চেংটু’র ডা‌য়েরী থেকে ‘৩’ (১লা মে)

maxresdefault (1)

ধরুন আপনি হাতদিয়ে কাপড় কাচেন ও ঘাস কাটেন। এরপরে আপনি বাড়িতে একটা কাপড় কাচার বা ঘাস কাটার যন্ত্র নিয়ে এলেন। তাতে যে কাজ করতে আপনার আগে ২ঘন্টা সময় লাগতো সেটা এখন আপনি মাত্র ৪০ মিনিটে করতে পারেন। এর পরে আরো ভালো একটা যন্ত্র আনলেন যাতে গোটা কাজটা করতে সময় লাগলো ২০ মিনিট। কিন্তু কোনোবারই আপনি ছাটাই হলেন না। বরঞ্চ যন্ত্র যত উন্নত হলো তত আপনার জন্য সুখ বয়ে নিয়ে আসলো। এর কারণ যন্ত্রের মালিক আপনি নিজে। কিন্তু যদি আপনি কোনো বড় ঘাস কাটা বা কাপড় কাচার কম্পানির কর্মচারী হতেন তবে প্রযুক্তির উন্নতির মানে হত প্রত্যেকবার আপনার কাজ হারাবার সম্ভবনা। বা ধরুন রেলে কম্পিউটারায়নের জন্য টিকিট কাউন্টাকে অনেক কর্মী ছাটাই হলো। কম্পিউটার হাতে নিয়ে কয়েক জন কাউন্টারে বসে রইলো। কিন্তু আপনাকে সেই লাইনেই দাঁড়াতে হয়। বাকি বন্ধ কাউন্টার গুলোতেও কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকলে আপনাকে লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রেন মিস করতে হতো না।

মে দিবসতো ঘটা করে পালন হলো। কিন্তু শ্রমিকের আট ঘন্টা ঘুম,আট ঘন্টা অবসর, আট ঘন্টা কাজের অধিকারের কি হবে?আইটি সেক্টর হোক বা জুট মিল আট ঘন্টার বেশী, ১০,১২ এমনকি ১৪ ঘন্টা খাটুনি স্বাভকবিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ভাবেই পুঁজিপতিরা একদিকে আট ঘন্টা শ্রম দিবস সহ যাবতীয় শ্রমিক অধিকার বিলোপ করার দিকে এগুচ্ছে, অন্য দিকে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে যে ৬ ঘন্টার অনেক কম শ্রম দিবস চালু করা যায়। সেই কোন কালে সোভিয়েত রাশিয়া ৬ ঘন্টার শ্রম দিবস চালু করে ছিলো। ভারতের মত পশ্চাৎপদ দেশেও মাওবাদি কমিউনিস্ট পার্টি তার পার্টি কর্মসূচীতে ৬ ঘন্টা শ্রমদিবস চালুর কথা ঘোষণা করেছে।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির উন্নতি মালিকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে তাকে লাভবান করে। আবার একই সাথে উন্নত প্রযুক্তি শ্রমিককে ছাটাই করে। অন্য দিকে কর্মরত শ্রমিককে একই সময় খাটতে হয়। ফলে উন্নত প্রযুক্তিতে শ্রমিকের কোনো লাভ হয় না। তাই শ্রমিকরা অটোমেশনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু ইতিহাসের গতিতে উন্নত প্রযুক্তিকে আটকানো সম্ভব নয়।

প্রযুক্তির উন্নতি শ্রমিক কর্মচারীর কাছে আতংক বয়ে আনে।

কিন্তু খেলা ঘুরতে পারে।

একই ভাবে পুঁজিপতি হঠিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থার মালিক যদি শ্রমিক শ্রেণী নিজে হয়, তবে ব্যক্তি স্বার্থে উৎপাদনের বদলে চালু হতে পারে সামাজিক স্বার্থে উৎপাদন। তার ফলে প্রত্যেকবার অটোমেশনকে শ্রমিকরা স্বাগত জানাবে। কারণ যন্ত্রের উন্নতির সাথে কমতে থাকবে শ্রম দিবসের কাজের ঘন্টা, বাড়বে অবসর বিনোদনের সময়। মেশিন প্রতিভাত হবে তার সংগায় “যা মানুষের শ্রমকে লাঘব করে”

