‘অন দা কালচারাল ফ্রন্ট’: ঋত্বিক ঘটক

 

অন দা কালচারাল ফ্রন্ট‘ নামে থিসিসটি ‘ঋত্বিক ঘটক’ ১৯৫৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’তে জমা দিয়েছিলেন –

বইটির পিডিএফ ডাউনলোড করতে নীচে ক্লিক করুন

অন দা কালচারাল ফ্রন্ট ঋত্বিক ঘটক


হারাবার কিছুই নেই শৃঙ্খল এবং পলিটিক্যালি কারেক্টনেস ছাড়া!!- ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে নবারুণ ভট্টাচার্য

হোয়াট ড্যু ইউ মিন বাই ফিল্ম?

সত্যিই কি তুলসী চক্রবর্তী পরশ পাথরে কিছু করেছিলেন নাকি হ্যামলেটে আমরা যে স্মোকনোফস্কিকে দেখেছি সেটা কি খুব ভাল ছিল… কীরম যেন কনফিউজড হয়ে যাই! এই যে আমাদের দেশে এইভাবে একটা লুম্পেন কালচার তৈরি হয়ে গেছে, যেখানে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক টেলিভিশনে এই কথাও কবুল করেন যে উনি মেঘে ঢাকা তারার রিমেক করবেন! মানে অসভ্যতা, অভব্যতা যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে এই সময়ে…!

সত্যি, উনি যে বললেন ঋত্বিক আবিষ্কার- এই আবিষ্কার যত বেশি করে করানো যায় ততই মঙ্গল! আমার একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছে- সেই অসামান্য সিকোয়েন্সটি তোলা হচ্ছে কোমল গান্ধারে যেখানে গিয়ে সেই বাফারের ট্রেনের ধাক্কাটা… সেই যে বাংলাদেশ বর্ডার… তো ঐখানে, আমি তখন খুব ছোট আর ঐ যে ট্রলিতে করে ক্যামেরা যাচ্ছে, ঐ ট্রলিতে আমি বসে আছি; তা লালগোলার কোন ফিল্মবেত্তা এসে হঠাৎ আমাকে বললো, ‘আচ্ছা খোকা শোন তুমি দেড়শো খোকার কাণ্ডতে ছিলে না?’ ঐ ধরেশ সিনেমা কোম্পানির সঙ্গেই সে সিনেমা করে বেড়ায়… আমি খুব স্মার্টলি উত্তর দিলাম- হ্যাঁ আমি ছিলাম! কথাটা কিন্তু খুব মিথ্যে নয়, কারণ আমার বন্ধু লোকনাথ দেড়শো খোকার একটি খোকা, আমরা একসঙ্গে পড়তাম অতএব সেই বন্ধুর গর্বে আমিও গর্বিত। যাইহোক, সেইখানে সেই লোকটিই ঋত্বিককে একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলো- ‘আচ্ছা এই ফিল্মে এমন কোন ক্যারেক্টার আছে যাকে নিয়ে আপনার ক্যামেরা এগোচ্ছে?!’ তো, ঋত্বিক বললো- কি বললে? তো, আবার বললো- ফিল্মে…? ঋত্বিক বললো, হোয়াট ড্যু ইউ মিন বাই ফিল্ম? এইটা একটা মারাত্মক প্রশ্ন কিন্তু!! ন্যাচারালি সে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি! ওর প্রশ্নের পালাতে পথ পাচ্ছে না লোকটি!!

ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে

কিন্তু হোয়াট ড্যু ইউ মিন বাই ফিল্ম? ফিল্ম বলতে আমরা কি বুঝি…? ফিল্ম কি…? ফিল্ম একটা স্টেটমেন্ট হতে পারে, ফিল্ম একটা দার্শনিক তাৎপর্য বহন করতে পারে, ফিল্ম একটা ট্রিটিজ হতে পারে, ফিল্ম একটা দাস ক্যাপিটাল হতে পারে… ফিল্ম অনেক কিছু হতে পারে। মুষ্টিমেয় চলচ্চিত্র পরিচালকই এই জায়গাটায় উত্তীর্ণ হন, সকলেই হন না! এবং সেখানে ঋত্বিক একজন, যেমন- তারকোভস্কি একজন, বার্গম্যান একজন, আকিরা কুরোশাওয়া একজন- যারা এই দর্শনের জায়গায় গিয়ে, ইতিহাসের জায়গায় গিয়ে অদ্ভুত একটা অবস্থান গ্রহণ করে- যেখানে সমস্ত শিল্পমাধ্যম গুলিয়ে যায়! তা, আমি এইটা নিয়ে একটা তত্ত্বে এসছি, ঋত্বিক ঘটক বা তার পাশাপাশি আমরা যাদের দেখতাম সেই বিজন ভট্টাচার্য, যতীন্দ্র মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, চিত্ত প্রসাদ, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য- এরা কারা? আজকে কোনো লোক এদের চেনে না! দু’দিন পর ঋত্বিককেও চিনবে না, সেটা ঠিক। কারণ, আমাকে যে নেমন্তন্নটা করা হয়েছিলো সেখানে বলা হয়েছে যে, বাঙ্গালির আধুনিকতা কোলন ঋত্বিক কুমার ঘটক। এখন, এই বাঙ্গালি যে রেটে আধুনিক হয়ে উঠেছে, তাতে তার কাছে ঋত্বিক ঘটক একটা উদ্বৃত্ত মানুষ! তা, আমি উদ্বৃত্ত মানুষটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। আমি সোভিয়েত দূতস্থানের প্রচার বিভাগে চাকরি করতাম। পাশের ঘরে বসতেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন পিকিংপন্থি। মানে, মস্কোর হেডকোয়ার্টারে পিকিংপন্থি মানুষ- অতএব কেউ তার সাথে কথা বলতো না। আমি জন্ম থেকেই ওকে দেখে আসছি। তো, আমি গিয়ে কথা বলতাম, গল্প করতাম। আর ঋত্বিক প্রায়ই আসতেন পয়সার জন্য। একটু মদ খাওয়ার জন্য পয়সা দরকার। এলেই শিবদেবের কাছ থেকে কিছু, আমার কাছ থেকে কিছু, হেমাঙ্গদার কাছ থেকে কিছু নিয়ে বেরিয়ে যেতেন। খুব কম সময়ের জন্য আসতেন। এই মানুষটাকে কাছে দেখতে দেখতে একদিন হলো কি- এই যুক্তি-তক্কো-গপ্পোর ফেইজটাতে বা তার আগে ঋত্বিক ফুটপাতে থাকতো, রাস্তায় থাকতো। আমার বাড়ির উল্টোদিকে একটা বাড়ি ছিলম, তার রক ছিল, তার উপরে থাকতো। শুধু ঋত্বিক নয়, ঋত্বিকের মত আরো কিছু লোক যাদের পরিপূর্ণ উদ্বৃত্ত বলা যায়- দে ওয়্যার লুম্পেনস, তারাও থাকতো। ঋত্বিকও সেই লুম্পেনদের একজন। আমার মনে আছে- সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আমি সিগ্রেট কিনতে গিয়েছি ঋত্বিক আমার কাছে পয়সা চেয়েছে… এক প্যাকেট চারমিনার কেনার পরে আমার কাছে আঠারো না আটাশ এরকম পয়সা আছে। তো, আমি বললাম এটা নেবে? ও বললো দে! আমি দিয়ে বললাম, এই পয়সায় কি হবে? ও বললো, চলে যাবে! ঋত্বিকের মৃত্যুর পর আমার বাবা একটা স্মরণ সভায় বলেছিলো, ‘ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে’। ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে- এই কথাটা যেন আমরা না ভুলি। কারণ, এই খুন নানাভাবে করা যায়! জাফর পানাহিকে যখন বলা হয় কুড়ি বছর তুমি ছবি করতে পারবে না, স্ক্রিপ্টও লিখতে পারবে না- এটা তাকে খুন করা। বিনায়ক সেন কে যখন বলা হয় তুমি ডাক্তারি করতে পারবে না, কিছুই করতে পারবে না- সেটাও তাকে খুন করা। এবং ঋত্বিক ছবি করার কি সুযোগ পেয়েছিলো তার সময়?! একটা স্ট্রাগ্লিং/ফাইটিং আর্টিস্ট বলতে যা বোঝায় ঋত্বিক পরিপূর্ণভাবে তাই ছিলো! আমি আপনাদের বলছি, সুবর্ণরেখার আউটডোর চাকুলিয়ায় হয়েছিলো। সেখানে রোজ রাত্তিরে সাড়ে নয়টায় কোলকাতা থেকে একটা ট্রেন এসে পৌঁছাতো। সাড়ে ন’টার আগে থেকে আমি ঋত্বিকের মধ্যে একটা অদ্ভুত টেনশন লক্ষ্য করতাম। টেনশনটা হচ্ছে ঐ ট্রেন এসে পৌঁছুবে কিনা! ট্রেনটা এলে তার থেকে কোন চেনা লোক নাববে কিনা! এবং সে ফিল্মের র’স্টক আনবে কিনা! সেইটা না আসলে শুটিং করা যাবে না! এসবের কারণে দিনের পর দিন শুটিং বন্ধ হয়ে গেছে, র’স্টক আসেনি। এইভাবে একটা মানুষকে কাজ করতে হয়েছে। ঋত্বিক যখন ছবি শ্যুট করতেন তখন তার মাথায় তো একটা অ্যাল্কেমি, একটা ক্যালকুলেশন সবই থাকতো…। কিন্তু, আরেকটা জিনিস করতেন- অনেক এক্সেস শ্যুট করতেন, ওগুলো সব এডিটিং টেবিলে ঠিক হবে। সুবর্ণরেখার সেই দুর্মূল্য বহু বহু ফুটেজ টালিগঞ্জে পড়ে পড়ে নষ্ট হয়েছে… আমাদের দেশে সত্যি কোন আর্কাইভ, সত্যি কিছু থাকলে (হয়তোবা সংরক্ষিত হতো)… এগুলো অমূল্য সম্পদ। যেমন, আইজেনস্টাইনের এইরকমের বহু কাজ তারা নষ্ট করেনি। সেগুলো নিয়ে পরে এডিট করে অনেক কিছু বেরিয়েছে। কিন্তু, ঋত্বিকের ভাগ্যে সেটা জোটেনি!! এই জন্য বললাম, ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে। ঋত্বিকের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ছে- ঋত্বিক যাদের বাজনা শুনতো, খুব পছন্দ করতো তার মধ্যে একজন মোজার্ট। মোজার্টের একটা জীবনী পড়েছিলাম সেখানে আছে যে, মোজার্ট কোথাও একটা, তার অর্কেস্ট্রা টিম দিয়ে একটা সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন, একটা সিম্ফোনি কম্পোজিশন, সামনে লোকের প্রচন্ড ওভেশন… তারা চিৎকার করছে লং লিভ মোজার্ট! আর মোজার্ট কানে শুনছেন লং স্টার্ভ মোজার্ট! তুমি না খেতে পেয়ে মরো! এইটা আমাদের দেশে হয়েছে! একাধিক শিল্পীর ক্ষেত্রে হয়েছে! আমি যাদের কথা বললাম এদের প্রত্যেকের হয়েছে। যেমন, যতিরীন্দ্র মৈত্র- তিনি কি মাপের একজন শিল্পী এটা কেউ ভাবতে পারে না! তার কাছে যখন কোন অর্কেস্টা নেই, কোন বাদ্যবৃন্দ নেই, কিচ্ছু নেই- তিনি ফুটপাতের, বস্তির বাচ্চাদের নিয়ে একটা টিম বানালেন। সেখানে ইন্সট্রুমেন্ট কি- একটা পাউডারের কৌটার মধ্যে ইট ভরে সেইটা দিয়ে একটা ইফেক্ট, এভাবে অন্যান্য ইফেক্ট এবং সেটার নাম দিলেন কী- জগঝম্প! তা জগঝম্পের সঙ্গে ঋত্বিকের যে সম্পর্ক, এই লোকটার সঙ্গে বিজন ভট্টাচার্যের যে সম্পর্ক… যেমন ধরুন একটা ঘটনা বলি- সুবর্ণরেখার ফাইনাল স্ক্রিপ্ট লেখা হচ্ছে, পরদিন শুটিং হবে… হরপ্রসাদ মানে যে চরিত্র আমার বাবা করেছিলেন, উনি সেই ডায়লগগুলিকে আবার লিখছেন- তখন ওকে একজন জিজ্ঞেস করেছে এই ডায়লগগুলি তো কালকে লেখা হয়ে গেছে আবার কেনো করছেন! বললেন, থামো! এশিয়ার গ্রেটেস্ট আর্টিস্ট তাকে আমায় প্রজেক্ট করতে হবে না!! এই বোধটা !!! এগুলি কিন্তু সবই উদ্বৃত্ত মানুষদের নিয়ে কথা। তারা কি ছিল আর বাঙ্গালির জানার কোন উপায় নেই।

ঋত্বিক সেই লোক যিনি ইংরেজি জানা ক্রিটিকদের কাল্টিভেট করতো না

আমি একটা ছোট্ট কথা বলছি, আপনাদের মধ্যে যারা আমার হারবার্ট উপন্যাসটা পড়েছেন… তা সেই হারবার্টকে নকশালি বুদ্ধি-টুদ্ধি শিখিয়েছিলো বিনু বলে একজন। এবং সুবর্ণরেখার বিনু, ছোট বিনু, যে আমার ভাই, যে মারা যায় লেকের জলে ডুবে… সুবর্ণরেখার শেষ হচ্ছে মামার সঙ্গে সে যাচ্ছে আর বলছে আমরা নতুন বাড়িতে যাবো যেখানে প্রজাপতি আছে, গান হয়, সেখানে গেলে মাকে পাবো, বাবা আছে… এই নতুন বাড়িতে যাচ্ছিলো বিনু। এখানেই ছবিটা শেষ হয়। এবং এর পরবর্তী যে বিনু, আমি যাকে কনশাসলি হারবার্টে নিয়ে এসেছিলাম; সেই বিনু তখন বড় হয়েছে। এবার সে নতুন বাড়িটা নিজে বানাবার চেষ্টা করছে। এবং আজকেও এই চেষ্টাটা ফুরিয়ে যায়নি। আজকে আমার যে মাওবাদী বন্ধুরা জঙ্গলে বা জেলে রয়েছেন তারা ঐ নতুন বাড়িটার জন্যই ভাবছেন… আর কিছু না। এবং প্রত্যেক যুগে, সমস্ত সময়ে বিনুদের এটা অধিকার! বিনুরা এটা করবেই, সেটা ঠিক হোক কি ভুল হোক! এবং সেইটাকে ক্যামেরায় এবং কলমে ধরবার লোকও থাকবে। যেমন, সত্যি সত্যি অমূল্য বাবুদের দলের সঙ্গে ঋত্বিকের কনফ্রন্টেশনটা… তা একটা ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট, অসামান্য ডকুমেন্ট। পার্টলি আপনারা এই রকম ডকুমেন্ট পাবেন বিজন ভট্টাচার্যের চলো সাগরে নাটকে। ওখানে একটা ডায়লগ আছে যেইটা একচুয়ালি নকশালবাড়িতে হয়েছিলো হরে কৃষ্ণ কুমারের সঙ্গে ঐখানকার নেতৃবৃন্দের- জঙ্গল সাঁওতাল, চারু বাবু এদের আলোচনা। এই ডকুমেন্টশনের যে কাজটা ঋত্বিক করে গেছেন, এটার মূল্য অপরিসীম। সেটা আজকেও টপিক্যাল। ঐ যে বলছেন- তোমরা সফল ও নিষ্ফল; সেখানে তিনি মোটামুটি একটা প্র্যাকটিসিং সোশালিজমের ইতিহাস বলছেন। ঋত্বিক কিন্তু সবটা জানতেন। তিনি সুসলভ থিসিস পড়েছিলেন, তিনি চেগুয়েভারার অন গেরিলা ওয়্যারফেয়ার জানতেন। এগুলো জেনে এই জিনিসটাকে করা। এবং কতটা তার ডিটেইল সেন্স… অনন্যর একটা সিকোয়েন্স আছে ব্রেনগান নিয়ে উলটে উলটে যায়, একচুয়ালি দ্যাট ইজ দ্য ওয়ে দ্যাট গান ইজ টু বি ট্যাকলড! এবং অন্যন্যর সঙ্গে একটা ছেলে ছিল সে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ঐ বন্দুকটা নিয়েই লড়াই করেছিলো এবং দে ওয়্যার প্রোপারলি ট্রেইন্ড। এখানে সবটা আবেগের বিষয় নয়, একটা সায়েন্টিফিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ফটোগ্রাফির এই যে সিদ্ধি দেখছি, এই যে আশ্চর্যের জায়গা ওর সিনেমায়, এরও কিন্তু একটা গুরু-শিষ্য পরম্পরা আছে। ঋত্বিকের এই কাজের অনেকটাই কিন্তু শেখা বিমল রায়ের কাছে। যার মত একজন টেকনিশিয়ান তখনকার যুগে কেন, এখনো নেই। বিমল রায় কি মানের টেকনিশিয়ান তার একটা উদাহরণ দেই- বিমল রায় শুটিং করছেন মীনা কুমারীকে নিয়ে। এমন সময় পাশের স্টুডিও থেকে কে.আসিফ একটা নোট পাঠায়- বিমলদা একবার আসবে? উনি গেলেন আর সেটে বলে গেলেন থাকো আমি আসছি। ওখানে গিয়ে দেখেন সব্বনাশে ব্যাপার! মুঘলে আযমের শুটিং হচ্ছে– আয়নায় মধুবালাকে দেখা যাচ্ছে, সেই সিকোয়েন্সেটা… ঐটা শুট করার সময় ক্যামেরা বারবার চলে আসছে আয়নায়। তো, কে.আসিফ বলছে এখন আমি কি করে শুট করবো!? ঐখানে ক্যামেরায় ছিলেন আর ডি মাথুর। তো, বিমল রায় ক্যামেরাম্যানকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ক্যামেরা বসাচ্ছেন কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না। তখন উনি নিজের ফ্লোরে একটা নোট পাঠালেন শুটিং প্যাকআপ করে দাও, মীনাকে বাড়ি চলে যেতে বলো। তিনি ঐ ফ্লোরের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন এবং ছয়-সাত ঘন্টা থেকে প্রব্লেমটা সলভ করেন। সেই ফিনিশড প্রোডাক্টটা আমরা দেখি এখন। সেই লোকের সঙ্গে কাজ করেছেন। এদের ট্রেনিং, এদের আউকাত, এদের ঘারানাসবগুলোই অন্যরকম। কারণ, ঋত্বিক সমন্ধে একটা ইমেজ বাজারে দেওয়া হয়, ঐ পলিটিক্যালি কারেক্ট বাঙ্গালিরা করে…! এ প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি ঋত্বিক সেই লোক যিনি ইংরেজি জানা ক্রিটিকদের কাল্টিভেট করতো না! বেশি তালেবড় লোক তার কাছে গেলে লাথ মেরে বের করে দিতেন, সোজা কথা। এবং আমি বাকি ডিরেকটদের জানি তারা এই হাফ সাহেবদের কালিটিভেট করেছিলেন এবং তারা তখনই বুঝতে পেরেছিলেন সাহেবদের বাজারে কল্কে না পেলে কিছু হবে না। ঋত্বিকের এসব মাথায় ছিলো না। একটা অ্যাওয়ার্ডও পায়নি, একটাও না! মানে কিচ্ছু পায়নি, কোন ফেস্টিভালে না… কিচ্ছু না! এবং আজকে সে সমস্ত ফেস্টিভালের বাইরে চলে গেছে, অন্য জায়গায় চলে গেছে। এবং এই যে, ফাইটিং স্পিরিট… ঠিক আছে ছবি করতে পারছে না, থিয়েটারের উপর ম্যাগাজিন করছে, নাম ছিল অভিনয় দর্পণ। সেটাও উইথ ইক্যুয়াল অনেস্টি। আমি নিজের চোখে দেখেছি। শেষে হলো প্রফেশনাল থিয়েটার করবো… শালা সিনেমা করতে দিবি না… যাহ থিয়েটারই করবো। এবং সেই প্রজেক্টও এগিয়েছিলো… সাথে ছিল তিনটা ছবি করা এবং প্রত্যেকটা বানচাল হয়ে যায়। ঐ মিসেস (ইন্দিরা)গান্ধী একটু স্পেশালি ফেভার করতেন বলে উনার কিছু কাজ-টাজ, তারপর ইমার্জেন্সি ফ্লাইটে করে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা-এগুলো হয়েছিলো। আদারওয়াইজ, কোন জায়গা থেকে কোন সহায়তা লোকটা পাননি। আমাদের সো-কল্ড ইন্ডাস্ট্রি, সো-কল্ড বিগ নেইমস কেউ পাশে এসে দাঁড়ায়নি। এবং তার সময়ও তাকে কেউ বুঝতো না। ছবি তো ফ্লপ। ছবি যখন রিলিজ হতো, হলে কেউ নেই।

