সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন ছিল ?

su-ps67s

একেবারে গরীব মজুর মেহনতী, চাষাভূষা, যাদের চালচুলো নেই, হাজার বছরের কুসংস্কারের অন্ধকারে যাদের বাস, গতর খাটানোই জীবন, সুস্থ সুন্দর জীবন যাদের কাছে ভাগ্যের বঞ্চনা- সেই নীচুতলার মানুষদের আবার লেখাপড়া! পুরো দুনিয়ার সামনে যা ছিল অকল্পনীয়, তাই ইতিহাসে বাস্তব করে তুলেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন।

শিক্ষা নিয়ে আজ পর্যন্ত পুরো দুনিয়ার আলোচনার শেষ নেই। শিক্ষা কাকে বলে, শিক্ষিত লোক কে – তা নিয়েও সবার মত এক নয়। ধনী ও দরিদ্রে বিভক্ত এ সমাজে শিক্ষা ও শিক্ষার উদ্দেশ্য একই রকম থাকে না। ছোটবেলায় বড়জনেরা বলত ‘বড় হও, মানুষ হও বাবা’। এই মানুষ হওয়া বলতে কি বোঝায়? প্রকৃতির নিয়মে আমরা বেড়ে উঠি। এটাই কি বড় হওয়া? সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই ইংরেজরা শিক্ষার উদ্দেশ্য বলতে শিখিয়েছিল – লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে। আমাদের দেশে তো বটেই দুনিয়া জুড়েই আজ একথার পেছনে সবাই ছুটছে। মানে লেখাপড়া শেষ করে বড় হয়ে কেউ চাকরি করবে, অনেক টাকা আয় করবে, বাড়ি, গাড়ি ধনদৌলত বানাবে। তাহলে এটাই কি শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য? আজ শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেই আমরা এ চিত্রই পাবো। কারণ শিক্ষার এ দর্শনের পেছনে কাজ করছে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা। পুঁজিবাদ এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের শ্রম শোষণ করে মুষ্টিমেয় মালিকশ্রেণি মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলে। পুঁজিপতিরা তাদের নিয়ম নীতি, আইন কানুন দিয়ে এ সমাজের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই মালিক এবং শ্রমিকে বিভক্ত এ সমাজে মালিকশ্রেণি ততটুকু শিক্ষা দেয় যতটুকু তাদের মুনাফার জন্য প্রয়োজন। তাই সকল মানুষের স্বার্থে মানবজাতির সঞ্চিত জ্ঞানকে সে কাজে লাগাতে পারে না। মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, কুসংস্কারমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও মানবিক মন গড়ে তুলতে হয় সে ব্যর্থ হয়। শুধু তাই নয়, দুনিয়াজুড়ে পুঁজিবাদ আজ শিক্ষার মহত্তম উদ্দেশ্যকে ভুলিয়ে দিয়ে একে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করেছে। কেড়ে নিয়েছে শিক্ষার অধিকার। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র শুধু শিক্ষার অধিকার দেয়নি, কর্মে, সৃজনে, মননে সৃষ্টি করেছে একেবানে নতুন মানুষ। সেই শিক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা পুরো দুনিয়ার সামনে আজও শ্রেষ্ঠ আসন নিয়ে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

বিপ্লবের আগে: পেছন ফিরে দেখা
রাশিয়া ছিল সম্রাট জারের অধীন। শিল্প কারখানার দিক থেকে এটি ছিল অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশ। বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। জারের মন্ত্রী, আমলা, সেনাবাহিনী, সুবিধাভোগী গোষ্ঠী আর ধনী জমিদার- শিল্পপতি মিলে পুরো দেশের শ্রমজীবী মানুষের উপর শোষণ, লুণ্ঠণ, অত্যাচার চালাত। জারের ক্ষমতার আগ্রাসন ক্রমে আশেপাশের রাজ্যগুলোকে দখল করে নিল। সেগুলোকে প্রদেশ বানিয়ে দুর্বল জাতিগুলোকে বছরের পর বছর শাসন-শোষণ চালাত।

সোভিয়েত সরকার প্রতিষ্ঠার আগে সেখানে সার্বজনীন শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তাই লক্ষ লক্ষ শিশু কখনোই স্কুুলে যায়নি। বেশিরভাগ কৃষক ছিল অজ্ঞ, মূর্খ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সংখ্যালঘু জাতিগুলোর অবস্থা আরও করুণ। রাশিয়ার ১৭৫ টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ১২৪ টির কোনো লিখিত হরফ ছিল না। ইউক্রেনীয়, জর্জিয়ানরা সংবাদপত্র, বই, এমনকি আদালতে পর্যন্ত নিজেদের ভাষা ব্যবহার করতে পারত না। রাশিয়ান ভাষায় তাদের পড়ালেখা শিখতে হতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৭৩ শতাংশ প্রাপ্ত বয়ষ্ক জনগণ ছিল অশিক্ষিত। কিছু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষিতের হার ৫ শতাংশেরও কম ছিল। (যেমন- কাজাকিস্তানে ২ শতাংশ, উজবেকিস্তানে ১ শতাংশ, তাজিকিস্তানে ০.৫ শতাংশ।)

জার আলোকজান্ডারের নির্দেশনা মন্ত্রী শিকভের একটি বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যাবে সে সময়ে শিক্ষা সর্ম্পকে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি — “জ্ঞান হলো লবনের মতো, যা জনগণের অবস্থা এবং চাহিদা অনুসারে অল্প পরিমাণে ব্যবহার এবং প্রদান করা হয়।… সকলকে এমনকি বেশিরভাগ মানুষকে শিক্ষিত করলে ভালোর চেয়ে অনিষ্ট হয় বেশি।” ফলে স্কুল-কলেজগুলো ছিল বড়লোকের সন্তানদের জন্য। স্কুল কলেজের পড়াশুনা ছিল ভয়ংকর চাপ, একঘেঁয়ে, আনন্দহীন। পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল যে, বাচ্চাদের আত্মহত্যার ঘটনা হর-হামেশায় ঘটত। মিস হেবে স্পাউলের ‘দি ইউথ অব রাশিয়া’ বইটির মতে, এই প্রবণতা এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল যে ছাত্রদের মধ্যে আত্মহত্যার কারণ উদ্ঘাটন করতে সরকারের Ministry of Public Instruction কে একটি কমিশন গঠন করতে হয়েছিল।

বিপ্লবের পর : নতুন যুগের কেতন
এই প্রেক্ষাপটে ১৯১৭ সালে শ্রমিকশ্রেণী ক্ষমতা দখল করল। শত শত বছরের গভীর অন্ধকার ভেদ করে আলোর দরজা খুলে গেল। পরিস্থিতি যত কঠিন হোক ,জনগণের দাবি পূরণের কাজ শুরু হলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার সরকার (তখনও বিপ্লব হয়নি) অংশ নেয়ার কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে বহু তরুণ-যুবককে এতিম, সম্বলহীন, গৃহহীন করে দেয়। আবার বিপ্লব পরবর্তী গৃহযুদ্ধ ও ১৯২১ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণে পরিস্থিতি আরও সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিপ্লবের আগেই কিশোরদের একটা অংশ বিভিন্ন অপরাধ চক্র গড়ে তুলে নানা আইনবিরোধী কর্মকান্ড পরিচালনা করত। অনেকেই চুরি করে জীবিকা নির্বাহ করত এবং নিয়মিত খুন-খারাবি করে গ্রামে ও শহরে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করত। তারা বসবাস করত সুরিখানা ও নালা-নর্দমার ধারে। ফলে শারীরিক-মানসিকভাবে ছিল প্রচ- অসুস্থ। এই শিশুদের কেবল শিক্ষা নয়, নৈতিক মুক্তিরও প্রয়োজন ছিল। এসব শিশুদের স্কুলের আওতায় আনা আর বিশাল নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করার মহান ব্রত নিয়ে শুরু হয় বিপ্লবী সরকারের কাজ।

সোভিয়েত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২১-এ বলা হয়েছে, ‘ইউএসএসআর- এর নাগরিকদের শিক্ষার অধিকার হবে সুরক্ষিত। সার্বজনীন, বাধ্যতামূলক, বুনায়াদী শিক্ষার দ্বারা এই অধিকার নিশ্চিত করা হবে। অবৈতনিক উচ্চশিক্ষাসহ ; উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর রাষ্ট্রীয় উপবৃত্তি প্রদান করা হবে। স্কুল শিক্ষা স্থানীয় মাতৃভাষার মাধ্যমে পরিচালিত হবে। রাষ্ট্রীয় খামার, ট্রাক্টর স্টেশন এবং যৌথ খামারে পরিশ্রমী বা মেহনতিদের বৃত্তিগত, প্রযুক্তিগত ও কৃষি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অবৈতনিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।’

বিশাল জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করার জন্য পরিপূরক প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জামের অভাব, তীব্র সংকট ছিল প্রয়োজনীয় শিক্ষক-বিল্ডিং-বইপত্রের। ফলে বহু বছর ধরে মস্কোর মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকার স্কুলগুলোতে বিভিন্ন শিফটে পড়াতে হতো। এছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে পূর্বে শোষিত হওয়া উপজাতিদের মধ্যে থাকা প্রবল অন্ধবিশ্বাস ও অজ্ঞতা যেটি শিক্ষকদের পাঠদানে সরাসরি বাধাপ্রদান করত, তাকেও অতিক্রম করতে হয়েছিল।

সোভিয়েত শিক্ষাকাঠামো
শৈশব থেকে ৮ বছর পর্যন্ত: Creches (কর্মরত মায়েদের শিশুদের দেখাশোনার জন্য সাধারণ শিশুভবন), কিন্ডারগার্টেন, প্লেগ্রাউন্ড, নার্সেরি স্কুল। (এগুলো ঐচ্ছিক) * ৭ বছরের স্কুল শিক্ষা: সকলের জন্য ছিল বাধ্যতামূলক। ৮-১৫ বছর পর্যন্ত। * ১০ বছরের স্কুল শিক্ষা: ৮-১৮ বছর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ছিল। পরে সেটি ১৫ বছর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করে। * শিল্প কারখানায় শিক্ষা: ফ্যাক্টরি এবং ব্যবসায় শিক্ষা স্কুল। * পেশাগত শিক্ষা: পেশাগত শিক্ষার স্কুল ও একাডেমিসমূহ। * উচ্চশিক্ষা: বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল এবং বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটসমূহ। *প্রাপ্ত বয়স্কদের শিক্ষা: ক্লাব, বিভিন্ন সহযোগী কোর্স, সিনেমা ইত্যাদি

