কমরেড আবদুল হক-এর ও কমরেড হেমন্ত সরকার-এর মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করুন

comred-hoq

২২ ডিসেম্বর কমরেড আবদুল হক-এর ২২তম ও ২৮ ডিসেম্বর কমরেড হেমন্ত সরকার-এর ১৯ তম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করুন

শ্রমিক-কৃষক-জনগণের রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রসর হউন।

সংগ্রামী সাথী ও বন্ধুগণ,

সংগ্রামী অভিনন্দন গ্রহন করুন। আগামী ২২ ডিসেম্বর কমরেড আবদুল হক এর ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯২০ সালের ২৩ডিসেম্বর যশোর জেলার সদর থানার খড়কিতে জন্মগ্রহণ করেন। সামন্তবাদী পীর পরিবার থেকে আগত হলেও তিনি যখন কলকাতায় পড়াশুনা করতেন সেই ছাত্রাবস্থায় তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং শ্রমিক এবং

শ্রমিক শ্রেণীর মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বৈপ্লবিক কর্মকান্ড শুরু করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে বি.এ অনার্স পড়ার সময় তিনি ১৯৪১ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী সভ্যপদ লাভ করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিচালিত ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট ফেডারেশনের বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির দায়িত্ব পালন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ভর্তি হলে তিনি পার্টির ডাকে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৪১ সালে যশোর জেলার বনগাঁয়ে তৃতীয় কৃষক সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই সম্মেলনে “লাঙ্গল যার জমি তার” এবং ঐতিহাসিক তে-ভাগা আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যশোর জেলার কৃষকের তে-ভাগা আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দানকারীর ভূমিকা পালন করেন। পাকিন্তান আমলে তিনি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পুর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশের সময়কালে তিনি অনেক আন্দোলন প্রত্যক্ষভাবে গড়ে তোলেন ও অংশ নেন- যেমন: ছাত্রজীবনে ১৯৩৯ সালে হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙ্গার আন্দোলন, ১৯৪৩ সালের মহা মন্বন্তরে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো, ১৯৪৪ সালে হাট তোলা বিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৬ সালে তে-ভাগা আন্দোলন, ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলে খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলন, বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনসহ ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলন ও গণঅভ্যূত্থান এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের বিপ্লবী আন্দোলন ইত্যাদি। এই সামগ্রিক সময়কালে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে অগ্রণী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। কমিউিনিষ্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি সংশোধনবাদের সকল প্রকাশের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের লাল পতাকা সমুন্নত রেখেছেন। তিনি ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ-গর্বাচেভ মার্কা, তিন বিশ্ব তত্ত্ব ও মাও-সেতুং চিন্তাধারা মার্কা সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে এদেশ তথা উপমহাদেশে মতাদর্শিক সংগ্রামে বলিষ্ঠ নেতৃত্বকারী ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি জাতীয় ক্ষেত্রে আলাউদ্দিন-দেবেন শিকদারদের কৃষিতে ধনবাদ, সুখেন্দু দস্তিদার-তোহাদের উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী অবস্থান ও জিয়াউর রহমানকে ‘দেশপ্রেমিক সরকার’ ও সত্য মৈত্রী-ইদ্রিস লোহানীদের জিয়াউর রহমানকে ‘জাতীয় সরকার’ চিহ্নিত করার ডান সুবিধাবাদী-সংশোধনবাদী অবস্থান থেকে, জাসদের ট্রটস্কিবাদী বাম হটকারী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের লাল পতাকাকে উর্ধ্বে তুলে ধরে বাংলাদেশে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রীর ভিত্তিতে সাম্যবাদ-সমাজতন্ত্রের লক্ষে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করার সঠিক লাইন তুলে ধরে অগ্রসর করতে ভূমিকা গ্রহণ করেন। দশটি গ্রন্থের সমন্বয়ে কমরেড আবদুল হক গ্রন্থাবলী ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও শতাধিক প্রবন্ধ তিনি রচনা করেছেন। সুদীর্ঘ ষাট বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে পঁচিশ বছরই তাকে আত্মগোপনে কাটাতে হয়। ২২ ডিসেম্বর ১৯৯৫ শুক্রবার রাত ১০টা ৫ মিনিটে বার্ধক্যজনিত অসুস্থ্যতায় কমরেড আবদুল হক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

অপর কমরেড হেমন্ত সরকার ১৯৯৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর ৮২ বছর বয়সে নড়াইলে মৃত্যুবরণ করেন। কমরেড হেমন্ত সরকারের বিপ্লবী জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় ১৯১৬ সালে নড়াইল জেলার সদর থানার বড়েন্দার গ্রামে এক গরীব কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী রাজনীতি ও কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্কিত হন ১৯৪০-এর দিকে এবং ১৯৪২ সালে পার্টি সভ্যপদ লাভ করেন। ঐতিহাসিক তে-ভাগা আন্দোলনে তিনি দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে গ্রেপ্তার হয়ে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বন্দী জীবন কাটান। ৬০ এর দশকে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনি দৃঢ় ভূমিকা রাখেন। এ প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এর যশোর জেলা পার্টি পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং যশোর জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের লাইন গৃহীত হলে তিনি তা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন এবং ১৯৭১ সালে পার্টি পরিচালিত বিপ্লবী যুদ্ধে তিনি নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা পালন করেন। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কমরেড আবদুল হকের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের প্লেনামে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৫ সালে ৫ম কংগ্রেসে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পুনঃনির্বাচিত হন।

তিনি ১৯৮০ সালে সংশোধনবাদী তিন বিশ্ব তত্ত্ব বিরোধী সংগ্রামে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৮৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এর ৬ষ্ঠ কংগ্রেসে কন্ট্রোল কমিশনের সভ্য নির্বাচিত হন এবং কন্ট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

