চারু মজুমদারের রচনা সংকলন: যে সব কমরেড গ্রামে কাজ করছেন

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

যে সব কমরেড গ্রামে কাজ করছেন

তাঁদের প্রতি

চেয়ারম্যান আমাদের শ্রেণীবিশ্লেষণ করতে বলেছেন। আমাদের কমরেডরা যাঁরা গ্রামে যাচ্ছেন তাঁরাও নিশ্চয়ই শ্রেণী বিশ্লেষণ করছেন। কিন্তু ত্রুটি যেটা হচ্ছে তা হল এই যে, শ্রেণী বিশ্লেষণ করছেন তাঁরা নিজেরা এবং মনে মনে। ফলে কৃষককর্মীরা শ্রেণী বিশ্লেষণ শিখছেন না এবং তার চেয়েও বড় কথা বিপ্লবী শ্রেণীগুলি তাদের নিজেদের দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন হচ্ছে না। কাজেই কৃষক-কর্মীদের বৈঠকে প্রথমেই আমাদের কমরেডদের দায়িত্ব হচ্ছে এক একজন কর্মীর শ্রেণীবিচার করতে হবে চেয়ারম্যানের কৃষকদের শ্রেণী বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এবং কৃষক কর্মীদের মতামত নিয়ে। এ কাজটি করা হলে তবেই আমাদের সংগঠক গণলাইন (mass line) পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবেন এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে বোঝাবেন যে তাদের পক্ষে বিপ্লব যত জরুরী অন্যদের পক্ষে তত জরুরী নয় এবং সেই জন্যই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে বেশী করে দায়িত্ব নিতে হবে বিপ্লবকে সফল করার জন্য এবং তার পরই কাজের ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে হবে। এবং পরবর্তী মিটিং-এ কাজের হিসাব-নিকাশ প্রথমে নিতে হবে এবং বারবার সচেতন করে তুলতে হবে এই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে যাতে তারা কাজের বেশী বেশী দায়িত্ব নিতে পারেন। দুই তিন মাস পর পর কাজের ভিত্তিতে আবায় বিশ্লেষণ করতে হবে। সে শ্রেণী বিশ্লেষণ হবে তিনটি ভিত্তিতে: (১) শ্রেণীভিত্তি; (২) কাজের আগ্রহ; (৩) লড়াইয়ের আগ্রহ। এই চেক আপ (Check up) এর মধ্যে দিয়েই সঠিক শ্রেণী বিচার হবে। কারণ প্রথম শ্রেণী বিশ্লেষণের সময় কৃষককর্মীরা অনেক মধ্যকৃষককে দরিদ্র কৃষকের শ্রেণীতে ফেলবেন। এই তিন নীতির ভিত্তিতে পুন:বিবেচনার সময়ই সেই ভুল বিশ্লেষণ ধরা পরবে। এ ভাবে কৃষক সংগঠকরা কাজ শুরু করলে সাধারণ কৃষককর্মীরা শ্রেণীবিশ্লেষণ করতে শিকবেন; শুধু তাই নয়, বিপ্লবী শ্রেণীগুলি তাঁদের দায়িত্ব সম্বন্ধেও সচেতন হবেন।

এভাবে কাজকে সংগঠিত করতে পারলে তবেই সমস্ত শ্রেণীকে সজাগ ও সচেতন করে তোলা যাবে এবং বিপ্লবী দায়িত্ব পালন করানো যাবে। এই তিন নীতির চেক-আপ (Check up) কৃষক জনতার মধ্যে প্রাথমিক শুদ্ধি অভিযানের (ractification campaign) কাজ করবে এবং সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম নির্দিষ্ট রূপ নেবে। এবং আমরা কৃষক নেতৃত্ব গড়ে ভুলতে পারবো। মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী কমরেডের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার উপর কৃষক আন্দোলন নির্ভরশীল থাকবে না এবং বুদ্ধিজীবী কমরেডটির একাত্ম হওয়া (integration) অনেক ত্বরান্বিত হবে। এবং যাঁরা একাত্ম হতে পারবেন না, তাঁরা সংগ্রামের পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন না। এই যুগে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী কর্মীর আমাদের খুবই দরকার, কিন্তু এটাও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, সকলেই শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী থাকবে না, বরং এ সম্ভাবনাই বেশী যে বেশীর ভাগ বুদ্ধিজীবী ক্যাডর পরবর্তী জমানায় অবিপ্লবী, এমন কি প্রতিবিপ্লবী হয়ে যাবে। এই সম্ভাবনাকে কখনোই ভুলে গেলে চলবে না। কাজেই এইসব বুদ্ধিজীবী ক্যাডাররা যদি শ্রেণী বিশ্লেষণের এই কাজ এবং চেক-আপ (Check up) একবাও করে যান, তাহলে এলাকা ঐ বুদ্ধিজীবী ক্যাডারের উপর নির্ভরশীল থাকবে না। অতএব, প্রত্যেকটি বুদ্ধিজীবী ক্যাডার তিনি কৃষকের উপর নির্ভরশীল থাকবে না। অতএব, প্রত্যেকটি বুদ্ধিজীবী ক্যাডার তিনি কৃষকের সহায়তায় যে শ্রেণীবিশ্লেষণ করবেন তার নোট রাখুন এবং ঐ নোট পাঠান। এই রিপোর্ট গুলো তদন্ত রিপোর্ট (investigation) হিসাবে সতর্কতার সঙ্গে ‘দেশব্রতীতে ছাপানো চলবে এবং সেগুলো অন্যান্য অঞ্চলের কমরেডদের সাহায্য করবে।

