বাংলাদেশঃ মার্কসবাদী শিল্প সাহিত্যের কাগজ ‘খনন’ এর আগস্ট ‘১৭ সংখ্যা বেরিয়েছে

20751511_1436426656438227_1757569254_n

প্রাপ্তি স্থানঃ ঘাস ফুল নদী(প্রথা বিরোধী প্রকাশনা), আজিজ সুপার মার্কেট(নীচ তলা), শাহবাগ, ঢাকা


শ্রমজীবী জনগণও চাঁদাবাজদের হাতে বন্দী

may_89632

আব্দুল ওয়াদুদ এক সময়ে জমিদার জোতদাররা দেশের শ্রমিক, কৃষক, জনগণের নিকট থেকে কর আদায় করতো। এর সাথে যুক্ত হতো ইজারাদারদের তোলা। এই তোলাবাজির বিরুদ্ধে জোরদার কৃষক আন্দোলন হয়েছিল। তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল হাট-বাজারে তোলা উঠানো বন্ধ করতে হবে। প্রবল আন্দোলনের মুখে তোলা উঠানো বন্ধ হয়। শুধু তোলা উঠানো নয়, জমিদারি প্রথাই চিরতরে বিলুপ্ত হয়। জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে এবং কৃষকের উপর জবরদস্তিমূলক উপরি আদায়ের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল। এখন কমিউনিস্টদের সেই শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই চাঁদাবাজদের জুলুমের শিকার হচ্ছেন গোটা শ্রমজীবী জনগণ। দেশের শ্রমজীবী জনগণকেই একশ্রেণির চাঁদাবাজদের আবদার মেটাতে হচ্ছে। দাবি না মেটাতে পারলে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে তা আদায় করে নিচ্ছে একশ্রেণির চাঁদাবাজ। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় অবাধ্যতার শাস্তি স্বরূপ শারীরিক নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে থেমে থাকছে না, জবরদস্তিমূলকভাবে শ্রমজীবী জনগণের সামান্য পুঁজিও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

চাঁদাবাজির ঘটনা সম্পর্কে একটি সচিত্র প্রতিবেদন দেখেছিলাম টেলিভিশনে। সেখানে দেখানো হয়েছে, সিএনজি চালিত অটোরিক্সা রাস্তায় চালাতে গেলে চালককে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। তবেই সিএনজি রাস্তায় নামতে পারে এবং বৈধ হিসাবে গণ্য হয়। সিএনজি চালক এই উৎকোচের অর্থ পুষিয়ে নেয় যাত্রীদের নিকট থেকে, বেশি ভাড়া আদায় করে। সড়কে চাঁদাবাজির কারণে বাজারে ফল-মূল, শাক-সবজী ও মাংসের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। গরু, ছাগল, হাস-মুরগি ইত্যাদি পরিবহন করতে গেলে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিয়ে তবেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর পরেও সেখানে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। ঢাকা মহানগরীতে কারওয়ান বাজার একই বড় বাজার। সেখান থেকে বছরে শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। ফলে মাংসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে এখন তা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে। শাক-সবজি, তরি-তরকারি ইত্যাদি উৎপাদন করে কৃষক লাভের মুখ তো দেখতে পান না, উপরন্তু তাকে লোকসানে পড়ে দেনার দায়ে শেষ সম্বল ভিটে বাড়ি হারাতে হয়। এই সব কৃষি পণ্য উৎপাদন করে কৃষক লাভবান হতে না পারলেও পণ্য বাজারে নেওয়ার পথে পরিবহন থেকে চাঁদাবাজরা অর্থ আদায় করে নিচ্ছে। আর ক্রেতা সাধারণের ঘাড়ে তার দায়ভার পড়ছে।

ঢাকাতে ফেরিওয়ালাদের ফুটপাতে বসতে হলে চাঁদাবাজির শিকার হতে হচ্ছে। ঢাকার নবাবপুর রোডের ডাব বিক্রেতা হাশেম মিয়া। আদি নিবাস রাজবাড়ী জেলাতে। পদ্মার ভাঙনে কয়েকবার ভিটে মাটি হারিয়ে ঢাকাতে এসেছেন, ডাব বিক্রি করতে। পরিবার-পরিজন এখন বেড়ি বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। ঢাকাতে একটি বস্তির ভাঙা ঘরে কয়েকজনে মিলে ভাড়া থাকেন। সেখানেও চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পাননি। নবাবপুর রোড এমনিতেই শহরের ব্যস্ত রাস্তা। সারাদিনই এখানে যানজট লেগেই থাকে। যার মাঝে ফুটপাতে হকারের ভিড়, দোকানদারের মালপত্র দিয়ে ফুটপাত দখল করা ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। তার মাঝে হাশেম মিয়া ভ্যানে করে ডাব ফেরি করে বিক্রি করেন। তার কাছ থেকেও চাঁদাবাজি হচ্ছে। প্রতিদিন সকালে ১০ টাকা, আর বিকালে ১০ টাকা হারে। চাঁদা দিতে বিলম্ব হলে পুলিশের লাইনম্যান নামে পরিচিত চাঁদাবাজ তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করে চাঁদা আদায় করে নেয়। তার উপরে ট্রাফিক সাজেন্ট তো রয়েছেন। তিনি সপ্তাহে দুই একবার এসে দেখা করেন। হাশেম মিয়ার ভাষায়, ‘সাজেন্ট স্যার আসলে একটা করে ডাব তাকে খাওয়াতে হয়’। এইভাবে চলে যায় ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা। ঢাকার রাস্তায় এখন রিক্সায় চলে ভ্রমণ করেন নিম্ন আয়ের জনগণ। নবাবপুর রোডের বিভিন্ন গলিতে রিক্সা ঢোকার জন্য মাঝে মাঝে পুলিশ বাধা দিয়ে থাকে। তবে গলিতে ঢোকার জন্য রিক্সা প্রতি পাঁচ টাকা করে পুলিশকে চাঁদা দিলেই গলিতে প্রবেশ বৈধ হয়ে যায়।

একবার ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম। ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যেকার ট্রেনে যাত্রী ভিড় লেগেই থাকে। এখানকার ট্রেনগুলোতে নির্ধারিত আসনে যাত্রী তো আছেনই, তার উপর আসন ছাড়াও বহু লোক দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করছেন। তার মধ্যে আবার বিভিন্ন হকারদের আনাগোণা, হাঁক-ডাক, চিৎকার মিলে গরমে এক ভয়াবহ অবস্থা। চলতি পথে ট্রেন ভৈরব এসে থামলো। ভৈরব স্টেশনে দাঁড়ানোর সাথে সাথে কিছু সংখ্যক মাস্তান চাঁদাবাজ হকারদের ওপর চড়াও হলো। তারা হকারদের কাছ থেকে জোর জবরদস্তিমূলকভাবে ২০ টাকা, ৩০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করে নিল। অনেক ফেরিওয়ালা সদ্য ফেরি করতে উঠেছেন, বিক্রি হয়নি, এই অজুহাতে চাঁদা দিতে না চাওয়ায় চাঁদাবাজ মাস্তানরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে চাঁদা আদায় করে নিল। ফেরিওয়ালাদের অসহায় অবস্থা দেখে ট্রেন স্টেশন থেকে ছাড়ার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারা গেল, ট্রেনে ফেরি করে ব্যবসা করতে হলে এই মাস্তানদের চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদাবাজ মাস্তানদের সাথে রয়েছে জিআরপি’র ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। মাস্তান চাঁদাবাজরা আবার জিআরপি’র পক্ষ থেকেই চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা আদায়ের পর জিআরপি ও মাস্তান চাঁদাবাজরা ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে।