এর পর পরই ১৯৮৪ সালে তিনি পুণরায় গ্রেপ্তার হন। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত ৭ম কংগ্রেসে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পূণঃনির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ৮ম কংগ্রেসে তিনি কন্ট্রোল কমিশনের সভ্য নির্বাচিত হন এবং কন্ট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। নবম কংগ্রেসের প্রায় পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। নবম কংগ্রেসে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা ও অন্যান্য কারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সংগঠনে থাকেন না এবং পার্টির সভ্য হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন। সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব জয়যুক্ত করার জন্য ব্রিটিশ আমল থেকে তাঁর সংগ্রামী ভূমিকা, অধ্যবসায়, ত্যাগ-তিতিক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক অবদান থেকে সকল প্রগতিশীল বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নেতা-কর্মীদের গভীরভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

সংগ্রামী বন্ধুগণ,

আজ যখন আমরা কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা কমরেড আবদুল হক ও কমরেড হেমন্ত সরকারের মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছি তখন বাংলাদেশ এক গভীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক তথা সামগ্রিক সংকটে নিমজ্জিত। চাল, লবন, পেঁয়াজ, শাক-সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, পুনরায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে পণ্যসামগ্রী, যানবাহনের ভাড়া, বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করে জনজীবনকে আরো বিপর্যস্ত করছে। শ্রমিক বাজারদরের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মজুরি না পেয়ে; বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক দ্বিতীয় দফায় উৎপাদন করতে পুনরায় ঋণগ্রস্থ ও উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে বিপর্যস্ত; শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ, ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, দূর্নীতি, শিক্ষাঙ্গনে দলীয় সন্ত্রাস; খুন-গুম-অপহরণ; নারী ধর্ষণ-নির্যাতন, নারী ও শিশু পাচার; সরকার দলীয় সন্ত্রাস, পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস; মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ; সংবাদপত্র ও সংবাদ মাধ্যম কালা-কানুন করে নিয়ন্ত্রণ; শহর-গ্রামে সর্বত্র মাদকের ছড়াছড়ি ইত্যাদি সর্বাত্মক করে চলেছে। মহাজোট সরকার স্বৈরতন্ত্রকে তীব্রতর করে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নেতৃত্বকারী বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল সামন্ত-আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী মহাজোট সরকারের নির্মম শোষণ-লুণ্ঠন ও স্বৈরাচারি শাসনের বিরুদ্ধে আজ প্রয়োজন শ্রমিক-কৃষক-জনগণের জরুরি সমস্যা ও দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামকে বেগবান করা। এ ক্ষেত্রে অতীতের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল বুর্জোয়া শ্রেণির লেজুড় সংশোধনবাদী-সুবিধাবাদীরা এই মূল কাজকে আড়াল করে উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের অবস্থান থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’র স্বপক্ষের শক্তির ঐক্যের শ্লোগানকে সামনে রেখে মহাজোট সরকারের লেজুড়বৃত্তি করে চলেছে। ১৯৯১ সালে ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ-গর্বাচেভ মার্কা সংশোধনবাদীরা বিপর্যস্ত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টিকে বিলোপ করে। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদীরা পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে সমাজতন্ত্রের নামাবলী গায়ে দিয়ে চলে এবং ১৯৬৭ সালে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়ে পরাশক্তি হিসেবে আগ্রাসন তৎপরতা চালায়। এ প্রক্রিয়ায় ১৯৯১ সালে পুঁজিবাদের উলঙ্গ প্রকাশ ঘটে। আবার চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৪৯ সালে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব করলেও তাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল না করায় চীনেও সংশোধনবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা বর্তমানে রুশ ফেডারেশনের কমিউনিস্ট পার্টি, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, ভিয়েতনামের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন দেশের রুশ ও চীনপন্থী সংশোধনবাদী পার্টিগুলো কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টিসমূহের আন্তর্জাতিক অধিবেশন করে (IMCWP) চীনকে সামনে রেখে ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া ও কিউবাকে সমাজতান্ত্রিক আখ্যায়িত করে যে ডান সুবিধাবাদী সংশোধনবাদী ধারা সামনে আনছে তাদের এদেশীয় দোসর ওয়ার্কার্স পার্টি ও সিপিবি এবং তাদের নেতৃত্বে তথাকথিত বামপন্থীদের ঐক্যের তৎপরতা এদেশের শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী সংগঠন ও সংগ্রাম তথা প্রকৃত বাম আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্থ করার ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়।

এমতাবস্থায় নয়াউপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী বাংলাদেশে তিন শত্রুর বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রীর ভিত্তিতে সাম্যবাদ-সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করার ক্ষেত্রে অন্যতম বাঁধা হচ্ছে উল্লেখিত সংশোধনবাদীরাসহ সকল রূপের সংশোধনবাদ। ২০১৭ সালে আমরা যখন কমরেড আবদুল হক ও কমরেড হেমন্ত সরকারের মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছি- এ বছরই হচ্ছে মহান অক্টোবর বিপ্লবের শততম বার্ষিকী। আমাদের দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের মহান নেতৃদ্বয় অক্টোবর বিপ্লব তথা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মহান শিক্ষাকে সামনে রেখে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশ ও অধীন হিসেবে এদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে সুবিধাবাদ ও সংশোধনবাদের সকল প্রকাশের বিরুদ্ধে যে আপসহীন মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনা করে লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থেকেছেন সেই শিক্ষাকে সামনে রাখতে হবে। তাই আজ আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সংশোধনবাদের উল্লেখিত প্রকাশসহ সকল রূপের সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করার লক্ষে আপসহীন ধারাবাহিক সংগ্রাম পরিচালনা করা। আসুন, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত জনগণ এবং দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক সকল শক্তি ঐক্যবদ্ধ হই, গড়ে তুলি সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের বিরুদ্ধে দূর্বার আন্দোলন।

