‘গণহত্যাকারীরা দাপাচ্ছে, আর বাম বুদ্ধিজীবীদের ধরপাকড় চলছে!!’ – অরুন্ধতী রায়

arundhatistory_647_100316054702

দেশ জুড়ে মাওবাদী তকমা দিয়ে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের ধরপাকড়ের তীব্র নিন্দা করলেন লেখিকা অরুন্ধতী রায়৷ তাঁর দাবি, কোনওরকম প্রমাণ ছাড়া এইভাবে ধরপাকড়ের অর্থ কী? দেশজুড়ে গণহত্যা চলছে, শুধুমাত্র সন্দেহের জেরে মানুষ খুন হচ্ছে, এখন সেই সন্দেহের বশেই বিশিষ্টদের ধরপাকড় করা হচ্ছে৷ যা মানা যায় না৷

এই ধরপাকড় স্পষ্ট করছে কোন জায়গায় দেশে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ যে দেশে প্রকাশ্যে গুলি চলে, হিটলিস্ট মেনে খুনের পরিকল্পনা হয় সেই দেশেই এইধরণের ধরপাকড় স্বাভাবিক বলে জানান অরুন্ধতী৷ প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ছক করছে মাওবাদীরা, এই তথ্য পেয়ে দেশজুড়ে মাওবাদী তকমা দিয়ে বামপন্থীদের বাড়িতে তল্লাশি চালায় পুলিশ৷ গ্রেফতার করা হয় মাওবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী সমাজকর্মী ভারভারা রাও সহ ৫ জনকে৷

ভারভারা রাওয়ের কন্যার বাড়িতে তল্লাশি চলে৷ এক সাংবাদিকের বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়৷ এক তেলুগু সাংবাদিকের পুনের বাড়িতেও তল্লাশি চলে৷ এছাড়াও এক বিদেশি ভাষার অধ্যাপকের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়৷ মুম্বইয়ে তল্লাশি চলে অরুন ফেরেইরা, সুসান আব্রাহাম, ভেনন গঞ্জালভেসের বাড়িতে৷ গোয়াতে আনন্দ টেলটম্বুদে, ঝাড়খণ্ডে স্ট্যালিন স্বামী ওসুধা ভরদ্বাজের বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়৷

গোটা ঘটনায় অরন্ধতীর দাবি, যুক্তিবাদীদের মুখ বন্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে৷ যা ভয়ঙ্কর৷

সূত্রঃ kolkata24x7.com


২০ বছর পর আসছে অরুন্ধতীর দ্বিতীয় উপন্যাস

Author Arundhati Roy photographed by Chiara Goia

ন্যায়-সমতা আর মুক্ত পৃথিবীর পক্ষে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর অরুন্ধতী রায়ের প্রথম উপন্যাস ‘গড অফ স্মল থিংস’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এর ২০ বছর পর প্রকাশিত হতে চলেছে তার দ্বিতীয় উপন্যাস। সামনের বছর জুনে প্রকাশিত হবে বুকারজয়ী এই লেখকের নতুন উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’।
একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিশ্বজুড়ে অরুন্ধতী এক পরিচিত নাম। নিজ রাষ্ট্র ভারত থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রসহ দুনিয়ার সব পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন তুলে যাচ্ছেন তিনি। ইরাক-আফগানিস্তানসহ বিশ্বর বিভিন্ন প্রান্তে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন শাণিতভাবে। কাশ্মিরের জনতার আত্মনিয়ন্ত্রুণের অধিকারের প্রশ্নে দাঁড়িয়েছেন নিজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ভারতের মাওবাদী আন্দোলন নিয়ে মূলধারার বুদ্ধিজীবীদের এবং এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অবস্থান নিয়েছেন তিনি। পেয়েছেন ‘রাষ্ট্রোদ্রাহিতা’র খেতাব।
এসব বিভিন্ন বিষয়ে লেখা তার বহু রচনা নিয়ে বই প্রকাশিত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ পাঠক তা সাদরে গ্রহণও করেছেন। তবে ‘গড অফ স্মল থিংস’-এর পর আর কোনও উপন্যাস লেখেননি তিনি। তার লেখা নতুন উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ প্রকাশ করবে ব্রিটেনের হামিশ হ্যামিল্টন এবং পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া।
১৯৯৭ সালে প্রকাশিত অরুন্ধতীর প্রথম উপন্যাস ‘গড অফ স্মল থিংস’ এর জন্য সেবছরই বুকার পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি।
নতুন উপন্যাস প্রসঙ্গে প্রকাশনা সংস্থার তরফ থেকে বলা হয়েছে, ‘এই উপন্যাস প্রকাশ করা একই সঙ্গে সম্মানের ও আনন্দের। বিভিন্নভাবে এটি একটি অসাধারণ বই, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের পড়া সেরা।’
হামিশ হ্যামিল্টন-এর প্রকাশনা পরিচালক সাইমন প্রসার এবং পেঙ্গুইনের প্রধান সম্পাদক মেরু গোখলে এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘তার (অরুন্ধতী) লেখনির মতোই চরিত্রগুলোও অসাধারণ – সজীব শব্দ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে যা উদারতা ও সহমর্মিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সেখানে প্রতিটা শব্দই যেন জীবন্ত, যা আমাদের জাগিয়ে তুলে এক নতুন পথে দেখতে, অনুভব করতে, শুনতে ও যুক্ত হতে শেখায়। এসবের মধ্যদিয়েই উপন্যাসটি পেয়েছে নতুনত্ব, যা তাকে প্রকৃত উপন্যাসে পরিণত করেছে।’

বইটি লেখার ক্ষেত্রে তার বন্ধু বুকার পুরস্কারজয়ী জন বার্গার উৎসাহ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অরুন্ধতী। ২০১১ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে তিনি জানিয়েছিলেন, কিভাবে জন অরুন্ধতীকে তার দ্বিতীয় উপন্যাসটি লেখার জন্য অনুরোধ করতেন। তবে তখন অরুন্ধতী ভারতে মাওবাদী আন্দোলন নিয়ে কাজ করছিলেন।

২০১১ সালে অরুন্ধতী ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেছিলেন, “প্রায় দেড় বছর আগে আমি তখন জনের বাড়িতে, জন বলছিল, ‘এখনই তোমার কম্পিউটার চালু করো এবং তুমি কি ফিকশন লেখছো, তা আমায় দেখাও।’ সম্ভবত পৃথিবীতে সে-ই একমাত্র ব্যক্তি, যে কিনা আমাকে একথাগুলো বলার সাহস রাখে। আর আমি তাকে কিছুটা পড়েও শোনালাম। সে বললো, ‘তুমি সোজা দিল্লি যাও, আর বইটা শেষ করো।’”

অরুন্ধতী ইন্ডিপেন্ডেন্টকে আরও বলেন, ‘আমি দিল্লিতে ফিরে আসি। আর এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই টাইপরাইটারে লেখা একটি চিরকুট আসে আমার কাছে। তাতে মাওবাদীদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আমাকে মধ্য ভারতের জঙ্গলে যেতে বলা হয়।’

অরুন্ধতীর সাহিত্য-বিষয়ক এজেন্ট ডেভড গুইউইন নতুন উপন্যাস সম্পর্কে বলেন, ‘কেবল অরুন্ধতকীর পক্ষেই এমন উপন্যাস লেখা সম্ভব, যা ২০ বছর ধরে লেখা হয়েছে। এখন তা প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, কেননা আমরা প্রকাশক পেয়েছি। এই সুদীর্ঘ সময়টা সার্থক হয়েছে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।


সামনের দিনগুলো ভয়ঙ্কর, আশঙ্কা ফুটে উঠল অরুন্ধতীর নতুন লেখায়

Cb18O94WIAEgwjD

My seditious heart, An  unfinished diary of nowday, THE CARAVAN এ প্রকাশিত অরুন্ধতী রায়ের এই প্রবন্ধে আগামী দিনে দেশে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি নেমে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।  গত কয়েক দশক ধরে বিজেপির কাজকর্ম পর্যালোচনা করে অরুন্ধতীর আশঙ্কা ২০১৭ উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোট বা ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে ভুয়ো জঙ্গি হানা বা সীমিত পরিসরে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধও হয়তো আমাদের দেখতে হতে পারে।  যেভাবে সব বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার জন্য বিরোধিতা করলেই জেলে পোরা হচ্ছে তাতে সামনের সময়টা আরো ভয়ঙ্কর বলে তিনি জানিয়েছেন।  পুরো লেখাটা পড়ুন THE CARAVAN এ।


“আমি অন্তত আন্না হতে চাই না”- অরুন্ধতী রায়

arundhati_roy_20140310

(দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকারের বঙ্গানুবাদ।)

