আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা – ঊ চিয়াং

gettyimages-113695033

 

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

ঊ চিয়াং

 

অনলাইন প্রকাশলাল সংবাদ / lalshongbad.wordpress.com

                                                             

                         

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

(চীনা পত্রিকা ‘ষ্টাডি’তে প্রকাশিত নিবন্ধের অনুবাদ)

 

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে মজুর, ক্ষেতমজুর আর বুদ্ধিজীবি-এ দুয়ের মধ্যে খুব বেশি তফাৎ নেই। তবে বুদ্ধিজীবিদের কতকগুলো বিশেষত্ব একটু ভিন্ন ধরনের। তাই সারবস্তু (কণ্টেণ্ট) ও পদ্ধতি দু’দিক থেকেই সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা প্রশ্নে এদিক দিয়ে কিছু কিছু পার্থক্য আছে। অতীতে যে সব কমরেড বুদ্ধিজীবি ছিলেন তাঁদের মধ্যেকার সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার সমস্যাই এই প্রবন্ধের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটা কি ?

এ বিষয়ে অনেকের স্পষ্ট ধারণা নেই। নিম্নলিখিত তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে বিষয়টা পরিষ্কার হতে পারে:

ক) বিভিন্ন বিপ্লবী পার্টি ও গ্রুপের পক্ষে তাদের চালিকা শক্তি (মোটিভ ফোর্স) হল সমালোচনা আর আত্ম-সমালোচনা; যে সব কমরেড ঐ পার্টি বা গ্রুপে কাজ করেন তাঁদের পক্ষেও তাই। কোন মেশিন দিয়ে যদি কিছু উৎপাদন করতে হয় তো আগে তার বাষ্প, বিদ্যুৎ বা ঐ ধরনের কোন একটা চালিকা শক্তির দরকার। তেমনি সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা বিপ্লবী পার্টির আর বিপ্লবী কমরেডদের উদ্দীপনা দেয়- তাঁদের এগিয়ে যাবার মত প্রেরণা যোগায়। এ না হলে অগ্রগতি শুধু বন্ধই হয়ে যায় না, এমন কি পশ্চাদগতি কিংবা ভাঙনও দেখা দেয়। ভুল-ত্রুটি শুধরে নিতে হলে, ভাল গুণগুলো আরও বাড়িয়ে তুলতে হলে, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ছাড়া পথ নেই। মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্রে এই অস্ত্রটি যদি আমাদের হাতে থাকে তবে ‘‘শত্রুর কোন ঘাঁটিই আমাদের কাছে অজেয় নয়, কোন শত্রুই আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারে না।”

বাস্তবিক, বিপ্লবী কর্মতৎপরতায় এগিয়ে যাবার মত অনুপ্রেরণা আমরা পাই সমালোচনা আর আত্ম-সমালোচনা থেকেই; বিপ্লবী পার্টি ও বিপ্লবীদের এগিয়ে যাবার সামর্থ্য কতখানি তা এর দ্বারাই নির্ধারিত হয়।

খ) বিপ্লবী পার্টি বা গ্রুপের উৎকর্ষ (কোয়ারিটি) কতখানি তা সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা থেকেই প্রকাশ পায়। প্রত্যেক বিপ্লবীর যোগ্যতার চূড়ান্ত পরীক্ষা হয় এরই মারফৎ। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটাকে পার্টি বা গ্রুপ কতখানি বুঝছে, কিভাবে কাজে লাগাচ্ছে, তা দেখেই বোঝা যায় সে পার্টি বা গ্রুপ সত্যিই বিপ্লবী কিনা। পার্টি বা তরুণ কমিউনিষ্ট লীগের কোন সভ্য বা মুক্তিফৌজের কোন সৈনিকের উৎকর্ষ যাচাই করতে হলেও ঐ সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সম্বন্ধে তাঁদের বোধ আর প্রয়োগ ক্ষমতা দিয়েই তা করতে হবে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আর কুওমিন্টাং এর দৃষ্টান্ত ধরুন। জমিদার, পুঁজিদার আর অত্যাচারীদের প্রতিনিধি হল- কুওমিন্টাং জনসাধারণকে শোষণ করে। আর কমিউনিষ্ট পার্টি হল সর্বহারা শ্রেণির প্রতিনিধি- এ পার্টি জনসাধারণকে পরিচালিত করে, তাদের মুক্তি এনে দেয়। পার্টি দু’টির আসল প্রভেদ এখানেই; আর এই মূল পার্থক্য থেকেই আসছে আর একটি বিশেষ পার্থক্য। কুওমিন্টাং-এর মতে অধঃপাতে গেছে যে পার্টি তার সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা মারফৎ লোকের সামনে নিজের দোষ-ত্রুটি খুলে ধরার ইচ্ছে নেই, ক্ষমতা বা সাহসও নেই। চিয়াং কাইশেক কখনো কারো কাছে নিজের দোষ স্বীকার করেনি। যদি কখনো স্বীকার করে থাকে তো সে নেহাত ঘটনা চক্রে কিংবা প্রতারণার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমাদের কমিউনিষ্টরা, বিপ্লবী সৈনিকেরা জনগণের কাছে নিজেদের দোষের কথা খুলে ভয়ই তো পায়ই না, বরং আনন্দ পায়; আর ধরার সঙ্গে সঙ্গে অমনি নতুন নতুন উপায় ভেবে বের করে, যাতে দোষ-ত্রুটি দূর করা যায়। অন্য পার্টি অন্য মানুষ- যারা বিশেষ ছাঁচে ঢালাই করা নয় – তারা এ কাজ করতে পারে না।

সম্প্রতি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আর কমিউনিষ্ট পার্টি ইনফরমেশন ব্যুরো জাপানী কমিউনিষ্ট পার্টি’র এক নেতৃস্থানীয় কমরেডের সমালোচনা করেছিলেন। ঐ কমরেড দ্বিধাহীনভাবে সর্বজন-সমক্ষে আমাদের সমালোচনা গ্রহণ করেছিলেন, স্বীকার করেছিলেন তাঁর দোষ। এ হলো একটা দৃষ্টান্ত যা বুর্জোয়া বা পাতিবুর্জোয়া রাজনৈতিক পার্টির পক্ষে করা অসম্ভব।

আমেরিকায় রিপাবলিকান আর ডেমোক্রেটিক নামে যে বুর্জোয়া পার্টি আছে তারা চিয়াং কাইশেককে ছ’ শ’ কোটি ডলার সাহায্য দিয়েও টিকিয়ে রাখতে পারেনি। কিন্তু মাইনে করা চিয়াং কাইশেকের যখন পতন হল, তখন তাদের সাহস হলো না খোলাখুলি নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করার। তার বদলে তারা এক সরকারী ইস্তিহার বের করে বললো যে, সব দোষ অপদার্থ চিয়াং কাইশেকের আর নিজেদের কুৎসিত বীভৎসতা ঢাকার জন্যে তারা আবার লজ্জার মাথা খেয়ে মিথ্যে গল্প বানালো ‘সোভিয়েত হস্তক্ষেপের’।

দোষ স্বীকার করতে বা সংশোধন করতে অনিচ্ছার বিরুদ্ধে আমাদের পার্টি সর্বদা সংগ্রাম করেছে, সংগ্রাম করছে রাজনৈতিক জড়তার বিরুদ্ধে- চরম শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের মত করেই। সর্বকালে ও সর্বদেশে আমাদের বিপ্লবী পার্টি প্রগতির দিকেই অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে এবং সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা প্রয়োগ করে।

সুতরাং বিপ্লবী কর্মধারার (প্র্যাকটিস) শ্রেষ্ঠ পরিচয় হল সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা।

গ) রোজ আমাদের যে সব জিনিস প্রয়োজন সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা তারই একটি। স্তালিন দেখিয়ে দিয়েছেন যে, পানি বাতাসের মতই এটা আমাদের প্রয়োজনে লাগে। পানি আর বাতাস ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, তেমনি সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ছাড়া বিপ্লবী পার্টি বা বিপ্লবী কমরেডরা বাঁচতে পারেন না।

এগিয়ে যাবার প্রেরণা জুগিয়ে দেয় সমালোচনা আর আত্ম-সমালোচনা। বিভিন্ন বিপ্লবী গ্রুপ ও কমরেডদের মূল উৎকর্ষ-এর ভেতর দিয়েই প্রকাশিত হয়। এটা আবার জরুরী নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসও বটে- এরই থেকে আসে অবাধ প্রগতির প্রেরণা, এরই থেকে শক্তি ও তেজ সংগ্রহ করে বিপ্লবী সংগঠনগুলো, সেগুলোর ক্ষমতা এতে বেড়ে চলে।

আমরা সত্যই বলতে পারি, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার সাহায্যে বিপ্লবী সংগঠন সুসংহত হয়, ব্যক্তিগতভাবে বিপ্লবীরা কর্মতৎপর হন এবং এর ফলে অতিরিক্ত শক্তির নিশ্চিত ভরসা পাওয়া যায়।

এ কথাটি অনেক কমরেড ঠিক মত বোঝেন না। তাঁরা ভাবেন, সমালোচনা, আত্ম-সমালোচনা এমন কিছু গুরুতর ব্যাপার নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়- ওটা শুধু অনুধাবন (স্টাডি) করার একটা পদ্ধতিমাত্র। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা হচ্ছে অপরকে আক্রমণ করার একটা বিশেষ পদ্ধতি- এমন কথাও কোন কোন কমরেড মনে করেন। আবার কেউ কেউ ভাবেন যে, এটা একটা ঐন্দ্রজালিক জিনিস যাতে সব দোষ ঢাকা পড়ে। এমন এক ধরনের কমরেড আছেন যাঁরা প্রায়ই আত্ম-সমালোচনা করেন- খোলাখুলি স্বীকৃতিতে তাঁরা ‘অদ্বিতীয়’ হলেও, তারপরও দোষ-ত্রুটিতে তাঁরা যে মহাপ্রভু সেই মহাপ্রভুই থেকে যান। কোন কোন কমরেড আবার অপরকে সমালোচনা করার বেলায় সবার আগে; কিন্তু নিজের দুর্বল জাযগায় ভুলেও হাত দেন না। লোকের চোখে ধূলো দিয়ে নিজেদের দোষ ঢাকার জন্যে তাঁরা এলোপাতাড়ি সমালোচনা করে চলেন।

কেউ কেউ ভাবেন, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা যেন বনের বাঘের মত ভয়ঙ্কর; সমালোচনার জন্যে মিটিং হবে শুনলেই তাঁদের ‘জ্বর এসে যায়’ এবং এইভাবেই তাঁরা পালাবার চেষ্টা করেন। আত্ম-সমালোচনা করতে হলেই এঁদের বুক কেঁপে উঠে, তার ঠেলা সামলাতে তাঁরা ভরসা পান না। কেউ কেউ আবার এ জিনিসটাকে জুজুর মত ভয় করেন; আর সব যেন ঠিকই চলছে, কেবল এটা নিয়েই যত গন্ডগোল। এরা ভুল করে মনে করেন যে, প্রকৃত সমালোচনা যেন “জনতার আদালতে বিচার”। কমরেডরা ভাবেন যে, অন্য লোকে তাঁদের দোষ-ত্রুটির কথা জানলে তাদের মর্যাদা নষ্ট হয়ে যাবে, ইজ্জত ধূলোয় লুটোবে। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার লক্ষ্য কি তা পরিষ্কার না বোঝার ফলেই এই সব ধারনার উদ্ভব হয়।

মোট কথা হল: সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা হচ্ছে বিপ্লবী আর প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যেকার বিপ্লবী আর প্রতি-বিপ্লবীদের মধ্যেকার একটি মূল পার্থক্য। আবার এর দ্বারাই কমরেডদের উৎকর্ষ ও প্রগতিশীলতা কতখানি তা-ও স্থির করা যায়।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা গড়ে তুলতে হবে কেন ?