  • চেংটু ১মে

Advertisements

কার্ল মার্কসের সংক্ষিপ্ত জীবনী

 maxresdefault

নতুন পঞ্জিকা অনুসারে ১৮১৮ সালের ৫ মে ট্রিভস শহরে (প্রুশিয়াল রাইন অঞ্চল) কার্ল মার্কসের জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন এডভোকেট, ইহুদী, ১৮২৪ সালে তিনি প্রটেস্টান্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। পরিবারটি ছিল সমৃদ্ধ ও সংস্কৃতিবান, তবে বিপ্লবী নয়। ট্রিভসের স্কুল থেকে পাশ করে মার্কস প্রথমে বন এবং পরে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, আইনশাস্ত্র পড়েন, কিন্তু বিশেষ করে অধ্যয়ন করেন ইতিহাস ও দর্শন। এপিকিউরাসের দর্শন সম্পর্কে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়-থিসিস পেশ করে ১৮৪১ সালে তিনি পাঠ সাঙ্গ করেন। দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে মার্কস তখনো ছিলেন হেগেলপন্থী ভাববাদী। … … হেগেলের দর্শন থেকে এঁরা নাস্তিক ও বিপ্লবী সিদ্ধান্ত টানার চেষ্টা করতেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে মার্কস অধ্যাপক হবার আশায় বন শহরে আসেন। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল নীতির ফলে- … … মার্কস অধ্যাপক জীবন ছাড়তে বাধ্য হন। সে সময় জার্মানিতে বামপন্থী হেগেলবাদীদের মতামত অতি দ্রুত বিকশিত হয়ে উঠছিল। ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ বিশেষ করে ১৮৩৬ সালের পর থেকে ধর্মতত্ত্বের সমালোচনা শুরু করেন এবং মোড় ফেরেন বস্তুবাদের দিকে, যা ১৮৪১ সালে তাঁর মনে (‘খৃষ্টধর্মের সারমর্ম’) প্রধান হয়ে ওঠে; ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘ভবিষ্যৎ দর্শনশাস্ত্রের মূলসূত্র’। ফয়েরবাখের এই সব রচনা সম্পর্কে এঙ্গেলস পরে লিখেছিলেন, এই সব বইয়ের ‘মুক্তি ক্রিয়া নিজের অভিজ্ঞতায় অনুভব করার মতো’। ‘আমরা সকলে’ (অর্থাৎ মার্কস সমেত বামপন্থী হেগেলবাদীরা) ‘তৎক্ষণাৎ ফয়েরবাখ-পন্থী হয়ে গেলাম’। এই সময় বামপন্থী হেগেলবাদীদের সঙ্গে যাঁদের কিছু কিছু মিল ছিল, রাইন অঞ্চলের এমন কিছু র‍্যাডিক্যাল বুর্জোয়া কলোন শহরে দি রাইনিশ গেজেট নামে সরকারবিরোধী একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন (বেরোয় ১৮৪২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে)। মার্কস ও ব্রুনো বাউয়েরকে পত্রিকাটির প্রধান লেখক হবার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১৮৪২ সালের অক্টোবরে মার্কস পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক হয়ে বন থেকে কলোনে চলে আসেন। মার্কসের সম্পাদনায় পত্রিকাটির বিপ্লবী-গণতান্ত্রিক প্রবণতা উত্তরোত্তর স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে এবং সরকার পত্রিকাটির ওপর প্রথমে দুইদফা ও তিনদফা সেন্সর ব্যবস্থা চাপায় এবং পরে ১৮৪৩ সালের ১ জানুয়ারি পত্রিকাটিকে একেবারেই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। … … পত্রিকায় কাজ করে মার্কস বুঝলেন অর্থশাস্ত্রের সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট পরিচয় নেই, তাই তিনি সাগ্রহে এ বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করলেন।

১৮৪৩ সালে ক্রয়েজনাখ শহরে মার্কস জেনি ফন ভেস্টফালেনকে বিবাহ করেন। জেনি তাঁর বাল্যবন্ধু, ছাত্রাবস্থা থেকেই তাঁদের বাগ্দান হয়েছিল। মার্কসের স্ত্রী প্রুশিয়ার একটি প্রতিক্রিয়াশীল অভিজাত পরিবারের মেয়ে। সর্বাধিক প্রতিক্রিয়াশীল এক যুগ- ১৮৫০-১৮৫৮ সালে এঁর বড়ো ভাই প্রুশিয়ার স্বরাষ্ট্র সচিব ছিলেন। … … বিদেশ থেকে একটি র‌্যাডিকাল পত্রিকা বার করার জন্য মার্কস ১৮৪৩ সালের শরৎকালে প্যারিসে আসেন। ‘জার্মান-ফরাসী বার্ষিকী’ নামক এই পত্রিকাটির শুধু একটি সংখ্যাই বের হয়েছিল। জার্মানিতে গোপন প্রচারের অসুবিধা এবং … … মতান্তরের ফলে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। এই পত্রিকায় মার্কস যেসব প্রবন্ধ লিখেছিলেন তাতে তখনই তিনি বেরিয়ে আসেন এমন এক বিপ্লবীরূপে, যিনি ‘বর্তমান সবকিছুর নির্মম সমালোচনা’, বিশেষ করে ‘অস্ত্রের সমালোচনা’ ঘোষণা করছে এবং আবেদন জানাচ্ছেন জনগণ ও প্রলেতারিয়েতের কাছে।

