ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তিঃ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর চরম হুমকি

india-bangladesh4

গত ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী বিশাল বহর নিয়ে ৪ দিনের ভারত সফর করে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বয়ং বিমান বন্দরে এসে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানানো ও রাষ্ট্রপতি ভবনে আতিথেয়তা, সরকারের ভাষায় তা ভারত-বাংলাদেশ বিশেষ বন্ধুত্বের মর্যাদার  নজির। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৬টি চুক্তি, ১৬টি সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে ৩৪টি দলিলে সইয়ের কথাও বলা হয়েছে। এ সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা পানি বন্টন চুক্তি, ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য বৈষম্য হ্রাস, গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প, সীমান্তে বি.এস.এফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যার মত বিষয়গুলোর সুরাহা হয়নি। যদিও ভারতের দিক থেকে  শেখ হাসিনার এ সফরে বিশেষ গুরুত্ব পায় ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তির মত স্পর্শকাতর বিষয়টি। সফরের পূর্বে ও পরে চুক্তির বিষয়ে জনগণকে মূলত অন্ধকারে রাখা হয়েছে। সরকারের এই গোপনীয়তা রক্ষা ও পরবর্তীতে চুক্তির বিষয়ে যতটুকু জানা যায় তা বাংলাদেশের জন্য চরম অবমাননাকর। এ সরকারের ঔদ্ধত্য এতখানি যে ব্যাপক জনগণের তীব্র বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ভারতের কাছে বিকিয়ে দিয়েছে। এমন একটি চুক্তি করতে তারা কোন গণভোট বা জাতীয় ঐক্যেরও প্রয়োজন বোধ করেনি। এমনকি তাদের ভুয়া সংসদে পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন পূর্ব-আলোচনা বা অনুমতি তারা নেয়নি। গুম-খুন-ক্রসফায়ার-মামলা-গ্রেফতার সর্বত্র রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাস সৃষ্টি করে জনগণের কণ্ঠরোধ করে তারা এ চুক্তি করে এসেছে। শাসকগোষ্ঠীর অপর দল বিএনপি-জামাতও এই প্রশ্নে কোন আন্দোলন গড়ে তুলেনি। আগামী নির্বাচনে গদি রক্ষার জন্যই দেশবিরোধী এই “চুক্তি” করেছে লুটেরা গণবিরোধী এ সরকার। দাসখতের এই চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী অতীতের মত ভারতের সমর্থন আদায়ের মধ্য দিয়ে তার শাসনামলকে দীর্ঘায়িত করার নকশা আঁকছে।

’৭১-এ মুজিবনগর অস্থায়ী সরকারের সাথে তৎকালীন ভারত সরকারের যে চুক্তি হয়েছিল তা পরিণতি পেয়েছিল ১৯৭২ সালের “মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি”র মধ্য দিয়ে। এই চুক্তির মাধ্যমে এদেশের উপর ভারতের যে সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা শুরু হয়েছিল “ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি” তারই বিকশিত রূপ। মার্কিন সাহায্য ও পরামর্শ ছাড়া ভারতের এই অঞ্চলে এই ধরনের চুক্তি করার সামর্থ্য নেই। মোদি সরকারের সাথে হাসিনা সরকারের এই চুক্তি বাংলাদেশে চীনের আধিপত্য ঠেকানো ও দক্ষিণ-চীন সাগর ও বঙ্গপোসাগর কেন্দ্রিক ‘ভারত-মার্কিন’ যৌথ পরিকল্পনার অংশ বৈ আর কিছু নয়।

এই চুক্তি হঠাৎ করেই হয়নি। ২০১৫ সালে মোদির বাংলাদেশে আগমনের সময়ই এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। জনগণ দেখেছে এদেশে আসার ঠিক আগে মোদি সরকার তাদের দৃষ্টিতে এদেশের “বোকা জনগণ”কে সান্তনা দেওয়া ও ভারত বিরোধিতা ঠেকানোর জন্য সংসদে “সীমান্ত চুক্তি” বিল এনেছিল। এই সীমান্ত চুক্তির পরও ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা বন্ধ তো হয়ইনি, বরং বেড়েছে।

এই চুক্তির মাধ্যমে সরকার যেমন সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করেছে, তেমনি ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীও অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙ্গে সম্প্রসারণবাদী নীতির ষোলকলা পূর্ণ করেছে। একটি বৃহৎ পুঁজির কাছে ক্ষুদ্র পুঁজি যেভাবে ধ্বংস হয়, বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর সাথে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়বে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই চুক্তির খসড়া সরকার জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মালিকানাধীন পত্রিকা “দ্য ইন্ডিপেন্ডেট” আংশিক প্রকাশ করেছে।

সেখানে দেখা যায় এ চুক্তিতে মোট ১০টি অনুচ্ছেদ রয়েছে।

** অনুচ্ছেদ-১ এ বলা হয়েছে “উভয় দেশ সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। এক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে এবং জাতীয় আইন, নিয়মনীতি ও প্রথার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।” এই ধরনের কথা বলা যে ফাঁকা বুলি, আর জনগণকে ধোকা দেওয়া ছাড়া কিছুই না তার অনেক উদাহরণ আছে। জনগণ দেখেছে গত ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে সংবিধানের দোহাই দিয়ে ভারত কিভাবে এদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে জাতীয় আইন, নিয়মনীতি ও প্রথার প্রতি কিরূপ “শ্রদ্ধা” দেখিয়েছে!

** অনুচ্ছেদ-২ এ বলা হয়েছে “উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধি পাঠাবে। সামরিক প্রশিক্ষণ, সামরিক বিশেষজ্ঞ বিনিময়, পর্যবেক্ষণ, তথ্যবিনিময়, সামরিক সরঞ্জাম দেখভালের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ত্রাণ সহায়তা, বার্ষিক আলোচনার ব্যবস্থা, জাহাজ ও বিমান কার্যক্রম পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় যৌথ মহড়া দিতে পারে”। এটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, পারস্পরিক সহযোগিতার নামে এক ভয়ানক নতজানু অবস্থান নিয়েছে এই সরকার। এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে ভারতীয় সেনাদের যথেচ্ছগমন নিশ্চিত হবে। এর ফলস্বরূপ ইতিমধ্যেই ভারতীয় সেনাপ্রধান দু’বার বাংলাদেশ সফর করেছে। কখন, কোথায়, কি নিয়ে আলোচনা হবে জনগণ এর কিছুই জানবে না। অবশ্য এই চুক্তির আগেও যে জনগণ জানত তা বলা যাবে না। কিন্তু এর মাধ্যমে জনগণকে আরো অন্ধকারে রেখে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে তা বলা যায়। ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে শাসকগোষ্ঠিও এসব গোপন করে যাবে। চলবে মিডিয়ার উপর নজরদারী।

‘সামরিক সরঞ্জাম দেখভাল’র মাধ্যমে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কাছে এদেশের সামরিক বাহিনীর প্রকৃত অবস্থা আর গোপন থাকবে না। এদেশের সেনাবাহিনীর কাছে কি কি অস্ত্র আছে তা খুব সহজেই জেনে যাবে তারা। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে তারা যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আশীর্বাদপুষ্ট একটা শ্রেণি তৈরি করবে তা বলাই বাহুল্য।

‘যৌথ মহড়া’র মাধ্যমে তারা এদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে ভারত-চীন ¯œায়ুযুদ্ধের রণকৌশলের সাথে যুক্ত করবে। ফলে স্পষ্টত এক ভয়াবহ মেরুকরণ হবে দক্ষিণ-এশিয়ার ভূরাজনীতিতে। যার ফলে এদেশ হতে পারে ভারত-মার্কিন যৌথ সামরিক ঘাঁটি ও রণক্ষেত্র। যেমনটি এখন চলছে উত্তর কোরিয়াকে ঠেকানোর লক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি। চীনকে ঠেকাতে এদেশও এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্ত হল।

