অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্রঃ জহির রায়হান

রুশ বিপ্লবের পঞ্চাশতম বার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘তরঙ্গ’ পত্রিকায় জহির রায়হান-এর লেখা ‘অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্র’ লেখাটি প্রকাশিত হয়। এ বছর রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকী উপলক্ষে ‘লাল সংবাদ’ এ লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হল:

আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে স্মরণীয় অবদান হচ্ছে দুটো।

একটি সিনেমার জন্ম।

অপরটি সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম।

দুটোই বিপ্লব।

একটা চারুকলার ক্ষেত্রে।

অন্যটা সমাজ ব্যবস্থা ক্ষেত্রে।

সিনেমা মানুষের স্বষ্টি ক্ষমতাকে প্রকাশের এবং বিকাশের এক নতুন মাধ্যমের সন্ধান দিয়েছে, যার শক্তি অপরিসীম।

সিনেমা হলো কবিতা।

সিনেমা হলো উপন্যাস।

সিনেমা হলো সংগীত।

সিনেমা হলো পেইন্টিং।

সিনেমা হলো নাটক।

সিনেমা হলো বিজ্ঞান।

সিনেমা হচ্ছে সবকিছুর সমষ্টি। এ এক যৌথকলা। অথচ কোন একটির একক অস্তিত্ব এখানে নেই। সবকিছুকে ভেঙেচুরে, সবকিছুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বৈজ্ঞানিক শিল্পকর্ম। অক্টোবর বিপ্লব এবং সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম মানুষের ইতিহাসে এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তন ঘটিয়েছে।

মানুষ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও বৈষম্যের শেকল থেকে মুক্তি পেয়েছে। শোষণের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে। মানুষ তার সত্যিকার মর্যাদা পেয়েছে এবং নিজের শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। ব্যক্তি ও সমষ্টির যৌথ প্রচেষ্টায় মানুষ এক বৈজ্ঞানিক সমাজ ব্যবস্থা গোড়াপত্তন করেছে এবং শ্রেণিহীন সমাজ গড়ে তোলার পথে এগিয়ে চলেছে।

অক্টোবর বিপ্লবের সঙ্গে সিনেমার জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই। দুটোই পৃথক ঘটনা।

কিন্তু অক্টোবর বিপ্লব যদি না হতো, সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম যদি না হতো তাহলে সিনেমা চারুকলা (Fine art) হিসাবে আদৌ স্বীকৃতি পেতো কিনা সন্দেহ। শুধু তাই নয়, এই নতুন কলামাধ্যমটির মধ্যে যে এতবড় স্বষ্টিশক্তি লুকিয়ে আছে তাও হয়তো আমরা আবিষ্কার করতে পারতাম না।

কথাটার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে বুর্জোয়া সিনেমার স্বরূপটা একবার দেখা দরকার।

বুর্জোয়া সিনেমার এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা। সিনামার আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া শ্রেণি মানব সভ্যতার এই নতুন আবিষ্কারটিকে অর্থ উপার্জনের এক মোক্ষম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে লাগলো। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানী ও ফ্রান্সের বুর্জোয়া শ্রেণি সিনেমার জন্ম মুহূর্তে তার স্বজনশীল সম্ভাবনার টুটি টিপে দিলো। সস্তা চিত্তবিনোদনকারী হাল্কা যৌন আবেদনময়, উগ্র অপরাধমূলক বিষয়বস্তুগুলোই প্রাধান্য পেলো বুর্জোয়া সিনেমার অঙ্গনে।

এ প্রসঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কীর একটা উক্তি মনে পড়লো।

লুমিয়ার ব্রাদার্স (ফরাসি) প্রযোজিত একটা ছবি দেখতে যান তিনি। সিনেমার সঙ্গে সেই তার প্রথম পরিচয়। সেটা ১৮৯৬ সাল। সিনেমা দেখে পরদিন গোর্কী একটা স্থানীয় সংবাদপত্রে লিখলেন–

Last night I was in the Kingdom of Shadows……………..I was at Aumont’s and swa Lumier’s Cinematograph_moving photography. The extraordinary impression it creates is so unique and complex that I doubt my ability to describe it with all its nuances………………I am convinced that these pictures will soon he replaced by others of a genre more suited to the general tone of the ‘Concert Parisian’. For example, they will show a Picture titled ‘As She undresses’ or ‘Madame at her Bath’ or ‘A woman in Stockings”.

বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় আর্টের সহজ ও স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব নয়। ফিল্ম আর্টের পক্ষে এ উক্তি সবচেয়ে বেশি করে প্রযোজ্য। কারণ চলচ্চিত্র হচ্ছে একদিকে আর্ট অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রি, দুটোই। ছবি বানাতে হলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। যে সমস্ত পুঁজিপতি এতে টাকা খাটান তাঁরা প্রচুর মুনাফা পাবার আশায় টাকা খাটান। দর্জির দোকানে মানুষ যেমন অর্ডার দিয়ে তাদের জামা কাপড় তৈরি করে তেমনি পুঁজিপতিরা অর্ডার দিয়ে তাদের মর্জিমাফিক এবং তাদের শ্রেণি-স্বার্থ রক্ষাকারী ছবি তৈরি করেন। এ ধরনের সমাজ ব্যবস্থায় আর্ট-ছবি কি করে তৈরি হবে?

‘Art is the privilege of the free……………..art is a mode of freedom, and a class society conceives freedom to be absolutely whatever relative freedom the class has attained to’_ Christopher Caudwell.তবু অনেকে হয়তো বলবেন, অক্টোবর বিপ্লবের অনেক আগে, আমেরিকার বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার ভেতরে থেকে ডি ডব্লু গ্রিফীথ কি করে দু-দুটো আর্ট-ফিল্ম (Birth of Nation Ges Intolearance) তৈরি করলেন?