প্রাক-স্কুল শিক্ষা: জন্মের পর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিশুকে পুরো সমাজের সম্পদ গণ্য করা হত। শিশুদের জন্য এখানে চালু করা হয়েছিল শিশু সদন বা Creches ( ক্রেস)। বিভিন্ন কাজের এলাকা যেমন- ফ্যাক্টরি, যৌথখামার বা কতকগুলি বাসভবনকে কেন্দ্র করে শিশুভবনগুলো গড়ে উঠে। আমাদের জানা থাকা দরকার সোভিয়েত ইউনিয়নে সমস্ত নারী কাজের সুযোগ পেত। যেসব কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের ছেড়ে কাজে যেতে হয়, তারা যেন সন্তানদের খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট সময় পান। সেকারণে শিশুভবনগুলো ছিল তাদের কর্মক্ষেত্রের কাছে। কেবল পিতামাতা নয়; বিভিন্ন ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা ও ট্রেড ইউনিয়নের কমিটিসমূহ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই শিশুভবনগুলো সচল রাখতে সচেষ্ট থাকত। Mrs. Beatrice King-এর বর্ণনায় একটি আদর্শ শিশুসদনের সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা যায় —“কক্ষগুলো অনেক প্রশস্ত ও উঁচু যাতে প্রচুর আলো-বাতাস ঘরে আসতে পারে। প্রত্যেকটি রুমের একটি বারান্দা আছে যেখানে গ্রীষ্মে ও শীতে শিশুরা ঘুমায়। বিশাল রান্নাঘরে প্রধান খাবারগুলো প্রস্তুত করা হয়, ধোলাইখানাও আছে। ভ্রমণকালে আমি দেখেছি, শিশুভবনগুলোতে খেলার জন্য বিশাল মাঠ, ফুলের বাগান আছে। প্রত্যেক গ্রুপের (১২-১৫ জন) তত্ত্বাবধানের জন্য একজন যোগ্য ব্যক্তি নিযুক্ত থাকেন। শিশুভবনগুলো মা-বাবাকে যোগ্য করে তোলার জন্য আদর্শ প্রতিষ্ঠান।”

৮ বছর পর্যন্ত প্রাক স্কুল শিক্ষার চালু ছিল। নার্সারি স্কুলগুলো শিশুসদনের ধারাবাহিকতায় এগুলো পরিচালিত হত। এখানে শিশু ভর্তির ব্যাপারটি ছিল ঐচ্ছিক। এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে শিশুদের ভর্তির সংখ্যা ১৯২৮ সালে ছিল ৮ লক্ষ, ১৯৩৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ালো ১৫ লক্ষে এবং ১৯৪০ সালে তা আরও বেড়ে হলো ৩৫ লক্ষ। সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতির সাথে সাথে প্রাক স্কুল বয়ষ্ক ছেলেমেয়েদের পদার্থবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র, এবং এমনকি ভাষাতত্ত্বের মত বিজ্ঞানগুলোর বিষয়ে মৌলিক জ্ঞানদানের বিষয় আবিষ্কৃত হয়েছিল। এরকম শিক্ষা কার্যক্রম শিশুর স্মৃতিকে ভারাক্রান্ত না তার মনন শক্তির বিকাশ ঘটাত। বিশেষ করে খেলাধুলা, বিভিন্ন জিনিসপত্র, ছবি আর মডেলের মাধ্যমে এসব শিক্ষা দেয়া হত। এই শিক্ষাব্যবস্থায় বাবা মার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাবা-মা এবং স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রতি মাসে স্কুলের স্টাফদের সাথে Parents’ Council-এর একটি মিটিং হত। নিয়মিত স্কুলে আসার জন্য মা-বাবাকে উৎসাহ দেয়া হত, তেমনি শিক্ষকদের উৎসাহ দেয়া হত বাচ্চাদের বাসায় যাবার জন্য। বাচ্চারা বয়স অনুযায়ী কিছু পড়াশুনা আর প্রচুর খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমানোর সুযোগ পেত। প্রতিটি স্কুলে স্টাফ হিসেবে একজন ডাক্তার ও নার্স নিযুক্ত থাকতেন। ছোট বেলা থেকেই স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার নিয়ম-নীতিগুলো শেখানো হত। নানা কর্মকা- এমনকি খেলাধূলা পর্যন্ত এমনভাবে সাজানো হত যেন একটি শিশুর সামাজিক অভ্যাসগুলো উন্নত হয়, তারা আত্মনির্ভরশীল এবং দায়িত্ববান হয়ে গড়ে উঠে। উদাহরণ হিসেবে শিশুদের একটি জনপ্রিয় খেলা রঙ্গিন ইট সাজানোর কথা বলা যায়। এই ইটগুলো এত বড় যে শিশুদের একার পক্ষে নাড়ানো এবং কিছু তৈরি করা সম্ভব হত না। তাই ইট দিয়ে কিছু তৈরি করতে হলে তাকে অবশ্যই অন্য সাথীদের কাছে সাহায্য চাইতে হত। এই সহয়োগিতা আর মিলে মিশে থাকার মধ্যেই গড়ে উঠত ভবিষ্যতের মানুষ।

বাধ্যতামূলক স্কুলশিক্ষা
ক্রেশ ও কিন্ডারগার্টেন শেষ করে ছেলেমেয়েদের যেতে হতো স্কুলে। আট থেকে পনের বছর পর্যন্ত হলো বাধ্যতামুলক মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষা। পনেরো বছর পর্যন্ত স্কুলজীবন শেষ করে আগ্রহীরা আরও দু’বছর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত। বিপ্লব পরবর্তী স্কুল শিক্ষা নিয়ে লেনিন বলেছিলেন , “জীবনের ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, কেবলমাত্র স্কুলের গন্ডির মধ্যেই যা বন্দী তেমনি শিক্ষাদান, ট্রেনিং বা বিদ্যায় আমরা বিশ্বাস করি না… আমাদের স্কুল থেকে তরুণদের পাওয়া উচিত জ্ঞানের মূল সূত্রগুলি, স্বাধীনভাবে সাম্যবাদী মতবাদ গড়ে তোলার ক্ষমতা, এবং শিক্ষিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারা।” নতুন যুগের ছেলে মেয়েদের গড়ে তোলার জন্য লেনিনের মত ছিল ‘তরুণদের শিক্ষার সঙ্গে উৎপাদনশীল শ্রমের মিলন ব্যতীত ভবিষ্যৎ সমাজের কল্পনা অসম্ভব।’

সোভিয়েত সমাজের উদ্দেশ্য ছিল নতুন মানুষ গড়ে তোলা। সোভিয়েত শিক্ষাবিদদের মতে, সততা, শ্রমশীলতা, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, মাতৃভূমি রক্ষার্থে আত্মোৎসর্গের মনোভাব- এই গুণাবলি নিয়ে কেউ জন্মায় না। তা অর্জিত হতে পারে সুশিক্ষার মাধ্যমে। বিপ্লবের আগে বহু বিজ্ঞানী প্রমাণ করতে চাইতেন, শিশুদের সবাই লেখাপড়া করতে, এমনকি প্রাথমিক স্কুলের পাঠ্যসূচি আয়ত্ত করতে সক্ষম নয়। কিন্তু ৩০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সর্বজনীন শিক্ষা চালুকরণের অভিজ্ঞতায় ‘ছেলে মেয়ে মানুষ করা প্রসঙ্গে’ বইতে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, এ ধারণা সর্ম্পূণ ভ্রান্ত। তাঁরা দেখিয়েছেন, কেবল কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রতিভাহীন লোক সাধারণত হয় না এবং সব মানুষই কোন না কোন নৈপুণ্যের অধিকারী। স্কুল এবং পরিবারের কর্তব্য হচ্ছে সেই নৈপুণ্যের আবিষ্কার ও বিকশিত করা।

মানুষ গড়া- সে হচ্ছে বহুমূখী এক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার দুটি দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ, অনুভূতি আর হৃদয় গড়ে তোলা এবং বুদ্ধির উন্মেষ ঘটানো। আর সর্বাঙ্গীন বিকশিত মানুষের অপরিহার্য গুণ হলো শ্রমশীলতা তৈরি করা। কিন্তু হিতোপদেশ দিয়েই এই শ্রমশীলতা বা মানবিক নৈতিকতা তৈরি করা যায় না। একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং ছাত্র শিক্ষক , বাবা-মা, স্কুলের পরিবেশ, রাষ্ট্রের অংশগ্রণের মাধ্যমে এ কাজটি করতে হয়। তাই বাইরে রাজনীতি, অর্থনীতির সাথে ও সময়ের সাথে সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থা একেবারে জড়ানো ছিল। শিক্ষা বলতে সেখানে শিল্প, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা, কাজ, খেলা, নৈতিক চরিত্র, আচার-আচরণ সবই বোঝাত। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন, “কমল হীরের পাথরটি হল বিদ্যে আর তার ঠিকরে পড়া জ্যোতি হলো কালচার”। শিক্ষা আর সংস্কৃতির এই অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছিল সেখানে।

আমাদের দেশে শিক্ষার সাথে জীবনের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। দেশপ্রেম বা শ্রমের মর্যাদা নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা রচনা লেখার পরও একজন ছাত্র এগুলো শুধু পরীক্ষা পাসের বস্তু মনে করে। হৃদয়কে তা কখনো প্রভাবিত করে না। পুঁজিবাদী শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কৌশলে সমাজকে অবহেলা করে নিজেকে বড় হতে শেখায়, সবাইকে নিজ নিজ ভবিষ্যৎ আর ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শেখায়। সোভিয়েত শিক্ষা কাঠামো তোতা পাখির মত মুখস্ত শেখাতো না। কী শেখানো হচ্ছে , কেন শেখানো হচ্ছে, শেখার পর সমাজে তাদের কি অবস্থা হবে এবং কী তাদের ভবিষ্যৎ এসব তারা স্পষ্ট ছিল। তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণীতে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ইতিহাস পড়ানো হত। বুর্জোয়া ইতিহাস যেখানে কিছু ঘটনার তারিখ, সম্রাট বা সম্রাজ্ঞী, যুদ্ধ বিগ্রহ ইত্যাদি মিলে একটা জগাখিচুরি তৈরি করে, তাতে সমাজ পরিবর্তনের কোনো প্রকৃত ধারণা গড়ে উঠে না। সোভিয়েত স্কুলে প্রথম ক্লাস থেকে আরম্ভ হত ইতিহাসের পাঠ যেমন- এসিরিয়, ব্যাবিলন, ভারতবর্ষ, মিশর, চীন, গ্রীস ও প্রাচীন সভ্যতা এবং শতাব্দী ধরে কীভাবে সামন্তবাদের বৃদ্ধি হয়েছে। এক একটি দেশ ধরে তাদের বিশ্লেষণ করে দেখানো হত। এভাবে পড়া শেষ পর একজন ছাত্র পৃথিবীকে স্বচ্ছভাবে বুঝতে শিখত। সাধারণ জ্ঞানের সাথে ব্যবহারিক জ্ঞানও তাকে অর্জন করতে হত। প্রত্যেক স্কুলে সিনেমা যন্ত্র, স্লাইড শো, যন্ত্রপাতির চালু করেছিল। শিক্ষকেরা ইতিহাস, ভুগোল বা বিজ্ঞানের যেকোন শাখা সম্বন্ধীয় ফিল্মের সাহায্যে তাদের পাঠকে চিত্রিত করতেন। প্রত্যেক স্কুলে ছিল প্রাণি বিভাগ। যাতে শিক্ষার্থীরা প্রত্যক্ষভাবে জীব জন্তুদের জন্ম, বৃদ্ধি, উৎপাদন ক্রিয়া প্রভৃতির সর্ম্পকে জানতে পারে।

সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রত্যেকটি ছেলেমেয়ে তার মাতৃভাষায় ও সাহিত্যের প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী হতে শেখে। স্কুলের দেয়াল পত্রিকা, বিভিন্ন শিশু পত্রিকায় তারা নিয়মিত লেখক ও পাঠক। স্কুলের পড়াশোনার বাইরে, সোভিয়েত ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যক্তিগত আগ্রহ বা রুচি মাফিক তারা অন্য কাজে যুক্ত থাকে। তবে তা সবার জন্য বাধ্যতামুলক নয়। আগ্রহী ছাত্ররা নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর গ্রুপ তৈরি করে স্কুল ছুটির পর এসব কাজে সময় দেয়। যার নাটক ও সাহিত্য সম্বন্ধে আগ্রহ তারা সাহিত্য চক্রে, যারা সঙ্গীতজ্ঞ হতে ইচ্ছুক তারা শিল্পী চক্রে যোগ দেয়। যারা বিজ্ঞানে আগ্রহী তারা পদার্থ বা রসায়ন চক্রে যোগ দেয়। ইঞ্জিনিয়ারিং বা নির্মাণ কাজের জন্য টেকনিক্যাল বিষয় শিখার জন্য ব্যবস্থা ছিল। এইসব চক্র বিশেষ উৎসবে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের পরিবেশনা করে। (চলবে)

অনুশীলন আগষ্ট ২০১৭

Advertisements

সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার শিকার মিয়ানমারের শরণার্থীরা

bangladesh-myanmar-unrest-rohingya-refugee_a0e8bf90-92d2-11e7-afc5-62fc49bb3ae4

মিয়ানমারের গণতন্ত্র পন্থী নেত্রী(!) ও ন্যাশনাল লীগ ফর ডোমেক্রাসি নেত্রী অং সান সুকি তার দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় রয়েছে। অং সান সুকি এখন মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলে কী হবে, তিনিই মিয়ানমারের অঘোষিত প্রেসিডেন্ট। তার সময়েই মিয়ানমারের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চলছে। এই নিপীড়ন নির্যাতনে বিচলিত হয়ে পড়েছে মার্কিনের নেতৃত্বে পরিচালিত পাশ্চাত্যের দেশগুলো ও তাদের গণমাধ্যম। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যতটা না উদ্বিগ্ন রোহিঙ্গাদের নিয়ে, তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন অং সান সুকিকে নিয়ে। অং সান সুকিকে তারা নেতা বানালো, অথচ তিনিই আজ বিরোধীদের শিবিরে। পুঁজিবাদী চীন অং সান সুকিকে করায়ত্ত করে নিয়েছে। অতদিন যা পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীরা করতো, এখন সেই কৌশল পুঁজিবাদী চীন আয়ত্ত করে নিয়েছে। সত্যিই কী অং সান সুকি মার্কিনের দালাল থেকে চীনের দালালে পরিণত হলো?

গত ৯ অক্টোবর এক সমন্বিত হামলায় মিয়ানমারের নয় জন বর্ডার গার্ড ও পাঁচ জন সেনাবাহিনী সদস্য নিহত হয় রাখাইন রাজ্যের বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায়। এই হামলাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের পুলিশ, বিজিপি ও সেনাবাহিনী এক সমন্বিত অভিযানে নামে। সমন্বিত অভিযান নামে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর আভিয়ান শুরু করে। কে বা কারা হামলা চালিয়েছে তা না জেনেই অভিযান শুরু করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। কারণ এই অঞ্চলে মাদকের চোরাচালানি ও মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অবস্থান রয়েছে। এই অভিযানে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের ৬৯ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে বলে সরকারি বাহিনী স্বীকার করে নিয়েছে। তবে বেসরকারিভাবে বলা হচ্ছে অভিযানে শত শত রোহিঙ্গাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলেছে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে এ পর্যন্ত নয় জন রোহিঙ্গা গ্রামবাসী পুড়িয়ে মেরেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

গ্রামের পুরুষদের ধরে নিয়ে আসছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। যে সমস্ত পুরুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের আর কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে হেলিকপ্টার নিয়ে অভিযানে নামে সেনাবাহিনী। এই অভিযানে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করে ৩০ জন রোহিঙ্গা হত্যা করা হয়। মাহিলাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। তার পর বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে আশ্রয়হীন করা হচ্ছে। গৃহপালিত গবাধি পশুকে লুট করে নিয়ে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার পরিবারকে বাড়ি ঘর ছাড়া বাস্তচ্যুত করা হয়েছে। অনেকে বনে জঙ্গলে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। অনেকে নাফ নদীর তীরবর্তি প্যারাবন ও জঙ্গলে পালিয়ে, অর্ধাহারে অনাহারে থেকে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। রাখাইন বেসামরিক লোকেরা ধারলো অস্ত্র দিয়ে পালায়নরত লোকেদের ওপর হামলা চালিয়ে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এই অভিযানের সময়ে আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীদের ও গণমাধ্যম সাংবাদিকদের রাখাইন রাজ্যে ঢুকতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে হামলা চালিয়ে হত্যা, ধর্ষণ, বাড়ি ঘর লুটের পর আগুন জ্বালিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মিয়ানমারের পত্র পত্রিকার সূত্রে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক হামলায় বাংলাদেশ জড়িত রয়েছে। উল্লেখ্য সীমান্ত অতিক্রম করে তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। টেকনাফ সীমান্তের হোয়াইক্যং, উলুবনিয়া, বালুখালি, লম্বাবিল, কাঞ্জরপাড়া, খারাংখালী, ঝিমংখালী, উনচিপ্রাং, জাদিমুড়া, নয়াপাড়া, নাথমুড়াপাড়া, গুদামপাড়া, ফুলের ডেইল, হোয়াব্রাং, নাইখ্যংখালী, আনোয়ার প্রজেক্ট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। অনুপ্রবেশের পর রোহিঙ্গারা বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, অনিবন্ধিত লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প, নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্প, সীমান্ত এলাকায় মানুষের বাড়ি ঘরে ও ঝোপঝাড়-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে নদীপথে সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য সীমান্তের নাফ নদীর মিয়ানমারের অংশে অবস্থান করছে। রাতের বেলায় তারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। মিয়ানমারের স্থল ও জল সীমান্তে টহলের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশ মোতায়েত করেও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ধরে পুশ ব্যাক করা হচ্ছে ও অনুপ্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে। তবুও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ হচ্ছে না।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক ইতিপূর্বে বাতিল করা হয়েছে। গত ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন্ট থান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর ফলে নারী, শিশু, বয়স্কসহ সেখানকার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। এসব লোক যাতে ভয়-ভীতি ছাড়া আবাসভূমিতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে রাখাইন রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে মিয়ানমারকে ব্যবস্থা নিতে বলেছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান চালিয়ে যাওয়ায় সেখানকার পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। রাখাইন রাজ্য থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের জন্য এ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মিয়ানমারের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় ও কনসুলার) কামরুল আহসান মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের হাতে একটি কূটনৈতিক পত্র তুলে দেন। রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করার ব্যাপারে মিয়ানমারের গণমাধ্যমের প্রবণতার সমালোচনা করা হয়। রাখাইন রাজ্যে বঞ্চনা ও সেনাবাহিনীর চলমান অভিযানের সময়ে মাত্রাতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ।

গত ১৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। চীন ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং অস্থায়ী সদস্যের মধ্যে জাপান, মিশর, নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভেনেজুয়েলা ও সেনেগালের প্রতিনিধিরা অংশ নেয়। বৈঠকে সবাই অভিযোগ করেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। তাদের অভিযানে নির্মমভাবে লোকজনকে হত্যার পাশাপাশি নারী ও শিশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা বন্ধের সমালোচনা করে অবিলম্বে তা চালুর জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার রাখাইন রাজ্যে লোকজনের নিরাপত্তা ও মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে প্রাণের ভয়ে ঐ অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা লোকজনের সহায়তায় বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার অনুরোধ জানান হয়েছে।
মিয়ানমারের সমস্যাটি আজ থেকে শুরু হয়নি। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারে নাগরিকত্ব আইন জারি হয়। এই আইনে বলা হয়েছে ১৮৫৩ সালের আগে তার পূর্ব পুরুষ মিয়ানমারের নাগরিক ছিল তা প্রমাণ করতে পারলে তাদেরকে সে দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এই আইনের আওতায় মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ফলে রোহিঙ্গারা হয়ে পড়ে মিয়ানমারের নাগরিক অধিকার বিহীন। ফলে এত দিনের বসতবাড়ি, বিষয় সম্পত্তি সহ যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির অধিকারহারা হয়ে তারা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। তারা বিবাহ করার অধিকার, শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের, চলাফেরার অধিকারও হারায়। যারা এ যাবৎকাল মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবে বসবাস করতো তারা সম্পত্তির অধিকার হারিয়ে হয়ে পড়ে বিষয় সম্পতিহীন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানির পথকে বেছে নেয়। এরই সুযোগ গ্রহণ করে মিয়ানমারে তৎপর এনজিওগুলো। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দাতা সংস্থার এনজিওগুলো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনতার মাঝে উগ্রবাদী তৎপরতাসহ নানা নেতিবাচক প্রবণতার বিস্তার ঘটাতে থাকে। সরকারের ভূমিকা ও এনজিওগুলোর কর্মকান্ডের ভিতর দিয়ে সংখালঘু মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এলিট শ্রেণি রাষ্ট্র বিরোধী, সরকার বিরোধী ভূমিকা অবতীর্ণ হয়ে পড়ে।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনতার বড় ধরনের বিরোধের প্রকাশ ঘটে ১৯৯১ সালে। এ সময়ে রাখাইনদের সাথে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জাতিগত দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এই দাঙ্গায় মদত দানের ভূমিকা পালন করে পশ্চিমা সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলো। দাঙ্গা থেকে বাঁচতে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায় বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী কক্সবাজারে তৎকালীন বিডিআর এর চেক পোস্ট দখল করে নেয়। এই সময়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পশ্চিমাদের ও তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত এনজিওদের বাংলাদেশে যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। কিন্তু তৎকালীন সরকারের সাথে চীনের গভীর সম্পর্ক ও উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় চীন ভূমিকা নিতে রাজি হওযায় এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়।

