কমরেড শ্রীধর শ্রীনিবাসনের মৃত্যুতে সিপিআই (মাওবাদী) কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি

সিপিআই(মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় সদস্য কমরেড শ্রীধর শ্রীনিবাসন

সিপিআই(মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় সদস্য কমরেড শ্রীধর শ্রীনিবাসন

[লাল সংবাদ কর্তৃক অনূদিত]

গত ১৮ই আগস্ট ২০১৫, আমাদের দেশের নিপীড়িত জনগণ ও ভারতীয় বিপ্লবের অনুকরণীয় আদর্শের এক কমিউনিস্ট নেতৃত্বকে হারিয়েছে। এক উজ্জ্বল বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী-কমরেড শ্রীধর শ্রীনিবাসন, যিনি বিপ্লবী শিবিরে ‘বিষ্ণু ও বিজয়’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, একটি তীব্র হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। সিপিআই(মাওবাদী) কেন্দ্রীয় কমিটি, এই কেন্দ্রীয় সদস্যের মৃত্যুতে বিনীত লাল শ্রদ্ধা জানাচ্ছে এবং যার জন্যে তিনি বেঁচে ছিলেন ও মৃত্যুবরণ করেন, সেই বিপ্লবী আদর্শ পূর্ণ করার প্রতিজ্ঞা করছে।

একজন বিপ্লবী হিসেবে তার পথচলা

এটা ছিল ১৯৭৮-৭৯, মুম্বাইয়ের এলফিনস্টোন কলেজে আর্টসের তরুণ ছাত্র থাকাকালীন কমরেড শ্রীধর বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি প্রভাবিত হন ও দেশের নিপীড়িত জনগণের জন্য কাজ করতে গিয়ে তার পড়াশুনা ছেড়ে দেন। এর পরের ৩৫ বছর তিনি অকুতোভয় মনোভাব এবং দৃঢ় সংকল্পের সাথে জনগণের সেবা করে যান। কমরেড শ্রীধর শ্রীনিবাসন ছাত্রদের সংগঠিত করেন এবং বিদ্যার্থী প্রগতি সংগঠন (ভিপিএস) এর ব্যানারে মুম্বাইতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি ১৯৭৯ সালে ছাত্রদের কর্তৃক মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে(ফি বাড়ানোর বিরুদ্ধে) আন্দোলনের অন্যতম ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ছিলেন। আন্দোলন যখন তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তিনি আবার নওজোয়ান ভারত সভার (NBS) ব্যানারে তরুণদের সংঘবদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

৮০ সালের শুরুর দিকে মিলের শ্রমিকদের ধর্মঘট চলাকালে NBS, দত্ত সামন্তের নেতৃত্বাধীন মিল শ্রমিক ইউনিয়নের সাথে মিলে শ্রমিকদের সংগঠিত করেন।ধর্মঘট চলাকালে তিনি অনেক সামরিক অ্যাকশনের মূল সংগঠক ছিলেন। এই সময় তিনি নগর কমিটির সদস্য হন এবং নিকটবর্তী শিল্পাঞ্চল থানে, ভিওান্ত ও সুরাত সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন প্রসারিত করেন। পরে, ১৯৯০ সালে পার্টির সিদ্ধান্তে তিনি বিদর্ভ অঞ্চলে যান, যেখানে চন্দ্রপুর, ভানি এবং এর কাছাকাছি এলাকা গুলোতে খনি শ্রমিকদের সংগঠিত করেন।