টিভি-তে যেটা দেখছি সেটা বিপ্লব হলে, সাম্প্রতিক কালের এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর এবং নির্বোধ বিপ্লব। জনলোকপাল বিল নিয়ে আপনার মনে যে প্রশ্নেরই উদয় হোক না কেন, সম্ভাব্য উত্তর যা আপনি পেতে চলেছেন তা এরকম: ক) বন্দে মাতরম, খ) ভারত মাতার জয়, গ) ভারত হল আন্না, আন্নাই ভারত, ঘ) জয় হিন্দ। সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে, আপনি বলতে পারেন মাওবাদীদের সঙ্গে জনলোকপালবাদীদের একটি সাদৃশ্য কিন্তু আছে –দুপক্ষেরই উদ্দেশ্য ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ছুঁড়ে ফেলা। একপক্ষ একেবারে গোড়া থেকে গরিব, তস্য গরিবদের (যাঁদের অধিকাংশই আদিবাসী) নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তুলছে। অন্য দিকে, সদ্য সাধুর আখ্যা পাওয়া আন্না হাজারের নেতৃত্বে চলছে অহিংস গান্ধীবাদী আন্দোলন, অংশগ্রহণকারীরা অধিকাংশই শহুরে এবং নিশ্চিত ভাবে যাঁদের জীবনযাত্রার মান আদিবাসীদের থেকে উন্নত (এ ক্ষেত্রে সরকার নিজেই নিজেকে ছুঁড়ে ফেলার জন্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ নিয়ে আন্দোলনে অক্সিজেন যোগাচ্ছে)। ২০১১-র এপ্রিলে আন্নার আমরণ অনশন শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই, বিপুল পরিমাণ দুর্নীতি থেকে সাধারণ মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতে, সরকার, তথাকথিত ‘নাগরিক সমাজের’ নামাঙ্কিত ব্র্যান্ড ‘টিম আন্না’-কে দুর্নীতি রোধক আইন প্রণয়নের জন্য যুগ্ম কমিটির অংশ হতে আমন্ত্রণ জানায়। কয়েক মাস পরেই সরকার অবশ্য নিজেই এই সংক্রান্ত বিল পেশ করে সংসদে, অজস্র ফাঁক-ফোঁকর থাকা এই বিলটিকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনও জায়গাই ছিল না। তারপরে ১৬ অগাস্ট ২০১১ সকালে, আন্নার দ্বিতীয় আমরণ অনশন শুরু করার আগেই তাঁকে জেলে ভরে দেওয়া হল। জনলোকপাল বিলের জন্য এই লড়াই মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকারের দিকে মোড় নিল। গণতন্ত্রের নিজের জন্যেই শুরু হল সংগ্রাম। ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম’ শুরুর কয়েক এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্নাকে ছেড়ে দেওয়া হল। যদিও নাটকীয় ভাবে তিনি জেল থেকে বেরোতে অস্বীকার করলেন। তিহার জেলের ভিতরে মাননীয় অতিথি হয়ে শুরু করে দিলেন অনশন—তাঁকে জনগণের সামনে অনশনের অনুমতি দিতে হবে। তারপরের তিন ধরে, তিহার জেলের বাইরে টিভি-ভ্যান ও জনতার ভিড় লেগে রইল। টিম আন্নার সদস্যরা ঘনঘন উচ্চ নিরাপত্তা সম্পন্ন তিহার জেলের ভিতরে ও বাইরে যাতায়াত করতে লাগলেন, জেলে এ অনশনরত আন্নার বক্তব্যের ভিডিও টিভি-র সমস্ত চ্যানেলগুলিতে দেখান হতে থাকল। (আর কোনও মানুষের জন্যে এই বিলাসিতার ব্যবস্থা করা হত? ) এরমধ্যে দিল্লি পুরসভার ২৫০ জন কর্মী, ১৫টি ট্রাক, ৬টা বুল-ডোজার রামলীলা ময়দানকে সপ্তাহান্তের চিত্তাকর্ষক মনোরঞ্জনের মঞ্চ করে তুলতে দিনরাত কাজ করে গেছে। এইবারে, অসংখ্য দর্শক ও উঁচু ক্রেনের ওপর চাপানো ক্যামেরার সামনে, ভারতের সবচেয়ে দামী ডাক্তারবাবুদের উপস্থিতিতে আন্নার তৃতীয় দফার আমরণ অনশন শুরু হল। “কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর, অখণ্ড ভারত”—টি.ভি.র সঞ্চালকরা আমাদের জানালেন। তাঁর উপায়টা গান্ধীবাদি হলেও দাবিদাওয়া সম্পর্কে সে কথা বলা যাচ্ছে না। গান্ধীর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের তত্ত্বের বদলে জনলোকপাল বিলটি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত, দুর্নীতি-বিরোধী একটি আইন, যেখানে সাবধানে নির্বাচিত একটি প্যানেল হাজার হাজার কর্মীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি বৃহৎ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর খবরদারি করবে- পুলিশ থেকে প্রধানমন্ত্রী-বিচার ব্যবস্থা-সাংসদ থেকে শুরু করে একেবারে নিচু স্তরের সরকারি কর্মী কেউ বাদ যাবেন না। লোকপালের নিজস্ব তদন্ত করার অধিকার, কড়া নজরদারি রাখার অধিকার, এমনকী বিচার করার ক্ষমতাও থাকবে। শুধু নিজেদের জেলখানা থাকবে না। একটি স্বাধীন প্রশাসন হিসেবে কাজ করবে–বর্তমানের দুর্নীতি গ্রস্ত ব্যবস্থার পাল্টা হিসেবে। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার একটি ব্যবস্থাকে শোধরানোর জন্যে আরেকটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ব্যবস্থা। এটা কার্যকর হবে কী হবে না, সেটা নির্ভর করছে আমরা দুর্নীতিকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি তার ওপর। দুর্নীতি বলতে কেবলমাত্র বেআইনি কার্যকলাপ, অর্থনৈতিক অনিয়ম আর ঘুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব? নাকি ক্রমাগত বাড়তে থাকা আর্থিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য যেখানে ক্ষমতা মাত্র কিছু লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমন একটি ব্যবস্থার ফল? এমন একটি শহরের কথা কল্পনা করুন, যেখানে শুধুমাত্র শপিং মল আছে, রাস্তায় হকারি করা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। একটি হকার স্থানীয় থানার পুলিশ এবং মিউনিসিপালিটির অফিসারটিকে অল্প ঘুষ দিয়ে আইন ভেঙ্গে হকারি করার ব্যবস্থা করল যাঁর গ্রাহক কিনা এমন মানুষ যাঁরা শপিং মলের দামে জিনিস কিনতে পারবেন না। ভবিষ্যতে কি লোকপালের প্রতিনিধিরা তাঁকেও জরিমানা করবেন? তাহলে সাধারণ মানুষ যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তার সমাধানের জন্যে কাঠামোগত অসাম্যকে ধরতে হবে, নাকি আরেকটা কুক্ষিগত ক্ষমতার নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে, যেখানে মানুষকে না চাইলেও ভরসা রাখতেই হবে? এরমধ্যে পুরও চিত্রনাট্য, উগ্র জাতীয়বাদ, এবং বিপুল উৎসাহ নিয়ে জাতীয় পতাকা তুলে ধরে আন্নার বিপ্লবের সমস্তটাই সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলন, বিশ্বকাপ জয়ের মিছিল এবং পরমাণু বোমা পরীক্ষার সাফল্যের উচ্ছ্বাসের থেকে ধার করা। এমনভাবে তুলে ধরা হল, যেন অনশন সমর্থন না করলে প্রকৃত ভারতীয় হওয়া যায় না। ২৪ ঘণ্টার খবরের চ্যানেলগুলির এমন ভাব, দেশে যেন আর খবর নেই। ‘আন্নার অনশন’ কোন ভাবেই মণিপুরের আইরম শর্মিলা চানুর এ এফ এস এ আইন কে তুলে নেওয়ার জন্যে ১০ বছর ধরে চলতে থাকা অনশন কে প্রতিনিধিত্ব করছে না, যে আইনের বলে সেনাবাহিনী শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে হত্যা করতে পারে। কুদানকুলামে পরমাণু চুল্লির বিরুদ্ধে চলতে থাকা হাজার দশের লোকের রিলে অনশনের কথাও তো কই বলছে না ‘আন্নার অনশন’। ‘প্রতিবাদকারী’ দের বলতে তো একবারও উঠে আসছে না সেই মণিপুরিদের কথা যারা আইরমের অনশন কে সমর্থন করছেন। জগৎসিংহপুর, কলিঙ্গগিরি, নিয়মগিরি, বস্তার, বা জয়তাপুরে খনি মাফিয়া আর সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম রত মানুষগুলোর কথাও তো কই বোঝানো হচ্ছে না ‘প্রতিবাদকারী’ বলে। ‘জনগন’ বলতে ভূপাল গ্যাস বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা নর্মদা উপত্যকায় বাঁধ-প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া লোকগুলোর কথা বোঝানো হচ্ছে না। বা নয়ডা ,পুনে কিংবা হরিয়ানা বা দেশের অন্য কোথাও যেখানে কৃষকরা জমি-অধিগ্রহনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তাদের কথাও বলা হচ্ছে না। ‘জনগন’ বা ‘প্রতিবাদকারী’ বলতে শুধু মাত্র ৭৪ বছর বয়সী ভদ্রলোকের অনশন দেখতে আসা জনতার কথাই বোঝানো হচ্ছে, আমরন অনশন ক’রে ভদ্রলোকের দাবী তাঁর প্রস্তাবিত জন-লোকপাল বিল কেই গ্রহণ করতে হবে। ‘জনগন’ মানে রামলীলা ময়দানে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার লোক, টি ভির দৌলতে যা লাখো লাখো লোকের অবস্থান মনে হচ্ছে, ঠিক যেমন খ্রীষ্ট রুটি আর মাছের সঙ্খ্যা বহুগুন বাড়িয়ে ক্ষুধার্তর মুখে খাওয়ার তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের বলা হল, “কোটি কণ্ঠ সোচ্চারিত-ভারত বলতে আন্না’। নব্য উদিত এই সাধুটি কে? অদ্ভুত ভাবে যে বিষয়গুলির ওপর এক্ষুনি নজর দেওয়া জরুরি , সেগুলি সম্পর্কে তিনি নীরব। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কৃষকের আত্মহত্যা বা সুদূরের ‘অপারেশন গ্রীন হান্ট’ নিয়ে একটি কথাও নেই তাঁর মুখে। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগঢ়, পস্কো নিয়ে মুখে রা কারেন নি। মধ্য ভারতের বনাঞ্চলে ভারত সরকারের সেনা নামানো নিয়ে তাঁর কোন মতামত আছে বলে মনেই হচ্ছে না। যদিও তিনি রাজ ঠাকরের উগ্র আঞ্চলিকতা কে সমর্থন করেন। নরেন্দ্র মোদীর “গুজরাট উন্নয়ন মডেল’ কে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন, ২০০২ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে। ( যদিও জনগনের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ায় আন্না পরে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন, কিন্তু সম্ভবত তাঁর মন থেকে সায় ছিল না) এরমধ্যে পুরও চিত্রনাট্য, উগ্র জাতীয়বাদ, এবং বিপুল উৎসাহ নিয়ে জাতীয় পতাকা তুলে ধরে আন্নার বিপ্লবের সমস্তটাই সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলন, বিশ্বকাপ জয়ের মিছিল এবং পরমাণু বোমা পরীক্ষার সাফল্যের উচ্ছ্বাসের থেকে ধার করা। এমনভাবে তুলে ধরা হল, যেন অনশন সমর্থন না করলে প্রকৃত ভারতীয় হওয়া যায় না। ২৪ ঘণ্টার খবরের চ্যানেলগুলির এমন ভাব, দেশে যেন আর খবর নেই। ‘আন্নার অনশন’ কোন ভাবেই মণিপুরের আইরম শর্মিলা চানুর এ এফ এস এ আইন কে তুলে নেওয়ার জন্যে ১০ বছর ধরে চলতে থাকা অনশন কে প্রতিনিধিত্ব করছে না, যে আইনের বলে সেনাবাহিনী শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে হত্যা করতে পারে। কুদানকুলামে পরমাণু চুল্লির বিরুদ্ধে চলতে থাকা হাজার দশের লোকের রিলে অনশনের কথাও তো কই বলছে না ‘আন্নার অনশন’। ‘প্রতিবাদকারী’ দের বলতে তো একবারও উঠে আসছে না সেই মণিপুরিদের কথা যারা আইরমের অনশন কে সমর্থন করছেন। জগৎসিংহপুর, কলিঙ্গগিরি, নিয়মগিরি, বস্তার, বা জয়তাপুরে খনি মাফিয়া আর সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম রত মানুষগুলোর কথাও তো কই বোঝানো হচ্ছে না ‘প্রতিবাদকারী’ বলে। ‘জনগন’ বলতে ভূপাল গ্যাস বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা নর্মদা উপত্যকায় বাঁধ-প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া লোকগুলোর কথা বোঝানো হচ্ছে না। বা নয়ডা ,পুনে কিংবা হরিয়ানা বা দেশের অন্য কোথাও যেখানে কৃষকরা জমি-অধিগ্রহনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তাদের কথাও বলা হচ্ছে না। ‘জনগন’ বা ‘প্রতিবাদকারী’ বলতে শুধু মাত্র ৭৪ বছর বয়সী ভদ্রলোকের অনশন দেখতে আসা জনতার কথাই বোঝানো হচ্ছে, আমরন অনশন ক’রে ভদ্রলোকের দাবী তাঁর প্রস্তাবিত জন-লোকপাল বিল কেই গ্রহণ করতে হবে। ‘জনগন’ মানে রামলীলা ময়দানে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার লোক, টি ভির দৌলতে যা লাখো লাখো লোকের অবস্থান মনে হচ্ছে, ঠিক যেমন খ্রীষ্ট রুটি আর মাছের সঙ্খ্যা বহুগুন বাড়িয়ে ক্ষুধার্তর মুখে খাওয়ার তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের বলা হল, “কোটি কণ্ঠ সোচ্চারিত-ভারত বলতে আন্না’। নব্য উদিত এই সাধুটি কে? অদ্ভুত ভাবে যে বিষয়গুলির ওপর এখনই নজর দেওয়া জরুরি, সেগুলি সম্পর্কে তিনি নীরব। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কৃষকের আত্মহত্যা বা সুদূরের ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ নিয়ে একটি কথাও নেই তাঁর মুখে। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়, পস্কো নিয়ে মুখে রা কাড়েননি। মধ্য ভারতের বনাঞ্চলে ভারত সরকারের সেনা নামানো নিয়ে তাঁর কোনো মতামত আছে বলে মনেই হচ্ছে না। যদিও তিনি রাজ ঠাকরের উগ্র আঞ্চলিকতাকে সমর্থন করেন। নরেন্দ্র মোদীর “গুজরাট উন্নয়ন মডেল’ কে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন, ২০০২ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে। ( যদিও জনগনের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ায় আন্না পরে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন, কিন্তু সম্ভবত তাঁর মন থেকে সায় ছিল না) সাংবাদিক রা যা করে থাকে, এখনো পর্যন্ত তাই করেছে। আর এস এসের সাথে আন্নার পুরন সম্পর্কের গল্প এখন আমাদের কাছে আছে। আন্নার গ্রাম রালেগান সিদ্ধি তে যে বিগত ২৫ বছর ধরে গ্রম পঞ্চায়েত বা সমবায় সমিতির নির্বাচন হয় না, সে খবরও আমাদের মুকুল শর্মা জানিয়েছন। হরিজনদের সম্পর্কে আন্নার মনোভাবও আমাদের অজান নয়ঃ “ মহাত্মা গান্ধী চাইতেন প্রত্যেকটি গ্রামে একজন সুনার, একজন চামার, একজন কুমহার ইত্যাদি থাকবে। তারা প্রত্যেকে নিজের নিজের কাজ করে গেলে, গ্রাম স্বয়ং-সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। রালেগান সিদ্ধি তে আমরা এটাই অনুশীলন করছি”। টিম আন্নার অন্যান্য সদস্যরা যে সংরক্ষণ বিরোধী ‘ ইয়ুথ ফর ইকুয়ালিটি’ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেটা কি আশ্চর্যজনক ঠেকছে? আন্দোলনটির রাশ ছিল কোকা-কোলা এবং ল্যেমান ব্রাদার্স মতো সংস্থার এর পয়সায় চলা কতিপয় এন জি ও র হাতে। আনন্দ কেজরিওয়াল এবং মনীশ সিসোদিয়া, আন্নার প্রধান পরমর্শদাতারা, কবীর নামে একটি সংগঠন চালান, বিগত তিন বছরে যেখানে ৪০০,০০০ ডলার টাকা এসেছে ফোর্ড ফাউন্ডেশন থেকে। আন্নার দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের প্রধান দাতারা হচ্ছে কিছু ভারতীয় ব্যাবসায়ী সংস্থা যারা নয় এলুমিনিয়াম কারখানা নয় বন্দর বানানো নয় এস ই জেড এর সাথে যুক্ত, এবং কিছু রাজনৈতিকের সাথে এদের নিবিড় সম্পর্কে আছে যারা কয়েক হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য চালায়। এদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আবার দুর্নীতির দায়ে তদন্তও চলছে। এরা হঠাৎ এত উদ্দীপ্ত কেন? মনে রাখুন জনলোকপাল বিলের দাবিতে আন্দোলনটা যখন শুরু হল, তখন উইকিলিকস থেকে ফাঁস হওয়া একের পর এক তথ্যে এবং পরপর দুর্নীতির দায়ে জেরবার কিছু প্রবীন সাংবাদিক, মন্ত্রী এবং কিছু রাজনৈতিক নেতা, কংগ্রেস এবং বিজেপি দুদলেরি। জনগনের কোটি কোটি টাকা কিছু লোকের ট্যাঁক মোটা করে দিয়েছে। বহু বছর পর এই প্রথম সাংবাদিক-লবিস্ট রা বিড়ম্বনায় এবং কর্পোরেট ভারতের তাবড় কিছু অধিনায়কদের গন্তব্য স্থল জেল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের একেবারে আদর্শ সময়। তাই কি? যখন সরকার নিজের দায়িত্ব থেকে হাত ধুয়ে ফেলছে, সরকারের সমস্ত কাজের ভার কর্পোরেট সংস্থা এবং এনজিও গুলির হাতে চলে যাচ্ছে ( পানীয় জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, টেলিকম ব্যবস্থা, খনন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ), যখন কর্পোরেট মিডিয়ার ভয়ঙ্কর ক্ষমতা এবং প্রভাব মানুষের চিন্তার বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন কর্পোরেটগুলি, মিডিয়া, এন জি ও গুলি যে প্রস্তাবিত লোকপাল বিলের আওতায় থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। আশ্চর্যজনক ভাবে, এদের একটিও প্রস্তাবিত বিলটির আওতায় নেই। সরকার এবং দুষ্ট রাজনৈতিকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে চেঁচামেচি করা, কায়দা করে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল। সরকার কে অসুর সাব্যস্ত করে , নিজদের জন্যে আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করেছে—সংস্কারের দ্বিতীয় পর্যায়– আরও বেসরকারিকরন, সরকারী পরিকাঠামো এবং ভারতের সম্পদের ওপর আরও দখল কায়েম করা। কর্পোরেট দুর্নীতি কে লবিং ফির নাম করে আইনসিদ্ধ করে দেওয়ার দিন আর বেশী দেরি নেই। সমস্যাটা বড় হয়ে উঠছে, কারণ ভারতের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এই সংসদীয় ব্যবস্থায় আইন প্রণয়ন করছে কিছু দুর্নিতিগ্রস্থ নেতা এবং কিছু কোটিপতি, যারা সাধারণ মানুষের সমস্যা গুলো থেকে সম্পুর্ন বিচ্ছিন্ন। এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত অর্থে একটাও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নেই। তাই শুধুমাত্র পতাকা নাড়ানো দেখে আবেগতাড়িত হয়ে লাভ নেই।