ও দুটো ছবি সত্যিকার আর্ট ফিল্মের মর্যাদা পাবার যোগ্য নয় বলেই আমার ধারণা।

এ সম্পর্কে John Howard Lawson Zvi Film, The Creative Process বইতে কি বলছেন শুনুন।

He [Griffith] felt that the fate of humanity is a factor in history……………He could not believe that humanity would ever control its own destiû. His philosophic views were colored by the vulgari“ation of Darwin’s theories current at the time…………..critics have praised the film’s technical brilliance and have deplored its reactionary treatment of the Negro struggle for freedom. Its advance technique and backward social content are often considered as fixed opposites’ এরজন্যে গ্রিফীথকে দায়ী করা অর্থহীন। বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত স্ববিরোধীতাই এর জন্যে দায়ী।

`In bourgeois art man is conscious of the necessity of outer reality but not of his own, because he is unconscious of the society that makes him what he is. He is only half a man’

_Christopher Caudwell ধনতন্ত্রের দেশ আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক ডি ডব্লু গ্রিফীথের অর্ধেক সত্য, অর্ধেক জীবন, অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক আর্ট তাই পরবর্তীকালে সমাজতন্ত্রের সন্তান, সোভিয়েত পরিচালক সার্জ্জি আইজেনস্টাইন, পুদোভকীন আর ডোভজেঙ্কোর হাতে এসে সম্পূর্ণ সত্য, সম্পূর্ণ জীবন, সম্পূর্ণ মানুষ ও সম্পূর্ণ আর্টের মর্যাদা পেয়েছে।

সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম ও তার ইতিহাস এবং সোভিয়েত সিনেমার জন্ম ও তার ইতিহাস এক ও অভিন্ন।

অক্টোবর বিপ্লবের প্রচণ্ড ঢেউ রাশিয়ার জনসাধারণের মধ্যে এক নতুন চেতনাবোধের জন্ম দিয়েছিলো। পুরাতনকে ভেঙেচুরে নতুনভাবে নতুন দর্শন ও নবলদ্ধ জীবন-বোধের আলোকে নতুন করে দেখার অদম্য বাসনা তখন সমার মনে। সাহিত্য, কবিতা, পেইন্টিং, সংগীত, নাটক এর একটা ট্র্যাডিশন আছে। অতীত আছে। এর কতটুকু গ্রহণ ও কতটুকু বর্জন করা প্রয়োজন এ নিয়ে তখনো দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের অবকাশ রয়েছে। এদিক থেকে চলচ্চিত্র তখনো রাশিয়ানদের কাছে একটা সম্পূর্ণ নতুন মাধ্যম। যার কোন ট্র্যাডিশন কিম্বা দ্বন্দ্বমূলক অতীত নেই এবং যার শক্তি সমাজতন্ত্রের শক্তির মতই অফুরন্ত ও অপরিসীম। তাই সমাজ সচেতন এই নতুন মানুষগুলো সিনেমার প্রতি আকৃষ্ট হলো সবচেয়ে বেশি। এবং সোভিয়েত সিনেমার জন্ম হলো।

`Soviet Cinematography is the offspring of the October Revolution. It was born of the struggle and has drawn its content, beauty and purpose from the latter’s great historical significance. It took Lenin’s behest_Art belongs to the people_as a banner, as a guide to action’_Alexander Doveyhenko.

`The all powerful form of the October Revolution uprooted all of us from the most diverse activities and occupations, swept us away with its mighty stream and combining into one whole everything we had brought with us from various field of knowledge and activity, set us working at a great and collective endeavour_our Cinematography’.আইজেনস্টান ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার, পুদোভকীন ছিলেন কেমিস্ট, ভোডজেঙ্কো ছিলেন স্কুলশিক্ষক, জীগান ছিলেন অভিনেতা, কুলেশভ, কোজিনস্তভ, ইয়াকুতভীচ এঁরা ছিলেন পেইন্টার, আলোকজান্ডারভ ছিলেন একজন সিনেমা অপারেটর আর ভার্তব তখন ডকুমেন্টারি ছবি বানাতেন আর মায়াকোভস্কি ছিলেন একজন খ্যাতনামা কবি। সোভিয়েত সিনেমার জন্ম মুহূর্তে এরাই ছিলেন তার পুরোধা।

সোভিয়েত সিনেমার প্রথম ফসল হচ্ছে সাজ্জি আইজেনস্টাইনের STRIKE (১৯২৪) আদিক, প্রতীকের ব্যবহার এবং উপস্থাপনায় ছবিটি অভিনব। গ্রিফীথের Intolerance ছবিতেও ধর্মঘটের একটা দৃশ্য আছে। সে দৃশ্যটিকে তিনি দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আইজেনস্টইনের STRIKE এ ছবির প্রতিটি চরিত্র এমনকি ছবির দর্শকরাও সংঘাতের সঙ্গে একাত্ম্য হয়ে যান। তবে ছবিটা মাঝে মাঝে একটু থিয়েটার ঘেঁষা হয়ে পড়েছে। আইজেনস্টাইন নিজেই বলেছেন– `Our first film, Strike, floundered about in the flotsam of rank theatricality’.

আইজেনস্টাইনের পরবর্তী ছবি Battleship Potemkin চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। সাহিত্যে যেমন টলস্টয়ের War and peace, কাব্যে যেমন মিল্টনের Paradise lost and paradise Regained, পেইন্টিংয়ে যেমন দা ভিঞ্চির Last Supper তেমনি চলচ্চিত্রে আইজেনষ্টাইনের Battleship Potemkin একটি ক্ল্যাসিক। একটি মহাকাব্য। অন্য মহাকাব্যগুলোর চেয়ে Battleship Potemkin আরো মহৎ, আরো শক্তিশালী। কারণ, অন্য মহাকাব্যগুলোতে নায়ক নিয়তির দাস। নিয়তি তাকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেখানেই যাচ্ছে সে। অসহায় শিশুর মত ঘুরে বেড়াচ্ছে নায়ক। কিন্তু এখানে নায়ক নিয়তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। নিয়তিকে নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিতে চাইছে। এখানে নায়ক হলো জীবন, নায়ক হলো মানুষ। এক নয় অনেক। অসংখ্য মানুষ। নায়ক হলো ইতিহাস।

মাত্র একটি ঘটনা, একটি সংঘাতের মাধ্যমে (সিনেমার ভাষায় যাকে বলা হয় Sequecne) একটি বিরাট ও ব্যাপক বিপ্লবী আন্দোলনকে (১৯০৫ সালের বিপ্লব) তার সমস্ত শক্তি, চেতনা, তাৎপর্য ও বিপর্যয়সহ জীবন্ত ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। অক্টোবর বিপ্লব যেমন সারা দুনিয়ার মেহনতি মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিলো তেমনি Battleship Potemkin পুঁজিবাদী দেশের সৎ ও সচেতন সিনেমা শিল্পীদের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছিলো।

