প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১৯) ‘বিহারী’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

বিহারী

 

অনেক অপেক্ষার পর

এলো ট্রেন।

যাত্রীদের উঠানামার চঞ্চলতা

কুলিদের হাঁকাহাঁকি।

তার পাশে চোখে পড়ে

অস্থিসার ছিন্নবস্ত্র-

কতগুলো বিভিন্ন বয়সের মেয়েদের

বোঝা নামানোর ব্যস্ততা-

হাঁক-ডাক।

বিবর্ণ-স্বাস্থ্যহীন- হাড়-বেরোনো

মনে হয় প্রাণ ওষ্ঠাগত

তবুও তারা কি কর্মব্যস্ত!

হয়তো দূর থেকে আনা গম-ডাব

বেচে সামান্য লাভে-

বাঁচার প্রহসন করছে তারা।

কেউ উঠে পড়ে আরেক চলন্ত ট্রেনে।

অনেক কষ্টে কেউ মাল উঠায়।

একজন পাদানিতে দাঁড়িয়ে

হাতল ধরে বুক দিয়ে

বস্তা ঠেলে রাখে।

কিন্তু ভারী বস্তা, শীর্ণ শক্তিহীন বক্ষ

ধারণ করতে পারে না।

চলন্ত ট্রেন থেকে

বস্তা সমেত পড়ে যায়-

আমি চমকে উঠি

আসন্ন দুর্ঘটনার সম্ভাবনায়।

পাশ দিয়ে যেতে যেতে

বাঙালী কুলি

তাকে সরিয়ে আনে

ট্রেনের পাদানী

তার পাঁজরার পাশ দিয়ে

চলে যায়।

ব্যথাকাতর মহিলার হাতে

পক্ককেশ বৃদ্ধা

হাত বুলায়।

এরা আমাদের দেশের বিহারী।

এদের বিষণ্ণ স্বরভাঙ্গা

কান্নারুদ্ধ

মৃত-শিশু কোলে মিছিল দেখেছি

ফাইস্যাতলায়।

মা-বোনদের অত্যাচার

আর নিরীহ লোকদের

সার বেঁধে গুলি করে হত্যার ঘটনা

শুনেছি ময়মনসিংহে

দিনাজপুরে

আরো অনেক স্থানে।

লাইনের ধারে

সারি সারি ঘর দেখেছি

ক্ষয়ে যাওয়া মাটির-দেয়াল সাক্ষী

শূন্য কলোনির সারি

অথচ, এখানেও প্রাণের স্পন্দন

ছিল এককালে।

পাক ফ্যাসিস্টদের সাথে

আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্টদের

কোন তফাৎ রয়েছে কি?


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১৮) ‘সন্ধ্যা’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

সন্ধ্যা

জলে ভরা মাঠ-

ডুবে যাওয়া পাটের মাথা

ঝোপ-ঝাড় কচুরিপানা।

কালো জলে-

শাখা-পাতা-গুঁড়ির ছায়া মিলে

সন্ধ্যার অন্ধকারে

রহস্য গড়েছে।

ওপারে গ্রামগুলো

কালো বনের রেখা-

তারপরে শেষ সূর্যচ্ছটায়

রঙীন আকাশ।

শোঁ-শোঁ-শন-শন

দখিনা বাতাস।

গুরু গুরু মেঘের ডাক।

ব্যস্ত গৃহিনীরা

পাট তোলে ঘরে-

ছোট্ট মেয়েরাও কি কর্মব্যস্ত-

প্রাণভরা জীবনের ছবি।

আম-কাঁঠালের সারি

কুমড়োর ঝাঁকা-

ঘরের ছায়া

ত্বরায় ডেকে আনে

সন্ধ্যার অন্ধকার।

ক্লান্ত গৃহিনীরা

রাতের আহার যোগায়-

বেড়ার খোলা পাকের ঘরে

রুটি বেলা আর সেঁকা-

কাঠের চুলো-

পাতার আগুন

ধোঁয়ায় ভরা।

তবুও তারা কষ্ট করে যায়।

আসন্ন মুক্তির সংগ্রামে

কষ্টের শোধ তারা তুলবেই-

সুখময় জীবন তারা গড়বেই।

 


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১৭) ‘নাট্যমঞ্চ’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

নাট্যমঞ্চ

পূর্ববাংলা একটি নাট্যমঞ্চ!