১৮৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কয়েক দিনের জন্য প্যারিসে আসেন এবং তখন থেকে মার্কসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। উভয়েই তাঁরা প্যারিসের তদানীন্তন বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির টগবগে জীবনে অত্যন্ত উদ্দীপ্ত অংশ নেন … … এবং পেটি-বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রের নানাবিধ মতবাদের সঙ্গে প্রবল সংগ্রাম চালিয়ে বিপ্লবী প্রলেতারীয় সমাজতন্ত্র অথবা কমিউনিজমের (মার্কসবাদের) তত্ত্ব ও কর্মকৌশল গড়ে তোলেন। … … প্রুশীয় সরকারের দাবিতে ১৮৪৫ সালে বিপজ্জনক বিপ্লবী বলে মার্কসকে প্যারিস থেকে বহিষ্কৃত করা হয়। মার্কস ব্রাসেল্সে আসেন। ১৮৪৭ সালের বসন্তে তিনি ও এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট লীগ’ নামে একটি গুপ্ত-প্রচার সমিতিতে যোগ দেন; লীগের দ্বিতীয় কংগ্রেসে (লন্ডন, ১৮৪৭ সালের নভেম্বর) তাঁরা অনন্যসাধারণ ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং কংগ্রেস থেকে ভার পেয়ে তাঁরা সুপ্রসিদ্ধ ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ রচনা করেন, ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা প্রকাশিত হয়। প্রতিভাদীপ্ত স্পষ্টতা ও উজ্জ্বলতায় এই রচনাটিতে রূপায়িত হয়েছে নতুন বিশ্ববীক্ষা, সমাজজীবনের ক্ষেত্রের ওপরও প্রযোজ্য সুসঙ্গত বস্তুবাদ, বিকাশের সব থেকে সর্বাঙ্গীন ও সুগভীর মতবাদ- দ্বান্দ্বিকতা, শ্রেণিসংগ্রাম এবং নতুন কমিউনিস্ট সমাজের শ্রষ্টা প্রলেতারিয়েতের বিশ্ব-ঐতিহাসিক বিপ্লবী ভূমিকার তত্ত্ব।

১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব শুরু হলে মার্কস বেলজিয়ম থেকে নির্বাসিত হন। আবার তিনি প্যারিসে চলে এলেন এবং মার্চ বিপ্লবের পর সেখান থেকে ফিরে যান জার্মানিতে, কলোন শহরেই। এইখানে প্রকাশিত হয় নিউ রাইনিশ গেজেট পত্রিকা, ১৮৪৮ সালের ১ জুন থেকে ১৮৪৯ সালের ১৯ মে পর্যন্ত; মার্কস ছিলেন তার প্রধান সম্পাদক। নতুন তত্ত্বের চমৎকার প্রমাণ পাওয়া গেল ১৮৪৮-১৮৪৯ সালের বিপ্লবী ঘটনা¯স্রোতে, যেমন তা সমর্থিত হয়েছে পরবর্তীকালে পৃথিবীর সব দেশের সমস্ত প্রলেতারীয় ও গণতান্ত্রিক  আন্দোলনে। প্রথমে বিজয়ী প্রতিবিপ্লব মার্কসকে আদালতে অভিযুক্ত করে (১৮৪৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন) এবং পরে নির্বাসিত করে জার্মানি থেকে (১৮৪৮ সালের ১৬ মে)। মার্কস প্রথমে প্যারিসে গেলেন, ১৮৪৯ সালের ১৩ জুনের মিছিলের পর সেখান থেকেও পুনরায় নির্বাসিত হয়ে লন্ডনে আসেন এবং সেখানেই বাকি জীবন কাটান।

নির্বাসনে মার্কসের জীবন অত্যন্ত কষ্টে কাটে, মার্কস-এঙ্গেলস পত্রাবলিতে [১৯১৩ সালে প্রকাশিত] তা বিশেষ পরিষ্কার করে ফুটে উঠেছে। অভাব-অনটনে মার্কস ও তাঁর পরিবার একেবারে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ওঠেন; এঙ্গেলসের নিরন্তর আত্মোৎসর্গী অর্থ-সাহায্য না পেলে মার্কসের পক্ষে ‘পুঁজি’ বইখানি শেষ করা তো দূরের কথা, অভাবের তাড়নায় নিশ্চিতই তিনি মারা পড়তেন। তাছাড়া, পেটিবুর্জোয়া, সাধারণভাবে অপ্রলেতারীয় সমাজতন্ত্রের প্রাধান্যকারী মতবাদ ও ধারাগুলি মার্কসকে অবিরাম কঠিন সংগ্রামে বাধ্য করেছে এবং মাঝে মাঝে অতি ক্ষিপ্ত বন্য ব্যক্তিগত আক্রমণও প্রতিহত করতে হয়েছে তাঁকে …। দেশান্তরী চক্রগুলি থেকে আলাদাভাবে মার্কস তাঁর একাধিক ঐতিহাসিক রচনায় … … নিজের বস্তুবাদী তত্ত্ব নিরূপণ করেন, এবং প্রধানত অর্থশাস্ত্রের চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এই বিজ্ঞানটির ক্ষেত্রে মার্কস তাঁর ‘অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে’ (১৮৫৯) এবং ‘পুঁজি’ (খ–১, ১৮৬৭) রচনা করে বিপ্লব সাধন করেছেন।