মিয়ানমারের সাথে চীনের গভীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক তথা সামগ্রিক সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। মিয়ানমারের সরকার মূলত চীনা সমর্থনপুষ্ট সরকার। চীন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিত্তুতে সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। সিত্তুর সাথে চীনের মূল ভূখন্ডের সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। এই পথে চীনের সাথে রেল যোগাযোগ স্থাপনের কাজও চলমান রয়েছে। তাছাড়া এই পথে সম্প্রতি চীনের তেলের পাইপ লাইন নির্মাণের কাজও চলছে। চীন চাইছে যে কোন জরুরি অবস্থায় বা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সাথে তার সমুদ্র পথে বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে। সেই হিসাবেই মিয়ানমারের সিত্তু বন্দরকে গড়ে তুলছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বাধীন জোট চাইছে এ কাজে বাধা সৃষ্টি করতে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে তৎপরতা চালাচ্ছে। তাই তো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাথে রাখাইন জনগোষ্ঠীর এই বিরোধ। এই বিরোধে রাখাইন সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারের সরকার।

অং সান সুকি তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রাসিকে (এনএলডি) এ যাবত মদত দিয়ে এসেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার সমর্থনপুষ্ট পাশ্চাতের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো। সেই সাথে পাশ্চাত্যের সমর্থনপুষ্ট এনজিওগুলোও একই ভূমিকা নিয়ে আসছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্ররা আশা করেছিল অং সান সুকি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল তাদের পক্ষে ভূমিকা গ্রহণ করবেন। কিন্তু তা না হয়ে প্রতিপক্ষ শক্তির সাথে মিলে চলায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শেষ আশাও ব্যর্থ হতে চলেছে। এখানে উল্লেখ্য ক্ষমতায় যেতে অং সান সুকি চীনের সাথে আপোস সমঝোতা করেই রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন বলে প্রতিভাত হচ্ছে। তাই তো পাশ্চাত্যের সমর্থনপুষ্ট দালালরা আওয়াজ তুলেছে অং সান সুকির নোবেল প্রাইজ ফিরিয়ে নিতে। তাই তো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উগ্রপন্থীদের মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে এই হতাহতের ঘটনা ঘটানো।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায় আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে আজ চরম নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়ে অমানবিক জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। এর এক দিকে রয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, যারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির হাতিয়ার হিসাবে কাজে লাগিয়ে সে দেশের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলের পরিস্থিতিকে অশান্ত করে তুলেছে। আর অন্য দিকে রয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন সম্প্রদায়, যাদের মদত দিয়ে চলেছে মিয়ানমার সরকার। আর মিয়ানমার সরকারের সাথে জড়িত রয়েছে চীনের ভূমিকা। চীন মিয়ানমারের রাখাইন অধ্যুষিত অঞ্চলে সংঘাত বৃদ্ধি পেয়ে তার জন্য কোন সমস্যা তৈরি হোক, বা তার পরিকল্পিত মেরিটাইম সিল্ক রোডে সমস্যা তৈরি হোক তা সে চায় না। তাই সে মিয়ানমারের সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। মিয়ানমারের রাখাইন ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্বের পেছনে ক্রিয়াশীল রয়েছে বাজার ও প্রভাব বলয় বিস্তারের আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব। আর এই আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সে দেশের সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকারে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৬।।সংখ্যা-০৫, রোববার।। ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬।।


৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর চীনে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ব্রিকস (BRICS) এর নবম শীর্ষ সম্মেলন

Brics-960-131016

আগামীকাল ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর চীনের ফুজিয়ানা প্রদেশের জিয়ামেনে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ব্রিকস (BRICS) এর নবম শীর্ষ সম্মেলন। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে ৪টি দেশ রাশিয়া, চীন, ভারত ও ব্রাজিলকে নিয়ে রাশিয়ার ইফতারিনবার্গে ব্রিকের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালের এপ্রিলে ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় ব্রিকের ২য় শীর্ষ সম্মেলন; এই সংস্থায় দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর ২০১১ সালে এপ্রিলে চীনের সানায়াতে ব্রিকসের তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলন; ২০১২ সালের মার্চ মাসে ভারতের নয়াদিল্লীতে ব্রিকসের ৪র্থ শীর্ষ সম্মেলন; ২০১৩ সালের মার্চে আফ্রিকার ডারবানে ৫ম শীর্ষ সম্মেলন; ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ব্রাজিলের ফর্টিলেজায় ৬ষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলন; ২০১৫ সালে রাশিয়ার উফায় জুলাই মাসে ৭ম শীর্ষ সম্মেলন ও গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ২০১৬ ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত অষ্টম শীর্ষ সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় এবারের ৯ম শীর্ষ সম্মেলন চীনে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এই সংস্থা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, বিশ্ব জিডিপি’র প্রায় ২৫% এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১৭%-এর জন্য দায়ি।

গত বছরের গোয়া সম্মেলনে ব্রিকস-এর নতুন উন্নয়ন ব্যাংক (NDB) এবং কন্টিজেন্ট মজুদ ব্যবস্থার (CRA- Contingent reserve arrangement) কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে অবদান রাখছে বলে বলা হয়। এনডিবি’র প্রেসিডেন্ট ১ম বছরের কার্যক্রমের উপর রিপোর্ট প্রদান করেন। এনডিবি’র আফ্রিকান আঞ্চলিক কেন্দ্রের কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এই ব্যাংক প্রদত্ত ১ম দফার ঋণ প্রদান বিশেষ করে ব্রিকস দেশগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানী প্রকল্পে ঋণ অনুমোদন করা হয়। এ প্রেক্ষিতে আড়াই বিলিয়ন (২৫০ কোটি) ডলার ঋণ প্রদান করার কথা বলা হয়।

এই ব্যাংক প্রদত্ত ১ম দফার ঋণ প্রদান বিশেষ করে ব্রিকস দেশগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানী প্রকল্পে ঋণ অনুমোদন করা হয়। গত ব্রিকস-এর শীর্ষ সম্মেলনের সময় উন্নয়নশীল ৬টি দেশ নিয়ে গঠিত বিমসটেকের (BIMSTEC- Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Co-operation) সাথে আউটরিচ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ২০১৫ সালে উফায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনকালে ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন ও এসসিও’র সাথে যৌথ বৈঠক করা হয়। বিমসটেকের সদস্য দেশ হচ্ছে- বাংলাদেশ, মায়ানমার, ভারত, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ড। যৌথ বিবৃতিতে জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ভিত্তিতে বিশ্বের আরো ন্যায্য, গণতান্ত্রিক এবং বহুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকে বিশ্বের গভীর পরিবর্তনের কথা বলা হয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক উপায়ে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কথা বলা হয়। একপাক্ষিক সামরিক হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের নিন্দা করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের সামগ্রিক সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়। এ প্রেক্ষিতে চীন ও রাশিয়া ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতিসংঘে বৃহত্তর ভূমিকা পালনের আকাঙ্খাকে সমর্থন জানানো হয়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখন্ডতা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ি সংকট সমাধানের কথা বলা হয়। এ প্রেক্ষিতে সিরিয়া সংকটের ক্ষেত্রে জেনেভা ঘোষণা ও নিরাপত্তা পরিষদের গৃহিত প্রস্তাব অনুযায়ি সিরিয়া পরিচালিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক জাতীয় সংলাপের মধ্যদিয়ে সমাধানের কথা বলা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক চিহ্নিত আইএসআইএল, জাভাত আল নুসরা ও অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে অব্যাহত সংগ্রামের আহ্বান জানানো হয়। প্যালেস্টাইন-ইসরাইল সংঘাতের প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা পরিষদে গৃহিত দুই রাষ্ট্র সমাধানের আহ্বান জানানো হয়। ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ি এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। আফগান দ্বারা চালিত ও আফগানদের জাতীয় সমঝোতা প্রতিষ্ঠা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানানো হয়। আফগান সমস্যা সমাধানে এসসিও, সিস্টো, হার্ট অফ এশিয়া সম্মেলনের ভূমিকা পালনের কথা বলা হয়। এসডিজি-২০৩০ এজেন্ডার সম্পূরক হিসেবে আফ্রিকার ২০৬৩ এজেন্ডাকে সমর্থন করা হয়। আফ্রিকান তহবিল এবং আফ্রিকান সেনাবাহিনীর পূর্ণ তৎপরতা সমর্থন করা হয়। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের এসডিজি এজেন্ডাকে সমর্থন করা হয়। চীনের হাংচাও জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের কর্মপরিকল্পনা সমর্থন করা হয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ, শরণার্থী প্রবাহ, যুক্তরাজ্যের গণভোটের ফলাফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মোকাবেলায় আর্থিক, মুদ্রার, কাঠামোগতসহ সকল পলিসি হাতিয়ার কাজে লাগানোর কথা বলা হয়। ঋণ-জিডিপি অনুপাত, অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ, আইএমএফ-এর সংস্কার, এসডিআর-এ রেন মিনবি’র অন্তর্ভূক্তি ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। ব্রিকস-এর ২০২০ রোডম্যাপ সামনে আনা হয়। ব্রিকস রেটিং এজেন্সি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা করা হয়। ভারতসহ ব্রিকসভুক্ত কয়েকটি দেশে সে সময়ে সন্ত্রাসী আক্রমণের নিন্দা করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ভারত উরি ঘটনায় পাকিস্তানকে দায়ি করে তাদের নাম উল্লেখ করার চেষ্টা করে।