দর্শক  জনতা।

সত্যিকার নায়কের আশায় উন্মুখ!

তারাও নায়কের সাথে

অংশ নেবে নাটকে

দুনিয়া আর সমাজকে পাল্টাবে।

নাটকটি তিন অংকের।

প্রথম অংক-

সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর

চব্বিশ বছর।

প্রথম দৃশ্য-

দুর্দান্ত-প্রতাপ

পাক-সামরিক দস্যুদের

হুংকার লম্ফঝম্প

নির্মম শোষণ লুণ্ঠন

তার সাথে আওয়ামী লীগের

বড় বড় বুলি আর রণধ্বনি।

বিভিন্ন আকৃতির সংশোধনবাদী

কুকুরগুলো পা-চাটা

আর ঘেউ ঘেউ।

নাটক জমে ওঠে।

তৃতীয় দৃশ্যে শিশুর প্রবেশ-

হাতে রক্ত পতাকা-

দৃঢ় পদক্ষেপ!

পাক-সামরিক দস্যুদের চরম হামলা।

আওয়ামী লীগের পলায়ন।

এর মাঝে শিশুর লড়াই-

স্ফুলিঙ্গ দাবানল জ্বালে;

অভিজ্ঞতা আর শক্তির সঞ্চয়।

ভারতের আগমন-

শিশুকে হত্যার চক্রান্ত,

পাকিস্তানের পরাজয়

পূর্ববাংলা ভারতের উপনিবেশ।

প্রথম অংক

এই ভাবে হলো শেষ।

দ্বিতীয় অংকের শুরু।

জনগণের কঠোর উপলব্ধি-

বৃথা হলো তাদের রক্তপাত।

ক্রোধে তারা ফেটে পড়ে-

রক্তের শোধ তারা তুলবেই।

বিশ্বাসঘাতকদের তারা খতম করবেই।

সরল স্মিত-হাসি শিশু-

কৈশোরে পৌঁছায়।

সংশোধনবাদী কুকুরগুলো

নিজেদের মাঝে কামড়া-কামড়ি করে।

কিশোরের পদাঘাতে তারা

ছিটকে পড়ে ড্রেনে।

আওয়ামী লীগের নায়কের বেশ খসে পড়ে-

পাক-দস্যুর মত ভিলেন বেরোয়।

জনগণ তাকে মার মার বলে তেড়ে আসে।

কিশোর দ্রুত যুবকের বয়সে পৌঁছায়

জনগণ তাকেই নায়কে বরণ করে।

দ্বিতীয় অংকের গতি দ্রুততর।

তৃতীয় অংক সমাগত প্রায়।

নায়কের সাথে জনগণ

আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্টদের

তমের দুর্বার সংগ্রাম চালায়।

গড়ে ওঠে ঘাঁটি এলাকা

বিস্তীর্ণ গেরিলা অঞ্চল।

এভাবে দ্বিতীয় অংকের

হলো অবসান।

তৃতীয় অংক-

গণযুদ্ধের রোমাঞ্চকর দৃশ্য।

যুবক, নায়ক, জনগণ

আর শত্রু-

ঘেরাও দমন-পাল্টা ঘেরাও দমন,

গণযুদ্ধের চমৎকার খেলা।

প্যাঁচে প্যাঁচে ফ্যাসিস্টরা খতম।

সচল যুদ্ধ, ঘেরাও যুদ্ধ, অবস্থান যুদ্ধ

কামান-বন্দুক-ট্যাংক।

কী রোমাঞ্চকর, অদ্ভুত শিহরণ!