সংগ্রামী অভিনন্দনসহ

আব্দুল হক

সভাপতি

হাফিজুর রহমান

সাধারণ সম্পাদক

জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, যশোর জেলা শাখা

৫৮, সমবায় ব্যাংক মার্কেট ভবন (৩য় তলা) পাইপপট্টি, যশোর-৭৪০০ থেকে ৫ ডিসেম্বর ২০১৭ প্রকাশিত ও প্রচারিত।

l

Advertisements

খাপড়া ওয়ার্ড সম্পর্কে কমরেড আবদুল হক-এর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার

18194809_918887364919843_7010470610119449904_n

18222183_918887388253174_4834193869224904335_n

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯

[শাসক-শোষক শ্রেণি ইতিহাসকে মিথ্যার জালে ঢেকে দিয়ে সব সময়েই প্রয়াস চালিয়ে থাকে। খাপড়া ওয়ার্ডের রক্তাক্ত ঘটনাকে হটকারিতার ফল হিসাবে অনেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। অনেকে আবার খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলনের নেতা কে ছিলেন সে সম্পর্কের বিকৃত বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। এ সম্পর্কে প্রকৃত সত্য তুলে ধরা আবশ্যক। খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলনের নেতা কমরেড আবদুল হক-এর মুখ থেকেই ঘটনার বিবরণ জানা যাক। এই ঘটনার নির্মম সত্য বর্তমান প্রজন্মের জানার স্বার্থে এই বিবরণ তুলে ধরা হলো। এই বিরল সাক্ষাতকারটি ইতিপূর্বে সাপ্তাহিক সেবায় প্রকাশ করা হয়েছিল। ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করেই সেটি আবার সাপ্তাহিক সেবাতে পুনঃমুদ্রিত হলো- সম্পাদক, সাপ্তাহিক সেবা]

দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর দুই বাঙলায় পৃথক পার্টি হয়। পূর্ব বাঙলার কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকেন- খোকা রায় (সম্পাদক), মনি সিংহ, বারীন দত্ত, মারুফ হোসেন, সর্দার ফজলুল করিম, আবদুল হক, মুনীর চৌধুরী, কেষ্টবাবু, ব্রজেস দাস, মনসুর হাবিব, কৃষ্ণ বিনোদ রায়। যদিও প্রাদেশিক কমিটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়, তাহলেও সেই কমিটি সাংগঠনিক দিক দিয়ে সর্বভারতীয় পার্টির সাথে পূর্বের মতোই যুক্ত থাকে। সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় কমিটিতে খোকা রায়, মনি সিংহ, কৃষ্ণ বিনোদ রায় এবং প্রমথ ভৌমিক (খুলনা) পূর্ব বাঙলার প্রতিনিধিত্ব করতেন। এছাড়া একটি নতুন পাকিস্তান কমিটিও গঠিত হয় সাজ্জাদ জহিরকে সম্পাদক করে। এই কমিটি পূর্ব বাঙলার সাথে সাংগঠনিক দিক দিয়ে যুক্ত ছিল না। তার কাজ ছিল শুধু দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা। ১৯৪৮ সালে পার্টি থেকে সকলকে Option দেওয়া হয় পূর্ব বাঙলায় অথবা পশ্চিম বাঙলায় কাজ করার জন্য। মনসুর হাবিব তখন পূর্ব বাঙলায় কাজ করার জন্য Option দেন। অন্যান্যরাও নিজ নিজ ইচ্ছামতো দুই জায়গার মধ্যে যেখানে ইচ্ছা থাকেন। ১৯৫১ সালে রণদীভে থিসিস পরিবর্তনের পর পূর্ব বাঙলাতে অন্যান্য জায়গার মতো নতুন সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটিতে থাকেন- মনি সিংহ (সম্পাদক), খোকা রায়, বারীন দত্ত, সুখেন্দু দস্তিদার, শচীন ঘোষ, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখ। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত দুই বাঙলার সংগঠনের সামগ্রিক দায়িত্ব ন্যাস্ত ছিল ভবানী সেনের ওপর।

১৯৪৯-৫০ সালে আমরা জেলখানায় মোট চারবার অনশন ধর্মঘট করি। প্রথমবার ৩৮ দিন, দ্বিতীয় বার ৪১ দিন, তৃতীয়বার ৪৫ দিন এবং চতুর্থবার ৬১ দিন। আমাদের দাবি প্রত্যেক বারই ছিল মোটামুটি এক। জেলখানায় সে সময়ে সরকার আমাদেরকে কোন রাজনৈতিক মর্যাদা না দিয়ে তৃতীয় শ্রেণির সাধারণ কয়েদি করে রেখেছিল। সেই হিসাবে আমাদের জেলের কুর্তা পরতে হতো, বইপত্র, খবরের কাগজ ইত্যাদি দেওয়া হতো না। এসবের প্রতিবাদে আমরা ধর্মঘট শুরু করি। এই ধর্মঘট ঢাকা ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার এবং অন্যান্য জেলা কারাগারগুলিতে শুরু হয়। রাজশাহী জেলে যারা অনশন ধর্মঘটে যোগ দেন তাদের মধ্যে ছিলেন অমূল্য লাহিড়ী, বাবর আলী, গারীসউল্লাহ, শিবেন ভট্টাচার্য, খবিরউদ্দিন, পি. রায়, আমিনুল ইসলাম, অজয় ভট্টাচার্য, শীতাংশু মৈত্র, ভুজেন পালিত, বিজন সেন, ডোমারাম সিংহ, কম্পরাম সিংহ, সুখেন ভট্টাচার্য, হানিফ শেখ, দেলোয়ার হোসেন, আবদুল হক, আনোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, মনসুর হাবিব, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, নুরুন্নবী চৌধুরী। ঢাকা জেলে ধর্মঘটিদের মধ্যে ছিলেন- শিবেন রায়, কমনীয় দাশগুপ্ত, নগেন সরকার, তকিউল্লাহ, জ্ঞান চক্রবর্তী, সর্দার ফজলুল করিম, নাসিম আহম্মদ, নাদেরা বেগম, নলিনী দাস, কেষ্টবাবু। রাজনৈতিক মর্যাদা আদায়ের জন্য সর্বশেষ ধর্মঘট চলাকালে ১৯৫০ এর ৫ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কুষ্টিয়ার শিবেন রায় মারা যান। অনশন ধর্মঘটের সময়ে আমাদেরকে জেল কর্তৃপক্ষ বুকের ওপর চড়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করতো নাকে পাইপ দিয়ে। এই পাইপ ঢুকিয়ে জবরদস্তি খাওয়ানোর সময়ে বরাবরে পাইপ শিবেন রায়ের Lungs পর্যন্ত যাওয়ায় তিনি সঙ্গে সঙ্গে মারা যান।