আমাদের মস্ত বড় জয় হয়েছে তা সবাই জানেন। পুরোনো সমাজ-টাকে উচ্ছেদ করে আমরা জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু তাই বলে পুরানো ব্যবস্থাটাকে আমরা একবারে লোপ পাইয়ে দিতে পেরেছি, একথা বলতে পারি কি? না। চীনদেশে সামন্তবাদ আর আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ এখনো সমূলে উৎপাটিত হয়নি। উৎপাদনের পুরানো সম্বন্ধগুলো এখনো একেবারে দূর হয়নি: পুরানো ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা এখনো রয়েছে; হাজার হাজার বছর পুরানো সমাজের বিশেষ করে তার জঘন্য মতাদর্শের ধ্বংসাবশেষের প্রভাব আজও অনেক লোকের চেতনায় দেখতে পাওয়া যায়।

এই সব আদর্শগত শত্রুর হাত থেকে আমরা কখনই নিরাপদ নই। কারণ তারা অনবরত চেষ্টা করেছে যাতে আমাদের আক্রমণ করে মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারে।

পুরানো সমাজ থেকে যেসব বুদ্ধিজীবিরা এসেছেন, অতীতে তাঁরা বরাবর কিছুটা আরামের জীবনই যাপন করতেন-পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী শিক্ষা এবং প্রভাব তাঁদের ওপর অনবরত পড়ত। তার ফলে তাঁদের মতাদর্শে সবসময়ে অনেক ‘বংশগত’ দুর্বলতা প্রতিফলিত হয় এবং সেগুলো বারে বারে সামনে এসে দাঁড়ায়। তাই যে অ-সর্বহারা মতাদর্শগুলো আমাদের ওপর ‘অতর্কিত আক্রমণ’ চালায়, ‘অলক্ষিতে আমাদের মধ্যে ‘অনুপ্রবেশ’ করে সেগুলিকে পরাস্ত করার জন্যে আমাদের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ব্যবহার করতেই হবে। শ্রেষ্ঠ গুণাবলীর বিকাশের জন্য সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা প্রয়োগ করতেই হবে।

মতাদর্শ ভ্রান্ত হওয়া সত্তে¡ও আমাদের বিপ্লবী কর্মীরা যদি তা উপেক্ষা করেন কিংবা সহ্য করেন, যদি তাঁরা অ-সর্বহারা লাইনে চলে কিংবা উদার নীতিবাদের প্রশ্রয় দেন- তাহলে ভ্রান্তি ঘটতেই থাকবে, ছোট ছোট ভুলগুলো মারাত্মক ভ্রান্তিতে পরিণত হবে, এখান ওখানকার আলাদা ভুলগুলো সর্বব্যাপী হয়ে দাঁড়াবে। এরকম ভ্রান্ত পদ্ধতিতে চলতে থাকলে কর্মীদের মধ্যেও অধঃপতনের আশঙ্কা দেখা দেবে।

কমরেড মাও সে তুং বলছেন: ‘বিপ্লব সাধারনভাবে আমরা যে জয়লাভ করেছি সে তো আমাদের ‘‘দশ হাজার লি দীর্ঘ অভিযানে, এ প্রথম কদম মাত্র” *এই মন্তব্যটার অর্থ নানান দিক থেকে ভেবে দেখা দরকার।

মতাদর্শের সংগ্রামের ব্যাপারে বলা যায়: কৃষককুল, পাতিবুর্জোয়া সম্প্রদায় আর জাতীয় পুঁজিদার শ্রেণী-এই তিন পক্ষকে পরিচালনা করে যে সর্বহারা শ্রেণী তাদের পক্ষে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা অপেক্ষাকৃত সহজই ছিল। কিন্তু পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী মতাদর্শের সংগ্রাম-ঠিক ‘দীর্ঘ অভিযানের’ মতো।

মাহিনা ও সুখ-সুবিধার ব্যাপার নিয়ে কোনো কোনো কমরেড সম্প্রতি খুব মেতে উঠেছেন। মনে হবে ব্যাপারটা খুব সামান্য, মাত্র কয়েকজন লোকই এ নিয়ে মাথা ঘামায়। কিন্তু আসলে এটা হচ্ছে বুর্জোয়া মতাদর্শের চিহ্নাবশেষ, ব্যক্তিগত সম্পত্তির যে ধারণা তারই জের। কমিউনিজমে লক্ষ্যে অগ্রসর হবার জন্যে আমাদের নয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নয়া গণতান্ত্রিক শিক্ষা ও প্রচার আমাদের ক্রমাগত চালিয়ে যেতে হবে এবং পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে এই সংগ্রামের অস্ত্র হচ্ছে সমালোচনা ও আাত্ম-সমালোচনা।

আমাদের বুদ্ধিজীবীদের বেশীর ভাগই অতীতকালে কোন প্রত্যক্ষ দৈহিক পরিশ্রমের কাজ করেননি। এই ঘটনা এবং তাঁদের লালন-পালনের পদ্ধতি আর পরিবেশের প্রভাবের ফলে- তাঁদের মধ্যে অনেক রকমের দুর্বলতা জন্মায়। আর সব থেকে বড় কথা, চীনদেশের প্রতিক্রিয়াশীল শাসন কর্তারা ধোঁকা আর অত্যাচারের কৌশল চালাত, যত সব বিষাক্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করত- যাতে তরুণ সম্প্রদায় তাদের যন্ত্রে পরিণত হয়- যাতে তারা দূষিত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এরই ফলে কত শোচনীয় ঘটনা ঘটত- কত তরুণ ছাত্র ঘুরে ঘুরে বেড়াত নাচঘরে না হয় জুয়ার আড্ডায়, নয় তো বেশ্যালয় কিংবা এমনি আরও কোথাও; বিষের ধোঁয়ায় তাদের মন আচ্ছন্ন হত, তাদের আত্ম-সম্মানবোধ নষ্ট হয়ে যেত।

সস্তা রোমান্টিক উপন্যাস আর অশ্লীল সিনেমা ছবি দিয়ে আমাদের শহরগুলোকে ছেয়ে দিত- জাপানী সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল কুওমিন্টাং। তাই সেই পুরানো সমাজে তরুণ বুদ্ধিজীবীরা এক জীবন্মৃত অস্তিত্বের বোঝা বয়ে বেড়াত। এই অবস্থায় মতাদর্শের দিক থেকে অনেক রোগই তাদের মধ্যে সংক্রমিত হত।

আজ বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে আমরা প্রতিজ্ঞা নিয়েছি- এই সব দোষ দূর করব, পিছনে টানার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেব। এর জন্যে আমাদের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছে এটাই সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন।

জনগণের মুক্তিযুদ্ধের জয়লাভ এখন প্রায় সর্ম্পূণ হয়ে এসেছে।* শীঘ্রই সমগ্র চীনদেশ মুক্ত হবে, প্রতিক্রিয়াশীলরা ঝাড়ে বংশে দূর হবে। কিন্তু এত দীর্ঘকালব্যাপী সামন্তবাদ, তার ওপর শতাধিক বর্ষব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ (সেই আফিম যুদ্ধের সময় থেকে)- এর পর এই বিপুল জনসংখ্যা সম্পন্ন এমন প্রকাণ্ড দেশে কমিউনিজম গঠন করা খুব সহজ কাজ হবে না। এর জন্য অনেক বিপ্লবী, অনেক কর্মী লাগবে যাতে জনসাধরনকে শিক্ষিত, সংগঠিত ও পরিচালিত করা যায়: সকলে মিলে গঠনকর্ম নিষ্পন্ন করা যায়, শেষ করা যায় “দীর্ঘ অভিযান”।

বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের কর্মী গড়ে তুলতে হবে, তাদের শিক্ষা দিতে হবে। চালু স্কুল যা আছে তা তো আছেই; তাছাড়া রাজনৈতিক মতাদর্শের সাধারনভাবে উন্নতির জন্যে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা মারফৎ শিক্ষা দিতে হবে।

বস্তুগত বা আত্মগত যেভাবেই দেখি না কেন, এই সব তথ্য থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা কত দরকার। বোঝাই যাচ্ছে যে, বিপ্লবী কাজকর্মের ফল পেতে হলে আমাদের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা উপর গুরুত্ব আরোপ করতেই হবে।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটাকে একটা জরুরী বিপ্লবী দায়িত্ব হিসেবে আমরা গ্রহণ করব- এই আমার প্রস্তাব।

সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার ক্ষেত্রে বিচ্যুতি

১। এক রকম কমরেড আছেন তাঁর দোষ ঢাকবার চেষ্টা করেন; খোলাখুলি, সৎ আচরণ করতে চান না। দেখলেই বোঝা যায় যে, তাঁদের দোষের কমতি নেই- তবু তারা ভাবেন যে দোষ অতি সামান্য। এমন কি একটা দোষের কথাও হয়তো তারা স্বীকার করেন না। এরা ভাবেন যে, যতক্ষণ দোষ স্বীকার না করছি ততক্ষণ ধরে কে? চীনে একটা প্রবাধ আছে,“কোন কিছু যদি বাস্তবিক গোপন রাখতে চাও তো তেমন কাজ করোই না”। কিন্তু এই সব কমরেড মনে করেন, “গোপন রাখার উপায় হল মুখে তালাচাবি আঁটা। আর যদি কেউ জেনেও ফেলে তবু যতক্ষণ স্বীকার না করছি ততক্ষণ করবে কি?” এ সব হল অহংকারের কথা- তাঁর বদনামের ভয়। কিন্তু কমরেড, যদি আপনি স্বীকার না-ও করেন তবু বাস্তবিকই কি আপনি মনে করেন যে, কেউ জানতে পারবে না? চুপ করে থাকতে আপনার শুধু তিক্ততাই বাড়বে। দোষ স্বীকার করলে “মানহানিটা” কোন খানে?

কারই বা দোষ নেই? নিজের দোষ স্বীকার করে শোধরাবার সাহস যদি আপনার থাকে তো লোকে আপনার তারিফই করবে, আপনাকে ঘৃণা করবে না।

কেউ কেউ শাস্তির ভয় পান। ভাবেন, ছোট ছোট দোষে হয় তো কেউ নজর করবে না; কিন্তু বড় দোষে শাস্তি পেতে হবে।

এ ধরনের অসাধু, এড়িয়ে- চলার মনোবৃত্তিতে ইজ্জত তো থাকেই না, বরং গুরুতর ‘মানহানি’ ঘটে থাকে।

২। কোন কোন কমরেড অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখান। ভাবেন “চোখের বদলে চোখ চাই, দাঁতের বদলে দাঁত” এবং “প্রতিহিংসা বড় মধুর”। সমালোচনা-সভায় তাঁরা অনুগ্রহের বদলে অনুগ্রহ দেখান, আর করেন আক্রমণের বদলে আক্রমণ। “গতবার তুমি আমার বিরুদ্ধে কিছু বলনি সুতরাং এবার আমিও তোমার সম্পর্কে কিছু বলব না” কিংবা, “গত সপ্তায় আমার সমালোচনা করেছিলে! আচ্ছা এবার তোমায় এমন দেখে নেব যে তুমি জীবনে তা ভুলবে না।” তারপর যত রাজ্যের কুৎসা, বিদ্বেষ জুটিয়ে এনে তাক্ লাগানো হামলা চালান। “তিন রাজ্য” উপন্যাসে *চুকে লিয়াং ওয়াং লাংকে শাপান্ত করে বেমালুম খতমই করে ফেললেন। গালাগালি দিয়ে একেবারে ভূত না ভাগানো পর্যন্ত এঁদের শান্তি নেই।

৩। কোন কোন কমরেড আবার নিজেদের দোষগুলো খুব ওপর ওপর দেখেন- গুরুতর দোষগুলো এড়িয়ে গিয়ে শুধু ছোটখাটো ত্রুটিরই উল্লেখ করেন। বড় দোষ ছোট করে দেখান, ছোট দোষ গ্রাহ্যেই আনেন না, কিংবা সমস্যার ভেতরই ঢুকতে চান না।

নিজেদের প্রতি এই তাঁদের মনোভাব। কিন্তু অন্যের বেলায় দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং সে দোষ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলাই তাঁদের রীতি। নিজের বেলায় খুব উদার আর অপরের বেলায় তাঁরা মহা কড়াঁ। এর নাম হচ্ছে-“তোমার বেলায় মার্ক্স, লেনিনবাদ-আর আমার বেলায় উদারনীতিবাদ।” নিজেদের দোষ সম্বন্ধে তাঁরা বলেন, ‘হঠাৎ হয়ে গেছে’, ‘ঝোকের মাথায় করে ফেলেছি’, ‘ও শুধু অসাবধনতার জন্যে’ ইত্যাদি। কিন্তু সে ভুলই যদি অপরে করে তখন এঁরা বলেন, ‘ওরা বদলাবে না’, ‘ওদের স্বভাবই ঐ রকম’, ‘গুরুতর ত্রুটি’, অমুক ‘বাদ’ নয় তো তমুক ‘বাদ’।