পুরস্কার ফিরিয়ে দিলেই কি ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে গেলো: অরুন্ধতী রায়

ArundhatiRoy_1997_lr

ভারতের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে বহু লেখক তাদের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন।

সম্প্রতি বুকার পুরস্কার বিজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায়ও ওই লেখকদের কাতারে সামিল হয়েছেন।

বিবিসি হিন্দিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, এই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করতেই তিনি সেটা করেছেন।

হিন্দুত্ববাদকে সমালোচনা করায় ভারতে লেখকদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে এবং গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে একজন মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা বলছেন, এই পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার কারণে বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

কিন্তু এই মন্তব্যের বিরোধিতা করে বুকার পুরস্কার বিজয়ী অরুন্ধতী রায় বলছেন, লোকজনকে যখন হত্যা করেন, পিটিয়ে মেরে ফেলেন তণ ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় না? আর পুরস্কার ফেরত দিলেই ভার্মূর্তি নষ্ট হলো গেলো?

সূত্রঃ http://www.bbc.com/bengali/multimedia/2015/11/151106_india_arundhati_final


অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকার: ‘একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি হিসেবে আমি কিছু করি না, আমি যা করি তা একজন নাগরিক হিসেবেই করি’

ArundhatiRoy_1997_lr

(সংগঠক ও সংগ্রামী অরুন্ধতি রায়ের আরও একটি পরিচয় হলো তিনি সাহিত্যিক। ১৯৯৭ সালে বুকার বিজয়ের মাধ্যমে নিজের এই পরিচয়টাই তিনি শুধু প্রতিষ্ঠিত করেন নি বরং ‘অচ্ছুৎ’ মানুষের সংগ্রামের কথাও পৌঁছে দিয়েছেন সাধারণের কাছে। মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড বারসামিয়া অরুন্ধতি রায়ের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ২০০১ সালের এপ্রিলে। প্রায় ১৫ বছর আগে নেয়া এই সাক্ষাৎকারটি আজও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায়। তাদের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে ভারতের বিশেষত কেরালার নারীদের অবস্থান, দক্ষিণ এশিয়ায় পারমানবিক শক্তির চর্চা, বহুল আলোচিত নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে সাধারণ ভুক্তভোগীদের সাথে তাঁর একত্রে কারাবরণের কথা, নিজের লেখালেখি, শ্রেণী বৈষম্য ও জাতিভেদ প্রথা এবং সর্বোপরি বিশ্বায়নের নামে পুঁজিবাদের সর্বগ্রাসী ছোবলে বিপর্যস্ত অর্থনীতির কথা। )

প্রশ্নঃ

আপনি কেরালাতে বড় হয়েছেন । সেখানকার নারীদের অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন

অ.রা.
কেরালার নারীরা সমগ্র ভারত এবং সারা বিশ্বে কাজ করছে, বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছে। কিন্তু তারপরেও তাদেরকে বিয়েতে যৌতুক দিতে হয়। আর সবচাইতে অদ্ভুত ব্যাপার হলো স্বামীর সাথে তাদের সম্পর্কটি হলো আনুগত্যের। আমি কেরালার একটি ছোট্ট গ্রামে বড় হয়েছি। আমার কাছে সেটা ছিলো দুঃস্বপ্নের মতো। আমি সব সময় সেখান থেকে পালাতে চাইতাম। মুক্তি পেতে চাইতাম। যাতে আমাকে সেখানে কাউকে বিয়ে করতে না হয়। অবশ্য সেখানে আমাকে বিয়ে করার জন্য কেউ মরে যাচ্ছিল না (হাসি)। একটা মেয়ের যত নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে তার সবই আমার ছিল। আমি ছিলাম লিকলিকে, কালো, আর ধূর্ত।

প্রশ্নঃ
আপনার মা ছিলেন একজন প্রথা বিরোধী নারী।

অ.রা.
আমার মা একজন বাঙ্গালী হিন্দুকে বিয়ে করেছিলেন। আর সবচে’ ভায়াবহ ব্যাপার হলো তিনি তাকে ডিভোর্স করেছিলেন। অর্থাৎ সেখানে সবার এটাই নিশ্চিন্ত ধারণা ছিল যে ডিভোর্স দেয়া একটি ভয়াবহ ব্যাপার। কেরালায় বংশ পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আপনার যদি বাবা না থাকে তাহলে আপনার কোনো বংশ পরিচয়ই নেই। আপনাকে নাম পরিচয়হীন মানুষ বলা হবে। আমি আয়োমেনে (একটি জায়গার নাম) বড় হয়েছি। যেটি The god of Small Things উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট। এই পরিচয়হীনতাই আমাকে বহিমুর্খী হবার পথ করে দিয়েছে, এখন আমি স্বাচ্ছন্দ্যে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে পারি কেননা ভারতের আর আট দশটা মধ্যবিত্ত মেয়ের অবস্থা আমার হয়নি। আমার বাবা ছিলনা, তাই কারো ভরণপোষণের বিনিময়ে আমাকে মারও (মাঝে মাঝে) খেতে হয়নি। আমার কোন গোত্র, শ্রেণী কিংবা ধর্ম ছিলো না। আমার চোখে প্রথাসিদ্ধতার ঠুলি পরানো ছিলো না। যা আমাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে হতো। মাঝে মাঝে ভাবি আমি সম্ভবত সেই মেয়ে যাকে তার মা বলতেন যাই করোনা কেন, কখনো বিয়ে করোনা (হাসি)। বিয়ের কনে আমার কাছে এক ধরনের অবিমৃষ্যকারিতা। বিয়ের কনে দেখলে আমার গায়ে ফোসকা পড়ে। ব্যাপারটি আমার কাছে পুরোপুরি মেকি মনে হয়। তাদেরকে আমার মনে হয় গহনায় মুড়ে দেয়া কোনো অবলা জীব। আমি The God of Small Things – এদেরকে পালিশ করা জ্বালানী কাঠ বলে উল্লেখ করেছি।