এরপরই জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে এসে বলে যে, আমাদেরকে তারপর থেকে ডিটিনিউ হিসাবে বিবেচনা এবং রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া হবে। এছাড়া রাজনৈতিক কর্মীদেরকে এক জায়গায় থাকতে প্রতিশ্রুতি দিল। সেই অবস্থায় ৮ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে আমরা ঢাকা, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং অন্যান্য কারাগারেও অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করি। ১৯৪৯ সালে দ্বিতীয়বার অনশন ধর্মঘট শুরু হলে পূর্ব বাঙলা সরকারের অর্থমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী ঢাকা জেলে গিয়ে অনশনরত ধর্মঘটীদের বলেন, আপনারা হচ্ছেন দেশদ্রোহী। সরকার আপনাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সেটাই খুব বেশি। তার ওপর আপনারা আবার রাজনৈতিক মর্যাদা চান। এই দ্বিতীয় ধর্মঘটের সময় আমাদেরকে আত্মহত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে এক বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়। যার ফলে আমাদের প্রত্যেককে ঘানি, তাঁত ইত্যাদিতে তারা সাধারণ কয়েদিদের মতো কাজে লাগিয়ে দেয়। এইভাবে আমরা বিভিন্ন চাকীতে কাজ করতে থাকি।

১৯৫০ সালে আমাদের রাজনৈতিক মর্যাদা পাওয়ার পরই সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেল। এই হাঙ্গামার সময়ে জেলের পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তার ওপর নাচোলের ঘটনাও ঘটে ফেব্রুয়ারি (জানুয়ারি) ১৯৫০ এ। সে ঘটনায় অন্যান্য দু’জন পুলিশের সাথে একজন A.S.I. মারা যায়। সেই A.S.I. এর স্ত্রী সেই সময়ে প্রত্যেক দিন রাজশাহী কারাগারের গেটে এসে বহুপথে নিয়মিতভাবে বসে থাকতো এবং হিন্দু ও সাঁওতালদেরকে গালাগালি করে এবং নাচোলের ঘটনা সম্পর্কে নানা প্রকার বিকৃত তথ্য বিবৃত করে বলতো যে হিন্দুরা মুসলমান মেরেছে ইত্যাদি। জেলের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং বৃদ্ধির চেষ্টা এইভাবে করতো। সেই সময়ে রাজশাহীর জেলার ছিলো মান্নান নামের একজন। সেও সক্রিয়ভাবে এই প্রচারণা এবং উত্তেজনা সৃষ্টির কাজে উৎসাহ দিতো এবং সহায়তা করতো। কেন্দ্রীয় জেল থেকে ইলা মিত্রকে রাজশাহী জেলে নিয়ে আসার পর তাকে তারা জেল গেটে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে কয়েদিদেরকে দেখাতো এবং বলতো, ‘তোমরা রানীমাকে দেখো। ইনি আবার রানী হয়েছিলেন।’ সাঁওতালরা ইলা মিত্রকে রানী বলতো। এছাড়া ইলা মিত্রের উপর থানা হাজত ও জেলখানাতে বহুবার পাশবিক অত্যাচারও করা হয়। এইসব কারণে সেই সময়ে জেলের মধ্যে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটে যে হিন্দু কমরেডরা ঘরের বাইরে বের হতে পারতেন না। ঘরের সামনে সামান্য একটু খালি জায়গায় বেড়ানোর যে সুযোগ ছিল তাও তাদের জন্য এইভাবে বন্ধ করা হলো। তখন সেই অসহ্য অবস্থা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে আমরা ১৫ দিনের সময় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীনের কাছে একটা মেমোরেন্ডাম দিলাম তাতে বলা হলো যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা যদি বন্ধ করা না হয় তাহলে আমরা তার প্রতিকারের জন্য অনশন ধর্মঘট করতে বাধ্য হবো। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোন জবান না পেয়ে ১৯৫০ এর ২ ফেব্রুয়ারি আমরা আবার অনশন ধর্মঘট শুরু করি। সেই ধর্মঘট চলার নবম দিনে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের সাথে দেখা করে বললেন, আপনারা নিশ্চিত হোন আমরা অবস্থা পরিবর্তনের ব্যবস্থা করছি। এরপর পূর্বোক্ত A.S.I. এর স্ত্রীর জেল গেটে আসা বন্ধ করে দিলো। জেলার মান্নান নাচোল সম্পর্কে বিকৃত সাম্প্রদায়িক বক্তব্যও বন্ধ হলো।