ঋত্বিক ওয়াজ দ্য ওনলি ম্যান

বাঙ্গালি শুধু বোঝেনি তা নয়… ঋত্বিক ওয়াজ দ্য ওনলি ম্যান যার হাত থেকে কোন ডিরেকটর বের হয়নি। তার সঙ্গে যারা ছিলো তারা কোন কাজ করতে পারেনি। এইটা একটা পিকুইলিয়ার ঘটনা কিন্তু! লোকে গিয়ে শেখে অথচ অত বড় লোকের কাছে থেকেও কেউ শিখতে পারেনি। কারণ, তারা তার অরাতে এত বেশি আচ্ছন্ন যে শুধু মদ খাওয়াটা শিখে নিলো কিন্তু কাজের কাজটা শিখলো না। যার ফলে কিছুই হয়নি। এ্যাটলিস্ট মিডিয়োক্রিটও তৈরি হয়নি। আমি ঋত্বিকের কাজের কতগুলি ধারার সাথে পরিচিত যার মধ্যে একটা স্পট ইম্প্রোভাইজেশন। ঐযে অসামান্য বহুরুপী এয়ারপোর্টে যার সামনে সীতা গিয়ে পড়ে, এই বহুরূপীর কোন সিকোয়েন্স স্ক্রিপ্টে ছিল না। আমরা গিয়েছিলাম ওখানে একটা বাজারে, সেইখানে ঐ বহুরূপী ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। তখন ওকে দেখে ইম্প্রোভাইজ করে তুলে নিয়ে যায় এয়ারপোর্টে। নিয়ে গিয়ে শ্যুট করা হয়। এবং তখন আমি অবাক হয়ে গেছলাম ওরে! বাবা! ওত বড় এয়ারপোর্টে আমি ঘুরে বেড়ালাম কই প্লেনটা তো দেখি নি… কিন্তু ছবিতে প্লেনের একটা রেকেজ ছিল… সিনেমায় তো এটাই মজা কোথায় কিসের সাথে কি জুড়ে দেয় বোঝা যায় না! তবে, চাখলিয়ার যে এয়ারপোর্ট ওখানে ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের প্র্যাক্টিস করার জায়গা ছিল… তারা মেশিনগান মানে পোর্টেবল গান নিয়ে মহড়া দিতো। আমি ওখান থেকে মেশিনগানের অনেক বুলেট খুলে এনেছিলাম কিন্তু বুলেটগুলো মরচে পড়ে পড়ে খুলে খুলে নষ্ট হয়ে গেছে। এটা সুবর্ণরেখার শুটিংয়ের সময় দেখা যেত, সেখানে রয়্যাল এয়ারফোর্সের ইন্সিগ্নিয়া লাগানো ছিল। কিন্তু সবই নষ্ট হয়ে গেছে… এখন আর কিচ্ছু নেই।

বাংলায় ঋত্বিকের কোন ঘারানা তৈরি হলো না কেন?

এবং এটাও ঠিক যে বাংলায় তার কোন ঘারানা তৈরি হলো না কেন? অন্য জায়াগায় কিন্তু অন্ধ ভক্ত ফিল্মমেকার জুটলো, বিশেষত জন এব্রাহাম; কিন্তু বাংলায় কোন কিছু হলো না। কারণ, এই এত আধুনিক বাঙ্গালি উদ্বৃত্ত মানুষটাকে আর রাখার দরকার মনে করেনি!! কেননা, এই লোকটা খুব ঝামেলা। আপনার লক্ষ্য করবেন এই ঝামেলাবাজ লোকগুলোর হাতে আর বাঙ্গালি কুক্ষিগত হয়ে থাকতে চাইছে না! এখন তার ফ্লাইট এত বেশি, এখন তার বহুমুখী ইয়ে এত বেশি মানে তার সাহিত্যই বলুন, চলচ্চিত্রই বলুন সব খানেই ঐ যে- কে যেন বলছিলেন হরমোনাল ডিজঅর্ডার না কি যেন…! তো, যাই হোক মানে প্রব্লেম বলবো না… এগুলোর কোন সোশ্যাল রিলেভেন্স আছে কি না…  মানে, এক পার্সেন্ট লোকের মধ্যে কে হোমোসেক্সুয়াল আর কে নয়, তার রাইট নিয়ে উচ্চবাচ্য হচ্ছে আর এদিকে ওয়ার্কারদের রাইট নিয়ে কোন কথা হবে না, কেউ কোন ফিল্ম করবে না। লাখের ওপর কারখানা বন্ধ তাই নিয়ে কোন ফিল্ম হবে না। চা-বাগানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করে মরে গেলো সেসব নিয়ে কিচ্ছু হবে না! আর ননসেন্স, ইডিয়োটিক ইস্যুজ নিয়ে যত কথা… আসল কথা কি, একটা সোসাইটি যখন ডি-পলিটিসাইজড হয়ে যায় তখন এইসব হয়। যেমন, আজকে হচ্ছে ফলস থিয়েট্রিক্যাল, ফলস স্পেক্টাকলস ভঙ্গি; এইভাবে যখন রাজনীতিটা এগোয়, শিল্পীরাও এই গড্ডলিকায় ভিড়ে পরে পয়সা খেয়ে এবং না খেয়ে। তো, এই কারবারের মধ্যে ঋত্বিকের কথা আনা, এ্যাট অল আলোচনা করা সম্ভব কি!

ঋত্বিকের রাজনীতি

আমি ঋত্বিকের রাজনীতি নিয়ে দু’একটা কথা বলছি। মেঘে ঢাকা তারার দুই ছেলে একজন কন্ঠশিল্পী হবে, হয়ও, প্রতিষ্ঠিত হয়। আরেকজন ফুটবলার হবে, হতে পারে না… কারখানায় চাকরি নেয় এবং সেখানে তার অঙ্গহানি ঘটে। ঐ যে আমার বাবার একটা ডায়লগ আছে ‘যন্ত্র গ্রাস করতে পারে নাই’। ষাটের দশকে বা পঞ্চাশের দশকের পর থেকে আমাদের দেশে এই যে একটা নতুন দশা এলো… এবার চিন্তা করুন সুবর্ণরেখায় রবিরাম- যে লেখক হবে তাকে হতে হলো বাস ড্রাইভার। একটা বিরাট মধ্যবিত্তের জীবনে পরিবর্তন এসে গিয়েছিলো; অসংখ্য বাঙ্গালি ছেলে ওয়ার্কার হয়ে দুর্গাপুর চলে গিয়েছিলো। সেই পুরো পিকচারটা, সমস্ত কিছু ঋত্বিকের ছবিতে রয়েছে। ঋত্বিকের মার্কস-এঙ্গেলস প্রীতি, যে টা সে বলছে- ‘এটা কিন্তু ফেলনা নয়’!উনি একমাত্র ডিরেকটর যার প্রতিটি ফ্রেম পলিটিক্যাল। প্রত্যেকটা ফ্রেম বারুদে ভর্তি। সে যখন একটা অপমানিত মানুষকে দেখায়… সে এই বার্তাই আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়-মানুষের অপমানকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে!! এবং সাঙ্ঘাতিক দায়িত্ববোধ থেকে কাজগুলো করা। তার দায়িত্ববোধের চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে যুক্তি-তক্কো-গপ্পো। আমার মজাটা হচ্ছে, ছবিটা যখন তৈরি হয় আমি তখন কিচ্ছু বুঝতে পারিনি। বরং আমি ঋত্বিকের সঙ্গে একটা ফ্যানাটিক ঝগড়া করেছি। আমি বলেছি এনাফ ইজ এনাফ!! তুমি ক্যামেরার ফ্রেমে মদ ঢেলে দিবে আর যা ইচ্ছা তাই করবে… ইন ডিফেন্সে অভ ইউর অ্যালকোহলিজম- এটা আমি মানবো না! প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিলো এবং তখনকার মত ঋত্বিক কিন্তুকন্সিডারড হিজ ডিফিট। সে বলছে- ‘না, আমি আর পারছি না’! ঐ কথাটাও মনে আছে, সেটা ক্যোওট করছে কিং লিয়ার থেকে ‘ডিনাওন্সড দ্য ওয়ার্ড’… আমি বললাম হ্যা… চুপ করে থাকো আর কিচ্ছু করতে হবে না। এবং তারপর আমি যতবার ছবিটা দেখেছি, তার আধুনিকতার দিকটি আমাকে পাগল করে দিয়েছে। কোথায় নিয়ে গেছে একটা ছবিকে… কোথায় চলে গেছে একেকটা ইমেজ… এবং তৎকালীন বাংলায় যা কিছু ঘটেছে পলিটিক্যাল, বিশ্বে যা কিছু ঘটেছে পলিটিক্যাল সমস্ত কিছু ঐ ছবিটাতে সারৎসার হয়ে ঢুকে গেছে। এবং ঋত্বিকের ফ্রেমের এপিক কোয়ালিটি… এটা আমাকে অসম্ভব মোটিভেইট করে। কোলকাতা শহরে রোজ অনেক মেয়ে নতুন করে বেশ্যা হয় তাদের কাছে তাদের দাদারা গিয়ে পৌঁছয়, প্রমত্ত অবস্থাতেই গিয়ে পৌঁছয় কিন্তু এটা ক্যামেরার ফ্রেমে অরকম একটা বোল্ড সিকোয়েন্সে দেখানো… এটা ঋত্বিক ছাড়া আর কারো পক্ষে করা সম্ভব ছিলো না। কারণ, গ্রেট আর্টিস্টরা খুব নিষ্ঠুর হয়। ঋত্বিকও নিষ্ঠুর। মারাত্মক নিষ্ঠুর। এবং তার নিষ্ঠুরতার চাবুক দিয়ে মেরে মেরে মেরে সে সম্বিৎ ফেরাবার চেষ্টা করেছে মানুষের! কতটা পেরেছে আমরা জানি না।

মেকানিক্যাল মার্ক্সিজম দিয়ে ঋত্বিককে বোঝা যাবে না

কিন্তু, আজকে আমার নিজের খুব ভালো লাগছে যে, এই ধরনের একটা আলোচনা সম্ভব হয়েছে। এতটা ভালোবাসা, এতটা রেস্পেক্ট নিয়ে ঋত্বিকের ব্যাপারটা ডিস্কাসড হচ্ছে। ঋত্বিকের জীবনদর্শন, ঋত্বিকের রাজনৈতিক আদর্শ প্লাস তার বহু বিশ্রুত ইয়ুং প্রীতি এইসবগুলি নিয়ে আরো বিশদ গবেষণা-আলোচনা করা দরকার। ঋত্বিকের দুটো বই ইনফ্যাক্ট আমার কাছে আছে, একটা হলো মডার্ন ম্যান ইন সার্চ অভ স্যোওল- কেউ গবেষণা করলে আমি দিতে পারি। ঐ বইটার পাতায় ঋত্বিকের কমেন্টস আছে। এবং আমার পরিচিত এক বন্ধুর কাছে আছে এরিখ নিউম্যানের দ্য গ্রেট মাদার। এবং সত্যি কথা বলতে কি ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলে- এই অন্তর্জগতের যে রহস্য আর বহির্জগতের যে সমস্যা এদের মধ্যে কিন্তু ভয়ংকর বিরোধের কিছু নেই। একটা ইন্ডিভিজুয়ালকে বুঝতে গেলে তার প্রব্লেমসকে বুঝতে গেলে, সে কিভাবে তার রিয়ালিটির সঙ্গে লড়াই করছে সেটা বুঝতে গেলে, তার এক্সিজটেনশিয়াল ফ্রেমটাকে বুঝতে গেলে আমাদের ইয়ুংকে দরকার, ফ্রয়েডকে দরকার, অ্যাডলারকে দরকার- প্রত্যেককে দরকার। ইভেন আব্রাহাম ম্যাসলোকেও দরকার। ম্যাসলো যে সাতটা ক্যাটাগরি বলছেন অর্থাৎ সাতটা ক্রাইসিস আছে মানুষের… একটা শেল্টারের ক্রাইসিস, একটা সান্নিধ্যের ক্রাইসিস, একটা খাবারের ক্রাইসিস… এগুলো মিট আপ করতে প্রতিটি স্তরে মানুষের লড়াই চলে। কাজেই, এই যে ট্রেন্ডটা ঋত্বিক আমাদের চিনিয়ে দিলো, এটারও অপরিসীম মূল্য আছে। কারণ, এই মেকানিক্যাল মার্ক্সিজম দিয়ে (জীবন-বাস্তবতা) বোঝা যাবে না! ইটালিতে মার্ক্সবাদের প্রতিষ্ঠাতা যিনি গ্যাব্রিওলা, তিনি বলেছিলেন- দান্তের সময়ে গম কত দামে বিক্রি হতো আর সিল্কের কাপড়ের কি দাম ছিলো- এইগুলো জানলেই সেই সোসাইটিকে এক্সপ্লেইন করা যাবে না, দান্তেকে তো নয়ই! এই ভুল মার্ক্সবাদ আমাদের দেশের অনেক বারোটা বাজিয়েছে। যার ফলে, একটা সময় এই তথাকথিত মার্ক্সিস্ট ক্যাম্পে আমরা দেখেছি যেটাকে আজকে ভুল রাজনীতির জন্য এক্সপ্লোয়েট করা হচ্ছে, তা হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে শিল্পীদের বিরোধের প্রেসনোট। আর মজাটা ছিলো- শিল্পীরা অনেক অ্যাডভান্সড লুকিং, তারা এগিয়ে ভেবেছিলেন আর কমিউনিস্ট পার্টি ছিলো ব্যাকোয়ার্ড, কমিউনিস্ট পার্টি ছিলোঅজিফায়েড চিন্তাধারার বাহক; কাজেই তারা সেই শিল্পীকে বুঝতে পারেনি। এই একই অভিযোগ ঋত্বিকের বিরুদ্ধেও এসছে, উনি কিসব গ্রেট মাদার পড়েন, আমার বাবার সমন্ধে এসছে… উনিও তো মাদার-কাল্টে বিশ্বাসী…। এই মেকানিক্যাল মার্ক্সিজমে যেটাকে আমি ভালগার মার্ক্সিজমই বলি- এটা নিজেকে এনরিচ করতে পারেনি, এনরিচ করতে না পেরে দিনের পর দিন নতুন নতুন গাড্ডায় গিয়ে পড়েছে এবং প্রচুর ভুল ব্যাখ্যা এবং ইন্টারপ্রিটেশনের সুযোগ ঘটেছে।