মাত্র একটি ঘটনা, একটি সংঘাতের মাধ্যমে (সিনেমার ভাষায় যাকে বলা হয় Sequecne) একটি বিরাট ও ব্যাপক বিপ্লবী আন্দোলনকে (১৯০৫ সালের বিপ্লব) তার সমস্ত শক্তি, চেতনা, তাৎপর্য ও বিপর্যয়সহ জীবন্ত ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। অক্টোবর বিপ্লব যেমন সারা দুনিয়ার মেহনতি মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিলো তেমনি Battleship Potemkin পুঁজিবাদী দেশের সৎ ও সচেতন সিনেমা শিল্পীদের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছিলো। ১৯৫৮ সালে Brussels এ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে Battleship Potemkin কে The best film of all times and Peoples” এবং আইজেনষ্টাইনকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সোভিয়েত সিনামের ইতিহাসকে তিন অধ্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম অধ্যায় হলো ১৯১৭ থেকে ১৯৩০। দ্বিতীয় অধ্যায় হলো ১৯৩০ থেকে ১৯৪১। তৃতীয় অধ্যায় হলো ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৭। প্রথম অধ্যায়ে যে ক’জন কৃতী পরিচালককে আমরা পাই তারা হচ্ছেন, সার্জি আইজেনষ্টাইন (Battleship Potemkin, October, Strike) ভি পুদোভকীন (Mother, The end of St petersburgh, Descendants of Chingis khan) আলেকজান্ডার ডোভজেঙ্কো (Arsenal, Earth) জীগা ভার্তব (Enthusiasm)। একই মতবাদের অনুসারী হলেও এঁদের প্রত্যেকের কাজের পদ্ধতি ছিলো ভিন্ন। প্রত্যেকেই নিজস্ব এক একটা ধারার সৃষ্টি করে গেছেন। এদের প্রত্যেকটি ধারার প্রভাব আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রে এখনো সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাই। আইজেনষ্টাইন ছিলেন আঙ্গিক প্রধান। পুদোভকীন বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক দুটোর প্রতিই সমান জোর দিয়েছেন। ডোভজেঙ্কো হলেন গীতিধর্মী। আর ভার্তব চূড়ান্ত বাস্তবতায় বিশ্বাসী। এদের প্রত্যেকেই মহৎ চিত্র সৃষ্টি করে গেছেন। জীগা ভার্তবের Enthusiasm সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিখ্যাত চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন বলেছেন– `Never had I known that these mechanical sounds could be arranged to seem so beautiful. I regard it as one of the most exhilarating symphonies I have heard.’ দ্বিতীয় অধ্যায় হলো সমাজতান্ত্রিক গঠনের অধ্যায়। সারাদেশ তখন গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত। দেশের তরুণরা তখন রাশিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, নতুন নতুন কল কারখানা, বাঁধ ও শহর তৈরির কাজে। তাই, প্রথম অধ্যায়ের ছবিগুলোতে যেমন বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিষয়বস্তু সবচেয়ে বেশি তেমনি, দ্বিতীয় অধ্যায়ের ছবিগুলোতে এই গঠনমূলক কাজের বিষয়বস্তুগুলো প্রাধান্য পেলো। এ অধ্যায়ের ছবিগুলোর আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চূড়ান্ত বাস্তবতা। `Counter Plan` `The Road to life`, `Golden Hills’, `Alone’ সেলুলয়েডে ধরে রাখা কয়েকটি বাস্তব জীবন দলিল। সার্জ্জি জেরাসীমভের “We are from Kronsdat”, ভ্যাসিলি ব্রাদার্স এর “Chapayev”, মার্ক ডনস্কয়ের “Gorï trilogy”, ভ্লাদিমির প্যাট্রভের “The storm”, মিখাইল বুমের “The dream”, ইয়ুদি রাজিমেন ও আইওনিফ হাইফিটের “Baltic Deputy”, ছবিগুলোতে বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের সমতা রক্ষা করা হয়েছে অতি সুন্দরভাবে। এতে বাস্তবতার আবেদন আরো বেড়েছে। মাঝে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সোভিয়েত সিনেমা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সোভিয়েত শিল্পী ও কলাকুশলীরা তখন স্টুডিওর চত্বর ছেড়ে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্যে সীমান্তে ছুটে যান। ক্যামেরা ছেড়ে রাইফেল তুলে নেন হাতে। তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম দিকের বছরগুলো হচ্ছে যুদ্ধোত্তর পূনর্গঠনের দিন। ফ্যাসিস্ট বর্বরতার ফলে সোভিয়েত সমজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী অঞ্চল তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের বীভৎসতা প্রতিটি নাগরিকের মনে যুদ্ধের প্রতি ঘৃণার জন্ম দিয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সমাজতন্ত্রের শক্তির প্রতি তাদের প্রত্যয় ও বিশ্বাসকে আরো সুদৃঢ় করেছে। এই পারিপার্শ্বিক ও মানসিক অবস্থার মধ্যে সোভিয়েত সিনেমা নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলো। আর যুদ্ধ নয়। আর ধ্বংস নয়। “Maû artists are today turing to the subject of the last war. That is quite understandable. We cannot forget toe war, just as we can’t stop thinking that the next one will be far more terrible……” Mikhail Romm Soviet film Director. “A war brings people together in irreconcilable conflicts, compels them to consider anwe the meaning of their life, of their relations with others. Their conceptions of the world is shattered rudely……my films are all connected with war to on degree or another.” Igor Talankin Soviet Film Director. যুদ্ধের ধ্বংসলীলা, ফ্যাসিজমের বর্বরতা, সমাজতান্ত্রিক মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্যে শত শত তরুণের জীবন বিসর্জ্জন, যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে বিপর্যয় এবং সেই বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করে নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলা–উপরোক্ত বিষয়বস্তু নিয়ে একের পর এক ছবি তৈরি হতে লাগলো। “The cranes are fliing”, “The house I live in”, A ManÕs Destiû”, “Ballad of a soldier”, “Ivan’s Childhood”, “Story of the flaming years”, “Ordinary Fascism.” প্রত্যেকটি ছবি বিষয়বস্তুর উপস্থাপনায়, সম্পাদনার ব্যঞ্জনায়, ক্যামেরার গীতিধর্মী গতিময়তায়, শিল্পীর নিপুন অভিব্যক্তিতে এবং সিনেমার সর্বাধুনিক কুশলতার প্রয়োগে এক অপূর্ব রসের সৃষ্টি করেছে। যে রস দর্শকের অন্তরের অন্তঃস্থলে এক দীর্ঘস্থায়ী আবেদনের সৃষ্টি করে। যখন দর্শক স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে- “Those remarkable works of the cinema art ÒBallad of a soldierÓ, and ÒThe cranes are flyingÓ— strengthens still more my deep faith on Socialism, in its genuinely inexhaustible possibilities for creativity.” -Dean Reed, Famous American Actor and Singer ‘An amaying film called Òordinary Fascism’ is on at the Urainai Cinema in Viena. A must for every democrat, it is a film that enables us to understand why bombs explode- whether in the centre of viena or in North Vietnam.’ -‘Volksstimme’, Austria, September, ৩, ১৯৬৬ শুধু যে যুদ্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে ছবি তৈরি হচ্ছে না নয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক “(“The two”, ‘The journalist’, ‘I am twenty’, ‘A long and happy life’, ‘Clear skies’, ‘The Communists’) খ্যাতনামা দেশি বিদেশি লেখকের চিরন্তন সাহিত্য কীর্তি। (‘Hamlet’, ‘War and Peace’, ‘The lady with the dog’, ‘Anna Krennina’) প্রভৃতি বিষয় নিয়েও সার্থক ছবি তৈরি হচ্ছে। সোভিয়েত চিত্র পরিচালক গ্রিগরী কোজিনৎস্তব তাঁর Hamlet ছবিতে শেক্সপিয়ারকে নবজন্ম দিয়েছেন। এখানে হ্যামলেট নিপীড়িত মানবাত্মার প্রতীক। এখানে হ্যামলেট চিরন্তন সত্যের প্রতীক। সার্জ্জি বন্দুরাকের War and Peace সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ফরাসি পত্রিকা Le Figaro লিখেছে- ‘Go to see `War and Peace’; it is, of course, one of the most splendid works of art, one of the most thrilling and memorable films ever made.’ (Le Figaro, Nov, 26-27, 1966, Louis Chamvet) সোভিয়েত সিনেমা সম্পর্কে কিছু দর্শক ও সমালোচকের কাছ থেকে অনুযোগ শোনা যায় যে- সোভিয়েত ছায়াছবিগুলো নাকি প্রচারধর্মী হয় এবং এতে বড় বেশি বক্তৃতাবাজী থাকে। বাইরে থেকে দেখতে গেলে তা মনে হওয়া স্বাভাবিক। সোভিয়েত সিনেমাকে বুঝতে হলে, সোভিয়েত সিনেমার রস পরিপূর্ণভাবে আস্বাদন করতে হলে সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থা, সমাজতান্ত্রিক সমাজে মানুষের ধ্যানধারণা, ব্যক্তি ও সমষ্টির সম্পর্ক, সেখানকার মানুষের বিভিন্ন মানসিকতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। উপনেবেশিক, আধাউপনেবেশিক, সামন্ততান্ত্রিক, আধাসামন্ততান্ত্রিক অর্থবা বুর্জোয়া সমাজে বাস করে সমাজতান্ত্রিক সমাজের মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন সম্ভবপর নয়। আমরা ছবি তৈরি করি মুনাফার জন্য। আমরা ছবি দেখি চিত্ত বিনোদনের প্রয়োজনে। সোভিয়েত পরিচালক ছবি বানান জীবনের অন্তরঙ্গ রূপকে সেলুলয়েডে ধরে রাখার অভিপ্রায়ে। সে জীবন James Bond মার্কা “০০৭” নয়। সে জীবন যৌবনা নারীর বিকার নয়- “Darling”, সে জীবন সামাজিক কলুষতায় বিধ্বস্ত নয়- “Apartment”. সে জীবন “সবার উপরে মানুষ সত্য” এই নীতিতে বিশ্বাসী। মানুষের কল্যাণ, মানবজাতির কল্যাণ হচ্ছে এই সদা সচেতন মানুষগুলোর সৃষ্টির লক্ষ্যে- …..‘We tell the world that man is born for happiness and that it is the striving for goodness, justice and creative labour that must triumph in society, not base instincts. We tell the world that man has no right to wrap himself up in a concoon of personal interests and concerns, but must realise his responsibility for everything that happens around him.’ -Lev Kulijanov President of the Union of Film makers of the U.S.S.R. q