৪। কোন কোন কমরেড একটা খুঁটিনাটির ওপর সবটা জোর দিয়ে ভাবেন যে, তাতেই সবটা ধরা যাবে। তাঁরা “কায়া ভ্রমে ছায়াকেই পাকড়াও করেন”। আপাত রূপটাই তাঁরা খেয়াল করেন, আসল মর্ম বিস্মৃত হন। এ কমরেড, সে কমরেডের সামান্য কোন খুঁত ধরে তারই সাহায্যে তাকে একহাত নিতে চান। দোষ খুঁজে বেড়ানোই তাদের একাগ্র সাধনা। ‘অমুক দিন তুমি বড্ড জোরে কথা বলেছিলে’, ‘বেড়ানোর সময় তোমার জামার বোতাম খোলা ছিলো’- এমনি সব তুচ্ছ নালিশের তাঁরা ফিরিস্তি করে বেড়ান, দোষটা বড় হোক বা ছোট হোক তার আসল চেহারাটা কি সেটা ধর্তেব্যের মধ্যেই আনেন না। দোষটা ইচ্ছাকৃত বা আকস্মিক, স্বভাবগত না অন্যরকম, রাজনীতিগত না মতাদর্শগত তা তাঁদের দেখার দরকার হয় না, তখনকার অবস্থার কথাটাও চিন্তা করেন না। উন্মাদ সমালোচনা করে তাঁদের শিকারকে তাঁরা একেবারে কাঁদিয়ে ছাড়েন। কিন্তু ফল কিছুই হয় না’, ‘বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া’।

৫। অন্য কমরেডদের সমালোচনা করার সময় কেউ কেউ আবার শুধু গুণের কথাই তোলেন, দোষের কথা একেবারে এড়িয়ে যান। চারদিকে প্রশংসা-সৃষ্টি করাই তাদের কায়দা। তাদের মতে সবাই একেবারে চমৎকার- সবার সেরা এঁরা লোকের সুনজরে পড়ার জন্যেই প্রাণপাত করেন।

অনেক কমরেড আছেন তাঁরা অন্যের মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শুনতেই শুধু ভালবাসেন- খোলাখুলি প্রশংসায় তাঁদের মন খুশী হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের ভুল-ত্রুটির কথা ওঠালেই এদের চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠে- মাথা গরম হয়ে যায়। প্রশংসা করাই যেসব কমরেডের কায়দা তারা এদের কাছে খুবই পছন্দসই। এ ধরনের প্রশংসা যে শুধু ফাঁকা কথা তা তাদের মাথায় ঢোকে না।

৬। অন্যদের শুধু দোষের সমালোচনাই করলাম; কিন্তু তাদের কৃতিত্বের কথা উল্লেখই করলাম না-এ আর এক ধরনের বিচ্যুতি। এ বিচ্যুতিটা খুব গোঁড়া ধরনের। কোন কোন কমরেড ভাবেন যে, সমালোচনা মানেই হ’ল শুধু দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। তারা ভাবেন যে, সমালোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে যত পার দোষ খুঁজে বের করে কমরেডটিকে এমন অপদার্থ বলে প্রমাণ করে দিতে হবে যে, সে যেন ‘আর মুখ দেখাবার ঠাঁই না পায়’। “প্রশংসা! তাহলে আর সমালোচনা কি হল?”

একজন কমরেডকে জানি, যাকে অনেকেই পছন্দ করত না। এ নিয়ে মিটিং হবার আগে তারা একটা খাতা-পেন্সিল নিয়ে ঘুরে বেড়াতে আরম্ভ করল- কমরেডটির সম্বন্ধে কার কি সমালোচনা আছে জড়ো করতে। দোষের কথা শুনলেই তারা খাতায় টুকল; কিন্তু যদি কেউ কমরেডটির পক্ষে কিছু বলল, তা আর টুকল না- বলল, “ওকে প্রশংসা করেন কেন ? আমরা তো আর ওকে আদর্শ কমরেড বলে দেখাতে যাচ্ছিনে।” এইভাবে তারা আসামীর বিরুদ্ধে প্রায় দু’তিন শ’ ‘কসুর’ জোগাড় করে আনল।

কমরেডস, আপনারা ভেবে দেখুন এ ধরনের সমালোচনায় কি কোন কাজ হতে পারে ? যাকে সমালোচনা করা হ’ল তার কি কোন উপকার হতে পারে ?

৭। কোন কোন কমরেড শুধু নিজেকেই যাচাই করেন, নিজের সমালোচনা করেন; কিন্তু অন্যদের সমালোচনা করেন না। এ ধরনের কমরেডের নজর শুধু নিজের দিকে, অন্যদের দিকে তার খেয়ালই নেই। তার ভয় অপরকে শত্রু দাঁড় করানো ঠিক হবে না। অপরকে সমালোচনা করতে তিনি ভয় পান, ভাবেন তারা তাহলে তাকে ঘৃণা করবে, তার ওপর শোধ নেবে। তার মনে হয়, “কারই বা দোষ নেই ? আজ যদি ওর সমালোচনা করি তো কালই হয় তো ও শোধ নেবে।” “আপন সদর দরজার সামনেটা ঝাঁট দাও- অন্যের ছাদের জঞ্জাল আপনা-আপনিই দূর হবে এখন”- খুচিয়ে ঘা করার দরকার কি? এ হল তার মন্ত্র।

৮। কোন কোন কমরেড চান “পূর্ণ শান্তি”। নিজেদের সম্বন্ধে তারা যেমন ঢিলেঢালা, অপরের সম্বন্ধেও তেমনি। চীনে প্রবাদ আছে, “নদীর জলে আর কুয়োর জলে ঝগড়া নেই”। সমালোচনায় কাজ কি? আর নেহাতই যদি সমালোচনা করবে তো মৃদুভাবে করো-ঝগড়াঝাটি করো না- পরস্পরের প্রতি বন্ধুত্বের পর্দায় সুর বেঁধে রাখ।”

এঁরা “অনাক্রমণ-চুক্তির” পক্ষপাতী। শুধু তাই নয়-এরা বিশ্বাস করেন যে, ‘আমাদের যুগেই শান্তি আসবে।’ সব বন্ধু-বান্ধব একসাথে সৌজন্যে আর শিষ্টাচারে, গড়ে তুলবে সুখী পরিবার। “আনন্দমুখর জমায়েত- কী সুন্দর, না! সমালোচনা করে মেজাজ বিগড়ে দিয়ে আমাদের কি লাভ?

৯। তারপর আছেন ‘প্রশান্তবাদীরা’ (ট্র্যাংকুইলিষ্টস) – মুশকিল এড়িয়ে যাওয়াই এঁদের চিরন্তন প্রচেষ্টা। “আপনার কথা ঠিক; কিন্তু উনি যা বলছেন তাও তো সত্যি।” “শ্বশুর বলেন, ভুলটা শাশুড়ির, আর শাশুড়ি বলেন শ্বশুরের- কিন্তু বৌ কি করে ভরসা করে বলে কে ঠিক!” এসব লোকে আবার বড় জিনিসগুলোকে সামান্য করে দেখান, আর ছোট জিনিস হ’লে উড়িয়ে দেন। “আমরা তো আর অচেনা মানুষ নই, তবে সবাই মাথা গরম করে কি দরকার ?”

১০। কমরেডদের সামনে সমালোচনা করে পেছনে টিপ্পনী কাটা কারও কারও অভ্যাস। মিটিংয়ে তাঁরা সমালোচনা করেন না, মিটিংয়ের পরে গাল-গল্পচ্ছলে তারা টিপ্পনী কাটেন। তারা মিটিংয়ে কথা কননি কেন? জিজ্ঞসা করলে জবাব দেন, “আমার কিছু বলার নেই ভেবেছ? যথেষ্ট বলতে পারি।” যার সঙ্গে দেখা হবে তার সঙ্গেই তারা গাল-গল্প চালান; কিন্তু যাকে সমালোচনা করতে চান শুধু তাকেই কিছুই বলেন না।

কথায় আছে, “ভালো লোক কখনো মুখের ওপর বলে দিতে ভয় পায় না।” কিন্তু এই কমরেডরা তা করতে বড়ই লজ্জা পান।

১১। নিজের পছন্দ-অপছন্দ দিয়েই কেউ বা নীতি স্থির করেন। যদি বন্ধু হয় তবে পরস্পরকে বাচাঁবেন, আড়াল করবেন। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, তাঁদের বন্ধুর বহু দোষ। তবু তারা ভাববেন, “আহা ওর সঙ্গে একসঙ্গে এসেছি”, “একসঙ্গে পড়েছি,” “ওর সঙ্গে জমে ভাল” সুতরাং এইসব ব্যক্তিগত কারণে তারা বন্ধুর সমালোচনা করবেন না, বরং তার দোষ ঢাকা দিতে চেষ্টা করবেন।

কিন্তু যে কমরেডকে তারা পছন্দ করেন না তার বেলায় একেবারে মারমুখো হয়ে এ বিশেষ বক্তৃতা ঝাড়বেন, বলবেন যে ওর সব ভুল। এর নাম “বন্ধু আমার এত ভাল যে তার সাতখুন মাফ আর শত্রু এত খারাপ যে তাকে টিকতে দেওয়াই চলতে পারে না।”

১২। কেউ কেউ আবার মিটিং এর আগেই চুক্তি করে ফেলেন-অনাক্রমণ চুক্তি ও গোপন শর্ত। “আমি প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে আপনি যদি আমার বিরুদ্ধে কোন কথা না তোলেন তবে আমিও আপনার বিরুদ্ধে সমালোচনা না করিতে বাধ্য থাকিব।” ফলে সবাই বেশ চুপচাপ থাকে।

১৩। কেউ কেউ আবার সাধারণ ‘শত্রুর’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার জন্যে চুক্তি ও পরিকল্পনা তৈরি করেন, নিজেদের প্রত্যেকটি ‘অভিনেতা’র  ‘ভূমিকা’ নির্দিষ্ট করে দেন। তারপর একেবারে মুহুমুর্হু গোলাবর্ষণ। আসামীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত সমালোচনার অগ্নিবৃষ্টি।

১৪। কোন কোন কমরেড একগুয়ে, কিছুতেই দোষ স্বীকার করবেন না। কেউ সমালোচনা করলে তাঁরা সবই অস্বীকার করবেন। “শেষ পর্যন্ত অটল থেকো,” “ধীর থেকো,” “আত্মসর্মপণ কোরো না”- এই হল তাঁদের মন্ত্র। যা করতে পার কর, কিন্তু আমাকে কবুল করাতে পারবে না।”

১৫। কোন কোন কমরেড মনে মনে সমালোচনা ও দোষত্রুটি স্বীকার করেন, কিন্তু প্রকাশ্যে খোলাখুলি দোষ স্বীকার করতে রাজী হন না। তাঁরা ভাবেন, “আমি নিজে যখন নিজের দোষ বুঝছি, দোষ শোধরাতেও প্রস্তুত আছি, তখন তার বেশী আর কি দরকার? সকলের সামনে স্বীকারোক্তির প্রয়োজন কোথায়?” কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এই কমরেডদের যদি স্বীকার করার মত সাহস ও মনের জোর না থাকে তবে দোষ সংশোধনের মত দৃঢ়তা তাঁরা পাবেন কোথায় ?