প্রশ্নঃ
আপনার মা সম্পর্কে আরো কিছু বলুন ।

অ.রা.
আমার মা ছিলেন Fellini Film হতে বিচ্যুত কারো মতো। তিনি এমন একজন নারী যার কখোনো কোনো পুরুষের প্রয়োজন পড়ে না। এটা খুব চমৎকার ব্যাপার। (যদিও এর জন্যে তাকে ভুগতে হয়)। আমার মা একটি স্কুল চালাতেন। আর স্কুলটি আশ্চর্য জনকভাবে সফল। বাবা মা’রা বাচ্চার জন্মের আগেই তাদের সন্তানটির জন্যে সেই স্কুলে আসন সংরক্ষণ করে রাখতো। তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারতো না আমার সাথে বা মায়ের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে। কারণ সমস্যাটা হলো আমরা দুজন তাদের ভাষায়, ‘প্রথাবিরোধী নারী’। কথা প্রসঙ্গে একটু বলি, আমার মা কেরালা তে সুপরিচিত কারণ ১৯৮৬ সালে তিনি একটি জনস্বার্থ মামলায় জয়লাভ করেন। এই মামলায় তিনি সিরীয় খ্রিষ্ট উত্তরাধিকার আইনকে চ্যালেঞ্জ করেন। যাতে বলা হয়েছে একজন নারী তার পিতার সম্পত্তির চারের একাংশ অথবা ৫,০০০ রুপির মধ্যে যেটি কম সেটি পাবে। ১৯৫৬ সালের আইন পর্যালোচনা করে সুপ্রীম কোর্ট যে রায় দেয় তা নারীকে সমানাধিকার দিয়েছিলো। কিন্তু খুব কম মহিলাই এই অধিকারের সুবিধা ভোগ করতে পারে। এমনকি চার্চের ফাদাররা এমনভাবে উইল লেখে যাতে কন্যারা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী না হয়। এই ধরনের অদ্ভুত নিপীড়ন ঘটে সেখানে।

প্রশ্নঃ
আপনি উপন্যাস লেখার পাশাপাশি কিছু রাজনৈতিক প্রবন্ধও লিখেছেন। এই দুটো কি ধরনের পরিবর্তন এনেছে বলে আপনি মনে করেন?

অ.রা.
পরিবর্তন শুধু এইটুকু যে The God of Small Things প্রকাশিত হওয়ার পর বহিঃর্বিশ্বের মানুষের কাছে আমি পরিচিতি লাভ করি। আসলে উপন্যাস লেখার আগে আমি রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছি। ফুলন দেবী নামক একজন নারীকে নিয়ে আমি The Great Indian Rape নামে একটি ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখেছি। Bandit Queen নামে একটি সিনেমা তাকে কিভাবে Exploit করেছে। একজন বেঁচে থাকা ধর্ষিতা নারীর ধর্ষণ কাহিনী তাঁর বিনানুমতিতে মঞ্চায়ন করা উচিত কিনা এই বিষয়গুলো আমি প্রবন্ধগুলোতে তুলে ধরেছি।

The good of small things এবং আমার Non Fiction কাজের মধ্যে বড় কোনো পার্থক্য দেখিনা। যেহেতু আমি বলছি ফিকশন হলো সত্যি। অন্তত আমি তাই মনে করি। সেখানে বর্তমানের ফিকশন হলো সব কিছুর চাইতে এক চরম সত্য। আমার বর্তমানের সমস্ত প্রচেষ্টা হলো এই পার্থক্যটি মুছে দেয়া। একজন লেখক হলেন বোধের ধাত্রী। রাজনীতিকে গল্পের মতো করে বলতে পারাটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি যা করতে চাই তা হলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো বস্তু বৃহত্তর কোনো কিছুর সাথে কিভাবে সর্ম্পকিত তা তুলে ধরতে। অর্র্থাৎ গ্রামের একজন পিতা-পুত্র কিভাবে গ্রাম থেকে বিতাড়িত হলো এবং এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের Mr. Wolfensohn কিভাবে জড়িত ছিলো তা আমি তুলে ধরতে চাই। The God of Small Things বইটিতে আমি এটাই দেখাতে চেয়েছি যে কিভাবে ক্ষুদ্র বিষয়গুলো বৃহত্তর ইস্যুগুলো দ্বারা প্রভাবিত। এটা হতে কিভাবে একটি ছোট মাকড়সা পানির উপর ঢেউ তৈরী করছে বা চাঁদের আলো নদীর উপর কিভাবে প্রতিফলন ঘটাচ্ছে অথবা হতে পারে আপনার জীবন, বাড়ি এমনকি আপনার শোবার ঘর কিভাবে ইতিহাস এবং রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।

প্রশ্নঃ
আপনার উপন্যাসের একটি চরিত্র ‘ইসতা’ বিশ্ব ব্যাংকের টাকায় কেনা মল এবং কীটনাশকের গন্ধে ভরা নদীর তীর ধরে হাঁটছে। নর্মদা উপত্যকায় ৩০০ বাঁধ তৈরীর যে পরিকল্পনা ছিলো বিশ্ব ব্যাংক ও ভারত সরকার তা রদ করেছে। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন সম্পর্কে কিছু বলুন।

অ.রা.
নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের কর্মীদের সাথে যখন আমার প্রথম দেখা হয়, তারা বললো আপনার The God of Small Things পড়ে জেনেছি, আপনি বিশ্ব ব্যাংক এর বাঁধ তৈরী পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। ন. বা. আ. এর উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো এটি ভারতের শ্রেণী ব্যবধানকে ঘুচিয়ে দেয়। এ যেন আদিবাসীদের সাথে উচ্চ শ্রেণীর কৃষক, অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত দলিত শ্রেণীর সাথে মধ্যবিত্তের এক মিলন মেলা। এটি গ্রাম, শহর, কৃষক, জেলে, এবং লেখক, চিত্রকরদের মধ্যে সংযোগ তৈরী করে দেয়, যা আন্দোলনকে দারুণভাবে শক্তি যোগায়। কিন্তু অনেকেই সমালোচনা করে বলেছিলো এটা ভারতীয় মধ্যবিত্তদের প্রতিবাদ। যা আমাকে ভীষণভাবে ক্রুদ্ধ করেছিলো। অথচ শহুরে মধ্যবিত্ত ইঞ্জিনিয়াররাও এর মধ্যে ছিলো। আপনি শুধু আদিবাসীদের সমালোচনাটাই দেখার প্রত্যাশা করতে পারেন না। আপনি তাদেরকে আলাদা করে দেন। কারণ তাদেরকে চাপে ফেলা সহজ। নানাভাবে লোকে মধ্যবিত্তদের অংশগ্রহণকে সীমিত করে দিতে চায়। বলে আপনি কিভাবে এসব লোকের পক্ষ হয়ে কথা বলেন ? কেউ কারো পক্ষ হয়ে কথা বলে না। আসল কথা হলো ন.বা.আ. একটি চমৎকার উদাহরণ যা শ্রেণী এবং বর্ণের মধ্যে হাত মিলিয়ে দিচ্ছে। এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের পরে সবচেয়ে বড় সুন্দরতম এবং উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ আন্দোলন ।

প্রশ্নঃ
গতবছর নর্মদার তীরে একটি গ্রামে প্রস্তাবিত বাঁেধর বিরুদ্ধে আন্দোলনে আপনি জড়িত ছিলেন। গ্রেফতারকৃত অনেকের মধ্যে আপনিও ছিলেন। ঘটনাটি সম্পর্কে একটু বলুন।

অ.রা.
ফ্যান্টাস্টিক। ঘটনাটি ঘটে সালগাঁ নামক একটি গ্রামে। সারা রাত ধরে মানুষ আসছিলো; মোটরগাড়ী, ট্রাক কিংবা পাঁয়ে হেঁটে। ভোর তিনটার মধ্যে আমরা প্রায় ৫,০০০ মানুষ জমায়েত হলাম। অন্ধকারে আমরা বাঁধের জন্য নির্ধারিত স্থানের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। পুলিশ ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছিলো যে বাঁধের সেই জায়গাটি দখল হয়ে যেতে পারে, কিন্তু তারা জানতো না যে কোথা হতে মানুষ আসবে। আমরা অন্ধকারেই হাঁটছিলাম। এটা ছিল প্রচন্ড রকম বিস্ময়কর একটা ব্যাপার। পাঁচ হাজার লোক, বেশিরভাগই ছিল গ্রাম্য কিন্তু শহরের আইনজীবি, স্থপতি, সাংবাদিক সহ সবাই সেই এবড়ো থেবড়ো পথ ধরে হাঁটছিলো-পার হয়ে যাচ্ছিলো নীরবে। কেউ সেখানে একটি বিড়িও ধরায়নি, কাশিও দেয়নি। এমনকি একবারও গলা-খাকড়ি দেয়নি। মাঝ পথে একদল মহিলা শুধু প্রস্রাব করার জন্য থেমেছিলো। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করলো। অবশেষে সকাল বেলা আমরা বাঁধের জন্য নির্ধারিত স্থানে পৌঁছুলাম। ঘন্টাখানেক পুলিশ আমাদেরকে ঘিরে রেখেছিলো, তারা লাঠি চার্জ করেছিলো। আমি সহ প্রায় এক হাজার লোক সেদিন গ্রেফতার হয়েছিলো। কারাগার ভরে গিয়েছিলো বন্দী লোকে।

প্রশ্নঃ
আপনি কি মনে করেন ভারত সরকার বাঁধ প্রকল্প শেষ করার জন্য বদ্ধ পরিকর ?