** অনুচ্ছেদ-৩ এ বলা হয়েছে, “উভয় দেশ সামরিক শিল্প স্থাপন ও সহযোগিতা বিনিময় করতে পারবে। মহাকাশ প্রযুক্তিতে সহায়তা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সমুদ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারবে।” এখানে উভয় দেশ বলা যে কত হাস্যকর তা বলাই বাহুল্য। কারণ ভারতে যদি এদেশের সামরিক বাহিনী কিছু করতে চায় তা তারা রাজনৈতিক অনুমতি ছাড়া করতে পারবে না। আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে ভারতের উপর নির্ভরশীল তা আগেই বলা হয়েছে। এদেশের সামরিক বাহিনী যে ভারত থেকে শক্তিশালী নয় তা জনগণ জানে। তাই পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময় যে একতরফা হবে তা বলা যায়। বরং এই চুক্তির মাধ্যমে এমন ক্ষেত্র তৈরি করা হবে যাতে ভবিষ্যতে এদেশের সেনাবাহিনী ভারতের অনুগত হয়ে কাজ করবে। এর আরো মূর্ত রূপ দেখা যায় এই অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে “সামরিক শিল্প স্থাপন”র কথা। অর্থাৎ ভারত চাইলেই এদেশে সামরিক শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। ভবিষ্যৎ যুদ্ধের পরিকল্পনায় যেকোন সময় জাহাজ বা অস্ত্র কারখানা তারা এদেশের মাটিতেই করতে পারবে। যার ফলে এদেশের সামরিক বাহিনী কার্যত হবে ভারতের পদানত। এদেশকে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের শুরু হবে নতুন নতুন খেলা। দেশের ভূখন্ড ও জনগণ হয়ে পড়বে চরমভাবে অরক্ষিত। এদেশের সামরিক বাহিনীতে সৃষ্টি হবে ভারতের মদদপুষ্ট আমলা-দালাল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। চিকিৎসা সেবার নামে এসব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পাবে নানা সুযোগ সুবিধা ও নিরাপত্তা। এর মাধ্যমে দেশের উপর ভারতের সামরিক আধিপত্য আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

“মহাকাশ প্রযুক্তি সহায়তা”র নামে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এদেশের উপর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করবে গোয়েন্দা নজরদারী। সীমান্ত কার্যত হয়ে পড়বে অরক্ষিত।

“সমুদ্র অবকাঠামো” নির্মাণের নামে এদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস উত্তোলন, গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর তৎপরতা। পায়রা বন্দরসহ দেশের সবকটি সমুদ্র ও নদী বন্দরে দেখা যেতে পারে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি।

** অনুচ্ছেদ-৭ এ বলা হয়েছে “উভয় দেশ তথ্য আদান-প্রদানে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না তা নিশ্চিত হবে এবং এক্ষেত্রে উভয় দেশ কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করবে”। এর মাধ্যমে ভারতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোন তথ্য বাংলাদেশ অন্য দেশকে দিতে পারবে না বা পরামর্শ করতেও পারবে না। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী তথা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভারতের নতজানু হয়ে চলতে হবে। বুর্জোয়া সামরিক বিশেষজ্ঞরা যতই বলুক পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করলে এই চুক্তিতে কোন সমস্যা নেই, বাস্তবে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে। গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র ভারতীয় স্বার্থই রক্ষা হবে, কারণ নিকট ভবিষ্যতে এদেশে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হবে। বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর বা গণবিরোধী হলেও এদেশের সামরিক বাহিনী কার্যত কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না অথবা রাখলেও দুই বাহিনীর মধ্যে প্রতিযোগিতায় ভারতীয় বাহিনীর স্বার্থই রক্ষিত হবে। এছাড়াও চুক্তিতে শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণে ভারত ও বাংলাদেশ থেকে কোন কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে তারও একটা খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে টাটা মেডিকেল সেন্টার, ভারতীয় ডিফেন্স কলেজগুলো……… পরস্পর সহযোগিতার আওতায় আসবে ।

এই চুক্তির আরো অংশ যে গোপন রয়েছে তা ধারণা করা যায়। যদি এ চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশিত হত তাহলে আরো ভালভাবে এই চুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব ব্যাখ্যা করা যেত। জনগণের কোন ধরনের অনুমতি ছাড়াই যেভাবে এই চুক্তি করা হয়েছে তার দায় কেবলমাত্র আওয়ামী সরকারের। এ দায় বর্তায় শুধু মাত্র আমলা-মুৎসুদ্দি শাসকশ্রেণির উপর। অবর্ণনীয় লুটপাট, বিদেশে টাকা পাচার, গুম-খুন-ক্রসফায়ারের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এই ফ্যাসিবাদী সরকার। ফলে জনগণের কন্ঠরোধ করতে সকল আয়োজনই ক্রমান্বয়ে সম্পন্ন করছে। “ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি” তার শেষ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে এদেশের উপর ভারতীয় শাসকগোষ্ঠির আধিপত্য আরো বৃদ্ধি পাবে, দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে এদেশকে ভারতের দক্ষিণ-এশীয় যুদ্ধকৌশলের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, তা এদেশের সচেতন জনগণ কখনো মেনে নেবে না। এ অবস্থায় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ত্ব-গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দেশের প্রতিটি জনগণ ভারতের এই আধিপত্য ও সরকারের নতজানু নীতির বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলবেন। সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে বেগবান করবেন।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা

 


নকশালবাড়ি পরবর্তী ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন

82927270-575b-46db-8d0e-50fcd6145a93

১৯৬৭ সালের মে মাসে নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন মূলত: মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাস। নকশালবাড়ি কৃষক সংগামের ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ বিশ্বাসঘাতক সংশোধনবাদী লাইনের মুখোশ টেনে-ছিঁড়ে খোলাসা করে দেয়। সিপিআই-সিপিএম অনুসৃত শ্রেণি সমন্বয়বাদী-শান্তিপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচনপন্থী-সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের (তখন মাও চিন্তাধারা বলা হতো) ভিত্তিতে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের পথে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনীতিতে এগিয়ে নেয়। নকশালবাড়ি তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহের উত্তরাধিকার লাভ করে। ভারতে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির মতবাদ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশ হিসেবে তৃতীয় স্তর মাওবাদ তথা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (মালেমা) প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

নকশালবাড়ির পর আর কোন কিছই আগের মতো রইলো না। পুরনো সব ধ্যান-ধারণা-চিন্তাধারা-দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা হয় নকশালবাড়ির কষ্টিপাথরে। যা ছিল চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধারাবাহিকতা।

কৃষক অভ্যুত্থানের পরপরই ১৪ জুন ১৯৬৭, কলকাতায় “নকশালবাড়ি ও কৃষক সংগ্রাম সহায়ক কমিটি” গঠিত হয়। নকশালবাড়ির স্ফুলিঙ্গ থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ-বিহার-উড়িশ্যা-উত্তর প্রদেশ-পাঞ্জাব-কেরালা-তামিলনাড়–-ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তৃত এলাকায় সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। ’৬৭ সালেই গঠিত হয় “কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি”। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল মহামতি লেনিনের জন্মবার্ষিকীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে)-[সিপিআই(এমএল)] গঠিত হয়। পার্টির তাত্ত্বিক ভিত্তি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা। নবগঠিত এই পার্টির দশ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন মহান মাওবাদী নেতা কমরেড চারু মজুমদার। ঐ বছরেই মে দিবসে কলকাতায় শহীদ মিনারে এক জনসভায় কানু সান্যাল পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন।

১৯৭১-৭২ সালে খুনি ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার পশ্চিমবঙ্গসহ সমগ্র ভারতে এই সশস্ত্র ও গণসংগ্রাম তথা গণযুদ্ধকে ধ্বংস করার জন্য ব্যাপক দমন-নির্যাতন চালায়। তারা ক. চারু মজুমদার-সরোজ দত্তসহ হাজার হাজার মাওবাদী বিপ্লবীকে গ্রেফতার-হত্যা করে। বিখ্যাত লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর লেখা “হাজার চুরাশির মা” উপন্যাসে তার কিঞ্চিত স্বাক্ষর রয়েছে। পার্টির কিছু লাইনগত ভুল-ত্রুটি এবং রাষ্ট্রীয় শ্বেত সন্ত্রাসে নকশালপন্থী সংগ্রাম বিপর্যস্ত হয়। পার্টি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়।

‘৭২ থেকে ‘৭৭ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দমন-নির্যাতন-বিপর্যয়-দল-উপদল-ভাঙ্গন-অধ:পতন চলতে থাকে। ‘৭৭ সালে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার হলে নকশালবাড়ি অনুসারীরা পার্টি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেন। সারা ভারতে নকশালবাড়ি দাবিদার বহু দল-উপদলের সৃষ্টি হয়। এইসব ধারা-উপধারায় মোটা দাগে তিন ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা প্রকাশিত হয়।

(১)     সিপিআই(এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন পুরোপুরি ভুল। এই ধারা অনুসারীরা পুরনো বস্তাপচা সংসদীয় নির্বাচনী পথ নেয়।