 

 

 


যে প্রেক্ষাপটে অক্টোবর বিপ্লব

Ussr_Day_of_the_October_Revolution_1938

 

যে প্রেক্ষাপটে অক্টোবর বিপ্লব

 

১৯১৭ খিষ্টাব্দের রুশদেশে নভেম্বর বিপ্লব মানব সমাজের ইতিহাসে সবথেকে বড় সামাজিক বিপ্লব। পুরানো পঞ্জিকার হিসাবে এটাকে অক্টোবর বিপ্লবও বলা হয়। ফরাসি বিপ্লবসহ অন্যান্য বিপ্লবগুলো এক ধরনের শোষণের উচ্ছেদ ঘটিয়ে আর এক ধরনের শোষণ, এক ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে আর এক ধরনের বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। রুশ অক্টোবর বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল মানব সমাজ থেকে সকল প্রকার শোষণ ও বৈষম্যের চির অবসান ঘটানো। এ ধরনের বিপ্লব মানব সমাজে এটাই প্রথম। অবশ্য এর আগে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে প্যারি কমিউন নামে একটা বিপ্লব হয়েছিল যে বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল মানব জাতির ওপর চেপে বসা সকল নিপীড়ন ও বৈষম্যের অবসান ঘটানো। ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ছিল এই বিপ্লবের স্থায়িত্বকাল। বিশ্বের প্রথম প্রলেতারীয় (সর্বহারা শ্রেণি) বিপ্লব ও শ্রমিক শ্রেণির সরকারকে শোষক শ্রেণি উচ্ছেদ করেছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে। অতএব রুশ নভেম্বর বিপ্লবই ছিল শোষণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম সফল বিপ্লব। সাম্যভিত্তিক মানবিক সমাজের যে স্বপ্ন মানুষ যুগ যুগ ধরে লালন করে আসছিল তার রূপায়নই ছিল এই বিপ্লবের লক্ষ্য। শোষণ বৈষম্যের যন্ত্রণায় আর্তনাদরত অমানবিক সমাজ ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করাই ছিল এর লক্ষ্য। রুশ দেশে অক্টোবর বিপ্লব কী কী করেছিল তার মূল্যায়ন করার সময়ে এই বিপ্লব কী কী করতে চেয়েছিল তাকেও বিবেচনায় রাখা উচিত।

