয়ান বলেন, ‘বাবা ও মায়ের মিশেলে গড়ে উঠেছিল সে। মা সিলিয়া ডি লা সারনা ছিলেন ধীরস্থির, বুদ্ধিমতী ও একই সঙ্গে প্রথাবিরোধী। বাবা এরনেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ আবার নিজেকে বেঁধে রাখার মানুষ নন। পরিবার থেকে কিছুটা দূরেই থেকেছেন। দুজনের বৈশিষ্ট্যই এসেছিল চের মধ্যে। আমার কাছে বাবার বিকল্প ছিল সে। আবার ছিল ভাই ও বন্ধুও।’

কিন্তু ১৯৫৭ সালের পর বদলে যায় চের পরিচয়। একই সঙ্গে হুয়ানের পরিচয়ও বদলে যায়। আগে ছিলেন মেডিকেল পড়ুয়া চের ভাই। পরে হলেন কিংবদন্তি বিপ্লবী ও ভয়ডরহীন যোদ্ধা চের ‘ছায়ায় বেড়ে ওঠা’ হুয়ান মার্তিন গুয়েভারা। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের শুরু পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে কারাগারে ছিলেন চের এই ছোট ভাই। পরে ছাড়া পান ঠিকই, কিন্তু তত দিনে প্রিয় ভাই আর পৃথিবীতে নেই।

হুয়ানের মতে, চের ভাস্কর্য বা মূর্তি গড়ে তাঁকে আরাধনা করার প্রয়োজন নেই। চেকে এই পূজার বেদি থেকে নামিয়ে আনতে হবে। সবার উচিত তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে দেখা, স্রেফ মানুষ, যিনি কিনা মার্ক্সবাদী আদর্শে বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়তে চেয়েছিলেন।

বিশ্বে কি চের মতো আরেকজন বিপ্লবীর প্রয়োজন আছে? তেমন মানুষ কি পাওয়া সম্ভব? হুয়ান দ্বিধাহীনভাবে
লিখেছেন, ‘হ্যাঁ, পাওয়া সম্ভব। সে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আমাদের কি ঠিক তাঁর মতো মানুষই প্রয়োজন? একজন গেরিলা? না। টুপি মাথায় পাহাড়ে থাকা কোনো মানুষ? না। কিন্তু এমন একজন মানুষ লাগবে, যাঁর পরিবর্তনের ভাবনা আছে। আছে সুস্পষ্ট নীতি, যা অর্থবিত্ত বা ক্ষমতার কাছে কখনো বিক্রি হয় না। চে এমনটাই ছিল। আমাদের এমন মানুষ দরকার। চে যখন বেঁচে ছিল, তখনকার তুলনায় আজকের পৃথিবী খুব ভালো অবস্থায় নেই। বরং আরও খারাপ অবস্থায় আছে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আমাদের অবশ্যই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

 


পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’র প্রথম অবাঙ্গালী বিপ্লবী শহীদ কমরেড তাহের আজমী

