চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: কমরেডদের প্রতি

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

ব্যাপক কৃষক সাধারণ থেকে বিচ্ছিন্নতা বিপ্লবীদের পক্ষে একটা মারাত্মক রাজনৈতিক দুর্বলতা; সংগ্রামের প্রতিটি স্তরে এই বিপদ থাকে, তাই গেরিলা যুদ্ধের কৌশল বলতে গিয়ে চেয়ারম্যান বলেছেন, “জনগণকে জাগিয়ে তোলার জন্য তোমাদের শক্তিকে তোমরা ভাগ করে দাও, শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য তোমাদের শক্তিকে একত্র জড়ো করো (Divide your forces to arouse the masses, concentrate your forces to deal with the enemy)- এটাই হোল প্রথম সূত্র। এই জনগণকে জাগিয়ে তোলা (arousing the masses) কোনদিন সম্পূর্ণ হয় না। দ্বিতীয় যে শিক্ষা তা হোল, গেরিলা যুদ্ধ মূলত: শ্রেণী সংগ্রামের উন্নত স্তর এবং শ্রেণী সংগ্রাম অর্থনীতিক ও রাজনীতিক দুটি সংগ্রামের যোগফল। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা যতই নির্দ্দিষ্টভাবে বুঝবার চেষ্টা করছি ততই নতুন নতুন শিক্ষা হচ্ছে। এ রকম শিক্ষা প্রত্যেক অঞ্চলেই হবে এবং তবেই আমাদের উপলব্ধি বাড়বে। আমরা আরও ভাল মার্কসবাদী হবো। সমস্ত কমরেডই যে এ কথা সঠিক বুঝেছেন এখনই সে কথা বলা যায় না, তবে সব কমরেডই এই পথে চিন্তা মুরু করেছেন এবং চেষ্টাও কিছু কিছু শুরু হয়েছে। জনগণের কাছ থেকে শেখা (Learn from the masses)- এটা খুবই কঠিন কাজ। মনগড়া ধারণা নিয়ে চলাও (Subjectivism) সংশোধনবাদের দান। সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আমরা শুরু করেছি মাত্র, এখনও অনেক পথ বাকী।

কৃষক এলাকায় যে সব কমরেড কাজ করছেন তারা যেমন রাজনীতি প্রচার করবেন তেমনই অর্থনৈতিক দাবীর উপর একটা সাধারণ আওয়াজ রাখার প্রয়োজনীয়তাকে কোন সময়েই ছোট করে দেখলে চলবে না। কারণ ব্যাপক কৃষক সাধারণকে আন্দোলনের পথে না আনলে রাজনীতি প্রচার বোঝার অবস্থায়, পশ্চাদপদ কৃষককে টেনে আনা যাবে না এবং শ্রেণীশত্রুর বিরুদ্ধে ঘৃণাকে জাগিয়ে রাখা যাবে না। “আগামী ফসলের উপর দখল রাখতে হবে”- এখন থেকেই এই আওয়াজকে প্রচার করতে হবে। সারা বছরের অনাহারের জন্য জোতদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে ঘৃণাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। সামনের ফসল কৃষকের- এই আওয়াজ ব্যাপক কৃষককে আন্দোলনের আওতায় আনবে এবং আমাদের সচেতন রাজনৈতিক প্রচার এই কৃষক আন্দোলনের চরিত্রকে বদলে দেবে।

দেশব্রতী, ১লা আগষ্ট, ১৯৬৮

Advertisements

চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর এক বছর

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

নকশালবাড়ীর এক বছর

নকশালবাড়ী কৃষক সংগ্রামের এক বছর পূর্ণ হোল। অন্য কৃষক সংগ্রাম থেকে এই সংগ্রামের পার্থক্য কোথায়? নানা অবিচার-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষক চিরকালই সংগ্রাম করে এসেছেন। এই প্রথম সেই কৃষক শুধু ভার ছোট দাদীর জন্য আন্দোলন করলেন না, তিনি আন্দোলন করলেন রাষ্ট্র ক্ষমতার জন্য। নকশালবাড়ীর কৃষক আন্দোলন থেকে যদি অভিজ্ঞতা নিতে হয় তবে সে অভিজ্ঞতা হচ্ছে এই যে, জমি বা ফসল ইত্যাদির জন্য জঙ্গী সংগ্রাম নয়, জঙ্গী-সংগ্রাম করতে হবে রাষ্ট্র ক্ষমতার জন্য। নকশালবাড়ীর নতুনত্ব এখানেই। এলাকার এলাকায় কৃষককে তৈরী হতে হবে নিজ নিজ এলাকায় সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দেওয়ার জন্য। ভারতবর্ষের কৃষক আন্দোলনে সর্বপ্রথম নকশালবাড়ীতেই এই পথ গৃহীত হোল। অর্থাৎ বিপ্লবী বর্ষ শুরু হোল। তাই নকশালবাড়ীর এই আন্দোলনকে প্রত্যেক দেশের সংগ্রামীরা অভিনন্দন জানাচ্ছেন।

ভারতবর্ষ সাম্রাজ্যবাদের ও সংশোধনবাদের ঘাটি হচ্ছে; সে আজ মুক্তিকানী জনতার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়ার ঘাঁটি হিসাবে কাজ করছে। তাই নকশালবাড়ীর সংগ্রাম শুধু জাতীয় সংগ্রাম নয়, একটা আন্তর্জাতিক সংগ্রাম। এ সংগ্রাম কঠিন-সহজ এ পথ নয়। বিপ্লবের পথ কঠিন–সহজ সে পথ নয়। বাধা আছে, বিপত্তি আছে, এমন কি পশ্চাদপশরণও আছে। তবুও এই নতুন আন্তর্জাতিকতায় উদ্বুদ্ধ কৃষক মাথা হেট করেন নি, সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত এক বছরের আমাদের অভিজ্ঞতা, এই ছোট এলাকায় সংগ্রামের বগী সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেক রাজনৈতিক পার্টির বিরোধীতা সত্বেও মানুষ এই সংগ্রামের কথাই ভাবছে এবং সেই সংগ্রামের পথেই এগোচ্ছে। আজ নকশালবাড়ীর বীর নেতারা জীবিত, আজও তাঁদের ধ্বংস করতে প্রতিক্রিয়াশীল সরকার পারে নি। তাই তো চেয়ারম্যান বলেছেন, সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দেখতে যত ভয়ংকরই হোক না কেন, আসলে কাগুজে বাঘ।

চেয়ারম্যান বলেছেন, সেদিন আর দূরে নেই যেদিন মানুষের উপর মানুষের শোষণ বন্ধ হবে, সমস্ত মানুষ মুক্ত হবে।

আমরা সেই উজ্জ্বল সূর্যোলোকের জন্য অপেক্ষা করছি।

২৩ শে মে, ১৯৬৮


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ‘যুক্তফ্রণ্ট ও বিপ্লবী পার্টি’

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

যুক্তফ্রণ্ট ও বিপ্লবী পার্টি

যে পার্টি সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করছে না, তার পক্ষে যুক্তফ্রণ্টের আওয়াজ অর্থহীন, কারণ স্বাধীন নীতির ভিত্তিতে কোন যুক্তফ্রন্টই তার পক্ষে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়; ফলে অনিবার্যভাবে তাকে লেজুড়ে পরিণত হতে হয়। সফল যুক্তফ্রণ্ট গড়ে উঠতে পারে একমাত্র সফল সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে। যুক্তফ্রণ্টের প্রধান কথা, শ্রমিকশ্রেণী ও কৃষকশ্রেণীর যুক্তফ্রণ্ট; এই যুক্তফ্রণ্টই পারে সংগ্রামী মধ্যবিত্তশ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং যার সাথে ঐক্য সম্ভব সাময়িকভাবে হলেও তার সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে। এ কাজ করতে পারে একমাত্র বিপ্লবী পার্টি এবং পার্টি বিপ্লবী কিনা এই যুগে তার একমাত্র মানদ- হচ্ছে সেই পার্টি সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করছে কিনা।

যুক্তফ্রণ্টের নামে ভারতবর্ষে যা ঘটছে সেগুলি হল কতকগুলি প্রতিক্রিয়াশীল পার্টির ক্ষমতার জন্য জোটবদ্ধ হওয়া। এই একজোট হওয়ার একটিই লক্ষ্য, তা হল, মন্ত্রিসভা দখল হবে কিনা। এই একই দৃষ্টিভঙ্গীতে তথাকথিত বামপন্থী পার্টিগুলিও জোট বাঁধছে, যেমন বেঁধেছিল পশ্চিম বাংলায়, কেরালায়। কোনও বামপন্থা যে এদের একত্রিত করেনি তা এঁদের মন্ত্রিসভার কাজের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে এবং করলে তার প্রতিক্রিয়া হয়েছে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে, কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং বাংলাদেশে জনসঙ্ঘও শক্তিবৃদ্ধি করতে পেরেছে। বাংলাদেশে যুক্তফ্রণ্টের ৯ মাসের শাসনে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে ‘বামপন্থী’ পার্টিগুলি সবাই শ্রমিক ও কৃষকের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে বিভ্রান্ত করার কাজ নিয়েছে। এ কাজ কংগ্রেস করতে পারে না, কাজেই তথাকথিত বামপন্থী পার্টিগুলি এই দায়িত্ব নিয়েছে যাতে ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়। বাম কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ একাজ সবচেয়ে বিশ্বস্তভাবে করছে, তাই চ্যবন আজ নতুন করে বাম কমিউনিস্টদের সম্পর্কে চিন্তা করছে। চিন্তা যে করছে তার প্রমাণ পাওয়া গেল বর্ধমান প্লেনাম শুরু হতে না হতে দীনেশ সিং জ্যোতি বসুকে ডেকে গোপনে বৈঠক করলো। অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস জ্যোতিবাবুদের নির্দেশ দিলো চায়ের কাপে তুফান তোল কিন্তু বাগ (Split) হতে দিও না। বর্ধমানে আমরা মালিকদের বেটনে সেই বাঁদর নাচ দেখলাম। বাংলাদেশের যুক্তফ্রণ্ট আমলে আমরা কংগ্রেসী খাদ্য নীতি চালু হতে দেখেছি। এবং তার দায়িত্ব মন্ত্রিসভার বাঘা বাঘা বিপ্লবীরা নির্বিকারে প্রফুল্ল ঘোষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলো। মন্ত্রিসভায় প্রফুল্ল ঘোষের যদি একটি শ্রেণীর স্বার্থ দেখার অধিকার থাকে, তা হলে দরিদ্র কৃষক শ্রেণীর স্বার্থ দেখার অধিকার হরেকৃষ্ণ কোঙারের থাকলো না কেন? কারণ দরিদ্র কৃষকদের স্বার্থ হরেকৃষ্ণবাবুদের শ্রেণীস্বার্থ বিরোধী। কাজেই প্রত্যেকটি যুক্তফ্রণ্টের শরিক দরিদ্র শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণীর শত্রু, কাজেই প্রত্যেকটি যুক্তফ্রণ্টের শরিক দরিদ্র শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণীর শত্রু, কাজেই প্রত্যেকটি যুক্তফ্রণ্টের শরিক দরিদ্র শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণীর শত্রু, কাজেই যুক্তফ্রণ্টে কোনও বিরোধ হয় নি, এবং এই শ্রেণীশত্রুতার ভিত্তিতেই এই ফ্রণ্ট গড়ে উঠেছে। বিহার, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান বা মাদ্রাজে এই যুক্তফ্রণ্টের শ্রেণী চরিত্র বুঝতে বিশেষ অসুবিধা হয় না, কারণ সামন্ত শ্রেণীগুলি ও প্রতিক্রিয়াশীল পার্টিগুলির সহযোগিতায় এই যুক্তফ্রণ্ট গড়ে উঠেছে। একজন বা দুজন বাম বা ডান কমিউনিস্ট এই মন্ত্রিসভায় ঢুকে তাদের নিজেদেরই শ্রেণীচরিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলা বা কেরাল এই যুক্তফ্রণ্টকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করার দরকার আছে, কারণ ও’দুটো জায়গায়ই বামপন্থী কমিউনিস্টরাই বৃহত্তম দল। ফলে ও’দুটো জায়গায় এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে পার্টিগতভাবেই এই কমিউনিস্টরা কমিউনিস্ট নামের অযোগ্য এবং এরা দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল ও সংশোধবাদী সোভিয়েত নেতৃত্বের পোষা কুকুর। বর্ধমান প্লেনামে এই স্বরূপ যাতে বেশী প্রকাশ হয়ে না পড়ে তাই দীনেশ সিং দেশী ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার পক্ষ থেকে জ্যোতি বসুকে সজাগ করে দিতে এসেছিল। কাজেই বর্ধমানে আন্তর্জাতিক সংশোধনবাদের চক্রান্ত সফল হয়েছে। তারা নিঃশ্বাস ফেলে বেঁচেছে যে সাময়িকভাবে হলেও ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতাকে একটা ধোঁকা দেওয়া গেছে। এখন তারা সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে পার্টির বিপ্লবী অংশের বিরুদ্ধে এবং সেখানেও তারা প্রয়োজনবোধে তাদের অনুচর প্রবেশ করিয়ে রাখবে যাতে সময় বুঝে সমস্ত নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কার্যক্রমকে ভিতর থেকে বানচাল করে দেওয়া যায় এবং বিপ্লবী অংশকে লোকচক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করা যায়। এ কৌশলও আন্তর্জাতিক সংশোধনবাদ অনেকদিন প্রয়োগের মারফৎ শিখেছে। কাজেই ‘উদারনীতির বিরুদ্ধে লড়াই কর’ [Combat libralism] নামক চেয়ারম্যানের লেখাটা আজ প্রত্যেকটি বিপ্লবীর অবশ্য পাঠা এবং তা ছেকে শিক্ষা গ্রহণ করাও অবশ্য কর্তব্য। চীনের মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে, আভ্যন্তরীণ সংগ্রাম একটা অবশ্য করণীয় কাজ। একাজে গাফলতি করলে ফল অনিবার্যভাবে বিপ্লবের বিরোধীদের পক্ষে চলে যায়।

বিপ্লবী পার্টির যুক্তফ্রণ্ট গড়তে গেলে প্রথমেই দরকার দেশের আভ্যন্তরীণ শ্রেণীগুলির বিচার করা। আমরা জানি, আমাদের দেশের বিপ্লব নয়াগণতান্ত্রিক, কারণ গণতান্ত্রিক বিপ্লব আমাদের দেশে অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। বুর্জোয়াশ্রেণী এই গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে পারে না। ২/১ টা ছোট দেশে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে ফিদেল কাস্ত্রোর মতো পোর্টি-বুর্জোয়াশ্রেণীর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সাময়িক সাফল্য অর্জন করতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান কাজ সামন্তশ্রেণীর হাত থেকে সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে জমি জাতীয়করণের ভিত্তিতে পুরোপুরি ধনতান্ত্রিক বিকাশ আজকের যুগে সে দেশেও সম্ভব নয়। কাজেই কাস্ত্রো জমি ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ না করে, বিপ্লবের ফাঁকা বুলি আওড়ে যাচ্ছেন এবং দেশকে একটা না একটা বৃহৎ শক্তির তাঁবে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। আলজেরিয়ার বিপ্লবেরও মূল শিক্ষা এটাই। ভারতবর্ষের মতো বিরাট দেশে পোটি-বুর্জোয়ার নেতৃত্বে বিপ্লব সফল করার স্বপ্ন দেখা নেহাৎই কল্পনা-বিলাস। এখানে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হতে পারে একমাত্র নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মারফৎ। নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলছি কাকে? যে বিপ্লব শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে ব্যাপক কৃষকশ্রেণীর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশী ও বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম মারফৎ সফল হতে পারে। এই বিপ্লব বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর মিত্র কে? মূলত: সমগ্র কৃষকশ্রেণী অর্থাৎ দরিদ্র, ভূমিহীন কৃষক ও ব্যাপক মধ্যকৃষক। ধনীকৃষকের একটা অংশও সংগ্রামে একটা বিশেষ স্তরে যোগ দিতে পারে। এবং এর সাথে থাকবে মেহনতী মধ্যবিত্তশ্রেণী। এই মুখ্য তিনটি শ্রেণী বিপ্লবের প্রধান শক্তি এবং এই তিনটি শ্রেণীর মছ্যে কৃষকশ্রেণীই সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণী হওয়ায় তাদের উপরই বিপ্লব প্রধানত: নির্ভরশীল। ঐ মূল শ্রেণীকে কতখানি বিপ্লবের পক্ষে আনা গেল তারই উপর বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কাজেই শ্রমিকশ্রেণীকে নেতা হিসাবে এবং মধ্যবিত্তশ্রেণীকে বিপ্লবী শ্রেণী হিসাবে এই কৃষকশ্রেণীর সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সেই ঐক্যই হবে যুক্তফ্রণ্ট। যুক্তফ্রণ্টের এটাই একমাত্র মার্কসবাদী ব্যাখ্যা।

এই বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রাম মারফৎ যে যুক্তফ্রণ্ট গঠিত হবে, সেই বিপ্লবী পার্টিই বিভিন্ন জাতীয় অভ্যুত্থানগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। বিভিন্ন পোর্টি-বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে যে সব জাতীয় সংগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলির বিজয় নির্ভর করে কতখানি এইসব জাতীয় আন্দোলনগুলি শ্রেণীসংগ্রামে পরিণত হচ্ছে এবং কতখানি শ্রেণী-সংগ্রামে তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে তারই উপর সম্পূর্ণ বিজয় নির্ভর করছে। এইসব জাতীয় সংগ্রাম সম্পর্কে বিপ্লবী পার্টিকে খুবই দ্ব্যর্থহীন ভাষার ঘোষণা করতে হবে যে, সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং প্রত্যেকটি জাতিসত্ত্বার স্বাধীন ও স্বতন্ত্র হওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে এবং থাকবে। এই নীতির মাধ্যমে একটি বিপ্লবী পার্টি স্বচ্ছন্দে নাগা…মিজো প্রভৃতি জাতীয় সংগ্রামগুলির সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। এবং এরকম যুক্তফ্রণ্ট গড়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে যে প্রত্যেকটি জাতি-সত্ত্বা সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করছেন। অনেকের ধারণা আছে, কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনের নেতা হবে এবং সেই জাতিসত্ত্বাগুলির আন্দোলনের সময়ই হবে নায়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব। এই চিন্তাধারা ভুল। কমিউনিস্টরা জাতীয় আন্দোলনের নেতা হবে না। যেখানে জাতীয় সংগ্রাম আছে কমিউনিস্টরা তাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হবেন, কিন্তু কমিউনিস্টদের দায়িত্ব শ্রেণী-সংগ্রাম গড়ে তোলা-জাতীয় সংগ্রাম নয়। শ্রেণী-সংগ্রামে বিভেদ দূর কারর জন্য কমিউনিস্টদের ঘোষণা করতে হবে; প্রত্যেকটি জাতিসত্ত্বার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, এমন কি বিচ্ছিন্ন হবার অধিকার রয়েছে। এই আওয়াজ খন্ড জাতিগুলিকে একটা শোষণ থেকে আর একটা শোষণের খপ্পরে পড়ছি না-এই বিশ্বাস দেবে। এবং তখনই কেবল তারা শ্রেণী সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করতে পারে। আমরা যদি জাতীয় আন্দোলনের নেতা হবার চেষ্টা করি তাহলে আমরা সে নেতা হতে পারবো না; আমরা বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার পোর্টি বুর্জোয়ার লেজুড়ে পরিণত হব। এই ঘোষণার পর শ্রেণী-সংগ্রামের নেতা হিসাবে আমরা যতই এগিয়ে যাব ততই বিভিন্ন জাতী-সত্ত্বার সংগ্রামের চরিত্র পরিবর্তিত হতে থাকবে; এবং বিজয়ের পূর্ব মূহুর্তে প্রত্যেকটি জাতিসত্ত্বার আন্দোলন শ্রেণী সংগ্রামে রূপান্তরিত হবে।

২০শে মে, ১৯৬৮

 


কৃষক বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত

Screenshot_2016-11-16-17-07-17-1

লিখেছেনঃ স্বপন কুমার চক্রবর্তী

প্রথম সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৭)

উপমহাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-সমাজ ধ্বংসের সূত্রপাত ঘটায় । পলাশী যুদ্ধের পূর্বে উপমহাদেশের ভূমি ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী অনুপস্থিত ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভারতের সনাতন জীবনধারার গতিরোধ করে সমাজ জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে। ১৭৯৩ সালে এই প্রথা চালু করার ফলে বঙ্গদেশে বংশপরস্পরায় চলে আসা স্বাধীন কৃষিকাজ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। মোঘল শাসনকালে জমির ওপর মালিকানা ছিল না। তা সত্ত্বেও কৃষকের উৎপাদিত ফসলের কিছু অংশের দাবি কমও ছিল না মোঘল শাসকদের। আকবরের আমলে কৃষক উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশ ফসলের রাজস্ব দিত। সেটাই আওরঙ্গজেবের আমলে হয় দুই তৃতীয়াংশ। মোঘল যুগের জাকজমকের যোগানদার ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষক জনতাই। বাণিজ্যিক পণ্যের চাষ করার মূল উদ্দেশ্য হলো রাজস্ব বৃদ্ধি করা। তাই কৃষকের ওপর শোষণ অত্যাচারের সীমা ছিল না মোঘল শাসনকালেও। এই সমস্ত কারণে মোঘল শাসনকালেও অত্যাচারিত কৃষক বারংবার বিদ্রোহ করেছিল।

কৃষকের জমির ওপর ভোগদখলের অধিকার মোঘল শাসনকালে স্বীকৃত ছিল। মোঘল শাসকেরা বুঝেছিল কৃষকের শ্রম ছাড়া সম্পদ সৃষ্টি হবে না। আর এই সম্পদই মোঘল শাসন টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ।