নতুন পঞ্জিকা অনুসারে ১৯১৭ সালের মার্চে (১২ মার্চ) রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়। জার রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। একই দিন উত্থান ঘটে শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত। পুরানো পঞ্জিকার হিসাবে (তখন রাশিয়ায় প্রচলিত) এটাকে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব বলা হয়। এই বিপ্লবের ফলে এক সাথে দ’ুটো সংস্থার উদ্ভব ঘটে। একটা হলো বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সরকার, আরেকটি হলো শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত। উল্লেখ্য যে তখন রাশিয়ার রাজধানী ছিল পেট্রোগ্রাড। এটা যেন অনেকটা একটা রাজতন্ত্রী সরকারের পতনের ফলে এক সাথে বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের দুটি সরকারের উদ্ভব। দু’টি সরকারের উদ্ভবের ঘটনা ইতিহাসে অভূতপূর্ব। মূলত শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতের উদ্ভবের মধ্যেই নিহিত ছিল রুশ দেশে নভেম্বর বিপ্লবের ভিত্তি।

এ সম্পর্কে লেনিন লিখেছেন, ‘আমাদের বিপ্লব সৃষ্টি করেছে দ্বৈত ক্ষমতা, এই হলো তার খুবই লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। এই ঘটনাটিকে সর্বাগ্রে উপলব্ধি করতে হবে, এটা না বুঝলে আমরা এগোতে পারবো না। দ্বৈত ক্ষমতার কথা আগে কেউ ভাবেনি, ভাবতে পারতোও না। এই দ্বৈত ক্ষমতাটা কি? বুর্জোয়াদের সাময়িক সরকারের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে আর একটা সরকার, সেটা এখন অবধি দুর্বল, প্রারম্ভিক, কিন্তু নিঃসন্দেহে একটা সরকার, যার প্রকৃত অস্তিত্ব রয়েছে বাড়ছে- শ্রমিক এবং সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলি। ….এটা প্রলেতারীয়েত এবং সৈনিকের উর্দি পরা কৃষকদের নিয়ে গঠিত।’ লেনিনের মতে শ্রমিক কৃষকের অসাধারণ সৃজনী ক্ষমতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সোভিয়েতগুলো সৃষ্টি না করলে নভেম্বর বিপ্লব সম্ভব হতো না।
মার্চ বিপ্লবের ফলে শ্রমিক ও সৈনিকদের পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় পরিণত হয়। গণতন্ত্রের পথে দ্রুত অগ্রযাত্রার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে এই সংস্থা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সাময়িক সরকারকে মেনে নেয়। দুমা সাময়িক কমিটি এবং সোভিয়েত কার্যকরী কমিটি যৌথভাবে কিছু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে কারাগারে ও নির্বাসনে থাকা সকল রাজনৈতিক নেতা কর্মীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা; মতামত প্রকাশ, বক্তৃতা ও সংবাদপত্র প্রকাশ এবং ধর্মঘট করার স্বাধীনতা, সমাবেশ করার স্বাধীনতা, সর্বজনীন গোপন ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা; যুদ্ধরত না থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনীও সংগঠন ও রাজনীতি করার অধিকার লাভ ইত্যাদি।

সেনাবাহিনীর রাজনীতি করার অধিকার লাভ একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বুর্জোয়া অস্থায়ী সরকারের যুদ্ধমন্ত্রী কেরেন্সকি সোলজার্স চার্টার্স জারি করেছিলেন। এর ফলে সৈনিকেরা সাধারণ নাগরিকদের মতো সকল বিষয়ে সমান অধিকার প্রাপ্ত হয়। তারা স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ, যুদ্ধে নিয়োজিত না থাকা অবস্থায় অসামরিক পোশাক পরিধান, রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ত হওয়া ইত্যাদি অধিকার লাভ করে। অফিসারদের প্রতি সৈনিকদের অভিবাদনের প্রথা এবং শারীরিক দন্ড বিধানের ব্যবস্থা রহিত করা হয়। প্রাণদন্ডের বিধানও বাতিল করা হয়। পাশাপাশি শ্রমিক ও সৈনিকদের সোভিয়েত এক ঘোষণা প্রচার করে। এই ঘোষণার ফলে সাধারণ সৈনিকেরা তাদের অফিসারদের নির্বাচনের অধিকার লাভ করে। অস্ত্রশস্ত্র সৈনিকদের হাতেই থাকবে এবং সেনাদলের পর্যবেক্ষণের ভার সৈনিক সমিতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। এই ঘোষণার ফলে সাধারণ সৈনিক ও তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকলো না।

মার্চ বিপ্লবের সময়ে লেনিন রাশিয়ায় ছিলেন না। বিপ্লবের পর তিনি দেশে ফেরেন। বিপ্লবের পর গৃহীত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাবলির ফলাফল সম্পর্কে লেনিন ১৯১৭ সালের ২০ এপ্রিল প্রাভদা পত্রিকায় রাশিয়াকে সবচেয়ে মুক্ত গণতন্ত্রের দেশ বলে উল্লেখ করেন। এ ধরনের অবাধ গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করে লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টি। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর মধ্যে সংগঠন করা ও রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের সুযোগ তারা লুফে নেয়। সেনাবাহিনীর মধ্যে বলশেভিকদের সংগঠন ছিল নভেম্বর বিপ্লবের মূল ভিত্তি। এ সম্পর্কে লেনিন লিখেছিলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ছিল সৈন্যবাহিনীর প্রায় অর্ধেক, লোকসংখ্যায় তা ছিল অন্তত এক কোটি।’ নভেম্বর বিপ্লবকে ভালভাবে বুঝতে হলে অন্তত এই কথাটি মনে রাখা দরকার।

তবে বিশ্বের সবথেকে অবাধ গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব ছিল খুবই কম। ৫ জুলাই থেকে বুর্জোয়াদের অস্থায়ী সরকার গণতন্ত্রের ওপর হামলা শুরু। ৬ জুলাই লেনিনসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে জারি করা হয় গ্রেফতারী পরোয়ানা। লেনিন আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হলেন। লেনিনকে বলা হলো জার্মানির দালাল। অথচ তখন রাশিয়ার সাথে জার্মানির যুদ্ধ চলছিল। লেনিনকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছিল। তবে লেনিনকে গ্রেফতারের জন্য বুর্জোয়া সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত পেট্রোগ্রাডে অনুষ্ঠিত হয় বলশেভিক পার্টির ৬ষ্ঠ কংগ্রেস। আত্মগোপনে থাকায় লেনিন এই কংগ্রেসে উপস্থিত হতে পারেন নাই। তবে তার লেখা প্রবন্ধ ও থিসিসগুলো হয় কংগ্রেসে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি। কংগ্রেসে সর্বসম্মতিক্রমে লেনিনকে বলশেভিক পার্টির নেতা নির্বাচিত করা হয়। সারা দেশ জুড়ে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান চলছিল বিধায় এই কংগ্রেসের খবর গোপন রাখতে হয়েছিল। কংগ্রেস সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ট্রটস্কিকে বলশেভিক পার্টিতে গ্রহণ করা হয়।