যখন পার্টি মহারাষ্ট্র রাজ্য কমিটির গোন্দিয়া-বালঘাট বিভাগের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন, তখন তিনি দায়িত্বটি নেন এবং বিদর্ভ অঞ্চলের দৃষ্টিকোণ থেকে আন্দোলনটি বিকাশের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে, তিনি দক্ষতার সাথে মহারাষ্ট্রের রাজ্য সম্পাদক হিসেবে পার্টির নেতৃত্ব দেন । তিনি ২০০১ সালে সিপিআই (মাওবাদী) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ঐক্য কংগ্রেসে (৯ম কংগ্রেস) কেন্দ্রীয় কমিটিতে পুনর্নির্বাচিত হন। তিনি আন্দোলনের ভালো এবং খারাপ সময়গুলোতে অবিচল ভাবে পার্টির লাইন রক্ষার করেন। পার্টি ও এর লাইনের প্রতি তার অটল আস্থা ছিল। তিনি পার্টির ভেতরে জেগে উঠা যে কোন সুবিধাবাদী প্রবণতাকে বিরোধিতা করতেন। তিনি আন্দোলনের প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন সত্ত্বেও দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পার্টি তাকে বিশ্বস্ততার সাথে যে দায়িত্ব দিতেন, তিনি পিছু হটে না গিয়ে স্তম্ভের মত দাঁড়িয়ে থেকে সেই দায়িত্ব পালন করতেন।একজন মহান নেতা হিসেবে, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বিপ্লবের প্রতি তার অটল অঙ্গীকার, ইস্পাতের মত দৃঢ় শক্তি ও সংকল্প নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন।

গ্রেফতার এবং তার জেল জীবন

২০০৭ সালের আগস্টে তিনি গ্রেফতার হন। এ সময় দিনের পর দিন তিনি জিজ্ঞাসাবাদ ও মানসিক নির্যাতনের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও শত্রুর কাছে নত হননি। রাষ্ট্র চালাকি করে তার বিরুদ্ধে ৬০টি মামলা সাজিয়ে তাকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ করে রাখার সাধ্যমত চেষ্টা করে এবং মিথ্যা মামলায় ৬ বছর ধরে দোষী সাব্যস্ত করে রাখে। তিনি তার সাথে জেলে থাকা তরুণ কর্মীদের শিক্ষিত করার পাশাপাশি অনুপ্রাণিত করতেন। তিনি কখনই বিশ্রাম নিতেন না, বই পড়ে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির নিয়ে পড়াশুনা করেই সময়কে কাজে লাগাতেন। তিনি বিভিন্ন ইসলামী কর্মীদের সাথে পারস্পরিক আলোচনার পাশাপাশি তাদের আন্দোলনকে বোঝার চেষ্টা করতেন। ভোরের সময়টিতে তিনি বিভিন্ন জেলে বন্দি কমরেডদের প্রতি বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক লেখা ও দীর্ঘ চিঠি লিখে সময়কে ব্যবহার করতেন। ২০১৩ সালের আগস্টে তিনি মুক্তি পান।

জেল জীবন তার মনোবলকে ভাঙ্গতে পারেনি, যদিও তার শরীরের উপরে এর মাশুল নিয়েছে। মুক্তির পর তিনি পরিবারের সাথেই থাকতেন এবং সভার কাজ ও আন্দোলন সম্পর্কে প্রচার করে এই সময়গুলোকে কাজে লাগাতেন। তিনি তার কমরেডদের সাথে যোগ দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু, তাদের সঙ্গে দেখা করার পথে তিনি মারা যান।তার ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে গেছে। কমরেড শ্রীধরের শাহাদাত আন্দোলনের জন্য বড় ধরণের আঘাত। আমাদের দেশের সর্বহারা শ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণ তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ এক সন্তানকে হারিয়েছে যিনি নিঃস্বার্থ ভাবে, তাদেরই স্বার্থ ও তার হৃদয়ে থাকা বিপ্লবী স্বার্থের জন্যে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে তাদের সেবা করে গেছেন।

কমরেড শ্রীধর লক্ষ লক্ষ ভারতীয় জনসাধারণ ও পার্টির পদে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।আমাদের পার্টি কমরেড শ্রীধরের আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে। আমরা নিরলস ভাবে তার স্বপ্ন পূরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমাদের সিপিআই(মাওবাদী) কেন্দ্রীয় কমিটি তার প্রতি মাথা নুইয়ে লাল শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তার পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং তাদের দুঃখে সম অংশীদার হিসেবে এটা প্রেরণ করছি।

