চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: শ্রেণীবিশ্লেষণ, অনুসন্ধান ও অনুশীলনের সাহায্যে কৃষকের শ্রেণী-সংগ্রাম গড়ে তুলুন

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

গ্রামাঞ্চলে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে সংশোধনবাদী কৌশল ও বিপ্লবী কৌশল এক হতে পারে না। আমরা এতকাল যে কায়দায় কৃষক আন্দোলন করবার চেষ্টা করেছি তাকে সংশোধনবাদী কৌশল ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। সংশোধনবাদীরা কৃষক আন্দোলন করে পার্টির প্রকাশ্য কার্যকলাপ অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে এবং আন্দোলনের জন্য নির্ভর করে বুদ্ধিজীবী পার্টি নেতাদের উপর। কাজেই তাদের আন্দোলনের সূত্রপাত হয় বড় বড় নেতার বক্তৃতা সংগঠনের ভিতর দিয়ে এবং কৃষকদের স্কোয়াড ইত্যাদির মারফৎ, প্রকাশ্য প্রচার আন্দোলনের মারফৎ। এই আন্দোলন স্বভাবতই বড় বড় নেতাদের উপর নির্ভরশীল, কাজেই সেই বুদ্ধিজীবী নেতারা সংগ্রাম তুলে নিতে বললেই সংগ্রাম শেষ হয়। তাছাড়া সমস্ত প্রচার ও আন্দোলন প্রকাশ্য থাকায় দমননীতির সামনে সমস্ত সংগঠন অসহায় হয়ে পড়ে। বিপ্লবীদের কৃষক সংগ্রাম সংগঠিত করার কেশৗশ হবে সম্পূর্ণ আলাদা। বিপ্লবীদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসার করা এবং কৃষকের শ্রেণী সংগ্রাম তীব্র করার চেষ্টা করা। কাজেই এই পার্টি সংগঠনের কাজ হব গোপন-বৈঠক মারফৎ প্রচারকে সংগঠিত করা। কৃষক তার পুরানো অভ্যাসবশে হয়তো মিটিং মিছিল চাইবে, সেক্ষেত্রে পার্টি সংগঠন এর পেছনে থেকে দুএকটা মিটিং মিছিল সংগঠিত করতে পারে।

কিন্তু মিটিং বা মিছিল আমাদের প্রধান হাতিয়ার কোন সময়েই হবে না। এই রীতি পদ্ধতি অভ্যাস করা খুবই কঠিন। একাজ করা যায় যদি বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা প্রথম থেকেই আত্মগোপন করে চলেন। তবেই তাঁরা বাধ্য হবেন কৃষক বিপ্লবীদের উপর নির্ভরশীল হতে। যতদিন কৃষক বিপ্লবীরা নিজেরা উদ্যোগ না নিচ্ছেন ততদিন বুঝতে হবে জনতা প্রস্তুত নয়। এবং স্বভাবতই আমরা আমাদের বক্তব্য কৃষক সাধারণের উপর চাপিয়ে দেবো না। দ্বিতীয় বিচ্যুতি যেটা ঘটে তা হোল যখন কৃষক ক্যাডাররা কোন কিছু করতে চান তখন বুদ্ধিজীবী কমরেডটি অত্যন্ত পশ্চাদপদ ক্যাডারটির কথার উপর জোর দিয়ে সেটাকেই সাধারণ মত বলে চালান এবং তার ফলেই দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতি ঘটে।

তাহলে প্রথম হোল, জনতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমরা কোন কিছু চাপিয়ে দেব না। এই নীতি ভুলে গেলে আমরা অনেকগুলো বিচ্যুতির মধ্যে পড়বো, সেগুলোকে সংকীর্ণতাবাদ, কাস্ত্রোবাদ ইত্যাদি অনেক নাম দেওয়া যেতে পারে। সুতরাং এই বিচ্যুতিগুলির হাত থেকে বাঁচতে গেলে আমাদের  অবিরাম কৃষকদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে যেতে হবে। এই রাজনৈতিক প্রচারের মারফৎ আমরা রাজনৈতিক ক্যাডার পাবো যারা রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলনে অভ্যস্ত হবে। এই ক্যাডারদের গোপন সংগঠনই হবে ভবিষ্যতের পার্টি। এই সংগঠন গড়ার সময় আমাদের পার্টি কমিটির নীতি মেনে চলতে হবে। প্রত্যেকটি পার্টি কমিটির নির্দিষ্ট এলাকা থাকবে এবং সে এলাকায় শ্রেণীবিশ্লেষণ করতে শিখতে হবে এবং অনুসন্ধান ও অনুশীলনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি অংশের মানুষের চিন্তা ও ইচ্ছাকে যাচাই করতে শিখতে হবে। এই অনুসন্ধান ও অনুশীলন অনেক বিচ্যুতি করবে, কিন্তু তাতে শংকিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন-যুদ্ধের ভেতর দিয়েই আমাদের যুদ্ধ শিখতে হবে। যদি পার্টি কমিটিগুলি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে চলে তাহলে এই বিচ্যুতিগুলি থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শিখবে।

বিপ্লবী শ্রেণীগুলির মধ্যেও অগ্রণী অংশ ও পশ্চাদপদ অংশ থাকে। অগ্রণী অংশ তাড়াতাড়ি বিপ্লবী নীতি গ্রহণ করে এবং পশ্চাদপদ অংশের রাজনৈতিক প্রচার গ্রহণ করতে স্বভাবতই দেরী হয়। এবং এই জন্যেই সামন্তশ্রেণীর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই জন্যেই ফসল দখলের আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই সংগ্রাম কোথায় কি রূপ নেবে তা নির্ভর করছে এলাকার রাজনৈতিক চেতনা এবং সংগঠনের উপর। এই সংগ্রাম পরিচালিত হবে স্বভাবতই সামন্তশ্রেণীর বিরুদ্ধে অর্থাৎ অ-কৃষক জমির মালিক অর্থাৎ জমিদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে এবং কোন মতেই মধ্যকৃষকের বিরুদ্ধে নয়।

কৃষকের ব্যাপক গণ-আন্দোলনের চেষ্টা না করলে এবং ব্যাপক জনতাকে আন্দোলনে সামিল করতে না পারলে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি কৃষক সাধারণের চেতনায় দৃঢ়মূল হতে স্বভাবতই দেরী হবে। তার ফলে সংগ্রামের উপর রাজনীতির প্রাধান্য কমে এসে অস্ত্রের প্রাধান্য বাড়াবার ঝোঁক দেখা দিতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বে কৃষকের শ্রেণীসংগ্রামের উচ্চতর রূপ হচ্ছে গেরিলা যুদ্ধ। তাই শ্রেণীবিশ্লেষণ, শ্রেণীসংগ্রাম, অনুসন্ধান ও অনুশীলন-এই চারটি হাতিয়ারকে সফল প্রয়োগ করতে পারলে তবেই কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তোলা যায়।

আমাদের দেশের ধনীকৃষক প্রধানত সামন্ত শোষণের উপরই প্রতিষ্ঠিত। তাই তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে প্রধানত সংগ্রামের সম্পর্ক। কিন্তু যেহেতু তাদের উপর সাম্রাজ্যবাদী বাজারের শোষণও আছে তার ফলে সংগ্রামের কোন কোন স্তরে তাদের সাথে ঐক্যের সম্ভাবনাও আছে। এই ধনীকৃষক বাদ দিলে অন্যান্য সমস্ত কৃষককেই সমর্থক শুধু নয়, সংগ্রামে সামিল করা যায়। শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক ব্যাপক কৃষক জনতার সংগ্রামের ঐক্য গড়ে তুলতে পারবে এবং এই ঐক্য যত দ্রুত হবে ততই সংগ্রামের চরিত্র বিপ্লবী রূপ নেবে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে চেয়ারম্যানের শিক্ষা, বিপ্লবী যুদ্ধ হচ্ছে জনগণের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ চালান যায় কেবলমাত্র জনগণকে সামিল করে এবং তাদের উপর নির্ভর করেই [Revolutionary war is a war of the masses. It can be waged only by mobilising the masses and relying on them].

