এল সালভাদরের কমিউনিস্ট কবি ‘রোকে ডালটন-এর ৩টি জনপ্রিয় কবিতা

Rdalton475x300

রোকে ডালটন– লাতিন আমেরিকার-এল সালভাদরের-লড়াকু কম্যুনিস্ট কবি

রোকে ডালটন লাতিন আমেরিকার-এল সালভাদরের-লড়াকু কম্যুনিস্ট কবি। জন্ম ১৯৩৫ সালে। তিনি পড়াশোনা করেন শুধু এল সালভাদরেই নয়; মেক্সিকো এবং চিলিতেও পড়াশুনার জন্য তার কিছু সময় কাটে। ১৯৫৫ সালে নিজ দেশে তিনি কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। মারা যান ১৯৭৫ সালে। আসলে তাকে মেরে ফেলা হয় এক বিছিন্নতাবাদী কোন্দলের ভেতর দিয়েই। রোকে ডালটনের বেশ কয়েকটি কবিতার বই আছে- যেগুলো লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে একাধিক অর্থেই বিপ্লবী কাজের দৃষ্টান্ত হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। খোদ মার্কস একবার লেখকদের পরামর্শ দিয়েছিলেন এই বলে, ‘তোমরা তোমাদের জমাটবাধা ধারণাগুলোকে একসঙ্গে এমনভাবে ঘঁষতে থাকো যাতে আগুন ধরে!’ মার্কসের এই পরামর্শটাকেই যেন রোকে ডালটন তাঁর মতো করেই গ্রহণ করেছিলেন আর কবিতার স্পেসেই তৈরি করেছিলেন অগ্নিঝরা, জীবন ও জগৎ বদলানো, লিপ্ত ‘ডায়ালেকটিকস্’, ভাষার আর সৌন্দর্যের সম্ভাবনাকে সম্প্রসারিত করেই।

কেবল তো শুরু

এক বন্ধু, এক ধরনের কবিও,
মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর হা হুতাশকে
এভাবে বর্ণনা করলেন:
‘আমি তো বুর্জোয়ার কয়েদবন্দী
যা আমি তা ছাড়া আর কীই বা হতে পারি।’
আর মহান বের্টোল্ট ব্রেখট,
কম্যুনিস্ট, জর্মন নাট্যকার ও কবি
(ক্রমটা ঠিক তাই) লিখেছিলেন:
‘ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অপরাধের তুলনায়
একটা ব্যাংক ডাকাতি তেমন কি আর মন্দ কাজ?’
এ থেকে আমি যে উপসংহার টানি
তা হলো: যদি নিজেকে অতিক্রম করতে গিয়ে
মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী
ব্যাংক ডাকাতি করেই ফেলে
তখন পর্যন্ত সে কিছুই করে নাই
কেবল নিজেকে একশ’ বছরের ক্ষমা
পাইয়ে দেওয়া ছাড়া।

উপদেশ

কখনো ভুলিও না
ফ্যাসিস্টদের মাঝে
সবচাইতে কম ফ্যাসিস্টও
ফ্যাসিস্ট।

উদ্বৃত্ত মূল্যের উপর, 
অথবা মালিক দুইবার ডাকাতি করে প্রতিটি শ্রমিককে

নারীর গার্হস্থ্যশ্রম
পুরুষের জন্য সময় বের করে
যাতে সে সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় কাজটা
সারতে পারে
যার জন্য সে আবার পুরা মজুরিটাও পায় না
(তার বড় অংশের মূল্যকে
পুঁজিপতি ডাকাতি করে নিয়ে যায়)
পায় ততোটুকু
যাতে সে বেঁচেবর্তে থাকে আর কাজ
করে যেতে পারে
সেই মজুরি নিয়েই
পুরুষ বাড়ি ফেরে
আর বউকে বলে:
দ্যাখো, টাইনাটুইনা চালায়া নিতে পারো কিনা
যাতে ঘরের কাজের সকল খরচাপাতি
মিটাইতে পারো।

[লেখাটি সাহিত্য পত্রিকা ওঙ্কার-এর ২০১৫-ফাল্গুন সংখ্যায় প্রকাশিত]

Advertisements

রোহিঙ্গা সঙ্কট সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট

B4972261-096C-42CD-B686-3FD6A6657BF6_cx0_cy4_cw0_w1023_r1_s

বাংলাদেশে শরণার্থী হিসাবে রোহিঙ্গাদের আগমন হঠাৎ বা নতুন কোন ঘটনা নয়। রোহিঙ্গা সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখারও সুযোগ নেই। বিগত কয়েক দশক ধরেই রোহিঙ্গা সমস্যা চলে আসছে। এর পিছনে রয়েছে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের নানা চক্রান্তমূলক তৎপরতা। সুতরাং বাংলাদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গার ধারাবাহিক আগমনকে দেখতে হবে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার জাতিগত নিপীড়ন, বিশ্বব্যাপী তাদের ভূ-রাজনীতিগত আধিপত্য ও দেশে দেশে প্রাকৃতিক সম্পদসহ ব্যাপক শোষণ লুণ্ঠনের কার্যক্রমের অংশ হিসাবে। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন। মুনাফার অন্তহীন উদগ্র লালসার গহ্বরে,“এরা মানব সভ্যতার সামনে একটাই সত্য এনে দাঁড় করিয়েছে, একটি মাত্র স্বাধীনতা- অবাধ বাণিজ্য।” তার রূপ হলো, “নগ্ন, নির্লজ্জ, সাক্ষাৎ পাশবিক শোষণ।” আর এর সহস্রগুণ পাশবিক শোষণ লুণ্ঠনের বেপরোয়া উত্থান ঘটেছে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ বিকাশ সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় উত্তরণের মধ্যে দিয়ে। এর পাশবিকতা এমনই যে, ‘যা কিছু সারবান তা-ই বাতাসে মিলিয়ে যায়, যা পবিত্র তা হয় কলুষিত।’ পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা সভ্যতা ও মানবতাকে পদদলিত করেছে এদের স্বার্থের যূপকাষ্ঠে। আর তাই মাঝে মধ্যেই মানব জীবনের ওপর অভিশাপের মত লক্ষ লক্ষ মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে দেশান্তরিত হতে বাধ্য হয়। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, মহামারিতে কোটি কোটি মৃত লাশের দুর্গন্ধে পৃথিবীকে করছে বিষাক্ত। কত নিষ্ঠুর ঘটনায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ, যুবাসহ কত প্রাণ হত্যা করা হয়েছে, অসহায় মৃত্যুবরণ করেছে, ধর্ষিত হয়েছে, তার নজির পাথর দিয়ে চাপা দিতে চাইলেও ইতিহাস থেকে তা মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। ইউরোপীয়দের আগমনে রেড ইন্ডিয়ান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরবে ইসরাঈল রাষ্ট্রের পত্তনের মধ্যে দিয়ে প্যালেষ্টাইনীদের দুরবস্থাসহ কত অসংখ্য নজির রয়েছে ইতিহাসের কালপঞ্জিতে। 
সাম্প্রতিক বিশ্বে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়াতে আঞ্চলিক যুদ্ধ, জাতিগত দাঙ্গায় রক্তাক্ত করে চলেছে একটার পর একটা জনপদ। বিশেষ করে নব্বই পরবর্তি সময় থেকে পূর্ব ইউরোপ, মধ্য এশিয়াসহ আফ্রিকাতেও থেমে থেমেই সংঘাত ও জাতিগত সংঘর্ষে বন্যার মতো আছড়ে পড়ছে শরণার্থীর ঢল। বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়া সঙ্কট, আফগান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার যুদ্ধ কোটি কোটি মানুষকে শরণার্থীর অভিশপ্ত জীবনে ঠেলে দিয়েছে। এর সাথে আবারও যুক্ত হলো নতুন করে রাখাইনের ঘটনা। রাখাইনে মানবতার বিপর্যয় সিরিয়ার আইলানের ঘটনাকেও ম্লান করে দিয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে অনতিবিলম্বে এ অঞ্চলব্যাপী আরও কোন মর্মান্তিক বিপর্যয়জনিত ঘটনা ঘটবে না, তাকে কে জোর দিয়ে বলতে পারে। 
ইতিহাসের কালপঞ্জিতে বিশ্বব্যাপী আরও একটি দুর্যোগের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিগত দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ যার নগ্ন উদাহরণ। কারণ পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের সামনে যখন দেখা দেয় অমীমাংসেয় সার্বিক সঙ্কট-যা পৃথিবীর সামনে মুখ্য ও একমাত্র করে তোলে একচেটিয়া আধিপত্য ও ক্ষমতা লিপ্সায়। তাদের আশা আকাঙ্খা পুরোপুরি অর্থনৈতিক কারণে চালিত হয়। এই শ্রেণি সব দেশে ভয়ঙ্করভাবে সক্রিয়, এই শ্রেণির লোকজন সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন ও বিচার বিবেচনায় সম্পূর্ণ উদাসীন। তাদের কাছে যুদ্ধ হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদন ও কেনা বেচার একটি উপলক্ষ্য যা তাদের ব্যক্তিগত ( শ্রেণিগত ) স্বাথর্, অর্থ ও প্রতিপত্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করে।’