কমরেড শ্রীধর শ্রীনিবাসন যার জন্যে প্রাণ দিলেন সেই মহান আদর্শকে পরিপূর্ণ করতে চলুন আমরা আবারো নিজেদের অঙ্গীকার করি।

(অভয়)

মুখপাত্র

কেন্দ্রীয় কমিটি

সিপিআই (মাওবাদী)

 

 

অনুবাদ সূত্রঃ http://www.signalfire.org/2015/09/22/cpi-maoist-cc-statement-on-the-death-of-comrade-sridhar-srinivasan/

Advertisements

মাওবাদীরা কখনো ভুলে না, কখনো ক্ষমা করে নাঃ একটি বিশ্লেষণ(রিপোর্ট-২ ও শেষ পর্ব)

ভারতের মাওবাদী প্রভাবিত জেলা সমূহ

ভারতের মাওবাদী প্রভাবিত জেলা সমূহ

ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের (Institute for Conflict Management) সহকারী গবেষক, মৃণাল কান্ত দাস ভারতের মাওবাদীদের উপর একটি গবেষণা রিপোর্ট তৈরি করেছেন।

লাল সংবাদ‘ রিপোর্টটি বাংলায় (রিপোর্ট-২ ও শেষ পর্ব) প্রকাশ করছে-

Maoists_1

মাওবাদীরা কখনো ভুলে না, কখনো ক্ষমা করে নাঃ একটি বিশ্লেষণ

২০০৫ এ ১৪ জন, ২০০৬ এ ৬ জন, ২০০৭ এ ২ জন, ২০০৮ এ ৫ জন, ২০০৯ এ ৮ জন, ২০১০ এ ১২ জন, ২০১১ এ ৪ জন, ২০১২ এ ৭ জন, ২০১৩ এ ৪ জন, ২০১৪ এ ৬ জন ও ২০১৫ এ ২ জন নিহত হয়েছে। বস্তার অঞ্চলে নিহত ৪ মাওবাদী ক্যাডার এই তালিকায় নেই কারণ তারা আত্মসমর্পণ করেনি। মাওবাদীদের সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী ঘাঁটি বস্তার এলাকায় সাম্প্রতিক আত্মসমর্পণের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই চলমান হত্যাগুলোকে দেখতে হবে।

SATP সংগৃহীত আংশিক তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে এখন পর্যন্ত ২৫১ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছে।

২০০৫ সাল থেকে অন্তত ৪,২৪৫ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছে (২রা অগাস্ট ২০১৫ পর্যন্ত)। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ২০১৫ সালে অন্ধ্র প্রদেশে ৮ জন ‘ডেপুটি কমান্ডার’, মহারাষ্ট্রে ১ জন ‘সেকশন কমান্ডার’ ও ১ জন কমান্ডার,  তেলেঙ্গানায় ১ জন স্থানীয় গেরিলা স্কোয়াড কমান্ডার ও ১ জন স্থানীয় অপারেশন স্কোয়াড কমান্ডার আত্মসমর্পণ করেছে। তবে ‘কমান্ডার’ পদে আত্মসমর্পণের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ছত্তিসগড়ে; এখানে ১ জন ‘বিভাগীয় কমান্ডার’, ৩ জন ‘ডেপুটি কমান্ডার’, ৫ জন কমান্ডার, ১ জন মিলিশিয়া কমান্ডার, ১ জন স্থানীয় গেরিলা স্কোয়াড কমান্ডার, ১ জন স্থানীয় অপারেশন স্কোয়াড কমান্ডার, ১ জন সেকশন কমান্ডার ও ২ জন প্লাটুন কমান্ডার আত্মসমর্পণ করেছে।