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও সোভিয়েত সংশোধনবাদ ভারতবর্ষে তাদের শাসন ও শোষণকে তীব্র করে তুলছে এবং এই শোষণের বোযা গিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়ছে ব্যাপক কৃষকশ্রেণীর উপর। দারিদ্র্য ও অনাহার কৃষকের জীবনে এক চরম অবস্থা এনে দিয়েছে এবং স্বভাবত:ই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। তেমনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও সোভিয়েত সংশোধনবাদের শাসন অন্যান্য শ্রেণীগুলির মধ্যেও বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছে এবং সেই বিক্ষোভের প্রভাব কৃষকের উপরে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ভারতবর্ষের সমস্ত রাজনৈতিক পার্টি আজ শাসকশ্রেণীর পার্টিতে পরিণত হয়েছে এবং সকলেই চেষ্টা করছে বিভিন্ন কৌশল জনতাকে শান্ত করে রাখার। এই কাজে সবচেয়ে সুদক্ষ ডাঙ্গে বিশ্বাসঘাতকচক্র ও নয়া-সংশোধনবাদী চক্র। তারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মুখোশ এঁটে অনেক বিপ্লবী বুলি কপচিয়ে জনতাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু চেকোশ্লোভাকিয়ায় সোভিয়েতের ফ্যাসীবাদী আক্রমণ এদের বিপ্লবী মুখোশ খুলে দিয়েছে এবং যত দিন যাবে ততই জনতার কাছে এটা স্পষ্ট হবে যে নয়া-উপনিবেশবাদের ফেরিওয়ালা বিশ্বের আক্রমণকারী শক্তিগুলির অন্যতম, সোভিয়েত রাষ্ট্রের বশংবদ এরা। এদের মুখোশ খোলার সাথে সাথে জনতার প্রতিরোধ সংগ্রামের জোয়ার খুলে যাবে এবং কৃষকের ব্যাপক গণ-আন্দোলনের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে। তাই আজ শ্রমিকশ্রেণী ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সামনে দায়িত্ব এসেছে কৃষকের শ্রেণী চেতনাকে জাগিয়ে তোল, ব্যাপক শ্রেণীসংগ্রাম সংগঠিত করা। সেদিন আর বেশী দূরে নেই যখন ভারতবর্ষের লক্ষ লক্ষ কৃষক জনতার সৃজনীশক্তি গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তুলবে, বিশ্বের সমস্ত বিপ্লবী মুক্তি-সংগ্রামের পাশে ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতা তার আসন করে নেবে; মহান লেনিনের স্বপ্ন-মহান চীন এবং ভারতবর্ষের সংগ্রামী মানুষের ঐক্য-বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের কবর রচনা করবে। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সমস্ত বিপ্লবীকে এখনই কাজে নামতে হবে।

দেশব্রতী, ১৭ই অক্টোবর, ১৯৬৮

Advertisements

কারা এই ‘আরবান মাওবাদী’?

bb

ভারতে মাওবাদী নকশাল আন্দোলনের শুরুর ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে গত বছর। আর এর প্রাথমিক বিপর্যয়ের প্রায় ৪৩ বছর চলছে ২০১৮-এ। বিদ্রোহের অগ্নিপুরুষ জঙ্গল সাঁওতাল, চারু মজুমদার, কানু সান্যালও জীবিত নেই আজ আর। তবে সবকিছুই ‘রুদ্ধশ্বাস অতীত’ নয়। নকশালপন্থা নিয়ে আজও স্বস্তিতে নেই ভারত ‘রাষ্ট্র’। এই অস্বস্তি কতটা মনস্তাত্ত্বিক ভীতিজনিত, আর কতটা বাস্তব হুমকি কিংবা সচেতন রাষ্ট্রীয় ‘প্রকল্প’—তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কে নতুন জ্বালানি জুগিয়েছে ‘আরবান মাওবাদী’ শোরগোল। দেশটির চলচ্চিত্রশিল্প থেকে লিটল ম্যাগ জগৎ—সর্বত্র এখন মুখরোচক এক সামাজিক এজেন্ডা ‘আরবান মাওবাদ’। এই আলাপের ভেতর খানিক চটুল ভঙ্গি থাকলেও দেশটির আইনি ব্যবস্থার এলিট চরিত্রটিও বোঝা যায় এ থেকে।

কর্তৃত্ববাদী শাসকদের ‘দেশবিরোধী’ প্রতিপক্ষ প্রয়োজন 
ভারতজুড়ে এই মুহূর্তে ‘মাওবাদী’ দল ও গ্রুপের সংখ্যা কত, সে সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা কঠিন। বলা হয় শতাধিক। এর মধ্যে মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার (এমসিসি) এবং পিপলস ওয়ার গ্রুপ (পিডব্লিউজি) বেশ বড় এলাকাজুড়ে সক্রিয়। এদেরই ঐক্যবদ্ধ নাম সিপিআই (মাওবাদী)। এদের উপস্থিতি বোঝাতেই অন্ধ্র-বিহার-ঝাড়খন্ড-ছত্তিশগড়-ওডিশা নিয়ে ‘রেড করিডর’ কথা চালু হয়েছে। দেশের ১০টি রাজ্যের অন্তত ৯০টি জেলায় নকশালদের সক্রিয়তা আছে বলে ভারত সরকারের দাবি। সরকার এ-ও বলে, ১০ বছর আগেও এ ধরনের সক্রিয়তা ছিল অন্তত ২০০ জেলায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনসভায়ও হামেশা বলেন, কমিউনিজম ভারতে অতীতের বিষয় হয়ে গেছে। তবে গত এক দশকে প্রতিবছর ন্যূনতম ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ মারা গেছে রাষ্ট্র বনাম মাওবাদী যুদ্ধে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ‘মাওবাদী’রা এখনো দেশটির ‘একক বৃহত্তম নিরাপত্তা হুমকি’। সর্বশেষ সেই হুমকি গ্রামীণ পরিসর ছেড়ে শহরে ঢুকে পড়েছে বলে দাবি সরকারি-বেসরকারি বহু ভাষ্যকারের। এ নিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ ক্ষেত্রে বিশেষ এগিয়ে আছেন রাষ্ট্রপন্থী ভাষ্যকার বলিউডের চলচ্চিত্রকার বিবেক অগ্নিহোত্রী। ২০১৬ সালে ‘আরবান মাওবাদ’কে উপজীব্য করে তৈরি করেছিলেন ‘বুদ্ধ ইন আ ট্রাফিক জ্যাম’ সিনেমাটি। সম্প্রতি সেই মুভি তৈরির পূর্বাপর তুলে ধরে বইও লিখেছেন ‘আরবান নকশাল’ নামে। গত ৮ জুন বইটির প্রকাশনা উৎসব হলো।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বিবেককে প্রকাশ্যেই অভিনন্দন জানিয়েছেন সিনেমা ও বইয়ের জন্য। বাড়িতে ডেকে কফিও খাইয়েছেন বলে সংবাদ বেরিয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, ভারতের নীতিনির্ধারকেরা ‘আরবান মাওবাদ’কে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে ইচ্ছুক। জনমনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে কর্তৃত্ববাদী শাসকদের প্রতিনিয়ত ‘দেশবিরোধী’ প্রতিপক্ষ প্রয়োজন হয়। বিশ্বজুড়েই এই প্রবণতা আছে।

অসন্তুষ্ট তরুণদের ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে মাওবাদী ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে

সর্বগ্রাসী সংঘ-শাসন এবং ‘উন্নয়ন’-এর ঝাঁজালো প্রচারণার মধ্যেও ভারতজুড়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার জগতে প্রায়ই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-ধরনা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে নোংরা দলিতপল্লি—সর্বত্র তরুণেরা এসব বিক্ষোভে সাড়া দিচ্ছে। আরও সরাসরি বললে, রেড করিডরের কৃষিজীবী গ্রামগুলোতে কর্মসংস্থানের বড্ড অভাব; ঐতিহাসিক স্থানীয় বনজ ও খনিজ সম্পদগুলো প্রায় ‘লুটে নিচ্ছে’ করপোরেটরা।