কালচার ইন্ডাস্ট্রির যে খেলা, মুনাফার যে খেলা, সেখানে ঋত্বিক চলে না

আমি আর কিছু বলবো না… সাম্প্রতিক একটা নাটক দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়ে, সেখানে কতটা ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট আছে এবং সেখানে যা যা সমস্যার কথা বলা হয়েছে সেগুলো কোন লেভেলের সমস্যা… এগুলো একটু ভাববার দরকার। অ্যাকচুয়ালি ঋত্বিকের সঙ্গে কি হয়েছিলো, হোয়াট সর্ট অভ ডিফারেন্স হি হ্যাড এবং সো ফার মাই নলেজ গোজ জর্জ বিশ্বাসের সঙ্গে এরকম ভয়ংকর কিছু টাসেল হয়েছিলো বলে আমার জানা নেই! এই ইতিহাসের অনেকটার সঙ্গেই আমি জড়িত খুব কাছ থেক জড়িত। আমার বাবাও একজন ভুক্তভোগী প্লাস আমি বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে এসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি, যেমন- সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন চট্টোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, বিষ্ণু দে… আমি কোথাও বাবা এসব পাইনি! এখন সব অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস উঠে আসছে এবং আমি দেখছি এগুলোকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই অস্ত্র সমস্ত যদি প্রতিপক্ষের হাতে চলে যায়, আমরা কি নিয়ে লড়বো?! এটাও একটা সমস্যা। কাজেই ঋত্বিক চান যে আমরা তাকে সেফগার্ড করি, আমিও চাই আজকের ইয়ঙ ফিল্মমেকাররা এ্যাটলিস্ট একটা অটোগ্রাফ কাজ করুক যেখানে বলা যাবে যে, ঋত্বিক বেঁচে আছেন। সেরকম একটা অবস্থা আসবে কি কখনো, কখনো কি দেখতে পাবো? নাকি বাঙ্গালি আরো আধুনিক হতে থাকবে! এ একটা জটিল সংকটের সময়, সংকটটাকে আমি অস্বীকার করি না… ম্যাসিভ একটা মার্কেট, একটা কালচার ইন্ডাস্ট্রি আছে… কালচার ইন্ডাস্ট্রির যে খেলা, মুনাফার যে খেলা সেখানে ঋত্বিক চলে না। বরং বলা হয়, ঋত্বিকের ছবির কদর এখন হচ্ছে। সত্যি কথা বলতে কি- যারা তাদের সময় অনেক এগিয়ে থাকে, তাদের লেখার কদর পরে হয় বা শিল্পকর্মের! যেমন, সেইদিন কাফকাকে কেউ বুঝতে পারেনি কিন্তু এখন দিন কে দিন কাফকার রেলিভেন্সি প্রত্যেকদিন বাড়ছে। এই নতুন ম্যানুস্ক্রিপ্টগুলো বেরোলে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে তা বোঝা যাচ্ছে না। যেমন, আন্তোনিও গ্রামসি। তাকে কুড়ি বছরের জন্য এই ব্রেনটাকে কাজ করতে দেবো না বলে জেলে দেয়া হলো; আর তিনি টুকরা পেন্সিল আর কাগজেলিখে ফেললেন প্রিজনারস ডায়েরি! সেটার রেলেভেন্স ভয়ংকরভাবে বেড়ে যাচ্ছে দিন কে দিন… সমাজকে দেখার চোখগুলো পালটে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। এই যে চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে রদবদল, এই রদবদলের যে দর্শন সেখানে ঋত্বিক একদম প্রথম সারির সৈনিক হয়ে থাকবেন।

অ্যাপারেন্টলি কিচ্ছু জানতোনা

এবং আমি এই মানুষটাকে এত কাছ থেকে দেখেছি, তিনি আমাকে এত কিছু জানিয়েছেন, বুঝিয়েছেন, শিখিয়েছেন… যেমন ধরুন মিউজিক শোনা- এই লোকটা ভারতীর মার্গ সঙ্গীত থেকে শুরু করে ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল ইভেন জ্যাজ ইভেন বিং ক্রসবির গান- এ সমস্ত কিছুর উপরে এন্সাইক্লোপিডিক নলেজ থাকতো। সেই লোকটা আমাকে মদেস মুশোভস্কির মিউজিক শোনালো। লং প্লেয়িং রেকর্ডের উপর মদের গেলাশ রাখতো ফলে গোল গোল দাগ হয়ে যেত… একটা বাজিয়ে একদিন শোনালো নাইট অন দ্য বেয়ার মাউন্টেন। পরে যখন চাকরি-বাকরি করেছিতখন এগুলো সংগ্রহ করেছি। একবার বসুশ্রী কফি হাউসে ক্রিকেট নিয়ে কিছু কথা বলেছিলো… সেখানে তো বাঙ্গালির ক্রিকেট নিয়ে বিশাল আড্ডা… সব একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে, এগুলো জানেই না! ক্রিকেটের সবচাইতে বড় যে লেখক সি এল আর জেমস- ওয়েস্ট ইন্ডিজের, হি ওয়াজ প্রোটেস্টান্ট অ্যান্ড আ জায়ান্ট ইন্টেলেকচুয়াল। তার লেখারও হদিশ জানতেন ঋত্বিক। এই যে ব্যাপারটা… সত্যি কি জানতেন আর জানতেন না… আমি তাকে কন্ঠস্থ শেক্সপিয়ার বলতে শুনেছি কিং লিয়ার থেকে। আমি ঋত্বিককে স্টেজে আশ্চর্য আলোর কাজ করতে দেখেছি, কিছু না জেনে। তিনি আমার বাবার নাটক দেখতে গেছেন, সেই নাটকে আলোর কাজ করছেন তাপস সেন। ঋত্বিক গিয়ে তাপস সেনকে গলাধাক্কা দিয়ে বললো, বেরো এখান থেকে! আমি আলো করবো, যা শালা ভাগ! তাপস আর কি করবে… ইয়ে মদটদ খেয়ে এসেছে… কিন্তু তারপর ও যে কাজটা করলো অসাধারণ। জাস্ট একটা ডিমার আর একটা স্পট লাইট কমিয়ে বাড়িয়ে পুরো ডাইমেনশনটা পালটে দিলো! ঋত্বিক থিয়েটারেরও লোক, ছবি আঁকার লোক ছিলেন, স্কেচ করতে পারতেন, তিনি মিউজিকের লোক…। এইবার বলি, ঋত্বিকের ক্যামেরার কথা, ওঁর প্রত্যেকটা ছবিতে ক্যামেরাম্যানের নাম থাকতো কিন্তু বেশিরভাগ কাজ ঋত্বিকের নিজের করা। ক্যামেরায় যখন লুক থ্রু করছে, সেখান থেকে বলে দিচ্ছে রোল-ক্যামেরা-অ্যাকশন… চললো! একটা লোক সবকিছু করতে পারতো। আর এডিটিংটা তো রমেশ যোশীর সাথে বসে ফ্রেম বাই ফ্রেম এডিট করতেন। যাই হোক, ঋত্বিক ঘটক কিরকম ছিলেন… তার বন্ধুবান্ধব অনেকে নেই দুই একজন যারা আছেন তারা কতটুকু বলবেন তাও জানি না। কিন্তু, আবার নতুন করে তথ্য যদি কিছু পাওয়া যায় সেগুলো যোগাড় করার এখন হাইটাইম! ঋত্বিকের সিনেমার মেকআপের কাজটা করতেন মূলত শক্তি সেন, শক্তি দা নেই, আমি নিজে দেখেছি ঋত্বিক নিজে বলে দিচ্ছেন এই শেডটা মার, ঐটা কর। মানে, এই লোকটা কি জানতো আর কি জানতো না সেইটাই একটা রহস্য। বাট, অ্যাপারেন্টলি কিচ্ছু জানতো না। সরোদ বাজাতে পারতো, বাঁশি বাজাতে পারতো। কিন্তু, কিচ্ছু নয়।

আরে! শালা! ও গ্রামার বানাচ্ছে! ওর গ্রামারটাকে শেখ!

আর বাঙ্গালি ক্রিটিকরা লেখলো- এনার একটু ডিসিপ্লিনের অভাব আছে! এনার সিনেমায় কোন গ্রামার নেই! আরে! শালা! ও গ্রামার বানাচ্ছে! ওর গ্রামারটাকে শেখ! চিরকাল এরা গোল গোল, নিটোল জিনিস মানে ঐ ক্যালেন্ডার ফটোগ্রাফি টাইপ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়ে গেলো!! খালি চিন্তা জিনিসটা কত নিটোল হবে! আরে, একটা বীভৎস ,ভাঙ্গাচোরা জিনিসকে নিটোল করা যায় না! দ্যাট ইজ নট দ্য নিউ এস্থেটিক! নিউ এস্থেটিক হলো মন্তাজ, সেটাও কিন্তু পলিটিক্যাল কারণেই ওয়ার্ক করেছে। ঐ যে সিকোয়েন্সটা- মা বলছে, ক্যামেরা উপরে ঘুরছে, সেখানে একটা জিনিস আছে, একটা বাচ্চা ছেলে দোলনায় দুলছে, এখানে বাচ্চা ছেলেটা হচ্ছে অনন্ত সময়ের মধ্যে একটা পেন্ডুলাম, সে কোথায় যাচ্ছে ডাইনে না বায়ে সে জানে না! কারণ, ঐ ছেলেটার এখন কেউ নেই… মা নেই, বাবা নেই, প্রেমিকা নেই, কেউ নেই! ওর লেখা নেই, কিচ্ছু নেই, টোটালি লস্ট! যেকোন সময় পেন্ডুলাম থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাবে, ও তখন ট্রাপিজের খেলোয়াড়! এই একটা সিকোয়েন্স তোলেন তিনি। আরেকটা সিকোয়েন্সে হরপ্রসাদকে যখন ঈশ্বর বলছে, তুমি আমাকে কোলকাতায় নিয়া যাবা? কোলকাতায় এখন মজা, সে যে কি বীভৎস মজা! তখন হরপ্রসাদ বলছে, নিয়ে যাবো… ওখান থেকে কাট করছে রেসের মাঠ, একটা ঘোড়া লাফ দিয়ে বের হচ্ছে, আর সীতার গলায় একটা পোকার হার…। চিন্তা করা যায় না! বিশ্ব সিনেমাতে নেই, কোথাও নেই এমন একটা সিকোয়েন্স! আমাদের যা বড় বড় নাম, যাদের নামে আকাডেমি, ইন্সটিটিউট হয়েছে তাদের কোন কাজে নেই, কিচ্ছু নেই! কিন্তু, এই লোকটার আছে! এই লোকটা বিশ্বসিনেমাতে রুথলেসলি অটোগ্রাফ করে গেছে, খোদাই করে দিয়ে গেছে! এবং আমাদের এটা গর্বের বিষয় তিনি আমাদেরই লোক, আমরা তাকে কাছে পেয়েছি দেখেছি।

হারাবার কিছুই নেই শৃঙ্খল এবং পলিটিক্যালি কারেক্টনেস ছাড়া!!

তার স্পিরিটটা খুব সহজ কিন্তু- মানুষের প্রতি বিশ্বস্ত হওয়া! গরিব মানুষের প্রতি অনেস্টি বজায় রাখা! বেশি বড়লোকের সঙ্গে মাখামাখি করার দরকার নেই- তাতে কখনো শিল্প হয় না, দালালি হয়! এগুলো হচ্ছে প্রত্যক্ষ শিক্ষা এবং পলিটিক্যালি অ্যালাইভ হওয়া। এবং আই স্ট্যান্ড ফর লেফট উইং আর্ট বাট নো ফারদার লেফট ইন দ্য আর্ট! এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কবুল করা এবং কবুল করতে করতে করতে করতে মরে যাওয়া একসময়! এইটাই স্বাভাবিক। এইটাই একটা শিল্পীর জীবন! এইখানেই সে বাঁচে। এবং শিল্পীরা পৃথিবীর কোন দেশে খুব একটা আনন্দে খেয়েছে আর থেকেছে এমনটা কেউ দেখাতে পারবে না! মদিলিয়ানির মত শিল্পী একটা ব্রেডরোল খাবার জন্য কাফেতে বসে সাদা কাপড়ে ছবি এঁকে দিতেন। সেই ছবিগুলি পরে কোটি ডলারে বিক্রি হয়েছে। এই মার্কেট তো রয়েছে চারদিকে…। তো, যাইহোক- আমাদের এই পলিটিক্যালি কারেক্ট ও কালচারালি কারেক্ট বাঙ্গালিরা নিপাত যাক!! তাদের আধুনিকতা নিপাত যাক!! আমরা যারা প্রিমিটিভ, পুরোনোপন্থি আমরা থাকবো! আমরাও বুঝি- এই হোমোসেক্সুয়ালিটি নিয়ে দেবেশ রায়ের দাদা দীনেশ রায় একটা গল্প লিখেছিলেন, অসামান্য গল্প, সেই গল্প আমরা প্রোমোট করেছিলাম… আমরা হোমোসেক্সুয়ালিটিকে প্রোমোট করিনি, আমরা প্রোমোট করেছিলাম একটা অসামান্য শিল্পকর্মকে- যার বিষয় হোমোসেক্সুয়ালিটি হতেই পারে!! আমরাও কিছু জানি না, বুঝি না এমন নয়! আমরা রামছাগল এরকম মনে করো না! আমরা ডেথ ইন ভেনিস দেখেছি। উই ক্যান টিচ ইউ হোয়াট ইজ হোমোসেক্সুয়ালিটি! এরা যেন আজকে আবিষ্কার করলো এমন ভাব! এগুলো অনেক প্রিমিটিভ ব্যাপার-স্যাপার! এসব হয়ে গেছে অনেক আগে! এগুলো আমরা জানি! কাজেই, হারাবার কিছুই নেই শৃঙ্খল এবং পলিটিক্যালি কারেক্টনেস ছাড়া!!

থ্যাঙ্কিউ !!

ভিডিওঃ https://www.youtube.com/watch?v=VIuC9Gv-R2o


ক্যাম্পাস হত্যার মিছিল দীর্ঘতরঃ দায় “উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে” : সুদীপ্ত শাহিন

 

ধারাবাহিকভাবে ঘটছেই দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে একের পর এক হত্যাকান্ড । তাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সমাজের সকল শ্রেণিপেশার মানুষ। সরব হয়ে উঠেছেন বুদ্ধিজীবি , সুশীল সমাজ এবং মিডিয়াও । ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের প্রতি সকলের অভিযোগের অংগুলি নির্দেশ হলেও অনেকেই আবার গোটা ছাত্র রাজনীতিকেই অভিযুক্ত করে তা নিষিদ্ধের দাবি তুলছেন। বিশেষত বুয়েটের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি তোলায় অতি উৎসাহীরা একে রেফারেন্স ধরে সারাদেশেই ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আওয়াজ তুলছে। এ প্রেক্ষিতে তাদের যুক্তি হলো- “ছাত্ররাজনীতিতে আদর্শিক অবস্থান এখন আর নেই, ছাত্ররা লেজুরবৃত্তি রাজনীতি করছে” – এরকম আরও বহু বদনাম। এইসব বদনামের পালে হাওয়া দিতে কোন কোন মিডিয়া দ্বারস্থ হচ্ছে ছাত্ররাজনীতির একাল আর সেকালের পার্থক্য নিরুপণে । শাসক গোষ্ঠির বয়োবৃদ্ধরাও “একদা আমরা ছিলাম. . . . .” এরকম মুখরোচক গল্প জমিয়ে প্রচার মিডিয়াতে এই প্রজন্মের প্রতি এক নাক সিঁটকানো ভাব দেখাচ্ছেন। অথচ আমরা জানি ছাত্র রাজনীতিও শ্রেণি নিরপেক্ষ নয়। বিদ্যমান রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্র দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও ধারণ করে। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বা প্রশাসনের মধ্যেও স্বৈরতন্ত্রের স্বরুপ মূর্ত হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের স্বৈরতন্ত্র রুপ যেমন রাষ্ট্রের শ্রমিক- কৃষক- জনগণের জীবনকে দূর্বিষহ করে তোলে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বৈরতন্ত্রও এই জনগণের সন্ত্বানদের জীবনকে দূর্বিষহ করে তোলে। একই হল- এ, একই ক্যাম্পাসে শত শত বা হাজার হাজার শিক্ষার্থী একসাথে চলার কারণে সচেতন শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যায়, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে বা সহজে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই শাসক গোষ্ঠী একদল লাঠিয়াল তৈরি করে রাখে, যাদের দিয়ে স্বৈরাচারি রাষ্ট্র ও সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে তার স্বৈরতন্ত্র সহজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। পাকিস্তান আমল থেকে সামরিক, বেসামরিক নামে বেনামে হাল আমল পর্যন্ত আমাদের দেশে যতগুলি সরকার এসেছে সকলেই নির্লজ্জভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই অপততপরতা অব্যাহত রেখেছে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে হল দখল, টেন্ডার বাজি, ভর্তি বাণিজ্য শাসক গোষ্ঠীর এই লাঠিয়ালরাই দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে। রাষ্ট্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজনীতি সচেতন ছাত্ররা যাতে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়তে না পারে ছাত্র নামধারী এই লাঠিয়ালদের বিভিন্নরকম পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে ছাত্র- শ্রমিক- কৃষক- জনগণের পক্ষে সবসময়ই আরেকদল শিক্ষার্থী দাঁড়িয়েছে। দেশের বড় বড় অর্জনগুলি তাদের হাত ধরেই এসেছে। অন্যায়, অনিয়মের বিরুদ্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী সবসময়ই দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী আজ পুঁজিবাদী- সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে ঘৃণ্য ফ্যাসিজম আর নয়া- ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে স্বৈরতন্ত্রের প্রকট রুপ ধারণ করছে। তাই শাসক- শোষক শ্রেণির কাছে আমাদের মত দেশে বড় আতংক ও প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ছাত্রসমাজ। তাই এই ছাত্রসমাজ যেনো সংগঠিত হতে না পারে এবং রাজনৈতিক সচেতন হয়ে গড়ে উঠতে না পারে সেই জন্য বিভিন্ন কৌশলে ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শাসক গোষ্ঠীই ছাত্ররাজনীতি বন্ধের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক বুয়েটের রাজনৈতিক অসচেতন ছাত্রদের দাবিকে পুঁজি করে শাসকগোষ্ঠী দেশব্যপী ছাত্ররাজনীতি বন্ধের পাঁয়তারা করছে। এ সমস্ত তৎপরতার মাধ্যমে ভারতের সাথে জাতীয় ও জনস্বার্থবিরোধী বিরোধী চুক্তিকে উন্মোচন ও বিরোধীতা করতে গিয়ে নিহত আবরার হত্যার বিচার দাবির আন্দোলনকেও ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ফাঁপা কথা ও বুলির মাধ্যমে আবরার হত্যার বিচারেরও অনিশ্চয়তা তৈরির চক্রান্ত চলছে। এই হত্যাকান্ডের সাথে ক্ষমতাসীনদের আরও অনেকের সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয় যখন সামনে আসছে তখন পরিকল্পিতভাবে সামনে আনা হচ্ছে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের টপিক। পিছনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এরকমভাবেই অতীতের সমস্ত ক্যাম্পাস হত্যার খুনীদের স্বৈররান্ত্রিক সরকারগুলি রক্ষা করে এসেছে।