২০১৫ সালে ঝাড়খন্ডে কমান্ডার পদের কোন আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটেনি।

ছত্তিসগড়ে আকস্মিক আত্মসমর্পণের ঘটনার বৃদ্ধি দেখে ২০১৪ সালের ১লা নভেম্বর মাওবাদী নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ছত্তিসগড়ে কর্তব্যরত সাংবাদিকদের সতর্ক করে দেয়া হয় যাতে করে পুলিশের কাছে মাওবাদী ক্যাডারদের আত্মসমর্পণের বিষয়ে তারা কোন সহায়তা প্রদান না করে।

এক প্রেস বিবৃতিতে সিপিআই (মাওবাদী) এর দক্ষিণ আঞ্চলিক কমিটির সেক্রেটারি গণেশ উইক ঘোষণা দেন, “ভুয়া আত্মসমর্পণের প্রতি নিন্দা জানাতে ও গণ আন্দোলনকে যারা ঠকিয়েছে তাদেরকে এ বিষয়ে উৎসাহ প্রদান না করতে আমরা সাংবাদিক ভাইদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি”।

কোনরকম আলোচনা ছাড়াই যারা আত্মসমর্পণ করে কিংবা যারা পালিয়ে যাবার পরিকল্পনা করে মাওবাদী নেতৃত্ব তাদেরকে সবসময়ই ঘৃণা করে। যদিও নেতৃত্বের অনুমতি নিয়ে পার্টির কিছু শ্রেণীর ক্যাডাররা আত্মসমর্পণের অনুমতি পাবে এধরনের একটি স্থায়ী নীতিমালা রয়েছে।

তবে এই আত্মসমর্পণ নীতিমালার সুযোগে বয়স্ক ও অসুস্থ ক্যাডারদেরকে ‘অবসর’ প্রদান করার ঘটনাও  রয়েছে যাদের অনেকে পরবর্তীতে মাওবাদী সমর্থিত প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছেন।

২০১৫ সালের ২৩শে জুলাই কাংকার জেলার পাখানজোর এলাকা থেকে গ্রেফতারকৃত মানসিং ওরফে অর্জুনকে গ্রেফতারের পর এ ধরনের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

কাংকারের এসপি জীতেন্দ্র সিং মীনা বলেন অর্জুন ২০০০ সাল থেকে মাওবাদীদের সাথে জড়িত, প্রথমদিকে সে ‘অস্থায়ী সদস্য’ হিসেবে কাজ করত তবে পরে তাকে অপরিশোধিত আগ্নেয়াস্ত্র জড়ো করা ও বন্দুক, রাইফেল মেরামতের দায়িত্ব দেয়া হয়।

মাওবাদী নেতাদের কথায় মানসিং আত্মসমর্পণ করে; তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। পরে সে জামিনে মুক্তি পায় এবং আবার আন্ডারগ্রাউন্ড আন্দোলনে যোগ দেয়।

পুনরায় যোগদানের পর তাকে কুলি জনমিলিশিয়ার (গণ মিলিশিয়া) কমান্ডার পদমর্যাদা প্রদান করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার কারণে তাকে পদাবনতি দিয়ে পুনরায় অস্ত্র মেরামতের কাজে নিয়োগ দেয়া হয়, গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত সে এই কাজই করত।

তার পূর্বের আত্মসমর্পণের মূল কারণ পরিস্কার নয় তবে এটা তার ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে হতে পারে আবার আত্মসমর্পণ চক্র সম্পর্কে মাওবাদী নেতৃত্বের আরো বেশি জানার আগ্রহের কারণেও হতে পারে।

আত্মসমর্পণ যেখানে অবৈধ সেখানে প্রথমে ব্যক্তিটিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, পরে সতর্ক করে দেয়া হয় এবং গণমাধ্যমের মধ্য দিয়েও জোরালোভাবে সমালোচনা করা হয়।

