‘আমার জায়গা থেকেই আমি আমার বদলা নেব’ – ভারত কুমারী রেগমী

maowomen

আমার জায়গা থেকেই আমি আমার বদলা নেব

– ভারত কুমারী রেগমী

[নারী মুক্তি/৪নং সংখ্যায় প্রকাশিত ॥ ফেব্রুয়ারি, ’০৬]

[ নিন্মোক্ত সাক্ষাতকারটি নেপালের গণযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন নারী কমরেডের। নাম ভারত কুমারী রেগমী। ৫ বছর বয়সী এক শিশুর মা ও প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা। বাড়ি দাইলেখ জেলার খুরশানী বাড়ি গ্রামে। ২০০১ সালে তার বয়স ২৬। ঐ বছরের ২৭ ডিসেম্বর মাঝ রাতের দিকে নিজ বাড়িতে সরকারি বাহিনীর সদস্যরা দলবেধে তাকে ধর্ষণ করে অজ্ঞান অবস্থায় রেখে যায়। এরপর সকাল ৮টার দিকে জ্ঞান ফিরলে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করেন। স্বামী ও সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্ত হবার ভয়ে তিনি ঐ নিষ্ঠুর ঘটনা সবার থেকে গোপন রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার স্বামী একসময় বিষয়টি জানতে পারেন এবং স্ত্রীকে পরিত্যাগ না করে চিকিৎসা করান। তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। প্রসঙ্গত স্বামী নারায়ণ শর্মাও (সন্দীপ) ছিলেন একজন বিপ্লবী। তিনি “সারা নেপালী জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন (বিপ্লবী)”র কেন্দ্রীয় কমিটির একজন বিকল্প সদস্য ছিলেন। তিনি ২০০২ সালের ২৩ আগস্ট দোলপায় রাজকীয় সেনাবাহিনীর গুলিতে মারা যান।
সাক্ষাতকারটি ২০০৩ সালে নেপালী পত্রিকা “জন আওয়াজ”-এ প্রকাশিত হয়েছিল। যার অংশবিশেষের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করে ভারতের বিপ্লবী পত্রিকা “পিপল্স মার্চ” ফেব্রুয়ারি-মার্চ,’০৫ সংখ্যায়।]

প্রশ্নঃ রাজকীয় সৈন্যবাহিনী কোথায় ও কখন আপনাকে ধর্ষণ করে ?
উত্তরঃ আমি খুরশানী গ্রামে ভাইয়ের বাড়ি থাকতাম। সেখান থেকে আমার স্কুলে যেতে সুবিধে হোত। সেদিন আমি একলাই বাড়িতে ছিলাম। একজন স্থানীয় মহিলা গোয়েন্দা (যাকে কিনা রাজকীয় সেনারা একটা কর্ডলেস টেলিফোন দিয়েছিল) সরকারি বাহিনীকে জানায় যে আমার স্বামী সেদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। গভীর রাতে প্রায় দুটোর সময় প্রায় চার ডজন সরকারি সৈন্য এসে বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল এবং আমার স্বামীর সন্ধান চালিয়েছিল। কিন্তু তারা তাকে খুঁজে পায়নি। তারপরই তারা আমার শ্লীলতাহানি করতে শুরু করে।

প্রশ্নঃ ধর্ষণকারীদের কাউকে কি চিনতে পেরেছিলেন ?
উত্তরঃ না, আমি সরকারি বাহিনীর কাউকে চিনতে পারিনি। কিন্তু আমি একজন হাবিলদার ও একজন পুলিশকে চিনতে পেরেছি। তাদের আমি আগে অনেকবার দেখেছি। কিন্তু আমি তাদের নাম জানি না। সমতলভূমি থেকে একজন প্রায়শ মরিচ বিক্রির অছিলায় আমাদের ওখানে আসত। আর একজন পুলিশ যার হাতে রুকমীতে পুলিশ আক্রমণের সময় গুলি লেগেছিল। আমি অত্যন্ত ভীত ও সন্ত্রস্ত থাকায় অন্যদের দিকে তাকাতে পারিনি আর সঠিকভাবে বলতে পারবো না তারা সংখ্যায় ক’জন ছিল।