শ্রেণিগতভাবে শাসক শ্রেণি সংখ্যায় সামান্য হলেও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদ মাধ্যমে এবং সাধারণ চার্চকে (ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান) নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে জনগণের বৃহত্তর অংশের ভাবনা-চিন্তা, আবেগকে নিয়ন্ত্রিত করতে তারা সংগঠিত প্রয়াস চালায়। তার তাই ভয়ঙ্কর সক্রিয় হয়ে ওঠে নিজ দেশে উগ্র শোভিনিজমের আড়ালে ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করতে। অপরদিকে নয়া ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশসমূহে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা তীব্রতর করে তোলে। নয়া উপনিবেশগুলোতে জিইয়ে রাখা জাতিগত, সম্প্রদায়গত ও আঞ্চলিকতার বিরোধকে উসকে দিয়ে মানুষের সাথে মানুষের সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি তছনছ করে একে অপরের বিরুদ্ধে জান্তব দাঙ্গা সংঘাতে লিপ্ত করতে বাধ্য করে। আর সৃষ্টি হয় অভিশপ্ত জীবনের মরণ খেলা। গোটা বিশ্বে চলছে এই মরণঘাতি কর্মকাণ্ড। 
শোষিত-নিপীড়িত শ্রেণি ও জাতিগোষ্ঠীর জানি দুষমণ সাম্রাজ্যবাদীদেরই দেয়া এক তথ্যে মর্মান্তিক চিত্র ফুটে উঠেছে। বর্তমানে বিশ্বে সংঘাত আর জাতিগত বিরোধে ছয় কোটি ছাপান্ন লক্ষ লোক দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমান সারা বিশ্বে দুই কোটি ২৫ লাখ শরণার্থী স্থায়ীরূপ নিয়েছে। এক কোটি মানুষের কোন পরিচয় নেই। বাস্তবের চিত্র এর থেকেও ভয়াবহ। পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে আঞ্চলিক সংঘাত, জাতিগত বিরোধ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার তিনশত মানুষ শরণার্থী হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। রোহিঙ্গা সমস্যাকে এর বাইরের বিষয় নয়। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র চক্রান্তের মুখোশ উম্মোচন করেই এর সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় সামগ্রিক সঙ্কট সুতীব্র হয়ে উঠেছে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-সংঘাতে। পুঁজিববাদের অসম বিকাশের নিয়মে বাজার পুনর্বণ্টনের প্রক্রিয়া তীব্রতর হওয়ায় বিশ্বের একক কর্তৃত্ব ও আধিপত্য ধরে রাখার প্রশ্নটিও বেপরোয়াভাবে ক্রিয়াশীল। ফলে ভূ-রণনীতিগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল নিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে সামনে চলে আসছে। তারই প্রতিফলনে সংঘটিত হচ্ছে আঞ্চলিক যুদ্ধ, জাতিগত, সম্প্রদায়গত সংঘাত ও সংঘর্ষ। এরই হচ্ছে বিপুল পরিমাণে শরণার্থী সমস্যাসহ নানা মানবিক বিপর্যয়। আজ রোহিঙ্গা সমস্যা হল তারই অংশ বিশেষ। জাতিগত, সম্প্রদায়গত নিপীড়ন ও বিভেদের জন্য দায়ী হল সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এর থেকে মুক্তির পথ হলো বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত জাতি ও জনগণকে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলে সাম্রাজ্যবাদ- সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৭।।সংখ্যা-০৫, রোববার।। ২২ অক্টোবর ২০১৭।।


বাংলাদেশঃ ঢাকায় ‘মহান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ’ উদযাপিত

f

 

১৪ নভেম্বর, ২০১৭

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

 রুশ বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কর্মসূচীতে- সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষায় সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের আদর্শ নিষ্ঠ সংগ্রাম এগিয়ে নেবার আহ্বান

গত ১০ নভেম্বর ২০১৭, শুক্রবার ঢাকায় দিনব্যাপী সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপনের কর্মসূচী আয়োজন করে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটি। সকাল ১০টা ৩০মিনিটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে কমিটির আহ্বায়ক হাসান ফকরী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে বেলা ১২টায় শুরু হয় লাল পতাকার মিছিল। মিছিলটি প্রেসক্লাব, পল্টন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে এসে শেষ হয়। ১২টা ৩০মিনিটে শুরু হয় চলচ্চিত্র। দেখানো হয় রুশ বিপ্লব নিয়ে বিখ্যাত সিনেমা ‘অক্টোবর’। দুপুরের খাবারের পর বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে শুরু  হয়ে সন্ধা ৭টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।

কমিটির আহ্বায়ক হাসান ফকরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় উপস্থাপনা করেন কমিটির সদস্য শারমিন রহমান ও আতিফ অনিক। আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর, নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চার সভাপতি জাফর হোসেন, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চের সভাপতি মাসুদ খান,  কমিউনিস্টদের সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক মঞ্জুরুল হক, বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের সভাপতি হাসিবুর রহমান, গণসংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ম. নুরুন্নবী, প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব সৈয়দ আবুল কালাম, জ্বালানী বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ, সাংবাদিক বাদল শাহ আলম, প্রগতিশীল লেখক শাহজাহান সরকার, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের সভাপতি বিপ্লব ভট্টাচার্য এবং আদিবাসী গবেষণা পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, আজ যখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের দেশে দেশে ফ্যাসীবাদ কায়েম হয়েছে, যখন, পুজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় জনগণের উপর বিভৎস শোষণ-নির্যাতন চলছে, তখন, আবারো নতুন করে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন জোরালোভাবে হাজির হচ্ছে। কেননা, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমেই যে মানুষ মুক্তির পথে এগিয়ে যেতে পারে তা ১৯১৭ সালে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব প্রমাণ করেছে। বক্তারা আরো বলেন, সংশোধনবাদের বিজয় ও পুজিবাদরে পথগামীদের ক্ষমতাদখলের কারণে সাময়িকভাবে সমাজতন্ত্র পরাজিত হলেও চুড়ান্তভাবে সমাজতন্ত্রের বিজয় অনিবার্য। সভাপতি হাসান ফকরী বলেন, শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের লক্ষে মুক্তিকামী জনগণের লড়াই অব্যাহত আছে। এদেশেও রুশ বলশেভিক পার্টির মত শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি ও সচেতন শ্রেণীসংগ্রাম বিকশিত করে বুর্জোয়া ও পেটিবুর্জোয়া বিপ্লববিরোধী সকল পথ ও প্রবণতাকে আমরা নস্যাত করবো। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রেরণায় আমরা এ দেশের নিপীড়িত জনগণও সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের সংগ্রাম সফল করতে পারবো।

ধন্যবাদসহ,

বার্তা প্রেরক,

শান্তনু সুমন

সদস্য, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটি। # ০১৯৫২৪৯৯৬৮০।


সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া প্রত্যেক নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করেছিল

Soviet-sasthya-2-768x623

নভেম্বর বিপ্লব পূর্ববর্তী রাশিয়ার স্বাস্থ্য পরিষেবা ছিল যৎসামান্য এবং তা অতি সাধারণ মানের৷ যেটুকু ছিল তা ভোগ করত সে দেশের সম্রাট বা জার এবং অভিজাত শ্রেণি৷

গরিবের ভরসা ছিল শিক্ষা–দীক্ষাহীন গ্রামীণ চিকিৎসক, গ্রামের যাজক এবং ঈশ্বর!  রোগ হলে ঈশ্বরের কাছে চোখের জল ফেলা আর প্রিয়জনের শেষযাত্রায় যোগ দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না৷ কলেরা, স্মলপক্স, টাইফাস, যক্ষ্মা ও সূতিকা জ্বরে লক্ষ লক্ষ মানুষ জারশাসিত রাশিয়ায় অসহায়ভাবে প্রাণ হারাত৷ শিশু মৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ২৬০ জন৷ মানুষের মৃত্যুর হার ছিল হাজার প্রতি ২৯.৪ জন

১৯১৩ সালে ৪,৩৬৭টি গ্রামীণ মেডিকেল স্টেশনে ৪,৫৩৯টি স্বাস্থ্য সহকারী (ফেল্ডসার) জাতীয় পদ ছিল এবং ৮ কোটি গ্রামীণ জনসাধারণের জন্য ছিল ৪৯০৮৭টি হাসপাতাল শয্যা৷ সারা দেশের শয্যা সংখ্যা ছিল ২,০৭,৩০০টি৷ প্রতি হাজারে ১.৩টি শয্যা৷ ওই সালের হিসাবে সমগ্র রাশিয়ার ১৫ কোটি  ৯২ লক্ষ লোকের জন্য ২৩,১৪৩ জন মাত্র চিকিৎসক ছিলেন, অর্থাৎ গড়ে ৬৯০০ লোক প্রতি ১ জন ডাক্তার৷ গ্রামে ১৮৫০০ জনে ১ জন ডাক্তার৷ ফেল্ডসার সংখ্যা ছিল ২৯,০০০, ছিল ১০,০০০ নার্স এবং ১৫,০০০ মিডওয়াইফ৷ হাসপাতালগুলির অবস্থান ছিল পরিকল্পনাবিহীন, এলোমেলো৷ ৩৫ শতাংশ শহরে কোনও হাসপাতাল ছিল না৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় এই নগণ্য স্বাস্থ্য  কাঠামোরও  বড়  অংশ  ধ্বংস  ও  অকেজো  হয়ে যায়৷

বিপ্লবের পর স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন

১৯১৭ সালে নভেম্বর বিপ্লবের পর সোভিয়েত ব্যবস্থায় চিকিৎসা মানুষের অধিকারে পরিণত হয়৷ সোভিয়েত সমাজে মায়েদের জন্যে দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে প্রতি এলাকায় মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল৷ অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের চিকিৎসার সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, ভয় দূর করা, হাসপাতালে প্রসব করানো প্রভৃতি এই কেন্দ্রগুলি করত৷