ঢাকা মহানগরের সড়কের আশে-পাশের ফুটপাতগুলোতে হকার উচ্ছেদের অভিযান এখনও চলমান রয়েছে। ঢাকা মহানগরীর রাস্তাগুলো থেকে ভিক্ষুক উচ্ছেদ, হকার উচ্ছেদের অভিযান মাঝে মাঝে চলে থাকে। প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় এটা সরকারের উদ্ভট পরিকল্পনা হলেও এই ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে। আর সরকারের তেল মারা কিছু মিডিয়া রয়েছে তারা প্রকৃত সমস্যা আড়াল করে এই ভূমিকার গুণকীর্তন করছে। প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যেখানে জনসংখ্যার অর্ধেকই বেকার সেখানে এই ধরনের অভিযানের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবুও চলেছে ঘটা করে হকার উচ্ছেদের অভিযান। সিটি কর্পোরেশন রাজধানী ঢাকার ফুটপাতকে হকারমুক্ত করার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারীদের সমন্বয়ে চলছে এই অভিযান। তবে একদিকে চলছে হকার উচ্ছেদের অভিযান আবার অন্যদিকে নতুনভাবে হকার বসানোর আয়োজন। এর তাৎপর্য কী তা বুঝতে একটু সময় লাগলো। নতুন করে বসা হকারদের কাছে একটু খোঁজ নিয়ে জানা গেল মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাদের আবার ফুটপাতে বসতে দেওয়া হয়েছে। তার উপরে হকারদের নিকট থেকে প্রতিদিনের চাঁদা তা তো অব্যাহত রয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী ও কিছু সংখ্যক অসাধু পুলিশের যোগাযোগে এই নতুন করে হকার বসানোর কর্মসূচি চলছে। সিটি কর্পোরেশনের হকার উচ্ছেদের কর্মসূচি এইভাবে একটি চক্রের পকেট ভারী করার কাজে লাগানো হচ্ছে। ভিক্ষুকদের নিকট থেকে চাঁদা আদায় হয় কী না সে সম্পর্কে কোন তথ্য এখনও জানা নেই।

এতো গেল সমাজের নিচের মহলের চাঁদাবাজির কিছু ঘটনা। সমাজের সর্বমহলেই এভাবে চলছে চাঁদাবাজি। এবারে আসা যাক সরকারের একজন মন্ত্রীর ভাইয়ের চাঁদাবাজির কাহিনী। সরকারের মন্ত্রী বলে তার ভাইয়েরও কদর বেড়েছে। তাই ভুক্তভোগী মানুষজন নিত্য যাতায়াত করছেন মন্ত্রীর ভাইয়ের কাছে সুপারিশের জন্য। চাকরি, ব্যবসা, জমিজমা, সামাজিক বিরোধ, এলাকার সকল সমস্যার সমাধান দেন মন্ত্রীর ভাই। এব্যাপারে অনেকেই তার গুণকীর্তন করে থাকেন। সরকারি চাকরির ব্যাপারে তার কাছে গেলে তো কথা নেই। তিনি কোন প্রার্থীর সুপারিশ-ই অগ্রাহ্য করেন না। চাকরি দেওয়ার নামে তিনি সকলের নিকট থেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা নগত হাতিয়ে নেন। তার মধ্যে কারো না কারো চাকরি নিজ যোগ্যতা বলে হয়ে যায়। যাদের যোগ্যতা বলে চাকরি হয়ে যায় তারা তো খুশিতে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আর যাদের চাকরি হয় না, তাদেরকেও তিনি হতাশ করেন না। যাওয়া মাত্র আলমারি থেকে কাগজপত্র, টাকা পয়সা বের করে তিনি চাকরি লাভে ব্যর্থ প্রার্থীর হাতে ধরিয়ে দেন। এইভাবেই তিনি কৌশল করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

এবারে আসা যাক বিগত সরকারের অর্থাৎ চার দলীয় জোট সরকারের জনৈক প্রভাবশালী মন্ত্রীর প্রভাব প্রতিপত্তি আর উৎকোচ গ্রহণের কাহিনী। তবে মন্ত্রী সজ্জন ব্যক্তি, নিছক ভদ্রলোক, তিনি উৎকোচ গ্রহণ করেন না। তাই তার কাছে কেউ উৎকোচ নিয়ে যেতে সাহস পায় না। তবে মন্ত্রীর স্ত্রী, যিনি জনগণকে উপকার (!) করতে কার্পন্য করেন না। সরকারি চাকরির সার্কুলার দিলেই তার পোয়াবারো অবস্থা। শত শত চাকরি প্রার্থী। তিনি কোন প্রার্থীকেই হতাশ করেন না। সকলকেই চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন। এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সবার নিকট থেকে মোটা অংকের উৎকোচ গ্রহণ করেন। তারপর প্রার্থীর যোগ্যতা অনুসারে কারো কারো চাকরি হয়ে যায়। যার চাকরি হলো তার খুশি আর ধরে না। যাদের চাকরি হলো না, তারা আবার মন্ত্রীর বাড়ির দিকে ছুটলেন মন্ত্রীর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে। অনেক কষ্ট করে দেখাও হয়তো করলেন। মন্ত্রীর স্ত্রী আশ্বাস দিল এবারে চাকরি হলো না, পরে আবার সাকুর্লার হলে দিয়ে দেওয়া যাবে। মন্ত্রীর স্ত্রীর কথায় আশ্বস্ত হয়ে পিছনে পিছনে ঘুরতে শুরু করলেন চাকরি প্রার্থী। কিন্তু পরের বারও হলো না। মন্ত্রীর স্ত্রীর সাথে দেখা করে টাকা ফেরত পেলেন। তবে তার দেওয়া পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকার পুরোটা নয়, আংশিক। অবস্থাভেদে এক থেকে তিন লাখ টাকা। বাঁকি টাকার ব্যাপারে মন্ত্রীর স্ত্রী বললেন, ‘এখন আর বিরক্ত করিস না, পরে আসিস দেখা যাবে’। মন্ত্রী বাহাদুরের স্ত্রী টাকা ফেরত চাইলে বিরক্ত হয়েছেন। এর পরে আর কোন চাকরি প্রার্থীর সাহস আছে তার পাওনা টাকা ফেরত চাওয়া।

ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি শাসক-শোষক শ্রেণির কল্যাণে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। চাঁদাবাজি, মাস্তানি, অনিয়ম, দুর্নীতি এত ব্যাপক হয়েছে যার হাত থেকে নিঃস্ব, হতঃদরিদ্ররাও রেহাই পাচ্ছে না। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি করতে পারাটাই এখন অনেকের কাছে কারিশমা। বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের আমলে এই দুর্নীতি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মহাজোট সরকার দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থেকে যাওযায় আশ্বস্ত হয়ে ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি এখন খোলাখুলিভাবে করতে পারছেন। অবক্ষয়ি সমাজের নৈতিকতার মানদন্ড এত নিচুতে পৌঁছেছে যে গোটা সমাজটাই ডুবতে বসছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৭।।সংখ্যা-০২, রোববার।। ২৫ জুন ২০১৭।।