ওডিশার কথাই ধরা যাক। এই রাজ্যে রয়েছে ভারতের কয়লা সম্পদের ২৫ ভাগ। নিকেল, ম্যাংগানিজ ও ইস্পাতের আকরিকে ওডিশার সর্বভারতীয় হিস্যা যথাক্রমে ৯২, ২৭ ও ২৮ ভাগ। কিন্তু প্রদেশটি বরাবরই অন্যতম দারিদ্র্যকবলিত এলাকা। ভারতের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত ১৪টি রাজ্যের মধ্যে বিহারের পরই ওডিশা। জনসংখ্যার ৪০ ভাগই দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে আছে এখানে। স্থানীয় সচেতন তরুণেরা সম্পদ ও দারিদ্র্যের এই ব্যবধান দেখে দেখে ক্ষুব্ধ। শাসক ভাবাদর্শে অসন্তুষ্ট এই তরুণদেরই ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে মাওবাদী ‘নগর বিদ্রোহী’ হিসেবে। এই ব্র্যান্ডিং ছাড়া এসব বিদ্রোহকে দমন করা যাচ্ছে না। ‘সন্ত্রাসী’দের ‘পোটা’ (প্রিভেনশন অব টেররিজম অ্যাক্ট ২০০২) ও উআপা (আন-লফুল অ্যাকটিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট) আইনে ধরা যায়—তাই ‘নগরক্ষুব্ধ’দের নকশাল তকমা সরকারের জন্য সুবিধাজনক। চট করে একে ‘উন্নয়নবিরোধী’ও বলা যায়। পশ্চিমবঙ্গে যে সিআরপিএফের কয়েক ডজন কোম্পানি রয়েছে, সে-ও এ রকম অল্পসংখ্যক ‘উন্নয়নবিরোধী’দের কারণেই; কিন্তু ভিন্নমত দলনই মূল লক্ষ্য।

বিজেপি ও বিবেকের মতো ‘বুদ্ধিজীবী’রা বলছেন, মাওবাদীরা নিজেদের অভূতপূর্বভাবে বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়েছে। পুরোনো কেন্দ্রীভূত ‘পার্টি’ আকারে নেই তারা। পুরোনো ধাঁচে ‘সশস্ত্র’ও নয়। ভারত রাষ্ট্রকে ছিঁড়ে ফেলতে উদ্যত মাওবাদীরা আগের গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের কৌশল ছেড়ে এখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সিনেমাশিল্প, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ছে। জঙ্গল ছেড়ে মধ্যবিত্তের ‘আইনি’ ও স্বীকৃত পরিসরগুলো ব্যবহার করছে তারা।

এই মুহূর্তে বহুল প্রচারিত এই ফর্মুলার মধ্যে ফেলা হচ্ছে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো এনজিও কর্মী, অত্যাচারিতকে বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়া আইনজীবী, ট্রাইবাল গ্রামে বিনা মূল্যে চিকিৎসারত ডাক্তার, ক্লাসরুমের র‍্যাডিক্যাল শিক্ষকদের দিকেও। পরিবর্তনবাদীমাত্রই সম্ভাব্য ‘নকশাল’; আর নকশালমাত্রই ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একজন ষড়যন্ত্রকারী—টেররিস্ট। সুতরাং নকশাল-নিধন মানে ভারতকে রক্ষার পবিত্র কর্তব্য। আন্তর্জাতিকভাবে ‘ওয়ার অন টেরর’-এ যুক্ত হওয়ার মতোই জরুরি তা।

চারু মজুমদার ও কানু সান্যালদের আপাতপরাজয়ের মধ্যেও ভারতজুড়ে সাহিত্য-সংগীত-সংলাপে নকশাল–চেতনার প্রতি সহানুভূতি আছে। ভারতের শাসকেরা অসন্তুষ্ট নতুন প্রজন্মকে ওসব থেকে রুখতে মাওবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক প্রচারণায় বিশেষ জোর দিচ্ছেন এখন। ফল হিসেবে কাশ্মীর থেকে অরুণাচল পর্যন্ত প্রতিবাদী সভাগুলোর গায়ে ‘মাওবাদী’ তকমা লাগছে। ‘তদন্ত’ও এগোচ্ছে সেই মোতাবেক। এভাবেই ভারতজুড়ে নতুন এক ‘রাষ্ট্রবাদী’ আক্রমণের মুখে পরিবর্তনবাদী সংখ্যালঘু ছিটেফোঁটা সচেতন মানুষগুলো। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক জি এন সাঁইবাবা, খ্যাতনামা চিকিৎসক বিনায়ক সেন প্রমুখ এভাবেই ‘আরবান মাওবাদী’ চিহ্নিত হয়ে যাবজ্জীবন দণ্ডের শিকার। মূলত, নিজ নিজ পরিমণ্ডলে নাগরিক অধিকারের বিভিন্ন বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন এঁরা।

বেশি আক্রান্ত দলিত ও কৃষক আন্দোলনের কর্মীরা

‘মাওবাদী’ তকমায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দলিত ও কৃষক আন্দোলন সংগঠকেরা। এ বছরের শুরুতে মহারাষ্ট্রের পুনের করেগাঁওতে দলিতদের নিপীড়নবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ ও সফল বন্‌ধের দিকে সমগ্র ভারতের নজর কাড়ামাত্রই বলা হলো, এর পেছনে মাওবাদীদের ইন্ধন রয়েছে। মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতাদের এরূপ বক্তব্য সংঘ পরিবার নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারও পেল। এরই সূত্র ধরে ঘটনার ছয় মাস পর জুনে নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সোমা সেন, দিল্লির মানবাধিকারকর্মী রোনা উইলসনসহ পাঁচজনকে আটক করে বলা হলো, এরা ‘টপ আরবান মাওবাদী’—দলিত বিস্ফোরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অচ্ছুতদের উত্তেজিত করতে শহুরে এই মাওবাদীরা সিপিআই (এম) থেকে অর্থ নিয়েছিল বলেও আটককালে সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই বলা হয়। অথচ পুনের ঘটনা যে দলিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে শুরু, তা আয়োজিত হয়েছিল ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে স্থানীয় দলিত মাহারদের এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ২০০ বছর পূর্তি স্মরণে। কিন্তু তথ্য প্রচারের আগেই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ হয়ে যাচ্ছে।

একইভাবে মাওবাদের তকমা পড়েছে গত মার্চে বিশ্বব্যাপী মনোযোগ পাওয়া মহারাষ্ট্রের কৃষকদের ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ লংমার্চের গায়েও। এই লংমার্চের উদ্যোক্তা সিপিআই (এম)–এর কৃষক সংগঠন নিখিল ভারত কৃষাণ সভা। বিভিন্ন জরুরি দাবিতে উত্তর-পশ্চিম মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে উঠে এসেছিল ৩৩ হাজার চাষির তিন দিনের ওই ‘কৃষাণযাত্রা’। মিছিল মহারাষ্ট্র বিধানসভা ঘেরাও করে কিছু দাবি আদায় করে নেওয়ার পরই আন্দোলনের নৈতিক বিজয়কে খাটো করতে যেসব অভিযোগ তোলা হলো, তার মধ্যে একটি হলো লংমার্চের অন্যতম সংগঠক ভিজু কৃষ্ণ একসময় জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্রসংসদের সভাপতি ছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে আরএসএস-বিজেপি পরিবার মাওবাদের প্রধান এক ‘আরবান সেন্টার’ মনে করে। বিজেপির প্রভাবশালী এমপি পুনম মহাজন মহারাষ্ট্রের লংমার্চের ইন্ধনদাতা হিসেবে ‘কৃষক সমাজে ঢুকে পড়া শহুরে মাওবাদী অনুপ্রবেশকারী’দের দায়ী করেছিলেন সরাসরি।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর গত দুই বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকগুলো বিক্ষোভ হলো। এগুলোকেও ‘মাওবাদী প্রভাবিত’ বলে প্রচার চালিয়েছে বিজেপির ছাত্রসংগঠন অখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদ। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন শহরতলির কয়েকটি জন-আন্দোলনের ক্ষেত্রে একইরূপ বৈরী প্রচার ছিল এবং আছে।