(২)     সিপিআই (এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন পুরোপুরি সঠিক। এরা পুরনো কায়দায় যান্ত্রিকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম করার চেষ্টা করে।

(৩)     সিপিআই (এম-এল)-এর রাজনৈতিক লাইন মৌলিকভাবে সঠিক। কিন্তু গুরুতর কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল।

এই ধারার অনুসারীদের অন্যতম কমরেড কোন্ডাপল্লী সিতারামাইয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য কমিটি ’৭৪ সালে  ৬৭-৭২-এর সংগ্রামের একটি সারসংকলন করে। এই সংগঠন আত্মসমালোচনামূলক লাইনগত পর্যালোচনায় ৪টি গুরুতর ভুলকে চিহ্নিত করে।

      ক) দেশীয়-বিশ্ব বিপ্লব সংঘটনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিজয় আকাংখা;

       খ) খতমকে এ্যাকশনের একমাত্র রূপ হিসেবে নির্ধারণ;

       গ) গণসংগঠন-গণসংগ্রামের লাইন বর্জন; এবং

       ঘ) পার্টি গঠনের কাজকে অবহেলা করা।

এই সারসংকলনের ভিত্তিতে ’৮০ সালের ২২ এপ্রিল সিপিআই(এম-এল) [পিপলস ওয়ার-জনযুদ্ধ] গঠন করে। এই গ্রুপ প্রথমে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পরে দন্ডকারণ্যসহ সন্নিহিত রাজ্যগুলিতে গণযুদ্ধ বিকশিত করে।

পরবর্তীতে আরো কিছু নকশালবাড়ি লাইনের অনুসারী সংগঠন প্রায় একই ধরনের সারসংকলন করে। যার মধ্যে পড়ে সিপিআই(এম-এল) পার্টি ইউনিটি, করম সিং-এর নেতৃত্বাধীন পাঞ্জাব কেন্দ্রীক মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র (যে সংগঠন পরে এমসিসির সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়), কেরালা কেন্দ্রীক সিপিআই (এম-এল) নকশালবাড়িসহ আরো কিছু সংগঠন। অন্যদিকে সিপিআই(এম-এল)-এ সংগঠিত হয়নি এমন সংগঠন “দক্ষিণ দেশ” এমসিসি নামে সংগঠিত হয়ে বিহার-ঝাড়খন্ডে গণযুদ্ধ গড়ে তোলে।

একই সাথে এইসব সংগঠন একটা সর্বভারতীয় মাওবাদী পার্টি গড়ার প্রক্রিয়াও চালাতে থাকে। প্রথমে ১৯৯৮ সালে সিপিআই(এম-এল)-এর “পিপলস ওয়ার” গ্রুপ এবং ক. নারায়ণ সান্যাল (বিজয়দা)’র নেতৃত্বাধীন “পার্টি ইউনিটি” গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ হয়। এবং পরে ২০০৪ সালে ২১ সেপ্টেম্বর ক. গণপতির নেতৃত্বাধীন সিপিআই(এম-এল) এবং ক. কানাই চ্যাটার্জী প্রতিষ্ঠিত ক. সুশীল রায়-ক. কৃষাণের নেতৃত্বাধীন এমসিসি  ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) গঠন করেন। এই নবগঠিত পার্টির সম্পাদক হন ক. গণপতি। ঐক্য প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ২০১৪ মে দিবসে ক. গণপতি এবং নকশালবাড়ি গ্রুপের সম্পাদক ক.অজিত এক যৌথ বিবৃতিতে সিপিআই(এম-এল) নকশালবাড়ি, সিপিআই (মাওবাদী)তে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেয়। মালেমা ও নকশালবাড়ি অনুসারী গণযুদ্ধের লাইনের অন্যান্য সংগঠনের সাথেও ঐক্য প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, এইসব সংগঠনের কোন কোনটি আরআইএম-কমপোসার সদস্য ছিল।

আর সংসদীয় নির্বাচনপন্থী সংশোধনবাদী এবং গোড়ামীবাদী-যান্ত্রিক ধারাগুলো শাসক সাম্রাজ্যবাদের দালাল আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া-সামন্ত শ্রেণির সেবাদাসে পরিণত হয়েছে।

নকশালবাড়ি একটা চলমান বিপ্লব। যার লক্ষ্য নয়া গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ। পথটা আঁকাবাঁকা, কিন্তু একে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তাই একটি থানা নকশালবাড়ির উত্থান মাত্র পঞ্চাশ বছরে আজ সর্বভারতীয় মাওবাদী পার্টি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সেই পার্টির নেতৃত্বে অন্ধ্র-বিহার-দন্ডকারণ্য-ছত্তিশগড়ের পর দক্ষিণ ভারতের কেরালা-কর্ণাটক সীমান্তে পশ্চিম ঘাট এলাকায় গেরিলা অঞ্চল এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের আসাম-মনিপুর রাজ্যে গণযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় শাসক শ্রেণি এখন বলতে বাধ্য হচ্ছে মাওবাদ ভারত রাষ্ট্রের জন্য প্রধান বিপদ। সে জন্যই চলমান গণযুদ্ধকে ধ্বংস করতে ২০০৯ সালে এক বছরের পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করা “অপারেশন গ্রিনহান্ট” বর্বরোচিভাবে এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।

গণযুদ্ধ হলো জনগণের যুদ্ধ। যেখানেই অন্যায়-অত্যাচার সেখানেই জনগণ প্রতিরোধ-যুদ্ধ করবে। এর আগানো-পিছানো থাকে, কিন্তু ধ্বংস করা যায় না। নকশালবাড়ি আবারো প্রমাণ করেছে ঝরে যাওয়া রক্তে বিপ্লব তলিয়ে যায়না, বরং ছড়িয়ে পড়ে।

নকশালবাড়ি লাল সালাম!।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা


মানুষের মতো মানুষ – বরিস পলেভয়

1

 

বইটি পড়তে বা ডাউনলোড করতে নীচে ক্লিক করুন –

মানুষের মতো মানুষ – বরিস পলেভয়


নকশালবাড়ি আন্দোলনে সৃষ্ট সাহিত্য সম্পর্কে

 

নকশালবাড়ির বিপ্লবী কৃষক আন্দোলন সংশোধনবাদী রাজনীতির সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে সারা ভারতে যেমন বিপ্লবী আলোড়ন তুলেছে, তেমনি সর্বহারা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতকেও লাল আলোয় উদ্ভাসিত করেছে। শিল্প-সাহিত্যেও বিপ্লবী জোয়ার এনেছে। এ আন্দোলন অনেক গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা ও গান সৃষ্টি করেছে। তবে নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলনের মতই শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির পথও কন্টকাকীর্ণ ও রক্তাক্ত ছিল। রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাসের খড়গ লেখক-সাহিত্যিকদের উপরও নেমে আসে। হত্যা-গ্রেপ্তার-নির্যাতন, কারাবরণ কিছুই বাদ যায়নি তাদের ক্ষেত্রেও। কারণ জনগণের ক্ষমতার লড়াইয়ে লেখক-সাহিত্যিকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। শ্রমিক-কৃষক-নিপীড়িত জনগণের বিপ্লবী সংগ্রাম যে বিপ্লবী সাহিত্য নির্মাণ করে নকশালবাড়ির সংগ্রাম তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নকশাল আন্দোলনে সৃষ্ট কবিতগুলোতে উঠে এসেছে সরাসরি কৃষকদের জীবন ও সংগ্রামের কথা, মতবাদ ও রাজনৈতিক আহ্বান। প্রতিক্রিয়াশীল-সংশোধনবাদী ভোটবাজ রাজনীতি বর্জনের ডাক, রক্তাক্ত সংগ্রামের আহ্বান। সামন্তবাদী শোষণের উম্মোচন, রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লাল সন্ত্রাসের ন্যায্যতা। গল্প-উপন্যাস-নাটকে উঠে এসেছে ছাত্র-তরুণ-তরুণী, কৃষক, নারী, আদিবাসীদের দুঃসাহসী হয়ে উঠার কাহিনী। উঠে আসে সাঁওতাল মেয়ের নির্ভীক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এবং সমাজের রীতি ভাঙ্গার দুঃসাহস। রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাস এবং কৃষক-আদিবাসী জনতাকে বিপ্লবী চেতনায় জাগ্রতকরণ।