ষষ্ঠ দশকের শেষে ও সপ্তম দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুনরুজ্জীবনের যুগ মার্কসকে আবার ব্যবহারিক কার্যকলাপে ডাক দেয়। ১৮৬৪ সালে (২৮ সেপ্টেম্বর) লন্ডনে বিখ্যাত প্রথম আন্তর্জাতিক,‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতি’, প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কস ছিলেন এই সমিতির প্রাণস্বরূপ, তার প্রথম ‘অভিভাষণ’ এবং বহুবিধ প্রস্তাব, ঘোষণা ও ইশতেহার তাঁরই লেখা। বিভিন্ন দেশের শ্রমিক আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করে, বিভিন্ন ধরনের অপ্রলেতারীয় প্রাক-মার্কসীয় সমাজতন্ত্রকে (মাৎসিনি, প্রধোঁ, বাকুনিন, ইংল্যান্ডের উদারনৈতিক ট্রেড ইউনিয়নবাদ, জার্মানিতে লাসালপন্থীদের দক্ষিণ দিকে দোদুল্যমানতা, ইত্যাদি) সংযুক্ত কার্যকলাপের পথে চালানোর চেষ্টা করে এবং এই সব সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগুলির মতবাদের সঙ্গে সংগ্রাম করতে করতে মার্কস বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেণির প্রলেতারীয় সংগ্রামের একটি একক কর্মকৌশল গড়ে তোলেন। যে প্যারিস কমিউনের অমন সুগভীর, যথার্থ, চমৎকার, কার্যকরী, বিপ্লবী মূল্যায়ন মার্কস উপস্থিত করেন (‘ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ’, ১৮৭১), তার পতন (১৮৭১) এবং বাকুনিনপন্থীগণ কর্তৃক আন্তর্জাতিক বিভেদ সৃষ্টির পর ইউরোপে তার অস্তিত্ব অসম্ভব হয়ে পড়ল। আন্তর্জাতিকের হেগ কংগ্রেসের (১৮৭২) পর মার্কস আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদকে নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত করার ব্যবস্থা করেন। প্রথম আন্তর্জাতিকের ঐতিহাসিক ভূমিকা শেষ হয়ে গিয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত দেশে শ্রমিক আন্দোলনের অপরিমেয় বেশি বৃদ্ধির একটা যুগের জন্য তার প্রসারবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জাতীয় রাষ্ট্রের ভিত্তিতে ব্যাপক  সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক পার্টি সৃষ্টির একটা যুগের জন্যই তা পথ ছেড়ে দেয়।

আন্তর্জাতিকে প্রচুর কার্যকলাপ এবং তত্ত্ব নিয়ে কাজের জন্য কঠিনতর পরিশ্রমের ফলে মার্কসের স্বাস্থ্য চূড়ান্তরূপে ভেঙ্গে দিয়েছিল। অর্থশাস্ত্রকে ঢেলে সাজা এবং ‘পুঁজি’কে সম্পূর্ণ করার কাজ তিনি চালিয়ে যান, রাশি রাশি নতুন তথ্য সংগ্রহ করেন ও একাধিক ভাষা (যথা রুশ) আয়ত্ত করেন, কিন্তু ভগ্নস্বাস্থ্যে ‘পুঁজি’ সম্পূর্ণ করা তাঁর হয়ে উঠল না।

১৮৮১ সালের ২ ডিসেম্বর তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ আরাম-কেদারায় বসে শান্তভাবে মার্কস তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। লন্ডনের হাই গেট সমাধিক্ষেত্রে মার্কসকে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে একত্রে সমাধিস্থ করা হয়। মার্কসের সন্তানদের মধ্যে কিছু বাল্যবস্থাতেই মারা যায় লন্ডনে। যখন চরম অভাবের মধ্যে পরিবারটি বাস করছিল। ‘এলেওনোরা এভেলিং, লাউরা লাফার্গ ও জেনি লঁগে- এই তিন মেয়ের বিয়ে হয় ইংরেজ ও ফরাসী সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে। শেষোক্ত জনের পুত্র ফরাসী সোশ্যাালিস্ট পার্টির একজন সদস্য।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, কার্ল মার্কসের জন্মদ্বিশতবর্ষ সংখ্যা


নেপালে ভারতীয় দূতাবাসে বিস্ফোরণ: মাওবাদী নেতা গ্রেফতার

india

নেপালের বিরাটনগরে ভারতীয় দূতাবাসের কাছে প্রেসার কুকার বোমা বিস্ফোরণে জড়িত এক মাওবাদী নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

গোপন সূত্রে খবর পেয়ে মঙ্গলবার বিকেলে দিল্লি থেকে তাকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার ওই মাওবাদী নেতার নাম সুরেশ কুমার রাই ওরফে সাগর রাই। নেপালের মোরাঙের বাসিন্দা সুরেশ সিপিআই-এমএল রেড স্টার (বিপ্লব গ্রুপ)-এর একজন ডিস্ট্রিক্ট সেক্রেটারি। এই সুরেশই বিস্ফোরণের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার বলেছে, জেরায় সুরেশ স্বীকার করেছেন, ওই বিস্ফোরণের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। এই ঘটনায় আগেই সুরেশের কয়েকজন সঙ্গীকে গ্রেফতার করেছিল নেপাল পুলিশ। তবে সুরেশ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

তাকে জেরা করে পুলিশ জানতে পারে, উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে সম্পর্কে তার এক দাদা থাকেন। সেই সূত্র ধরেই এ রাজ্যে আশ্রয় নেন তিনি।  তারপর সেখান থেকে দিল্লি যান।

শুধু ভারতীয় দূতাবাসই নয়, নেপালে বিভিন্ন ভারতীয় সংস্থাগুলো যে তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল জেরায় সুরেশ সে কথাও স্বীকার করেছেন বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। 

প্রসঙ্গত, গত ১৬ এপ্রিল বিরাটনগরের ভারতীয় দূতাবাসের সামনে রাত সাড়ে ৮টা নগাদ বিস্ফোরণ ঘটে। সেই সময় দূতাবাসে কেউ ছিল না। ফলে হতাহতের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয় বলে জানান মোরাঙের পুলিশ সুপার অরুণ কুমার বিসি।