শাসক শোষক গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ব্যবহার করার নতুন অপকৌশল

lqreb_227301

গৌর হরি দাস ॥ পুঁজিবাদী সমাজের মতাদর্শগত ভিত্তি জাতীয়তাবাদ। যে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয় সামন্তবাদের গর্ভেই। সমাজ বিকাশের অগ্রগতির ধারায় সামন্তবাদকে উচ্ছেদ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পুঁজিবাদ। প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় রাষ্ট্র; এই জাতীয় রাষ্ট্রে বুর্জোয়া শ্রেণি হয়ে ওঠে সকল ক্ষমতার একচ্ছত্র মালিক। জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে জাতীয়তাবাদের আসল চেহারা মূর্ত হয়ে ওঠে। যে সাম্য, মৈত্রী স্বাধীনতার স্লোগান দিয়ে শ্রমিক কৃষক জনগণের ভবিষ্যত নিশ্চিত করার কথা বলে বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের উদ্দেশ্যে ইতিপূর্বের দেওয়া সকল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে সম-অধিকারের পরিবর্তে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয় নির্মম নিষ্ঠুর নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা, মজুরি দাসত্ব। সেই সাথে মজুরি দাসত্বের জগদ্দল পাথরের নিচে চাপা পড়ে শ্রমজীবী মানুষের সকল অধিকার। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ভিতর দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন বুর্জোয়া শ্রেণি সামন্ততন্ত্রের পরিপূর্ণ উচ্ছেদ করে এবং সামন্ত মতাদর্শের মূল ভিত্তি ধর্মকে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে নির্বাসনে পাঠায়। রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করা হয়। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের বিষয়ে পরিণত হয়। রাষ্ট্র হয় প্রকৃত পক্ষেই সেক্যুলার। ধর্ম নিরপেক্ষতা বলতে আমাদের দেশের শাসক শোষক গোষ্ঠীর মতো ধর্মনিরপেক্ষ নয়। আমাদের দেশের শাসক শোষক গোষ্ঠী ধর্মের প্রতি তার অবিচল আস্থার মনোভাবের প্রকাশ ঘটাতে প্রচার করে থাকে, ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।

বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল ধারার রাজনীতি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ উগ্র জাতীয়তাবাদী যারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে থাকে। তাদের এই ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে সাম্প্রদায়িকতা। এ বাদে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক ধারায় আর এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যারা সরাসরি ধর্ম রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে থাকে। বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলো মূলত এই দুই ধারার বিভক্ত হয়ে রাজনীতি করে চলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ধর্মীয় মতাদর্শকে লালন পালন করা হচ্ছে কার্যত সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে। বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো কখনও উগ্র জাতীয়তাবাদ আবার কখনও সাম্প্রদায়িকতার তথা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি স্লোগান দিয়ে সামনে আসে। এই পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিয়েই তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করে রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করে থাকে। আধা সামন্তবাদী, নয়া ঔপনিবেশিক দেশ হওয়ায় এদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের প্রকৃত ক্ষমতা থাকে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর হাতে। তাই ক্ষমতা দখল করতে করতে হলে প্রভু সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে তুষ্ট করতে হয়। সাম্রাজ্যবাদী প্রভু যে রাজনৈতিক দল লগ্নি পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় সব থেকে বেশি উপযোগী বলে বিবেচিত হয় তাকেই ক্ষমতায় বসায়। জনগণকে নির্বাচন দেখিয়ে বা অন্য কোনভাবে ক্ষমতায় আনে সাম্রাজ্যবাদ। যখন এই প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে বা জনগণ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে তখনই সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর ইঙ্গিতে রাষ্ট্র দখল করে সেনাবাহিনী। সামরিক সরকার জনগণে সামনে নতুন করে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে। যে প্রতিশ্রুতি দিক না কেন তার ভিত্তি হলো ধর্মকে রক্ষা করা তথা সাম্প্রদায়িকতা অথবা উগ্র জাতীয়তাবাদ।

বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল সকল রাজনৈতিক শক্তিই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে চলেছে। তবে প্রতিক্রিয়াশীলদের এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। সকল প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অসম্প্রদায়িক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার এবং প্রতিপক্ষকে সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসাবে পরিচিত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে থাকে। রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার হাতিয়ার ব্যবহারের দৃষ্টান্ত আজ থেকে শুরু হয়নি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতেই ব্রিটিশ রাজশক্তির সহযোগিতায় এ দেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার শুরু হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির নীতি ছিল ‘বিভক্ত কর এবং শোষণ কর’। এই নীতির ভিত্তিতে ভারতের প্রধান দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়কে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করানো হয়। ভারতে মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেণির উদ্ভবের সাথে সাথে গড়ে ওঠে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে রাজনৈতিক দল। এই সময়ে মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণির নেতৃত্বে গড়ে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির প্রত্যক্ষ পৃষ্টপোষকতায় গড়ে উঠে এই দুই রাজনৈতিক দল। তারা সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে নির্বাচনের আয়োজন করে সমাজের সর্বস্তরে অতি সহজেই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ছড়িয়ে দেয়। পরবর্তিকালে ভারতবর্ষকে বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র সৃষ্টি তার শাসনভার তুলে দেয় তাদেরই সৃষ্ট সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণির দুই রাজনৈতিক শক্তি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের হাতে। সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশ বিভক্ত হয়। শত শত বছর ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসকারী দুই সম্প্রদায়ের কোটি কোটি মানুষ আশ্রয় ও নিরাপত্তার সন্ধানে উদ্বাস্তু হয়ে ছুটতে থাকে।

সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ বিভক্তি যে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি হয়, যে রক্তক্ষরণ তার দাগ এখনও মুছে যায়নি। এখনও সেই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে উদগিরণ ঘটে তার বিষবাস্প, ছাই দিয়ে এখনও সমাজকে আচ্ছন্ন করে চলেছে। ১৯৭১ সালে উগ্র জাতীয়তাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র বিভক্ত হয়ে নয়া ঔপনিবেশিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হলেও সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা সমাধান এখও হয়নি। তাই এখনও শাসক শোষক গোষ্ঠীর একাংশ এখনও অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্লোগান দিয়ে নতুন রূপে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রদায়িকতার মূল ভিত্তি অবক্ষয়ি সামন্ত মতাদর্শ। সামন্ত সমাজের মতাদর্শগত ভিত্তি ধর্ম। সমাজের উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে এখনও অবক্ষয়ি সামন্ততন্ত্রের অবশেষ টিকে রয়েছে। সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে সামন্ত অবশেষসমূহ টিকে থাকায় এর প্রভাব পড়েছে সংস্কৃতিতে। তাই ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব আমাদের সাংস্কৃতি এত প্রবল। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে গেলে সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে সামন্ততন্ত্রকে নির্মূল করতে হবে। সেই কাজ না করে বা সামন্ত অবশেষসমূহকে টিকিয়ে রেখে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্লোগানের রাজনীতিতে রয়েছে সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার। বরং এটা গাছের গোড়ায় সার, পানি দিয়ে গাছের আগা ছেঁটে দেওয়ার রাজনীতি। এ রাজনীতি দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বাড় বৃদ্ধি ঘটবে ছাড়া সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল হবে না। সামন্ত সমাজে রাজার ছেলে রাজা হয়। সামন্ত সমাজের উত্তরাধিকার এই নিয়ম আমাদের বড় দুই প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের মধ্যেই প্রচলিত রয়েছে এবং তার চর্চা চলছে। তাই সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া বিএনপি নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী। অনুরূপভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারী তারেক জিয়া আগামী দিনে বিএনপির পরবর্তি নেতা। একইভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেত্রী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। পরবর্তিতে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অনেকে দলের নেতা হিসাবে ভাবছেন।