অ.রা.
এখানে অনেকগুলো বিষয় আছে। প্রথমে আপনাকে বুঝতে হবে, বড় বাঁধের পুরাণ কথা। পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে তিন বছর বয়সেই বিক্রি করা হয়েছে। নেহেরু বলেছেন, বাঁধ হলো আধুনিক ভারতের মন্দিরের মতো। তাই বাঁধগুলো বিশালাকারের জাতীয় পতাকার মতো। ন. বা. আ. এর আগে, বাঁধগুলো ছিলো আপনার কাছে এমন যা আপনাকে সকালের নাস্তা যোগান দেবে, আপনি আপনার মেয়েকে বিয়ে দিতে পারবেন এবং আপনার জন্ডিস ভালো হয়ে যাবে। মানুষকে বুঝতে হবে যে, এগুলো রাজনৈতিক দুর্নীতির স্মারক। আর এগুলোর উৎপত্তিও হলো অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হতে। আপনি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ কেন্দ্রীভূত করতে পারেন, মানুষের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে নিতে পারেন কিন্ত মানুষের এসব বিষয়ে সিদ্বান্ত নেয়ার আপনি কে ? ১৯৯০ সালে নর্মদায় প্রথম বার্গী বাধঁটি তৈরী হয়, তারা বলেছিলো এটা ৭০,০০০ লোককে বাস্তুচ্যুত করবে এবং ১০১টি গ্রাম নিমজ্জিত করবে। একদিন কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই সরকার জলাধার ভরাট করে ফেলে। ১,১৪,০০০ লোক বাস্তুহীন ও ১৬২টি গ্রাম নিমজ্জিত হয়ে যায়।


প্রশ্নঃ 

এমন পরিস্থিতিতে গৃহহীন মানুষগুলোর সামনে একমাত্র বিকল্প যা ছিলো তা হলো শিশু ও গবাদি পশুগুলো নিয়ে পাহাড়ে উঠে যাওয়া। ১০ বছর পরে সেই বাঁধ ৫ ভাগ জমি সেচন করে। যত ভাগ জমি এই বাঁধ নিমজ্জিত করেছিলো তার চেয়ে কম জমি সেচেছে। তারা কোনো খালও বানায় নি। কারণ ঠিকাদার আর রাজনীতিবিদদের কাছে বাঁধ নির্মাণ শুধু একগাদা টাকা পকেটে আনার উপায়।

যারা গৃহহীন হয়েছিলো তাদের সম্পর্কে কিছু বলুন।

অ.রা.
কেউ জানে না, The Greater Common God লেখার সময় যারা আছে, তাদের চেয়ে যারা নেই তাদের জন্য আমার বেশি কষ্ট হচ্ছিলো। সেই বিশাল বাঁধ কত মানুষকে যে ঘর হারা করেছিল তার কোনো পরিসংখ্যান ভারত সরকারের কাছে নেই। আমি মনে করি এটা শুধু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নয়, এটা বুদ্ধিজীবিদেরও ব্যর্থতা। আর মূল বিষয়টা হলো উচ্ছেদ হওয়া। মানুষগুলো আসলে তাদের কাছে মানুষ নয়, তারা হল আদিবাসী তারা অস্পৃশ্য। সেই প্রতিবেদনের মতে Indian Institution of Public Administration কর্তৃক করা ৫৪ টি বাঁধের উপর আমি একটি Sanity Check করেছিলাম। তাদের মতে শুধু জলাধারগুলো স্থানান্তরিত করা হয়েছে, এটা একধরনের স্থানান্তরই যেখানে প্রতিটি বাঁধের কারণে গড়ে ৪৪,০০০ লোক স্থানান্তরিত হয়েছে। আমরা জানি গত ৫০ বছরে ভারতে প্রায় ৩,৬০০ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। সুতরাং শুধু একটি Sanity Check এর রিপোর্ট বলছে যে এই বাঁধ ৩৩ মিলিয়ন মানুষকে বাস্তুুহারা করেছে। তারা শহরে অভিবাসিত হয়েছে, এবং সেখানেও তারা নাগরিক নয়, শুধুই বস্তিবাসী। তারা শুধু এমন মানুষ যাদেরকে মিনিটের মধ্যেই লাথি মেরে উচ্ছেদ করা যায়, নয়াদিল্লির অভিজাত এলাকার গিন্নিরা যেকোন সময়ে তাদেরকে, এইসব বাস্তিবাসীদেরকে বিপদজনক বলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

প্রশ্নঃ
আপনি এসব উচ্ছেদকৃত মানুষগুলোকে জঞ্জাল অপসারনের সাথে তুলনা করেছেন ।

অ.রা.
এটা আসলে জঞ্জাল অপসারনই। ভারত সরকার এই ধারণাটিকে অসহিংসতা বলে চালিয়ে দিচ্ছে। চীন, তুরস্ক কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো ভারত সরকার এসব মানুষকে কচুকাটা করছে না । যারা উচ্ছেদ হতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে তাদেরকে হত্যাও করছে না। ভারত শুধু উচ্ছেদ করার জন্য অপেক্ষা করে। ভারতকে যা করতে হবে তা ভারত করে যাচ্ছে এবং তা পরবর্তী ফলাফলকে উপেক্ষা করেই করছে। জাতি প্রথার কারণে এখানে সিদ্ধান্তগ্রহীতা এবং সিদ্ধান্তের ফল ভোগকারীদের মধ্যে সংযোগ নেই। সিদ্ধান্তটি নেয়া হয় এবং সেই মোতাবেক কাজও করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করা হয়। এসব মানুষ মনে করে এটা তাদের ভাগ্য, তাদের কর্ম, যা তাদের কপালে লেখা ছিলো। গণতন্ত্রের জন্য ভারতের খ্যাতি আছে কিন্তু দায়িত্ববান সরকারের হাতে অপরিমেয় ক্ষমতা আছে, এটাই সমস্যা সৃষ্টি করেছে।

প্রশ্নঃ
কিন্তু আপনি আপনার রাজনীতি সম্পর্কে বলেন যে আপনি কোন উন্নয়ন বিরোধী নন, আপনি প্রথা কিংবা ঐতিহ্যকে চিরতরে তুলে দিতে চান না।

অ.রা.
আপনি আমাকে কিভাবে সেটা বলতে পারেন ? আমি ভারতের একটি গ্রামে বেড়ে উঠেছি। আমার সমস্ত জীবন কেটেছে একটি সংগ্রামী ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে। একজন প্রথাসিদ্ধ ভারতীয় গৃহিণী হবার কোনো উপায় আমার ছিলো না। তাই আমি উন্নয়ন বিরোধী কোনো কথা বলছি না, আমি বলছি রাজনীতির উন্নয়নের কথা, আপনি কিভাবে সিদ্ধান্ত নেবার এককেন্দ্রিক অগণতান্ত্রিক প্রথাটিকে ভাঙতে পারেন? আপনি কিভাবে বিকেন্দ্রীকরণের নিশ্চয়তা দিতে পারেন ? এসব মানুষের তো তাদের জীবন আর প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ভারত সরকারের অধিকার আছে। আজ ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানা হতে ব্যক্তি মালিকানায় এটা হস্তান্তর করতে চাচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানা হচ্ছে কেন্দ্রীভূতকরণের একটি প্রক্রিয়া যেখানে সরকার বলছে উৎপাদনের সর্ম্পূণ ক্ষমতা মহারাষ্ট্র হতে ইনরনকে দিয়ে দেবার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। ৫০ বছর ধরে ভারতের জনগণের টাকায় ভারতের গণখাতের অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। একে ইনরন এর কাছে বিক্রি করে দেবার কোনো অধিকার তাদের নেই। এটা তারা করতে পারে না।

প্রশ্নঃ
আমি মনে করি এখনো আপনার কিছু আশা আছে যাকে আপনি ভারতের সহজাত নৈরাশ্য বলেন তা বিশ্বায়নের জোয়ার ঠেকাতে পারে।

অ.রা.
বিশ্বায়নের ব্যপারে ভিন্নমত দেয়াই যায়, আমি আসলে জানি না এখানে আশাবাদী হবো কিনা। শহরের বাইরে থাকলে আশাবাদী হই। ভারতের এত বিশালতা … এত সৌন্দর্য। আমি জানি না হয়তো তারা এই সৌন্দর্য্যকে খুন করতে পারে। আমি ভাবতে চাই না তারা তা করতে পারে। আমি মনে করি না শাড়ির মতো সুন্দর কোনো কিছু হতে পারে, আপনি কি শাড়ী বাদ দিতে পারেন ? আপনি কি শাড়ীর ঐতিহ্যকে অন্য কোন কোম্পানীর সাথে ভাগাভাগি করতে পারেন ? বহুজাতিক কোম্পানীগুলোকে কেন দেশের ভেতরে আসার অনুমোদন দেয়া হচ্ছে? কেন তারা বাসমতি চাল নিয়ে ব্যবসা করারও অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে? মানুষ তো ম্যাকডোনাল্ড বার্গারের চেয়ে রুটি আর দোসা খেতে বেশি ভালোবাসে। আমেরিকায় আসার আগে আমি একটি বাজারে গিয়েছিলাম সেখানে সব ধরনের ডাল, এমনকি মসুর ডালও পাওয়া যাচ্ছিলো। আমার চোখে জল এসে গিয়েছিলো। আজকাল এসব আমাকে কাঁদায়, যখন দেখি যে, সব ধরনের ডাল চাল টিকে থাকুক এটা তারা চায় না।