কলকাতাঃ গড়চিরোলিতে মাওবাদীদের নিহত হওয়ার প্রতিবাদে শহরে সভার ডাক

31369128_2114762971873246_1644968711702083404_n

গড়চিরোলি ও বিজাপুরে অন্তত ৪৭জন মানুষ নিহত হয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। অধিকাংশরাই মাওবাদী। মাওবাদীরা ইতিমধ্যেই অভিযোগ করেছে সংঘর্ষ নয়, খাদ্য বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছে এদের। এবার খাস কলকাতায় মাওবাদীদের নিহত হওয়ার ঘটনাকে গণহত্যা বলে আখ্যা দিয়ে এই ‘হত্যাকাণ্ডের’ বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভার ডাক দিল মানবাধিকার সংগঠন APDR। ৪মে শুক্রবার, বিকেল ৪টে  বউবাজার ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সামনে হবে এই সভা।

সূত্রঃ satdin.in


মার্কস থেকে মাও এবং তারপর… … …

1504484775_melsm

মার্কসের জন্মের ২০০ বছর পর তাঁকে আমরা স্মরণ করছি প্রথমত তাঁর প্রবর্তিত মতবাদের জন্য। যে মতবাদ তাঁর নামানুসারে “মার্কসবাদ” নামে পরবর্তীতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মার্কসবাদ মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে চিন্তা ও কাজের এক সম্পূর্ণ নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিল। যারই পথ বেয়ে পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার বিপ্লবকে সম্পন্ন করেছিল।

সচেতন মার্কসবাদী মাত্রই জানেন যে, মার্কস জ্ঞানের জগতে তিনটি প্রধান ক্ষেত্রকে তাঁর অবিস্মরণীয় আবিষ্কার দ্বারা আলোকিত করেছিলেন। সেগুলো হলো- দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি। দর্শনে তিনি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে প্রতিষ্ঠা করেন- যাকে লেনিন বলেছিলেন সবচেয়ে সুসংগত বস্তুবাদ, অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী উৎপাদনের শ্রমিক-শোষণের গোপন কুঠরীটি খুলে ধরেন উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব আবিষ্কারের মাধ্যমে, এবং রাজনীতিতে তিনি এই প্রথম সচেতনভাবে শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব বিজ্ঞানসম্মতভাবে তুলে ধরেন, যা শ্রেণিহীন কমিউনিস্ট সমাজের পথে চালিত করবে। নিঃসন্দেহেই এগুলো করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন প্রাধান্যকারী বুর্জোয়া-পুঁজিবাদের তত্ত্বমালাকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে উন্মোচন করেছেন। কিন্তু একইসাথে তিনি সমাজতন্ত্রের নামে আর যতসব বিভ্রান্তকারী মতধারা তখনকার সময়ে প্রচলিত ছিল সেগুলোকেও নির্মমভাবে সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু এখানে যা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন তাহলো, তিনি শুধু তত্ত্বের জায়গাতে কাজের জন্যই এগুলো করেছিলেন তা নয়। তাকে এ সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ ও  গবেষণায় প্ররোচিত ও প্রণোদিত করেছিল শ্রমিক শ্রেণির সার্বিক মুক্তির চেতনা। আর সে কারণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে যখনই সম্ভব হয়েছে, শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, তার পথ প্রদর্শন করেছেন, তাকে সংগঠিত করেছেন। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে ১৮৪৮ সালে তিনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সাথী এঙ্গেলস মিলে যে “কমিউনিস্ট ইশতেহার” রচনা করেছিলেন সেটি যতনা ছিল একটি নব বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির গবেষণামূলক সৃষ্টি, তার চেয়ে বেশি করে ছিল শ্রমিক শ্রেণির সংগঠনের ও তার বিপ্লবের পথপ্রদর্শক। বাস্তবে বিপ্লবী সংগ্রামে ব্যক্তিগত অংশগ্রহণ ব্যতীত মার্কসের পক্ষে মার্কসবাদের প্রবর্তন সম্ভব হতো না। এটা আজ শত কণ্ঠে অতীব জোরালোভাবে বলা প্রয়োজন এজন্য যে, আজকের বিশ্বে মার্কসবাদের তত্ত্বগত আলোচনায় অংশ নিয়ে বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা নিজেদেরকে বড় বেশি মার্কসবাদী দাবি করতে চান, বাস্তব বিপ্লবী কাজে অংশ না নিয়েই। এমনকি কেউ কেউ এমন অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতাকে ঘুরে ফিরে বিরোধিতাও করেন।