ভারতীয় উপমহাদেশের পাঁচশো বৎসরের সমাজ জীবনে জমিদার শ্রেণি কৃষি অর্থনীতিতে জড়িয়ে আছে। এই জমিদার শ্রেণি ইংরেজদের সৃষ্ট নয়। সুলতানি আমলে এই শ্রেণির জন্ম নয়। আমাদের দেশের কৃষি অর্থনীতি নির্ভর সমাজ জীবনে মোঘল শাসনকালেই রাজস্ব আদায়ের জন্য জমিদার নিযুক্ত হয়।

বাংলাদেশের জমিদারেরা নির্দিষ্ট হারে মোঘল সরকারকে রাজস্ব দিত। জমিদারেরা জমির মালিকানার অধিকারী ছিল না। জমিদারের খাজনা আদায় আর মোঘল শাসককে দেয় রাজস্বে কিছু ফারাক ছিল। এই ফারাকটুকুই জমিদারের লাভ। গ্রামের কৃষকদের জমির মালিক জমিদার কখনই ছিল না।

মোঘল শাসন ব্যবস্থায় কৃষকদের জমি হইতে উৎখাতের চেয়ে জমিতে চাষের উৎসাহ দেয়া হতো। জমির ওপর কৃষকদের অধিকার ছিল চিরস্থায়ী। ধারাবাহিকভাবে বংশ পরস্পরায় তারা জমি ভোগদখল করতো। জমি এবং উৎপাদিত ফসলের অধিকার মোঘল শাসক জমিদারের ছিল না। অধিকার ছিল শুধু সামান্য রাজস্ব নেবার। জমির উপর কৃষকের অধিকার ছিল চিরস্থায়ী। ১৭৯৩ সালের ইংরেজ শাসকের চালু করা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঠিক বিপরীত ব্যবস্থা উপমহাদেশের সমাজজীবনে।

ইংরেজরা মোঘল সম্রাটের নিকট থেকে রাজস্ব আদায়ের ফরমান লাভ করে ১৭৬৫ সালে। শুরু হয় নগ্ন বর্বরতা আর সীমাহীন লুণ্ঠন, রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। কৃষকদের ওপর বলপূর্বক রাজস্ব আদায়ই ছিল ইংরাজদের পদ্ধতি। রাজস্ব আদায় ছাড়া ছিল আমলা, দালালদের অত্যাচার।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বহুমুখী উদ্দেশ্য সাধন করেছিল ইংরেজ শাসনের (১) ঔপনিবেশিক শাসনের স্থায়ীত্ব বৃদ্ধি (২) শিল্প পুঁজির কাঁচামাল ভারতীয় উপমহাদেশ হতে সংগ্রহ (৩) ক্রমবর্ধমান কৃষক বিদ্রোহ হতে ইংরেজ শাসকদের রক্ষা করার জন্য জমিদার নামক শ্রেণিকে জমির বন্দোবস্ত দিয়ে চড়া হারে রাজস্ব আদায় এবং সমস্ত অপকর্মের স্থায়ী সঙ্গী হিসাবে ব্যবহার করা।

ইংরেজ সৃষ্ট ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা উচ্ছেদ জমিদারের কখনও কাম্য ছিল না। কারণ লুণ্ঠিত সম্পদের উচ্ছিষ্ট জমিদারেরাও ভোগ করতো। প্রায় দুইশত বৎসরব্যাপী ইংরাজ শাসন চলাকালীন কৃষক বিদ্রোহে জমিদারেরা একই ভূমিকা পালন করেছে। কৃষক বিদ্রোহকে জমিদারেরা যেমন ভয় করতো, সেইরূপ আতঙ্কিত দালাল ইতিহাস লেখকরাও ভয় করতো। কৃষক বিদ্রোহ যে মূলত স্বাধীনতার সংগ্রাম তা স্বীকার করলেই লুক্কায়িত ঝোলা হতে বিড়াল বেরিয়ে আসে। 
ইংরেজ শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার এবং তার ঔরসজাত শিক্ষিত সম্প্রদায় তৎপরতার সাথে তার জন্মদাতা ইংরেজ প্রভুর নির্দেশ পালন করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকদের সম্পর্কে উপমহাদেশ ব্যাপী আজও অনেক অন্ধকার। কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসই একমাত্র এদের স্বরূপ উন্মোচিত করতে পারে।

সাঁওতালদের পরিচয় 
ইতিহাসের সমস্ত বিদ্রোহের মতই সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ইংরেজ জমিদার, সুদখোর মহাজন শ্রেণির আর্থিক শোষণ উৎপীড়নের অনিবার্য পরিণতি। কোন দেশ হতে কবে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী উপমহাদেশে এসেছিল সে সম্পর্কে ইতিহাস নীরবতা পালন করেছে। গাঙ্গেয় সমতট এই উপমহাদেশের বিহার রাজ্যেই তারা প্রথম বসতি স্থাপন করে। 
জঙ্গল পরিষ্কার করে, জমি চাষযোগ্য করে, হিংস্রর জন্তুর মোকাবিলা করে, কৃষিকাজে মনোনিবেশ করে। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে সরল অনাড়ম্বর জীবনে কয়েক হাজার বৎসর অতিবাহিত করে। কৃষিকাজ, বনজ সংগ্রহ এবং বিনিময় প্রথার মাধ্যমেই তাদের দিন অতিবাহিত হতো।

ধীরে ধীর সমগ্র বিহার এবং উপমহাদেশের সমস্ত প্রদেশ ইংরেজদের গ্রাসে পড়ল। সনাতন সমাজ জীবনে অভ্যস্ত সাঁওতালদের জীবনে নেমে আসে আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়। মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতি সাঁওতালদের জীবনে অমানুষিক শোষণ উৎপীড়নের ব্যবস্থা কায়েম করল।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদাররা জঙ্গলের মালিক হলো। জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি চাষাবাদ করার জন্য প্রচুর শ্রমিক প্রয়োজন হলো। এভাবেই সাঁওতালেরা ছড়িয়ে পড়ে বীরভূম, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, ভাগলপুর, দুমকা, পাকুড়, পুর্ণিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে। সাঁওতাল পরগণাই ‘দামিনই কো’ অঞ্চল- সভ্য মানুষের পদার্পণ ঘটেনি এ অঞ্চলে। কায়িক শ্রমই ছিল তাদের পুঁজি, ঘাম, মেহনত বিনিয়োগ করে সাঁওতালরা সোনার ফসল ফলায়। বন্য হিংস্রর জন্তুর মোকাবেলা নিত্য দিনের ব্যাপার। ভদ্র, সভ্য মানুষদের অমানুসিক আচরণের সাথে কালো অসভ্য সাঁওতালরা অপরিচিত। ইংরেজ বণিকের প্রগাঢ় কপটতা, ছলনা, ষড়যন্ত্র, শৃগালের ধূর্ততা, হায়েনার লালসার সঙ্গে তাদের অনেক পরে পরিচয় হয়েছিল। 
আর্য আক্রমণকারীরা গাঙ্গেয় সমভূমিতে বহুবার আক্রমণ করে সফল হতে পারেনি। চম্পারণ (চম্পাদেশ) এলাকায় বসবাস করার সময়ও সাঁওতাল সর্দারেরা সামান্য পরিমাণে খাজনা দেওয়া ছাড়া স্বাধীনই ছিল। সরলতাপূর্ণ জীবন, অতীত স্বাধীন জীবন ছিল তাদের সমাজ জীবনের বৈশিষ্ট্য।

নিদ্রাভঙ্গের পর্ব
মহাবিদ্রোহ আরম্ভ হতে তখনও কিছু সময় বাকি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফল উপমহাদেশের আর্থিক, রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থার ওপর তীব্র কষাঘাত করছে। বিদেশি শাসকগণের বিরুদ্ধে লাগাতার কৃষক বিদ্রোহ শতবর্ষ পার করবে। অবিচারের কৃপাণ মেঘ বাংলা বিহারের আকাশ আচ্ছন্ন করে ফেলে। শারীরিক নির্যাতন করে জমিদার গোষ্ঠী সাঁওতালদের উৎপাদিত ফসলের সিংহভাগ কেড়ে নিতে শুরু করল। ফসলের যে সামান্য অংশটুকু সাঁওতালেরা ভাগে পেত ওই সামান্য ফসলটুকু দিয়ে স্ত্রী পুত্র, কন্যা, পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাছাড়া মুদ্রাভিত্তিক ক্রয় বিক্রয়, সাঁওতাল বিনিময় প্রথার অবসান ঘটায়। ব্যবসায়ী মহাজন নামক শ্রেণিটিও মুদ্রা ব্যবস্থা চালুর সঙ্গে সঙ্গেই এ অঞ্চলে উপস্থিত হলো। মুদ্রা ব্যবস্থা ভাল করে সাঁওতালরা বুঝে ওঠার আগেই মহাজন ব্যবসায়ী শ্রেণি অল্প মূল্যে ফসল ক্রয়ের নামে শুরু করে অবাধ লুণ্ঠন। ইংরেজ শাসকেরা লুণ্ঠনকারীদের প্রশ্রয় দিল।

খ্রিষ্টান ধর্মযাজকেরা সাঁওতাল পরগণায় তখনও পৌঁছায় নাই। সুদখোররাও জমিদার মহাজনদের মতই চড়া সুদে টাকা ধার দিতে শুরু করে সাঁওতালদের। অল্প সময়েই সাঁওতালদের সর্বস্বান্ত করে সুদখোররা মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলে। গো-শকট নৌকা ইত্যাদির পরিবহনের মাধ্যমে সাঁওতালদের ঘাম মেহনতে উৎপন্ন সোনালী ফসল ধান, সরিষা ইত্যাদি মুর্শিদাবাদ, কলিকাতা এমন কী খোদ ইংল্যান্ডে রপ্তানি হতে শুরু হয়।

কোন ঘটনাই একদিনে ঘটে না। প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার পশ্চাদে থাকে দীর্ঘ দিনের কান্না, ঘাম, রক্তের ইতিহাস। জমিদার গোষ্ঠী জমি, ফসল ছিনিয়ে নেয় । সুদখোর মহাজন চড়া সুদে টাকা খাটায়। সুদ দিয়ে ঋণ কোন দিন শোধ হবার নয়। ঋণ শোধ করতে না পারলে মহাজন ধরে নিয়ে বেগার খাটায়। ক্রীতদাসে পরিণত করে সমগ্র পরিবারকে। সামান্য ঋণ এক জীবনে শোধ হয় না। আমৃত্যু সাঁওতাল পরিবার পরিজনদের জমিদার, সুদখোর মহাজনের ক্রীতদাস হয়ে থাকতে হয়।

প্রবাদ আছে পশুরাজ ক্ষুধা ছাড়া শিকার করে না। সীমাহীন অত্যাচার, নির্মম, ভীষণ শোষণের রথের চাকায় পিষ্ট হয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ঘুমন্ত সিংহ, প্রকৃতির সন্তান সাঁওতালদের কয়েক শতাব্দীর ঘুম ভেঙে গেল। এই ঘুম ভাঙার কণ্ঠস্বর অচিরেই সমগ্র সাঁওতাল এলাকায় লক্ষ কণ্ঠের গর্জনে রূপান্তরিত হলো।

অবশেষে শত্রু নির্বাচন
নরপশুর অত্যাচার সনাতন, সরল, জীবনের গর্ভে জন্ম নিল এক প্রচ- শক্তি। যার ভিতর ছিল পৌরুষের আগুনে ঝলসানো এক গৌরবগাঁথা, মাদলের ঝঙ্কার। সেই উন্মাদ নির্মম মাদলধ্বনি মুক্তির ধারার বেগে ধাবিত হয়ে কাঁপিয়ে তোলে বিদেশি ইংরেজ শাসনের অহংকারের স্তম্ভ, তাদের (ইংরেজদের) আজ্ঞা অনুগ্রহধন্য জমিদার, সুদখোর মহাজন, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, পরিশেষে সমাজ সংস্কারক দালাল চরিত্রের বুদ্ধিজীবীদের। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সাঁওতাল কৃষক জনতা চিনতে ভুল করে নাই তাদের পরাধীন জীবনের মূল শত্রু বিদেশি ইংরেজ শাসক। এই সারমেয়কূল ইংরেজদের শক্তিতে বলীয়ান।

বিদেশি লেখকদের বিবরণ
উপমহাদেশের শিক্ষিত সমাজ সংস্কারক বুদ্ধিজীবী হিসাবে ইংরেজ যাদের আমাদের সাথে পরিচয় করে দিয়েছে, তারা কেহই অশিক্ষিত সাঁওতাল কৃষক জনতার স্বাধীনতার সংগ্রামের কাহিনী লেখেন নাই। ওই সময়ের বিভিন্ন জেলার গেজেট, লোকমুখে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সংগ্রামের স্মৃতিচারণ প্রভৃতি সংগ্রহের মাধ্যমে মহান সাঁওতাল বিদ্রোহের কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে।

স্যার উইলিয়াম হান্টার ‘এনালস অফ রুরাল বেঙ্গল’ নামে সাঁওতাল বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে একটি বিরাট পুস্তক রচনা করেছিলেন- ‘এই সকল কথা লেখার পিছনে সাহেবের ছিল এক দুষ্ট মতলব। ওই সাহেব কোথাও ইংরেজ শাসনের নামও করেন নাই, অথবা সাঁওতালদের এই চরম দুর্দশার জন্য ইংরেজদের দায়ীও করেন নাই। সাঁওতালদের ওপর ইংরেজ শাসকদের অমানুষিক অত্যাচার ও শোষণ গোপন রাখার জন্য-ই ওই সাহেব সকল দোষ ইংরেজ শাসকদের ভাড়াটিয়া দালালদের ওপর চাপিয়েছেন। কিন্তু ওই সাহেবরাই আবার স্বীকার করেছে যে, ওই অঞ্চলের ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারকগণ যে কেবল খাজনা আদায় করেই সাঁওতালদের সর্বস্বান্ত করতেন তাই না, তারা সরাসরি লুটের বখরাও আদায় করতেন। যা হোক উক্ত সাহেবের এই বিবরণটি সাঁওতালদের চরম দুর্দশা ও দুর্ভাগ্যের কথা বুঝবার পক্ষে যথেষ্ট। 
উপরিউক্ত বিবরণ কী ভয়ঙ্কর অবস্থার ইঙ্গিত করে ভাবলেও শিহরণ জাগে। ন্যায় বিচার পাবার জন্য তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন ছিল না। সবাই মিলে যুক্ত হয়ে নিরীহ নিষ্পাপ সাঁওতালদের ওপর পশুর মত অত্যাচার করেছে। স্যার উইলিয়াম হান্টারের বিবরণ পরিষ্কার ইংরেজ শাসনের চিত্র অঙ্কন করেছে।

মহান সমাজ বিজ্ঞানী কার্ল মার্কস যথার্থই বলেছেন, “বিকাশ হইতে সমাজে এমন এক অবস্থার উদ্ভব হয় যে, তখন উৎপাদনের বাস্তব শক্তিসমূহের সহিত উৎপাদন সম্বন্ধ ও সম্পত্তি সম্বন্ধের বিরোধ আসিয়া যায়। ইহার ফলে এতদিন যাবৎ যে অবস্থা উৎপাদন শক্তির সহায়ক হইয়াছে, তাহাই আবার নতুন অবস্থায় সেই শক্তির বিকাশের পথে বাধা হিসাবে দেখা দেয়। এইভাবে সমাজে বিপ্লবের মুহূর্ত ঘনাইয়া আসে। তাহার পূর্বতন আর্থিক ভিত্তি বদল হইয়া যায় এবং উহার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের উচ্চাঙ্গের সমগ্র গঠনও পরিবর্তিত হইয়া পড়ে।”

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রয়োগের ফসল মধ্যবর্তী শোষক ও নতুন আর্থিক রীতি। এর ফলে পরিবর্তন হয়ে গেল সাঁওতাল সমাজের জনতান্ত্রিক উৎপাদন রীতি, যা ছিল বিদ্রোহীদের মূল আর্থিক বুনিয়াদ। সাঁওতালদের বিদ্রোহের মূল কারণ বিচার করতে হবে পরিবর্তিত উৎপাদন পদ্ধতি, আর্থিক রীতির নিরিখে।

ভারতে ইংরেজ শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে মহান মার্কস তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্তব্য করেছেন, “স্বদেশে যা ভদ্র রূপ নেয় এবং উপনিবেশে গেলেই যা নগ্ন হয়ে আত্মপ্রকাশ করে, সেই বুর্জোয়া সভ্যতার প্রগাঢ় কপটতা এবং অঙ্গাঙ্গী বর্বরতা আমাদের সামনে অনাবৃত।”

হুল বিদ্রোহ শুরু
এক শতাব্দীর কৃষক বিদ্রোহের ধারাবাহিকতার রূপ হলো সাঁওতাল বিদ্রোহ। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ সমাপ্ত হয়ে ওয়াহাবি বিদ্রোহ শুরু হয়, এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে সমগ্র উত্তর ভারতে দাবানল আকারে ছড়াইয়া পড়ে। সৈয়দ আহম্মদদের আদর্শে অনুপ্রাণিত ওয়াহাবি বিদ্রোহীরা পেশোয়ার হতে বঙ্গদেশ পর্যন্ত জীবনপণ সংগ্রাম করেছিল বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে। বাংলা বিহারের ওয়াহাবি বিদ্রোহীরা কৃষকদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশীদার হবার জন্য সাঁওতালরাও বিদ্রোহ করে। দীর্ঘ অত্যাচার বিদ্রোহীদের নির্মম আঘাতের শক্তি যোগান দেয়। সাঁওতাল বিদ্রোহীরা তাদের ‘দামিন ই কো’র স্বাধীনতা রক্ষার্থে বিদেশি ইংরেজ জমিদার সুদখোর, মহাজন, পুলিশ আমলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্মম আঘাত হেনে বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটাল। শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়।

পরাধীন জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য সুসংবদ্ধ রাজনৈতিক দল তখনও অনুপস্থিত। স্বাধীন সাঁওতাল রাজ গড়ার সংগ্রামই তাদের নেতার জন্ম দিয়েছিল। দেশি বিদেশি শোষক শয়তানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছাড়া অন্য কোন পথ তাদের সামনে ছিল না। অর্থনৈতিক শোষণ, উৎপীড়ন হতে মুক্তির পথ সাঁওতালরাই ঠিক করিল, “আক্রমণই দেশি বিদেশি শাসকদের লুণ্ঠন শোষণের অবসান ঘটাবে।” নিজভূমে পরবাসী হয়ে বাঁচার দরকার হবে না। 
স্বাধীন সাঁওতাল রাজ ফিরিয়ে দেবে আমাদের হারানো মাটি, ঘরবাড়ি, ক্ষেতখামার, লুণ্ঠিত সম্মান, হারানো বিশাল বনভূমি। হুল হুল রবে মাদলের ডঙ্কা নিনাদের অগ্নিস্ফূলিঙ্গ দাবানল হয়ে সমগ্র সাঁওতাল মহলে ছড়িয়ে পড়লো। এই বিদ্রোহে অন্যান্য মেহনতি শ্রেণি, বঞ্চিত সর্বহারার দল বিদ্রোহীদের সমর্থনে সীমাহীন আত্মত্যাগ করে বিদ্রোহীদের জয়যুক্ত করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসে। আদিবাসী নয় এমন শ্রেণিও উপলব্ধি করেছিল সাঁওতালদের শত্রু তাদেরও শত্রু। বঙ্গদেশের বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, বিহারের ভাগলপুর, দুমকা, ছোটনাগপুর ইত্যাদি অঞ্চলের অ-সাঁওতাল গোষ্ঠীও বিদ্রোহীদের সমর্থনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করে বিদ্রোহের শক্তি বৃদ্ধি করেছিল।

ইংরেজ লেখক ও সরকারি কর্মচারীদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো রিপোর্টে সাঁওতাল বিদ্রোহ এবং এই বিদ্রোহে অন্যান্য অ-সাঁওতাল শ্রেণির সমর্থনের উল্লেখ পাওয়া যায়।

বিদ্রোহের নেতৃত্ব 
আকাশ হতে দেবদূত এসে বিদ্রোহের নেতৃত্ব গঠন করেনি। সাঁওতাল পরগণার আকাশে বিদ্রোহের মাদলধ্বনির মধ্যে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বীর সাঁওতার বিদ্রোহীদের চারজন নেতা- কানু, সিধো, চাঁদ, ভৈরব। বিচক্ষণ এই চার নেতা সাঁওতালদের চিন্তা চেতনার গভীর পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান তদন্ত করেছিলেন বিদ্রোহের পূর্বেই। চিন্তা, চেতনার অনুসন্ধান কর্মে চার নেতাই অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

দ্রুততার সাথে সাঁওতাল জনতাকে লড়াইয়ে সামিল করার শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হল, “ভগবানের নির্দেশে সাঁওতালদের ইংরেজ ও দিকু’দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে”- এই কথা প্রচার করা। যেই কথা সেই কাজ। কানু, সিধো উভয়ে গ্রামে গ্রামে প্রচার করল, “ভগবান কাগজে লিখে নির্দেশ দিয়েছেন- সমগ্র সাঁওতাল পরগণার সাঁওতালদের রক্ত শোষক বিদেশি ইংরেজ ও তার দালাল দেশীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। স্বাধীন সাঁওতাল রাজ কায়েম করতে হবে। যে এই যুদ্ধে শামিল হবে না সে ভগবানের নির্দেশ অমান্য করবে। সে সমগ্র সাঁওতাল সমাজের শত্রু।”

কানু, সিধো গ্রামে গ্রামে সংঘবদ্ধতার প্রতীক শালগাছের ডালসহ ভগবানের নির্দেশ কাগজে লিখে পাঠিয়ে দিলেন।