দেশের ছাত্ররাজনীতির স্নায়ুবিক স্থান ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ের চিত্র দেখলেই স্পষ্ট হয়ে উঠে শাসক-শোষক গোষ্ঠীর চক্রান্ত । অভ্যন্তরীণ কোন্দল , ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি এসব ঘৃণিত বিষয়-বস্তু নিয়ে শাসক-শোষক গোষ্ঠীর হাতের ক্রীড়ানক ছাত্রসংগঠনগুলোর মাধ্যমে একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটলেও সচেতনভাবেই এ পর্যন্ত কোন সরকার এসব হত্যাকান্ডের কোনটিরও বিচার করে নি । ঘটনা প্রবাহগুলির দিকে চোখ বুলালে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল রাত ১টা ২৫ মিনিটে সূর্যসেন হলের ৬৪৫ ও ৬৪৮ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করে ৭ জনকে টেনে বের করে এনে টিভি রুমের সামনের করিডোরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে। নিহতেরা হলেন – নাজমূল হক কোহিনর , মোহাম্মদ ইদ্রিস, রেজওয়ানুর রব , বশির উদ্দিন আহমেদ জিন্নাহ, আবুল হোসেন এবং এবাদ খান । এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগের সেক্রেটারী শফিউল আজম এর যাজ্জীবন সাজা হলেও অদৃশ্য শক্তি বলে মুক্তি পেয়ে যায় । ১২ এপ্রিল ১৯৭৮ সালে ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ও তাদের সমর্থক ছাত্রীদের সঙ্গে অপর পক্ষের ছাত্রীদের মতবিরোধের জের ধরে পারস্পরিক সংঘষের্ রেজিষ্ট্রার বিল্ডিংয়ের ১২৭ নম্বর কক্ষে এক ছাত্র মারা যায় । যার নাম প্রকাশ করা হয়নি । এই হত্যারও বিচার হয়নি । ১৩ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৩ সালে শিবিরের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শোভাযাত্রা বের হলে কলা ভবনের পশ্চিম গেট অতিক্রম করার সময় সংগ্রাম পরিষদের একটি মিছিল হামলা করে । এত জয়নুল নামের এক ছাত্র মারা যান । এ ঘটনাতেও দোষী সাব্যস্ত্ করা হয়নি । ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টায় জহুরুল হক হল ও এফ রহমান হলের মধ্যবর্তী রাস্তায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ফেব্রুয়ারি প্রস্তুতি মিছিলের ওপর কাঁটা রাইফেলের গুলিবর্ষণে বাকশালের সংগঠক জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ন সম্পাদক ঢাবিতে সমাজ বিঞ্জান শেষ বর্ষের ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া নিহত হন । এ ঘটনার জন্য সরকারি মদদপুষ্ট পেটোয়া বাহিনীকে দায়ী করলেও পরবর্তীতে কোন বিচার হয় নি । ১৯৮৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীর রাতে ছবি টানানো নিয়ে শহীদ মিনারে ছাত্রদল , আওয়ামীলীগ ও জাসদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে । এতে সোহরাব গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । সোহরাবের মায়ের দায়ের করা মামলায়ে ছাত্রদলকে অভিযুক্ত করা হলেও বিচার হয় নি। ৩১ মার্চ ১৯৮৬ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রইউনিয়নের মিছিলের ওপর ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও জাসদ ছাত্রলীগ সম্মিলিত সশস্ত্র আক্রমনের ফলে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী আসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় । এ ঘটনায় কারো বিচার হয়নি । ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ মুহসীন হলের ৪২৬ নম্বর কক্ষে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে । এতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা বাবলু, মাঈনুদ্দীন ও নূর মোহাম্মদ আহত হয়ে পিজিতে নেয়ার পথে মারা যান । একই বছরের ১৪ জুলাই সূর্যসেন হলের একটি কক্ষের দখল নিয়ে ছাত্রদল, জাসদ ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে । এতে সূর্যসেন হলের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইতিহাস বিভাগের ১ম বর্ষেও ছাত্র আব্দুল হালিম নিহত হন । এ ঘটনার জের ধরে ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন রণক্ষেত্রে পরিণত হয় । এতে আরও ৩ জন নিহত হন । নিহতদের মধ্যে শহিদুল্লাহ হলের ছাত্র আসাদ, রিক্সাচালক আব্দুর রহিম এবং পথচারী কামরুল হাসান । এ ঘটনায় ৮ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন এবং কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয় । কিন্তু সেই রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হয়নি । ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সালের রাতে মুহসীন হলের ৩৫৭ নং কক্ষে জাতীয়তাবাদি ছাত্রদলের অন্যতম নেতা বজলুর রহমান শহীদ আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । এ ঘটনায় ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করে ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে রিপোর্ট করতে বলা হলেও সে রিপোর্ট আজও আলোর মূখ দেখেনি। ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকসু নির্বাচনে ফলাফলকে কেন্দ্র করে পরাজিত ছাত্রদলের হামলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মি কফিল উদ্দিন কনক নামের ছাত্র নিহত হন । এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করলেও ঐ তদন্তের ফল আজও জানা যায় নি । ১৯৯০সালের ২৬ নভেম্বর সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য ও ছাত্রদলের থেকে বহিষ্কৃত নেতা নিরু-অভি গ্রুপের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে ক্যাম্পাসের চা দোকানদার নিমাই নিহত হন । এ পরিস্থিতি আর যেন উপনীত না হয় এ বিষয়ে আইন -শৃঙ্খলা বাহিনীকে পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানিয়ে ঘটনার সমাপ্তি ঘটে । এর আগে ১৯৯০ সালের ২১ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার মিছিলে ছাত্রলীগের হামলার জের ধরে ২৫ ফেব্রুয়ারি মধুর কেন্টিনে এক সংঘর্ষে জহুরুল হক হলের ছাত্রলীগের ভিপি শহীদুল ইসলাম চুন্নু মাথায় গুলিবিদ্দ হয়ে মারা যান । এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করে ২০ মার্চের মধ্যে রিপোর্ট পেশ করতে বলা হলেও তার হদিস মেলেনি আজ পর্যন্ত । ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্মর স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্তরে ছাত্রদল ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে ক্রসফায়ারে ডা. মিলন প্রাণ হারান । ২০ জুন ১৯৯১ সালে সিট দখল নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের সূত্র ধরে আওয়মী ছাত্রলীগ ও জাসদ ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষে জাসদ ছাত্রলীগের নেতা মাহবুবুর গুলিবিদ্ধ হন । দীর্ঘ ৪ মাস ধরে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের মধ্যে বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনার জের ধরে ২৭ অক্টোবর ১৯৯১ সালে ছাত্রদল –ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষে ভাষা ইনষ্টিটিউটের সামনে ছাত্রদল কর্মি মির্জা গালিব গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । গালিব কে নেয়ার জন্য এগিয়ে গেলে ছাত্রদল কর্মি লিটন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । এই ২ জনের মৃত্যুর পর ছাত্রদল ছাত্রলীগের উপর ব্যাপকভাবে গুলিবর্ষণ করলে রেজিষ্ট্রারের বাসভবনের সামনে ছাত্রলীগ কর্মি মিজানুর রহমান ও এক টোকাই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় । তখন কারফিউ জারি করে পরিস্থিতি আয়ত্বে আনা হয় । ৯ জানুয়ারি ১৯৯২ সালে টিএসসির সড়কদ্বীপে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা চলাকালে সংগঠনের দুই গ্রুপের কর্মিদের মধ্যে সংঘর্ষে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান বাদল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান । ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ গণতান্ত্রিক ছাত্রঐক্য ও ছাত্রদলের মধ্যে গোলাগুলির এক পর্যায়ে ছাত্রইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় নেতা মইন হোসেন রাজু টিএসসির সড়কদ্বীপে গুলিতে নিহত হন । মৃত্যুর পর ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয় । ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ সালে সূর্যসেন হল দখল কে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের ২ গ্রুপের সংঘর্ষে আশরাফুল আজম মামুন ও মাহমুদ হোসেন নামে ছাত্রদল নেতা নিহত হন । এ ঘটনার প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল ও বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা পর্যন্ত –ই ক্ষান্ত থাকেন । ১লা নভেম্বর ১৯৯৩ সালে চাঁদা আদায় ও ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আভ্যন্তলীণ কোন্দলে মারা যান ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা জিন্নাহ । এ প্রেক্ষিতে ৮ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি-ই হয় সর্বশেষ বিচার । ২২ নভেম্বও ১৯৯৩ সালে নিজেদের মধ্যে টেন্ডারের চাদা নিয়ে কোন্দলের শিকার হয়ে মারা য়ান ছাত্রলীগের মন্টু গ্রুপের নেতা অলোক কান্তি । ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে এক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাচের অভ্যন্তরে ছাত্রলীগের মধ্যে পরস্পর বিরোধী ২টি গ্রুপের গোলাগুলিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে পুলিশের টিয়ারশেলের আঘাতে মারা যান বুলবুল নামে এক ছাত্র । এ ঘটনায় ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি র মধ্যেই বিচার কার্য আটকে থাকে । ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ সালের ছাত্রদলের ২টি গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দ্বলে মিঠু নামে এক ছাত্র মারা যায় । ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ সালের ছাত্রলীগের জগন্নাথ হল নেতা জাকিরকে হলের মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় । ছাত্রলীগ এজন্য সরকারী কিলিং এজেন্টকে দায়ী করে । আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিরকেট সভা ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিতেই বিচার কার্য সমাপ্ত করে । ১৩ মার্চ ৯৭ সালে ছাত্রদলের নেতা কামরজ্জামান নিয়ন্ত্রিত ইলিয়াস গ্র“প ও বরিশাল টিটু গ্রুপের মধ্যে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের হিসেবে মুজিব হলের ৩০৫ নং কক্ষে আরিফ কে গুলি করে হত্যা করে । এ ঘটনায়ও একটি তদন্ত কমিটিতেই শেষ । ২৩ এপ্রিল ৯৮ সালে সূর্যসেন হল দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষে পার্তপ্রতিম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় । এ ঘটনার জন্যও একটি তদন্ত কমিটি করে । ২৯ মার্চ ২০০১ সালে ৫০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে খায়রূল আলম লিটন ওরফে কুত্তা লিটন মারা যায় । এ ঘটনার জন্যও ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে । ১৭ আগস্ট ২০০১ সালে গুলিবিদ্ধ হয়ে জিয়াউর রহমান হলের ছাত্রলীগ নেতা ফিরোজ নিহত হন্ । এঘটনায়ও ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি হয় । এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২০১০ এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই গ্র“পের সংঘর্ষে প্রাণ হারান মেধাবী ছাত্র আবু বকর । এ ঘটনায় ৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দেয় পুলিশ । তবে তা গ্রহণ না করে সিআইডি কে পুনর্তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত । গত ২ বছওে আসামী গ্রেফতার তো দূরের কথা কাউকে জিজ্ঞাসা ও করা হয় নি । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কেন্দী্রয় ছাত্ররাজনীতির আরেকটি গুর“ত্বপূর্ন স্থার বুয়েটে গত ২০ বৎসরে মারা গেছে ১৯ জন। যা তদন্ত কমিটি তেই সীমাবদ্দ থাকে বিচারকার্য । এদের মধ্যে ১২ জন এম এ রশিদ হলের ছাত্র ।এবং ৪জনের অস্বভাবিক মৃত্যু । ৭১ সালের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬২ টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে । ভয়াবহ এসব সংঘর্ষে ঝরে গেছে ২৯ টি তাজা প্রাণ । এছাড়াও আহত হয়েছে দুই হাজারের বেশী । এদের মধ্যে ২৭ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র । সংঘর্ষের পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থেকেছে ৬০০ দিন । নিহতদেও মধ্যে ১৫ ছাত্রশিবিরের , ৫ছাত্রলীগের , ৪ জন ছাত্রদলের , ২জন ছাত্রমৈত্রীর এবং ১জন ছাত্র ইউনিয়নের । এছাড়াও অন্যান্য বিশবিদ্যালয়ের ২/১ টি ঘটনা উল্লেখ করলে বোঝা যাবে সমগ্র দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভৎস চিত্র । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৮৮ সালের ১৫ জানুয়ারি জাতীয় ছাত্রসমাজের হাতে নিহত হন আইনুর হক । ৮৮ সালের ১৮ এপ্রিল ট্রেন থকে নামিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা খুন করে আমিনুলকে । সর্বশেষ ২০১২ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের হামলায় মাসুদ ও মুজাহিদুল নামে ছাত্র শিবিরের দুই কর্মি নিহত হয় । ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯২ সালে ২৫ নভেম্বর হরিণায়নপুরে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও ছাত্রমৈত্রীর যৌথ হামলায় নিহত হন সাইফুল । ৯৬ সালে ২৬ সেপ্টেম্বও ছাত্রলীগের হামলায় নিহত হয় আমিনুল । ৯৮ সালে ২৯ অক্টোবর ছাত্রলীগের হামলায় নিহত হন মুহসীন ও মামুন । এছাড়াও জাহাঙ্গীর নগর , কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় , শাহজালাল বিশ্ব বিদ্যালয় সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও অসংখ্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে । তাতে ঝরে গেছে অসংখ্য তাজা প্রাণ । ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র রাজনীতির কারণেই ভীত হয়ে শাসক শোষক শ্রেণী পরিকল্পিতভাবে এসব হত্যাকান্ডের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ নষ্ট করার সুযোগ নিয়ে বেসরকারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করছে । যেখানে শিক্ষা থেকে সর্বোচ্ছ মুনাফার একটা অবাধ সুযোগ এবং ছাত্ররাজনীতির অনুপস্থিতির সুযোগে নিশ্চিত থাকে লুটপাটের নিরাপত্তাও । কিন্তু সব ক্যাম্পাস হত্যাকান্ডের প্রশ্ন একটাই – কী অদৃশ্য কারণে এসব হত্যাকান্ডের বিচার হলো না । আর সেক্ষেত্রে যুক্তির উত্তর হলো- রাষ্ট্রই এসব হত্যাকান্ডের হোতা এবং হত্যাকারীদের রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে । পুঁজিবাদী – সাম্রাজ্যবাদি অর্থনীতি ব্যবস্থার নিজস্ব সংকটের চক্রাকারে একের পর সংকট ও মন্দায় নিমজ্জিত পুঁজিবাদী সাম্রাজৗবাদী দেশগুলো । সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির অভয়ারণ্য বাংলাদেশে অবাধ লুটপাট, সীমাহীন দুর্নীতি, জনস্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপ – এ সমস্ত কারণে ছাত্র জনতা দিন দিন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংক , আই,এম , এফ র নীতি নির্দেশে এ কাজ করতে যেয়ে শাসক শোষক শ্রেণীর একমাত্র ভয় ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রআন্দোলনকে । আর সে কারণেই শাসক শোষক গোষ্ঠী তার শ্রেণী , সঙ্গী সাথী প্রতিক্রিয়াশীল মিডিয়া, বুদ্ধিজীবি বা সূশীল সমাজদের নিয়ে মাথা বেঁধে মাঠে নেমেছে ছাত্ররাজনীতির বদনাম দিয়ে ছাত্ররাজনীতিকে বন্ধ করার ষড়যন্ত্রে । তাই এ ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত উন্মোচন করার দায়িত্ব এই ছাত্রসমাজ বা ছাত্র আন্দোলনের কর্মিদেরকেই নিতে হবে । শাসক শোষক শ্রেণীর হাতের ক্রীড়ানক ছাত্ররাজনীতির বিপরীতে শক্তিশালী করতে হবে বিপ্লবী বিকল্প ধারার ছাত্ররাজনীতিকে ।

লেখক পরিচিতিঃ সুদীপ্ত শাহিন, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ(ময়মনসিংহ জেলা)


মাওবাদী নেতা কমরেড ‘নিজামউদ্দিন মতিন’-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

মাওবাদী নেতা কমরেড ‘নিজামউদ্দিন মতিন’-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