এই সব ত্রুটি বিশ্লেষণ করলে তিনটি ভ্রান্ত মতাদর্শ ধরা পড়ে,যথা-আত্মবাদিতা (সাবজেক্টিভিজম), উদারনৈতিকতা (লিবারলিজম) এবং চক্রান্তকারিতা (ক্লিকিজম) সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সম্বন্ধে এই যে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি, এর কোনটাই সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গি নয়। এর কোনটিতেই নীতির বালাই নেই।

আত্মবাদিতা হচ্ছে অবস্তুবাদী মতাদর্শ। উদারনতৈক পুঁজিবাদী মতাদর্শেরই জের। আর সামন্তবাদী মতাদর্শের রেশ হচ্ছে চক্রান্তকারিতা। এগুলি সবই সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধী।

এ ধরনের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা মোটেই সাচ্চা নয়, সোজা নয়-এ হচ্ছে তার হীন ধরনের রকমফের। এতে অহংকেই প্রথম স্থান দেওয়া হয়, সমষ্টির কথা আসে তারপর।

এর অর্থ হচ্ছে যে, সর্বহারা শ্রেণীর সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার মধ্যে প্রাচীন সামাজিক তত্ত্বের ভ্রান্ত মতাদর্শ অনুপ্রবেশ করেছে।

এর অর্থ হচ্ছে যে, বিভিন্ন বিপ্লবী কমরেডদের পরস্পর সম্পর্কগুলিকে ব্যক্তিগত সামাজিক সম্পর্কের স্তরে নামিয়ে আনা। এর মানে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা জিনিসটাকে এমন ঘুরিয়ে দেওয়া যাতে সেটা যেন সামাজিক মেলামেশারই পন্থা হয়ে দাঁড়ায়।

শ্রেণি শত্রুর বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম তার সঙ্গে আভ্যন্তরীণ মতাদর্শের সংগ্রাম গুলিয়ে যায় যদি সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা ভ্রান্ত পথে চলে। তার ফল হয় যে, চাষী যে দৃষ্টিতে জমিদারকে দেখে কিংবা জমিদার যে দৃষ্টিতে চাষীকে দেখে, আমরা নিজেদের কমরেডকেও সেই দৃষ্টিতে দেখতে আরম্ভ করি।

আর এক ভ্রান্ত ধরনের সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা বিপ্লবী সমালোচনার মধ্যে গুণ্ডা-বদমায়েশদের পদ্ধতি সংক্রামিত করে, যেমন, প্রতারণা, হুমকি, মারমার কাটকাট (কাট এন্ড থ্রাষ্ট) সন্ত্রাস।

বিপ্লবী উদ্দেশ্যের চেয়ে নিজেদের স্বার্থের প্রতি কমরেডদের বেশী দৃষ্টি থাকে বলেই এই সব ত্রুটির উদ্ভব হয়।

বিপ্লবী সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার এই সব কদর্য অভ্যাসের পরিচয় দেওয়া মস্ত ভুল। এই সব নীচ মতাদর্শ বিশেষ করে চক্রান্তকারিতার মতাদর্শ বিপ্লবী বাহিনীতে সংক্রামিত করা কিছুতেই চলতে পারে না।

প্রকৃত সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা গড়ে তোলা

১। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনায় ষোল আনা সাধুতা দরকার। মান-অপমানের কথা ভুলে যান। সেই যে প্রাচীন বচন “ছাল থাকে সব গাছে, সব মানুষের মান আছে”- এ হচ্ছে সেই প্রাচীন সামাজিক সম্পর্কেরই দার্শনিকতা। কিন্তু সর্বহারা শ্রেণী হল সৎ, অকপট, তার ব্যবহার খোলাখুলি। তথ্যের মধ্যে থেকেই সর্বহারা শ্রেণী সত্যের অনুসন্ধান করে।

কমরেড মাও সেতুং শিখিয়েছেন যে “কুন্ঠা না করে, সকলের সামনে দাঁড়িয়েই আমাদের টিকি (টেলস) কেটে ফেলতে হবে।” অহংকার বড়াই এসব একেবারে বাদ দিতে হবে।

দোষ স্বীকার করা মানে এ নয় যে আপনি নিজেকে একবারে অপদার্থ বলে মেনে নিচ্ছেন। দোষ স্বীকার করে গ্রুপের কাছে তা প্রকাশ করলে লাভই হয়, কোন ক্ষতি হয় না। এতে মান খোয়াতে তো হয়ই না, বরং ইজ্জত বাড়ে, প্রভাব বাড়ে। খোলাখুলি দোষ স্বীকার করলে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়, তাই জনগণও খোলাখুলি কথাবার্তা খুব পছন্দ করে। যে কমরেড দোষ মানেন না, সাফাই দেবার চেষ্টা করেন, তর্কের চোটে দোষটাই উড়িয়ে দিতে চান- সে কমরেডের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হচ্ছে যে তিনি জনগণের কাছ থেকে আলাদা হয়ে পড়বেন। জনগণ তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হবে, তাঁর সম্পর্কে কোন ভরসা রাখতে পারেন না, তিনিও তাদের ওপর সমস্ত প্রভাব হারিয়ে ফেলবেন।

২। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা সম্বন্ধে চটুল বা দায়িত্বহীন ভাব দেখালে চলবে না, গুরুত্ব আরোপ করে একে গ্রহণ করতে হবে। কমরেডরা যেন ‘মধ্যপন্থা’ বা দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ না করেন। প্রত্যেকে কমরেড তথা সমগ্র গ্রুপটির স্বার্থ আমাদের মনে রাখতে হবে, কারণ যে কমরেডের ত্রুটি আছে, যিনি দোষ করেন তিনি বিপ্লবী লক্ষ্যের পক্ষে ক্ষতিকর- তাঁর সম্বন্ধে তাই সকলকেই মাথা ঘামাতে হবে। “পরের দোষ নিয়ে আমার মাথা ব্যাথার কি দরকার”- এ মনোভাব ভুল। একজনের দোষে বিপ্লবী লক্ষ্যের ক্ষতি হয়, গ্রুপেরও ক্ষতি  হয়।

কমরেডদের আত্ম-সমালোচনা গড়ে তুলতে হবে এবং  গ্রুপের সমালোচনায় কান দিতে হবে। নিজের দোষ আর পরের দোষ-এর মধ্যে তফাৎ করা কমরেডদেও উচিৎ নয়। অন্য কমরেডদের দোষ দেখে চোখ বুজে থাকলে সেই কমরেডদেরই সর্বনাশ করা হয়। আবার নিজের দোষ হাল্কা করে দেখার মানে মতাদর্শের দিক থেকে আত্মহত্যা করা।

দোষ সহ্য করা বা দোষের সাফাই দেওয়া মানে দোষ আরও বাড়ানো, গায়ে পড়ে দোষগুলিকে বাড়িয়ে তোলা।

৩। পথনির্দেশের নীতিটি কমরেডদের অটলভাবে ধরে রাখতে হবে, কোন্টা ভুল আর কোন্টা ঠিক তা বুঝে নিতে হবে, সমালোচনা করতে হবে পথনির্দেশের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশী মতো করলে চলবে না। পথনির্দেশক নীতিটা কি? শ্রমিক শ্রেণীর ব্যাপক স্বার্থ আমাদের পথনির্দেশক নীতি, পার্টির নীতি, পর্টির বিভিন্ন লক্ষ্য ও পার্টির লাইন, জনসাধারণের কল্যাণ- এই আমাদের শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশক নীতি।

এই নীতি দৃঢ়ভাবে তুলে ধরলে আমরা সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা থেকে লাভবান হতে পারি। শুধু এই পথেই আমাদের নানান সমস্যার সঠিক সমাধান পাওয়া যেতে পারে।

তুচ্ছ, দৈনন্দিন যে সব জিনিসের সঙ্গে নীতির সম্বন্ধ নেই, যেমন “অমুক দিনে চারবার দাঁত মাজে” ‘মেয়ে কমরেডদের চুল বাঁধার কায়দা’ “অমুক বড্ড জোরে হাসে,” এসব জিনিস গ্রুপের সমালোচনার যোগ্য নয়, এ সব জিনিসকে নীতির পর্যায়ে তোলার দরকার নেই।

৪। কোন কমরেড সমালোচনা করার সময় প্রথমে তাঁর সদ্-গুণের কথা বলে তারপর তার ভুলত্রুটির কথা বলা উচিৎ। এভাবে বললে তবেই আমরা তাঁকে সমালোচনা করার মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারব, তবেই তিনি খুশী মনে আমদের সমালোচনা গ্রহণ করবেন, সমালোচনার উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হবে। কোন কমরেডের বেলায় যদি শুধু তাঁর দোষ নিয়েই পড়া যায়, তাঁর গুণগুলি নাকচ বা অস্বীকার করে দেওয়া হয়, দেখানো হয় যে কমরেডটি একদম বাজে তাহলে প্রথমতঃ সে কমরেডের পক্ষে কোন সমালোচনা মেনে নেওয়া মুশকিল হয়; দ্বিতীয়তঃ তাঁর মনে হয় যে তাঁর কোণ গুণ নেই, একেবারেই তিনি অপদার্থ- সুতরাং তিনি হতাশ বা নৈরাশ্যবাদী হয়ে পড়েন। অবশ্যি কোন কমরেডের সমালোচনা করার আগে প্রত্যেকবারই যে তার গুণের তালিকা দাখিল করতে হবে তা নয়। কথাটা হচ্ছে এই যে, কারও সমালোচনার সময় মনে রাখা দরকার যে তাঁর কতগুলি সদ্গুণও আছে।

যে সব কমরেডের অপেক্ষাকৃত বেশী দোষত্রুটি আছে শুধু তাঁদের ক্ষেত্রেই সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা যেন সীমাবদ্ধ না থাকে, এটা বুঝা দরকার। কোন কোন ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ভাল কমরেডের সমালোচনা প্রায় হয়ই না। এর একমাত্র ফল হচ্ছে সে কমরেডটি অহংকারী ও আত্মসন্তুষ্ট হয়ে দাঁড়াবেন। তিনি যাতে উন্নতির পথে এগিয়ে চলেন সেজন্য তাঁকে জাগিয়ে তুলতে হবে, মাঝে মাঝে সাবধান করতে হবে, এতে আমাদের অবহেলা করা চলবে না। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা এমনই জিনিস যে প্রত্যেককেই এতে অংশ নিতে হবে, এর কোন ব্যতিক্রম নেই।

৫। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনা করার সময় কমরেডদের আবেগ বাদ দিয়ে বস্তুগত ভিত্তির (অবজেকটিভ) ওপর দাঁড়াতে হবে। তাঁদের সহৃদয়, যুক্তিপূর্ণ ও বিশ্লেষণপরায়ণ হতে হবে। এরাপাথারি গালা-গালির প্রয়োজন নাই। ‘টুপির মাপ ঠিক হলে তবেই মাথায় লাগবে- এই কথাটা খুব জুরুরী। কোন কোন কমরেডের আবেগের প্রাবল্য বড় বেশী, কল্পনার লাগাম ছেড়ে দিয়ে তাঁরা একবারে “কথার ঝড় বইয়ে দেন”। নানান ধরনের ‘বাদ’-এর অপরাধে তারা আসামীকে অপরাধী সাব্যস্ত করেন। তথ্য সম্বন্ধে যদি যথেষ্ট জ্ঞান না থাকে, যদি শুধু আবেগই থাকে তো তার ফলে আসে আত্মগত বিচার আর সংকীর্ণচিত্ততা। পাতি-বুর্জোয়া পরিবেশ থেকে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের দৃষ্টি প্রায়ই সংকীর্ণ হয়ে থাকে। কোন লোক বা কোন বিষয়ের সমালোচনা করতে গেলে ভুলটার জড় কোথায়, সেটা কিভাবে বেড়ে উঠল তা পরীক্ষা করা খুবই দরকার। কোন্টা দরকারী আর কোন্টা নয়, কোন্টা ইচ্ছাকৃত কোন্টা অনিচ্ছাকৃত, তা বুঝে নিতেই হবে। যদি তথ্য থেকে সত্য খুঁজে বার করি, বস্তুগতভাবে প্রতিটি প্রশ্ন বিচার ও বিশ্লেষণ করি, তবেই আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি যে আমাদের সমালোচনা বিনাশর্তে প্রফুল্ল মনে গৃহীত হবে।

সঙ্গে সঙ্গে কমরেডটিকে উন্নতির পথও দেখিয়ে দেওয়া উচিত। যতখানি সম্ভব তাঁর ভুল শোধরানোর পথ বাতলাতে হবে। কারণ সমালোচনা তো শুধু ধ্বংসই করে না, গঠনও করে। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে পাতি-বুর্জোয়া, বুর্জোয়া আর সামন্তবাদী মতাদর্শের জায়গায় সর্বহারা মতাদর্শ কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।

৬। রোগীর প্রতি ডাক্তারের মনোভাব যে রকম, কমরেডদের প্রতি আমাদের মনোভাবও সেই রকম হওয়া উচিত। সমালোচনা করতে হবে সহৃদয়ভাবে, এমনভাবে যাতে কমরেডটি তাঁর ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য পান। কোন অবাঞ্ছিত ব্যাপারের বা কোন কমরেডের সমালোচনার উদ্দেশ্য হল কমরেডটির দোষ সংশোধন করা, কাজের উন্নতি করা। কমরেডটি তো আমাদের শত্রু নন, শত্রু হল তাঁর ভ্রান্ত  মতাদর্শ। তারা মতাদর্শের এই ভ্রান্ত অংশটুকুই আমরা নষ্ট করতে চাই, তার গোটা মতাদর্শ তো আর নষ্ট করতে চাইনে! এই ভাবেই শুধু আমরা কমরেডটিকে তাঁর ত্রুটি সংশোধন করতে, সদ্গুণগুলি বাড়িয়ে তুলতে উৎসাহিত করতে পারি।

৭। আত্ম-সমালোচনার জন্যে কমরেডদের নির্ভীক মনোভাব দরকার। মতাদর্শের রণক্ষেত্রে চূড়ান্ত জয়ের জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হবে।