বিশ্বজনগণেরও দৃষ্টি টানে।

গ্রাম দখল, শহর ঘেরাও

অবশেষে শহর দখল।

যুবক আর জনগণের মহান বিজয়

সমাপ্ত হলো তৃতীয় অংক।

অবশেষে পূর্ববাংলা হলো মুক্ত।

(শিশু হচ্ছে অনভিজ্ঞ সর্বহারা বিপ্লবীরা যারা প্রথম সংগঠিত হয় পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলনে। কিশোর, যুবক হচ্ছে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি)


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১৬) ‘দশ হাজার ফুট উপরে’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

দশ হাজার ফুট উপরে

দশ হাজার ফুট

উপরে

শরতের বিকালে

আকাশটা উজ্জ্বল নীল।

নীচে সাদা মেঘের মিনার-

দিগন্ত বিস্তৃত।

কোথাও উত্তুঙ্গ চূড়া

খাড়া ধ্বংস

উপত্যকা-

মনে হয় বরফ ঢাকা পর্বতমালা।

মেঘের নীচে

সবুজ শ্যামল ভূমি-

খাল-নদী-নালা-

আঁকাবাঁকা।

আলেভরা ক্ষেতগুলো-

চতুষ্কোণে মোড়া।

বিমানবন্দরে

দক্ষিণা বাতাসে

দূরে রানওয়ে ছাড়িয়ে

দোলায়িত কাশবন-

ফুলে ফুলে সাদা।

মনে পড়ে যায়

বিয়েনহোয়া।

সেখানেও কাশবন-

আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল

গেরিলাদের সন্তর্পণ ক্রলিং-এ।

সহসা প্রলয় ঘটেছিল-

মার্কিন আগ্রাসী ঘাঁটিতে-

গেরিলাদের প্রবল আক্রমণে।

এখানেও

আমাদের দেশের শত্রু বিমানঘাঁটিতে

কাশবন আন্দোলিত হবে-

গেরিলাদের আক্রমনে-

মুহূর্তে প্রলয় ঘটবে-

বিমানবন্দরে।

পথ-ঘাট-ঘর-বাড়ি-

চলন্ত নৌকা-ট্রাক-বাস-মানুষ-

শিশুর সাজানো খেলনা।

দ্রুতগামী

শত্রু বিমান

বাজপাখীর মত ছুটে আসবে

শিশুর সাজানো ঘর ভেঙ্গে দিতে।

আকাশের মেঘের মিনার

ঝোপঝাড়-

আচ্ছাদন

অন্তরায় গড়বে

দ্রুতগামী বিমান আক্রমণে।

বাধ্য হয়ে নীচে দিয়ে

শ্লথ গতিতে চলা বিমান-

পাখীর মত সহজ নিশান।

আমাদের গেরিলাদের গুলি খেয়ে-

গোত্তা মেরে পড়বে ধরণীতে

বা

ফেটে যাবে আকাশে

ধোঁয়ার কুণ্ডলী রেখে।

সেদিন আর বেশি দূর নয়।


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১৫) ‘সন্ধ্যা’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

         সন্ধ্যা             

শেষ বিকেলে-

বাতায়ন পথে

শিশুদের কোলাহল

শোনা যায়।

মাঠের শিশুদের মাতামাতি

ছাড়িয়ে-

কলোনির হলদে বাড়িগুলোর

খোলা জানালা

তারপর

আবছা আঁধার ঘর-

এখনো বাতিগুলো জ্বলেনি।

হয়ত গৃহিনীরা

সারাদিনের খাটুনি

আর-

স্বাধীনতার ব্যর্থ পরিহাস-

অভাব-অনটন

নিরাপত্তার চিন্তার ক্লেশ সেরে

বারান্দায় দাঁড়িয়েছে,

দিগন্তের পানে চেয়ে।

হয়ত ক্ষণিকের জন্য

থেমে গেছে তারা।

সন্ধ্যার আগমনে

কালো হয়ে আসা জগৎটা-

নীড়ে ফেরা পাখীর কাকলি;