পুঁজি ও শক্তির অনুপাত পরিবর্তিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপি আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী শক্তি সম্পর্কে যে পুনর্বিন্যাস ও পুনর্মেরুকরণ প্রক্রিয়া চলছে সে ক্ষেত্রে ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব সামনে আসছে। সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া, বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে অগ্রসরমান পুঁজিবাদী চীন, দক্ষিণ এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ যথাক্রমে নয়াউপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী ভারত ও ব্রাজিল এবং আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতি নয়াউপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে এই সংস্থাটি গঠিত। এর মধ্যে কয়েকটি দেশে মার্কিন প্রাধান্য ও পাশ্চাত্যের প্রভাব থাকলেও এর কার্যক্রমে কার্যতঃ নেতৃত্ব দিচ্ছে রাশিয়া ও চীন। ভারতে মার্কিন প্রাধান্য এবং ভারতকে চীনের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে গড়ে তোলার মার্কিন প্রচেষ্টা থাকলেও ২০১৫ সালে উফায় অনুষ্ঠিত ১৫তম শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়া ও চীন ভারতকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার পূর্ণ সভ্যপদ প্রদান করা; ভারতের বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে রাশিয়ার ভূমিকা; ব্রিকস, রিক ইত্যাদি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে পক্ষে টানতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আবার ব্রাজিলে দিলমা রৌসেফকে ক্ষমতাচ্যুত করে মার্কিনপন্থী মাইকেল তেমার ক্ষমতায় আসলে ব্রিকস আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে অকার্যকর হওয়ার সম্ভাবনার কথা আলোচিত হয়। এতদ্বসত্ত্বেও বহুকেন্দ্রীক বিশ্ব ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থানকারী ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তেমার যোগদান করে। এই সংস্থা যে বহুকেন্দ্রীক (Multi-polar) বিশ্বের কথা বলছে তা কার্যতঃ একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এককেন্দ্রীক (Unipolar) বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতি আঘাত স্বরূপ। ডলারের পরিবর্তে নিজস্ব মুদ্রার মাধ্যমে বাণিজ্য করার এই সংস্থার পদক্ষেপ কার্যতঃ ডলারের প্রভাব হ্রাস করছে। আবার বিশ্বের ২য় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীনা মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে সম্প্রতি আইএমএফ-এর এসডিআর ঝুড়িতে চনিা মুদ্রা রেন মিনবি’র আন্তর্ভূক্তি তাৎপর্যপূর্ণ।

গত বছর ব্রিকসের ৮ম শীর্ষ সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে ‘নতুন উন্নয়ন ব্যাংক’ এবং কন্টিজেন্ট মজুদ ব্যবস্থা (CRA) কার্যকরী করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ প্রদানের পদক্ষেপ শুরু হওয়া। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে এনডিবি চীন, ভারত, ব্রাজিল ও আফ্রিকাকে ৮১১ মিলিয়ন (৮১ কোটি ১০ লক্ষ) ডলার ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২১ ডিসেম্বর ২০১৫ ব্রিকস্-এর নতুন উন্নয়ন ব্যাংক (NDB) সাংহাই সৌর শক্তি প্রকল্পে ৮১ মিলিয়ন (৮ কোটি ১০ লক্ষ) ডলারের ঋণ প্রদান করে তার ঋণ প্রদানের কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৭ সালে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য ২৫০ কোটি ডলারের ঋণ প্রদানের পরিকল্পনা করে। সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীন তাদের স্বার্থকে অগ্রসর করতে ব্রিকসের এই নতুন উন্নয়ন ব্যাংককে কাজে লাগাচ্ছে। এই উন্নয়ন ব্যাংককে আন্তর্জাতিক বহুজাতিক ঋণদানকারী বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি’র ‘সম্ভাব্য পাল্টা ভারসাম্য’ (A Potential Counter Weight) হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। আবার নতুন উন্নয়ন ব্যাংক চীনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘এশিয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (AIIB)’-এর সাথে সহযোগিতা করার ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ। তাছাড়া ভারতের গোয়ায় ব্রিকসের সাথে বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিকস শুধু অর্থনৈতিক বিষয়ে নয় বরং কিছু রাজনৈতিক প্রশ্নেও তার অবস্থান গ্রহণ করছে। মার্কিনের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা মোকাবেলায় পাল্টা পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীন যে বিভিন্ন রূপের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে তার অংশ হিসেবে ব্রিকসের ৯ম শীর্ষ সম্মেলন গুরুত্ব বহন করবে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি’র কাছে ব্রিকস হলো পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধকে একত্রিত করার ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’র (ওবিওআর) অংশবিশেষ। শি ইতোমধ্যেই আরো কয়েকটি দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ব্রিকস প্লাস (BRICS+) গঠন করার জন্য। ব্রিকস প্লাসে (BRICS+) চিলি, গিনি, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান, ইথিওপিয়া, তানজানিয়া ও মিসর যোগ দিতে পারে। (দি সাউথ এশিয়া মর্নিং ডটকম, আগস্ট ২৯, ২০১৭)

সূত্রঃ  সাপ্তাহিক সেবা


রুশ বিপ্লব ও নজরুল

শিল্পীর চোখে ‘রুশ বিপ্লবের সংবাদ প্রকাশ করছেন নজরুল’। ছবিটি চুরুলিয়ায় নজরুল জাদুঘরে সংরক্ষিত

১৯১৭ সাল। নভেম্বর মাস। রাশিয়ায় বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে রাজতন্ত্রের। প্রতিষ্ঠিত হয় কৃষক-শ্রমিকের রাষ্ট্র। জনগণের হাতে আসে ক্ষমতা। সেই হিসাবে এ বছরের অক্টোবর মাসে পূর্ণ হচ্ছে রুশ বিপ্লবের শতবর্ষ। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই বিপ্লবের সফলতা সে সময় বিশ্বের সব স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর অভাবনীয় প্রভাব বিস্তার করেছিল। এমনকি আলোচ্য বিপ্লব তৎকালীন পরাধীন ভারতবাসীর কাছেও দেখা দিয়েছিল আশার আলো হিসেবে। রুশ বিপ্লব প্রভাবিত করেছিল কাজী নজরুল ইসলামকেও। কবির পরবর্তী জীবন-পরিক্রমা ও সাহিত্যকর্মের দিকে নজর দিলে বিষয়টি বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
তবে প্রশ্ন হলো, ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় যখন উড়ল সমাজতন্ত্রের লাল পতাকা, নজরুল সেটিকে কীভাবে গ্রহণ করেছিলেন? বইপত্র ও নজরুলের ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিকথা মিলিয়ে দেখলে প্রশ্নটির একটা সুরাহা মিলতে পারে।
১৯১৭ সালের শেষার্ধে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে করাচি চলে যান কাজী নজরুল ইসলাম। সে সময় তিনি ছিলেন আঠারো-উনিশ বছরের এক টগবগে তরুণ। কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠার আগ অব্দি, অর্থাৎ ১৯২০-২১ সাল পর্যন্ত নজরুলের জীবনের অনেক বিষয় সম্পর্কেই বস্তুনিষ্ঠ তথা খুব নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না—একেকজন একেক রকম বলেন। ফলে বিভ্রান্তির অবকাশ থেকেই যায়। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে এটা জানা যায় যে সৈনিকজীবনে পল্টনে অবস্থানকালেই রুশ বিপ্লবের সংবাদ পেয়েছিলেন তিনি।
বস্তুত, বিপ্লবের সংবাদে আপ্লুতই হয়ে উঠেছিলেন সেদিনের তরুণ নজরুল। তিনি কতটা আপ্লুত হয়েছিলেন, সেটি কবির পল্টনজীবনের সহযোদ্ধা জমাদার শম্ভু রায়ের বর্ণনায় উজ্জ্বল হয়ে আছে, ‘এদিন সন্ধ্যায় ১৯১৭ সালের শেষের দিকেই হবে, এখন ঠিক স্মরণে আনতে পারছি না, হয়তো সেটা শীতের শেষের দিকে। নজরুল তাঁর বন্ধুদের মধ্যে যাঁদের বিশ্বাস করতেন, তাঁদের এক সন্ধ্যায় খাবার নিমন্ত্রণ করে।…ঐ দিন যখন সন্ধ্যার পর তাঁর ঘরে আমি ও নজরুলের অন্যতম বন্ধু তাঁর অর্গান মাস্টার হাবিলদার নিত্যানন্দ দে প্রবেশ করলাম, তখন দেখলাম, অন্যান্য দিনের চেয়ে নজরুলের চোখে-মুখে একটা অন্যরকম জ্যোতি খেলে বেড়াচ্ছিল…তিনি [নিত্যানন্দ] অর্গানে একটা মার্চিং গৎ বাজানোর পর নজরুল সেই দিন যে গান গাইলেন ও প্রবন্ধ পড়লেন, তা থেকেই আমরা জানতে পারলাম যে রাশিয়ার জনগণ জারের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে। গানবাজনা-প্রবন্ধ পাঠের পর রুশ বিপ্লব সম্বন্ধে আলোচনা হয় এবং লালফৌজের দেশপ্রেম নিয়ে নজরুল খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন।’
রুশ বিপ্লবের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শক্তির বহুমুখী আক্রমণ প্রতিহতের জন্য জনগণ ও কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে রাশিয়া গঠন করেছিল একটি সৈন্যদল, যাকে বলা হতো ‘লালফৌজ’। বিভিন্ন দেশের মুক্তিকামী মেহনতি মানুষ এবং বুদ্ধিজীবীরাও যোগ দিয়েছিলেন এই লালফৌজে। ভারতের প্রগতিবাদী রাজনীতিবীদ এম এন রায়ের লেখা ও রাশিয়ায় সংরক্ষিত নথিপত্র থেকে জানা যায়, এ সময় ভারত থেকেও অনেকে যোগ দিয়েছিলেন ওই লালফৌজে। কেবল তা-ই নয়, রাশিয়ায় বিপ্লব দমনের জন্য নিয়োগকৃত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় সেনাদল থেকে পালিয়েও অনেক ভারতীয় সৈনিক তখন যোগ দিয়েছিলেন এই বাহিনীতে। নজরুল এসব তথ্য জানতেন। তাঁর পল্টন থেকেও কয়েকজন সৈন্য পালিয়ে লালফৌজে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে পলাতকদের অনেকেই তাঁদের অভীষ্ঠ লালফৌজ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি, পেশোয়ারের বিভিন্ন জায়গায় ধরা পরেছিলেন তাঁরা। এ রকম এক সৈনিককে পল্টনে ফেরত নেওয়ার জন্য একবার পেশোয়ারে গিয়েছিলেন নজরুল। এ নিয়ে সৈনিক-পরবর্তী জীবনে কবির অন্যতম সুহৃদ ও ভারতের কমিউনিস্ট নেতা মুজাফ্ফর আহ্মদ লিখেছেন, ‘নজরুলের মুখে শুনেছি যে কোনো পলাতক সৈনিককে ধরার জন্যে তাকে (হয়তো সঙ্গে অন্য সৈনিকও ছিল) একবার বেলুচিস্তানের গুলিস্তান, বুস্তান ও চমন প্রভৃতি ইলাকায় যেতে হয়েছিল।’
সেনাবাহিনীর কড়া বাধানিষেধ তথা সেন্সরশিপের ভেতরেও পল্টনে থাকাকালে নজরুল কীভাবে রুশ বিপ্লব ও লালফৌজের সংবাদ সংগ্রহ করতেন, তা বিস্ময়কর। শম্ভু রায়ও এ বিষয়ে কোনো আলোকপাত করতে পারেননি। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘আমাদের ব্যারাকের কর্তৃপক্ষের শ্যেন দৃষ্টি ছিল, যাতে আমরা বাইরে থেকে কোন রকম রাজনৈতিক খবর না পাই। সে জন্য পত্রপত্রিকা যা আসত তা পরীক্ষা করে আমাদের দেওয়া হত। তা সত্ত্বেও “বজ্রআটুনী ফসকা গেরো”র মত হওয়ার দরুন ওসব খবরাখবর কী করে জোগাড় করত সেই [নজরুল] জানে।’
রাশিয়ার বিপ্লব ও লালফৌজের লড়াই নজরুলকে এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পল্টনের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে এই সংবাদগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন তিনি। শম্ভু রায় আরও লিখেছেন, ‘নজরুলের আড্ডা থেকেই বাছাই করা কয়েকজনকে সে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সংবাদ দিত, যেমন আইরিশ বিদ্রোহ ও রুশদের কথা। আমরা কয়েক বন্ধু এসব বিষয় যেমন সাবধানতার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতাম নজরুল তার ভাবকে তেমন করে চেপে রাখতে পারত না। অবশ্য তার একটা পথ ছিল, গান ও কবিতার সাহায্য, সে গান গেয়ে ও কবিতা পড়ে তার ভাবকে ব্যক্ত করত। সৈন্যদের মধ্যে এসব নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামাত না।’
জীবনের প্রথমার্ধ থেকই নজরুল ছিলেন স্বাধীনচেতা। রুশ বিপ্লবের আগে থেকেই তাঁর বিশ্বাস ছিল বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত হবে দেশের স্বাধীনতা। কবির স্কুলজীবনের বন্ধু সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, ‘নজরুল যুদ্ধবিদ্যা শিখে এসে ভারতবর্ষে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী গঠন করবে, তারপর দেশ থেকে ইংরেজ তাড়াবে-তার এই গোপন মতলবের কথা আমাকে সে বলেছিল একদিন।’
শিয়ারশোল স্কুলে নজরুলের শিক্ষক ছিলেন নিবারণচন্দ্র ঘটক। বিপ্লবী দল ‘যুগান্তর’-এর সদস্য ছিলেন তিনি; এবং দলের হয়ে বিপ্লবের জন্য কর্মী সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে কর্মীদের দীক্ষাও দিতেন। এই নিবারণ ঘটকের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন নজরুল। কিন্তু ১৯১৭ সালের জানুয়ারি মাসে বিপ্লবী দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন নিবারণ, বিচারে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয় তাঁর। নিবারণ ঘটক আটক হওয়ার পর দলের অন্য কর্মীদের সনাক্ত করার জন্য গোপনে তদন্ত চালায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। তখন নিবারণের ঘনিষ্ঠ ছাত্র হিসেবে নজরুল ছিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষের সন্দেহের তালিকায়। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু প্রাথমিকভাবে তাঁকে সন্দেহ করা হয় এবং তাঁর ছাত্রবৃত্তি কয়েক মাসের জন্য স্থগিত রাখা হয়। যুগান্তর কর্মী ও নজরুলের জীবনীকার প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের ভাষ্যে, ‘আমি দুজনেরই [নিবারণ ও নজরুল] কাছের মানুষ হিসাবে এটা বুঝেছিলাম যে নজরুল যুগান্তর দলের কর্মী ছিলেন কিন্তু কাজ করবার মুখেই নিবারণ ঘটক হয়ে গেলেন গিরিফতার।’ পরে নজরুল নিজেও মুজফ্ফর আহমদের কাছে স্বীকার করেছিলেন, নিবারণ ঘটকের মতবাদে একসময় দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি।