ভারতীয় সমাজে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হলেও ধনতন্ত্রের বিকাশ অতি মন্থর। জনজীবনে ধর্ম তখনও গভীর রেখাপাত করতো। পৃথিবীর সমস্ত দেশে স্বাধীনতা জনতার সংযোগও অংশগ্রহণ ধর্মীয় আহ্বান দ্বারাই সংগঠিত হয়েছিল। অন্য কোন পদ্ধতি ছিল অজানা। কানু, সিধো তৎকালীন আর্থ সামাজিক পরিস্থিতিতে ধর্ম, ভগবান- এর নামে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ডাক দিয়ে সমগ্র সাঁওতাল, অ-সাঁওতাল কৃষকদের সংগ্রামে সামিল করাতে সক্ষম হয়েছিল। সেই সময়ের নিরিখে এটাই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।

অগ্নিগর্ভ সাঁওতাল পরগণা ১৮৫৫
মহেশলাল দত্ত তখন দিঘি থানার দারোগা। ইংরেজ শাসক, জমিদার, সুদখোর মহাজনদের স্বার্থ রক্ষার্থে অত্যধিক তৎপর। অপরদিকে স্বাধীনতা হারিয়ে সাঁওতালেরা বীরসিং মাঝি নামক এক সাঁওতাল সর্দারের নেতৃত্বে ‘দিকু’দের বাড়ি বাড়ি ডাকাতি ও লুণ্ঠন আরম্ভ করে দিল। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত অত্যাচার, অবিচারের প্রতিহিংসাই তাদের বাধ্য করলো এই কর্মে। জমিদার, মহাজন দারোগাকে অভিযোগ করল। দারোগা যথেষ্ট সংখ্যক পুলিশ থানায় না থাকায় এক্ষেত্রে অভিযোগের প্রতিকার করতে তৎপর হতে পারে না। পাকুড়ের জমিদার বীরসিং মাঝিকে আটক করে অত্যধিক নির্যাতন করেছিল। দলনেতার প্রতি অত্যাচারে ক্ষিপ্ত হয়ে বিদ্রোহী সাঁওতালরা প্রতিশোধ নিল কিছু মহাজনের বাড়ি লুট করে।

জমিদার, মহাজন উপরমহলে অভিযোগ করে। উপরমহল তখন বাধ্য হলো মহেশলাল দত্তকে প্রচুর পুলিশ পাঠাতে। নতুন পুলিশের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দারোগা বিদ্রোহী সাঁওতালদের আক্রমণ করে। অবস্থাপন্ন এক সাঁওতাল গোক্কোকে চুরির অভিযোগে দারোগা বেশ কিছু সঙ্গীসহ গ্রেফতার করে। কিন্তু মিথ্যা অভিযোগে গোক্কো গ্রেফতার হলেও শত চেষ্টা করেও দারোগা অভিযোগ প্রমাণ না করতে পেরে, বাধ্য হলো গোক্কোকে মুক্তি দিতে। সাঁওতালেরা দারোগার কার্যকলাপে আরও ক্ষুব্ধ হলো। শত বৎসরব্যাপী ইংরেজ বিরোধী কৃষক বিদ্রোহের কিছু সংবাদ এ অঞ্চলে এসে পড়েছে। তারা বিদ্রোহ আরম্ভ করার অপেক্ষায় সতর্ক হয়ে সমস্ত প্রস্তুতি সমাপ্ত করেছিল।

সমুদ্র কল্লোল, সমুদ্র কল্লোল শোন, শোন শোন রে…
বিদ্রোহ বিদ্রোহ বিদ্রোহ ….. চারিদিকে বিদ্রোহ রে …
১৮৫৫ সালের ৩০ জুন। সূর্য অস্ত যেতে তখনও খানিক দেরি আছে। অস্তগামী সূর্যের প্রভাবে আকাশ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। উত্তপ্ত আকাশ, বাতাস ভগনাদিহি গ্রামে। পরিষ্কার উঠানে বসে আছেন সাঁওতাল বিদ্রোহের বীর চার নায়ক। আম সভার দিন আগেই ঠিক করে ভগবানের নির্দেশ লেখা কাগজ ও শাল ডাল প্রায় চার শত গ্রামে পাঠান হয়েছিল। দশ হাজার আদিবাসী ঘরোয়া অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কিছু খাবার সঙ্গে নিয়ে ভগনাদিহি গ্রামে উপস্থিত হলো। কানু সিধো সমবেত সাঁওতালদের সামনে জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। উভয়ের বক্তব্যের মূল কথায় দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অত্যাচার, শোষণের বিরুদ্ধে আগুন ঝরে পড়তে লাগল। স্বাধীন সাঁওতালেরা কিভাবে পরাধীন জীবনযাপন করছে, কারা তাদের জীবন ঢেকে দিয়েছে অত্যাচারের ঘন অন্ধকারের আবরণে, তাদের উভয়কে চিহ্নিত করে দিল। তাদের বক্তব্যের প্রখরতায় সাঁওতালদের মনে পড়ে গেল দীর্ঘদিনের ফসল লুণ্ঠন, নারীর ইজ্জত সম্ভ্রম হরণের এক বিরাট পাহাড় তাদের বুকে চেপে আছে। ভয়াবহ বিবরণ প্রতিশোধ স্পৃহার আগুনে ঘি ঢেলে দিল। কানু, সিধো বললেন, “ভগবান নির্দেশ দিয়েছেন সাঁওতাল এলাকা হতে সমস্ত ইংরেজ দিকু’দের উৎখাত করে স্বাধীন সাঁওতাল রাজের লড়াই একমাত্র কর্তব্য। ভগবানের এই নির্দেশ যে পালন করবে না সে সাঁওতালদের শত্রু, ইংরেজ দিকু’দের বন্ধু।

দাসত্বের অসহনীয় পীড়নে লাঞ্ছিত সাঁওতালেরা কানু, সিধোর কথা শুনে নতুন করে বাঁচার আশা ভরসা পেল। দশ হাজার সাঁওতাল গর্জন করে সমর্থন জানালো প্রতিকারের পন্থার উপায়ে। এক স্থানে দাঁড়িয়ে শপথ গ্রহণ করলো ‘দাসত্ব নয়, চাই স্বাধীনতা, স্বাধীন সাঁওতাল রাজ’ মাদলের শব্দে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল স্বাধীন সাঁওতাল রাজ গড়ার ঘোষণা।

কানু, সিধোর অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতায় শিক্ষিত যুবক কির্তা, ভাদু, সুন্নো মাঝি তাদের দুই নেতার নির্দেশে চরমপত্র দিল, পনেরো দিনের মধ্যে সাঁওতাল এলাকায় অত্যাচার অবিচার অবসানের জন্য। কিন্তু অত্যাচারী বিদেশি শাসক ও তার দালাল জমিদারদের নিকট হতে কোন উত্তর আসলো না। ঘরোয়া হাতিয়ারে সজ্জিত সাঁওতার জনতা সদাসতর্ক। স্বাধীনতার স্পৃহা কেউ-ই রোধ করতে পারবে না। যে কোন মুহূর্তে আরম্ভ হবে মহাসমর। 

পাঁচ ক্ষেতিয়া বাজারে কানু, সিধো সাঁওতাল জনতার মাঝে প্রচার করার সময় উক্ত বাজারের সুদখোর মহাজনরা বিদ্রোহী সাঁওতালদের ওপর আক্রমণ করে। বিক্ষুব্ধ জনতা কানু, সিধোর নেতৃত্বে কুখ্যাত ৫ জন সুদখোর মহাজনকে প্রকাশ্য বাজারে হত্যা করে দীর্ঘ দিনের একচেটিয়া হত্যা, অত্যাচারের অধিকার কেড়ে নেয়। এই ঘটনা হতে পূর্ণ উদ্যমে সাঁওতাল বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল।

বাতাসে সংবাদ দিঘি থানায় পৌঁছায়। কুখ্যাত দারোগা অনেক পুলিশ নিয়ে কানু, সিধোকে আটক করতে ভগনাদিহি গ্রাম আক্রমণ করে। পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সমবেত জনতা অন্যান্য পুলিশসহ মহেশ দারোগাকে পাল্টা আটক করে। তৎক্ষণাৎ শুরু হয় অত্যাচারী দারোগা ও সঙ্গী পুলিশের বিচার। বিচারে জনতা দারোগাসহ নয় পুলিশের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। কানু, সিধো নিজের হাতেই দারোগাকে হত্যা করে। অন্যান্য সঙ্গীরা অপর নয় পুলিশের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করে। দূরে দাঁড়িয়ে যারা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছিল, অবস্থা বেগতিক দেখে দারোগা পুলিশের লাশ ফেলে পালায়ন করে। মহেশলাল একটি নরপশু ছিল, জমিদার, সুদখোর মহাজনের নিকট হতে উৎকোচ নিয়ে সমস্ত ধরনের অপকর্ম করেছিল সাঁওতালদের বিরুদ্ধে। অত্যাচারিত সাঁওতালদের আর্ত চিৎকারে অশ্রু ও রক্তের বন্যা বয়েছে সাঁওতাল এলাকায়। শান্ত সরল সাঁওতাল জনতা নীরবে সহ্য করেছে সমস্ত অত্যাচার। প্রতিকার চেয়েছিল, কিন্তু কে করবে প্রতিকার?
প্রতিকার কেউ-ই করে দেয় নাই, নিজেদের-ই প্রতিকার করতে হয়। এই উপলব্ধির মাধ্যমে সাঁওতাল দ্রোহের আগুন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গলমহলে।

দিঘি থানার দারোগা হত্যার দিন ছিল ১৮৫৫ সালের ৭ই জুলাই। এই দিনই হলো সাঁওতাল হুল।

বিদেশি লেখক হান্টার সাহেবের মতে দারোগা হত্যার ঘটনা হতেই সাঁওতাল বিদ্রোহের অভিযানের চরিত্র ও রূপ বদল হয়ে যায়। এই দারোগা হত্যার মধ্যে দিয়েই বিদ্রোহের শুরু, এতে কোন দ্বিমত নেই। তবে দারোগা হত্যার নানারকম কাহিনী বিভিন্ন লেখকের লিখিত কাহিনীতে ভিন্নতা আছে, তা সত্ত্বেও মূল ঘটনা প্রায় একই রকম। তাই ‘ভগবান যেমন হিন্দু মহাজনদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, তেমনই নিম্নবর্ণের অন্য সকল শ্রেণিকে রক্ষারও নির্দেশ দিয়েছিল।’
সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব পূর্বেই ঘোষণা করেছিলেন ‘আমাদের সংগ্রামে সহায়তা করছে কর্মকার, মুসলমান, তাঁতি, চামার, ডোম, তেলি ইত্যাদি সম্প্রদায়। বিদেশি দিকুদের বিরুদ্ধেই কেবল আমাদের সংগ্রাম পরিচালিত হবে। অন্যান্য শ্রেণিদের সঙ্গে আমাদের সংগ্রামের স্বার্থেই দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। অ-সাঁওতাল জনতাকে ইংরেজ এবং দিকুদের আক্রমণ হতে রক্ষা করতে হবে।’

সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব প্রথম সফল আক্রমণের পর সংগ্রাম পরিচালকদের সঙ্গে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনায় বসলেন। সিদ্ধান্ত হলো যে, সমস্ত সাঁওতালরা প্রচলিত ঘরোয়া হাতিয়ারে সজ্জিত হয়ে বিদেশি ফৌজ ও পুলিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইংরেজ শক্তি ধ্বংস করতে হবে।’ উন্নত কামান বন্দুকের সাথে তীর, কুঠার মুখোমুখি হলো। 
অপরিসীম মনোবল, স্বাধীনতার স্পৃহা, জীবনদানের প্রতিযোগিতা লক্ষ কামান, বন্দুক হতে অধিক শক্তিশালী। অদম্য সাহস, সংকল্পে স্থির, সাঁওতালদের শক্তি অটুট, দৃঢ় মনোবল, কে বাধা দিবে? বিদেশি ইংরেজ ও দিকুদের প্রতিরোধ শক্তি সাঁওতাল আক্রমণের ঘৃণার আগুনে পুড়ে অন্তত বেশ কিছুদিনের জন্য ছাই হয়ে গিয়েছিল।

পাল্টা আক্রমণের মোকবিলার প্রস্তুতিতে সাঁওতালরাও নিজস্ব লড়াকু বাহিনী গড়ে তোলে। তারা জানত ইংরেজ শাসক এবং জমিদার মহাজনদের হাতিয়ার মহেশলাল হত্যার ঘটনায় পাল্টা আক্রমণ আসবেই। আর এই আক্রমণ হবে পূর্বের যে কোন আক্রমণ হতে আরও তীব্র।

সাঁওতালদের নিজস্ব গুপ্তচর বাহিনী মারফত খবর আসল কুরহরিয়া থানার দারোগা প্রতাপনারায়ণ বিদ্রোহীদের আক্রমণ করার ফন্দি আঁটছে। বিদ্রোহীরা দারোগাকে আক্রমণের পরিকল্পনা করে। বিশেষ কাজে দারোগা দলবলসহ থানা হতে বেশ কিছু দূরে (আসলে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের আক্রমণের কলা কৌশল নিয়ে জমিদারদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে গোদ্দা মহাকুমা সদরে) গিয়েছিল। অ-সাঁওতাল সম্প্রদায় বিদ্রোহী সাঁওতালদের গুপ্তচরের কাজ করতো। সময় নষ্ট না করে বিদ্রোহী সাঁওতালেরা প্রতাপনারায়ণের ফেরার পথে গোপনে লুকিয়ে থাকে। অত্যাচারী প্রতাপনারায়ণ নির্দিষ্ট পথে ফেরার সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিদ্রোহী সাঁওতালদের হাতে বন্দী হয়। ভগবানের নামে বিদ্রোহীরা প্রতাপনারায়ণকে বলি দেয়।

দীর্ঘদিন ধরে সুদখোর মহাজনের ঘাঁটি ছিল বড় হাইতের বাজার। এই বিরাট বাজারটি বিদ্রোহী সাঁওতালেরা দখল করে। সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। দীর্ঘদিনের শোষণ, অত্যাচারে নিষ্পেষিত সাঁওতাল জনতার হাতে প্রায় সব সুদখোর মহাজন (ওই বাজারের) নিহত হয়। কিছু অত্যাচারী বদমাইশ ধন সম্পদ বাঁচানোর চেয়ে প্রাণ বাঁচানো শ্রেয় মনে করে দ্রুত ঐ স্থান ছেড়ে পালায়ন করে। খান সাহেব নামক এক কুখ্যাত দারোগা কানুর হাতে নিহত হয়।

বিষাক্ত তীর, টাঙ্গি সজ্জিত সাঁওতাল বিদ্রোহীরা মাদল বাজাতে বাজাতে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সমগ্র সাঁওতাল পরগণায় ছড়িয়ে পড়ে।

মাদলধ্বনি বজ্রের শক্তি হয়ে আঘাত করতে করতে সাঁওতাল পরগণায় ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীদের আক্রমণে শঙ্কিত পুলিশ, চৌকিদার, জমিদার, সুদখোর মহাজন, প্রাণভয়ে সংগ্রামী এলাকা পরিত্যাগ করে পলায়ন করে। বিদ্রোহী সাঁওতালেরা ঘোষণা করে- বিদেশি ইংরেজ শাসন ধ্বংস হয়েছে। স্বাধীন সাঁওতাল রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কখনও ইংরেজ রাজ স্বাধীন সাঁওতাল শক্তির আঘাত কতটা, পরিমাপ করতে পারে নাই। চিরশান্ত সাঁওতালেরা বিদ্রোহ করেছে, এই সংবাদে বিদেশি শক্তি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। পর পর দারোগা হত্যা, বাজার লুণ্ঠন, সুদখোর মহাজন হত্যা- ইংরেজদের হতবুদ্ধিভাব কাটাতে সাহায্য করে।

ব্যাপক ফৌজ ইংরেজরা তখনও সংগ্রহ করতে পারে নাই। এক বিরাট পুলিশ বাহিনী কানু, সিধোর গ্রাম ভগনাদিহি আক্রমণ করে। মাদলের শব্দে সাঁওতালেরা বুঝতে পারে পুলিশ গ্রাম ঘেরাও করেছে। যে সকল সুদখোর মহাজন পুলিশকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল, সাঁওতালেরা প্রথম তাদের হত্যা করে, তারপর বীরের ন্যায় যুদ্ধ করে পুলিশকে নিশ্চিহ্ন করে। জমিদার সুদখোর মহাজনদের গো সম্পদ, মজুত শস্যের গুদাম বাজেয়াপ্ত করে গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। সাহেবদের অফিস কাছারি ধ্বংস করে ফেলে। রেললাইন উপড়ে ফেলে, পাকা রাস্তা ভেঙে মাঠ করে দেয়। সাঁওতালদের ঘাঁটিতে আক্রমণ করার সাধ মিটিয়ে দেয়।

হুল আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দেয়। বিদ্রোহের সংবাদ একদিকে যেমন বিদেশি শাসক ও দিকু সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করে, বিপরীতে সকল সম্প্রদায়ের হাজার হাজার কৃষক, কারিগর জনতাকে বিদ্রোহে উৎসবে সামিল করে।

চারিদিকে ওয়াহাবি বিদ্রোহের ঢেউ। সমগ্র কৃষক জনতা ওয়াহাবি বিদ্রোহে সামিল হয়ে সংগ্রামী অঞ্চলের পরিধি বাড়িয়েছিল। গুপ্তচরের কাজ অ-আদিবাসী জনতা তো করতোই। উপরন্তু কর্মকার সমাজ দিনরাত পরিশ্রম করে বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের হাতিয়ার প্রস্তুত করে দিল। ধর্ম, জাতপাত উঠে গেল। কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে আদিবাসী এই পরিচয় আর কোন কাজে লাগল না। সমগ্র জনতার পরিচয় হল, হয় সে বিদ্রোহী জনতার স্বাধীনতার পক্ষে- নতুবা ইংরেজ দিকুদের অন্যায় অত্যাচারের পক্ষে।

পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ ভারতীয় পূর্ব অঞ্চলের শোষিত, মেহনতি, দলিত জনসাধারণের মধ্যে যে অভূতপূর্ব ঐক্যের বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল, ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার স্বার্থে তাকে কেবলমাত্র সাঁওতাল বিদ্রোহ আখ্যা দিল এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি করবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এই সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ঐক্যবদ্ধ সমগ্র মেহনতি কৃষক জনতার ইংরেজ ও জমিদার মহাজনদের উৎখাত করে স্বাধীন রাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বহু বৎসরের যন্ত্রণার রুদ্ধ কক্ষে বিস্ফোরণ। যা ছিল মহান পূর্ব পুরুষের সুর, আর পাগল করা বিদ্রোহের মাদলধ্বনি।

রাজমহলের পথে ভাগলপুর অভিমুখে অগ্রসর হবার কালে বিদ্রোহীদের তীব্র আঘাতে ইংরেজ জমিদারদের কুঠি, বাড়িগুলি ধুলায় মিশে গেল। এতদিন বিনা বাধায় ইংরেজ সরকারের পুলিশের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিয়ে জমিদার, সুদখোর মহাজনগণ যে ভয়াবহ অন্ধকারের রাজত্ব কায়েম করেছিল, এক আঘাতেই সেই অন্ধকার সরে গিয়ে নতুন সূর্য উঠলো আদিবাসী সাঁওতাল অধ্যুষিত জঙ্গলমহলে।

উদিত সূর্যের বিকীর্ণ অগ্নিতাপের প্রচণ্ডতায় সাঁওতালদের চোখের জল শুকিয়ে গেল। শুকিয়ে গেল দিনের পর দিন তাদের মুখে ছিটানো অবজ্ঞার থুতু।

আত্মরক্ষার কোন উপায় নেই দেখে ভাগলপুরের কমিশনার দিকে দিকে বার্তা পাঠিয়ে সৈন্য প্রেরণের জন্য অনুরোধ করলেন, যাতে সাঁওতাল বিদ্রোহী জনতা ভাগলপুরে পৌঁছিবার পূর্বেই তাদের ধ্বংস করা সম্ভব হয়। হাজার হাজার সাঁওতাল বিদ্রোহী সমস্ত বাধা অতিক্রম করে একের পর এক নতুন অঞ্চল দখল করে, মাদল বাজাতে বাজাতে সামনে এগিয়ে চললো।

ভাগলপুরের ভারপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর মেজর মিঃ বরোজ তার ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে দশ হাজার সাঁওতাল ফৌজের বিশাল বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করতে ভয় পেয়ে গেল। দানাপুর, ছোটনাগপুর, সিংভূম, হাজারীবাগ, মুঙ্গের হতে বিপুল সংখ্যক সেনা আসে বিদ্রোহ দমন করতে।

১৮৫৫ সালের ১৬ জুলাই ভাগলপুরের পিয়ারপুরের কাছে পীর বাইতির ময়দানে মেজর বরোজের বিপুল সংখ্যক সৈন্যের সঙ্গে বীর বিদ্রোহী সাঁওতাল বাহিনীর এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়। মৃত্যু ভয়হীন সাঁওতালেরা মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করে ইংরেজ সৈন্যদের পরাজিত করে। মেজর বরোজের বাহিনীর বেশ কিছু অফিসার ও সাধারণ সেনা এই যুদ্ধে নিহত হয়। চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করে জীবিত কিছু সেনাসহ বরোজ যুদ্ধক্ষেত্র হতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। এই যুদ্ধে সাঁওতালদের হাতিয়ার ছিল শুধু ঘরোয়া হাতিয়ার। পরাজিত শত্রুর নিকট থেকে বিদ্রোহীরা বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলা বারুদ ছিনিয়ে নেয়।

ক্রমশ ইংরেজ বাহিনীর আক্রমণ ধ্বংস করে বিদ্রোহীরা বাংলা, বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করে, সাময়িকভাবে হলেও সাঁওতাল রাজ প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

আতঙ্কে দিশেহারা ইংরেজ শাসকবৃন্দ সাঁওতালদের প্রতিষ্ঠিত মুক্ত এলাকায় সামরিক আইন জারির পরিকল্পনা করে। বিদ্রোহী নায়ক ও তাদেরসহ নেতৃত্বকে ধরে দেবার জন্য বিভিন্ন পরিমাণে আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করে। বিদ্রোহীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়। তলে তলে গোপনে বিদ্রোহীদের নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা চলতে থাকে।