শহীদ কমরেড তাহের আজমী

শহীদ কমরেড তাহের আজমী

মোহম্মদ শমিউল্লাহ্ আজমী(পার্টি নাম- তাহের আজমী)। এই তাঁর পারিবারিক নাম। ডাকনাম বাচ্চু। জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালের জানুয়ারী মাসের কোনো একদিন। বর্তমান পূর্ব উত্তর প্রদেশের বালিয়া শহরে। পাঁচ ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। তাঁর বাবা মা ছিলেন উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলা থেকে আগত। তাঁর পরিবার দেশভাগের পর তদানিন্তন পূর্বপাকিস্তানে চলে যান। শমিউল্লা সেখানেই বড় হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রাথমিক পড়াশুনা শুরু হয় তালোরা, গাইবান্ধা ও ফেনী এই তিন জায়গার বাংলা মাধ্যম স্কুলে। পরে যখন তাঁরা পাকাপাকিভাবে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন তখন প্রথমে ভর্তি হন ডন স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ও পরে শাহীন স্কুলে নবম ও দশম শ্রেণীতে। পরে ইন্টারমিডিয়েট তেজগাঁও টেকনিকাল কলেজে এবং তারপর কায়দে আজম কলেজে। কায়দে আজম কলেজে তিনি soil science নিয়ে B.sc.পড়তে শুরু করেন। এই সময়েই তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৬৯ এ আত্মগোপন করার আগে পর্যন্ত তাঁর বাসস্থান ছিল ৯৫ সবুজবাগ, কমলাপুর, ঢাকা। কমরেড সিরাজ সিকদার কর্তৃক প্রথম যে দলটি সংগঠিত হয়, তিনি ছিলেন তার পুরোধা। ১৯৬৭ সালের শেষদিকে মেনন গ্রুপের EPSU ছাত্র সংগঠনের আজীমপুর, তোপখানা রোডের দফতরে তাঁর সাথে আজমীর প্রথম সাক্ষাত। সিরাজ সিকদার সেসময় একগুচ্ছ অত্যন্ত অগ্রসর বিপ্লবী চেতনা সম্পন্ন মানুষকে একত্রিত করার কাজে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো পরাধীন পূর্ববাংলার শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য একটি সর্বাত্মক সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলা। পরিচয়ের কিছুদিনের মধ্যেই শমিউল্লা আজমী সিরাজ সিকদারের ঘনিষ্ঠতম সাথীদের একজন হয়ে হয়ে উঠলেন এবং ১৯৭১ এ সাভারে শহীদ হওয়া পর্যন্ত তাঁর স্থান এবং আনুগত্য অটুট ছিল। আজমীর এই অকাল মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে যখন তাঁর পরিবার করাচি চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখনই তাঁর মা আজমীকে সস্ত্রীক তাঁদের সাথে দেশত্যাগ করতে বলেন। আজমী এবং তাঁর স্ত্রী উভয়েই সে প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। মাতৃ হৃদয় অবুঝ। তিনি চলে গিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত সন্তানের মাতৃক্রোড়ে ফিরে আসার প্রতীক্ষা করেছেন। এমনকি সন্তানের মৃত্যুর সংবাদ বিশ্বাস করেননি মৃত্যু পর্যন্ত। আজমীর মৃত্যুর পর সিরাজ সিকদার শোকজ্ঞাপন করে এবং সংগঠনে ওপূর্ববাংলার জনগণের মুক্তিসংগ্রামে তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করে একটি চিঠি আজমীর বোনের কাছে প্রেরণ করেন। বাংলার জন্য তাঁর আত্মদানকে সিরাজ সিকদার কানাডার কম্যুনিস্ট ডাক্তার নর্মান বেথুনের সঙ্গে তুলনা করে তাঁকে “বাংলার নর্মান বেথুন”এই আখ্যা দিয়েছিলেন।