এই সময়ে নিরাপত্তার স্বার্থে লেনিন গোপনে ফিনল্যান্ডে অবস্থান করেন। ইতোমধ্যে কেরেন্সকি অস্থায়ী বুর্জোয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রাপ্ত হন (জুলাই)। তিনি জেনারেল কর্নিলভকে সেনাবাহিনীর প্রধান নিয়োগ করেন। কর্নিলভ ঘোষণা করেন (আগস্ট), ‘লেনিন যাদের নেতা সেই জার্মান গুপ্তচর সমর্থকদের এখনই নির্মূল করতে হবে; শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত এখনই ভেঙে দিতে হবে। যাতে তারা আর একত্রিত হতে না পারে।’ এক পর্যায়ে কর্নিলভ কেরেন্সকি সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। তবে সেই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং কর্নিলভকে গ্রেফতার করা হয়। কর্নিলভের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ফলে সরকার ও সেনাবাহিনীর অবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

কর্নিলভ যেদিন গ্রেফতার হন সেদিন অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বর (নতুন পঞ্জিকা অনুসারে) পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতে [এত দিন যেখানে মেনশেভিক ও সোশালিস্ট রেভেল্যুশনারি নিয়ন্ত্রণ ছিল] বলশেভিকদের পক্ষে একটি প্রস্তাব পাশ হয়। পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত বলশেভিকদের পক্ষে যোগদান করে। এর পাঁচ দিন পর মস্কো সোভিয়েতও বলশেভিকদের পক্ষে যোগদান করে। এর পর অন্যান্য শহরের সোভিয়েতগুলো ক্রমে ক্রমে একই পথ অবলম্বন করে বলশেভিকদের পক্ষে যোগদান করে। এর আগে জুলাই মাসে অস্থায়ী সরকার বলশেভিকদের ওপর দমন পীড়ন শুরু করলে তাদের অবস্থা সঙ্কটে পড়ে। এবার বলশেভিকদের অবস্থার দ্রুত উন্নতি শুরু হয়। কর্নিলভ ঘটনার পর তাজা বাতাস বলশেভিকদের পালে হাওয়া লেগে তাদের যেন সামনে নিয়ে এলো। লেনিন লিখেছেন, ‘শ্রমিক ও সৈনিকদের সোভিয়েতে সংখ্যাধিক্য লাভ করায় রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারে বলশেভিকরা এবং তারা অবশ্যই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে। উভয় রাজধানীতে শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতে বলশেভিকরা সংখ্যাধিক্য লাভ করেছে। …. পেট্রোগ্রাড ও মস্কোতে অবিলম্বে ক্ষমতা দখল করতে হবে।’

অক্টোবরে লেনিন দেশে ফিরে আসেন [পুরাতন পঞ্জিকা অনুসারে]। ১০ অক্টোবর বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির গোপন অধিবেশনে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন লেনিন। এর ছয় দিন পর কেন্দ্রীয় কমিটির আর একটি অধিবেশন হয় কালিনিনের সভাপতিত্বে। লেনিন এতে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। ওই অধিবেশনে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কেন্দ্রীয় কমিটি পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতে গঠন করে বৈপ্লবিক সামরিক কমিটি। পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের সভাপতি ছিলেন ট্রটস্কি।

৭ নভেম্বর ১৯১৭ বলশেভিক পার্টি পেট্রোগ্রাডে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেরেন্সকি পালায়ন করেন। এই সশস্ত্র বিপ্লবে কোন রক্তপাত হয়নি। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পর লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা সরকার গঠন করে। বুর্জোয়াদের বহুল ব্যবহৃত গতানুগতিক মন্ত্রিসভা শব্দটি লেনিন বর্জন করেন। তিনি তার মন্ত্রিসভার নামকরণ করেন ‘পিপলস কমিশার্স’। তিনি হন এর সভাপতি।

বলশেভিক পার্টি ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে একটা ঘোষণা জারি করে। তা হলো; রাশিয়ার নাগরিকদের প্রতি! সাময়িক সরকার ক্ষমতাচ্যুৎ। রাষ্ট্র ক্ষমতা শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের সংস্থা- সামরিক বিপ্লবী কমিটির হস্তগত, পেট্রোগ্রাড প্রলেতারিয়েত ও গ্যারিসনের নেতৃত্ব করছে এই কমিটি। জনগণ যে অভীষ্টের জন্য লড়েছিল; অবিলম্বে গণতান্ত্রিক শান্তির প্রস্তাব, জমির ওপর জমিদারি স্বত্বের অবসান; উৎপাদনের ওপর শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণ সোভিয়েত সরকার গঠন সেই লক্ষ্য নিশ্চিতভাবে অর্জিত হয়েছে। শ্রমিক সৈনিক ও কৃষকদের বিপ্লব জিন্দাবাদ।

সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে বলশেভিক পার্টির সংগঠন থাকায় ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীই ৭ নভেম্বর মূল ভূমিকা পালন করে। এ জন্য জন রিড তাঁর ‘দুনিয়া কাপানো দশ দিন’ বইতে নভেম্বর বিপ্লবকে বলশেভিক ক্যুদেতা বলেও উল্লেখ করেছেন। নভেম্বর বিপ্লব ভালভাবে বুঝতে হলে সশস্ত্র বাহিনীর এই ভূমিকা বোঝা দরকার।

বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা সোভিয়েতকে এত ঘৃণা করতো যে, শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতকে বলতো ‘কুকুর প্রতিনিধিদের সোভিয়েত’। আলবার্ট রিচ উইলিয়মস লিখেছেন, ‘বলশেভিক পার্টির শতকরা ৯৬ জন ছিলেন শ্রমজীবী। সরাসরি শ্রমিকের জীবন থেকে আসেন নাই এমন সব বুদ্ধিজীবীও অবশ্য পার্টিতে ছিলেন। তবে লেনিন আর ট্রটস্কি দুঃখকষ্টের জীবনের এত কাছাকাছি ছিলেন যে, গরিব মানুষের ভাব ভাবনার কথা তাঁদের জানা ছিল।’