Author Arundhati Roy photographed by Chiara Goia
Author Arundhati Roy photographed by Chiara Goia

প্রশ্নঃ
আপনার The End of Imagination বইটিতে উপমহাদেশের পরমাণবিক শক্তি পরীক্ষা নিয়ে যা লিখেছেন সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

অ.রা.
এটা ভয়ানক। আমি খুব ভীত। এটা যে কোনো কিছুর জন্যই ব্যবহার করা হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ করছে এবং ভারত, পাকিস্তান ও আমেরিকার মতোই অন্যদেশের মানুষকে অত্যাচার করার জন্য আর নিজেদের মানুষকে প্রতারণা করার জন্য তা ব্যবহার করছে। পারমাণবিক পরীক্ষা ছিলো আমাদের আত্মসম্ভ্রমের ধ্বজা ঠেকিয়ে রাখার একটি কৌশল। ভারত এখনো তার সাংস্কৃতিক অবমাননা হতে পিছিয়ে আসতে পারছে না। ভারত এখনো তার স্বকীয়তা খুঁজছে।

প্রশ্নঃ
আপনি বলেছেন বিদ্রুপমুখর তরুণ হিন্দুরা যারা পারমানবিক শক্তি পরীক্ষাকে অভিনন্দিত করছে আর যারা বাবরি মসজিদ ধবংস করে আনন্দ পেয়েছে তাদের মধ্যের কোনো পার্থক্য নেই ?

অ.রা.
ভারতীয় বুদ্ধিজীবিরা আজকাল মৌলবাদকে দুষতে পারলে নিজেদের প্রগতিবাদী মনে করে, কিন্তু খুব কম লোকই বেসরকারীকরণ, বিশ্বায়ন আর মৌলবাদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কথা বলছে। বিশ্বায়ন ভারতের অভিজাত শ্রেণীকে সন্তুষ্ট করতে পারে কিন্তু মৌলবাদ তা পারেনা। এটা আসলে শ্রেণী ভেদাভেদের সমস্যা। যখন সাধারণ মানুষ কোন ছবির শুটিং করতে দেয়না কিংবা কোন বই পুড়িয়ে দেয় তখন তারা শুধু এই কথাই বলে না যে, এসব ভারতীয় সংস্কৃতির বিরোধী। বরং তাঁরা এও বলে যে পাশ্চাত্যবাদী, অভিজাত আর ইংরেজি বলিয়ে এইসব লোকেরা খুব সুখে আছে। এটি খুব বিষ্ময়কর। আমি মনে করি এই প্রতিরোধটা সম্মিলিতভাবে করা দরকার, আলাদাভাবে নয়।

ধর্মীয় ডানপন্থী মতবাদ সরাসরি বিশ্বায়ন ও বেসরকারিকরণের সাথে সম্পর্কিত। ভারত সরকার তার সমস্ত বৈদ্যুতিক খাত বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানীর কাছে বিক্রি করার কথা বলেছেন। যখন রাজনৈতিক হাওয়া গরম ও অস্থির হয়ে উঠছে, তখনই সরকার বলতে শুরু করলো আমাদের বাবরি মসজিদের জন্য নির্ধারিত স্থানে হিন্দুদের মন্দির নির্মাণ করা উচিত। সবাই তখন সেদিকেই ঘুরে গেলো। এটাতো একটা খেলা। আমাদের সেটা বুঝতে হবে। একদিকে আপনি পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পনীগুলোর নিকট দেশ বিক্রি করে দেবেন, অন্যদিকে সীমান্ত রক্ষা করতে চাইবেন পারমাণবিক বোমা দিয়ে এটা কি হাস্যকর নয়? আপনি বলেছেন পৃথিবীটা আসলে বিশ্বগ্রাম কিন্তু আপনি কোটি কোটি রুপি খরচ করছেন পারমানবিক অস্ত্র তৈরী করতে !

প্রশ্নঃ
আপনি দুই ধরনের নিরাপত্তা জাহাজের উপমা ব্যবহার করেছেন। একটি বড়, অনেক যাত্রী অন্ধকারের দিকে যাত্রা করছে, আর অন্যটি খুব ছোট; আলোকিত তীরের দিকে যাচ্ছে। আপনি আসলে কি বুঝাতে চাইছেন-একটু ব্যাখ্যা করবেন ?

অ.রা.
ভারত কয়েক শতাব্দী ধরে একই জায়গায় পড়ে আছে। প্রতিদিন, আমার বাড়ির পাশের রাস্তায় একদল দুর্বল মজুর সাইবার অপ্টিকস্ কেবল স্থাপন করার জন্য গর্ত তৈরী করে যা ডিজিটাল বিপ্লবকে গতিময় করছে। তারা কয়েকটি মোমবাতির আলোতে কাজ করে। বর্তমানের ভারতে এটাই ঘটছে।যে জাহাজটি অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে তার কোন শব্দ নেই, টেলিভিশনে তাদের কোনো উপস্থিতি নেই, জাতীয় দৈনিকে তাদের কোনো স্থান নেই, তাই তাদের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছেনা। আর যারা ছোট্ট জাহাজটিতে আছে, তাঁরা তাদের উজ্জ্বল গন্তব্যের দিকে পৌঁছে যাচ্ছে। তাঁরা বিশ্বচূড়ায় পৌঁছে গিয়ে অন্য জাহাজটির দিকে পিছু ফিরে দেখার দৃষ্টিও সম্পূর্ন রূপে হারিয়ে ফেলছে। তাই দিল্লীতে গাড়িগুলো বড় আর মসৃণ হচ্ছে, হোটেলগুলো আরো চকচকে হচ্ছে, পাহারাদাররাও আর পুরনো চৌকিদার নেই, তারা এখন Watchmen, অস্ত্রধারী কর্মচারী। আর গরীবরা শহরে ফাটা দেয়ালে বন্দী পোকার মতো। তারা কিছু দেখতে পাচ্ছেনা। ঠিক যেন মাঝখানে একটি উজ্জ্বল বাতি জ্বলছে আর তার চারপাশে আঁধার জমাট বাঁধছে। মানুষ জানতে চাচ্ছে আসলে কি ঘটছে । যেসব লোক দিন দিন ধনী হচ্ছে তারা জানে না যে পৃথিবী ঠিক সুবিধের জায়গা নয়।

প্রশ্নঃ
আপনি কি আপনার স্বরূপ নির্ণয়ের জন্য সেই বিশাল জাহাজের অংশ হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিংবা আপনার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে?

অ.রা.
আমি বড় জাহজের যাত্রী হতে পারি না কারণ সেটি আমার উপর নির্ভর করে না। আসল ব্যাপার হলো আমি একজন শিক্ষিত মানুষ অর্থাৎ আমি সেই জাহাজের অংশ হতে পারি না। আর আমি তা হতে চাইওনা। আমি ভুক্তভোগী হতে চাই না। আমি অন্ধকারে হারিয়ে যেতে চাই না। আমি একজন শিল্পী, একজন লেখক। আমি মনে করি কেউ তার নিজের ছবি সেখানেই সাজাতে চাইবে যেখানে তা মানানসই হবে। ১৬ বছর বয়সে আমি বাড়ি ছেড়ে ছিলাম এরপর আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে অন্যদিকে যাওয়া অনেকটা সহজ ছিলো। আমি বড় জাহাজটির অংশ হতে পারতাম কারণ আমি ছিলাম একজন নারী এবং সর্বোপরি একাকী নারী। ভারতে এটা কোন রসিকতা নয়। আমার পরিণতি খুব খারাপ হতে পারতো, আমি খুব ভাগ্যবান যে তা হয়নি।

প্রশ্নঃ
আপনি কি নতুন কোনো ফিকশন লেখার চিন্তা করছেন ?

অ.রা.
আমার জন্য ফিকশন তেমনি যেমন আপনার জন্য খাওয়া কিংবা শরীরচর্চা, কিন্তু ঠিক এই মূহুর্তে ফিকশন লেখা দূরুহ। এখন আমি জানিনা কিভাবে আমার জীবন চালাবো। জানিনা কিভাবে ‘আমি এখন একটি বই লিখছি’-এই কথাটি বলার মতো পরিস্থিতি আমি তৈরী করবো।

প্রশ্নঃ
আপনি কি দায়িত্ববোধ করছেন একটি নারীর কঠোর প্রতিষ্ঠা আপনাকে ডেকে যাচ্ছে…?