অপরকে সমালোচনা করতে গেলে যেমন সাহস চাই, নিজেকে করতে গেলেও তেমনি সাহস চাই। যখন সত্যই যুদ্ধ চলে, তখন অনেক কমরেড নির্ভয়ে শত্রুর সাথে সংঘর্ষে নামেন। প্রাণ দিতে, রক্ত ঢালতে তাঁদের দ্বিধা নেই। কিন্তু আত্ম-সমালোচনার অস্ত্র দিয়ে মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ে নামার যখন সময় আসে তখন তাঁরা ঘাবড়ে যান। অত্যন্ত প্রতিক‚ল অবস্থায়ও এঁরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন, কিন্তু আত্ম-সমালোচনার সামান্য অসুবিধা তাদের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে।

কোন কোন কমরেড সবসময়ই আগে দাঁড়াতে চান, অন্যদের তাঁরা অনবরত ডাক দেন প্রতিযোগিতার জন্য। কিন্তু আত্ম-সমালোচনার বেলায় পেছনে থাকাই তারা পছন্দ করেন। সব ময়লা ঝেড়ে-মুছে সাফ করার বদলে এরা নিজের জঞ্জাল ঘরের মধ্যে রেখে দিতে চান, লোকচক্ষু থেকে আড়াল করতে চান। জঞ্জাল চোরা গুদামে রাখলেই লাভ হবে এদের ধারনা। ঘরদোর, পোশাক-আশাক সব এঁরা ঝক্ঝকে তকতকে রাখতে চান, কিন্তু মতাদর্শের জঞ্জাল ঝেঁটিয়ে সাফ করার ব্যাপারে এদের মাথা ব্যথা নেই।

কমরেডদের চেষ্টা করা দরকার যাতে মতাদর্শের যুদ্ধক্ষেত্রেও তাঁরা সবার আগে থাকতে পারেন।

৮। সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার ব্যাপারে- চরম লাইন নয় যা যথাযথ তা সেই লাইনেই নেওয়া উচিত। পাতি-বুর্জোয়া মতাদর্শের বিরুদ্ধে পাতি-বুর্জোয়া কৌশল প্রয়োগ করা ঠিক নয়। আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মনোভাবে যতক্ষণ ভুল থাকবে ততক্ষণ আমরা ভ্রান্ত মতাদর্শ নিঃশেষ করতে পারব না।

ব্যক্তিগত অন্ধ সংস্কারের ভিত্তিতে কমরেডদের সমালোচনা করা ঠিক নয়। এইভাবে যদি আমরা দোষ দিয়েই দোষের বিরুদ্ধে লড়তে যাই তবে তার ফলে শুধু গোলমালই বাড়বে, দোষের বোঝা বাড়তে থাকবে, কোন্টা ভুল আর কোন্টা ঠিক তার হদিস পাওয়া যাবে না। তাই দোষের সঙ্গে আপোষ করার মতবাদের যেমন আমরা বিরোধিতা করি, তেমনি চরম পন্থারও (এক্সষ্ট্রিমিজম) আমরা বিরোধী।

কমরেডরা কেউ কেউ ভাবেন “সংগ্রামের জ্ঞান”(সেন্স অব ষ্ট্রাগ্ল) দেখাবার জন্যে তাঁদের বুঝি হিংস্র মূর্তি ধরে লোককে ভয় দেখাতে হবে। কিন্তু আস্তিন গুটিয়ে দাঁত কিড়মিড় করা, চেঁচিয়ে শাপান্ত করা এ সব একদম ভুল। যাঁরা অনভিজ্ঞ তাঁরা এতে ভয় পেতে পারেন, কিন্তু তাঁরাও এমন হতভম্ব হয়ে যাবেন যে, আপনারা সমালোচনা ধরতেই পারবেন না। আর অভিজ্ঞ কমরেডরা এসব গ্রাহ্যই করবেন না, তাঁরা জানেন আপনি যতই “চেঁচান না কেন লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন না”।

নিশ্চয়ই সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার ভিত্তি হতে হবে বিচার-বুদ্ধি; এর মধ্যে অবশ্যই বস্তু থাকা চাই, নিদের্শক নীতি থাকা চাই। সমালোচনা করার সময় গুরুত্ব দিয়ে কথা বলতে হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু সাবধান! মতাদর্শের লড়াইয়ে ঘুঁষাঘুঁষি করে কাজ হয় না।

 

লেখাটির পিডিএফ সংগ্রহ করতে নীচে ক্লিক করুন –

আত্ম-সমালোচনার বিভিন্ন সমস্যা

Advertisements

ভারতবর্ষে জমি-সম্পর্কের ইতিহাস প্রসঙ্গে -কার্ল মার্কস

karl-marx-wikimedia-commons

 লেখাটি পড়তে বা ডাউনলোড করতে নীচে ক্লিক করুন

ভারতবর্ষে জমি-সম্পর্কের ইতিহাস প্রসঙ্গে


পুঁজিবাদ যেভাবে আমাদের মেরে ফেলছে -বেলেন ফার্নান্দেজ

maxresdefault

বেশ কয়েক বছর আমি আর আমার এক বন্ধু ভেনেজুয়েলায় ছিলাম। সেখানে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চিরশত্রু বলে পরিচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকগুলোতে আমার বিনা মূল্যে যে চিকিৎসাসেবা নিয়েছি, তা ভুলবার নয়। আমার দেশ আমেরিকায় আমি বিনা মূল্যে এমন উন্নত চিকিৎসাসেবা কল্পনাও করতে পারি না। এর কারণ হলো, পুঁজিবাদের ধ্বজাধারী আমেরিকা যুদ্ধ বাধানো এবং করপোরেট মুনাফা অর্জনের পেছনে এত বেশি সময় দেয় যে মৌলিক মানবাধিকার নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় সে পায় না। ভেনেজুয়েলার একটি ক্লিনিকের একজন নারী চিকিৎসক আমাকে বলছিলেন, বিশ্বের যেখানেই যুদ্ধ সেখানেই মার্কিন সেনাবাহিনীর দেখা পাওয়া যাবে। আর সেসব যুদ্ধবিধ্বস্ত জায়গায় কিউবার লোকও থাকে। তবে তারা সেনা নন, তাঁরা চিকিৎসক।

২০১৭ সালে জাতিসংঘের তীব্র দারিদ্র্য ও মানবাধিকার বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার  একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, চীন, সৌদি আরব, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স ও জাপান সম্মিলিতভাবে জাতীয় নিরাপত্তা খাতে যত অর্থ ব্যয় করে, তার চেয়ে বেশি ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী উন্নত বিশ্বের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ওই সময় বিশদ তথ্য দিয়ে একটি প্রতিবেদন পেশ করেছিলেন। সেখানে তিনি আমেরিকার সমাজব্যবস্থাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে অসম সমাজ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আমেরিকায় অন্তত চার কোটি মানুষ দরিদ্র। সেখানে মৃত্যুহার বাড়ছে এবং সামাজিক অস্থিরতা ও নেশার কবলে পড়ে বহু পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, এই সবকিছুর পেছনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা একটি বড় ভূমিকা রাখছে।

আমেরিকান সমাজে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক। এই সমাজের একটি বিরাট অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। অর্থ আর মুনাফা অর্জনের সীমাহীন নেশা এখানকার মানুষের জীবনকে এতটাই অস্থির করে তুলছে যে বহু মানুষের পক্ষে আক্ষরিক অর্থেই এই সমাজ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর ২০১৮ সালের জরিপে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার এই অস্থির ও নির্বান্ধব জীবনকে মেনে নিতে না পারায় সমগ্র দেশের মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নব্য উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষ অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্রমাগত একা হয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক বন্ধন ছুটে যাচ্ছে। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এই নিষ্ঠুর নিঃসঙ্গতা মানুষের জীবনে হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষ ভোগবাদী জীবনের অস্থিরতার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিষণ্নতা থেকে আরোগ্যলাভের জন্য সেখানে ‘বিষমিশ্রিত’ বিশাল বিশাল ওষুধ কোম্পানি খোলা হচ্ছে। ওষুধ কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ডলারের মুনাফা তুলে নিলেও দিন শেষে বিষণ্ন মানুষগুলোর জীবনে প্রাণখোলা হাসি–আনন্দ আসছে না।

মার্কিন পুঁজিবাদ শুধু যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বা আশপাশের দেশের মানুষের পারিবারিক বা সামাজিক বন্ধনের জন্য হুমকি, তা নয়। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও ভোগবাদী সমাজ সম্প্রসারণের কারণে পণ্যের অতি ব্যবহার, অপব্যবহার ও বিষক্রিয়া বাড়ছে। এটি গোটা পৃথিবীকে এমন এক ধ্বংসের জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব হবে না। ১৯৮৯ সালের আগে মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল সুইজি বলেছিলেন, অধিক ভোগ ও উৎপাদন প্রবণতার কারণে গ্রিনহাউস ইফেক্ট বা কার্বন নিঃসরণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে। পুঁজিবাদ যত বেশি বিকশিত হবে, এই ধারা তত বাড়তে থাকবে। ক্রমেই পৃথিবী ধ্বংসের দিকে যেতে থাকবে।

 এক্সট্রিম সিটিজ: দ্য পেরিল অ্যান্ড প্রমিজ অব আরবান লাইফ ইন দ্য এজ অব ক্লাইমেট চেঞ্জবইয়ের লেখক অ্যাশলে ডওসোন গত ডিসেম্বরে ভারসো বুকস ওয়েবসাইটে লেখা একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘উগ্র পুঁজিবাদ’ এবং ‘পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভকে অপরাধ সাব্যস্ত করার চেষ্টা’ দিয়ে গোটা বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। অ্যাশলে ডওসোন বলছেন, ট্রাম্প নিজেও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন। এ থেকে তিনি বের হতে পারবেন না। আমেরিকাও বের হতে পারবে না।

পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে এই ধনতান্ত্রিক অস্থির সমাজকে ভাঙতেই হবে। বিশ্বকে জাগতেই হবে।

সূত্রঃ আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত

বেলেন ফার্নান্দেজ- মার্কিন লেখক ও গবেষক

prothomalo.com


জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতা-কর্মীদের জীবনাচরণ প্রসঙ্গে -কমরেড হেমন্ত সরকার

49135321_740783072966592_7648877497618006016_n

 প্রয়াত প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা হেমন্ত সরকার দক্ষ সংগঠকই শুধু ছিলেন না, তিনি অবসর সময়ে লেখালেখিও করতেন। তাঁর এই লেখাটি শ্রুতি লিখনের সাহায্যে লিখিত। ২৮শে ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে এই মূল্যবান রচনাটি প্রকাশিত হল।

সাধারন মানুষ সম্পর্কে ব্যাপক শিক্ষিত সুধীজনদের একটি বদ্ধমুল ধারণা বহু কাল ধরে চালু আছে। আর তা হল, এই সাধারণ মানুষ মূর্খ, অশিক্ষিত, অলস, জীবন-জগত, সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্কে ওরা কিছুই ভালো করে বোঝে না। ওদেরকে যে দিকে চালানো যায় সে দিকেই ছোটে। গত একশ’ বছরে লেখাপড়া জানা সাফ-কাপুড়ে অধিকাংশ শিক্ষিত ভদ্রলোকদের এই নাক উঁচু ধারণার উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন হয়েছে বলে বাস্তবে দেখা যায় না। শাসক-শোষক গোষ্ঠীর নানা বর্ণের নানা রঙের প্রায় দেড় শতাধিক রাজনৈতিক দল এদেশে তাদের ঘুনে-ধরা সমাজ-রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্বে সদা তৎপর, সাধারণ মানুষ সম্পর্কে তাদের ধারণা ও আচার-আচরণ ঐ সুধীজনদের চেয়ে ভিন্ন নয়। সাধারণের সঙ্গে তাদের আচরণ সব সময়ই হয় প্রভুত্বমূলক। নিজেদেরকে তারা জনগণের মাস্টার ভাবে। জনগণের চিন্তা-চেতনা আর সৃষ্টিশীলতার ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা-বিশ্বাস-ভরসা এদের নেই (আর তার প্রয়োজনও করে না)। একমাত্র ভোটার হিসাবে এদের কাছে জনসাধারণের মূল্য অসীম, দেবতা-তুল্য!