নকশালবাড়ি আন্দোলনে ব্যাপক সংখ্যায় ন্যায়নিষ্ঠ ছাত্র-যুবকরা এসেছিল। পার্টির ‘গ্রামে চলো’ ডাকে ঘর ছেড়ে তারা ভূমিহীন ও গরীব কৃষকদের সঙ্ঘবদ্ধ করতে গ্রামে যায় এবং শহরে যায় মজুরের মধ্যে। স্বর্ণমিত্র লিখলেন ‘গ্রামে চলো’ উপন্যাস। ‘গ্রামে চলো’ উপন্যাসে দেখা যায় উচ্চ শিক্ষিত শহুরে ছাত্র-তরুণদের অংশগ্রহণে মধ্যবিত্ত জীবনের মোহ ত্যাগ করে গ্রামের কষ্টকর সংগ্রামে তাদের জীবন-মরণ সংগ্রাম। নকশালবাড়ির সাহিত্য সম্পর্কে ভারতীয় বিপ্লবী সাহিত্যিক-কবি কাঞ্চন কুমার লিখেছেন “নকশালবাড়ির রাজনৈতিক উত্তাপ জোয়ারের মতো অগুণতি নতুন কবিদের সামনে নিয়ে এল। এই নতুন প্রজন্মের অগ্রগামী কবি ছিলেন দ্রোণাচার্য ঘোষ……এই কবি এবং গেরিলা কমান্ডারকে শাসকশ্রেণি জেলে নির্মমভাবে হত্যা করে। আজ বাংলার কোনো কবিতা সংকলন দ্রোণাচার্যের কবিতা ছাড়া অপূর্ণ থেকে যাবে”। নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান শুরু হতেই নাট্যকার উৎপল দত্ত নকশালবাড়ি যান; সরেজমিনে কৃষকদের এবং স্বয়ং চারু মজুমদারের সাথে আলাপচারিতার ভিত্তিতে লেখেন ‘তীর’ নাটক। যা বাংলা নাটকে নকশালবাড়ির আন্দোলনের তত্ত্বকে শৈল্পিক রূপ দিয়ে দর্শকদের আলোড়িত করেছিলো।

 ১৯৬৭ সালে নকশালপন্থীদের মুখপত্র ‘দেশব্রতী’র শারদীয় সংখ্যায় অনল রায়ের ‘রক্তের রং’ ছাপা হয়-  নকশালবাড়ি আন্দোলনের উপর এটি মুদ্রিত প্রথম নাটক। নকশালবাড়ির আন্দোলনের জোয়ারে যেখানে যেখানে সংগ্রাম হয়েছিল সেখানে সেখানেই বিপ্লবী সাহিত্য লেখা হয়েছে। বিপ্লবী লেখক সরোজ দত্ত তার লেখা প্রবন্ধগুলোতে সাহিত্য সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বকে তুলে ধরেছেন। নকশালবাড়ীর আন্দোলনে সৃষ্ট শিল্প-সাহিত্যের সমগ্র বিবরণ আমাদের এই ছোট্ট পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়। এমন অসংখ্য শিল্প সাহিত্য সৃষ্টির রূপকার কবি সাহিত্যিকদের সংগ্রাম ও সাহিত্যের তথ্য পাওয়া যাবে বিপ্লবী কবি ও সাহিত্যিক কাঞ্চন কুমারের “নকশালবাড়ী ও সাহিত্য”সহ ভারতীয় বিপ্লবীদের বিভিন্ন প্রকাশনায়।

কবিদের মধ্যে দ্রোনাচার্য ঘোষ, তিমির বরণ সিংহ, অমিয় চট্টোপাধ্যায়, মুরারি মুখোপাধ্যায়, সৃজন সেন, চেরাবন্ডা রাজু, ওয়র ওয়র রাও, সুব্বারও পানিগ্রাহী সহ আরও অনেকে। এদের অনেকেই শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন। সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘জননাট্য মন্ডলী’ নকশালবাড়ি শহীদ কমরেডগণের রক্ত বহন করছে। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব গড়ে তোলার লক্ষে কাজ করছে। নকশালবাড়ী আন্দোলনে সৃষ্ট উপন্যাস, গণসংগীত ও সিনেমা রয়েছে বেশ কিছু।

আমাদের দেশে বিপ্লবাকাঙ্খী সাহিত্যিকগণ আন্দোলন থেকে দূরে বা বিচ্ছিন্ন থেকে সাহিত্য নির্মাণের চেষ্টা করেন যা বিপ্লবী হয় না, হয় কল্পনাশ্রয়ী সাহিত্য। তারা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অংশগ্রহণ, দৃঢ় সমর্থন ও নতুন সমাজ নির্মাণে তাদের ভূমিকাকে এড়িয়ে চলেন। এবং বলেন যে, বিপ্লবী আন্দোলন গড়া পার্টির কাজ, সাহিত্যিকদের নয়। এ ধরনের বক্তব্যে তারা নিজেদের দায় সারা করেন। যে জিনিসটা তারা বুঝেন না অথবা বুঝেও সুবিধাবাদী অবস্থান নেন সেটা হল বিপ্লবী সাহিত্য নির্মাণের জন্য প্রয়োজন বিপ্লবী মতাদর্শ ধারণ। বিপ্লবী মতাদর্শ ধারণ না করলে সে সাহিত্য সংস্কৃতিও পুঁজিবাদী মতাদর্শকেই ধারণ করে। মাও বলেছেন রাজনীতি-অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশ হচ্ছে সংস্কৃতি। বিপ্লবী সাহিত্য সৃষ্টিতে বিপ্লবী সংগ্রামকে ধারন করতেই হবে।

নীচে নকশালবাড়ির সাহিত্যের কিছু তালিকা দেওয়া হলোঃ

উপন্যাসঃ

১। হাজার চুরাশির মা- মহাশ্বেতা দেবী

২। গ্রামে চলো- স্বর্ণমিত্র

৩। অগ্নির উপাখ্যান- শৈবাল মিত্র

৪। কমুনিস – শঙ্কর বসু

৫। শালবনী- গুনময় মান্না

৬। এই ভাবেই এগোয়- জয়ন্ত জোয়ারদার

গল্পঃ

১। অপারেশন, বসাই টুডু, ‘দ্রৌপদী’- মহাশ্বেতা দেবী

২। বাঘ শিকার, প্রসব – স্বর্ণমিত্র

৩। খোচর –  নবারুণ ভট্টাচার্য

৪। অপ্রতিদ্বন্দ্বী –  দীপংকর চক্রবর্তী

৫। মোকাবেলা –  কালী প্রসাদ রায় চৌধুরী

৬। অভ্যুত্থান – সুখেন মুখার্জী

৭। প্রতিরোধ – শঙ্কর সেনগুপ্ত

৮। খোদা হাটির ডাক –  ব্রজেন মজুমদার

৯। সন্তানের নাম ধান – বেনু দাসগুপ্ত

নাটকঃ

১। তীর – উৎপল দত্ত

২। রক্তের রং – অনল রায় ইত্যাদি।

 

বিপ্লব জ্বলে

   – দ্রোণাচার্য ঘোষ

প্রত্যেক ঘরে গর্জে উঠছে আজকে লক্ষ ছেলে

প্রত্যেক গ্রামে ঘাঁটি  গড়া চাই এই কথা ভুলে গেলে

বিষম সর্বনাশ।

   তাই আজ জাগে নতুন সূর্য। নতুন দিনের মাস।

বিপ্লবী দিন বুকে এসে বাজে ছুঁড়ে ফ্যালো ভীরু ঘুম

ক্রীতদাস বেলা কাটানো এখন নয়।

এখন আমরা নির্ভীক নির্ভয়

এখন সময় নেই ওড়ানোর বৃথা কোনো কালো ঘুম।

পৃথিবী সচল, বিপ্লব আগুয়ান

সেই পথে যেতে মজদুর হাতে থাকুক লাল নিশান

    অন্য ভাবনা ভাবার সময় আজকে যে আর নেই

বিপ্লব জ্বলে প্রতি বুকে বুকে মুক্তির বাতাসেই।

 

মুখোশ খুলে ধরেছে

সৃজন সেন

পিকিং মন্ত্রে ধনুর্ধারী

যত সব হঠকারী

দখল করে খড়িবাড়ি

ফাঁসিদাও আর নকশালবাড়ী

লড়াই শুরু করেছে।

তাই না দেখে দাদা-কাকা

ছাড়েন বচন আঁকা-বাঁকা

মাও-ও নাকি সিআইএ-র চর

মিটিং করে বলেছে।

জোতদারেরা মদত পেয়ে

বন্দুক হাতে চলেছে,

সাতকিষাণী দু’জন শিশুর

রক্তে মাটি ভরেছে।

এক তীরেতে ভাঙলো হাড়ি

‘ডাঙ্গে’ ধরা পড়েছে।

পিকিং মন্ত্রে ধনুর্ধারী

যত সব হঠকারী

দখল করে খড়িবাড়ী

ফাঁসিদাও আর নকশালবাড়ী

ঠুনকো যত বিপ্লবীদের

মুখোশ খুলে ধরেছে

সাত কিষাণী দুজন শিশুর

মরণ ধন্য হয়েছে।

১৫.৮.১৯৬৭

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা


রোজাভা থেকে তুরস্কের মাওবাদী TKP/ML-র গেরিলা যোদ্ধার চিঠি (ইংরেজি থেকে অনুবাদ)