বিদ্রোহীদের সঙ্গে মেজর বরোজের সৈন্যবাহিনীর চূড়ান্ত মোকাবেলা সংগঠিত হবার পূর্বেই সাঁওতালেরা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মূলঘাঁটি পাকুড় রাজবাড়ি ও অম্বর পরগণার জমিদারের কাছারিবাড়ি দখল করে। এই আক্রমণের দিন ছিল ১৮৫৫ সালের ১২ জুলাই। চাঁদ ও ভৈরব এই আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। উভয় স্থান থেকেই বিদ্রোহীরা বিপুল পরিমাণে ধনসম্পদ, মজুত খাদ্য, অন্যান্য জিনিস লুট করে জনসাধারণের মধ্যে বিলি করে দেয়।

ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিদ্রোহীরা ইংরেজ সৈন্যদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে মনোবল গুঁড়িয়ে দেয়। পরাজিত বাহিনীর ওপর ভরসা করতে না পেরে অত্যাচারী জমিদার, সুদখোর মহাজন, রাজা, নীলকর সাহেব কুঠিবাড়ি, ধনসম্পদ ত্যাগ করে নিরাপদ অঞ্চলে পালিয়ে যায়। মহারাজা, রাজা, জমিদার, মহাজন, নীলকর সাহেব মুর্শিদাবাদের নবাব সকলে মিলে পুনরায় ধনসম্পদ লোকবল একত্রিত করে বিদ্রোহীদের হাতে পরাজয়ের প্রতিহিংসা গ্রহণের উদ্দেশ্যে কলকাতার ইংরেজ গভর্নরের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

অর্থ, অস্ত্র, রসদ লোকবল সংগ্রহ করেও সাঁওতালদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসঘাতক, বেইমান দেশীয় সামন্তশ্রেণির নিকট হতে আদায় করে, বিদ্রোহ দমন করার লক্ষ্যে এক বিপুল সংখ্যক সৈন্যবাহিনীকে ইংরেজ শাসকেরা বিদ্রোহ অধ্যুষিত অঞ্চলে পাঠায়।

আতঙ্কে দিশেহারা তৎকালীন ইংরেজদের সাময়িক পত্রিকা ক্যালকাটা রিভিউ সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে- ‘এই অসভ্য কালো ভূতগুলির মনে মৃত্যুভয় জাগাইয়া তোলা ব্যতীত এই বিদ্রোহ দমনের অন্য কোন উপায় নেই। প্রত্যেকটি পরাজয় এবং হত্যার প্রতিশোধ যেন অতি ভয়ঙ্কর হয়। ভবিষ্যতে তারা যেন আর কোন বিদ্রোহ করতে সাহসী না হয়। কেবল বিদ্রোহের নায়কদেরই নয়, সকল বিদ্রোহী সাঁওতালকেই বার্মার ভয়ঙ্কর জঙ্গলে নির্বাসিত করতে হবে, না হয় গুলি করে অথবা ফাঁসিতে হত্যা করতে হবে।’

বড় লাট ডালহৌসির নির্দেশে ব্রিগেডিয়ার লয়েডের নেতৃত্বে কামান, বন্দুক ইত্যাদি আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত এক বিরাট সৈন্যদল গ্রামে তাঁবু ফেলল। মধ্যরাত্রে কানু, সিধোর বাহিনী ইংরেজ শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আকস্মিক আক্রমণে কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইংরেজ সৈন্যবাহিনী পরাজিত এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। ইংরেজ বাহিনীর সমস্ত আগ্নেয়াস্ত্র গোলাবারুদ বিদ্রোহীরা দখল করে। বিজয়ী বাহিনী গঙ্গার তীর ধরে গলসা পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে রানীগঞ্জ দখল করে।

তারা মুর্শিদাবাদ অভিযানকালে কালিকাপুর, বল্লভপুর প্রভৃতি গ্রামের মহাজন ও সুদখোরদের গৃহ ধ্বংস করে ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। মহেশপুর আক্রমণ করে বিদ্রোহীরা সমস্ত ধনরত্ন বাজেয়াপ্ত করে। এই মহেশপুরে বিশাল ইংরেজ বাহিনীর সাথে সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা কানু, সিধোর আরও একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে বহু সাঁওতাল বীর যুদ্ধ করে প্রাণ দেয়। ইতিমধ্যে ভাগলপুরের যুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ দুই সাঁওতাল নেতা দস্যু ইংরেজ বাহিনীর হাতে নিহত হয়। অপরদিকে প্রায় ৫ হাজার বিদ্রোহী ত্রিভূবন ও মান সিং মাঝির নেতৃত্বে দুমকার নিকট নীলকুঠি আক্রমণ করে ধূলিস্যাৎ করে এবং অত্যাচারী নীলকর সাহেবদের হত্যা করে।

বড় লাটের নির্দেশে পূর্ব ভারতের সমস্ত সৈন্য একত্র করে সাঁওতাল বিদ্রোহ ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে। সাঁওতাল বিদ্রোহের আতঙ্কে কম্পমান ইংরেজ শাসকরা বিভিন্ন স্থান থেকে পদাতিক, গোলন্দাজ, অশ্বারোহী বাহিনী সংগ্রহ করে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের মোকাবেলা করার পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়। দেশীয় রাজা, মহারাজা, জমিদারবর্গ অর্থ অস্ত্র খাদ্য লোকবল যোগান দিয়ে ইংরেজ বাহিনীর শক্তি বাড়ায়।

মুর্শিদাবাদের নবাব সৈন্য, অস্ত্র, রসদ, খাদ্য ছাড়াও তার সুশিক্ষিত হস্তীবাহিনী প্রেরণ করার মাধ্যমে ইংরেজ শাসকদের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দিল। নীলকর দস্যুরাও অর্থ, অস্ত্র, খাদ্য যোগান দিল। পূর্ববঙ্গের সমস্ত সামরিক শক্তি সংগ্রহ করেও ইংরেজ শাসক নিশ্চিত হতে পারে না। নিশ্চিতরূপে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জয়লাভের উদ্দেশ্যে পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন স্থানের সৈন্যদের নিয়ে আসে। দেড় বৎসর কাল ধরে স্বাধীনতা সংগ্রামরত সাঁওতালদের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন সামরিক শক্তির সমাবেশ ঘটে। মুখোমুখি হলো কামান, বন্দুক আর তীর, বল্লম, কুঠার।

বীরভূম, মুর্শিদাবাদ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইংরেজ সৈন্যদের সাথে বিদ্রোহী সাঁওতাল বাহিনীর মরণপণ যুদ্ধ হয়। এই অসম যুদ্ধে দলে দলে সাঁওতাল নারী-পুরুষ যুদ্ধ করতে করতে অকাতরে প্রাণ বলি দিল। যেখানে ইংরেজ বাহিনী পরাস্ত হল সেখানে মত্ত হস্তি ছেড়ে দিয়ে গ্রাম, ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেয়া হলো। বহু নারী, শিশুকে মত্ত হস্তী পদপিষ্ঠ করলো। যুদ্ধে ইংরেজরা চূড়ান্ত কপটতার আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।

সম্মুখ যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে জঙ্গলের গভীরে আশ্রয় গ্রহণ করে হঠাৎ আক্রমণ করে বিদ্রোহী বাহিনী ইংরেজদের প্রচুর সৈন্য ধ্বংস করে।

বিদ্রোহীদের মূলঘাঁটি বরহাইত অঞ্চলে কামান, বন্দুক, হস্তীবাহিনী সুসজ্জিত ইংরেজ সৈন্যদলের সাথে বিদ্রোহী সাঁওতাল বাহিনীর এক ঘোরতর যুদ্ধ হয়। বিদ্রোহী বাহিনী এই যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে। পশুশক্তি আগুন দিয়ে সাঁওতালদের গ্রামগুলি ধ্বংস করে দিল।

উত্তর পশ্চিমের ভাগলপুর, দক্ষিণ পশ্চিমে তালডাঙ্গা থেকে রাজমহল, বীরভূমের নলহাটি, রামপুরহাট, সিউড়ি প্রভৃতি স্থানকে কেন্দ্র করে বাংলা, বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী সাঁওতালগণ নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তৎকালীন বহু সরকারি বেসরকারি বিবরণে এ সত্য স্বীকার করা হয়েছে। শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু থাকা পর্যন্ত বিদ্রোহী সাঁওতালরা যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করেনি। বিদ্রোহী সাঁওতালেরা তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে বিদ্রোহের বিস্তার ঘটায় মুঙ্গের অঞ্চলে। এই ঘটনায় ইংরেজ বাহিনী উল্লসিত হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানায় যে বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়েছে।

ইংরেজ শাসক সাঁওতাল বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। আত্মসমর্পণ করলে তাদের মার্জনা করা হবে। বিদ্রোহী সাঁওতালেরা ঘৃণাভরে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ১৮৫৫ সালের ১০ নভেম্বর ইংরেজ সরকার প্রচলিত আইন মারফত বিদ্রোহীদের দমন করতে অসমর্থ হয়ে, বঙ্গদেশের বীরভূম, মুর্শিদাবাদসহ বিহারের ভাগলপুর পর্যন্ত বিশাল আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে সামরিক আইন জারি করে। সমগ্র অঞ্চলটি সামরিক বাহিনীর হস্তে ন্যস্ত হয়। এর সুবিধা হলো আইন আদালত সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন নেই। সামরিক আদালত অবাধে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অধিকার পেল।

আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ইংরেজ বাহিনী গ্রামে গ্রামে মত্ত হস্তী নিয়ে হত্যা, লুণ্ঠন, ধ্বংস শুরু করে। হাজার হাজার বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ শিশুকে হত্যা করে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ফসলের ক্ষেতে মত্ত হস্তী ছেড়ে দিল। গ্রামের পর গ্রাম জনমাবনশূন্য হয়ে গেল। বিদ্রোহীরা সম্মুখ যুদ্ধ না করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে প্রাণপণে ইংরেজ শক্তিকে বাধা দিল। কিন্তু পর পর কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বিদ্রোহীরা হতাশ হয়।

এই ডামাডোলের মাঝেই একদিন হতাশ একদল সাঁওতাল, বীরশ্রেষ্ঠ নায়ক সিধোর গোপন আশ্রয়স্থলের সংবাদ ইংরেজদের জানিয়ে দেয়, সম্ভবত ১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১০/১২ তারিখে। ইংরেজ সৈন্যরা সিধোকে গোপন আশ্রয়স্থল হতে গ্রেফতার করেই গুলি করে হত্যা করে। সিধো, চাঁদ, ভৈরব বীরের মৃত্যুবরণ করলেন। কানু তখনও জীবিত। ছত্রভঙ্গ সাঁওতালদের একত্রিত করে যুদ্ধপ্রস্তুতির জন্য কানু আগুনের মত জ্বলে উঠলেন। আবার বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়, বহু ইংরেজ সৈন্য প্রাণ হারায়। সংগ্রামের প্রতি নিষ্ঠা, আত্মত্যাগই ছিল বিদ্রোহীদের মূলশক্তি। এই শক্তির বলে বলীয়ান হয়েই তারা যুদ্ধ করেছে।

১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯/২০ তারিখে একদল সশস্ত্র ইংরেজ সৈন্যের বিরুদ্ধে বীরভূম জেলার ওপারে বাঁধের নিকটে যুদ্ধ চলাকালীন ঘেরাও হয়ে যান বীর বিদ্রোহী নেতা কানু। কোনমতেই ঘেরাও হতে বের হতে পারেননি। ইংরেজ সৈন্যরা আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিলে কানু ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে পুনরায় তীরনিক্ষেপ করে একজন সেনাকে হত্যা করেন। ইংরেজ সেনা তৎক্ষণাৎ গুলি করে কানুকে হত্যা করে। অন্যান্য সাঁওতাল নেতারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। অসমশক্তি নিয়ে তুলনায় বিপুল শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ধীরে ধীরে থেমে যায়। বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী কেউ-ই আর তখন জীবিত নেই। শেষ যুদ্ধ বিদ্রোহীরা করেছিল শরীরে প্রাণ থাকা পর্যন্ত। আত্মসমর্পণ ছিল তাদের অজানা।

কপটতা এবং দস্যুবৃত্তি যাদের পেশাগত, অস্থিমজ্জায় যাদের ভণ্ডামি, হিংস্রতা মিশে ছিল, পরাজিত সাঁওতালদের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিল, তা পরবর্তীকালে সংগঠিত মহাবিদ্রোহ থেকে ৪৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজ দস্যুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহের ঘটনার মধ্যেই ভারতবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

এই বিদ্রোহের পরাজয় সাঁওতালদের মধ্যে হতাশা ও গ্লানির জন্ম দেয়। বহুমাত্রায় অত্যাচার, উৎপীড়ন বৃদ্ধি পায়। মূল নেতৃত্বের মৃত্যুতে মাদলধ্বনি থেমে যায়। এক বিরাট অংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পাহাড় ও জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। অপর অংশ গঙ্গা পার হয়ে মালদহ, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি জেলায় নতুন করে ঘর বাঁধে। ৫০ হাজার বিদ্রোহীর মধ্যে ২৫ হাজার বিদ্রোহীর রক্তে বাংলা ও বিহারের মাটি লাল হয়ে যায়। কিভাবে অকাতরে স্বাধীনতার জন্য এক বিরাট শক্তি জান দিয়েছে মান দেয়নি, আদালতের নথি তারই প্রমাণ। আদালতে ২৫১ জন বিদ্রোহীকে রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে ১৯১ জন সাঁওতাল। বাকিরা ডোম, চামার, কর্মকার, মুসলমান (মোমিন), তাঁতী, ধাঙর, গোয়ালা, ভূঁইয়া ইত্যাদি নিম্ন বর্গের মানুষ। বালকের সংখ্যা ৪৬, যাদের বয়স ছিল ৯/১০ বৎসর। বিচারে বিচারক বালকদের বেত মারার আদেশ দেন, অন্যদের ৭ থেকে ১৪ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

প্রত্যক্ষ বিদেশি শাসনের অবসান হলেও পরোক্ষ শোষণ আজও বিদ্যমান। যে দাবি নিয়ে সাঁওতাল ও তার সহযোগিরা লড়াই করেছিল, তা আজও পূরণ হয়নি। সাঁওতালদের দাবি আজ সাধারণ দাবিতে পরিণত হয়ে বনভূমি হতে রাজপথে পৌঁছে গিয়েছে। তৎকালীন তাদের দাবি আজও কৃষক অব্যাহত রেখেছে বার বার লড়াই করে। এই উপমহাদেশের কৃষককে সম্মানের আসনে বসিয়েছে। কৃষককে আজ কোন শাসক উপেক্ষা করতে পারে না। আজ পর্যন্ত চলে আসা সমস্ত কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৫৫ সালের প্রথম সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৭) একটি মাইল স্টোন।

সাঁওতাল বিদ্রোহের মাদলধ্বনি সাময়িকভাবে বন্ধ গেলেও একেবারে স্তব্ধ হয়নি। ভারতীয় উপমহাদেশে কৃষক জনতার উত্তাল আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামে আজও বর্তমান কালের কৃষক সংগ্রামীদের প্রেরণা যোগায়- ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম সাঁওতাল বিদ্রোহ। যতদিন না দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক জনতার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম বিজয় অর্জন করছে, ততদিন অব্যাহত থাকবে সাঁওতাল বিদ্রোহের মাদলধ্বনি।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লববার্ষিকী ২০১৭

 


নৈরাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদ -জোসেফ স্তালিন

88617610-b099-4d21-89a9-bb394cdfd93c---0

 

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ


আমরা সেই ধরনের লোক নই, যারা নৈরাজ্যবাদ শব্দটার উল্লেখ হলেই অবজ্ঞাভরে মুখ ফিরিয়ে এবং উন্নাসিকভাবে হাত নেড়ে বলে, ‘ও সম্পর্কে সময় নষ্ট করে কি হবে? ওটা তো আলোচনারই যোগ্য নয়!’ আমরা মনে করি এ রকম সস্তা সমালোচনা মর্যাদাহানিকর ও নিরর্থক।

আমরা আবার সে ধরনের লোকও নই, যারা এই চিন্তা করে নিজেদের সান্ত¡না দেই যে নৈরাজ্যবাদীদের ‘পেছনে কোনো ব্যাপক জনসাধারণ নেই এবং সেজন্য তারা ততটা বিপজ্জনক নয়।’ আজ কার কত বেশি বা কম গণসমর্থন আছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো মতবাদের সারবস্তু। যদি নৈরাজ্যবাদীদের মতবাদ সত্য প্রকাশ করে, তাহলে বলা নিষ্প্রোয়জন যে, তা নিশ্চয়ই নিজের পথ নিজেই কেটে নেবে এবং তার চারিপাশে জনগণকে সমবেত করবে। কিন্তু যদি তা অযৌক্তিক ও মিথ্যা ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা বেশিদিন স্থায়ী হবে না এবং শূন্যে ঝুলতে থাকবে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদের অযৌক্তিতা অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, নৈরাজ্যবাদীরা মার্কসবাদের প্রকৃত শত্রু। তদনুযায়ী আমরা এই মত পোষণ করি যে, প্রকৃত শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রকৃত সংগ্রাম অবশ্যই চালাতে হবে। সুতরাং গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত নৈরাজ্যবাদীদের মতবাদ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা এবং সমস্ত দিক থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার মূল্য নির্ণয় করা প্রয়োজন।

কিন্তু নৈরাজ্যবাদকে সমালোচনা করা ছাড়াও আমাদের নিজেদের অবস্থান আমাদের অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে এবং এইভাবে মার্কস ও এঙ্গেলসের মতবাদের সাধারণ রূপরেখা সংক্ষেপে উপস্থিত করতে হবে। এটা আরও বেশি প্রয়োজন এই জন্য যে, কিছু কিছু নৈরাজ্যবাদী মার্কসবাদ সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করছে এবং পাঠকদের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাহলে এখন আলোচ্য বিষয় নিয়ে অগ্রসর হওয়া যাক।

“বিশ্বে সবকিছুই গতিশীল, জীবন বদলে যায়, উৎপাদনশীল শক্তিসমূহ বৃদ্ধি পায়, পুরানো সম্পর্কসমূহ ধসে পড়ে চিরন্তন গতিশীলতা, চিরন্তন ধ্বংস এবং সৃষ্টি- এটাই হলো জীবনের মর্ম।”- কার্ল মার্কস [দর্শনের দৈন্য]।

মার্কসবাদ শুধু সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব নয়, মার্কসবাদ একটি অখণ্ড বিশ্ববীক্ষা, একটি দার্শনিক প্রণালী, যা থেকে মার্কসের সর্বহারার সমাজতন্ত্র যুক্তিসঙ্গতভাবেই এসে পড়ে। এই দার্শনিক প্রণালীকে বলা হয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। সুতরাং মার্কসবাদকে ব্যাখ্যা করার অর্থ হলো দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে ব্যাখ্যা করা।

এই দার্শনিক প্রণালীকে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বলে কেন? 
বলে এই জন্য যে, এর পদ্ধতি হলো দ্বন্দ্বমূলক এবং তত্ত্ব হলো বস্তুবাদী।

দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিটি কি? 
বস্তুবাদী তত্ত্বটি কি? 
বলা হয়, নিরন্তর জন্ম, বৃদ্ধি ও বিকাশের ধারাই জীবন। এটা সত্য, সামাজিক জীবন অবশ্যই অব্যয় এবং স্থানু একটা কিছু নয়, জীবন কখনও একই স্তরে থাকে না। শাশ্বত গতিশীলতায়, ধ্বংস ও সৃষ্টির এক শাশ্বত প্রক্রিয়ায় জীবনের প্রবাহ। সঙ্গত কারণেই মার্কস বলেছিলেন যে, চিরন্তন গতিশীলতা, এবং চিরন্তন ধ্বংস ও সৃষ্টিই হলো জীবনের ধর্ম। সুতরাং জীবনের মধ্যে সব সময়ে রয়েছে নতুন এবং পুরাতন, জয়মান ও ক্ষীয়মান, বিপ্লব এবং প্রতিক্রিয়া- এর মধ্যে প্রতিনিয়ত একটা কিছু মারা যাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে সব সময়েই একটা কিছু জন্মাচ্ছে। 
দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি আমাদের বলে যে, জীবন বাস্তবিকপক্ষে যা জীবনকে সেই মতোই বিবেচনা করতে হবে। জীবন অবিরাম গতিশীল, এবং সেজন্য জীবনকে অবশ্যই তার গতিশীলতা, তার ধ্বংস ও সৃষ্টির মধ্যেই বিবেচনা করতে হবে। জীবন কোথায় যাচ্ছে, জীবন কী লয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং কী-ই বা জন্মলাভ করছে, কী ধ্বংস হচ্ছে এবং কী-ই বা সৃষ্টি হচ্ছে? সর্বপ্রথম এই প্রশ্নগুলিরই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা উচিত।

দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির এই হল প্রথম সিদ্ধান্ত। 
জীবনে যা জন্মাচ্ছে এবং দিনে পর দিন বেড়ে উঠছে তা অজেয়, তার অগ্রগতি প্রতিহত হতে পারে না, তার বিজয়লাভ অবশ্যম্ভাবী। অর্থাৎ উদাহরণ স্বরূপ, শ্রমিক শ্রেণি যদি জন্মগ্রহণ করে, দিনের পর দিন বাড়তে থাকে, তাহলে তারা আজ দুর্বল এবং সংখ্যায় যত কমই হোক না কেন, তাতে কিছু এসে যায় না, পরিণামে তারা নিশ্চয়ই বিজয়ী হবে। পক্ষান্তরে, জীবনে যা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং কবরের দিকে এগিয়ে চলেছে, তা অবশ্যম্ভাবীরূপে পরাজয় বরণ করবে। অর্থাৎ উদাহরণস্বরূপ, আজ যদি বুর্জোয়াদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে থাকে এবং তারা প্রতিদিন পিছন থেকে আরও পিছনে যেতে থাকে, তাহলে তারা আজ যতই সবল এবং সংখ্যায় যত বেশিই হোক না কেন পরিণামে তারা অবশ্যই পরাজয় বরণ করবে এবং কবরে যাবে। এ থেকেই সুবিদিত দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির উদ্ভব: যা কিছু বাস্তবক্ষেত্রে বিদ্যমান, অর্থাৎ যা কিছু দিনের পর দিন বেড়ে উঠছে, তা যুক্তিসিদ্ধ।

দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির এই হলো দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত। 
গত শতাব্দীর আশির দশকে রাশিয়ার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এক বিরাট বিতর্ক উঠেছিল। নারদনিকেরা ঘোষণা করলো- প্রধান যে শক্তি রাশিয়াকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিতে পারে, তারা হলো গরিব কৃষকেরা। কেন?- মার্কসবাদীরা তাদের জিজ্ঞাসা করলো। নারদনিকরা জবাব দিল, এর কারণ কৃষক সমাজ সংখ্যায় সর্বাধিক এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা রাশিয়ার সমাজের দরিদ্রতম অংশ। এর জবাবে মার্কসবাদীরা বললো- একথা সত্য যে কৃষক সমাজ আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা অত্যন্ত গরিব, কিন্তু এটাই কী প্রশ্নঃ কৃষক সমাজ তো বহুদিন ধরেই সংখ্যাগরিষ্ঠ রয়েছে, কিন্তু এ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির সাহায্য ব্যতীত তারা মুক্তির সংগ্রামে কোন উদ্যোগ দেখায়নি। কেন? কারণ কৃষক সমাজ, শ্রেণি হিসাবে দিনের পর দিন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে এবং ভেঙে গিয়ে বুর্জোয়ায় ও শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণি, শ্রেণি হিসাবে দিনের পর দিন বাড়ছে এবং শক্তিলাভ করছে। এখানে দারিদ্র্যেরও চূড়ান্ত গুরুত্ব নেইঃ ভবঘুরেরা কৃষকদের তুলনায় অধিকতর গরিব, কিন্তু কেউ বলবে না যে তারা রাশিয়াকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিতে পারে। একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোঃ জীবনে কারা বেড়ে উঠছে এবং কারা ক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে। যেহেতু শ্রমিক শ্রেণি হলো একমাত্র শ্রেণি যা নিশ্চিত গতিতে বেড়ে উঠছে এবং শক্তি অর্জন করছে, আমাদের কর্তব্য হলো এদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো এবং রাশিয়ার বিপ্লবে একে প্রধান শক্তি হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া- মার্কসবাদীরা এইভাবেই জবাব দিয়েছিল। তাহলে আপনারা দেখছেন, মার্কসবাদীরা প্রশ্নটি দেখেছিল দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে, পক্ষান্তরে নারদনিকরা তাকে দেখেছিল অধিবিদ্যক দৃষ্টিকোণ থেকে, কেননা তারা জীবনকে গণ্য করতো এমন একটা কিছু বলে যা অনড়, অব্যয় এবং চিরকালের মতো নির্দিষ্ট (এফ এঙ্গেলসের ‘ফিলসফি, পলিটিক্যাল ইকনোমিক সোস্যালিজম দেখুন)।

এইভাবেই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি সমাজজীবনের আন্দোলনকে দেখে থাকে। 
কিন্তু আন্দোলন আছে নানা রকমের। ডিসেম্বরের দিনগুলিতে সামাজিক আন্দোলন ঘটেছিল, যখন শ্রমিক শ্রেণি শিরদাঁড়া সোজা করে অস্ত্রশস্ত্রের ডিপো প্রচ- বেগে আক্রমণ করলো এবং প্রতিক্রিয়ার ওপর আক্রমণ চালালো। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলির আন্দোলন যখন শ্রমিক শ্রেণি শান্তিপূর্ণ বিকাশের অবস্থাতে বিচ্ছিন্ন ধর্মঘটে এবং ছোট ছোট ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিল, তাকেও সামাজিক আন্দোলনই বলতে হবে। স্পষ্টতই আন্দোলন বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। এই জন্যই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি বলে আন্দোলনের দুটি রূপ আছেঃ বিকাশমূলক রূপ ও বিপ্লবমূলক। যখন অগ্রগতিশীল অংশসমূহ তাদের প্রাত্যহিক কার্যকলাপ স্বতঃস্ফূর্তভাবে চালিয়ে যেতে থাকে এবং পুরাতন ব্যবস্থার গৌণ, মাত্রাগত পরিবর্তন ঘটায়, তখন সে আন্দোলন হলো বিকাশমূলক। আন্দোলন বিপ্লবী হয়, যখন সেই একই অংশসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয়, একটিমাত্র ধারণায় পরিপূর্ণভাবে অনুপ্রাণিত হয় এবং পুরানো ব্যবস্থা ও তার গুণগত বৈশিষ্ট্যগুলি সমূলে উৎপাটিত করার জন্য এবং একটি নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য শত্রু শিবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে; বিপ্লব বিকাশের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণতা দান করে এবং তার পরবর্তী কর্মকা- সহজ করে।

প্রকৃতিতেও অনুরূপ প্রক্রিয়া ঘটে থাকে। বিজ্ঞানের ইতিহাস দেখিয়ে দেয় যে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি একটি খাঁটি পদ্ধতিঃ জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে সমাজবিজ্ঞান প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা এই ধারণারই অনুমোদন পাই যে, এই বিশ্বে কিছুই শাশ্বত নয়, প্রকৃতিতে প্রতিটি বস্তুই পরিবর্তিত হয়, প্রতিটি বস্তুই বিকশিত হয়। এজন্য প্রকৃতিতে প্রতিটি বস্তুকেই গতি এবং বিকাশের দৃষ্টিকোন থেকেই বিবেচনা করতে হবে। এবং এর অর্থ এই যে, দ্বন্দ্ববাদের মূলনীতি আজকের দিনেও সমস্ত বিজ্ঞানেই পরিব্যাপ্ত রয়েছে।

গতির বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে দ্বন্দ্ববাদী তত্ত্বের যে সিদ্ধান্ত- ছোট ছোট মাত্রাগত পরিবর্তন, শীঘ্রই হোক আর বিলম্বেই হোক, বড় বড় গুণগত পরিবর্তনে পরিণতি লাভ করে- এই সিদ্ধান্ত, এই নিয়ম সমানভাবে প্রকৃতির ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেনডিলিয়েভে উপাদানসমূহের পর্যাবৃত্ত প্রণালী সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতির ইতিহাসে মাত্রাগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তনের উদ্ভব কত গুরুত্বপূর্ণ। জীববিদ্যায় নয়া লামার্কবাদী তত্ত্ব এই একই জিনিস দেখিয়েছে। এই তত্ত্বের কাছে নয়া ডারউইনবাদ নতি স্বীকার করছে। 
অন্যান্য ঘটনা সম্পর্কে আমরা কিছুই বলবো না; এফ এঙ্গেলস তার এ্যান্টি ডুরিংএ তাদের ওপর পর্যাপ্ত আলোচনা করেছেন।

তাহলে আমরা এখন দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সাথে পরিচিত। আমরা জানি যে এই পদ্ধতি অনুযায়ী বিশ্বজগৎ চিরন্তন গতিশীল, ধ্বংস এবং সৃষ্টির চিরন্তন প্রক্রিয়ায় চলমান এবং সেইজন্য প্রকৃতি ও সমাজের প্রতিটি ঘটনায়ই দেখতে হবে গতিময়তার দিক থেকে, দেখতে হবে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রক্রিয়ার দিক থেকে, নিশ্চল এবং গতিহীন কিছু বলে একে বিবেচনা করা চলবে না। আমরা আরও জানি এই গতির দুটি রূপ আছেঃ বিকাশমূলক রূপ এবং বিপ্লবী রূপ।

নৈরাজ্যবাদীরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে কিভাবে দেখে? 
প্রত্যেকেই জানে, হেগেল দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির স্রোষ্টা ছিলেন। মার্কস কেবল এই পদ্ধতিকে পরিশোধিত করে উন্নত করেছিলেন। নৈরাজ্যবাদীরা তা জানে; তারা এও জানে যে হেগেল ছিলেন রক্ষণশীল, এবং এই জন্য তারা তার সুযোগ নিয়ে তাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রবক্তা বলে গালিগালাজ করে; তার দিকে কাদা ছোড়ে এবং চরম উৎসাহ নিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যে, হেগেল হলেন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দার্শনিক; প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যে, হেগেল আমলাতান্ত্রিক নিয়মতান্ত্রিকতার চরম রূপের স্তুতিকার, তার ইতিহাসের দর্শন-এর সাধারণ ভাবধারা হল পুনঃপ্রতিষ্ঠার কালের দার্শনিক প্রবণতার বশবর্তী এবং তাকেই তা সাহায্য করে ইত্যাদি ইত্যাদি (ভি, চেরকেজিশভিলির প্রবন্ধ দেখুন)। সত্য বটে, এই প্রশ্নে তারা যা বলে, কেউ তার প্রতিবাদ করে না এবং প্রত্যেকেই স্বীকার করে যে, হেগেল বিপ্লবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাজতন্ত্রের একজন সমর্থক। এ সত্ত্বেও নৈরাজ্যবাদীরা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং অবিরাম এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে যে, হেগেল পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রবক্তা ছিলেন। কেন তারা তা করে? সম্ভবত এই সবের দ্বারা তারা হেগেলকে অপদস্ত করতে চায়, পাঠককে বোঝাতে চায় প্রতিক্রিয়াশীল হেগেলের পদ্ধতিটি অগ্রহণীয় ও অবৈজ্ঞানিক। তাই যদি হয়, যদি নৈরাজ্যবাদীরা মনে করেন যে তারা এইভাবে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে অপ্রমাণ করতে সক্ষম, তাহলে আমি বলবো যে, এইভাবে তারা তাদের অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই স্বপ্রমাণ করতে পারেন না। পাসক্যাল ও লাইবনিৎস বিপ্লবী ছিলেন না, কিন্তু যে গাণিতিক পদ্ধতি তারা আবিষ্কার করেছিলেন তা আজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসাবে স্বীকৃত; মেয়ার ও হেলমহোলৎসও বিপ্লবী ছিলেন না, কিন্তু পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে তাদের আবিষ্কার বিজ্ঞানের ভিত্তি রচনা করেছিল। লামার্ক ও ডারউইন বিপ্লবী ছিলেন না; কিন্তু তাদের বিবর্তনমূলক পদ্ধতি জীববিজ্ঞানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। হ্যাঁ এইভাবে নৈরাজ্যবাদী মশাইরা তাদের অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই প্রমাণ করতে পারছেন না।

আরও এগোনো যাক। নৈরাজ্যবাদীদের মতে দ্বন্দ্ববাদ হল অধিবিদ্যা এবং যেহেতু তারা বিজ্ঞানকে অধিবিদ্যা থেকে এবং দর্শনকে ঈশ্বরতত্ত্ব থেকে মুক্ত করতে চায়। সেইজন্য তারা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে অস্বীকার করে।

হায়, এই নৈরাজ্যবাদীরা! কথায় বলে নিজের পাপ অন্যের ঘাঁড়ে চাপিয়ে দাও। অধিবিদ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ভিতর দিয়েই দ্বন্দ্ববাদ পূর্ণতা প্রাপ্ত হলো এবং প্রতিষ্ঠা অর্জন করলো; কিন্তু নৈরাজ্যবাদীদের মতে সেই দ্বন্দ্ববাদই হলো অধিবিদ্যা। নৈরাজ্যবাদীদের জনক প্রুঁধো বিশ্বাস করতেন যে, জগতে চিরকালের জন্য নির্ধারিত অপরিবর্তনীয় ন্যায় বিদ্যমান রয়েছে, এবং এরই প্রেক্ষিতে প্রুঁধোকে বলা হয়েছে অধিবিদ্যাবিদ। মার্কস দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সাহায্যে প্রুঁধোর সাথে সংগ্রাম করেছিলেন এবং প্রমাণ করেছিলেন, ‘যেহেতু পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তুই বদলায়, ন্যায় অবশ্যই বদলাবে এবং সেজন্য অপরিবর্তনীয় ন্যায় হলো অধিবিদ্যার অর্থহীন বুলি।’ [মার্কসের দর্শনের দারিদ্র্য]। কিন্তু তবুও অধিবিদ্যক প্রুঁধোর জর্জিয়ান শিষ্যেরা প্রমাণ করার চেষ্টায় লেগে যায় যে, বস্তুবাদ হলো অধিবিদ্যা এবং অধিবিদ্যা অজ্ঞেয় ও স্বয়ংসিদ্ধ সত্তা স্বীকার করে এবং পরিণামে নীরস ঈশ্বর তত্ত্বে পর্যবসিত হয়। প্রুঁধো এবং স্পেনসারের বিরুদ্ধে এঙ্গেলস দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সাহায্যে অধিবিদ্যা ও ঈশ্বরতত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। [লুডউইগ ফয়েরবাগ এবং এ্যান্টি ড্যুরিং দেখুন]। তিনি প্রমাণ করেছিলেন তারা কেমন হাস্যকরভাবে ধোঁয়াটে ছিলেন। কিন্তু আমাদের নৈরাজ্যবাদীরা প্রমাণ করতে সচেষ্ট যে প্রুঁধো এবং স্পেন্সার ছিলেন বৈজ্ঞানিক। পক্ষান্তরে মার্কস ও এঙ্গেলস ছিলেন অধিবিদ্যাবিদ। দুটি জিনিসের একটা হয় নৈরাজ্যবাদী মশাইরা নিজেদের প্রতারিত করছে, না হয় অধিবিদ্যা কী তারা তা বোঝে না। সে যাই হোক কোনটার জন্যই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে দোষ দেওয়া যায় না।

নৈরাজ্যবাদী মশাইরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির বিরুদ্ধে আর কী কী অভিযোগ আনেন? তারা বলেন দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি হলো সূক্ষ্ম কথার জাল বোনা, কুতর্কের কৌশল, তর্কশাস্ত্রের এবং মানসিক ডিগবাজি। যার সাহায্যে সত্য এবং মিথ্যা দুই-ই সমান স্বাচ্ছন্দে প্রমাণ করা যায়।

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে যে, নৈরাজ্যবাদীদের উত্থাপিত অভিযোগের কিছু ভিত্তি আছে। অধিবিদ্যক পদ্ধতির অনুসরণকারীদের সম্পর্কে এঙ্গেলস কি বলেন মনোযোগ দিয়ে শুনুন: “…. তার বাণী হলো হ্যাঁ নিশ্চয়-ই হ্যাঁ, না নিশ্চয়ই না, কারণ যা কিছু এই দুইয়ের অতিরিক্ত তা-ই অশুদ্ধ থেকে আগত। তার পক্ষে একটা জিনিস হয় বিদ্যমান, নয় বিদ্যমান নয়। তেমনি কোন বস্তুর পক্ষে একই সময়ে সেই বস্তু এবং অন্য কোন বস্তু হওয়া অসম্ভব। ইতি এবং নেতি চূড়ান্তভাবে পরস্পরের ব্যতিরেকী।” [এ্যান্টি ড্যুরিং এর ভূমিকা]।

সে কি রকম? নৈরাজ্যবাদীরা চিৎকার করে বলে কোনো বস্তুর পক্ষে একই সময়ে ভাল এবং মন্দ হওয়া কি সম্ভব? এটা হলো কুতর্ক, কথার মারপ্যাচ, এটা দেখাচ্ছে যে, তুমি সত্য ও মিথ্যাকে সমান আয়েশে প্রমাণ করতে চাও।

আচ্ছা বিষয়টির মর্মে যাওয়া যাক। আজ আমরা গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র দাবি করছি। কিন্তু গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র বুর্জোয়া ধনসম্পত্তিকে শক্তিশালী করে। আমরা কি বলতে পারি যে, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র সর্বদা এবং সর্বক্ষেত্রে ভাল! না আমরা পারি না! কেন? যেহেতু আমরা যখন সামন্ততান্ত্রিক সম্পত্তিকে বিনষ্ট করছি সেই আজকের জন্য গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র ভাল, কিন্তু আগামীকাল যখন আমরা বুর্জোয়াদের সম্পত্তি বিনষ্ট করতে এগুবো, এগুবো সমাজতান্ত্রিক সম্পত্তি প্রতিষ্ঠা করতে তখন গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র আর ভাল থাকবে না। পক্ষান্তরে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং তাকে আমরা চূর্ণ করে ফেলে দেব। কিন্তু যেহেতু জীবন শাশ্বত গতিশীল এবং যেহেতু অতীতকে বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না এবং সেহেতু আমরা যুগপৎ সামন্ততান্ত্রিক শাসন এবং বুর্জোয়াদের সঙ্গে লড়াই করছি, সেহেতু আমরা বলি একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র যেখানে সামন্ততান্ত্রিক সম্পত্তিকে ধ্বংস করে, সেখানে তা ভাল এবং আমরা তাকে সমর্থন করি; কিন্তু যেখানে তা বুর্জোয়া সম্পত্তিকে শক্তিশালী করে সেখানে তা খারাপ এবং সেখানে আমরা তাকে সমালোচনা করি। এ থেকে আসে যে, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র একই সময়ে ভাল এবং উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব হতে পারে হ্যাঁ এবং না দুটোই। দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির সঠিকতা প্রমাণে উক্ত কথাগুলো বলার সময়ে এই ধরনের বিষয়গুলিই এঙ্গেসের মনে ছিল। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা তা বুঝতে পারে না এবং তাদের কাছে এটা কুতর্ক মনে হয়। অবশ্য প্রকৃত বিষয়গুলি গ্রহণ করার বা প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা নৈরাজ্যবাদীদের আছে, তা করবার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের আছে। কিন্তু তারা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে টেনে আনছে কেন? দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি নৈরাজ্যবাদের মতো নয়; তা চোখ বন্ধ করে জীবনের দিকে তাকানো নয়; জীবনের স্পন্দনের ওপরে তার আঙ্গুল রয়েছে এবং তা খোলাখুলিভাবে বলে, যেহেতু জীবন পরিবর্তনশীল ও গতিময়, সেজন্য জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে দুটি ঝোঁক আছে ; একটি ইতিবাচক অন্যটি নেতিবাচক; প্রথমটিকে আমরা অবশ্যই রক্ষা করবো, দ্বিতীয়টিকে আমরা অবশ্যই বর্জন করবো। কী আজব লোক এই নৈরাজ্যবাদীরাঃ তারা প্রতিনিয়ত ন্যায় সম্বন্ধে বাণী দিচ্ছে কিন্তু দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির ওপর পুরো অন্যায় চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও এগোনো যাক। আমাদের নৈরাজ্যবাদীদের মতে দ্বন্দ্বমূলক বিকাশ হলো প্রলয়মূলক বিকাশ; যার দ্বারা প্রথমে অতীতকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয় এবং তারপর ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। কুভিয়ারের প্রলয় ঘটেছিল অজানা কারণে, মার্কস এবং এঙ্গেলসের প্রলয়ের কারণ দ্বন্দ্ববাদ। অন্য এক জায়গায় একই লেখক লিখেছেন, মার্কসবাদ ডারউইনের ওপর নির্ভর করে এবং বিনা সমালোচনায় তাকে গ্রহণ করে। 
পাঠক এই কথায় মনোযোগ দিন!