এ হলো দেশের শিক্ষিত সুধীজনদের একাংশ আর শোষক-শাসক গোষ্ঠীর জনসাধারণের প্রতি মনোভাব। কিন্তু নিজেদেরকে যাঁরা জনগণের প্রকৃত বন্ধু মনে করেন, জনগণকে তাঁরা কিভাবে দেখবেন কি ধরণের আচরণ করবেন সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন। যাঁরা প্রগতিশীল তাঁরা সমাজ পরিবর্তনের ধারাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেন। সমাজের পরিবর্তন ঘটে কেন? শোষক ও শোষিতের মধ্যকার শ্রেণী সংগ্রাম সমাজকে পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে নেয় বলে প্রগতিপন্থীরা শোষিত শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং শ্রমজীবী মানুষের সৃষ্টিশীলতা, কর্মদক্ষতায় আস্থা স্থাপন আর ইতিহাসের নায়ক হিসাবে স্বীকার করা। একজন দু’জন করে সবাইকে শ্রমজীবী মাসুষের ভাবাদর্শে দীক্ষিত করা। সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর প্রতি প্রগতিধারার নেতা-কর্মীদের প্রাথমিক কাজ হবে নিজের পরিবারের সদস্যদের সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের আর্থিক বিষয়, কুশল ও সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে নিয়মিত আন্তরিকভাবে খোঁজ-খবর নেয়া। অর্থাৎ তাদের পরিবারের একজন হিসাবে নিজেকে ভাবা। এক সময় ছিল যখন প্রগতিশীল কর্মীদের মধ্যে কৃষক-শ্রমিকসহ ব্যাপক জনসাধারণের সঙ্গে মেলামেশার, তাদের সঙ্গে একাত্ম হবার বিপুল আগ্রহ লক্ষ্য করা যেত। দেখা যেত তাঁরা জনগণের মধ্যে শ্রেণীঘৃণা ও শ্রেণীস্বার্থের চেতনা জাগাবার জন্য বিশেষভাবে সচেষ্ট। জনগণের মধ্যে শ্রেণীচেতনা সৃষ্টি হবার ফলে তাদের কাছে শত্রু-মিত্র সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হত, সংঘশক্তির প্রয়োজন তারা অনুভব করত এবং জনসাধারণের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার জন্য এগিয়ে আসার আগ্রহও লক্ষ্য করা যেত। জনগণের আপনজন হবার জন্য কর্মীদের মধ্যে চলত নীরব প্রতিযোগিতা। জনগণ ও নেতা-কর্মীদের মধ্যে গড়ে উঠত ত্যাগের মনোভাব। সে সময় জনগণের প্রতি নেতা-কর্মী-সংগঠনের মনোভাব ছিল পরম শ্রদ্ধার। জনগণের প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধ, কর্তব্যবোধ, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কর্মীদের নিবেদিতপ্রাণ করে তুলত। জনগণের সঙ্গে একাত্ম হবার জন্য এবং তাদের সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করে তোলার জন্য খাল-পুকুর খনন, রাস্তা-ঘাট সংস্কার, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, তাদের অক্ষর জ্ঞানদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেখা যেত।

জনগণের শ্রেণী সচেতন করার জন্য তাদের মধ্যে র্সংগঠন গড়ে তোলার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রায়ই শ্রমিক বস্তি আর সাধারণ ভূমিহীন, গরীব ও মাঝারি কৃষকদের বাড়িতে যেত ও থাকতে দেখা যেত। সে সময় তারা বাড়িতে সকল সদস্যের সঙ্গে সংসারের সব খুঁটি-নাটি অভাব-অভিযোগ, সমস্যা-সংকট সম্পর্কে আলোচনা করতেন। অভাব-অভিযোগের মৌলিক কারণ নিয়ে আলোচনা করতেন। সুন্দর মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে সকলের মন জয় করে নিতে চেষ্টা করতেন। এ সময় হিন্দু-মুসলমান পরিবারগুলোর মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা সৃষ্টির জন্য ধারাবাহিক আদর্শিক সংগ্রাম চলত। সহজভাবে সংগঠনের উদ্দেশ্য-আদর্শ ব্যাখ্যা করার ফলে সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কি বলতে চায় এবং কি তাদের করণীয়- জনগণের কাছে অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠত। সে সময় শ্রমিক বস্তিতে আর গ্রামে গ্রামে নিয়মিত গ্রুপ বৈঠক, পাড়া বৈঠক, গ্রাম বৈঠক হত। এ সব বৈঠক গণসংগ্রাম, গণআন্দোলন আর গণসংগঠন সম্পর্কে, দেশের ও বিশ্বের রাজনীতি সম্পর্কে শ্রমিক-কৃষকদের প্রশিক্ষণের কাজ করত। জনসাধারণের সঙ্গে এসব বৈঠকের ফলে নেতা-কর্মীরাও অর্জন করতেন জ্ঞান, অনুভব করতে পারতেন জনগণের মনোভাব ও সংগ্রামী উত্তাপ-যা উদ্দীপ্ত করে তুলত কর্মী ও জনগণ উভয়কেই।

প্রগতিশীল সংগঠনের কর্মী রিক্রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এ সময় সংগঠনে কর্মী রিক্রুট করা হত খুবই সতর্কভাবে ও বিচার-বিবেচনা করে। হুট করে কাউকে কর্মী হিসাবে গ্রহণ করা হত না। নতুন কর্মীর শ্রেণী অবস্থান, তার স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেওয়া হত এবং অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টিতে তাদের কাজ-কর্মের তদারক করা হত। একই সঙ্গে আদর্শ সংগ্রামী মনোভা, সংগঠন, সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা, জনগণ ও জনগণের শত্র“-মিত্র সম্পর্কে তাদের ধারণার স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তা যাচাই করা হত। কাজেই খেটে খাওয়া মানুষের জন্য শোষনহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দর্শন যিনি গ্রহণ করবেন তাঁকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে অবশ্যই সমষ্টিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্ম-বর্ণ গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের ধারণার বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। তাকে অবশ্যই বিনয়ী ও সৎ মনোবৃত্তি রূপে গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক কর্মী পার্টি-সংগঠনকে একটি পরিবার হিসাবে দেখবেন। পার্টি-সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তাকে চোখের মণির মত রক্ষা করবেন। পার্টির সিদ্ধান্ত কার্যকরী করতে ব্যর্থ হলে অথবা কোন ভূল করলে সে জন্য সংগঠনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মনে করতে হবে দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য আমি জনগণের কাছে আসামী হয়ে গিয়েছি। শ্রমিকশ্রেণী ছাড়া অন্যান্য শ্রেণী থেকে আসা কর্মীদের সর্বাগ্রে শ্রেণীচ্যুত হওয়া ও সর্বহারা শ্রেণীর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী অর্জনের জন্য আত্মগত সংগ্রাম চালাতে হবে। অর্থাৎ তাকে সবার আগে লড়তে হবে নিজের অ-সর্বহারা শ্রেণী চরিত্রের বিরুদ্ধে। শোষকের বিরুদ্ধে শ্রেণী ঘৃণাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।

বর্তমান শ্রেণী বিভক্ত সমাজে শ্রেণীচ্যুত হওয়ার কাজটি একটি খুবই জরুরী সমস্যা। সমালোচনা-আত্মসমালোচনার যে হাতিয়ার মার্কসবাদীদের আছে তা সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করতে হবে। নিজের রূপান্তর ঘটাতে হবে। প্রতিটি মানুষের ত্র“টি-বিচ্যুতি আছে। পচা-গলা এ সমাজে জন্ম ও বেড়ে ওঠায় ত্র“টির পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে গভীরভাবে সমালোচনা-আত্মসমালোচনার অস্ত্রটিকে রপ্ত ও ব্যবহার করতে শিখতে হবে। প্রত্যেক কর্মীকে কোন না কোন কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত থাকা ও কমিটির বৈঠকে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে হবে। কোন কারণে উপস্থিত না হতে পারলে চিঠি লিখে বৈঠকের পূর্বেই সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেবার তাড়না অনুভব করতে হবে। প্রতি বৈঠকে লিখিত রিপোর্ট উপস্থিত করা জরুরী কর্তব্য। তবে কখনোই রিপোর্টে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা তথ্য উপস্থিত করা যাবে না। কমিটির সকল সদস্যকে আপন করে নিতে হবে। তাদের ভুল-ত্র“টি ধরা পড়লে গঠনমূলকভাবে সমালোচনা করে ত্র“টি শোধরাতে সাহায্য করতে হবে। সহকর্মীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ, চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করার অভ্যাস পরিহার করতে হবে। সহকর্মীদের রক্ষার জন্য জীবনও দিতে হতে পারে- এ মনোভাব মনে প্রাণে লালন করতে হবে। সহকর্মী যাতে কোন বিপদে না পড়ে সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রত্যেক সহকর্মীকে নিজের অঙ্গ মনে করতে হবে। মনে করতে হবে সে যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, অধঃপতিত হয় তাহলে যেন নিজেরই অঙ্গহানি ঘটছে।

প্রত্যেক কর্মীকে কৃষক-শ্রমিক ও অন্যান্য পেশার মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে পুংখানুপুংখভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তারা কি উদ্দেশ্যে নেতা-কর্মীদের প্রতি সদয় আচরণ করছে তা উপলব্ধি করতে হবে। অবশ্যই জনগণের প্রতি গভীর আস্থা রাখতে হবে। তবে তাদের সবার কথাকেই সরলভাবে বিশ্বাস করে সামাজিক দলাদলি আর কোন্দলে পার্টি সংগঠনকে জড়ানো চলবে না। জনগণের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি, জোর করে চাঁদা আদায় বা কোন সম্পদ হস্তগত করা নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। সামাজিক প্রতিপত্তি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি সুবিধা গড়ে তোলার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। মিথ্যা বলা যাবে না, কোন অন্যায় করা চলবে না। যদি তা করেও ফেলেন এবং তা বুঝতে পারার সাথে সাথে খোলাখুলি ভুল স্বীকার করা উচিত।

মাদকসেবী, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী, খুনী, মামলাবাজ, টাউট, দুর্ণীতিবাজ মাতব্বর ইত্যাদি লোকদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে এবং কৃষক-শ্রমিকদের সংকীর্ণ স্বার্থবোধ দ্বারা নিজেকে চালিত করা যাবে না। মনে রাখতে হবে সামন্ত প্রথায় তাদের জীবনে সংকীর্ণ স্বার্থপরতা ও নিজেদের শক্তির উপর আস্থা-বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে। তাদের আত্মবিশ্বাসকে জাগিয়ে তোলায় সচেষ্ট হতে হবে।

সর্বোপরি সারাদিনের কাজের পর প্রতিদিন গভীরভাবে আত্মবিশ্লেষণ করা উচিত। সারাদিন কয়টি কাজ বাস্তবায়িত হলো, কয়টি হয়নি, কোন কাজটি সঠিক হলো, কোনটি হয়নি, এজন্য কি করা প্রয়োজন ছিল-এভাবে নিজের দায়বদ্ধতার কাছে, রাজনৈতিক সচেতনতার কাছে জবাবদিহিতা বিশ্লেষণ করা। মনে রাখা প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ এই পদ্ধতি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে একজন নেতা বা কর্মী ধীরে ধীরে আত্মআবিষ্কার করা শেখে, তার উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল ক্ষমতা বেড়ে যায়, মধ্যবিত্ত নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য- যেমন ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখা, আমলাতান্ত্রিকতা, নিজেকে জাহির করা, সংকীর্ণতা, হিংসা-বিদ্বেষ, অপরের ছিদ্রান্বেষণ, চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করা, সংগঠনকে কুক্ষিগত করা ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এক নতুন মানুষে রূপান্তরিত হন। এ ধরণের নেতা কর্মীদের দ্বারাই রাশিয়ার যুগান্তকারী বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল, বাংলাদেশে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করতে হলে শ্রমিক শ্রেণীর চিরকালীন আদর্শকেই অনুসরণ করতে হবে।

সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা’র ১৭ জানুয়ারী ১৯৯৯ রবিবার ১৮ বর্ষ ২১ সংখ্যা


মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা

29C1CD9A00000578-3130307-image-m-5_1434660552551

মস্কো শহরে আমদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক নিখিল রাশিয়া শ্রমিক নারী ও কিষাণদের কংগ্রেস আহ্বানের পর পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে। দশ লক্ষ গতর খাটানো মেয়েদের এক হাজারেরও অধিক প্রতিনিধি এই কংগ্রেসে সমবেত হয়েছিল। মেহনতকারী মেয়েদের মধ্যে আমাদের পার্টির কর্ম তৎপরতায় এই কংগ্রেস নতুন যুগের সূচনা করে। আমাদের রিপাবলিকের শ্রমিক নারী ও কিষাণ মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করে কংগ্রেস অপরিমেয় কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। অনেকে মনে করতে পারেন, এ আর কি ব্যাপার? কারণ পার্টি নারীসহ জনসাধারণের মধ্যে সবসময়েই রাজনৈতিক শিক্ষা বিস্তার করে এসেছে। আবার অনেকে এমনও ভাবতে পারেন, মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার এমন কি গুরুত্ব থাকতে পারে; কারণ শীঘ্রই আমাদের মধ্যে শ্রমিক ও কিষাণদের সমবেত কর্মীদলসমূহ গড়ে উঠবে। এই ধরনের মতগুলি সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত।

শ্রমিক ও কিষাণদের হাতে শাসন ক্ষমতা চলে আবার পর মেহনতকারী মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন উপস্থিত হয়েছে। আমি এর কারণটা দেখাতে চেষ্টা করছি। আমাদের দেশের লোকসংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি; তন্মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেকই নারী। নারীদের মধ্যে অধিকাংশই অনগ্রসর, পদদলিত ও অতি অল্প রাজনৈতিক চেতনা যুক্ত শ্রমিক ও কিষাণ নারী।

আমাদের দেশ যদি রীতিমতো উৎসাহ দিয়ে নতুন সোভিয়েট জীবন গড়ে তোলার কাজ আরম্ভ করে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ইহা সুস্পষ্ট হবে যে, মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নিয়ে গঠিত এই দেশের নারীসমাজ যদি ভবিষ্যতেও অনগ্রসর, পদদলিত ও রাজনীতির দিক থেকে অজ্ঞ থেকে যায় তাহলে তারা প্রগতিমূলক যে কোন কাজকে ব্যাহত করবে না কি?

নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে একযোগে কাজ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আমাদের শিল্প সংগঠনের সার্বজনীন কাজে পুরুষদের সঙ্গে একযোগেই তারা কাজ করছে। তাদের যদি রাজনৈতিক চেতনা থাকে ও তারা রাজনৈতিক শিক্ষা পায়, তাহলে তারা এই সার্বজনীন কাজে বেশ সাহায্য করতে পারে। কিন্তু যদি তারা পদদলিত ও অনগ্রসর থেকে যায়, তাহলে নিজেদের দুষ্টবুদ্ধিবশত নয়, যেহেতু তারা অনগ্রসর সেইজন্য, এই সর্বসাধারণের কাজ পণ্ড করে ফেলতে পারে।

কিষাণ মেয়েরাও দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরুষ কৃষকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করার জন্য। পুরুষদের সঙ্গেই তারা আমাদের কৃষির উন্নতি, সাফল্য ও সমৃদ্ধি সাধন করছে। তারা যদি অনগ্রসরতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হয়, তাহলে তারা এক্ষেত্রে প্রভূত কাজ করতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত অবস্থাও ঘটতে পারে। ভবিষ্যতেও যদি তারা অশিক্ষার গোলাম থেকে যায় তাহলে তারা কাজের বাধাস্বরূপ হয়ে পড়তে পারে।

পুরুষ শ্রমিক ও কিষাণ পুরুষদের মত নারী শ্রমিক ও কিষাণ নারীরা সমান অধিকারপ্রাপ্ত স্বাধীন নাগরিক। মেয়েরা আমাদের সোভিয়েট ও সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহ নির্বাচন করে এবং এইগুলোয় নিজেরা নির্বাচিত হতে পারে। নারী শ্রমিক ও কিষাণ মেয়েরা যদি রাজনৈতিক জ্ঞানযুক্ত হয় তাহলে তারা আমাদের সোভিয়েট ও সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহে সংস্কার সাধন এবং ঐগুলোর শক্তি ও আয়তন বাড়াতে পারে। কিন্তু তারা যদি অনগ্রসর ও অজ্ঞ থেকে যায় তাহলে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, পণ্ড করে ফেলতে পারে।

চরম কথা হচ্ছে এই যে, শ্রমিক নারী ও কিষাণ নারীরা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের জননী আর তাদেরকে মানুষ করার দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত রয়েছে। তারা হতাশার মনোবৃত্তি জুগিয়ে শিশুদের খর্বতা সাধনও করতে পারে, আবার তাদের মনকে সতেজ ও স্বাস্থ্যসম্পন্ন করে তাদের দ্বারা আমাদের দেশের অগ্রগতির ব্যবস্থাও করতে পারে। সোভিয়েত ব্যবস্থা সম্বন্ধে আমাদের নারী ও জননীদের সহানুভূতি আছে, না তারা পুরোহিত, ধনী চাষি ও বুর্জোয়াদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে, এই সমস্ত তারই ওপর নির্ভর করছে।

সেইজন্য শ্রমিক ও কিষাণরা যখন নতুন জীবন গড়ে তোলার দয়িত্ব গ্রহণ করেছে, সেই সময় আজ বুর্জোয়াদের ওপর প্রকৃত জয়লাভ সম্পর্কে শ্রমিক নারী ও কিষাণ মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষা সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। সেইজন্য মেহনতকারী মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক ও কিষাণ নারীদের প্রথম কংগ্রেসের মূল্য ও গুরুত্ব সত্য সত্যই অপরিমেয়।

পাঁচ বছর আগে এই কংগ্রেস নতুন সোভিয়েত জীবন গড়ে তোলা সম্পর্কে লক্ষ লক্ষ মেহনতকারী মেয়েদের টেনে আনা পার্টির চলতি কর্তব্যরূপে গণ্য হয়েছিল। এই কর্তব্যের পুরোভাগে দাঁড়িয়েছিল কারখানা অঞ্চলসমূহ থেকে আগত শ্রমিক মেয়েরা; কারণ মেহনতকারী মেয়েদের মধ্যে তারাই ছিল সবচেয়ে জীবন্তু চেতনাযুক্ত। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ সম্বন্ধে যে অনেক কিছু করা হয়েছে তা বেশ বলা যেতে পারে, যদিও করণীয় অনেক কিছুই এখনও পড়ে আছে।

আজ পার্টির আশু করণীয় কর্তব্য হচ্ছে আমাদের সোভিয়েত জীবন গড়ে তোলার কাজে নিযুত কিষাণ মেয়েদের টেনে আনা। 
পাঁচ বছরের কাজের ফলে কিষাণদের ভেতর থেকে বহুসংখ্যক অগ্রগামী কর্মী গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।

আশা করি নতুন নতুন রাজনৈতিক চেতনাযুক্ত কিষাণ মেয়েরা এসে অগ্রগামিনী কিষাণ নারীদের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলবে। আশা করি, আমাদের পার্টি এই সমস্যারও সমাধান করতে পারবে।

– স্ট্যালিন, প্রথম শ্রমিক ও কিষাণ নারী কংগ্রেসের পঞ্চবার্ষিকী উপলক্ষে প্রদত্ত বক্তৃতা, ১৯২৩।


কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা কমরেড অজয় ভট্টাচার্য স্মরণে

22490195_491992164512352_6170092800779996947_n

কমরেড অজয় ভট্টাচার্য বিপ্লবী, সাম্যবাদী রাজনীতিক, ইতিহাসকার, সাহিত্যিক। নানকার বিদ্রোহে (১৯৪৫-৪৮) নেতৃত্ব প্রদান এবং এর প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অবদান। ১৯১৪ সালের ১০ জানুয়ারি অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের অন্তর্গত সিলেট জেলার পঞ্চখন্ড পরগনার লাউতা গ্রামে এক সামন্ত পরিবারে অজয় ভট্টাচার্যের জন্ম। তাঁর পিতা উপেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য এবং মাতা কৃপাময়ী ভট্টাচার্য। উপেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য জমিদার সমিতির এবং সিলেট জেলা কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব ছিল অজয় ভট্টাচার্যের গোটা পরিবারে। গোপন রাজনীতির কারণে তিনি দেওয়ানভাই, কাসেম, অনিল ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। রাজনৈতিক সাহিত্য ও প্রবন্ধ রচনায় তিনি যাত্রিক, সাজ্জাদ জহির প্রভৃতি ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।

অজয় ভট্টাচার্য লাউতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা এবং লাউতা এম.ই স্কুল ও বিয়ানীবাজার হরগোবিন্দ স্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৩৯ সালে আসামের কাছাড় জেলার শিলচর গুরুচরণ কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে আই.এ পাশ করেন। তিনি ১৯৪১ সালে সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ (এম.সি)-এ বি.এ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু ছাত্র ও কৃষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় তাঁর পক্ষে পড়ালেখা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয় নি। কিশোর বয়সে অজয় ভট্টাচার্য ‘তরুণ সংঘ’ নামে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিপ্লবী সংগঠনে যোগ দেন এবং লাউতা শাখার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রাবস্থায় অজয় ভট্টাচার্য কুলাউড়া কৃষক বিদ্রোহ এবং ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৩৫-৩৬ সালে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন। ১৯৩৬ সালে সিলেটে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির শাখা গঠিত হলে তিনি পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিচালিত সর্বভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনের সুরমা উপত্যকা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কৃষক সভা কাছাড় জেলার সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৩৭ সালে অজয় ভট্টাচার্য ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪০ সাল থেকে তিনি পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে আত্মগোপনে থেকে বিপ্লবী কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। ১৯৪১ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি সিলেট জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের ডেলিগেট নির্বাচিত হন। অজয় ভট্টাচার্য সিলেটের ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী নানকার বিদ্রোহের প্রাণকেন্দ্র ছিল লাউতা বাহাদুরপুর। ১৯৪৮ সালের মে মাসে গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত লাউতা বাহাদুরপুর কেন্দ্রিক পঁয়তাল্লিশ সদস্য বিশিষ্ট নানকার আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা কমিটির সম্পাদক ছিলেন তিনি।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে তিনি মোট সাতবার কারাবন্দি হন। পাকিস্তান আমলে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ বছর জেলে কাটান। পূর্ব পাকিস্তানের নূরুল আমিন সরকার কারামুক্তির বিনিময়ে অজয় ভট্টাচার্যকে চিরতরে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যাবার প্রস্তাব দেয়। তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে তিনি কারাগারে থেকেই কমরেড আব্দুল হকের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। বিশ শতকের ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে ক্রুশ্চেভতত্ত্ব কেন্দ্রিক মহাবিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়। ১৯৬৭ সালে পার্টির চতুর্থ কংগ্রেসে গড়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) [ইপিসিপি(এম-এল)]। তিনি এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে শ্রেণিভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনা করে।
১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অজয় ভট্টাচার্য কমরেড আব্দুল হকের সাথে সমন্বিতভাবে তাঁদের ভাষায় এসব ‘শ্রেণি সমন্বয়বাদী’, ‘বিলোপবাদী’, ‘আত্মসমর্পণবাদী’, লেজুড়বৃত্তির প্রতিবিপ্লবী লাইনের বিরুদ্ধে আদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন। তবে একজন পার্টিসভ্য ও অভিজ্ঞ প্রবীণ বিপ্লবী নেতা হিসেবে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, পরামর্শ, মতামত ও সহযোগিতা দিয়ে আমৃত্যু পার্টিতে ভূমিকা পালন করেন। বিশ শতকের নববইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত রাশিয়া ও পূর্ব-ইউরোপের দেশসমূহের পতনের সময় তিনি সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি ছদ্মনাম পরিত্যাগ করে স্বনামে লিখতে শুরু করেন।
ব্রিটিশ আমলে সিলেট থেকে প্রকাশিত ও জ্যোতির্ময় নন্দী সম্পাদিত সাপ্তাহিক নয়া দুনিয়া, সংহতি এবং কালিপ্রসন্ন দাস সম্পাদিত মাসিক বলাকা পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর লেখক জীবনের সূত্রপাত হলেও দীর্ঘ কারাজীবনই তাঁর লেখক জীবনের রচনাস্থল। এক্ষেত্রে সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, সরদার ফজলুল করিম, আব্দুল হকের মতো সহবন্দিদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা তাঁকে কলম সৈনিকে পরিণত করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো: উপন্যাস: এঘর-ওঘর (১৯৬৮), কুলিমেম (১৯৯৫), অরণ্যানী (১৯৮৩), বাতাসির মা (১৯৮৫), রাজনগর (১৯৯৫), গল্পগ্রন্থ: নীড় (১৯৬৯), সুবল মাঝির ঘাট (১৯৯৭); ইতিহাস গ্রন্থ: নানকার বিদ্রোহ (অখন্ড ১৯৯৯), অর্ধ শতাব্দী আগে গণ আন্দোলন এদেশে কেমন ছিল (১৯৯০)। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ও অগ্রন্থিত তাঁর শতাধিক প্রবন্ধ এবং গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের পান্ডুলিপি অপ্রকাশিত অবস্থায় রয়ে গেছে। তাঁর সৃষ্টিশীল লেখায় ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে সামন্ত শোষণ এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষের জীবন সংগ্রামের কথা প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁর নানকারবিষয়ক দুটি গ্রন্থ এদেশের কৃষক-আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক দলিল।

১৯৯৯ সালের ১৩ অক্টোবর ৮৫ বছর বয়সে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