এক্ষণে নিশ্চয় এটুকু অনুমান করা দুঃসাধ্য হবে না যে সেই ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে সেই সময় করাচিতে সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে বিপ্লবীদের একটা দল তৎপর ছিল, যাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নজরুলের; এবং সেনাবাহিনীর এই বিপ্লবী গোষ্ঠীর মাধ্যমেই নিয়মিতভাবে বিপ্লবের সংবাদ সংগ্রহ করতেন নজরুল। অধিকন্তু তৎকালের অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও সেনা সেন্সরশিপের কারণে বাংলাদেশ থেকে সংবাদ ও বইপত্র সরাসরি নজরুল পর্যন্ত পৌঁছা ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। বাঙালি পল্টনের সৈনিক ও স্বদেশি আন্দোলনের বিভিন্ন বিপ্লবীর লেখা থেকে জানা যায়, প্রথম মহাযুদ্ধকালে বাঙালি পল্টনসহ বেশ কিছু ভারতীয় সেনা ইউনিটে পরিকল্পিতভাবে অনুপ্রেবেশ ঘটেছিল বিপ্লবীদের। হতে পারে নজরুল নিজেও এ ধরনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও লেখাপড়ায় ইস্তফা দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন পল্টনে। তবে এটি কেবলই অনুমানমাত্র, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা কষ্টসাধ্যই বটে।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালেও রুশ বিপ্লবের প্রভাব লক্ষ করা যায় বেশ ভালোভাবে। এখানে স্বল্প পরিসরে তাঁর একেবারে প্রথম দিকের দুটি রচনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এর মধ্যে প্রথমটি গল্প, দ্বিতীয়টি কবিতা—‘ব্যথার দান’ কবির প্রথম দিকে লেখা গল্প। রুশ বিপ্লবের মাত্র দুই বছর পর ১৯১৯ সালে পল্টনে বসে তিনি লেখেন গল্পটি। এর প্রধান দুই চরিত্র—দারা ও সয়ফুল মুলক—এদের ভারত থেকে লালফৌজে যোগ দেওয়া সৈনিক হিসেবে দেখিয়েছিলেন তিনি। যেমন, গল্পে সয়ফুল মুলকের গলায় শোনা যায়, ‘ঘুরতে ঘুরতে শেষে এই লালফৌজে যোগ দিলুম। এ পরদেশীকে তাদের দলে আসতে দেখে তারা খুব উৎফুল্ল হয়েছে। মনে করছে, এদের এই মহান নিঃস্বার্থ ইচ্ছা বিশ্বের অন্তরে অন্তরে শক্তি সঞ্চয় করছে। আমায় আদর ক’রে এদের দলে নিয়ে এরা বুঝিয়ে দিলে যে কত মহাপ্রাণতা আর পবিত্র নিঃস্বার্থপরতা প্রণোদিত হয়ে তারা উৎপীড়িত বিশ্ববাসীর পক্ষ নিয়ে অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, এবং আমিও সেই মহান ব্যক্তি সঙ্ঘের একজন।’ উল্লেখ্য, ‘ব্যথার দান’ গল্পে ‘লালফৌজ’ শব্দটি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় প্রকাশকালে তা পাল্টে দেওয়া হয়েছিল।
১৯২০ সালে পল্টন থেকে ফিরে এলেন নজরুল। ১৯২২ সালে রুশ বিপ্লবকে ভারতে আহ্বান করে লিখলেন বিখ্যাত ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা। আর এই কবিতায় রুশ বিপ্লবকে তুলনা করা হলো ‘প্রলয়’ শব্দের সঙ্গে। এই কবিতার ‘আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল, /সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল।’—এই দুই পঙ্তিতে উন্মোচিত হয়েছে রুশ িবপ্লবের স্বরূপ।
আজীবন রুশ বিপ্লবের আদর্শকে নিজের সৃষ্টি ও কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত করেছেন নজরুল ইসলাম। তাঁর বিভিন্ন রচনা, পত্রিকা সম্পাদনা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রুশ বিপ্লবের প্রভাব লক্ষ করা গেছে বিচিত্র মাত্রায়। সবশেষে দুটি তথ্য দিয়ে এ লেখার ইতি টানব: ভারতে রুশ বিপ্লবের প্রকাশ্য ধারক ও বাহক কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন নজরুল। অন্যদিকে রাশিয়ার জনগণও বাংলাদেশের এই কবিকে ‘বিপ্লবী-প্রলেতারীয়-রোমান্টিক’ কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

সূত্রঃ http://www.prothom-alo.com/art-and-literature/article/1301111/%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B6-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%AC-%E0%A6%93-%E0%A6%A8%E0%A6%9C%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B2


২২ জুলাই ডহুরী কৃষক অভ্যূথানের শিক্ষা

download

২২ জুলাই ডহুরী দিবস। ডহুরীতে এই দিন আত্ম বলিদান করেছিলেন গোবিন্দ দত্ত। পুলিশের গুলিতে তার নির্মম মৃত্যু হয়েছিল। ১৯৮৮ সালের ২২ জুলাই এর এই বীরত্বপূর্ণ কৃষক আন্দোলনকে প্রজন্মে প্রজন্মে অনুপ্রাণিত করতে কৃষক সংগ্রাম সমিতি কেন্দ্রিয় উদ্যোগে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে আসছে। এই ধারাবাহিক পালনের ফলে সংগ্রামী মর্যাদায় দিবসটি জনমনে স্থায়ী হয়েছে। ডহুরী দিবসের এই সংগ্রাম ও শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দুই বছর পরেই ১৯৯০ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক বিল ডাকাতিয়ায় জোয়ার-ভাটার আন্দোলনে কৃষক সংগ্রাম সমিতির নেতৃত্বে বীর কৃষক-জনতা প্রশাসনের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে দাবী আদায়ে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