কুভিয়ার ডারউইনের ক্রমবিকাশ তত্ত্ব বাতিল করেন। তিনি কেবলমাত্র প্রলয়কেই স্বীকার করেন এবং প্রলয় হলো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়, যার কারণ অজ্ঞাত। নৈরাজ্যবাদীরা বলে মার্কসবাদীরা ডারউইনের ওপর নির্ভর করে এবং বিনা সমালোচনায় তাকে গ্রহণ করে। অর্থাৎ মার্কসবাদ কুভিয়ারের প্রলয়কে স্বীকার করে না।

ইচ্ছা হলে একে নৈরাজ্যবাদ বলতে পারেন! কথায় বলে সার্জেন্টের স্ত্রী নিজেই নিজেকে বেত মেরেছিল। স্পষ্টতই ৬ নং নোভাতিতে এস এইস জি. কী বলেছিলেন ৮নং নোভাতিতে তিনি তা ভুলে বসে আছেন।

কোনটা সঠিক ৮নং না ৬নং? অথবা দুটিতেই মিথ্যা উক্তি করা হয়েছে?
প্রকৃত ঘটনার দিকে তাকানো যাক। মার্কস বলেন, বিকাশের একটা স্তরে সমাজের বস্তুগত উৎপাদিকা শক্তিগুলি তৎকালীন উৎপাদন সম্পর্ক সমূহের সঙ্গে অথবা আইনের ভাষায় বলতে গেলে সম্পত্তিগত সম্পর্কসমূহের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে- তখন শুরু হয় সামাজিক বিপ্লবের একটা যুগ। কিন্তু সমস্ত উৎপাদন শক্তিগুলির যতদূর সম্ভব বিকশিত হওয়ার সুযোগ আছে। ততদূর অবধি বিকশিত হবার আগে কোনো সমাজব্যবস্থা কখনো ধ্বংস হয় না। (কার্ল মার্কস- এ কনট্রিবিউশন টু দি ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমির ভূমিকা)।

মার্কসের এই ধারণা যদি সমসাময়িক সামাজিক জীবনে প্রযুক্ত হয়, তাহলে আমরা দেখবো যে, একদিকে আজকের দিনের উৎপাদিকা শক্তিগুলিতে, যার চরিত্র হলো সামাজিক এবং অন্যদিকে উৎপাদিত বস্তুর আত্মসাতের রূপ, যার চরিত্র হলো ব্যক্তিগত এই দুইয়ের মধ্যে একটি মৌলিক সংঘাত রয়েছে। যা অবশ্যই পরিণতি লাভ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে। (এঙ্গেলসের এ্যান্টি ড্যুরিং দেখুন, তৃতীয় অংশ, তৃতীয় অধ্যায়)। তাহলে আপনারা দেখছেন মার্কস ও এঙ্গেলসের মতে বিপ্লব (প্রলয়) কুভিয়ারের অজ্ঞাত কারণের জন্য সংঘটিত হয় না। সংঘটিত হয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কারণে, যাকে বলা হয় উৎপাদিকা শক্তিসমূহের বিকাশ। আপনারা দেখছেন মার্কস এঙ্গেলসের মতে বিপ্লব শুধু তখনই আসে যখন উৎপাদিকা শক্তিগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়, অপ্রত্যাশিতভাবে নয় যেমন কুভিয়ার ভাবছেন। স্পষ্টতই কুভিয়ারের প্রলয় এবং দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির মধ্যে কোন মিল নেই। পক্ষান্তরে ডারউইনবাদ শুধু কুভিয়ারের প্রলয়কেই অস্বীকার করে না, দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিকাশ- যার মধ্যে বিপ্লবও অন্তর্ভুক্ত তাকেও অস্বীকার করে। অন্যদিকে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিবর্তন ও বিপ্লব, পরিমাণগত ও গুণগত পরিবর্তন একই গতির দুটি আবশ্যিক রূপ। এটা বলাও ভুল যে মার্কসবাদ ডারউইনবাদকে বিনা সমালোচনায় গ্রহণ করে। তাহলে এর থেকে বোঝা যায় যে যেমন ৬ নম্বরে তেমনি ৮ নম্বরেও, উভয় ক্ষেত্রেই নোভাতি সঠিক।

এইসঙ্গে এইসব মিথ্যাবাদী সমালোকেরা আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বার বার বলতে থাকেঃ তোমরা পছন্দ কর আর নাই করো, আমাদের মিথ্যাগুলি তোমাদের সত্যের চেয়ে উৎকৃষ্টতম। সম্ভবত তাদেরও বিশ্বাস তারা যা-ই বলুক বা করুক না কেন সব কিছুই ক্ষমার্হ। 
আর একটি বিষয় আছে যার জন্য নৈরাজ্যবাদী মশাইরা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে ক্ষমা করতে পারে নাঃ দ্বন্দ্ববাদ … নিজের থেকে বেরিয়ে বা লাফিয়ে যাওয়া অথবা লাফ দিয়ে নিজেকে টপকে যাওয়ার কোন সুযোগ দেয় না। নৈরাজ্যবাদী মশাইরা এখানে আপনারা চূড়ান্তভাবে সঠিক, দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিতে সত্যই এ রকমের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু কেন নেই? নিজের থেকে বেরিয়ে বা লাফিয়ে যাওয়া, কিংবা লাফ দিয়ে নিজেকে টপকে যাওয়া হলো বুনো ছাগলের কসরৎ, কিন্তু দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি তো সৃষ্টি হয়েছে মানুষের জন্য। এই হলো গোপন তত্ত্ব!… 
সাধারণভাবে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির প্রশ্নে নৈরাজ্যবাদীদের মত হচ্ছে এই।

স্পষ্টতই নৈরাজ্যবাদীরা মার্কস-এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি অনুধাবন করতে অক্ষম, তারা তাদের নিজস্ব দ্বন্দ্ববাদ সৃষ্টি করেছে এবং তার বিরুদ্ধে তারা এত নির্মমভাবে লড়াই করে চলেছে। এই দৃশ্য দেখে আমরা শুধু হাসতেই পারি, কারণ কেউ যখন দেখে যে একজন তার নিজেরই কল্পনার সঙ্গে লড়াই করে চলেছে; নিজের আবিষ্কারকে চূর্ণ করছে আর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে জোর দিয়ে বলছে যে, সে তার প্রতিপক্ষকেই চূর্ণ করছে তখন কেউ না হেসে থাকতে পারে না।


“মানুষের চেতনা তার বাস্তব অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে না, পক্ষান্তরে, তার সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে”- কার্ল মার্কস।

বস্তুবাদী তত্ত্বটা কি?
পৃথিবীতে সব জিনিসের পরিবর্তন ঘটে, পৃথিবীতে সব কিছুই গতিশীল, কিন্তু কীভাবে এই পরিবর্তনগুলি সংগঠিত হয়, এই গতিশীলতা কী রূপ পরিগ্রহ করে এটাই হলো প্রশ্ন। উদাহরণস্বরূপ আমরা জানি, এই পৃথিবী একদিন ছিল জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড, তারপরে তা ক্রমে ক্রমে ঠাণ্ডা হলো; তারপরে জীবজন্তুর রাজ্যের অভ্যুদয় হলো, বিকাশ ঘটলো, তারপরে আবির্ভাব ঘটল এক জাতের বানরের যা থেকে পরবর্তীকালে হল মানুষের উদ্ভব। কিন্তু এই বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল? কেউ কেউ বলে থাকে, প্রকৃতি ও তার বিকাশের পূর্বে ছিল বিশ্ব চৈতন্য যা পরবর্তীকালে এই বিকাশের ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল। ফলে বলতে গেলে প্রকৃতির ঘটনার বিকাশ এই চৈতন্যের বিকাশের বাইরেকার রূপ। এই লোকগুলিকে বলা হয় ভাববাদী, যারা পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রবণতায় বিভক্ত হয়ে পড়লো এবং বিভিন্ন ধারা অনুসরণ করলো। অন্যেরা বলে একেবারে গোড়া থেকেই এই জগতে পরস্পরের নেতিবাচক দুটি শক্তি আছে- ভাব এবং বস্তু এবং অনুরূপভাবে, ঘটনাসমূহও দুই শ্রেণিতে বিভক্ত, ভাবগত ও বস্তুগত, যারা প্রতিনিয়ত পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এইভাবে দেখা যায় প্রকৃতির ঘটনাসমূহের বিকাশ হলো ভাবগত ও বস্তুগত ব্যাপারের মধ্যে নিরন্তর সংগ্রাম। এই লোকগুলিকে বলা হয় দ্বৈতবাদী এবং ভাববাদীদের মতো তারাও বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত।

মার্কসের বস্তুবাদী তত্ত্ব, দ্বৈতবাদ ও ভাববাদ উভয়কেই চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করে। অবশ্য, ভাবগত ব্যাপার ও বস্তুগত ব্যাপার দুই-ই এই পৃথিবীতে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই না যে, তারা পরস্পরকে নিরাকরণ করে। বিপরীত পক্ষে, ভাবগত ও বস্তুগত দিক হল একই ব্যাপারের দুটি বিভিন্ন রূপ। তারা একত্রে বিকশিত হয়, তাদের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ রকম অবস্থাতে আমাদের মনে করার কোন যুক্তিই নেই যে, তারা পরস্পর পরস্পরকে নিরাকরণ করে। অতএব, দ্বৈতবাদ ভুল বলে প্রমাণিত হয়। এক ও অবিভাজ্য প্রকৃতি দুটি বিভিন্ন রূপে অভিব্যক্ত- বস্তুগত ও ভাবগত- এইভাবেই প্রকৃতির বিকাশকে আমাদের গণ্য করতে হবে। এক ও অবিভাজ্য জীবন দুটি বিভিন্ন রূপে অভিব্যক্ত- ভাবগত ও বস্তুগত- এইভাবেই জীবনের বিকাশকে আমাদের গণ্য করতে হবে।

এই হলো মার্কসের বস্তুবাদী তত্ত্বের অদ্বৈতবাদ।
সঙ্গে সঙ্গে মার্কস ভাববাদকেও প্রত্যাখ্যান করেন। এই ভাবা ভুল হবে যে, ভাবগত দিক এবং সাধারণভাবে চেতনা তার বিকাশের প্রকৃতি তথা সাধারণভাবে বস্তুগত দিকের পূর্ববর্তী। তথাকথিত বাহ্য প্রাণহীন প্রকৃতি জীবন্ত সত্তাসমূহে অস্তিত্বের পূর্বেই বিদ্যমান ছিল। প্রথম জীবন্ত বস্তু প্রোটোপ্লাজমÑ জীবকোষের মূল উপাদান- তার কোন চেতনা ছিল না। তার ছিল কেবলমাত্র উত্তেজনা ও সংবেদনার অঙ্কুর। পরবর্তীকালে ক্রমে ক্রমে প্রাণিদের সংবেদন শক্তি ধীরে ধীরে চেতনায় রূপান্তরিত হলো। বানর যদি চিরকাল চার হাত পায়ে হেঁটে বেড়াত, সে যদি কোনদিনই সোজা হয়ে না দাঁড়াত, তাহলে তার বংশধর মানুষ ফুসফুস ও স্বরতন্ত্রীসমূহ অবাধে ব্যবহার করতে পারতো না এবং সেইজন্য, কথাও বলতে সক্ষম হতো না; এবং তা বহুলাংশে তার চেতনার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতো। অর্থাৎ বানর যদি তার পেছনের পা দুটির ওপর ভর করে না হাঁটতে পারতো তাহলে তার বংশধর মানুষ চিরকাল নিচের দিকে তাকাতে বাধ্য হতো এবং শুধু সেখান থেকেই তার সব ধারণা লাভ করতো। এখন যেমন সে তাকায় তখন সে উপরে এবং তার চারপাশে তাকাতে পারতো না এবং সেজন্য যার মস্তিষ্ক একটি বানরের মস্তিষ্কের চেয়ে বেশি ধারণা অর্জন করতে পারতো না এবং তা তার চেতনার বিকাশকে বহু পরিমাণে পিছিয়ে দিতো। এর থেকে এটাই আসে যে চেতনাগত দিকের বিকাশ, ভাবের বিকাশ দেহের কাঠামো এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের ওপর নির্ভরশীল। এ থেকে আসে যে চেতনাগত দিকের বিকাশ ভাবের বিকাশের পূর্ববর্তী হলো বস্তুগত দিকের বিকাশ, সামাজিক অস্তিত্বের বিকাশ। স্পষ্টত প্রথমে বাইরের অবস্থা বদলায়, প্রথমে বস্তুর পরিবর্তন হয়- ভাবগত দিকের বিকাশ বস্তুগত দিকের বিকাশের পেছনে পড়ে থাকে। বস্তুগত দিককে, বাইরের পরিবেশকে সামাজিক অস্তিত্ব ইত্যাদিকে যদি আমরা বলি বিষয়বস্তু, তাহলে ভাবগত দিক চেতনা এবং এই রকমের ব্যাপারকে আমাদের বলতে হবে রূপ। এ থেকেই উদ্ভুত হয়েছিল সুবিদিত বস্তুবাদী তত্ত্ব; ক্রমবিকাশের গতিধারায় বিষয়বস্তু রূপের পুরোবর্তী থাকে, রূপ বিষয়বস্তুর পেছনে পড়ে থাকে।

সামাজিক জীবন সম্পর্কে একটি কথা বলতে হবে, সেখানেও বস্তুগত পরিবর্তন পূরোবর্তী, এখানেও রূপ বিষয়বস্তুর পিছনে পড়ে থাকে। এমনকি যখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা চিন্তা করাও হয়নি, তার আগে থেকেই ধনতন্ত্র বিদ্যমান ছিল এবং একটি ভীষণ শ্রেণি সংগ্রাম প্রচণ্ডভাবে চলছিল। সমাজতান্ত্রিক ধারণার উদ্ভবের অনেক আগেই উৎপাদনের প্রক্রিয়া একটি সামাজিক চরিত্র ধারণ করেছিল।

এখানেই মার্কস বলেন, ‘আমাদের চেতনা তার বাস্তব অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে না; পক্ষান্তরে তার সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে।’ (এ কন্ট্রিবিউসন টু দি ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনোমি- কার্ল মার্কস)। মার্কসের মতে অর্থনৈতিক বিকাশ হলো সামাজিক বিকাশের বস্তুগত ভিত্তি, তার বিষয়বস্তু, তার আইনগত রাজনৈতিক ও ধর্মগত দার্শনিক বিকাশ হলো এই বিষয়বস্তুর ভাবাদর্শগত রূপ, তার উপরিকাঠামো। সেইজন্য মার্কস বলেন, ‘অর্থনৈতিক ভিত্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সমগ্র বিরাট উপরিকাঠামো কম বেশি দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত হয়।’ (ঐ)

সামাজিক জীবনেও প্রথমে উপরের বস্তুগত অবস্থা পরিবর্তিত হয় এবং তারপর মানুষের চিন্তা তাদের বিশ্ববিক্ষা বদলায়। বিষয়বস্তুর বিকাশ রূপের উদ্ভব ও বিকাশের পূর্ববর্তী। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, মার্কসের মতে রূপ ছাড়াই বিষয়বস্তু সম্ভব- যেমন এস-এইস জি. মনে করেন। রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু অসম্ভব; কিন্তু বিষয়টি হলো এই যে, যেহেতু একটি নির্দিষ্ট রূপ তার বিষয়বস্তুর পিছনে পড়ে থাকে, সেহেতু রূপটি কখনও এই বিষয়বস্তুর পুরোপুরি অনুরূপ হয় না; এবং নতুন বিষয়বস্তুটি প্রায়শঃই কিছুকালের জন্য পুরনো রূপে আবৃত থাকতে বাধ্য হয় এবং তার ফলে তাদের মধ্যে নতুন বিষয়বস্তু ও পুরাতন রূপের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। উদাহরণস্বরূপ বর্তমান সময়ে উৎপন্ন বস্তুর আত্মসাতের ব্যক্তিগত চরিত্র উৎপাদনের সামাজিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এবং আজকের দিনের সামাজিক সংঘর্ষের এই হলো ভিত্তি। অন্যপক্ষে ভাব বাস্তব সত্তার একটি রূপ- এই প্রকৃতিগতভাবে ধারণার অর্থ এই নয় যে, তার চেতনা ও বিষয়বস্তু একই জিনিস। এই মত পোষণ করতেন কেবলমাত্র স্থূল বস্তুবাদীরা। তাদের তত্ত্বসমূহ মার্কসের বস্তুবাদকে মূলগতভাবে অস্বীকার করে। এবং এঙ্গেলস তার লুডউইগ ফয়েরবাখে এদের সঠিকভাবে বিদ্রুপ করেছিলেন। মার্কসের বস্তুবাদী চেতনা ও বাস্তব সত্তা মন এবং বস্তু, একই ব্যাপারের দুটি বিভিন্ন রূপ, যাকে মোটামুটিভাবে বলা হয় প্রকৃতি, সুতরাং তাদের পরস্পর পরস্পরকে নিরাকরণ করে না, কিন্তু তারা আবার এক ব্যাপারও নয়। একমাত্র বিষয় হলো এই যে, প্রকৃতি ও সমাজের বিকাশে চেতনা- অর্থাৎ যা আমাদের মাথার মধ্যে ঘটে একটি তদনুরূপ বস্তুগত পরিবর্তন- অর্থাৎ যা আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা নিরপেক্ষ। কোন নির্দিষ্ট বস্তুগত পরিবর্তনকে শীঘ্র কিংবা দেরিতে একটি অনুরূপ ভাবগত পরিবর্তন অনিবার্যভাবেই অনুসরণ করে। এই জন্যই আমরা বলি একটি ভাবগত পরিবর্তন হলো তদনুরূপ একটি বস্তুগত পরিবর্তনের রূপ।

সাধারণভাবে এই হলো মার্কস ও এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের অদ্বৈতবাদ।
কেউ কেউ আমাদের বলবেনঃ প্রকৃতি ও সমাজের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এ সমস্ত প্রযুক্ত হলে, সেসব সত্য হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে নির্দিষ্ট বস্তু সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা এবং ভাব কীভাবে আমাদের মাথার মধ্যে জাগে? তথাকথিত বাইরের অবস্থাগুলি কী সত্যসত্যই বিদ্যমান, না এইসব বাইরের অবস্থা সম্বন্ধে আমাদের ধারণাগুলিই শুধু বিদ্যমান এবং যদি বাইরের অবস্থার অস্তিত্ব থাকেই, তাহলে কোন মাত্রা পর্যন্ত তারা প্রত্যক্ষ এবং পরিজ্ঞেয়?

এই বিষয়টি সম্পর্কে আমরা বলিঃ বাইরে অবস্থা যতখানি বিদ্যমান থেকে আমাদের অহং এর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, আমাদের ধারণা আমাদের অহংও ঠিক ততখানি বিদ্যমান। যে কেউই না ভেবে, না চিন্তে বলে যে, আমাদের ধারণা ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই, তাকেই সমস্ত বাইরের অবস্থা অস্বীকার করতে বাধ্য হতে হয় এবং সেই কারণেই, তার নিজের অহং ছাড়া অন্য সমস্ত লোকের অস্তিত্ব তাকে অস্বীকার করতেই হয়। এটা বিজ্ঞান এবং জীবন্ত বাস্তবের প্রধান প্রধান নীতিসমূহের মূলগতভাবে বিরোধী। হ্যাঁ, বাইরের অবস্থা সত্যই বিদ্যমান; এই অবস্থাগুলি আমাদের আগেও ছিল আমাদের পরেও থাকবে; এবং যত ঘন ঘন এবং যত প্রবলভাবে আমাদের চেতনার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তত সহজে তারা প্রত্যক্ষ ও পরিজ্ঞেয় হয়। বর্তমান সময়ে নির্দিষ্ট বস্তু সম্পর্কে কীভাবে বিভিন্ন ধারণা ও ভাব আমাদের মাথার মধ্যে জাগে, সে বিষয় সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই লক্ষ্য করতে হবে যে, প্রকৃতি ও সমাজের ইতিহাসে যা ঘটছে এখানে আমরা তারই সংক্ষিপ্ত পুনরাবৃত্তি পাই। এ ব্যাপারেও আমাদের বাইরের বস্তু আমাদের ধারণার পূর্ববর্তী; এ ব্যাপারেও আমাদের ধারণা অর্থাৎ রূপ বস্তুর পেছনে অর্থাৎ বিষয়বস্তুর পিছনে পড়ে থাকে। যখন আমি একটা গাছের দিকে তাকিয়ে গাছটিকে দেখতে পাই- তা কেবল দেখিয়ে দেয় যে, আমার মাথার মধ্যে একটি গাছের ধারণা জন্মাবার পূর্বেই গাছটির অস্তিত্ব ছিল; দেখিয়ে দেয় যে, এই গাছটিই আমার মাথার মধ্যে অনুরূপ ধারণা জাগিয়ে তুলেছিল।

মানব জাতির ব্যবহারিক কার্যকলাপে মার্কস ও এঙ্গেলসের অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদের গুরুত্ব সহজেই বোঝা যায়। যদি আমাদের বিশ্ববীক্ষা আমাদের অভ্যাস, আমাদের রীতি-নীতি বাইরের অবস্থার দ্বারা নির্ধারিত হয়, যদি আইনগত, রাজনীতিগত রূপের অনুপযোগিতা একটি অর্থনৈতিক বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট যে অর্থনৈতিক সম্পর্কসমূহে একটি মূলগত পরিবর্তন ঘটাতে আমরা অবশ্যই সাহায্য করবো যাতে এই পরিবর্তনের সাথে, জনসাধারণের অভ্যাসে, রীতিনীতিতে এবং তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি মূলগত পরিবর্তন ঘটানো যায়।

এই বিষয়ে কার্ল মার্কস বলেছিলেনঃ
“বস্তুবাদের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের আন্তঃসংযোগ প্রত্যক্ষ করার জন্য খুব বিরাট একটা বিচারশক্তির দরকার হয় না। যদি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ থেকে মানুষ তার সমস্ত জ্ঞান, প্রত্যক্ষ ইত্যাদি গঠন করে… তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায় যে, অভিজ্ঞতা গোচর এই পৃথিবীকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সে এর ভিতর সত্যকারের যা মানবিক তার অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে, যাতে সে একজন মানুষ হিসাবে অভিজ্ঞতা অর্জনে অভ্যস্ত হয়। … বস্তুবাদী অর্থে মানুষ যদি স্বাধীন না হয়- অর্থাৎ এটা বা ওটা এড়িয়ে চলতে সমর্থ হবার নেতিবাচক শক্তির কারণে স্বাধীন নয়, সে স্বাধীন হয় তার প্রকৃত ব্যক্তিসত্তাকে স্বপ্রতিষ্ঠা করার ইতিবাচক ক্ষমতার কারণে, তাহলে অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি মানুষকে শান্তি দেওয়া উচিত নয়, বরং উচিত অপরাধের সমাজ বিরোধী প্রজনন ক্ষেত্রগুলিকে ধ্বংস করা … মানুষ যদি অবস্থার দ্বারা গঠিত হয়, তাহলে অবস্থাকেও অবশ্যই মানবিকভাবে গঠন করতে হবে। (লুডউইগ ফয়েরবাখ, পরিশিষ্ট দেখুন, অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি বস্তুবাদের ইতিহাস সম্পর্কে কার্ল মার্কস)।