প্রশ্নঃ ঘটনাটা কীভাবে ঘটল আপনি কি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করবেন ?
উত্তরঃ সৈন্যরা প্রথমে আমার বিছানা বালিশ ছিঁড়ে ফেলে অনুসন্ধান চালায়। তারপর তারা আমার স্বামীর (সন্দীপের) একটা ছবি বার করে এবং সেটা পুড়িয়ে ফেলে। আমি তাদের বলি ঘটনা যাই ঘটে থাকুক না কেন, ওটা আমার স্বামীর ছবি, পোড়ালে কেন? তারপরেই একজন সৈন্য আমাকে ধর্ষণ করার আদেশ দেয়। তারা আমাকে জাপটে ধরে বুটের লাথি মেরে মেঝেতে ফেলে দেয়। প্রথম সুযোগে আমি দৌড়ে পালাতে পেরেছিলাম। তারপর তাদের মধ্যে একজন আমার বুকে বুটের লাথি মারে। সেই আঘাতের পর আমি চোখে ঝাপসা দেখতে থাকি এবং আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যাই। ছয় সাত জন ধর্ষণকারী ধর্ষণ করা অবধি আমার জ্ঞান ছিল, তারপর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পরদিন সকাল আটটার সময় জ্ঞান ফিরে পাই, তখনও আমার শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। শরীরে এক টুকরো কাপড়ের আবরণ ছিল না। শয়তানেরা যাবার সময় ঘরবাড়ির সমস্ত দরজা-জানালা খোলা রেখে গিয়েছিল। আমি ধীরে ধীরে উঠে বসেছিলাম এবং ভান করেছিলাম যেন কিছুই হয়নি। আমার ভাইও তাই ভেবেছিল। কিন্তু আমার ভাই পরে ব্যাপারটি জানতে পেরেছিল এবং আমাকে রক্ত বন্ধ করার ইঞ্জেকশন দিয়েছিল। আমি আমার ভাইকে অনুরোধ করেছিলাম আমাকে তার ভগ্নীপতির কাছে নিয়ে যেতে। কিন্তু সে আমার শরীরের এই অবস্থায় ওখানে যেতে নিষেধ করল। কিন্তু আমি শুনিনি, সন্দীপের অপেক্ষায় ছিলাম এবং তাকে পেয়েও গেলাম। সন্দীপকে এ ব্যাপারে আমি কিছু বলিনি। আমি তাকে ভীষণ ভালবাসতাম। আমার ভয় ছিল ঘটনাটা জানতে পারলে সে আমায় না-ও গ্রহণ করতে পারে। এই ঘটনাটা জানার পর সে যদি আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে আমি সব হারাবো। সেই কারণে গত তিন মাস ঘটনাটা গোপন করে গিয়েছিলাম।

প্রশ্নঃ সন্দীপ জানতে পারলো কী করে?
উত্তরঃ যদিও আমি বলতে চাইনি, কিন্তু আমার মনে হয় সৈন্যবাহিনীর কেউ অথবা অন্য কেউ যে কিনা খোলা দরজা দিয়ে ব্যাপারটা দেখেছিল, তারাই হয়তো কেউ সন্দীপকে বলে থাকবে। সন্দীপও ঘটনাটা শুনেছিল, এবং আমাকে প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসাবাদ করত। বহুদিন ধরে আমি এটা মিথ্যা কথা বলে এড়িয়ে গেছি। তা সত্ত্বেও সে বলেছিল, তুমি তো নিজের ইচ্ছেয় কাজটা করনি, সুতরাং আমায় খুলে বল। আমি তখন সমস্ত সত্য তার সামনে তুলে ধরলাম।

প্রশ্নঃ সন্দীপ ও তার পরিবারের লোকেরা সমস্ত ঘটনা জানার পর আপনার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছিল?
উত্তরঃ আমি বুঝতে পেরেছিলাম সন্দীপ সম্বন্ধে আমার ধারণা কত ভ্রান্ত। সে আমায় গ্রহণ করল। বস্তুত আমি সমস্ত ঘটনা খুলে বলার পর সে আমাকে যত্ন ও ভালবাসায় ভরিয়ে দিল। সে বলেছিল, প্রতিশোধ নিতেই হবে, সেই কারণে সে আমাকে দলের সংগঠনে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিল। আমি যখন মাঝে মাঝে বিমর্ষ হয়ে পড়তাম, সে আমাকে হাসাত। সে আমাকে প্রায়শ বলতো, তুমি যদি প্রতিশোধ নিতে না পার, আমি ঠিক নেব। হায়, সেও শত্রুর হাতে মারা গেল। আমার চিকিৎসা হওয়ার পরই কেবলমাত্র তার বাবার সাথে দেখা করতে পেরেছিলাম। তার আগে পর্যন্ত আমি কারুর সাথে দেখা করেনি।

প্রশ্নঃ সন্দীপের বাবা আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছিলেন ?
উত্তরঃ সন্দীপের বাবা বলেছিলেন, তুমি আমাদের পুত্রবধূ নও, তুমি আমাদের পুত্র। তুমি আমার পুত্রের জায়গা নিয়েছ। তিনি আমার প্রচুর যত্ন নিয়েছেন।