10380994_173384719717563_1837776385379154892_n

রোজাভার চিঠিঃ “আমরা যুদ্ধ করার মধ্য দিয়েই যুদ্ধ শিখি”

চিঠিটা লিখেছেন তুরস্কের একজন TKP/ML গেরিলা যোদ্ধা (ইংরেজি থেকে অনুবাদ)

বিপ্লব একটা পথ; জনগণ যখন এ পথে পা বাড়ায় তারা একটা অচেনা পৃথিবীর দরজাই খোলে। আমরা এ পথে এসেছি আগুন ও মাটিকে ভালবেসে। আমরা এ পথে হাটা শুরু করেছি ব্যক্তিগত সম্পদের সাথে সব ধরনের যোগসুত্র ছিন্ন করে, একজন নবজাতকের মত জীবনে পদার্পণ করতে পেরে যে খুব খুশি ও আশাবাদী। আমরা এ পথে হাটা শুরু করেছি মধ্যরাত্রে, চাঁদের আলো আমাদের পথ দেখিয়েছে। যে বন্ধুরা আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে তারা সতর্কবাণী দিয়েছে, আমরা হাটতে শুরু করেছি। উচু উচু পর্বত, প্রমত্ত নদী ও গম ক্ষেতের বিষাক্ত গন্ধ পেরিয়ে আমরা অবশেষে রোজাভায় এসে পৌঁছেছি। আমাদের ভ্রমন ছিল মোট চৌদ্দ ঘন্টা, কোন রুটি, কোন পানি ও সিগারেট ছাড়া। এমন সব মানুষের সাথে যাত্রা যাদেরকে আমরা আগে কখনো দেখিনি….রাতের অন্ধকারের কারনে, এসব বন্ধুদের মুখ পর্যন্ত দেখতে পাইনি। এটা অবাক করার মত, হতে পারে তাদের কারো কারো সাথে পাশাপাশি যুদ্ধ করছি একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে। হতে পারে অন্যের বাহুতেই শেষ নিশ্বাসটি নিয়েছি কিন্তু জানা হয়নি তার প্রিয় বই কিংবা প্রিয় মুভি কি।

আমরা এখন রোজাভায়। এখানে কেবল অস্ত্রধারীরাই মিলিত হয় আর চুমু খায়। একটা উষ্ণ অভ্যর্থনার পর আমরা চা পান করলাম,চিজ দিয়ে রুটি খেলাম। সবার উৎসুক দৃষ্টি। প্রত্যেকের চোখ অন্যের চোখের উপর, অন্যের দিকে তাকিয়ে এমনতর কমরেডসুলভ হাসির মধ্যে যেন তলিয়ে গেছে সমস্ত ক্লান্তি।

তিন/চার দিন অপেক্ষার পর সংগঠন আমাদেরকে ফ্রন্টে নিয়ে গেল, যেখানে আমরা যুদ্ধ করব। উভয় পাশে দুটো পর্বত দাঁড়িয়ে : একটা ধুলো দিয়ে তৈরি অন্যটা ধোয়ায়। এক পাশে আব্দুল আজিজ পর্বত অন্য পাশে সেনগাল পর্বত। আর বাকী যা তা হল বিশাল শুন্যতা, এক উষর প্রান্তর সমতল ও অনুর্বর, গাছের চিহ্নমাত্র নেই। তাপমাত্রা যে কারো চোখকে বিষন্ন করে দিতে পারে। প্রত্যেক দিনই ধুলিঝড় দৃষ্টিসীমা শুন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসে। আমরা যেখানে আছি সেখানে কমরেডরা এসেছে কুর্দিস্তানের চার কোনা থেকে- টার্কি, ইরান,ইরাক ও সিরিয়া থেকে। সবাই তরুন যোদ্ধা জীবনী শক্তিতে ভরপুর। এটা আমাকে আহমেদ আরিফের কবিতা মনে করিয়ে দেয় : ‘যদি তুমি আমার ভাই বোনদের জান, তারা কতোটা ভাল তবে আমিও তোমাকে জানাব ‘।

ব্যাটেলিয়নে যৌথজীবন পদ্ধতি। যা কিছু করা হবে তার পরিকল্পনা যৌথভাবেই হয়। এখানে আমাদের বন্ধুত্বটাই আসল। অনেক বন্ধুরা TKP-ML/TiKKO সম্পর্কে জানেনা। এটা তাদের জন্য উৎসুকের ব্যাপার যে YPG/YPJ ছাড়াও তাদের জন্য আরেকটি সংগঠন রয়েছে। যখন আমরা বলি, আমাদের রোজাভায় আসার কারন আমাদের পার্টি, আমাদের বন্ধুত্ব দৃঢ হয় এবং একে অপরের প্রতি আত্মবিশ্বাস প্রসারিত হয়।আমাদের ব্যাটেলিয়নে আমাদের একটা স্লোগান আছে,” চা, সিগারেট এবং যুদ্ধ “।এই তিনটা জিনিস যেন এখানে দৃঢভাবে গেঁথে আছে।

আমরা সম্মুখ সমরে। ISIL গ্যাংদের থেকে আমাদের অবস্থান মাত্র সাতশত মিটার দুরে। প্রতিদিনই কোন না কোন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়। মর্টার, মিসাইল, বুলেট আমাদের কালোরাতকে আলোকিত করে। রাতে আমরা এম্বুশের জন্য অপেক্ষা করি, আমাদের ক্ষেত্র তৈরি করি । কোন কোন দিন আট থেকে দশ ঘন্টা সারভেইলেন্স ডিউটি থাকে। আমাদের মনোবল দৃঢ় কারন আমরা যুদ্ধের মধ্যেই তাকে কেন্দ্রীভূত করতে পেরেছি। এখানে শহর ও যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে অনেককিছু শিখেছি, আমাদের নেতা কমরেড ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া ঠিক যেমনটি আমাদের শিখিয়েছিলেন :” আমরা যুদ্ধ করার মধ্য দিয়েই যুদ্ধ শিখি”। স্বাধীনতা মানে হল নিজের আবশ্যক বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং পার্টির নির্দেশনা মতো আমরা সর্বহারা শ্রেণীর ডাকে সাড়া দিতে প্রস্তুত। আত্মবিশ্বাসের সাথে ছোট ছোট পদক্ষেপে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব, আমরা এটাও অবশ্যই বিনয়ের সাথে স্মরন করব- আমাদের ক্ষমতা ও আদর্শের ব্যাপ্তি।

কমরেড সেফাগুল কেশকিন আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন : “প্রত্যেকে অবশ্যই তাদের দায়িত্ব পালন করবে”। আমরা আমাদের নির্দেশনা পেয়েছি, আমরা আমাদের কাজের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। সে সব কাজ আজ রোজাভায়, আগামীকাল দারসিমে তারপর কৃষ্ণসাগরে- আমরা আমাদের কাজ করে যাব। আর সবসময় এই কথাটিই স্মরন করব, পুনরাবৃত্ত করব: যেখানে নিপীড়ন আছে, সেখানে প্রতিরোধ আছে এবং কমরেড ইব্রাহিম সেখানেই আছেন।

রোজাভা থেকে একজন TKP/ML গেরিলা যোদ্ধা।

অনুবাদঃ সাইফুদ্দিন সোহেল

সূত্রঃ http://www.signalfire.org/2016/03/16/hi-comrades-a-letter-from-a-tkpml-tikko-fighter-in-rojava/