মধ্যবর্তী ইতিহাসঃ

এক সন্ধ্যায় সিরাজ সিকদারের বাড়িতে তিনি, শমিউল্লাহ্ ও রজীউল্লাহ্(শমির ছোটো ভাই) একটি শপথনামায় নিজেদের রক্ত দিয়ে সই করেন। তাঁরা শপথ নেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁরা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন বিপ্লবের পথে। ঐ তিনজন ছদ্মনাম গ্রহন করেন। সিরাজ ওরফে রুহুল আলম, শমিউল্লাহ্ ওরফে রুহুল আমিন এবং রজীউল্লাহ্ ওরফে রুহুল কুদ্দুস। এই রুহুল শব্দটি তিন জনের নামের মধ্যে রেখে একটি ভ্রাতৃত্ববোধের সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন বোধহয়।কিন্তু পরবর্তিতে তা সফল হয়নি। ১৯৭০ এ খালেদা নামে একজন বিপ্লবী তরুণীর সাথে আজমীর ঘনিষ্ঠতা ও প্রেম হয়। তিনি সংগঠনের অনুমতিক্রমে ৫ই মে তে, যেদিন পাকিস্তান কাউন্সিল ও ইউসিস লাইব্রেরীর উপর একটি প্রতীকি হামলা চালানো হয়(কোনো জান মালের ক্ষতি না করে) সেই দিন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। অবশ্য অনুমতিপত্র পকেটে নিয়েও সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করতে পারেননি। সাতদিন পর তিনি স্ত্রীকে নিয়ে বরিশাল রওনা হলেন লঞ্চে। বরিশালে কিছুকাল সংগঠন গড়ে তোলার পর আবার সস্ত্রীক ঢাকা ফিরে আসেন। এরপর দুজনে চলে যান চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামে একটি অবাঙালী টোলায় তাঁরা এবং আরও দুজন কমরেড একটি বাড়ি ভাড়া করে থাকেন। ঢাকা থেকেই সিরাজ সিকদার, তাঁর স্ত্রী জাহানারা, আজমী, তাঁর স্ত্রী খালেদা সকলের নামেই পাকিস্তান সরকার গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেছিল। প্রত্যেকের মাথার দাম ঘোষিত ছিলো এবং জীবিত অথবা মৃত। এই মহল্লার মানুষের পক্ষে এসব জানা সম্ভব ছিলনা। এখানে আজমীর পরিচয় ছিল সাংবাদিক। তিনি ঐখান থেকেই চট্টগ্রামে জোরকদমে সংগঠন গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ বাগ্মি এবং সহজেই মন জয় করতে পারতেন এবং উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন কর্মীদের। ইতিমধ্যে কমরেড সিরাজ সিকদারের নির্দেশক্রমে আজমী তাঁর স্ত্রীর সহায়তায় স্বাধীন বাংলার পতাকার রূপ দান করেন। ১৯৭০ সালের ৩রা ডিসেম্বর পল্টনে মওলানা ভাসানীর জনসভায় পুর্ব বাংলার জাতীয় গনতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার আহ্বান সংবলিত লিফলেট এবং ভবিষ্যতে স্বাধীন পুর্ব বাংলার পতাকা বিতরন করে। সে পতাকাটি, সিরাজ সিকদারের অনুসারীদের ভাষায়, এখনকার বাংলাদেশের পতাকা যার ডিজাইন করেছিলেন শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় কর্মী অবাঙ্গালী কমরেড তাহের আজমী ।

৭ই মার্চ পল্টন ময়দানে জনসমাবেশে মুজিব ঘোষিত স্বায়ত্বশাসনের ডাক জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্খার হুঙ্কারের নীচে চাপা পড়ে গেলে, মুজিবকে গ্রেফতারের নাটক হয়ে গেলে সারাদেশে শৃঙ্খলাহীণভাবে লড়াই শুরু হয়ে যায়। যুব সম্প্রদায় ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ দিতে থাকে এই অসংগঠিত যুদ্ধে। বানের জলের মতো যোশ আর উচ্ছাসে জানের পরোয়া নেই কারো। ফলে অযাচিতভাবে কত তরুণপ্রাণ বিনষ্ট হয়েছে। ঐ অবস্থাতেই শুরু হয়ে যায় বাঙালী অবাঙালী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আজমী হালিশহর থেকে কোনোভাবে বেরিয়ে মেহেদীবাগে ইঞ্জিনিয়ারদের মেসে উঠলেন। সেখান থেকে পাহাড়তলী। পাহাড়তলী থেকে হেঁটে রামগড় শাব্রুম হয়ে আগরতলা। আগরতলায় পৌঁছে তাঁর স্ত্রী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এদিকে টাকা নেই।  স্ত্রীর গহনা যা কিছু আজমীর মায়ের দেয়া তা পার্টিফাণ্ডে জমা করা হয়ে গেছে। বিক্রি করে ওষুধ কেনার মতো কিছু ছিলনা। ছিল শুধু একটি লেডিস ঘড়ি স্ত্রীর হাতে।