আমাদের দ্বিতীয়বার অনশন ধর্মঘটের পর এবং এক বৎসরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হলে বিভিন্ন চাকীতে যখন কাজ করতে দিলো সে সময় সাধারণ কয়েদিদের সাথে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপিত হতো। তারা সে সময় নানাভাবে উৎপীড়িত হতো কিন্তু উপযুক্ত সহযোগিতা ও সহানুভূতির অভাবে সাহস করে কোন কিছু করতে পারতো না। কিন্তু তারা বলতো যে পাকিস্তান হওয়ার পরেও জেলের মধ্যে মানুষ দিয়ে ঘানি টানাবে কেন? তামাক খাওয়া বেআইনি থাকবে কেন ইত্যাদি। আমরাও তাদের এই দাবিগুলি সমর্থন করি এবং আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতার আশ্বাস দেই। এরপর তারা একটা মেমোরেন্ডাম দেয় জেল কর্তৃপক্ষের কাছে। সেটি মনসুর হাবিব এবং অন্য দু’জন মিলে তৈরি করেন। জেল কর্তৃপক্ষ মেমোরেন্ডামে কর্ণপাত না করায় তারা ৫ এপ্রিল ১৯৫০ সাল থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করে। তাদের সমর্থনে আমরাও ৭ই এপ্রিল থেকে অনশন শুরু করি। অনশন শুরু হওয়ার কয়েকদিন পর কয়েদিদের মধ্যে অনেকে ধর্মঘট ছেড়ে দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রায় এক হাজার কয়েদি ধর্মঘটে অটল থাকে। ধর্মঘটের পঞ্চম দিনে অর্থাৎ ১০ এপ্রিল ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজনস আমীর হোসেন রাজশাহী জেলে গিয়ে কয়েদিদেরকে ধর্মঘট প্রত্যাহার করার জন্যে বলে। আমাদের সাথে আমীর হোসেন এগারো বারো তারিখ দেখা করে বলে যে কয়েদিদের ধর্মঘট আমাদের সমর্থনের জন্যই হচ্ছে, কাজেই আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করলে তারাও প্রত্যাহার করবে। সে বিবেচনায় সে আমাদেরকে ধর্মঘট প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করে। তার কথা মতো কাজ করার কোন প্রশ্নই আমাদের ওঠেনি। কাজেই জেলে অনশন অব্যাহত থাকে। ১৪ এপ্রিল আমীর হোসেন আমাদের সকলকে এবং কয়েদিদের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধিদেরকে ডেকে পাঠালো। কয়েদিদেরকে সে বললো ধর্মঘট প্রত্যাহার করতে। কয়েদিরা বললো, আগে দাবি মেনে নাও পরে ধর্মঘট প্রত্যাহার। ১৫ তারিখে আবার তারা আমাদের সকলকে ডাকলো এবং বললো যে, মানুষ দিয়ে আর ঘানি টানা হবে না। সরকারি পয়সায় তামাক দেওয়া সম্ভব হবে না, তবে তারা নিজের পয়সায় তামাক যোগাড় করতে পারবে এবং তাদেরকে তামাক খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। এছাড়া মারপিট ইত্যাদিও বন্ধ করা হবে। রাজশাহী জেলের ফুটবল মাঠের মধ্যে সেদিনই বিকেলে আমীর হোসেন জেলের প্রায় ২,৫০০ কয়েদিকে হাজির করে বললো, তারা যেন কমিউনিস্টদের সম্পর্কে হুশিয়ার থাকে। ফুটবল মাঠের এই মিটিং শেষ হওয়ার পূর্বেই আমাদের লক আপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সন্ধ্যার পর আমীর হোসেন তালা খুলে ভিতরে এসে আমাদেরকে বললো, ‘বাইরে আপনার বিপ্লব করেছেন। জেলের ভেতরেও এই সব করছেন। এর প্রতিফল কী আপনাদেরকে পেতে হবে।’ ১৫ তারিখের ঘটনার পর এলো ২৪ এপ্রিল। সেদিন সকাল ঠিক পৌনে পাঁচটায় জেলের কোন জায়গাতেই লক আপ খোলা হয়নি। সে সময়ে জেল সুপারিনটেন্ড মিঃ বিল, জেলার মান্নান এবং আর কয়েকজন অফিসার লক আপ খুলে আমাদের ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো। ঘরে ঢুকে তারা বললো এখনই তোমাদেরকে ঘর ত্যাগ করতে হবে। আমরা বললাম, জেলে যখন আছি তখন ঘর ত্যাগ করতে আপত্তি নেই, তবে তৎক্ষণাৎ আমরা ঘর ত্যাগ করতে পারবো না। সকালের চা-নাস্তা খাওয়া শেষ হলে আমরা ঘর ছেড়ে দেব। আমাদের এ কথা শুনে তারা আর কোন বিতর্কের মধ্যে না গিয়ে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে লক করে দিল। এবং বাইরে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পাগলা ঘণ্টী বাজিয়ে দিয়ে জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো।

গুলিতে প্রথম মারা যান কমরেড হানিফ শেখ, তারপর কমরেড আনোয়ার হোসেন। উদ্যত রাইফেলের লক্ষ্যকে উপেক্ষা করে আনোয়ার হোসেন আমাকে এক ধাক্কা দিয়ে বলেন, ‘সরে যাও তোমার বাঁচা দরকার।’ এরপর মুহূতেই একটি বুলেট আমার কপালে সামান্য ক্ষত সৃষ্টি করে আনোয়ার হোসেনের মাথায় লাগে এবং তার মাথা সম্পূর্ণরূপে চুরমার হয়ে যায়। কমরেড সুধীন ধর মারা যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তেও তার সহজ ভাব পরিত্যাগ করেন নি। একটা বিড়ি তাড়াতাড়ি ধরিয়ে তিনি বলেন, সবাই আজ লম্বা বিড়ি ধরাও। আজ আর কারো রক্ষা নেই। এর অল্পক্ষণ পরেই তিনি গুলিতে নিহত হন। কম্পরাম সিংহ মারা যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বলেন, ‘যাঁরা বেঁচে থাকবে বাইরে গিয়ে তাদেরকে বলো লাল ঝান্ডার সম্মান রেখেই আমরা মারা গেলাম’। পাগলা ঘণ্টী শুনে রাজশাহীর এস.পি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হলে সেদিন আমাদের প্রত্যেককেই মারা যেতে হতো। এস.পি সঙ্গে সঙ্গে সেই নৃশংস হত্যাকান্ড বন্ধ করার আদেশ করলেন। তার বাড়ি ছিল হায়দারাবাদে (ডেকান)। তিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে ক্যাপ্টেন ছিলেন সেনাবাহিনীতে। তিনি বলেছিলেন যে, যুদ্ধের সময়ে অনেক মৃত্যু তিনি দেখেছিলেন। কিন্তু অসহায় লোকদেরকে ঘরের মধ্যে গুলি করে মারবার কোন নজির তিনি জানেন না।