নকশালবাড়ী আন্দোলনে ছাত্র-যুবদের অবিশ্বাস্য উত্থান

cropped-13254344_601118923376961_7289040117773670514_n

নকশালবাড়ী আন্দোলন ভারতের বুকে প্রতিত্রিয়াশীল রাষ্ট্র-সরকারের ক্ষমতার বিপরীতে ভূমিহীন, গরীব কৃষক, নিপীড়িত নারী ও জাতিসত্তার ব্যাপক দরিদ্র জনগণের গণক্ষমতার বিস্ফোরণ। যা পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ীসহ কয়েকটি থানায় শুরু হলেও ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০-এর মধ্যেই এর বিপ্লবী শিক্ষা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশে দেশে। এ আন্দোলন প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবতাবাদী ছাত্র-তরুণ-বুদ্ধিজীবীদের সামনে বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল ও তার লেজুড় নির্বাচনপন্থী, সংস্কারবাদী, সংশোধনবাদী ভুয়া বামদের রাষ্ট্রক্ষমতার বিপরীতে মর্যাদাসম্পন্ন, দুর্নীতিমুক্ত নির্লোভ চিত্ত, আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সমতা-ভিত্তিক এক নতুন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। যে আন্দোলনের মতবাদ ছিল মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (তৎকালে মাওসেতুঙ চিন্তাধারা)। এবং এর তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় সিক্ত, ত্যাগ বিপ্লবী দৃঢ়তা ও যোগ্যতার প্রতীক কমরেড চারু মজুমদার।

তাই নকশালবাড়ীর বিপ্লবী ঢেউয়ে প্লাবিত হয়ে ভারতের আলোকপ্রাপ্ত ছাত্র-তরুণগণ অন্যায়, অমানবিকতা ও তাদের স্রষ্টাদের উচ্ছেদ করে পৃথিবীর বুকে কাঙ্খিত স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষে দলে দলে যোগদান করেন। যেখানে কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না, একে অন্যকে নিপীড়ন করবে না, জাত-পাত, ধর্ম ও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হবে না। যেখানে জন্ম নেবে এক নতুন সমাজতান্ত্রিক মানুষ। যাদের লোভ, স্বার্থপরতা, আত্মঅহংকার, প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্থলে প্রতিস্থাপিত হবে নিঃস্বার্থ, বিনয়ী ও পরস্পর সুসমন্বয়ের মহান জীবনবোধ।

মাওবাদী আদর্শে বলিয়ান তরুণ-যুবক বিপ্লবীগণ নিপীড়িত জনগণের সেবায় বুর্জোয়া লেখাপড়া, সম্পদ, পরিবার সর্বস্ব ত্যাগ করেন। শত্রুর বুলেট ও অমানবিক নির্যাতনের মুখে মরণজয়ী সাহস প্রদর্শন করেন। সেসময় সহ¯্রাধিক ছাত্র ও যুবক ভূমিহীন গরীব কৃষকদের সাথে একাত্ম হওয়া ও তাদেরকে বিপ্লবের জন্য জাগিয়ে তুলতে গেরিলা অঞ্চলে গিয়েছিলেন এবং কষ্টকর গ্রামীণ জীবনকে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭০-৭১ সালে তারুণ্য ধ্বংসের রাষ্ট্রীয় শ্বেত-সন্ত্রাসে সহস্রাধিক হত্যাকান্ড এবং তাতে শতাধিক ছাত্র-যুব বুদ্ধিজীবী কমরেড শহীদ হন।

১৯৬৯-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজ, হিন্দু ছাত্রাবাস মাওবাদী রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। মাওবাদী ছাত্রদের জোট- “প্রগতিশীল ছাত্র সমন্বয় কমিটি” কলকাতা এবং চারদিকের প্রায় সব ছাত্র সংসদই দখল করেছিল। মাওবাদীদের নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ছাত্র ফেডারেশন ‘ঘেরাও’-এর মতো জঙ্গীরূপ আবিস্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অসংখ্য সংগ্রাম পরিচালনা করে। পরবর্তীতে পার্টির ডাকে ঐসকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শতাধিক ছাত্র বিপ্লবী রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। বুর্জোয়া আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া ত্যাগ করে কৃষক জনতার সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য গ্রামে চলে যান।

অন্ধ্র প্রদেশে যারা নকশালবাড়ী আন্দোলনের সমর্থনে প্রথমেই এগিয়ে এসেছিলেন এবং ‘নকশালবাড়ী সংহতি কমিটি’ গঠন করেছিলেন তারা ছিলেন গুনতুর মেডিকেল কলেজের ছাত্র। এম ভেঙ্কটারত্মম এবং প্রেমচাঁদ ছিলেন তার পথিকৃৎ। তারা পার্টির ‘লিবারেশন’ পত্রিকা থেকে প্রবন্ধ তেলেগু ভাষায় অনুবাদ করে কমিউনিস্টদের সর্বস্তরে বিতরণ করেন। চাগান্তি প্রসাদ রাও এবং দেবীনেনি মাল্লিকর জুন্ধদ্ধ ছিলেন মেডিকেলের মেধাবী ছাত্র। তারা শ্রীকাকুলামে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে গিয়েছিলেন। ভাস্কর রাও প্রথমদিকে ছাত্রদের মধ্যে নকশালবাড়ীর রাজনীতি তুলে ধরার জন্য পিকিং রেডিও থেকে সংবাদ ও প্রবন্ধ নিয়ে ‘রণভেরী’ নামে হাতে লেখা ম্যাগাজিন বের করেছিলেন।

তারপর পাঞ্জাব, বিহার, ইউপি, তামিলনাড়ু, কেরালা, দিল্লী ও বোম্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও নকশালবাড়ীর রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলাম এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের সশস্ত্র সংগ্রামের উত্থানেও ছাত্র-যুবরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শ্রীকাকুলামকে কমরেড চারু মজুমদার বলেছিলেন ভারতের “ইয়েনান”। যে শ্রীকাকুলাম গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষক বুদ্ধিজীবী সত্যম, কৈলাশম এবং পরবর্তীতে কমরেড পঞ্চাদ্রি কৃষ্ণমূর্তি। যেখানের লোকসাহিত্যে গেঁথে রয়েছেন বিপ্লবী গণশিল্পী শুব্বারও পানিগ্রাহী। যারা রাষ্ট্রীয় শ্বেতসন্ত্রাসের হাজারো শহীদের উজ্জ্বল তারকা।

নকশালবাড়ীর মাওবাদী বিপ্লবী আন্দোলন ’৭০-এর দশকে বিপর্যস্ত হলেও পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারীগণ সারা ভারতে নতুন বিপ্লবী উত্থানের সৃষ্টি করেছেন। ছত্রিশগড়, বিহার, ঝাড়খ-, উড়িষ্যা, কেরালাসহ পশ্চিমবেঙ্গের লালগড়/ জঙ্গলমহলে। যা নকশালবাড়ী আন্দোলনের নতুন বিকাশ। এখনও ভারতের তরুণরা নতুন সংগ্রামে যুক্ত হচ্ছেন, বিপ্লবের স্বার্থে সর্বস্ব ত্যাগ করছেন। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষে। আমাদের দেশের ছাত্র-যুব-তরুণদেরকেও আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে নকশালবাড়ীর বিপ্লবী শিক্ষা তথা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদে সজ্জিত হয়ে অভিন্ন লক্ষ্যে শ্রমিক-কৃষকের সাথে একাত্ম হতে হবে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা


নক্সালবাড়ীর শিক্ষা অমর হোক!

xNAXALBARI-EKAL-SEKAL-1-678x381.jpg.pagespeed.ic.W35FKhk1wi

নক্সালবাড়ী একটি ছোট এলাকার নাম। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার একটি প্রত্যন্ত থানা ছিল নক্সালবাড়ী। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু গত শতাব্দীর ’৬০-দশকের শেষদিকে সেই নামটি ছড়িয়ে পড়লো সারা ভারতে, সারা দক্ষিণ এশিয়ায়, শুধু তাই নয় সারা দুনিয়ায়। নক্সালবাড়ী হয়ে উঠলো এক অমিততেজ আন্দোলনের নাম। আর আজ ৫০ বছর পরে নক্সালবাড়ী হয়ে উঠেছে, বিশেষত ভারতের নিপীড়িত কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী, নারী, দলিত, প্রগতিশীল ছাত্র বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্তসহ শত কোটি মানুষের বিপ্লবী সংগ্রাম ও মুক্তি আন্দোলনের প্রেরণার উৎস। তা হয়ে উঠেছে এক আলোকস্তম্ভ, যাকে দিশা ধরে আজ নিপীড়িত জনগণ তাদের মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