 তাই বেচে স্ত্রীর পথ্য জোগাড় হ’ল। এখান থেকে ট্রেনে উঠে সোজা কুচবিহার খালেদার বাড়ি। তখন গোলমালের সময় বলে বোধহয় ট্রেনে টিকিট লাগতোনা।  যাই হোক কুচবিহারে কতদিন তিনি অবস্থান করেছিলেন জানা যায়না। পরে কলকাতা এসে বনগাঁ দিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন সস্ত্রীক। ঢাকা পৌঁছে আবার সংগঠনের সাথে যোগাযোগ স্থাপন হ’ল।

কোনো এক অজানা কারণে কমরেড সিরাজ সিকদার আজমীকে তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে রাখলেন। একই শহরে থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সাক্ষাতের অনুমতি ছিলনা।

এর কিছুদিন পর যুদ্ধের প্রয়োজনে মুক্তিবাহিনীর সাথে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের উদ্দেশ্যে আজমীকে সাভারে প্রেরণ করা হয়। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। আওয়ামী মুক্তিবাহিনীরা কমরেড তাহেরসহ অন্যান্যদের হত্যা করে।

কিন্তু জানা গেলনা কিভাবে ঠিক কোন জায়গায় তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল।

এ নিয়ে সিরাজ শিকদার ‘সাভারের লাল মাটি’ শীর্ষক কবিতা লেখেন

তাহের, তোমাকে কতবার বলেছি

সতর্ক হতে।

আওয়ামী লীগের চররা

হায়নার মত খুঁজে বেড়ায়

বন্ধুর বেশে আমাদের

খতম করে।

রাতের অন্ধকারে

ফ্যাসিস্টদের বুলেটের শব্দে

তোমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায় ।

তারপর…

লড়েছিলে ।

আর কিছু জানিনে ।

সূত্রঃ

raziazmi.com

ও শহীদ কমরেডের স্ত্রী Monzi khaleda begum

 


শহীদ কমরেড ‘মার্গারেট কাগোল’ লাল সালাম

উত্তর ইটালির এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া শহীদ কমরেড ‘মার্গারেট কাগোল’ (৮ই এপ্রিল ১৯৪৫ – ৫ই জুন ১৯৭৫) ছিলেন ইতালি এবং পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে শুরু হওয়া সর্বহারা সংগ্রামের নতুন তরঙ্গ সশস্ত্র কমিউনিস্ট সংগঠন ‘রেড ব্রিগেড'(Brigate Rosse) এর প্রতিষ্ঠাকালীন নেত্রী।  ৬০ এর দশকের শেষে এককুই তেরম এর সময় আধাসামরিক পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধে তাকে হত্যা করা হয়।

বিস্তারিত পড়ুনঃ

Margherita Cagol

06Margherita_Cagol_Mara2

cagol1

 

ভিডিও – 


ছবির সংবাদঃ তুরস্কের শহীদ মাওবাদী কমরেড ইব্রাহীম কায়পাক্কায়া

তুরস্কের শহীদ মহান মাওবাদী নেতা কমরেড ইব্রাহীম কায়পাক্কায়া-

তুরস্কের দেরসিমের পার্বত্য এলাকায় ইব্রাহিম কাপাক্কায়া নিজে প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন, কিন্তু তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।  তার এক সপ্তাহ পরে আহত অবস্থায় তিনি বন্দী হন।  তাকে বাধ্য করা হয় নগ্ন পায়ে হেটে যেতে ৫০ কিলোমিটার তুষার আর বরফের নদী পেরিয়ে শহর থেকে শহরে, তারপর প্রায় চার মাস দিয়ারবাকিরস বন্দীশালায় তাকে রাখা হয় নির্জন কারাবাসে এবং ধারাবাহিকভাবে তার ওপর নির্যাতন চলে।  পার্টি ও কমরেডদের কোনরকম তথ্য প্রকাশ না করায় প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র তাকে গুলি করে হত্যা করে।