সংগ্রাম বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হচ্ছে, এখন আমাদের সবচেয়ে জোর দিতে হবে বিপ্লবী ক্যাডার তৈরীর কাজে। এ কাজ এখন সবচেয়ে জরুরী এবং এই কাজে আমাদের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। বিরাট সম্ভাবনা, বিরাট জয় ভারতবর্ষের মানুষের আয়ত্তের মধ্যে আসছে। কর্মীদের মন থেকে পরাজিতের (defeatist) চিন্তাধারা ঝেড়ে ফেলতে হবে। অর্থাৎ, চেয়ারম্যানের ভাষায়, “আমাদের কর্মীদের মন সর্বপ্রকারের নিস্ফল চিন্তা থেকে মুক্ত করতে হবে। শত্রুর শক্তিকে বড় করে দেখে এবং জনগণের শক্তিকে ছোট করে দেখেÑএমন সমস্ত মতই ভুল।”

আমাদের আজকের দিনের আওয়াজ, চেয়ারম্যানের ভাষায়: দৃঢ় থাক, কোনো ত্যাগকেই ভয় কোরো না এবং যুদ্ধে জেতার জন্য সমস্ত বাধা উত্তীর্ণ হও।

দেশব্রতী, ২৬ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৮

Advertisements

চারু মজুমদারের রচনা সংকলন: জনৈক কমরেডের গ্রেপ্তার প্রসংগে

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

জনৈক কমরেডের গ্রেপ্তার প্রসংগে

(দেশব্রতী’র সম্পাদক মন্ডলীর কাছে লেখা চিঠি)

প্রিয় কমরেড,

‘ষ্টেটসম্যান’-এর রিপোর্টে আমি নিজেই এত ব্যথিত (shocked) হয়েছিলাম যে আপনাদের কথা মনে করতে পারিনি। কোনো কমরেড কি আর একজন কমরেড সম্পর্কে এমন কথা বলতে পারে? দুটো কথা আমি বলেছিলাম দুটো প্রসঙ্গে (content এ) এবং সে দুটো মিলিয়ে এ রিপোর্ট তৈরী করা হয়েছে।

প্রথম কথা আমি বলেছিলাম, “ধরা পড়ায় আমি দুঃখিত।” আর একটা কথা বলেছিলাম, “…………..তো বেঁচে আছে, লড়াইয়ের মধ্যে সে তো মারা যেতেও পারতো। কাজেই সে যখন বেঁচে আছে, তখন আজ হোক কাল হোক সে আবার বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দিতে পারবে এবং এই সরকারের পক্ষে ওকে চিরকাল বন্দী করে রাখা সম্ভব হবে না। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং সংকটের মুখে মুক্তি ওদের দিতেই হবে।” এ দুটো কথাকে কাগজে ওভাবে লিখেছে, সুতরাং কমরেডরা যে সমালোচনা আমার করেছেন তা অত্যন্ত ন্যায়সংগত। কোনো কমিউনিস্টের মুখে এরকম কথা বেরোলে সেটা নিন্দারই যোগ্য। ‘আনন্দবাজার’ ও ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র রিপোর্টারকে আমি বলেছিলাম, “কৃষকের আন্দোলন কোন একজন ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। ব্যক্তির মূল্য আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু সেটা নিয়ামক নয়।” ওরা প্রশ্ন করেন, “আন্দোলন কি পিছিয়ে যাবে?” এর উত্তরে আমি বলেছিলাম, “এই গ্রেপ্তারের ফলে কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে এবং সেটা একটা প্রক্রিয়া (Process)-র অঙ্গ। তার ফলে কৃষকের সংগ্রাম বড় জোর একমাস কি দুমাস পিছিয়ে যেতে পারে।” এটাকেই ওরা “নভেম্বরে না হয় ডিসেম্বরে হবে” বলে লিখেছে।

লাল সেলাম – চারু মজুমদার

দেশব্রতী, ২৮ শে নভেম্বর, ১৯৬৮


মাওবাদীদের ‘পেন গান’ উদ্ভাবন, ধারণা ভারতীয় পুলিশের

maoist-pen-gun

ভারতের মাওবাদী বিদ্রোহীদের হাতে নয় থেকে ১০ মিটার রেঞ্জের একটি বিশেষ অস্ত্র রয়েছে, যাকে ‘পেন গান’ বলে উল্লেখ করেছে ndtv। বিশেষ এই বন্দুকটি মাওবাদীদের কারিগরি দলই উদ্ভাবন করেছে বলে সন্দেহ দেশটির পুলিশের।

বৃহস্পতিবারের ওই লড়াইয়ে চার নারী বিদ্রোহীসহ আট মাওবাদী বিদ্রোহী নিহত হয়েছেন বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।  

ওই দিন বন্দুক লড়াইয়ের পর রাজ্যটির বিজাপুর ও দান্তেওয়াদা জেলার সীমান্ত সংলগ্ন টিমিনার ও পুষনার গ্রামে তল্লাশি অভিযান চালায় জেলা রিজার্ভ গার্ড ও স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের যৌথ বাহিনী। সেখানে তল্লাশিকালে অন্যান্য অস্ত্রের সঙ্গে ওই অদ্ভুত দর্শন যন্ত্রটি খুঁজে পায় তারা।

