আন্দোলন পত্রিকা, ফেব্রুয়ারী ‘১৬ সংখ্যাঃ সিরিয়ায় আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠছে

download

সম্প্রতি সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব তথা আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠছে সিরিয়াকে কেন্দ্র করে। সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ-ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত-প্রতারণা তা-ও সকলে পুনরায় প্রত্যক্ষ করছে। সিরিয়ায় রুশপন্থি আসাদ সরকারকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে আইএস তথা দায়েস উচ্ছেদের ছুতায় মার্কিন আগ্রাসনের পর এই বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। তার পর রাশিয়া আইএস উচ্ছেদে (মূলত আমেরিকার বিরুদ্ধে) সিরিয়ায় সামরিক হামলা করলে আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ফলে একবিশ্ব ব্যবস্থার মোড়ল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পড়ে মহাসংকটে।

মধ্যপ্রাচ্যে তেলের উপর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইরাক-আফগানিস্তান-লিবিয়া দখলের পর আমেরিকা সিরিয়া আক্রমণের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করে। ইতিমধ্যে দজলা-ফোরাত নদী দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ইউক্রেনে রুশ বিরোধী শক্তিকে আমেরিকা মদদ দিতে থাকে। বহুবিধ সংকটের কারণে আমেরিকাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া নতুনভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিশ্ব পরিসরে মার্কিনের সাথে দ্বন্দ্বমান চীন ইরানের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে। অতি সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর ইরান সফর সেটাই তুলে ধরছে। উল্লেখ্য এই সফরে দু দেশের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাঝে হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যিক চুক্তিও রয়েছে। এ ছাড়া কৌশলগত সম্পর্কের ব্যপারে ২৫ বছরের একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টা খ্বুই গুরুত্বপূর্ণ।

এবারে জাতিসংঘে সিরিয়া আক্রমণে মার্কিন প্রস্তাবে রাশিয়া ভেটো প্রদান করে। ৯০-এর দশকের প্রথম দিকে রুশ-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধ স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় মুখোমুখি হয় এই দুই পরাশক্তি। আমেরিকা পিছু হঠতে বাধ্য হলেও ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত অব্যাহত রাখে। আমেরিকা আসাদ বিরোধী শক্তিকে সংগঠিত করে “ফ্রি সিরিয়ান আর্মি” গড়ে তোলে। অন্যদিকে ইরাক-সিরিয়ায় হতাশাগ্রস্ত সুন্নীদের মার্কিনীরা মদদ দিয়ে গড়ে তোলে আইএস। এ জন্য মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে মার্কিন ব্যবহার করে। আইএসও বিভিন্ন কারণে এক পর্যায়ে লাদেনের মতো আমেরিকার অবাধ্য হয় কখনো কখনো। তাই আইএস উচ্ছেদের উছিলায় আমেরিকা সিরিয়ায় সৈন্য পাঠায়। প্রচার আছে যে, মার্কিনীরা আইএসকে যত না আক্রমণ করে, তার চেয়ে বেশি আক্রমণ করে বাশারের সৈন্যদের উপর। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ৩৫টি দেশের জোট থাকা সত্ত্বেও নতুন করে মার্কিনের পা-চাটা সৌদি আরবের নেতৃত্বে ৩৪টি মুসলিম দেশ নিয়ে আইএস বিরোধী জোট গঠন করেছে। মজার বিষয় হচ্ছে এই জোটে আইএস-এর কট্টর বিরোধী ইরান নেই। এসব হচ্ছে মার্কিনের আধিপত্য বজায় রাখা ও প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী যুদ্ধ-পরিকল্পনার অংশ। এই প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধের  মধ্য দিয়ে তারা তাদের অস্ত্র ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছে।

এই আমেরিকান জোট আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না তা পরিষ্কার। তুরস্ক হচ্ছে এই জোটের অংশীদার। অথচ আইএস-এ যোগদান করতে ইচ্ছুক বহির্বিশ্বের গেরিলারা অনেকেই তুরস্কের সীমান্ত দিয়েই আইএস-এর ঘাঁটিতে প্রবেশ করছে। শুধু তাই নয়, তুরস্কসহ অনেক জোট সদস্য দেশই আইএস অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে সস্তায় চোরাই পথে তেল কিনে নিচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিদার আইএস মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিমদের সাধারণ শত্রু ইসরাইলের বিরুদ্ধে টু-শব্দ করছে না।

সুতরাং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে যুদ্ধ আইএস উচ্ছেদের যুদ্ধ নয়। এর রয়েছে দ্বিমুখী তৎপরতা। আইএসকে রক্ষা করে কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরদ্ধে অদৃশ্য যুদ্ধকে জিইয়ে রাখা এবং যখন আইএস সীমা লংঘন করে তখন অবাধ্য সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কিছু যুদ্ধ করা। এই মার্কিনী ছকে বাধ সেধেছে রাশিয়া, আইএস উচ্ছেদে অংশ নিয়ে। সৃষ্টি হয়েছে বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব।

রাশিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রেখে মধ্যপ্রাচ্যে নিজস্ব আধিপত্যের এ খুঁটিকে রক্ষা করা। অন্যদিকে আমেরিকা চাইছে বাশার সরকারকে উচ্ছেদ করে মধ্যপ্রাচ্যে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এখানকার আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরব মার্কিনের সাথে জোটবদ্ধ থেকে রাজতন্ত্র রক্ষায় ব্যস্ত। ইরানের কর্মসূচি হচ্ছে একটা বৃহৎ শিয়া সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। আর তুরস্কের এরদোগান সরকার চাচ্ছে মার্কিনী জোটে থেকে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা অব্যাহত রেখে তা ছড়িয়ে দিতে। যেজন্য তারা আইএস-এর সাথে গোপন সম্পর্ক রক্ষা করে। এরা প্রকাশ্যে মার্কিন-রুশ জোটে থাকলেও যার যার সুবিধা অনুযায়ী ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত-প্রতারণা-কামড়াকামড়ি করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দী জাতি ছিল বিখ্যাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদীরা এই বিশাল কুর্দী জাতিকে ইরান-ইরাক-তুরস্ক-সিরিয়ার মধ্যে মধ্যে ভাগ করে দেয়। সেই কুর্দী জাতি এখন আবার স্বাধীনতার জন্য ফুঁসে উঠেছে। পিকেকে নামক পেটি-বুর্জোয়া সংগঠন সশস্ত্র সংগ্রাম করছে। তাদের সংগ্রামের প্রধান ক্ষেত্র তুরস্কের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল। এখানে ইব্রাহীম কায়াপাক্কায়া প্রতিষ্ঠিত মাওবাদী সংগঠনও সক্রিয়। এরাও আইএস নামের দায়েসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তুরস্ক সরকার পিকেকে এবং মাওবাদীদের উপর আক্রমণ করে আইএসকেই সহায়তা করছে। মাওবাদীদের লক্ষ্য হচ্ছে আইএস উচ্ছেদের পরও নয়া গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লব অব্যাহত রাখা।

সাম্রাজ্যবাদ ও সকল দেশের দালাল শাসকশ্রেণির কার্যক্রম হচ্ছে গণবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল। তারা তাদের শোষণ-নিয়ন্ত্রণ-আধিপত্য বজায় রাখার জন্য জনগণের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে। এই বহুবিধ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের জনগণকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ-এর ভিত্তিতে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এবং আজ আওয়াজ তুলতে হবে- সকল সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলরা সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাত গুটাও।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, ফেব্রুয়ারী ‘১৬ সংখ্যা

Advertisements

আমেরিকায় চলতি বছর পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে প্রায় ১০০০ ব্যক্তি

4bhk91e187d9071uix_620C350

চলতি বছর আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে প্রায় ১০০০ ব্যক্তি নিহত হয়েছে। মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট এ খবর দিয়ে লিখেছে, পুলিশের হামলায় নিহত হয়েছে মোট ৯৬৫ জন। আমেরিকার বিভিন্ন শহরে প্রায়ই বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয় এবং পুলিশি হামলার ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতিতে দৈনিকটির খবর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

দৈনিকটির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, পুলিশের গুলিতে যে ৯৬৫ জন নিহত হয়েছে তাদের মধ্যে হামলার সময় প্রায় ১০০ জন ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র।

এতে আরো বলা হয়েছে, চলতি বছর পুলিশ যাদের ওপর গুলিবর্ষণ করেছে তাদের ৪০ শতাংশই হচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী। দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টের এ প্রতিবেদন এমন সময় প্রকাশিত হল যখন চলতি বছর শিকাগো শহরে পুলিশের বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সেখানকার স্থানীয় জনগণ বহুবার বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।

2EC9630D00000578-3332731-Hundreds_of_protesters_took_to_the_streets_of_Chicago_within_hou-a-13_1448465498163

আজও ২ কৃষ্ণাঙ্গকে গুলি করে হত্যা, উত্তাল শিকাগো

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আবারও দুই কৃষ্ণাঙ্গকে গুলি করে হত্যা করেছে পুলিশ। বড়দিনের একদিন পর শনিবার সকালে শহরের ‘ওয়েস্ট গারফিল্ড পার্ক’-এ একই ভবনে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও এক নারীকে গুলি করে পুলিশ। একের পর এক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার প্রতিবাদে আবারো হাজার হাজার মানুষ শহরের রাস্তায়।

আবারো ক্ষোভে উত্তাল শিকাগো। পুলিশের গুলিতে একের পর এক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদ জানাতে নেমে পড়েছে রাস্তায়।

গত বছর পুলিশের গুলিতে কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর ম্যাকডোনাল্ডের হত্যার বিচার দাবিতে শুক্রবার উত্তাল ছিল পুরো শিকাগো। এর জের কাটতে না কাটতেই আবারো দুজনকে গুলি করে মারলো পুলিশ। পুলিশের সহিংসতা, বিচারবিভাগীয় তদন্ত ও মেয়রের পদত্যাগ দাবিতে শনিবার সকাল থেকে আবারো রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ।

পুলিশের খোঁড়া যুক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র কোইনটোনিও বড় দিনের ছুটিতে বাবার কাছে গিয়েছিলেন। বাক-বিতণ্ডার এক পর্যায়ে সে বেসবলের একটি ধাতব ব্যাট নিয়ে বাবাকে হত্যার হুমকি দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। পরে ব্যর্থ হয়ে গুলি চালায়।

নিহত কোইনটোনিও’র মা জ্যানেট কুকসে বলেন, ‘এটা খুবই বাড়াবাড়ি। আমার ছেলের কিছুটা মানসিক সমস্যা ছিলো, তাই বলে সে আগ্রাসী ছিলো না। কখনো কোনো সহিংসতাও করেনি সে। সাহায্যের জন্য পুলিশ ডেকে আমার ছেলেকে হারাতে হলো।’

তবে একই ভবনে ৫৫ বছর বয়সী এক নারীকে গুলি করে হত্যাকে নিছক দুর্ঘটনা বলছে পুলিশ।

এ ঘটনায় দায়ী পুলিশ সার্জেন্টকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম।

একইদিন, শহরের ‘ওয়াশিংটন হাইটস’ এলাকায় পুলিশ জরুরি আহ্বানে সাড়া দিয়ে, একজনকে গুলি করে বলে জানায় গণমাধ্যম। তার অবস্থা গুরুতর না হলেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।