Ibrahim+kaypakkaya

11146517_1107322785964049_4341136930796364123_n

11137105_1107339045962423_9084783778939951154_n

10996500_1107334642629530_8638134056262204072_n

10404316_1108096995886628_9074624616420149553_n

11256556_1107322045964123_5568295775044506141_n

CBDBkm2WoAE15j4

13165906_1340192512677074_6899916796104538859_n

BKipxQiCUAAzJPa

কমরেড ইব্রাহীম কায়পাক্কায়া'র মা

কমরেড ইব্রাহীম কায়পাক্কায়া’র মা

11012278_547261495412696_2103255304_n


তুরস্কের শহীদ মহান মাওবাদী কমরেড ইব্রাহীম কায়পাক্কায়া স্মরণে প্রশ্নোত্তর –

zzz

কীভাবে ও কোন প্রেক্ষাপটে কমরেড ইব্রাহিম কাপাক্কায়া পথনির্দেশক চিন্তাধারা উদ্ভূত হল?

তুরস্কের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন মুস্তাফা সুফী (১৮৮৩-১৯২১), কিন্তু তা শীঘ্রই ধ্বংস হলো কামালবাদের কারণে, যা ছিল অটোমান সাম্রাজ্যবাদের পতনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণকারী আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়াদের মতবাদ।১৯৪৯ সালে জন্ম নিয়েছেন যিনি, সেই ইব্রাহীম কাপাক্কায়া চিন্তাধারা উদ্ভূত হয়েছে জনগণের সৃষ্ট সমগ্র বিপ্লবী তরঙ্গের সর্বাধিক বিকশিত অংশ হিসেবে (অপরাপর বিখ্যাত ব্যক্তি যারা সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলেছেন তারা হচ্ছেন চেবাদী মহির কায়ান এবং হোজাবাদী ডেনিস গেজমিস)।   প্রধান প্রশ্ন ছিল তুর্কী শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র ও তার উত্স কামালবাদী “বিপ্লব”কে বোঝা, একটা প্রতিবিপ্লব যাকে সুবিধাবাদ “বুর্জোয়া” অথবা এমনকি “গণতান্ত্রিক ও যার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে” বিবেচেনা করেছিল ।

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া অধ্যয়ন করেন তুরস্কের চরিত্র, মুস্তাফা কামাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠার সময় থেকে এর ইতিহাস, এর আধা উপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী চরিত্র নিশ্চিত করে এবং নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা।

কমরেড ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কি একটি নতুন পার্টি গঠন করেন নাকি একটা পূর্ব থেকে অস্তিত্বমান পার্টিতে যোগ দেন?

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া মাত্র ২১ বছর বয়সে টিআইআইকেপিতে যোগ দেন, যা মাওসেতুঙ কর্তৃক মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ব্যাখ্যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরছিল, সেখানে তিনি লেখেন ১৯৭২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত, তখন তিনি টিআইআইকেপির সাথে বিভাজন ঘটাতে এক বিপ্লবী দলকে নেতৃত্ব করেন, তিনি তার চিন্তাধারার জন্ম দেন।

কায়পাক্কায়া মধ্য জুন ১৯৭০-এর মহান ধর্মঘট থেকে শিক্ষা নেন এবং টিআইআইকেপি (তুরস্কের বিপ্লবী শ্রমিক ও কৃষক পার্টি)-এর পুনর্মূল্যায়নের কাজ শুরু করেন।

চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে সমর্থন করে তিনি টিআইআইকেকেপিতে একটা বিপ্লবী দল সংগঠিত করেন যা শেষ পর্যন্ত টিআইআইকেপির সাথে বিভাজন ঘটিয়ে তুরস্কের কমিউনিস্ট পার্টি/মার্কসবাদী-লেনিনবাদী টিকেপি/এমএল গঠন করে।

কমরেড ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কি নিজেকে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফসল হিসেবে বিবেচনা করেছেন?

টিআইআইকেপির কর্মসূচির সমালোচনাতে ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া ব্যাখ্যা করেন: “আমাদের আন্দোলন হচ্ছে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফল।”

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়ার প্রধান দলিলগুলো কী কী?