কী হয়েছিলো নক্সালবাড়ীতে সে সময়টাতে? বাহ্যিকভাবে সেটা ছিল একটি সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থান, যাতে কিনা সেই এলাকা ও আশপাশের আরো দু’একটি থানার (খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া) কৃষকেরা জাগরিত হয়েছিলেন। তারা জোতদারদের জোঁকসম শোষণ-নিপীড়ন উচ্ছেদে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা বিদ্রোহ করেছিলেন। কিন্তু এরকম স্থানীয় বিদ্রোহ, বিশেষত কৃষক বিদ্রোহ ভারতেবর্ষে বহু বহু ঘটেছে। ব্যাপকতা ও বিস্তৃতির দিক থেকে বহু কৃষক অভ্যুত্থান ছিল এর চেয়ে অনেক উন্নত। ভারতবর্ষের প্রায় সকল কৃষক অভ্যুত্থান যেমনটা এক পর্যায়ে সশস্ত্র রূপ গ্রহণ করে, এটিও তেমনটাই হয়েছিল, যদিও ব্যাপকতা ও মাত্রার বিচারে অন্য অনেক আন্দোলনের চেয়ে তা ছিল অনেক দুর্বল। তাহলে নক্সালবাড়ী কেন এত বিশিষ্ট হয়ে উঠলো? কেন পরবর্তীকালে ভারতের গোটা বিপ্লবী আন্দোলনটিই ‘নক্সাল আন্দোলন’ নামে পরিচিতি পেয়ে গেলো? আর কেনই বা সেই আন্দোলন আজ “মাওবাদী আন্দোলন” বা “মাওবাদী বিপ্লব” নামে ভারতের মতো এতবড় এক শক্তিশালী প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রের প্রধানতম বিপদ হিসেবে আবির্ভুত হলো? এখানেই নিহিত নক্সালবাড়ীর কৃষক অভুত্থানের বিশিষ্টতা। আর তার মহত্ত্ব।

নক্সালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল কৃষকদের নিছক কিছু জরুরি স্বার্থকে কেন্দ্র করে নয়। ঠিক-যে, সেখানে জোতদারদের শোষণ-নিপীড়ন উচ্ছেদের বিষয় ছিল, ছিল জোতদারের গোলায় ধান না তুলে কৃষকের দখলে তা নিয়ে আসার কর্মসূচি, ছিল সুদি ব্যবসায়ীদের কাগজপত্র ধ্বংস করে দেবার কর্মকা-, কৃষকের হাতে জমির অধিকার ছিনিয়ে নেবার আন্দোলন। সেখানে শিলিগুড়ির চা-শ্রমিকদের সাথে কৃষকের আন্দোলনের এক দৃঢ় মৈত্রী ও মেলবন্ধনও সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সব কিছুর ঊর্ধ্বে এসবই হয়েছিল সমাজবিপ্লবের সর্বশেষ তাত্ত্বিক-মতাদর্শগত বিকাশ মাওবাদের আদর্শে; শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবকে অক্ষশক্তি হিসেবে আঁকড়ে ধরে; শ্রমিক-কৃষকের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হিসেবে ধারণ করে। এবং ফলতঃ ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বের মাঝে জেঁকে বসা সংস্কারবাদী-নির্বাচনবাদী-সংশোধনবাদী মতাদর্শ, রাজনীতি, ঐতিহ্য ও কর্মপদ্ধতিকে স্পর্ধিত চূর্ণ করার মাধ্যমে তার সাথে পরিপূর্ণ বিচ্ছেদ সাধনের দ্বারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক নব উল্লম্ফনের সূচনা ক’রে।

তৎকালীন ভারতবর্ষের সবচেয়ে অগ্রসর কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা একটি সচেতন আদর্শগত ভিত্তিতে এবং একটি সচেতন বিপ্লবী কর্মসূচির অধীনে, সর্বোপরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের স্বপ্নকে ধারণ করে এই নক্সালবাড়ীকে সৃষ্টি করেছিলেন। যাকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম সচেতন মাওবাদী বিপ্লবী কমরেড চারু মজুমদার। যে কারণে নক্সালবাড়ীর অভ্যুত্থানের সাথে চারু মজুমদারের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। যদিও তাকে অস্বীকার করার বহু অপচেষ্টা হয়েছে, যদিও এই নেতৃত্ব ও এই আন্দোলনটির বিরুদ্ধে হাজারটা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যদিও এই আদর্শটিকে ধ্বংস করার জন্য তাবদ প্রতিক্রিয়াশীল এবং ভারতের চরম ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রশক্তি তার সর্বোচ্চ বর্বরতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু তাদের সে সকল অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। নক্সালবাড়ী রয়ে গেছে জাজ্বল্যমান সত্য রূপে। তার বাণী ছড়িয়ে গেছে সারা ভারত জুড়ে, সারা দক্ষিণ এশিয়ায়। তার বার্তা পৌঁছে গেছে সারা বিশ্বে।

** নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ১৯৬৭ সালের মে মাসে। মে মাসের ২৫ তারিখটিকে বিশেষভাবে আনা হয়, কারণ সেদিনটি ছিল সংগ্রামের একটি টার্নিং পয়েন্ট। এটা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা মনে হতে পারে যে, যখন শিলিগুড়ির কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা এরকম এক কৃষক অভ্যুত্থানের সূচনা ঘটান, তখন তারা অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে যে পার্টির সদস্য ছিলেন সেই পার্টিটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হুকুমেই ঐ দিনের নারকীয় হত্যালীলাটি সংঘটিত হয়েছিলো। কারণ, ওই সিপিএম পার্টিই তখন পশ্চিম বঙ্গের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল। আগে থেকেই ক্রমান্বয়ে তীব্র হতে থাকা কৃষক অভ্যুত্থানটির উপর ২৫ মে তারিখে যে কাপুরুষোচিত পুলিশী আক্রমণ পরিচালিত হয় তাতে  ৮ জন নারী ও ২ জন শিশুসহ মোট ১১ জন শহীদ হন। পরে অবশ্য সিপিএম নেতৃত্ব (জ্যোতি বসুরা) কালবিলম্ব না করে চারু মজুমদারসহ অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদেরকে তাদের সেই পচে যাওয়া পার্টি থেকে বহিস্কার করে। সেজন্য অবশ্য পার্টির বিপ্লবী অংশটির মানসিক প্রস্তুতি হয়েই ছিল।

এ পরিস্থিতিটিকে বুঝতে হলে সে সময়কার ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরিস্থিতিটি খুব সংক্ষেপে হলেও তুলে ধরা যায়। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি মহান স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ৩য় আন্তর্জাতিকের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিলো ২০-এর দশকে। সেই পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের সবেচেয়ে সংগ্রামী, ত্যাগী ও মেধাবী বিপ্লবীরা। কিন্তু পার্টিটি সাংগঠনিকভাবে বিরাট বিস্তৃতি ঘটালেও বিপ্লবী রাজনীতির ভিত্তিতে বিপ্লবী সংগ্রামকে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। তবে কৃষক শ্রমিক জনতার বহু গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে এ পার্টির আন্তরিক নেতা-কর্মীরা যুক্ত থাকেন ও তাতে নেতৃত্ব দেন। এর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও উত্থান ছিল ৪০-দশকের শেষ দিকে ও ৫০-দশকের শুরুতে তেলেঙ্গানার মহান কৃষক অভ্যুত্থান, যা কৃষক ও নিপীড়িত জনতার বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের সংগ্রামে পর্যবসিত হয়। কয়েক হাজার গ্রাম জুড়ে সামন্তবাদী কর্তৃত্ব ভেঙ্গে কৃষক-জনতার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হাজার হাজার কৃষকের বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে। কিন্তু তৎকালীন পার্টি নেতৃত্ব এই মহান উত্থানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা একে বর্জন করে ও নিভিয়ে দেয়Ñ তৎকালীন রাষ্ট্রক্ষমতার কংগ্রেস পার্টির সাথে যোগসাজশে। সেই থেকে শুরু। কিছু পরেই এই নেতৃত্ব যৌক্তিকভাবেই প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র রাশিয়ায় বিপ্লব-বিরোধী ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদীদের উত্থান হলে তাদের সাথে সহজেই যোগ দেয়। এ অবস্থায় বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিপ্লবী নেতৃত্বদানে মাও সেতুঙের নেতৃত্বে চীনা পার্টি এগিয়ে আসে। তারই প্রভাব পড়ে ভারতীয় পার্টিতেও। চীনা পার্টির বিপ্লবী লাইনের প্রভাবে ভারতের আন্তরিক কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা সিপিআই নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এর ফলশ্রুতিতেই গঠিত হয় ১৯৬৪ সালে সিপিএম। জ্যোতি বসু-নাম্বুদ্রিপদদের নেতৃত্বে। স্বভাবতই শিলিগুড়ির বিপ্লবীরা সিপিএম-এ যুক্ত হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই প্রমাণ হতে থাকে যে, সিপিএম নেতৃত্ব শুধু বাহ্যিকভাবেই চীনা পার্টির আদর্শের কথা বলছে, কিন্তু সারবস্তুগতভাবে তারা পুরনো সিপিআই সংশোধনবাদী-সুবিধাবাদীদের পথেই চলছে।