শিশুদের কোলাহল।

তারপর-

জ্বলে ওঠে বাতিগুলো।

ঘরে ঘরে আলো।

শিশুরা ফিরে আসে।

শেষ সন্ধ্যায় শূন্য মাঠ।

গৃহিনীরা ফিরে আসে

কষ্টকর জীবনের মাঝে।

তাদেরও মনে জেগে উঠে

স্বাধীনতার পরিহাস থেকে

মুক্তির আকুতি।

(নোটঃ কবি এ কবিতাটিকে গানে রূপ দিয়েছেন)


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১৪) ‘একটি সংগ্রামী এলাকা সফর’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

একটি সংগ্রামী এলাকা সফর

 

বাস থেকে নেমে চলেছি আমরা

হাটের মাঝ দিয়ে।

মনে হয় কতকালের চেনা পথ

অথচ কখনো আসিনি এখানে!

অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা কুরিয়ার

পথ দেখায়।

হাটের কেরোসিনের কুপি

দোকান ফেলে চলি

গ্রামের পথ বেয়ে।

কুরিয়ার চলে

দূরত্ব রেখে

বিরাট কোট গায়ে

মাফলার জড়িয়ে

একা একা দ্রুত পায়ে।

মনে হয় আমাদের সাথে নেই কোনো পরিচয়।

অন্ধকার রাত

ভীষণ কুয়াশা।

চুল ভিজে আসে

অল্প দূরেও দেখা যায় না।

রাস্তার পাশে

মাঝে মাঝে এক আধটা দোকান-

টিম টিমে বাতি আর-

আবছা লোকজন চোখে পড়ে।

অনেক পথ-আর ফুরোয় না

চুপ চাপ হাঁটা-

কথাও অসুবিধা।

অবশেষে ক্ষেত ভেঙ্গে

আশ্রয়।

কমরেডদের সান্নিধ্য।

অনেক কথা-

অনেক ভালোবাসা

অনেক আলোচনা

নিস্তব্ধ রাত

শেয়ালের ডাক-

আমাদের বিশ্রামের ইঙ্গিত জানায়।

ফেরার পথে লঞ্চে

বসে আছি অপেক্ষায়।

অনেক রাত, কুয়াশা

খালপাড়ে বাঁধা নৌকো।

জলের মাঝে বাতিগুলো

লাল আলোর স্তম্ভ-

ছোট ছোট ঢেউয়ে কম্পমান!

অবশেষে রাত ভোরে

কুয়াশার মাঝ দিয়ে

লঞ্চ চলে-

বিশাল তেঁতুলিয়ায়।

এই নদী বেয়ে চলে গেছে

আমাদের গেরিলারা সমুদ্র পাড়ে।

কুকরী-মুকরী আরো

অজানা চরে-

শত্রু সংহারে।

লঞ্চ থেকে নেমে

কৃষকের দেওয়া

খেজুরের রস খেয়ে

ফিরে আসি গন্তব্যস্থানে।


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১৩) ‘নবীনতারা’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

নবীনতারা

নবীনতারা

তোমার নাম!

মহাকাশের কোলে

জ্বলছো উজ্জ্বল ঝিকিমিকি করে।

কত তারা জ্বলে-

গেছে নিভে,

আরো কত তারা জ্বলছে

আরো কত তারা রয়েছে অপেক্ষায়।

নবীনতারা

স্বাগত তোমায়।

মহাকাশ-তারকামণ্ডল-

তার মাঝে নবীন তারা

জ্বলছো উজ্জ্বল।

কিন্তু তুমিও যাবে নিভে

জ্বলা আর নেভার

অন্তহীন আবর্তে

তুমিও যাবে হারিয়ে

সীমাহীন মহাকাশে।

নবীনতারা

স্বাগত তোমায়।


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১২) ‘ট্রেনের বাইরে রাত’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