উপরের কথাগুলোর সাথেই যুক্তভাবে চলে আসে এই সত্যটি যে, মার্কস-জন্মের ২০০ বছর পরে শুধু মার্কসের অবদানের আলোচনা মার্কসবাদের বিরুদ্ধে চলে যায়, যদি আমরা তার পরবর্তী বিকাশগুলোকে মনে না করি ও মান্য না করি। মার্কসবাদ একটি মতবাদ অবশ্যই, কিন্তু সেটি হলো বিজ্ঞানসম্মত মতবাদ। সেটি হলো বিপ্লবের বিজ্ঞান। তাই, বিজ্ঞানের অন্য যেকোন শাখার মতো মার্কসবাদও নিজেকে বিকশিত না করে বিজ্ঞান হিসেবে নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করতে পারে না। একারণেই মার্কস ও তার ঘনিষ্ঠ সাথী এঙ্গেলসের আলোচনার পর চলে আসে লেনিন এবং তার পরে মাও-য়ের কথা। এবং মার্কসবাদের পর লেনিনবাদ ও মাওবাদের উদ্ভব ও বিকাশের কথা। বাস্তবে আজকের সময়ে মার্কসবাদ, লেনিনবাদ ও মাওবাদ- এই তিনটি সূত্র কোন আলাদা সত্ত্বা নয়। এটা হলো একটি অখ- মতবাদ- যাকে আমরা এখন বলে থাকি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ, সংক্ষেপে মালেমা। একে এককথায় মাওবাদ বলেও আমরা আলোচনা করে থাকি, কারণ, মাওবাদ হলো এই অখ- মতাদর্শের বিকাশে সর্বোচ্চ স্তর।

প্রকৃত মার্কসবাদীরা জানেন যে, মার্কসের জীবতকালেই, সমাজতন্ত্রের নামে তার মতবাদিক বিরোধীরা মাঠে সক্রিয় ছিল। তাদের বিরুদ্ধে মতবাদিক সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মার্কসের মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছিল। তথাপি মার্কসের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন “১ম আন্তর্জাতিক” তার জীবিতাবস্থাতেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাঁর মৃত্যুর পর এঙ্গেলস যে “২য় আন্তর্জাতিক” সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন মার্কসবাদের ভিত্তিতে, সেটিও তাঁর মৃত্যুর কিছু পরে সুবিধাবাদীদের করায়ত্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বিশ্ব-পরিস্থিতিতেও কিছু মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মার্কস-সময়কালের পুঁজিবাদের সা¤্রাজ্যবাদের স্তরে বিকাশ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মার্কসবাদের মতবাদে নতুন যে বিকাশ দরকার হয়ে পড়লো সেটিই মহান লেনিন সম্পাদন করেছিলেন এবং তাকেই লেনিনবাদ বলা হয়ে থাকে। একদিকে মার্কস-মতবাদের বিপ্লবী সারমর্মকে বিবিধ সুবিধাবাদী-সংশোধনবাদীদের বিকৃতি থেকে রক্ষা করা ছিল লেনিনের মহান কৃতিত্ব। অন্যদিকে পুঁজিবাদের নতুন বিকাশকে ব্যাখ্যা করে কালোপযোগী বিপ্লবী সংগঠন ও রণনীতি-রণকৌশল নির্মাণ করার দায়িত্বটিও তিনি সম্পন্ন করেন। এ কারণেই লেনিনের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ইউরোপের সবচেয়ে পশ্চাদপদ দেশটিতে প্রথম মার্কসবাদী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা এবং শ্রমিক শ্রেণি এবং তার সাথী হিসেবে অন্যান্য নিপীড়িত জনগণকে, বিশেষত গরীব কৃষকদেরকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন করা। ১৯১৭ সালের সেই রুশ-বিপ্লব প্রায় ৩৫ বছর কাল টিকে ছিল (৫০-দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত) এবং লেনিনের পর স্ট্যালিনের নেতৃত্বে অসংখ্য মহান উপাখ্যান সৃষ্টির মাধ্যমে এক অভুতপূর্ব অপরূপ সমাজ-ব্যবস্থা বিশ্বকে উপহার দিয়েছিল, যা কিনা মানবজাতি আগে কখনো দেখেনি।

কিন্তু, এরই মধ্যে বিপ্লবের ভারকেন্দ্র আরো পূব দিকে স্থানান্তরিত হতে শুরু করেছে, যার সূচনা হয়েছিল আরো আগেই, লেনিনের সময় থেকেই। লেনিন প্রাচ্য দেশের বিপ্লব নিয়ে গুরুত্বসহকারে কাজ শুরু করেছিলেন ১৯১৯ সালে ৩য় আন্তর্জাতিক গঠনের সময় থেকেই। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশিক-আধাউপনিবেশিক দেশে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বিপ্লবের ঝঞ্ঝাকেন্দ্র স্থানান্তরিত হতে শুরু করেছিল। যার সফল কেন্দ্র হয়ে ওঠে প্রাচ্যদেশীয় শোচনীয়ভাবে পশ্চাদপদ বিশাল চীন দেশ।

অনেকগুলো অনুন্নত দেশে সেসময় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠলেও চীনেই শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বাধীন বিপ্লব প্রকৃতপক্ষে বড় ধরনের সফলতা পায় মাও সেতুঙের নেতৃত্বে। এ ধরনের একটি দেশে মার্কসবাদী বিপ্লবের সফলতা ছিল সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে এক সম্পূর্ণ নতুন বিষয়। যেখানে প্রধানত কৃষককে ভিত্তি করে গ্রামভিত্তিক দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লব’ সফল হয়েছিল। বাস্তবে সেখানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রথম স্তরটি ১৯৪৯ সালে সম্পন্ন হয় সম্পূর্ণ নতুন তাত্ত্বিক ভিত্তি সৃষ্টি করার প্রক্রিয়ায়, যা ছিল সনাতন মার্কসবাদ-লেনিনবাদে অজানা। বিপ্লবের এক সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক রণনীতি, নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতির পাশাপাশি এই প্রথম মার্কসবাদের তত্ত্বভান্ডারে এক সুসংহত সামরিক তত্ত্বেরও সংযোজন করেন মাও।