বস্তুবাদ ও মানুষের ব্যবহারিক কার্যকলাপের ভিতর এই হলো সম্পর্ক।
মার্কস ও এঙ্গেলসের অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের অভিমত কি?
মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির উদ্ভব হেগেল থেকে আর তার বস্তুবাদী তত্ত্ব হলো ফয়েরবাখের তত্ত্বের আরও বিকাশ। নৈরাজ্যবাদীরা এটা ভালভাবেই জানে, এবং তারা মার্কস ও এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে অপদস্থ করার জন্য হেগেল ও ফয়েরবাখের ত্রুটির সুবিধা গ্রহণ করার চেষ্টা করে। আমরা হেগেল সম্পর্কে আলোচনায় এর আগেই দেখিয়েছি যে, নৈরাজ্যবাদীদের এই সমস্ত চাতুরি তাদের নিজেদের তার্কিক ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই প্রমাণ করে না। ফয়েরবাখ সম্পর্কেও ওই একই কথা বলতে হয়। উদাহরণস্বরূপ তারা জোরের সঙ্গে বলে, ‘ফয়েরবাখ ছিলেন একজন সর্বেশ্বরবাদী’, বলে যে তিনি মানুষের ওপর দেবত্ব আরোপ করেছিলেন, যে ফয়েরবাখের মতে, মানুষ যা খায় সে তাই….’ তারা অভিযোগ করেছে, এ থেকে মার্কস নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত টেনেছিলেনঃ সুতরাং প্রধান ও প্রাথমিক জিনিস হল অর্থনৈতিক অবস্থাসমূহ ইত্যাদি। সত্য বটে ফয়েরবাখের সর্বেশ্বরবাদ, মানুষের ওপর দেবত্ব আরোপ এবং তার একই রকমের অন্যান্য ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে কারও কোনো সন্দেহ নেই। পক্ষান্তরে মার্কস ও এঙ্গেলসই সর্বপ্রথম ফয়েরবাখের ভুলভ্রান্তি উদঘাটিত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও নৈরাজ্যবাদীরা আগেই উন্মোচিত ফয়েরবাখের ভুলভ্রান্তিকে পুনরায় উদঘাটিত করা প্রয়োজন মনে করে। কেন? খুব সম্ভবত এই জন্য যে, ফয়েরবাখকে গালাগালি করে তারা বস্তুবাদকে অপদস্থ করতে চায়, কারণ মার্কস ফয়েরবাখের কাছ থেকেই বস্তুবাদের তত্ত্বটি ধার করেছিলেন এবং তার পর তাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিকশিত করেছিলেন। ফয়েরবাখের কী একই সঙ্গে কিছু ঠিক কিছু ভুল ধারণা থাকতে পারে না? আমরা বলছি যে এই ধরনের চাতুরির দ্বারা নৈরাজ্যবাদীরা অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদকে এতটুকুও টলাতে পারবে না, তারা যা করতে পারবে তা হলো নিজেদের ব্যর্থতা প্রমাণ করা।
মার্কসের বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যেই মতের মিল নেই। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আমাদের যদি মিঃ চেরকেজিশভিলির বক্তব্য শুনতে হয় তাহলে মনে হবে মার্কস ও এঙ্গেলস অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদকে ঘৃণা করতেন; তার মতে, তাদের বস্তুবাদ হলো স্থূল এবং তা অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ নয়ঃ ‘প্রকৃতিবিদদের মহান বিজ্ঞান তার বিবর্তনের প্রণালী, রূপান্তরবাদ এবং অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ- যা এঙ্গেলস এত আন্তরিকভাবে ঘৃণা করতেন …. সে সব দ্বন্দ্ববাদকে পরিহার করেছে ইত্যাদি। সুতরাং এ থেকে এইটি আসে যে, চেরকেজিশভিলি কর্তৃক অনুমোদিত এবং এঙ্গেলস কর্তৃক ঘৃণিত প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ ছিল অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ। কিন্তু আর একজন নৈরাজ্যবাদী আমাদের বলছে যে, মার্কস ও এঙ্গেলসের বস্তুবাদ হলো অদ্বৈতবাদী এবং সেজন্যই তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মার্কসের ইতিহাসের ধারণা হেগেলের ধারণাতেই প্রত্যাবর্তন।

সাধারণভাবে পরম বিষয়মুখীতার অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ, এবং বিশেষভাবে মার্কসের অর্থনৈতিক অদ্বৈতবাদ প্রকৃতিগতভাবে অসম্ভব এবং তত্ত্বগতভাবে অযৌক্তিক। অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ হলো অক্ষমভাবে প্রচ্ছন্ন দ্বৈতবাদ এবং অধিবিদ্যা ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটি আপস। সুতরাং এ থেকে আসে যে অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ গ্রহণীয় নয়, কারণ মার্কস ও এঙ্গেলস একে ঘৃণা তো করতেনই না, বরং তারা নিজেরাই ছিলেন অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদী।

যদি মনে করেন একে নৈরাজ্যবাদ বলতে পারেন! তারা এখনও মার্কসের বস্তুবাদের সারমর্মই উপলব্ধি করতে পারেনি, তারা এখনও বোঝেনি যে, মার্কসের বস্তুবাদ অদ্বৈতবাদী কী না, এর গুণাগুণ সম্পর্কে তারা নিজেদের মধ্যেই একমত হতে পারেনি, কিন্তু তারা এর মাঝেই এই উদ্ধৃত দাবিতে আমাদের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে যে, আমরা সমালোচনা করে মার্কসের বস্তুবাদকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছি! এ থেকেই বোঝা যায় যে, তাদের সমালোচনার কী ভিত্তি থাকতে পারে।

আরও দেখা যাক। মনে হয় যে কিছু নৈরাজ্যবাদী এই সত্য সম্পর্কেও অজ্ঞ যে বিজ্ঞানশাস্ত্রে বিভিন্ন ধরনের বস্তুবাদ আছে, যারা পরস্পর থেকে বহু পরিমাণে পৃথকঃ উদাহরণস্বরূপ আছে স্থূল বস্তুবাদ (প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে এবং ইতিহাসে), যা ভাববাদী দিকের গুরুত্বকে এবং বস্তুবাদী দিকের ওপর এর ফলাফলকে অস্বীকার করে। কিন্তু আবার তথাকথিত অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদও আছে- যা বস্তুবাদী ও ভাববাদী দিকের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ককে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিচার করে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা এসবের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলে এবং সেইসঙ্গে প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জাহির করেঃ তোমরা পছন্দ কর আর নাই কর, আমরা মার্কস ও এঙ্গেলসের বস্তুবাদকে সমালোচনা করে উৎসন্ন করে দিচ্ছি। শুনুন তা হলেঃ ‘এঙ্গেলস ও কাউৎস্কির মতে, মার্কস অন্যান্য জিনিস ছাড়াও বস্তুবাদী ধারণা আবিষ্কার করে মানবজাতির বিরাট কল্যাণ করেছেন।’ এটা কি সত্য? আমরা তা মনে করি কী না, কেননা আমরা জানি ….যে সমস্ত ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক এই মতের অনুগামী যে, সমাজব্যবস্থা ভৌগলিক, আবহাওয়াগত, জাগতিক, মহাজাগতিক, নৃতাত্ত্বিক এবং জীবতাত্ত্বিক অবস্থাবলী দ্বারা গতিশীল- তারা সকলেই বস্তুবাদী’ (২নং নোভাতি দেখুন, এস-এইস জি.)। এইসব লোকের সঙ্গে কীভাবে কথা বলা চলে! তাহলে এ থেকে আসে যে, এ্যারিস্টোটল ও মন্তেস্কুর বস্তুবাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, পার্থক্য নেই মার্কস ও সেন্ট মাইমনের বস্তুবাদের মধ্যে। প্রতিপক্ষকে বুঝে তাকে সমালোচনা করে ভূমিস্যাৎ করে দেবার চমৎকার দৃষ্টান্তও বটে!

কোন কোন নৈরাজ্যবাদী কোথাও হয়তো শুনেছেন যে মার্কসের বস্তুবাদ হলো একটি পৈটিকতত্ত্ব এবং তক্ষুণি তারা এই ধারণাকে ব্যাপকভাবে জন সাধারণ্যে প্রচার করতে লেগে গেলেন- সম্ভবত নোবাতি অফিসে কাগজের দাম শস্তা এবং কাজে খরচও বিশেষ পড়ে না। শুনুন তাহলে, ফয়েরবাখের মতে মানুষ যা খায়, সে তাই। এই সূত্র মার্কস ও এঙ্গেলসের ওপর ঐন্দ্রজালিক প্রভাব বিস্তার করলো। এবং নৈরাজ্যবাদীদের মতে, এ থেকে মার্কস এই সিদ্ধান্ত টানলেন যে, সুতরাং প্রধান ও প্রাথমিক জিনিস হলো অর্থনৈতিক অবস্থা উৎপাদন সম্পর্ক। এবং তার পরে নৈরাজ্যবাদীরা এগিয়ে এলেন দার্শনিক ভঙ্গিতে আমাদের শিক্ষা দিতেঃ এটা বলা ভুল হবে যে সমাজ জীবনে এই উদ্দেশ্য সাধনের একমাত্র উপায় হলো খাওয়া এবং অর্থনৈতিক উৎপাদন। ….অদ্বৈতবাদী মতানুযায়ী যদি ভাবাদর্শ প্রধানত নির্ধারিত হতো খাওয়া এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্বের দ্বারা- তাহলে কিছু পেটুক ব্যক্তিই প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি হতো। তাহলে দেখছেন মার্কসের বস্তুবাদকে সমালোচনা করা কত সহজ। রাস্তায় কোন স্কুল বালিকার কাছ থেকে মার্কস ও এঙ্গেলস সম্পর্কে চুটকি কথা শোনাই যথেষ্ট, যথেষ্ট রাস্তার সেই চুটকি কথাকে দার্শনিক আত্মবিশ্বাসে মুড়ে নোভাতির মতো সংবাদপত্রের পাতায় পুনরাবৃত্তি করা এবং মার্কসের সমালোচক হিসাবে হঠাৎ খ্যাতি অর্জন করা। কিন্তু ভদ্রলোকেরা একটা কথা বলুনঃ কোথায় কখন কোন দেশে মার্কসকে বলতে শুনেছেন যে খাওয়া ভাবাদর্শকে নির্ধারিত করে? আপনাদের অভিযোগের সমর্থনে মার্কসের রচনাবলী থেকে একটি মাত্র উদ্ধৃত করলেন না কেন? অর্থনৈতিক অবস্থা এবং খাওয়া কি একই জিনিস? এই সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণার মধ্যে তালগোল পাকানোর জন্য বড় জোর একটি স্কুল বালিকাকে ক্ষমা করা যেতে পারে, কিন্তু এটা কেমন যে আপনারা, স্যোস্যাল ডেমোক্রাসির পরাভবকারীরা, বিজ্ঞানের নব জন্মদাতারা এত অসতর্কভাবে স্কুল বালিকার ভুলকে পুনরাবৃত্তি করছেন? বাস্তবিক পক্ষে খাওয়া কীভাবে সামাজিক ভাবাদর্শকে নির্ধারিত করতে পারে? আপনারা নিজেরাই যা বলেছেন, তা ভেবে দেখুনঃ খাওয়া, খাওয়ার ধরণ বদলায় না, এখন যেভাবে করা হয়, পুরাকালে ঠিক সেইভাবে মানুষ খেত, চিবোত এবং খাদ্য হজম করতো। কিন্তু ভাবাদর্শের রূপ সব সময় বদলায়, বিকশিত হয়। প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক, বুর্জোয়া এবং শ্রমিক শ্রেণির এইগুলি হলো ভাবাদর্শের রূপ। এটা কি কল্পনীয় যে যা, সাধারণভাবে বলতে গেলে, বদলায় না, তা, যা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে তাকে নির্ধারণ করতে পারে? সত্য, মার্কস বলেছেন যে অর্থনৈতিক অস্তিত্ব ভাবাদর্শকে নির্ধারণ করে- এবং তা উপলব্ধি করা সহজ, কিন্তু খাওয়া এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্ব কী একই জিনিস? আপনারা আপনাদের ব্যর্থতা মার্কসের স্বন্ধে আরোপ করাটা যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করলেন কেন?

আরও দেখা যাক আমাদের নৈরাজ্যবাদীদের মতে, মার্কসের বস্তুবাদ হলো সমান্তরালবাদ।… অথবা পুনরায়ঃ অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদ হলো অক্ষমভাবে প্রচ্ছন্ন দ্বৈতবাদ এবং অধিবিদ্যা এবং বিজ্ঞানের মধ্যে একটা আপোস।…’ মার্কস দ্বৈতবাদের মধ্যে পড়ে যায়, কেননা তিনি উৎপাদন সম্পর্ককে বস্তুগত হিসাবে এবং মানুষের প্রচেষ্টা এবং সঙ্কল্পকে একটি মায়া তথা কল্পনা হিসাবে চিত্রিত করেছেন, তা যদি থেকেও থাকে, তবুও তার কোনো গুরুত্ব নেই’। প্রথমতঃ, নির্বোধ সমান্তরালবাদের সঙ্গে মার্কসের অদ্বৈতবাদী বস্তুবাদের কোন সম্পর্ক নেই। বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বস্তুগত দিক বিষয়বস্তু অবশ্যই ভাবগত দিক তথা তার রূপের পুরোবর্তী। কিন্তু সমান্তরালবাদ এই মতকে অস্বীকার করে এবং দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে যে, বস্তুগত ও ভাবগত কোনোটিই কারো আগে আসে না; তারা যুগপৎ পাশাপাশি বিকশিত হয়। দ্বিতীয়ত, মার্কসের অদ্বৈতবাদ এবং দ্বৈতবাদের মধ্যে কী মিল থাকতে পারে যখন আমরা পুরোপুরি ভালভাবেই জানি (এবং অন্যান্য নৈরাজ্যবাদী মশাইরা একথা জানবেন যদি অবশ্য আপনারা মার্কসীয় সাহিত্য পড়েন) যে অদ্বৈতবাদ একটি মূলনীতি অর্থাৎ প্রকৃতি, যার একটি বস্তুগত ও একটি ভাবগত রূপ আছে, তা থেকে উদ্ধৃত তদ্বিপরীতে দ্বৈতবাদ দুটি মূলনীতি- বস্তুগত ও ভাবগত থেকে উদ্ভুত যারা, দ্বৈতবাদ অনুযায়ী পরস্পর পরস্পরে নিরাকরণ করে। তৃতীয়ত কে বলেছেন যে মানুষের প্রচেষ্টা ও সংকল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়? আপনার জায়গাটা দেখিয়ে দেননা কেন, যেখানে মার্কস একথা বলেছেন? মার্কস কী তার এইটিনথ ব্রুমেয়ার অব লুই বোনাপার্ট, তার ক্লাস স্ট্রাগেলস ইন ফ্রান্স আর সিভিল ওয়ার ইন ফ্রান্স এবং অন্যান্য পুস্তিকায় প্রচেষ্টা ও সংকল্পের গুরুত্বের কথা বলছেন না? তবে কেন মার্কস সর্বহারা শ্রেণির সংকল্প ও প্রচেষ্টাকে সমাজতান্ত্রিক ধারায় বিকশিত করতে চেয়েছিলেন; যদি তিনি প্রচেষ্টা ও সঙ্কল্পের ওপর গুরুত্ব দিয়ে না থাকেন, তাহলে কেন তিনি তাদের মধ্যে প্রচার আন্দোলন চালিয়েছিলেন অথবা, এঙ্গেলস তার ১৮৯১-৯৪ এর সুবিদিত প্রবন্ধগুলিতে কী সম্পর্কে বলেছিলেন যদি প্রচেষ্টা ও সংকল্পের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে থাকেন? সত্য বটে মানুষের প্রচেষ্টা ও সংকল্প অর্থনৈতিক অবস্থাবলী থেকে তাদের বিষয়বস্তু অর্জন করে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকাশের ওপর তারা কোন প্রভাব বিস্তার করে না। সত্য সত্যই কী নৈরাজ্যবাদীদের পক্ষে এমন একটি সরল ধারণা বুঝতে পারা এতই কঠিন? এটা সঠিকই বলা হয় যে, সমালোচনার জন্য প্রচণ্ড আগ্রহ থাকা এক জিনিস আর কার্যক্ষেত্রে সমালোচনা করা অন্য জিনিস।

নৈরাজ্যবাদী মশাইরা আর একটি অভিযোগ উত্থাপন করেন ঃ ‘বিষয়বস্তু ছাড়া রূপ অকল্পনীয়…’, সুতরাং বলা যায় না যে, রূপ বিষয়বস্তুর পেছনে পড়ে থাকে… তারা সহঅবস্থান করে, তা না হলে অদ্বৈতবাদ হয়ে পড়ত একটি অসম্ভব ব্যাপার’ (১নং নোভাতি দেখুন, এস-এইস জি.)। নৈরাজ্যবাদী মশাইরা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু অকল্পনীয় সত্য, কিন্তু বিদ্যমান রূপ বিদ্যমান বিষয়বস্তুর সঙ্গে কখনও হুবহু একরূপ হয় না। নতুন বিষয়বস্তু কিছুদূর পর্যন্ত সব সময়ে পুরানো রূপে আবৃত থাকে। এর ফলে সব সময়ে পুরাতন রূপ এবং নতুন বিষয়বস্তুর মধ্যে একটা সংঘর্ষ বাধে। ঠিক এই কারণেই বিপ্লব সংঘটিত হয়, এবং অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এটাও একটি যা মার্কসের বস্তুবাদের মূলনীতিকে প্রকাশ করে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু নেই, এ কথাটা জেদের সঙ্গে পুনরাবৃত্তি করছে।

এই হলো বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের মত। আমরা আর কিছু বলবো না। এটা যথেষ্ট পরিষ্কার হয়েছে যে নৈরাজ্যবাদীরা তাদের নিজেদের মার্কসকে উদ্ভাবন করেছে, নিজ নৈরাজ্যবাদী মশাইরা আর একটি অভিযোগ উত্থাপন করেন ঃ ‘বিষয়বস্তু ছাড়া রূপ অকল্পনীয়…’, সুতরাং বলা যায় না যে, রূপ বিষয়বস্তুর পেছনে পড়ে থাকে… তারা সহঅবস্থান করে, তা না হলে অদ্বৈতবাদ হয়ে পড়ত একটি অসম্ভব ব্যাপার’ (১নং নোভাতি দেখুন, এস-এইস জি.)। নৈরাজ্যবাদী মশাইরা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু অকল্পনীয় সত্য, কিন্তু বিদ্যমান রূপ বিদ্যমান বিষয়বস্তুর সঙ্গে কখনও হুবহু একরূপ হয় না। নতুন বিষয়বস্তু কিছুদূর পর্যন্ত সব সময়ে পুরানো রূপে আবৃত থাকে। এর ফলে সব সময়ে পুরাতন রূপ এবং নতুন বিষয়বস্তুর মধ্যে একটা সংঘর্ষ বাধে। ঠিক এই কারণেই বিপ্লব সংঘটিত হয়, এবং অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এটাও একটি যা মার্কসের বস্তুবাদের মূলনীতিকে প্রকাশ করে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীরা এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং রূপ ছাড়া বিষয়বস্তু নেই, এ কথাটা জেদের সঙ্গে পুনরাবৃত্তি করছে।

এই হলো বস্তুবাদ সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদীদের মত। আমরা আর কিছু বলবো না। এটা যথেষ্ট পরিষ্কার হয়েছে যে নৈরাজ্যবাদীরা তাদের নিজেদের মার্কসকে উদ্ভাবন করেছে, নিজেদের উদ্ভাবিত একটি বস্তুবাদী তত্ত্ব তার মুখে আরোপ করেছে এবং তারপরে সেই বস্তুবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কিন্তু তাদের একটি বুলেটও সত্যকার মার্কস ও সত্যকার বস্তুবাদকে আঘাত করতে পারবে না।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭


মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অঙ্গ -ভ.ই.লেনিন

jpg

সভ্য দুনিয়ার সর্বত্র বুর্জোয়া বিজ্ঞানের (সরকারি এবং উদারনীতিক উভয় প্রকার) পক্ষ থেকে মার্কসের মতবাদের প্রতি চূড়ান্ত শত্রুতা ও আক্রোশ দেখা যায়। মার্কসবাদকে তারা দেখে একধরনের `বিষাক্ত গোষ্ঠী’ হিসাবে। অবশ্যই অন্য কোন মনোভাব আশা করা বৃথা, কেননা শ্রেণি সংগ্রামের ওপর গড়ে ওঠা সমাজে `নিরপেক্ষ’ সমাজবিজ্ঞানের অস্তিত্ব অসম্ভব। সবরকমের সরকারি ও উদারনীতিক বিজ্ঞানেই কোন না কোনভাবে মজুরি-দাসত্বের সমর্থন করা হয়ে থাকে, আর সে মজুরি-দাসত্বের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন সংগ্রাম ঘোষণা করেছে মার্কসবাদ। পুঁজির মুনাফা কমিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো উচিত নয় কিÑ এই প্রশ্নে মিলমালিকদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা আর মজুরি-দাসত্বের সমাজে, বিজ্ঞানের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা সমান বাতুলতা।

কিন্তু এইটুকুই সব নয়। `গোষ্ঠীবাদ’ বলতে যদি বোঝায় একটা আত্মবদ্ধ শিলীভূত মতবাদ, যার উদয় হয়েছে বিশ্বসভ্যতা বিকাশের রাজপথ থেকে বহুদূরে, তবে দর্শন এবং সামাজিক বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে অতি পরিষ্কার করে দেখা যায় যে, মার্কসবাদের মধ্যে তেমন কোন কিছুই নেই। বরং মার্কসের সমগ্র প্রতিভাটাই এইখানে যে, মানব সমাজের অগ্রণী ভাবনায় যে সব জিজ্ঞাসা আগেই দেখা দিয়েছিল মার্কস তারই জবাব দিয়েছেন। তাঁর মতবাদের উদ্ভব হয়েছে দর্শন, অর্থশাস্ত্র এবং সমাজবাদের মহাচার্যেরা যে শিক্ষা দান করেছিলেন, তাই সরাসরি ও অব্যবহিত অনুবর্তন হিসেবে।

মার্কসের মতবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ তা সত্য। এ মতবাদ সুসম্পূর্ণ ও সুসমজ্ঞস্য; এর কাছ থেকে যে সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি লাভ করা যায় তা কোন রকম কুসংস্কার, প্রতিক্রিয়া অথবা বুর্জোয়া জোয়ালের কোনোরূপ সমর্থনের সঙ্গে আপস করে না। ঊনিশ শতকের জার্মান দর্শন, ইংরেজ অর্থশাস্ত্র এবং ফরাসি সমাজবাদ রূপে মানবজাতির যা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তার ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী হল মার্কসবাদ। মার্কসবাদের এই তিনটি উৎস এবং সেই সঙ্গে তিনটি অঙ্গ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।