বাংলাদেশে সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটেনি। তারই প্রভাব পড়ছে দেশের রাজনীতিতে। দেশে স্বৈরতন্ত্রের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবও বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে হেফাজতে ইসলাম নেতৃবৃন্দের বৈঠক, কওমি মাদ্রাসার ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রির সমমান ঘোষণা ও হাইকোর্টের ভাস্কর্য অপসারণে হেফাজতে ইসলাম নেতৃবৃন্দের সাথে সহমত পোষণ করা, বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণির পক্ষে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে এড়িয়ে, কিংবা সম্প্রদায়িকতা মুক্ত হয়ে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণি তার প্রয়োজনে কখনও সাম্প্রদায়িকতা গোপনে ব্যবহার করে; আবার কখনও বা প্রকাশ্যে ব্যবহার করে। তাই শাসক শোষক গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ্য ব্যবহার মধ্যে দিয়ে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসলেও বিষ্মমের কিছু থাকবে না।

সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৭।।সংখ্যা-০২, রোববার।। ২৫ জুন ২০১৭


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: ‘ভারতবর্ষের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব’

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

ভারতবর্ষের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব

 

পঞ্চাশ কোটির এই দেশে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হওয়ার অর্থ সমগ্র বিশ্বের সমস্ত সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদ তার নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়াবে।

এ দেশের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে হবে বিশ্বের সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরোধীতা করে বিশেষ করে মোকাবিলা করতে হবে সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের নেতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের, যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যুদ্ধ-পূর্ব যুগের জার্মানী, জাপান ও ইটালীর সমস্ত আক্রমণমুখী রূপকে শুধু গ্রহণ করেনি তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেক দূল। সারা বিশ্বে আজ তার আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ ছড়িয়ে আছে এবং ভারতবর্ষকে সে কুক্ষিগত করছে নয়া ঔপনিবেশিক জালে। ভিয়েতনামের মানুষ এই আক্রমণমুখী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের নেতৃত্ব করছেন। এই সংগ্রাম চলেছে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। ভারতবর্ষের সফল বিপ্লব এই সাম্রাজ্যবাদ দানবকে একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করবে।

এই দেশে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে হবে মহান অক্টোবর বিপ্লবের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সক্রিয় বিরোধীতা করে। কারণ সোভিয়েত রাষ্ট্রের, পার্টির ও সৈন্যবাহিনীর বর্তমান নেতারা সংশোধনবাদী নীতি গ্রহণ করে বুর্জোয়া একনায়কত্ব কায়েম করেছে এবং এশিয়া, আফ্রিকা, লাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে মার্কিন সহযোগিতায় শোষক ও শাসকের ভূমিকা নিয়েছে। ওরা এই ভারতবর্ষে মহান লেনিনের নামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রধান ফেরিওয়ালা। ওদের তৈরী দালালদের সাহায্যে [ডাঙ্গে চক্র ও নয়াসংশোধনবাদী চক্রের সাহায্যে] ভারতবর্ষকে নিরঙ্কুশ শোষণের ক্ষেত্র বানাচ্ছে এবং সংগ্রামী জনতাকে ধোঁকা দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের বিশ্বাসী কুকুরদের কাজ করছে। ভারতবর্ষের সফল বিপ্লব শুধু ভারতবর্ষের মাটিতেই সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও তাদের দেশী দালালদের মৃত্যুর দিন ঘনিয়ে আনবে না, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের মৃত্যু ঘটবে নিশ্চিত।

আমাদের দেশে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে হবে মহান চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার উপর নির্ভর করে। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে কে কতখানি উপলব্ধি করল ও প্রয়োগ করল তারই উপর তিনি বিপ্লবী কিনা তার বিচার হবে। তাছাড়া চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা যতখানি কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার ও প্রসার করা হোল তারই উপর বিপ্লবী জোয়ার সৃষ্টি হবে। কারণ চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা আজকের যুগের মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, তাইই নয় চেয়ারম্যান মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে অনেক উচ্চ পর্যায়ে তুলছেন। তাই বর্তমান যুগ চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার যুগে রূপান্তরিত হয়েছে।

আমাদের ভারতবর্ষে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে হবে দেশের ভেতরে আমলাতান্ত্রিক ও মুৎসুদ্দি পুঁজির বিরুদ্ধে এবং ব্যাপক গ্রামাঞ্চলে সামস্ত শোষণের বিরুদ্ধে। পঞ্চাশ কোটি মানুষের এই দেশে যেহেতু গ্রামে বাস করেন ৪০ কোটি লোক এবং যেহেতু তাদের উপর সামন্ত শোষণই প্রধান, তাই আমাদের দেশের আজও প্রধান বিরোধ গ্রামের কৃষক শ্রেণীর ও জমিদার শ্রেণীর মধ্যে। এই বিরোধের মীমাংসা হতে পারে একমাত্র গ্রামাঞ্চলে, শ্রমিক নেতৃত্বে কৃষকের সশস্ত্র বাহিনীর সাহায্যে মুক্ত অঞ্চল গড়ার মধ্য দিয়ে। আমাদের যুগে এ কাজ সর্ব বৃহৎ ও সর্ব প্রধান কাজ হিসাবে দেখা দিয়েছে কারণ ভারতবর্ষে আজ বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার এসেছে এবং চেয়ারম্যানের নির্দেশিত এই পথ কৃষক ও বিপ্লবী জনতার মধ্যে ক্রমেই বেশী বেশী করে প্রবেশ করছে।

আমাদের দেশে বিপ্লব করতে হবে আমলাতান্ত্রিক ও মুৎসুদ্দি পুঁজির প্রতিভূ কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধোত্তর যুগের গণ-অভুত্থান দেখে ভয় পায় এবং সমস্ত শ্রেণীর সহযোগিতায় সা¤্রাজ্যবাদীদের সাথে রফা করে। ভারতবর্ষের তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা সক্রিয় সহযোগিতা করল এই সব প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সাথে, কখনও আপসের নামে, কখনও সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা মারফৎ। তারা কলঙ্কিত করেছে কায়র বীরদের পুনাপ্রাভায়ালার সংগ্রামীদের, তেলেঙ্গানার অসম সাহসীক বীর এবং বাংলা ও অন্যান্য দেশের শত শত শহীদদের রক্তে রঞ্জিত লাল পতাকা। আজ ভারতবর্ষের প্রতিটি রাজনৈতিক পার্টি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সংশোধনবাদ ও দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের সক্রিয় সহযোগী ও বিপ্লবের শত্রু। তাই ভারতবর্ষের নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হতে পারে একমাত্র শ্রমিক নেতৃত্বে এবং চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার সাহায্যে।