যে সকল প্রাক্তন কমরেড ‘পার্টি বিরোধী কর্মকাণ্ডে’ লিপ্ত আছে বলে মনে করা হয় মাওবাদীরা তাদেরকে বর্জন করে।

‘বর্জন করা’ যেখানে শেষ সমাধান সেখানে আত্মসমর্পণ করা বেশ কয়েকজন নেতা বর্তমানে বেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

২০০৭ সালের ২০শে জুন তৎকালীন অবিভক্ত অন্ধ্র প্রদেশের গুনতুর জেলার ৫ জন আত্মসমর্পণকারী মাওবাদীকে সতর্ক করে বলা হয় যে পুলিশের সাথে মেলামেশা বন্ধ না করলে তাদেরকে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ সম্মুখীন হতে হবে।

একইভাবে ২০১৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি সিপিআই (মাওবাদী) এর দক্ষিণ গাদচিরোলি ‘বিভাগীয় কমিটি’ এর প্রাক্তন ‘সেক্রেটারি’ শেখর ওরফে মাল্লায়া ও তার স্ত্রী বিজয়ার সমালোচনা করে কারণ তারা ২০১২ সালে অন্ধ্র প্রদেশ সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।

২০১৩ সালের ৯ই জুন সিপিআই (মাওবাদী) এর একটি ‘অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিশন’ পলিটব্যুরো সদস্য কিষেণজির মৃত্যুর জন্য আত্মসমর্পণকারী মাওবাদী নেত্রী সুচিত্রা মাহাতোকে দোষারোপ করে; ২০১১ সালের নভেম্বরে পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কিষেণজির মৃত্যু হয়।

সুজাতাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সিপিআই (মাওবাদী) এর কেন্দ্রীয় কমিটি ‘ষড়যন্ত্রের’ সাথে লিপ্তদের প্রতি ‘প্রতিশোধ গ্রহণ’ করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানায়।

২০১৪ সালের ১৩ই জানুয়ারি দণ্ডকারণ্য বিশেষ জোনাল কমিটির রাজ্য কমিটির সদস্য প্রসাদ ওরফে গুদসা উসেন্দি ওরফে সুখদেবের আত্মসমর্পণকে নিন্দা জানায় সিপিআই (মাওবাদী)।

দণ্ডকারণ্য বিশেষ জোনাল কমিটির (DKSZC) পরবর্তী মুখপাত্রও গুদসা উসেন্দি ছদ্মনামে কাজ করতেন; তিনিও DKSZC এর সদস্য অর্জুন ও তার স্ত্রী রণিতার আত্মসমর্পণকে নিন্দা জানান। অর্জুন ও রণিতা ২০১৪ সালের ১লা অগাস্ট তেলেঙ্গানা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

পার্টি জানায় এই দম্পতির পক্ষে আন্দোলনের ‘কঠিন সময়’ সহ্য করে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।

‘কঠিন সময়ের’ সাথে আরো বিশদভাবে যুক্ত হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের আকর্ষণীয় আত্মসমর্পণ নীতিমালা যাতে রয়েছে বড় ধরনের আর্থিক পুরস্কার ও পুনর্বাসন প্রকল্প; এসব আর্থিক পুরস্কার ও প্রকল্প অনেক মাওবাদীকে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পুনরায় চিন্তা করতে বাধ্য করেছে।

মাওবাদী অধ্যুষিত রাজ্যগুলোর সরকার আত্মসমর্পণকারী ক্যাডারদের জন্য অর্থের পরিমাণও বাড়িয়েছে।