এদিকে কিন্তু মাও-এর শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে শিলিগুড়িসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার আন্তরিক বিপ্লবীরা সত্যিকার কৃষি বিপ্লব সাধনের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন। চারু মুজুমদার তখন শিলিগুড়ি শাখার নেতৃত্বদের একজন। যদিও তিনি ছিলেন পূর্বাপর অসুস্থ, কার্ডিয়াক এ্যাজমার জটিল রোগী, ক্ষীণকায় এক মানুষ। কিন্তু তিনি তার অঞ্চলে পার্টিকে বিপ্লবী চেতনায় সজ্জিত এবং বাস্তব বিপ্লবী সংগ্রামে উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ১৯৬৫ সালের মধ্যেই পর পর আটটি দলিল রচনা করেন। যা পরবর্তীতে ‘ঐতিহাসিক ৮ দলিল’ নামে খ্যাত হয়। এই ছিল মতাদর্শগত-রাজনৈতিক ভিত্তি,  সেইসাথে নতুন বিপ্লবী ধারার সাংগঠনিক কাজেরও গাইড লাইন, যার ভিত্তিতে শিলিগুড়িতে চা-শ্রমিক ও কৃষকদের মাঝে বিপ্লবী সংগঠন বিকশিত হয়ে ওঠে। এবং তারই যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে সংঘটিত হয় নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান।

নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান তিনটি মূল বিষয়কে সামনে নিয়ে এলো- ১. মাও সেতুঙ চিন্তাধারাকে মতাদর্শগত তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা; ২. কৃষি-বিপ্লবকে আঁকড়ে ধরা; এবং ৩. সশস্ত্র বিপ্লবী পথে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা। এই ছিল সূচনা, এক নতুন ভোর, যা পরে বিকশিত হয়ে ওঠে এক রোদ্র করোজ্জল দিবসে। যা ছিল মহান মাওয়ের নেতৃত্বে চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরই ভারতীয় সংস্করণ।

তখনও উপরোক্ত মতাদর্শ-রাজনীতির ভিত্তিতে কোন বিপ্লবী পার্টি গড়ে ওঠেনি। অভ্যুত্থানটি ছিল স্থানীয়। ফলে রাষ্ট্রীয় দমনে ও স্থানীয় শত্রুদের যোগসাজশে যে দমন-নির্যাতন নেমে আসে তাকে মোকাবেলা করে সে অভ্যুত্থান টিকতে পারেনি। কিন্তু তা এক নতুন বার্তা সমগ্র ভারতে সাচ্চা কমিউনিস্ট, সাচ্চা বিপ্লবী ও নিপীড়িত জনগণের সামনে তুলে ধরে। সারা ভারত জুড়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো- নক্সালবাড়ী লাল সেলাম! মুক্তির একই পথ নক্সালবাড়ী!! কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠতে থাকে বহু গ্রুপ ও গোষ্ঠী যারা এই নতুন মতাদর্শ ও রাজনীতির সমর্থনে এগিয়ে এলো। যারই ধারাবাহিকতায় দুই বছর পর ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল কলকাতায় ভারতের সত্যিকার বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, সিপিআই(এমএল) গঠিত হয়, যার প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হন কমরেড চারু মজুমদার।

** পার্টি-গঠনের পর নক্সালবাড়ীর আদর্শে বিপ্লবী সংগ্রাম ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে, তা আরো এগিয়ে চলে। সারা ভারতকে তা কাঁপিয়ে দেয়। শ্রীকাকুলাম, দেবরা-গোপীবল্লভপুর, বীরভূমসহ বিভিন্ন বিপ্লবী এলাকা গড়ে ওঠে। অসংখ্য তরুণ ও কৃষক ঝাঁপিয়ে পড়েন এই মুক্তি সংগ্রামে। এক নতুন বিপ্লবী সংস্কৃতি পুরনো বুর্জোয়া মুৎসুদ্দি সামন্ত সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণার দুর্গে সজোর আঘাত হেনে বেড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র ও কায়েমী স্বার্থবাদীরাও বসে থাকেনি। তারা বিভৎস দমনে ক্ষত-বিক্ষত করে বিপ্লবী কৃষক, তরুণ ও বিপ্লবীদেরকে। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে কমরেড চারু মজুমদারকে গ্রেফতারের পর পুলিশী হেফাজতে তাকে হত্যা করা হয়। মুক্তির এ সংগ্রাম সাময়িকভাবে হলেও মার খেয়ে যায়।

কিন্তু পূর্বেই যেমনটা বলা হয়েছে, নক্সালবাড়ী নিছক এক স্থানীয় কৃষক অভ্যুত্থান ছিল না। সেটা ছিল ভারতবর্ষে বিশ্বের অগ্রসরতম বিপ্লবী মতাদর্শ ও তাত্ত্বিক ভিত্তির আগমনবার্তা। যার কোন মৃত্যু নেই। তাই আমরা দেখি আজ ৫০-বছর পরে নক্সাল আন্দোলন ধ্বংস তো দূরের কথা, বরং ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় নক্সালবাড়ীর আদর্শ মাথা উঁচু করে ভিত্তি গেড়ে বসেছে। বিগত ৫০-বছরে এই আদর্শের বেদিতে স্বেচ্ছাবলী দিয়েছেন হাজারো তরুণ, হাজারো কৃষক ও শ্রমিক। কিন্তু এ মিছিলের শেষ নেই। এবং তার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অমিত শক্তিধর চরম প্রতিক্রিয়াশীল ভারতীয় রাষ্ট্রশক্তিকে পরাজিত করে বিস্তীর্ণ মুক্ত এলাকা, কৃষক ও নিপীড়িত জনগণের, আদিবাসী কৃষক ও নারীদের বিশাল বাহিনী। যার সুবাতাস প্রতিনিয়তই ছড়াতে থাকে ছত্তিশগড়, ঝাড়খ-, বিহার, মহারাষ্ট্র, পশ্চিবঙ্গের জঙ্গলমহল থেকে।

** নক্সালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান, আর ‘নকশাল আন্দোলন’ একই বিষয় নয়। নক্সালবাড়ী দিয়ে সূচিত নকশাল আন্দোলনও অন্ততপক্ষে দুটো প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত- কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বকালীন সময়কাল; আর পরবর্তীকালে অন্ধ্র-বিহার থেকে উত্থিত সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। এগুলো একটি থেকে আরেকটি উচ্চতর। বিপ্লবী সারবস্তুকে আঁকড়ে ধরে কৃত ভুলকে কাটিয়ে ক্রমাগত এগিয়ে যাবার অভিন্ন ধারা। এই ক্রমোন্নতির ধারাটিকে কেউ কেউ বুঝতে চান না, যদিও তারা নকশাল আন্দোলনের সমর্থক। এটা হয় এজন্য যে, তারা একথা অস্বীকার করেন যে, নক্সালবাড়ী বা চারু মজুমদারের জায়গাতেই এ বিপ্লবী আন্দোলন সীমাবদ্ধ নেই, থাকতেও পারে না, থাকলে তা এগুতেও পারতো না।

কিন্তু এগুলোকে এক থেকে আরেকটিকে বিচ্ছিন্ন করলেও চলবে না। নক্সালবাড়ীরই ধারাবাহিকতা আজ ছত্তিশগড়ের গণযুদ্ধ। যাকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে মাওবাদ, নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব- যার কেন্দ্রে রয়েছে কৃষি বিপ্লব এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের গণযুদ্ধ- এই তিন মৌলিক মতাদর্শ ও রাজনীতি।

নক্সালবাড়ীর ৫০-তম বার্ষিকীতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন আর স্মৃতিতর্পণের সাথে যদি উপরোক্ত মতাদর্শ-রাজনীতিকে সঠিকভাবে ধারণ ও প্রয়োগ করা না যায় তাহলে পথভ্রষ্ট হতে হবে। নক্সালবাড়ীর মূল বাণী বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ জনগণের বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিষ্ঠা, বিপ্লবী রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণ, যা কিনা সমাজতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ বেয়ে বিশ্বব্যাপী কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষে এগিয়ে চলবে। তাই, সংগ্রামটি বৈশ্বিক এবং সুদীর্ঘস্থায়ী। কয়েক প্রজন্ম ধরে এই সংগ্রামকে বহমান রাখতে হবে। ভারতে, বাংলাদেশে, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় এবং সারা বিশ্বে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, নক্সালবাড়ী সংখ্যা