যশোর জেলার কেশবপুর থানার পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত ডহুরী বিল খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার গাঁ ঘেঁষা এবং এই দুই জেলার মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে শ্রী নদী।ওয়াপদা বাধের ফলে এই বিলের অভ্যন্তরে ভূমি নিচু রয়ে গেছে এবং নদীর বুক উঁচু হয়ে ভরাট হয়েছে। ফলে দক্ষিণ অঞ্চলের মত ডহুরীও বর্ষাকালে জলাবদ্ধ হয়ে থাকে। কিন্তু কৃষক সাধারণ শুকনা মৌসুমে একটা ফসল করতে পারত। সেখানে বাধ সাধলো অত্যাচারী ঘের মালিকেরা তাদের মধ্য অন্যতম ডুমুরিয়া এলাকার আতিয়ার খাঁ ডহুরীর বিলে নোনা পানি তুলে সাধারণ কৃষকের জমি এক প্রকার জোরপূর্বক ঘের ব্যবসা করে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। ঘেরের মধ্যে থৈ থৈ পানি-ধান নেই, মাছ আছে, কিন্তু তাতে কৃষকের অধিকার নেই। এক পর্যায়ে অত্যাচারিত কৃষকের আন্দোলন দানা বাঁধে। এমনি এমনি কোন কিছু দানা বাঁধে না, তার জন্য অনুঘটক লাগে। কৃষক সংগ্রাম সমিতি কৃষক জনগণের প্রাণের সংগঠন তারাই এই আন্দোলনের প্রথম থেকে নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করে। সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন কৃষক নেতা সাইফুল্লাহ লস্কর ও কালীপদ দাস। প্রশাসনের কাছে বহু দেন-দরবার করে কোনভাবেই কৃষকের সমস্যার কোন সমাধান তো হলোই না। উল্টো প্রশাসনের সহায়তায় ঘের মালিক আতিয়ার খাঁ বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

২২ জুলাই ১৯৮৮ কৃষক-জনতা সমবেত হতে থাকে নারায়নপুর মাঠে। পাশ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা আসে বিশাল এই সংগ্রাম স্থালে। খুলনা ডুমুরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা যোগ দেয় ঐতিহাসিক এই মহেন্দ্রক্ষণে। ডাংকা ওয়ালারা আসে যুদ্ধের বাজনা নিয়ে। ওয়াপদার ওপর দিয়ে মিছিল এগিয়ে চলে আতিয়ার খাঁর ভেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে দেবার জন্য। যেখানে আতিয়ার খাঁ মোতায়েন রেখেছে এক দল মাস্তান বাহিনী এবং তাদের সাথে ছয় জন অস্ত্রধারী পুলিশের বন্দুক তাক করা একটি স্কোয়াড। এই পুলিশের দল ডুমুরিয়া থানা থেকে রাজঁনৈতিক চাপে এবং আতিয়ার খাঁর উৎকোচে অন্যায় অবৈধভাবে এই অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছিল।

নিরস্ত্র জনতার মিছিলে বাঁধ কাটার জন্য খোন্তা, কোদাল, লাল পতাকা আর ডাংকার বাড়ি। আকাশ বাতাস কাপিয়ে যখন মিছিল এগিয়ে যায়- শত্রুর বেরিকেড অভিমুখে তখনি গুলির শব্দ। পুলিশের গুলিতে মিছিল অভ্যুাত্থানে রুপ নেয় । সবাই যেন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। শ্রী নদীর পূর্বপাশে খুলনা জেলার অনেক নেতা-কর্মী দেরীতে এসে দাঁড়িয়েছিল আগে থেকে। এবার তারাও নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে এসে যোগ দিল লড়াইয়ে। গুলির শব্দে অনেকে ওয়াপদার রাস্তার ঢালুতে নেমে সামনের দিকে অগ্রসার হচ্ছিল। এরই মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল মারা গেছে- কেউ একজন মারা গেছে। ওমনি মিছিল তীরের গতিতে ঝাপিয়ে পড়ল শত্রুর আস্তানায়। পূর্ব পারের কর্মীরা যেমন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল মিছিলে সামিল হতে, তেমনি পুলিশ ও মাস্তানরা ঝুঁপঝাঁপ করে নদীতে লাফিয়ে পড়ল পালিয়ে প্রাণ বাঁচাবার জন্য।

ডহুরী বাঁধ উচ্ছেদ করা হলো। ডহুরী কৃষক অভ্যূত্থান জয়যুক্ত হলো। লডাইয়ে পুলিশের গুলিতে মারা গেল ২২ দিন আগে যোগদান করা এক মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক কৃষকের সন্তান তাজা তরুণ প্রাণ গোবিন্দ দত্ত। মারাত্মক আহত হলেন গোবিন্দ সরকার, সারোয়ার মাস্টার সহ আরো অনেকে। অন্যদিকে একজন পুলিশ পালাতে না পেরে পদদলিত হয়ে মরে পড়ে রইল খোলা আকাশের নিচে।

শিক্ষাঃ

১। জোয়ার-ভাটা চালু রেখে নদীর নাব্যতা রক্ষা করে জলাবদ্ধতার সমাধান করা। নদীর হাত পা বেঁধে অর্থাৎ ওয়াপদার বাঁধ দিয়ে নদীকে ভূমি প্রকৃতি থেকে আলাদা করে জলবদ্ধতার ও বন্যার বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।

২। শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জয়লাভ করা যায়।

৩। ভূক্তভোগী সম্প্রদায়ের বা শ্রেনীর নিজস্ব সংগঠনের নেতৃত্বে আন্দোলন পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিণতিতে নিয়ে বিজয় অর্জন নিশ্চিত হয়।

৪। ভূক্তভোগী এলাকার মানুষই শুধু নয়, সাংগঠনিক নেতৃত্বে পাশ্ববর্তী এলাকা থেকেও কর্মী ও জনগণের সমর্থন আদায় করে আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিজয় সংহত হয়।

৫। ছোট বড় আন্দোলনে আর্থিক পরিকল্পনা জরুরি। ডহুরী আন্দোলনের পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। যা মোকাবেলা করার জন্য আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয়।

৬। যে কোন আন্দোলনের আগে ও পরে প্রচারমূলক দিকট তরান্বিত করা, কারণ শত্রুর পক্ষে সাম্রাজ্যবাদী তথ্য দুনিয়া সব সময় জনগণের সাফল্যের অপপ্রচার করে।

পৃথিবীর দেশে-দেশে শ্রমিক কৃষক জনগণের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে এমন একটি অভ্যূথান আমাদের অনুপ্রাণীত ও শিক্ষিত করে তুলতে পারে। অধিকার বঞ্চিত মানুষের চিহ্নিত শত্রুকে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে অন্যান্য সকল শ্রেনীর অংশগ্রহণ ও সমর্থনে ব্যাপক আন্দোলনের মাধ্যমে পরাস্থ করে বিজয় অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের ব্যাপক জনগণের সমস্যা সংকটের জন্য দায়ী সাম্রাজ্যবাদ ও এদেশের সমান্ত, আমলা মুৎসুদ্দী শ্রেনীর বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষক, মধ্যবৃত্ত ও অন্যান্য অধিকার বঞ্চিত সকল পেশাজীবী ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণে আন্দোলন-সংগ্রামের পরিণতিতে অধিকার আদায় করতে হবে। ডহুরী যেন আমাদের এই শিক্ষাই গ্রহণ করতে বার বার আহ্বান জানাচ্ছে।

 

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৭।।সংখ্যা-০৩, রোববার।। ১৩ আগস্ট ২০১৭।।


বাংলাদেশঃ মার্কসবাদী শিল্প সাহিত্যের কাগজ ‘খনন’ এর আগস্ট ‘১৭ সংখ্যা বেরিয়েছে

20751511_1436426656438227_1757569254_n

প্রাপ্তি স্থানঃ ঘাস ফুল নদী(প্রথা বিরোধী প্রকাশনা), আজিজ সুপার মার্কেট(নীচ তলা), শাহবাগ, ঢাকা


শ্রমজীবী জনগণও চাঁদাবাজদের হাতে বন্দী

may_89632

আব্দুল ওয়াদুদ এক সময়ে জমিদার জোতদাররা দেশের শ্রমিক, কৃষক, জনগণের নিকট থেকে কর আদায় করতো। এর সাথে যুক্ত হতো ইজারাদারদের তোলা। এই তোলাবাজির বিরুদ্ধে জোরদার কৃষক আন্দোলন হয়েছিল। তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল হাট-বাজারে তোলা উঠানো বন্ধ করতে হবে। প্রবল আন্দোলনের মুখে তোলা উঠানো বন্ধ হয়। শুধু তোলা উঠানো নয়, জমিদারি প্রথাই চিরতরে বিলুপ্ত হয়। জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে এবং কৃষকের উপর জবরদস্তিমূলক উপরি আদায়ের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল। এখন কমিউনিস্টদের সেই শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই চাঁদাবাজদের জুলুমের শিকার হচ্ছেন গোটা শ্রমজীবী জনগণ। দেশের শ্রমজীবী জনগণকেই একশ্রেণির চাঁদাবাজদের আবদার মেটাতে হচ্ছে। দাবি না মেটাতে পারলে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে তা আদায় করে নিচ্ছে একশ্রেণির চাঁদাবাজ। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় অবাধ্যতার শাস্তি স্বরূপ শারীরিক নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে থেমে থাকছে না, জবরদস্তিমূলকভাবে শ্রমজীবী জনগণের সামান্য পুঁজিও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

চাঁদাবাজির ঘটনা সম্পর্কে একটি সচিত্র প্রতিবেদন দেখেছিলাম টেলিভিশনে। সেখানে দেখানো হয়েছে, সিএনজি চালিত অটোরিক্সা রাস্তায় চালাতে গেলে চালককে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। তবেই সিএনজি রাস্তায় নামতে পারে এবং বৈধ হিসাবে গণ্য হয়। সিএনজি চালক এই উৎকোচের অর্থ পুষিয়ে নেয় যাত্রীদের নিকট থেকে, বেশি ভাড়া আদায় করে। সড়কে চাঁদাবাজির কারণে বাজারে ফল-মূল, শাক-সবজী ও মাংসের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। গরু, ছাগল, হাস-মুরগি ইত্যাদি পরিবহন করতে গেলে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিয়ে তবেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর পরেও সেখানে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। ঢাকা মহানগরীতে কারওয়ান বাজার একই বড় বাজার। সেখান থেকে বছরে শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। ফলে মাংসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে এখন তা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে। শাক-সবজি, তরি-তরকারি ইত্যাদি উৎপাদন করে কৃষক লাভের মুখ তো দেখতে পান না, উপরন্তু তাকে লোকসানে পড়ে দেনার দায়ে শেষ সম্বল ভিটে বাড়ি হারাতে হয়। এই সব কৃষি পণ্য উৎপাদন করে কৃষক লাভবান হতে না পারলেও পণ্য বাজারে নেওয়ার পথে পরিবহন থেকে চাঁদাবাজরা অর্থ আদায় করে নিচ্ছে। আর ক্রেতা সাধারণের ঘাড়ে তার দায়ভার পড়ছে।