২৪ এপ্রিল ১৯৫০এ গুলিতে যারা মারা যান যারা তারা হলেন- বিজন সেন, কম্পরাম সিংহ, হানিফ শেখ, দেলোয়ার হোসেন, আনোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, সুখেন ভট্টাচার্য। আহতদের মধ্যে ছিলেন আবদুল হক, বাবর আলী, আমিনুল ইসলাম, মনসুর হাবিব, ভুপেন পালিত, অমূল্য লাহিড়ী এবং নুরুন্নবী চৌধুরী। গুলিতে আবদুল হকের বাম হাতটি দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় এবং মনসুর হাবিবের জানু ও বাহুতে গুলি লাগে। নুরুন্নবী চৌধুরীর পা কেটে ফেলে দিতে হয়। বাকী চারজনও গুরুতর আহত হন। সেদিন যে ৭ জন আহত হয়েছিলেন তারা সেরে ওঠার পর আড়াই বছর তাদেরকে ১৪ নম্বর সেলে তারকাঁটার বেড়ার মধ্যে রাখা হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি ছিল জেলের মধ্যে আমাদের জন্য একটি বিরাট দিন। গুলি চলার পর থেকে আমাদের জন্য খবরের কাগজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পূর্বে জেলে যেভাবে আমরা এক এক ঘরে থাকতাম এরপরে তার অবসান ঘটে। এরপর থেকে তারা আমাদেরকে সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। আমাদেরকে নিজেদের লোক হিসাবে মনে করলো।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৭।।সংখ্যা-০১, রোববার।। ৩০ এপ্রিল ২০১৭।।


শ্রদ্ধাঞ্জলি – শহীদ সাইদুল হাসান

20130614081243

লেখকঃ ডাঃ এম.এ.করিম

কমরেড আবদুল হক বলতেন, কারবালা প্রান্তর থেকে দুলদুল যখন একা একা ফিরে এলো তখনই সকলে বুঝতে পেরেছিল ইমাম হোসেন শহীদ হয়েছেন, তেমনি সাইদুল হাসান ভাইয়ের গাড়ি যখন ফিরে এলো তখনই তার আপনজনেরা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি শহীদ হয়েছেন। ১৯৭১ সালের ৫ মে তিনি নিখোঁজ হন। ঠিক ঐ তারিখে শহীদ হন কি-না নিশ্চিত নই, তবে ঐ দিন হতে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কেন তাকে হত্যা করা হয়েছিল, কারা তাকে হত্যা করেছিল, তা আজও রহস্যে ঢাকা। আজও আমরা জানতে পারিনি এই বিরাট হৃদয় মানুষটির চির অন্তর্ধানের মূল বিষয়টি।

সাইদুল হাসান আজকের দিনে বিস্মৃত প্রায় একটি নাম। অথচ এমন একটা সময় ছিল দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, শিল্প-সাহিত্যের প্রত্যেক শাখায় এ মানুষটির অবাধ বিচরণ ছিল। যেখানে অন্যায় যেখানে অবিচার সেখানেই প্রতিবাদ মুখর হাসান ভাই। সেটি যত সাধারণ ঘটনা হোক আর বিশেষ ঘটনা হোক। প্রথম যেদিন তাকে দেখি সেদিনের ঘটনাটি উল্লেখ করলেই স্পষ্ট হবে। সন দিন তারিখ এখন আর কিছু মনে নেই। কিন্তু ঘটনাটি স্পষ্ট মনে আছে। কোন সদ্য সিএসপি অফিসারের বিয়ে। তখনকার দিনে বিয়ে এখনকার মতো হোটেল রেস্তোরায় বা কমিউনিটি সেন্টারে হতো না। ছেলে কিংবা মেয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠান হতো। আর্মানিটোলায় এক বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান। আমিও নিমন্ত্রিত। বিয়ে বাড়িতে সাধারণত যা হয় খোশ গল্পে মেতে আছি। দেখি এক সুদর্শন ভদ্রলোক ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলছেন না এখানে আর দাওয়াত খাওয়া সম্ভব হবে না। মেহমানদের ডেকে এনে এমন অপমান। ব্যাপার কি জানতে গিয়ে জানলাম, আমার সার্জারির প্রফেসর ডাঃ আব্দুল্লাহর ছোট ভাই কোন এক সিএসপি অফিসারকে বলেছেন ‘ওতো ঘুষ খায়’। ব্যাস আর যায় কোথা! যতনা সিএসপি অফিসার প্রতিবাদ করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিবাদ মুখর আমার অচেনা ঐ ভদ্রলোক। ডাঃ আব্দুল্লাহর ছোট ভাইতো বার বার বলছেন আমি ঠিক ওভাবে বলতে চাইনি। কার কথা কে শোনে। মহা হুলস্থুল কান্ড। ডাঃ আব্দুল্লাহর ছোট ভাই ভুল স্বীকার করে মাফ চাওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে জেনেছিলাম প্রতিবাদমুখর ভদ্রলোক হলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনৈতিক সাইদুল হাসান।