দান্তেওয়াদা জেলা পুলিশ সুপার কামালোচন কশ্যপ বলেছেন, “একটি পেন গানসহ সাতটি অস্ত্র খুঁজে পেয়েছি আমরা। পেন গানটি নকশালীদের স্থানীয় কারিগরি দল তৈরি করেছে। পেন গানটিতে নাইন এমএম বুলেট ব্যবহার করে তারা, যেটি তৈরিতে ছোট পাইপ ও ট্রিগার হিসেবে পিন ব্যবহার করা হয়েছে।”

পেন গানটির রেঞ্জ নয় থেকে ১০ মিটার।

বন্দুক লড়াই চলার সময় নারী মাওবাদী কমান্ডার জাইনি আহত হওয়ার পর নিজের ইনসাস রাইফেল ফেলে দিয়ে এটি দিয়ে দুটি গুলি করেছে বলে দাবি পুলিশের। জাইনি স্থানীয় ভাইরামগাড এলাকার এরিয়া কমান্ডার।

অস্ত্রটি সম্পর্কে জ্ঞাত এমন কয়েকজন এনডিটিভিকে জানিয়েছেন, মাওবাদীদের ছোট ছোট দল পেন গান অস্ত্রটি ব্যবহার করে, যেটি কোনো সন্দেহের উদ্রেক না করেই সহজে বহন করা যায়। জরুরি পরিস্থিতিতে মাওবাদী ক্যাডাররা তাদের মূল অস্ত্র হারিয়ে ফেললে এই পেন গান ব্যবহার করে থাকে বলে জানিয়েছেন তারা।

গোপন সংবাদের সূত্র ধরে বিজাপুর ও দান্তেওয়াদা জেলার সীমান্ত এলাকায় অভিযান শুরু করেছিল যৌথ বাহিনী। যৌথ বাহিনীর সঙ্গে দুই ঘন্টা ধরে বন্দুক লড়াইয়ের পর সেখানে অবস্থান নেওয়া চার নারী যোদ্ধাসহ আট মাওবাদী বিদ্রোহীর সবাই নিহত হন।


চারু মজুমদারের রচনা সংকলন: কেরালার কৃষক বিপ্লবীদের লাল সেলাম

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

কেরালার ঘটনা আর একবার দেখিয়ে দিল ভারতবর্ষে আজ কি চমৎকার বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রত্যেক ভারতবাসীর প্রতিক্রিয়াশীল ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অবিচ্ছেদ্য অধিকার আছে-যে সরকার ভারতবর্ষকে আবার উপনিবেশে পরিণত করেছে বর্তমানকালে যা হোল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের নয়া উপনিবেশ। তাই এই সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা শুধু অধিকারের প্রশ্নই নয়, প্রতিটি বিদ্রোহ হোল ন্যায় কাজ।

কেরালার দারিদ্রপীড়িত জনগণ যে বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তাতে সারা ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতার মধ্যে নতুন উৎসাহ উদ্দীপনার ঢেউ উঠেছে এবং তারা কেরালার বীর জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছেন।

ভারতবর্ষে, বর্তমানে আগ্নেয়গিরির অবস্থা বিরাজ করছে, এবং এখানে কৃষক জনতার বিদ্রোহ একমাত্র চেয়ারম্যান মাওয়ের চিন্তাধারার সফল প্রয়োগের দ্বারা বিজয় অর্জন করতে পারে। অর্থাৎ কৃষক জনতাকে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করে শ্রমিক ও দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষকের নেতৃত্বে কৃষিবিপ্লবের কাজে তাদের সক্রিয় যোগদানে সক্ষম করে তুলতে হবে। গ্রামাঞ্চল থেকে গেরিলা লড়াইয়ের মারফৎ শ্রেণীশত্রুদেরকে বিতাড়িত করে ও এই ধরণের অঞ্চলের বিস্তার সাধন ঘটিয়ে মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সশস্ত্র গেরিলাদলগুলো থেকে গণফৌজ গড়ে গ্রামগুলো নিয়ে শহরকে ঘেরাও ও অবশেষে দখল করতে হবে। একমাত্র এই পথেই ভারতবর্ষকে মুক্ত করা যায়। সুতরাং প্রত্যেক এলাকার বিদ্রোহীরা জয়লাভের জন্য নিশ্চয়ই এই পথ অনুসরণ করবেন।

কেরালার বীর কৃষক বিপ্লবীরা পুরাপ্রা-ভায়লার কৃষক সংগ্রামের গৌরবময় ঐতিহ্যকে বহন করে নিয়ে চলেছেন। তাঁরা আরো একবার সাহস ও বীরত্বের নজীর স্থাপন করেছেন এবং শত্রুর প্রচন্ড আক্রমণের মুখেও মাথা নত করতে অস্বীকার করেছেন। আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস তাঁরা সমস্ত রকম অসুবিধা কাটিয়ে উঠবেন ও ভারতের কোটি কোটি বিপ্লবী জনগণকে নেতৃত্ব দেবেন।

কেরালার মহান কৃষক বিপ্লবীরা জিন্দাবাদ!