কিন্তু এখানেই মাও-য়ের অবদান শেষ হয়নি। বিশাল কৃষক ও কৃষি প্রধান দেশে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে তিনি সনাতন রাশিয়ান মডেল থেকে ভিন্নতা সৃষ্টি করেন। এর সফল সমাপ্তির পর তার উপর যে বৃহত্তম দায়িত্বটি এসে পড়ে তাহলো, একটি সমাজতান্ত্রিক দেশে পুঁজিবাদের পুনরুত্থানের সমস্যার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দান। কারণ, ইতিমধ্যে, ৫০-দশকেই মহান স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র রাশিয়ায় পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ঘটেছিল। মাও এই পশ্চাদগতির উল্লম্ফনে অন্তর্নিহিত সংশোধনবাদকে উন্মোচন ও সংগ্রামে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিলেন। কিন্তু এখানেই তিনি থেমে থাকেননি। খোদ চীন দেশে একইরকম ঘটনাকে প্রতিহত করার জন্য তাঁর নেতৃত্বে সূচিত হয় মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের। বাস্তবে এর মধ্য দিয়ে মার্কসবাদী মতবাদ তার বিকাশের ৩য় স্তরটিতে উল্লম্ফন ঘটায়। কারণ, তাঁর পূর্বোল্লিখিত যাবতীয় অবদানগুলোর ধারাবাহিকতায় তিনি মার্কসবাদের দর্শন, অর্থশাস্ত্র ও রাজনীতিÑ এই তিনটি উপাদানেই গুণগত অগ্রগতি সংযুক্ত করেন, যার মধ্য দিয়ে সর্বহারা শ্রেণির বিপ্লবের এই মতবাদ, এই বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি ও বিজ্ঞান তার তৃতীয় স্তরে উত্তরণ ঘটায়।

তাই, মার্কস ও তার মতবাদ আজ রূপ নিয়েছে মালেমা-তে। একে না বুঝলে, ধারণ না করলে আজকে মার্কসকেও আর ধারণ করা যায় না।

* কিন্তু আমরা জানি যে, সমাজতান্ত্রিক দেশে পুঁজিবাদ পুনরুত্থানের সমস্যাকে ব্যাখ্যা ও প্রতিহত করার বিপ্লবের তত্ত্ব আবিষ্কার সত্ত্বেও ১৯৭৬ সালে মাও-এর মৃত্যুর পর সেখানে এক ক্যুদেতার মাধ্যমে পুঁজিবাদের পথগামীরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। ফলে সমাজতান্ত্রিক চীনও, পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার মতই, সমাজতন্ত্রের নামে পুঁজিবাদে অধঃপতিত হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়েই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে একটা সংকট নেমে এসেছে।

এ ধরনের সার্বিক সংকট বিপ্লবী কমিউনিস্ট আন্দোলনে নতুন কিছু নয়। নিশ্চয়ই, পূর্বকালের মতো এবারও, বিপ্লবের এই মতবাদ নিজেকে রক্ষা করবে এবং এই সংকটকে কাটিয়ে তুলবে। কিন্তু এজন্য আর সব বিষয়ের মতো যা মনে রাখতে হবে যে, এ ধরনের অবস্থায় পূর্বেও যা ঘটেছে, এখনো সেটাই ঘটে চলেছে, শুধু ভিন্ন রূপে। মাও-এর মৃত্যুর পরবর্তীকালে আন্দোলন পুনর্গঠনের জন্য মাওবাদীদের যে প্রথম উদ্যোগ ‘রিম’ (রিম হলো ‘বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদী আন্দোলন’-এর ইংরেজী নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি বিশ্বের মাওবাদীদের নিয়ে ১৯৮৪ সালে গঠিত হয়েছিল এবং একটি নতুন ‘আন্তর্জাতিক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি-সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠেছিল) গঠনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছিল, সেটা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। এর কারণ হলো, এ আন্দোলনের অভ্যন্তরেই সুবিধাবাদের উদ্ভব ও বিভ্রান্তি-বিচ্যুতির বিকাশ। পেরু ও নেপালের নেতৃত্বদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং আমেরিকার মাওবাদী পার্টির অবিবেচক নীতি রিমের মধ্য থেকেই ঘটেছে। এ কারণে পুরো বিপ্লবী কমিউনিস্ট আন্দোলন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এখন দেখা যাচ্ছে দু’তরফের আক্রমণকে মালেমা-র মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রথমত, এই সংকটের কারণে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের পথ ও মতবাদকে প্রকাশ্যে বর্জনের ধারা। দ্বিতীয়ত, মালেমা’র বিকাশের নামে তার মৌলিক নীতি থেকে সরে যাবার, তাকে কূট-কৌশলে সংশোধন করার ধারা। এ দুটোই কার্যত একই কাজ করছে, মালেমা-কে বদলে দিচ্ছে। তাকে অচল, সেকেলে বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছে। এক পক্ষ চরমভাবে প্রমাণিত সেকেলে হয়ে পড়া বুর্জোয়া গণতন্ত্রে আশ্রয় নিচ্ছে, কার্যত পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের ফেরিওয়ালা হয়েছে। আর অন্য পক্ষ মার্কস থেকে মাও পর্যন্ত তত্ত্বের ‘ত্রুটি’ খুঁজে বেড়াচ্ছে- যার মধ্য দিয়ে মার্কসবাদ, তথা মালেমা’র মৌলিক নীতির বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছে। আজ মার্কসের শিক্ষাকে র্ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হলে এই উভয় ধরনের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থেকেই তা করতে হবে।