হাসান ভাইকে প্রথম দেখেই ভাল লেগে যায়। শান্ত শিষ্ট মানুষটি যে অশান্ত হতে পারেন তা কল্পনার অতীত। এর পর থেকে হাসান ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে হাসান ভাই আর বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী ওয়াহিদুল হক সাভারের দাঙ্গা পীড়িত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। দাঙ্গাকারীদের প্রতিরোধ করা প্রতিহত করা একাজে তখন সম্ভবত তার সাথে ছিলেন সাভার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান ইদ্রীস। দাঙ্গা পীড়িতদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য আমাকে বেশ কয়েকবার সাভারে যেতে হয়েছিল। চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র ঔষধ পথ্য দেওয়া এ কাজ হাসান ভাই নিজ উদ্যোগে অনেককে সঙ্গে নিয়ে করেছেন। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করবার জন্য ক্ষতির পরিমাণ সরে জমিনে গিয়ে নির্ধারণ করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে ক্ষতিগ্রস্থদের নামধাম ক্ষতির পরিমাণের তালিকা দিয়ে তা দিতে দাবি করেছেন। দাবি আদায়ে সক্রিয় থেকেছেন। যারা এগুলো না দেখেছে তারা তা বিশ্বাস করতে পারবেন না। একজন মানুষ কতটা অসাম্প্রদায়িক সংবেদশীল হলে এমন উদ্যোগী হতে পারেন সেটা হাসান ভাইকে না দেখলে শুধু অনুমানে সম্ভব নয়।

১৯৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনের পর মাওলানা ভাসানী কাগমারীতে কৃষক সম্মেলন করেন। সে সম্মেলনে আদমজী আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করে। এ ধরনের আডম্বর দেখে আমি সম্মেলনে যায়নি। এতে করে মাওলানা সাহেব খুব অবাক। মওলানা ভাসানী আহুত সম্মেলনে করিম উপস্থিত নেই দেখে মওলানা মনে মনে আহত হন। এর কিছু দিন পর হাসান ভাই আমাকে এক রকম জোর করেই সন্তোষে নিয়ে গেলেন। সাথে কমরেড আবদুল হক ও মোহাম্মদ তোয়াহা। সন্তোষে গিয়ে জানলাম মওলানা যমুনায় বজরা নিয়ে আছেন। আমরা সবাই মিলে যমুনায় গেলাম। মওলানা তো আমাকে দেখে মহাখুশি। আমি বললাম হাসান ভাই আমাকে এক প্রকার জোর করে ধরে এনেছেন। শুনে মওলানা বললেন ‘তুমি কৃষক কনফারেন্সে আইলা না কেন করিম। আমি মওলানার সরল প্রশ্নের উত্তরে বললাম আমি এলে কি হতো বলেন, বড়জোর ২০/৫০ টা মোমবাতি অথবা এক ডজন হারিকেন দিতে পারতাম। ইলেকট্রিক বাতি দিয়ে আলোকসজ্জা করতে পারতাম না। মওলানা আমার ভাষা বুঝে আর কথা বাড়ালেন না।

যমুনার অবাধ মুক্ত হওয়া পেয়ে আমি বললাম- আমি একটু ঘুমিয়ে নেই, আপনারা আলোচনা করুন। আলোচনার মানে রাজনৈতিক বিতর্ক। একদিকে মওলানা আর অন্য দিকে কমরেড আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা মাঝখানে হাসান ভাই। বাক্যালাপ উচ্চস্বরে উঠলেই হাসান ভাইয়ের হস্তক্ষেপ। এদেশে মওলানা ভাসানী, আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহার নাম কমবেশি সবার জানা। কিন্তু বিস্মৃতির দেয়ালে চাপা পড়ে গেছে সদা কর্মব্যস্ত এই মানুষটির নাম। এদেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক অগ্নিপুরুষ ছিলেন হাসান ভাই। যারা তাকে কাছে থেকে দেখেছেন তাদের পক্ষেও এই মানুষটির বিশালতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। মানুষের প্রতি দরদ ভালবাসা ছিল অকৃত্রিম। তাইতো মানুষের দুর্যোগে বিপন্নের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন এই মানুষটি। ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পার্টির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ন্যাপের প্রয়োজনে অকাতরে নিজের পকেট থেকে পয়সা ঢেলেছেন। বাড়িতেই হতো ন্যাপের ওয়াকিং কমিটির মিটিং। মিটিং মানেই বিশাল আয়োজন। হয়তো বলেছি আমরা তো ঢাকার কর্মী নিজেদের বাড়িতে গিয়েই খেয়ে নিতে পারি। যারা মফস্বল থেকে এসেছে ওদের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেই তো হয়। হাসান ভাই শোনেননি। সবাইকে ভুরিভোজ করিয়েই ছেড়েছেন।

অতি সাধারণ বিষয়ে যেমন দৃষ্টি রেখেছেন তেমনি এদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন, সংগ্রাম, সংলাপ সব জায়গায়ই হাসান ভাইয়ের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। সম্ভবত উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর পরই ভুট্টো এসেছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আলোচনা। সেই আলোচনার মধ্যমণি সাইদুল হাসান ভাই। যেমন লাঞ্চ ডিনারের ব্যবস্থা করেছেন তেমনি জাঁদরেল রাজনীতিবিদ ভুট্টোর মোকাবেলা করেছেন। মিডিয়া রাজনীতি অর্থনীতি শিল্প বাণিজ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তার অবাধ বিচরণ এবং এই বিচরণ কোন অমূলক উদ্দেশ্যবিহীন বিচরণ নয়,তার লক্ষ্য ছিল জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ আমলা মুৎসুদ্দি শোষণ মুক্ত স্বাধীন এক স্বদেশ। এই আকাঙ্খা বাস্তবায়নের প্রচন্ড এক তাগিদ আপন সত্তায় অনুভব করতেন- আর এই তাড়নায় তাকে আরও বেশি সামনে এগিয়ে নিয়ে যেত।
হাসান ভাই যেদিন হারিয়ে যান সেই রাতেই আমার সেগুন বাগিচার বাসায় এসেছিলেন। সব সময়ই গাড়ি বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসতেন। কিন্তু ঐদিন গাড়ি ভিতরে না এনে বাইরে রেখেছিলেন। অনেক কথাই হলো কিন্তু প্রতিটি কথাই খাপছাড়া ছিল একটু যেন চিন্তাযুক্ত মনে হচ্ছিল। বেরিয়ে যেতে গিয়ে আবার ফিরে এলেন, কি যেন বলতে চাইছিলেন বলে মনে হলো, আমি বললাম হাসান ভাই কিছু বলবেন, কোন কথা না বলে গেটের দিকে রওনা দিলেন। এমন সময় কে যেন চা নিয়ে এলো। বললাম ভাই চা খেয়ে যান। বললো না আজ যাই আর এক দিন এসে খাব। এই বলে গেট খুলে বাইরে চলে গেলেন এটাই তার সাথে আমার শেষ দেখা। ওদিন ভাবতেও পারিনি হাসান ভাইয়ের সাথে আর কোন দিন দেখা হবে না। ঐ দিন রাতে আর খোঁজ নেইনি। পরদিন হাসান ভাই বিহীন গাড়ি ফিরে এলো। আর তখন বোঝা গেল হাসান ভাই নেই। নেই তো নেই চিরদিনের জন্য নেই। পরে অনেক খোঁজাখুজি হয়েছে কিন্তু পাওয়া যায়নি সাইদুল হাসানকে সকলের প্রিয় হাসান ভাই। হাসান ভাই মারা গেছেন কবে কেন তাকে মেরে ফেলা হয়েছে তা আজও জানা যায়নি। এমনকি তার মৃতদেহটিও পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তখনকার সামরিক গভর্নর টিক্কা খানও অনেক চেষ্টা করেছেন বলে শুনেছি কিন্তু হাসান ভাইয়ের মৃত্যু রহস্য এবং মৃত দেহের কোন হদিসই পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বিষ্ময়ের ব্যাপার তিনি গাড়ি পাকিং জোনে পার্ক করে আজকের রূপসী বাংলা তখনকার ইন্টার কন্টিনেন্টাল এর ভেতরে যান আর ফিরে আসেননি। আমার মনে আজও প্রশ্ন জাগে যে হোটেল হলো সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, সেখান থেকে তাকে অপহরণ করে তাকে হত্যা করা হলো এটা সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার কিন্তু সব সম্ভবের এদেশে সেটাও সম্ভব হয়েছে।