এই নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত ও সফল করতে হলে চাই শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি ও তার রাজনৈতিক মতাদর্শ হবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও তার সর্বোচ্চ রূপ মাও সেতুঙ এর চিন্তাধারা। কিন্তু এই পার্টি কিভাবে গড়ে উঠবে? বিভিন্ন তথাকথিত মার্ক্সিষ্ট সদস্যরা চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারা মানেন বলে তাদের পার্টির নেতৃত্বেও বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আসলেই কি আমরা তাদের একত্রিত করে ঘোষণা করবে। যে একটি মাওবাদী পার্টি গঠিত হল? নিশ্চয়ই না। কারণ শুধু বিদ্রোহের পতাকা ওড়ালেই মাওবাদী পার্টি গড়ে ওঠে না। সেই বিদ্রোহী কমরেডদের চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে এবং সেই প্রয়োগের মারফৎ শ্রমিক ও কৃষক ক্যাডার তৈরী করতে হবে। তবেই আমরা বলবো একটি সঠিক মাওবাদী পার্টি গড়ার পথে এগোচ্ছি। পুরাতন রাজনৈতিক কর্মীরা অবশ্যই এই পার্টিতে থাকবেন কিন্তু মূলত এই পার্টি গড়ে উঠবে শ্রমিক কৃষক ও মেহনতী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যুবকদের দ্বারা, যাঁরা শুধু মুখে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে মানবেন না, জীবনে তার প্রয়োগ করবেন, ব্যাপক জনতার মধ্যে প্রচার ও প্রসার করবেন এবং গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের ঘাঁটি বানাবেন। সেই নতুন পার্টি শুধু বিপ্লবী পার্টিই হবে না; তারা হবে জনতার সশস্ত্র বাহিনী এবং জনতার রাষ্ট্রশক্তি। এই পার্টির প্রত্যেকটি সভ্যকে সংগ্রাম করতে হবে সামরিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। এই রকম একটি পার্টি গড়ার কাজে আমাদের এখনই হাত দিতে হবে। সারা ভারতবর্ষব্যাপী এরকম পার্টি গড়া আজকেই হয়ত সম্ভব নয় কিন্তু তাতে হতাশ হলে চলবে না। যতটুকু এলাকায় এরকম পার্টি গড়া যায় সেইটুকু এলাকা নিয়েই কাজ শুরু করতে হবে সংখ্যালঘু হওযার ভয় আমাদের ত্যাগ করতে হবে এবং চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার উপর দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। আমাদের কাজ সহজ নয়, অত্যন্ত কঠিন। আমাদের সংগ্রাম বিশ্বের সমস্ত সংগ্রামী মানুষের মনে নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করবে। এইভাবে আমরা সফলভাবে ভিয়েতনামের বীর যোদ্ধাদের সাহায্য করতে পারবো। এই রকম একটি বিপ্লবী পার্টি পারে সফলভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করতে এবং পারে ব্যাপকতম যুক্তফ্রণ্ট গড়ে তুলতে – যে দুটোর সাহায্যে বিপ্লব সাফল্যমণ্ডিত হবে।

যাঁরা ভাবছেন যে তথাকথিত মার্কসবাদী পার্টিগুলো থেকে ব্যাপকতম অংশকে আমাদের পক্ষে টেনে আনাই প্রধান কাজ এবং এ কাজ করতে পারলেই বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে তারা আসলে আর একটা নির্বাচনের পার্টি গড়ার কথাই ভাবছেন সচেতনভাবে বা অচেতনভাবে। কারণ তারা ভুলে যাচ্ছেন যে এইসব তথাকথিত মার্কসবাদী পার্টিগুলোর সভ্যদের হয়তো বিপ্লবী হওয়ার মতো গুণ আছে এখনও, কিন্তু যে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে তারা গেছেন তা হল খাঁটি সংশোধনবাদ এবং সেই প্রয়োগের ফলে তারা তাদের বিপ্লবী গুণগুলি অনেকাংশেই হারিয়েছেন এবং তাদের নতুন প্রয়োগ শিক্ষার ভিতর দিয়ে নতুন করে বিপ্লবী হতে হবে। তাই পুরাতন পার্টি সভ্যদের উপর ভরসা করে বিপ্লবী পার্টি গড়া যায় না। নতুন পার্টি তৈরী হবে সম্পূর্ণ নতুন বিপ্লবী শ্রমিক-কৃষক ও মধ্যবিত্ত যুবকদের চেয়ারম্যানের চিন্তাধারায় শিক্ষিত করে বিপ্লবী প্রয়োগ মারফৎ।

বিপ্লবী পার্টি গড়ার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলা। এ কাজে হাত না দেওয়া পর্যন্ত বিপ্লব শুধু মুখে স্বীকার করা হোল। সুতরাং চেয়ারম্যানের ভাষায় তাঁরা হলেন কথায় বিপ্লবী (revolutionary in words)। আমাদের বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে কাজে বিপ্লবীদের (revolutionary in deeds) দ্বারা। এভাবে না দেখলে পার্টি হবে একটি কচকচির আড্ডাখানা (debating society)। যেমন বর্ধমান প্লেনাম হলো একটি কচকচির আড্ডাখানা।

বর্ধমানে কি হয়েছে? যে সোভিয়েত শাসকচক্র আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণমুক্তি সংগ্রামের এক নম্বর শত্রু হয়ে গেছে এবং প্রকাশ্যভাবে জাতীয় বিপ্লবগুলি ধ্বংস সাধনের চেষ্টা করছে সেই সোভিয়েত রাষ্ট্রে ধনতন্ত্রের কতখানি বিকাশ হয়েছে তাই নিয়ে জোর বিতর্ক চালান হোল। শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব ধ্বংস করে যেখানে বুর্জোয়া একনায়কত্ব কায়েম হয়ে গেছে সেখানে ধনতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে জোরতর্ক করা হচ্ছে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করা এবং প্রধান শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ভোঁতা করে দেওয়া। তাই বর্ধমানে যা ঘটেছে তাতে, দুনিয়াব্যাপী সংশোধনবাদীরা খুশী হয়েছে এবং তাদের চক্রান্ত সফল হয়েছে। বর্ধমানে একজনও এই সংশোধনবাদী বিশ্বাসঘাতকদের সম্পর্ক ত্যাগ করেনি।

তাই পার্টির ভেতরে যে বিপ্লবী শক্তি আছে তার উপর ভরসা করলে আমরা বিপ্লবী পার্টির বাইরে লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী নওজোয়ানদের প্রতি। তবেই সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের বিপ্লবের ঘাঁটি আমরা তৈরী করতে পারবো।

কমরেডস, আমাদের দায়িত্ব অনেক। বিশ্বের সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আমাদের দেশকে ঘাঁটি করেছে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুক্তি সংগ্রামকে ধ্বংস করার কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করছে। ভারতবর্ষকে তারা কামানের খোরাক সংগ্রহের প্রধান কেন্দ্র করতে চাচ্ছে মহান চীনের বিরুদ্ধে আক্রমণের। সেই ষড়যন্ত্রই করে গেলো দলত্যাগী কোসিগিন-ট্রিটো আর চেষ্টার বোলজ নয়া-দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বসে। তাই তো আমাদের দেশে বিপ্লব করা একটা বিরাট আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। তাই নকশালবাড়ীর ছোট্ট স্ফূলিঙ্গ সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ণ এশিয়ার সংগ্রামী জনগণকে উৎসাহিত করে, উৎসাহিত করে বিশ্ব বিপ্লবের নেতা মহান চীন পার্টির নেতাদের, উৎসাহিত করে পৃথিবীর সমস্ত দেশের বিপ্লবী জনতাকে। এক পবিত্রতম আন্তর্জাতিক দায়ীত্ব আমাদের মাথায় এবং আমরা এই দায়ীত্ব পালন করবোই। মূল্য দিতে হবে অনেক, কিন্তু মূল্য দিতে ভয় পায় না বিপ্লবীরা চেয়ারম্যানের শিক্ষা: আমাদের লড়বার হিম্মত রাখতে হবে-জেতবার হিম্মত রাখতে হবে (We must dare to fight and dare to win)। চেয়ারম্যান এখনও বেঁচে আছেন। জয় আমাদের হবেই।

চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-জিন্দাবাদ।

দীর্ঘ-দীর্ঘদিন ধরে তিনি বেঁচে থাকুন!

ভারতবর্ষের নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব-জিন্দাবাদ!