২৭ শে নভেম্বর, ১৯৬৮


ছত্তিশগড়ে ‘সংঘর্ষে’ নিহত অন্তত ৭ মাওবাদী

3-maoists-killed-in-encounter-in-malkangiri-district

ছত্তিশগড়ে ফের ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ গার্ড ও এসটিএফের সঙ্গে ‘সংঘর্ষে’ নিহত সন্দেহভাজন মাওবাদীরা। সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী পুলিসের দাবি, আজ বৃহষ্পতিবার ভোররাতে দান্তেওয়াড়া-বিজাপুর সীমান্তের কাছে একটি জঙ্গলে সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৭ মাওবাদী। নিহতদের মধ্যে ৩জন মহিলা। নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে অাশঙ্কা করা হচ্ছে।

সূত্রঃ satdin.in


কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সাধারণ সম্পাদক ‘জর্জি দিমিত্রভ’ এর জীবনী

Georgi_Dimitrow

গত ১৮ জুন ২০১৮ সোমবার ছিল কমরেড জর্জি ডিমিট্রভ (১৮ জুন ১৮৮২ ২ জুলাই ১৯৪৯)’র ১৩৬তম জন্মবার্ষিকী

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে জর্জি ডিমিট্রভ একটি সুপরিচিত নাম। মানব ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে জর্জি ডিমিট্রভ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের (কমিণ্টার্ণ) নেতৃত্বের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে সোভিয়েত রাশিয়ার অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, পুঁজিবাদের সাধারণ সঙ্কটের তীব্রতা বৃদ্ধি শ্রম ও পুঁজির মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিরোধ এবং সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সাথে উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশ দেশগুলোর জাতিসমূহের ক্রমবর্ধমান বিরোধ সারা দুনিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনে তরঙ্গ প্রবাহ সৃষ্টি করে। শুরু হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রবল উর্ধ্বগতির যুগ। এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে জাতিসমূহের অর্জিত সকল বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল অগ্রগতির এবং জাতীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে জার্মানী, ইতালীসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিবাদী শক্তি ক্ষমতা দখল করে। এর পরিণতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শান্তি ও গণতন্ত্রের পক্ষে শ্রমিকশ্রেণি ও সকল স্তরের শান্তিকামী জনগণকে একত্রিত করার সংগ্রামের ঐতিহ্যের সাথে এক অটল ও দুঃসাহসী যোদ্ধারূপে জর্জি ডিমিট্রভ চিরকাল আদর্শস্থানীয় ও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

দিমিত্রভ ১৮৮২ সনের ১৮ জুন আজকের পারনিক প্রদেশে কোভচেভসিতে জন্মগ্রহণ করেন, আট সন্তানের মধ্যে তিনি প্রথম। গরীব টুপী সেলাইয়ের দর্জি পিতার সন্তান জর্জি ডিমিট্রভ মাত্র ১২ বছর বয়সে ছাপাখানার কম্পোজিটার হিসাবে ধর্মঘট আন্দোলনে যোগদান করেন। অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সময় তিনি ছিলেন ৩৫ বছরের যুবক। এই যুবক বয়সেই তিনি তৎকালীন বামপন্থী সোশ্যালিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্য, জাতীয় ট্রেড ইউনিয়নের সম্পাদক এবং পার্টির পার্লামেন্টারী গ্রুপের সম্পাদক হিসাবে বুলগেরিয়ার শ্রমিকশ্রেণি ও মেহনতি জনতার সুযোগ্য ও জনপ্রিয় নেতা ও তাত্ত্বিক হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। রুশ বিপ্লবের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ১৯১৯ সালে বুলগেরিয়াতে প্রকৃত শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা জর্জি ডিমিট্রভ প্রতিষ্ঠা কংগ্রেসেই পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নির্বাচিত হন।

যুদ্ধোত্তরকালের প্রথম দিককার বছরগুলোতে সারা পৃথিবী জুড়ে বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ারের সময় ১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বুলগেরিয়ার রাজতন্ত্রী ফ্যাসিস্ট একনায়কত্ব উচ্ছেদের সশস্ত্র অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ইতিহাসে এই অভ্যুত্থান কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে প্রথম ফ্যাসিস্ট বিরোধী অভ্যুত্থান বলে পরিচিত। এই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও তাত্ত্বিক হিসাবে ডিমিট্রভ অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন। অভ্যুত্থানে পরাজিত হবার পরপরই তিনি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।

১৯২৪ সালের শুরু থেকেই পুঁজিবাদী অর্থনীতি সংকটাবস্থা কাটিয়ে উঠে উন্নয়নের পর্যায়ে উপনীত হয় এবং ১৯২৮ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাদী অর্থনীতি সাময়িকভাবে স্থিতি লাভ করে। এই বছরগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়। এই পটভূমিতে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিসমূহের আদর্শগত ও সাংগঠনিক দৃঢ়তা ও শক্তি বৃদ্ধির কর্মপন্থা গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই প্রয়োজনীয় মূহুর্তে ১৯২৫ সালের শরৎকালে জর্জি ডিমিট্রভ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নির্বাহী কমিটির স্টাফ হিসাবে মনোনিত হন। ১৯২৯ সালে তিনি যুগোশ্লোভিয়া, রুমানিয়া, গ্রীস, বুলগেরিয়া প্রভৃতি দেশের কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ে গঠিত বলকান কমিউনিস্ট ফেডারেশনের রাজনৈতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯২৯ সাল থেকেই পুঁজিবাদী দুনিয়ার অর্থনৈতিক সংকট আবার গভীরতর হতে থাকে। এই সংকট ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত চলে। এই বছরগুলোতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সোভিয়েত জনগণ প্রথম পাঁচসালা পরিকল্পনার দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করে। এই সময়কালে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ এই দুই সমাজ ব্যবস্থায় পৃথিবীর বিভক্তি ও তাদের পরস্পর বিরোধী সংগ্রাম তীব্রতর হয়। পুঁজিবাদের সংকট ও সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রার পটভূমিতে একদিকে উন্নত পুঁজিবাদী দেশসহ ঔপনিবেশিক দেশসমূহে বিপ্লবী জোয়ার দেখা দেয়, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের শত্রুভাবাপন্ন শক্তিরূপে ফ্যাসিস্টদের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৩২ সালের শুরুতে জার্মানীর লগ্নিপুঁজির প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো ফ্যাসিস্ট হিটলারকে ক্ষমতায় বসায় এবং ইতিহাসের এক কলংকময় অধ্যায়ের সূচনা করে।