ঢাকাতে ফেরিওয়ালাদের ফুটপাতে বসতে হলে চাঁদাবাজির শিকার হতে হচ্ছে। ঢাকার নবাবপুর রোডের ডাব বিক্রেতা হাশেম মিয়া। আদি নিবাস রাজবাড়ী জেলাতে। পদ্মার ভাঙনে কয়েকবার ভিটে মাটি হারিয়ে ঢাকাতে এসেছেন, ডাব বিক্রি করতে। পরিবার-পরিজন এখন বেড়ি বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। ঢাকাতে একটি বস্তির ভাঙা ঘরে কয়েকজনে মিলে ভাড়া থাকেন। সেখানেও চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পাননি। নবাবপুর রোড এমনিতেই শহরের ব্যস্ত রাস্তা। সারাদিনই এখানে যানজট লেগেই থাকে। যার মাঝে ফুটপাতে হকারের ভিড়, দোকানদারের মালপত্র দিয়ে ফুটপাত দখল করা ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। তার মাঝে হাশেম মিয়া ভ্যানে করে ডাব ফেরি করে বিক্রি করেন। তার কাছ থেকেও চাঁদাবাজি হচ্ছে। প্রতিদিন সকালে ১০ টাকা, আর বিকালে ১০ টাকা হারে। চাঁদা দিতে বিলম্ব হলে পুলিশের লাইনম্যান নামে পরিচিত চাঁদাবাজ তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করে চাঁদা আদায় করে নেয়। তার উপরে ট্রাফিক সাজেন্ট তো রয়েছেন। তিনি সপ্তাহে দুই একবার এসে দেখা করেন। হাশেম মিয়ার ভাষায়, ‘সাজেন্ট স্যার আসলে একটা করে ডাব তাকে খাওয়াতে হয়’। এইভাবে চলে যায় ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা। ঢাকার রাস্তায় এখন রিক্সায় চলে ভ্রমণ করেন নিম্ন আয়ের জনগণ। নবাবপুর রোডের বিভিন্ন গলিতে রিক্সা ঢোকার জন্য মাঝে মাঝে পুলিশ বাধা দিয়ে থাকে। তবে গলিতে ঢোকার জন্য রিক্সা প্রতি পাঁচ টাকা করে পুলিশকে চাঁদা দিলেই গলিতে প্রবেশ বৈধ হয়ে যায়।

একবার ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম। ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যেকার ট্রেনে যাত্রী ভিড় লেগেই থাকে। এখানকার ট্রেনগুলোতে নির্ধারিত আসনে যাত্রী তো আছেনই, তার উপর আসন ছাড়াও বহু লোক দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করছেন। তার মধ্যে আবার বিভিন্ন হকারদের আনাগোণা, হাঁক-ডাক, চিৎকার মিলে গরমে এক ভয়াবহ অবস্থা। চলতি পথে ট্রেন ভৈরব এসে থামলো। ভৈরব স্টেশনে দাঁড়ানোর সাথে সাথে কিছু সংখ্যক মাস্তান চাঁদাবাজ হকারদের ওপর চড়াও হলো। তারা হকারদের কাছ থেকে জোর জবরদস্তিমূলকভাবে ২০ টাকা, ৩০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করে নিল। অনেক ফেরিওয়ালা সদ্য ফেরি করতে উঠেছেন, বিক্রি হয়নি, এই অজুহাতে চাঁদা দিতে না চাওয়ায় চাঁদাবাজ মাস্তানরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে চাঁদা আদায় করে নিল। ফেরিওয়ালাদের অসহায় অবস্থা দেখে ট্রেন স্টেশন থেকে ছাড়ার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারা গেল, ট্রেনে ফেরি করে ব্যবসা করতে হলে এই মাস্তানদের চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদাবাজ মাস্তানদের সাথে রয়েছে জিআরপি’র ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। মাস্তান চাঁদাবাজরা আবার জিআরপি’র পক্ষ থেকেই চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা আদায়ের পর জিআরপি ও মাস্তান চাঁদাবাজরা ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে।

ঢাকা মহানগরের সড়কের আশে-পাশের ফুটপাতগুলোতে হকার উচ্ছেদের অভিযান এখনও চলমান রয়েছে। ঢাকা মহানগরীর রাস্তাগুলো থেকে ভিক্ষুক উচ্ছেদ, হকার উচ্ছেদের অভিযান মাঝে মাঝে চলে থাকে। প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় এটা সরকারের উদ্ভট পরিকল্পনা হলেও এই ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে। আর সরকারের তেল মারা কিছু মিডিয়া রয়েছে তারা প্রকৃত সমস্যা আড়াল করে এই ভূমিকার গুণকীর্তন করছে। প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যেখানে জনসংখ্যার অর্ধেকই বেকার সেখানে এই ধরনের অভিযানের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবুও চলেছে ঘটা করে হকার উচ্ছেদের অভিযান। সিটি কর্পোরেশন রাজধানী ঢাকার ফুটপাতকে হকারমুক্ত করার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারীদের সমন্বয়ে চলছে এই অভিযান। তবে একদিকে চলছে হকার উচ্ছেদের অভিযান আবার অন্যদিকে নতুনভাবে হকার বসানোর আয়োজন। এর তাৎপর্য কী তা বুঝতে একটু সময় লাগলো। নতুন করে বসা হকারদের কাছে একটু খোঁজ নিয়ে জানা গেল মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাদের আবার ফুটপাতে বসতে দেওয়া হয়েছে। তার উপরে হকারদের নিকট থেকে প্রতিদিনের চাঁদা তা তো অব্যাহত রয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী ও কিছু সংখ্যক অসাধু পুলিশের যোগাযোগে এই নতুন করে হকার বসানোর কর্মসূচি চলছে। সিটি কর্পোরেশনের হকার উচ্ছেদের কর্মসূচি এইভাবে একটি চক্রের পকেট ভারী করার কাজে লাগানো হচ্ছে। ভিক্ষুকদের নিকট থেকে চাঁদা আদায় হয় কী না সে সম্পর্কে কোন তথ্য এখনও জানা নেই।

এতো গেল সমাজের নিচের মহলের চাঁদাবাজির কিছু ঘটনা। সমাজের সর্বমহলেই এভাবে চলছে চাঁদাবাজি। এবারে আসা যাক সরকারের একজন মন্ত্রীর ভাইয়ের চাঁদাবাজির কাহিনী। সরকারের মন্ত্রী বলে তার ভাইয়েরও কদর বেড়েছে। তাই ভুক্তভোগী মানুষজন নিত্য যাতায়াত করছেন মন্ত্রীর ভাইয়ের কাছে সুপারিশের জন্য। চাকরি, ব্যবসা, জমিজমা, সামাজিক বিরোধ, এলাকার সকল সমস্যার সমাধান দেন মন্ত্রীর ভাই। এব্যাপারে অনেকেই তার গুণকীর্তন করে থাকেন। সরকারি চাকরির ব্যাপারে তার কাছে গেলে তো কথা নেই। তিনি কোন প্রার্থীর সুপারিশ-ই অগ্রাহ্য করেন না। চাকরি দেওয়ার নামে তিনি সকলের নিকট থেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা নগত হাতিয়ে নেন। তার মধ্যে কারো না কারো চাকরি নিজ যোগ্যতা বলে হয়ে যায়। যাদের যোগ্যতা বলে চাকরি হয়ে যায় তারা তো খুশিতে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আর যাদের চাকরি হয় না, তাদেরকেও তিনি হতাশ করেন না। যাওয়া মাত্র আলমারি থেকে কাগজপত্র, টাকা পয়সা বের করে তিনি চাকরি লাভে ব্যর্থ প্রার্থীর হাতে ধরিয়ে দেন। এইভাবেই তিনি কৌশল করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

এবারে আসা যাক বিগত সরকারের অর্থাৎ চার দলীয় জোট সরকারের জনৈক প্রভাবশালী মন্ত্রীর প্রভাব প্রতিপত্তি আর উৎকোচ গ্রহণের কাহিনী। তবে মন্ত্রী সজ্জন ব্যক্তি, নিছক ভদ্রলোক, তিনি উৎকোচ গ্রহণ করেন না। তাই তার কাছে কেউ উৎকোচ নিয়ে যেতে সাহস পায় না। তবে মন্ত্রীর স্ত্রী, যিনি জনগণকে উপকার (!) করতে কার্পন্য করেন না। সরকারি চাকরির সার্কুলার দিলেই তার পোয়াবারো অবস্থা। শত শত চাকরি প্রার্থী। তিনি কোন প্রার্থীকেই হতাশ করেন না। সকলকেই চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন। এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সবার নিকট থেকে মোটা অংকের উৎকোচ গ্রহণ করেন। তারপর প্রার্থীর যোগ্যতা অনুসারে কারো কারো চাকরি হয়ে যায়। যার চাকরি হলো তার খুশি আর ধরে না। যাদের চাকরি হলো না, তারা আবার মন্ত্রীর বাড়ির দিকে ছুটলেন মন্ত্রীর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে। অনেক কষ্ট করে দেখাও হয়তো করলেন। মন্ত্রীর স্ত্রী আশ্বাস দিল এবারে চাকরি হলো না, পরে আবার সাকুর্লার হলে দিয়ে দেওয়া যাবে। মন্ত্রীর স্ত্রীর কথায় আশ্বস্ত হয়ে পিছনে পিছনে ঘুরতে শুরু করলেন চাকরি প্রার্থী। কিন্তু পরের বারও হলো না। মন্ত্রীর স্ত্রীর সাথে দেখা করে টাকা ফেরত পেলেন। তবে তার দেওয়া পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকার পুরোটা নয়, আংশিক। অবস্থাভেদে এক থেকে তিন লাখ টাকা। বাঁকি টাকার ব্যাপারে মন্ত্রীর স্ত্রী বললেন, ‘এখন আর বিরক্ত করিস না, পরে আসিস দেখা যাবে’। মন্ত্রী বাহাদুরের স্ত্রী টাকা ফেরত চাইলে বিরক্ত হয়েছেন। এর পরে আর কোন চাকরি প্রার্থীর সাহস আছে তার পাওনা টাকা ফেরত চাওয়া।

ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি শাসক-শোষক শ্রেণির কল্যাণে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। চাঁদাবাজি, মাস্তানি, অনিয়ম, দুর্নীতি এত ব্যাপক হয়েছে যার হাত থেকে নিঃস্ব, হতঃদরিদ্ররাও রেহাই পাচ্ছে না। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি করতে পারাটাই এখন অনেকের কাছে কারিশমা। বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের আমলে এই দুর্নীতি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মহাজোট সরকার দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থেকে যাওযায় আশ্বস্ত হয়ে ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি এখন খোলাখুলিভাবে করতে পারছেন। অবক্ষয়ি সমাজের নৈতিকতার মানদন্ড এত নিচুতে পৌঁছেছে যে গোটা সমাজটাই ডুবতে বসছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৭।।সংখ্যা-০২, রোববার।। ২৫ জুন ২০১৭।।