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া, যিনি ২১ বছর বয়সে মারা যান, চারটি প্রধান দলিল রচনা করেছেন। এই দলিলগুলো টিকেপি/এমএল (তুরস্কের কমিউনিস্ট পার্টি/মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) র প্রতিষ্ঠার মুল দলিল।

প্রথমটি ১৯৭২-এর শুরুতে টিকেপি/এমএল-এর গঠনের পর লেখা হয়েছিল, যার শিরোনাম “টিকেপি/এমএল কর্তৃক সাফাক (আইদিনিলিক) সংশোধনবাদের সাধারণ সমালোচনা”।

সাফাক (ভোর) ছিল সংশোধনবাদী তুরস্কের বিপ্লবী শ্রমিক ও কৃষক পার্টির বেআইনি কেন্দ্রিয় পত্রিকা; আর আইদিনিলিক (স্বচ্ছতা) ছিল পার্টির লাইনকে তুলে ধরা আইনি পত্রিকা।

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কৃত “সাধারণ সমালোচনা”য় রয়েছে ১১টি প্রবন্ধ এবং একটি দীর্ঘ দলিল “সাফাক সংশোধনবাদ থেকে আমাদের পৃথক করে যে মূল প্রশ্নসমূহ”; এগুলো মিলে বই ১৫০ পৃষ্ঠার।

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়ার অন্য দলিলগুলো যার প্রতিটি ৬০ পৃষ্ঠা করে, আরো বিখ্যাত।  ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে কায়পাক্কায়া লেখেন “টিআইআইকেপি (আইদিনিলিক)এর কর্মসূচির সমালোচনা এবং “কামালবাদ সম্পর্কে মতাবস্থান”।

প্রথম দলিলটি “সাধারণ সমালোচনা”র চেতনায় সংশোধনবাদী টিআইআইকেপির সমালোচনা; আর দ্বিতীয়টি খুব বিখ্যাত দলিল যেখানে তিনি কামালবাদকে ফ্যাসিবাদ হিসেবে চরিত্রায়িত করেছেন।

ডিসেম্বর ১৯৭১-এ আরো লেখেন “তুরস্কে জাতীয় প্রশ্ন”, এখানে তিনি সংশোধনবাদী জাত্যাভিমানকে বর্জন করে ও জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে রক্ষা করে কুর্দী প্রশ্নকে আলোচনা করেন।

বিপ্লবী ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কি গণযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন?

হ্যাঁ, ইব্রাহিম কাপাক্কায়া টিক্কো (টিআইকেকেও) গঠন করেন যা হচ্ছে তুরস্কের শ্রমিক ও কৃষকদের মুক্তি বাহিনী। দেরসিমের পার্বত্য এলাকায় ইব্রাহিম কাপাক্কায়া নিজে প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন, তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তার এক সপ্তাহ পরে তিনি বন্দী হন। তাকে বাধ্য করা হয় নগ্ন পায়ে হেটে যেতে ৫০ কিলোমিটার তুষাঢ় আর বরফের নদী পেরিয়ে শহর থেকে শহরে, তারপর প্রায় চার মাস দিয়ারবাকিরস বন্দীশালায় তাকে রাখা হয় নির্জন কারাবাসে এবং ধারাবাহিকভাবে তার ওপর নির্যাতন চলে। কোনরকম তথ্য প্রকাশ না করায় প্রতিক্রিয়া তাকে গুলি করে হত্যা করে।

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কি একজন নতুন নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন?

হ্যাঁ, ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া তুরস্কের মাওবাদী আন্দোলনের মহান নেতায় পরিণত হন। আর এটা লক্ষনীয় যে, তুরস্কের প্রতিক্রিয়াশিল রাষ্ট্র তার সাথে সম্পর্কিত সবকিছু নিষিদ্ধ করতে যাবতীয় প্রচেষ্টা চালায়, অন্যদিকে চেবাদী মহির কায়ানের রোমান্টিকতাবাদ আধা গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় এবং হোজাবাদী ডেনিস গেজমিদ প্রায় স্বীকৃত হয়।

আজ পর্যন্ত মাওবাদীদের কাছে ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কেন্দ্রীয়, এমনকি যারা তাকে “সংশোধন করার ভাণ করে মাওসেতুঙের রেফারেন্স, গণযুদ্ধ ও নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে নেতিকরণ করে সেই “মার্কসবাদী-লেনিনবাদী”দেরও।

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কি গণযুদ্ধকে সার্বজনীন বিবেচেনা করেছেন?

