সাম্রাজ্যবাদী/পুঁজিবাদী গেরিলা দল ‘কন্ট্রা’

download

গেরিলা সংগঠনের ইতিহাসে কন্ট্রা একটি ব্যতিক্রমী ধারা, যারা সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে পুঁজিবাদী সমাজ নির্মাণে লড়ে গেছে। গেরিলা গোষ্ঠীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পৃথিবীর প্রায় সব গেরিলা গোষ্ঠিই সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা নিয়ে সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে গড়ে উঠেছিল। তবে নিকারাগুয়াতে ১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সক্রিয় কন্ট্রা গেরিলাদের উদ্দেশ্য ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এটাই পৃথিবীর একমাত্র গেরিলা গোষ্ঠী যাদের উদ্দেশ্য ছিল সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করা, সমাজতান্ত্রিক ধ্যান ধারণাকে ধূলিসাৎ করে পুঁজিবাদের ঝান্ডা ওড়ানো।

‘কন্ট্রা’ শব্দটির উৎপত্তি ল্যাতিন শব্দ কন্ট্রা হতে যার অর্থ ‘বিরোধী’। তবে কন্ট্রার অনেক সদস্য তাদের  কন্ট্রা বলে পরিচয় দিতে অস্বস্তি বোধ করেন। তারা মনে করতেন কন্ট্রা শব্দটি নেতিবাচক অর্থ বহন করে। তাই তারা নিজেদের কমান্ডোস বা লস প্রিমস বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। নিকারাগুয়ার ত্রাস এই গেরিলা গোষ্ঠীটি সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের নায়ক যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ানে পরিচালিত হতো। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নিকারাগুয়ার শাসন ক্ষমতায় আসে বামপন্থি দল সানডিনিয়ান্থে জান্তা অব ন্যাশনাল রিকন্সট্রাকশন সরকার। এতে করে আশা ভঙ্গ হয় মার্কিন প্রশাসনের । তারা অচিরেই বুঝতে পারে বামপন্থি এ সরকার কিউবা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নিকারাগুয়ায় তাদের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ফলে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। যেটা ১৯৮২ সালে এসে অত্যন্ত কদর্য রুপ ধারণ করে। এ বছরই রিগানের প্রশাসন কন্ট্রা বিদ্রোহীদের সহায়তার জন্য প্রায় ১৯ মিলিয়ন এবং ১৯৮৪ সালে এসে প্রায় ২৪ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করে। মূলত স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান সরকারের প্রত্যক্ষ মদদ ও অর্থায়নে এ বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি পরিচালিত হতো। এক কথায় কন্ট্রার বিদ্রোহীদের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ প্রদান, তাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র প্রদান সব কিছুই হতো মার্কিন সরকারের ইশারায়। যদিও এ দাবি সব সময় প্রত্যাখ্যান করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে পরে এটা জনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং মার্কিন কংগ্রেস কন্ট্রার জন্য  সরাসরি সহয়তা বাতিল করলে। কিন্তু  রিগান প্রশাসন গোপনে তাদের সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।

প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ব্যাতীত সমগ্র নিকারাগুয়ার গ্রামীণ অঞ্চলে ২৩ হাজার সদস্যের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত। এদের মূল লক্ষ্যই ছিল নিকারাগুয়ার সরকারের স্বার্থে আঘাত করে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ সাল এই ১১ বছরে কন্ট্রা বিদ্রোহীরা নিকারাগুয়াতে প্রায় তেরশোর মতো বিচ্ছিন্ন আক্রমণ বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। সরকার ব্যাতীত তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হামলা করে ওষুধপত্র ছিনিয়ে নেওয়া ও স্বাস্থ্য কর্মীদের অপহরণ, বেসামরিক লোক অপহরণ, তাদের সম্পত্তি লুটপাট নয়তো জ্বালিয়ে দেওয়া, নারী ও শিশু পাচারের মতো অপকর্মে লিপ্ত থাকত কন্ট্রা বিদ্রোহীরা।

১৯৮৬ সালে এফএসএলএন-সমর্থিত ডেনিয়েল ওর্তেগা সরকার কন্ট্রা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। এরপর ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল এই  তিন বছরে বেশ কয়েকটি বড় বড় সামরিক অভিযানের মুখে কন্ট্রা বাহিনী ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সামরিক অভিযান তদুপরি মার্কিন প্রশাসনের সহায়তা প্রকল্প বাতিল হওয়ার ফলে কন্ট্রা বিদ্রোহীরা ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসে কিছু শর্ত সাপেক্ষে অস্ত্র জমাদানে সম্মত হয়।

কন্ট্রা বিদ্রোহীদের দাবিদাওয়ার মধ্যে অন্যতম ছিল একটি অবাধ-সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। বিদ্রোহীদের দাবির মুখে তৎকালীন সরকার ১৯৯০ সালে নির্বাচনের আয়োজন করে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ডেনিয়েল ওর্তেগার সরকার নির্বাচনে পরাজিত হয়। তবে ধারণা করা হয়, এই পরাজয়ের পিছনে মার্কিন প্রশাসনের হাত ছিল। এরপর বিদ্রোহীদের অনেকে বিভিন্ন দলে ঢুকে রাজনীতি শুরু করে। তবে অধিকাংশ বিদ্রোহী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে এবং রাজনীতি থেকে দূরে চলে যায়। ১৯৯০ সালের নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে সমাপ্ত হয় কন্ট্রার ইতিহাস।

Advertisements