হিটলারের ক্ষমতা দখলের সময়ে জীবনের নিরাপত্তার অভাবকে উপেক্ষা করে ডিমিট্রভ ফ্যাসিস্ট বিরোধী ইউরোপীয় শ্রমিকদের কংগ্রেসের প্রস্তুতিমূলক কাজে জার্মানীতে ছিলেন। কিছুদিনের মধ্যে নাৎসিদের দ্বারা প্ররোচিত জার্মানীর পার্লামেন্ট ভবন রাইখস্টাগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে জার্মানীর কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের সাথে ডিমিট্রভকে গ্রেপ্তার করা হয়।

রাইখস্টাগ অগ্নিকাণ্ড মিথ্যা মামলার আসামী হিসাবে ডিমিট্রভ নির্ভিকভাবে ফ্যাসিবাদের বর্বর নৃশংসতা ও সন্ত্রাসবাদী নীতির মুখোশ খুলে দেন এবং তর্কাতিতভাবে প্রমাণ করেন যে কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে রক্তাক্ত প্রতিহিংসা গ্রহণ, দেশে সন্ত্রাস ও পরিকল্পিত নরহত্যার শাসন কায়েম করার উদ্দেশ্যেই নাৎসিরা রাইখস্টাগ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত করেছে। ডিমিট্রভ আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটসহ সকল স্তরের শান্তিকামী ও গণতন্ত্রী মানুষকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের আহ্বান জানান। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির যুক্তফ্রন্ট ও সকল স্তরের মানুষের গণফ্রন্ট গঠনের তাত্ত্বিক ভিত্তি তিনি মামলা চলাকালীন সময়েই উত্থাপন করেন।

১৯৩৪ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ব্যাপি সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে সংগ্রাম আরো তীব্রতা লাভ করে। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নব নব সাফল্য অর্জন করে, অন্যদিকে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী প্রতিক্রিযার আক্রমণ জোরদার হয়। এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে ১৯৩৪ সালের এপ্রিলে ডিমিট্রভ আন্তর্জাতিকের নির্বাহী কমিটির রাজনৈতিক সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। পরের মাসেই তিনি আন্তর্জাতিকের নির্বাহী কমিটির সভাপতিমণ্ডলীতে অন্তর্ভূক্ত হন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির এই জটিল ও সংকটজনক মূহুর্তে কমিণ্টার্ণের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় ফ্যাসিবাদের আক্রমণ ও যুদ্ধের ভয়াবহ বিপদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণি ও শান্তিকামী জনগণকে একত্রিত করা। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিকের সেকেলে কৌশলগত পথনির্দেশগুলোকে পরিবর্তন করে নতুন পথনির্দেশ প্রণয়ন করা জরুরী হয়ে পড়েছে। এই যুগসন্ধিক্ষণে আন্তর্জাতিকের কাজে জর্জি ডিমিট্রভ এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩৫ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। জর্জি ডিমিট্রভ তাঁর বিপুল সৃজনশীল প্রতিভা ও শ্রম দিয়ে আন্তর্জাতিকের অন্যান্য নেতাদের সহযোগিতায় এই কংগ্রেসের অন্যতম মূল রিপোর্টে ‘ফ্যাসিবাদের আক্রমণ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যগঠনের সংগ্রামে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দায়িত্ব’ প্রণয়ন করেন। রিপোর্টটি তিনিই কংগ্রেসে উত্থাপন করেন এবং রিপোর্টের উপর উত্থাপিত প্রশ্নসমূহের জবাব দেন। এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণি যুক্তফ্রন্ট এবং ব্যাপক গণফ্রন্ট গঠনের তত্ত্ব সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে। এই কংগ্রেসেই তিনি আন্তর্জাতিকের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

আন্তর্জাতিকের সাধারণ সম্পদক হিসাবে জর্জি ডিমিট্রভ শান্তির পক্ষে ফ্যাসিস্ট যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট ও সোশ্যালিস্ট শ্রমিকদের নিয়ে শ্রমিকশ্রেণির যুক্তফ্রন্ট এবং ব্যাপক ভিত্তিতে গণফ্রন্ট গঠনের বাস্তব কাজে উদ্যোগী হন। তা সত্ত্বেও ১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর হিটলারের পোল্যাণ্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। মানব ইতিহাসের এই কঠিন, জটিল ও বিভিষীকাপূর্ণ দিনগুলোতে ডিমিট্রভের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিকের তৎপরতার মধ্য দিয়ে দেশে দেশে শান্তিকামী, গণতান্ত্রিক ও দেশ প্রেমিকদের একত্রিত করা সম্ভবপর হয়। এর ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন জোরদার হয় এবং কমিউনিস্টরা প্রতিরোধ আন্দোলনের উদ্যোক্তা, সাংগঠনিক পরিচালক হিসাবে নেতৃত্বের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধোত্তরকালে পূর্ব ইউরোপের একগুচ্ছ দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম কমিউনিস্ট পার্টিসমূহের এই অবস্থান গ্রহণের ফলেই সম্ভবপর হয়।