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া এ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেননি। তবে মাওয়ের ধারণাকে অনুসরণ করে লাল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নকে আলোচনা করে ইব্রাহিম কাপাক্কায়া নিশিচত করেন যে “ঔপনিবেশিক ও আধা ঔপনিবেশিক সকল পশ্চাদপদ দেশে লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্ভব। কেবল সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতেই তা সম্ভব নয়।”

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কি সাহিত্য উদ্ধৃত করেছেন?

না, ইব্রাহিম কায়পাক্কায়ার এমন রেফরেন্স পাওয়া যায়না।

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কি কবিতা লিখেছেন?

না, এমন কিছু পাওয়া যায়নি।

স্কুলজীবন থেকেই কি ইব্রাহিম কায়পাক্কায়ার বিপ্লবী জীবন শুরু?

প্রায় চার মাস নির্যাতিত হওয়ার পর, ২১ বছর বয়সে ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া মৃত্যুবরণ করেন; তিনি ইতিমধ্যেই পার্টি ও মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলেছেন। এটা দেখায় আগে তার জীবন কী ছিল।

ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের পদার্থবিদ্যার ছাত্র থাকা অবস্থায় কায়পাক্কায়া বিপ্লবী ভাবধারা আবিষ্কার করেন। মার্চ, ১৯৬৮তে তিনি কাপা ভাবধারা ক্লাবের ফাউন্ডেশনে যোগ দেন এর সভাপতি হয়ে। আমেরিকার ষষ্ঠ নৌবহরের বিরুদ্ধে লিফলেট প্রস্তুত করায় নভেম্বর ১৯৬৮তে তিনি স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হন।

বিপ্লবী বাম প্রেসে তখন তিনি প্রবন্ধ লেখেন, আর শীঘ্রই একজন নেতায় পরিণত হন।

ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া বেঁচে থাকলে কি তিনি গনসালো চিন্তাধারার মত অধিক বিকশিত চিন্তাধারা গড়ে তুলতে সফল হতেন?

অবশ্যই, যেহেতু ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া তুরস্কের সমাজের বাস্তবতাকে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও কুর্দী জাতীয় সমস্যার প্রধান প্রশ্ন সমেত।

 


মহান মে দিবসঃ ফাঁসির মঞ্চে যারা গেয়ে গেল, জীবনের জয়গান

13077100_714602458681669_4733753899653735568_n

13082549_714602388681676_6753552528195513473_n

13087326_714602405348341_3248175293377600857_n

13102622_714602415348340_3367767728623855861_n

কাজের সময়সীমা ৮ ঘন্টা দাবী বাস্তবায়িত করা সংগ্রামের গতিপথে ১৮৮৪ সালে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ১৮৮৬ সালের ১ মে সমাবেশ, বিক্ষোভের। কিন্তু বুর্জোয়াশ্রেণীর সরকারের পুলিশ ও গুণ্ডা বাহিনীর নির্মম দমন-পীড়নের প্রতিবাদে ১ মে শ্রমিক ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নাইটস অব লেবার ও আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবারের নেতৃত্বে বুর্জোয়াশ্রেণীর সকল চক্রান্ত্র-ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে ১ মে শ্রমিক সমাবেশ ও ধর্মঘট সফলভাবে পালিত হয়। শ্রমিক আন্দোলন ও ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়ে এবং শিকাগো শহরে তা জঙ্গীরূপ লাভ করে। শিকাগোর ম্যাককামক ওয়ার্কর্স নামে এক কারখানার শ্রমিকদের সাথে পুঁজিপতি শ্রেণীর দালালদের সংঘর্ষ শুরু হয়। মালিক ও পুলিশের এই বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে ৪ মে শ্রমিককেরা শিকাগোর হে মার্কেটে প্রতিবাদ সভার ডাক দেয়। প্রতিবাদ সভা চলাকালে পুলিশের পৈশাচিক গুলিবর্ষণে নিহত হন ৭ জন শ্রমিক এবং হতাহত হন অনেকে।