মার্কসবাদের দর্শন- বস্তুবাদ। ইউরোপের সমগ্র আধুনিক ইতিহাস থেকে এবং বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দির শেষের দিকে, ফ্রান্সে যখন সবরকম মধ্যযুগীয় জঞ্জালের বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠান ও ধ্যান-ধারণায় নিহিত সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রাম জ্বলে উঠেছিল, তখন থেকে বস্তুবাদই দেখা দিয়েছে একমাত্র সঙ্গতিপরায়ণ দর্শন হিসাবে, যা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সমস্ত সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বস্ত এবং কুসংস্কার, ভণ্ডামি প্রভৃতির শত্রু। গণতন্ত্রের শত্রুরা তাই বস্তুবাদকে `খণ্ডন করার’ জন্য, তাকে ধূলিসাৎ ও নিন্দিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এবং সমর্থন করেছে নানা ধরনের দার্শনিক ভাববাদ যা সর্বদাই পর্যবসিত হয় কোন না কোনভাবে ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণ অথবা সমর্থনে।

মার্কস ও এঙ্গেলস অতি দৃঢ়তার সঙ্গে দার্শনিক বস্তুবাদকে সমর্থন করেছেন এবং এই ভিত্তি থেকে প্রত্যেকটি বিচ্যুতিই যে কী দারুণ ভুল তা বারবার ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন। তাঁদের এই মতামত সবচেয়ে পরিষ্কার করে এবং বিশদভাবে ব্যক্ত হয়েছে এঙ্গেলসের রচনা `ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ’ এবং `অ্যান্টি-দ্যুরিং’ বইতে। কমিউনিস্ট ইশতেহারের মতো এই বই দু’খানিও প্রত্যেকটি শ্রেণি সচেতন শ্রমিকদের কাছে নিত্যপাঠ্য।

অষ্টাদশ শতাব্দির বস্তুবাদেই কিন্তু মার্কস থেমে যাননি, দর্শনকে তিনি অগ্রসর করে গেছেন। এ দর্শনকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন জার্মান চিরায়ত দর্শনের সম্পদ দিয়ে, বিশেষ করে হেগেলীয় তত্ত্ব দিয়ে, যা আবার পৌঁছিয়েছেন ফয়েরবাখের বস্তুবাদে। এই সব সম্পদের মধ্যে প্রধান হলো দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব, অর্থাৎ গভীরতম, পূর্ণতম, একদেশদর্শিতাবর্জিত বিকাশের তত্ত্ব, যে মনুষ্য জ্ঞানে আমরা পাই নিরন্তর বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন তার আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। জরাজীর্ণ পুরনো ভাববাদের ‘নব নব’ প্রত্যাবর্তনসহ সমস্ত বুর্জোয়া দার্শনিক মতবাদ সত্ত্বেও, রেডিয়ম, ইলেক্ট্রন, মৌলিক পদার্থের রূপান্তর প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আধুনিকতম আবিষ্কার থেকে মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ চমৎকার হয়েছে।

দার্শনিক বস্তুবাদকে গভীরতর ও পরিবিকশিত করে মার্কস তাকে সম্পূর্ণতা দান করেন, প্রকৃতি-বিষয়ক জ্ঞানকে প্রসারিত করেন মানবসমাজের জ্ঞানে। বৈজ্ঞানিক চিন্তার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হল মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। ইতিহাস ও রাজনীতি-বিষয়ক মতামতে যে বিশৃঙ্খলা ও খামখেয়াল এযাবৎ চলে আসছিল তার সমাপ্তি ঘটিয়ে এগিয়ে এল এক আশ্চর্য রকমের সর্বাঙ্গীণ ও সুসামঞ্জস্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা দেখালো কী করে উৎপাদন শক্তিগুলির বিকাশের পথে সমাজজীবন একটি ব্যবস্থা থেকে উদ্ভব হয় উচ্চতর ব্যবস্থার- দৃষ্টান্তস্বরূপ, কী করে সামন্ততন্ত্র থেকে বিকশিত হয় পুঁজিবাদ।

মানুষের জ্ঞান যেমন মানুষের অস্তিত্ব-নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক জগতের, অর্থাৎ বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন, তেমনি সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিফলনই হলো মানুষের সামাজিক জ্ঞান (অর্থাৎ বিভিন্ন দার্শনিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক প্রভৃতি মতামত ও তত্ত্ব)। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি হল অর্থনৈতিক বনিয়াদের উপরিকাঠামো। দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখা যাবে যে আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক রূপ যাই হোক, তার কাজ প্রলেতারিয়েতের ওপর বুর্জোয়ার প্রভুত্ব সংহত করা।

মার্কসের দর্শন হল সুসম্পূর্ণ দার্শনিক বস্তুবাদ- তা থেকে মানবসমাজ, বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি, তার জ্ঞানাঞ্জনশলাকা লাভ করেছে।


অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই হল বনিয়াদ, তার ওপরেই রাজনৈতিক উপরিকাঠামো দণ্ডায়মান- এ কথা উপলব্ধির পর মার্কস তাঁর সবখানি মনোযোগ ব্যয় করেন এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পর্যালোচনায়। মার্কসের প্রধান রচনা `পুঁজি’তে আধুনিক, অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পর্যালোচিত হয়েছে।

মার্কসের পূর্বে চিরায়ত অর্থশাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিকশিত দেশে-ইংল্যান্ডে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনুসন্ধান করে এ্যাডাম স্মিত ও ডেভিড রিকার্ডো মূল্যের শ্রম-তত্ত্বের সূত্রপাত করেন। মার্কস তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি এ তত্ত্বকে অমূল্যরূপে সুসিদ্ধ ও সুসঙ্গতরূপে বিকশিত করেন। তিনি দেখান যে, পণ্যের উৎপাদনে সামাজিকভাবে আবশ্যক যে শ্রম-সময় ব্যয় হয়েছে, তাই দিয়েই তার মূল্য নির্ধারিত হয়। 
বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদেরা যেখানে দেখছিলেন দ্রব্যের সঙ্গে দ্রব্যের সম্পর্ক (এক পণ্যের সঙ্গে অন্য পণ্যের বিনিময়) মার্কস সেখানে উদ্ঘাটিত করলেন মানুষে মানুষে সম্পর্ক। পণ্য বিনিময়ের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে বাজারের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন উৎপাদকদের পারস্পরিক সম্পর্ক। মুদ্রা থেকে সূচিত হচ্ছে, সে সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, বিভিন্ন উৎপাদকদের সমস্ত অর্থনৈতিক জীবন বাঁধা পড়েছে অবিচ্ছিন্ন সমগ্রতায়। পুঁজির অর্থ এই সম্পর্কের আরও বিকাশ: মানুষের শ্রম-শক্তি পরিণত হচ্ছে পণ্যে। জমি, কারখানা, শ্রমের হাতিয়ারপাতির মালিকের কাছে মজুরি শ্রমিক তার শ্রম-শক্তি বিক্রি করে। শ্রম-দিনের একাংশ সে খাটে তার সপরিবার ভরণপোষণের খরচা তোলার জন্য (মজুরি), বাকি অংশটা সে খাটে বিনামজুরিতে এবং পুঁজিপতির জন্য উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করে যা পুঁজিপতি শ্রেণির মুনাফা ও সম্পদের উৎস।

মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের মূলকথা হলো এই উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব। 
শ্রমিকদের মেহনতে গড়া এই পুঁজি শ্রমিকদের পিষ্ট করে, ক্ষুদে মালিকদের ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে বেকার বাহিনীর। শিল্পের ক্ষেত্রে বৃহদাকার উৎপাদনের জয়যাত্রা অবিলম্বেই চোখে পড়ে, কিন্তু কৃষির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার দেখা যাবে : বৃহদাকার পুঁজিবাদী কৃষির প্রাধান্য বাড়ছে, যন্ত্রপাতির নিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষকের অর্থনীতি এসে মুদ্রাপুঁজির ফাঁসে আটকে যাচ্ছে, তারপর নিজের পশ্চাৎপদ টেকনিকের বোঝা নিয়ে ভেঙ্গে পড়ছে ও ধ্বংস হচ্ছে। কৃষিতে ক্ষুদ্রাকার উৎপাদনের যে ভাঙন তার রূপগুলো অন্যরকম, কিন্তু ভাঙনটা তর্কাতীত সত্য। 
ক্ষুদ্রাকার উৎপাদনকে ধ্বংস করে পুঁজি শ্রমের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি ঘটায় এবং বৃহৎ পুঁজিপতি সঙ্ঘগুলির একচেটিয়া প্রতিষ্ঠা সৃষ্টি করে। উৎপাদনটাও উত্তরোত্তর সামাজিক হতে থাকে- লক্ষ লক্ষ এবং কোটি কোটি মজুর বাঁধা পড়ে একটি প্রণালীবদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়- কিন্তু যৌথ শ্রমের ফল আত্মসাৎ করে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি। বৃদ্ধি পায় উৎপাদনের নৈরাজ্য, সংকট, বাজারের জন্য ক্ষিপ্ত প্রতিযোগিতা, এবং জনসাধারণের ব্যাপক অংশের মধ্যে জীবনধারণের অনিশ্চয়তা। 
পুঁজির কাছে শ্রমিকদের পরাধীনতা বাড়িয়ে তুলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্মিলিত শ্রমের মহাশক্তি গড়ে তোলে।

পণ্য অর্থনীতির ভ্রƒণাবস্থা থেকে, সরল বিনিময় থেকে শুরু করে তার সর্বোচ্চ রূপ, বৃহদাকার উৎপাদনের রূপ পর্যন্ত মার্কস পুঁজিবাদের বিকাশ পর্যালোচনা করেছেন। 
এবং নতুন পুরনো সবরকম পুঁজিবাদী দেশের অভিজ্ঞতা থেকে মার্কসের এই মতবাদের সঠিকতা বছরের পর বছর বেশি বেশি মজুরদের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। 
সারা দুনিয়ায় পুঁজিবাদের জয় হয়েছে। কিন্তু এ জয় শুধু পুঁজির ওপর শ্রমের বিজয়লাভের পূর্বাভাস।


সামন্ততন্ত্রের পতনের পর ঈশ্বরের দুনিয়ায় `মুক্ত’ পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, মেহনতি মানুষদের ওপর পীড়ন ও শোষণের একটি নতুন ব্যবস্থাই হল এ মুক্তির অর্থ। যে পীড়নের প্রতিফলন ও প্রতিবাদস্বরূপ নানাবিধ সমাজতান্ত্রিক মতবাদ অবিলম্বে দেখা দিতে শুরু করে। কিন্তু আদিম সমাজবাদ ছিল ইউটোপীয় সমাজবাদ। পুঁজিবাদী সমাজের তা সমালোচনা করেছে, নিন্দা করেছে, অভিশাপ দিয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে তার বিলুপ্তির, উন্নততর এক ব্যবস্থার কল্পনায় মেতেছে, আর ধনীদের বোঝাতে চেয়েছে শোষণ নীতিবিগর্হিত কাজ।

কিন্তু সত্যিকারের উপায় দেখাতে ইউটোপীয় সমাজবাদ পারেনি। পুঁজিবাদের আমলে মজুরি-দাসত্বের সারমর্ম কী তা সে বোঝাতে পরেনি, পুঁজিবাদের বিকাশের নিয়মগুলি কী তাও সে আবিষ্কার করতে পারেনি, খুঁজে পায়নি কোন সামাজিক শক্তি নতুন সমাজের নির্মাতা হবার ক্ষমতা ধরে।

ইতিমধ্যে সামন্ততন্ত্র, ভূমিদাসত্বের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের সর্বত্র এবং বিশেষ করে ফ্রান্সে যে সব উত্তাল বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছিল, তা থেকে উত্তরোত্তর পরিষ্কার করে বেরিয়ে আসে যে শ্রেণিসমূহের সংগ্রামই হল সমস্ত বিকাশের ভিত্তি ও চালিকা শক্তি।

মরিয়া প্রতিবন্ধকতা ছাড়া সামন্ত শ্রেণির উপর রাজনৈতিক স্বাধীনতার একটি বিজয়লাভও সম্ভব হয়নি। পুঁজিবাদী সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে মরণপণ সংগ্রাম বিনা কোন পুঁজিবাদী দেশই ন্যূনাধিক মুক্ত ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি।

কিন্তু বিশ্ব ইতিহাস থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে, এ থেকে সে সিদ্ধান্ত সর্বাগ্রে মার্কসই গ্রহণ করেছেন এবং সুসঙ্গতরূপে তাকে টেনে নিয়ে গেছেন, এই হল মার্কসীয় প্রতিভার বৈশিষ্ট্য। সে সিদ্ধান্তটা হল শ্রেণি সংগ্রামের মতবাদ।

সবকিছু নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত লোকে রাজনীতির ক্ষেত্রে চিরকাল প্রতারণা ও আত্মপ্রতারণার নির্বোধ বলি হয়ে ছিল এবং চিরকাল থাকবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাজে সংস্কার ও উন্নয়নের প্রবক্তারা সর্বদাই বোকা বনবে যদি না তারা এ কথা বোঝে যে, যত অসভ্য ও জরাজীর্ণ মনে হোক না কেন প্রত্যেকটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে কোন না কোন শাসক শ্রেণির শক্তির জোরে। এবং এই সব শ্রেণির প্রতিরোধ চূর্ণ করার শুধু একটিই উপায় আছে; যে শক্তি পুরানোর উচ্ছেদ ও নতুনকে সৃষ্টি করতে পারে- এবং নিজের সামাজিক অবস্থা হেতু যা তাকে করতে হবে- তেমন শক্তিকে আমাদের চারপাশের সমাজের মধ্যে থেকেই আবিষ্কার করে তাকে শিক্ষিত ও সংগ্রামের জন্যে সংগঠিত করে তোলা।

যে মানবিক দাসত্বের মধ্যে নিপীড়িত শ্রেণিগুলির সকলে এতদিন বাঁধা পড়ে ছিল তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ প্রলেতারিয়েত পেয়েছে একমাত্র মার্কসের দার্শনিক বস্তুবাদ থেকে। একমাত্র মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বেই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সাধারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের সত্যিকার অবস্থাটা কী।

আমেরিকা থেকে জাপান এবং সুইডেন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা- সারা দুনিয়া জুড়ে প্রলেতারিয়েতের স্বাধীন সংগঠনের সংখ্যা বাড়ছে। নিজেদের শ্রেণি সংগ্রাম চালিয়ে আলোকপ্রাপ্ত ও শিক্ষিত হয়ে উঠেছে প্রলেতারিয়েত; বুর্জোয়া সমাজের কুসংস্কার থেকে তারা মুক্ত হয়ে উঠেছে; ক্রমেই নিবিড় হয়ে জোট বাঁধছে, শিখছে কী করে নিজেদের সাফল্যের খতিয়ান করতে হয়; আপন শক্তিসমূহকে তারা পোক্ত করে তুলছে এবং বেড়ে উঠছে অপ্রতিহতভাবে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭

 


কার্ল মার্কসের সমাধিস্থলে বক্তৃতা -ফ্রেডারিক এঙ্গেলস

lead_960

১৪ই মার্চ, বেলা পৌনে তিনটেয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক চিন্তা থেকে বিরত হয়েছেন। মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্য তাঁকে একা রেখে যাওয়া হয়েছিল। আমরা ফিরে এসে দেখলাম যে তিনি তাঁর আরামকেদারায় শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন- কিন্তু ঘুমিয়েছেন চিরকালের জন্য।

এই মানুষটির মৃত্যুতে ইউরোপ ও আমেরিকার জঙ্গি প্রলেতারিয়েত এবং ইতিহাস-বিজ্ঞান উভয়েরই অপূরণীয় ক্ষতি হল। এই মহান প্রাণের তিরোভাবে যে শূন্যতার সৃষ্টি হল তা অচিরেই অনুভূত হবে।

ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন তেমনি মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানুষের ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম, মতাদর্শের অতি নিচে এতদিন লুকিয়ে রাখা এই সহজ সত্য যে, রাজনীতি, বিজ্ঞান, কলা, ধর্ম ইত্যাদি চর্চা করতে পারার আগে মানুষের প্রথম চাই খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, পরিচ্ছদ, সুতরাং প্রাণধারণের আশু বাস্তব উপকরণের উৎপাদন এবং সেইহেতু কোনো নির্দিষ্ট জাতির বা নির্দিষ্ট যুগের অর্থনৈতিক বিকাশের মাত্রাই হলো সেই ভিত্তি যার ওপর গড়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট জাতিটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের ধ্যান-ধারণা, শিল্পকলা, এমনকি তাদের ধর্মীয় ভাবধারা পর্যন্ত এবং সেই দিক থেকেই এগুলির ব্যাখ্যা করতে হবে, এতদিন যা করা হয়েছে সেভাবে উল্টো দিক থেকে নয়।

কিন্তু শুধু এই নয়। বর্তমান পুঁজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতির এবং এই পদ্ধতি যে বুর্জোয়া সমাজ সৃষ্টি করেছে তার গতির বিশেষ নিয়মটিও মার্কস আবিষ্কার করেন। যে সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে এতদিন পর্যন্ত সব বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ ও সমাজতন্ত্রী সমালোচক উভয়েরই অনুসন্ধান অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল, তার ওপর সহসা আলোকপাত হল উদ্ধৃত্ত মূল্য আবিষ্কারের ফলে।

একজনের জীবদ্দশার পক্ষে এরকম দুটো আবিষ্কারই যথেষ্ট। এমনকি এরকম একটা আবিষ্কার করতে পারার সৌভাগ্য যাঁর হয়েছে তিনিও ধন্য। কিন্তু মার্কসের চর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে- এবং তিনি চর্চা করেছিলেন বহু বিষয় নিয়ে এবং কোনোটাই ওপর ওপর নয়- তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই, এমনকি গণিতশাস্ত্রও তিনি স্বাধীন আবিষ্কার করে গেছেন। 
এই হল বিজ্ঞানী মানুষটির রূপ। কিন্তু এটা তাঁর ব্যক্তিত্বের অর্ধেকও নয়। মার্কসের কাছে বিজ্ঞান ছিল এক ঐতিহাসিকভাবে গতিষ্ণু বিপ্লবী শক্তি। কোনো একটা তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের নতুন যে আবিষ্কার কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের কল্পনা করাও হয়তো তখনো পর্যন্ত অসম্ভব, তেমন আবিষ্কারকে মার্কস যতই স্বাগত জানান না কেন, তিনি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের আনন্দ পেতেন যখন কোনো আবিষ্কার শিল্পে এবং সাধারণভাবে ঐতিহাসিক বিকাশে একটা আশু বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যুৎশক্তির ক্ষেত্রে যেসব আবিষ্কার হয়েছে তার বিকাশ এবং সম্প্রতি মার্সেল দ্রেপ্রের আবিষ্কারগুলি তিনি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করতেন।

কারণ মার্কস সবার আগে ছিলেন বিপ্লববাদী। তাঁর জীবনের আসল ব্রত ছিল পুঁজিবাদী সমাজ এবং এই সমাজ যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে তার উচ্ছেদে কোন না কোন উপায়ে অংশ নেওয়া, আধুনিক প্রলেতারিয়েতের মুক্তি সাধনের কাজে অংশ নেওয়া, একে তিনিই প্রথম তার নিজের অবস্থা ও প্রয়োজন সম্বন্ধে, তার মুক্তির শর্তাবলী সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছিলেন। তাঁর ধাতটাই ছিল সংগ্রামের। এবং যে আবেগ, যে অধ্যবসায় ও যতখানি সাফল্যের সঙ্গে তিনি সংগ্রাম করতেন তার তুলনা মেলা ভার। প্রথম Rheinische zeitung (1842), প্যারিসের vorwarts (1844) পত্রিকা, Deutsche Brusseler zeitung (1847), Neue Rheinische (1848-49), New york Tribune (1852-61) পত্রিকা এবং এছাড়া একরাশ সংগ্রামী পুস্তিকা, প্যারিস, ব্রাসেলস এবং লন্ডনের সংগঠনে তাঁর কাজ এবং শেষে, সর্বোপরি মহান শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি গঠন- এটা এমন একটা কীর্তি যে আর কোন কিছু না করলেও শুধু এইটুকুর জন্যই এর প্রতিষ্ঠাতা খুবই গর্ববোধ করতে পারতেন।

তাই, তাঁর কালের লোকেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রোশ ও কুৎসার পাত্র হয়েছেন মার্কস। স্বেচ্ছাতন্ত্রী এবং প্রজাতন্ত্রী দু’ধরনের সরকারই নিজ নিজ এলাকা থেকে তাঁকে নির্বাসিত করেছে। রক্ষণশীলই বা উগ্র-গণতান্ত্রিক সব বুর্জোয়ারাই পাল্লা দিয়ে তাঁর দুর্নাম রটনা করেছে। এসব কিছুই তিনি ঠিক মাকড়শার ঝুলের মতোই ঝেঁটিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন, উপেক্ষা করেছেন এবং যখন একান্ত প্রয়োজনবশে বাধ্য হয়েছেন একমাত্র তখনই এর জবাব দিয়েছেন। আর আজ সাইবেরিয়ার খনি থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত, ইউরোপ ও আমেরিকার সব অংশে লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী সহকর্র্মীদের প্রীতির মধ্যে, শ্রদ্ধার মধ্যে, শোকের মধ্যে তাঁর মৃত্যু। আমি সাহস করে বলতে পারি যে মার্কসের বহু বিরোধী থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রু তাঁর মেলা ভার।

যুুগে যুগে অক্ষয় হয়ে থাকবে তাঁর নাম, অক্ষয় হয়ে থাকবে তাঁর কাজ।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা বিশেষ সংখ্যা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৭