ফ্যাসিস্ট জার্মানীর পতনের মুখে ১৯৪৪ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর বুলগেনিয়ার শ্রমজীবী জনগণ ফাদারল্যাণ্ড ফ্রন্টের নেতৃত্বে রাজকীয় ফ্যাসিস্ট একনায়কত্ববাদী শাসকদের উচ্ছেদ করে সমাজতান্ত্রিক বুলগেরিয়া প্রতিষ্ঠা করে। ফাদারল্যাণ্ড ফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে ডিমিট্রভের যুক্তফ্রন্ট ও গণফ্রন্টের তত্ত্ব বাস্তব রূপ লাভ করে। ফাদারল্যাণ্ড ফ্রন্টের নেতা হিসাবে ২২ বৎসর দেশান্তরী জীবন কাটানোর পর দেশে ফিরে এসে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে জর্জি ডিমিট্রভ সমাজতান্ত্রিক বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বেই বুলগেরিয়ার শ্রমিকশ্রেণি সমাজতন্ত্রের ভিত্তি সৃষ্টি করে। ১৯৪৯ সালের ২রা জুলাই জর্জি ডিমিট্রভ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এই বছরের ২০১৮ সালের ১৮ই জুন সারা বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণি, প্রগতিশীল ও শান্তিপ্রিয় জনগণ এই মহান নেতার ১৩৬তম জন্মবার্ষিকী পালন করবে। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের সুযোগ্য উত্তরসুরী, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম তাত্ত্বিক ও সংগঠক, সমাজতান্ত্রিক বুলগেরিয়ার স্থপতি জর্জি ডিমিট্রভের ১৩৬তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য তাঁর সৃষ্টিশীল তাত্ত্বিক কীর্তি আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে উপস্থাপিত ‘ফ্যাসিবাদের আক্রমণ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির ঐক্য সংগঠনের সংগ্রামে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দায়িত্ব’ নতুন করে অধ্যয়নের প্রয়োজনীয় সামনে আসছে।

পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় ২০০৮ সাল থেকে সূচিত এ পর্যায়ের দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক মন্দা দশ বছর অতিক্রান্ত, আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী শক্তি সম্পর্কে একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অধঃগতি, মন্দা থেকে পরিত্রাণ লাভে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী যুদ্ধ বিস্তৃত হয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি, শাসক-শোষক গোষ্ঠির মধ্যকার সংকট ও বিরোধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় সামনে আসে রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প’র একলা চলে নীতি। যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতাকে সামনে রেখে তার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব, আধিপত্য যতদূর সম্ভব ধরে রাখতে মার্কিন একচেটিয়া পুঁজি সচেষ্ট। “যুক্তরাষ্ট্র প্রথম” (American first) শ্লোগান সামনে রেখে সংরক্ষণবাদ তথা বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্রতর করে অধিকতর সুযোগ-সুবিধা আদায়ের তৎপরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রাধান্য ধরে রাখতে সামরিক শক্তি ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিয়াল আদেশ আগ্রাসীযুদ্ধকে তীব্রতর করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি করছে। অন্যদিকে জার্মান-ফ্রান্সের নেতৃত্বে ইউরোপীয় বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্তসহ ন্যাটোর মধ্যে বিভিন্ন টানাপোড়েন লক্ষ্যণীয়। এ সময়ে ইউরোপে ‘লোকরঞ্জনবাদী’ তথা নব্য উগ্র জাতীয়তাবাদী/ফ্যাসীবাদী কোথাও পরাজিত হয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি রূপে ও ইতালিতে ক্ষমতায় সামনে রয়েছে। ইউরোপসহ বিশ্বের সকল শক্তিকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে গত ৮ মে ইরান চুক্তি থেকে আমেরিকার প্রত্যাহার, ১৫ মে জেরুজালেমে আমেরকিার দূতাবাস ব্যাপক প্যালেস্টাইনী হতাহতের মধ্যে উদ্বোধন করে। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রিকরণে ১২ জুনে আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া চুক্তি আলোচনার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। এতদ্বসত্ত্বেও ১৮ ডিসেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেণ্ট ট্রাম্প তার আমলের প্রথম ‘প্রতিরক্ষা নীতি’ ঘোষণা করেন। ১৯ জানুয়ারি প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মেট্রিস পেন্টাগনে ‘নতুন প্রতিরক্ষা নীতি’ ঘোষণা করে বলেন যে, এখনকার Central focus হচ্ছে ‘বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ নয়’। তিনি চীন ও রাশিয়ার বর্ধিত হুমকি মোকাবেলার কথা বলেন। এশিয়া-প্যাসিফিক রণনীতিকে সম্প্রসারিত করে ইন্দো-প্যাসিফিক রণনীতি সামনে আনা হয়; চীন ও রাশিয়াকে সংশোধনবাদী চিহ্নিত করে তাদেরকে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়; পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দেওয়া হয় এবং তা প্রয়োগ করার জন্য ছোট ছোট পারমাণবিক বোমা বানানো ও তার প্রয়োগ করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