মাওবাদী নেতা কমরেড নিজামউদ্দিন মতিন ১৯৫৫ সালে বরিশালের আলেকান্দায় এক মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি যখন নবম শ্রেণির ছাত্র, তখন বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী লড়াই-সংগ্রামের তাত্ত্বিক ভিত্তি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সেতুঙ চিন্তাধারা ও মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৬৯ সালেই তিনি কমরেড সিরাজ সিকদার প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী পার্টি গঠনের প্রস্তুতি সংগঠন ‘পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন’-এ যোগ দেন এবং বরিশাল শহরে কাজ শুরু করেন। মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭০ সালে তিনি দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে বুর্জোয়া একাডেমিক শিক্ষা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে পেশাদার বিপ্লবীতে পরিণত হন।
সার্বক্ষণিক সংগঠক হিসেবে কমরেড মতিন চট্টগ্রামে নিয়োজিত হন এবং সেখানে গ্রামাঞ্চলে সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি পাবনায় কাজ করেন।
বিচ্ছিন্নতা ও যুদ্ধরত অবস্থায় কমরেড মতিন পার্টি গঠনের সংবাদ অবহিত হননি। পরে সংযোগ হলে তিনি কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি’তে যোগ দেন।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময়ে কমরেড মতিন বিক্রমপুরে প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭৩-৭৪ সালে বিক্রমপুরে পার্টির বিপ্লবী সংগ্রামের উত্থান ঘটে। এরপর শেখ মুজিবের ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে সারা দেশে বিপ্লবী লড়াইয়ের যে উত্থান সৃষ্টি হয় তাতে কমরেড মতিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৪ সালের ১৬ জুন ও ১৫-১৬ ডিসেম্বর পার্টির আহ্বানে যে হরতাল পালিত হয়, সেখানেও কমরেড মতিন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৭৪ সালে কমরেড মতিন ময়মনসিংহ অঞ্চলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পরিচালনা করেন এবং পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭৪ সালে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সংকট নিরসনে সেপ্টেম্বর মাসের বর্ধিত অধিবেশনে কমরেড সিরাজ সিকদার ৬ সদস্যের যে রাজনৈতিক ও সামরিক সাহায্যকারী দুটি গ্রুপ গঠিত করেন তাতে কমরেড মতিন ছিলেন ‘সামরিক সাহায্যকারী’ গ্রুপের ১ নম্বর সদস্য।
১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি শেখ মুজিবের ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র্র কর্তৃক কমরেড সিরাজ সিকদার গ্রেফতার ও নিহত হলে পার্টি গুরুতর বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। পার্টির নেতৃত্বদানের মারাত্মক সংকটকালে সাহায্যকারী গ্রুপদ্বয়ের কোনো সিনিয়র সদস্য দায়িত্ব নিয়ে সভা আহ্বান না করলে কমরেড মতিন উদ্যোগী হয়ে সভা আহ্বান করেন এবং আলোচনার ভিত্তিতে পার্টির অস্থায়ী কেন্দ্র ‘অস্থায়ী সর্বোচ্চ সংস্থা (অসস)’ গঠন করেন। কমরেড মতিনের ওপর প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব অর্পিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালের জুন মাসে পার্টির বর্ধিত অধিবেশনে তা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়। সে সময় তিনি পার্টিকে গুছিয়ে পুনরায় বিপ্লবী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সমর্থনপুষ্ট খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সামরিকবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর কমরেড সিরাজ সিকদারের আগাম বিশ্লেষণ অনুযায়ী কমরেড মতিনের নেতৃত্বাধীন ‘অসস’ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে জাতীয় দ্বন্দ্বকে প্রধান দ্বন্দ্ব নির্ধারণ করে বিপ্লবী লড়াই অব্যাহত রাখে।
১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পার্টির দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কমরেড মতিন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হন। তাঁর গ্রেফতারের কিছুকাল পরে পার্টি তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জেলবন্দী অবস্থায় কমরেড মতিন আরেক জেলবন্দী নেতা কমরেড সুলতানকে নিয়ে গঠন করেন ‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির বিপ্লবী সত্তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া’ যা সংক্ষেপে ‘সত্তা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরে জেলে অন্তরীণ থাকাকালে দুই লাইনের সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় তিনি কমরেড আনোয়ার কবীরের নেতৃত্বাধীন পার্টি-কেন্দ্র ‘সর্বোচ্চ বিপ্লবী’ পরিষদ (সবিপ)’র সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ১৯৭৮ সালে ঐক্যবদ্ধ হন।
১৯৮০ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় কমরেড মতিন নিপীড়নমূলক কারা-আইনের বিরুদ্ধে দুর্বার সংগ্রাম গড়ে তোলেন। সব জেলে পার্টির জেলবন্দী নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে সংগঠিত হয় জেল আন্দোলন।
সুদীর্ঘ ১০ বছর কষ্টকর বন্দীজীবনে তিনি মাওবাদ ও বিপ্লবের প্রতি আনুগত্যকে কখনো শিথিল করেননি এবং ১৯৮৬ সালে বন্দীদশা থেকে মুক্তি লাভের পর পুনর্বার বিপ্লবী অনুশীলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
‘অভূতপূর্ব বিপ্লবী অনুশীলন, ত্যাগ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কমরেড মতিন ১৯৮৭ সালে পার্টির দ্বিতীয় ও ১৯৯২ সালে তৃতীয় কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনেরও সদস্য ছিলেন।
তৃতীয় কংগ্রেসের পর দক্ষিণাঞ্চলের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়। তিনি তৃতীয় কংগ্রেসের গৃহীত লাইন অনুযায়ী বিপ্লবী লড়াই সূচনা করেন। পরে ’৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে পার্টি অভ্যন্তরে বিবিধ লাইন প্রশ্নে দুই লাইনের সংগ্রাম সূচিত হয়, যার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে পার্টি তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কমরেড মতিন ১৯৯৯ সালের মে দিবসে গঠন করেন ‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির মাওবাদী বলশেভিক পুনর্গঠন আন্দোলন (এমবিআরএম)’।
নতুন কেন্দ্র গঠন করেই তিনি বিপ্লবী লড়াইয়ের সূচনা করেন এবং বেশকিছু সাড়া জাগায় ও বিকাশ ঘটায়। বিপ্লবী অনুশীলনের একপর্যায়ে তিনি গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় কমরেড নিজামউদ্দিন মতিন গত ১১ আগস্ট ২০১৯ দুপুর ১২টায় মৃত্যুবরণ করেন।
কমরেড নিজামউদ্দিন মতিনের ত্যাগীজীবন, অধ্যাবসায়, অবিরাম বিপ্লবী অনুশীলন ও বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস থেকে নতুন প্রজন্মের বিপ্লবীদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। কমরেড মতিন আজীবন নয়াগণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের জন্য লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে জনগণের সেবা করেছেন। তাই তাঁর মৃত্যু থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী। কমরেড মতিনের মৃত্যুতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো। কমরেড মতিনের স্মৃতির প্রতি আমরা জানাই লাল সালাম।

মাওবাদী নেতা কমরেড নিজামউদ্দিন মতিন স্মরণ কমিটি

কর্মসূচি
স্মরণসভা : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, শুক্রবার, বিকেল ৪টা
স্থান : আরসি মজুমদার মিলনায়তন(কলা ভবনের পেছনে), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্রঃ জহির রায়হান

রুশ বিপ্লবের পঞ্চাশতম বার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘তরঙ্গ’ পত্রিকায় জহির রায়হান-এর লেখা ‘অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্র’ লেখাটি প্রকাশিত হয়। এ বছর রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকী উপলক্ষে ‘লাল সংবাদ’ এ লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হল:

আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে স্মরণীয় অবদান হচ্ছে দুটো।

একটি সিনেমার জন্ম।

অপরটি সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম।

দুটোই বিপ্লব।

একটা চারুকলার ক্ষেত্রে।

অন্যটা সমাজ ব্যবস্থা ক্ষেত্রে।

সিনেমা মানুষের স্বষ্টি ক্ষমতাকে প্রকাশের এবং বিকাশের এক নতুন মাধ্যমের সন্ধান দিয়েছে, যার শক্তি অপরিসীম।

সিনেমা হলো কবিতা।

সিনেমা হলো উপন্যাস।

সিনেমা হলো সংগীত।

সিনেমা হলো পেইন্টিং।

সিনেমা হলো নাটক।

সিনেমা হলো বিজ্ঞান।

সিনেমা হচ্ছে সবকিছুর সমষ্টি। এ এক যৌথকলা। অথচ কোন একটির একক অস্তিত্ব এখানে নেই। সবকিছুকে ভেঙেচুরে, সবকিছুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বৈজ্ঞানিক শিল্পকর্ম। অক্টোবর বিপ্লব এবং সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম মানুষের ইতিহাসে এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তন ঘটিয়েছে।

মানুষ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও বৈষম্যের শেকল থেকে মুক্তি পেয়েছে। শোষণের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে। মানুষ তার সত্যিকার মর্যাদা পেয়েছে এবং নিজের শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। ব্যক্তি ও সমষ্টির যৌথ প্রচেষ্টায় মানুষ এক বৈজ্ঞানিক সমাজ ব্যবস্থা গোড়াপত্তন করেছে এবং শ্রেণিহীন সমাজ গড়ে তোলার পথে এগিয়ে চলেছে।

অক্টোবর বিপ্লবের সঙ্গে সিনেমার জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই। দুটোই পৃথক ঘটনা।

কিন্তু অক্টোবর বিপ্লব যদি না হতো, সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম যদি না হতো তাহলে সিনেমা চারুকলা (Fine art) হিসাবে আদৌ স্বীকৃতি পেতো কিনা সন্দেহ। শুধু তাই নয়, এই নতুন কলামাধ্যমটির মধ্যে যে এতবড় স্বষ্টিশক্তি লুকিয়ে আছে তাও হয়তো আমরা আবিষ্কার করতে পারতাম না।

কথাটার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে বুর্জোয়া সিনেমার স্বরূপটা একবার দেখা দরকার।

বুর্জোয়া সিনেমার এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা। সিনামার আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া শ্রেণি মানব সভ্যতার এই নতুন আবিষ্কারটিকে অর্থ উপার্জনের এক মোক্ষম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে লাগলো। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানী ও ফ্রান্সের বুর্জোয়া শ্রেণি সিনেমার জন্ম মুহূর্তে তার স্বজনশীল সম্ভাবনার টুটি টিপে দিলো। সস্তা চিত্তবিনোদনকারী হাল্কা যৌন আবেদনময়, উগ্র অপরাধমূলক বিষয়বস্তুগুলোই প্রাধান্য পেলো বুর্জোয়া সিনেমার অঙ্গনে।

এ প্রসঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কীর একটা উক্তি মনে পড়লো।

লুমিয়ার ব্রাদার্স (ফরাসি) প্রযোজিত একটা ছবি দেখতে যান তিনি। সিনেমার সঙ্গে সেই তার প্রথম পরিচয়। সেটা ১৮৯৬ সাল। সিনেমা দেখে পরদিন গোর্কী একটা স্থানীয় সংবাদপত্রে লিখলেন–

Last night I was in the Kingdom of Shadows……………..I was at Aumont’s and swa Lumier’s Cinematograph_moving photography. The extraordinary impression it creates is so unique and complex that I doubt my ability to describe it with all its nuances………………I am convinced that these pictures will soon he replaced by others of a genre more suited to the general tone of the ‘Concert Parisian’. For example, they will show a Picture titled ‘As She undresses’ or ‘Madame at her Bath’ or ‘A woman in Stockings”.

বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় আর্টের সহজ ও স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব নয়। ফিল্ম আর্টের পক্ষে এ উক্তি সবচেয়ে বেশি করে প্রযোজ্য। কারণ চলচ্চিত্র হচ্ছে একদিকে আর্ট অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রি, দুটোই। ছবি বানাতে হলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। যে সমস্ত পুঁজিপতি এতে টাকা খাটান তাঁরা প্রচুর মুনাফা পাবার আশায় টাকা খাটান। দর্জির দোকানে মানুষ যেমন অর্ডার দিয়ে তাদের জামা কাপড় তৈরি করে তেমনি পুঁজিপতিরা অর্ডার দিয়ে তাদের মর্জিমাফিক এবং তাদের শ্রেণি-স্বার্থ রক্ষাকারী ছবি তৈরি করেন। এ ধরনের সমাজ ব্যবস্থায় আর্ট-ছবি কি করে তৈরি হবে?

‘Art is the privilege of the free……………..art is a mode of freedom, and a class society conceives freedom to be absolutely whatever relative freedom the class has attained to’_ Christopher Caudwell.তবু অনেকে হয়তো বলবেন, অক্টোবর বিপ্লবের অনেক আগে, আমেরিকার বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার ভেতরে থেকে ডি ডব্লু গ্রিফীথ কি করে দু-দুটো আর্ট-ফিল্ম (Birth of Nation Ges Intolearance) তৈরি করলেন?

ও দুটো ছবি সত্যিকার আর্ট ফিল্মের মর্যাদা পাবার যোগ্য নয় বলেই আমার ধারণা।

এ সম্পর্কে John Howard Lawson Zvi Film, The Creative Process বইতে কি বলছেন শুনুন।

He [Griffith] felt that the fate of humanity is a factor in history……………He could not believe that humanity would ever control its own destiû. His philosophic views were colored by the vulgari“ation of Darwin’s theories current at the time…………..critics have praised the film’s technical brilliance and have deplored its reactionary treatment of the Negro struggle for freedom. Its advance technique and backward social content are often considered as fixed opposites’ এরজন্যে গ্রিফীথকে দায়ী করা অর্থহীন। বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত স্ববিরোধীতাই এর জন্যে দায়ী।

`In bourgeois art man is conscious of the necessity of outer reality but not of his own, because he is unconscious of the society that makes him what he is. He is only half a man’

_Christopher Caudwell ধনতন্ত্রের দেশ আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক ডি ডব্লু গ্রিফীথের অর্ধেক সত্য, অর্ধেক জীবন, অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক আর্ট তাই পরবর্তীকালে সমাজতন্ত্রের সন্তান, সোভিয়েত পরিচালক সার্জ্জি আইজেনস্টাইন, পুদোভকীন আর ডোভজেঙ্কোর হাতে এসে সম্পূর্ণ সত্য, সম্পূর্ণ জীবন, সম্পূর্ণ মানুষ ও সম্পূর্ণ আর্টের মর্যাদা পেয়েছে।

সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম ও তার ইতিহাস এবং সোভিয়েত সিনেমার জন্ম ও তার ইতিহাস এক ও অভিন্ন।

অক্টোবর বিপ্লবের প্রচণ্ড ঢেউ রাশিয়ার জনসাধারণের মধ্যে এক নতুন চেতনাবোধের জন্ম দিয়েছিলো। পুরাতনকে ভেঙেচুরে নতুনভাবে নতুন দর্শন ও নবলদ্ধ জীবন-বোধের আলোকে নতুন করে দেখার অদম্য বাসনা তখন সমার মনে। সাহিত্য, কবিতা, পেইন্টিং, সংগীত, নাটক এর একটা ট্র্যাডিশন আছে। অতীত আছে। এর কতটুকু গ্রহণ ও কতটুকু বর্জন করা প্রয়োজন এ নিয়ে তখনো দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের অবকাশ রয়েছে। এদিক থেকে চলচ্চিত্র তখনো রাশিয়ানদের কাছে একটা সম্পূর্ণ নতুন মাধ্যম। যার কোন ট্র্যাডিশন কিম্বা দ্বন্দ্বমূলক অতীত নেই এবং যার শক্তি সমাজতন্ত্রের শক্তির মতই অফুরন্ত ও অপরিসীম। তাই সমাজ সচেতন এই নতুন মানুষগুলো সিনেমার প্রতি আকৃষ্ট হলো সবচেয়ে বেশি। এবং সোভিয়েত সিনেমার জন্ম হলো।

`Soviet Cinematography is the offspring of the October Revolution. It was born of the struggle and has drawn its content, beauty and purpose from the latter’s great historical significance. It took Lenin’s behest_Art belongs to the people_as a banner, as a guide to action’_Alexander Doveyhenko.

`The all powerful form of the October Revolution uprooted all of us from the most diverse activities and occupations, swept us away with its mighty stream and combining into one whole everything we had brought with us from various field of knowledge and activity, set us working at a great and collective endeavour_our Cinematography’.আইজেনস্টান ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার, পুদোভকীন ছিলেন কেমিস্ট, ভোডজেঙ্কো ছিলেন স্কুলশিক্ষক, জীগান ছিলেন অভিনেতা, কুলেশভ, কোজিনস্তভ, ইয়াকুতভীচ এঁরা ছিলেন পেইন্টার, আলোকজান্ডারভ ছিলেন একজন সিনেমা অপারেটর আর ভার্তব তখন ডকুমেন্টারি ছবি বানাতেন আর মায়াকোভস্কি ছিলেন একজন খ্যাতনামা কবি। সোভিয়েত সিনেমার জন্ম মুহূর্তে এরাই ছিলেন তার পুরোধা।

সোভিয়েত সিনেমার প্রথম ফসল হচ্ছে সাজ্জি আইজেনস্টাইনের STRIKE (১৯২৪) আদিক, প্রতীকের ব্যবহার এবং উপস্থাপনায় ছবিটি অভিনব। গ্রিফীথের Intolerance ছবিতেও ধর্মঘটের একটা দৃশ্য আছে। সে দৃশ্যটিকে তিনি দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আইজেনস্টইনের STRIKE এ ছবির প্রতিটি চরিত্র এমনকি ছবির দর্শকরাও সংঘাতের সঙ্গে একাত্ম্য হয়ে যান। তবে ছবিটা মাঝে মাঝে একটু থিয়েটার ঘেঁষা হয়ে পড়েছে। আইজেনস্টাইন নিজেই বলেছেন– `Our first film, Strike, floundered about in the flotsam of rank theatricality’.