কিন্তু ভারতজুড়ে এসব আন্দোলনের জন্ম ও প্রসার আঞ্চলিকভাবে ভারসাম্যহীন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচারের শূন্যতা এবং রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক আবহের দুর্বলতা থেকে। মোদি সরকার ও ভারতীয় শাসনকাঠামো সেটা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক। পুনের দলিত বন্‌ধ্‌ (হরতাল), মহারাষ্ট্রের কৃষক লংমার্চ কিংবা জেএনইউয়ের ছাত্রসংগ্রামীরা নিজ নিজ পরিমণ্ডলের সংকট নিয়ে অহিংস পথেই সর্বোচ্চ সক্রিয় হয়েছিল। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে পোটা ও উআপাসহ দানবীয় সব আইনে শহুরে ছাত্রসংগঠক, নারী আন্দোলনকর্মী, শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মীদের আটক করে বিনা বিচারে জেলে পুরে রাখা হচ্ছে। আর প্রচারমাধ্যম এটাকে দেখাচ্ছে মাওবাদবিরোধী এক দেশপ্রেমিক যুদ্ধ আকারে।

সূত্রঃ prothomalo.com


যে ছাত্র আন্দোলন দেশছাড়া করল রাষ্ট্রপ্রধানকে

image

জনজোয়ার: প্যারিসের রাস্তায় ব্যরিকেডের বিরুদ্ধে ছাত্ররা।

সময়টা ১৯৬৮। প্যারিসে ছাত্র আন্দোলন তখন মধ্যগগনে। প্রতিদিন রাস্তায় ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের খন্ডযুদ্ধ চলছে। এরকম এক সন্ধেবেলায় রাজপথে তৈরি করা অস্থায়ী ব্যারিকেডের উপর দাঁড়িয়ে ছাত্রদের সামনে ধর্মঘটের সপক্ষে বক্তব্য রাখছিলেন বেলজিয়ামের মার্ক্সবাদী দার্শনিক আর্নেস্ট ম্যান্ডেল। বক্তৃতা শেষ করে নেমে এসেই তিনি দেখতে পেলেন সামনে একটি গাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলছে। ওই রাজপথেই শিশুর মতো আনন্দে নেচে উঠে চেঁচাতে লাগলেন ম্যান্ডেল, “কী অপূর্ব! কী সুন্দর! বিপ্লব তা হলে এসেই গেছে।” যারা দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখল, তাদের মধ্যে হাতেগোনা ওঁর কিছু ছাত্র ছিল। এক মাত্র তারাই জানত—ওই গাড়িটা  ছিল প্রফেসর ম্যান্ডেলের নিজের!

আজ, প্যারিসের ছাত্র আন্দোলনের অর্ধশতবর্ষ পূর্তিতে ফিরে দেখতে গেলে উপরের ঘটনাটির থেকে বেশি ব্যঞ্জনাময় গল্প আর কিছু হতেই পারে না। নিজের গাড়ি পুড়তে দেখে আনন্দে নাচার যাদুবাস্তবতা তো আসলে একটা অভ্যুত্থানের আকাশ ছুঁতে চাইবার রূপক মাত্র। কে না জানে, আন্দোলনরত প্যারিসের দেওয়ালে তখন সবচেয়ে বেশি যে স্লোগানটা চোখে পড়ত তা হল, ‘বাস্তববাদী হও, অসম্ভবের দাবি করো’!

অসম্ভবের দাবি ফিরে ফিরে আসে। বহু বছর পরে যখন ‘হোক কলরব’ স্লোগানে কলকাতা কেঁপে উঠবে, যখন কানহাইয়াকুমার, উমর খালিদদের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে সমগ্র ভারত জুড়ে ছাত্রসমাজ আন্দোলনে নামবে, অথবা যখন সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে ছাত্রছাত্রীদের অভিন্ন আবাসনের দাবিতে গর্জে উঠবে ক্যাম্পাস, তখন কি নেপথ্যে থেকে অট্টহাসি হাসবে ৬৮’র মে মাস? সেই ধর্মঘটও তো শুরু হয়েছিল গ্রেফতার হওয়া ছাত্রনেতাদের মুক্তির জন্যই। আর আন্দোলনের সূত্রপাত কী থেকে হয়েছিল? নঁতের বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের আবাসনে ছেলেদের ইচ্ছে মতো রাত্রিযাপনের অনুমোদনের দাবিতে।  আজ যখন ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলগুলি বিদ্রোহী প্রেসিডেন্সি বা যাদবপুরকে চিহ্নিত করে দেয়  নেশা ও যৌনতার আখড়া হিসেবে, তখন অবধারিতভাবেই তাই স্মৃতিতে উঁকি মারেন ১৯৬৮-র ফরাসি প্রধানমন্ত্রী পঁপিদ্যু। যিনি আন্দোলনরত ছাত্রদের অভিহিত করেছিলেন ‘নৈরাজ্যবাদী, যৌনবিকৃতির ধ্বজাধারী’ আখ্যায়।

HEZ-2662207 - © - Fine Art Images

জনজোয়ার: প্যারিসের রাস্তায় বিদ্রোহী ছাত্ররা। মে ১৯৬৮

বস্তুত, নাগরিক অধিকারের আন্দোলন কীভাবে রাজনৈতিক রূপ পেয়ে যায় তার একটা উদাহরণ হতে পারে ’৬৮-র প্যারিস। ছাত্রী-আবাসনে অবাধ প্রবেশের দাবিতে বিক্ষোভ চলছিলই। ১৯৬৮-র মার্চ মাসে এই বিক্ষোভে যোগ দিল অন্যান্য বামপন্থী ছাত্ররা, স্লোগান তুলল ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে। মে মাসের শুরুতে নঁতের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিল প্রশাসন। বিদ্রোহী ছাত্ররা প্যারিসের প্রাণকেন্দ্র লাতিন কোয়ার্টারে অবস্থিত সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘাঁটি গাড়ল। প্রতিদিন ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ মুখরিত হতে থাকল স্লোগান, কবিতা, গানে। প্রমাদ গুণে কর্তৃপক্ষ এবার পুলিশের কাছে সাহায্য চাইলেন। দাবি, বহিরাগতদের হটিয়ে দিয়ে ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। হোক কলরবের সময়কালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সম্ভবত এই ইতিহাস জানতেন না। ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢোকালে তার পরিণতি কতদূর অবধি যেতে পারে, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছে সরবোন।

image (2)

স্লোগানে, প্রতিবাদে মুখরিত ছাত্রছাত্রীরা। মে, ১৯৬৮।

৩ মে পুলিশ আসবার পরেই সমগ্র লাতিন কোয়ার্টার রণক্ষেত্রের চেহারা নিল। পুলিশকে লক্ষ করে বৃষ্টির মতো উড়ে আসতে থাকল পাথর। পুলিশ প্রত্যুত্তর দিল কাঁদানে গ্যাস, নির্মম প্রহার এবং নির্বিচারে গ্রেফতারের মাধ্যমে। পাল্টা জবাবে ৬ থেকে ১০ মে-র মধ্যে পরপর ধর্মঘটে অচল হয়ে গেল প্যারিস। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে নিয়ে ছাত্ররা ঘোষণা করল এবার থেকে এটি হবে জনগণের শিক্ষাক্ষেত্র। অলিতে গলিতে খাড়া করা হল ছোটবড় ব্যারিকেড। টানা কয়েকদিন পুলিশ বনাম ছাত্রদের খণ্ডযুদ্ধ চলল। দেওয়ালগুলি ভরে উঠল অসংখ্য বাঙ্‌ময় স্লোগান এবং গ্রাফিতিতে।  ‘ব্যারিকেডে অবরোধ হয় রাস্তা, খুলে যায় পথ।’ ‘আমরা ভিক্ষা করি না, দখল করি।’ ‘বিপ্লব অবিশ্বাস্য, কারণ তা বাস্তব।’ স্লোগান আর কবিতা যেন করমর্দন করল একে অন্যের! কেউ লিখলেন, ‘ওঠো, জাগো, বিশ্ববিদ্যালয়ের হা-ঘরেরা।’ কেউ বা আরও স্পষ্ট: ‘পরীক্ষার খাতায় উত্তর দিয়ো প্রশ্নে প্রশ্নে।’ চেক সাহিত্যিক মিলান কুন্দেরা তাঁর বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘লাইফ ইজ এলসহোয়ার’-এর নামকরণ করলেন এরকমই এক দেওয়াল লিখন থেকে। জীবন আর সাহিত্য যেখানে মিলেমিশে যায়, সেটাই হয়ত বিপ্লব!