এ প্রেক্ষিতে অবশ্যাম্ভাবী বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন যুদ্ধ, ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমরসজ্জা ও সামরিক মহড়া, যুদ্ধোন্মাদনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি, দক্ষিণ চীন সাগর ও পূর্ব চীন সাগরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমরসজ্জা ও যুদ্ধ প্রস্তুতি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া আফগানিস্তানে যুদ্ধ এবং আফ্রিকার দেশে দেশে যুদ্ধ অব্যাহত আছে। ইসরাইল কর্তৃক সিরিয়ার ইরানের সম্ভাব্য স্থাপনায় হামলা, প্যালেস্টাইনের জনগণের ওপর হামলা, লেবাননের হিজবুল্লাদের লক্ষ্য করে হামলার ধারাবাহিকতায় বাজার ও প্রভাববলয় নিয়ে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-সংঘাত, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা এবং শক্তি সম্পর্কের পুর্নবিন্যাস প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ এশিয়াসহ বাংলাদেশে। এতদ্বাঞ্চলে মার্কিনের প্রাধান্য থাকলেও তা হ্রাস পাচ্ছে এবং প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীনের শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

35398238_1771429869558733_6827762780930572288_n

কমরেড স্তালিনের সাথে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সাধারণ সম্পাদক কমরেড ‘জর্জি দিমিত্রভ’-


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: “নির্বাচন বয়কট করো” স্লোগানের আন্তর্জাতিক তাৎপর্য

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

১৯৩৭ সাল। জার্মানী, ইটালী এবং জাপানী ফ্যাসীবাদ-বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের তিন অগ্রবাহিনী পৃথিবীকে নতুন করে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেওয়ার ষড়যন্ত্রে অগ্রসর হচ্ছিল। স্পেনের রঙ্গমঞ্চে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর পেছনে এসে দাঁড়াল জার্মানী ও ইটালী ফ্যাসীবাদ। সংযুক্ত ফ্রণ্টের সরকারকে সমর্থন জানাল বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণী। দেশে দেশে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গড়ে উঠল। আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের প্রতিরোধ চূর্ণ করে ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদ স্পেনে প্রতিষ্ঠিত হোল।

ঠিক তখনই চীনের এক এলাকা ইয়েনানকে মুক্ত করে চেয়ারম্যান মাও-এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি জাপানী অধিকৃত অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের জাগ্রত করে সৃষ্টি করে চলল নতুন নতুন মুক্ত এলাকা জাপানী সমরবাদের সমস্ত দম্ভকে চূর্ণ করে। এই মুক্ত এলাকা শুধু টিকে থেকেছে তাই নয়, আঘাত করেছে জাপানী সাম্রাজ্যবাদকে। চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সেদিন শুধু জাপানী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল তাই নয়, তাকে প্রতিরোধ করতে হয়েছিল চিয়াং-এর নেতৃত্বে কুয়োমিণ্টাঙ সরকারকেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হোল। পুরাতন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির উপনিবেশগুলি তাসের ঘরের মত ভেঙে গেল। ঔপনিবেশিক দুনিয়ার মানুষ দেখল প্রবল প্রতাপান্বিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি জাপানী আক্রমণের সামনে মার খাওয়া কুকুরের মত লেজ গুটিয়ে পালাল। জার্মান ফ্যাসীবাদ সারা ইউরোপ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিকে করল পদানত-কি সমর-কৌশলে, কি শক্তিমত্তায়। পুরাতন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি ফ্যাসিবাদের মোকাবেলা করতে অসমর্থন হোল। সমস্ত ইউরোপের শিল্পোশ্চর্যের মালিকানা পেয়ে উদ্ধত ফ্যাসিবাদ আক্রমণ করল শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। মহান স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত দেশের সমস্ত মানুষকে, উদ্বুদ্ধ করলেন দেশরক্ষার পবিত্র সঙ্কল্পে, চূর্ণ করলেন ফ্যাসীবাদের সমস্ত ঔদ্ধত্যকে। স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মান ফ্যাসীবাদের পরাজয় সুনিশ্চিত করে তুলল স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়। পৃথিবীর সর্বত্র ফ্যাসীবাদ দ্বারা নিপীড়িত মানুষ মহান চীন কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে ফ্যাসীবাদকে রুখে দাঁড়াল। তারই ফলে বিশ্ব ফ্যাসীবাদ ধ্বংস হোল। যুদ্ধ পরবর্তী যুগে যখন পুরাতন সাম্রাজ্যবাদীরা আবার তাদের শাসন ও শোষণকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করল তখন আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ ঔপনিবেশিক দুনিয়ার মানুষ দাবানলের মত জ্বলে উঠল। সশস্ত্র সংগ্রামের আগুন ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ল। চেয়ারম্যান মাও এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তার সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে যখন এগিয়ে চলেছে ইয়াংসির দিকে সুনিশ্চিত জয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তখন ভারতবর্ষের বুকে ঘটেছে তেলেঙ্গানা; কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের নেতৃত্বে গড়ে তুলেছে কৃষক গেরিলা বাহিনী, লক্ষ লক্ষ কৃষকের মনে জাগিয়ে তুলেছে বিপ্লবী প্রতিরোধের চেতনা, শত শত গ্রামকে করেছে মুক্ত।