আইজেনস্টাইনের পরবর্তী ছবি Battleship Potemkin চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। সাহিত্যে যেমন টলস্টয়ের War and peace, কাব্যে যেমন মিল্টনের Paradise lost and paradise Regained, পেইন্টিংয়ে যেমন দা ভিঞ্চির Last Supper তেমনি চলচ্চিত্রে আইজেনষ্টাইনের Battleship Potemkin একটি ক্ল্যাসিক। একটি মহাকাব্য। অন্য মহাকাব্যগুলোর চেয়ে Battleship Potemkin আরো মহৎ, আরো শক্তিশালী। কারণ, অন্য মহাকাব্যগুলোতে নায়ক নিয়তির দাস। নিয়তি তাকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেখানেই যাচ্ছে সে। অসহায় শিশুর মত ঘুরে বেড়াচ্ছে নায়ক। কিন্তু এখানে নায়ক নিয়তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। নিয়তিকে নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিতে চাইছে। এখানে নায়ক হলো জীবন, নায়ক হলো মানুষ। এক নয় অনেক। অসংখ্য মানুষ। নায়ক হলো ইতিহাস।

মাত্র একটি ঘটনা, একটি সংঘাতের মাধ্যমে (সিনেমার ভাষায় যাকে বলা হয় Sequecne) একটি বিরাট ও ব্যাপক বিপ্লবী আন্দোলনকে (১৯০৫ সালের বিপ্লব) তার সমস্ত শক্তি, চেতনা, তাৎপর্য ও বিপর্যয়সহ জীবন্ত ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। অক্টোবর বিপ্লব যেমন সারা দুনিয়ার মেহনতি মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিলো তেমনি Battleship Potemkin পুঁজিবাদী দেশের সৎ ও সচেতন সিনেমা শিল্পীদের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছিলো।

মাত্র একটি ঘটনা, একটি সংঘাতের মাধ্যমে (সিনেমার ভাষায় যাকে বলা হয় Sequecne) একটি বিরাট ও ব্যাপক বিপ্লবী আন্দোলনকে (১৯০৫ সালের বিপ্লব) তার সমস্ত শক্তি, চেতনা, তাৎপর্য ও বিপর্যয়সহ জীবন্ত ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। অক্টোবর বিপ্লব যেমন সারা দুনিয়ার মেহনতি মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিলো তেমনি Battleship Potemkin পুঁজিবাদী দেশের সৎ ও সচেতন সিনেমা শিল্পীদের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছিলো। ১৯৫৮ সালে Brussels এ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে Battleship Potemkin কে The best film of all times and Peoples” এবং আইজেনষ্টাইনকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সোভিয়েত সিনামের ইতিহাসকে তিন অধ্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম অধ্যায় হলো ১৯১৭ থেকে ১৯৩০। দ্বিতীয় অধ্যায় হলো ১৯৩০ থেকে ১৯৪১। তৃতীয় অধ্যায় হলো ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৭। প্রথম অধ্যায়ে যে ক’জন কৃতী পরিচালককে আমরা পাই তারা হচ্ছেন, সার্জি আইজেনষ্টাইন (Battleship Potemkin, October, Strike) ভি পুদোভকীন (Mother, The end of St petersburgh, Descendants of Chingis khan) আলেকজান্ডার ডোভজেঙ্কো (Arsenal, Earth) জীগা ভার্তব (Enthusiasm)। একই মতবাদের অনুসারী হলেও এঁদের প্রত্যেকের কাজের পদ্ধতি ছিলো ভিন্ন। প্রত্যেকেই নিজস্ব এক একটা ধারার সৃষ্টি করে গেছেন। এদের প্রত্যেকটি ধারার প্রভাব আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রে এখনো সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাই। আইজেনষ্টাইন ছিলেন আঙ্গিক প্রধান। পুদোভকীন বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক দুটোর প্রতিই সমান জোর দিয়েছেন। ডোভজেঙ্কো হলেন গীতিধর্মী। আর ভার্তব চূড়ান্ত বাস্তবতায় বিশ্বাসী। এদের প্রত্যেকেই মহৎ চিত্র সৃষ্টি করে গেছেন। জীগা ভার্তবের Enthusiasm সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিখ্যাত চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন বলেছেন– `Never had I known that these mechanical sounds could be arranged to seem so beautiful. I regard it as one of the most exhilarating symphonies I have heard.’ দ্বিতীয় অধ্যায় হলো সমাজতান্ত্রিক গঠনের অধ্যায়। সারাদেশ তখন গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত। দেশের তরুণরা তখন রাশিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, নতুন নতুন কল কারখানা, বাঁধ ও শহর তৈরির কাজে। তাই, প্রথম অধ্যায়ের ছবিগুলোতে যেমন বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিষয়বস্তু সবচেয়ে বেশি তেমনি, দ্বিতীয় অধ্যায়ের ছবিগুলোতে এই গঠনমূলক কাজের বিষয়বস্তুগুলো প্রাধান্য পেলো। এ অধ্যায়ের ছবিগুলোর আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চূড়ান্ত বাস্তবতা। `Counter Plan` `The Road to life`, `Golden Hills’, `Alone’ সেলুলয়েডে ধরে রাখা কয়েকটি বাস্তব জীবন দলিল। সার্জ্জি জেরাসীমভের “We are from Kronsdat”, ভ্যাসিলি ব্রাদার্স এর “Chapayev”, মার্ক ডনস্কয়ের “Gorï trilogy”, ভ্লাদিমির প্যাট্রভের “The storm”, মিখাইল বুমের “The dream”, ইয়ুদি রাজিমেন ও আইওনিফ হাইফিটের “Baltic Deputy”, ছবিগুলোতে বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের সমতা রক্ষা করা হয়েছে অতি সুন্দরভাবে। এতে বাস্তবতার আবেদন আরো বেড়েছে। মাঝে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সোভিয়েত সিনেমা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সোভিয়েত শিল্পী ও কলাকুশলীরা তখন স্টুডিওর চত্বর ছেড়ে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্যে সীমান্তে ছুটে যান। ক্যামেরা ছেড়ে রাইফেল তুলে নেন হাতে। তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম দিকের বছরগুলো হচ্ছে যুদ্ধোত্তর পূনর্গঠনের দিন। ফ্যাসিস্ট বর্বরতার ফলে সোভিয়েত সমজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী অঞ্চল তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের বীভৎসতা প্রতিটি নাগরিকের মনে যুদ্ধের প্রতি ঘৃণার জন্ম দিয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সমাজতন্ত্রের শক্তির প্রতি তাদের প্রত্যয় ও বিশ্বাসকে আরো সুদৃঢ় করেছে। এই পারিপার্শ্বিক ও মানসিক অবস্থার মধ্যে সোভিয়েত সিনেমা নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলো। আর যুদ্ধ নয়। আর ধ্বংস নয়। “Maû artists are today turing to the subject of the last war. That is quite understandable. We cannot forget toe war, just as we can’t stop thinking that the next one will be far more terrible……” Mikhail Romm Soviet film Director. “A war brings people together in irreconcilable conflicts, compels them to consider anwe the meaning of their life, of their relations with others. Their conceptions of the world is shattered rudely……my films are all connected with war to on degree or another.” Igor Talankin Soviet Film Director. যুদ্ধের ধ্বংসলীলা, ফ্যাসিজমের বর্বরতা, সমাজতান্ত্রিক মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্যে শত শত তরুণের জীবন বিসর্জ্জন, যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে বিপর্যয় এবং সেই বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করে নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলা–উপরোক্ত বিষয়বস্তু নিয়ে একের পর এক ছবি তৈরি হতে লাগলো। “The cranes are fliing”, “The house I live in”, A ManÕs Destiû”, “Ballad of a soldier”, “Ivan’s Childhood”, “Story of the flaming years”, “Ordinary Fascism.” প্রত্যেকটি ছবি বিষয়বস্তুর উপস্থাপনায়, সম্পাদনার ব্যঞ্জনায়, ক্যামেরার গীতিধর্মী গতিময়তায়, শিল্পীর নিপুন অভিব্যক্তিতে এবং সিনেমার সর্বাধুনিক কুশলতার প্রয়োগে এক অপূর্ব রসের সৃষ্টি করেছে। যে রস দর্শকের অন্তরের অন্তঃস্থলে এক দীর্ঘস্থায়ী আবেদনের সৃষ্টি করে। যখন দর্শক স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে- “Those remarkable works of the cinema art ÒBallad of a soldierÓ, and ÒThe cranes are flyingÓ— strengthens still more my deep faith on Socialism, in its genuinely inexhaustible possibilities for creativity.” -Dean Reed, Famous American Actor and Singer ‘An amaying film called Òordinary Fascism’ is on at the Urainai Cinema in Viena. A must for every democrat, it is a film that enables us to understand why bombs explode- whether in the centre of viena or in North Vietnam.’ -‘Volksstimme’, Austria, September, ৩, ১৯৬৬ শুধু যে যুদ্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে ছবি তৈরি হচ্ছে না নয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক “(“The two”, ‘The journalist’, ‘I am twenty’, ‘A long and happy life’, ‘Clear skies’, ‘The Communists’) খ্যাতনামা দেশি বিদেশি লেখকের চিরন্তন সাহিত্য কীর্তি। (‘Hamlet’, ‘War and Peace’, ‘The lady with the dog’, ‘Anna Krennina’) প্রভৃতি বিষয় নিয়েও সার্থক ছবি তৈরি হচ্ছে। সোভিয়েত চিত্র পরিচালক গ্রিগরী কোজিনৎস্তব তাঁর Hamlet ছবিতে শেক্সপিয়ারকে নবজন্ম দিয়েছেন। এখানে হ্যামলেট নিপীড়িত মানবাত্মার প্রতীক। এখানে হ্যামলেট চিরন্তন সত্যের প্রতীক। সার্জ্জি বন্দুরাকের War and Peace সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ফরাসি পত্রিকা Le Figaro লিখেছে- ‘Go to see `War and Peace’; it is, of course, one of the most splendid works of art, one of the most thrilling and memorable films ever made.’ (Le Figaro, Nov, 26-27, 1966, Louis Chamvet) সোভিয়েত সিনেমা সম্পর্কে কিছু দর্শক ও সমালোচকের কাছ থেকে অনুযোগ শোনা যায় যে- সোভিয়েত ছায়াছবিগুলো নাকি প্রচারধর্মী হয় এবং এতে বড় বেশি বক্তৃতাবাজী থাকে। বাইরে থেকে দেখতে গেলে তা মনে হওয়া স্বাভাবিক। সোভিয়েত সিনেমাকে বুঝতে হলে, সোভিয়েত সিনেমার রস পরিপূর্ণভাবে আস্বাদন করতে হলে সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থা, সমাজতান্ত্রিক সমাজে মানুষের ধ্যানধারণা, ব্যক্তি ও সমষ্টির সম্পর্ক, সেখানকার মানুষের বিভিন্ন মানসিকতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। উপনেবেশিক, আধাউপনেবেশিক, সামন্ততান্ত্রিক, আধাসামন্ততান্ত্রিক অর্থবা বুর্জোয়া সমাজে বাস করে সমাজতান্ত্রিক সমাজের মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন সম্ভবপর নয়। আমরা ছবি তৈরি করি মুনাফার জন্য। আমরা ছবি দেখি চিত্ত বিনোদনের প্রয়োজনে। সোভিয়েত পরিচালক ছবি বানান জীবনের অন্তরঙ্গ রূপকে সেলুলয়েডে ধরে রাখার অভিপ্রায়ে। সে জীবন James Bond মার্কা “০০৭” নয়। সে জীবন যৌবনা নারীর বিকার নয়- “Darling”, সে জীবন সামাজিক কলুষতায় বিধ্বস্ত নয়- “Apartment”. সে জীবন “সবার উপরে মানুষ সত্য” এই নীতিতে বিশ্বাসী। মানুষের কল্যাণ, মানবজাতির কল্যাণ হচ্ছে এই সদা সচেতন মানুষগুলোর সৃষ্টির লক্ষ্যে- …..‘We tell the world that man is born for happiness and that it is the striving for goodness, justice and creative labour that must triumph in society, not base instincts. We tell the world that man has no right to wrap himself up in a concoon of personal interests and concerns, but must realise his responsibility for everything that happens around him.’ -Lev Kulijanov President of the Union of Film makers of the U.S.S.R. q

 

 

 