দেশব্রতী”, ১৬ই মে, ১৯৬৮

 


ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তিঃ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর চরম হুমকি

india-bangladesh4

গত ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী বিশাল বহর নিয়ে ৪ দিনের ভারত সফর করে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বয়ং বিমান বন্দরে এসে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানানো ও রাষ্ট্রপতি ভবনে আতিথেয়তা, সরকারের ভাষায় তা ভারত-বাংলাদেশ বিশেষ বন্ধুত্বের মর্যাদার  নজির। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৬টি চুক্তি, ১৬টি সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে ৩৪টি দলিলে সইয়ের কথাও বলা হয়েছে। এ সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা পানি বন্টন চুক্তি, ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য বৈষম্য হ্রাস, গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প, সীমান্তে বি.এস.এফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যার মত বিষয়গুলোর সুরাহা হয়নি। যদিও ভারতের দিক থেকে  শেখ হাসিনার এ সফরে বিশেষ গুরুত্ব পায় ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তির মত স্পর্শকাতর বিষয়টি। সফরের পূর্বে ও পরে চুক্তির বিষয়ে জনগণকে মূলত অন্ধকারে রাখা হয়েছে। সরকারের এই গোপনীয়তা রক্ষা ও পরবর্তীতে চুক্তির বিষয়ে যতটুকু জানা যায় তা বাংলাদেশের জন্য চরম অবমাননাকর। এ সরকারের ঔদ্ধত্য এতখানি যে ব্যাপক জনগণের তীব্র বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ভারতের কাছে বিকিয়ে দিয়েছে। এমন একটি চুক্তি করতে তারা কোন গণভোট বা জাতীয় ঐক্যেরও প্রয়োজন বোধ করেনি। এমনকি তাদের ভুয়া সংসদে পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন পূর্ব-আলোচনা বা অনুমতি তারা নেয়নি। গুম-খুন-ক্রসফায়ার-মামলা-গ্রেফতার সর্বত্র রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাস সৃষ্টি করে জনগণের কণ্ঠরোধ করে তারা এ চুক্তি করে এসেছে। শাসকগোষ্ঠীর অপর দল বিএনপি-জামাতও এই প্রশ্নে কোন আন্দোলন গড়ে তুলেনি। আগামী নির্বাচনে গদি রক্ষার জন্যই দেশবিরোধী এই “চুক্তি” করেছে লুটেরা গণবিরোধী এ সরকার। দাসখতের এই চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী অতীতের মত ভারতের সমর্থন আদায়ের মধ্য দিয়ে তার শাসনামলকে দীর্ঘায়িত করার নকশা আঁকছে।

’৭১-এ মুজিবনগর অস্থায়ী সরকারের সাথে তৎকালীন ভারত সরকারের যে চুক্তি হয়েছিল তা পরিণতি পেয়েছিল ১৯৭২ সালের “মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি”র মধ্য দিয়ে। এই চুক্তির মাধ্যমে এদেশের উপর ভারতের যে সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা শুরু হয়েছিল “ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি” তারই বিকশিত রূপ। মার্কিন সাহায্য ও পরামর্শ ছাড়া ভারতের এই অঞ্চলে এই ধরনের চুক্তি করার সামর্থ্য নেই। মোদি সরকারের সাথে হাসিনা সরকারের এই চুক্তি বাংলাদেশে চীনের আধিপত্য ঠেকানো ও দক্ষিণ-চীন সাগর ও বঙ্গপোসাগর কেন্দ্রিক ‘ভারত-মার্কিন’ যৌথ পরিকল্পনার অংশ বৈ আর কিছু নয়।

এই চুক্তি হঠাৎ করেই হয়নি। ২০১৫ সালে মোদির বাংলাদেশে আগমনের সময়ই এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। জনগণ দেখেছে এদেশে আসার ঠিক আগে মোদি সরকার তাদের দৃষ্টিতে এদেশের “বোকা জনগণ”কে সান্তনা দেওয়া ও ভারত বিরোধিতা ঠেকানোর জন্য সংসদে “সীমান্ত চুক্তি” বিল এনেছিল। এই সীমান্ত চুক্তির পরও ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা বন্ধ তো হয়ইনি, বরং বেড়েছে।

এই চুক্তির মাধ্যমে সরকার যেমন সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করেছে, তেমনি ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীও অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙ্গে সম্প্রসারণবাদী নীতির ষোলকলা পূর্ণ করেছে। একটি বৃহৎ পুঁজির কাছে ক্ষুদ্র পুঁজি যেভাবে ধ্বংস হয়, বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর সাথে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়বে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই চুক্তির খসড়া সরকার জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মালিকানাধীন পত্রিকা “দ্য ইন্ডিপেন্ডেট” আংশিক প্রকাশ করেছে।

সেখানে দেখা যায় এ চুক্তিতে মোট ১০টি অনুচ্ছেদ রয়েছে।

** অনুচ্ছেদ-১ এ বলা হয়েছে “উভয় দেশ সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। এক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে এবং জাতীয় আইন, নিয়মনীতি ও প্রথার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।” এই ধরনের কথা বলা যে ফাঁকা বুলি, আর জনগণকে ধোকা দেওয়া ছাড়া কিছুই না তার অনেক উদাহরণ আছে। জনগণ দেখেছে গত ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে সংবিধানের দোহাই দিয়ে ভারত কিভাবে এদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে জাতীয় আইন, নিয়মনীতি ও প্রথার প্রতি কিরূপ “শ্রদ্ধা” দেখিয়েছে!

** অনুচ্ছেদ-২ এ বলা হয়েছে “উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধি পাঠাবে। সামরিক প্রশিক্ষণ, সামরিক বিশেষজ্ঞ বিনিময়, পর্যবেক্ষণ, তথ্যবিনিময়, সামরিক সরঞ্জাম দেখভালের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ত্রাণ সহায়তা, বার্ষিক আলোচনার ব্যবস্থা, জাহাজ ও বিমান কার্যক্রম পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় যৌথ মহড়া দিতে পারে”। এটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, পারস্পরিক সহযোগিতার নামে এক ভয়ানক নতজানু অবস্থান নিয়েছে এই সরকার। এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে ভারতীয় সেনাদের যথেচ্ছগমন নিশ্চিত হবে। এর ফলস্বরূপ ইতিমধ্যেই ভারতীয় সেনাপ্রধান দু’বার বাংলাদেশ সফর করেছে। কখন, কোথায়, কি নিয়ে আলোচনা হবে জনগণ এর কিছুই জানবে না। অবশ্য এই চুক্তির আগেও যে জনগণ জানত তা বলা যাবে না। কিন্তু এর মাধ্যমে জনগণকে আরো অন্ধকারে রেখে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে তা বলা যায়। ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে শাসকগোষ্ঠিও এসব গোপন করে যাবে। চলবে মিডিয়ার উপর নজরদারী।

‘সামরিক সরঞ্জাম দেখভাল’র মাধ্যমে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কাছে এদেশের সামরিক বাহিনীর প্রকৃত অবস্থা আর গোপন থাকবে না। এদেশের সেনাবাহিনীর কাছে কি কি অস্ত্র আছে তা খুব সহজেই জেনে যাবে তারা। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে তারা যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আশীর্বাদপুষ্ট একটা শ্রেণি তৈরি করবে তা বলাই বাহুল্য।

‘যৌথ মহড়া’র মাধ্যমে তারা এদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে ভারত-চীন ¯œায়ুযুদ্ধের রণকৌশলের সাথে যুক্ত করবে। ফলে স্পষ্টত এক ভয়াবহ মেরুকরণ হবে দক্ষিণ-এশিয়ার ভূরাজনীতিতে। যার ফলে এদেশ হতে পারে ভারত-মার্কিন যৌথ সামরিক ঘাঁটি ও রণক্ষেত্র। যেমনটি এখন চলছে উত্তর কোরিয়াকে ঠেকানোর লক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি। চীনকে ঠেকাতে এদেশও এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্ত হল।

