আদিবাসী কৃষকদের উদ্দেশে কিছু কথা

07339241681da5387f8c36f4ca258fc6-02

 

আদিবাসী কৃষকদের উদ্দেশে কিছু কথা

কৃষকদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গেলে আদিবাসী কৃষকদের সমস্যা নিয়ে পৃথকভাবে বলার গুরুত্ব চলে আসে। কেননা আদিবাসীরা প্রধানত কৃষক হলেও ধনীক শ্রেণীর (আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া, জোতদার-মহাজন-ইজারাদার) দ্বারা শুধু শ্রেণীগতভাবেই শোষিত-নিপীড়িত নয়। তারা উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ দ্বারাও নিপীড়িত, যা বৃটিশ আমল থেকেই চলে এসেছে।
বাংলাদেশ জুড়ে ৪৯টি সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার ২৫ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠীর বাস। ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে তারা বিকশিত হোক তা সাম্রাজ্যবাদ এবং দালাল শাসক শ্রেণি কখনও চায়নি। তাই আদিবাসী কৃষক জনগণ বৃটিশ আমল থেকেই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম করে আসছেন। তার মধ্যে সাঁওতাল, হাজং বিদ্রোহ উল্লেখযোগ্য। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী কৃষকগণ তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু শেখ মুজিব সরকার আদিবাসীদের আলাদা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে তাদেরকে বাঙালি হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে শান্তি বাহিনী দমনের নামে পাহাড়ী আদিবাসী জনগণের উপর দমন-নির্যাতন চালায় যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিব-জিয়া-এরশাদ-খালেদা-হাসিনার সব সরকারের আমলেই পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী কৃষক তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন। সমতলের শোষিত, নিঃস্ব ভূমিহীন গরীব বাঙালি কৃষকদের পাহাড়ে পুনর্বাসনের নামে বুর্জোয়া শাসকদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করছে এবং দরিদ্র বাঙালি ও আদিবাসীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লাগিয়ে নিজেরা ফায়দা লুটছে।
বিগত সময়ে শাসকশ্রেণী তাদের সেনাবাহিনী দ্বারা পাহাড়ে বেশ কয়েকটি গণহত্যা চালিয়েছে। তার মাঝে লংগদু, লোগাং, নানিয়ারচর গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৮ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামের সাজেকে আদিবাসী কৃষকদের কয়েকশ’ বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। পাহাড়ে চলছে অঘোষিত সেনা-শাসন। হত্যা-ধর্ষণ-অপহরণ, গ্রেপ্তার-নির্যাতন পাহাড়ে নিত্যদিনের ঘটনা।
সমতলেও আদিবাসী কৃষকদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে এখানেও তা নৃশংস রূপ নিচ্ছে। গত ১২ জুন ’০৯-এ নওগাঁ জেলার পোরশা থানার সোনাডাঙ্গা আদিবাসী পল্লীটি ভূমিদস্যু, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা নুরুল ইসলাম মাস্টার তার লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ও লুটপাট করে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। একই থানার ছাওর ইউনিয়নের খাতিরপুর গ্রামের ২২ বিঘা জমির উপর গড়ে ওঠা আদিবাসী দরিদ্র কৃষকদের ৬০/৭০টি বাড়ি সম্পূর্ণভাবে এরা পুড়িয়ে দেয়। এইসব তাণ্ডবে দিনবদলের হাসিনা সরকারের পুলিশ বাহিনী সহায়তা করছে। এভাবেই নিরবে বা সরবে সমতলেও আদিবাসী কৃষকগণ ভিটেমাটি-জমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন। ইকোপার্ক নির্মাণের নামে টাঙ্গাইলের মধুপুর ও সিলেটে আদিবাসীরা জমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন।
পাহাড়ীদের সাথে ’৯৮ সালে হাসিনা যে শান্তিচুক্তি করেছিল তা ছিল মূলত পাহাড়ী আদিবাসীদের মধ্যে বিভক্তি ও ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বসংঘাত সৃষ্টি করে বাঙালি বুর্জোয়াদের লুটপাট অব্যাহত রাখার এক নতুন ষড়যন্ত্র মাত্র। সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন এন.জি.ও, মিশনারী সংস্থা আদিবাসীদের মাঝে যে সংস্কারমূলক কাজ করছে তা মূলত মহাজনী সুদী ব্যবসা করা এবং আদিবাসী কৃষকদের খুদ-কুঁড়ো দিয়ে প্রকৃত শত্রুদের আড়াল করা ছাড়া কিছু না। সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে আদিবাসীদের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের যে স্বীকৃতি দিয়েছে তা কাগুজে। বিগত ২০ বছরে তা প্রমাণিত। কারণ আজও আদিবাসী জনগণ ভিটেমাটি-জমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন, বনজঙ্গলে-অরণ্যে তাদের অধিকার হারাচ্ছেন, হুমকির মুখে রয়েছেন। এজন্য সঠিক রাজনীতি ও সঠিক সংগঠন বেছে নেয়া ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই।

সূত্রঃ কৃষক সমস্যা ও কৃষক সংগঠন সম্পর্কে, কৃষক মুক্তি সংগ্রাম কর্তৃক প্রকাশিত

Advertisements