বিনামূল্যে সর্বদা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার পরিষেবা ছিল৷ এ সময় ছিল মায়েদের চাকরি থেকে ৭৭ দিন সবেতন ছুটি৷ ডাক্তার পরামর্শ দিলে তবেই কাজে যোগদান৷ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থার চতুর্থ মাস থেকে ওভারটাইম কাজ বন্ধ৷ প্রসবের পর প্রত্যেক মাকে কাজের সাড়ে তিন ঘন্টা অন্তর আধঘন্টা ছুটি দেওয়া হত শিশুকে স্তন্যপান করানোর জন্য৷ মাকে রাতের শিফটে কাজ দেওয়া বন্ধ থাকত৷ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থার ছয় মাস থেকে প্রসবের পর চার মাস পর্যন্ত প্রত্যেক মায়ের রেশন দ্বিগুণ করে দেওয়া হত৷ শিশুর জামাকাপড় কেনার জন্য এবং এক বছর বয়স পর্যন্ত খাওয়ার জন্য মাকে নগদ টাকা সাহায্য করা হত৷ ২ মাস থেকে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের ক্রেশে রাখার ব্যবস্থা ছিল৷

শিশুদের এই ক্রেশগুলি ছিল অতুলনীয়৷ শুধু রোগ প্রতিরোধ আর চিকিৎসাই নয় প্রতিটি শিশুর সার্বিক বিকাশের অভূতপূর্ব বন্দোবস্ত করেছিল সোভিয়েত দেশ৷ সারা দেশে শিশুদের দেখার জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ এবং ডিসপেনসারি ও পলিক্লিনিক ছিল৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেই শিশুমৃত্যুর হার, পুষ্টি, টিকাকরণ সহ সব মাপকাঠিতে উন্নত  পুঁজিবাদী দেশগুলিকে ধরে ফেলেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন৷ ক্রস ইনফেকশন রোখার জন্য ছিল সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা৷

সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রথমেই জোর দেওয়া হয়েছিল অধিক সংখ্যায় উপযুক্ত মানের ডাক্তার তৈরিতে৷ তার পাশাপাশি নার্স এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফেল্ডসার (সহকারী চিকিৎসক) তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হত৷ ১৯৮০ সালে দেশে ৮৩টি মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ হিসাবে আরও ৯টি মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে যায়৷ ১৯৮৬ সালে দেশে চিকিৎসক সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ লক্ষ৷ ১ লক্ষ জনসাধারণ পিছু ৪৩০ জন ডাক্তার, যা বিপ্লবপূর্ব রাশিয়ায় ছিল ১ লক্ষ মানুষ পিছু ১৪.৫ জন মাত্র৷ সমাজতন্ত্রে পড়াশোনার কোনও খরচ ছিল না৷ নিত্য নতুন মেডিকেল চিকিৎসা, প্রযুক্তি, ওষুধপত্রের  জ্ঞানার্জনের জন্য প্রত্যেক সোভিয়েত চিকিৎসকের  বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল৷

মেডিকেল স্টেশন, ডিসপেনসারি, পলিক্লিনিক, হাসপাতাল ব্যবস্থা

সোভিয়েত স্বাস্থ্য পরিষেবায় হাসপাতালের ভূমিকা ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমাজতন্ত্রে গড়ে ওঠা বহু স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পুনর্নির্মাণ করতে হয়েছে৷ ১৯৮৩ সালে সারা দেশে ২৩,৫০০ স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্র এবং ৩৬,৬০,০০০ শয্যা সংখ্যা ছিল৷ সোভিয়েতের সর্বত্র সাধারণের হাসপাতাল পরিষেবা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে৷ অঞ্চলভিত্তিক হাসপাতালে গড়ে ১০০০০ লোকের জন্য ৩৫ থেকে ৫০টি বেড ছিল৷ এখানে সার্জেন সহ কয়েক ধরনের বিশেষজ্ঞও থাকত৷ জেলা স্তরে  ৮০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ মানুষ প্রতি হাসপাতালে ১৪ থেকে ১৬ জন বিশেষজ্ঞ এবং ১০০ থেকে ৩০০ বেড থাকত৷ প্রাদেশিক হাসপাতালে ৬০০ থেকে ১২০০ বেড থাকত এবং সেগুলি প্রযুক্তিগতভাবে ছিল অনেক উন্নত৷ এগুলি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও কাজ করত৷ এ ছাড়া শিশুরোগ, প্রসূতি, ক্যানসার, মানসিক রোগ, টিবি, সংক্রমণ, ট্রমা, হার্ট, চক্ষুরোগ ইত্যাদির জন্য বিশেষ বড় হাসপাতাল ও গবেষণাকেন্দ্র ছিল৷ এর বাইরে সোভিয়েত দেশে প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ ১৩০০ বিশ্রাম আবাস এবং তাতে ২১ লক্ষ বেড ছিল৷ পৃথিবীর আর কোনও দেশে এত বিস্তৃত স্বাস্থ্যনিবাস ছিল না৷

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শুধুমাত্র ফেল্ডসার–নার্স পরিচালিত মেডিকেল স্টেশন ছিল৷ তার উপরে ছিল ৪,০০০ লোক প্রতি পলিক্লিনিক ব্যবস্থা– সেখানে জেনারেল প্র্যাকটিশনার্স, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, একজন প্রসূতি ও স্ত্রী–রোগ বিশেষজ্ঞ, একজন দন্ত চিকিৎসক এবং সাথে নার্স,  ক্লার্ক প্রভৃতির ব্যবস্থা ছিল৷ সাধারণ পলিক্লিনিক ছাড়াও শুধু শিশুদের জন্য ১৩,০০০ পলিক্লিনিক ছিল৷ প্রসূতি, শ্রমিক, ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ–তরুণীদের জন্য বিশেষ পলিক্লিনিক সারা দেশে ছড়ানো ছিল৷ ১৯৮৬ সাল নাগাদ সারা দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৪০,১০০ পলিক্লিনিক ছিল, গড়ে ৭০০০ লোকের জন্য একটি৷

১৯৩৬ সালের গৃহীত সংবিধানে (স্ট্যালিন সংবিধান) নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কিত ১২০ নম্বর ধারাতে বলা হয়েছিল– সোভিয়েত নাগরিকদের বার্ধক্যে, অসুস্থতায় এবং অক্ষম অবস্থায় সম্পূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা আছে৷ সরকারি অর্থেই বিস্তৃত ভাবে শ্রমিক এবং অন্যান্য কর্মচারীদের জন্য ইনসিওরেন্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল৷ শ্রমজীবী মানুষদের জন্য সমস্ত প্রকার চিকিৎসা পরিষেবা বিনামূল্যে সুনিশ্চিত করা হয়েছিল এবং তাদের জন্য দেশজুড়ে স্বাস্থ্যনিবাস গড়ে তোলা হয়েছিল৷

ইমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিস

সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সমাজের একটি অভিনব ব্যবস্থা ছিল এই ইএমএস৷ ফোন কল করলেই সেন্ট্রাল সুইচ বোর্ডের মাধ্যমে নিকটবর্তী কেন্দ্র থেকে অ্যাম্বুলেন্সসহ ডাক্তার এবং ফেল্ডসার বা নার্স হাজির হয়ে যেত৷ তারা প্রাথমিক চিকিৎসা করে প্রয়োজনে হাসপাতালে পাঠাত৷ আর ইমার্জেন্সি মনে না করলে রোগীকে অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হত৷ সারা দেশের গ্রাম–শহর মিলিয়ে এরকম ৫,১০০টি ইর্মাজেন্সি মেডিকেল সার্ভিস অ্যাম্বুলেন্স স্টেশন ছিল৷

রিসার্চ–জ্ঞানচর্চা–টেকনোলজি

নতুন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জ্ঞান, স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে গবেষণা এবং প্রযুক্তি কৌশল বাড়ানোর জন্য সোভিয়েত দেশে নিরলস প্রচেষ্টা ছিল৷ মেডিকেল রিসার্চের কাজ বিশেষভাবে পরিচালনার জন্য ৭০০টি গবেষণাকেন্দ্র ছিল৷ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী পাভলভের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সোভিয়েত সরকার সমস্ত সহযোগিতা প্রদান করে এবং তাকে অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সে উত্তীর্ণ করে৷ রিসার্চ প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রকের পরিচালনায় এবং অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স ও ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্সের তত্ত্বাবধানে অর্থদান করা হত৷ গুরুত্বপূর্ণ পত্র–পত্রিকা (জার্নাল) এবং বইপত্র স্বল্পমূল্যে হাজার হাজার কপি ছাপানো হত৷ তার দামও অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম ছিল৷

টাইফাস–টিবি–যৌনরোগ্ বিরুদ্ধে সংগ্রাম

লেনিনের শিক্ষা অনুযায়ী সোভিয়েত সমাজতন্ত্র ঘোষণা করেছিল– ‘আমরা শুধু অর্থনৈতিক ভিত্তিতে মানবসমাজ পুনর্গঠিত করছি না, আমরা বিজ্ঞানসম্মত নিয়ম অনুযায়ী মানবসমাজকে ভেঙে গড়ছি’৷ সোভিয়েত সমাজ সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে শিরোধার্য করে বিজ্ঞানের আধারে এই সমস্ত অসুখকে নিয়ন্ত্রণ ও নির্মুল করে৷

১৯২৫ সালে সোভিয়েত সরকার ‘পতিতাবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের কর্মসূচি’ গ্রহণ করে৷ পতিতাদের বিরুদ্ধে জার সরকারের সমস্ত দমনমূলক আইন বাতিল, এই বৃত্তি থেকে মুনাফাভোগীদের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন যুদ্ধ এবং যৌনরোগাক্রান্ত মানুষের কাছে বিনাপয়সায় চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি গৃহীত হয়৷

১৯৫১ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ঘোষণা করে ‘সোভিয়েত ইউনিয়নে আর পতিতাবৃত্তির অস্তিত্ব নেই’৷ যৌনরোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ৬,০০০ ক্লিনিক ও ১০,০০০ ছোট ডিসপেনসারি ছিল৷ ১৯৪০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ সিফিলিস নির্মূল হয়৷