হাসান ভাইয়ের মৃত্যু দিবস নেই। আছে অন্তর্ধান দিবস। একটিই সান্তনা হাসান ভাই অমর, আমরা কোন দিনই তার মৃত্যু দিবস পালন করবো না। একাত্তরে শুধু হাসান ভাই নয় মারা গেছেন ডাঃ ফজলে রাব্বি, ডাঃ আলীম চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, ডাঃ মুর্তোজার মতো ব্যক্তিত্ব। যারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ছিলেন ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার অধিকারী এবং প্রত্যেকেই ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির অনুসারী কর্মী ও নেতা। এরা কোন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। এদেশের জন্য ছিলেন সম্পদ। এরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। এখানেই সাহসের সাথে থেকেছেন। পালিয়ে গেলে যেতে পারতেন, কিন্তু দেশ ছেড়ে যাননি। অন্যদের কথা জানিনা কিন্তু হাসান ভাই সহজেই যেতে পারতেন এ বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। কারণ ঐ দুর্যোগের সময়ে হাসান ভাইয়ের ব্যবসায়ীক অংশীদার এক হিন্দু ভদ্রলোক তার অবিবাহিত তরুণী মেয়েদের নিয়ে কোথায় যাবেন কি করবেন চিন্তায় দিশেহারা তখন হাসান ভাই তার বন্ধুকে সকণ্যা ভারত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। যে ব্যক্তি অন্যদের নিরাপদে দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠাতে পারেন, তিনি নিজেও ইচ্ছা করলে যেতে পারতেন, যাননি। দেশপ্রেমের এমন নিদর্শন বোধহয় বিরল। শুধু হাসান ভাই নয় আমাদের মতো অনেকেই যাননি। এদের অনেকেই শহীদ হয়েছেন আমরা হাতে গোণা কয়েকজন মানুষ বেঁচে আছি। শুনেছি আমাকেও মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। কিন্তু যারা মারবে সেই ‘মুক্তিযোদ্ধাদের’ মধ্যে আমাকে মারা নিয়ে বিভেদের কারণে হয়তো বেঁচে আছি, কিন্তু বাঁচতে পারেননি হাসান ভাইয়েরা।

মৃত্যু মানুষের জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি, সেই মৃত্যু যদি বীরের মতো হয় তাতে গর্ব আছে। হাসান ভাইয়েরা কখনও কোন প্রকার আপোস করেননি। নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন আপোস করেননি। এটি হাসান ভাইদের বৈশিষ্ট্য। আজ ৪৩ বছর পার হয়ে গিয়েছে, আজও মনে হয় সেদিনের কথা। এখনও সেই স্মৃতি জ্বল জ্বল করছে। কত মানুষের সাথেই তো পরিচয় হয়েছে কিন্তু এমন ক্ষণজন্মা পুরুষ কমই দেখেছি। এ মানুষের স্মৃতি তর্পণও গর্বের বিষয়। এসব মানুষ সম্বন্ধে আরও আরও বিস্তারিত লিখে এ প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। বিশাল বিত্ত বৈভবের মাঝে মানুষ হয়েও সাধারণ মানুষের মুক্তির আন্দোলনে শরিক হওয়া মানুষ- আজ ক’জন আছে। সাইদুল হাসান সেই বিরলদের একজন। জীবন দিয়েছেন মাথা নোয়াননি। যে আদর্শ যে নীতিনিষ্ঠতা এই মানুষগুলোকে সাহসী করেছিল সেই আদর্শ সেই রাজনীতি আজ মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া আজ কত বেশি প্রয়োজন্ এদের সাহসী জীবন দান অন্যদেরকে সাহসী হতে প্রেরণা যোগাবে। সাইদুল হাসানের মৃত্যু নেই। সাইদুল হাসান অমর।

সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা


২২শে ডিসেম্বরঃ কমরেড আবদুল হকের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করুন!

15401226_10211486971155831_1564898713_n


বাংলাদেশঃ আগামীকাল কমরেড আবদুল হকের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করবে জাতীয় কমিটি

12392012_655424137932835_5510994464305166450_n

12360194_654607701347812_8913511760735879758_n