যে নৈতিকতা বিপ্লবীদের মেনে চলা উচিত: হো-চি-মিন

পুরনো সমাজকে পাল্টে দিয়ে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিপ্লব সমাধা করা একটি মহান কর্তব্য। কিন্তু এ কর্তব্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এজন্য প্রয়োজন হয় জটিল, দীর্ঘকালীন ও নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের। শক্তি-সমর্থ মানুষেরাই কাঁধে বোঝা নিয়ে দীর্ঘ দুরন্তকে পাড়ি দিতে সক্ষম। একজন বিপ্লবীকে অবশ্যই বিপ্লবী নৈতিকতার ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং তা থেকেই শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। কেবলমাত্র তখনই সে তার গৌরবোজ্জ্বল বিপ্লবী কর্তব্য পূরণে সক্ষম হবে। আমাদের অবশ্যই নিজেদের বদলাতে হবে পুরনো সমাজের মধ্যেই আমরা বেড়ে উঠেছি। উত্তরাধিকার সূত্রে পুরনো সমাজ থেকে আমরা যা পেয়েছি তার ভেতর সবচাইতে বিরূপ ও বিপজ্জনক হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। বিপ্লবী নৈতিক মূল্যবোধের নিরিখে ব্যক্তিস্বান্ত্র্যবাদ হলো অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি প্রবণতা। এই ‘বাদ’ যদি চলতেই থাকে, এমনকি যদি খুব সামান্য পরিমাণেও চলতে থাকে, তবে তা সামান্যতম খোঁচানি পেলেই বেড়ে উঠতে পারে, বিপ্লবীর নৈতিক গুণাবলিকে দমিয়ে দিতে পারে এবং বিপ্লবের জন্য পরিপূর্ণভাবে আত্ম-নিয়োগের প্রয়াস থেকে বিপ্লবীকে বিরত রাখতে পারে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ নিজেই বেশ অনিষ্টকারী এবং তা কপটতাকেও প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। অতীতের জের সমূলে উৎপাটিত করতে হলে এবং প্রকৃত বিপ্লবীর নৈতিক গুণাবলি আত্মস্থ করতে হলে প্রয়োজন অনুশীলনের, নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তোলার ও নিজেদেরকে বদলে ফেলার, যা আমাদের অক্লান্তভাবে এগিয়ে চলতে যোগ্য করে তুলবে। কেউ যদি অগ্রসর হতে না চায় তবে সে অনিবার্যভাবেই পিছিয়ে পড়বে। বিপ্লবীর নৈতিক গুণাবলি দিয়ে কেউ যদি নিজেকে মণ্ডিত করে তোলে, তবে সে সন্ত্রস্ত হবে না, ধৈর্য হারাবে না, অথবা অসুবিধা কিংবা পরাজয়ের মুখেও পিছু হটবে না। পার্টি, বিপ্লব ও শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থে, জাতি ও সমগ্র মানবজাতির সাধারণ স্বার্থে সে বিনা দ্বিধায় তার ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিলিয়ে দেবে এবং যদি প্রয়োজন পড়ে তবে দ্বিধাহীন চিত্তে ও কোনো প্রকার আক্ষেপ ছাড়াই সে তার প্রাণ বিসর্জন দেবে। একজন বিপ্লবীর নৈতিক গুণাবলির ক্ষেত্রে এটাই হলো সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ। বিপ্লবীর নৈতিক গুণাবলি যার আছে, সে অবশ্যই হবে খোলা মনের মানুষ এবং সাফল্যের মধ্যে কিংবা অনুকূল পরিস্থিতিতেও বিনয়ী। “অন্য সকলের আগে উদ্বিগ্ন হও, অন্য সকলের পরে আনন্দ করো”- বাহাবা পাওয়ার জন্য উদগ্রীব না হয়ে নিজের নিজের কর্তব্যকে কত ভালোভাবে পূরণ করা যায়, তা নিয়েই ভাবনা-চিন্তা করতে হবে। আত্ম-অহমিকা কিংবা আমলাতান্ত্রিকতা দুটোকেই দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। চাল্চুল্ দেখান বা যেকোনো প্রকার নীতিভ্রষ্টতার অবশ্যই ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। বিপ্লবী নৈতিকতার অথবা নীতিবোধের এগুলি যোগ্য অভিব্যক্তি। বিপ্লবের তিনটি শত্রু একজন বিপ্লবী সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের জন্য, শ্রমিক শ্রেণি ও সকল শ্রমজীবী জনতার জন্য সংগ্রামে এমন কোনো প্রচেষ্টা নেই যা সে করবে না। বিপ্লবী নৈতিকতার অর্থ- পার্টি ও জনগণের প্রতি চূড়ান্ত বিশ্বস্ততা। সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম হলো একটি সুদীর্ঘকালীন ও কষ্টদায়ক প্রক্রিয়া। আর এজন্যই প্রয়োজন খাঁটি বিপ্লবের। কেননা, বিপ্লবের শত্রু রয়েছে। বিপ্লবের আছে তিন শত্রু। পুঁজিবাদ-সামাজ্যবাদ খুবই বিপজ্জনক ও অনিষ্টকারী শত্রু। এই হলো প্রথম শত্রু। পশ্চাদপদ রীতিনীতি ও পরম্পরাগত প্রথাগুলি হলো দ্বিতীয় শত্রু। কেননা এরা হলো বিপ্লবের পথে লুক্কায়িত বাধা। এদেরকে মোটেই অবহেলা করা চলে না। এদেরকে বেশ অধ্যবসায়ের সাথেই নির্মূল করতে হবে। যদিও এতে সময় লাগবে। তৃতীয় শত্রু হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, এটি পেটি-বুর্জোয়া ভাবাদর্শ, যা আমাদের সবার ভেতরই এখনও শিকড় গেড়ে আছে। মাথাচাড়া দিয়ে উঠবার জন্য এটি ওঁত পেতে বসে থাকে। প্রথম দুই শত্রুর জন্য এটি হলো পরম মিত্র। সুুতরাং বিপ্লবী নৈতিকতা দাবি করে সকল শত্রুর বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রাম, নিরবচ্ছিন্ন সতর্কতা, সংগ্রামের জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি এবং কোনো অবস্থাতেই শত্রুর কাছে মস্তক অবনত না করা। এভাবেই কেবল শত্রুকে পরাজিত করা যায় এবং বিপ্লবী কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকা যায় । কথায় ও কাজে ঐক্য পার্টি সদস্যের বক্তব্য ও কাজের মধ্যে যদি ঐক্য না থাকে, তবে সংগঠন একটি বিশৃঙ্খলায় পরিণত হবে। যেখানে যে যার খুশিমত চলছে, ফিরছে, করছে- ব্যাপারটা যদি এরকম হয়, তাহলে জনতাকে নেতৃত্বদান এবং বিপ্লব সমাধা করা একেবারেই অসম্ভব। জনগণের স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখেই পার্টি তার নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণ করে থাকে। সুতরাং বিপ্লবী নৈতিকতা দাবি করে : দ্বিধাহীনভাবে পার্টি নীতি অনুসরণ এবং পার্টি নির্দেশগুলি মেনে চলা অবস্থা যত কঠিনই হোক না কেন, এটা করতেই হবে এবং এভাবেই জনগণের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জনগণের প্রেরণা যোগাবে। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদকে অবশ্যই দমন করতে হবে এবং দৃঢ়তার সঙ্গে মূলোৎপাটন করতে হবে বিপ্লবীদের। আমাদের পার্টি শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমজীবী জনতার সাধারণ স্বার্থ ফুটিয়ে তোলে। কেননা, কোনো ব্যক্তি বিশেষ কিংবা গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থ দেখা পার্টির কাজ নয়, এটাতো সর্বজনবিদিত। শুধু নিজেদের মুক্তির জন্যই নয়, নিপীড়ন ও শোষণের হাত থেকে গোটা মানবজাতির মুক্তির জন্যই শ্রমিকশ্রেণি লড়াই করছে। এজন্যই সমগ্র জনগণের স্বার্থের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ মিলে যায়। পার্টির নামে কাজ করে একজন সভ্য শ্রমিক শ্রেণি ও সকল শ্রমজীবী জনতার জন্য কাজ করে থাকে। এবং এ কারণেই একজন পার্টি সভ্যের স্বার্থ অবশ্যই হবে গোটা পার্টি ও শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের অনুকূল, প্রতিকূল নয়। পার্টি ও শ্রমিক শ্রেণির প্রতিটি বিজয় হল প্রতিটি সভ্যেরই বিজয়। একজন লোক যতই গুণাবলি সম্পন্ন হোক না-কেন, পার্টি ও শ্রমিকশ্রেণি থেকে নিজেকে পৃথক করে রেখে, নিজের একক শক্তি দিয়ে সে কিছুই করতে পারবে না। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ফলাফল সকল অবস্থাতেই পাটি সভ্য নিজের চাইতে পার্টির স্বার্থকে উচ্চ স্থান দেবে- বিপ্লবী নৈতিকতার এটাই দাবি। পার্টির সামগ্রিক স্বার্থের সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত সভ্যের স্বার্থের যদি বিরোধ হয়, তবে পার্টির স্বার্থই বলবৎ থাকবে। ভিয়েতনামের পার্টি আত্মগোপনে ছিল এবং প্রতিরোধের যুদ্ধকালে অনেক কমরেড বীরত্বের সঙ্গে জীবনদান করেন। কিন্তু ওইসব সৈনিক ‘উচ্চপদ’ কিংবা ‘সম্মানের’ দাবি করেনি অথবা পার্টির কাছ থেকে তারা কোনো প্রকার ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রত্যাশা করেনি। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে জয় করতে পারেনি এমন সভ্য আমাদের পার্টিতে এখনও আছে। তারা দাবি করে যে তাদেরকে কাজের জন্য ‘মূল্য’ দেয়া হোক। তারা পার্টির দেয়া ধন্যবাদের জন্য অপেক্ষা করে। তারা দাবি করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, উচ্চপদ ও সম্মান। তাদের দাবি যদি পূরণ না হয় তাহলে তারা এই বলে পার্টিকে গালমন্দ দেয় যে- ‘পার্টি তাদেরকে ঠিক ঠিক উন্নতি লাভের সুযোগ দিলো না.. পার্টি তাদের স্বার্থকে একবারেই উপেক্ষা করলো’। ক্রমে ক্রমে এরা পার্টি থেকে দূরে সরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত পার্টি-নীতি ও পার্টি শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে চলে যায়। তারা অন্যের সমালোচনা করে কিন্তু নিজেরা সমালোচিত হতে চায় না। তারা আত্মসমালোচনায় পরান্মুখ, অথবা কিছুটা করে বাত্-কি-বাত্ হিসেবে। তাদের আশঙ্কা হলো এই যে, আত্মসমালোচনার পরে তারা সম্মান ও কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলবে। তারা জনগণের মতামতের প্রতি কর্ণপাত করে না। তারা বুঝতে চায় না যে, ভুল থেকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভুলের জন্য আমরা আতঙ্কিত বোধ করি না, কিন্তু সবার জন্য আতঙ্কের কারণ হবে এটাই -ভুল করবার পরে সেটা শুধরে নেয়ার জন্য আমরা যদি সিদ্ধান্তগ্রহণ না করি। ব্যক্তি সমষ্টি এবং সমাজ ব্যক্তিস্বান্ত্র্যবাদ মোকাবিলা করাকে ‘ব্যক্তি-স্বার্থকে পদদলিত’ করার সাথে এক করে দেখাটা ভুল হবে। প্রত্যেক ব্যক্তির তার নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে, আছে চমৎকার গুণাবলি। আছে তার নিজস্ব ও পারিবারিক জীবন। ব্যক্তিস্বার্থ যদি সমষ্টির স্বার্থে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়, তাহলে ব্যক্তিস্বার্থে মন্দ কিছু নেই। সমাজতন্ত্রই প্রতিটি মানুষকে তার ব্যক্তিজীবনের অবস্থাকে উন্নত করে তোলে এবং ব্যক্তিচরিত্র ও ব্যক্তির গুণাবলিকে বিকশিত করে তুলতে সক্ষম। বিপ্লবী নৈতিকতা আকাশ থেকে পড়ে না। দৈনন্দিন কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিপ্লবী নৈতিকতা বিকশিত হয় ও শক্তি সঞ্চয় করে। হীরক খণ্ডের মত যত সময় ধরে একে ঘষামাজা করা যাবে ততই এটা উজ্জল থেকে উজ্জলতর আলোক দান করবে। এটা সোনার মত। যতই আগুনে পোড় খাবে ততই এটা খাঁটি থেকে অধিকতর খাঁটি হবে। মানবজাতির দাসত্ব মোচনে যথাযোগ্য অবদান রাখতে একজন প্রকৃত বিপ্লবীর নৈতিক গুণাবলি নিজের মধ্যে পরিপুষ্ট করে তোলার কর্মদক্ষতার চাইতে অধিকতর উত্তম আর কিছু নেই।

সূত্রঃ http://weeklyekota.net/?page=details&serial=9359&fbclid=IwAR1T-ME0PWYg2aP9LfTYlK1OZnKXZICTDToZ_6xeWHaLReHi_7WF6VtbFJY


শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির পার্টিঃ জোসেফ স্তালিন

শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির পার্টি

– জোসেফ স্তালিন


(পার্টির নিয়মাবলির প্রথম অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে)

‘রাশিয়া এক এবং অবিভাজ্য’ যখন লোকে জোর গলায় এ কথা বলতো সেদিন চলে গেছে। আজ একটি শিশুও জানে এক এবং অবিভাজ্য রাশিয়া বলে কিছু নেই, অনেক আগেই রাশিয়া ভাগ হয়ে গেছে- বুজোয়া ও শ্রমিক এই দুটি বিরোধী শ্রেণিতে। আজ আর এ কথাটি গোপন নেই যে, এই দুটি শ্রেণির সংঘর্ষকে কেন্দ্র করেই আমাদের বর্তমান জীবন অতিবাহিত হচ্ছে।

অবশ্য কিছুদিন আমাদের এসব লক্ষ্য করা কঠিন ছিল- কারণ সেদিন পর্যন্ত শুধু আলাদা আলাদা গোষ্ঠীগুলোই সংগ্রামের ময়দানে দেখতে পেয়েছি; কেননা বিভিন্ন শহর ও দেশের বিভিন্ন অংশে শুধু আলাদা আলাদা গোষ্ঠীগুলোই সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে এবং বুর্জোয়া ও শ্রমিকরা শ্রেণি হিসাবে সহজে স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ত না। কিন্তু এখন শহর ও জেলা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, শ্রমিক শ্রেণির বিভিন্ন গোষ্ঠী হাতে হাত মিলিয়েছে, যুক্ত ধর্মঘট ও বিভোক্ষে ফেটে পড়েছে, আর আমাদের সামনে ভেসে উঠেছে বুর্জোয়া রাশিয়া ও শ্রমিক রাশিয়া এ দুইয়ের সংঘাতের অপরূপ দৃশ্যটি। দুইটি বিপুল সেনাবাহিনী- শ্রমিক শ্রেণির বাহিনী ও বুর্জোয়া শ্রেণির বাহিনী- আজ সংগ্রামের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে এবং দুই বাহিনীর সংগ্রাম আমাদের সমগ্র সমাজ জীবনকে ছেয়ে ফেলেছে।

একটা সেনাবাহিনী যেমন নায়কবিহীনভাবে চলতে পারে না, প্রতিটি সেনাবাহিনীর যেমন একটি অগ্রবাহিনী থাকে যারা আগে এগিয়ে পথকে আলোময় করে রাখে, তেমনি এটাও স্পষ্ট যে, এই দুইটি সেনাবাহিনীরও দরকার নিজ নিজ উপযুক্ত নেতৃগোষ্ঠী; সাধারণভাবে যাকে বলা হয় পার্টি।

তাহলে ছবিটা দাঁড়াচ্ছে এই রকম: একদিকে লিবারেল পার্টির নেতৃত্বে বুর্জোয়া শ্রেণির বাহিনী; অন্যদিকে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণির বাহিনী; প্রত্যেকটি বাহিনীর তাদের পরিচালিত শ্রেণি সংগ্রামে নিজ নিজ পার্টির নেতৃত্বে চলছে।

এসবের উল্লেখ আমরা করছি শ্রমিক শ্রেণির পার্টিকে শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে তুলনা করার এবং এভাবে পার্টির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে সামনে তুলে ধরার জন্যে।

উপরে এই বক্তব্য থেকে এ কথা যথেষ্ট পরিষ্কার হয়ে উঠে যে নেতাদের সংগ্রামী গোষ্ঠী হিসাবে শ্রমিক শ্রেণির পার্টি, প্রথমতঃ সভ্য সংখ্যার দিক থেকে শ্রমিক শ্রেণির তুলনায় অবশ্যই অনেক ছোট হবে। দ্বিতীয়তঃ উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে শ্রমিক শ্রেণির পার্টি শ্রমিক শ্রেণি থেকে শ্রেয় হবেই, আর তৃতীয়তঃ পার্টি হবে একটি সুসংবদ্ধ সংগঠন।

যা বলা হল, আমাদের মতে তার প্রমাণের কোন দরকার পড়ে না। কারণ যতক্ষণ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকবে আর তার অনিবার্য অনুসঙ্গ হিসাবে জনগণের দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতা বহাল থাকবে ততদিন শ্রমিক শ্রেণি সামগ্রিকভাবে শ্রেণি চেতনার বাঞ্ছিত স্তরে উন্নীত হতে পারে না। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণির বাহিনীকে সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্দীপ্ত করে তোলার জন্যে, তাকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলার সংগ্রামে নেতৃত্বদানের জন্যে তার একদল শ্রেণি সচেতন নেতা থাকবেনই। এটাও পরিষ্কার, যে পার্টি সংগ্রামী শ্রমিক শ্রেণিকে নেতৃত্বদানের পথ গ্রহণ করছে, তাকে আকস্মিকভাবে গড়ে ওঠা কতকগুলো ব্যক্তির সমষ্টিমাত্র হলে চলবে না; তাকে হতে হবে সুসংহত এবং কেন্দ্রীভূত একটা সংগঠন যাতে একটি মাত্র পরিকল্পনা অনুসারে তার কার্যকলাপ পরিচালনা করতে পারে।

সংক্ষেপে গুলোই হল আমাদের পার্টির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। 
এসব কথা মনে রেখে এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক; কাকে আমরা পার্টিসভ্য আখ্যা দেব? বর্তমান প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় পার্টির নিয়মাবলির প্রথম অনুচ্ছেদে ঠিক এই প্রশ্নটি নিয়েই আলোচনা করা হবে। 
অতএব এই প্রশ্নটি বিচার করা যাক।

রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির সভ্য বলতে পারি অর্থাৎ একজন পার্টি সভ্যের কর্তব্য কি কি?

আমাদের পার্টি হল একটা সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি। তার অর্থ হল তার একটা নিজস্ব কর্মসূচি (আন্দোলনের আশু এবং চরম লক্ষ্য) রয়েছে, নিজস্ব রণকৌশল (সংগ্রামের কায়দা) রয়েছে এবং নিজস্ব সাংগঠনিক নীতি (সংগঠনের রূপ) রয়েছে। কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই আমাদের পার্টি গড়ে উঠেছে। এই ধ্যানধারণার ঐক্যই আমাদের পার্টিসভ্যদের একটি কেন্দ্রীভূত পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। ধ্যানধারণার এই ঐক্য যদি চুরমার হয়ে যায়, পার্টিও চুরমান হয়ে যায়। সুতরাং যিনি পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল, সংগঠনগত রীতিকে পুরোপুরি মেনে নেবেন তাকেই পার্টিসভ্য বলা চলবে। আমাদের পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণাকে যিনি ভালভাবে অধ্যায়ন করেছেন এবং পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন তিনিই পার্টিসভ্যের একজন এবং এভাবে শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর নেতাদের একজন হতে পারেন।

কিন্তু শুধু পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণা গ্রহণ করাই কি একজন পার্টিসভ্যের পক্ষে যথেষ্ট? এরকম একজন লোককে কি শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর একজন যথার্থ নেতা বলে গণ্য করা চলে? নিশ্চয়ই না! প্রথমতঃ সকলেই জানেন যে, দুনিয়ার এমন অনেক বাক্যবাগীশ আছে যারা পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণা বিনা প্রতিবাদেই ‘মেনে নেবে’- অথচ যাদের গলাবাজি ছাড়া আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই। এরকম একজন বাক্যবাগীশকে পার্টির সভ্য পার্টির (অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর একজন নেতা) আখ্যা দেওয়ার অর্থ পার্টিকে নষ্ট করে দেওয়া। তাছাড়া আমাদের পার্টি একটা দার্শনিক সম্প্রদায় অথবা ধর্মীয় গোষ্ঠীও নয়। আমাদের পার্টি কি একটা সংগ্রামী পার্টি নয়? আর সে জন্যই কি এটা স্বতঃসিদ্ধ নয় যে এর কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণার নিরাসক্ত স্বীকৃতিতেই আমাদের পার্টি সন্তুষ্ট থাকতে পারে, পার্টি সভ্যরা যা স্বীকার করে নিয়েছেন তা তারা বাস্তবে প্রয়োগও করবেন, পার্টি নিঃসন্দেহে এই দাবিও আমাদের কাছে করবে। সুতরাং যিনিই আমাদের পার্টি সভ্য হতে ইচ্ছুক তিনি শুধু পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণা গ্রহণ করে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না, সেগুলো বাস্তব প্রয়োগ, কার্যক্ষেত্রে সেগুলোকে ব্যবহারও তাকে করতেই হবে।

কিন্তু একজন পার্টি সভ্যের পক্ষে পার্টির ধ্যানধারণার বাস্তব প্রয়োগ বলতে কী বোঝায়? কখন তিনি এইসব ধ্যানধারণা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারবেন? শুধু তখনই যখন তিনি লড়াই করবেন, যখন তিনি সমগ্র পার্টিকে নিয়ে শ্রমিক শ্রেণির সেনাবাহিনীর সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলবেন। সংগ্রাম কি কখনও একক, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে চালানো সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়, বরং ঠিক উল্টো- জনগণ প্রথমে ঐক্যবদ্ধ হন, সংগঠিত হন তারপর তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তা যদি না করা হয়, সমস্ত সংগ্রামই হয় নিষ্ফল। তাহলে এটা পরিষ্কার যে, পার্টি সভ্যরা যদি একটা সুসংবদ্ধ সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ হন একমাত্র তখনই তারা সংগ্রাম করতে পারবেন এবং তার ফলে পার্টির ধ্যানধারণা বাস্তবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবেন। এটাও পরিষ্কার যে পার্টি সভ্যেরা যে সংগঠনে সংঘবদ্ধ হবেন তা যত সুসংবদ্ধ হবে, তারা তত ভাল লড়াই করতে পারবেন, পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণাকে তত বেশি পূর্ণতরভাবে তারা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারবেন। আমাদের পার্টি কতকগুলো ব্যক্তিমাত্রেরই সমষ্টি, আমাদের পার্টি হল নেতাদের সংগঠন- একথা অকারণে বলা হয় না। এবং যেহেতু পার্টি হল নেতাদের সংগঠন, সেহেতু এটা স্পষ্ট যে একমাত্র তাদেরই এই পার্টির ও সংগঠনের সভ্য বলে গণ্য করা চলে। যারা এই সংগঠনে কাজ করেন এবং স্বভাবতঃই পার্টির ইচ্ছার সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে মিলিয়ে দেওয়াকে এবং পার্টির সঙ্গে একাত্বভাবে কাজ করাকে তাদের কর্তব্য বলে মনে করেন।