১৯৪৯ সালে মহান চীন বিপ্লবের সাফল্য ও চীন প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করল জনযুদ্ধের অসীম ক্ষমতা। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সেতুঙ’ এর চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত চীনের কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক কৃষক মেহনতী জনতার ঐক্য দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে চীনের বিজয়লাভ সমস্ত ঔপনিবেশিক দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রত্যেকটি উপনিবেশে সশস্ত্র সংগ্রাম দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলল। সফল চীন বিপ্লব ঔপনিবেশিক দুনিয়ার মানুষের সামনে সাফল্যের সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এনে দিল এবং তখনই শুরু হলো বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের পরিপূর্ণ ধ্বংসের যুগ। বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস যতই আসন্ন হয়ে উঠল ততই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংশোধনবাদী কমিউনিস্ট নেতৃত্ব জনতার সংগ্রামের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করল এবং স্তালিনের মৃত্যুর পর সংশোধনবাদী চক্র সোভিয়েত পার্টি-নেতৃত্ব দখল করে বসল এবং বিশ্বসাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বিশ্বব্যাপী সংশোধনবাদী চক্রের মিলিত প্রচেষ্টা শুরু হলো। চীন বিপ্লবের সাফল্যে আতঙ্কিত হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট নামধারী বিশ্বাসঘাতকেরা তেলেঙ্গানার মহান সংগ্রামকে নিঃশর্তভাবে তুলে নিল এবং সংসদীয় পথে পা বাড়াল। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর প্রত্যেকটি ঔপনিবেশিক দেশের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে সোভিয়েত সংশোধনবাদী চক্র বিভেদ এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহযোগিতা করে। চেয়ারম্যান বলেছেন, বিশ্বসাম্রাজ্যবাদ আজকের যুগে এমন একটা ইমারত-যে ইমারতটি একটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং সেই স্তম্ভটি হোল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস বিশ্বসাম্রাজ্যবাদকে চূর্ণ বিচূর্ণ করবে। বিশ্বাসঘাতক ক্রুশ্চেভচক্র তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়াল। তাই চেয়ারম্যান মাও ১৯৫৭ সালে সাবধান বাণী ঘোষণা করলেন যে, বিপ্লবী সংগ্রামের যুগে প্রধান বিপদ সংশোধনবাদ। ১৯৬২ সাল থেকে চেয়ারম্যান মাও যখন সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংগ্রাম শুরু করলেন তখন পৃথিবীব্যাপী বিপ্লবী মার্কসবাদী লেনিনবাদীদের মনে নতুন উৎসাহ সঞ্চারিত হোল। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠতে থাকল। বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকলেন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম এক নতুন স্তরে উন্নীত হোল। ভিয়েতনামের বীর সংগ্রামীরা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের পুরোভাগে থেকে আঘাত হানতে শুরু করলেন সাম্রাজ্যবাদের একমাত্র স্তম্ভ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে। দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে উঠলো বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের আসন্ন ধ্বংস। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা যে আজকের দিনের মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-এটা স্বীকার করতে আজকে দ্বিধা থাকলে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম দুর্বল হতে বাধ্য। কারণ সংশোধনবাদকে আঘাত করার হাতিয়ারকেই করে দেওয়া হয় ভোঁতা। চেয়ারম্যান মাও আমাদের শিখিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদকে আঘাত করতে হলে সংশোধনবাদকে আঘাত না করে এক পাও এগোন যায় না। আজকের যুগে অর্থাৎ যে যুগে সাম্রাজ্যবাদ পরিপূর্ণ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, যখন বিপ্লবী সংগ্রাম দেশে দেশে সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ নিয়েছে, যখন সোভিয়েত সংশোধনবাদ সমাজতন্ত্রের মুখোশ রাখতে না পেরে সাম্রাজ্যবাদের কৌশল পর্যন্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে, যখন বিশ্ববিপ্লব এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে এবং সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা দুর্বার বেগে এগিয়ে চলেছে-সেই যুগে সংসদীয় পথে পা বাড়ানোর অর্থ বিশ্ববিপ্লবের এই অগ্রগতিকে রোধ করার সামিল হয়ে দাঁড়ায়। সংসদীয় পথ আজ বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের পক্ষে গ্রহণীয় নয়। এটা ঔপনিবেশিক দেশের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, ধনতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রেও তা’ একই রকম সত্য। বিশ্ববিপ্লবের এই নতুন যুগে যখন চীনের সর্বহারা শ্রমিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব জয়লাভ করছে তখন বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের একটি কাজই প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হোল, গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে দৃঢ় ভিত্তিতে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতী মানুষের ঐক্য গড়ে তোলা। তাই সমগ্র যুগ ধরে বিপ্লবী মার্কসবাদী লেনিনবাদীদের আওয়াজ হবে, ‘নির্বাচন বয়কট করো’ এবং গ্রামে চলো, ঘাঁটি গেড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা বানাও। সংসদীয় পথে চলে বিশ্বব্যাপী বিপ্লবীরা বহু রক্তের ঋণ জমা করেছেন। আজ দিন এসেছে সেই ঋণ শোধ করার! শত শত শহীদ আজ বিপ্লবীদের আহ্বান জানাচ্ছেন ‘মুমূর্ষু সাম্রাজ্যবাদকে আঘাত করো’, ‘ধ্বংস করো’! পৃথিবীকে নতুন করে গড়বার দিন আজ এসেছে। জয় এবার সুনিশ্চিত।

দেশব্রতী, ২১শে নভেম্বর, ১৯৬৮