** অনুচ্ছেদ-৩ এ বলা হয়েছে, “উভয় দেশ সামরিক শিল্প স্থাপন ও সহযোগিতা বিনিময় করতে পারবে। মহাকাশ প্রযুক্তিতে সহায়তা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সমুদ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারবে।” এখানে উভয় দেশ বলা যে কত হাস্যকর তা বলাই বাহুল্য। কারণ ভারতে যদি এদেশের সামরিক বাহিনী কিছু করতে চায় তা তারা রাজনৈতিক অনুমতি ছাড়া করতে পারবে না। আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে ভারতের উপর নির্ভরশীল তা আগেই বলা হয়েছে। এদেশের সামরিক বাহিনী যে ভারত থেকে শক্তিশালী নয় তা জনগণ জানে। তাই পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময় যে একতরফা হবে তা বলা যায়। বরং এই চুক্তির মাধ্যমে এমন ক্ষেত্র তৈরি করা হবে যাতে ভবিষ্যতে এদেশের সেনাবাহিনী ভারতের অনুগত হয়ে কাজ করবে। এর আরো মূর্ত রূপ দেখা যায় এই অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে “সামরিক শিল্প স্থাপন”র কথা। অর্থাৎ ভারত চাইলেই এদেশে সামরিক শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। ভবিষ্যৎ যুদ্ধের পরিকল্পনায় যেকোন সময় জাহাজ বা অস্ত্র কারখানা তারা এদেশের মাটিতেই করতে পারবে। যার ফলে এদেশের সামরিক বাহিনী কার্যত হবে ভারতের পদানত। এদেশকে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের শুরু হবে নতুন নতুন খেলা। দেশের ভূখন্ড ও জনগণ হয়ে পড়বে চরমভাবে অরক্ষিত। এদেশের সামরিক বাহিনীতে সৃষ্টি হবে ভারতের মদদপুষ্ট আমলা-দালাল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। চিকিৎসা সেবার নামে এসব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পাবে নানা সুযোগ সুবিধা ও নিরাপত্তা। এর মাধ্যমে দেশের উপর ভারতের সামরিক আধিপত্য আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

“মহাকাশ প্রযুক্তি সহায়তা”র নামে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এদেশের উপর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করবে গোয়েন্দা নজরদারী। সীমান্ত কার্যত হয়ে পড়বে অরক্ষিত।

“সমুদ্র অবকাঠামো” নির্মাণের নামে এদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস উত্তোলন, গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর তৎপরতা। পায়রা বন্দরসহ দেশের সবকটি সমুদ্র ও নদী বন্দরে দেখা যেতে পারে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি।

** অনুচ্ছেদ-৭ এ বলা হয়েছে “উভয় দেশ তথ্য আদান-প্রদানে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না তা নিশ্চিত হবে এবং এক্ষেত্রে উভয় দেশ কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করবে”। এর মাধ্যমে ভারতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোন তথ্য বাংলাদেশ অন্য দেশকে দিতে পারবে না বা পরামর্শ করতেও পারবে না। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী তথা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভারতের নতজানু হয়ে চলতে হবে। বুর্জোয়া সামরিক বিশেষজ্ঞরা যতই বলুক পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করলে এই চুক্তিতে কোন সমস্যা নেই, বাস্তবে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে। গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র ভারতীয় স্বার্থই রক্ষা হবে, কারণ নিকট ভবিষ্যতে এদেশে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হবে। বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর বা গণবিরোধী হলেও এদেশের সামরিক বাহিনী কার্যত কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না অথবা রাখলেও দুই বাহিনীর মধ্যে প্রতিযোগিতায় ভারতীয় বাহিনীর স্বার্থই রক্ষিত হবে। এছাড়াও চুক্তিতে শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণে ভারত ও বাংলাদেশ থেকে কোন কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে তারও একটা খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে টাটা মেডিকেল সেন্টার, ভারতীয় ডিফেন্স কলেজগুলো……… পরস্পর সহযোগিতার আওতায় আসবে ।

এই চুক্তির আরো অংশ যে গোপন রয়েছে তা ধারণা করা যায়। যদি এ চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশিত হত তাহলে আরো ভালভাবে এই চুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব ব্যাখ্যা করা যেত। জনগণের কোন ধরনের অনুমতি ছাড়াই যেভাবে এই চুক্তি করা হয়েছে তার দায় কেবলমাত্র আওয়ামী সরকারের। এ দায় বর্তায় শুধু মাত্র আমলা-মুৎসুদ্দি শাসকশ্রেণির উপর। অবর্ণনীয় লুটপাট, বিদেশে টাকা পাচার, গুম-খুন-ক্রসফায়ারের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এই ফ্যাসিবাদী সরকার। ফলে জনগণের কন্ঠরোধ করতে সকল আয়োজনই ক্রমান্বয়ে সম্পন্ন করছে। “ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি” তার শেষ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে এদেশের উপর ভারতীয় শাসকগোষ্ঠির আধিপত্য আরো বৃদ্ধি পাবে, দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে এদেশকে ভারতের দক্ষিণ-এশীয় যুদ্ধকৌশলের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, তা এদেশের সচেতন জনগণ কখনো মেনে নেবে না। এ অবস্থায় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ত্ব-গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দেশের প্রতিটি জনগণ ভারতের এই আধিপত্য ও সরকারের নতজানু নীতির বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলবেন। সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে বেগবান করবেন।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা

 


নকশালবাড়ি পরবর্তী ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন

82927270-575b-46db-8d0e-50fcd6145a93

১৯৬৭ সালের মে মাসে নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন মূলত: মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাস। নকশালবাড়ি কৃষক সংগামের ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ বিশ্বাসঘাতক সংশোধনবাদী লাইনের মুখোশ টেনে-ছিঁড়ে খোলাসা করে দেয়। সিপিআই-সিপিএম অনুসৃত শ্রেণি সমন্বয়বাদী-শান্তিপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচনপন্থী-সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের (তখন মাও চিন্তাধারা বলা হতো) ভিত্তিতে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের পথে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনীতিতে এগিয়ে নেয়। নকশালবাড়ি তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহের উত্তরাধিকার লাভ করে। ভারতে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির মতবাদ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশ হিসেবে তৃতীয় স্তর মাওবাদ তথা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (মালেমা) প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

নকশালবাড়ির পর আর কোন কিছই আগের মতো রইলো না। পুরনো সব ধ্যান-ধারণা-চিন্তাধারা-দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা হয় নকশালবাড়ির কষ্টিপাথরে। যা ছিল চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধারাবাহিকতা।

কৃষক অভ্যুত্থানের পরপরই ১৪ জুন ১৯৬৭, কলকাতায় “নকশালবাড়ি ও কৃষক সংগ্রাম সহায়ক কমিটি” গঠিত হয়। নকশালবাড়ির স্ফুলিঙ্গ থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ-বিহার-উড়িশ্যা-উত্তর প্রদেশ-পাঞ্জাব-কেরালা-তামিলনাড়–-ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তৃত এলাকায় সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। ’৬৭ সালেই গঠিত হয় “কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি”। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল মহামতি লেনিনের জন্মবার্ষিকীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে)-[সিপিআই(এমএল)] গঠিত হয়। পার্টির তাত্ত্বিক ভিত্তি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা। নবগঠিত এই পার্টির দশ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন মহান মাওবাদী নেতা কমরেড চারু মজুমদার। ঐ বছরেই মে দিবসে কলকাতায় শহীদ মিনারে এক জনসভায় কানু সান্যাল পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন।