প্রশ্নঃ আপনার চিকিৎসার ব্যবস্থা কে বা কারা করেছিলেন ?
উত্তরঃ সন্দীপের সঙ্গে থাকার সময় আমি প্রায় অসুস্থই ছিলাম। ইতিমধ্যে আমি পার্টি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। পার্টি সংগঠনই আমার সমস্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এখন আমি সুস্থ এবং সংগঠনের কাজ করছি।

প্রশ্নঃ সন্দীপের শহীদ হওয়ার ঘটনা শুনে আপনার মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল ?
উত্তরঃ আমরা সবাই মানুষ, সুতরাং আমাদের মানবিক অনুভূতি থাকাটাই স্বাভাবিক। আমারও মানবিক অনুভূতি আছে। যদিও আমি এখন মতাদর্শগতভাবে অনেক পরিণত তবুও স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতির কারণেই আমি আঘাত পেয়েছিলাম। ঘটনাটি শোনার পর আমি প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা অজ্ঞান হয়েছিলাম। মতাদর্শ যখন অনুভূতির চেয়ে বড় হয় তখন এটা বোঝা উচিত সে কেন শহীদ হয়েছে।

প্রশ্নঃ আপনাদের বিয়ে কীভাবে হয়েছিল ?
উত্তরঃ প্রাথমিকভাবে এটা ভালবাসার বিয়ে ছিল, কিন্তু আমার ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে প্রথাগতভাবে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল।

প্রশ্নঃ আপনার মতে আপনার উপর একদিকে গণধর্ষণের আঘাত অপরদিকে শত্রুর দ্বারা আপনার স্বামী শহীদ হওয়ার ঘটনা, এর সমুচিত জবাব কী ?
উত্তরঃ বাস্তবে একমাত্র সঠিক মতাদর্শই এই গভীর আঘাতের বেদনাকে সারিয়ে তুলতে পারে। নেপাল বিপ্লবের জন্য সে সর্বহারা শ্রেণির পক্ষে সর্বদাই লড়াই করে গেছে এবং সেই কারণেই সে তার জীবন দান করেছে। আমার মতে সে ছিল এক মহান ব্যক্তিত্ব। তার আদর্শ এবং ফেলে রাখা রক্তরাঙা পথ ধরে তার বন্দুক তুলে নিয়ে লড়াইয়ের পথে এগিয়ে যেতে পারলেই আমার এই ব্যথা কমবে। অবিরাম বিপ্লবী পথে যুক্ত হয়ে এগিয়ে যেতে পারলেই আমি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাব। আমি মনে করি আমি সাহসী হয়ে উঠেছি। যদিও আমার কিছু মানসিক দুঃখ আছে তবুও আমি বলতে পারি না যে আমি মতাদর্শগতভাবে উন্নত হব না। আমি আমার জায়গা থেকেই প্রতিশোধ নেব। আমার সিঁদুর শূন্য সিঁথি প্রত্যক্ষ করবে এক প্রভাতী সূর্যের লাল আলো। আমি খুবই আশাবাদী।

প্রশ্নঃ সারা দেশে আপনার মতো বহু নারী যারা এই ধর্ষণের শিকার তাদের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী ?
উত্তরঃ যারা আমার মতো দলীয় সংগঠনে যুক্ত আছেন তাদের উদ্দেশে আমি বলবো তারা যেন সাময়িক ক্ষয়ক্ষতির জন্য স্বপ্নভঙ্গ হয়ে এগিয়ে যাওয়া থেকে থেমে না যান। আসুন আমরা সবাই সাহসী হই এবং অত্যাচার, শোষণ এবং একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে যাই। আমরা যেন আমাদের ব্যক্তিগত ক্ষতিকে প্রাধান্য না দিই, দলের বিজয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখি। শহীদ পরিবারের লোকজন যারা আজও সংগঠনে যোগদান করেননি তাদের উদ্দেশে বলি যে, যারা দেশ ও জাতির জন্য প্রাণ দিয়েছেন তারা কখনও ভুল পথ গ্রহণ করেননি। ছেলেরা পিতা-মাতার কোলহারা হয়েছে এবং বোনেরা সিঁথির সিঁদুর হারিয়েছে বলে আমরা কখনই আশাহত হব না। শহীদের রক্তের ঋণ আমরা রক্তেই শুধবো। পার্টি আজ বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে। আমাদের প্রিয়জনদের রক্তদান বৃথা যায়নি। তাদের আত্মবলিদানের পথ ধরে যেন আমরা এগিয়ে যাই। এইভাবেই আমরা সেইসব শহীদ পরিবারের সম্মুখীন হতে পারি।

সূত্রঃ দেশে দেশে বিপ্লবী নারী সংকলন, বিপ্লবী নারী মুক্তি প্রকাশনা

Advertisements