সুতরাং একজন পার্টিসভ্য হতে হলে পার্টির কর্মসূচি, রণকৌশল ও সংগঠনগত ধ্যানধারণার বাস্তব প্রয়োগ করতে হবে; আর তা প্রয়োগ করতে গেলে তার জন্য লড়াই করতে হবে; এইসব মতামতের জন্যে লড়াই করতে হলে একটা পার্টি সংগঠনের মধ্য থেকে এবং পার্টির সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করতে থাকতেই হবে। একমাত্র যখন আমরা একটানা একটা পার্টি সংগঠনে যোগ দেই এবং এইভাবে আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ পার্টিস্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে দিই- শুধু তখনই আমরা পার্টিসভ্য হতে পারি আর তার ফলে শ্রমিক শ্রেণির বাহিনীর প্রকৃত নেতা হয়ে উঠতে পারি।

যদি আমাদের পার্টি জনাকয়েক বাক্যবাগীশের একটা সমষ্টিমাত্র না হয়, এটা যদি নেতাদের এমন একটি সংগঠন হয় যা কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণির বাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে উপরে লিখিত প্রতিটি কথাই স্বতঃসিদ্ধ হবে।

নিচের কথাগুলো লক্ষ্য করতে হবে। 
এযাবৎকাল আমাদের পার্টির ধরন-ধারণ ছিল অতিথিপরায়ণ কর্তা-শাষিত একটা পরিবারের মতো- সকল দরদীর জন্যই সেখানে ঠাঁই ছিল। কিন্তু এখন পার্টি হয়েছে একটা কেন্দ্রীভূত সংগঠন। গোষ্ঠী কর্তার শাসনের দিকটা খসে গিয়ে সব দিক থেকে তা হয়ে উঠেছে একটা দুর্গের মতো, যার দরজা একমাত্র যোগ্য ব্যক্তিদের জন্যই খোলা হয়। এটা আমাদের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বৈরতন্ত্র যখন শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণি চেতনাকে ‘ট্রেড ইউনিয়নবাদ’, জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা প্রভৃতির মাধ্যমে কলূষিত করার চেষ্টা করছে, আবার অন্যদিক থেকে উদারনীতিবাগীশ বুদ্ধিজীবীর দল ক্রমাগত চেষ্টা করে চলেছে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যতাকে বিনষ্ট করতে এবং নিজেদের মাতব্বরি শ্রমিক শ্রেণির ওপর চাপিয়ে দিতে- তখন আমাদের খুব সতর্ক হতে হবে এবং আমাদের ভুলবে চলবে না যে আমাদের পার্টি হল একটি দুর্গ; এই দুর্গের দরজা খোলা হবে কেবল তাদেরই জন্য যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এসেছেন।

পার্টির সভ্যদের দুটি আবশ্যিক শর্ত আমরা নির্ধারণ করেছি (পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ এবং পার্টির একটি সংগঠনে থেকে কাজ করা)। এর সঙ্গে যদি তৃতীয় একটি শর্ত আমরা যুক্ত করি যে- একজন পার্টিসভ্যকে পাটিকে অর্থসাহায্য করতেই হবে- তাহলে পার্টিসভ্য আখ্যা লাভের প্রয়োজনীয় সমস্ত শর্তই আমরা পেয়ে যাব।

সুতরাং রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির সভ্য তিনিই হবেন যিনি এই পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ করেন, পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দেন এবং পার্টির কোন একটা সংগঠনে কাজ করেন।

এইভাবেই কমরেড লেনিন তাঁর রচিত পার্টির নিয়মাবলির খসড়ার প্রথম অনুচ্ছেদটি প্রস্তুত করেছিলেন।

আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন পার্টি একটি কেন্দ্রীভূত সংগঠন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির একটি সমষ্টিমাত্র নয়- এই ধারণা থেকেই এই সূত্রটির সম্পূর্ণ উদ্ভব ঘটেছে।

এখানেই আছে সূত্রটির সর্বময় শ্রেষ্ঠত্ব।

কিন্তু দেখা গেছে, কিছু কিছু কমরেড লেনিনের এই সূত্রকে ‘সঙ্কীর্ণ’ এবং ‘অসুবিধাজনক’ বলে বাতিল করে দেন এবং তাদের নিজস্ব একটি সূত্র এনে হাজির করেন যা নাকি ‘সঙ্কীর্ণ’ ও ‘অসুবিধাজনক’ নয়। আমরা মার্তভের সূত্রের কথাই বলছি এবং তা-ই এখন আমরা বিশ্লেষণ করব। 
মার্তভের সূত্র হল- ‘রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির সভ্য হলেন তিনি যিনি তার কর্মসূচিটি গ্রহণ করেন, পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দেন এবং তার কোন সংগঠনের নির্দেশ তাকে নিয়মিত ব্যক্তিগত সাহায্য করেন।’ আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এই সূত্রটি পার্টি সভ্যপদের তৃতীয় আবশ্যিক শর্ত- পার্টি সংগঠনগুলির কোন একটিতে পার্টি সভ্যদের কাজ করার কর্তব্যের কথাটি বাদ দিয়েছেন। মনে হয় মার্তভ সুস্পষ্ট ও আবশ্যিক শর্তটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন এবং তার সূত্রে তিনি একটিও জায়গায় অস্পষ্ট, ভাসাভাসা ‘কোন সংগঠনের নির্দেশ অনুসারে ব্যক্তিগত সাহায্য’ কথাটি এনে উপস্থিত করেছেন। এ থেকে দেখা যাচ্ছে কোনও পার্টি সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত না হয়েও (নিশ্চয়ই বলা যায় একটা চমৎকার পার্টিই বটে!) এবং পার্টির ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করার বাধ্য বাধকতা না রেখেও (নিশ্চয়ই বলা যায় চমৎকার পার্টি শৃঙ্খলা বটে!)- যে কেউ পার্টির সভ্য হতে পারবেন। বেশ তো, পার্টিইবা কি করে নিয়মিত নির্দেশ দেবে সেইসব লোকদের যারা পার্টির কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নেই এবং ফলে পার্টি শৃঙ্খলার কাছে আদৌ কোন বাধ্যবধকতাও যাদের নেই।

এই প্রশ্নে মার্তভ রচিত পার্টির নিয়মাবলির খসড়া প্রথম অনুচ্ছেদ সম্পর্কিত সূত্রটি ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু সূত্রটিতে এই প্রশ্নটির সুদক্ষ জবাব দেওয়া হয়েছে। কারণ তাতে পার্টিসভ্য পদের তৃতীয় ও আবশ্যিক শর্ত হিসাবে পার্টি সংগঠনের মধ্যে থেকে কাজ করার কথা সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে।

আমাদের যেটা করতে হবে তা হল মার্তভের সূত্র থেকে অস্পষ্ট ও অর্থহীন ‘একটি পার্টি সংগঠনের নির্দেশ অনুসারে নিয়মিত ব্যক্তিদের সাহায্যের’ কথাগুলি বাতিল করে দেওয়া। এই শর্তটি বাদ দিয়ে মার্তভের সূত্রে দু’টি মাত্র শর্তই অবশিষ্ট থাকে (কর্মসূচিকে গ্রহণ করা এবং আর্থিক সাহায্য করা) যা নিছক শর্ত হিসাবে নিতান্তই মূল্যহীন; কারণ যে কোন বাক্যবাগীশ লোকই পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ করে নিতে পারে এবং পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দিতে পারে; কিন্তু এসবের দ্বারা পার্টি সভ্যপদের সামান্যতম যোগ্যতাও তার অর্জিত হয় না।
বলতেই হয় সূত্রটা খুবই সুবিধাজনক!

আমরা বলি সাচ্চা পার্টিসভ্যর পার্টির কর্মসূচিকে শুধু মেনে নিয়েই নিশ্চিত হতে পারে না, যে কর্মসূচি তাঁরা গ্রহণ করলেন সেটা বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগের চেষ্টা নিশ্চয়ই তাঁরা করবেন। মার্তভ জবাবে বলছেন: তোমরা ভীষণ কড়া; পার্টিকে আর্থিক সাহায্য করতে রাজি হলে পার্টির গৃহীত কর্মসূচির বাস্তব প্রয়োগ করাটা জরুরি কিছু নয়- ইত্যাদি। দেখে-শুনে মনে হয় মার্তভের কিছু বাক্যবাগীশ ‘সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের’ জন্য দুঃখের অন্ত নেই। আর তাই তিনি পার্টির দ্বার তাদের জন্য বন্ধ করে দিতে চান না।

আমরা আরও বলছি- কর্মসূচিকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হলে লড়াই করতে হবে এবং সংহতি ছাড়া লড়াই করা যেহেতু অসম্ভব তাই একজন সম্ভাব্য পার্টিসভ্যকে পার্টির কোন একটা সংগঠনে যোগ দিতেই হবে, পার্টির ইচ্ছার সঙ্গে নিজের ইচ্ছাকে মিলিয়ে দিতে হবে, শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামী বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে হবে অর্থাৎ তাকে একটা কেন্দ্রীভূত পার্টির সুসংগঠিত বাহিনীর মধ্যে স্থান করে নিতে হবে। মার্তব এর উত্তরে বলছেন, সভ্যদের সুসংহত বাহিনীতে সংগঠিত হবার খুব একটা কিছু প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই সংগঠনে সংঘবদ্ধ হবার; একক লড়াই-ই যথেষ্ট।

আমাদের প্রশ্ন হল আমাদের পার্টিটা তাহলে কি? কতকগুলো ব্যক্তির একটা আকস্মিক জনতা, না নেতাদের সুসংহত সংগঠন? আর যদি এটা নেতাদেরই সংগঠন হয় তাহলে যে এর অন্তর্ভুক্ত নয়, এবং যার ফলে এর শৃঙ্খলা মেনে চলার কোন বাধ্যবাধকতাও যার নেই এমন লোককে এর সভ্য বলা চলে? মার্তভ জবাবে বলছেন, পার্টি কোন সংগঠন নয়, বরং পার্টি হল একটা অসংগঠিত সংগঠন (চমৎকার কেন্দ্রানুগত্য সন্দেহ নেই!)। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, মার্তভের মতে পার্টি কোন কেন্দ্রীভূত সংগঠন নয়, পার্টির কর্মসূচি ইত্যাদি মেনে নিয়েছেন এমন ‘সোশ্যাল ডেমোক্রাট ব্যক্তিবিশেষদের এবং আঞ্চলিক সংগঠনসমূহের তা একটা সমষ্টিমাত্র। কিন্তু আমাদের পার্টি একটা কেন্দ্রীভূত সংগঠন না হলে- তা একটা দুর্গ হতে পারবে না- যে দুর্গের দুয়ার শুধু পরীক্ষিতদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

বাস্তবিকপক্ষে মার্তভের সূত্র থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তাঁর কাছে পার্টি একটা দুর্গ নয়- বরং একটা ভোজসভা বিশেষ- যাতে প্রতিটি সমর্থকেরই প্রবেশাধিকার রয়েছে। খানিকটা জ্ঞান, খানিকটা সহানুভূতি, খানিকটা আর্থিক সাহায্য- তাহলেই হল আপনি পার্টিসভ্য বলে গণ্য হবার সম্পূর্ণ অধিকার পেয়ে গেলেন। আতঙ্কিত ‘পার্টিসভ্যদের’ উৎসাহ যোগানোর জন্য মার্তভ চেঁচিয়ে বললেন- শুনবেন না, কানে নেবেন না, সেই লোকেদের কথা যারা বলে, পার্টিসভ্যকে একটা পার্টি সংগঠনে থাকতেই হবে এবং পার্টির ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাকে বিলিয়ে দিতে হবে। তিনি বললেন, প্রথমত: এমন শর্ত একজন মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়াই কঠিন, পার্টির ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছা বিলিয়ে দেওয়া তামাশা নয়! আর দ্বিতীয়ত: আমার ব্যাখ্যায় আমি এর আগেই দেখিয়ে দিয়েছি- ঐ লোকগুলোর মতামত নিতান্তই ভ্রান্ত। কাজেই ভদ্রমহোদয়গণ- এই ভোজসভায়….. আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

দেখে মনে হচ্ছে মার্তভ পার্টির ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাকে বিলিয়ে দিতে ঘৃণা বোধ করেন এমন কিছু অধ্যাপক এবং হাই স্কুলের ছাত্রদের জন্য উদ্বেগে আকুল হয়ে উঠেছেন, আর তারই জন্য আমাদের পার্টির দুর্গপ্রকারে ফাটল সৃষ্টি করে এইসব সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকদের চোরাগোপ্তা পথে পার্টিতে ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন। সুবিধাবাদকে দরজা খুলে দিচ্ছেন তিনি- আর সেটা করছেন এমন একটা সময়ে যখন শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রেণিসচেতনতার হাজার হাজার শত্রু আক্রমণ হেনে চলেছে!

কিন্তু এইটেই আসল কথা নয়। আসল কথা হল, মার্তভের এই সন্দেহজনক সূত্রটি পার্টির অভ্যন্তরেই অন্য দিকে থেকে সুবিধাবাদের উদ্ভব ঘটাতে সাহায্য করে।

আমরা জানি মার্তভের সূত্রে শুধু কর্মসূচি গ্রহণের কথাই আছে; রণকৌশল ও সংগঠনের ব্যাপারে একটি কথাও নেই। কিন্তু পার্টির পক্ষে সাংগঠনিক ও রণকৌশলগত ধ্যানধারণার দিক থেকে ঐক্য কর্মসূচিগত মতামতের ঐক্যের চেয়ে মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের তিনি বলতে পারেন যে কমরেড লেনিনের সূত্রেও তো এ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। ঠিকই! কিন্তু কমরেড লেনিনের সূত্রে এ সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। এটা কি স্বতঃসিদ্ধ নয় যে, পার্টি সংগঠনে যে কাজ করে এবং স্বভাবতঃই পার্টির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যে লড়াই করে, পার্টি শৃঙ্খলাকে যে মাথা পেতে নেয়- সে পার্টির সাংগঠনিক নীতি এবং রণকৌশল ছাড়া অন্য কোন সাংগঠিক নীতি এবং রণকৌশল অনুসরণ করতেই পারে না? কিন্তু পার্টি কর্মসূচি মেনে নিয়েছেন, অথচ কোন পার্টি সংগঠনের যিনি অন্তর্ভুক্ত নন- এমন একজন পার্টিসভ্য সম্পর্কে আপনি কী বলবেন? কী নিশ্চয়তা আছে যে এই ধরণের একজন সভ্যের রণকৌশলগত এবং সাংগঠনিক মতামত পার্টির মতামতই হবে, অন্য কিছু হবে না? মার্তভের সূত্র ঠিক একথাটিই ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। মার্তভের সূত্রের ফলে আমরা পাব একটি ‘অদ্ভূত পার্টি’ যার ‘সভ্যরা’ একই কর্মসূচি মানে (এবং সে বিষয়ে কোন প্রশ্ন নেই!), অথচ সাংগঠনিক ও রণকৌশলগত ব্যাপারে একমত নয়। কী আশ্চর্য বৈচিত্র্য! একটি ভোজসভার সঙ্গে আমাদের পার্টির পার্থক্য রইল কোথায়?

আর একটি প্রশ্ন আমরা করতে চাই: দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেস আমাদের পার্টির হাতে ভাবাদর্শ ও কর্মগত কেন্দ্রিকতা তুলে দিয়েছিল আর মার্তভের সূত্রে যার পুরোপুরি বিরোধিতা রয়েছে- তারই বা আমরা কী করব? বেমালুম ছুড়ে ফেলে দেব? যদি বেছে নেওয়ার প্রশ্নই আসে তবে নিঃসন্দেহে মার্তভের সূত্রকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া অনেক বেশি সঠিক হবে।

কমরেড লেনিনের সূত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই উদ্ভট সূত্রটিই মার্তভ আমাদের উপহার দিয়েছেন।

আমার মত হচ্ছে দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসে মার্তভের সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- সেটি প্রচন্ড ভুল; এবং আমরা আশা করি যে তৃতীয় পার্টি কংগ্রেসে এই ভুল শুধরে নেবে এবং কমরেড লেনিনের সূত্রটি গ্রহণ করবে।

সংক্ষেপে পুনরুল্লেখ করা যাক: শ্রমিক শ্রেণির বাহিনী রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে। সব সৈন্যবাহিনীরই যেমন একটি অগ্রবাহিনী থাকা আবশ্যক, এই বাহিনীও চাই একটি অগ্রবাহিনী। সুতরাং সর্বহারার নেতাদের একটা দল- রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির আবির্ভাব ঘটেছে। একটি সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট অগ্রবাহিনী বলেই এই পার্টিকে প্রথমত: নিজস্ব কর্মসূচি, রণকৌশল আর সাংগঠনিক নীতিতে সুসজ্জিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত: একে হতে হবে একটি সুসংহত সংগঠন। রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির সভ্যপদ কাকে দেয়া যেতে পারে?- এই প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তরই পার্টি দেবে : যিনি পার্টির কর্মসূচি মেনে নেবেন, পার্টিকে আর্থিক সাহায্য দেবেন আর পার্টির কোন একটি সংগঠনে কাজ করবেন- তাঁকেই। 
এই সুস্পষ্ট সূত্রটি কমরেড লেনিন তাঁর চমৎকার সূত্রটিতে ব্যক্ত করেছেন।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী ২০১৮