আত্মসমর্পণ নীতিমালার সাফল্যের জন্য যে বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে সেগুলো হল- মহারাষ্ট্রে প্রোপাগান্ডা প্রচারণা, শান্তি র‍্যালি, স্থানীয়দের সাথে আলোচনা সহ ‘কে হবে লাখপতি’ প্রকল্প; অন্ধ্র প্রদেশ সরকারের ‘সাদা কার্ড’ (রেশন কার্ড) প্রদান, বাসস্থান কর্মসূচি, LPG গ্যাসে ভর্তুকি প্রদান ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে ভর্তি করা; সিপিআই (মাওবাদী) এর পলিটব্যুরো, বিশেষ এরিয়া কমিটি ও আঞ্চলিক ব্যুরোর সদস্যদেরকে বড় অংকের অর্থ (২৫ লাখ রুপি) প্রদানের ব্যাপারে ঝাড়খণ্ড কেবিনেটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ;  ইন্দ্র আওয়াস যোজনার হারে আর্থিক সহায়তা ও বাসস্থান প্রদানের ব্যাপারে উড়িষ্যা সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত।

২০১৪ সালের ২৯শে নভেম্বর সিপিআই (মাওবাদী) স্বীকার করে যে তাদের ক্যাডাররা পার্টি ছেড়ে যাচ্ছে এবং “এটা সত্যি যে আমাদের কিছু দুর্বল ক্যাডার সরকারের দেউলিয়া ও দুর্নীতিপরায়ণ নীতিমালার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাদের অস্ত্র ছেড়ে দিচ্ছে”; এক প্রেস বিবৃতিতে গুদসা উসেন্দি এ বক্তব্য রাখেন।

মাওবাদী নেতাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে আত্মসমর্পণ ও দলত্যাগের যে ঢেউ তাকে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যেই আত্মসমর্পণকারী ক্যাডার ও বিশেষত পুলিশদের সাথে গোপন চক্রান্ত রয়েছে এমন ক্যাডারদের হত্যা করা হয়েছে। তবে এর মধ্য দিয়ে আরো যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ফুটে উঠেছে তা হল মাওবাদীদের যারা ছেড়ে আসছে তাদেরকে একটি নিরাপদ পরিবেশ প্রদানে সরকারের ব্যর্থতা। আর্থিক পুরস্কার ও ‘পুনর্বাসনের’ অন্যান্য উপাদান আত্মসমর্পণে উৎসাহ বৃদ্ধির পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে কিন্তু মাওবাদীরা যদি আত্মসমর্পণকারী ক্যাডারদের ক্রমাগত শাস্তি প্রদান করতে সমর্থ হয় সেক্ষেত্রে এই নীতি ক্রমান্বয়ে ব্যর্থ হবে।

(সমাপ্ত)      

সূত্রঃ

India: Maoists Never Forgive, Never Forget – Analysis


ভারতঃ মাওবাদীদের ‘লালগড়’ পর্যালোচনা প্রতিবেদনে ৫টি ভুল স্বীকার

মাওবাদীদের লালগড় পর্যালোচনা প্রতিবেদনে ৫টি ভুল স্বীকার

ভুলগুলো ক্ষমা করে গঠনমূলক পরামর্শ প্রদানের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানাল মাওবাদীরা

 

ফিরে দেখা-

গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থানকে অমান্য করে ‘শান্তি আলোচনার ফাঁদে পা দেয়ার’ জন্য সিপিআই (মাওবাদী) এর পশ্চিমবঙ্গের নেতাদের প্রতিও দোষারোপ করা হয়েছে এ পর্যালোচনায়,

পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, “সিপিআই(এম) এর পাশবিকতার প্রতি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে জনগণের কাছে কোন ঘোষণা ছাড়াই মানুষ হত্যা করে ও গোপনে লাশ চাপা দিয়ে আমরা সিপিআই(এম) এর ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করেছিলাম।”

সিপিআই (মাওবাদী) এর দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এর কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্বাঞ্চলীয় ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে এই পর্যালোচনা

images

ঝাড়গ্রামঃ কিষেনজির মৃত্যু ও লালগড় আন্দোলনের পর প্রথমবারের মতো সিপিআই (মাওবাদী) এ আন্দোলনটির একটি প্রাথমিক পর্যালোচনা প্রকাশ করেছে যেখানে মাওবাদীদের কয়েকটি ভুলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; এর মধ্যে একটি হল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেণী চরিত্র বুঝতে ভুল করা। জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রাম সাবডিভিশনে গোপনে প্রচারিত তিন পৃষ্ঠার এই পর্যালোচনায় লালগড় আন্দোলনকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করে পাঁচটি ভুল উল্লেখ করা হয় এবং জনগণকে ‘গঠনমূলক সমালোচনা’ করতে ও পরামর্শ প্রদান করতে আহ্বান জানানো হয়।