নভেম্বর বিপ্লব যখন সম্পন্ন হয় তখনও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। এই যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে। অসংখ্য মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ফলে কলকারখানা ও কৃষিতে কাজের মানুষের অভাব দেখা দিয়েছে। অস্ত্রশস্ত্রের অভাব, মন্ত্রীদের দুর্নীতি, রাষ্ট্র যন্ত্রের বিশৃঙ্খল অবস্থা, জারের দরবারে মূর্খ রাজপুটিনের অপ্রতিহত প্রভাব ইত্যাদির ফলে রাশিয়ায় ঘনিয়ে আসে এক ভয়াবহ সঙ্কট। যুদ্ধেও জারের সৈন্যবাহিনীর হার হচ্ছিল। এই ব্যাপক অরাজক অবস্থার আসল চাপটা পড়েছিল রাশিয়ার শ্রমিক ও কৃষকদের ওপর। বলতে গেলে জারের শাসন ব্যবস্থা নিজ থেকেই ভেঙে পড়েছিল। শান্তির জন্য মানুষ ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতেই রাশিয়াতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে উদ্ভুত পরিস্থিতি এই বিপ্লবের সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব মানুষের শান্তির আকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। জারের আমলে শুরু হওয়া সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ অব্যাহত রাখে বুর্জোয়া সরকার। অথচ রাশিয়ার মানুষের চাওয়া ছিল যুদ্ধের অবসান। এই পরিস্থিতি নভেম্বর বিপ্লবের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে দেয়।

একটা দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হলে সে দেশে বিপ্লবের পরবর্তি স্তর হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। তাই রাশিয়ায় তখন থেকে শুরু হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর। ভারতের সুব্রত বল লিখেছেন, ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর শুরু হওয়া, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হওয়া এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সামাজিক দায়িত্বসমূহ শুরু হওয়া এক জিনিস নয়। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরের সূচনা নির্ধারিত হয় বুর্জোয়া শ্রেণির রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল দ্বারা, আর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা নির্ধারিত হয় শ্রমিক শ্রেণির একচ্ছত্র ক্ষমতা কায়েমের দ্বারা [শ্রমিক শ্রেণির সেই সরকার কখন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সামাজিক দায়িত্বসমূহের রূপায়ন শুরু করতে পারছে তার দ্বারা নয়]। যদিও কৃষি প্রধান রাশিয়ার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে ১৯১৭ সালের নভেম্বর বিপ্লবের ফলে সর্বশ্রেণির কৃষকের যৌথ ক্ষমতা কায়েম হয়েছিল এবং যদিও দীর্ঘ এক বছর যাবৎ গ্রামের বিপ্লব বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক স্তরের সীমা অতিক্রম করেনি। তবু যেহেতু শ্রমিক শ্রেণি একচ্ছত্রভাবে রাশিয়ায় কেন্দ্রীয় অর্থাৎ নির্ধারক ক্ষমতা দখল করে নিতে পেরেছিল, তাই বলা হয় যে অক্টোবর বিপ্লব ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা।’

নভেম্বর বিপ্লবের সময়ে রাশিয়া ছিল কৃষি প্রধান দেশ। জনসাধারণের ৮০ শতাংশ ছিল কৃষক। কৃষকের সমস্যার সমাধান ছাড়া দেশের উন্নতি ছিল অসম্ভব। কৃষি ছিল অত্যন্ত পশ্চাৎপদ এবং তাতে ভূমিদাস প্রথার চিহ্নিত সামন্তবাদী অবশেষসমূহ বিদ্যমান ছিল। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যমান ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদন ইউনিটগুলো ছিল সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের বাধা। এক কথায় রাশিয়া তখন ছিল চাষাদের দেশ। পুরো দেশটাই ছিল এই অবস্থার প্রভাবাধীন। হয়তো এই জন্যই সৈনিকদের বলা হতো উর্দি পরা কৃষক অর্থাৎ সামরিক পোশাক পরলেও তারা কৃষক। একইভাবে শিল্প শ্রমিকদের নতুন প্রজন্মের অধিকাংশই ছিল কারখানার পোশাকে কৃষক। ই.এইস.কারের মতে, কৃষকদের একটা ধূসর পুঞ্জ রাতারাতি পরিবর্তিত হয়েছে কারখানা শ্রমিকদের ধূসর পুঞ্জে।’রাশিয়ার এই ব্যাপক পশ্চাৎপদতা থেকে উদ্ভুত কয়েকটি কারণ নভেম্বর বিপ্লবের বিজয়কে এগিয়ে দিয়েছে। নভেম্বর যে কর্তব্যের সম্মুখীন হয় তা ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং কম সংগঠিত বুর্জোয়া শ্রেণিকে উৎখাত করা। দ্বিতীয়ত লেনিনের ভাষায়, ‘রাশিয়ার পশ্চাৎপদতা এক অদ্ভুত উপায়ে সর্বহারার বুর্জোয়া বিরোধী বিপ্লবকে কৃষকের জমিদার বিরোধী বিপ্লবের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।’