এ সমস্ত ধরনের আক্রমণকে প্রতিহত করার মধ্য দিয়েই মার্কসকে আজ রক্ষা করতে হবে। মালেমা’র নীতিকে রক্ষা ও তার সৃজনশীল প্রয়োগের মধ্য দিয়েই তার বিকাশও ঘটবে। এটা এক সর্বজনীন নিয়ম। যা বর্তমান বিশ্ব-বাস্তবতার জটিল সমস্যাকে মোকাবিলা করে শ্রমিক শ্রেণি ও নিপীড়িত জনগণের বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে। বিশ্ব সেদিকেই এগিয়ে যাবে, কারণ, পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে চলেছে- যা থেকে বিশ্বকে ও বিশ্ব-জনগণকে মুক্ত করা অপরিহার্য। এবং সেটা অনিবার্যও বটে।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, কার্ল মার্কসের জন্মদ্বিশতবর্ষ সংখ্যা


মাদারীপুরে সর্বহারা অধ্যুষিত শিবচরে নৌপুলিশ ফাঁড়ি উদ্বোধন

photo-1518355660

সর্বহারা অধ্যুষিত মাদারীপুরের শিবচরের প্রত্যন্ত এলাকায় নৌপুলিশ ফাঁড়ির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের সেক্রেটারি ও অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি নূর-ই আলম চৌধুরী (এমপি) এবং নৌপুলিশের ডিআইজি শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসান (বিপিএমপিপিএম) এ ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন।

গতকাল শনিবার বিকেলে শিবচর উপজেলার চরমপন্থী অধ্যুষিত নিলখী ইউনিয়নের কলাতলা এলাকায় নৌপুলিশ ফাঁড়ির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সময় নৌপুলিশের ডিআইজি শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসান বলেন, চরমপন্থী সর্বহারা অধ্যুষিত এলাকায় জেলা পুলিকে সহযোগিতা করতে নৌপুলিশ ফাঁড়ির যাত্রা শুরু হলো। চরমপন্থী যেই হোক এই এলাকায় কেউ কোনো কর্মকাণ্ড করে রেহাই পাবে না।’

উল্লেখ্য যে, শিবচর এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি(MBRM) অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত।

সূত্রঃ http://www.kalerkantho.com/online/country-news/2018/04/29/630720


গড়চিরোলিতে সংঘর্ষ নয়, খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছে, অভিযোগ মাওবাদীদের

31369128_2114762971873246_1644968711702083404_n

২২ এপ্রিল ও ২৩ এপ্রিল দুটি ঘটনায় নিহত ৩৯জন সকলেই মাওবাদী নয় তাদের মধ্যে অন্তত ৮জন গ্রামবাসী বলে দাবি করেছে মাওবাদীরা। মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, তেলেঙ্গানা রাজ্য কমিটির তরফে জারি করা প্রেস বিবৃতিতে মাওবাদীরা জানিয়েছে বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীকেও হত্যা করেছে পুলিস। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য বেরিয়েও এখনও নিখোঁজ ৮ জন গ্রামবাসী। টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী গ্রামবাসীদের ধারণা ওই ৮জনকে হত্যা করেছে পুলিস। মাওবাদীদের অভিযোগ চরের( প্রাক্তন মাওবাদী এখন পুলিসের হোম গার্ড) মাধ্যমে খাবারে বিষ মিশিয়ে মাওবাদীদের হত্যার পর তাদেরকে গুলি করা হয়। কিছু দেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মাওবাদীরা দাবি করেছে সংঘর্ষের ঘটনা ২২ এপ্রিল হয়নি, বরং তার আগে হয়েছিল। মাওবাদীদের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে গড়চিরোলির পুলিস সুপার অভিনব দেশমুখ, দাবি মাওবাদীরা কখনও একসঙ্গে সবাই খাবার খায় না। যদি খাবারে বিষ বা নেশার কিছু মিশিয়ে দেওয়া হত তাহলে অন্যসঙ্গীরা তা বুঝতে পারতো বলে দাবি পুলিস সুপারের। মাওবাদী ও পুলিসের দাবি , পাল্টা দাবির মধ্যে একটা প্রশ্ন রয়েই গেল সত্যি কী করে এতজন মাওবাদীদের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিতে পারলো পুলিস? তাছাড়া চর বা আত্মসমর্পণকারী মাওবাদীদের মাধ্যমে পুলিস আগেও এরকম ঘটনা ঘটিয়েছে বলে মাওবাদীরা আগেও অভিযোগ করেছিল। তারপরও ? গড়চিরোলির ‘ভুয়ো সংঘর্ষের’ প্রতিবাদে ৪ মে ভারত বনধের ডাক দিয়েছে মাওবাদীরা।

সূত্রঃ satdin.in