স্বীকারোক্তিগুলোর মধ্যে চমক লাগানো যেটি ছিল সেটি হল মমতার শ্রেণী চরিত্র সম্পর্কে নেতৃত্বের ভেতরে স্পষ্ট ধারণার অভাব ছিল; এ কারণে তাদের ভেতরে ‘ভুল ধারণা’ তৈরী হয়েছিল যে তৃণমূল প্রধান পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক বন্দীরা মুক্তি পাবে যা এই আন্দোলনকে লাভবান করবে।

গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থানকে অমান্য করে ‘শান্তি আলোচনার ফাঁদে পা দেয়ার’ জন্য সিপিআই (মাওবাদী) এর পশ্চিমবঙ্গের নেতাদেরকেও দোষারোপ করা হয়েছে এ পর্যালোচনায়। সিপিআই (মাওবাদী) এর দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এর কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্বাঞ্চলীয় ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে এই পর্যালোচনা।

কেন্দ্রের অবস্থান ছিল, পারস্পরিক যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির পরই কেবল পার্টি শান্তি আলোচনায় বসবে। পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদীরা যুদ্ধবিরতি দিয়েছিল অথচ কোন রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেয়া হয়নি।

পার্টি এটাও স্বীকার করেছে যে তাদের কয়েকটি খতম সঠিক ছিল না। পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, “সিপিআই(এম) এর পাশবিকতার প্রতি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে জনগণের কাছে কোন ঘোষণা ছাড়াই মানুষ হত্যা করে ও গোপনে লাশ চাপা দিয়ে আমরা সিপিআই(এম) এর ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করেছিলাম।”

এতে বলা হয়েছে, “আমরা আমাদের ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং পশ্চিমবঙ্গের জনগণের কাছে আমাদের পার্টি প্রকাশ্যে খোলা মনে আত্মসমালোচনা করছে। আমরা ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গিকার করছি। গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শ প্রদান করার জন্যেও আমরা আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”

ইউপিএ-২ সরকারের সাথে কিষেণজিকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ও এই উদ্দেশ্যে শান্তি আলোচনাকে ব্যবহার করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে এই পর্যালোচনায়। অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের নিয়োগকৃত প্রধান দুই আলোচনাকারী সুজাত ভদ্র ও ছোটন দাশকে ক্লিন চিট (নির্দোষিতার প্রমাণপত্র) দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে কিষেণজির হত্যাকাণ্ডের সাথে সুজাত ভদ্র ও ছোটন দাশকে যুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের প্রচারণা চালানো হলে তা গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর হবে।

প্রতিবেদনটি ২০১৪ সালের ২০শে অক্টোবর প্রকাশিত হলেও কখনো সর্বসাধারণের সামনে আসেনি। এতে আরো বলা হয়েছে রাজ্য কমিটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য সব কমিটিগুলোকে পুনরূজ্জীবিত করার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।

পর্যালোচনায় জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি সম্পর্কে স্বচ্ছতার অভাবের কারণে মাওবাদীরা তাদের লোকজনদের মমতার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাঠিয়েছিল; এতে করে মূলতঃ তারা তৃণমূল প্রধানের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছিল আর মমতাকে ব্যবহার করার মূল যে পরিকল্পনা ছিল মাওবাদীদের, তা তারা হারিয়ে ফেলেছিল।

সূত্রঃ hindustantimes.com

11214718_10201019991979008_6809894257605910269_n