পুঁজিবাদী সঙ্কটের আর এক নাম বিশ্ব(বাণিজ্য)যুদ্ধ

p8-eichengreen-a-20180412-870x593

বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পুঁজিবাদী চীনের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে যুদ্ধ ক্রমাগত মীমাংসার অতীত পর্যায়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই বাণিজ্য যুদ্ধ শুধু সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন য্ক্তুরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে এমন নয়, এই যুদ্ধ প্রধান প্রধান অর্থনেতিক শক্তি ছাড়াও কানাডা, মেক্সিকো, ভারত প্রভৃতি দেশের সাথেও বিস্তৃত হচ্ছে। এছাড়াও রাজনৈতিক কারণে রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরানসহ কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক অবরোধ সৃষ্টি করে রেখেছে। এ সকল ঘটনা ২০০৮ সালের পূর্ব হতে সূচিত বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান মন্দা এই সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত হয়ে জটিল ও বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সম্প্রতি শুরু হওয়া এই বাণিজ্য যুদ্ধ নতুন ও হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে এমন নয়, পুঁজিবাদের অসম বিকাশের বৈশিষ্ট্যই পুঁজিবাদী সাম্রাজবাদী দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হওয়া অনিবার্য। “বিশ্বপুঁজিবাদের উৎপাদন ও বাণিজ্য বৃদ্ধির সবচেয়ে বিশিষ্ট লক্ষণ হলো এই যে, সেই বিকাশ এগিয়ে চলে অসমভাবে। বিকাশটা এইভাবে হয় না যে, পুঁজিবাদী দেশগুলো কেউ কাউকে বাঁধা না দিয়ে, একে অপরকে টলিয়ে না দিয়ে স্বচ্ছন্দ ও সুষমভাবে একের পর এক সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, বরং তা এমনভাবেই হচ্ছে যে কয়েকটি দেশ হটে যাচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে, নীচে নামছে, অপরদিকে অন্যরা ধাক্কা মেরে সামনে এগোচ্ছে ও ওপরে উঠছে, এটা এগিয়ে চলেছে বাজারের আধিপত্যের জন্য ও মহাদেশগুলোর লড়াইয়ের ভেতর এক প্রাণান্তকর রূপ ধরে।” (কমঃ স্তালিন) অর্থাৎ উৎপাদন ক্ষমতার বৃদ্ধি এবং বাজারের আপেক্ষিক স্থিতিশীলতার মধ্যকার দ্বন্দ্বই হল এই ঘটনার মূলে, যে বাজারের সমস্যাটাই হল পুঁজিবাদের আজ মৌলিক সমস্যা। সাধারণভাবে বাজারের সমস্যার তীব্রতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে বৈদেশিক বাজারের সমস্যার তীব্রতা বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্টভাবে পুঁজি রপ্তানির জন্য বাজারের সমস্যার তীব্রতা বৃদ্ধি- এই হল সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্যজনিত সমস্যা।

এই ধরনের একটা পরিস্থিতিতে শুল্কপ্রাচীর গড়ে তোলা মানেই হল আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়ার নামান্তর। যার লক্ষণসমূহ প্রকাশ করে চলেছে প্রতিনিয়ত নানারূপে।

১৯৯৫ সালে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদীরা সোৎসাহে গড়ে তুলেছিল WTO বা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা- যাকে বলা হয়েছিল ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’। মার্কিন সাম্রাজ্যাবাদের লক্ষ্য ছিল একক বৃহৎ শক্তি হিসেবে এই মুক্তবাজার অর্থনীতির আড়ালে গোটা বিশ্ববাজারের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, ১৯৯০ সালে অপর পরাশক্তি সেই সময়ের সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়ন) পতন ঘটে যায়। রাশিয়ার পতনে স্বাভাবিকভাবে একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভুত হয় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। এতদসত্ত্বেও নতুন করে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল কেন?

পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী সঙ্কটের কারণে সংঘটিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে বৃহৎ উপনিবেশিক শক্তি ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঔপনিবেশিক শক্তির একচ্ছত্র অধিপতি ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের স্থলে ঔপনিবেশিক শক্তির নতুন নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভুত হয় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। অন্যদিকে হিটলারের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদ পরাস্ত হয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক দেশের শ্রমিকশ্রেণির হাতে। বিশ্বশান্তির পক্ষে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণির শ্রেষ্ঠত্ব ও শৌর্যবীর্য প্রমাণিত হয়। এর প্রভাব পড়ে বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণি, নিপীড়িত জাতি ও জনগণের ওপরে। সারা বিশ্বে জাগরণ ঘটে সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের। বিশ্ব জনগণের মুক্তি সংগ্রামের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন।

যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের হাত থেকে ইউরোপকে রক্ষা ও বিশ্ব বাণিজ্য পরিচালনার জন্য ১৯৪৭ সালে General Agreement of Trade and Tariffs (GATT) গঠন করে। এ সময়ে ব্রিটেন উডস সম্মেলনে গড়ে তোলা হয় বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল(IMF) সহ প্রস্থা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এ সকল সংস্থার ওপর কার্যত একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার নেতা হিসেবে সামনে আসে।

১৯৫৬ সালে ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে প্রতিবিপ্লবী সংশোধনবাদী শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতা দখল করে সমাজতন্ত্রের নামে পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। এরই পরিণতিতে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে- যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে আর এক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভুত হয়।

এরপর থেকেই ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজার, অর্থনীতি, ভূ-রাজনৈতিক, সামরিকসহ গোটা বিশ্বব্যবস্থায় দুই পরাশক্তির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা তীব্রতর হতে থাকে; যা ‘শীতলযুদ্ধ’ নামে পরিচিতি পায়।

আগেই বলা হয়েছে, রাশিয়ার পতনে যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একক পরাশক্তি হিসাবে তার এই অবস্থানকে সুদৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী করতে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে।

১৯৪৭ সালে গড়ে ওঠা গ্যাট বিশ্ববাণিজ্যে একচেটিয়া স্বার্থ আদায়ে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। গ্যাট দ্বারা সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে দিয়ে এর সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার ক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না।

পুঁজিবাদীরা চায় সব সময় বাজারের ‘স্থিতিশীলতা’। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ‘স্থিতিশীলতা’ হলো আপেক্ষিক। সাময়িক স্থিতিশীলতায় উৎপাদন বাড়ে, বাণিজ্য বাড়ে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে, অথচ বিশ্ববাজার, বাজারের সীমা এবং আলাদা আলাদা একক সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবাধীন এলাকা কমবেশী এক জায়গাতেই বজায় থাকে। -স্পষ্টত এটাই কিন্তু পুঁজিবাদের এক অত্যন্ত গভীর ও তীব্র সংকটের উদ্ভব ঘটায়। সে সংকট হলো, নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্বারা আকীর্ণ।

গত শতাব্দীর ৩০ এর দশকেও সাম্রাজ্যবাদী উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রযুক্তির বিকাশের কারণে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি যে হারে বাড়তে থাকে, পাশাপাশি অসম বিকাশের নিয়মে বাজারের দাবিদার বাড়তে থাকে। এর সাথে যুক্ত হতে থাকে বাজারের নতুন নতুন দাবিদার। অর্থনীতির গতি মুখ থুবড়ে পড়তে থাকে স্থবিরতায়। সংক্রামকের মতো তীব্র-তীক্ষ্ণ হয় মন্দার ছোবল, সর্বগ্রাসী এই আগ্রাসী আক্রমণে দিশেহারা অবস্থায় আত্মরক্ষার পথ খুঁজতে থাকে অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে থাকা পুঁজিবাদীরা।

বাজারের সমস্যা সমাধানে শান্তিপূর্ণ পথ পুঁজিবাদীদের সামনে রুদ্ধ হয়ে যায়।‘পুঁজিবাদের সামনে একমাত্র বেরোনোর পথ’ হলো শক্তি প্রয়োগ করে, সশস্ত্র সংঘর্ষ দিয়ে নতুন করে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মাধ্যমে বাজার ও প্রভাবাধীন এলাকা পুনর্বন্টন- যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়া।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বপরিস্থিতিতে উদ্ভুত বৈশিষ্ট্যসমূহ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ রূপ সাম্রাজ্যবাদী সংকটের ধারাবাহিকতার প্রতিফলন মাত্র। সুতরাং চলতি বাণিজ্যযুদ্ধসহ বিশ্বব্যবস্থায় সংঘটিত ঘটনাসমূহ তার থেকে ভিন্নভাবে দেখার অবকাশ আছে বলে মনে হয় না।
১৯৯০-এ রাশিয়ার পতনের মধ্য দিয়ে ‘শীতল যুদ্ধের’ অবসানের মাধ্যমে পরবর্তীতে যে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাতে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দেখা দেয় আপাত ‘স্থিতিশীলতা’। বাণিজ্য সম্প্রসারিত হতে থাকে, প্রযুক্তি ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে, কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় বাণিজ্য ও বাজার থাকে পেছনে পড়ে। পুঁজিবাদের অসম বিকাশের ধারায় শক্তি সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যে থাকে বিরাট ব্যবধান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে সামরিক ক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্রের সংযোজন এবং পরবর্তীকালে তথ্যপ্রযুক্তির সংযোজন, এই প্রযুক্তির বহুমাত্রিক ব্যবহার, উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এর গতিবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা পায়। বিশেষ করে সেবাখাত ভোগের অন্যতম প্রধানখাতে উপনীত হয়। যে হারে বাজারের গতিবেগ বৃদ্ধি করে বিপরীতে উৎপাদন বাজার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সংকটের মাত্রা আর গভীর ও নতুন পর্যায়ে উপনীত করে। ফলে উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সংকটের গভীরতার মাত্রা ও ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

প্রযুক্তির ব্যবহার কেন্দ্রিভুত হচ্ছে সামরিকীকরণে এবং পুঁজির সঞ্চালনকে শেয়ার বাজারের ফটকাবাজারিতে কেন্দ্রীভুত করা হয়। বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া পুঁজিবাদীরা এ পথেই তাদের সঙ্কট উত্তরণের পথ খোঁজে। শেয়ার বাজারগুলো বুদ্বুদের মত ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে আবার ফানুসের মতো চুপশে যায়। রেসের নেশার মতো বৃহৎ কোম্পানিগুলোর মধ্যে চলতে থাকে একত্রিকরণ(মার্জার) ও বৃহৎ একত্রিকরণের (মেগা মার্জার) প্রক্রিয়া।

ঋণগ্রহণে যুক্তরাষ্ট্র, জাপানের মতো দেশগুলো শূণ্য শুল্ক হারে নামিয়ে আনে। চাহিদার তুলনায় কৃত্রিমভাবে তেজি হয়ে উঠতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র-জাপানের হাউজিং সেক্টরগুলো। পাশাপাশি এর অধিক গতিতে শেয়ার বাজার বুদ্বুদের মত বাড়তে থাকে।

সামরিক বিনিয়োগকে চাঙ্গা রাখার জন্য যুদ্ধকে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়া হয। পূর্ব ইউরোপ ও রাশিয়ার শূণ্যস্থান পূর্ণ করার জন্য ন্যাটোকে পূর্বমুখী অভিযানে সম্পৃক্ত করার অংশ হিসাবে পুর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে ন্যাটোর আওতায় আনতে ন্যাটোকে সম্প্রসারিত করা হয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক যুদ্ধকে সম্প্রসারিত ও দীর্ঘস্থায়ী করে অস্ত্রের বাজারের কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে অস্ত্রের ব্যবসাকে চাঙ্গা করার প্রয়াস চলতে থাকে। আফ্রিকা, এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোসহ মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক যুদ্ধকে বিস্তৃত করার নগ্ন খেলায় মেতে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো, বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। এই যুদ্ধ বিস্তৃতির নগ্নরূপ প্রত্যক্ষ করা যায় ‘ইসলামি জঙ্গি’ হামলার নামে সংঘটিত নাইন ইলেভেনের ঘটনাকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে আফগানিস্তান, পরবর্তিতে মিত্রদের নিয়ে ইরাক, লিবিয়ায় প্রত্যক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে শুধু ব্যর্থই হয় না, নতুন নতুন সঙ্কটের জালে জড়িয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক ইত্যাদির ক্ষেত্রে ক্ষয়িষ্ণুতায় আক্রান্ত হতে থাকে। যা প্রাধান্যকারী শক্তি হিসাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য অস্তিত্বের সঙ্কট হিসাবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৮।।সংখ্যা-০৫, রোববার।। ২২ জুলাই ২০১৮।। ০৭ শ্রাবণ ১৪২৫ বাংলা