অ.রা.
না। আমি কোনো দায়িত্ববোধ করছি না। কারণ ‘দায়িত্ব’ শব্দটি খুব গতানুগতিক।

প্রশ্নঃ
আপনি খুব সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন কারণ আপনি ভারতীয় এবং তার বাইরে একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি।

অ.রা.
কিন্তু কখনো একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি হিসেবে আমি কিছু করি না। আমি যা করি তা একজন নাগরিক হিসেবেই করি। আমার লেখা আমার নির্ভরতা। আমি যা লিখি তা আমি বিশ্বাস করি। আমার সম্পর্কে যে প্রকার প্রচার কিংবা বিরুদ্ধ প্রচারে বিশ্বাস করতে শুরু করা আমার জন্য সহজ। এই প্রচার আপনাকে আপনার সম্পর্কে একটি হাস্যকর ধারণা দেবে। আমি জানি যে আমার নিজস্ব শক্তিকে সাবলীলভাবে ব্যবহার এবং অপব্যবহার করার মধ্যে একটি চমৎকার সামঞ্জস্য আছে। আমি কখনোই নিজেকে বাকশক্তিহীনদের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চাই না। আমি এটাকে ভয় পাই। কিন্তু কেউ কেউ আমার উপর নাখোশ, কারণ আমার যে অবস্থানটি আছে (যারা নিজেদেরকে আমার মতো মনে করে) তাদের সেটা নেই।


‘নতুন অর্থনীতির মৌলিক পদক্ষেপ হল কর্পোরেট কর্তৃক ভূমি দখল’- অরুন্ধতী রায়

36175-a-roy

লেখক-মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায় ৪ঠা মে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এতে তিনি কথা বলেছেন জাতপ্রথা, ভূমি সমস্যা ও প্রগতিবাদী বা বিপ্লবী আন্দোলন নিয়ে।

অরুন্ধতী মনে করেন, ভারতীয় সমাজে জাতিপ্রথা যে ভূমিকা পালন করছে, বামপন্থীদের এখন তার বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন করে বামদের ভাগ্যে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আসবে না।

ডানপন্থী হিন্দু রাজনীতিতে বামদের গ্রহণযোগ্য বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসার ব্যাপারে আশাবাদী নন অরুন্ধতী।

‘জাতি ইস্যু মোকাবিলায় বামরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। জাতকে শ্রেণী বলে বামরা নিজেরাই নিজেদের পরাস্ত করেছে এবং নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে বোম্বের কারখানা শ্রমিকদের অধিকার ইস্যুতে ১৯২০-এর দশকের ভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শ্রীপদ অমৃত ডাঙ্গে ও ড. আম্বেদকরের দ্বন্দ্বটা গুরুত্বপূর্ণ। আম্বেদকর সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছিলেন, শ্রমিকদের মধ্যেও সমতা নেই। কারণ দলিতরা কেবল নিম্ন মজুরির কাজ পায়। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির যাত্রা শুরুর পর থেকে ঘটনা এটাই,’ মন্তব্য অরুন্ধতীর।

‘জাতের বিরুদ্ধে লড়াইটা বেশ জটিল’ মনে করেন প্রখ্যাত এই লেখক। তাঁর মতে, ‘দার্শনিকভাবে বলতে গেলে, অধীনস্ত জাতগুলোকেও তাদের পরিচয়ে গর্ববোধ করতে হবে এবং জাতিগত শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সেই গর্বকে কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু তখনই মূল বিষয়টা চলে আসে, যেখানে এর বিরুদ্ধে সেই বিপ্লবী অবস্থানই ব্যবহৃত হয় একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে এবং এটি সুবিধাভোগীদের অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

নতুন নয়

অরুন্ধতীর মতে, হিন্দু ডানপন্থীদের ঘর বাপসি প্রচারণা, যেখানে ধর্মান্তরিত মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ‘ফেরত নেওয়া’ হয়। এর মাধ্যমে অধঃস্তন জাতকে ‘বড় বাড়িতে আনা হয়, কিন্তু রাখা হয় চাকরের ঘরে’। তিনি বলেন, ঘর বাপসি কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে অশুদ্ধদের শুদ্ধ করে, ধর্মান্তরিতদের হিন্দু দুনিয়ায় আনার মধ্য দিয়ে আর্য সমাজ ও শুদ্ধি আন্দোলন এটি শুরু করেছিল।’

অরুন্ধতী মনে করেন, সাম্রাজ্যের রাজনীতি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের রাজনীতিতে রূপান্তরের মুহূর্তে এটা ছিল জনসাধারণকে প্রভাবিত করার জন্য হিন্দু ডানপন্থীদের সুচতুর পাল্টা পদক্ষেপ।

‘তখন পর্যন্ত কেউ অধঃস্তন জাতগুলোর ইসলাম, খ্রিস্টান বা শিখধর্ম গ্রহণের বিষয়টিকে পাত্তা দেয়নি। তারপর, হঠাৎ সেই জনসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। এই ইতিহাসে, যেখানে আর্য সমাজের মতো গোষ্ঠী যুক্ত হয়েছিল, গান্ধীও এ ধারার উত্তরাধিকারী ছিলেন – তখন অস্পৃশ্যতার ব্যাপারে অনেক কথা হতো, কিন্তু জাতপ্রথা নিয়ে কোনো কথাবার্তা হতো না। জমি, সম্পদ, নির্দিষ্ট কাজের অধিকার নিয়ে কথা হতো না। এসবই ছিল জাত ব্যবস্থার সত্যিকারের ভিত্তি। এখন তারা এটাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে, কারণ এটা কেবল দলিত সম্প্রদায়ের ব্যাপার নয়, আদিবাসীরাও এ নিয়ে লড়ছে,’ বলেন অরুন্ধতী।

মূলধারার বুদ্ধিজীবীরা যেখানে বিশ্বায়ন ও অতি-পুঁজিবাদিতাকে জাতপ্রথা ও অন্যান্য বৈষম্যের সমাধান মনে করছেন, সেখানে অরুন্ধতী রায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘পুঁজিবাদিতাকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে জাতপ্রথার কাঠামো ভেঙে পড়বে না, বরং আরো শক্তিশালী করবে।’

বিষাক্ত মিশ্রণ

‘প্রকৃত ঘটনা হলো, এটা উল্লেখযোগ্য হারে ঘটেনি। টমাস পিকেটি তাঁর ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি বইয়ে দেখিয়েছেন, যাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ পেয়েছেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে তাঁদের সাফল্য অর্জনের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এটাই জাতপ্রথাকে পুঁজিবাদের মা-তে পরিণত করে, কারণ জাতপ্রথা বংশানুক্রমিক অধিকারেরই ব্যাপার, যা ঈশ্বরের ইচ্ছায় নির্ধারিত। জাতপ্রতা ও পুঁজিবাদ এক বিষাক্ত মিশ্রণে মিলিত হয়েছে। বেসরকারীকরণ দলিতদের সামান্য নিরাপদ অবস্থানটুকু, যা সংরক্ষণের কারণে প্রচলিত ব্যবস্থায় রয়েছে, তা-ও ধ্বংস করে দেবে,’ উল্লেখ করেন অরুন্ধতী রায়।

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির উত্থাপন করা ভূমি অধিগ্রহণ বিলের কঠোর সমালোচনা করেন অরুন্ধতী রায়। এর ফলে অধিক কর্মসংস্থানের দাবিও তিনি উড়িয়ে দেন। বলেন, ‘নতুন অর্থনীতির মৌলিক পদক্ষেপ হলে করপোরেট কর্তৃক ভূমি দখল। তা হতে পারে আইটি, কয়লা কিংবা ইস্পাত কোম্পানি, প্রথম কাজ হলো ভূমি, জলাশয় নিয়ে নেওয়া এবং নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা।

এটাকে মানতে বলা হচ্ছে এই যুক্তিতে যে এতে কর্মসংস্থান বাড়বে; আসলে তা রূপকথা। পরিসংখ্যান বলে, আমরা কেবল বেকার বাড়তেই দেখছি।’

অরুন্ধতী বিষাদ নিয়ে বলেন, ষাটের দশক ও সত্তরের দশকের তুলনা করলে এখনকার ভূমি ঘিরে চলা বিতর্ককে আর বিপ্লবী বলা যায় না।

“যখন নকশাল আন্দোলন শুরু হয় এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলছিল, তখন ইন্দিরা গান্ধীর এক সমালোচক বলেছিলেন, তারা কী বলছে? তারা সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলছে, জমির পুনর্বণ্টনের কথা বলছে, কৃষকের কাছে জমি দেওয়া এবং এ রকম আরো অনেক কথা বলছে। আর এখন, এমনকি সবচেয়ে ‘বিপ্লবী’ আন্দোলনও কেবলে আদিবাসীদের জমি তাদের হাতেই ছেড়ে দেওয়ার দাবি করছে,” বলেন অরুন্ধতী।

সূত্রঃ http://www.ntvbd.com/opinion/8117/%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%AC%E0%A7%80-%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%87–%E0%A6%85%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%A4%E0%A7%80-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F