১৯৭১-৭২ সালে খুনি ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার পশ্চিমবঙ্গসহ সমগ্র ভারতে এই সশস্ত্র ও গণসংগ্রাম তথা গণযুদ্ধকে ধ্বংস করার জন্য ব্যাপক দমন-নির্যাতন চালায়। তারা ক. চারু মজুমদার-সরোজ দত্তসহ হাজার হাজার মাওবাদী বিপ্লবীকে গ্রেফতার-হত্যা করে। বিখ্যাত লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর লেখা “হাজার চুরাশির মা” উপন্যাসে তার কিঞ্চিত স্বাক্ষর রয়েছে। পার্টির কিছু লাইনগত ভুল-ত্রুটি এবং রাষ্ট্রীয় শ্বেত সন্ত্রাসে নকশালপন্থী সংগ্রাম বিপর্যস্ত হয়। পার্টি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়।

‘৭২ থেকে ‘৭৭ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দমন-নির্যাতন-বিপর্যয়-দল-উপদল-ভাঙ্গন-অধ:পতন চলতে থাকে। ‘৭৭ সালে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার হলে নকশালবাড়ি অনুসারীরা পার্টি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেন। সারা ভারতে নকশালবাড়ি দাবিদার বহু দল-উপদলের সৃষ্টি হয়। এইসব ধারা-উপধারায় মোটা দাগে তিন ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা প্রকাশিত হয়।

(১)     সিপিআই(এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন পুরোপুরি ভুল। এই ধারা অনুসারীরা পুরনো বস্তাপচা সংসদীয় নির্বাচনী পথ নেয়।

(২)     সিপিআই (এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন পুরোপুরি সঠিক। এরা পুরনো কায়দায় যান্ত্রিকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম করার চেষ্টা করে।

(৩)     সিপিআই (এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন মৌলিকভাবে সঠিক। কিন্তু গুরুতর কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল।

এই ধারার অনুসারীদের অন্যতম কমরেড কোন্ডাপল্লী সিতারামাইয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য কমিটি ’৭৪ সালে  ৬৭-৭২-এর সংগ্রামের একটি সারসংকলন করে। এই সংগঠন আত্মসমালোচনামূলক লাইনগত পর্যালোচনায় ৪টি গুরুতর ভুলকে চিহ্নিত করে।

      ক) দেশীয়-বিশ্ব বিপ্লব সংঘটনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিজয় আকাংখা;

       খ) খতমকে এ্যাকশনের একমাত্র রূপ হিসেবে নির্ধারণ;

       গ) গণসংগঠন-গণসংগ্রামের লাইন বর্জন; এবং

       ঘ) পার্টি গঠনের কাজকে অবহেলা করা।

এই সারসংকলনের ভিত্তিতে ’৮০ সালের ২২ এপ্রিল সিপিআই(এম-এল) [পিপলস ওয়ার-জনযুদ্ধ] গঠন করে। এই গ্রুপ প্রথমে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পরে দন্ডকারণ্যসহ সন্নিহিত রাজ্যগুলিতে গণযুদ্ধ বিকশিত করে।

পরবর্তীতে আরো কিছু নকশালবাড়ি লাইনের অনুসারী সংগঠন প্রায় একই ধরনের সারসংকলন করে। যার মধ্যে পড়ে সিপিআই(এম-এল) পার্টি ইউনিটি, করম সিং-এর নেতৃত্বাধীন পাঞ্জাব কেন্দ্রীক মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র (যে সংগঠন পরে এমসিসির সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়), কেরালা কেন্দ্রীক সিপিআই (এম-এল) নকশালবাড়িসহ আরো কিছু সংগঠন। অন্যদিকে সিপিআই(এম-এল)-এ সংগঠিত হয়নি এমন সংগঠন “দক্ষিণ দেশ” এমসিসি নামে সংগঠিত হয়ে বিহার-ঝাড়খন্ডে গণযুদ্ধ গড়ে তোলে।

একই সাথে এইসব সংগঠন একটা সর্বভারতীয় মাওবাদী পার্টি গড়ার প্রক্রিয়াও চালাতে থাকে। প্রথমে ১৯৯৮ সালে সিপিআই(এম-এল)-এর “পিপলস ওয়ার” গ্রুপ এবং ক. নারায়ণ সান্যাল (বিজয়দা)’র নেতৃত্বাধীন “পার্টি ইউনিটি” গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ হয়। এবং পরে ২০০৪ সালে ২১ সেপ্টেম্বর ক. গণপতির নেতৃত্বাধীন সিপিআই(এম-এল) এবং ক. কানাই চ্যাটার্জী প্রতিষ্ঠিত ক. সুশীল রায়-ক. কৃষাণের নেতৃত্বাধীন এমসিসি  ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) গঠন করেন। এই নবগঠিত পার্টির সম্পাদক হন ক. গণপতি। ঐক্য প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ২০১৪ মে দিবসে ক. গণপতি এবং নকশালবাড়ি গ্রুপের সম্পাদক ক.অজিত এক যৌথ বিবৃতিতে সিপিআই(এম-এল) নকশালবাড়ি, সিপিআই (মাওবাদী)তে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেয়। মালেমা ও নকশালবাড়ি অনুসারী গণযুদ্ধের লাইনের অন্যান্য সংগঠনের সাথেও ঐক্য প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, এইসব সংগঠনের কোন কোনটি আরআইএম-কমপোসার সদস্য ছিল।

আর সংসদীয় নির্বাচনপন্থী সংশোধনবাদী এবং গোড়ামীবাদী-যান্ত্রিক ধারাগুলো শাসক সাম্রাজ্যবাদের দালাল আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া-সামন্ত শ্রেণির সেবাদাসে পরিণত হয়েছে।

নকশালবাড়ি একটা চলমান বিপ্লব। যার লক্ষ্য নয়া গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ। পথটা আঁকাবাঁকা, কিন্তু একে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তাই একটি থানা নকশালবাড়ির উত্থান মাত্র পঞ্চাশ বছরে আজ সর্বভারতীয় মাওবাদী পার্টি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সেই পার্টির নেতৃত্বে অন্ধ্র-বিহার-দন্ডকারণ্য-ছত্তিশগড়ের পর দক্ষিণ ভারতের কেরালা-কর্ণাটক সীমান্তে পশ্চিম ঘাট এলাকায় গেরিলা অঞ্চল এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের আসাম-মনিপুর রাজ্যে গণযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় শাসক শ্রেণি এখন বলতে বাধ্য হচ্ছে মাওবাদ ভারত রাষ্ট্রের জন্য প্রধান বিপদ। সে জন্যই চলমান গণযুদ্ধকে ধ্বংস করতে ২০০৯ সালে এক বছরের পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করা “অপারেশন গ্রিনহান্ট” বর্বরোচিভাবে এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।

গণযুদ্ধ হলো জনগণের যুদ্ধ। যেখানেই অন্যায়-অত্যাচার সেখানেই জনগণ প্রতিরোধ-যুদ্ধ করবে। এর আগানো-পিছানো থাকে, কিন্তু ধ্বংস করা যায় না। নকশালবাড়ি আবারো প্রমাণ করেছে ঝরে যাওয়া রক্তে বিপ্লব তলিয়ে যায়না, বরং ছড়িয়ে পড়ে।

নকশালবাড়ি লাল সালাম!।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা


মানুষের মতো মানুষ – বরিস পলেভয়

1

 

বইটি পড়তে বা ডাউনলোড করতে নীচে ক্লিক করুন –

মানুষের মতো মানুষ – বরিস পলেভয়