 ৮ ঘন্টা শ্রম দিবসের এই ঐতিহাসিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবার জন্য পুলিশ গ্রেপ্তার করে ৭ জন শ্রমিক নেতা –অসাষ্ট স্পাইজ, সীমফেল্ডেন, মাইকেল, জর্জ এঞ্জল, এডলফ ফিশার, লুই নিংগ ও অঙ্কার নিবেকে। বুর্জোয়া শ্রেণী ও তাদের স্বার্থরাকারী সরকার ফাঁসির আদেশ দেয় শ্রমিকশ্রেণীর নির্ভীক, দৃঢ়পতিজ্ঞ বীর নেতা অগাষ্ট স্পাইজ, গ্যারসন, ফিশার ও এঞ্জলকে

ক্ষমা প্রদর্শনের আবেদন জানাতে অস্বীকার করে এই সব বীর শ্রমিক নেতারা সৃষ্টি করেন আত্মত্যাগ ও বিপ্লবী দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও ইতিহাস।

অগাষ্ট স্পাইস আদালতে বলেন, “ অভাব ও কষ্টে খেটে খাওয়া লক্ষ লক্ষ শোষিত মানুষের আন্দোলনে তাদের মুক্তির আশা দেখে আপনারা যদি ভাবেন যে, আমাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েই আপনারা সেই শ্রমিক আন্দোলনকে উচ্ছেদ করতে পারবেন, যদি এটাই আপনাদের মত হয়, তবে দিন আমাদের ফাঁসি। এখানে একটা স্ফুলিঙ্গের ওপর আপনারা পা দেবেন, কিন্তু সেখান থেকেই আপনাদের পেছনে, আপনাদের সামনে এবং সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে লেলিহান অগ্নিশিখা। এটা ভূ-গর্ভের আগুন এবং আপনারা তা কখনও নেভাতে পারবেন না।” তিনি বলেন, “ আজ তোমরা আমাদের টুটি টিপে ধরেছো, কিন্তু আমাদের নীরবতা সেই কণ্ঠস্বরের চেয়েও অনেক বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠবে এমন দিন আসবে।”

ফাঁসির পূর্বে ফিমারের মত সর্বহারা বীররাই এমন কথা উচ্চারণ করতে পারেন যে, “এটা আমার জীবনের সবচেয়ে খুশীর মূহুর্ত।”

ফাঁসির দড়ি গলায় পরেও অপারেজেয় যোদ্ধা এঞ্জেল ঘোষণা করেন,“জনগণের কষ্ঠস্বর শোনা হোক।”

পারসনের মতো সর্বহারা যোদ্ধারাই মৃত্যুর পূর্বে তার স্ত্রীকে লেখা চিঠিতে তুলে ধরতে পারেন এমন সর্বহারা ভাবমানস, “ আমার অসহায় প্রিয় বৌ, তোমাকে আমি জনগণের কাছেই অর্পণ করছি, তুমি জণগণের একজন নারী। তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ, আমি যখন রইব না তখন কোন বেপরোয়া কাজ করনা, তবে সমাজতন্ত্রের মহান আদর্শকে আমি যেখানে রেখে যেতে বাধ্য হলাম, সেখান থেকে তাকে তুলে ধরো।” অধিকার ও মুক্তি ছিনিয়ে আনার সংগ্রামের অগ্নিশিখা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।

অনেক ত্যাগ, রক্ত, সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায় ৮ ঘন্টা শ্রম দিবসের দাবী। কিন্তু এর মধ্যে তা সীমাবদ্ধ ছিল না, এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, এটা হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির লক্ষ্যে মজুরী দাসত্ব ব্যবস্থা তথা পুঁজিবাদ উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মহান সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।