৫ মে থেকেই শহরের সিনেমা হল এবং নাট্যশালাগুলিকে ছাত্ররা দখল করে জনসমাবেশ করছিল। এরকমই একটি সভায় এক মাওবাদী নেতা তাঁর রাষ্ট্রবিরোধী বক্তৃতায় বললেন, ‘দ্য গলের (তৎকালীন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট) স্বৈরাচার জনগণের সংসদকে বুর্জোয়া নাট্যশালায় পরিণত করেছে।’ সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে ছাত্রনেতা ওয়ালি রোজেল বলে উঠলেন, ‘‘আর ঠিক এই কারণেই বুর্জোয়া নাট্যশালাগুলোকে দখল করে তাদের আমরা জনগণের সংসদে পরিণত করব।’’ সরকার আন্দোলনকে দাগিয়ে দিল মাওবাদী ষড়যন্ত্র হিসেবে। দেশকাল নির্বিশেষে রাষ্ট্রক্ষমতা সম্ভবত একই রকমের ভূত দেখে!

সমাবেশগুলি থেকে দাবি উঠল লিঙ্গ সাম্যের। দাবি উঠল, শিক্ষা ব্যবস্থাকে শোষিত জনগণের পাঠশালায় রূপান্তরিত করতে হবে। অবাধ চিন্তার স্বাধীনতা চাই। যৌনতা হোক মুক্ত। রক্ষণশীল দ্য গলের পতন হোক। সনাতনপন্থীরা তো বটেই, ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টিও ঢোঁক গিলল এবার। এই বিদ্রোহ এতই নতুন ধাঁচের যে চিরাচরিত মাকর্সবাদ দিয়ে ঠিক মেলানো যাচ্ছিল না। বিদ্রোহীদের নতুন আইকন এখন চে গেভারা, হারবার্ট মারক্যুস, মাও জে দং। তাদের দাবি যত না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে। ফলে এক সময়ে দ্বন্দ্বটা শুধু নতুন বনাম সনাতনী সমাজ নয়, নতুন বনাম পুরনো বামপন্থার রূপও নিয়ে নিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়ার ব্যাঙ্গাত্মক আহ্বান, ‘ঢোকার সময় যেমন ভেবেছিলেন, ছাড়ার সময়ও তেমন সাফসুতরো রাখুন কমিউনিস্ট পার্টিকে’। অবশেষে সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে কয়েকদিন পরে কমিউনিস্ট পার্টির ট্রেড ইউনিয়ন তাদের নিজস্ব  দাবিদাওয়া নিয়ে ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়াল। শ্রমিকেরা দখল নিয়ে নিলেন একাধিক কারখানার। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এক কোটি শ্রমিকের ধর্মঘটে ফ্রান্স স্তব্ধ হয়ে গেল।

ব্যাপক সংখ্যায় মানুষ, গায়ক, কবি, অধ্যাপক এবার আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে এলেন। রেনো কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্র-শ্রমিক সংহতির পক্ষে দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্র প্রকাশ্যে বিলি করলেন নিষিদ্ধ মাওবাদী পত্রিকা। তখন কান চলচ্চিত্র উৎসব চলছিল। মঞ্চে উঠে চলচ্চিত্রকার জঁ লুক গদার আন্দোলনরত ছাত্রদের প্রতি সহমর্মিতা জানালেন। প্রতিবাদে আইরিশ চিত্রপরিচালক পিটার লেনন চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘‘আমার ফিল্ম প্রদর্শনের পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আপনাদের বিপ্লব শুরু হতে হল?’’ সপাটে  জবাব দিলেন গদার, ‘‘আমরা বিপ্লব নিয়ে কথা বলছি। আর আপনি এখনও ক্লোজ আপ আর ট্র্যাকিং শট নিয়ে কচকচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তফাতটা বুঝুন।’’ উৎসব বন্ধ হয়ে গেল। 

তত দিনে ফ্রান্সের সরকার প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে। কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজপথ—সব কিছুরই দখল সাধারণ মানুষের হাতে। এবার  চার্লস দ্য গল যেটা করলেন সেটা প্রায় অভাবনীয়। মন্ত্রিসভাকে অন্ধকারে রেখে দেশ ছেড়ে নিরুদ্দেশ হলেন। যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীকে বলে গেলেন, ‘‘আমার দিন শেষ’’। সঙ্গে সঙ্গে গোটা দেশ ফেটে পড়ল প্রবল উল্লাসে। অভ্যুত্থানের ভয়ে প্রেসিডেন্ট ভাগলবা হয়েছেন! কয়েকদিন বাদে অবশ্য ফিরেও এলেন। নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হল রাজবন্দিদের। জুন মাসে সাধারণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল। এরপর আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসল অভ্যুত্থান। কিন্তু দ্য গল আর কখনও তাঁর হৃত জনপ্রিয়তা ফিরে পাননি। নির্বাচনে জয়লাভ করা সত্বেও ১৯৬৯ সালে পদত্যাগ করেন তিনি।

আর্নেস্ট ম্যান্ডেল ভুল ভেবেছিলেন। বিপ্লব আসেনি। প্যারিসের ছাত্র আন্দোলন এক সময়ে স্তিমিত হয়ে নিভে গিয়েছে। কিন্তু বিপ্লবের থেকেও বেশি বিপজ্জনক হল বিপ্লবের ভূত, যা ভবিষ্যতের পৃথিবীকে তাড়া করে বেড়ায়। নতুন রূপে ফিরে আসে বারবার। জেএনইউ থেকে যাদবপুর, তাহিরির স্কোয়ার, শাহবাগ, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট…

এই ভোজসভায় সার্বিক সমাজের যোগদানের রূপ কেমন হতে পারে, তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন ফ্রাঁসোয়া লেনার্ড। ফ্রাঁসোয়া ’৬৮-র ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন, বর্তমানে পেশাদার ফটোগ্রাফার। প্যারিস রিভিউ-তে ’৬৮-র স্মৃতিচারণে ফ্রাঁসোয়া লিখেছিলেন, ইকোল নর্মাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁদের গ্রিক দর্শন পড়াতেন এক সুদর্শন শান্তস্বভাবের অধ্যাপক। ছাত্রবিক্ষোভে যোগ দেওয়ার জন্য এক দিন তাঁর ক্লাস কেটেছিলেন ফ্রাঁসোয়া। একটি অধিকৃত নাট্যশালায় পিছনের দরজা দিয়ে ভয়ে ভয়ে প্রবেশ করেছিলেন, যাতে আসবার পথে ক্লাসের কারোর চোখে না পড়ে যান। কিন্তু মঞ্চের কাছে গিয়ে আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায় ফ্রাঁসোয়ার। দেখেন, জনগণের অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে সেই সৌম্য মূর্তি অধ্যাপক অগ্নিবর্ষী বক্তব্য রাখছেন! অধ্যাপকের নাম জাক দেরিদা!

image (1)

মঞ্চের কাছে গিয়ে আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায় ফ্রাঁসোয়ার। দেখেন, জনগণের অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে সেই সৌম্য মূর্তি অধ্যাপক অগ্নিবর্ষী বক্তব্য রাখছেন! অধ্যাপকের নাম জাক দেরিদা!