বিশ্বখ্যাত থোরাসিক সার্জেন ডাঃ নর্মান বেথুন ১৯৩০–এর দশকে ডাক্তারদের এক সভায় উল্লেখ করেন, আমেরিকার কম রোজগারের ৩৮.২ শতাংশ মানুষের কোনও চিকিৎসার সুযোগ নেই৷ আজকের আমেরিকাতেও ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন মানুষের কোনও মেডিকেল ইনসিওরেন্স নেই, অর্থাৎ চিকিৎসার সুযোগ নেই৷ দেশের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষ বেকার৷ এর থেকে বোঝা যায় সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অগ্রসর পুঁজিবাদী দেশগুলির স্বাস্থ্যব্যবস্থার পার্থক্য কতখানি৷

পুঁজিবাদে ফিরে আসা রাশিয়ায় স্বাস্থ্যের দৈন্যদশা

স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ক্ষমতাসীন অযোগ্য নেতৃত্ব সমাজতন্ত্র থেকে সরে এসে পুঁজিবাদ কায়েম করায় বর্তমান রাশিয়ার স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে গর্ব করার মতো বিশেষ কিছু নেই৷ জন্মের পরে আয়ুর যে মাত্রা নির্ধারিত হয় তাতে গর্বাচভ–ইয়েলতসিন রাশিয়া নেপাল–বাংলাদেশের সাথে আজ তুলনীয়৷ স্বাস্থ্যে অর্থবরাদ্দ ভীষণভাবে হ্রাস করা হয়েছে৷ চালু করা হয়েছে ম্যান্ডেটরি হেলথ ইনসিওরেন্স যার প্রিমিয়াম ব্যক্তিকেই দিতে হবে৷ আজ পুঁজিবাদী রাশিয়ায় মানুষের অধিকার নেই বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার৷ যদিও সংবিধানে স্বাস্থ্য নাগরিকের অধিকার হিসাবে স্বীকৃত– কিন্তু তার ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন রকমের ইনসিওরেন্সের মাধ্যমে৷ সরকার সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছে৷ টাকা বা সাজ–সরঞ্জামের অভাবের কথা বলে এই ইনসিওরেন্স কোম্পানিগুলি স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে নাগরিকদের প্রায়শই বঞ্চিত করে৷

পুঁজিবাদী রাশিয়াতে গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত ডিসপেনসারি ও পলিক্লিনিকগুলি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে৷ অর্থ ও সরবরাহের অভাবে পরিষেবা ধুঁকছে৷ গ্রামের সাথে শহরের বহু হাসপাতাল বন্ধ করা হয়েছে৷ কমানো হয়েছে শয্যাসংখ্যা৷ আউটডোর প্রেসক্রিপশনের ওষুধ কোথাও সরবরাহ করা হয় না৷ সামান্য কিছু প্রান্তিক মানুষদের ছাড়া৷ পকেটের টাকা খরচ করে কিনে নিতে হয়৷

২০১২ সালের ‘মে ডিক্রি’–তে প্রেসিডেন্ট পুতিন স্বাস্থ্য কর্মচারীদের বেতনবৃদ্ধি এবং সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবাকে ধীরে ধীরে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন৷ যে দেশ পৃথিবীতে যৌনরোগকে নির্মূল করেছিল এবং পতিতাবৃত্তিকে সমাজজীবন থেকে বিনাশ করেছিল– সে দেশে এখন বর্তমান সময়ের মারণ যৌনরোগ– এইচ আই ভি–এইডস রোগের রমরমা৷ পুঁজিবাদী রাশিয়ার বুকে শুধু নয়, পৃথিবীর প্রায় সব শহরেই রুশ যুবতীদের দেহ বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে৷ সমাজতন্ত্র থেকে সরে আসায় যক্ষ্মা সংক্রমণ এবং তা থেকে মৃত্যু দুটোই অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে৷ বেড়েছে শিশুমৃত্যু, প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু৷

জারের আমলের জরাগ্রস্ত চিন্তাভাবনা ও জঘন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভেঙে লেনিন–স্ট্যালিনের নেতৃত্বে সর্বাধুনিক এবং সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক দর্শন মার্কসবাদ–লেনিনবাদ প্রয়োগ করে নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বলশেভিক পার্টি রাশিয়ার সমাজে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল, তার প্রভাবে সারা দুনিয়ার বুকে সোভিয়েত স্বাস্থ্যব্যবস্থা হয়ে উঠেছিল শীর্ষস্থানীয় এবং দৃষ্টান্তস্বরূপ৷ বিশ্বের মানুষের, বিশেষত ধনতান্ত্রিক পশ্চিমী দেশগুলির কাছে যা ছিল বিস্ময় সৃষ্টিকারী এবং ঈর্ষার বস্তু৷ পুঁজিবাদে ফিরে আসা রাশিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থার দৈন্যদশা আবার প্রমাণ করল সমাজতন্ত্রই সবার জন্য সুনিশ্চিত স্বাস্থ্যের শেষ কথা৷


সমাজতান্ত্রিক সমাজের বিপর্যয়ের কারণ

1612251300-The-Fall-Of-The-Soviet-Union

সমাজতান্ত্রিক সমাজ বলতে কমরেড লেনিন-স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং কমরেড মাওয়ের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক চীনকেই বোঝানো হয়ে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনেই কেবলমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং তা কমিউনিজমের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণিকে পথ নির্দেশ করেছিল। অন্য কিছু দেশ, যেমন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, উত্তর কোরিয়া, কিউবা, পূর্ব ইউরোপীয় কয়েকটি দেশে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হলেও সেসব দেশ সমাজতন্ত্রের পথে সঠিকভাবে এগোতে পারেনি। হয় তারা সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্ততায় চলে গেছে, নতুবা বিভিন্ন ধরনের জাতীয়তাবাদী ও সংশোধনবাদী তত্ত্বগত অনুশীলনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাই সমাজতন্ত্রের দৃষ্টান্ত হিসেবে উপরোক্ত দুটো সময়ের রাষ্ট্রকেই বোঝানো হয়। যদিও সেগুলোও যথাক্রমে স্ট্যালিন ও মাও-য়ের মৃত্যুর পর পুঁজিবাদে অধঃপতিত হয় এবং এভাবে সমাজতন্ত্র সাময়িকভাবে হলেও পরাজিত হয়।

          কিন্তু প্রশ্ন হলো এ দুটো সমাজতন্ত্রের আদর্শস্থানীয় দেশ হলেও কেন সেখানে সমাজতন্ত্র টিকতে পারলো না? অন্যকথায় সমাজতন্ত্রের এই বিপর্যয়ের কারণ কী?

১৯৩৬ সালে কমরেড স্ট্যালিন বলেছিলেন, রাশিয়ার সমাজতন্ত্র পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। এখন আর ব্যক্তি মালিকানা নেই। বৈরী শ্রেণি নেই। কাজেই বৈরী শ্রেণিসংগ্রামও নেই। তিনি সমাজতন্ত্রের মূল শত্রু হিসেবে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করেন।

কিন্তু আমরা দেখেছি যে, সমাজতন্ত্রের অভ্যন্তর থেকেই আসল শত্রু সৃষ্টি হয়েছে। যদিও তাতে বাইরের সাম্রাজ্যবাদীদের বিরাট মদদ ছিল, এবং সাম্রাজ্যবাদের বাস্তবতা সমাজতন্ত্রের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল, তথাপি এটা বলা সঙ্গত যে, অভ্যন্তরীণ শ্রেণি সংগ্রামের বাস্তবতাকে স্ট্যালিনের ঐ লাইন কার্যত বাতিল করে দিয়েছিল।

মাও রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর এই সারসংকলন করেন।

মাও দেখান যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজেও বৈরী শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রাম থাকে এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজেও শ্রেণি সংগ্রামই হলো চাবিকাঠি। তিনি  লেনিন বর্ণিত সর্বহারা একনায়কত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। লেনিন বলেছিলেন “বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিরোধ, নিজের পতনের কারণে (একটি মাত্র দেশে পতন ঘটলেও) দশ গুণ তর হয়ে উঠে। তার প্রবলতা শুধু আন্তর্জাতিক পুঁজির শক্তিতে নয়, শুধু তার বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃঢ়তায় ও শক্তিতে নয়, উপরন্তু অভ্যাসগত শক্তিতে ও ক্ষুদে উৎপাদনের শক্তিতেও বটে। কারণ দুঃখের বিষয় এই যে, দুনিয়ায় এখনো অনেক অনেক বেশি ক্ষুদে উৎপাদন রয়েছে, আর ক্ষুদে উৎপাদন সর্বদাই, প্রতিদিন প্রতিঘণ্টায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও বিপুল পরিমাণে  পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া শ্রেণিকে জন্ম দিচ্ছে। এই সব কিছু কারণে, সর্বহারাশ্রেণির একনায়কত্ব  হচ্ছে অপরিহার্য।” (লেনিন রচনাবলী. চীনা সংস্করণ, খ- ৩১, পৃঃ ৬)