ট্রেনের বাইরে রাত

চাঁদনী রাত, হিমেল হাওয়া।

দ্রুতগামী ট্রেনে চলেছি আমরা।

আবছা আঁধারে

লাইনের ধারে

ঝোপ-ঝাড় গাছগুলো

দ্রুতবেগে চলে যায়।

ফালি ফালি আঁকাবাঁকা

পায়েচলা পথ-

আলেভরা ক্ষেতগুলো

মিশে গেছে গ্রামে।

ঝোপ-ঝাড়-গাছ-গাছালি;

ছনেঢাকা কুঁড়ের ছায়া;

মাঝে মাঝে ছোট ছোট খাল-

জলের রেখা;

ক্ষেতগুলো জলে ভরা

তার মাঝে আকাশের ছায়া;

আবছা রহস্য ঘেরা।

মাঝে মাঝে চমকে উঠে আলোর মেলা

আধুনিক কারখানা।

তার পাশে, আবছা আঁধারে

ছনে ঢাকা কুঁড়ের ছায়া-

ক্লান্ত শ্রমিকেরা

ঘুমিয়েছে মাটির বিছানায়।

অতিরিক্ত বোঝাই কামরায়

ক্লান্ত কমরেড ঘুমে ভেঙ্গে পড়ে।

বাইরে আলোর মশাল হাতে স্টেশন

ঝোপ-ঝাড়-গাছ-গাছালি-

দ্রুতবেগে চলে যায়।

তারপর আলেভরা ক্ষেত

দূরে বনের দেয়াল;

মেঘহীন আকাশ

মিটমিটে তারা

আধখানা চাঁদ

চলছে আমাদের সাথে।

ঐ আলগুলো কবে উঠে যাবে!

রাতেও কর্মব্যস্ত ক্ষেতগুলো

কবে জনগণের সম্পদ যোগাবে!

আলোয় উজ্জ্বল কারখানা-

তার পাশে আবছা আঁধারে-

ছনেঢাকা কুঁড়ের শ্রমিকেরা

কবে মানুষের মত বাঁচবে?


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১১) ‘ডি.এন.এ’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

ডি.এন.এ

ডি.এন.এ’র সর্পিল সিঁড়ি-

এর মাঝে আঁকা জীবনের জটিল কোড।

ধাপে ধাপে কোড থেকে নির্দেশ যায়ঃ

ডি.এন.এ-

আর.এন.এ-

-প্রোটিন কোষ।

এমনি ভাবে গড়ে উঠে

মানব আর জীবন্ত জগত।

হাজার বছরের অজানা রহস্য

কত ভাববাদ- আর অধিবিদ্যার

দুর্ভেদ্য রাজত্ব,

কত শোষণ আর লুণ্ঠনের হাতিয়ার;

অবশেষে ভেঙ্গে যায়

বিজ্ঞানের দুর্বার যাত্রায়।

জীবন-রহস্য উদঘাটিত

সকল কুসংস্কার ভাববাদ-অধিবিদ্যা

উড়ে যায় ধোঁয়ার মত।

সমাজ আর প্রকৃতির বিকাশে

বিজ্ঞান রেখে যায় মহান অবদান।


প্রতিদিন কমরেড সিরাজ সিকদারের কবিতা- (১০) ‘পেয়ারাবাগান, মহান পেয়ারাবাগান’

poster, siraj sikder, 17 X 22 inch, 2 colour, 2005

পেয়ারাবাগান, মহান পেয়ারাবাগান

তোমরা কি দেখেছো পেয়ারাবাগান?

শুনেছো ভিমরূলী, ডুমুরিয়া-

আটঘর-কুড়িয়ানার নাম?