কৃষকদেরকে কারখানায় ঢুকিয়ে তাদের ওপর কারখানা শৃঙ্খলা আরোপ করায় তাদের সাথে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের শ্রেণি বিরোধ উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর তুলনায় বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। ই.এইস. কারের মতে, ‘পাশ্চাত্যের অগ্রসর প্রলেতারিয়েতের চেয়ে দুর্বল পশ্চাৎপদ রুশ প্রলেতারিয়েত প্রলেতারীয় বিপ্লবের জন্য বেশি উর্বরভূমি যোগান দিয়েছে।’এর ফলে বিপ্লবের জন্য আত্মগত প্রয়াস অর্থাৎ ওপর থেকে বিপ্লবের (সংগঠন কর্তৃক বিপ্লবের প্রয়াস) পাশাপাশি নিচু থেকে বিপ্লবের (সাধারণ শ্রমিকদের বিপ্লবের চেষ্টা) পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়। অন্যভাবে ব্যাখ্যা করলে বলা যায় শোষিত নিপীড়িত শ্রেণি কর্তৃক ন্যায়বিচার ও সাম্যের দাবিতে আন্দোলনের ব্যাপারটাই (নিচু থেকে বিপ্লব) বিপ্লবের জন্য যথেষ্ট নয়; শোষক নিপীড়কদের মধ্যে সঙ্কটেরও প্রয়োজন রয়েছে। নভেম্বর বিপ্লবের সময়ে এই দুই পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। শোষিত-নিপীড়িতদের পক্ষ থেকে শোষিত-নিপীড়িত হতে না চাওয়া অর্থাৎ শোষণের জোয়াল ফেলে দেওয়ার প্রয়াস এবং শোষক-নিপীড়কের পক্ষে শোষণ-নিপীড়ন চালিয়ে যেতে অক্ষমতা বিপ্লবী পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। যে দেশে জনগণের শতকরা ৮০ জন কৃষক সেদেশে ভূমি সমস্যা যে একটা জ্বলন্ত সমস্যা তা বলাই বাহুল্য। কৃষিতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের চরিত্রের পরিবর্তন সাধনের কোন পদক্ষেপ-ই নেয়নি অস্থায়ী বুর্জোয়া সরকার। এ জন্য বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধরনের অনেক কাজই করতে হয়েছে বলশেভিক সরকারকে। অবশ্য বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের আর্থ সামাজিক দায়িত্বগুলোর রূপায়ন সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে অস্থায়ী বুর্জোয়া সরকার কাজগুলো শুরুই করে নাই। এন.এম. বরোদিন তাঁর ‘ওয়ান ম্যান ইন হিজ টাইম’এ সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। বরিসভ নামক এক রুশ রাজনীতিক বলেন, ‘গরিব কৃষকরা কী তাদের জমি পেয়েছে? না খনি শ্রমিকরা কী খনিগুলির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভ করেছে? না। আমরা অবশ্যই তাদেরকে (বুর্জোয়া সরকার ও রাষ্ট্র যন্ত্রকে) ঝেঁটিয়ে দূর করবো। আমরা অবশ্যই এ সব কীটপতঙ্গকে তাদের সব কিছুসহ ধ্বংস করবো এবং তাদের ধ্বংস স্তূপের ওপর গরিবদের প্রজাতন্ত্র গড়ে তুলবো।’ধনীদের রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে গরিবদের রাজত্ব কায়েমের একটা আকাক্সক্ষা তখন রাশিয়ার জনগণের মধ্যে বিরাজমান ছিল। এটাও নভেম্বর বিপ্লবের অনুকূল একটা বিষয় ছিল।

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব হওয়ার মাত্র আট মাসের মধ্যে সমাজতন্ত্রের জন্য অবস্থা পরিপক্ক হওয়া খুব স্বাভাবিক ছিল না। এ যেন আট মাসের মধ্যে একটা নবজাতকের যুবকে পরিণত হওয়া; যে বোঝা বহন করার জন্য যুবকের প্রয়োজন সে বোঝা নবজাতক কিভাবে বহন করবে? নভেম্বর বিপ্লবের ভিত্তিতে এই দুর্বলতা ছিল। এ জন্য লেনিন আর্থ সামাজিক দায়িত্বগুলো সম্পাদনের দিক থেকে নভেম্বর বিপ্লবকে অনেকটা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে উল্লেখ করেছিলেন। লেনিন একবার বলেছিলেন, ‘১৯১৭ সালের অক্টোবরে আমরা ক্ষমতা দখল করি সমগ্র কৃষক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একত্রে। এ ছিল একটা বুর্জোয়া বিপ্লব, কেননা গ্রামাঞ্চলে তখনও অবারিত হয়নি। আগে বলেছি গ্রামাঞ্চলে সত্যিকার প্রলেতারীয় বিপ্লব শুরু হয় মাত্র ১৯১৮ সালের গ্রীষ্মে। এ বিপ্লবকে জাগিয়ে তুলতে না পারলে আমাদের কাজ থাকতো অসম্পূর্ণ। অবশ্য ১৯১৭ সালের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর লেনিন লিখেছিলেন যে রাশিয়াতে সমাজতন্ত্র রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তিনি লিখেছিলেন, এখনই সমাজতন্ত্র প্রবর্তন নয়, আসন্ন বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষকে ঠেকাবার জন্য অবিলম্বে জরুরি বৈপ্লবিক ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে এই মুহূর্তের করণীয়।’

সত্যিকার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিক শ্রেণির সরকার তথা সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব। ৭ নভেম্বর ১৯১৭ লেনিনের নেতৃত্বে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, লেনিন তাকে ‘শ্রমিক কৃষকের সরকার’বলে ঘোষণা করেন। যে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষক সে দেশে এমন না করে উপায় ছিল না। যাহোক শান্তির জন্য মানুষের ব্যাকুলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে লেনিন ৮ নভেম্বর ঘোষণা করেন শান্তির ডিক্রি। এতে তিনি ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আলাপ আলোচনা শুরু করতে সমস্ত যুদ্ধমান জাতি ও তাদের সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। নভেম্বর বিপ্লবের প্রথম কথাই হলো শান্তি চাই। এরপর একই দিন তিনি ঘোষণা করেন ভূমি সংক্রান্ত ডিক্রি। এতে তিনি কোন খেসারত ছাড়াই জমিতে জমিদারের মালিকানা বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এখন থেকে বাজেয়াপ্ত করা জমিসহ সকল ভূমির মালিক হবে সমগ্র জনগণ। উল্লেখ্য জমিদারি জমির সাথে সেগুলোর সমস্ত পশুসম্পদ, সরঞ্জাম, ঘরবাড়ি ও সেগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট সব কিছু বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার লোপ করা হয়। নিজেদের শ্রমে যতটুকু জমি চাষ করা সম্ভব কৃষক পাবে শুধু ততটুকু জমি; মজুর খাটানো নিষিদ্ধ। কৃষি সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে এই ডিক্রিতে বিস্তারিত কর্মসূচি রয়েছে। ৯ নভেম্বর শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে খসড়া প্রবিধান ঘোষণা করেন লেনিন। যেসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক আর কর্মচারীর সংখ্যা পাঁচের কম নয়, সেসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয় এতে। এ লক্ষ্যে এ প্রবিধানে বিস্তারিত কর্মসূচি রয়েছে। এই হলো নভেম্বর বিপ্লব। ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ছিল রক্তপাতহীন। কিন্তু উৎখাত হওয়া শাসক শোষক শ্রেণি পরবর্তি সময়ে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু করে। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের মদতপুষ্ট এই শাসক শোষক শ্রেণি অবশেষে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।

লেখকঃ আবদুল মন্নান

 

সূত্রঃ 

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n