মাও আন্তর্জাতিক সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রামের সাথে নিজ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবেরও সারসংকলন করেন। ১৯৫৭ সালে জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সঠিক মীমাংসা সম্পর্কে দলিলে মূর্ত বিশ্লেষণ দ্বারা দেখান, মালিকানা ব্যবস্থার সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের মাধ্যমে কৃষি সমবায়ের অর্জন হলেও শ্রেণিসমূহ, শ্রেণিদ্বন্দ্বসমূহ এবং শ্রেণি সংগ্রাম রয়েছে। উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদিকা শক্তির মধ্যে, আর উপরিকাঠামো ও অর্থনৈতিক ভিত্তির মধ্যে সঙ্গতি ও দ্বন্দ্ব তখনো রয়ে গেছে। তিনি মালিকানা ব্যবস্থা পরিবর্তনের পর সর্বহারা একনায়কত্বের করণীয় ও কর্মনীতিসমূহ নিরূপণ করেন এবং সর্বহারা একনায়কত্বের অধীনে বিপ্লব অব্যাহত রাখার ও পার্টির মৌলিক লাইনের তত্ত্বগত ভিত্তি স্থাপন করেন। তার ভিত্তিতে দীর্ঘ সময়ব্যাপী লিউ শাওচী, লিন-পিয়াও এবং তেং-শিয়াও পিং ও তাদের অনুসারীদের অনুসৃত সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তীব্র মতাদর্শগত-রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করেন, যা মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব নামে পরিচিত। ১৯৬৯ সালে নবম কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে মাও বলেছিলেন “স্পষ্টতঃই প্রতীয়মান যে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ব্যতীত আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না, কারণ আমাদের ভিত্তি মজবুত ছিল না। আমার পর্যবেক্ষণ থেকে, আমি ভীত যে কারখানাসমূহের একটা ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতেই- আমি মনে করছিনা সকল কিংবা নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ- প্রকৃত মার্কসবাদীদের এবং শ্রমিক জনগণের হাতে নেতৃত্ব ছিলনা। তার মানে এই নয় যে কারখানাসমূহের নেতৃত্বে কোন ভাল মানুষ ছিল না। সেখানে তা ছিল। পার্টির কমিটিসমূহের সম্পাদক, উপসম্পাদক ও সদস্যদের মধ্যে এবং পার্টির শাখা সম্পাদকের মধ্যে ভাল মানুষ ছিল। কিন্তু তারা লিউ শাও-চি’র শুধুমাত্র বৈষয়িক প্রণোদনাকে অবলম্বন করা, মুনাফাকে কমান্ডে রাখা, আর সর্বহারা রাজনীতিকে উৎসাহের পরিবর্তে বোনাসের মুষ্টিভিক্ষা ও এ জাতীয় বিষয়কে উৎসাহ দেবার লাইনকে অনুসরণ করছিলেন।” “কিন্তু কারখানাসমূহে প্রকৃতই মন্দ লোক বিদ্যমান।” “এটাই দেখাচ্ছে যে বিপ্লব এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে।”

মাও আরো বলেছিলেন, “আমাদের দেশ বর্তমানে একটা পণ্য ব্যবস্থা অনুশীলন করছে, মজুরি ব্যবস্থাও অসম, যেমন আট গ্রেড মজুরি স্কেল ও এ রকম আরো কিছু। সর্বহারা একনায়কত্বের অধীনে এ জাতীয় বিষয়গুলোকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই, লিন পিয়াওয়ের মতো লোকেরা ক্ষমতায় আসলে তাদের পক্ষে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তৈরী করা খুবই সহজ হবে।” এই সব বক্তব্যের মধ্যদিয়ে মাও সমাজতন্ত্র থেকে কমিউনিজমে পৌঁছার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন শ্রেণি সংগ্রাম, সর্বহারা একনায়কত্বের কথা বলেছেন। এবং কয়েক দশক অন্তর অন্তর সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরিচালনার পথনির্দেশ করেছেন।

এ থেকেই বোঝা যায় যে, চীনের সমাজতন্ত্র বিপদমুক্ত ছিল না। যদিও মাও মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের পুনরুত্থানকে দশ বছর ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু নিরন্তর এক কঠিন বিপ্লব চলাকালীন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। চীনা পার্টি তখনও যথেষ্টভাবে পুনর্গঠিত হয়নি। নতুন লাইনে নেতৃত্ব সংকটও ছিল এক বিরাট সমস্যা।

এসবই চীনের সমাজতন্ত্রকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে না পারায় পর্যবসিত হয়।

চীনে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটলেও পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ঠেকানোর জন্য মাওয়ের সাংস্কতিক বিপ্লবের লাইনই যে সমাধান তাতে কোন সন্দেহ নেই। রাশিয়া ও চীনে ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদ হয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলেও বুর্জোয়া উপাদান তখনও থেকেই গিয়েছিল। তখনো মার্কস বর্ণিত চার সকলের বিলোপ সাধন সম্পূর্ণ হয়নি। অর্থাৎ, ১) সাধারণভাবে সকল শ্রেণি পার্থক্য বিলোপ; ২) যে উৎপাদন সম্পর্ক সমূহের উপর এগুলো দাঁড়িয়ে তার সকলগুলোর বিলোপ; ৩) এই উৎপাদন সম্পর্কসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সকল সামাজিক সম্পর্কের বিলোপ; এবং ৪) এই সামাজিক সম্পর্কসমূহ থেকে জন্ম নেওয়া সকল ধারণাসমূহের বিপ্লবীকরণ সম্পূর্ণতা পায়নি। বিপ্লব চলমান ছিল। এ অবস্থায় মাও-এর মৃত্যুর পর পরই সংকটের সুযোগে পুঁজিবাদের পথগামী তেং শিয়াও পিং চক্র ক্যু-দেতার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মাও-এর প্রকৃত অনুসারীদের কু-চক্রী হিসেবে চিত্রিত করে। মাওকে রক্ষার নামে সারাদেশে প্রকৃত মাও অনুসারীদের উপর রাষ্ট্রীয় দমন চালিয়ে তাদের বিধস্ত করে। সর্বহারা একনায়কত্ব বর্জন করে পুঁজিবাদ পুনপ্রতিষ্ঠিত করে।

সমাজতান্ত্রিক সমাজের চূড়ান্ত গন্তব্য হল কমিউনিজম। কমিউনিজম হল শোষণ, বৈষম্য ও শ্রেণিহীন সুসভ্য মানব সমাজের এক বিজ্ঞানসম্মত বিশ্বব্যবস্থা। কিন্তু এই বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্তর্বর্তীকালে সমাজতন্ত্র হচ্ছে একটি উৎক্রমণকালীণ স্তর যা পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের পথগামী সংশোধনবাদীদের সাথে নিরন্তর সংগ্রাম এবং জয়-পরাজয়ের মধ্যদিয়ে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত কমিউনিজমে পৌঁছাবে।

এই অন্তর্বর্তীস্তরে মাও-প্রদর্শিত ও অনুশীলিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। নিশ্চয়ই এই বিপ্লবেই সব শিক্ষা সম্পন্ন হয়ে গেছে তা নয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাও-শিক্ষাকে আরো এগিয়ে নিতে হবে- প্রথম সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সারসংকলন করে এবং আরো নব নব সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ ধরে এগিয়ে চলে। যার মধ্য দিয়ে আগামীতে আরো উচ্চতর সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। এবং সমাজতন্ত্রের বিজয়কে স্থায়ী করা যাবে। সেটা সফলভাবে এগিয়ে যাবে বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের কাংখিত বন্দরে। 

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, অক্টোবর ’১৭ সংখ্যা


অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে সৃষ্ট নিপীড়িত জনগণের শিল্প-সাহিত্য

RussianRevsmall-48b84eb46f24673f0fb27995c4ca2921

অক্টোবর বিপ্লবই বুর্জোয়া শিল্প-সাহিত্যের বিপরীতে প্রথম বিপ্লবী শিল্প-সাহিত্যের শক্ত ভিত স্থাপন করে। শিল্প-সাহিত্যের বুর্জোয়া শ্লোগান ‘শিল্পের জন্য শিল্প’-কে মোকাবেলা করে ‘জনগণের জন্য শিল্প’ এই আওয়াজ তোলে এবং বুর্জোয়া সাহিত্য ও বিপ্লবী সাহিত্যের মধ্যে ভেদ রেখা টেনে দেয়।

মার্কসবাদীরা জানে, যেকোন সমাজের ক্ষেত্রে তার অর্থনীতিই হলো ভিত্তি। রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্পকলা তার উপরিকাঠামো। যা অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে গড়ে ওঠে, আবার সেই অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সেবা ও প্রভাবিত করে। পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির উপর দন্ডায়মান তাদের স্ব স্ব উপরিকাঠামো। শ্রেণি বিভক্ত সমাজে শ্রেণির রাজনীতির অধীন শাসন-ব্যবস্থায় সংস্কৃতি ও সাহিত্য-শিল্পকলা কখনই শ্রেণি নিরপেক্ষ হতে পারেনা। বুর্জোয়ারা এটাকে আড়াল করে সাহিত্য শিল্পকলা সকলের জন্য- এই কথা বলে। যেভাবে শাসক শ্রেণির বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে শাশ্বত ও সকলের জন্য একই- একথা বলে। অক্টোবর বিপ্লবই বুর্জোয়াদের এই মিথ্যাচারকে পুরোপুরি ভাবে উন্মোচন করে দেয়।

বুর্জোয়া শিল্প-সাহিত্য পুঁজিবাদী উৎপাদন ও বন্টন কর্তৃক সৃষ্ট যে সামাজিক সম্পর্ক ও সংস্কৃতি তৈরি হয় তাকেই তুলে ধরে। পুঁজিবাদের ব্যক্তিমালিকানা ভিত্তিক চিন্তা-চেতনা-ভাবাদর্শ তার সংস্কৃতি বা শিল্প-সাহিত্যে প্রকাশিত হয়। ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রবাদ, ভোগবাদ, বিনিময় সম্পর্কের শ্রেণিভেদ বুর্জোয়া শিল্প-সাহিত্য তার দর্পন। বুর্জোয়া শিল্প-সাহিত্য শ্রমিক-কৃষক-নিপীড়িত জাতি-জনগণের সংগ্রামী চেতনা ভোতা করে দেয় এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে তাদেরকে বিভক্ত রাখে।