এখানে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়েছে

আমাদের পার্টি,

গড়েছে গেরিলাযুদ্ধের ঘাঁটি।

সারি সারি পেয়ারা গাছ

মাঝে মাঝে ছোট ছোট খাল-

জোয়ার-ভাটার খেলা;

ঝিঙে-শশার ঝাঁকা

ঢেঁড়স-আখক্ষেত

সবুজে ঢাকা।

রাতের অন্ধকারে

খাল বেয়ে

গেরিলাদের নৌকা

নিঃশব্দে চলে যায়।

দুই পারে আখক্ষেত

জোনাকিরা জ্বলে আর নেভে।

বিজয় উৎসবমুখর ঘাঁটি এলাকায়

আলোর দেয়ালী যেন।

সারাদিন শত্রুর গোলা

আগুন আর ধোঁয়া।

শত্রু অপেক্ষায়

আমরা এ্যামবুশ পাতি।

পেয়ারা গাছের ঝোপে ঢাকা

খালগুলো চমৎকার ট্রেঞ্চ।

এর মাঝে আমাদের গোপন আস্তানা।

যুদ্ধ ক্লান্ত গেরিলারা

সন্ধ্যায় হাজির হয় ক্যাডার স্কুলে।

যুদ্ধ আর সংগঠন, পার্টির ক্লাস।

মনে হয় বাংলার ইয়েনান-

এই পেয়ারাবাগান!

গ্রাম পরিচালনা কমিটি

গ্রামের কাজ চালায়।

স্থানীয় গেরিলা ইউনিট

গ্রামরক্ষী বাহিনী।

ঘরে ঘরে জনগণ

সংগঠিত হয়।

বহু গ্রাম-বিশাল এলাকা

লক্ষ লক্ষ জনগণ;

গেরিলারা এদেরই রক্ত-মাংস।

একটিও খবর বেরোয়না।

শত্রুচরেরা ঢুকতে সাহস পায় না।

প্রতি খালে পথে পাহারা

ঘরে ঘরে দুর্গ গড়া।

শত্রু কামানের শব্দ

গেরিলা আর জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ।

এর মাঝে গড়ে উঠে-

’৭১-এর ৩রা জুন-

‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি’।

সমাপ্ত হয় পূর্ববাংলার শ্রমিক আন্দোলনের

ঐতিহাসিক ভূমিকা।

আমাদের পার্টি-

পূর্ববাংলার সর্বহারা আর জনগণের

আশার আশা, প্রাণের প্রাণ-

তাদের নেতা, নতুন ভরসা-

অন্ধকার আকাশে ধ্রুবতারা।

পূর্ববাংলায় শুরু হয় এক নতুন ইতিহাস;

পেয়ারাবাগান জন্ম দেয়।

আরেক মহান ঘটনার।

আওয়ামী লীগ পালিয়েছে ভারতে

পূর্ববাংলায় আর প্রতিরোধ নেই।

পার্টির নেতৃত্বে

পেয়ারাবাগানের স্ফুলিঙ্গ

ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে দাবানলের মত।

কণ্ঠে-কণ্ঠে, ঘরে-ঘরে

প্রতিধ্বনিত হয় পার্টির বিজয়গান।

পেয়ারাবাগান শত্রু-প্রাণের শঙ্কা

তাদের ঘুম কেড়ে নেয়।

পাক-সামরিক দস্যুরা

পাগলা কুত্তার মত মরিয়া হয়ে উঠে।

কয়েক জেলা থেকে খুনীরা একত্রিত হয়।

পেয়ারাবাগানে চালায়

প্রচণ্ড ঘেরাও দমন।

বন্দুকের ডগায়

দূর দূরাঞ্চল থেকে

লোক ধরে আনে

পেয়ারা বাগান কাটে।

দেশব্যাপী গেরিলাযুদ্ধের

দাবানল জ্বালাবার আশায়-

গেরিলারা সরে আসে-

নিরাপদে।

পেয়ারাবাগান।

গণযুদ্ধের মহান উপাখ্যান।

আমাদের ড্রেস রিহার্সেল।

দেশব্যাপী গণযুদ্ধ

পরিচালনার মহান পীঠস্থান!