ছোটদের রাজনীতি ও অর্থনীতি: অধ্যাপক নীহার কুমার সরকার

IMG_000112

বইটি পড়তে বা ডাউনলোড করতে নীচে ক্লিক করুন

ছোটদের রাজনীতি ছোটদের অর্থনীতিঃ অধ্যাপক নীহার কুমার সরকার


ফ্যাসীবাদবি‌রোধী সংগ্রাম ও যুক্তফ্রন্ট প্রস‌ঙ্গেঃ জর্জি দিমিত্রভ

Georgi_Dimitrow

জর্জি দিমিত্রভ মিখাইলভ, যিনি জর্জি দিমিত্রভ, নামে পরিচিত একজন বুলগেরিয়ান কমিউনিস্ট রাজনীতিবিদ ছিলেন। ১৯৪৬ – ১৯৪৯ পর্যন্ত তিনি বুলগেরিয়ার প্রথম কমিউনিস্ট নেতৃত্ব ছিলেন। তিনি ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নেতৃত্ব দেন।

বইটি পড়তে বা ডাউনলোড করতে নীচে ক্লিক করুন –

ফ্যাসীবাদবি‌রোধী সংগ্রাম ও যুক্তফ্রন্ট প্রস‌ঙ্গে


কোটা সংস্কার: বিজয় হয়েছে, হয়নি / আন্দোলন চলবে

Students-Strike

 ছাত্র-ছাত্রী-যুবদের উত্থান

 কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্র-ছাত্রী-যুবদের বিশাল উত্থান ঘটেছিল। এ ক্ষেত্রে ছাত্রীদের অভূতপূর্ব ভূমিকা রয়েছে।  প্রধানমন্ত্রী ছাত্রীদের তিরস্কার করেছেন এই বলে ‘যদি কোনো অঘটন ঘটতো তার দায়দায়িত্ব কে নিত’ ? নারী অধিকারের নেত্রী বটে! কোন কোন শিক্ষয়ত্রী ছাত্রীদের প্রবল প্রতিবাদী দেখে মন্তব্য করেছেন ‘তখন মনে মনে গর্ব করেছি’। দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ। ঐ রাতে ছাত্র লীগের ক্ষমতা ভেঙ্গে পড়ায় ছাত্রীরা নিরাপদে ছিলেন অবশ্য! ছাত্র-ছাত্রীরা সৌহাদ্যপূর্ণভাবেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন, কোন অঘটন ঘটেনি। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব-এটা আন্দোলনের বড় দুর্বলতা। ফলে সরকারী ষড়যন্ত্রটা যথাসময়ে যথার্থভাবে উন্মোচিত হতে পারছে না। এই আন্দোলনে সরকার ও ছাত্র লীগ আওয়ামী পন্থী বুদ্ধিজীবীগণ বিরোধী শক্তি ছিলেন এবং আছেন – এর উন্মোচন ও প্রতিবাদ হওয়া দরকার।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংবিধান বিরোধী

 মুক্তিযোদ্ধা কোটা শুধু যে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অপমানজনক তাই নয়, তা সংবিধান বিরোধীও বটে। এতদিন ধরে এটা চলে আসলেও কোনো আইনবিদ বা রাজনীতিক এটা কখনো তুলে ধরেনি। রাষ্ট্রের সংবিধানে শুধু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুযোগদানের কথা বলা হয়েছে। নতুবা ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠী নির্বিশেষে কোনো বৈষম্য তাদের নিজেদের তৈরি এই সংবিধানও অনুমোদন করে না। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এইসব ভাতা আর কোটার জন্য যুদ্ধ করেননি। তদুপরি, তাদের লড়াই এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছে যেখানে ব্যাপক জনগণের অধিকাংশের জীবন আগের মতই মানবেতর- এটাও আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য। জনগণের প্রকৃত মুক্তি হলে কাউকে এমন কোটার জন্য লড়াই করতে হতো না।

কোটা বাতিল সংবিধানবিরোধী

প্রধানমন্ত্রী বিরাগের বশবর্তী হয়ে সকল কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও কেউ এমন কোন দাবি করেনি। যে দাবি কেউ করেনি, সেরকম এক সংবিধান বিরোধী ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী কীভাবে করেন? সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে পিছিয়ে পড়াদের জন্য বিশেষ সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবন্ধী, আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া অঞ্চল- এসব ক্ষেত্রে কোটা বাতিলের কোন অধিকারই প্রধানমন্ত্রীর নেই। এটা কীভাবে অভিনন্দনযোগ্য হয়?

‘বঙ্গবন্ধুর বাংলা’য় সর্বদাই বৈষম্য ছিল

এই বিভ্রান্তকারী স্লোগানটি ছাত্রলীগ আন্দোলনে ঢুকিয়ে দিয়েছে। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে একটি উদাহরণও নেই যেখানে বাংলাদেশে বৈষম্য ছিল না ও নেই। এটা ভাবলে ভুল হবে যে, বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ মুজিবের আদর্শ থেকে সরে গেছে। তারা তাদের আদর্শ ধরেই চলছে। কোটা সংস্কারের ছাত্র আন্দোলনে আক্রমণ, নিপীড়ন ও ষড়যন্ত্র তারই ধারাবাহিকতা, তার ব্যত্যয় নয়।

আন্দোলন বিরোধী নেত্রীকে ‘মাদার’ ঘোষণার নাটক

এ আন্দোলনে পরিস্কারই দুটো পক্ষ ছিল। একটি হলো, সরকার, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ। যারা এ আন্দোলনকে বিরোধিতা করেছে, আক্রমণ করেছে, পুলিশী নিপীড়ন করেছে। অন্যটি হলো, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী, যারা আন্দোলন করেছেন, নিপীড়িত হয়েছেন ও হচ্ছেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের দাবি আদায় করেছেন। আন্দোলনের চাপে সব কোটা বাতিলের নতুন ষড়যন্ত্রের পর প্রধানমন্ত্রীকে কোন হিসেবে ‘মাদার’ উপাধি দেয়া যেতে পারে? এটা হলো এরশাদের সুদীর্ঘ নয় বছর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের চাপে এরশাদের পতনের পর তাকেই গণতন্ত্রের অতন্ত্র প্রহরী দাবি করার মতো হাস্যকর।

ভিসি’র বাড়িতে হামলা- বাস্তবতা ও বিভিন্ন মত

ভিসি’র বাড়িতে হামলা সম্পর্কে বুর্জোয়া সুশীল ও বুদ্ধিজীবীদের থেকে শুরু করে ‘মূল স্রোত’র রাজনৈতিক দলগুলো নিন্দার ঝড়া তুলেছে। এ সম্পর্কে কেউ এখনো প্রামাণ্যভাবে কিছু বলতে পারছে না। তবে এদেশের ইতিহাসে ’৬৯-এর অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে কোনো গণ ও ছাত্র-অভ্যুত্থানই এতটা সুশীল কখনই ছিল না। বহু আগুন ও ভাঙচুরের মধ্য দিয়েই একেকটা আন্দোলন বিজয় দেখেছে। প্রচলিত মান্য গণ্য বহু ব্যক্তিত্ব, যারা গণবিরোধী রাজনীতির দালালিতে নাম করেছে, গণঅভ্যুত্থানের আগুনে ছাই হয়ে গেছে। যদিও ভিসি-কে শারীরিক হামলা সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু জনজোয়ার সর্বদা এসব কিছু মেনে এগোয় না। আন্দোলনে পুলিশী আক্রমণ ও ছাত্রলীগের সহিংস হামলার পেছনে ভিসি’র মদদ ছিল না- এটা কেউ বিশ্বাস করবে না। আবার আন্দোলনে স্যাবোটাজ চালানোর জন্যও এ ধরনের কাজ করা হয়ে থাকে। সুতরাং পাইকারী নিন্দার আগে বোঝা প্রয়োজন আক্রান্তটা কে, তার ভূমিকা কী এবং বাস্তবে কী ঘটেছে।

 বিজয় সম্পন্ন হয়নি, আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে

আন্দোলনকে ঘিরে ষড়যন্ত্র চলছে। সুফিয়া কামাল হলের ঘটনা, তিন নেতার গুম প্রচেষ্টা, মামলা প্রত্যাহার না করা, আক্রমণকারী পুলিশ অফিসার ও ছাত্রলীগ নেতাদের গ্রেফতার না করা ও শাস্তি না দেয়া, নতুন আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলা ও বাধাদান প্রভৃতি এরই আলামত। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাও আন্দোলনে বিভ্রান্ত সৃষ্টির চেষ্টা ব্যতীত কিছু নয়। তাই আন্দোলন শেষ হয়নি। নতুন পর্বে প্রবেশ করেছে মাত্র। আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে, ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করার মাধ্যমে। এর বিকল্প নেই।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, কার্ল মার্কসের জন্মদ্বিশতবর্ষ সংখ্যা


মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অঙ্গ

Karl-Marx-jubilee-trier-germany-capitalism-economist-communism

সভ্য দুনিয়ার সর্বত্র বুর্জোয়া বিজ্ঞানের (সরকারী এবং উদারনৈতিক উভয় প্রকার) পক্ষ থেকে মার্কসের মতবাদের প্রতি চূড়ান্ত শত্রুতা ও আক্রোশ দেখা যায়; মার্কসবাদকে তা দেখে একধরনের ‘ক্ষতিকর গোষ্ঠী’ হিসেবে। অবশ্যই অন্য মনোভাব আশা করা বৃথা, কেননা শ্রেণিসংগ্রামের ওপর গড়ে ওঠা সমাজে ‘নিরপেক্ষ’ সমাজবিজ্ঞানের অস্তিত্ব অসম্ভব। সবরকমের সরকারী ও উদারনৈতিক বিজ্ঞানই কোনো না কোনো ভাবে মজুরি-দাসত্বের সমর্থন করে থাকে, আর সে মজুরি-দাসত্বের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন সংগ্রাম ঘোষণা  করেছে মার্কসবাদ। পুঁজির মুনাফা কমিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো উচিত নয় কি- এই প্রশ্নে মিল মালিকদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা, আর মজুরি-দাসত্বের সমাজে বিজ্ঞানের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা সমান বাতুলতা।

… … মার্কসের সমগ্র প্রতিভাটাই এইখানে যে মানবসমাজের অগ্রণী ভাবনায় যেসব জিজ্ঞাসা আগেই দেখা দিয়েছিল তিনি তারই জবাব দিয়েছেন। তাঁর মতবাদের উদ্ভব হয়েছে দর্শন, অর্থশাস্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মহাচার্যেরা যে শিক্ষা দান করেছিলেন, তারই প্রত্যক্ষ ও অব্যবহিত অনুবর্তন হিসেবে।

মার্কসের মতবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ তা সত্য। এ মতবাদ সুসম্পূর্ণ ও সুসমঞ্জস, এর কাছ থেকে লোকে একটা সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি লাভ করে যা কোনোরকম কুসংস্কার, প্রতিক্রিয়া অথবা বুর্জোয়া জোয়ালের কোনো রূপ সমর্থনের সঙ্গে আপোস করে না। উনিশ শতকের জার্মান দর্শন, ইংরেজী অর্থশাস্ত্র এবং ফরাসী সমাজতন্ত্র রূপে মানবজাতির যা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তার ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী হল মার্কসবাদ।

মার্কসবাদের এই তিনটি উৎস এবং সেই সঙ্গে তার তিনটি অঙ্গ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।

১. মার্কসবাদের দর্শন হল বস্তুবাদ। ইউরোপের সমগ্র আধুনিক ইতিহাস ধরে এবং বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, ফ্রান্সে যখন সবরকমের মধ্যযুগীয় জঞ্জালের বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠান ও ধ্যানধারণায় নিহিত ভূমিদাস প্রথার বিরুদ্ধে বদ্ধপরিকর সংগ্রাম জ্বলে উঠেছিল, তখন থেকে বস্তুবাদই দেখা দিয়েছে একমাত্র সঙ্গতিপরায়ন দর্শন হিসেবে, যা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সমস্ত শিক্ষায় বিশ্বস্ত এবং কুসংস্কার, ভণ্ডামি প্রভৃতির শত্রু। গণতন্ত্রের শত্রুরা তাই বস্তুবাদকে ‘খণ্ডন করার’ জন্য, তাকে ধূলিসাৎ ও ধিক্কৃত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এবং সমর্থন করেছে নানা ধরনের দার্শনিক ভাববাদ যা সর্বদাই পর্যবসিত হয় কোনো না কোনো ভাবে ধর্মের সংরক্ষণে অথবা সমর্থনে।

মার্কস ও এঙ্গেলস অতি দৃঢ়তার সঙ্গে দর্শনিক বস্তুবাদকে সমর্থন করেছেন এবং এই ভিত্তি থেকে যেকোনো বিচ্যুতিই যে কী দারুণ ভুল তা বারবার ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন। তাঁদের মতামত সবচেয়ে পরিষ্কার করে এবং বিশদে ব্যক্ত হয়েছে এঙ্গেলসের ‘ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ’ এবং ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’ রচনায়। ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এর মতো এ বইদু’খানিও প্রত্যেকটি সচেতন শ্রমিকের নিত্যপাঠ্য।

অষ্টাদশ শতাব্দীর বস্তুবাদেই কিন্তু মার্কস থেমে যাননি, দর্শনকে তিনি অগ্রসর করে গেছেন। এ দর্শনকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন জার্মান চিরায়ত দর্শনের সম্পদ দিয়ে, বিশেষ করে হেগেলীয় তন্ত্র দিয়ে, যা আবার পৌঁছিয়েছে ফয়েরবাখের বস্তুবাদে। এই সব সম্পদের মধ্যে প্রধান হল দ্বান্দ্বিকতা অর্থাৎ বিকাশের পূর্ণতম, গভীরতম, একদেশদর্শিতাবর্জিত তত্ত্ব, যে মনুষ্যজ্ঞানে আমরা পাই নিরন্তর বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন তার আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। জরাজীর্ণ ও পুরনো ভাববাদের ‘নব নব’ প্রত্যাবর্তনের সমস্ত বুর্জোয়া দার্শনিক শিক্ষা সত্ত্বেও- রেডিয়ম, ইলেকট্রন, মৌলিক পদার্থের রূপান্তর, প্রকৃতিবিজ্ঞানের আধুনিকতম আবিষ্কার- মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের চমৎকার প্রমাণ।

দার্শনিক বস্তবাদকে গভীরতর ও পরিবিকশিত করে মার্কস তাকে সম্পূর্ণতা দান করেন, প্রকৃতি বিষয়ক জ্ঞানকে প্রসারিত করেন মানবসমাজের জ্ঞানে। বৈজ্ঞানিক চিন্তার সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকীর্তি হল মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ক মতামতে যে বিশৃঙ্খলা ও খামখেয়ালের রাজত্ব এযাবৎ চলে আসছিল তার বদলে দেখা দিল এক আশ্চর্য রকমের সর্বাঙ্গীণ ও সুসমঞ্জস বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা দেখাল কী করে উৎপাদন-শক্তিসমূহের বিকাশের ফলে আমাদের সমাজজীবনে একটি ব্যবস্থা থেকে উদ্ভব হয় উচ্চতর ব্যবস্থার- দৃষ্টান্তস্বরূপ, কী করে সামন্ততন্ত্র থেকে বিকশিত হয় পুঁজিবাদ।

মানুষের জ্ঞান যেমন মানুষের অস্তিত্ব-নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক জগতের অর্থাৎ বিকাশমান পদার্থের প্রতিফলন, তেমনি সমাজের  অর্থনেতিক ব্যবস্থার প্রতিফলনই হল মানুষের সামাজিক জ্ঞান (অর্থাৎ দার্শনিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন মতামত ও তত্ত্ব)। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি হল অর্থনৈতিক বনিয়াদের উপরিকাঠামো। দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখা যাবে যে, আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক রূপ যত বিভিন্ন হোক, তার কাজ হল প্রলেতারিয়েতের ওপর বুর্জোয়া প্রভুত্ব সংহত করা।

মার্কসের দর্শন হল সুসম্পূর্ণ দার্শনিক বস্তুবাদ- তা থেকে মানবসমাজ এবং বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণি তার জ্ঞানাঞ্জন-শলাকা লাভ করেছে।

২. অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই হল বনিয়াদ, তার ওপরেই রাজনৈতিক উপরিকাঠামো দণ্ডায়মান- একথা উপলব্ধির পর মার্কস তাঁর সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেন এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অধ্যয়নে। মার্কসের প্রধান রচনা ‘পুঁজি’-তে আধুনিক, অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পর্যালোচিত হয়েছে। মার্কসের পূর্বেকার চিরায়ত অর্থশাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিকশিত দেশে- ইংলন্ডে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করে অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডো শ্রমের মূল্য-তত্ত্বের সূত্রপাত করেন। মার্কস তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি এ তত্ত্বকে আমূলরূপে সুসিদ্ধ ও সুসঙ্গতরূপে বিকশিত করেন। তিনি দেখান যে, পণ্যের উৎপাদনে সামাজিকভাবে আবশ্যক যে শ্রমসময় ব্যয় হয়েছে, তা দিয়েই তার মূল্য নির্ধারিত হয়।

বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদেরা যেখানে দেখছিলেন দ্রব্যের সঙ্গে দ্রব্যের সম্পর্ক (এক পণ্যের সঙ্গে অন্য পণ্যের বিনিময়), মার্কস সেখানে উদ্ঘাটিত করলেন মানুষে মানুষে সম্পর্কে। পণ্যবিনিময়ের মধ্যে যোগাযোগ। মুদ্রার অর্থ হল সে যোগসূত্র ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, বিভিন্ন উৎপাদকদের গোটা অর্থনৈতিক জীবন অবিচ্ছিন্ন হয়ে সংযুক্ত হচ্ছে একটি অখ- সমগ্রতায়। পুঁজির অর্থ এই যোগসূত্রের আরো বিকাশ: মানুষের শ্রমশক্তি পরিণত হচ্ছে পণ্যে। জমি, কলকারখানা ও শ্রমের হাতিয়ারপাতির মালিকের কাছে মজুরি-শ্রমিক তার শ্রমশক্তি বিক্রি করে। শ্রমদিনের এক অংশ সে খাটে তার সপবিার ভরণপোষণের খরচা তোলার জন্য (মজুরি), বাকি অংশটা সে খাটে বিনামজুরিতে, সৃষ্টি করে পুঁজিপতির জন্য বাড়তি মূল্য, পুঁজিপতি শ্রেণির মুনাফার উৎস ও সম্পদের উৎস।

মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের মূলকথা হল এই বাড়তি মূল্যের তত্ত্বটা। শ্রমিকের মেহনতে গড়া এই পুঁজি শ্রমিকদের পিষ্ট করে, ক্ষুদে মালিকদের ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে বেকার বাহিনীর। শিল্পের ক্ষেত্রে বৃহদাকার উৎপাদনের জয়যাত্রা অবিলম্বেই চোখে পড়ে, কিন্তু কৃষির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার দেখা যাবে: বৃহদাকার পুঁজিবাদী কৃষির প্রাধান্য বাড়ছে, যন্ত্রপাতির নিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষকের অর্থনীতি এসে মুদ্রা পুঁজির ফাঁসে আটকে যাচ্ছে, তারপর নিজের পশ্চাৎপদ টেকনিকের বোঝায় ভেঙ্গে পড়ছে ও ধ্বংস পাচ্ছে। কৃষিতে ক্ষুদ্রাকার উৎপাদনের যে ভাঙ্গন তার রূপগুলো অন্যরকম, কিন্তু ভাঙনটা তর্কাতীত সত্য।

ক্ষুদ্রাকার উৎপাদনকে ধ্বংস করে পুঁজি শ্রম-উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি ঘটায় এবং বড় বড় পুঁজিপতিদের সঙ্ঘগুলির একচেটিয়া প্রতিষ্ঠা সৃষ্টি করে। উৎপাদনটাও উত্তরোত্তর সামাজিক হতে থাকে- লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি মজুর বাঁধা পড়ে একটি প্রণালীবদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়- অথচ যৌথ শ্রমের ফল আত্মাসাৎ করে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি। বৃদ্ধি পায় উৎপাদনের নৈরাজ্য, সংকট, বাজারের জন্য ক্ষিপ্ত প্রতিযোগিতা, এবং ব্যাপক জনসাধারণের জীবনধারণের অনিশ্চয়তা।

পুঁজির কাছে শ্রমিকদের পরাধীনতা বাড়িয়ে তুলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্মিলিত শ্রমের মহাশক্তি গড়ে তোলে।

পণ্য অর্থনীতির ভ্রƒণাবস্থা থেকে, সরল বিনিময় থেকে শুরু করে তার সর্বোচ্চ রূপ বৃহদাকার উৎপাদন পর্যন্ত মার্কস পুঁজিবাদের বিকাশ পর্যালোচনা করেছেন।

এবং নতুন পুরনো সবরকম পুঁজিবাদী দেশের অভিজ্ঞতায় মার্কসের এ মতবাদের সঠিকতা বছরের পর বছর বেশি বেশি মজুরের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠছে।

সারা দুনিয়ায় পুঁজিবাদের জয় হয়েছে, কিন্তু এ জয় শুধু পুঁজির ওপর শ্রমের বিজয়লাভের পূর্বাভাস।

৩. ভূমিদাস প্রথার পতনের পর ঈশ্বরের দুনিয়ায় ‘মুক্ত’ পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই একথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, মেহনতী মানুষের ওপর পীড়ন ও শোষণের একটি নতুন ব্যবস্থাই হল এ মুক্তির অর্থ। সে পীড়নের প্রতিফলন ও প্রতিবাদ স্বরূপ নানাবিধ সমাজতান্ত্রিক মতবাদ অবিলম্বে দেখা দিতে শুরু করে। কিন্তু আদিম সমাজতন্ত্র ছিল ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র। পুঁজিবাদী সমাজের তা সমালোচনা করেছে, নিন্দা করেছে, অভিশাপ দিয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে তার বিলুপ্তির, উন্নততর এক ব্যবস্থার কল্পনায় মেতেছে, আর ধনীদের বোঝাতে চেয়েছে শোষণ নীতিবিগর্হিত কাজ।

কিন্তু সত্যিকারের উপায় দেখাতে ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র পারেনি। পুঁজিবাদের আমলে মজুরি-দাসত্বের সারমর্ম কী তা সে বোঝাতে পারেনি, পুঁজিবাদের বিকাশের নিয়মগুলি কী তাও সে আবিষ্কার করতে পারেনি, খুঁজে পায়নি সেই সামাজিক শক্তি বা নতুন সমাজের নির্মাতা হবার ক্ষমতা ধরে।

ইতিমধ্যে সামন্ততন্ত্র, ভূমিদাসত্বের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের সর্বত্র এবং বিশেষ করে ফ্রান্সে যেসব উত্তাল বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছিল, তা থেকে উত্তরোত্তর পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, শ্রেণীসমূহের সংগ্রামই হল সমস্ত বিকাশের ভিত্তি ও চালিকাশক্তি।

মরিয়া প্রতিবন্ধকতা ছাড়া ভূমিদাস-মালিক শ্রেণির ওপর রাজনৈতিক স্বাধীনতার একটি বিজয়লাভও সম্ভব হয়নি। পুঁজিবাদী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে মরণপণ সংগ্রাম বিনা কোনো পুঁজিবাদী দেশই ন্যূনাধিক মুক্ত ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি।

মার্কসের প্রতিভা এইখানে যে এ থেকে তিনি সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হন ও তাকে সুসঙ্গতরূপে বিকশিত করেন, যা পাওয়া যায় বিশ্বইতিহাসের শিক্ষা থেকে। সে সিদ্ধান্ত হর শ্রেণিসংগ্রামের মতবাদ।

যেকোনো নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত লোকে রাজনীতির ক্ষেত্রে চিরকাল প্রতারণা ও আত্মপ্রতারণার নির্বোধ বলি হয়ে ছিল এবং চিরকাল তাই থাকবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাছে সংস্কার ও উন্নয়নের প্রবক্তারা সর্বদাই বোকা বনবে যদি তারা একথা না বোঝে যে, যত অসভ্য ও জরাজীর্ণ মনে হোক না কেন, প্রত্যেকটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে কোনো না কোনো শাসক শ্রেণির শক্তির জোরে। এবং এই সবশ্রেণির প্রতিরোধ চূর্ণ করার শুধু একটি উপায় আছে: যে শক্তি পুরনোর উচ্ছেদ ও নতুনকে সৃষ্টি করতে পারে- এবং নিজের সামাজিক অবস্থানহেতু যা তাকে করতেই হবে- তেমন সব শক্তিকে আমাদের চারপাশের সমাজের মধ্যে থেকেই আবিষ্কার করে তাকে দীক্ষিত ও সংগ্রামের জন্য সংগঠিত করে তোলে।

 যে মানসিক দাসত্বের মধ্যে নিপীড়িত শ্রেণিগুলির সকলে এতদিন বাঁধা পড়ে ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ প্রলেতারিয়েত পেয়েছে একমাত্র মার্কেসের দার্শনিক বস্তুবাদ থেকে। একমাত্র মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বেই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সাধারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের সত্যিকার অবস্থাটা কী।… … …

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, কার্ল মার্কসের জন্মদ্বিশতবর্ষ সংখ্যা