অন্যদিকে জনগণের বিপ্লবী শিল্প-সাহিত্য পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ উন্মোচন ও উচ্ছেদের জন্য ঐক্যবদ্ধ করে, শ্রেণি সচেতনতাকে তীক্ষ্ণ করে এবং সংগ্রামের দিশা দেয়। শিক্ষা দেয় শ্রমিকশ্রেণির হাতে রাষ্ট্র-ক্ষমতা ব্যতীত শ্রমিকশ্রেণি ও নিপীড়িত জনগণের মুক্তি নেই। মাও বলেছেন- “সর্বহারা শ্রেণির সাহিত্য ও শিল্পকলা হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির সমগ্র বিপ্লবী কর্মকা-ের একটা অংশ”। লেনিন বলেছেন, সমগ্র বিপ্লবী যন্ত্রের “দাঁতওয়ালা চাকা ও ইস্ক্রুপ”। এই সাহিত্য, শিল্পকলা ব্যক্তি মানুষকে বিজ্ঞান ও বস্তুবাদী ধারণায় সজ্জিত করে এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য জনগণের মধ্যে বিপ্লবী মতাদর্শের বীজ বপন করে। ফলে পুঁজিবাদে বিভক্ত জনগণ শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয়, লড়াই করে। অতএব বিপ্লবী সাহিত্য বিপ্লবী সংগ্রামকে জাগরিত করে; আবার বিপ্লবী সংগ্রাম বিপ্লবী সাহিত্যকদের প্রেরণা জোগায়, তাদেরকে সৃষ্টির বিষয়বস্তুর জোগান দেয়। বিপ্লবী সংগ্রামী তৎপরতা কর্মকা- থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের  বিপ্লবী সাহিত্য নির্মাণ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামে অংশগ্রহণ ও তার মতাদর্শে সজ্জিত হওয়া। প্রগতিশীল লেখক-সাহিত্যিকদের এর জন্য প্রস্তুত হতে হবে। বিপ্লব গড়ে উঠার পূর্বে তাকে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখা, বিপ্লব হলে পরে তাকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে যুক্ত হওয়া।

অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে দেখি ম্যাক্সিম গোর্কির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, তার উপন্যাস, গল্প, নাটক, কবিতা বিপ্লব সংগঠিত করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। তার ‘মা’ উপন্যাস পড়ে লেনিন প্রশংসা করেছিলেন যে, “এটি একটি দরকারী বই, বহু মজুর বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন অসচেতন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে, এবার ‘মা’ পড়ে তাদের মহা উপকার হবে…… খুবই যুগোপযোগী বই।” বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও সাহিত্য নির্মাণের জন্য গোর্কিকে নির্বাসন, কারাবরণ ও গোপনে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। সাহিত্য, সাংস্কৃতিক কর্মীদের এর জন্যও প্রস্তুত থাকতে হয়। দেশে দেশে বিপ্লবী সংগ্রামে এরকমটাই দেখা যায়। অক্টোবর বিপ্লবী সাহিত্যের মধ্যে আলোচিত কিছু হলো- মা, ইস্পাত, কুমারী মাটির ঘুম ভাঙ্গলো, জীবন জয়ের পথে, ভলকলামস্কয়ে সড়ক, গোত্রান্তর ইত্যাদি। এই সব সাহিত্য সমাজতান্ত্রিক সমাজের বিনির্মাণ এবং শ্রমিক-কৃষক নিপীড়িত জনগণকে পুনর্গঠনে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখে।

যেমন, ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ একটি রাজনৈতিক ভাবাদর্শের উপন্যাস। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকে রূপায়িত করে এটি রচিত হয়। এ উপন্যাসের নায়ক পাভেল একজন শ্রমিক। পাভেলের রাজনৈতিক দৃঢ় আদর্শ জারতন্ত্রের জেল জুলুম শত নির্যাতনও তাকে দমাতে পারেনা, বরং আরও ইস্পাত দৃঢ় করে। শ্রমিক পাভেলের মা নিলভনা সাধারণ শ্রমিকের মায়ের মতই বস্তিতে থাকত। পাভেলের রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগ্রাম তার মাকে বিপ্লবী প্রেরণা জোগায়। মা নিলভনা সাধারণ গৃহিনী থেকে আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হয়ে উঠেন। উপন্যাসে জারতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বাধীন প্রকৃত মানবিক সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার চেতনায় জনগণকে উজ্জীবিত করে। একই সাথে জনগণের মধ্যে আন্তর্জাতিক চেতনার শিক্ষাও তুলে ধরে।

পাশাপাশি সামন্ত বুর্জোয়া সাহিত্য রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে এর রচনাকাল ছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক বিরোধী জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের নেতৃত্বে জনগণের বিদ্রোহের যুগ। এ সময় রচিত উপন্যাসে দেখানো হয়েছে বিপ্লবীদেরকে উশৃঙ্খল-চরমপন্থী হিসেবে, আড়াল করা হয়েছে বৃটিশ, জমিদার, সামন্তদের কৃষক জনগণের উপর শোষণ, লুন্ঠন, লুটতরাজের ফলে দুর্ভিক্ষ, লক্ষ-কোটি কৃষকের না খেয়ে মরার চিত্রকে। এ রচনায় রবীন্দ্রনাথ তার শ্রেণি চেতনারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সংক্ষেপে এ হলো সামন্ত, বুর্জোয়া শোষক শ্রেণির গণবিরোধী সাহিত্যর নমুনা।

কাজেই প্রগতিশীল, বিপ্লবী শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠনের দায়িত্ব হলো গণবিরোধী বুর্জোয়া শিল্প সাহিত্যের সমালোচনা ও তাকে উন্মোচন করা এবং শ্রমিকশ্রেণির সাহিত্য নির্মাণের জন্য তার সংগ্রামে একাত্ম হওয়া। এটাই হলো সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে সাম্রাজ্যবাদ, দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই। এ লড়াই নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করে সমাজতান্ত্রিক-কমিউনিজম ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করবে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, অক্টোবর ’১৭ সংখ্যা


পুঁজিবাদ উচ্ছেদ করে শেষ পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাই কায়েম হবে — মাও সে তুঙ

mao-zedong-456x300

নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার সুপ্রিম সোভিয়েত আহূত সমাবেশে ১৯৫৭ সালের ৬ নভেম্বর মহান নেতা মাও সেতুঙের ভাষণ৷ এটি ওই বছরই পিপলস চায়না পত্রিকার ১ ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়৷

প্রিয় কমরেডগণ,

মহান নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস, জনগণতান্ত্রিক চীনের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি, পার্টি সদস্য ও দেশের সমস্ত মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে আমি এবং চীনের প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্যরা মহান সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি, সরকার, এদেশের মানুষ এবং এখানে উপস্থিত সমস্ত কমরেড ও বন্ধুদের উষ্ণ ভ্রাতৃত্বমূলক অভিনন্দন জানাবার সুযোগ পেয়ে সম্মানিত বোধ করছি (উৎসাহব্যঞ্জক করতালি)৷ আমাদের বিপ্লবী শিক্ষক লেনিন বার বার উল্লেখ করেছেন, ৪০ বছর আগে সোভিয়েতের জনগণ যে মহান বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করেছিল৷

ইতিহাসে বহু ধরনের বিপ্লব ঘটেছে, কিন্তু এর কোনওটিই নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সঙ্গে তুলনীয় নয়৷

বিশ্বের সমস্ত প্রগতিশীল ও খেটে–খাওয়ামানুষ হাজার হাজার বছর ধরে এমন এক সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে মানুষের উপর মানুষের শোষণ থাকবে না৷ নভেম্বর বিপ্লবের মাধ্যমে প্রথম বার পৃথিবীর ছয়ভাগের একভাগ ভূখণ্ডে সেই স্বপ্ন সফল হয়েছে৷ এই বিপ্লব প্রমাণ করেছে, জমিদার ও পুঁজিপতিদের বাদ দিয়েই সাধারণ মানুষ পরিকল্পিত উপায়ে স্বাধীন ও সুখী এক নতুন জীবন গড়ে তুলতে পারেন৷ এই বিপ্লব এ–ও প্রমাণ করেছে যে, সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়ন না থাকলেই বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রগুলি মিলেমিশে বন্ধুর মতো এক সাথে বসবাস করতে পারে৷ গত ৪০ বছর সোভিয়েতের জনগণ দুর্গম পথ অতিক্রম করেছেন৷ বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশটিকে ধ্বংস করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা সমস্ত রকমের অপচেষ্টা চালিয়েছে৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের শত্রুদের একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনায় বেশি শক্তিশালী বলে মনে হয়েছিল এবং তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর দু–দু’বার সশস্ত্র আক্রমণও চালায়৷ কিন্তু সাহসী সোভিয়েত জনগণ তাঁদের মহান কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে হামলাকারীদের সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন৷ (করতালি)৷ সোভিয়েত ইউনিয়ন অপরাজেয় থেকেছে কারণ, এই দেশ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে হঠিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং শোষক শ্রেণির একনায়কত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করে প্রতিষ্ঠা করেছে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বকে৷ এই দেশে সামাজিক উৎপাদিকা শক্তির উন্নয়ন হয়েছে এমন তীব্র গতিতে, যার ধারে কাছে পৌঁছতে পারেনি পুঁজিবাদী দেশগুলি৷ এই দেশ প্রকৃত অর্থে সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের চর্চা করে, জাতীয় নিপীড়নের প্রকৃত বিরুদ্ধতা করে এবং নিপীড়িত দেশগুলিকে মুক্ত হতে সাহায্য করে৷ এমন একটি দেশকে সমস্ত দেশবাসী ও বিশ্বের সকল দেশের জনসাধারণ উৎসাহভরে সমর্থন করে৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি এই দু’ধরনের সমর্থন এমন উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, রাষ্ট্রগুলির ইতিহাসে যার তুলনা নেই৷ গত ৪০ বছরে সোভিয়েত ইউনিয়নের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেছে৷ বিপ্লবের আগে অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে রাশিয়া ছিল একটি পিছিয়ে পড়া দেশ৷ বর্তমানে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম সারির শিল্পোন্নত দেশগুলির মধ্যে অন্যতম৷ সোভিয়েতের জনগণের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত উন্নত হয়ে চলেছে৷ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলির উন্নয়নের মাপকাঠিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন পুঁজিবাদী দেশগুলিকে অনেক পিছনে ফেলেছে৷ বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র স্থাপন করেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন৷ এই দেশই দুনিয়ার মধ্যে প্রথম তৈরি করেছে যাত্রীবাহী জেট প্লেন, আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক রকেট এবং উৎক্ষেপণ করেছে মনুষ্যনির্মিত প্রথম ও দ্বিতীয় পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী কৃত্রিম উপগ্রহ৷ দু’বার মানুষের তৈরি করা পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্যকে গোটা বিশ্বই এই বলে স্বীকৃতি দিয়েছে যে, এর দ্বারা প্রকৃতির উপর মানুষের বিজয়ের এক নতুন যুগের সূচনা হল৷ শুধু সোভিয়েত জনগণই নয়, গোটা বিশ্বের সর্বহারা শ্রেণি ও সমগ্র মানবজাতি এর জন্য গর্ব অনুভব করে (করতালি)৷ কেবল অল্প কিছু প্রতিক্রিয়াশীলই এ সবে অখুশি৷ বাস্তব কর্তব্য সমাধা করার ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি যে সৃজনশীলতার সঙ্গে মার্কসবাদ–লেনিনব প্রয়োগ করেছে, তা সোভিয়েত জনগণের নির্মাণ কার্যে অটুট সাফল্য নিশ্চিত করেছে৷ বিশ্বজুড়ে জনগণ তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ আরও সুস্পষ্টরূপে দেখতে শুরু করেছে সোভিয়েত জনগণের সাফল্যকে ঘিরে৷ বস্তুতপক্ষে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পথ, নভেম্বর বিপ্লবের পথ হল সমগ্র মানবজাতির অগ্রগতির আলোকোজ্জ্বল সাধারণ পথ (করতালি)৷ বিশ্বের জনগণ নভেম্বর বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উষ্ণ আন্তরিকতায় উদযাপন করছে, কারণ গত ৪০ বছরের ইতিহাস তাদের মধ্যে এই প্রত্যয় এনে দিয়েছে যে, সর্বহারা শ্রেণি বুর্জোয়া শ্রেণিকে নিশ্চিতরূপে পরাজিত করতে সক্ষম, সমাজতন্ত্র নিশ্চিতভাবে পুঁজিবাদকে খতম করতে সক্ষম এবং নিপীড়িত জাতি সাম্রাজ্যবাদীদের পরাস্ত করতে সক্ষম৷ অবশ্য নানা প্রতিবন্ধকতা, নানা বাঁক ও মোড়ের সামনে পড়তে হবে জনগণকে৷ ৩০ বছর আগে লেনিন যথার্থই বলেছিলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বরফ গলে গেছে৷ পথ আজ উন্মুক্ত এবং আলোকোজ্জ্বল’৷ (তীব্র হর্ষধ্বনি) চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব নভেম্বর বিপ্লবের আলোকে উদ্ভাসিত সর্বহারা শ্রেণির বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অংশ৷ চীনের বিপ্লবের কতকগুলি নিজস্ব জাতীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং সেগুলি বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে৷ কিন্তু আমাদের বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকার্যে আমরা সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি এবং জনগণের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতাকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগিয়েছি৷ চীনের জনগণের সৌভাগ্য যে, তাদের সামনে রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের নভেম্বর বিপ্লবের অভিজ্ঞতা ও সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকার্যের অভিজ্ঞতা, যার ফলে ভুল হয়েছে কম, বহু ভ্রান্তি এড়ানো গেছে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগোনো গেছে সহজে, সাবলীলভাবে, যদিও এখনও বহু বাধা মোকাবিলা করতে হচ্ছে৷ এটা স্পষ্ট যে, নভেম্বর বিপ্লবের পর কোনও দেশের সর্বহারা বিপ্লবী যদি রাশিয়ার বিপ্লব সম্পর্কে উপেক্ষার মনোভাব নেন অথবা এই বিপ্লবের অভিজ্ঞতা, সর্বহারা একনায়কত্ব এবং সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ সম্পর্কে খুঁটিয়ে চর্চা না করেন, এই বিপ্লবের অভিজ্ঞতা নিজ নিজ দেশের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের বিশ্লেষণ করে সৃজনশীল ভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি লেনিনবাদ যা মার্কসবাদের সমৃদ্ধির নয়া স্তরকে বোঝায়, তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবেন এবং বিপ্লব ও নিজ দেশের নির্মাণ কার্যের সমস্যা সমাধান করতে পারবেন না৷ হয় তিনি সূত্রবাদিতার ভ্রান্তিতে পড়বেন অথবা সংশোধনবাদে৷ উভয় বিচ্যুতির বিরুদ্ধেই আমাদের একসঙ্গে লড়তে হবে৷ কিন্তু এখন সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামটাই বিশেষভাবে জরুরি৷ নভেম্বর বিপ্লবের পর এটা আজ স্পষ্ট যে, কোনও দেশের সরকার যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে অস্বীকার করেন, তাহলে সেই সরকার নিজ নিজ দেশের জনস্বার্থের মারাত্মক ক্ষতি করবেন৷ (দীর্ঘক্ষণ ধরে করতালি)৷ বিশ্বে এখন ইউরোপ ও এশিয়ার একের পর এক দেশ, যাদের জনসংখ্যা ৯০ কোটিরও বেশি, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ সফলতার সাথে গ্রহণ করেছে এবং শক্তিশালী বিশ্বসমাজতান্ত্রিক শিবির গঠন করেছে৷ কিছুদিন হল পুঁজিবাদ তার শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়েছে, সমাজতন্ত্র অজেয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে৷ পুঁজিবাদ উচ্ছেদ করে শেষ পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাই কায়েম হবে৷ এটা বাস্তব নিয়ম যা মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না৷ প্রতিক্রিয়াশীলরা ইতিহাসের অগ্রগতির চাকা রোধ করার যত চেষ্টাই করুক না কেন, দ্রুত বা বিলম্বে হলেও বিপ্লব হবে এবং নিশ্চিত রূপে জয়ী হবে৷ (দীর্ঘক্ষণ হাততালি)৷ ‘পাথর সরাতে গিয়ে নিজের পা ভেঙে ফেলা’ একটি চীনা প্রবাদ৷ মূর্খের কাজ বোঝাতে কথাটি ব্যবহূত হয়৷ প্রত্যেক দেশের প্রতিক্রিয়াশীলরা এমনই মূর্খ৷ বিপ্লবীদের নির্যাতন করে খতম করে দেওয়ার তাদের মনোবাসনা ব্যর্থ হবে বিপ্লবের বৃহত্তর এবং কঠোরতর কর্মকাণ্ডে জনতার জাগরণের ফলে৷ রুশ জারের নির্যাতন বা চিয়াং কাই–শেকের নির্যাতন কি রুশ বিপ্লব বা চীন বিপ্লবকে উদ্দীপিত করেনি? একইভাবে সাম্রাজ্যবাদীরা নিজ দেশে, উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশগুলিতে জনগণের উপর নির্যাতন করে যুদ্ধই ডেকে এনেছে৷ যুদ্ধ থেকে কী তারা আশা করতে পারে? বিগত অর্ধশতকে আমাদের দু’টি বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা হয়েছে৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে মহান নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হল রাশিয়ায়৷ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপ এবং প্রাচ্যে আরও অনেকগুলি বিপ্লব ঘটল৷ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজরা যদি একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে বদ্ধপরিকর হয়, তাতে একমাত্র একটি ফলই ফলবে– বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান হবে৷ (প্রবল হর্ষধ্বনি)৷ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সরকার ও জনগণ এক নতুন শান্তিপূর্ণ জীবনের স্রষ্টা৷ আমরা কোনও অবস্থাতেই যুদ্ধ চাই না এবং একটা নতুন বিশ্বযুদ্ধের আমরা ঘোরতর বিরোধী৷ সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ নিরস্ত্রীকরণ, গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের উৎপাদন, ব্যবহার ও পরীক্ষা বন্ধ করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন যে বারবার প্রস্তাব দিচ্ছে তা সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সাধারণ অবস্থানকেই তুলে ধরছে৷ এই প্রস্তাব একই সাথে বিশ্বের সমস্ত জনগণের স্বার্থের অনুকূল৷ সমাজতান্ত্রিক এবং পুঁজিবাদী দেশগুলির শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার আমরা দৃঢ় সমর্থক৷ প্রত্যেকটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলির সমাধান সেই দেশের জনগণের ইচ্ছা অনুসারে এবং তাদের দ্বারাই হওয়া উচিত, এই আমাদের দৃঢ় অভিমত৷ আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি সমস্ত দেশেরই একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, অনাক্রমণ, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সমতা, পারস্পরিক কল্যাণ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান– সর্বজনবিদিত এই পাঁচটি নীতিমেনে চলা উচিত৷ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা গোঁয়ারের মতো সমাজতান্ত্রিক দেশ সহ অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর চেষ্টা করছে৷ যেমন, তাইওয়ানের মুক্তির নামে চীনের উপর তারা হস্তক্ষেপ করছে৷ হাঙ্গেরিতে প্রতিবিপ্লবী দাঙ্গায় তারা মদত দিয়েছে৷ বিশেষত আমেরিকা এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যবর্তী এলাকার দেশগুলিতে হস্তক্ষেপের জন্য ওরা একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে৷ তুরস্ক্ অথবা ইজরায়েলের মাধ্যমে স্বাধীন সিরিয়াকে দখল করার জন্য মার্কিনীরা এখনও ছক কষছে৷ মিশরের উপনিবেশ বিরোধী সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য ওরা চক্রান্ত করে চলেছে৷ উন্মত্ত আগ্রাসী মার্কিন নীতি মধ্যপ্রাচ্যে শুধু সংকটের জন্ম দিচ্ছে না, নতুন একটা বিশ্বযুদ্ধের বিপদ ডেকে আনছে৷ শান্তি ও স্বাধীনতাকে ভালবাসেন– সারা বিশ্বের এমন সমস্ত মানুষ সিরিয়ার পাশে দাঁড়ান এবং মার্কিন ও তুর্কি আগ্রাসনকারীদের বিরোধিতা করুন৷ যেমন করে তাঁরা ব্রিটিশ, ফরাসি এবং ইজরায়েলি আগ্রাসনের বিরোধিতায় গত অক্টোবরে মিশরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন৷ সোভিয়েত সরকার অবিলম্বে আগ্রাসী পরিকল্পনা প্রত্যাহার করার জন্য আমেরিকা ও তুরস্কে হুঁশিয়ারি দিয়েছে৷ চীন সরকার এবং জনগণ সিরিয়ার আত্মরক্ষার লড়াইকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানাচ্ছে এবং সোভিয়েতের সঠিক অবস্থানকেও সমর্থন করছে৷ (দীর্ঘক্ষণ করতালি)৷ সাম্রাজ্যবাদী নেকড়েদের মনে রাখা দরকার, তারা যেভাবে আগে মানবজাতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারত এবং তাদের মর্জিমাফিক এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলিকে কাটাছেঁড়া করতে পারত, তাদের সে দিন চিরতরে বিদায় নিয়েছে৷ চীনের জনগণের মুক্তিসংগ্রামকে হেয় করার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা আগেও চেষ্টা করেছে এবং এখনও করে চলেছে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত চীনের ষাট কোটি জনগণের সমাজতন্ত্রের পথ অবলম্বন করার সাহসী লড়াইকে তারা রুখতে পারেনি৷ (করতালি)৷ মাত্র আট বছরের স্বল্প সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গঠনমূলক কাজে চীন যে অগ্রগতি অর্জন করেছে তা বিগত একশো বছরেও অর্জন করা সম্ভব হয়নি৷ চীনে হাতে গোনা কিছু বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থী সমাজতন্ত্রের পথে চলার বিরোধিতা করছে৷ তারা জাতীয় জীবনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকারী ভূমিকারও বিরোধী৷ চীন, সোভিয়েত এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশের নিবিড় যোগাযোগেরও তারা বিরোধী৷ সমগ্র চীন জুড়ে জনগণের পাল্টা আঘাতে তাদের নিষ্ফল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে৷ (হর্ষধ্বনি)৷ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে চীনের জনগণ সমাজতন্ত্রকে চীনের মাটিতে আরও উন্নত ও দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ত্রুটিমুক্ত হওয়ার এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম চালাচ্ছে৷ চীনের জনগণের মধ্যে যে দ্বন্দ্বগুলি বাস্তবে বিদ্যমান তার সঠিক সমাধান এবং যেগুলির সমাধান এখনই করতে হবে, সেই লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে এই সংগ্রাম৷ দেশব্যাপী বিতর্কের মাধ্যমে তা চলছে৷ এই বিতর্ক একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত, আবার মুক্ত–ও৷ সমাজতান্ত্রিক পথ না পুঁজিবাদী পথ, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং তার প্রধান নীতিসমূহ, কমিউনিস্ট পার্টি ও সরকারি পদাধিকারীদের কাজের ধরন, জনগণের কল্যাণ– এই সমস্ত বিষয়ে শহরে ও গ্রামে তথ্য–যুক্তি দিয়ে বিতর্ক চালানো হচ্ছে৷ আত্মশিক্ষা এবং নিজেকে নতুন করে গড়ার জন্য জনগণের মধ্যে এই সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম চলছে৷ ইতিমধ্যেই এই কাজে বিরাট সাফল্য লক্ষ করা যাচ্ছে৷ যেখানেই এই সংগ্রাম চলছে সেখানেই জনগণের সমাজতান্ত্রিক চেতনা দ্রুত উন্নত হচ্ছে, মিথ্যা ধারণা কাটছে, কাজের খামতি দূর হচ্ছে, জনগণের সমস্ত স্তরের মধ্যে ঐক্য দৃঢ়তর হচ্ছে, শ্রমের শৃঙ্খলা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ছে৷ (করতালি)৷ এখন আমরা এই আত্মশিক্ষার সংগ্রামকে আমাদের ৬০ কোটি মানুষের মধ্যে ধাপে ধাপে এবং প্রতিটি স্তর থেকে স্তরে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি৷ আশা করা যায় আর কয়েক মাসের মধ্যেই দেশব্যাপী ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হবে৷ ভবিষ্যতে আমরা চাই প্রতিবছর অথবা এক বছর অন্তর ত্রুটি মুক্ত করার এই সংগ্রাম চালাতে৷ উত্তরণের পথে চলার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে বিভিন্ন সামাজিক দ্বন্দ্বগুলির সমাধানের এটাই অন্যতম প্রধান পথ৷ যদিও এর জন্য প্রয়োজনীয় সময় অনেকটাই কমানো যেতে পারে৷ এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করার প্রধান ভিত্তিটি হল জনগণের অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত আমাদের পক্ষে আছে এবং তারা আমাদের যুক্তি শুনবে–এই নিশ্চিত প্রত্যয়৷ বহু বছরের বিপ্লবী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জনগণের সাথে নিবিড় সংযোগের লেনিনীয় নীতির ভিত্তিতে জনগণের উদ্যোগকে মূল্য দিয়ে, সমালোচনা, আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ত্রুটিমুক্ত হওয়ার সংগ্রামের পথটিকে তৈরি করতে পেরেছি আমরা৷ এই পদ্ধতির সঠিকতা আবার প্রমাণিত হল বর্তমান সমাজতান্ত্রিক আত্মশিক্ষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে৷ সমাজতন্ত্রের গঠনে নানা ক্ষেত্রে চীন ভ্রাতৃত্বমূলক সাহায্য পেয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে৷ নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী পালন করার সময় চীনকে এই বন্ধুত্বপূর্ণ সাহায্য দেওয়ার জন্য আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি, সরকার এবং জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানোর অনুমতি প্রার্থনা করছি৷ (দীর্ঘক্ষণ করতালি)৷ গঠিত হওয়ার ঠিক পরেই গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বন্ধুত্ব, জোটবদ্ধতা ও পারস্পরিক সহায়তার চুক্তি সম্পাদন করেছে৷ দু’টি মহান সমাজতান্ত্রিক দেশের এক মহান চুক্তি৷ সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমগ্র সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সঙ্গে একই ভবিষ্যৎ এবং জীবনস্রোতের আমরা শরিক৷ (হর্ষধ্বনি)৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমস্ত সমাজতান্ত্রিক দেশের ঐক্য ও সংহতিকে সুদৃঢ় করাকে আমরা পবিত্র আন্তর্জাতিক দায়িত্ব হিসাবে সম্মান করি৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বন্ধুত্ব ও ঐক্য ভাঙার মতলবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমাদের মধ্যে বিবাদের বীজ বুনতে সম্ভাব্য সমস্ত রকম উপায় গ্রহণ করেছে৷ কিন্তু বাস্তব অবস্থা নিশ্চিত ভাবে সাম্রাজ্যবাদীদের আশাহত করবে৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি এখন আগের চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠভাবে ঐক্যবদ্ধ৷ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যেকার সম্পর্কের ভিত্তি হল সমস্বার্থবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অনুপ্রেরণা৷ ইতিহাসের সূচনা পর্ব থেকে কখনওই দেশে দেশে এমন সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব হয়নি৷ এর কারণ, সমাজতান্ত্রিক দেশ হল এমন এক নতুন ধরনের দেশ যেখানে শোষক শ্রেণিগুলিকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং শ্রমিক শ্রেণিকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে৷ এই দেশগুলির মধ্যেকার সম্পর্কে ঐক্য বজায় রাখতে স্বদেশপ্রেমের সঙ্গে আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতি অনুসরণ করা হয়৷ আমরা সাধারণ স্বার্থ ও আদর্শের বন্ধনে ঘনিষ্ঠভাবে বাঁধা৷

প্রিয় কমরেডগণ,

নভেম্বর বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সুপ্রিম সোভিয়েত আহূত এই বিশাল সমাবেশে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেণি ও সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি থেকেই বিশ্ব জনশক্তির মহান ঐক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকাশমানতার প্রতীক৷ আসুন, আরও অনেক নতুন ও মহান বিজয় অর্জন করার লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি, বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণি এবং নিপীড়িত জাতিগুলির ঐক্য শক্তিশালী করতে আমাদের প্রচেষ্টা জারি রাখি৷ মহান নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সংহতি ও বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক! মার্কসবাদী–লেনিনবাদী আন্তর্জাতিকতাবাদের মহান পতাকা দীর্ঘজীবী হোক! দুনিয়ার শ্রমিক ও শান্তিপ্রিয় জনগণ, এক হোন!